১৪ এপ্রিল, ২০১১

আমার পয়লা বৈশাখ : আইভি চট্টোপাধ্যায়


পর্ব -এক
শুভ নববর্ষ । পয়লা বৈশাখ । বাঙালির নিজস্ব দিন ।
আমার ছোটবেলার পয়লা বৈশাখ মানে প্রভাতফেরি, বিকেলে গানের জলসা । বাংলা ক্যালেন্ডার, নতুন পজ্ঞিকা, হালখাতা, মিষ্টির বাক্স । চড়কের মেলা, গাজন । সকাল সকাল নতুন জামা । মা-ঠাকুমার সঙ্গে মন্দিরে যাওয়া । দুপুরে পঞ্চব্যঞ্জন । সব বাঙালি রান্না । সুক্তো, ঝিঙেপোস্ত, ধোকার ডালনা, রুইমাছের কালিয়া, গলদা চিংড়ির মালাইকারি, মাংস । আমের চাটনি, কিশমিশ দেওয়া পায়েস । সন্দেশ, রসগোল্লা ।
সকালে উঠে মা বলবেন, ‘আজ সারাদিন ভালো মেয়ে হয়ে থাকবে । কোন দুষ্টুমি করবে না .. কারো কাছে যেন বকুনি খেতে না হয় । হাসিমুখে খুশিমনে থাকবে সারাদিন, তবে সারা বছর এইরকম ভালো কাটবে ।‘
আমরা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতাম । ঝগড়া দূরে থাক, সেদিন কেউ কাউকে একবার জোরে কথাও বলব না ।
এইরকম দৃশ্য পাড়ার সব বাড়িতেই ।
আমাদের পয়লা বৈশাখের আগের দিন হরবিন্দর-গুরপ্রীতদের নববর্ষ ‘বৈশাখী’ হয়ে গেছে .. বিশাল মিছিল বেরিয়েছিল ওদের .. সেইসঙ্গে গুরুদোয়ারায় খাওয়া দাওয়া । মিনি ভার্গিস শুকনো মুখে আছে, কারণ এবছর কেরালার নতুন বছর ‘ভিশু’ পড়েছে আরো দুদিন পরে । মৃদুলা-প্রাচীদের মারাঠী নববর্ষ ‘গুডি পারোয়া’ আমাদের সঙ্গেই পড়েছে, কিন্তু ওদের এত হৈ হৈ ব্যাপার নেই .. বাড়ির দরজায় রঙ্গোলি আঁকবে আর গণেশপুজো করবে । গত সপ্তাহে শৈলজা রেড্ডিদের নতুন বছরের অনুষ্ঠান ‘উগাডি’ হয়ে গেছে .. ওদেরও মারাঠীদের মতই আল্পনা আর পুজো .. সাদা রঙের আল্পনা .. ভারি সুন্দর । হৈ হল্লা নেই । অসমীয়াদের আজকের দিনে ‘বিহু ফেস্টিভাল’ হবে .. শ্রুতি বড়ুয়া আমাকেও বিহু নাচে শামিল করবে বলেছিল .. আমি যাব কি করে ? সন্ধেবেলা আমাদের জলসা আছে না ? নেপালীদের নববর্ষ পালন হল মোটামুটি ‘উগাডি’র সময়, কান্তা আর ক্রেনো আমাদের ‘মায়ার খেলা’য় নাচ করবে এবার । বাবার বন্ধু আনন্দআঙ্কল কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ .. ওঁদের বর্ষবরণ ‘নবরে’ অনুষ্ঠানের লাল সেমাইয়ের পায়েসের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে । আনন্দআঙ্কলের ছেলে মহেন্দ্র এবার আমাদের গানের দলে গান গাইবে । কেটি বাথেনাদের পার্সী নিউ ইয়ার হয়ে গেছে একত্রিশে মার্চ, বাথেনারা ইরানীরা আমাদের পয়লা বৈশাখে আসবেনই ।

বিশুদ্ধ পঞ্জিকা কেনা হয়েছে .. পঞ্জিকা পড়াটা খুব মজার । আমি বিজ্ঞাপনগুলোও পড়ে ফেলি .. অনেক অচেনা শব্দ .. ছোটনদি আর দোলাদি চোখে চোখে হেসে বিজ্ঞাপনের সব বুঝে ফেলে । গোপন ইশারাটা কিছুতেই বুঝি না আমি । হেসে হেসে আমার মোটা কলাবিনুনী ধরে নেড়ে দেয়, ‘তুই এখন দুধভাত ।‘ এইটা শুনলেই খুব রাগ হয় আমার । ‘আর কোনদিন তোমাদের সঙ্গে খেলব না’ বলে এসে বিছানায় মুখ গুঁজি ।
ঠাকুমা এসে আদর করে চোখের জল মুছিয়ে দেন, ‘আমার সোনা মেয়ে বচ্ছরকার দিন কাঁদে কেন ? আয়, তোকে পঞ্জিকা দেখতে শেখাই ।‘ মঘা, অশ্লেষা । শিহরণ জাগানো শব্দ সব । তিথি নক্ষত্র । উপোস ব্রত । পরিবার পরিজনের কল্যাণকামনার বার্তা ।
মা একটু রাগ করেন । অল্পবয়স থেকে এসব ব্রত তিথি নক্ষত্রের হিসেব শেখানো মায়ের পছন্দ নয় । অবশ্য ঠাকুমার মুখের ওপর সে কথা বলার সাহস নেই মায়ের । আমাকে কোলের কাছে বসিয়ে বাংলা ক্যালেন্ডারের গল্প করবেন । হিজরি ক্যালেন্ডার থেকে কিভাবে বাংলা ক্যালেন্ডার আলাদা রূপ নিল, মা সেই হিসেব শেখাবেন । হিজরি ক্যালেন্ডারে পৃথিবীকে চন্দ্র-পরিক্রমার হিসেব হয় । বাংলা ক্যালেন্ডারের হিসেব পৃথিবীর রবি-পরিক্রমা দিয়ে । মা বুঝিয়ে দেবেন, সেইজন্যেই হিজরি ক্যালেন্ডারে বছরে এগারো-বারো দিন কম ।
বাবা দিনের মধ্যে কতবার যে বাজারে যাবেন । আমি বাবার হাত ধরে ঘুরব । বাবা হালখাতার মানে বুঝিয়ে দেবেন । পয়লা বৈশাখের দিন থেকে দোকানীদের ফিনান্সিয়াল ইয়ার শুরু হয় ।
আমাদের ছোট্ট পপা ‘পয়লা’ বলতে পারে না । বাবার হাত ধরে ঝুলে পড়বে, ‘আমিও পেয়ালা বোশেখের বাজারে যাব’। বাবা পপাকে নিয়ে সুরুচি মিষ্টান্ন ভান্ডারে যাবেন, মিষ্টি দৈ আর রকমারি মিষ্টি কিনবেন । সুরুচির দোকানের সামনে বসে আড্ডা দেওয়া পাড়ার ছেলেরা ডাক দেবে, ‘এই পপা, আজ কি দিন রে ?’
পপা অমনি সুর করে বলে উঠবে, ‘পেয়ালা বৈ ই ই ই শাখ ।‘ সবাই হৈ হৈ করে হাসবে । পাড়ার দাদাদের দেওয়া লজেন্স বিস্কুট দু’হাত ভরে নিয়ে ছোট্ট পপা বাড়ি ফিরবে । 

সন্ধেবেলা জলসা । বাবারা সবাই সাদা ধুতি, সাদা পাঞ্জাবী । মায়েরা তাঁতের শাড়ি, সোনার গয়না । আমরা লালপাড় সাদা শাড়ি, মাথায় ফুল । আমরা গান গাইতে শুরু করলেই পর্দা সরবে ।
হারমোনিয়াম বাজাবে শমিতাদি । আমায় খুব ভালোবাসে, ইশারায় পাশে ডেকে নেয় । তবলা বাজাতে বাজাতে মাণিকদা ইশারা করেন .. ছন্দা আর মল্লিকার গম্ভীর মুখ .. ওরা মাইকের সামনে দাঁড়াতে পারে নি । আমি ছন্দার হাত ধরে শমিতাদির পাশে টেনে নিই, মল্লিকার হাত ধরে বুনিদির পাশে । ছন্দা আর মল্লিকা হেসে ফেলে । শমিতাদি মিষ্টি হেসে ঘাড় নেড়ে দেয় ।একটুখানি ছেড়ে দিলেই যে অনেকখানি পাওয়া হয়ে যায় তা বুঝে ফেলে আমিও হাসি ।
কুচোকাচাদের আবৃত্তি । তারপর আবার গান । গানের মাঝে উদাত্ত গলায় আবৃত্তি করবেন শিবাজিদাদা ।
ছোটদের নাটক । এক বছর ‘অবাক জলপান’, আরেক বছর ‘ডাকঘর’ । দেবকাকু বলেছেন এবার ‘সামান্য ক্ষতি’ গীতিনাট্যরূপ হবে, আমি পরিচালনা করব । আমার চেয়েও বেশি খুশি ছন্দা আর মল্লিকা । সবশেষে শিশুতীর্থের ‘মায়ার খেলা’ .. গান আবৃত্তি নাটক নৃত্যনাট্য .. জমজমাট ব্যাপার ।
কোনো এক বছর সত্যেনজ্যেঠু আমাকে নববর্ষ অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা লিখতে বললেন । সত্যেনজ্যেঠু আমাদের পাড়ায় একজন গণ্যমান্য মানুষ । সেই জ্যেঠু আমায় লিখতে বলেছেন .. আহা আর কি চাই জীবনে ! আমার লেখা লাইনগুলো পড়বে শৌভিক আর বুবুন । আনন্দে চোখ জ্বালা করে আমার ।
সারা বছর অপেক্ষায় থাকি, কবে আসবে পয়লা বৈশাখ ।


পর্ব -দুই
মিলুবৌদি মাঝে মাঝেই ফোন করেন, ‘মোহর আর তিতলি যখন গল্প করে, শুনেছ ? হয় হিন্দি, নয় ইংরেজি । হ্যাঁগো, দুজন বাঙালি মেয়ে গল্প করবে আর একটাও বাংলা শব্দ বলবে না?’
সে ভাবনা তো আমারও । মোহর আর তিতলি দুজন কেই বেশ বাবা বাছা করে বোঝাই । আজকাল আর বকাঝকা করার চল নেই । দুই বন্ধু হেসে গড়ায়, ‘মা/কাকিমা তোমরা বড্ড পুরানা জমানা । আরে, কমিউনিকেট করাটাই আসল । বাংলা বললাম কি হিন্দি কি ইংরেজি .. কি যায় আসে?’
প্রিয়াঙ্কার মা করুণ গল্প করেন, ‘জানো, দুই ছেলে মেয়ের একজনও বাংলা বলে না । যতই বকি, ওদের কোনো হেলদোল নেই ।‘
অভিষেকের মা রাগ করেন, ‘কি সব অদ্ভুত অদ্ভুত বাংলা শব্দ শিখেছে অভিষেক । আমি তো মানেই বুঝি না । ল্যাদ, একঘর, ঢপ .. এমন সুন্দর বাংলা ভাষার কি অবস্থা । আমার কান্না পায় ।‘
অভিষেককে দোষ দিই বা কি করে ? কলকাতা থেকে আসে বাংলা কাগজ । তাতে এমন সব শব্দের ব্যবহার দেখি, আমাদের বাঙালি সত্তাটা ধাক্কা খায় । প্রবাসী মায়েদের বড় সমস্যা ।
বিনু ভার্গিস আমাকে বোঝায়, ‘তোমার তিতলি তো তবু বাংলা বোঝে । একটু হলেও পড়তে পারে । আমার মিনি তো মালয়ালাম বলতেই পারে না । দেশের বাড়ি গেলে যে কি লজ্জায় পড়ি !’
বলে নির্মলা রাগম, সতবিন্দর কাউর, মৃদুলা আপ্তেও ।
ললিতা পান্ডে, শীলা মিশ্রারাও বলে, ‘জানো ভোজপুরী মগহি বলতে ছেলেমেয়ের লজ্জা করে ।‘ ওরা একরকম মেনেই নিয়েছে । আমাদের বাঙালি মায়েদের এইটা মেনে নেওয়া হয় না বলেই সমস্যা ।
আমরা ঠিক করি, নববর্ষ পালন করব ।  বকুলদি, মীরাদি, সংযুক্তা, সুপ্তি, মুনমুন আমরা সবাই ।
এমনিতে আমাদের ক্যাম্পাসে সারাবছরই হৈ হৈ । নীলম-সরিতাদের ব্যবস্থায় ‘হোলি মিলন’ হয় । অনুপা-সতবিন্দরদের ‘লোড়ি’, মহাপাত্ররা জন্মাষ্টমীর দিন ঝুলন করে । কৃষ্ণনদের ‘দিওয়ালি মিলন’, আমাদের ‘বিজয়া সম্মেলন’, কোশি-থমাসদের ‘ক্রিসমাস পার্টি’ ।
গেট-টুগেদার । বেশ খাওয়াদাওয়া .. কাঁথা-আড়ি-বমকাই-ঢাকাই .. জরদৌসি-শিফন-পৈঠানি .. জ়ৈনদের ছেলের সঙ্গে মিশ্রাদের মেয়ের মাখামাখি .. এগজিকিউটিভ স্বামীদের অফিসের গল্প থেকে শাশুড়ির নিন্দে .. কিছুই বাদ যায় না ।
‘বঙ্গালি নয়া সাল সেলিব্রেশন’ .. সেটা আবার কি ? এমনিও বাঙালিরা তেমন পুজোআচ্ছা করে না, শ্রাবণমাসেও মাছ-মাংস খায়, বাঙালি বৌরা খুব স্বাধীন .. এসব নিয়ে নানা নালিশ আছেই । আবার এ কি? পুজো টুজোর ব্যাপার নেই, শুধু নাচগান । এই ‘পহেলা বৈশাখ’ জিনিসটা কাউকে বোঝানো যায় না ।
তাতে আমাদের বয়েই গেল ।

রায়বৌদি কোমরে কাপড় জড়িয়ে মেয়েদের দলকে ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে’ শেখান, একমুখ উজ্জ্বল হেসে ঘাম মুছতে মুছতে বলেন, ‘বড্ড মোটা হয়ে গেছি যে, নইলে কলেজে সব নৃত্যনাট্যে আমিই তো নায়িকা হতাম ।‘
তিতলি মোহর কিঙ্কি প্রিয়া সোনাইকে নিয়ে আমি খরগোশ আর কচ্ছপের গল্পটা নাটক করাই ।
বিনু ভার্গিসের মেয়ে ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে’ গ্রুপ-নাচে অংশ নেয় । গুরপ্রীতের ছেলে গুড্ডু ‘হবুরাজার গবুমন্ত্রী’ হয়ে দারুণ অভিনয় করে । কুচোরা জোরগলায় ‘তাঁতীর ঘরে ব্যাঙের বাসা’ আবৃত্তি করে ।
গৌতমদা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গানের দল তৈরী করে ফেলেন .. ‘সব ঠিক হয়ে গেছে বৌদি, শুধু হারমোনিয়ামটা যদি আপনি ম্যানেজ করে নেন’ .. খুশি হয়ে উঠে আমি মাণিকদাকে খবর পাঠাই .. তবলাটাই বা বাকি থাকবে কেন ?
রোজ রিহার্সাল । কিন্তু কিন্তু মুখ করে একদিন ডঃ গুপ্ত এসে পড়লেন । নামী শিশু-বিশেষঞ্জ সবাই জানি, এমন মন–ভরানো কান-জুড়োনো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন, কে জানত !
সন্ধেবেলায় জলসা । ধুতি পাজ্ঞাবির দলে ‘ওরা জীবনের গান গাইতে দেয় না’ । আমরা ঢাকাই শাড়িতে ‘এসো হে বৈশাখ’ । ধাক্কাপাড়ের ধুতি কাঁথাকাজের পাজ্ঞাবি প্রশান্ত সিনথেসাইজার বাজাবেন, সারাবছর দেখা পাওয়াই যায় না .. ব্লাস্ট ফারনেসের দায়িত্ব কম কথা ? আজ কাজ থেকে ছুটি । কনভেন্টে পড়াশোনা করা সুস্মিতা স্বামীর সিনথেসাইজারের সঙ্গে গাইবেন ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ ।
সাদা ধুতি সাদা পাজ্ঞাবি বাসুদা মাউথ-অর্গ্যান । কসমোপোলিটান শহরে বাস । আলাদা করে বাঙালি বলে চিনে নেবার উপায় নেই । এ শহরে এই একদিন আমরা বাঙালি হয়ে উঠি ।
তিতলি মোহর উজ্জ্বল মুখে ঘোরে, এবছর পয়লা বৈশাখে গান গাইবার পর ছাব্বিশে জানুয়ারি-পনেরো আগস্টের অনুষ্ঠানে গান গাইবার ডাক পেয়েছে । সারাবছর ক্যাম্পাসের বাচ্চারা ‘পয়লা বৈশাখ’-এর অপেক্ষায় থাকে ।

সকালে উঠে মেয়েকে বলি, ‘আজ সারাদিন ভালো মেয়ে হয়ে থাকবে । কোন দুষ্টুমি করবে না, কারো কাছে যেন বকুনি খেতে না হয় । হাসিমুখে খুশিমনে থাকবে সারাদিন, তবে সারা বছর এইরকম ভালো কাটবে ।‘
মা-বাবাকে প্রণাম করতে যাই । মা একমুখ হেসে বলেন, ‘এই দ্যাখ, পেয়ে গেছি । আয় তিতলি, তোকে দেখা শেখাই ।‘
আমি হাসি, ‘মা, তুমিও !’
মা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন, ‘সেই ছোটবেলায় বৌ হয়ে এসেছি, যা কিছু শেখা সব তো তোমার ঠাকুমার কাছেই । আচার বিচার সংস্কারে কেন আনন্দ পেতেন উনি, আমিও এখন জেনেছি । তবে তুমি যদি না চাও, তোমার মেয়েকে না হয় পাঁজি দেখা শেখাব না ।‘
‘তুমি’ করে বলা মানেই মায়ের রাগ হয়েছে । বাবার মুখে চাপা হাসি । আমি মানে মানে সরে আসি । মা বিজয় উল্লাসে নাতনিকে তিথি নক্ষত্র, ব্রত উপবাস শেখান । শিখুক । ক্ষতি নেই । এ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ।
ইউনাইটেড ক্লাবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয় ঘটা করে । সব বাঙালির সেখানে যাওয়া চাই । পাশের বাড়ির সুজাতা, নতুন বিয়ে হয়ে এ শিল্পশহরে এসেছে, এখনো শহরটার সঙ্গে চেনাজানা হয় নি । বলি, ‘আমাদের সঙ্গে ক্লাবে চলো, কেমন নববর্ষ পালন করি আমরা দেখবে । এখন থেকে তোমাকেও চাই যে ।‘
সন্ধেবেলার সুজাতা, পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর । দেখে চোখ ফেরাতে পারি না । বাঙালি সাজের মত এমন সুন্দর সাজ আছে নাকি ? লাল লাল মুখে সুজাতা নালিশ করে, ‘তোমার ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল বৌদি । বলছে ধুতি- পাজ্ঞাবি পরে কেউ ক্লাবে যায় না ।‘
তাপস আমাকেই সালিশ মানে, ‘বোঝাও বৌদি । এখানে ওসব হয় না । এ কি কলকাতা নাকি ?’
আমি মজা পেয়ে হাসি । সন্ধেবেলা যে এখানেও সব অন্যরকম দেখবে তাপস । মস্ত কর্পোরেট লিডার মুখার্জিসাহেব সেনসাহেব চ্যাটার্জিসাহেব কেমন ধুতি-পাজ্ঞাবি বাঙালি সেজে আস বেন । ডঃ অমিত চ্যাটার্জি বাংলা কবিতা আবৃত্তি করবেন । রকমারি বাঙালি খাবার, বাংলা গান । এবছর মহাশ্বেতা দেবী প্রধান অতিথি । ‘ক্যাকটাস’-এর গান .. সন্ধেবেলা আবার তাপসের মনে হবে, ‘এ কি কলকাতা নাকি ?’

মিলুবৌদির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল খাবার জায়গায় । গলা নামিয়ে হেসে বললেন, ‘দেখছ, তিতলি মোহর কেমন বাংলায় কথা বলছে ?’
পাশ থেকে শ্রাবণীও হেসে অঠে, ‘আমিও লক্ষ্য করেছি বৌদি, সারা সন্ধে ধরে তিতলি মোহর ঋভু গোগোল বাংলা বলছে ।‘
আমিও দেখেছি । তিতলিরাও খুব খুশি । আমাদের পয়লা বৈশাখ আছে । আমাদের ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ নেই । বাংলা নিয়ে আমাদের আবেগ, বাঙালি হওয়া নিয়ে আমাদের অহঙ্কার । আমাদের যাপন, আমাদের মূল্যবোধ, পুরোনো যা কিছু তা নতুন করে চিনে নেবার তাগিদ আমাদের আছে ।
সারাবছর অপেক্ষায় থাকি, কবে আসবে ‘পয়লা বৈশাখ’ ।  


আইভি চট্টোপাধ্যায়
পেশা :স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় কর্মরতা
নেশা জমিয়ে গল্প লেখা এবং ব‌ইপড়া ( "নিরবলম্ব" ও "রাতপাখি ও অন্যান্য" এই দুটি গল্পের ব‌ই প্রকাশিত )










[ ১ম পাতায় ফেরত ]

৪টি মন্তব্য:

nm বলেছেন...

পড়তে পড়তে কোথায় যে চলে গেছিলাম.. খুব সুন্দর লিখেছ দিদি।
মেঘ

indira mukerjee (ইন্দিরা মুখার্জি) বলেছেন...

আইভির লেখায় কোথায় যেন একটা সারা ভারতের মাঝে বাংলায় বসে বাঙালির ও আর সকলের বৈশাখি হুল্লোড়ের ছবি দেখলাম !

Mahasweta বলেছেন...

বেশ ভাল লাগল পড়ে। আমার ছোটবেলাও কেটেছে একটা ছোট শিল্পনগরীতে, তাই ছোটবেলার অনেক কথা মনে পড়ে গেল।

সংঘমিত্রা বলেছেন...

বাঃ লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো। নিজের ছেলেবেলার দিনগুলো মনে পড়ে গেল।