২৮ জানু, ২০২০

কলাবতী কথা সম্পর্কে কে কি বলেছিলেন ২০১৫ তে


সানন্দা পুজোসংখ্যা-২০১৫ এ প্রকাশিত উপন্যাস  
মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যঃ
এবছরের সেরা পুজো উপন্যাস ছিল কলাবতী কথা। 

প্রত্যুষা চক্রবর্তীঃ  
অপেক্ষা করছি অনেক অনেক দিন ধরেই ...
হাতে আসামাত্র পড়ে ফেললাম একটু ও দেরি না করে,
ঘড়ির কাঁটা কি করে তিরিশ মিনিট ঘুরে গেল, টের পেলাম না!
পটশিল্পের কি অসাধারণ কথামালা বোনা হয়েছে বাংলার রীতি আচার অনুষ্ঠান আর ব্রতকথার সুতো দিয়ে ।মেদিনীপুর এর প্রত্যন্ত গ্রাম তাদের কথা নিয়ে উঠে এসেছে অবলীলায়। নয়াগ্রাম , খড়্গেশ্বর , পিংলা, পাথরা , কুকাই , নানকারচক , কুরুম্ভেরা গনগনি কত নাম না জানা গাঁয়ের গন্ধ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে বৈশাখী অশোক ষষ্ঠীর ব্রতকথা থেকে মঙ্গলচণ্ডী, ভৈমীএকাদশী,বিপত্তারিণী , লোটন ষষ্ঠীর কথার সাথে ।আর চরিত্রেরা ! মাটির গন্ধ পাচ্ছি যেন ।
সবশেষে লেখিকার উদ্দেশ্যে বলি, আপনি লুপ্তপ্রায় একটি শিল্পকে পুনঃজীবিত করার প্রয়াস করেছেন ।
অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ 
কাছের মানুষদের নাম যখন বহুল প্রচারিত পত্রিকার পুজোসংখ্যায় দেখি, গর্বে ও খুশিতে ভরে ওঠে।
প্রিয় মানুষ, বন্ধু ও দিদি ইন্দিরাদির প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে সানন্দা পুজো সংখ্যায়। ‘কলাবতী কথা’। পড়া শেষ করলাম কাল।
মেদিনীপুর নিয়ে রীতিমত রিসার্চ করা এ উপন্যাস। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম গঞ্জের অলিগলি, গ্রামীন সংস্কৃতি ও তার রীতিনীতি, ব্রতকথার নানা হারিয়ে যাওয়া গল্প, গ্রামীন মেলা ও উতসব, নানা পার্বন ও গ্রামীন মানুষের জীবনের এত ডিটেইলস এ উপন্যাসে পেলাম যে অবাক হতে হয় লেখকের পরিশ্রম ও গবেষনায়। উপন্যাসের পটভূমিকা হল গ্রাম বাঙলার পট শিল্প। এই পটশিল্পীদের জীবন, তাদের মনস্তত্ব, দারিদ্র, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধা, তাদের স্বপ্ন, অপ্রত্যাশিত সুযোগ, সাফল্য সবকিছুই এসেছে এ উপন্যাসের সাজানো ইটের সারিতে। লতু, কনক,  কলাবতী, মিকি, আকিও এবং আরো নানা চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে লেখক বলেছেন অনেক অনেক গ্রামীন সংস্কারের গল্প, তাদের বিচিত্র জীবন চর্চা, প্রতিবাদ, বেঁচে থাকার স্বপ্ন। নিবিড় গ্রাম বাংলার সাহচর্য্য, ক্ষয়ে যেতে থাকা এক শিল্পী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ও তাদের লড়াই হয়ে উঠেছে এ উপন্যাসটির উপজীব্য।
অর্ণব রায়চৌধুরীঃ 
কলাবতী কথা পড়লাম। বাংলার পটশিল্পীদের জীবন নিয়ে এরকম লেখা আগে পড়িনি। গ্রামবাংলার এত মেলার কথাও জানা ছিল না। কুরুম্ভেরা মেলা বা ময়নাগড়ের রাসমেলার বর্ণনা পড়ে ইচ্ছা করে ঘুরে আসতে। তবে যে জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করেছে তা হল সহজ সরল ভাষায় কথকতার গল্প। পুরাণ নিয়ে তোমার গল্প সম্ভার আমাকে মোহিত করেছে। যদিও 'অহল্যা' নিয়ে তোমার বিশ্লেষণ পড়ে জেনেছিলাম পুরাণ নিয়ে তোমার অগাধ আগ্রহ ও knowledge। উপন্যাসের শেষে নোট থেকে জানলাম মেদিনীপুরের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকার সময় তুমি এই পটশিল্পীদের সান্নিধ্যে এসেছিলে। অনেক ধন্যবাদ তাদের কথা এরকম সুন্দর উপন্যাসের রূপ দেওয়ার জন্য। দু একটা জায়গায় একটু প্রশ্ন এসেছে মনে। এক জায়গায় পড়ে মনে হয়েছে আকিও বাংলা ভাষা জানে না। আবার সে রাতেই সে দিব্যি পরিষ্কার বাংলায় কলাবতীর সাথে কথা বলে। মনে হল এখানে কথোপকথন টা না থাকলেও চলত। আর উপন্যাসের শেষ লগ্নে যখন কলাবতী জাপানে নিজের সংসার শুরু করেছে তখন জানা গেল না তার স্বামী রামু বা তার শ্বাশুড়ি কনকের মনের অবস্থা কেমন হল বা তারা এত সহজে কি করে মেনে নিল ব্যাপারটা। আর জানতে ইচ্ছা করছে এখন কি গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে এইসব পটশিল্পীদের জন্য কম্পিউটার পৌঁছেচে নাকি তোমার উপন্যাসে ভবিষ্যতের রূপরেখার ইংগিত আছে। সব শেষে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম একটা উপন্যাস আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। আশাটা এবার বেড়ে গেল।
সুনন্দা চক্রবর্তীঃ 
দিদি আজ আমি সারা দুপুর ধরে লেখাটি পড়েছি । প্রথমেই বলি তোমার ধৈর্য অপরিসীম । তোমার লেখা ১) খুব ক্লাসি, ২) ঐতিহাসিক তথ্য সমৃদ্ধ , ৩) বাংলার বার ব্রত যা অনেকেই জানেনা তা সুচারুরূপে ব্যক্ত করেছ, ৪) বাংলার একটা শিল্প তোমার লেখনীতে স্থান পেয়েছে বলে খুব ভালো লেগেছে। এবার আসি কলাবতীর কথায়, তিনটে একই সংসারে থাকা নারী যেখানে ঝগড়া ঝাঁটি আর গালাগালিতেই পার করে সেখানে সুন্দর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর একে অপরের পরিপূরক , উদার হৃদয় চরিত্রগুলো অপূর্ব এঁকেছ । পুরো উপন্যাসটাই আসলে রূপকথা । যা বেঁচে থাকার রসদ দেবে । 
শর্বরী ব্যানার্জিঃ
কলাবতী কথা পড়লাম। গ্রামীন শিল্পীদের অনেক অনেক সম্মান ও মর্যাদা প্রাপ্য। আমরা শহরে বসে তাঁদের শিল্পীমন বা শিল্পের কথা জানতেই পারিনা তাই হয়ত প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিতে পারিনা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই শিল্পীদের তুলে ধরার জন্য।

শ্রাবণী দাশগুপ্তঃ
কলাবতীকথা - অনেক যত্নের বহু পরিশ্রমের ফসল উঠেছে লেখিকার কর্ষণে। প্রয়োজনীয় বৃষ্টি দিয়েছে সজীবতা, শ্যামল হয়ে উঠেছে উপন্যাস - বারব্রত, সংস্কার মিলেমিশে। একেক সময়ে মন ভার হয়ে উঠেছে, কত দ্রুত এসব হারিয়ে গিয়েছে শহুরে জীবন থেকে, নিষ্প্রাণ দেখনদারী এসে দখল করে নিয়েছে সজল আত্মীয়তা - আত্মার কাছাকাছি, মনের কাছাকাছি থাকা মানুষদের। হয়ত আছে গ্রামে-গঞ্জে এখনো - থাকুক, বেঁচে থকুক। বেঁচে থাকুক পটচিত্র আর স্বরচিত গান নিয়ে কলাবতীরা। শহরায়ন বিশ্বায়ন - অনেক কিছু শুকিয়ে দিয়েছে, কোথাও বাঁধ দরকার...। নইলে আমাদের নিজস্বতা হারিয়ে যাবে।
টানাপোড়েন আছে উপন্যাসে, কিন্তু তেমনটা নয়, খুব সাবলীল ভাবে ঘটে যায় ওঠা-পড়া। জটিলতা ধরা যায়না তেমন।

নন্দিতা ভট্টাচার্যঃ
এত ডিটেলিং ভাবা যায়না।  অনেকদিনের প্রয়াস মনে হচ্ছে। বাংলাকে এভাবে  একেবারে টেনে তুলে এনেছ, তুলে ধরেছ ভুলে যাওয়া সব কথা।

অমৃতা ঘোষঃ
অনেক কিছু জানতে পারলাম বাঙলার পটচিত্রও কিংবদন্তীর ব্যাপারে। অসাধারণ শুধুই কলাবতী নয়। কনক, লতু প্রত্যেকেই। আরো একটি ব্যাপার যেটি খুব ভালো লেগেছে সেটি হল একজন নারী হয়ে অন্য আরেকজনকে অণুপ্রাণিত করা। লতু, তার পুত্রবধূ কনককে আর কনক তার পুত্রবধূ কলাবতীকে।  আমাদের জীবন এমন হলে বরতে যেতাম।

রুচিরা চ্যাটার্জিঃ 
কলাবতী কথা পড়ে পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারলাম আগে যা অজানা ছিল। ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস জেনে ভালো লেগেছে। সত্যি অনেক অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে লড়াই করে ওঁরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বাংলার সব ব্রতকথার ছোতছোট গল্পগুলি বিশেষতঃ উমনোঝুমনোর কথা জেনে অনেকদিন বাদে খুব মজা পেলাম। আবারো নস্টালজিক হয়ে পড়লাম।

শর্মিলা দাশগুপ্তঃ
খুব ভালো লাগল কলাবতী কথা পড়ে। পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অজানা কথা, ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস, আমাদের গ্রামবাংলার এতসব ব্রতকথা আর পুজোআর্চার গল্প জানতামনা। কনক আর কলাবতীর সম্পর্কটা এত সুন্দর ভাবে দেখিয়েছ খুব ভালো লাগছে। কনকের প্রতিবাদী চরিত্রটি দারুন। কিন্তু শেষের দিকটা পড়ে মনে হল কলাবতী কেন এত স্বার্থপর হয়ে গেল? যে শাশুড়িমা তার জন্য এতকিছু করল তাকে ছেড়ে, স্বামীকে ছেড়ে সে চলে গেল কি করে? হতেই পারে এটাই বাস্তব কিন্তু কনক এত পুজো করে কি পেল? খুব‌ই বাস্তবিক পটভূমি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পুরোটাই নিঃসন্দেহে উপভোগ্য। 

২০ জানু, ২০২০

সীতায়ণের খোঁজে শ্রীলঙ্কার পথে পথে





আমাদের প্রতিবেশী দেশ সিংহল দ্বীপ বা শ্রীলংকাকে আবিষ্কার করতে গেলে মহাকাব্য রামায়ণের সাহায্য নিতেই হয়। তখন রামায়ণকে আর নিছক কাল্পনিক কাব্য নয়, ইতিহাস বলেই মেনে নিতে ইচ্ছে করে ।
রামায়ণের স্মৃতিচিহ্ন বিজড়িত দশটি এমন প্রধান স্থান নিয়ে এই আলোচনা করব আজ। এদেশের ট্যুর এজেন্টরা রামায়ণ ট্রেইল বা রামায়ণ ট্যুর আখ্যা দিলেও আমি বলব সীতায়ণের রুট এটি। কারণ সেই দেশে সীতা আর হনুমান সর্বত্র পূজ্যতে। তাই রামায়ণের মাহাত্ম্য না সীতায়ণের দাপট সে নিয়ে আমার আর সংশয়ের অবকাশ নেই।


শ্রীলংকার সিগিরিয়া আর মান্নার বাদে বাকী একই রুটে অবস্থিত আটটি এমন স্থান ছুঁয়ে আসার পরে মনে হল এই নিয়ে আলোকপাত করাই যায়। প্রথমে দেখে নি কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ দশটা সেই জায়গায় রামায়ণের আলো পড়েছিল। তাই এখনও সেগুলি দেশ বিদেশের মানুষের কাছে অন্যতম ট্যুরিস্ট গন্তব্য।


  • সিগিরিয়া (রাবণের ভাই কুবেরের প্রাসাদ)
  • মান্নার (রামেশ্বর সেতুর শেষ বিন্দু)
  • নুয়ারা এলিয়া (অশোকবন, সীথাআম্মার মন্দির, হনুমানের পায়ের ছাপ, সীতার স্নানের জায়গা)
  • সীথা এলিয়া (হনুমান মন্দির)
  • ধিভুরাম্পুলা (সীতার অগ্নি পরীক্ষার স্থান)
  • রামবোডা জলপ্রপাত (হনুমান শক্তি সঞ্চয় করেন)
  • রামবোডা (চ্যারিয়ট পাথ, সীথা অশ্রুকুন্ড)
  • গুরুলাপোথা ( সীথা দুর্গ )
  • গায়াত্রীপীঠ ( নিকুম্ভিলা)
  • উনাবান্টুনা (গল, গন্ধমাদন উপড়ে এনে ফেলেছিল হনুমান)

অশোকবন 

সীতা মন্দির 

এছাড়াও রয়েছে আরও কয়েকটি স্থান যেগুলি রামায়ণের জন্য এখনও বিখ্যাত তবে আমাদের এবার শ্রীলংকার সেদিকটায় যাওয়া হয়নি। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রাবণ গুহা । সংলগ্ন ঝর্ণার ধারে পাহাড়ের মাথায় এই গুহার মধ্যে সীতাকে নিয়ে লঙ্কায় আসার পর রাবণ লুকিয়ে রাখেন কিছুদিন। এই স্থানটি এল্লা নামক স্থানে।
আর রয়েছে শঙ্করী দেবী শক্তি পীঠ যেটি শ্রীলঙ্কার পূর্ব উপকূলে ত্রিনকোমালিতে অবস্থিত অন্যতম হিন্দু তীর্থস্থান । শঙ্করী মাদুর্গার সঙ্গে এখানে রয়েছেন তাঁর ভৈরব ত্রিকোণেশ্বর এর কোণেশ্বরম্‌ মন্দির।পর্তুগীজরা সপ্তদশ শতাব্দীতে যা ধ্বংস করে। পরম শৈব রাবণ মা দুর্গার তপস্যা করেছিলেন এখানে । দেবী শঙ্করী প্রসন্ন হয়ে বিশ্বকর্মা নির্মিত রাবণের প্রাসাদে এসে বাস করেছিলেন। রাবণ শঙ্করী দেবীর জন্য বিশাল মন্দির বানিয়ে দেন।
তামিল রামায়ণ মতে মুনেস্বরমে রাবণ বধের পর রাম সেখানে তপস্যা করেন ।
রামায়ণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য তীর্থস্থান হল উসসাংগোডা । এটি দক্ষিণ শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত, রামায়ণ মতে যেখানে সীতার সঙ্গে দেখা করার পর হনুমান রাবণ এবং তাঁর রাক্ষস বাহিনীর শক্তি পরীক্ষা করার জন্য লঙ্কাপুরী আগুণ লাগিয়ে ছারখার করেন। তখন হনুমানের লেজটি রাক্ষসরা আগুন ধরিয়ে দেয়। উসসাংগোডায় নাকি রাজা রাবণের ব্যবহৃত আকাশপথে চালিত পুষ্পক রথের বিমানবন্দরটি ছিল বলে বিশ্বাস স্থানীয় মানুষজনের।
তবে আমরা এবার যে স্থানগুলি গিয়েছিলাম সেগুলি মানচিত্রে মোটামুটি আশেপাশেই রয়েছে আর এগুলির গুরুত্ব রামায়ণে সবচেয়ে বেশী।


সিংহলের উঁচু পাহাড়্চূড়ায় সিংহগিরি বা সিগিরিয়া তে ছিল রাবণের রাজপ্রাসাদ যেখানে পাহাড় কেটে রাবণের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কুবের তৈরী করেছিলেন এক বিশাল দুর্গ। প্রায় হাজার দেড়েক খাঁড়াই সিঁড়ি ভেঙে সেই পাহাড়ে উঠতে হয়।

তামিলনাড়ুর পাম্বান বা রামেশ্বরম থেকে শ্রীলঙ্কার মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত সেই পাথরের সেতুর অস্তিত্ব পাওয়া যায় এখনও। কথিত আছে, সীতা উদ্ধারের জন্য লঙ্কাপুরী যাত্রার জন্যই পাথরের এই সেতু তৈরি করেছিলেন রাম।সেই যুগে শ্রীলঙ্কা পৌঁছানোর অন্য কোন উপায় ছিলনা। সীতা উদ্ধারের পরে ফিরে এসে, রাবণকে বধ করে ব্রহ্মহত্যার পাপ খণ্ডনের জন্যই শিবের আরাধনা করেন রাম। তিনি যে শিবলিঙ্গের আরাধনা করেন তামিলনাডুর সেইস্থানই আজ আমাদের হিন্দু তীর্থ রামেশ্বরম নামে পরিচিত।
শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে হালকা ঠান্ডার অপূর্ব শৈল শহর ক্যান্ডি হয়ে যেতে হয় মনোরম এক নৈসর্গিক শহরে যার নাম "নুয়ারা এলিয়া"। সিংহলী ভাষায় নুয়ারা মানে নগর আর এলিয়া মানে জ্যোতি। এখানে সীতা আম্মার জন্য বিগলিত স্থানীয় জনগণ তথা আমাদের মত ভারতীয় পর্যটকেরাও। নুয়ারা এলিয়ার সবুজ পাহাড় ঘেরা ফুলপাখীর স্বর্গরাজ্য অশোক বটিকা বা অশোক বন আজো জ্বলজ্বল করছে নিজের সবুজ জ্যোতিতে। রাবণের বিলাস বহুল প্রাসাদে সীতার থাকতে আপত্তি থাকায় এই সুন্দর অশোক বনে রাবণ তাঁকে রেখেছিলেন, এমনি বিশ্বাস রামায়ণে। এই অশোকবন শ্রীলঙ্কার হাকগালা ন্যাশানাল পার্ক এখন। অত্যন্ত সুন্দরভাবে সংরক্ষিত এই বটানিকাল গার্ডেনটি বেশ দামী টিকিট কেটে আমাদের মত বিদেশী পর্যটকদের দেখতে যেতে হয়। সেখানে পৃথিবীর সব গাছ রয়েছে। সেখানেই দূরের এক উঁচু পাহাড়ের খোঁচাটির নাম হাকগালা রক। দেখে মনে পড়ল আবারো রামায়ণের কাহিনী। সেই পাহাড়ের উল্টোদিকেই এখন হয়েছে সীতা মাঈয়ার অপূর্ব এক মন্দির। বন্দিনী সীতাকে এখানেই কাঁদতে দেখে পাহাড়ের মাথা থেকে হনুমান এক লাফে সেখানে হাজির হয়ে সীতার হাতে দেন রামের আংটি, সীতা যা রাবণের পুষ্পক রথে আসার সময় ছুঁড়ে ফেলেছিলেন আকাশপথে। চোখে পড়ল মন্দির সংলগ্ন খরস্রোতা পাহাড়ী নদী, নুড়িপাথরের বুকে এখনো যা বয়ে চলেছে অবিরত। সীতাকে রাবণ অশোক বনের এই অঞ্চলেই বন্দী করে রেখেছিলেন। তবে সসম্মানে। সীতা প্রতিদিন এই নদীতেই স্নান করতেন । এই নদীর তীরেই রয়েছে মস্ত এক শিলাখন্ডের ওপর হনুমানের পায়ের ছাপ। শক্তিমান হনুমানের লাফানোর ফলে যা বহু যুগ আগে পাথরের মধ্যে গর্ত সৃষ্টি করে রেখেছে । এমনি বিশ্বাস স্থানীয় মানুষের।
এই অঞ্চলে আসার পথে তাই বুঝি পড়েছিল ভক্ত হনুমান মন্দির। এখানে সীতা আর হনুমান সর্বত্র পূজ্যতে। এই স্থানকে স্থানীয় মানুষ "সীথা এলিয়া"ও বলে যার অর্থ সীতার জ্যোতি। রাবণের সঙ্গে অশোকবনে আসার পথে বিশ্রাম নিয়েছিলেন সীতা এখানে।
সীতা স্নান কুণ্ড 

সীথা এলিয়া থেকে কিছুদূরেই এক বনভূমি যেখানে সীতার অগ্নি পরীক্ষা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। সিংহলীভাষায় এই অঞ্চলের নাম Divurumpola বা ইংরেজীতে Place of oath। দলীয় বা পারিবারিক বিবাদ, বিরোধ নিষ্পত্তি করার সময় শ্রীলংকার আইনি ব্যবস্থা এই মন্দিরে নেওয়া শপথকে এখনও আইনি মান্যতা দেয়।
নুয়ারা এলিয়া থেকে বেন্টোটা যাবার পথে পড়ে শ্রীলঙ্কার অনেকগুলি জলপ্রপাতের মধ্যে একটি, যার নাম রামবোডা ওয়াটারফলস। রামবোডা গ্রামের অন্তর্গত ১০৯ মিটার উঁচু এই জলপ্রপাতটির কাছেই হনুমান নাকি সীতা উদ্ধারের জন্য বিপুল শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন।
ক্যান্ডি থেকে নুয়ারা এলিয়া যাবার পথে রামবোডা পর্বত দেখা যায়। সেখানে এঁকে বেঁকে যে মনোরম বীথিপথ চলে গেছে সেই পথ দিয়েই রাবণ সীতা কে অশোক বনে নিয়ে যান, এমনি বিশ্বাস করা হয়। নিজের রাজধানী কেমন সুন্দর সীতাকে তা ব্যাখ্যা করতে করতে চলেছিলেন রাবণ। এই বনানীকে বলা হয় চ্যারিয়ট পাথ। সীতার চোখের জল পড়তে পড়তে গেছিল এখানে। তাই কেউ কেউ সীতা টিয়ার পণ্ড বা অশ্রুকুন্ডও বলেন।
শ্রীলঙ্কার গুরুলাপোথা কে বলা হয় লঙ্কাপুর। ক্যান্ডি থেকে গুরুলাপোথা পৌঁছতে সময় লাগে ঘণ্টা দুয়েকের কম। কিংবদন্তী বলে সবুজ পাহাড়, ঝর্ণা আর ছোট ছোট নদী ঘেরা অপূর্ব সুন্দর এই স্থানে রাবণের রাণী মন্দোদরীর প্রসাদ ছিল। আকাশ পথে সীতা কে নিয়ে যাবার সময় রাবণ এই প্রাসাদে তাকে কিছুদিন রাখেন। তারপর আবার বিশ্রাম নিয়ে অশোক বনের দিকে যাত্রা করেন। এই কারণে এই জায়গার নাম সীথা কটুয়া বা সীতা দুর্গ।
নিকুম্ভিলা ( গায়ত্রী পীঠ) 

সীতা মন্দির 

নুয়ারা এলিয়ার আরেকটি অন্যতম পীঠস্থান হল গায়ত্রী পীঠ বা গায়ত্রীদেবীর জাগ্রত এক মন্দির। সেখানে গায়ত্রীদেবীর মন্দিরে পুজো হয় নিয়মিত। এই অঞ্চল ছিল লঙ্কার অন্যতম এক উপবনাঞ্চল, রামায়ণে উল্লিখিত নিকুম্ভিলা। এই স্থানের ঐতিহাসিক আরেক মাহাত্ম্য আবিষ্কার করলাম মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করে। রাবণের পুত্র মেঘনাদ রাম-লক্ষমণের সঙ্গে যুদ্ধের পূর্বে নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করেছিলেন এই স্থানে। মেঘনাদের বরটি এমনি ছিল যে যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলেই তিনি অজেয় হবেন। তাই পরপর দুবার তিনি যজ্ঞ সম্পূর্ণ করে ধরাশায়ী করেন লক্ষ্মণ কে । লক্ষ্মণ পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন জানতে পেরে আবার মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে যজ্ঞ সম্পাদনা করতে যান। এদিকে বিভীষণ তার গুপ্তচর মারফৎ সেই সংবাদ পেয়ে রামকে সতর্ক করেন। কারণ যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলে মেঘনাদ অজেয় হয়ে যাবেন। বিভীষণ লক্ষ্মণকে যজ্ঞাগারে নিয়ে যান। যজ্ঞাগারে মেঘনাদ অস্ত্র স্পর্শ করতেন না। তিনি প্রথমে যজ্ঞের বাসন ছুঁড়ে লক্ষ্মণকে অচেতন করে দেন। কিন্তু অস্ত্রাগারে যাওয়ার সময় পান না। তার পূর্বেই লক্ষ্মণের জ্ঞান ফেরে এবং তিনি নিরস্ত্র মেঘনাদকে হত্যা করেন।

বস্তুত এটি লঙ্কার উল্লেখযোগ্য শক্তিপীঠ। পীঠনির্ণয়তন্ত্রে আছে

লঙ্কায়াং নূপুরশ্চৈব ভৈরবো রাক্ষসেশ্বরঃ
ইন্দ্রাক্ষী দেবতা তত্র ইন্দ্রোণোপাসিতা পুরা ।।

বিষ্ণুচক্রে খণ্ডিত হয়ে সতী দেবীর পায়ের নূপুর এখানে পতিত হয়। দেবীর নাম ইন্দ্রাক্ষী। তাঁর ভৈরবের নাম রাক্ষসেশ্বর। পণ্ডিতেরা এই নিকুম্ভিলা দেবীকে সেই শক্তিপীঠের দেবী মানেন। কিন্তু শাস্ত্রে লঙ্কার শক্তিপীঠের দেবীকে ইন্দ্রাক্ষী বলা হয়। বৃত্রাসুরের হাতে রাজ্য হারিয়ে দেবরাজ ইন্দ্র দেবতাদের সঙ্গে এখানে এসে দেবী ভগবতী বা গায়ত্রীদেবীর তপস্যা করেছিলেন । গায়ত্রী হলেন দৈব নারীশক্তির পুঞ্জীভূত নারীশক্তির প্রকাশ। লঙ্কায় এই দেবীর মন্দির এখনও আছে। তবে এটি শক্তিপীঠ রূপে পরে স্বীকৃতি পায় নি । ভয়ংকরী, আসুরিক দেবী নিকুম্ভিলা সাধারণের পূজিতা হয়ে উঠতে না পাড়ায় ধীরে ধীরে গায়ত্রী পীঠে পরিণত হয়েছে এই স্থান।

কৃত্তিবাসী রামায়ণেও আছে নিকুম্ভিলার কথা।

বিভীষণ বলে শুন রাজীব- লোচন ।
সামান্যেতে ইন্দ্রজিৎ না হবে পতন ।।
নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করে দুষ্ট নিশাচর ।
করিয়াছে যজ্ঞকুণ্ড লঙ্কার ভিতর ।।

আদ্যাস্তোত্রে পাই

পাতালে বৈষ্ণবীরূপা সিংহলে দেবমোহিণী
সুরসা চ মনিদ্বীপে লঙ্কায়াং ভদ্রকালিকা ।

সেসময় সিংহল আর লংকা কে পৃথক স্থান বলা হত। পরে এই দুই অঞ্চল কে এক মনে করা হয়।

তবে শক্তির উপাসক পরম শৈব রাবণের আরাধ্যা দেবী যে ছিলেন এই ভদ্রকালী সেকথা বলাই বাহুল্য ।

আমরা ভারত মহাসাগরের তটরেখা ধরে চলেছিলাম শ্রীলংকার অন্যতম সৈকত শহর বেন্টোটা থেকে মিরাস্যা । যাবার পথে পড়ে গল্‌ নামে এক বিস্তীর্ণ শহর। রামায়ণের জন্য বিখ্যাত এই গল্‌ শহরের অন্তর্গত রুমাস্যালা পর্বত। হনুমান হিমালয় থেকে শক্তিশেলে বিদ্ধ অচৈতন্য লক্ষ্মণের জন্য ভেষজ জরিবুটি বিশাল্যকরণী খুঁজতে গিয়ে পুরো গন্ধমাদন পাহাড় টিকেই নাকি তুলে এনেছিলেন এই গল্‌ অঞ্চলের উনাওয়াটুনাতে Unawatuna। যেখানে পাহাড়ের পাদদেশ অবিরত স্পর্শ করে ভারত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ। নীল আর সবুজে মাখামাখি এই সমুদ্রতট।

হাকগালা রক 
হনুমানের পায়ের ছাপ 

রামায়ণের স্পর্শে ধন্য শ্রীলংকার ইতিহাস ভূগোল যেন আরও কাছের বলে মনে হয় আমাদের। বাকীটা মানুষের বিশ্বাস। তবে যাহা রটে তাহা কিছু তো বটে, এই বিশ্বাসে এগিয়ে চলি আবারো কলম্বো এয়ারপোর্টের দিকে। মহানাগরিক ভীড়ে মিশে যাই। কানে তখনও বাজতে থাকে সীথা মাইয়ার ভজন। রামায়ণ তবে মিথ না মিথ্যে? এ নিয়ে ভাববার অবকাশ নেই আর। আপাতত মাথায় ঘুরতে থাকল সীতায়ণের ইতিহাস। অথবা রাবণায়নের প্রেক্ষাপট।  
রামবোডা ওয়াটার ফলস 
প্রবন্ধ টি প্রকাশিত যুগশঙ্খ সংবাদপত্রের রবিবারের বৈঠকে ১৬ র পাতায় 

১৪ জানু, ২০২০

টুসু আর পৌষলক্ষ্মী কি এক?

      
ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত 


"পোষ পরবে টুসু আসে বছরখানি ঘুইরা যায় 
ধনী শ্বশুর ঘরে ফি‌ইরা যায় 
এ টুসুকে ক্যামনে আনি গাঁয়? 
এ টুসুকে জলে দিব, জল টুসুকে চিনে লাও' 


পৌষমাসে  বর্ধমানের আসানসোল অঞ্চলে টুসু পুজোর ধুম। টুসু মূলতঃ মানভূম, ঝাড়খণ্ড, পুরুলিয়া, সাঁওতাল পরগণার উৎসব। ঘরের কন্যাশ্রী টুসু লৌকিক এক দেবী। কেউ বলে টুসুমণি। লোকগাথায় বলে, টুসু নামে এক স্থানীয় কন্যা নিজের প্রেমের নিষ্ফল পরিণতি স্বরূপ জলে ডুবে আত্মঘাতী হয় তাই তাঁকে প্রতিবছর স্মরণ করেই পুজো।  
পৌষ মাসে নতুন ধানের গন্ধে ঘর গেরস্থলি থৈ থৈ। পৌষসংক্রান্তি এগিয়ে আসা মানেই আমনে-বামনে বাঁধা আর নতুন চালের পিঠেপুলির তোড়জোড়।  সেই সঙ্গে একদিকে টুসু পরব অন্যদিকে পিঠে পার্বণের ঘটা। 
টুসু প্রধানতঃ আদিবাসীদের পার্বণ। কিন্তু দক্ষিণবাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে এই পরব মিলেমিশে একাকার হয়েছে । তাই মনে হয় তুষু বা টুসু যেন আমাদের ঘরের কুললক্ষ্মী। কৃষিভিত্তিক এই প্রাণের উত্সব যেন পূর্ণতা পায় শস্যের ভান্ডার ভরে উঠলে। সমগ্র রাঢ় বাংলার এই আরাধ্যা দেবী কিন্তু পৌরাণিক নয়। কোনো পঞ্জিকায় এই পুজোর নির্ঘন্ট মেলে না।  ধানের তুষ হল এই পুজোর প্রধান উপাচার। তাই বুঝি এই দেবীর নাম তুষু বা টুসু।   
টুসু হলেন আটপৌরে, চিরকুমারী আর এঁর পূজাও করেন কুমারী মেয়েরা। অঘ্রান মাসের শেষ দিন থেকে পৌষ মাসের শেষ দিন অবধি রাঢ় বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে এই টুসু পূজিতা । আর এই পুজোর রীতিও অন্যরকম। নিজের ঘরেই পোড়ামাটির টুসু প্রতিমা এনে মেয়েরা মিলে নানারকমের গান বাঁধেন টুসুকে ঘিরে।  টুসু কে ঘিরেই সেই গানের কথা। টুসুর সাধ আহ্লাদ, টুসুর জীবন যন্ত্রণা, টুসুর  মান অভিমান আর সব শেষে টুসু বিসর্জনের দিন মনখারাপের কথা উঠে আসে ।  মনে নতুন ফসল ওঠার আনন্দ আর টুসুকে ঘিরে গান বাঁধার স্বপ্নে তারা বিভোর থাকেন এই একটি মাস।  
সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল, ওরাওঁ, ভুঁইয়া, কুর্মি, মাহাতো,বাউরী, বাগদী প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায়রাই এই পুজো করেন।  বাংলার দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তের বিস্তীর্ণ অংশে টুসুকে অনেকে মকর পরব ও বলেন। পৌষ সংক্রান্তির পরে মাঘের প্রথম দিনে যেহেতু নতুন কৃষি বর্ষের সূচনা  তাই কেউ আবার টুসু কে বলেন ফসল ঘরে তলার উৎসব।  
কোনো চাওয়াপাওয়া নয়। নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে এরা টুসুর কাছে নিজেদের সুখ-দুঃখের টানাপোড়েনের কাহিনী শোনায় গানের মাধ্যমে। কোনো অভাব অভিযোগ নয় যেন ঘরেতে অতিথি এসেছে, তাকে বরণ করো গো, তার সঙ্গে দুটো মনের কথা ক‌ও গো।  

"গাঁয়ের কথা টুসু জানে, পেট খোরাকি জুটে লাই
পাথর ভাঙে পাথর গড়ে, চুলার খোলা ভরে লাই' 

অভাব অনটন যতই থাকুক সংসারে, যেমন করেই হোক টুসু কে তাঁদের ঘরে আনতেই হবে। তার সঙ্গে দিনযাপন করতেই হবে।  আর পৌষ সংক্রান্তির দিনে ধুমধাম করে টুসু বিসর্জনের সময় চোখের কোণে জল নিয়ে আবারো ওরা গেয়ে উঠবে 

" এ টুসু কে জলে দিব লাই, এ টুসু কে ক্যামনে রাখি গাঁয় 
লাল পায়েতে আলতা মাখা টুসুর চোখে কথা লাই 
পাথর ভেঙ্গে ধান তো ফলে লাই তবু টুসু জলে দিব লাই 
এ টুসুকে ক্যামনে আনি গাঁয়' 

 নদীতে টুসু বিসর্জন এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। এ যেন দোলের মত আরেক রঙের ভাসান  উৎসব।  একদিকে স্নান করে গ্রামের মেয়েরা রঙ্গীন পোষাকে অন্যদিকে বাঁশ কঞ্চির কাঠামোয় কত রঙের ছোঁয়া। রঙ বেরঙ্গের কাগজ দিয়ে মুড়ে রঙ্গীন পুতুল দিয়ে সাজানো হয় সেই চতুর্দোলা বা চৌডল।
অঘ্রাণ সংক্রান্তির  সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের কুমারী মেয়েরা টুসু পাতে। একটি পাত্রে চালের গুঁড়ো মাখিয়ে তার মধ্যে তুষ, ধান, গোবর, দূর্বা ঘাস, আতপ চাল, আকন্দ ফুল, গাঁদা ফুলের মালা প্রভৃতি রেখে পাত্রটির গায়ে হলুদ রঙের টিপ লাগিয়ে পাত্রটিকে কুলুঙ্গীর ওপর রেখে, ফুল ছড়িয়ে  টুসুকে প্রতিষ্ঠা করে । সন্ধ্যাবেলায় তারা দলবদ্ধ হয়ে টুসুর নিকট তাঁদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিজ্ঞতা সুর করে গান বাঁধে ও দেবীর উদ্দেশ্যে চিঁড়ে, গুড়, বাতাসা, মুড়ি, ছোলা ইত্যাদি ভোগ নিবেদন করেন।পাড়ায় এর  ওর মধ্যে কোঁদলও চির পরিচিত। এ বলে আমার টুসু ভাল, ও বলে আমার টুসু আরো ভাল। মকর সংক্রান্তির ভোরে টুসু ভাসানের দিন এর প্রতি ওর বক্রোক্তি আরো চরমে ওঠে। বাঁশের চতুর্দোলার মধ্যে থাকে টুসুর সরা। কেউ আবার মাটির কন্যা মূর্তিও রাখে।  টুসুকে সাজিয়ে নিয়ে  ভাসানো হয় নদীতে।  টুসু গানের করুণ সুর, টুসুর বিদায়ী গান চোখে জল এনে দেয়।  ধামসা মাদল, কাঁড়া, নাকাড়া, কাঁসর ঘণ্টা, ঢোল, তাসা বাজিয়ে বিসর্জনে  সামিল হয় গ্রামবাসী। টুসু বিসর্জন দিয়ে সকলে নতুন কাপড় পরে। কোথাও ধুম করে টুসু মেলা.বসে। টুসুর চৌডল নিয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রা দেখবার মত। 
পুরুলিয়ায় এই চৌডল নিয়ে প্রতিযোগিতাও চরমে ওঠে । 

আমরা কেউ মকর স্নান করে পুণ্যি কুড়োই আর আদিবাসীদের ঘরে টুসু পরবের গানের সঙ্গে মাদলের দ্রিমি দ্রিমি বেজে ওঠে। টুসু গানের মহড়ার পাশাপাশি  কেউ আবার  নতুন ধানের আউনি-বাউনি বেঁধে পিঠে বানাতে বসে। সেই পিঠে টুসু ঠাকুরকে দিয়ে তবে খায়। বাংলার এই পাব্বনী সংস্কৃতির মেলবন্ধন ভরিয়ে তোলে মন কে। মনে মনে বলে উঠি টুসুকে, "পুনরাগমনায় চ" ! 


কেউ ওড়ায় ঘুড়ি। আটপৌরে বাঙালীর এই পিঠে সংস্কৃতি যেন তাদের বাৎসরিক সংস্কার। 

এর মাঝে খুব প্রচলিত লক্ষ্মী পুজো। সদ্য ওঠা ধানের বেদীতে লক্ষ্মীর আসন। তার হাতের পেঁচা, কুনকে ভরা ধান, সিঁদুর কৌটো সবকিছুই পাতা ধানের বিছানায়। লক্ষ্মীর হাঁড়ির সারাবছরের ধান বদল করে নতুন ধান দিয়ে পূর্ণ করা হয়। ইনি হলেন পৌষলক্ষ্মী, ঘটিদের কুললক্ষ্মী। পৌষমাসের শুক্লপক্ষের বৃহষ্পতিবারে অথবা সংক্রন্তির দিনে এই লক্ষ্মীপুজো হয় । নতুন চাল এবং নতুন গুড় দিয়ে পিঠেপায়েস বানিয়ে নিবেদন করা হয়। এর ব্রতকথাটিও বেশ ।

 এক গরীব বিধবা বামনী এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে  পৌষমাসের একদিন তার সচ্ছল ভাইয়ের সংসারে গেল। ননদকে দেখে তার ভাজ খুব অসন্তুষ্ট হল। কারণ হল পৌষমাসে বৃহষ্পতিবার নাকি কারো বাড়ি যেতে নেই। বামনী সরল মনে বলল ভাইয়ের বাড়ি যেতে কি দিনক্ষণ লাগে?  বাচ্ছারা মামাবাড়ির বায়না করল তাই সে এসেছে। তার ভাজ বলল সে তাদের ভাত খাওয়াতে অপারগ কারণ গৃহকর্তা অর্থাত বামনীর ভাই বাড়ি নেই। কিন্তু বামনীর খিদের জ্বালা। সে বলল, যা হোক কিছু খেতে দিতে। ভাজ দুটি ক্ষুদ দিয়ে বলল এগুলো সেদ্ধ করে খেতে । বামনী দেখল তাদের মাচায় ডগডগে লাউশাক। চারটে লাউপাতা চাইতে তার ভাজ রেগে গিয়ে বলল ঐ পাতায় হাত দিলে নাকি তার স্বামী তাকে আস্ত রাখবে না। বামনী মনের দুঃখে ফিরে যাচ্ছিল। সেই দেখে ভাজ বলল যাবার আগে তার মাথার উকুন বেছে দিতে। বামনী লক্ষ্মীবারে উকুন তোলার নিষেধের কথা জানাল।  নির্দয় ভাজ তার ননদের আঁচল থেকে সব ক্ষুদ কেড়ে নিয়ে নিল। শুক্লপক্ষের বৃহষ্পতিবার ছেলেমেয়ের হাত ধরে বামনী ভাইয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল আর প্রতিজ্ঞা করল রাস্তায় যা কুড়িয়ে পাবে তাই রেঁধে খাওয়াবে ছেলেমেয়েকে। পথের ধারে একটা মরা কেউটে দেখতে পেয়ে সেটাই কুড়িয়ে নিল বামনী। কাঠকুটো জ্বেলে সেই সাপকে যত‌ই জাল দেয় তত‌ই তার থেকে সোনার ফেনা বের হয়। শেষে খানিকটা সোনার ফেনা নিয়ে ছেলেকে বাজারে বেচতে পাঠাল। আর তারপর তাদের অবস্থা আর দেখে কে?  একদিন তার ভাজ এসে ননদের কুঁড়েঘরটি দেখতে না পেয়ে অবাক হল। সেখানে মস্ত বাড়ি। কি করে এমন হল জানতে ননদকে একদিন তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করল। বামনী তার বাড়ি নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গিয়ে বলল, যখন আমরা গরীব ছিলুম তখন আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলে আজ আমাদের অবস্থা ফিরে যাওয়ায় এত আপ্যায়ণ করছ?  ভাজ তখন লজ্জায় ননদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। এটি ঠিক আমাদের সংসারের চিত্র। এমন তো ঘরে ঘরে আমরা এখনো লক্ষ্য করি।