২৮ জুল, ২০১৫

অন্য অহল্যা

Photo Courtesy : Google
 অভিধানে অহল্যা শব্দটির অর্থ হলঃ লাঙল চালনার অযোগ্য এমন ভূমি  আর সংস্কৃতে ন-হলা বা যা হলকর্ষণযোগ্য নয় ।  এই অহল্যা নাম্নী নারীটি অযোনিসম্ভবা অর্থাত কোনো নারীর থেকে তার সৃষ্টি হয়নি।  সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার নিজ হাতে গড়া  অমন তিলোত্তমা অন্য কোনো পুরুষের হয়ে উঠুক সেটিও বোধ হয় ব্রহ্মা মনেপ্রাণে মানতে পারেননি তাই বুঝি অহল্যা ছিলেন চিরকুমারী।  এবং সেখানেই তার  নামটি সার্থক। আবার অভিশপ্ত পাথরে রূপান্তরিত অহল্যা সত্য সত্য‌ই হলকর্ষণযোগ্য নয়  এবং নিষ্ফলা । সেদিক থেকেও নামের আক্ষরিক অর্থটির সাথে সাজুয্য রয়েছে।  

সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সৃষ্ট অহল্যা নামে নারী চরিত্রটি পৌরাণিক উপাখ্যানে স্বনামধন্য হয়ে আছে অনেকগুলি কারণে।
১) তাঁর রূপ ( সৃষ্টিকর্তার খেয়াল  )
২) বুদ্ধি (বৃদ্ধস্বামীকে মানিয়ে নেওয়া ও এক‌ইসাথে দেবরাজ ইন্দ্রকেও খুশি করা) 
৩) বৃদ্ধ স্বামীকে মেনে নেওয়া  (পিতা ব্রহ্মার কথা লক্ষ্মী মেয়ের মত মেনে নেওয়া )
৪) অসাধারণ সিডিউসিং পাওয়ার  (বৃদ্ধ, যুবক সকলকেই পটিয়ে ফেলা )
৪)ইন্দ্রের সাথে পরকীয়ার কারণে অভিশপ্ত পাথরে রূপান্তরিত হয়ে প্রকৃতিকে আঁকড়ে বেঁচে থেকে যাওয়া (চিরন্তন ভারত-নারীর ত্যাগ ) 
৫) রামায়ণের রামকে অতিথি সত্কারের দ্বারা অভিভূত করে অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া  (কঠোর তপস্যার জন্য, আর কিছুটা  গৌতমমুণির ক্ষমতা প্রদর্শণ) 
এবং এইসবগুলি কারণে পঞ্চকন্যার আখ্যা পাওয়া ।

"অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তদা, পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহা পাতক নাশনম্‌।।" 

এবার দেখি মূল অহল্যা-গৌতম-ইন্দ্র উপাখ্যান কি বলে ? 

 ব্রহ্মা যতগুলি মানসকন্যা সৃষ্টি করেছিলেন তার মধ্যে সর্বোত্কৃষ্টা এবং তিলোত্তমা ছিলেন এই অহল্যা।     সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা নাকি স্বর্গের নর্তকী ঊর্বশীর রূপের দেমাক খর্ব করার জন্য‌ই এই অবর্ণনীয় সুন্দরী অহল্যাকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন। অহল্যা পেলেন ব্রহ্মার কাছ থেকে চিরযৌবনবতী থাকার আশীর্বাদ।
গৌতমমুণির কামনার স্বীকার হলেন যৌবনবতী অহল্যা। ধ্যানের বলে ব্রহ্মা জানতে পারলেন সে কথা।    কিন্তু ব্রহ্মা ঘোষণা করলেন, যে সারা পৃথিবী পরিক্রমা করে সর্বাগ্রে তাঁর সামনে আসবে তার সাথেই তিনি অহল্যার বিবাহ দেবেন। 
সেই কথা শুনে সমগ্র দেবকুল এবং মুণিঋষিরা সকলেই যাত্রা শুরু করলেন। যাত্রাশেষে আশ্রমে ফেরার মুখে মহর্ষি গৌতম একটি গোরুর বাছুর জন্ম নেওয়া লক্ষ্য করলেন। সেটি ছিল কামধেনু বা দৈব গোরু। সৃষ্টির এরূপ প্রকাশ লক্ষ্য করে গৌতম সেই গোবত্স্যের চারিপাশে প্রদক্ষিণ করে সেই পরিধির মধ্যিখানে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করলেন। 
ব্রহ্মা দৈববলে সে কথা জানতে পেরে গৌতমমুণিকে বললেন যে একটি গাভীর সন্তানের জন্ম দেওয়া হল পৃথিবী সহ সপ্তদ্বীপের উত্পত্তির সমতুল্য।  এবং সেই গোবত্স্যটি প্রদক্ষিণ করে তার মধ্যে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হল সারা পৃথিবী ভ্রমণের সমান। গৌতমের এরূপ কঠোর ধৈর্য দেখে ব্রহ্মার মন ভিজল।  তিনি গৌতমমুণির সাথে অহল্যার বিবাহে সায় দিলেন।  অসামান্যা সুন্দরী অহল্যা হলেন বৃদ্ধ গৌতম মুণির যুবতী ভার্যা। ব্রহ্মা নবদম্পতিকে উপহারস্বরূপ "ব্রহ্মগিরি" দান করলেন। ব্রহ্মগিরি  হল নবদম্পতির আশা আকাঙ্খা পূরণের সর্বোচ্চ স্থান।
বিবাহের পর ঈর্ষায় কাতর হলেন সমগ্র দেবকুল এবং মুণিঋষিরা। দেবরাজ ইন্দ্রেরো খুব রাগ হল । তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন অহল্যাকে। তখনি তিনি ফন্দী আঁটলেন মনে মনে। 
প্রতিদিন সূর্যোদয়ের পূর্বে গৌতমমুণি স্নান ও তপস্যার কারণে আশ্রমের বাইরে যেতেন।  দেবরাজ ইন্দ্র সেই সময় চন্দ্রের তপস্যা করে চন্দ্রকে বুঝিয়ে বললেন একটি মোরগের রূপ নিতে এবং গৌতমমুণিকে আরো ভোরে জাগিয়ে দিতে। সেদিন মোরগের ডাকে গৌতমমুণির ঘুম গেল ভেঙে। মোরগের ডাক শুনে গৌতম ভাবলেন ভোর হয়ে গেছে। তিনি আশ্রম থেকে নির্গত হলেন মাঝরাতে।

 দেবরাজ ইন্দ্র সুযোগের সদ্ব্যাবহার করে অহল্যার কাছে এলেন   তাকে আহ্বান করলেন।  অহল্যা সম্মত হল।  যুবতী অহল্যা মহাখুশি। দেবরাজ ইন্দ্র সুদর্শন । বৃদ্ধ স্বামীর তরুণী পত্নীও যারপরনেই  দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে নিজেকে উজাড় করে দিতে পেরে মহাখুশি হলেন। শৃঙ্গার, সম্ভোগ পর্ব মিটতেই অহল্যা ইন্দ্রকে তখুনি চলে যেতে বললেন কারণ গৌতমমুণির আশ্রমে ফেরার সময় আসন্ন। 
নিজের ভোগলালসায় তৃপ্ত হয়ে ইন্দ্র সেই স্থান থেকে বেরিয়ে আসবার সময় গৌতমমুনির সাথে তার সাক্ষাত হয়ে গেল। গৌতম সব অবগত হলেন। তাই চন্দ্রে কলঙ্ক চিরস্থায়ী হয়ে গেল।   গৌতমমুণি অহল্যাকে অভিশাপ দিয়ে  বললেন,    "ছিঃ অহল্যা! আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। তোমার রূপের দেমাক ধুলি ধূসরিত হল আজ থেকে। তোমাকে আমি চিরকালের মত অদৃশ্য করে দিলাম পৃথিবী থেকে। আজ থেকে সামান্য একটি পাথরে পরিণত হলে তুমি ।  যদি কখনো বিষ্ণু মনে করেন তিনি‌ই একমাত্র তোমাকে শাপমুক্ত করতে পারবেন।"

তাই বুঝি  ব্রহ্মা স্রষ্টা আর বিষ্ণু পালনকর্তা ।  ( Brahama, the Creator, Bishnu, the Preserver, Shiva, the Destroyer ).....  ভগবানদের মাহাত্ম্য কীর্তণে শুনতে পাই ।

অহল্যা হল প্রস্তর আর ইন্দ্র হলেন সহস্রযোনীপ্রাপ্ত এক তৃতীয় লিঙ্গের জীব। 

শোকে, অনুতাপে প্রকৃতির কোলে অহল্যা বেঁচে থাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। 
পরে রামায়ণে পাই রামকে তার আতিথেয়তায় মুগ্ধ করে আর কঠোর তপস্যার দ্বারা অহল্যা শাপমুক্ত হন এবং পুনরায় মানবদেহ লাভ করেন। তাই অহল্যা পঞ্চকন্যার প্রথম স্থানে। 

ভীল উপজাতিদের রামায়ণে বলে  সপ্তর্ষিদের যজ্ঞাগ্নির ছাই থেকে উঠে এসেছিল অহল্যা।   ভাগবদ্‌পুরাণে বলে অহল্যা নাকি চন্দ্রবংশীয় রাজা মুদ্‌গলের কন্যা । 

 এ হল অহল্যা নিয়ে আমাদের তথাকথিত ধর্মীয় উপাখ্যান। 

এবার আসল আলোকপাত "কহানী" খ্যাত পরিচালক সুজয় ঘোষের মাত্র ১৪ মিনিটের এপিক থ্রিলার "অহল্যা"র ওপর।
এও এক নতুন কহানী। কিছুটা  পুরাণকথা থেকে বেরিয়ে আবার কিছুটা তাকে রেখে দিয়ে। আর নামধাম অনুষঙ্গ সবকিছুই অটুট। ব্রহ্মা অনুপস্থিত এই অহল্যা কাহিনীতে কিন্তু গৌতম সাধু, ইন্দ্র সেন ও অহল্যা এই তিন মূল চরিত্র বেশ মিলেমিশে একাকার। এমনকি আর্টিষ্ট গৌতম সাধুর দেওয়া পরশপাথরটিও বেশ প্রতীকি। শিল্পী গৌতমের "বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা" অহল্যার সিডাকশান, পুলিশ ইন্সপেক্টর ইন্দ্র সেনের অহল্যার সাথে সেই শরীরিখেলায় মেতে ওঠা । অহল্যা গৌতমের সাথেও সাবলীল আবার তরুণ ইন্দ্রের (টোটা রায়চৌধুরী) সাথেও। রামায়ণ প্রসঙ্গ, পাথর অনুষঙ্গ, ঠিক আমাদের মূল উপাখ্যানের মত। কিন্তু যে ব্যক্তি হঠাত করে শিল্পীর কাছে আসেন আর ফিরে যান না তিনি। আর পাথর স্পর্শ করলেই তিনি পুতুলে পরিণত হন। সেটি বুঝি গৌতমমুণির অহল্যাকে অভিশাপ দেবার মত এক কঠিন শাস্তিপ্রদান। কিন্তু একটা খটকা থেকেই গেল। গৌতমরা  যুগে যুগে  তাঁর স্ত্রী অহল্যাকেই বারেবারে শাস্তি দিচ্ছেন এভাবে
কিন্তু কেন যে সুজয় ঘোষের অহল্যাকে "এপিক থ্রিলার" আখ্যা দেওয়া হল তা বুঝলামনা। অনবদ্য সৃষ্টি, নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় প্রেক্ষাপট, দুর্দ্দান্ত সিনেম্যাটোগ্রাফি, আর সবচেয়ে ভালো মাত্র ১৪ মিনিটের মধ্যে একটা কিছুকে কংক্রীট দাঁড় করানো।   
ভাবতে কষ্ট হল এই ছবিতে গৌতম সাধু(সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)  বারেবারে তাঁর যুবতী স্ত্রীয়ের কাছে ঋণি থেকে গেলেন কারণ তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টির পেছনে নাকি তাঁর এই স্ত্রীরত্নটির অপরিসীম অবদান। আর তাই বুঝি বারেবারে অহল্যা (রাধিকা আপ্টে)  মোবাইলটি নীচে ফেলে চলে যায়। গৃহে কোনো আগন্তুক এলেই তাকে পাথর ছোঁবার অছিলায় বৃদ্ধ শিল্পী গৌতম সাধু সেই আগন্তুককে পুতুল বানিয়ে ফেলেন। সব কিছুই ঠিক ছিল যদিনা অহল্যার মূল কাহিনীর সাথে গুলিয়ে না ফেলি।
সব কিছুই ঠিক আছে তিনি সুজয় ঘোষ মহাশয় বলে। সবকিছুই ঠিক আছে যদিনা একজন ফেসবুক বন্ধু এই ছবিকে সত্যজিত রায়ের "প্রোফেসর শঙ্কু ও আশ্চর্য পুতুলের্" সাথে তুলনা না করতেন। তাহলে কি সুজয় ঘোষ "কপি পেস্ট" করলেন  কোন্‌টির থেকে (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)? পুরাণের গৌতমমুণি-অহল্যা-ইন্দ্রের গল্প থেকে না কি সত্যজিত রায়ের ঐ ছবিটি থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে।
স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি ভাবায় আমাদের সফল ছোটগল্পের মত। শেষ হয়েও যা শেষ হয়না।   ওহ্‌! আরেকটা কোশ্চেন! গৌতমমুণি সে যুগে স্ত্রীকে শাস্তি দিয়ে, অভিশাপ দিয়ে প্রস্তরীভূত করেছিলেন কারণ পরকীয়া।  এযুগের গৌতম সাধু বেশ মেনে নিয়েছেন তাঁর যুবতী স্ত্রীয়ের অন্য পুরুষকে সিডিউস করা, কিছুটা যেন উসকেই দিয়েছেন তাকে পরকীয়ায় মেতে উঠতে কারণ নিজের অক্ষমতা ( যা তিনি স্বীকার ও করেছেন ) ।  এইযুগে মোবাইল ফোন, ম্যাগাজিনে স্বাছন্দ্য আধুনিকা অহল্যাকে বর্তমানের গৌতম সাধু কিন্তু বেশ প্যামপার করেন। সেটাই যুগোপযোগী পরিবর্তন কিন্তু অহল্যা-গৌতম-ইন্দ্রের প্রত্যাবর্তন নয়। 



ও কলকাতা ব্লগজিনে প্রকাশিত 

১৭ জুল, ২০১৫

নেত্রদান


কারো আষাঢমাস, কারো যগ্যিমাস! এক‌ইসাথে ঈদের শপিং, হাঁড়ি চেঁচেপুঁছে কিঞ্চিত হালিম, জগাদার প্রোফাইল বদল আর ছাপ্পান্নভোগের যগ্যি, রথের ঝাড়াপোঁছ । 
আজ জগাদার নেত্রদান-উত্সব। মানে উনি কারোকে আই ডোনেট করছেন না । ওনার নবকলেবরে চোখ উঠবে আজ। না, না, কংজাইটিভাইটিস নয়। নতুন শরীরে নতুন চোখ প্রতিস্থাপনা। না, না আই ট্রান্সপ্লান্টও নয়। শিল্পী চোখ আঁকবেন তাঁর নতুন কলেবরে। 
গতকাল ব্রহ্মবস্তু  সানন্দে ট্রান্সফার হয়ে গেছে ওনার আত্মার সাথে। আজ চোখ আঁকা হলেই রথের পূর্ব মুহূর্তের প্রস্তুতি শেষ।  তাঁদের চোখে, ঠোঁটে নাকি রাসায়নিক বর্জিত রং দেওয়ার প্রথা। মানে যাকে বলে ইকোফ্রেন্ডলি, ভেষজ রং । আর কেন‌ইবা তা হবেনা? এই শরীরের রং নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে দিনের পর দিন, যতক্ষণ না আবার নবকলেবর হয়।  
আয়ুর্বেদগুণ সম্পন্ন হরিতাল(হত্যেল, হলুদ রং), হিঙ্গুলা( টুকটুকে লাল পারদের প্রাকৃতিক যৌগ, যাকে বলে সিনাবার)  সোনার প্রদীপ জ্বালিয়ে তার ভুসোকালি (কালো রং),  শাঁখের গুঁড়ো থেকে সাদা রং, আবার সোনার গুঁড়ো‌ও  মিশিয়ে জগাদা এন্ড কোম্পানিদের সং সাজানোর পালা। 
পুরো বিউটি স্যালোনে তিনমূর্তি এখন। দারুব্রহ্মের নতুন অঙ্গ মার্জনা, ফেসিয়াল, পর্বের ইতি। কুড়চি-কদম্ব-কেতকীর স্নিগ্ধ জলে স্পা পর্ব শেষ। বাকী শুধু আই মেকাপ। ব্যস! রেডি টু বোর্ড অন রথ। টাইমেই আছে গজেন্দ্রগমন। শুধু ছাড়ার অপেক্ষা আর আমাদের দেখার!!! 

১৩ জুল, ২০১৫

সুবর্ণলতার সেকাল ও একাল

(আশাপূর্ণা  দেবীর ছবিটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

১৩ই জুলাই আশাপূর্ণাদেবীর মৃত্যু দিবস। আসুন তাঁকে বারেবারে স্মরণ করি। বরণ করি তাঁর চিন্তাধারাকে। পালটে ফেলি আজকের সুবর্ণলতাদেরো। 

আশাপূর্ণাদেবীর কলমে প্রথম-প্রতিশ্রুতির সত্যবতী এবং তারই ভাবমূর্তির মূর্ত প্রতীক তার কন্যা সুবর্ণলতা চরিত্রটি আজো আমার মনে চির সমাদৃতা । দুটি উপন্যাস পড়েছিলাম বারোক্লাসের পরীক্ষা দিয়ে । তখন নারীমুক্তি, নারী সংরক্ষণ নিয়ে এতটা মাতামাতি শুরু হয়নি কিন্তু ঘোমটা পরিবৃতা বঙ্গনারীর উত্তরণ ততদিনে হয়ে গেছে সালোয়ার-কুর্তায় এবং জিনস-টিশার্টে । ঘরের বন্দিনী নারী বাইরের জগতে পা রাখার প্রোমোশানও পেয়ে গেছে । কিন্তু পাল্টায়নি পারিবারিক বোঝাপড়া বা সম্পর্কের টানাপোড়েনের চিত্র, উড়ে যায়নি রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপ । যে যুগে সত্যবতী সুবর্ণলতার মধ্যে সঞ্চার করেছিল স্ত্রী স্বাধীনতার ভ্রূণ, সেদিনের থেকে সমাজের চিত্র পাল্টে গেছে অনেকটাই কিন্তু বিবাহিতা নারীর লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও অপমানের বোঝা বোধ হয় এখনও হালকা হয়নি । সে সময় সুবর্নলতা পড়ে মনে হয়েছিল আমি সত্যবতী তথা সুবর্ণলতার সকলরসের ধারক ও বাহক হলাম । আমি আমার প্রাকবৈবাহিক জীবনে এইরূপ প্রতিবাদী মানসিকতা নিয়েই ঘর সংসার করব এবং "আমারে দাবায়ে রাখতে পারবা না" এই ভাবেই আন্দোলন চালিয়ে যাব । কিন্তু কার্যকালে অতটা অন্দোলন প্রবণ না হয়েও বরিষ্ঠনাগরিকজনের মুখনিঃসৃত বাক্যমালাকেও আপ্তবাক্য রূপে মেনে নিতে পারিনি ।

মেয়েদের মনকে বুঝতে পেরেছিলেন আশাপূর্ণা । বিভিন্ন বয়সে মেয়েদের বয়সের মনের গঠনকে খুব অন্তর দিয়ে লক্ষ্য করলে যা বোঝা যায় । নারীমনের বয়স এবং তার সঙ্গে নানাবিধ জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। যখন সে কন্যা তখন তাকে দিতে হবে অনেক কিছু, গড়তে হবে, শাসন করতে হবে, সোহাগও করতে হবে সেই সাথে । তাকে যোগ্য সম্মান দিতে হবে । তবেই তার কাছ থেকে সম্মান পাওয়া যাবে । সুবর্ণলতাকেও আশাপূর্ণার সত্যবতী এই ভাবেই গড়ে তুলছিল কিন্তু তার শাশুড়ি এলোকেশীর জেদের কাছে হার মানতে হয়েছিল আত্মসম্মানবোধ সম্পন্না সত্যবতীর । বেথুন স্কুলে পাঠরতা দশ অনুত্তীর্ণা সুবর্ণকে কেমন করে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার ঠাকুমা নিয়ে চলে এলেন আর তার মায়ের অনিচ্ছায় বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিলেন তা আমরা দেখেছি । এলোকেশী বামনির কাছে পুত্রবধূর মতামত অপ্রয়োজনীয় । তিনি সত্যবতীকে মানুষ বলেই মনে করেন নি তাই এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছিলেন । নিজের ছেলেকে তিনি যারপরনাই বৌয়ের বশীভূত বলতেও কুন্ঠিত হন নি । সে যুগে একজন মেয়ে মানুষ কিরূপে আর একজন মেয়েমানুষকে পায়ের তলায় অর্থাত নিজের অধীনে রাখার চেষ্টা করত তা এহেন লজ্জাকর বিবাহ দেখে আমরা শিক্ষা লাভ করি । বৈধব্যের একাকীত্বে উপনীত এলোকেশীর এহেন নিন্দনীয় সিদ্ধান্তে তার পুত্রও মনে মনে অখুশী হলেও প্রতিবাদী হননি কারণ সেই মেরুদন্ডের কাঠিন্য তার ছিলনা । "মা রাখি না বৌ রাখি" তো সব বিবাহিত পুরুষেরই জীবন যুদ্ধের অন্যতম পর্যায় । কিন্তু যে পুরুষটি সেই কাজ বুদ্ধির বলে করতে পারে সে তো রাজা ।

সুবর্ণলতা শিক্ষালাভ করে যে অপমানের স্বীকার হয়েছিল তা বোধ হয় এখনকার সুবর্ণদের কল্পনাতীত । বরং সংসারের স্বাচ্ছল্যতার কারণে এই শিক্ষালাভ শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে । এখনকার স্বাধীন নারী সানন্দে চাকরীর দায় ভার গ্রহণ করে যারপরনাই খুশি; বৌমাটি রোজগেরে বলে শাশুড়িমা কিন্তু মনে মনে গর্বিতা কিন্তু অন্দরমহলে তার নিত্য অনুপস্থিতি সংসারে সূত্রপাত ঘটায় নিত্যি কলহের । ঠিক যেমনটি আমরা দেখেছি সুবর্ন পড়তে ও লিখতে পারত বলে তা মহা অপরাধ বলে গণ্য হত আবার বাড়িতে কোনো চিঠিপত্র এলে তাকে দিয়ে সেটি পড়িয়ে নেওয়াটি কোনো অপরাধ বলে মনে করা হত না ।

তখনকার পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আমরা লক্ষ্য করেছি স্বৈরাচারীর ভূমিকায় এলোকেশী নামক বিধবা রমণীকে । আবার সেই একনায়কতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে সুবর্ণলতার সংসারে । সেখানে সুবর্ণলতার বিধবা শাশুড়ি মুক্তকেশী তার চারপুত্রের কারোকেই মানেন না । তাঁর সংসারে তিনিই সর্বময় কর্ত্রী এবং স্ত্রী নায়িকার ভূমিকা পালন করে চলেছেন। সত্যবতী এবং সুবর্ণলতা উভয়ের সংসারেই এই শ্ব্শ্রূমাতা স্বরূপিণী কর্তা ব্যাক্তিটির অত্যাচারের চরম মূহুর্তে ঘটেছে নিত্যি অশান্তি এবং গল্পদুটি পড়তে পড়তে কেবলই মনে হয়েছে ইতিহাসের মাত্‌সন্যায় যুগের কথা অর্থাত দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার । কি আনন্দই না পেয়েছেন এই দুই মহিলা দুটি কন্যাসমা অবলা পুত্রবধূর ওপরে মানসিক অত্যাচার করে ! এ যেন নবপরিণীতা বধূটির উপর ইচ্ছকৃত কর আরোপ করা । তাহলে প্রশ্ন জাগে পুত্রের বিবাহের প্রয়োজনীয়তা কি শুধুই দাসী আনার জন্যই? আর শাশুড়ি মা টি কি সব কাজকর্ম ফেলে ছোট সেই বালিকাবধূটিকে গালমন্দ করার জন্যই গৃহে এনেছিলেন বরণ করে?তিনি একথা ভুলে যান বারবার যে পুত্রবধূটিকে আপন করতে না পারলে তিনি ও তাঁর পুত্রের থেকে অনেক দূরে সরে গেলেন ।কিন্তু তাতে কি আসে যায় ! ভবি ভোলবার নয় ।

নারীশিক্ষার প্রসার হয়েছে আমাদের দেশে । বালিকা আর বধূ হয় না শিক্ষিত সমাজে । শাশুড়িমাও কিন্তু শিক্ষিতা আজকের যুগে, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়ায় উভয়ই হিমশিম খান আজকের যুগেও । অবশ্যি এর ব্যতিক্রমও থাকে । এক হাতে তালি না বাজিয়েই বলছি আজ দুইপক্ষের কেউই বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র জায়গা ছাড়েন না এই সংসারে । "যে সহে সে রহে" এই অমোঘবাণীকে মাথায় করে যে বধূটি চলতে পারে সে আদর্শ গৃহবধূ আর "কারো দোষ দেখো না" এই নীতির অনুগামিনী হয়ে যে শাশুড়িমা কাল কাটাচ্ছেন বহাল তবিয়তে, তিনিই ভাল শাশুড়ির সংবর্ধনা পান প্রতিবেশী, আত্মীয় পরিজনের কাছ থেকে । কিন্তু তবুও এই শাশুড়ি-বৌ মানিয়ে চলার কারণে ভেঙে যাচ্ছে কত যৌথ পরিবার । সে যুগেও আমরা দেখেছি স্বাধীনচেতা সত্যবতীর স্বামীকে নিয়ে শ্বশুরভিটে পরিত্যাগ করে ভাড়াবাড়িতে এসে সংসার করতে । আর এযুগে শিক্ষিত, চাকুরীরতা নারীর তো কথাই নেই । সে তো আরো স্বাধীন, আরো বেশী সচেতন ;
শাশুড়িমায়েরও ভুলে গেলে চলবে না যে তিনিও একদা ছিলেন বধূ বেশে । তাঁরও অনেক শখ, অনেক স্বপ্ন পূরণ হয়নি বিয়ের পরে কিম্বা তাঁরও ইচ্ছা করত একান্তে স্বামীটিকে পাবার, স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করার কিন্তু তাই বলে তাঁর পুত্রবধূটির ওপর তো তিনি সেই সব নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন না বা তিনি পাননি বলে পুত্রবধূটিও তা থেকে বঞ্চিত হোক এতো মেনে নেওয়াও যায় না । যেমন ধরা যাক তখন কার কালে ঘোমটা মাথায় দেওয়া ছিল ম্যান্ডেটরি । কিন্তু এখন তা সভ্য সমাজে লুপ্তপ্রায় । তখন বাড়িতে ম্যাক্সি বা হাউসকোটের চল ছিলনা কিন্তু এখন তা আমাদের ঘরে ঘরে চালু হয়ে গেছে । এবার যিনি নতুন বৌমাটিকে এখনও ঘোমটা দিতে বাধ্য করছেন তিনি কিন্তু তাঁর অন্দরমহলে নিজের সুবিধার্থে ম্যাক্সি বা হাউসকোট পরে আধুনিকা হয়ে ঘুরে বেড়চ্ছেন ।"আমাদের সময়ে এমন হত না, আমরা অনেক সংযত ও বাধ্য ছিলাম" "আমাদের কালে এমন দেখলে লোকে ছি ছি করত" কিন্তু একবারও কি তিনি ভাবেন না যে তেনাদের কালে তাকে এমন হাউসকোট বা ম্যাক্সি পরিহিতা দেখলে তাঁর শ্বশুরভিটার গুরুজনেরা ভিরমি খেতেন ! আবার ধরা যাক বাপের বাড়ি থাকা নিয়ে বৌমাটিকে শুনতে হয় প্রচুর কথা । কিন্তু শাশুড়িমা যখন বৌ ছিলেন তখন তিনিও থাকতেন বাপের বাড়ি গিয়ে আর তাঁর মেয়েটির বেলায় তো তিনি এ ব্যাপারে রা'টি কাড়েন না ।

তিনি বয়সে বড় বলে "do what I say, don't do what I do"অথবা "a king can do no wrong" এই আপ্তবাক্যটিকে মেনে নিতে বাধ্য করেন। বধূরাও আজকের দিনে শিক্ষিত সুশীল সমাজের কর্ণধার । সত্যবতী বা সুবর্নলতার ধারাপাতে কিছুটা পুষ্ট । তারা আজকালকার নিউক্লিয়ার পরিবারের সদস্যা এবং সর্বোপরি শিক্ষার আলোয় জ্বাজ্জল্যমান এক একটি তারকা ; তার মা-বাবার স্নেহের সুধারসে লালিত ওয়ান এন্ড ওনলি কন্যারত্ন । তাই চট করে কিছুকে মেনে নেওয়াও তার পক্ষে কঠিন হয় । আর শাশুড়িমাটি কিন্তু ভিতর-বাহিরে, অন্তরে অন্তরে সুপ্ত এলোকেশী, প্রচ্ছন্ন মুক্তকেশী স্বরূপিণী । তাই ছলে বলে কৌশলে বধূটিকে আঘাত করতে বা অন্তরটিপুনি দিতেও কুন্ঠিত হন না ।

তবে এও স্বীকার করে নিতে বাধ্য হই যে আশাপূর্ণার সত্যবতীর আমলে শ্বশুর ঘরে যাওয়ার পূর্বে কন্যাকে কিন্তু অনেক সতর্ক করে দেওয়া হত যাতে মেয়েটি সভ্যতা, শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে, গুরুজনদের মান্যি করে, সকলকে যত্নআত্যি করে; এখনকার যুগে সেই কন্যাটি কে সেই মত কোনো সতর্কীকরণ করাও হয়না তার প্রধান কারণ সে এখন সত্যবতীর মত অবলা বালিকা নয় । সে রীতিমত উচ্চ শিক্ষিতা ও সাবালিকা । তার নিজস্ব মতামতকেই আজীবন কাল তার বাড়ির লোকেরা প্রাধান্য দিয়ে এসেছে অতএব সে তো সেই সতর্কীকরণ বার্তা শুনতেও চাইবে না । তবে এর ব্যাতিক্রমও আছে ।

সে যুগের সুবর্ণলতার তার ঠকুমার গুরুদেবের আদেশে হঠাত বিবাহ স্থির করা , সুবর্ণলতার সংসারে তার দুই দেবরের অমানবিক আচরণ এবং সুবর্ণলতার স্বামীর পুরুষ সিংহের কোনোরকম বিকাশ লক্ষ্য না করে ভেবেছিলাম পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের ক্ষমতার এহেন অপব্যবহার যেন আমাদের যুগে না হয় কিন্তু হায় রে বিধাতা এখনো পুরুষ বোধ হয় পুরোপুরি পুরুষ হননি । এ যুগেও অনেক পুরুষদ্বারা আজকের সুবর্ণলতারা লাঞ্ছিত হন সামান্য কারণে যেমন ধরুণ পণপ্রথা মেনে নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যান বরবেশে আর পণের অঙ্কটি মন:পুত না হলে কনের "দেবর" রূপী বন্ধুটি কিন্তু অমানবিক আচরণ করতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হন না । ঈশ্বরের স্বপ্নাদেশের মত মিথ্যের অজুহাতে সে যুগের শাশুড়িমাটি বন্ধুর প্ররোচনায় ছেলেকে নিজের কাছে শুতে বলে কারণ বৌয়ের সাথে এক সঙ্গে শুলে নাকি ছেলের অকল্যাণ হবে । এ যুগেও ধর্মের নামে ভুচুংভাচুং দিয়ে আধুনিকা শাশুড়িরা এরূপ মিথ্যার আশ্রয় নেন কিনা সে ঘটনা আমার জানা নেই তবে প্রাকবৈবাহিক ঘনিষ্ঠতাও কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আপত্তিজনক হয় তার কারণ একটাই তারা একত্রে থাকলে তাদের বন্ধন যদি আরো সুদৃঢ় হয়ে যায় !

মনে হয় সমাজের পরিকাঠামো বদলানো প্রয়োজন । আমেরিকার অগ্রসর-সমাজ কত যুগ আগে যা অনুধাবন করেছিল তাদের সমাজচেতনার মাধ্যমে;আমাদের দেশে সেই গঠনের বোধ হয় একান্ত প্রয়োজন তাতে রক্ষা পাবে উভয় পক্ষ । ভাঙবে না সংসার । মা-বৌ এই টানাপোড়েনের হাত থেকে বাঁচবে অবলা সেই পুরুষপ্রাণীটি । যাকে সহ্য করতে হবে না বৌয়ের কাছ থেকে অহেতুক গালমন্দ, "কাপুরুষ", "মেরুদন্ডহীন" এই সব বিশেষণ আর মায়ের কাছ থেকেও শুনতে হবে না "বৌয়ের আঁচল ধরা", "ভেড়ো", "স্ত্রৈণ" এহেন কটুক্তি।

আমার কাছে মেয়েদের মনকে "গ্লাস ইনসাইড, হ্যান্ডল উইথ কেয়ার" এই রূপ ভাবে প্রতিপালন করা উচিত । মেয়েটি যখন স্কুল যাচ্ছে তখন থেকে শুরু করে সে যখন শাশুড়ি মা তে পদার্পণ করেছে, তখন পর্যন্ত এবং তারপর সেই মা'টি যখন একাকী কালাতিবাহিত করছেন অর্থাত বৈধব্যের স্বীকার হয়েছেন । আর প্রয়োজন ঘরোয়া কাউন্সেলিং অর্থাত সংসারের প্রতিটি সদস্যের সামনে বসে একটা মিমাংসা বা সমাধানের সূত্র খোঁজা । নয়ত "বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনীর" ন্যায় চলতে থাকবে উভয় পক্ষের কোঁদল আর কখনো কখনো যার পরিণতি ঘটবে ডিভোর্সের ডিসিশনে । মেয়েটি যখন সাবালিকা তখন তার নিজস্ব মতামত , তার চিন্তাধারাকে সম্মান জানাতে হবে আবার বেচাল কিছু দেখলে তার বাবা-মাকেই শাসনের শাণিত অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে এবং তাও তাদের কন্যাটির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আর বিবাহের পরে পুত্রটিকে মায়ের পাশে থেকে বুদ্ধি করে মাকে ও শাসন করতে হবে যাতে যে তিনি যাতে তার প্রিয়তমা স্ত্রীরত্নটিকেও আঘাত না দেন তাহলে সব থেকে বেশী দুঃখ ছেলেটিই পাবে । তাকে নিতে হবে বিচারকের ভূমিকা । সে পিঠ বাঁচিয়ে চলবে মায়ের সামনে আর রাতের আঁধারে প্রেয়সী স্ত্রীটির বিরহে কাতর হবার ভান করবে তা যেন না হয় ।

এখনকার মেয়েরা যখন বধূরূপে বরণ হয়ে পা দেন শ্বশুর গৃহে তখন তাদের মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয় কারণ তারা তখন তো সেকালের সত্যবতী-সুবর্ণলতার মত কচি নন । আর তাই বলে নাবালিকা ঘরে আনাও তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর সবশেষে এখনকার সুবর্ণলতাদের বলি অন্যায় মেনে নিতে হবে না কিন্তু নিজের মাটি শক্ত করে শাশুড়িমাটিকেও একটু বোঝার চেষ্টা করে দেখুন না যাতে সাপ ও মরে লাঠিও না ভাঙে। আপনিও তো একদিন শাশুড়ি হবেন ।

আর সর্বকালের সকল এলোকেশী বা মুক্তোকেশী রূপিণি শাশুড়ি মায়েদের উদ্দেশ্যে বলি আপনারাও একটু ভেবে দেখুন না । ছেলেটি তো আপনার; তার অর্ধাঙ্গিনীকে একটু ভালবাসতে চেষ্টা করুন না । সেই মেয়েটি তো আপনার পরিবারেরই একজন, সে আপনার "মেয়ের মত" কেন ? মেয়ে হয়েই থাক না সে আপনার কাছে, পাক না একটু পক্ষপাতিত্ব । আপনারও ভুলে গেলে চলবেনা যে "আপ ভি কভি বহু থি" !
আজকের দিনেও মিডিয়া সোচ্চার প্রতি পলে পলে, দন্ডে দন্ডে । তাই বুঝি সেলিব্রিটিদের দিয়েও অবগুন্ঠনা বিয়ের কনেকে শৌচালয়ের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে দেখি আমরা। কিন্তু হায় আমার গ্রাম্যবধূ! তোমার শ্বশুরকুল তোমাকে ঘোমটা দিতেও বাধ্য করবে আবার খোলা স্থানে শৌচকর্ম‌ও করতে বলবে। আজকের সুবর্ণলতাদের কি সুদিন আসবেনা?  মদ্যা কথা তোমাকে অবদমিত করেই রাখবে তারা সেই মাত্সন্যায় যুগের মত অথবা কলেজের ragging period এর মত।  দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চলছে ও চলবে। কিন্তু সুবর্ণলতারা যথেষ্ট সবলা আজ। তাই প্রতিবাদী মন নিয়ে এগিয়ে আসি আমরা। ঘরে ঘরে সব সুবর্ণরা স্বেচ্ছাচারিতা, স্বাধীনতার সীমারেখা আর IPC র 498Aর যথেচ্চাচার না করেই  সুবর্ণলতা হয়ে উঠুক.. আশাপূর্ণা দেবীর মৃত্যুদিনে আমাদের সমাজের কাছে এই হোক প্রথম প্রতিশ্রুতি। 




উত্তরবঙ্গ সংবাদ, শনিবার ১১ই জুলাই ২০১৫