১৩ অক্টোবর, ২০১৬

পুজোসাহিত্য ২০১৬

৪ অক্টোবর, ২০১৬

নিদ্রারূপেণ


যা দেবী সর্বভূতেষু নিদ্রারূপেণ সংস্থিতা ! 

 

মানুষের চোখ থেকে সব ঘুম কেড়ে নিয়ে তুমি নিদ্রারূপেণ বিরাজিতা। আর তাই বুঝি আমাদের এত অনিদ্রার প্রকোপ। ঘুম নেই কারোর চোখে।

এমনকি স্বয়ং ব্রহ্মার আটচোখেও ঘুম নেই। তিনিও ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত। কি আর করেন! মা দুর্গার আদেশ।

কুমোর পাড়ায় ধরপাকড় চলছে। মা দুর্গার আদেশে ব্রহ্মা স্বয়ং তলব করেছেন কুমোর পাড়ায়। কিছুদিন ধরেই তিনি নালিশ শুনছিলেন । প্রজাপিতাকে বলেছিলেন দুর্গা। 

 

- আপনি আর বুঝবেন কেমন করে? আপনার তো আর বারোমেসে পুজোটুজো করেনা কেউ। যত বিপদ আমাদের। মহেশ্বরও কিছুটা অবগত আছেন। কারণ শিবরাত্রিতে বিশাল শিবমূর্তি গড়ে ওনার পুজোরও চল হয়েছে আজকাল। আপনারা তিন মক্কেল মানে আপনি, বিষ্ণু আর মহেশ্বরই স্বর্গের মাথা। তার মধ্যে একজন সিদ্ধি- গাঁজা-আফিমের ঘোরে অহোরাত্র। বিষ্ণুর তেমন একটা হেলদোল নেই । নিজের আবতারত্বের প্রচারে মত্ত। তাই আপনার শরণ নিলাম পিতাশ্রী।

ব্রহ্মা তখনকার মত তথাস্তু বলে তক্কে তক্কে ছিলেন। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগেনি তাঁরও। একদিন ভরদুপুরে তিনি হাজির হলেন কুমোর পাড়ায়।

সেখানে শয়ে শয়ে কুমোর মূর্তি গড়ায় ব্যস্ত। পুজোর সিজনেই যা রোজগার পাতি তাদের।

একজন পায়ে ধরে বসল । " হে প্রভু, আমাদের মূর্তি না গড়তি দিলে বালবাচ্চা নিয়ে না খেতি পেয়ে যে মরে যাব" 

ব্রহ্মা কুমোরকে বললেন, তা ভায়া পেছনে বাঁশ দিয়ে মূর্তি গড়িস তোরা, ভাবলি কি করে যে ভগবান তোদের রক্ষে করবে ? মূর্তি গড়বার সময় মনে থাকেনা সে কথা?

গরীব কুমোরটি বলল, বাঁশের কাঠামো না হলে খড় দিয়ে মূর্তি গড়ব কেমনে ঠাকুর?

ব্রহ্মা বললেন, কেন? আসল তো ঘট। ঘটের পুজোই তো করতে পার।

কুমোর বলল, ঘট? তাহলে আমাদের রুজি রোজগার যে বন্ধ হয়ে যাবে। ঘট গড়ে আর ক'টাকাই বা পাব আমরা?

ব্রহ্মা বললেন একে তো বাঁশ তার ওপর ঐ মৃন্ময়ী মূর্তিগুলো সব গঙ্গার জলে ফেলে দূষণ বাড়াস তোরা। জানিস মা গঙ্গা এতে ক্ষুব্ধ হন?

মা দুর্গা মনে মনে বললেন, আমাকে জলে ফেলে তো খুব মজা করিস সব, এবার বোঝ ঠ্যালা! ব্রহ্মা স্বয়ং কেসটা টেক ওভার করেছেন, আর কি চিন্তা আমাদের!

'দিন থেকেই দুর্গা কানাঘুষো শুনছিলেন... 

মনে মনে বললেন, তোরা কি ভাবিস? আমি সারাদিনই কেবল নিদ্রারূপেণ সংস্থিতা?

 

কে জানি বলছে, "মায়ের হাজার হাত"

তা বাপু আমি দশভুজা, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লড়াই করি। আমি কি তাই বলে জল ঘাঁটি যে আমার হাতে হাজা হবে? আমার এই দশ হাত তোদের আস্থার, ভরসার স্থল আর তোরা কিনা "হাজার হাত, হাজার হাত" করে মরছিস? আমি ঠাণ্ডার দেশে থাকি। আমার আবার চর্মরোগ হবে কেন বাপু?

কি যে সব শুরু করল আমাকে নিয়ে!  

এই তো সেবার একদল আমার গগনচুম্বী মূর্তি গড়ল অথচ দেহানুপাতে আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দিকে খেয়াল রাখলনা। আরো বড়? সত্যি? সবচেয়ে বড়? এইসব গোলেবাকুলির গপ্পো বলে তুমুল লোক জড়ো করল অথচ... এ আবার কেমন তর? মাইকে পুরুত "পীনোন্নত ঘটোস্তনী", "পীনোন্নতপয়োধরম্‌" এইসব সংস্কৃত আওড়ে চেঁচিয়ে মরছে, অথচ দেখো কি কিম্ভূত আমাকে লাগছিল। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। সেইজন্যেই তো আমি বন্ধ করে দিলুম ঐ পুজো। বাপ্‌রে! পালিয়ে বেঁচেছিলুম যেন! তার চেয়ে বাপু ব্রহ্মা যেমন বলছেন তেমনি হোক্‌না। ঘট পুজো করো তোমরা।

পাড়ায় পাড়ায় পুজোর টিজারের রেষারেষিতে আমার পরাণ আঁটুপাটু। অগত্যা আমি পাড়ি দিলাম কৈলাসে। পড়ে থাক তোরা মৃন্ময়ী দুর্গা নিয়ে।

৩ অক্টোবর, ২০১৬

কাউন্ট ডাউন বিগিনস...

র্বভূতে তিনি চেতনায় আছেন? হায়রে! তাই মানুষ আজ অচৈতন্য? মানুষের সব কোমলপ্রবৃত্তি আজ কোথায় অন্তর্হিত হল? কোথায় লুকোল মানুষের চেতনা? মানুষ তো এখন জড় পদার্থ গো মা। এর মূলে কিন্তু তুমি। আমাদের সর্বভূতের সর্ব চেতনা তোমার মধ্যে তাই আমরা আজ চেতনা-চৈতন্যহীন হয়ে নিঃস্ব।

তুমি বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতা। তাই বলে মানুষের সব বোধবুদ্ধি কি তোমার কাছে গচ্ছিত ? তাই কি আজ সমাজের সর্বস্তরে মানুষের মধ্যে এত বুদ্ধির অভাব ? অথচ বুদ্ধিজীবিতে ছয়লাপ চারিদিক।

তুমি ক্ষুধারূপেণ সংস্থিতা। তবুও কেন মানুষের ক্ষুধা দূর করোনা? এযুগেও পৃথিবীতে খাদ্যের অভাব এখনো ।

তুমি নাকি লজ্জারূপেণ সংস্থিতা? তাই কি মেয়েদের সব লাজলজ্জা, বসন ভূষণ হরণ করেছ? তাই বুঝি আজ তারা দেশের আনাচেকানাচে, পথেঘাটে, অলিতেগলিতে, দিনেদুপুরে নির্লজ্জের মতো ধর্ষিতা? অপমানিতা, লাঞ্ছিতা?

তিনি শান্তিরূপেণ সংস্থিতা, তাই বুঝি ভুবনব্যাপী শান্তির বড়োই অভাব। সব শান্তি হরণ করে তিনি নিজেই আজ তুরীয়া নন্দিনী যে। তোমরা চাইলে উনি থোড়ি দেবেন। তোমরাই তো যুগ যুগ ধরে বলে আসছ, তাই উনি দুনিয়ার সব শান্তির ভান্ডার থেকে শান্তি হরণ করলেন কি? তাই বুঝি শান্তির এত হাহাকার।

তুমি শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, কিন্তু তাই বলে সব জাগতিক শক্তির আধার থেকে সব শক্তি কেড়ে নিয়ে বসে রইলে তুমি? এ তুমি কেমন তুমি? প্রকৃত শক্তির এত অভাব কেন ঘটালে মা?

তুমি স্মৃতিরূপেণ, নিদ্রারূপেণ, ভ্রান্তিরূপেণ সংস্থিতা.....ব্লা, ব্লা, ব্লা...

তাই বলে মানুষের স্মৃতির আগার থেকে সব স্মৃতিটুকুনি আর সেই সঙ্গে আমাদের ভুল ভ্রান্তি সব ঝেড়েপুঁছে নিয়ে বসে আছ? তাহলেও আমাদের এত ভুলভ্রান্তি হয় কেন গো মা? আর মানুষের এত ভুলে যাওয়ার রোগ ক্রমাগতঃ বেড়েই চলেছে। ঘরে ঘরে ডিমেনশিয়া। মানুষের চোখ থেকে সব ঘুম নিয়ে তুমি নিদ্রারূপেণ বিরাজিতা। আর তাই বুঝি এত অনিদ্রার প্রকোপ। ঘুম নেই কারোর চোখে।