১৪ আগস্ট, ২০১৭

আজ রাত পুইলেই...।

তক্ষণে মহামান্য দেশ নেতাগণ নিশ্চয়ই ভাষণের জন্য প্রস্তুত। ভোরের আলো ফুটলেই বেরুবে প্রভাত ফেরী। বীরবিক্রমে কন্ঠনালী ফুলিয়ে গগনভেদী চিত্কার করে বাতাস ভারী করবেন সকলে । প্রচার মাধ্যমগুলি প্রতি পলে পলে স্বাধীনতার সংগীত, প্রতি দন্ডে দন্ডে স্মৃতিচারণ, সকালে স্বাধিনতা সংগ্রামের উপর তথ্যচিত্র তো বিকালে ছায়াছবি, প্রদর্শন করবে | কখনো বিরলকেশ,বর্ষীয়ান নেতাকে বহুকষ্টে উপস্থিত করে তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমাদের পরিবেশন করবেন । শহীদ-স্মৃতি ফলক অচিরেই শ্বেত-পুষ্পের অবগুন্ঠনে চলে যাবে । ব্রিগেডের মৃত্তিকা পুষ্পবৃষ্টিতে ছয়লাপ হবেই, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। শহীদমিনারের পাদদেশে লক্ষ মানুষ ভীড় করে নেতার জ্বালামুখী বক্তৃতা শুনবে, এতেও কোনও সন্দেহ নেই। সারাদেশের আকাশে বাতাসে স্বাধীনতার পাঞ্চজন্যের বজ্রনিনাদ অনুরণিত হবে আর ঠিক তখুনি তোলপাড় হবে আমাদের মত কিছু মানুষের মন। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগবে কেনই বা এই উত্সব? কি জন্য পেয়েছিলাম স্বাধীনতা? আমরা কি স্বাধীনদেশের যোগ্য উত্তরসুরী? ইত্যাদি, ইত্যাদি। হ্যাঁ, তাই তো সোশ্যালনেটে এমন কপচাচ্ছি। তবু দেখবেন বাবা, বুঝেশুনে কপচাবেন। ফেসবুক দেওয়ালেরও কান আছে কিন্তু। স্বাধীনতার অপব্যবহার করে কার্টুন ফারটুন ( বিশ্বাস করুন, খারাপ কথা আমি পারদ পক্ষে বলি না, বাক স্বাধীনতা নেই আমার ) আবার এঁকে না ফেলি! তুমি মহারাজ স্বাধীন হলে আজ, আমি আজ পরাধীন বটে!

আচ্ছা বলুন তো স্বাধীন হয়ে কি হল? নিজেই নিজের মন কে বলি, এই যে পাড়ায় পাড়ায় স্বাধীনতার ফ্ল্যাগ উড়ছে, সকলেরি এত স্বাধীনতা পালনের হিড়িক, এর তো একটা ইম্প্যাক্ট আছে না কি? স্বাধীনতা আমাদের জলভাত যে। যেখানে খুশি যেতে পারি, যা খুশি তাই করতে পারি, যা ইচ্ছে তাই বলতে পারি, যখন খুশি পুরোণো নোট বদল করে কেরামতি দেখাতে পারি। রাতারাতি আধার লিংক করার আদেশ দিতে পারি। কিন্তু পেরেও পারিনা। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারি কিন্তু অর্ধশিক্ষিত মানুষগুলিকে স্বাধীনতা দিতে পারি না। বিশেষত বৃদ্ধেরা যারা প্রযুক্তিগত ভাবে পিছিয়ে তারা দেহ রাখবার আগেও স্বাধীন হতে পারেন নি আজ। বরং উত্যক্ত হয়ে ব্যাপক বিশ্বায়নের ঊর্মিমালায় খাবি খেতে খেতে বাণপ্রস্থ নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে বাস করছে।
সমাজের অলিগলির দুষ্কৃতি, দুরাত্মা ? পেরেছি কি তাদের স্বাধীনতা খর্ব করতে?
সেই আলগা গায়ের মায়ের বাছা? তাকে কি দিয়েছি? মিড ডে মিলের লোভ দেখিয়ে বিশুদ্ধ বানান শেখাতে পেরেছি?
মোড়ের মাথার গম ভাঙ্গানোর দোকানে সেই ছেলেটার টিন ফিরিয়ে দিতে পেরেছি? টিন মানে আটার টিন নয় মশাই, তার টিন, তার মধুর কৈশোর অধরাই থেকে গেছে।
জানেন? আমার বেলাতেও দেখিনি। স্বাধীনদেশের রক্ষণশীল, একান্নবর্তী পরিবারের কন্যা সন্তানের স্বাধীনতা ছোটথেকেই ছেঁটেকেটে রাখা হয়। আমার বেলাতেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি ।ছাঁটা-কাটা স্বাধীনতার ঘেরাটোপে, শুল্ক বসানো সাজপোশাক, কর চাপানো বন্ধুনির্বাচন, আর খাজনা আরোপিত বাইরে বেরোনো মেনে নিয়ে লক্ষ্মী মেয়ে হয়েছি। হুঁ, হুঁ, বাবা, স্বাধীনতা দিলে মেয়েরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে যায়।

৮ আগস্ট, ২০১৭

ভাদ্র লক্ষ্মী ভদ্রাবতী আজও পূজিতা

এইসময়, বর্ধমান সমাচার ৭ই আগষ্ট ২০১৭ 

দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলার মত বর্ধমানেও বেশ কিছু স্থানে ভাদ্রমাসের প্রথম দিন থেকে ভাদু পূজা আরাম্ভ হয় ।পয়লা ভাদ্র কুমারী মেয়েরা গ্রামের কোন বাড়ীর কুলুঙ্গী বা প্রকোষ্ঠ পরিষ্কার করে ভাদু প্রতিষ্ঠা করে । একটি পাত্রে ফুল রেখে ভাদুর বিমূর্ত রূপ কল্পনা করে তারা সমবেত কন্ঠে ভাদু গীত গায় । ভাদু এদের আঞ্চলিক লৌকিক দেবী। কেউ বলে ভাদু লক্ষ্মী। ভাদ্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে ভাদুর মূর্তি ঘরে এনে সংক্রান্তির সকালে দলবদ্ধভাবে ভাদু মূর্তির বিসর্জন দেয়। ভাদ্রমাসের জল থৈ থৈ দিনগুলোতে এখানে এখনো প্রত্যন্ত গ্রামে শোনা যায় ভাদু গান। আদিবাসী ঘরে ঘরে পালিত হয় ভাদু পরব।

এখনো আদিবাসী মানুষদের মুখে মুখে ফেরে বিখ্যাত আঞ্চলিক ভাদুগান

খিরই নদীর কুল ভাইঙ্গেছে
ভাদু নাকি আইস্যেছে
হাতে তার পানের বাটা
রুমালটি যার ভাঁইসেছে। 

কুমারী ভাদু দেবীর কাহিনি ঠিক যেন রূপকথা। সে ছিল এক দুঃখিনী কন্যা ।

মানভূমের পঞ্চকোট রাজ্যে তখন রাজা নীলমণি সিংদেও রাজত্ব করছেন দাপিয়ে। কোনও সন্তানাদি নেই তাঁর। মনে খুব দুঃখ। এদিকে রাজা তখন ঐ অঞ্চলে নতুন প্রজাতির এক ধান চাষ নিয়ে মত্ত। ধানের নাম দিয়েছেন তিনি নিজেই "ভাদুই' । ভাদ্র মাসে বোনা হয় সেই ধান। নিজের রাজ্য কাশীপুরের মানুষের জন্য বিগলিত প্রাণ রাজার। মানুষ ধন্য ধন্য করে।রাজা নিজেই মন্ত্রীকে সঙ্গে করে সাধারণ বেশভূষায় গ্রাম পর্যটনে বেরিয়ে পড়েন। ঐ ভাদুই ধানের ব্যাপারে গ্রামের মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে। ধানের ফলন আরো কি করে বাড়ানো যায়, ঐ ধান মানুষের পছন্দ হয়েছে কিনা এইসব তথ্য সংগ্রহের জন্য। এর মাঝে  তাঁর এক প্রজা রাজত্বের সীমানার মধ্যেই এক গ্রামে গ্রাম প্রধানের ঘরে বেড়ে ওঠা এক পরমাসুন্দরী সুলক্ষণা কন্যা ভদ্রাবতীর (মতান্তরে ভদ্রেশ্বরী) সন্ধান দিল। নিঃসন্তান রাজা সেই শোনামাত্র কন্যাটিকে চাইলেন নিজের কন্যা রূপে পালন করবেন বলে। কিন্তু মেয়েটির পিতা গ্রামের মুখিয়া কিছুতেই রাজি নন। অবশেষে স্থির হল সেই মেয়েটি তাঁর নিজের ঘরেই থাকবে তবে রাজা তার জন্য রাজকুমারীর মত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেবেন আর নিজের কন্যারূপেই দেখবেন তাকে।নিজের পিতার ঘরেই  রাজকন্যার মত বড় হতে লাগলেন ভদ্রাবতী। ভদ্রাবতীর আদরের নাম ভাদুমণি।

এদিকে সারা দেশে তখন সিপাহী বিদ্রোহের ঝড় বইছে। রাজা নীলমণি সিংদেও ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে বন্দী । জেল থেকে ফিরে এসে শুনলেন রাজকন্যা ভদ্রাবতী নাকি কবিরাজের পুত্রের প্রেমে পাগলিনী। কে এই কবিরাজ? কি তার নাম, ধাম? অবশেষে খোঁজ মিলল। তার নাম অঞ্জন।
এবার কালে কালে লোককথা, এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে লোকগাথাতে পরিবর্তিত হতে থাকে যুগ যুগ ধরে। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরে সেই রূপকথা।

ঘটনা শুনে  অগ্নিশর্মা রাজা নীলমণি সিংদেও তড়িঘড়ি আদেশ দিলেন কবিরাজ পুত্র অঞ্জনকে বন্দী করার। দুঃখে, অপমানে ভদ্রাবতী তাঁর দুই সখীকে নিয়ে রাজ্যের সমস্ত বন্দীশালায় গান গেয়ে গেয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল যাতে তার গান শুনে অঞ্জন তাকে চিনতে পারে । এবার সেই গান শুনে রাজারও অনুশোচনা হল, তিনি অঞ্জনকে মুক্তি দিলেন বটে কিন্তু ততদিনে রাজকন্যা ভদ্রাবতী নিজের মনোকষ্টে কোথায় যেন চিরদিনের মত অন্তর্হিত। কেউ বলে সে আত্মহত্যার পথ বেছেছিল। কেউ বলে সে পালিয়ে গেছিল। সেই থেকেই রাজকন্যা ভদ্রাবতীর মূর্তি স্থাপন করে শুরু হল রাজার রাজত্বে ভদ্রাবতীর পুজো আর এই পুজোই পরে গ্রামে গ্রামে ভাদু পুজো বা ভাদু পরব নামে পরিচিতি লাভ করে। আর তার দুঃখে দুঃখী হয়েই ভাদুর বারমাস্যা কীর্তন করে মেয়েরা। তাঁকে আনা হয় আদর করে, পুজো করা হয় আদর করে। তুমি থাক আমাদের মাঝে, আর চলে যেওনা তোমার প্রেমিকের খোঁজে দূর- দুরান্তরে। আমরা তোমায় যতন করে রাখব আমাদের মাঝে।

ওদিকে আবার পশ্চিমবাংলার ঘটিদের রীতি অনুযায়ী ভাদ্রমাসেই শুক্লাষষ্ঠী তিথিতে চাপড়া বা চর্পটা ষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন এ অঞ্চলের মায়েরা।

বর্ষার জল পেয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা ভাদ্রের নদনদী, খালবিলে যখন দুএকটা করে পদ্ম ফুটতে সবেমাত্র শুরু করেছে, বাতাসে যখন পুজো পুজো গন্ধ নিয়ে শিউলি ঝরতে শুরু করেছে তখন হয় চাপড়া ষষ্ঠী বা চপটা ষষ্ঠী । দুর্গা ষষ্ঠীর ঠিক একমাস আগে । কাঁঠালী কলা, পিটুলী গোলা দিয়ে পুতুল বানিয়ে পুকুরে ভাসায় গ্রামের মায়েরা, সন্তানের কল্যাণে । আর মটর ডালের চাপড়া বানিয়ে তাওয়ায় সেঁকে মায়েদের খেতে হয় ।

কোনো একদেশে এক বণিক ছিলেন যার তিন পুত্র ও তাদের তিন বৌ ছিল । বৌয়েরা পুত্রবতীও ছিল সকলে । কিন্তু পক্ষপাতিত্বের কারণে বণিক গিন্নী ছোট বৌকেই বেশি ভালবাসতেন । ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষে চাপড়া ষষ্ঠীর জন্য ছোটবৌমা'কে বণিক গিন্নী একফালি পুকুর কাটিয়ে দিলেন । কিন্তু গভীর করে পুকুর খনন করলেও সেখানে একফোঁটাও জল উঠলনা । বণিক আর গিন্নী তা দেখে অবাক হলেন । উপোস করে সারাদিন রাত পড়ে র‌ইলেন ।

অবশেষে মা ষষ্ঠী স্বপ্ন দিয়ে গিন্নীকে বললেন যে এক‌ই ঘরে ছোটবৌয়ের জন্য পুকুর কাটা হল আর বাকী দুটি বৌয়ের প্রতি এমন অসম আচরণ করার কারণে তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন তাই পুকুর শুষ্ক । আর বণিক যেন অন্য বৌদের জন্য আরো দুটি পুকুর কাটিয়ে দেন তবেই এই দুটি পুকুর সহ আগেরটিতেও জল থৈ থৈ করে উঠবে । সেই স্বপ্নাদেশ পাওয়া মাত্রই  বণিক লোক-লস্কর ডেকে  আগের পুকুরের পাশে আরো দুটি পুকুর কাটালেন  আর ঠিক সময়মত তিনপুকুরেই কাঁচের মত জল থৈ থৈ করে উঠল । বণিক গিন্নী তিন বৌমাকে নিয়ে ঐ পুকুরের জলে পিটুলীবাটার পুতুল ভাসিয়ে পুজো আচ্ছা করে ষষ্ঠীর ব্রত পালন করলেন ।  ভাদ্রে ওঠা নতুন ধানে ভাদ্র লক্ষ্মীর পাশাপাশি এই চাপড়া ষষ্ঠীর পুজো এখনো সমাদৃত।

৪ আগস্ট, ২০১৭

সেজোমাসী

 তোমার এয়োস্ত্রী ছবিতে মালা পরাতে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি গো। আজ তোমার রঙীন ছবির দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলার কত সাদাকালো কথা। গরমের ছুটি হলেই মায়ের হাত ধরে তিন নম্বর বাসে চড়ে তোমার বাড়ি। আর  তোমার হাতে কত কত তৈরী মুখরোচক। রন্ধনে দ্রৌপদী ছিলে তুমি। আমার মা সেবার লেবার পেনে কাতরাচ্ছে উত্তর কলকাতার বনেদী প্রসূতিসদন, নর্থ ক্যালকাটা নর্সিংহোমে। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, এখনো দেরী আছে অনেক। বাড়ি থেকে মাছের কচুরী বানিয়ে এনে আসন্ন প্রসবার মুখে দিয়ে তবে তোমার শান্তি হয়েছিল। আমি জন্মেছিলাম তার কিছু পরেই। তুমি মায়ের দিদি অথচ মায়ের কোলে আগে এসে গেল সন্তান । তখনো তোমার সন্তান হয়নি তাই আমার জন্যে  সারাজীবন তোমার চোখে খুশি দেখেছিলাম গো। তারপর আমায় কোলে নিয়ে মা চলল মামার বাড়ি। তোমার অদিখ্যেতা শুরু হল তখন। একুশ দিনের ষষ্ঠীপুজোয় লোকে ছেলের জন্যে একুশটা ক্ষীরের পুতুল গড়ে ষষ্ঠীবুড়ির চুপড়ি সাজায় আর তুমি কিনা ক্ষীরের পুতুল বানিয়েছিলে এই একরত্তি মেয়ে সন্তানের জন্যে!  দেখো, প্রকৃতির কি খেয়াল! তারপরেই তোমার দুটি ছেলে হল কোল আলো করে। আমার ভাই হবার আগে বেশ মনে পড়ে, তুমি নিয়ম করে মা'কে দেখতে আসতে। আর যাবার সময় মা'কে বলে যেতে, প্রথমটি কে অযত্ন কোরো না। বলেই আমার হাতে পুতুল, চকোলেট  কেনার টাকা গুঁজে দিতে। আমি কি করে ভুলব এসব??? 
তুমি কথায় কথায় বলতে দেখিস, আমি এয়োস্ত্রী মরব। আমি রাজরাণীর মত চলে যাব। সত্যি‌ই তাই হল। তোমার ভরভরন্ত সংসার, পাশে দুই ছেলে বৌ, নাতি, নাতনী...জমজমাট সংসারের সব দেখে শুনে সত্যিই তুমি রাণীর মত চলে গেলে! এমন ভাগ্য কজনের হয় আজকের যুগে?
যেখানেই থাকো, ভালো থেকো সেজোমাসী!

শ্মশান অনলে দগ্ধসি পরিত্যক্তোসি বান্ধবৈঃ
ইদং নীরং, ইদংক্ষীরং অত্র স্নাহি ইদং পিব
আকাশস্থ নিরালম্ব বায়ুভূত নিরাশ্রয়
অত্র স্নাত্বা, ইদং পীত্বা স্নাত্বা, পীত্বা সুখি ভব।

২৪ জুলাই, ২০১৭

মঙ্গলচণ্ডী আজও

Ei Samay Bardhaman Suppliment 12th JUne 2017

বাঙলামায়ের বারোমাসে তেরো পার্বণ । আর সেই তেরো পার্বণে হাজারো বারব্রত । পূর্ববঙ্গে এই রীতির কিছুটা ছাড় কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মায়েরা নাছোড় এই বারব্রত পালনে । ঋতুর হাওয়াবদলের সাথে সাথে বর্ধমানের ঘরে ঘরে এই বাঙালীয়ানাটুকুকে সম্বল করে এখানকার মহিলারা বেশ  হুল্লোড়ে থাকেন ঐ দিনগুলোতে ।  যারা অফিস করেন তাঁরাও শুনি উপোসটুকুনি ছাড়তে নারাজ । ভোরবেলা ব্রতকথার ব‌ইখানিতে পেন্নাম ঠুকে কথকতায় চোখ বুলিয়ে তারপর দশটা-পাঁচটায় সামিল হন । সেদিন শিকেয় তোলা মাছের ঝোলভাত-ডাল-চচ্চড়ি। দুপুরে ফলাহার রাতে ময়দার ভাজা সব সুস্বাদু । কারোকে আবার বলতে শুনেছি মায়েদের মুখ বদলানোর সব উপায় করে দেওয়া হয়ে আসছে অনন্তকাল ধরে । কিন্তু সত্যি কি তাই? আসলে প্রতিটি ব্রতকথার আড়ালে যে ছোট উপাখ্যানগুলি আছে সেগুলি প্রচলিত হলেও লোকশিক্ষার মোড়কে হাজির করা হয় আমাদের সামনে । আর বিশেষ দিনগুলি পালনের অর্থ হল সেগুলিকে বারবার নিজেদের সাংসারিক টানাপোড়েনে ঝালিয়ে নেওয়া ।

মনে মনে তাঁরা বলেন "বারব্রত নিষ্ফল হয়না, ধর্মকর্ম যাই কর ঈশ্বরে বিশ্বাস চাই"

 জ্যৈষ্ঠমাসের প্রতি মঙ্গলবারে  কুমারী ও এয়োস্ত্রীরা সংসারের মঙ্গলকামনায় স্মরণ করেন মা মঙ্গল চণ্ডীকে।  বর্ধমানের মায়েরা এইদিন কাঁঠালপাতায় দুব্বোঘাস, ধান, যব ও মুগকলাই রেখে খিলি বানিয়ে মা চন্ডীকে নিবেদন করেন ও পরে কলার মধ্যে সেই ধান-যব পুরে "গদ"  গিলে খান। আমলা বাটা আর হলুদ দিয়ে স্নান করানো হয় মা'কে এবং পাঁচটি ফল দান করতে হয়। 
মঙ্গলচণ্ডীর এই  ব্রতকথায় আছে, জয়দেব ও জয়াবতীর কথা। দেবীমাহাত্ম্য বিস্তারের জন্য স্বয়ং মা দুর্গাই বুড়ী ব্রাহ্মণীর বেশ ধরে মর্ত্যে চলেন। 

"মায়া করি ধরে মাতা জরাতীর বেশ, হাতে লাঠি কাঁধে ঝুলি উড়ি পড়ে কেশ'  

উজানী নগরে এক সওদাগরের বাড়িতে তিনি হাজির হন। প্রখর রোদে হঠাত গিয়ে ভিক্ষা চাইলেন। বেনেবৌ থালায় করে চাল আর টাকা দিয়ে সিধে দিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণীর  সাতটি মেয়ে, একটিও পুত্র নেই। বুড়ি সেই শুনে আর ভিক্ষে নিলেন না।  দিনে দুপুরে ভিক্ষা না নিয়ে চলে যাওয়ায় সংসারের অকল্যাণ হবে জেনে বেনেবৌ কান্নায় ফেটে পড়লেন।  এদিকে সওদাগর খোঁজ করে সেই বুড়ির কাছে গেলেন । বুড়ি তার হাতে একটি ফুল দিয়ে বললে, সেই ফুলটি যদি তার বৌ ধুয়ে জল খায় তবে সে সুপুত্রের জননী হবে। বুড়ো বয়সে বেনেবৌ আবার গর্ভবতী হল। ফুটফুটে ছেলে হল তার। তার নাম রাখা হল জয়দেব।  এবার সেই ব্রাহ্মণী হাজির হল আরেক সওদাগরের গৃহে। তার সাতটি পুত্র, কন্যা নেই। তাই ভিক্ষে নিলেন না তাঁর ঘরে। এবারে কারণ হল কন্যাসন্তানকে প্রাধান্য দেওয়া। ঠিক আগের মত‌ই এই গৃহেও ফুল ধোয়া জলপান করে গৃহিণীর কন্যাসন্তান হল। তার নাম রাখা হল জয়াবতী। পাশাপাশি দুটি গ্রামে জয়দেব আর জয়াবতী বড় হয় । 
তারা খেলে বেড়ায়, আপনমনে ছেলেখেলার ছলে মঙ্গলচন্ডীর পুজো করে। জয়দেবের বিশ্বাস নেই কিন্তু জয়াবাতীর অগাধ বিশ্বাস। এভাবেই একদিন জয়দেবের পায়রা এসে বসে জয়াবতীর কোলে। জয়াবতী দিতে নারাজ । জয়দেব প্রশ্ন করে, সে কি পুজো করছে? জয়াবতী বলে এই চন্ডীপুজো করলে

"হারালে পায়, মলে জিওয় খাঁড়ায় কাটেনা। আগুণে জলে ফেলে দিলে মরণ ঘটে না। সতীন মেরে ঘর পায়, রাজা মেরে রাজ্য পায়'

জয়দেবের তা শুনে ভাল লাগে। জয়াবতীকে সে বিয়ে করতে চায়, মা'কে জানায়। জৈষ্ঠ্যমাসের মঙ্গলবারে তাদের বিয়ে হয় । সেদিন জয়াবতী আঁচল থেকে গদ বের করে গিলে খায়। এবার জয়দেবের জয়াবতীকে পরখ করার পালা। অঢেল ধনরত্ন, গয়নাগাটি নিয়ে জয়াবতী জলপথে শ্বশুরঘরে যাত্রা করে। মাঝপথে জয়দেব জয়াবতীকে বলে ডাকাতের উপদ্রবের কথা। কাপড়ের পুঁটুলিতে সব গয়নাগাটি বেঁধে জয়দেব সেটিকে জলে ফেলে দেয়। জয়াবতী তা দেখে মা চন্ডীকে স্মরণ করে।  শ্বশুরবাড়ি গিয়ে পরদিন বৌভাতে অতিথি আপ্যায়নের জন্য নদীতে জাল ফেলে যে মাছ ধরে আনা হয় সেই মাছ কাটতে গিয়ে লোকজন হিমশিম। বঁটি, দা, কুড়ুল কিছু দিয়েই সেই বোয়ালমাছ টি কাটা যায় না।  তখন জয়াবতীর ডাক পড়ে। জয়াবতী মা মঙ্গলচন্ডীকে স্মরণ করে অতি অনায়াসেই বঁটিতে মাছের পেট কেটে ফেলে আর তার গয়নাশুদ্ধ পুঁটুলিটা পায়। তখন জয়দেবও বুঝতে পারে দেবী মাহাত্ম্য। তাই বুঝি মঙ্গলচন্ডীর পুজোয় এখনো মেয়েরা আওড়ায় এই মন্ত্র

আটকাটি, আটমুঠি সোনার মঙ্গলচন্ডী রূপোর পা, কেন মাগো মঙ্গলচন্ডী হল এত বেলা?
হাসতে খেলতে, তেলহলুদ মাখতে, আঘাটায় ঘাট করতে, আইবুড়োর বিয়ে দিতে,
অন্ধের চক্ষু দিতে, বোবার বোল ফোটাতে, ঘরের ঝি বৌ রাখতে ঢাকতে হল এত বেলা। 

এভাবেই ব্রত উদযাপনের মাধ্যমে সংসারের রমণীটি সংসারের সার্বিক সুখ শান্তি কামনা করে থাকে ।

আরেকটা কারণ হল গ্রীষ্মের দাবদাহে ফুটিফাটা বাংলার মাঠঘাট। মা চন্ডীর পুজোয় যদি সময় মত বর্ষা নামে তবে বাংলার কৃষিপ্রধান বর্ধমান জেলাটির শস্যভান্ডারটিও ফুলে ফেঁপে উঠবে সেই আশায় বুঝি মা চন্ডীর শরণাপন্ন হওয়া।  অন্যদিকে এই সময়টা রোগভোগের প্রকোপও নিদারুণ। তাই সংসারে যাতে সেই প্রাদুর্ভাব না হয় তার খেয়াল ও রাখেন গৃহকর্ত্রী। বাকীটুকুনি মায়ের কৃপা। আসলে ঘরে ঘরে এই শীতলা, ষষ্ঠী, চন্ডীর প্রতিমাসে পুজো তো আর কিছুই নয়। মা দুর্গা  বা কালীর শরণ নেওয়া।  
মহাযানী বৌদ্ধধর্মের অবলোকিতেশ্বর কোয়াননের মধ্যে একটি দেবীমূর্তির পূজা হয়। জাপানীভাষায় এই দেবীর নাম “চনষ্টী”। এই চনষ্টী শব্দটি সংস্কৃত শব্দ চন্ডীর অনুরূপ। সুকুমার সেনের মতে চন্ডী শব্দটি এসেছে চান্ডী থেকে। চান্ডী একজন অনার্যা দেবী, যিনি ওঁরাও, বীর, হোড়দের দ্বারা পূজিতা।আর তাই বুঝি বিরচিত চন্ডীমঙ্গলে আমরা ওরাঁও উপজাতিদের দ্বারা পূজিতা দেবীদুর্গার এই চান্ডী রূপটিই পাই।  কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর এই চন্ডীমঙ্গল সর্বজনবিদিত।তাঁর জন্ম বর্ধমানের দামুন্যা গ্রামে। চন্ডীমঙ্গলে আমরা যে উজানি গ্রামের কথা পাই সেখানে একটি চন্ডীমন্দির আজো আছে। এছাড়া অজয়নদীর তীরে কোগ্রামেও রয়েছে বর্ধমানের পল্লীপ্রেমী কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বিখ্যাত চন্ডীমন্দিরটি। 

  

শ্রাবণী পূর্ণিমা এবং লুন্ঠন ষষ্ঠী

Ei Samay Bardhaman Suppliment, 24th July 2017


বর্ধমান মিউনিসিপালিটির অনতিদূরেই বর্ধমানেশ্বর শিবমন্দির খুব প্রাচীন নয় । বাংলার ১৩৭৯ সালের শ্রাবণমাসেই এঁকে আবিষ্কার করা হয়। বিশাল পরিধির এই শিবলিঙ্গটি না কি চাঁদসওদাগরের আরাধ্য গৃহদেবতা। এনাকে "মোটা শিব" ও বলা হয়। আরেকটি হল নবাবহাটের তালিতের ১০৮ শিব মন্দির। এটি ন্যাশানাল হাইওয়ের ধারেই। বর্ধমানের মহারাজা তিলকচাঁদের বিধবা স্ত্রী বিষ্ণুকুমারী নাকি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এই ১০৮ শিবমন্দির তৈরী করেছিলেন।
১৭৮৮সালে এই মন্দির নির্মাণ কার্য শেষ হয়।

শ্রাবণমাসে মনসাপূজা, অরন্ধন ছাড়াও বর্ধমানেশ্বর আর তালিতের ১০৮ শিব মন্দিরে সারাটা শ্রাবণমাস ধরে চলে বিশেষ শিব পূজা।

শ্রাবণের মেঘজাল ভেদ করে শুক্লা একাদশীর চাঁদ বেরিয়ে আসবে। ধীরে ধীরে তার ষোলকলা পূর্ণ করবে। তারপর সেই পূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্না চুঁইয়ে পড়বে সমস্ত চরাচরে। শ্রাবণের ধারাজলে ধৌত সবুজ প্রকৃতি, বৃষ্টি স্নানে আপ্লুত পাখীকুল সেই শেষ বর্ষার পূর্ণিমার আলো দেখবে । ধানচারা রোপণের আনন্দে কৃষকের মনে পরম তৃপ্তি আর তৃষ্ণার্ত চাতক চাতকীর মন যেন কানায় কানায় পূর্ণ ।
বিশ্বনাথের জন্মমাস নাকি শ্রাবণ। শ্রাবণীপূর্ণিমাতে সেই জন্মমাস উদযাপিত হয় শিবলিঙ্গে জলধারা বর্ষণ করে । আসেপাশের নদী, নালা, সমুদ্র, কুন্ড যা আছে সবই তো বর্ষার জল পেয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা জলাধার। এবার শিবভক্তদের বাঁক কাঁধে নিয়ে খালি পায়ে সেই জলাধার থেকে মাটির ঘটি কিম্বা কলসী ভর্তি করে আবারো পায়ে হেঁটে শিবমন্দিরে গিয়ে শিবলিঙ্গকে সেই জলে সিক্ত করা....এ তো চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। সোমবার নাকি শিবের বার । তাই শ্রাবণের সপ্তাহান্ত গুলো জমজমাট থাকে শিবভক্তদের কোলাহলে। নতুন গৈরিকবাস, নতুন মাটির কলস, বাঁক আরো আনুষাঙ্গিক কতকিছু! আবালবৃদ্ধবণিতা সামিল হয় কাঁবর কাঁধে এই পথচলায়। কিসের এই পথচলা? কিসের এই আকুতি? মহাদেব নাকি ভক্তের বয়ে আনা এই জলেই তুষ্ট হন। কাঁধে বাঁক নিলেই কঠোর সংযম। বাঁক রাখলেই আবার শুদ্ধ হয়ে তবেই পুনর্যাত্রা। ভাল, মন্দ, সৎ অসৎ সকলেই পাপ স্খালনের আশায় এই ব্রত করে।

"ভোলেবাবা পার লাগাও, ত্রিশূলধারী শক্তি জাগাও, ব্যোম্‌, ব্যোম্‌ তারক ব্যোম্‌, ভোলে ব্যোম্‌, তারক ব্যোম্‌ …' এই সম্মিলিত বাণী ছড়িয়ে যায় তারা। তাদের পথচলায় অনুরণিত হয় এই শব্দগুলো বারেবারে আর সেই সাথে থাকে টুং টাং ঘন্টাধ্বনি।

পুরাণে বলে সমুদ্র মন্থন হয়েছিল এই শ্রাবণেই। মহাদেব সেই মন্থনের ফলে উঠে আসা গরল নিজকন্ঠে ধারণ করে নীলকন্ঠ হয়েছিলেন। তাঁর এই বিষের জ্বালা নিরাময়ের কারণেই শিবলিঙ্গে অনর্গল জল ঢালার রীতি।দল বেঁধে প্রতিটি পাড়া থেকে জনায় জনায় কত মানুষ এই শিবলিঙ্গে জলঢালা আর শ্রাবণী পূর্ণিমার মেলায় সামিল হবার আশায় জমায়েত হন বছরের এই সময়টায়। জলযাত্রীদের জন্য পসরা নিয়ে আশপাশের গ্রাম থেকে দোকানিরাও বসে পড়ে। প্লাস্টিকের ঘট, মাটির কলসি, ফুল বেলপাতা, গেরুয়া পোশাক, বাঁক, গামছা, তোয়ালে, বাঁক সাজানোর উপকরণ হিসেবে ঘণ্টা, কী থাকে না সেখানে? এভাবেই বুঝি বছরের পর বছর টিকে থাকে হিন্দুদের শিবমহিমা, তাদের ধর্মবিশ্বাস। শ্রাবণ যে মহাদেবের বড়ো প্রিয় মাস। ভক্তের ঢল নামাতে তিনিও খুশি হন যে!

বৈষ্ণবদের ঝুলনপূর্ণিমার মহামিলনে অথবা শিবমন্দিরগুলির প্রাঙ্গণে শৈবদের এই শ্রাবণী পূর্ণিমাটিও মহামিলনের বার্তা দেয় ।

এছাড়াও মায়েদের হাতের পাঁচ হল শ্রাবণমাসের শুক্লপক্ষের তিথিতে ধুমধাম করে হয় লোটনষষ্ঠীর পুজো। এর ব্রতকথাটিও চমৎকার।
লোটন মানে নোটন, মানে ঝুঁটিওলা পায়রা। একপাল নাতিপুতি নিয়ে কাদম্বিনীর ভরভরন্ত সুখি গৃহকোণ।পাড়ার প্রৌঢ়া বিমলিমাসিও নিমন্ত্রিত।তিনি আবার একটু আধটু ক্লেপট্যোম্যানিয়াক। সকলের অজান্তে টুকটাক জিনিসপত্র সরানোর অভ্যেস আছে তাঁর। গাঁয়ের অনেক লোকের ভীড়ে বিমলিপিসি প্রসাদ খেয়ে বাড়ি ফেরেন। সাথে হাতসাফাই করেন কাদম্বিনীর সোনার তিনটি খুদে লোটন। এই ষষ্ঠীর পুজোতে মাষষ্ঠীর পায়ের কাছে রাখা থাকে ছটি সোনার লোটন । কৌটোর মধ্যেই থাকে লোটনগুলি। সকলে যখন প্রসাদ বিতরণে ব্যস্ত বিমলিপিসি তখনই কাজটি সেরে নেন। ওনার এই স্বভাবটির কথা জানেন গাঁয়ের সকলে। পুজো শেষে জিনিষপত্র গুছিয়ে রাখতে গিয়ে কাদম্বিনী টের পেলেন তিনটি লোটন কৌটোর মধ্যে থেকে চুরি গেছে। তখুনি কাদম্বিনীর সন্দেহ হয়। বিমলিপিসির তলব করলেন তিনি কিন্তু বিমলিপিসি মানলেন না। অতঃপর কাদম্বিনী মাষষ্ঠীকে ডেকে কেঁদে কেটে একশা। মা ষষ্ঠী ভক্তের আকুল আহ্বানে বিচলিত হলেন ও বিমলিপিসির তিনটি ছেলেকে কঠিন রোগে ফেললেন। স্বপ্নাদেশ পেলেন বিমলিপিসি এবং শীঘ্র ঐ চুরি করা লোটন তিনটিকে ফেরত দিতে বললেন। এবার বিমলিপিসি কাদম্বিনীর বাড়িতে লোটন ফেরত দিতে গেল আর ষষ্ঠীর পুজোর নিয়ম জানতে চাইল। টাইমট্রাভেল করে আবারো ফিরে এল শ্রাবণের শুক্লাষষ্ঠী। বিমলিপিসি লোটনষষ্ঠীর পুজো করে তার ছেলেদের নীরোগ শরীর পেল। লোটন চুরি গেছিল বলে এই ষষ্ঠীর আরেক নাম লুন্ঠন ষষ্ঠী।

সারা বাংলার অগণিত মন্দির চত্বরে ষষ্ঠীতলা থাকবেই। আর সেখানে বট, অশ্বত্থ কিম্বা পাকুড় গাছের নীচে, মাটীর বেদীতে, অথবা নদীর ধারে পড়ে থাকবেই পরিত্যক্ত, বিসর্জিত মা ষষ্ঠী, শীতলা, মনসার মূর্তি। মানুষের অগাধ বিশ্বাস, পুজো করে জলে ফেলতেও মন চায়না। আজকাল আবার জলদূষণের জন্য নদীতে ফেলতেও মানা আছে। আর সেই পরিত্যক্ত মাটীর মূর্তিতেই ষষ্ঠী পুজোর সুতো বেঁধে ফলমূল নিবেদন করে আসে মায়েরা। সংসারের মঙ্গল কামনায়। সন্তানের কল্যাণে। অথবা কেবলমাত্র মনের শান্তিতেই মা ষষ্ঠীর আরাধনাতে মগ্ন থাকেন একটি দিন। উপোস করে পয়সা তুলে রাখেন তাকের ওপর। ব্রতকথার পুঁথিটিতে মাথা ঠেকিয়ে সেদিনের মত ফলাহার করেন। প্রত্যেক ষষ্ঠীই আসলে মা দুর্গার পুজো। মায়ের এক অঙ্গে বহু রূপ। মা কখনো চন্ডী, কখনো ষষ্ঠী, কখনো শীতলা। তবে ষষ্ঠীমাতা শুধুই সন্তানবতীদের দেখেন সেটাই বড়ো একচোখোমি।

শ্রাবণমাসে শুধুই কি শিবের পুজো হবে? তাই মা দুর্গা এগিয়ে আসেন নিজের পুজো নিতে। আর তাই বুঝি এইমাসে লুন্ঠন ষষ্ঠীর এত চল। আর সেখানেই পুরুষ আর প্রকৃতির জয়।

৩ জুলাই, ২০১৭

সর্বমঙ্গলা বিপদতারিণী মা দুর্গা


Ei Samay Burdwan Suppliment 3rd July 2017


বর্ধমানের মানুষজনের বিশ্বাস দেবী বিপত্তারিণী হলেন মা দুর্গার অনেকগুলি অবতারের মধ্যে একটি। আষাঢ়মাসে শনি-মঙ্গলবারে মহা ধুম করে এখানে মেয়েরা বিপদতারিণীর পুজো করেন। অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন রীতিতে এ নির্মিত মন্দির হল বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দির । ১৭০২ খ্রীষ্টাব্দে বর্ধমানের মহারাজ কীর্ত্তিচাঁদ হলেন এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠিতা  । 
এখানে দেবী কষ্টি পাথরে অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী মহিষমর্দ্দিনী। এই সেই মন্দির যেখানে দুর্গাপুজোর সন্ধিপুজোয় কামান দাগার ক্ষণটিতে সারা জেলা জুড়ে একযোগে অষ্টমী-নবমী সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম বর্ধমানের কবি রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্যেও উল্লেখ আছে এই সর্বমঙ্গলা দেবীর । 

স্থানীয় মানুষদের কিংবদন্তী  বলে বর্ধমানের উত্তরে সর্বমঙ্গলা পল্লীতে ছিল বাগদী সম্প্রদায়ের বাস। সেখানেই নাকি ছিল এই কষ্টিপাথরের বিগ্রহটি। তারা না জেনে বুঝে এই পাথরটির ওপরে তাদের খাবার জন্য গেঁড়ি, গুগলি, শামুক, ঝিনুক রেখে ভাঙত প্রতিদিন। আর চুনোলী মানে যারা চুন তৈরী করে তারা এসে খোলাগুলি পরিষ্কার করে নিয়ে যেত। একদিন তারা খোলার সাথে সেই পাথরটিও নিয়ে যায় আর চুনভাটির মধ্যে পাথরটিকেও পুড়তে দেয়। কিন্তু পাথরটি পোড়ে না। পরে তারা দামোদর নদে পাথরটি ফেলে আসে। দামোদর নদের  বিছানায় পাথরটি পড়ে থাকতে দেখে এক ব্রাহ্মণ সেটিকে ধুয়ে মুছে এনে সেটির গায়ে দেবীমূর্তির সকল চিহ্ন দেখতে পান ও তক্ষুনি তাকে গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠা করেন ।  
প্রতিবছর এখানকার মেয়েরা নিজেদের বিশ্বাসে হাজির হয় এই জাগ্রত মন্দিরে। কেউ কেউ নদীতে স্নান করে দন্ডী কাটে বিপদ কেটে যাবার আশায়।  ভাবলে অবাক হতে হয়, এই বাংলায় দেবী দুর্গা তবে শুধুই আশ্বিন মাসে পূজিতা হন না । প্রতিমাসেই তাঁর আরাধনা নিয়ে থাকে বাঙালী, সংসারের মঙ্গলকামার্থে, বিপদের হাত থেকে বাঁচবে বলে।
বিপত্তারিণী পুজোর ব্রতকথাটি ঘাঁটলে দেখতে পাই তেমনি এক গল্প যেখানে ধর্মশীল বৈদর্ভ রাজ্যের রাজার রাণী সুরূপা অগাধ বিশ্বাসে মা বিপদতারিণীর ব্রত করেছিলেন । রাজা অনেক দান-ধ্যান,  যাগ-যজ্ঞ করতেন এবং প্রজাপালক রূপে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন । তাঁর রাণী  সুরূপাও ছিলেন ধর্মপরায়ণা। তিনি জাতপাঁতের বিচার না করে সমাজের আপামর স্ত্রীলোকের সাথে সমানভাবে  মিশতেন । এক নিম্ন শ্রেণীর চামার বৌয়ের সাথে তিনি স‌ই পাতিয়েছিলেন । ফলে রাজবাড়িতে এই চামার বৌটির খুব যাতায়াত ছিল । রাণী সুরূপা ভালোভালো খাদ্যদ্রব্য তাকে দিতেন এবং তার বিনিময়ে সেই চামার বৌ রাণীকে নানাবিধ ফলমূল এনে দিত । এইভাবে বেশ চলছিল উভয়ের বন্ধুতা ।

একদিন সুরূপার সাধ হ'ল গোমাংস কেমন হয় তা চাক্ষুষ দেখতে । চামার বৌ তাকে বারবার নিষেধ করল কিন্তু রাণী তাঁর জেদ ধরে বসে র‌ইলেন। অতঃপর চামার বৌ পরদিন একটি থালায় করে চাপা দিয়ে কিছুটা গোমাংস নিয়ে যেমনি রাজবাড়িতে প্রবেশ করবেন তখুনি দ্বারীর তা নজর পড়ল । রাজাকে গিয়ে তত্ক্ষণাত সে নালিশ করলে । প্রহরীকে বেঁধে রেখে রাজা স্বয়ং রাজ অন্দরমহলে গেলেন সত্যতা  যাচাই করতে। রাণী সেই সময় তাঁর স‌ই কে আদেশ দিচ্ছিলেন, সেই গোমাংস পূর্ণ থালাটি  খাটের নীচে লুকিয়ে রাখার জন্য ।
রাজা এসে রাণীকে জিজ্ঞাসা করলেন "তোমার স‌ই তোমার জন্য কি উপহার এনেছে আমাকে দেখাও"
রাণী তো রাজাকে দেখে ভয়ে চোখে অন্ধকার দেখলেন এবং বিপদগ্রস্ত হয়ে মা বিপদতারিণীকে স্মরণ করলেন । কারণ বাড়ীতে গোমাংস ঢুকেছে  জানলে রাজা  রাণীর গর্দান নেবেন।
মাদুর্গার আসন রাণী সুরূপার আর্তিতে টলে উঠল । তিনি রাণীকে যেন কানেকানে বললেন ঐ চাপা দেওয়া থালাটির মধ্যে তার স‌ইয়ের দেওয়া চৌদ্দটি ফল  রাজাকে দেখিয়ে দিতে এবং স্নান সেরে রাজাকে সেই ফলগুলি ব্রাহ্মণকে দান করতে ।  রাণী সুরূপা তো অবাক! থালার চাপা সরিয়ে রাজাকে দেখালেন সেই চৌদ্দটি ফল । মাদুর্গার কৃপায় গোমাংসের চৌদ্দটি ফলে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনা দেখে রাজা এবং  রাণী সুরূপা নিজে তো বিস্ময়ে হতবাক । মাদুর্গা রাণীকে আরো বললেন যে তিনি স্বয়ং বিপদতারিণী মা । যে তাঁকে স্মরণ করবে তার কোনো বিপদ আপদ হবেনা ।
রাণীকে যাবজ্জীবন এই ব্রত পালন করতে বলে তিনি অন্তর্হিত হলেন। রাণী এভাবে বিপদ থেকে মুক্তি পেলেন।
রাজা স্নান সেরে এসে সেই ফলগুলি ব্রাহ্মণসেবায় দিলেন । মা বিপদতারিণীর অলৌকিক ক্ষমতায় সেদিন সুরূপা প্রাণে বেঁচে গেছিলেন।   
সেই থেকে বর্ধমান তথা সারা বাংলার এয়োতিরা এই বিপদতারিণী পুজোয় সামিল হয়ে নিষ্ঠাভরে দেবী দুর্গার পুজো করেন।  শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া থেকে দশমী অবধি যে যে শনি ও মঙ্গলবার পড়ে সেগুলিতে এই ব্রত পালনের নিয়ম। একটি চুপড়িতে তেরো রকমের ফল (দুটি খণ্ড করা), তেরো গাছা লাল সুতো, তেরো রকমের ফুল, তেরোটি মিষ্টি, পান, সুপারী হল এই পুজোর উপাচার। পুজো শেষে ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা দিয়ে তেরোটি গাঁট দেওয়া লাল সুতো বা তাগা  মেয়েদের বাঁহাতে আর ছেলেদের ডান হাতে বেঁধে দেবার  নিয়ম।
আর পুজো শেষে যেনতেনপ্রকারেণ তেরোটি নুন না দেওয়া লুচি খেতেই হবে উপোসী ব্রতীকে। তাই দেখেছি এই পুজোর দিনে ছোট্ট ছোট্ট লুচি বানাতে, পেট ভরে গেলেও যাতে শেষ করা যায় তেরোটি।  আর সারাদিনে পুজো করে ঐ একবারই খেতে পারবে সে। কোনও তরকারী খাওয়া চলবে না ঐদিন।
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। এভাবেই মা বিপত্তারিণী একাধারে সংকট হারিণী আবার বাংলায় অবশ্য কর্তব্য আষাঢ় মাসের দুর্গা পুজোও বটে।

১৪ ফেব, ২০১৭

ভ্যালেন্টাইনস ডে

ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিল না আমাদের সময়ে । কিন্তু তখনো প্রেমে পড়ত ছেলেমেয়েরা । আর বসন্ত এলেই প্রেমের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিত তারা । যেমন এখনো দেয় সকলে।  পালন করত নিত্য নতুন ভ্যালেন্টাইনস ডে । কখনো হোলি, কখনো সরস্বতী পুজো কে উপলক্ষ করে। 
আর প্রণয়ের পারাবারে সাঁতার কাটতে কাটতে বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীরা ? দৈনন্দীন জীবনের একঘেয়েমিতে কেমন পাগল পাগল ভাব নিয়ে  তারাও মাঝে মাঝে পালন করত ভ্যালেন্টাইন্স ডে । স্বামী তার বিশেষ দিনটিতে স্ত্রীয়ের জন্য ছোট খাট সোনার গয়না কিনে উপহার দিতেন । অথবা আচমকা নিয়ে আসতেন বম্বেডাইং এর ফুলকাটা সুন্দর ডাবল বেডশিট। কোনও বার গিন্নীর জন্যে একটা ফুরফুরে পাতলা ডি সি এম এর ভয়েল কিম্বা  ফুলিয়ার টাঙ্গাইল।  অফিস থেকে ফেরার পথে, জলযোগের মাংসের প্যাটিস কিম্বা ফারপোর ফ্রেশলি বেকড কেক নিয়ে বাড়ি ফিরে বলতেন... 
"কি গো চা বসাও ? দেখ আজ কি এনেছি, তোমার জন্যে" 
কিম্বা পকেট থেকে বের করতেন বিশ্বরূপা, রঙমহল এর নাটকের সস্তার টিকিট দুটি। 
সদ্য শীতের আলস্য কাটিয়ে তাঁর গৃহিণীটি ঘরের মধ্যে থেকে গা ধুয়ে কিউটিকিউরার ফুলেল গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে নরম ছাপা শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে সলজ্জে যেন হাতে চাঁদ পেতেন। কত অল্পে খুশী ছিলেন এঁরা। এগুলি যেন সংসার করার পার্কস বা উপরি পাওনা, বোনাসের মত। এ সব দেখেছি আমাদের বাবা মায়েদের আমলে ।
মনে আছে এমনি মধুর নাতিশীতোষ্ণ সময়ে একবার কলকাতার বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের সারারাত ব্যাপী জলসার টিকিট এনেছিলেন বাবা। হেমন্ত-আরতির গান দুজনেরি খুব পছন্দ। আর তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় খ্যাতির শীর্ষে আর আরতি মুখোপাধ্যায় নবাগতা। এই সারপ্রাইজে মায়ের মুখের হাসিটুকু বাঁধিয়ে রাখা হয়নি কারণ আমি তখন মাত্র ক্লাস ফোর এ।   
স্কুল জীবনের সরস্বতী পুজোর স্মৃতিটা বেশ অন্য ধরণের । যত বড় ক্লাস তত দায়িত্ত্ব । আর ক্লাস টেনের পুজোটা সবচেয়ে সুখের । সেখানে ছোটোদের ওপর দিদিগিরি আর যারপরনেই ফতোয়া জারি করা । সরস্বতী পুজোটা যেন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পাসপোর্ট হাতে পাওয়া । মায়ের হলদে শাড়ি পরে সেজে গুজে একদম ফিল্মি লুক নিয়ে স্কুলের পুজোয় সামিল হওয়া । কিন্তু আমি যে কলেজে পড়েছি সেই কলেজে মা সরস্বতী কলেজ-কন্যাদের রক্ষণশীলতার বেড়াজালেই শুধু আবদ্ধ রেখেছিলেন । মা সরস্বতীর পুজো সে কলেজে ব্রাত্য । অগত্যা বাড়িতে নিজেদের মত করে পুজো করে যে যার গ্রুপ তৈরী করে বেরোনো । ঠাকুর দেখা, খাওয়াদাওয়া, সিনেমা দেখা ব্যাস্‌ ! ঐ অবধি । ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিলনা শেষ আশির দশকে । অতএব নো প্রেম-প্রেম খেলা বা ভ্যালেন্টাইন উত্সব । সরস্বতী পুজোই আমাদের বসন্তের একমাত্র বহু প্রতীক্ষিত বসন্ত উত্সব ছিল । ফাগুণ হাওয়ায়, রঙে রঙে বেশ ছিলাম আমরা । ডিজিটাল গোলাপ ছিলনা, মুঠোফোনের রিংটোনে সংক্ষিপ্ত সংবাদ আসতনা হয়ত কিন্তু ভালোবাসা ছিল সরস্বতীর প্রতি ।



আমাদের বিয়ের ঠিক আশপাশের সময় থেকে শুরু হ'ল ভ্যালেন্টাইন্স ডে । লেট আশির দশকে । ব্যাস! সেই থেকে শুরু "ভ্যালেন্টাইন প্যাকেজ"  ফুলের দোকান থেকে শুরু করে গ্রিটিংস কার্ড , গয়না থেকে কেক, মকটেল, কফি, আইস ক্রিম সর্বত্র সেই তীর বিদ্ধ হৃদয়ের ছবি !  শপিং মলে ঝুলছে বিশাল বিশাল রক্তাক্ত হৃদয়, টিভির পরদায় প্রেমের গান, প্রেমের ছবি, প্রেমের কবিতা আবৃত্তি । আর এসেমেসের চোটে আগের দিন মধ্য রাত থেকে সেলফোনের নেট ওয়ার্ক হ'ল বেজায় স্লো হওয়া... এসব ও দেখেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেলফোন হাতে নিয়ে মুচকি হেসে কথা বলা? এসব ও দেখেছি বহুত। আর ল্যাপটপে চ্যাটালাপ? আর ম-বাবার ঝটিতি আগমন এ কন্ট্রোল টি মেরে অন্য ট্যাব খুলে গা ঢাকা দেওয়া? তাও দেখেছি। 
সামনেই সব ছেলেপুলেদের বড় বড় পরীক্ষা ! তো কি ? পরীক্ষার আগে একটু ডাইভারশান চাই না ? তাই তো সাধু ভ্যালেন্টাইন এই উপায় বাতলেছেন ।
গতবছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে'র দিন সকালে মর্নিং ওয়াকে গেছি; এক ভদ্রলোক তার সহধর্মিনীকে বলছেন " এই রোজ রোজ তোমার পাল্লায় পড়ে সকালে হাঁটতে বেরোনো আমার জীবন বিষময় করে তুলছে" 
নীরব স্ত্রীটি হাঁটতে লাগলেন আরো জোরে জোরে । 
ভদ্রলোক বললেন " খাবার ওপর ট্যাক্স ও বসালে , আর হাঁটাও ধরালে ...তাহলে যেকোনো একটাই করো হয় খেতে দিও না, নয় হাঁটতে  বোলোনা"আমার মা বেঁচে থাকলে দেখিয়ে দিত তোমার মজা  সব কিছুতেই  কাঁটছাঁট ! চায়ে চিনি বন্ধ , সকালে একগাদা ফল খাও , দুপুরে ভাত নৈব নৈব চ ! রাতে মোটে একটা রুটি ! কি কুক্ষণে একটা সেমি-ডায়েটিশিয়ান বৌ এনেছিলাম" 
বেচারী বৌটি তখনো চুপ !  
স্বামীটি আবারো বললে " দাঁড়াও দেখাব মজা , অফিসের বেয়ারাকে দিয়ে ভাল ভাল খাবার আনিয়ে খাব, তুমি জানতেও পারবে না" 
তখন বৌটি আর থাকতে না পেরে মুখ খুলল "আজকের দিনে ঝগড়া করতে  নেই গো , আজ প্রেমের দিন, আজ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে আর তুমি কি না শুধুমুদু আমাকে সক্কালবেলা গালাগালি দিচ্ছ ? আমি যে তোমার ওয়ান এন্ড ওনলি ভ্যালেন্টাইন !" 
একটা সময় ছিল যখন বসন্তের প্রথমদিনে লালগোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কোর্টশিপ চালু  হত । দোল  রঙীন হত  নীল খামে পারফিউম মাখানো চিঠির ভাঁজে লিপষ্টিকের চুমু দিয়ে ।  লুকিয়ে চুরিয়ে পার্কে গিয়ে দেখা করে কিম্বা কলেজ পালিয়ে কফিহাউসের টেবিলে মুখোমুখি হয়ে, হেদুয়া থেকে শ্যামবাজার গা ঘেঁষে ঘেঁষে হেঁটে  বাসে ওঠা ; আবার মনখারাপের পার্টির তোড়জোড় । আবার কবে হবে দেখা ? বাড়ির বড়দের চোখ এড়িয়ে চুপিচুপি লেটারবাক্স হাতড়ে চিঠি খোঁজা । টানটান উত্তেজনায় চিলেকোঠার দুপুরগুলোয় সেই কফিহাউসের স্মৃতির লালন চলত আবার যতদিন না দেখা হয় দুটিতে ।

ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সাথে । ভালোবাসার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । কত চোখ এড়িয়ে প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত ।    এখন   ভালোবাসার বাতাস বয় অর্কুট অলিন্দে। ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা  ভালোবাসা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই প্রেম ।


 প্রেম ছিল তাই রক্ষে! প্রোপোজ ডে, কিসিং ডে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, হাগ ডে,  দোল   ... এই সব দিনগুলোতো  ঐ প্রেমকেই ঝালিয়ে নেবার জন্যেই। প্রেম না থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হত? সারারাত ধরে অনলাইন চ্যাট করে রাতে আধোঘুমে স্বপ্নসুন্দরীকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কোথা দিয়ে একটা সুন্দর সকাল এসে পড়ল ! আর এই মোবাইলফোন ? সেও তো প্রেমের একটা দারুন পজিটিভ ক্যাটালিস্ট । কত সহজে একটা কথা মেসেজ করে জানিয়ে শুরু হয়ে যায় প্রেম । আর ঐ বিশেষ দিন গুলোতে  মনের মানুষটির হাতের মুঠোয়   ভালোবাসার দুটো কথা টুক করে চলে যায় । আঙুলে আঙুলে এমন চটপট প্রেম কিন্তু আগে ছিল না । এখন অনেক সহজ হয়েছে দুনিয়া ।বাজারে   গ্রিটিংস কার্ডের হার্ডকপি  ফুরোল, ভালোবাসার নটেগাছ লকলক করে ডালপালা বিস্তার করে দিল ওয়েব দুনিয়ায় ।


ভালোবাসার উপহারের তালিকায় কাফলিঙ্ক, টাইপিন  এখন অবসোলিট ; আইপড কিম্বা পেনড্রাইভের কাটতি বেশী ।   ভালোবাসার কবিতার খাতা লুকিয়ে থাকত বালিশের নীচে । আর এখন সেই কবিতা ঝরে ঝরে পড়ছে ফেসবুকের বারান্দায়, কার্ণিশে সর্বত্র । তবে ভালোবাসা আছে ভালোবাসাতেই । ভালোবাসা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে । শুধু আগে  শাড়িতে ব্লাউজে ছিল এখন কুর্তি, কেপরি লেহেঙ্গা আর জিনসে ।
তখন ছিল তরতাজা সত্যি গোলাপ । আর এখন তা ডিজিটাল গোলাপ । ছিল বসন্ত কেবিনে দুজনে মুখোমুখি দুটো ডিমের ডেভিল কিম্বা ফাউল কাটলেট । এখনো সেই সংজ্ঞা বদলায়নি কিন্তু চপ-কাটলেট থেকে প্রেম এখন বার্গার-মকটেলে আছড়ে পড়েছে অবিরত । 


ভালোবাসার চুপকথারা তখনো ছিল এখনো আছে শুধু বদলেছে তার মোড়ক । এখন চুপকে চুপকে নয়, ওপেন সিকরেট ।   তখন এই কূলে আমি আর ঐ কূলে তুমি টাইপের একটা ব্যাপার ছিল আর এখন অর্কুটে আমি আর ফেসবুকে তুমি মাঝখানে একরাশ ডেজিটাল ঢেউ । কিন্তু এখন ভালোবাসা আরো স্মার্ট হয়েছে ।  গুরুজনের সামনে ধরা পড়ে গেলে  কন্ট্রোল টি মেরে পালাও । তখন কিন্তু কাপড়ে চোপড়ে টাইপের অবস্থা ছিল । ভালোবাসার আয়ু বেড়ে গেল ভ্যালেন্টাইন পুজোর দৌলতে, আন্তর্জালের কৃপায় । মাঝখান থেকে বসন্তের কোকিল এই টেক দুনিয়া ছেড়ে পালিয়ে গেল । মোবাইল  রিংটোনের  দাপটে তার নিজেরই আজ ভাল্লাগেনা কুহুতান  ধরতে ।

আর ভালোবাসার উষ্ণতার পারদও চড়ছে বসন্ত সমাগমে । কারণটা কি গ্লোবাল ওয়ার্মিং ???    

বসন্ত এসে গেছে

তুচক্রের নির্ঘন্ট মেনে বসন্ত এসে গেছে। শীত পড়বে কি পড়বে না এই শুনতে শুনতে সুপর্ণারাও হাঁফিয়ে উঠেছে  আর সেই ফাঁকে সব শত্রুমুখে ছাই দিয়ে  মাঘের মধ্যিখনেই বিদায়ী শীতের পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়ে ফিরে যাবার তোড়জোড়। আর আমাদেরো লেপ-বালাপোষ-লাইসেম্পি আর যাবতীয় শখের শীত পোষাকদের ন্যাপথলিন বলের আড়ালে মুখ লুকোনো।
শান্তিনিকতনি ঘরাণায় কলকাতার বাঙালীর মাঘোত্সব যেন ব‌ইমেলা। আর সেই ব‌ইমেলার ফুরিয়ে যাওয়া মানেই শীতের যাই যাই ভাব। তখন স্মরণে, মননে বসন্ত জাগ্রত তার ঘরে। যেন এইটুকুনির পথ চেয়ে সারাটা বছর বসে থাকা। আর যদি শীত বাই বাই করে নাকের ডগা দিয়ে চলেই যায়, তাকে অলবিদা জানিয়ে বসন্তকে ওয়েলকাম করাটাই আমাদের একমাত্র লুকিং ফরওয়ার্ড, গোল অফ লাইফ। বসন্ত এসে গেছে।
যাই দেখি কোকিলার প্রসব বেদনা উঠল কি না! কোকিলগুলো ঠিক বুঝতে পারে। ওদের বাসা বানানোর চাপ নেই। স্বার্থপরের মত কাকের বাসায় ডিমটা পেড়েই খালাস। করণটা বসন্ত। এখন আর সময় নেই বাসা বাঁধবার। অলস কোকিল এর  পত্নী আসন্নপ্রসবা।  এখন সময় নষ্ট না করে প্রাণ উজাড় করে তাকে ভালোবাসা দাও। ট্যাঁপোর টোপর কোকিল বৌ টির থৈ থৈ রূপ তায় আবার সে বিয়োবে। অতএব এক্সট্রা কেয়ার নাও।  বাসা বাঁধতে গিয়ে যদি বৌটা হাতছাড়া হয়ে যায়! অগত্যা বরিষ্ঠ পক্ষী বাসিন্দা কাকেশ্বরই ভরসা।
এ বসন্তের প্রতিটি মূহুর্ত  বাঁচো নতুন করে। প্রেমে প্রেমে, নূতন রতনে স্বাগত জানাও। বাদাম গাছের পাতাগুলো ঝরে গিয়ে কেমন বৈধব্য পর্ব চলছিল। হঠাত তাকিয়ে দেখি তার পাতার অগ্রভাগ থেকে মুকুলোদ্গম হয়েছে। কচি পাতা সবে গজাতে শুরু করেছে। কমল মুকুলদল খুলিল বুঝি!  আগুণ রং তার। পাতাশূন্য, রিক্ত গাছ সেই আগুণ রঙে সিক্ত।  সেই গাছের শুকনো ডালে বসে কোকিল তার সন্তানসম্ভবা প্রণয়ীকে খোঁজে আর শিস্‌ দেয়। বসন্তের হিম জোছনায় ভোররাত থেকে কোকিলটা প্রহর গোনে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তার সঙ্গীটিকে কাছে পাবার আশায় ডাকতেই থাকে সে। পুরুষ হয়ে স্ত্রী টির ওপর গুরু দায়িত্ব পালন করেছে সে। সর্বশক্তি দিয়ে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে বলেছে, আমি তোমায় বড় ভালবাসি। কিন্তু তারপর? আরো বড় কাজটি করেছে। তাকে ইমপ্রেগনেট করেছে। অথচ তারপর সে কোথায় বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার পাতবে তা নিয়ে একটুও মাথাব্যাথা নেই তার। একেই বলে উদাসী বসন্ত। কবির কথায় সেই উদাসী বসন্তের হাওয়াতেই পথে পথে মুকুল ঝরে।   
-এই কোকিল ডাকিস কেন রে ? তোর জীবনে এত্ত বোলবোলা কিসের? 
দেখছিস্‌ না? বাইরে পৃথিবীটা কত অশান্ত? তবুও এত্ত স্বার্থপরের মত ফূর্তি তোদের? ভোর থেকেই ডেকেই চলেছিস তোরা। আহাম্মক! 
কোকিল সাড়া দিয়ে আবার বলে, কুহু। কু-কু...উউউউ ।
-আ মলো যা! আবার ডাকে! এই ডাক ঝালাপালা করে দেবে চৈত্রের শেষদিন পর্যন্ত। বাইরের বিশ্বে কি হচ্ছে তার কোনো হেলদোল নেই, ডেকেই চলেছে। তোর কর্কশ স্বর বৌটাকে ভাল লাগিয়েই ছাড়বি?  আমাদের জীবন থেকে বসন্ত বিদায় নিয়েছে রে মুখপোড়া। তবুও বসন্ত এসেছে বুঝতে পারি তোর জন্যে। এই কোকিল, রাগ করলি?
কোকিল বলে পি----উ..উ ।
-এবার অন্য সুর? তার মানে বুঝেছিস আমার কথা? ধরে নিলাম আগেরটা ছিল বসন্তরাগ। এবার ধরলি বেহাগ...কি তাই তো?
কোকিল বলে কু-উ-উ-উ।
-কি মিষ্টি ডাকছিস রে! নে, তোরা বরং প্রেম কর। আমি একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে আসি। বসন্ত আর কোকিল বিলাস করতে করতে যদি ঠান্ডা লেগে যায়! নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু ডেঞ্জারাস বুঝলি কোকিলা? তোদের নেই কো উত্তরপুব তাই তোদের মনে সদাই সুখ। 
শীতের অন্তিম নিঃশ্বাসটুকুনি থাকতে থাকতেই ভুঁইচাঁপা গাছগুলো কেমন শ্রীহীন। কেন বলতো? ওরাও ফুল ফোটাবে এইবারে। পাতাগুলো কেমন মন মরা তাই। সারাটা বছর যেমন তেমন পড়ে থাকে এই সময়টার অপেক্ষায়। তার পরেই বসন্তের দখিণা হাওয়া গায়ে মেখে মাটির মধ্যে থেকে ওদের স্টকগুলো বিকশিত হয়ে সদর্পে ঘোষণা করে তাদের অস্তিত্ব। আম্মো পারি ওদের মত। মানে বাগানের আর পাঁচটা ফুলগাছের মত। 
শীতের অবসান মানেই বাঙালীর ঘরে নিম বেগুণের গন্ধ। কাঁচা আম দিয়ে টকের ডাল আর সজনে ডাঁটা দিয়ে চচ্চড়ি, টোপাকুলের অম্বল । এসব নাকি খেতেই হয় এসময় । "রুড ফুড অফ বেঙ্গল"... নাম করা ফুড জার্নালিষ্ট ভীর সাঙ্ঘভির দেওয়া অনবদ্য নাম। সিম্পলি অসাম এই সময়। শীতের পার্টির অবসান। তেল-ঝাল-গরগরে রান্নাবাটির বিরাম। বসন্তে চাই হালকাপুলকা মানে সহজপাচ্য। কারণ পেট ঠান্ডা রাখো নয়ত রোগের প্রকোপে পড়বে বাপু! জন্মেছ ট্রপিকাল দেশে, মরিবে কি অবশেষে?  তাই বুঝি এদেশের আমগাছে বউল এসেই গেছে আর চিরুনির মত সারে সারে সজনে ডাঁটা ঝুলছে তো ঝুলাছেই। বাতাসে সজনে ফুলের ঘ্রাণ। নিমগাছে কচি কচি সবুজ নিমপাতা ধরেছে মনের সুখে। আবার কোকিলটা সেই নিমগাছটাতেই বসে দোলা খাচ্ছে। কারণ বসন্ত এসে গেছে। 
-ও কোকিলা, তোরে শুধাই রে? আবার সেই এক কথা। কেন রে তোর কোকিলটা বাসা বাঁধে না?
এই বসন্তটাকে  আষ্টেপৃষ্টে সে গায়ে মেখে নিচ্ছে আর তুই কেবলি তাকে সিডিউস করছিস যাতে সে অন্য কারো দিকে না চলে যায়। আচ্ছা কোকিলা তুই সত্যি সত্যি ওকে খুব ভালোবাসিস না রে? কিন্তু তোর ডিম পাড়া হয়ে গেলে  ঐ কোকিলটা আর তোর হয়ে থাকবে সারা জীবন? না কি আসছে বছর বসন্তে সে অন্য এক কোকিলার জন্য ডেকেই চলবে? আর ভুলে যাবে তোকে।
যাক আর ভ্যানতাড়া না করে সকলে বসন্তের পায়ে পড়ে থাকো দিন কয়েক। সে আসতে না আসতেই বন্ধু দিবস,  গোলাপ দিন, প্রোপোজ দিন, চকোলেট দিন, জড়িয়ে ধরার দিন, চুমুর দিন...করতে করতেই ভালবাসাবাসির দিন। এবার সে যেতে না যেতেই দে দোল, দে  দোল... দোলের দিন । রাধাকৃষ্ণের ফষ্টিনষ্টির দোহাই দিয়ে আমজনতার মাতামাতি ইত্যাদি। ওদিকে বসন্ত সমাগমে সারস্বত সমাজ হাইপার।  সোশ্যাল নেটে সাহিত্যের ঝলক। আর কেন‌ই বা লিখবেনা তারা?  মধুর বসন্ত এলে তারা " কুহক লেখনী ছুটায়ে কুসুম তুলিছে ফুটায়ে, লিখিছে প্রণয়-কাহিনী বিবিধ বরন-ছটাতে..." রবিঠাকুরের কথা। 
কি মহিমা এ বসন্তের! তবুও শান্ত হয়না পৃথিবী, সেটাই বড় কষ্টের।
একটু বিষাদ, একটু বিরহ, একটু প্রেম, একটু ভালোলাগা সব মিলিয়ে আমাদের বেশ একটা ফিল গুড ফ্যাক্টর কাজ করে এই সময়। ভোগ্য পণ্য সবেতেই অফ সিজন ডিসকাউন্ট। কেন রে ভাই? বসন্ত তোদের কাছে একটা অফ  সিজন? ব্যবসায়িক কেমিষ্ট্রি অবিশ্যি আমরা বুঝব না। আসলে  লোকটানার কৌশল। ছুতোয় নাতায় স্প্রিং ফেস্টের আকর্ষণ। ছলে বলে কৌশলে কখনো গোলাপ ফুল, কখনো চকোলেট, কখনো বা টেডি বেয়ার আর ভ্যালেন্টাইন গিফ্ট তো হাতের পাঁচ।  বসন্তে মানুষের সম্পর্ক ঝালিয়ে নেবার পালা। সেই আবার নতুন করে পাব বলে।
কখনো হেঁটে পেরুব শিমূল বিছানো গালচের পথ, কখনো মহুয়া সরণী, কখনো পলাশ কুড়িয়ে নেব দুহাত ভরে । সেই রং চোখ থেকে মুছতে না মুছতেই আবার এসে পড়বে আমাদের বসন্তের রংয়ের উত্সব।
 ছোটবেলায় বসন্তের খোলা জানলায় দাঁড়ালে বড়রা বলতেন বসন্ত কিন্তু ভয়ানক। যতটা দেয় ততটাই নেয় উশুল করে।  সত্যি তো, ঘরে ঘরে অসুখ এই সময়ে। আর ঋতু পরিবর্তনে এই মারণ ব্যাধির থেকে মুক্তিলাভের আশায় আবার নতজানু আমরা নারীশক্তির কাছে। বাসন্তীপুজোর আয়োজন। কারণ যমদংষ্ট্রা বসন্ত ঋতুর রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে অতি প্রাচীনকাল থেকেই আমরা পরিচিত।  ঋতুর নামে রোগ‌ও রয়েছে বটে। কি আর করি? ফাগুণ হাওয়ায় সব দান করেছি যে আজ। তাই তো আমার আপনহারা, বাঁধনহারা প্রাণ।
কলকাতা ২৪x ৭ 

১১ ফেব, ২০১৭

কন্যাশ্রী সরস্বতী

 রস্বতীপুজোর  ভোর হতে না হতেই একছুট্টে কলঘরে।  তারপরেই হুড়োতাড়া করে  ফ্রকের ওপরে  কষে  মাড় দেওয়া ফুল ফুল নতুন বৃন্দাবনী ছাপাশাড়ী চাপিয়ে  কাবুলিওয়ালার মিনি সেজে, জড়ভরত মার্কা হয়ে ইস্কুলের সরস্বতী পুজো ।  শাড়ির কুঁচি, বোঁদের সঙ্গে লুচির কুচি, খিচুড়ির সাথে গরম বেগুনী আর শাড়ির  কড়কড়ে আঁচল নিয়ে আমি থরথর যেন। ল্যাজেগোবরে অবস্থা কুমারীর ।  তখন আমি দশ কি নয় । নো চাপ তখন! বড় হয়নিতো মেয়ে তাই কিছুটা নিশ্চিন্ত মা, বাবা।

এরপর বোধবুদ্ধি বিকশিত হবার আগেভাগেই  মিষ্টি টিনের আমি। একটা ফক্কড় ছোঁড়া স্কুল যাবার পথে রোজ সাইকেল চড়ে চারপাশে ঘুরপাক খেত। যদিও ধর্ষণের ধারাপাত অধরা তখন। কারণ এত মিডিয়ার প্রবচন নেই আকাশে, বাতাসে। বাড়িতে এসে জানালাম মা'কে। মা বাবাকে পাঠালো । চুপিচুপি বাবা আমাকে ফলো করল আর সেই ছোঁড়াকে ভয়টয় দেখিয়ে সেযাত্রায় তার নতুন সাইকেল চড়া মাথায় ওঠালো। তাই টিনে পা দিতেই  মায়ের চোখ ঘুরছে সর্বত্র। পারলে শ্যাম্পু করা উড়ো উড়ো মাথায় একখাবলা তেল ঢেলে দিল বলে! পাছে আমাকে ছেলেরা ঝাড়ি করে । পরেছিও জম্পেশ একখানা ডিসিএমের ভয়েল শাড়ি । আগুণ-ফাগুণ-বেগনী ফুলফুল ছাপা। শ্যম্পু চুল হাওয়ায় উড়িয়ে  লাস্যময়ীরা এমন পরেন সানন্দাতে। চেখে পড়েছে সেই টিনেই । যাবার সময় ক্যাচাল্! চুলটা বেণী করতেই হবে।মায়ের ফতোয়া। আবার ডবল ঝুঁটি। নো ওয়ে! আমিও নাছোড় । তারপর দর কষাকষি। অগত্যা মধুসূদনের মত রক্ষা করলেন বাবা। " আহা! ছেড়েই দাওনা একটা দিন্! সরস্বতী পুজো বলে কথা।  নিজের দিনগুলোর কথা ভাব দিকিনি!” 

তারপর টিন পেরোনো আমি যুবতী। যেন বেতস লতা। চোখে মুখে শিক্ষা আর কথার খ‌ই অনবরত ফুটছে টগবগ করে । একটু একটু করে বোধশক্তির অধিকারিনী হচ্ছি । মানে জাগো কুমারী, বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতা কন্যাশ্রী !   সেই কলঘরের ভোর পেরিয়ে বাথরুমে গ্লেজড টাইলস আর বাথরুমের আয়নায় নিজেকে আবিষ্কার করার পালা। সরস্বতীপুজো যেন পড়ার চাপে ফেড একটু। তবুও বছরে একটা দিন আগলছাড়া পাগল পাগল ভাব। তখনো মায়ের চোখ সামনে পেছনে। প্রেম হলনা তখনো। স্কুলের আলপনা, লুচি-আলুর দম-বেগুনী,বোঁদে আর মায়ের দামী সিল্কের শাড়ি তখন পরণে। কিছুটা বড় মাপের চামড়ার চটি পায়ে দিয়ে গেছি। আর সেই চটি  হারিয়ে ফেলে কি বিপত্তি!   সেটা ছিল মায়ের সে বছরের পুজোর নতুন চটি। বাটিকের কাজ করা । কলেজস্ট্রীটের রাদু থেকে কেনা ।
তারপর খালিপায়ে সাইকেল রিকশা চড়ে বাড়ি ফিরে বেদম বকুনি! বারণ করা সত্ত্বেও নতুন চটিজোড়া পরে গেলি! দিন দিন যেন উড়ছে মেয়ে! ঘুচিয়ে দেব উড়নচন্ডী ভাব, ইত্যাদি ইত্যাদি! 

তারপর ভাইয়ের সাথে আলমবাজার থেকে বরানগর বাজার সার্ভে করে সরস্বতী পছন্দ করা।  যেন কনে দেখতে যাওয়া। চোখ চাই বড় বড়, নাকটা টিকোলো। পাতলা ঠোঁটদুটো আর কুচযুগ শোভিত কুঁচ বরণ কন্যা ।  মনের মত করে পুজোর বাজার আর বাবা নামক পুরোহিতের দ্বারা  পুজো উতরোনো ।  ধান-যবের শীষ থেকে শুরু করে আমের মুকুল, পলাশকুঁড়ি থেকে প্যাঁড়া, চিঁড়ে-মুড়কি থেকে খৈ-দৈ... এক্কেবারে ষোড়শ উপচার । কোনও অনুষ্ঠানের ত্রুটি নেই।  কলেজবেলা তখন আমার । বীরখন্ডি-কদমায় তদ্দিনে ফ্যাশন আউট সানন্দার । ক্যালরি কনশাস তন্বী তনয়া। খাগের কলম ডোবানো মাটির দোয়াতে ভায়ের জন্য ডুবু ডুবু কাঁচা দুধ ঢালা।যেন ভায়ের হল শুরু, আমার হল সারা। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পেরোনো আমি যেন মুক্ত বিহঙ্গ। স্বাধীনতার পাসপোর্ট তখন আমার বগলে। বাব তখন বন্ধু আমাদের । পুজোয় বসে তিনি বলেন নিদেন একখান বিড়ি না হলে পুজোয় বসবেননা তিনি।পুরুতমশাইরা নাকি কানে বিড়ি গুঁজে আসেন পুজো করতে!   এবার মায়ের কাছে কাকুতি মিনতি করে বাবার জন্যে স্পেশ্যাল চা হাতে দিতেই তিনি গলে জল হয়ে পুজোয় বসলেন।  বুঝলাম, কত বিচক্ষণ হলে সংসারে গিন্নীর কাছ থেকে এক্সট্রা এককাপ চা আদায় করা যায়! 

দুই বিরুণী থেকে এক বিরুণী ও শেষে অলবিরুণি gone! খোলা চুলে ট্রানজিশান । সায়েন্স কলেজের গন্ডী পেরুনো। কোর্টশিপ চলছিল হবু বরের সাথে ।  সেবছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে আর সরস্বতী পুজো পড়েছিল পিঠোপিঠি। নীলখামে একখানা প্রেমপত্র এসে পড়ল ঐদিনেই । যেন সুরের ঝর্ণায় হায় মরি হায় মরি হায়রে! ঝর্ণা ঝরে রে! রহিনা ঘরেরে। সেই থেকে প্রেমপত্র চালাচালিতে সাহিত্যচর্চা জেগে ওঠা।  সালটা ১৯৮৯। আটপৌরে, সাদামাটা আমি। কিছুটা আবেগে, কিছুটা ভালোলাগায় ভালোবাসতে শিখলাম আমার প্রথম প্রেমকে।

বিয়ের পর  সরস্বতীপুজো জমিয়ে শুরু করলাম আবারো ছেলের হাতেখড়ি দিয়ে । তারপর মা হওয়ামাত্র‌ই সরস্বতীপুজো আসা মানেই গোটাষষ্ঠীর তোড়জোড়। মানে সব গিয়ে রান্নাঘরের খুন্তি-কড়াইতে । 
সরস্বতীপুজোর পরদিন গোটাষষ্ঠী বা শীতল ষষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গের রীতি । অনেক পূর্ববঙ্গের মানুষও শখে করেন । আমাদের অরন্ধন । পাথরের শিলকে তেল হলুদ জলে স্নান করিয়ে তার কোলে নোড়াটি রেখে দিতে হবে আর জোড়া শিম, ফুল দিয়ে তার পুজো করতে হবে । সব ঠাণ্ডা। তাই বুঝি নাম শীতল ষষ্ঠী। শ্রীপঞ্চমী তিথি থাকতে থাকেতেই গোটা রেঁধে রাখতে হয় । গোটা মুগডাল (সবুজ মুগকলাই ), গোটা শিম, গোটা মটরশুঁটি, গোটা রাঙা আলু, গোটা আলু, গোটা বেগুণ জোড়া সংখ্যায় দিয়ে  (কমপক্ষে ৬টি করে ) গোটা সেদ্ধ হয় নুন দিয়ে । সাথে গোটা শুকনো লঙ্কা আর নুন ।  গোটা মুগ ডালকে শুকনো খোলায় একটু নেড়ে নিতে হবে যতক্ষণ না হালকা গন্ধ বেরোয় । কিন্তু প্রেসারে রাঁধা চলবে না । আর কিছু পরে ঢাকা খুলে দেখতে হবে কিন্তু ডাল বা সবজীকে হাতা দিয়ে ফাটানো চলবেনা ।   সেদ্ধ হয়ে গেলে কাঁচা সরষের তেল দিয়ে নামিয়ে রাখা হয় ।  সাথে পান্তাভাত আর সজনেফুল ছড়ানো কুলের অম্বল ও টক দৈ । সরস্বতীপুজোর পরদিন আমাদের দুপুরের আহারে  সবকিছু বাসি রান্না  খাওয়া হ'ল আমার শ্বশুরবাড়ির রীতি ।
সারাটা পশ্চিমবাংলার মায়েরাই এমন করে গোটাষষ্ঠী করেন ছেলেমেয়ের মঙ্গলকামনায়।  কিন্তু যখন দেখি আজকের ছেলেমেয়ের মায়ের জন্য সেই গোটাষষ্ঠীর পুণ্যফল রেসিপ্রোকেট না করা তখন আমার এ যাবত সঞ্চিত বোধ-বুদ্ধি সব বিসর্জন হয়! 
পুজোর পরদিন পান্তা আর গোটাসেদ্ধ খেয়েদেয়ে বোধহয় একটু ঝিমুনি এসেছিল। 
দেখি বাসন্তী, ভুবনমোহিনী সরস্বতীর উপছে পড়া কলকাতায়  ব্যালকনির সুখ । মনে মনে ডাকি তাঁকে। শুধু বলি আর বছরে আবার এসো মাগো। ভেলায় ভাসতে ভাসতে বেলপাতা বোঝাই হলুদ গাঁদার ঝুড়ি তখন বোধহয়  গঙ্গার মোহানায়  । জলের বুকে ভাসমান সরস্বতী মুখে তাম্বুল আর কপালে সিঁদুর নিয়ে দুলতে থাকে ঢেউয়ের ওঠানামায় । ফিরে আসে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক। "বিদ্যাস্থানে ভয়ে-বচ"দের যেন কৃপা করেন তিনি।  বস্তির সেই ছেলেগুলো যারা বাড়িবাড়ি চাঁদা তুলতে এসে ভুল বানানে নষ্ট করে ডটপেনের সস্তার কালি।  সরস্বতী যাদের কাছে শুধুই একটা পুজো, আনন্দের হৈ হল্লা, আর পাঁচটা হুজুগের মত, খিচুড়ি-বোঁদে-দধিকর্মার সুখ আর পড়ায় ফাঁকির সুখ।  আর মাইকে জোরসে পাগলু থেকে রামলীলা অথবা শীলার জওয়ানি থেকে মুন্নির বদনাম ।  চোখ বুঁজে ফুল ছুঁড়ে আসছি আমরাও ওদের সাথে প্রতিবছর সেই মেয়ের পায়ে যার নাম সরস্বতী।
তখনো জানতাম না আমাদের আদরের সরস্বতী আজীবন কুমারী।  তখন তো জানি তিনি শিব-দুগ্গার শান্তশিষ্ট কন্যা, নারায়ণের ঘরণী।  শুধু লক্ষী মেয়ের মত লেখাপড়া আর গানবাজনা নিয়েই থাকতে পছন্দ করেন। আর তাই ছাত্রছাত্রীরা চোখ বুঁজে সরস্বতীপুজোর দিনে তাঁর পায়ে ফুল ছোঁড়ে। আমিও  ছুঁড়েছি সেই হাতেখড়ির বেলা থেকে আর এখনো ছুঁড়ে চলি মন দিয়ে।  তবে এখন এই সরস্বতীকে আমি কেবল ই বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলে ভাবতে পারিনা। তাঁকে একজন প্রতিবাদী মেয়ে হিসেবে দেখি যিনি অত্যন্ত লড়াকু ছিলেন। 
নিজেকে অনেকবার প্রশ্ন করেছি এই সরস্বতীর বিয়ে নিয়ে। আমাদের এই মেয়েটি কি সুখী বিবাহিত জীবন পেয়েছিল নাকি কদর্য এই পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতি ঘৃণায়, লাঞ্ছনায় বিয়ের মত প্রহসনের দিকে পা দেন নি ? না কি আজকের দিনের মত বিবাহ-বিচ্ছিন্নাই থেকে গেলেন আজীবন? অথবা  একাধিক সপত্নীর সাথে ঘর করার অসহ্য বেদনা বুকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে ?  
না:,পুরাণ বলে, পালিয়ে তিনি যান নি। পরাজিতও হন নি । তিনি দাপটের সঙ্গে লড়ে গেছেন পুরুষের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করে গেছেন পুরুষের কামনার স্বীকার হতে হতে । কিন্তু বেঁচে রয়েছেন আজো মানুষের মনে কারণ তিনি জয়ী ।  সে যুগে বিয়ের ফাঁদে আদৌ কি বাঁধা পড়তেন দেবদেবীরা ? রক্তমাংসের সম্পর্কের মত দেবদেবীদেরও তো কৈশোরে বয়ঃসন্ধির সুবাদে দেহরসের ক্ষরণ ও সেই হেতু ছোঁকছোঁকানিও ছিল । ছিল ইভ-টিজিং ও মোলেষ্টশান । আর জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলি দেব-দৈত্যকুলে রেপিষ্টের সংখ্যাও নিদেন কম ছিলনা সেযুগে । তারা লিভটুগেদার বা "থাকাথাকি" তে বিশ্বাসী ছিলেন না বিয়ের মত লিগাল ইনস্টিটিউশানে বিশ্বাসী ছিলেন সে তো পরের কথা।  সেক্স ও ভায়োলেন্স এর দাপট কিন্তু এ যুগের চেয়ে সেযুগে কিছু কম ছিলনা । সরস্বতী তাঁর সাজগোজ, পোশাক-আষাকের মধ্য দিয়ে আর সর্বোপরি তাঁর গুণ, বুদ্ধি আর বিদুষী ব্যক্তিত্ত্বের দ্বারা পিতৃসম ব্রহ্মা থেকে শুরু করে প্রেমিক তুল্য নারায়ণের মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন এক্কেবারে । যাকে আমরা এখন শহুরে ভাষায় বলি "হেড টার্নার" ; তিনি এমনি ছিলেন ।মানে এখনকার দিনে যাকে বলে পেজ থ্রি কাঁপানো।   সমাজে এমন মেয়ের কদর তো হবেই যিনি একাধারে রূপসী আবার বিদুষী । পুরাণ কিন্তু অন্য কথা বলে।  সরস্বতী ছিলেন অসম্ভব ঝগড়াটে আর তাঁর মেজাজ ছিল দাপুটে । হতেই পারে । যিনি একহাতে বশিষ্ঠ থেকে বিশ্বামিত্র আর অন্যহাতে ব্রহ্মা থেকে বিষ্ণুকে নাচাতে পারেন তিনি তো অযোনিসম্ভবা, অসামান্যা । কিন্তু আজকের সমাজের চিত্রটাও ঠিক তেমনি আছে অনেক ক্ষেত্রে । তবে এমনি মেয়েই তো আসল কন্যাশ্রী আজকের সমাজে। এমনি তো চাই আমাদের। এ কথা কেন বলছি তা বুঝতে গেলে জানতে হবে সরস্বতীর পুরাণ বেত্তান্ত ।
  সরস্বতীর জন্মবৃত্তান্ত এবং বিবাহ এই দুই নিয়ে অনেক কিংবদন্তী আছে । কেউ বলেন পরমাত্মার মুখ থেকে নির্গত হয়ে তিনি পাঁচ ভাগে বিভক্ত হন : রাধা, পদ্মা, সাবিত্রী, দুর্গা ও সরস্বতী । আবার কারো মতে পিতা ব্রহ্মার মানসকন্যা তিনি । ঠিক যেমন গ্রিক দেবী কুমারী এথেনা পিতা জিউসের কপাল থেকে নির্গত হয়েছিলেন । যদিও ব্রহ্মার মানসকন্যা সরস্বতী তবুও পিতা ব্রহ্মা তাঁর এই সুন্দরী কন্যাটিকে কামনা করে বসলেন । বৃদ্ধের এই চাহনি  কন্যার  পছন্দ হলনা । কন্যা এড়িয়ে চলতে লাগল পিতাকে ।পালিয়ে বেড়াতে লাগল । ব্রহ্মা অসন্তুষ্ট হলেন । কামদেব মদনকে অভিশম্পাত করলেন যে কেন এই সুন্দরী কন্যার প্রতি  তাঁর সম্ভোগ লালসা রূপায়িত হচ্ছেনা এই বলে । অচিরেই শিবের দ্বারা মদন ভস্মীভূত হল সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ! আর  প্রতি পদে পদে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর লাঞ্ছনার গল্প উঠে এল ।
বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির মূলে যখন অগ্নির করাল গ্রাসে সৃষ্টি প্রায় ধ্বংসের মুখে তখন এই বিপর্যয়কে রুখতে দেবরাজ ইন্দ্র গেলেন নদী সরস্বতীর কাছে । সরস্বতীকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে আগুন নেভাতে আদেশ দিলেন । সরস্বতী তখন সমুদ্রের দিকে ধাবমান । সে তখন বলল ব্রহ্মা স্বয়ং আদেশ দিলে তবেই সেই আগুন নেভাতে তার গতিপথ ঘোরাবে । ব্রহ্মা ইন্দ্রের অনুরোধে সরস্বতীকে আদেশ দিলেন । সরস্বতী সম্মত হল । গঙ্গা, যমুনা, মনোরমা, গায়ত্রী ও সাবিত্রী এই পাঁচ নদী তার সঙ্গ নিতে চাইল কিন্তু সরস্বতী একাই গেলেন সেই অগ্নিনির্বাপণ কাজে । পথে ক্লান্ত হয়ে ঋষি উতঙ্কর আশ্রমে বিশ্রাম নিতে গেলেন আর তখুনি মহাদেব সমুদ্রাগ্নিকে একটি পাত্রে ভরে সরস্বতীর সম্মুখে হাজির করলেন । সরস্বতী তখন উত্তরে ব‌ইতে শুরু করল । ভারতের উত্তরপশ্চিমে পুষ্করে গিয়ে তার দ্বিতীয় বিশ্রাম হল । যার জন্য পুষ্কর হ্রদ হল এখনো একটি তীর্থক্ষেত্র । নারীর মহিমায় ভারতের কোণায় কোণায় বিখ্যাত ও স্মরনীয় হয়েছে অনেক এমন স্থান । পুরাণের সরস্বতী থেকে রামায়ণের সীতা কিম্বা চিরস্মরণীয়া পঞ্চকণ্যাঃ অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা, মন্দোদরী... এঁদের প্রত্যেকের জন্য বিখ্যাত অনেক তীর্থস্থান।
এমন আরো একটি গল্প ভাবিয়ে তোলে আজো যেখানে সরস্বতী নামের মেয়েটি  পুরুষের লালসার স্বীকার হয় একাধিকবার । সেই সমাজের দুটি শক্তিমান পুরুষের সম্ভোগ লালসার টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে যায় মেয়েটির জীবন । তবুও সে ক্ষতবিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকে । 

একবার ঋষি বশিষ্ঠ সরস্বতীর তীরে তপস্যায় মগ্ন ছিলেন । তাঁর শত্রু মুনি বিশ্বামিত্র এসে সরস্বতীকে বললেন বশিষ্ঠকে নিয়ে প্রচন্ড বেগে তাকে লন্ডভন্ড করে প্রবাহিত হতে । সরস্বতী প্রথমে রাজী হননি । অবশেষে বিশ্বামিত্রের অনুরোধ উপেক্ষা না করতে পেরে দুকুল ছাপিয়ে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠকে নিয়ে বানভাসি হলেন । নদীর ঢেউয়ের সর্বোচ্চ শিখরে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠ । একবার উঠছেন আবার একবার নামছেন ঢেউয়ের দোলায় । বিশামিত্র তো বেজায় খুশি । কিন্তু এই প্লাবনে বশিষ্ঠের কোনো হেলদোল নেই দেখে তাঁর একটু সন্দেহ হল । বিশ্বামিত্র বুঝলেন সরস্বতী বশিষ্ঠকে নিশ্চয়ই রক্ষা করছে । অতএব সরস্বতীর এইরূপ ছলকলায় যারপরনেই অসন্তুষ্ট হয়ে বিশ্বামিত্র সরস্বতীকে অভিশাপ দিলেন ও সরস্বতী অচিরেই রক্ত রূপী নদীতে পরিণত হল । মুনি ঋষিরা যখন সরস্বতীর তীরে স্নান করতে এলেন তখন বিশুদ্ধ জলের পরিবর্তে রক্ত দেখে খুব আশ্চর্য হলেন । এর অর্থ আমার জানা নেই। তবে হয়ত মেয়েটি প্রতিবাদ করে বলেছিল, আমি ঋতুমতী। আমাকে রেহাই দাও। নাকি জলে ঝাঁপ দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল তা?  সরস্বতী তাঁদের কাছে কেঁদেকেটে সব কথা খুলে বললেও রেহাই পান নি? বিশ্বামিত্রের এহেন দুরাভিসন্ধির কথাও জানালেন  । নিজের মুক্তি চাইলেন ও পুনরায় পূত:সলিলা সরস্বতী রূপে ফিরে চাইলেন নিজের জীবন ।  দয়ালু মুনিঋষিদের প্রার্থনায় শাপমুক্ত হলেন সরস্বতী এবং পুনরায় বিশুদ্ধ হল নদীর জল । এই কারণে সরস্বতীর অপর এক নাম "শোন-পুণ্যা" ।
পুরাণের আরেকটি গল্পের মতে সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং গঙ্গা ছিলেন বিষ্ণুর তিন পত্নী । বিষ্ণু কিন্তু গঙ্গার প্রতি একটু বেশিমাত্রায় আসক্ত ছিলেন ।  নম্রস্বভাবের লক্ষ্মী এই ঘটনায় মনে মনে খুব দুখঃ পেতেন কিন্তু কিছু প্রকাশ করতেন না । সরস্বতী কিন্তু বিষ্ণুর এই অতিরিক্ত গঙ্গাপ্রেমকে প্রশ্রয় না দিয়ে অশান্ত এবং রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন ।  একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল ।  প্রচন্ড উগ্রমূর্তি ধরলেন তিনি ।   গঙ্গার মুখোমুখি হলেন । লক্ষ্মী একটি ভয়ানক কলহের পূর্বাভাস পেয়ে সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালেন । সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিয়ে একটি গাছে পরিণত করলেন । লক্ষ্মী আবার সেই অভিশাপে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সরস্বতীকে নদীতে রূপান্তরিত করলেন । সরস্বতী নিজেও তখন উগ্রচন্ডা । নিজে নদীতে পরিণত হয়েছেন বলে গঙ্গাকেও নদী হতে অভিশাপ দিলেন । ইতিমধ্যে বিষ্ণু সেইখানে হাজির হলেন । এতসব ঝগড়া বিবাদ দেখে ও শুনে স্থির করলেন সরস্বতী ও গঙ্গার সাথে আর নয় । এখন থেকে তিনি কেবলমাত্র লক্ষ্মীর সাথেই ঘর করবেন । সরস্বতীকে ব্রহ্মার হাতে এবং গঙ্গাকে শিবের হাতে সমর্পণ করে বিষ্ণু  হলেন লক্ষ্মীর প্রিয় পতিদেবতা । আর  সরস্বতী ও গঙ্গার ওপর এরূপ অন্যায় শাস্তির জন্য  লক্ষ্মী মনে মনে ব্যথিত হলেন আবার বিষ্ণুকে একান্ত নিজের স্বামীরূপে বরণ করে আনন্দিতও হলেন  । বিষ্ণুকে শান্ত হতে বললেন এবং তাদের দুজনের আশীর্বাদে লক্ষ্মী ও গঙ্গা মর্ত্যের ওপর দিয়ে নিজ নিজ গতিপথে ব‌ইতে লাগল । স্বর্গে তাদের দুজনার একটি করে শাখা বিষ্ণুর হাত ধরে র‌ইল।

এমন সরস্বতী যেন বারবার ফিরে আসে আমাদের সমাজে  যাকে মনে রাখার জন্য বছরে একটি নির্দ্দিষ্ট দিন পালন করা হবে আর পূজা-পাঠ-অঞ্জলি-আরতি এ সব তো মনগড়া! আসল তো সে মেয়ের ব্র্যান্ড যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে দাগ কেটে দিয়ে যাবে ।   সে তো আমাদেরই ঘরের চেনা একটা মেয়ে অথবা শুধুই মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয় !!!
 কলকাতা ২৪ x ৭

১৩ জানু, ২০১৭

পোষের শীত পিঠের গায়


ত্তুরে হাওয়ায় ভাসতে শুরু হয়েই ফুরিয়ে যায় আদরের শীতের পৌষের ডাক। লেপ বালাপোষের ওম নিতে নিতেই উধাও হয় অমৃত কমলার মিষ্টি দুপুর। তবে শীতের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে বসে চষি পাকানো, মোয়া গড়া কিম্বা পুলিপিঠে গড়তে গড়তে মেয়েলি গল্প? তা কিন্তু ফুরোয়না। বছরের পর বছর জি‌ইয়ে থাকে বাংলার গৃহিণীদের হাতের যাদুতে আর জয়নগরের মোয়ার শীতের প্যাকেজে।  কথায় বলে "মাঘের শীত বাঘের গায়'  আর পোষের শীত ? খেজুরের গুড়ে, পিঠেপুলিতে, নলেনগুড়ের পায়েসে আর পাটালীতে। 

আমাদের দুই বাংলাতেই অপর্যাপ্ত খেজুর গাছ আর তার হাত ধরে কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে  ঘুম ভাঙে কোলকাতায় । হ্যালোজেন নিভে যায় । আমি কান পেতে র‌ই । উশখুশ প্রাণ বলে, খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন  । মফস্বলের দিকে ভোরবেলায় অন্ধকার থাকতেই "চাই রস"  বলে সেই বিখ্যাত হাঁক? এখন আর শুনি ক‌ই?  রোদ বাড়ার সাথেসাথেই খেজুর রস গেঁজে তাড়ি হয় । সেই খেজুর রস জাল দিয়ে প্রথম দফায় পয়রা বা পয়লা গুড় আমাদের বড্ড প্রাণের। এ যেন অল্পদিনের অতিথি। একে ছেড়ে দিলে আর পাবনা সারাটি বছর তাই যতই  দাম হোক গেরস্থ তার সাধ্যমত একটি ছোট্ট মাটির নাগরী  খড়ের বিঁড়ের ওপর বসিয়ে বাড়ি বয়ে আনবেই। রান্নাবান্নার ঝুটঝামেলা নেই। রুটি, লুচি, পরোটা দিয়ে দিব্য চলবে পয়লাগুড়। বিদেশের মেপল সিরাপ যেন। ওরা খায় প্যানকেক, ওয়েফল দিয়ে। 
তারপর সেই খেজুর রস জাল দিয়ে ঘন করে মাটির সরার মধ্যে থরে থরে পাটালি গুড় তৈরী হয়। কিছুটা আধাঘন গুড় বিক্রী হয় খেজুরের গুড় হিসেবে। সেটা বেশ অনেকদিন রেখে খাওয়া যায়। মূলতঃ পৌষমাসের সেরা উত্সব মকরসংক্রান্তিতে সেই খেজুরের গুড় দিয়েই পিঠেপুলি বানানো হয়। মোয়া তৈরী হয় হরেক কিসিমের। নবান্নের নতুন ধানের গন্ধ তখনো লেগে থাকে চিঁড়ে, মুড়ি আর খ‌ইয়ের গায়ে। নতুন ধান আর নতুন গুড়ের সুঘ্রাণে পরতে পরতে শীতের রূপ হয় খোলতাই।  পৌষলক্ষীর বরণডালা উপচোয়  সোনার ফসলে। আনন্দে কবি বললেন, মরি হায় হায় হায়। এতে মরার একটাই কারণ কাজের চাপে শীত ফুরায়। আর শীত ফুরোলে কি আর থাকে বাঙালীর কপালে? চলে যায় মরি হায় নলেন গুড় আর চালের গুঁড়ির জম্পেশ কেমিষ্ট্রি।  
 আমাদের ঘটিবাড়ি খুলনা জেলার সাতক্ষীরার ঐতিহ্য মেনে এখনো পৌষসংক্রান্তিতে নতুন ধান দিয়ে পৌষলক্ষীর পুজো করে। আর সেই পুজোয় মুখ্য ভোগ হল নতুন গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে  নলেন গুড়ের পায়েস আর তার মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া তুলতুলে নরম দুধপুলি। মা লক্ষী কৃপা করলে সারাজীবন ধরে বংশ পরম্পরায় যেন এই ভোগ নিবেদন করা যায়, এমনি বিশ্বাস ছিল আমাদের ঠাকুমার। নতুন গুড়ের পায়েসের গন্ধে শিকেয় উঠত জ্যামিতি পরিমিতি ।
পুলিপিঠে বানাতে বসে ঠাকুমা বলতেন রিভেঞ্জ নেবার এক গল্প। 
এক দজ্জাল শাশুড়ি তার নিরীহ বৌমাটিকে অত্যাচার করত। দাপুটে শীতে গাদা গাদা পিঠে বানাতেই হত। একদিকে সংসারের সমস্ত কাজ, তায় আবার একাধিক কাচ্চাবাচ্চা সামলিয়ে নিদারুণ শীতে নিজের পিঠে পিঠে রাঁধার চাপ নিতে হত। বৌটি মুখে প্রতিবাদ করতে পারতনা। এক শীতে সে ঠিক করল দুধ ঘন করে, পাটালী দিয়ে ফুটিয়ে নিয়ে এক জব্বর দুধপুলি বানিয়ে শাশুড়িকে খাইয়েই ছাড়বে। রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘরের আশপাশ থেকে ছোট্ট ছোট্ট দুধসাদা নেংটি ইঁদুর ধরে এনে সেই ফুটন্ত দুধের পায়েসের মধ্যে ফেলে দিল ইঁদুরগুলিকে। অন্ধ শাশুড়িকে শীতের রাতে জামবাটি ভরে সেই দুধপুলি খেতে দিল। শাশুড়ি হাত ডুবিয়ে সেই নরম তুলতুলে পুলি খায় আর ইঁদুরের লেজগুলি ছুঁয়ে বলতে থাকল,
' কালে কালে কত‌ই হল, পুলিপিঠের লেজ গজালো '  
এমন কাহিনী আজ হয়ত অচল । বদলেছে শাশুড়ি-বৌয়ের গল্প অন্য আঙ্গিকে। তবে পিঠেপুলি বানাতে বানাতে এমন মুখরোচক গল্প শোনাটাও ছিল আমাদের উপরি পাওনা। 
আর এইসব কাহিনীর জন্যেই বুঝি লোকমুখে ছড়িয়ে গেল
 "কারও পোষ মাস, কারও সব্বনাশ " এর মতন প্রবাদ।

পৌষসংক্রান্তির আগের দিন থেকে পরের দিন অর্থাত মোট তিনদিন ধরে চলে আমবাঙালীর পিঠে-উত্সব। দুধ, নারকেল আর নতুনগুড়ের বিক্রিবাটরায় হৈ হৈ  তলা লেগে যাওয়া ঘন দুধের গন্ধে ম ম করা ঘরবাড়ি আর বার্কোশ পেতে কুরুনিতে নারকেল কোরার খসখস শব্দ?
  
মামারবাড়িতে দিদিমার সে এক হৈ হৈ জগ্যি পৌষসংক্রান্তির দিনে।  বিশাল রান্নাঘরের মধ্যে কয়লার উনুন জ্বলছে গাঁকগাঁক করে। দুটো  ষন্ডামার্কা লোক বড়বড় কাঠের বার্কোশে কলাপাতা বিছিয়ে নারকেল কুরছে। উনুনে কালো লোহার কড়াইতে দুধ ঘন হচ্ছে।  আগের রাতে ভেজানো নতুন চাল শিলে বাটছে দুজন মেয়ে। এবার সেই চালের গুঁড়ি ঠাণ্ডা জলে মসৃণ করে গুলে ঘি দিয়ে উনুনে বসিয়ে নাড়া । এবার সোনার মত চকচকে করে মাজা পেতলের পরাতে ঘি মাখিয়ে সেই চালের মণ্ড ঢেলে দিলেন দিদিমা । সাথেসাথে ঠাণ্ডা হাতে গরমের ওম মেখে, ময়দা মাখার মত ঠেসে নিলেন সেই চালের মণ্ড। ছোট ছোট লেচি বানিয়ে ভেজা মসলিন কাপড়ে ঢেকে রাখলেন তা। ততক্ষণে কালো লোহার কড়াইতে খেজুরের গুড় জাল দিয়ে নারকেল মিশিয়ে ছেঁই প্রস্তুত। বাড়ীর কচিকাঁচাদের হাতে নারকেল নাড়ু সম সেই ছেঁই চাখার জন্য একটু করে দেওয়াও হল । এই ছেঁই হল পিঠের পুর। এই বানিয়ে রাখা হল। চলবে একমাস ধরে। ছেঁই ঠাণ্ডা হতেই চালের মণ্ডের লেচি হাতের তেলোয় নিয়ে একটু করে ছেঁই ভরে পুলিপিঠের মুখ বন্ধ করার পালা। ফিডিং বোতলের আকারে আলতো হাতে ছোট্ট ছোট্ট পুলি গড়ে ফেললেন দিদিমা তাঁর শৈল্পিক অনুভূতিতে।   আধাঘন  ফুটন্ত দুধে সেই  পুলিগুলো ছাড়লেন  ধীরে ধীরে । আর হাতা দিয়ে  আলতো করে মাঝেমাঝে নেড়ে দিলেন ।  কি সুন্দর হেঁশেল পারিপাট্য! খেজুরের গুড় ভর্তি বয়াম থেকে পরিমাণ মত গুড় দুধে ফেলে সমান ভাবে মিশিয়ে দিলেন ।  সারাবাড়ি ম ম করছে দুধপুলির আগাম আগমনীবার্তায়  ।  ক্ষীরসমুদ্রে ভাসমান পুলি নিয়ে তখনো সংশয়ে দিদিমা। পুলি ফেটে গেলে চূড়ান্ত ডিস্ক্রেডিট।  সেই দুজন ষন্ডামার্কা লোক এসে পেল্লায় লোহার কড়াইটাকে নামিয়ে দিল মাটিতে।

কিছু পুলিপিঠে  গড়ে রাখা হল সেদ্ধ বা ভাপানো হবে বলে। সেদ্ধপুলি হল বাঙালীর মিষ্টি মোমো। পেল্লায় হাঁড়ির মুখে জল ফুটবে। আর সাদা নরম কাপড়ে পুলিগুলোকে বেঁধে হাঁড়ির মুখে স্টীমারে ভাপানো  হবে। তারপর সেদ্ধপুলি খাওয়া হবে বাটি ভর্তি করে পাতলা পয়রাগুড়ে চুবিয়ে। 

কিছুটা চালবাটা আর কলাইয়ের ডালবাটা মিশিয়ে রাখা হল একটি গামলায়। তা দিয়ে বানানো হবে সরুচাকলি। দক্ষিণী দোসার অনুরূপে পাতলা পাতলা সেই দোসা খাওয়া হবে পৌষসংক্রান্তির রাতে। আবারো পয়রাগুড়ে চুবিয়ে। পিঠে উত্সবের মধ্যমনি হল পাটিসাপটা। ঐ যে নারকোল আর খেজুর গুড়ের ছেঁই বানিয়ে রাখা হল সেই ছেঁইতে একটু খোয়া ক্ষীর মিশিয়ে মসৃণ করে আরেকটা রাজকীয় কেমিষ্ট্রি তৈরী হল । সেটি হল পাটিসাপটার পুর। এবার পাটিসাপটার ব্যাটার বা গোলা তৈরীর পালা।  আমাদের ঘটিবাড়ির পাটিসাপটা এতটাই নরম ও তুলতুলে হয় যে তা পরেরদিনও দিব্যি গরম করে নিয়ে খাওয়া যায়। আর এখন ফ্রিজের দৌলতে গোলা বানিয়ে ঠান্ডায় রেখে দিলে রোজ বানিয়ে খাওয়া যেতেই পারে গরমাগরম এই পিঠে। গোলার কেমিষ্ট্রি তৈরী হয়  ঠান্ডা দুধ, সম পরিমাণ সুজি-ময়দার মসৃণ মিশ্রণে সামান্য চালের গুঁড়ো, একটু পাতলা খেজুর গুড় আর অল্প ঘি দিয়ে ।  ঠিক ভাজার পূর্ব মূহুর্তে গোলায় ছড়িয়ে দাও বড়দানার সামান্য চিনি।  কারণ  গোলারুটিতে একটা ফুটোফুটো ভাব আনার জন্য। এখন ছুটছি সকলে। তাই টেফলন‌ই ভরসা। বেশ করে ননস্টিক তাতিয়ে নিয়ে বেগুনের বোঁটায় করে ঘি মাখিয়ে নেওয়া আর হাতায় করে গোল দেওয়ার পর দেশলাই বাক্সের খোলের ভেতরটা  দিয়ে সেটিকে ডিম্বাকৃতি রুটির আকার দেওয়া। এবার পাতলা সেই গোলারুটির ধার দিয়ে সামান্য ঘিয়ের ছিটে দিয়ে কম আঁচে ভেজে নিয়ে  আগে থেকে বানিয়ে রাখা রাজকীয় পুর চালান হল। তারপর কাঠের তাড়ু দিয়ে হাতের কৌশলে পাশবালিশের আকারে পাটিসাপটা মুড়ে নিতে পারলেই হল বাঙালীর মিষ্টি প্যানকেক।  আজকাল বাজারে যে পাটিসাপটা বিক্রি হয় সেগুলি ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যায়। এর কারণ হল ময়দা বা সুজির পরিবর্তে জলে গোলা চালের গুঁড়ি। 

কখনো খাও ক্ষীর সাঁতারে ডুব দেওয়া দুধপুলি। কখনো কামড় বসাও পাটিসাপটায় অথবা হালকা মিস্টির স্বাদ নিতে সরুচাকলিতে।  আমাদের আড়িয়াদহের বাড়ীতে  ঠাকমা বানাতেন রসবড়া।  বিউলির ডাল বাটার ঘন ব্যাটারে, মৌরী আর সামান্য চিনি ছড়িয়ে ( ফাঁপা করার জন্য) সরষের তেলে ভেজে নিতেন বাদামী রংয়ের টোপা টোপা রসবড়া। এটা হল ভাজার গুণ। কম আঁচে মুচমুচে করে ভাজতে হবে, যাতে খেজুরগুড়ের পাতলা রসে ফেললে বড়া আরামে না নেতিয়ে পড়ে । এবার খাও কে কত খাবে।
আরেকটি পিঠে আমাদের ঘটিবাড়ির স্পেশ্যাল। তা হল মুগসামালী। শুকনো খোলায় ভাজা সোনামুগ ডাল সেদ্ধ করতে হবে এমনভাবে যাতে ডাল গলে ঘ্যাঁট না হয় আর শুকনো শুকনো সেই ডালসেদ্ধ ঘিয়ের হাতে আলতো চাপে সামান্য ময়দা আর চালের গুঁড়ো মাখিয়ে নিয়ে গড়তে হবে পুলির আকারে। মধ্যে দিতে হবে সেই আদি, অকৃত্রিম খেঁজুর গুড় আর নারকেলের ছেঁই। এবার পুলির মুখ বন্ধ করে গরম সর্ষের তেলে ভেজে নিতে হবে। পয়রা গুড়ে চুবিয়ে কিম্বা এমনি এমনি‌ ই খাওয়া যায় এই মুগসামালী। অনেক পিঠের মাঝখানে একটু মুখ বদল করতে ময়ান দিয়ে মাখা ময়দার খোলে ঐ ছেঁই চালান করে বানানো হত সিঙাড়া পিঠে।  কেউ মনের আনন্দে পরিপাটি করে গড়েই চলত এই সিঙাড়া পিঠে আর কেউ ভাজত গরম খোলা চাপিয়ে। এক‌ই অঙ্গে কত রূপ পিঠের! সৃষ্টিসুখে সামিল হওয়া বাংলার ঘরণীদের কত আইডিয়া মাথায়! অফুরন্ত সময় ছিল তাদের। সংসার ছিল যৌথ। পরিবারের সকলকে নিজের হাতে খাওয়ানো ছিল নেশা।

 ওদিকে বাংলার আদিবাসীদের ঘরে সেদিন টুসু পরবের গানের সাথে শোনা যায় মাদলের দ্রিমি দ্রিমি। আমরা গঙ্গসাগরে মকর স্নান করে পুণ্যি কুড়োই আর ওরা শোভাযাত্রা করে টুসু ভাসায়।  কেউ নতুন ধানের আউনি-বাউনি বেঁধে পিঠে বানাতে বসে। সেই পিঠে ঠাকুরকে দিয়ে তবে খায়। কেউ ওড়ায় ঘুড়ি। আটপৌরে বাঙালীর এই পিঠে সংস্কৃতি যেন তাদের বাৎসরিক সংস্কার। একজনের কাছে গুড়পিঠের কথা শুনেছি। মালপোয়ার মত ভাজা পিঠে গুড়ের রসে ফেলে খাওয়া আর কি! সাধ আর সাধ্যের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে পিঠের রেসিপিতে, রসনায় কত বৈচিত্র্য এসেছে যুগ যুগ ধরে। আমাদের প্রিয় গোকুলপিঠেও এমনি এক বৈচিত্র্য। আর এই একটি পিঠেতে খোয়া ক্ষীর, নারকেল অর খেজুরের গুড়ের সঙ্গে ছানার রসায়ন জমে যায় একেবারে।
পিঠেপুলির পরিবারে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে রাঙা আলুর পুলি।  এখন ক্যানসার রুখতে রাঙা আলুর জুড়ি নেই তাই বেশ কদর এই পুলির। সেদ্ধ করে নিয়ে চালের গুঁড়ি আর ময়দা আর ঘিয়ের হাতে রাঙা আলুর পুলির মধ্যে আবারো চালান করো নারকেলের ছেঁই আর পুলির মুখ বন্ধ করে ভেজে নাও তেলে। এবার এমনি খাও অথবা গুড়ের রসে ফেলে খাও। সেটা নিজের চয়েস।      
মনে পড়ে যায় পিঠের প্রসঙ্গে ইতু পুজোর ব্রতকথা। অঘ্রাণের শীতেই প্রতি রবিবারে ইতুপুজো করতে গিয়ে মা শোনাতেন সেই ব্রতের কথা। গরীব বামুন ভিক্ষে করে পিঠের উপকরণ যোগাড় করে বৌকে এনে দেয় আর বলে, দ্যাখ বামনী, এই যে মাগ্যির পিঠে বানাবি তা যেন তোর ঐ অলুক্ষুণে মেয়েদুটো মানে উমনোঝুমনোর পেটে না যায়।  বামনী পিঠে ভাজে আর বামুন একটা করে তেঁতুলে বিচি দিয়ে গুনতি করে রাখে মোট ক'খানা পিঠে সবশুদ্ধ ভাজা হল। বামুনের কাছে দুই কন্যাসন্তান সংসারে ব্রাত্য। এদিকে বামনীর প্রাণ পারেনা মেনে নিতে। উনুনপিঠেয় রাখা চোঁয়া, পোড়া, কাঁচা পিঠেগুলো সে মেয়েদের গিয়ে চুপিচুপি দিয়ে আসে। বামুন তা জানতে পেরে উমনোঝুমনোকে বনবাসে দিয়ে আসে। তারপর একদিন ঐ ইতুপুজো করার কারণেই তার মেয়েরা রাজরাণী হয়ে বামুনের দুঃখ ঘোচায়। এখনো তাই পিঠে বানালেই মনে পড়ে যায় এইসব। ফিরে ফিরে অসে কাহিনীরা নতুন গল্পের মোড়কে। 

 শিলাদিত্য  জানুয়ারি সংখ্যা ২০১৭

৮ জানু, ২০১৭

মাছে ভাতে বাঙ্গালী

"ও বৌমা, ও বৌমা আঁশবটিটা বার করোগো শিকার ধরেছি'
ছোটবেলার রূপকথার গল্প বলতেন বাবা।
যেখানে এক ডাইনি বুড়ি একটি ছোট ছেলেকে তার আঁশ বটিতে কুপিয়ে কাটবে বলে মনের আনন্দে নাচতে নাচতে ছেলের বৌকে কথাগুলো বলছিল।
শুধু রূপকথা কেন?  বাঙালী বাড়ির বনেদিয়ানা ছিল বিশাল এই আঁশবটি। আমবাঙালীর গরীব গেরস্থ, সকলেরি ঘরে থাকত একখানা আঁশবটি। এই আঁশবটির সংগে মাছের নিবিড় সম্পর্ক। তাই মত্স্যপ্রিয় বাঙালীর পেল্লায় আঁশবটি ছিল রান্নাঘরের ঐতিহ্য। আমাদের ঘটিবাড়িতে আঁশ-নিরামিষের ছুঁতমার্গ বেশ দাপটের সঙ্গে মানা হত। ঠাকুমার ঝুলকালির রান্নাঘরের কুলুঙ্গীর মধ্যে মাছভাজার লোহার আঁশ কড়া আর সেই আঁশবটি খানি থাকত। আঁশবটির ইজ্জত মাছের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলনা। কোনো বৃহষ্পতিবারে বাড়িতে মাছ না এলে ঠাকুমা তাঁর ছেলের বৌদের বলতেন, আঁশবটি ধুয়ে জল খেতে।  এয়োতির বেষ্পতিবারে মাছ না খেলে  পাছে ঠাকুমার ছেলেদের অকল্যাণ হয় তাই এই ব্যবস্থা। মায়েরা অবিশ্যি তা খেত না। ঐ আঁশবটিতে পেঁয়াজ কেটে ভাতের সঙ্গে খেয়ে নিত। 
অথবা দুপুরবেলায় মা তার নিজের দুই হাঁটুর মধ্যে আমাকে নিয়ে দোল খাওয়াতে খাওয়াতে বলতেন,

ঘুঘু ঘুঘু মতি স‌ই, পুত কই ?
হাটে গেছে।
কি মাছ আনতে?
সরলপুঁটি
কি দিয়ে কুটি?
বোঁচা বঁটি।

কিম্বা

মাছ কুটলে মুড়ো দেব
ধান ভাঙলে কুলো দেব,
কালো গরুর দুধ দেব,
দুধ খাবার বাটি দেব....

এসব ছড়া আজকের ছোটরা শোনেনা তাই রান্না ঘরে আঁশবটি কি জিগেস করলে তারা হয়ত উত্তর দিতেও পারবেনা। তারা জানে মাছ বাজার থেকে কেটে এনেই রান্না করা হয়। আমার বাপু বাবার মুখে এইসব ছড়ার গান না শুনলে একসময় ঘুম আসতনা ছুটির দুপুরে। 
বাবা গাইতেন,

আয়রে আয় ছেলের দল মাছ ধরতে যাই,
মাছের কাঁটা পায় ফুটেছে দোলায় চেপে যাই,
দোলায় আছে স্বপনকড়ি গুনতে গুনতে যাই....তখন কড়ি দিয়ে মাছ কেনা যেত। 

এই মাছ ধরার প্রসংগে মনে পড়ে আমাদের বাড়ির সবচেয়ে বড়দাদার কথা। আমরা বলতাম দাদাভাই। নিজে ছিলেন স্পোর্টসম্যান। পড়াশুনো শেষে চাকরী সামলিয়ে তাঁর যত ছিল ফুলগাছের নেশা তত ছিল মাছ ধরার নেশা। ঠিক ছুটির সকালে মাছ ধরবার জিনিষপত্র যেমন  মাছের চার অর্থাত আটামাখার গুলি, জ্যান্ত কেঁচো, ভাতের মন্ড ইত্যাদি, ছিপ, ফাতনা, সুতো নিয়ে তিনি চলে যেতেন গঙ্গার ধারে। মাছ উঠলেই হত আমাদের পারিবারিক মহামেছো ভোজ। 
বাবা আরো জানতেন ছড়ার গান। সেখানেও ঐ মাছ প্রসঙ্গ যেন এসেই পড়ত।


ও পাড়ার ঐ ছেলেগুলো নাইতে নেমেছে
দুইদিকে দুই রুইকাতলা ভেসে উঠেছে...    

কীর্তণে কানু বিনে গীত নাই আর বাঙালীর মত্স্য বিনে গতি নাই। তাই বুঝি শয়নে, স্বপনে, জাগরণে মাছ অনুষঙ্গটি এড়াতে পারেনা তারা।  

মাছ শুভ। মাছ পুণ্যতার প্রতীক। তাই বিয়ে, পৈতে, অন্নপ্রশনের তত্ত্বে মাছকে তেল, হলুদ, সিঁদুর লাগিয়ে তত্ত্বের তালিকায় রাখা হয়।  এমনকি শ্রাদ্ধের পিন্ডদানের পরেও মৃতের আত্মার রসনা তৃপ্তিতে কলাপাতার ওপরে এক টুকরো মাছ ভেজে দেওয়ার রীতিও দেখেছি। যেন তাঁকে নিবেদন করে অশৌচের পর বাড়ির লোকজন আবার মত্স্যমুখী হতে পারে।
তারপর সেই ছড়ার গানটি? আয়ঘুম যায় ঘুম বাগদীপাড়া দিয়ে বাগদীদের ছেলে ঘুমোয় জালমুড়ি দিয়ে। সেসময়  জেলে, বাগদী এদের এত‌ই আর্থিক অনটন এতটাই প্রবল  ছিল যে মাছ ধরার বাতিল জাল গুলিও তারা বুঝি ফেলত না । গায়ে দেবার কাঁথার কাজ করত সেই মাছ ধরবার জাল। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের সেই মেছুনির গল্প। মাছ নিয়ে যাদের কারবার সেই মেছুনির নাকি  রাতে শোবার সময় মাছের ঝুড়িটা মাথার শিয়রে না রাখলে ঘুম আসেনা। অর্থাত মানুষের যেমন আধার তেমন কর্ম। মেছুনির ভাল লাগে মাছের আঁশটে গন্ধ। ঐ গন্ধ না পেলে তার ঘুম‌ই আসবেনা ঠিক যেমন ছোট ছেলেকে গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ানোর অভ্যেস  অথবা শোবার সময় ব‌ইপড়ার অভ্যেস।

এই মীন শরীরের  সব ভাল কেবল ঐ আঁশটে গন্ধটা ছাড়া। এই আঁশের কথাতে মনে পড়ে দিদিমার কথা। কালো ভেলভেটের ওপর ক‌ইমছের আঁশ দিয়ে যে অপূর্ব শিল্পকর্মের গল্প শুনেছি তা বুঝি আজ হারিয়ে গেছে। ক‌ইমাছের আঁশ তো রূপোর মত চকচকে আর ছোট্টছোট্ট। আর এতো নষ্ট হবার নয়।  কোনো বাড়িতে কতগুলি ক‌ইমাছ এলে অমন শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তোলা যায় তা ভেবে কুল পাইনা। এখন তো বাজারে বড় ক‌ইমাছ অর্ডার না দিলে মেলেনা। ছোটোগুলিতে এত কাঁটা যে কেউ খাবেনা।
এহেন "আমি'র  শিরা-উপশিরায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বাঙাল রক্ত ও বাকী পঞ্চাশ ভাগ ঘটি রক্ত বহমান । আমার মায়ের বাবা এবং বাবার মা দুজনের বাংলাদেশের খুলনাজেলার সাতক্ষীরায় জন্ম। তাই এহেন "আমি" সেই অর্থে  হাফ বাঙাল ও হাফ ঘটি । অন্তত: আমার শ্বশুরালায়ের মন্তব্য তাই । ইলিশ আর চিংড়ি দুইয়ের সাথেই আমার বড় দোস্তি ।
বাঙালদের সেই চিতলামাছের মুইঠ্যা একবগ্গা মাছের এক্সোটিক ডিশ ফর গ্যাস্ট্রোনমিক তৃপ্তি । আর আছে কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বেগুণ দিয়া বাদলা দিলে কাদলা মাছের পাদলা ঝোল। ঘটির হল জিরে-মরিচ-ধনে বাটা দিয়ে আলু-পটল-ফুলকপি দিয়ে কাটাপোনার ঝোল, হিং,আদাবাটা, টামেটো আর ডুমোডুমো আলু দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি পোনার কালিয়া ? আমাশা রোগীর জন্য সেই ঝোলে একটুকরো কাঁচকলা ফেলে দিলেও মন্দ নয়। এই শিলে বাটা জিরে-ধনে-গোলমরিচের যে কত গুণ তা আয়ুর্বেদ পড়লে জানা যায়।
এক টুসকী কাগজী লেবুর রস দিয়ে এই পাতলা ঝোল যেন গ্রীষ্মেবর্ষায় অমৃত। বাটির ঝোলে আবার বাকী লেবুটুকুনি নিংড়ে স্যুপের মত খেলেও পুষ্টি। এত রিফ্রেশিং এই ঝোল ভাত যে খেলেই মনে হয় পুকুরে ডুব দেবার অনুভূতি। তবে মা বলতেন ঝোলের মাছ যেন খুব টাটকা হয়। আর সবজীগুলো ভেজে নিয়ে জিরে অথবা পাঁচফোড়ন দিয়ে ভাজা মাছ, সবজী সেদ্ধ হবার পর নামানোর ঠিক আগে দেবে ঐ জিরে-ধনে-গোলমরিচ বাটা। তবেই হবে ঝোলের আসল স্বাদ। মশলার গুণও বজায় থাকবে।
 এছাড়া এই একেঘেয়ে রুই কাতলার বাঙালী ঘরোয়া পার্টিতে আরো অনেকভাবে ধরা দেয়। মাছ সেদ্ধ করে মাছের কাঁটা বেছে নিয়ে চপের মত পুর বানিয়ে ফিশ ক্রোকে, মাছের কচুরী, মাছের চপ,  টাটকা রুই- কাতলার পেটি দিয়ে দৈ-মাছ, কোর্মা, মাছের পোলাও, আরো কত বলব ! ঘটি হেঁশেলে শুঁটকি ফুটকির নো এন্ট্রি !  তাই বেশীরভাগ ঘটিবাড়িতেই রুই-কাতলা-ভেটকি-পার্শ্বে, চিংড়ি, ইলিশ, ক‌ই, ট্যাংরা আর মৌরলা নিয়ে মজে থাকতে হয় বারোমাস। 

আমার দিদিমা খাস উত্তর কলকাতার কুটিঘাটের ব্যানার্জি পরিবারের মেয়ে। বয়স মাত্র এগারো। ঐটুকুনি মেয়ে বিয়ের কি বোঝে! সে আবিষ্কার করতে শুরু করেছিল গ্রাম্য পরিবেশের মাধুর্য্য। গাছের ফলপাকড়, টাটকা শাকসব্জী, নদী-পুকুর থেকে মাছ ধরে আনা সেই বিবাহিতা কিশোরীর কাছে যেন বিস্ময় তখন। শ্বশুরবাড়িতে  দুপুর হলেই পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা ছিল তার কাছে এক আশ্চর্য্যের বিষয়।
দিদিমার মুখে গল্প শুনেছি শাশুড়ি, ননদ ভাজের মধুর সম্পর্কের কথা।  নতুন বৌ হয়ে তিনি  শ্বশুরবাড়ি যাবার পর তাঁকে এত যত্ন তাঁরা করেছিল যে তিনি মারা যাবার শেষদিন বধি বলে গেছেন সে কথা। দিদা ছিল বাড়ির মেজবৌ। ননদরা নদী থেকে সদ্য ধরা ট্যাংরামাছ ভাজা আর তেল দিয়ে একথালা ভাত দিয়ে নতুন বৌকে বসিয়ে আদর করে খেতে দিয়েছিল। নদীর টাটকা মাছ আর অমন যত্ন দিদার মাও বুঝি করেনি তাকে..তিনি বলতেন।
অনেকেই এই ট্যাংরামাছ পিঁয়াজ দিয়ে খান তবে আমাদের ঘটিবাড়িতে রাঁধবার ধরণটা সম্পূর্ণ আলাদা। মাছ ভাল করে ভেজে নিয়ে সরষের তেলে পাঁচফোড়ন দিয়ে টমেটো কুচি, কাঁচালঙ্কা, কড়াইশুঁটি আর সর্ষে-শুকনো লঙ্কাবাটা দিতেন মা। মাছ সেদ্ধ হলে বেশ গায়ে মাখামাখা এই ট্যাংরার ঝালে এবার সর্ষের তেল ছড়িয়ে  গরগরে করে নামিয়ে যে পাত্রে রাখবে তার মধ্যে ছড়াও একটু গরমমশলা। ব্যাস! দিদিমার হাতে এই রান্নার স্বাদ আর কোথাও পাইনি। শীতকালে গরমমশলার বদলে ধনেপাতা কুচিয়েও দেওয়া যায় ওপর থেকে। 
মামাবাড়িতে এক প্রকান্ড বাঁধানো পুকুর ছিল। আমার দিদিমার নেশা ছিল লাল শান বাঁধানো পুকুরের ঘাটের সিঁড়িতে বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরা। সেই টাটকা মাছের কাঁচা ঝাল দিয়ে গরম ভাত হত সেদিন রাতের আহার। মায়েরা তাদের ছোটবেলায় ঐ পুকুরে গরমের ছুটিতে সব তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে চানে নামত। প্রত্যেকের লাল গামছা পুকুরের জলে ফেলে ছোট ছোট চিংড়িমাছ ধরত। এবার চান সেরে যে যার মত বাগানের কোনে কাঠকুটো জ্বেলে ছোট কলাইয়ের বাটিতে সেই মুঠোমুঠো  জ্যান্ত চিংড়িমাছ, ঝিরিঝিরি  আলুর কুচি, কাঁচা সর্ষের তেল, নুন, হলুদ আর চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে বসিয়ে দিত। বাটিতে হয় বলে এর নাম বাটিচচ্চড়ি। পংক্তিভোজে দুপুরের খাবার সময় যে যার নিজের বাটি নিয়ে বসে পড়তে মাটিতে। বাড়ির বড়রা তা দেখে তাজ্জব হয়ে যেতেন। এখনো বাটিচচ্চড়ি রাঁধি তবে জ্যান্ত মাছ আর পাই ক‌ই? 
দাদামশাই এই বাটিচচ্চড়ি খেতেন আর বলতেন, তোমাদের কোফতা কালিয়া চুলোয় যাক্‌! আজ এটা আর খাবনা, খেলেই তো ফুরিয়ে যাবে। বরং বাটিটা মাথার বালিশের পাশে নিয়ে শুই। কত সম্মান ছিল এই বাটিচচ্চড়ির মত সাধারণ পদটির। 
রবিঠাকুরের প্রিয় খাবারের তালিকায় ছিল পান্তাভাত আর চিংড়িমাছ ভাজা। তাঁর লেখা কবিতাতেও প্রচুর পাই এমন চিংড়ির কথা। 

তিমি ওঠে গাঁ গাঁ করে
চিঁ চিঁ করে চিংড়ি
ইলিস বেহাগ ভাঁজে
যেন মধু নিংড়ি।
অথবা 
মাছ এল সব কাৎলাপাড়া, খয়রাহাটি ঝেঁটিয়ে ,
মোটা মোটা চিংড়ি ওঠে পাঁকের তলা ঘেঁটিয়ে ।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে সহজপাঠ দ্বিতীয় ভাগের সেই কথা...
"কাংলা, তোর ঝুড়িতে কী? ঝুড়িতে আছে পালং শাক, পিড়িং শাক, ট্যাংরা মাছ, চিংড়ি মাছ। সংসারবাবুর মা চেয়েছেন'

সে ছিল অনুঃস্বরের অধ্যায়। চিংড়ি আমাদের নিজের হাতে বেছে খেতে দেওয়া হতনা। কারণ সহজপাঠ পড়ুয়াদের পেটখারাপ হবে তাই।  
আজকাল হোটেলে ডাবচিংড়ি নামে একটি মাগ্যির ডিশ সার্ভ করা হয়। মামারবাড়িতে ডাব দিয়ে নয়। নারকোলের শাঁসসুদ্ধ দুটি মালার মধ্যে বাগদাচিংড়ি সর্ষে-পোস্ত-কাঁচালঙ্কা বাটা দিয়ে মেখে, কাঁচা সর্ষের তেল, হলুদ, লঙ্কা, নুন দিয়ে নারকোলের মালায় রেখে এবার নারকোলটিকে বন্ধ করে সেই ফাটা অংশে ময়দার পুলটিশ লাগিয়ে মরা উনুনের আঁচে ঐ নারকোলটি রেখে দেওয়া হত ছাইয়ের ভেতরে । ঘন্টা দুই পরে তাক লাগানো স্বাদ ও গন্ধে ভরপুর ভাপা চিংড়ি নাকি খুঁড়লেই বেরিয়ে আসত নারকোলের শাঁসের সঙ্গে। চিংড়ির মালাইকারীও এভাবে রাঁধা হয়েছে বহুবার। সেখানে সর্ষের বদলে পিঁয়াজ, আদা-রসুন গরমমশলা বাটা আর তেলের বদলে ঘি দেওয়া হত। পোলাও সহযোগে এই মালাইকারী জমে যেত। 
চিংড়ি মাছের কথা উঠলেই মনে পড়ে যায় আমার এক মামার কথা। উনি খুব রগুড়ে ছিলেন। ওনাদের সময় কত্তবড় চিংড়ি খেয়েছিলেন তা বোঝানোর জন্য উনি একবার বলেছিলেন" জানিস? এ আর কি চিংড়ি? এ তো লবস্টার কো বাবালোগ। আমরা যে চিংড়ি খেয়েছি তার খোলাগুলো ডাস্টবিনে পড়ে থাকলে তার মধ্যে দিয়ে কুকুরের বাচ্ছা ঢুকতো আর বেরুত।"  
চিংড়ি আর কাঁকড়া মাছ নয় বলে আর সম্পূর্ণ অন্যজাতের সজীব বলে বুঝি ওদের এত স্বাদ। আঁশটে ব্যাপরটা নেই । আছে এক অন্য রসায়ন। সংস্কৃত শ্লোকে পর্যন্ত চিংড়ি নিয়ে ঠাট্টা পড়েছিলাম কল্যাণী দত্তের "থোড় বড়ি খাড়া' য়। 

গলদাং বাগদাং রস্যাং নারিকেল সমণ্বিতাম্‌
অলাবু লোভানাং কৃত্বা তক্ষিতব্যং শুভে যোগে।। 

অর্থটি খুব সহজ। নারকেল অথবা লাউয়ের সঙ্গে চিংড়ির কেমিস্ট্রিটা সবচেয়ে ভাল জমে যে কোনও শুভযোগে।

ঘটির হেঁশেলে সবকিছুতে চিংড়ি। রোজকার পদে একটি কুচো বা ঘুষো, চাবড়া (ধানক্ষেতের জলে হয়)   কিম্বা বাগদার পদ থাকবেই। সেটি হল সাইড ডিশ। বড় চিংড়ি দিয়ে মোচা, এঁচোড় কিম্বা ফুলকপি দিয়ে ডালনা হল রাজভোগ্য। সবকিছুর রেসিপিতেই সবজী ভেজে নিয়ে আদাবাটা, টমেটো, লঙ্কা দিয়ে গরগরে কালিয়া আর নামানোর আগে মোক্ষম অস্ত্র ঘি আর গরমমশলার কম্বিনেশান।   
আমার ঠাকুমার হাতের আরেকটি বিশেষ পদ হল চিংড়ি দিয়ে পটলপোস্ত। শুধু পাঁচফোড়নের মহিমা আর লঙ্কাবাটার প্রশ্রয়ে পোস্তর সাথে ভেজে নেওয়া কুচোনো পটল, আলু আর নামানোর সময় কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে শুকনো ভাতে মেখে খাও।  
 চিংড়ির পরেই মনে পড়ে কাঁকড়ার কথা। কেউ বলে দশরথ। সকালবেলায় এর নাম নিলে নাকি দিন খারাপ যাবে,  যত্তসব কুসংস্কার বাঙালীর।  অথচ তার স্বাদ নেয়নি  এমন বাঙালীর সংখ্যা বিরল। 
রসিক রবির গল্পে  পাকড়াশীদের কাঁকড়াডোবা অথবা ডিমভরা কাঁকড়ার কথায় মনে পড়ে মেয়ে কাঁকড়ায় ডিম হয় বলে ছেলে কাঁকড়া কিনলে নাকি মাস বেশী পাওয়া যায়। যাদের এলার্জি তারা এ স্বাদের ভাগ পাবেনা। দাঁড়াগুলো ভেঙে নিয়ে চুষে রস বের করতে ছোটবেলায় আমাদের সারাটা দুপুর কাবার হত। হাতের এঁটো শুকিয়ে যেত। ভাত শেষ হয়ে যেত। কাঁকড়ার এমনি মোহ। কেউ রাঁধে পিঁয়াজ-রসুন-আদা দিয়ে রসা। তার এক স্বাদ। তবে সর্ষে কাঁকড়ার ঝাল অন্যরকম। কাঁকড়ার গন্ধটা পুরো পাওয়া যায়। আর তার পা গুলো দিয়ে পুঁইশাক চচ্চড়ির স্বাদ অনবদ্য।
বৈষ্ণবরা নাকি এ রসে বঞ্চিত তাই ঠাট্টা করে ট্রেনে এক বৈষ্ণবের পাশে বসে একজন শৈব গেয়েছিলেন
"বোষ্টম টমটম, হাঁড়ির ভেতর কাঁকড়া রেখে যায় বৃন্দাবন' 
মানে শৈব গায়ক বোঝালেন, বোষ্টমরা চুপিচুপি সব‌ই খায় তাদের যত্তসব হিপোক্রেসি। 
আমরা বলি কাঁকড়া অযাত্রা অথচ সংস্কৃতের পঞ্চতন্ত্রের গল্পে রয়েছে এই কাঁকড়াই নাকি সাপকে মেরে এক বণিকের পুত্রের জীবন বাঁচিয়েছিল । 
বিদেশের ট্রাউটের সমগোত্রীয় হল আমাদের ভেটকী। ভেটকীর ফ্রাই বা ব্যাটারে ডুবিয়ে ফিশ ওরলি নেমন্তন্ন বাড়ির মোষ্ট ফেবারিট।  ফিশ ফিঙ্গার হল কেতাদুরস্ত ককটেল স্ন্যাক। দুধসাদা টার্টার সসে একটি একটি করে ডুবিয়ে মুখের মধ্যে পুরে আলতো চাপ দিলে আদা-রসুন সমন্বয়ে ভেটকিফিলের এই  স্লিম আঙুল তখন ফুলে উঠেছে ডিম আর বেডক্রাম্বের কোটিঙয়ে ।  কিন্তু ভেটকীর সর্ষেবাটা ও আদা দিয়ে ঝাল অথবা শীতের মরশুমী ফুলকপি দিয়ে কালিয়া কিম্বা কাঁটাচচ্চড়ি হল আটপৌরে বাঙালীর আভিজাত্যপূর্ণ সাবেকী ডিশ। এখন কলাপাতায় মুড়ে ভেটকীর ফিলে দিয়ে পাতুড়ির খুব চল। আমি এই রেসিপিকে একটু মডিফাই করেছি। কলাপাতার বদলে পুঁইশাকের পাতায় কিম্বা লাউপাতায় মুড়ে ননস্টিকে এই পাতুড়ি করলে পাতার মধ্যে লেগে থাকা তেলমশলা সমেত এই পাতুড়িটা ভাতে মেখে খেয়ে ফেলা যায়।
ঘটিবাড়ির আরেকটি প্রধান মাছের রান্না হল মৌরলার টক। তেঁতুল অথবা আমের টক করে নিয়ে তার মধ্যে মুচমুচে করে ভাজা মৌরলা ভেসে থাকবে। আর সরষে ফোড়নের সঙ্গে তার রসায়নে যে রসনা সৃষ্টি হবে তা যেকোনো ঋতুতেই শেষপাতে দৌড়বে। অরুচির রুচি আনবে। এই মৌরলা মাছ শানের মেঝেতে রেখে একপ্রকার ডলে নিতেন মা। তার ন্যানো সাইজের আঁশগুলো বেরিয়ে যাবে আর পেটটা ধরে আলতো করে চাপ দিলে পিত্তিটা বেরিয়ে যাবে।  পিত্তিসমেত রান্না করলে দশসের দুধে একফোঁটা গো-চোনার সামিল হবে সেই তেতো পদটি।
এবার আসি বাঙ্গালীর আদরের রূপোলী সজীব শস্যে।  ঝিরঝির করে অবিরাম ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেই থাকবে আর ঠিক তখনি ঝাঁকেঝাঁকে গভীর জলের এই ইলিশমাছ সমুদ্রের নোনা জল সাঁতরে, জোয়ারের আনুকূল্যে  স্বল্প পরিশ্রমে,  নদীর কাছে আসবে, আমাদের ধরা দিতে। বলবে, বাঙ্গালী, তোমার জলকে নেমেছি।
ছোটবেলায় সবচেয়ে মজা ছিল রেনিডেতে  হঠাত ইলিশের গন্ধটা। হঠাত ছুটির সাথে বৃষ্টি আর হঠাত পাওয়া ইলিশের অনুষঙ্গে মন কানায় কানায় !
মায়ের সারপ্রাইজ। উনুনের পিঠে হাঁড়ির মধ্যে গরম ভাত আর তার মুখে চাপা দেওয়া একটা টিফিনকৌটোর মধ্যে বন্দী ইলিশমাছের ভাতে বা ভাপা । হলুদ পড়বেনা এই পদে।টাটকা মাছের গন্ধ নষ্ট হয়ে যাবে।  কৌটোর মধ্যেই নুন মাখানো ইলিশের গাদা-পেটি সর্ষে, কাঁচালঙ্কা বাটা, কাঁচা সর্ষের তেল আর বেশ কয়েকটি চেরা কাঁচালঙ্কার সাথে জারিয়ে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে মিনিট দুয়েক রেখে দিলেই এই অমূল্য পদ তৈরী।  আমার রন্ধন পটিয়সী দিদিমা তার বিশাল সংসারে বিরাট এক হাঁড়ির মুখে বিশাল এক কচুপাতার মধ্যে মাছগুলিকে ম্যারিনেট করে পাতাটি সুতো দিয়ে বেঁধে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে রাখতেন। মা বলত, সে ভাপা ইলিশের নাকি অন্য স্বাদ। দিদিমার নাতনী মানে এহেন আমি একটু ইম্প্রোভাইজ করে এই কায়দাটি করি লাউপাতায় মুড়ে এবং ননস্টিক প্যানে অর্থাত পাতুড়ির স্টাইলে। যাই করো এ কানুর তুলনা নেই। কাঁচা তেলঝাল, ভেজে ফোড়ন দিয়ে ঝাল, গায়ে মাখামাখা হলুদ সর্ষেবাটার ঝাল, বেগুন দিয়ে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বাঙালদেশের পাতলা ঝোল...সব‌ই যেন এই বর্ষায় দৌড়তে থাকে গরম ভাতের সঙ্গে। 
তাবে আমি বাপু রসুন-পেঁয়াজ-আদা সহযোগে ইলিশমাছের স্বাদ ও গন্ধ কোনোটাই পাইনা। এমনকি কাঁটা বেছে খেতে যারা ভয় পায় তাদের স্মোকড হিলসা অথবা ইলিশ বিরিয়ানীর স্বাদেও আমি বঞ্চিত কারণ সেক্ষেত্রে যেন মনে হয় মাছটাই নষ্ট হল। 
ইলিশমাছের কিছুই যায়না ফেলা। মাথা আর তেল দিয়ে ছ্যাঁচড়াও আমাদের ঘটি হেঁশেলের একটি অভিনব বর্ষার পদ। সাদাভাত অথবা খিচুড়ি দিয়ে জমে যায় এই চচ্চড়ি। সর্ষের তেলে মুচমুচে করে মাথা ভেজে নিয়ে ঐ তেলের মধ্যেই পাঁচফোড়ন আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে দুনিয়ার সবজী অর্থাত আলু, মূলো, কুমড়ো, ঝিঙে বেশ করে নেড়ে নিয়ে পুঁইশাক ডাঁটা ও পাতা দিয়ে ঢেকে দাও। নুন, হলুদ ছড়িয়ে দাও। কুচোনো থোড়, বাঁধাকপিও দিতে পারো সাথে। তারপর নুন, হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো, চিনি আর নামানোর আগে সর্ষেবাটা দিয়ে নাড়তে থাকবে। এটাই হল সফল ছ্যাঁচড়া টেষ্টি হবার উপায়। মা বলতেন, যতক্ষণ না অবধি কড়ায় "লাগা লাগা' অর্থাত একটু পোড়া পোড়া হবে ততক্ষণ রাখতে হবে আঁচে। সিল্ক পিওর কিনা পরখ করতে গিয়ে দাদু বলতেন, শাড়ির কোল আঁচল থেকে একগাছি সুতো পুড়িয়ে যদি "ছ্যাঁচড়া পোড়া' অর্থাত একটা মেছো অথচ পোড়া গন্ধ পাওয়া যায় তবেই সেটি আসল সিল্ক। তার মানে বুঝেছিলাম ছ্যাঁচড়া কড়ায় একটু লেগে গেলে তবেই হবে অথেন্টিক।আর যেহেতু পিওর সিল্ক হল ফাইব্রাস প্রোটিন জাতীয় তা পোড়ালে ঐ গন্ধ পাওয়াটা কিছু অস্বাভিক নয়। 
ঘটি হেঁশেলে রুই বা কাতলার মুড়ো দিয়ে সোনামুগ ডাল ভেজে নিয়ে করা হয় মুড়িঘন্ট বা মাছের মাথা দিয়ে ডাল। এ এক উপাদেয় যজ্ঞ্যিবাড়ির পদ। বাঙালবাড়িতে এটাই রাঁধা হয় সুগন্ধী আতপচাল দিয়ে। বাকীটুকু এক‌ই রকম। শুরুতে মাথা ভেজে নিয়ে পিঁয়াজ, রসুন আদা, টমেটো কষে ওরা দেয় সেদ্ধ করা ভাত আর আমরা তার মধ্যে দি সেদ্ধ করা সোনামুগ ডাল। তারপর ঘি, গরমমশলার ছোঁয়া আর চিনির স্পর্শে তা যেন হয়ে ওঠে অমৃত ডাল। একঘেয়ে ডালের থেকে ধোঁয়া ওঠা এই ডাল বরং ক্ষুধার উদ্রেক করে। আর মাছের মুড়োয় যেন অল্প মাছ থাকে আর ডাল ফোটার সময়  মুড়ো একটু ভেঙে দিতে হয়। হলুদ সোনামুগ ডালের মধ্যে চেরা সবুজ কাঁচালঙ্কার অনুষঙ্গে এই ডাল শুধু ডাল নয় বরং একটি সম্পূর্ণ পদ। 
মনে পড়ে কোনও এক পৈতেবাড়ি আর সাধভক্ষণের দ্বিপ্রাহরিক নিমন্ত্রণে এই ডাল দিয়ে তপসে মাছের ফ্রাই খেয়েছিলাম।  অতুলনীয়  সেই যুগলবন্দী। এই তপসে মাছ সন্ন্যাসীর মত শ্বশ্রুগুম্ফ যুক্ত আর তপস্বীর মত গেরুয়া পোষাক পরিহিত অর্থাত তার ল্যাজা মুড়ো, পাখনা, দেহের রং সবেতেই গেরুয়া রঙের ছোঁয়া। এ মাছের ভাজা বানানো অতীব সহজ। আমার শাশুড়িমা বাড়িতে এনে মাথার কাঁটা দিয়ে এর পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুঁড়ি, পিত্তি টেনে বের করতেন। কারণ কেটে ফেললে মাছ ভাজতে গিয়ে ভেঙে যাবে তাই। তারপর ড্রেশ করা সেই মাছ রগড়ে নিয়ে আঁশ বের হয়ে গেলে, ধুয়ে এক টুসকী পাতিলেবুর রস, নুন আর সামন্য হলুদ দিয়ে জারিত করতেন।  কিছু পরে এর মধ্যেই আদা-রসুন কাঁচালঙ্কা বাটা নরম হাতে মাখিয়ে দিতেন । পড়ে থাক তেমনি করে অন্ততঃপক্ষে ঘন্টাখানেক। ওদিকে ব্যাটার তৈরী হল দুরকমের বেসন (ছোলা ও মটরের), ঠান্ডা জল,  নুন, হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো, পোস্তদানা আর কালোজিরে দিয়ে। এবার ব্যাটারটি হবে নাতি পাতলা নাতি ঘন অর্থাত মাঝামাঝি। এবার সে মিশ্রণ ফ্রিজে রাখতে হবে। তারপর খাবার সময় কড়াইতে সর্ষের তেল গনগনে করে গরম করে ঐ মিশ্রণে চালের গুঁড়ো ছড়িয়ে একটি একটি করে মাছের গায়ে অতি সন্তর্পণে কোটিং করে ভাজতে হবে আঁচ কমিয়ে বাড়িয়ে। ছোট সাইজের গুর্জাওলি মাছও এমন করে ফ্রাই করলে মন্দ লাগেনা খেতে। 
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে এই অনুপম তপসে মাছের কথা। 

তপ্ত তপ্ত তপসে মাছ, গরম গরম লুচি,
অজামাংস ভাজাকপি আলু কুচি কুচি।
শীতের দিনে খাবে যদি তুলে থাবা থাবা
দশ নম্বর পদ্মপুকুর দৌড়ে এস বাবা। 

আরেকটি সামুদ্রিক মাছ হল ফ্যাঁশা। ইলিশের মত রূপোলী, ঝকঝকে দেখতে। দামও বেশ কম। নদীর ফ্যাঁশার স্বাদ সমুদ্রের চেয়ে ঢের ভাল। সমুদ্রের গুলো হয় বড় আর নদীর গুলো হয় অপেক্ষাকৃত ছোট। এই ফ্যাঁশামাছ ডালের সাথে প্রথম পাতে মুচমুচে ভাজা আর বড়ি আর সর্ষেবাটা দিয়ে গায়ে মাখা ঝাল ঘটিদের আরেকটি প্রিয় পদ। 
 
মাছভাজার কথা বললেই মনে পড়ে যায় অরুচির রুচিকারক ঘুষোচিংড়ির বড়ার কথা। এর দোষ একটাই বড্ড তেল লাগে ভাজার সময়। তবে যারা এই ঘুষোচিংড়ির বড়া খায়নি তারা একবার খেলে আর ভুলতে পারবেনা। অনেকের কাছেই এ হল সস্তার মাছ, গরীবের খাবার অথবা খেলে "পেটের অসুখ করবে' টাইপ। কিন্তু ভাল করে ধুয়ে বেছে নুন, হলুদ, পোস্তদানা, কাঁচালঙ্কা কুচি আর বেসন ছড়িয়ে এই বড়া ডালের সাথে অথবা অম্বলে ফেলে খেতে বড়ো ভাল লাগে। 
ঘুষোচিংড়ির কথাতে মনে পড়ে কবি ঈশ্বর গুপ্তকে।

"দীনের তারণকারী চিংড়ির ঘুষো
সুমধুর বাতহর পয়সায় দুশো'


আজকের সফিষ্টিকেটেড মডিউলার কিচেনে মাছকাটা কিম্বা আঁশবটি ব্রাত্য কারণ স্থানাভাব। কিন্তু বাবা বলতেন পরিপাটি করে মাছকে কেটে সাজিয়ে রান্নার উপযুক্ত করে তোলাটাও হল এক শিল্প। তাইতে মনে হয় তখনকার দিনে মেয়েরা  বেশীর ভাগ বাড়িতেই আটকে থাকতেন। কর্তামশাই বাজার থেকে মাছ এনে দিলে তবে তিনি সেই কর্তণ পারিপাট্য দেখাবেন। কারণ যে রাঁধে সে মাছও কাটে। আর কথাতেই বলে মাছ ধুলে মিঠে, মাংস ধুলে রিঠে। তাই তেল, পোঁটা, আঁশ ফেলে কাটা মাছ ভালো করে ধুলে তবেই তা হবে সুস্বাদু। বাড়ির গিন্নীরাই সেই কাজটি করতেন সে যুগে।  এসব আজকের বদলে যাওয়া গতিশীল দুনিয়ায় স্বপ্ন। বিশ্বায়নের যুগে  হংকং থেকে হনললু, টরোন্টো থেকে টেক্সাস কিম্বা লন্ডন থেকে লাসভেগাস সর্বত্র মাছ কিচেনে প্রবেশ করে বরফের সমাধি থেকে। কখনো বা ক্যানবন্দী হয়ে। এমনকি আমাদের ভারতেও ডিপারটমেন্টাল স্টোরসের দুর্গন্ধময় ফিশকর্ণার থেকে কেটেকুটে সোজা প্রবিষ্ট হয় বাড়ির ফ্রিজে। রান্নার মাসী তাকে কিভাবে ধুয়েছে তা দেখবার সময় নেই বাড়ির ব্যস্ত গৃহিণীর। এখনকার চালানীর মাছে শুনছি আধিক্য রয়েছে পর্যাপ্ত কীটনাশক অথবা মাছকে বহুদিন তাজা রাখবার রাসায়নিক। তাই বারেবারে ধোয়াটাও খুব জরুরী। তার চেয়ে মনে হয় বাজার থেকে জিওল মাছ খাওয়া অনেক বেশী পুষ্টিকর। আর অল্পসংখ্যক চুনোচানা মাছ নিয়ে যারা বাজারে বসে সেগুলি বোধহয় স্বাস্থ্যকর । এদের মাছের স্বাদও ভাল আর রিস্কফ্যাক্টরও কম।

শিলাদিত্য ডিসেম্বর সংখ্যা ২০১৬