২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

আনন্দনাড়ু পর্ব



কেমন যেন স্বপ্নের মত একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম কয়েকটা সপ্তাহ। এখনো মনে হচ্ছে ঘোর কাটেনি। ওরা এল, দেখল, জয় করল আবার ফিরে চলেও গেল। শাশুড়ি নামক এহেন ভিনগ্রহের জীবটির কি বিশেষত্ব থাকে, তার পদোন্নতিতে কি পরিবর্তন হয় এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি কখনো। এখন খুব সন্তর্পণে ভাবতে বসেছি এতসব। আয়নার সামনে নিজেকে দেখছি আর ভাবছি হস্ত-পদ-স্কন্দ-মাথা যথাস্থানে আছে কিনা। আমার কি ইস্পেশ্যাল গ্রুমিং দরকার? অথবা লেসেন নিতে হবে ভেটারান কোনো শ্বশ্রূমাতার কাছ থেকে? তা যাইহোক আমার মতন এহেন শ্বশ্রূমাতার শারীরিক ধকলটি ছিল বেশ ঘটনাবহুল এবং উত্তেজনাপূর্ণ। শুরুরদিনেই ছাদে প্যান্ডেল বাঁধতে এসে  ডেকরেটারের লোকজন দিল খানকয়েক ফুলের টব ভেঙ্গে। তারপর আদ্যোপান্ত ছাদটাকে মুড়ে ফেলে রং মিলিয়ে কাপড় সেলাই করে চলে যাচ্ছে। আমার ঘরমোছার মেয়ে চেঁচিয়ে বলল, আমার ন্যাতা-বালতি?
ডেকরেটরের লোকটা বললে "কাপড়টা একটু তুলুন, ওখানেই আছে'
ব্যাস! বিয়েবাড়িতে হাসির রোল। বাড়ি ভর্তি লোক জন  সকলে হেসে খুন।

তারপর রোজ সকালে দুধ চা না লাল চা? এই কটা দিন দুধ-চিনির ফতোয়া জারি ছিল না। অতএব চালাও পানসি দুধ চা।  শাশুড়ি হবার আগে একটু শক্তি সঞ্চয় প্রয়োজন কিনা। তারপর একটু ফাটা গোড়ালি, ফ্রুট ফেসিয়াল, এক্সট্রা সাইন হেয়ার ট্রিটমেন্ট। সবটাই ঘরোয়া যদিও। বিউটি স্যালোঁ আমার পোষাতা নেহি হ্যায়।   শীতের সকাল। ছোট দিন। পরাণ আঁটুপাটু।



হঠাত আমার মায়ের চীত্কার। ওরে কাল আনন্দনাড়ুর বাজার ? বললাম, সব রেডি আছে। ঘটিবাড়ির আরেক রীতি। শুভকাজে আনন্দনাড়ু বানানো। সে এক যজ্ঞ। আত্মীয় স্বজন মুখিয়ে থাকেন সেই নাড়ুর জন্য। সত্যনারায়ণের শিরণির মত মাপ তার। যত প্রিসিশন তত সুস্বাদু হবে সেই নাড়ু। আমার মায়ের মাপ মুখস্থ। সেইমত বাজার করেছি। সে এক যজ্ঞ আমাদের। বিয়ের আগের দিন বিশাল পরাতে নারকোল কোরা হল। চারটে বড় বড় নারকোলের জন্য  এক কিলো আটশো আতপচালের মিহি গুঁড়ো, আটশো গ্রাম সাদা তিল আর দেড়কিলো শুকনো আখের গুড় এর জোগাড় হল। আর ভাজার জন্য সরিষার তেল। এবার আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি, মাখিব নাড়ু সবে ভাজিব তায়। প্রথমে নারকোলের ওপর চালের গুঁড়ো আর গুড় দিয়ে ঠাসা। ভাগে ভাগে পেতলের গামলায় এক একটি অংশ নিয়ে ঠাসল বাড়ির মেয়েরা, বৌয়েরা। তারপর তিল ছড়িয়ে আবার ঠাসো। মোলায়েম করে, মসৃণ করে। এবার পাকানোর পালা। ঘন্টা তিনেক কাবার এই ঠাসাঠাসিতে। বিশাল গ্যাস আভেনে বিশাল পিতলের কড়াই। সরষের তেলে ধোঁয়া উঠতেই প্রথম খোলায় একুশটা নাড়ু আমাকে মানে পাত্রের মা'কে ভেজে তুলে রাখতে হবে মাটির হাঁড়িতে। এর নাম শ্যামের হাঁড়ি। বিয়ে মিটলে নারায়ণের পুজোয় এই নাড়ু নিবেদন করতে হবে। এই একুশটি নাড়ুর অদ্ভূত সব আকার প্রকার। আমাকেই গড়তে হল। জ্যামিতিক আকৃতি। কোনটা গোলক, কোনটা চৌকো, কোনটা ত্রিকোণ,কোনটা তারা, কোনটা আবার চোঙাকৃতি। গনগনে আঁচে গরম তেলে নাড়ু ভাজা শুরু হল। শাঁখ বাজল।  সেইসঙ্গে ছিল অঘ্রাণের কালো মেঘ করা আকাশের অন্তহীন বৃষ্টি। মা বললেন এ হল আশীর্বাদ। নাড়ুভাজার সময় বৃষ্টি নাকি আনন্দের বার্তা বহন করে।।

১৭ নভেম্বর, ২০১৭

ঘুম গেছিলাম গত দীপাবলিতে। প্রত্যন্ত চা বাগান তামসাং  টি-রিট্রিটের বাঙালি ম্যানেজার এই ধানী লঙ্কার দানা দিয়েছিলেন। এদ্দিনে সেই লঙ্কা আমার যত্নে। প্রথমে গাছের তেজ দেখে মালুম হয়নি।  এখন বুঝছি ভরা পোয়াতির কি তেজ! বিয়োতে না বিয়োতেই দাপট! দিদা বলত, " যেমন তেমন মেয়ে বিয়োব, বয়েস কালে তেজ দেখাব"

 প্রচন্ড ঝাল আর ঝাঁজ এই লঙ্কায়।তবে একে ধানী বলেনা পরে জেনেছি।  ঠিক বাঙালী মেয়ের মত। রূপে না গুণে ভোলায়, মিছরির ছুরিতে নয় শুধুই গন্ধে, ঝালের মাত্রা ছাড়িয়ে কাজ সারে।
বেশী ফলে না। জৈব সারের মাহাত্ম্য। গোবর,  খোল ভেজানো জল, মাছ ধোয়া জল আর বাকীটা অমিতাভ বচ্চনের অমৃত বচন যারর নাম বিজ্ঞাপন।  অল্প খাব, প্রতি রান্নাপিছু একটি লঙ্কাতেই মাত। অরগ্যানিক লঙ্কা বলে কথা। দুষ্প্রাপ্য।

১৪ নভেম্বর, ২০১৭

নবান্নে হেমন্ত লক্ষ্মী আর কুলুই চণ্ডী কি এক?


এইসময় ১৩ই নভেম্বর ২০১৭
বর্ধমান কে বলে Granary of Bengal অর্থাত বংলার শস্যভান্ডার। অঘ্রাণে ধানকাটা আর মাড়াই শেষ।চাষীর উঠোন ভরে গেছে সোনার ফসলে। নতুন ধানের গন্ধে ম ম করা গ্রাম। মৌসুমীর আনুকুল্যে বাম্পার ফলন। কৃষক পরিবারে আনন্দের বন্যা। আর তাই আমন ধান ওঠার সময় এখানে নবান্ন উত্সব বা হেমন্ত লক্ষ্মীর আরাধনায় মহাধূম। 
গ্রামবাসীরা খেতের সদ্য ওঠা নতুন আতপ চাল, এক টুকুরো সোনা, একটুকুরো রুপো, একটি ধাতব রেকাবির মধ্যে রেখে লক্ষ্মীকে নিবেদন করেন আর বলেন

“নতুন বাঁধি, পুরনো খাই, তাই খেতে খেতে যেন জন্ম যাই
নতুন বস্ত্র পুরনো অন্ন, তাই খাই যেন জন্ম জন্ম”

উৎসবমুখর বাঙালীর প্রিয় পার্বণ এই নবান্ন। নতুন অন্নের এই উৎসবে মেতে ওঠার আরেক অর্থ হল মা লক্ষ্মীর প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন।
বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলার মন্দিরে সর্বকালের ঐতিহ্য পরম্পরা মেনে অনুষ্ঠিত হয় নবান্ন উৎসব। দেবী দুর্গার আর এক রূপ অন্নপূর্ণা।তাই এখানে মা  অন্নপূর্ণাকে নতুন অন্নের রাজকীয় ভোগ নিবেদন করে তবেই ভক্তরা নতুন অন্ন গ্রহন করেন। কেউ আবার তাদের আরাধ্য দেবদেবী, পিতৃ পুরুষ কে নিবেদন করে তবেই নতুন অন্ন গ্রহণ করেন।
আরেকটি লৌকিক প্রথা হল কাক কে নতুন চালের খদ্যদ্রব্য নিবেদন করা। যাতে কাকের মাধ্যমে সে অন্ন পূর্বপুরুষের নিকট পৌঁছে যায়।এর নাম "কাকবলী' । 
অঘ্রাণের নতুন চাল, মটরশুঁটি, মূলো, কমলালেবু আর খেজুরের গুড়ের পাটালী দিয়ে মা ঠাকুরঘরে "নতুন" দিতেন। দুধের মধ্যে সব নতুন জিনিস দিয়ে পাথরের বাটিতে ঠাকুরকে নিবেদন করা আর কি! আর পুজোর পর সেই প্রসাদের কি অপূর্ব স্বাদ! তখন মনে হত, 
আহা শীতকাল, থাক্‌না আমার ঘরে। বারেবারে ফিরে আসুক নবান্ন, ঠিক এমনি করে । 

অঘ্রাণের শুক্লপক্ষে "বড়িহাত' থাকে বাংলার ঘরে ঘরে ।  নতুন বিউলির ডাল ভিজিয়ে রেখে শীলে বেটে নিয়ে তার মধ্যে চালকুমড়ো কুরে দিয়ে, হিং, মৌরী সব মিশিয়ে  স্না সেরে অঘ্রাণের রোদে পিঠ দিয়ে মেয়েরা বড়ি দেয় । একটি বড় কুলোর ওপরে পাতলা পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে সুচারু হস্তে এই বড়ি হাত অর্থাত বড়ি দেওয়ার রীতি অনেকেরি আছে। ঝোলে খাবার বড় বড়ি, ছোট্ট ছোট্ট ভাজাবড়ি এসব আজকাল স্মৃতি। আমরা দোকান থেকে কিনে খাই। আর ডালের সাথে পরিবেশিত হওয়া এই ভাজাবড়ির অন্যতম অঙ্গ ছিল কালোজিরে আর পোস্ত। কেনা বড়িতে পাইনা তেমন আর। এই বড়িহাতের দিন দুটি বড় বড়ি গড়ে তাদের বুড়ো বুড়ি করা হত। বুড়ি-বড়িটির মাথায় সিঁদুর আর দুজনের মাথাতেই ধানদুব্বো দিয়ে, পাঁচ এয়োস্ত্রীর হাতে পান, কপালে সিঁদুর ছুঁইয়ে, শাঁখ বাজিয়ে তাদের রোদে দেওয়া হত। একে বলে বড়ির বুড়োবুড়ির  বিয়ে দেওয়া।
এছাড়াও অঘ্রাণ মাসের শুক্লপক্ষের মঙ্গলবারে মেয়েরা কুলুই চন্ডীর ব্রত করে । বহুযুগ আগে এক ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণী এই ব্রত করত।তাদের মেয়ে পুজোর যোগাড়  দিত ।এই পুজোয় ঘটে জোড়া কলা রাখার নিয়ম। মেয়ে একবার জোড়াকলাটি লোভ করে খেয়ে নিল । কিছুদিনের মধ্যে তার গর্ভে এল যমজ সন্তান । কুমারী মেয়ের গর্ভধারণে কুলের সম্মান রক্ষার্থে ও লোকলজ্জার ভয়ে তার বাবা মা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল । মেয়েটি বনের মধ্যে কাঠকুটো দিয়ে পাতার ঘর বানিয়ে বাস করতে লাগল । নির্ধারিত সময়ে তার দুই যমজ পুত্র হল । নাম রাখল আকুলি ও সুকুলি । বড় হয়ে তারা নদীর ধারে খেলা করছে মস্ত এক সওদাগর ধনরত্ন বোঝাই নৌকা নিয়ে তাদের সামনে আসতেই আকুলি ও সুকুলি বলল "তোমার নৌকায় কি আছে? আমাদের একটু দেবে? '
সওদাগর বলল "কেবল গাছপালা আছে বাবা, আর কিচ্ছু নেই'
ছেলে দুটি বলল "বেশ, তবে তাই হোক'
সাথে সাথে সওদাগর গিয়ে দেখে নৌকায় সত্যি সত্যি গাছপালা রয়েছে ।
সওদাগর ছেলেদুটির মাথায় হাত রেখে বললে "তোমরা কে বাবা? আমার ঘাট হয়েছে, আমার নৌকার জিনিষ যেমনটি ছিল তেমনটি ঠিক করে দাও বাবা"

আকুলি-সুকুলি বলল "আমরা তো কিছু জানিনা" এই বলে সওদাগরকে তাদের মায়ের কাছে নিয়ে গেল । তার মা  সব শুনে মা মঙ্গলচন্ডীকে সবকথা জানাল ।
মা মঙ্গলচন্ডী  সওদাগরকে  দৈববাণী করে বললেন  "কেন সে তাঁর ব্রতদাসের অপমান করেছে, কেন সে কিছু ভিক্ষা দেয়নি ছেলে দুটিকে' 

সওদাগর তার ভুল বুঝতে পেরে বাড়ি ফিরে মঙ্গলচন্ডীর পুজোর আয়োজন করল ও হারাণো জিনিষ সব ফিরে পেল।

এবার মঙ্গলচন্ডী স্বপ্নাদেশ দিলেন সেই রাজ্যের রাজাকে । বললেন তার দুই মেয়েকে আকুলি আর সুকুলির সাথে বিয়ে দিয়ে তাদের ঘরজামাই করতে । আকুলি-সুকুলি আর তাদের মায়ের বরাত ফিরে গেল ।

ব্রতকথা যদি লোকশিক্ষার অস্ত্র হয় তবে আমি বলব কন্যার অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের জন্য পাশে থাকুক তার বাবা-মা। যে কারণেই গর্ভাধান হোক না কেন মেয়েসন্তানকে তাড়িয়ে না দিয়ে তার প্রতিকার করুক ।
সওদাগরের ধনসমুদ্র থেকে এক আঁচলা ভিক্ষান্ন পাক আকুলি-সুকুলির মত অবাঞ্ছিত শিশুরা ।
রাজকন্যার সাথে হোকনা ঐ যমজ ছেলেদুটির বিয়ে । বেঁচে যাবে সংসারটি ও সাথে তাদের মা টিও যাকে একদিন লোকলজ্জার ভয়ে ত্যজ্যা কন্যা হতে হয়েছিল । 
প্রতিবছর অঘ্রাণের ভোরে যখন শীত দরজায় কড়া নাড়ে তখন মনে পড়ে এইসব। পাল্টায়না ব্রতকথার গল্পগুলো। শুধু পাল্টে যায় সমাজের চিত্রকল্পটা। বদলে যায় চরিত্রগুলো। ব্রতের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলে এ যুগেও  । সমাজে মেয়েগুলো আজো ব্রাত্য ।

২০ অক্টোবর, ২০১৭

"ভাইবোনফোঁটা"

ছবি সূত্রঃ গুগল

* সূর্যের ঔরসে সংজ্ঞার গর্ভে যম এবং যমী নামে একজোড়া পুত্র কন্যা হয়। মাতৃজঠরে একত্রে প্রতিপালিত ভ্রাতা যমের জন্য দেহের বাইরে এসে ভগিনী যমীর খুব কষ্ট হত। সে যত বড় হতে লাগল তত তার কষ্ট বাড়তে লাগল। অন্যথায় বিমাতা ছায়া দুজনকে পৃথক করে রাখতে চাইলেন। ছায়ার কুমন্ত্রণায় সূর্য নিজ পুত্র যমকে নরকে এবং কন্যা যমীকে মর্ত্যে পাঠিয়ে দেন। বহুদিন অতিবাহিত হলে যম এবং যমী উভয়ে একে অপরের বিচ্ছেদে কাতর হলেন। যম দেখা করতে গেলেন যমীর সঙ্গে। আর সেদিনটি ছিল কালীপুজোর দু-দিন পর কার্তিক অমাবস্যার শুক্লাদ্বিতীয়া তিথি যা আজো ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা যমদ্বিতীয়া নামে খ্যাত। ভাইয়ের জন্য যমী ঘর সাজিয়ে, নানাবিধ খাদ্যদ্রব্যের আয়োজন করে উপহার সাজিয়ে নাকি বসেছিলেন তাই ঐদিনে বোনেরা ভাইদের জন্য এভাবেই পালন করে থাকে। কারণ একটাই। ভাইয়ের মঙ্গলকামনায়, ভাইয়ের পরমায়ু কামনায়। এটি বলে পুরাণ।
* ঋগ্বেদ বলে যম আর যমী মায়ের শরীরের বাইরে এসেও নাকি মাতৃজঠরের একত্র অবস্থানকে ভুলতে পারেনা। তাই যমী যমকে কামনা করে বসেন। বলেন, আমাকে তোমার সন্তান দাও। যম কিন্তু নিরুত্তর। প্রত্যাখ্যান করেন আপন সহোদরা যমীকে।
* অথর্ববেদে বলে যমুনা নাকি যমকে বলেছিলেন মায়ের পেটে তো তাঁরা একসাথেই দশমাস পাশে শুয়ে ছিলেন অতএব এখনো তিনি সেভাবেই যমকে শয্যাসঙ্গিনী রূপে কামনা করেন কিন্তু যম বোনের মুখে এমনটি শুনে যেন তড়িতাহত হলেন। বলেন, জন্মসূত্রে এক পরিবারের হলে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করা গর্হিত কর্ম।
* যদিও প্রাকবৈদিক যুগে ভাই-বোন বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছে তাই যমীর এরূপ ধারণা অমূলক নয়। কিন্তু যম সেই ধারণাকে এক্কেবারে আমল না দিয়ে চলে যান।
আজ আমাদের শরীরবিজ্ঞান বলছে ভাই-বোনে বিবাহ হওয়াটা সত্যি সত্যি যুক্তিযুক্ত নয় ।
জিনগত সমস্যা এই বিবাহকে নিরাপদ করেনা অনেকাংশেই। সুস্থ মাতৃত্ব আসেনা। এলেও জিনগত ত্রুটি নিয়ে সন্তান আসে তাদের যা পরবর্তী জীবনে দুর্বিষহ। ভয়ানক সব রোগের স্বীকার হয় ভাইবোনের মিলনের ফলস্বরূপ সন্তানটি। সে যুগে এত বিজ্ঞান ছিলনা। ছিলনা হেমাটোলজির পরীক্ষানিরিক্ষা। মানুষ বুঝতনা জিনতত্ত্ব ও জৈবরহস্য। সেই বিয়ের ফলশ্রুতি মোটেই সুখকর হয়নি তাই বুঝি ধীরে ধীরে বিদায় নিয়েছে সহোদর-সহোদরার বিবাহ। আর তাই বুঝি যমীর ভাইকে বিবাহের আবেদন ও বোনকে বিবাহে যমের এই প্রত্যাখানের লোকায়ত কাহিনীটি প্রচার করে ধীরে ধীরে মর্যাদার আসনে বসানো হয়েছে ভাইফোঁটাকে আর সমাদর করা হয়েছে ভাইবোনের মধুর সম্পর্কটিকে।

যা হয়েছে তা সমাজের ভালোর জন্যেই। যম-যমীর সুস্থতার জন্যেই। আর ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়েছে ভাইবোনের বিয়ে। তাই বুঝি যমী মনকে বুঝিয়ে বলে, যমের অখন্ড পরমায়ু আশা করে। বোনেরা এখনো ভাইয়ের কপালে চুয়া-চন্দনের ফোঁটা দিতে দিতে বলে ওঠে

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁট৷ ।
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।
ঢাক বাজে, ঢোল বাজে আর বাজে কাঁড়া।
আজ অবধি ভাই তুমি যেওনা কো যমের দক্ষিণ পাড়া।

সেই সময় কেউ বোধহয় যমীকে বুঝিয়েছিল যে এই বিয়েতে ঠিক হবেনা। তুমি যদি সত্যি সত্যি ভাইকে ভালোবাসো তবে তার সুস্থ পরমায়ু কামনা করো। তাকে পেট পুরে তার মনের মত পদ রেঁধেবেড়ে খাওয়াও, তাকে উপহার দাও..শুধু এই বিয়ে থেকে শতহস্ত দূরে থাকো।
কালের স্রোতে ধুয়েমুছে সাফ হল ভাইবোনের যৌনতার গন্ধ মাখা সম্পর্ক। আর ঠাঁই পেল স্বর্গীয় সুন্দর এক অমলিন, পবিত্র সম্পর্ক। যম যমীর ফোঁটা নিয়ে পরম তৃপ্তি পেলেন। আর সমাজ স্বীকৃতি দিল ভাই-ফোঁটা, ভাই-দুজ, ভাই-বীজ, ভাই-টীকা বা ভাই-তিলকের মত পবিত্র উত্সবকে।

*তাই আবহমান কাল ধরে বোনেরা ভাইদের মঙ্গল কামনা করে ফোঁটা দেয় ভাইয়ের শত পরমায়ু, উন্নতি কামনা করে।
কিন্তু কখনো কি শুনেছি আমরা এর উল্টোটা? অর্থাৎ ভাই তার বোনকে ফোঁটা দিয়ে বোনের সুস্থতা, সুরক্ষা এবং সার্বিক উন্নতি চাইছে? সকালে ধোপদুরস্ত হয়ে মাঞ্জা দিয়ে, ধুতির কোঁচা দুলিয়ে ভাইরা যুগে যুগে বলে এল, "ভাইফোঁটা নিতে যাচ্ছি"। কিন্তু "বোনফোঁটা দিতে যাচ্ছি" ও তো বলতে পারত তারা।
তাই এস আমরা চালু করি সামগ্রিক "ভাইবোনফোঁটা"। দু-তরফের পক্ষ থেকেই ফোঁটা চালু হোক!

১৯ অক্টোবর, ২০১৭

দীপাণ্বিতার স্মৃতিকণা



মার স্মৃতিতে ছোটবেলায় কালীপুজোর প্রদোষে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজোর স্মৃতি অমলিন। সব ঘটিবাড়িতেই এই পুজো হবার কথা। আমাদের কোজাগরী পুজো নেই তাই এই পুজোয় মহা ধুম হত। সকাল থেকেই সাজো সাজো রব পড়ে যেত বাড়িতে। মা, ঠাম্মা উপোস থাকতেন। আর সারাদিন ধরে বিকেলের পুজোর জোগাড় যন্ত্র চলত। আগেরদিন বাজার হয়ে যেত। নারকোল নাড়ু মা আগের দিন করে রাখতেন। ঠাম্মা বসে নাড় পাকাতেন। আখের গুড়ের গন্ধে বাড়ি ঘর ম ম করত। স্কুল ছুটি থাকায় পড়াশুনো শিকেয় তখন। বারান্দার গ্রিলে মোমবাতি, ছাদের প্যারাপেটে মোমবাতি জ্বালানো নিয়ে কত এক্সপেরিমেন্ট চলত আমার আর ভাইয়ের। পুজোর দিন সকালে বাগানের ফুল তোলা ছিল আমার কাজ। একটাও কুঁড়ি না ছিঁড়ে শিউলি, জবা অপরাজিতা ফুল, স্থলপদ্ম তুলে সাজি ভরে আনতাম। ভাই ব্যস্ত তার বাজী নিয়ে। বাজি রোদে শুকনো, কড়মড়ে করে তবে তার শান্তি। আর ক্যাপ ফাটানো নিয়ে তার কত উত্তেজনা। একবার বম্বে থেকে বাবা তার জন্য নিয়ে এলেন স্পেশ্যাল এক ক্যাপ ফাটানোর স্টীলের বন্দুক। তার সঙ্গে আবার কিছু ক্যাপ ফ্রি ছিল। সেই দেখে আমিও উত্তেজিত। যদিও হাতে খেলনা বন্দুক দেওয়া মায়ের নাপসন্দ তবুও ভাইয়ের ইচ্ছে কে বেশ ভালোই প্রশ্রয় দেওয়া হত বাড়িতে।আমাদের বাড়ীতে পুত্র সন্তান ছোট থেকেই বেশ অগ্রাধিকার পায়, দেখেছি এমনটি। কিন্তু আমি
আমার ন'বছরের ভাকে এতটাই স্নেহ করতাম যে তার আনন্দে আমার আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যেত। ভাবতাম এটাই যেন হওয়া উচিত। ও তো কত ছোট আমার থেকে। সেই ফুল দিয়ে মা দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীর জন্য মালা গাঁথতেন দেখবার মত। এবার পুজোর ভোগ রাঁধার প্রস্তুতি। বড় হয়ে মা আমাকে বঁটিতে ভোগের ভাজাগুলি কাটতে বলতেন। পাঁচভাজার মধ্যে আলু, পটল, ফুলকপি, বেগুণ, আর রাঙা আলু ভাজা। মা ভাগ করে দিয়ে ভোগের খিচুড়ি বসাতেন। আমি মন দিয়ে ভাজা কাটতাম। ভাই ঠিক সময়ে এসে আমাকে বলত দিদি, বেশী করে গোল গোল চাকা চাকা আলুভাজা কেটে দে প্লিজ। মা যা আলু দিয়েছে তার প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ আলু কাটিয়ে নিত, যাতে না কম পড়ে। এবার মায়ের সেই আলুভাজতে প্রাণান্ত হত। নিয়মিত বাড়িতে এমন আলুভাজা হত না। তাই বুঝি ওর এমন আসক্তি ছিল ঐ স্পেশ্যাল আলুভাজায়। মা ভোগের জন্য সোনামুগ ডাল আর গোবিন্দভোগ চালের অপূর্ব খিচুড়ি, ঘিভাত, ফুলকপির ডালনা, রাঁধতেন। এরপর সুজির পায়েস বসত পেতলের কড়ায়। তাতে কাজু, কিশমিশ দিয়ে গার্ণিশ করার দায়িত্ব পড়ত আমার ওপরে। আর হত একটা স্পেশ্যাল চাটনী। এটা সারাবছরে আর হত না বাড়িতে। পালংশাক ভাজা হয়ে যেত আগেভাগে। সদ্য ওঠা মূলো, রাঙা আলু, বেগুণ আর মটর ডালের ছোট্ট ছোট্ট বড়ি দিয়ে সেই চাটনী।সরষে, ফোড়ন আর নামানোর ঠিক আগে একাটু ময়দা গোলা আরা কাঁচা তেঁতুলের ক্বাথ। সে যে কি অপূর্ব রসায়ন!
সব শেষে চাপত ছোট্ট ছোট্ট গোল গোল ঘিয়ের লুচির খোলা। সে গন্ধ আর পেতুম না সারা বছর।বছরের একটি দিনেই লুচির ময়দা কি করে শক্তপোক্ত করে, কম জল দিয়ে মাখতে হয় শিখে গেছিলাম সারা জীবনের মত। ভাই পাশ থেকে এসে বলত দিদি, বেশী করে ময়দা টা মেখেছিস তো? তারপর পাহাড় প্রমাণ সেই লুচি ভাজতে উপোসী মা হিমশিম খেতেন।
ভোগ রান্নার সময় মা একটিও কথা বলতেন না। পাছে ভোগের মধ্যে থুতু পড়ে যায়।
এবার মা লক্ষ্মী পাততেন। ধানের মধ্যে লক্ষ্মী আর তাঁর পেঁচার আসন গ্রহণ সুচারু আলপনা দেওয়া জল চৌকি তে। ঠাকুমার লক্ষ্মীর হাঁড়ি পেয়েছিলেন মা। সেই ধান প্রতিবছরে বদলানো হত পৌষ মাসে নতুন ধান উঠলে। এবার লক্ষ্মীর পা, ধানের শীষ এঁকে মা পিটুলি গোলা দিয়ে সারা বাড়ি আলপনা দিতেনা। লক্ষ্মীর কুনকে ভর্তি ধান আর ধান, পাশে সিঁদুর কৌটোখানি। মা লক্ষ্মীর ছবিতে পুজোই আমাদের রীতি।
লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজো হয় । পিটুলি বাটা দিয়ে মা তাঁর নিপুণ হাতে তৈরী করেন তিন পুতুল.... সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী পুতুল, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল নারায়ণ পুতুল, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের পুতুল । কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন । আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী । চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয় ।
চাটাই বাজাতে বাজাতে বলা হয়,
"অলক্ষ্মী বিদেয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক্'
আসলে কুললক্ষ্মী তথা ভাগ্যলক্ষ্মীর পুজো এই দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো। সূর্যাস্তের আগেভাগে প্রদোষকালে হয় অলক্ষ্মীর পুজো। তারপর শুরু হয় দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীর পুজো। ব্রতকথা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম ঈশ্বর, মানুষ, পুজোআর্চা এসবকিছুই তো মানুষের মনগড়া। এই অনুষঙ্গগুলি জীবনযাপনের উপলক্ষ্যমাত্র। উপযুক্ত চেষ্টা এবং ভাগ্যের জোরে মানুষের সংসারে শ্রীবৃদ্ধি হয়। যাকে আমরা বলি লক্ষ্মীর আগমন। তাই ভাগ্যলক্ষ্মীকে বরণ করা হয় দীপাণ্বিতার দিনে।

২ অক্টোবর, ২০১৭

ধান্যলক্ষ্মী বা ধনলক্ষ্মী কোজাগরী


এইসময়, ২রা অক্টোবর ২০১৭


দুর্গা পুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই ধুমধাম করে আশ্বিনমাসের পূর্ণিমাতে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর রীতি মূলত পূর্ববাংলার মানুষদের। তবে এখনো বর্ধমানের ঘরে ঘরে এই পুজো লক্ষ্য করা যায়। কারণ দেশভাগের পর বহু মানুষ বর্ধমান জেলাতেও এসে ঘর বেঁধেছিলেন।এঁরা কেউ মাটীর সরায় রঙীন লক্ষ্মী মূর্তি এঁকে অথবা কেউ মাটীর প্রতিমা এনে পুজো করেন ঘরেই। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলার ব্রত ব‌ইতে আছে, দেবীর কাছে খেতের ভাল ফলনের আশায় মানুষ পুজো দেয়। বর্ধমান জেলাটি আমাদের রাজ্যের শস্যভান্ডার। তাই কোজাগরী পুজোর উপাচার হিসেবে ফলমিষ্টি ছাড়াও ধানজাত দ্রব্যাদি অর্থাত খ‌ই, চিঁড়ে, মুড়কি, মুড়ি ইত্যাদির মোয়া অবশ্য‌ই নিবেদিত হয়। তাই কোজগরী লক্ষ্মী পুজো বর্ধমনের এই লৌকিক কৃষি উত্সবও বটে। আকাশে পূর্ণচাঁদের রূপোলী জ্যোত্স্নায় ঘরে ঘরে সোনার ধানের গোলা। তাই সম্বচ্ছর যেন ধনের ফলন নিয়ে গৃহস্থ কে চিন্তা করতে না হয়, তাদের পরিবার যেন থাকে দুধেভাতে। আউস ধানে পরিপূর্ণ মাঠঘাট। লক্ষ্মী তাদের ধান্য তথা ধনদেবী।

মানুষের বিশ্বাস কোজাগরীর রাতে ঘুমোনো চলবেনা। তাহলেই লক্ষ্মী তাকে ছেড়ে চলে যাবে। মা লক্ষ্মীর হাতে ধানের শীষের গুচ্ছ। চৌকাঠে পিটুলিগোলার আলপনা, সারা বাড়ীময় লক্ষ্মীর পদচিহ্ন এই বিশ্বাসে...তিনি ঠিক আসবেন প্রত্যেক ব্রতীর ঘরে। পুরাণে বলে সমুদ্রমন্থনের সময় ক্ষীরসাগর থেকে পদ্মফুল হাতে লক্ষ্মীদেবী‌ই উঠে এসেছিলেন হাতে রাশিরাশি সোনাদানা, মণিমাণিক্য নিয়ে।
সমুদ্রমন্থনের সময় উঠে এসেছিলেন বলে লক্ষ্মীর অপর নাম সমুদ্রকন্যা। কেউ আবার ডাকে ভূদেবী অর্থাত সারা পৃথিবীর, সমগ্র প্রকৃতির পালনকর্ত্রীরূপে।
শারদপূর্ণিমা তাঁর যে ভীষণ প্রিয়। আশ্বিনের এই পূর্ণিমার সময় বর্ষা ঋতু ফিরে যায় একবছরের মত। মৌসুমীবায়ু বিদায় নেয়। শস্যশ্যামলা মাটি থেকে সোনা রঙের নতুন আউস ধানের গন্ধ ওঠে। ভক্তের ঘরে পরব আর লক্ষ্মী তখন কোজাগরী। এটি তাঁর কৌমুদী-উত্সব। চাঁদের আলোয় তখন রাত পরিক্রমার শুরু। কোজাগরী হয়ে তিনি নজর রাখেন কে তাঁকে চায়। কে তাঁর পালন করে। কে তাঁকে বেঁধে রাখে আজীবন।
অবনীন্দ্রনাথের মতে কোজাগরী লক্ষ্মী হলেন আদিম অনার্য লক্ষ্মী। আর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর ব্রত কথাটিও সেই অনার্যা কন্যা কে ঘিরেই।
উজ্জয়িনীর এক ধার্মিক রাজা তাঁর প্রজাপালনের জন্য খুব সুখে কাল যাপন করতেন। একবার তিনি ঢেঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে দিলেন যে তাঁর রাজ্যের হাটে কোনো অবিক্রিত জিনিষ যেন না পাড়ে থাকে। দিনের শেষে তিনি‌ই সেই জিনিষটি কিনে নেবেন দোকানীর কাছ থেকে। রটে গেল খবর। জানা গেল এক কামারের কাছে এক ভয়ানক চেহারার বিশ্রী নারীমূর্তি পড়ে রয়েছে। কামারকে জিগেস করতেই সে বলল, মহারাজ এটি নাকি অলক্ষ্মী মূর্তি তাই কেউ কিনতে চাইছেনা। মহারাজ বললেন, তিনি যখন কথা দিয়েছেন তখন সেটি কিনে নিয়েই বাড়ি ফিরবেন। নয়ত অধার্মিক রাজা হিসেবে তাঁকে রাজ্যের মানুষ চিনে যাবে। রাজা অগত্যা সেই লোহার মূর্তিটি কিনে এনে নিজের ঠাকুরবাড়িতে তাকে আশ্রয় দিলেন। মাঝরাতে নিজের রাজপুরীর মধ্যে মেয়েলি কান্নার কন্ঠস্বর শুনে রাজা দেখতে পেলেন এক ক্রন্দনরতা নারীমূর্তিকে।
রাজা তাকে জিগেস করলেন "তুমি কাঁদছো কেন মা?'
সেই নারী বললে," মহারাজ, আমি আপনার রাজলক্ষ্মী, আজ আপনার বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি'
রাজা বললেন, কেন মা? আমি কি অন্যায় করেছি? জানতে পারি?'
সেই নারীমূর্তি বললে," আপনি রাজবাড়িতে অলক্ষ্মীকে ঠাঁই দিয়েছেন। অতএব আমি আর এখানে থাকতে পারবনা।' এই বলে তিনি অন্তর্হিতা হলেন। আবার কিছুপরে রাজা দেখলেন আরেক সুন্দরী, সুশীলা নারী প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে হল ভাগ্যলক্ষ্মী। তার কিছুপরেই যশোলক্ষ্মী, কুললক্ষ্মী, সকলেই একে একে রাজপুরী থেকে বিদায় নিল। রাজার সেরাতে ঘুম এলনা। এবং সকলেরি বিদায় নেবার কারণ হল সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি যেটি রাজা কিনে এনেছিলেন।

এভাবেই তাঁর দিন কাটে।

তবুও শিল্পীর হাতে বানানো সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি ফেলে দিতে রাজার মন চায়না। শিল্পী তো আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরী করেছে তাকে।

শিল্পীর শিল্পীসত্তায় আঘাত করতে মন চায়না রাজার। তাই প্রাসাদ থেকে একটু দূরেই সরিয়ে রাখেন তাঁকে কিন্তু ফেলতে পারেন না। ক্রমে তিনি দরিদ্র হতে থাকলেন। ধন, মান, যশ, সাফল্য ভাগ্য তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। একদিন রাজা দেখতে পেলেন ধর্মরাজ তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। রাজা তখন নিরূপায় হয়ে ভাবলেন এটা মেনে নেওয়া যায়না। ধর্ম তাঁকে ত্যাগ করলে তিনিতো অধার্মিক রাজা রূপে পরিগণিত হবেন। রাজা তখন ধর্মকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেন।

ধর্মরাজা রাজার যুক্তি শুনে খুব খুশি হলেন। ধর্মরজের কথায় আশ্বিনমাসের পূর্ণিমায় রাণীকে কোজাগরী ব্রত পালন করতে বললেন । রাণী সারারাত জেগে বসে র‌ইলেন। আর নিষ্ঠাভরে লক্ষ্মীর পুজো করে রাজা সব ফিরে পেলেন। আবার আগের মত তাঁর রাজবাড়ি ভরে উঠল জাঁকজমকে, ধনসম্পত্তিতে।

আর ঠিক সেখানেই যেন মানব সংসারে ভাল এবং মন্দ মেয়ের টানাপোড়েনের গল্পটি উঠে আসে। লক্ষ্মী এবং অলক্ষ্মীর পুজোর তাই বুঝি চল। কারোকে ফেল না। সব মেয়েই পূজ্য। দোষে গুণে গড়া মানুষ। লক্ষ্মীকে বরণ করলেও অলক্ষ্মীকেও ফেলে দেওয়া চলবেনা...ইহজগতের মানুষের জন্য সেই শিক্ষামূলক বার্তা আজো পাই এই পুজোর থেকে। লক্ষ্মী সুরূপা আর অলক্ষ্মী কুরূপা। লক্ষ্মী শান্ত আর অলক্ষ্মী চঞ্চলা। তারা তো আমাদের ঘরের আর পাঁচটা মেয়েরি মতন। তাই অলক্ষ্মীর পুজো করে নিয়েই লক্ষ্মী পুজোর রীতি।

কুমারীপুজো এবং



এইসময় ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৭
বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলার মন্দির তিনশো বছরেরও পুরোনো এক তীর্থস্থান। এটি অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির। এখানে দেবী মূর্তি কষ্ঠি পাথরের অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী, মহিষমর্দিনী, মহালক্ষী রূপিণী । মায়ের ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে এখানে শারদোতসবের সূচনা হয়। মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদে কৃষ্ণসায়র থেকে রূপোর ঘটে জল ভরে শোভাযাত্রা বের হয় মন্দিরের উদ্দেশ্যে।ঘোড়ায় টানা রথে বাদ্যযন্ত্র, ঢাক সহকারে বিশাল শোভাযাত্রায় অংশ নেন শহরবাসীরা। শহরের রাজপথের দুই ধারে মানুষের ভিড় উপচে পড়ে । অবশেষে শোভাযাত্রা এসে সর্বমঙ্গলা মন্দিরে শেষ হয় এবং ঘট প্রতিষ্ঠা হয়।

সারাবছর এখানে দেবীর নিত্যপুজো ছাড়াও মহাষষ্ঠীতে বিল্ববৃক্ষে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস, মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা পূজা, মহা অষ্টমীতে কুষ্মান্ড বলিদান, আরতি ও সন্ধিপূজা হয় । মহানবমীতে হয় কুমারী পুজো, হোমযজ্ঞ। মহা দশমীতে বিহিত পুজোর পর অপারাজিতা পূজা ও ঘট বিসর্জন হয় ।
বর্ধমানের কোথাও আবার পালকি চেপে কুমারীকে ঘোরানো হয় সারা শহর। সেখানেও ঐতিহ্য মেনে নবমীর দিন কুমারী পুজো হয়।
বর্ধমানের সাবেকী বাড়ির পুজোগুলি খুব প্রাচীন। কোনোটি বা পাঁচশো বছরেরো পুরোনো। বুদবুদের মানকরের বড় কবিরাজ বাড়ির পুজো প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের। বর্ধমান রাজার কাছে জমিদারি পাওয়ার পরে এখানে বাস শুরু করেন পূর্বপুরুষেরা। তখন থেকেই এই পুজো চলছে।
কাঁকসার ত্রিলোকচন্দ্রপুরের মণ্ডলবাড়ির পুজো প্রায় তিনশো বছরের পুরনো। নবমীর দিন গ্রামের বাইরে তিলুইচণ্ডী তলায় পুজো হয়। এই তিলুইচণ্ডী নাকি লক্ষ্মণ সেনের আমলের। এখানে নবমীর দিন কুমারীপুজো হয় দেখবার মত। এছাড়া আসানসোল রামকৃষ্ণ মিশন ও কাটোয়ার রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে ধুম করে হয় কুমারী পুজো।

কুমারী কন্যার শুদ্ধ আত্মাতেই নাকি ভগবতী দেবী দুর্গার প্রকাশ সবচেয়ে বেশী। তন্ত্রসার মতে ১ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত অরজঃস্বলা বালিকারা কুমারী পূজার উপযুক্ত । যে কোনো জাতের কন্যাকেই মাতৃজ্ঞানে দুর্গাপুজোর অষ্টমী কিম্বা নবমী তিথিতে পুজো করা হয়। বেদ পুরাণের যুগে মুনি ঋষিরা প্রকৃতিকে কুমারী জ্ঞানে পুজো করতেন।
স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০১ সালে বেলুড়মঠে দুর্গাষ্টমীতে পুনরায় কুমারীপুজো চালু করেছিলেন। ভারতবর্ষের দুটি স্থানে, মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরে এবং কন্যাকুমারীতে দেবীশক্তিকে কুমারী জ্ঞানে পুজো করা হয়।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে ত্রিশক্তির বলে প্রতিনিয়ত যে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় ক্রিয়া অনবরত চলছে সেই ত্রিবিধ শক্তিই বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। কুমারী প্রকৃতি বা নারী জাতির প্রতীক ও বীজাবস্থা। তাই কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপিত করে দেবীরূপে তার সাধনাই হল কুমারী পূজা । এ সাধনপদ্ধতিতে সাধকের নিকট বিশ্বজননী কুমারী নারীমূর্তির রূপ ধারণ করে । তার নিকট নারী ভোগ্যা নয়, পূজ্যা।দুর্গাপুজো কে কলিকালের অশ্বমেধ যজ্ঞ বলা হয়। আর রামায়ণ্-মহাভারতে আমরা যত যজ্ঞের কথা শুনি কুমারীপুজো হল দুর্গাপুজোর মধ্যে আরো একটি বিশেষ যজ্ঞ।
বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ রামের জন্য ব্রহ্মার দুর্গাপূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। তখন শরৎকাল, দক্ষিণায়ণ। দেবতাদের নিদ্রার সময়। তাই, ব্রহ্মা স্তব করে দেবীকে জাগরিত করলেন। দেবী তখন কুমারীর বেশে এসে ব্রহ্মাকে বললেন, বিল্ববৃক্ষমূলে দুর্গার বোধন করতে। দেবতারা মর্ত্যে এসে দেখলেন, এক দুর্গম স্থানে একটি বেলগাছের শাখায় সবুজ পাতার রাশির মধ্যে ঘুমিয়ে রয়েছে একটি তপ্তকাঞ্চন বর্ণা বালিকা। ব্রহ্মা বুঝলেন, এই বালিকাই জগজ্জননী দুর্গা। তিনি বোধন-স্তবে তাঁকে জাগরিত করলেন। ব্রহ্মার স্তবে জাগরিতা দেবী বালিকামূর্তি ত্যাগ করে চণ্ডিকামূর্তি ধারন করলেন।

মনু সংহিতা অনুসারে
যত্র নার্যন্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ
যত্রৈতান্তু ন পূজ্যতে সর্বান্তুত্রাফলাঃ ক্রিয়া’।।

এর অর্থ হল, যেখানে নারীরা পূজিত হন সেখানে দেবতারা প্রসন্ন। যেখানে নারীরা সম্মান পান না, সেখানে সব কাজই নিষ্ফল। আর তাই তো নারীর সম্মান প্রদানে ব্রতী হয়ে স্বামীজি এই কুমারী পুজো চালু করেন।

আবার মহাদেব যোগিনী শাস্ত্রে বলেছেন,
কুমারী পূজনং ফলং বক্তু নার্হামি সুন্দরী।
জিহ্বাকোটি সহস্রৈস্তু বস্তুকোটি শতৈরপি’।

এর অর্থ শতকোটি জিহ্বায় কুমারী পূজার ফল ব্যক্ত করতে পারব না। কুমারীরা শুদ্ধতার প্রতীক হওয়ায় মাতৃরূপে ঈশ্বরের আরাধনার জন্য কুমারী কন্যাকে নির্বাচন করা হয়।

তবে অরজ:স্বলা কুমারীদেরই কেন পুজো করা হবে সেই নিয়ে আধুনিক ভাবনাচিন্তায় দ্বিমত। কন্যা ঋতুমতী হলেই কি অশুদ্ধ হয়ে যায় ? আর অরজস্বঃলা কন্যাই কি অপাপবিদ্ধ? তাহলে অম্বুবাচীর দিনে কামাখ্যা মন্দিরে এত ভীড় কিসের হয়?

যোগিনীতন্ত্রে বলে ব্রহ্মার শাপে বিষ্ণুর দেহে পাপ সঞ্চার হলে সেই পাপ থেকে মুক্ত হতে হিমাচলে মহাকালীর তপস্যা শুরু করেন। বিষ্ণুর তপস্যায় মহাকালী খুশি হন। দেবীর সন্তোষ মাত্রেই বিষ্ণুর হৃদ পদ্ম হতে সহসা ‘কোলা’ নামক মহাসুরের আবির্ভাব হয়। সেই কোলাসুর ইন্দ্রাদি দেবগণকে পরাজিত করে অখিল ভূমণ্ডল, বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠ এবং ব্রহ্মার কমলাসন প্রভৃতি দখল করে নেয়। তখন পরাজিত বিষ্ণু ও দেবগণ ‘রক্ষ’ ‘রক্ষ’ বাক্যে ভক্তিবিনম্রচিত্তে দেবীর স্তব শুরু করেন। দেবতাদের স্তবে প্রসন্ন হয়ে দেবী চণ্ডিকা কুমারী কন্যারূপে দেবতাদের সামনে দেখা দিয়েছিলেন।সন্তুষ্টা দেবী বলেন, ‘হে বিষ্ণু! আমি কুমারীরূপে কোলানগরী গমন করে কোলাসুরকে সবান্ধবে হত্যা করব।’ দেবী কথামতো কাজ করেন। সেই থেকে দেব-গন্ধর্ব, কিন্নর-কিন্নরী, দেবপত্নীগণ সকলে সমবেত হয়ে কুসুম-চন্দন-ভারে কুমারীর অর্চনা করে আসছেন।
আজকের সমাজের নারী নির্যাতনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কন্যাভ্রূণ হত্যা, ধর্ষণ, ইভটিজিং ইত্যাদির মত নৃশংস ঘটনায় মনে হয় প্রতিদিন যদি এভাবেই মন্দিরে মন্দিরে এক একজন জ্যান্ত কুমারীকে পুজো করা হয় তবে বুঝি কিছুটা হলেও এই কদর্য এবং বিকৃত রুচির কাজগুলির হাত থেকে মেয়েরা মুক্তি পেত। যে কুমারী কন্যাশ্রীদের দেবীজ্ঞানে পুজো করা হচ্ছে ধর্ম ভীরু সেইসব পুরুষরা পথেঘাটে তাদের স্পর্শ করতে অন্ততঃ একবার ভাববে।

১ অক্টোবর, ২০১৭

শারদীয়া অক্ষর প্রসব ১৪২৪

শারদসাহিত্যে ২০১৭

আবাপ ডিজিটাল, আনন্দ উতসব : লাইট-ক্যামেরা-একশন (রম্য)http://www.anandabazar.com/events/puja-parikrama/special-write-up-on-durga-puja-dgtl-1.679653?ref=puja-parikrama-new-stry
ভ্রমণ (আলাস্কার তিমি )
নিবোধত (কাশ্মীর মন্দির সোপান তলে)
পুরুলিয়া দর্পণ (বড়গল্প জন্মান্তর)
উত্তরবঙ্গসংবাদ শারদঅর্ঘ্য (ছোটগল্প পূর্বপুরুষ)
দৈনিক যুগশঙ্খ ( ছোটগল্প পিতৃত্ব)
একান্তর ( ছোটগল্প তিন কন্যা)
সপ্তপর্ণ ( ছোটগল্প বদলা)
মালিনী ( ছোটগল্প নিয়মভঙ্গ)
ম‌উল ( ছোটগল্প ডিলিট)
শৈলজা ( ভ্রমণ অরুণাচল প্রদেশ)
যুগসাগ্নিক (রম্য রচনা)
তিস্তা নন্দিনী (অণুগল্প লাবণ্যময়ীর স্বর্গ লাভ)
স্মরণিকা ( প্রান্তিক )

অনুভব (রম্যরচনা, শিব দুর্গার আধার কার্ড )
ইচ্ছামতী (ভ্রমণ ভিক্টোরিয়া, কানাডা)
ম্যাজিক ল্যাম্প (সহজে দুর্গা কথা)
কলকাতা ২৪x৭ (পুরাণ কথা)
শব্দের মিছিল (পুজোর স্মৃতি, পত্রসাহিত্য)
ঐহিক (ছোটগল্প দেবী)

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

১৪ আগস্ট, ২০১৭

আজ রাত পুইলেই...।

তক্ষণে মহামান্য দেশ নেতাগণ নিশ্চয়ই ভাষণের জন্য প্রস্তুত। ভোরের আলো ফুটলেই বেরুবে প্রভাত ফেরী। বীরবিক্রমে কন্ঠনালী ফুলিয়ে গগনভেদী চিত্কার করে বাতাস ভারী করবেন সকলে । প্রচার মাধ্যমগুলি প্রতি পলে পলে স্বাধীনতার সংগীত, প্রতি দন্ডে দন্ডে স্মৃতিচারণ, সকালে স্বাধিনতা সংগ্রামের উপর তথ্যচিত্র তো বিকালে ছায়াছবি, প্রদর্শন করবে | কখনো বিরলকেশ,বর্ষীয়ান নেতাকে বহুকষ্টে উপস্থিত করে তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমাদের পরিবেশন করবেন । শহীদ-স্মৃতি ফলক অচিরেই শ্বেত-পুষ্পের অবগুন্ঠনে চলে যাবে । ব্রিগেডের মৃত্তিকা পুষ্পবৃষ্টিতে ছয়লাপ হবেই, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। শহীদমিনারের পাদদেশে লক্ষ মানুষ ভীড় করে নেতার জ্বালামুখী বক্তৃতা শুনবে, এতেও কোনও সন্দেহ নেই। সারাদেশের আকাশে বাতাসে স্বাধীনতার পাঞ্চজন্যের বজ্রনিনাদ অনুরণিত হবে আর ঠিক তখুনি তোলপাড় হবে আমাদের মত কিছু মানুষের মন। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগবে কেনই বা এই উত্সব? কি জন্য পেয়েছিলাম স্বাধীনতা? আমরা কি স্বাধীনদেশের যোগ্য উত্তরসুরী? ইত্যাদি, ইত্যাদি। হ্যাঁ, তাই তো সোশ্যালনেটে এমন কপচাচ্ছি। তবু দেখবেন বাবা, বুঝেশুনে কপচাবেন। ফেসবুক দেওয়ালেরও কান আছে কিন্তু। স্বাধীনতার অপব্যবহার করে কার্টুন ফারটুন ( বিশ্বাস করুন, খারাপ কথা আমি পারদ পক্ষে বলি না, বাক স্বাধীনতা নেই আমার ) আবার এঁকে না ফেলি! তুমি মহারাজ স্বাধীন হলে আজ, আমি আজ পরাধীন বটে!

আচ্ছা বলুন তো স্বাধীন হয়ে কি হল? নিজেই নিজের মন কে বলি, এই যে পাড়ায় পাড়ায় স্বাধীনতার ফ্ল্যাগ উড়ছে, সকলেরি এত স্বাধীনতা পালনের হিড়িক, এর তো একটা ইম্প্যাক্ট আছে না কি? স্বাধীনতা আমাদের জলভাত যে। যেখানে খুশি যেতে পারি, যা খুশি তাই করতে পারি, যা ইচ্ছে তাই বলতে পারি, যখন খুশি পুরোণো নোট বদল করে কেরামতি দেখাতে পারি। রাতারাতি আধার লিংক করার আদেশ দিতে পারি। কিন্তু পেরেও পারিনা। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারি কিন্তু অর্ধশিক্ষিত মানুষগুলিকে স্বাধীনতা দিতে পারি না। বিশেষত বৃদ্ধেরা যারা প্রযুক্তিগত ভাবে পিছিয়ে তারা দেহ রাখবার আগেও স্বাধীন হতে পারেন নি আজ। বরং উত্যক্ত হয়ে ব্যাপক বিশ্বায়নের ঊর্মিমালায় খাবি খেতে খেতে বাণপ্রস্থ নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে বাস করছে।
সমাজের অলিগলির দুষ্কৃতি, দুরাত্মা ? পেরেছি কি তাদের স্বাধীনতা খর্ব করতে?
সেই আলগা গায়ের মায়ের বাছা? তাকে কি দিয়েছি? মিড ডে মিলের লোভ দেখিয়ে বিশুদ্ধ বানান শেখাতে পেরেছি?
মোড়ের মাথার গম ভাঙ্গানোর দোকানে সেই ছেলেটার টিন ফিরিয়ে দিতে পেরেছি? টিন মানে আটার টিন নয় মশাই, তার টিন, তার মধুর কৈশোর অধরাই থেকে গেছে।
জানেন? আমার বেলাতেও দেখিনি। স্বাধীনদেশের রক্ষণশীল, একান্নবর্তী পরিবারের কন্যা সন্তানের স্বাধীনতা ছোটথেকেই ছেঁটেকেটে রাখা হয়। আমার বেলাতেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি ।ছাঁটা-কাটা স্বাধীনতার ঘেরাটোপে, শুল্ক বসানো সাজপোশাক, কর চাপানো বন্ধুনির্বাচন, আর খাজনা আরোপিত বাইরে বেরোনো মেনে নিয়ে লক্ষ্মী মেয়ে হয়েছি। হুঁ, হুঁ, বাবা, স্বাধীনতা দিলে মেয়েরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে যায়।

৮ আগস্ট, ২০১৭

ভাদ্র লক্ষ্মী ভদ্রাবতী আজও পূজিতা

এইসময়, বর্ধমান সমাচার ৭ই আগষ্ট ২০১৭ 

দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলার মত বর্ধমানেও বেশ কিছু স্থানে ভাদ্রমাসের প্রথম দিন থেকে ভাদু পূজা আরাম্ভ হয় ।পয়লা ভাদ্র কুমারী মেয়েরা গ্রামের কোন বাড়ীর কুলুঙ্গী বা প্রকোষ্ঠ পরিষ্কার করে ভাদু প্রতিষ্ঠা করে । একটি পাত্রে ফুল রেখে ভাদুর বিমূর্ত রূপ কল্পনা করে তারা সমবেত কন্ঠে ভাদু গীত গায় । ভাদু এদের আঞ্চলিক লৌকিক দেবী। কেউ বলে ভাদু লক্ষ্মী। ভাদ্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে ভাদুর মূর্তি ঘরে এনে সংক্রান্তির সকালে দলবদ্ধভাবে ভাদু মূর্তির বিসর্জন দেয়। ভাদ্রমাসের জল থৈ থৈ দিনগুলোতে এখানে এখনো প্রত্যন্ত গ্রামে শোনা যায় ভাদু গান। আদিবাসী ঘরে ঘরে পালিত হয় ভাদু পরব।

এখনো আদিবাসী মানুষদের মুখে মুখে ফেরে বিখ্যাত আঞ্চলিক ভাদুগান

খিরই নদীর কুল ভাইঙ্গেছে
ভাদু নাকি আইস্যেছে
হাতে তার পানের বাটা
রুমালটি যার ভাঁইসেছে। 

কুমারী ভাদু দেবীর কাহিনি ঠিক যেন রূপকথা। সে ছিল এক দুঃখিনী কন্যা ।

মানভূমের পঞ্চকোট রাজ্যে তখন রাজা নীলমণি সিংদেও রাজত্ব করছেন দাপিয়ে। কোনও সন্তানাদি নেই তাঁর। মনে খুব দুঃখ। এদিকে রাজা তখন ঐ অঞ্চলে নতুন প্রজাতির এক ধান চাষ নিয়ে মত্ত। ধানের নাম দিয়েছেন তিনি নিজেই "ভাদুই' । ভাদ্র মাসে বোনা হয় সেই ধান। নিজের রাজ্য কাশীপুরের মানুষের জন্য বিগলিত প্রাণ রাজার। মানুষ ধন্য ধন্য করে।রাজা নিজেই মন্ত্রীকে সঙ্গে করে সাধারণ বেশভূষায় গ্রাম পর্যটনে বেরিয়ে পড়েন। ঐ ভাদুই ধানের ব্যাপারে গ্রামের মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে। ধানের ফলন আরো কি করে বাড়ানো যায়, ঐ ধান মানুষের পছন্দ হয়েছে কিনা এইসব তথ্য সংগ্রহের জন্য। এর মাঝে  তাঁর এক প্রজা রাজত্বের সীমানার মধ্যেই এক গ্রামে গ্রাম প্রধানের ঘরে বেড়ে ওঠা এক পরমাসুন্দরী সুলক্ষণা কন্যা ভদ্রাবতীর (মতান্তরে ভদ্রেশ্বরী) সন্ধান দিল। নিঃসন্তান রাজা সেই শোনামাত্র কন্যাটিকে চাইলেন নিজের কন্যা রূপে পালন করবেন বলে। কিন্তু মেয়েটির পিতা গ্রামের মুখিয়া কিছুতেই রাজি নন। অবশেষে স্থির হল সেই মেয়েটি তাঁর নিজের ঘরেই থাকবে তবে রাজা তার জন্য রাজকুমারীর মত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেবেন আর নিজের কন্যারূপেই দেখবেন তাকে।নিজের পিতার ঘরেই  রাজকন্যার মত বড় হতে লাগলেন ভদ্রাবতী। ভদ্রাবতীর আদরের নাম ভাদুমণি।

এদিকে সারা দেশে তখন সিপাহী বিদ্রোহের ঝড় বইছে। রাজা নীলমণি সিংদেও ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে বন্দী । জেল থেকে ফিরে এসে শুনলেন রাজকন্যা ভদ্রাবতী নাকি কবিরাজের পুত্রের প্রেমে পাগলিনী। কে এই কবিরাজ? কি তার নাম, ধাম? অবশেষে খোঁজ মিলল। তার নাম অঞ্জন।
এবার কালে কালে লোককথা, এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে লোকগাথাতে পরিবর্তিত হতে থাকে যুগ যুগ ধরে। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরে সেই রূপকথা।

ঘটনা শুনে  অগ্নিশর্মা রাজা নীলমণি সিংদেও তড়িঘড়ি আদেশ দিলেন কবিরাজ পুত্র অঞ্জনকে বন্দী করার। দুঃখে, অপমানে ভদ্রাবতী তাঁর দুই সখীকে নিয়ে রাজ্যের সমস্ত বন্দীশালায় গান গেয়ে গেয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল যাতে তার গান শুনে অঞ্জন তাকে চিনতে পারে । এবার সেই গান শুনে রাজারও অনুশোচনা হল, তিনি অঞ্জনকে মুক্তি দিলেন বটে কিন্তু ততদিনে রাজকন্যা ভদ্রাবতী নিজের মনোকষ্টে কোথায় যেন চিরদিনের মত অন্তর্হিত। কেউ বলে সে আত্মহত্যার পথ বেছেছিল। কেউ বলে সে পালিয়ে গেছিল। সেই থেকেই রাজকন্যা ভদ্রাবতীর মূর্তি স্থাপন করে শুরু হল রাজার রাজত্বে ভদ্রাবতীর পুজো আর এই পুজোই পরে গ্রামে গ্রামে ভাদু পুজো বা ভাদু পরব নামে পরিচিতি লাভ করে। আর তার দুঃখে দুঃখী হয়েই ভাদুর বারমাস্যা কীর্তন করে মেয়েরা। তাঁকে আনা হয় আদর করে, পুজো করা হয় আদর করে। তুমি থাক আমাদের মাঝে, আর চলে যেওনা তোমার প্রেমিকের খোঁজে দূর- দুরান্তরে। আমরা তোমায় যতন করে রাখব আমাদের মাঝে।

ওদিকে আবার পশ্চিমবাংলার ঘটিদের রীতি অনুযায়ী ভাদ্রমাসেই শুক্লাষষ্ঠী তিথিতে চাপড়া বা চর্পটা ষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন এ অঞ্চলের মায়েরা।

বর্ষার জল পেয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা ভাদ্রের নদনদী, খালবিলে যখন দুএকটা করে পদ্ম ফুটতে সবেমাত্র শুরু করেছে, বাতাসে যখন পুজো পুজো গন্ধ নিয়ে শিউলি ঝরতে শুরু করেছে তখন হয় চাপড়া ষষ্ঠী বা চপটা ষষ্ঠী । দুর্গা ষষ্ঠীর ঠিক একমাস আগে । কাঁঠালী কলা, পিটুলী গোলা দিয়ে পুতুল বানিয়ে পুকুরে ভাসায় গ্রামের মায়েরা, সন্তানের কল্যাণে । আর মটর ডালের চাপড়া বানিয়ে তাওয়ায় সেঁকে মায়েদের খেতে হয় ।

কোনো একদেশে এক বণিক ছিলেন যার তিন পুত্র ও তাদের তিন বৌ ছিল । বৌয়েরা পুত্রবতীও ছিল সকলে । কিন্তু পক্ষপাতিত্বের কারণে বণিক গিন্নী ছোট বৌকেই বেশি ভালবাসতেন । ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষে চাপড়া ষষ্ঠীর জন্য ছোটবৌমা'কে বণিক গিন্নী একফালি পুকুর কাটিয়ে দিলেন । কিন্তু গভীর করে পুকুর খনন করলেও সেখানে একফোঁটাও জল উঠলনা । বণিক আর গিন্নী তা দেখে অবাক হলেন । উপোস করে সারাদিন রাত পড়ে র‌ইলেন ।

অবশেষে মা ষষ্ঠী স্বপ্ন দিয়ে গিন্নীকে বললেন যে এক‌ই ঘরে ছোটবৌয়ের জন্য পুকুর কাটা হল আর বাকী দুটি বৌয়ের প্রতি এমন অসম আচরণ করার কারণে তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন তাই পুকুর শুষ্ক । আর বণিক যেন অন্য বৌদের জন্য আরো দুটি পুকুর কাটিয়ে দেন তবেই এই দুটি পুকুর সহ আগেরটিতেও জল থৈ থৈ করে উঠবে । সেই স্বপ্নাদেশ পাওয়া মাত্রই  বণিক লোক-লস্কর ডেকে  আগের পুকুরের পাশে আরো দুটি পুকুর কাটালেন  আর ঠিক সময়মত তিনপুকুরেই কাঁচের মত জল থৈ থৈ করে উঠল । বণিক গিন্নী তিন বৌমাকে নিয়ে ঐ পুকুরের জলে পিটুলীবাটার পুতুল ভাসিয়ে পুজো আচ্ছা করে ষষ্ঠীর ব্রত পালন করলেন ।  ভাদ্রে ওঠা নতুন ধানে ভাদ্র লক্ষ্মীর পাশাপাশি এই চাপড়া ষষ্ঠীর পুজো এখনো সমাদৃত।

৪ আগস্ট, ২০১৭

সেজোমাসী

 তোমার এয়োস্ত্রী ছবিতে মালা পরাতে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি গো। আজ তোমার রঙীন ছবির দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলার কত সাদাকালো কথা। গরমের ছুটি হলেই মায়ের হাত ধরে তিন নম্বর বাসে চড়ে তোমার বাড়ি। আর  তোমার হাতে কত কত তৈরী মুখরোচক। রন্ধনে দ্রৌপদী ছিলে তুমি। আমার মা সেবার লেবার পেনে কাতরাচ্ছে উত্তর কলকাতার বনেদী প্রসূতিসদন, নর্থ ক্যালকাটা নর্সিংহোমে। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, এখনো দেরী আছে অনেক। বাড়ি থেকে মাছের কচুরী বানিয়ে এনে আসন্ন প্রসবার মুখে দিয়ে তবে তোমার শান্তি হয়েছিল। আমি জন্মেছিলাম তার কিছু পরেই। তুমি মায়ের দিদি অথচ মায়ের কোলে আগে এসে গেল সন্তান । তখনো তোমার সন্তান হয়নি তাই আমার জন্যে  সারাজীবন তোমার চোখে খুশি দেখেছিলাম গো। তারপর আমায় কোলে নিয়ে মা চলল মামার বাড়ি। তোমার অদিখ্যেতা শুরু হল তখন। একুশ দিনের ষষ্ঠীপুজোয় লোকে ছেলের জন্যে একুশটা ক্ষীরের পুতুল গড়ে ষষ্ঠীবুড়ির চুপড়ি সাজায় আর তুমি কিনা ক্ষীরের পুতুল বানিয়েছিলে এই একরত্তি মেয়ে সন্তানের জন্যে!  দেখো, প্রকৃতির কি খেয়াল! তারপরেই তোমার দুটি ছেলে হল কোল আলো করে। আমার ভাই হবার আগে বেশ মনে পড়ে, তুমি নিয়ম করে মা'কে দেখতে আসতে। আর যাবার সময় মা'কে বলে যেতে, প্রথমটি কে অযত্ন কোরো না। বলেই আমার হাতে পুতুল, চকোলেট  কেনার টাকা গুঁজে দিতে। আমি কি করে ভুলব এসব??? 
তুমি কথায় কথায় বলতে দেখিস, আমি এয়োস্ত্রী মরব। আমি রাজরাণীর মত চলে যাব। সত্যি‌ই তাই হল। তোমার ভরভরন্ত সংসার, পাশে দুই ছেলে বৌ, নাতি, নাতনী...জমজমাট সংসারের সব দেখে শুনে সত্যিই তুমি রাণীর মত চলে গেলে! এমন ভাগ্য কজনের হয় আজকের যুগে?
যেখানেই থাকো, ভালো থেকো সেজোমাসী!

শ্মশান অনলে দগ্ধসি পরিত্যক্তোসি বান্ধবৈঃ
ইদং নীরং, ইদংক্ষীরং অত্র স্নাহি ইদং পিব
আকাশস্থ নিরালম্ব বায়ুভূত নিরাশ্রয়
অত্র স্নাত্বা, ইদং পীত্বা স্নাত্বা, পীত্বা সুখি ভব।

১ আগস্ট, ২০১৭

সনাতন আর কতদিন ?

রাজ্য জুড়িয়া সনাতনদের উত্তরোত্তর রমরমা। তন্ত্র, বশীকরণ, ব্ল্যাক ম্যাজিকের পাশাপাশি সনাতন প্রথায় বেকারত্ব দূরীকরণের প্রলোভন।

সত্য ঘটনাঃ স্থান কলিকাতা, তারিখঃ ৩০শে জুলাই, রবিবার

আমার গৃহ পরিচারিকার কন্যা এবত্সর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করিয়া কন্যাশ্রীর মহার্ঘ্য অর্থ ব্যায় করিয়া যোগমায়া দেবী কলেজে ভর্তি হ‌ইয়াছে। প্রাতঃকালীন কলেজ। সারাটা দিন তাহার অঢেল সময়। কোনোদিন সন্ধ্যায় কেটারিং এর কাজ করিয়া কিছু অর্থ প্রাপ্তিতে তাহার মন ভরিয়া ওঠে কানায় কানায়। কোনোদিন কোনো ইভেন্টের কাজে যাইয়া বিরিয়ানির প্যাকেট মায়ের হাতে, ভাইয়ের হাতে তুলিয়া দিয়া আনন্দ পায়। এহেন কন্যাশ্রীটি তাহার বন্ধুর ফাঁদে পড়িয়া গত রবিবার কালিঘাট অঞ্চল হ‌ইতে মেট্রো করিয়া কবি নজরুল এবং সেখান হ‌ইতে অটোর ভাড়া গুণিয়া তাহার মা'কে ল‌ইয়া পৌঁছায় গড়িয়ার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আরো এক সনাতনের ফাঁদ পাতা সেইস্থানে। গল্পের শুরু এইবার। বিশাল লাইন। প্রচুর কন্যাশ্রীরা লাইনে দন্ডায়মান। তাহাদের মাথাপিছু একজন অভিভাবক
(প্রধানত:তাহাদের মাতৃদেবী, টুপি পরানো সহজ বলিয়া ) বেঞ্চিতে ঘন্টার পর ঘন্টা উপবিষ্ট হ‌ইয়াই রহিলেন। অতঃপর আমাদের পরিচিত কন্যাশ্রীটির ডাক পড়িল। মাত্র আট হাজার টাকা(যাহাদের মাসিক আয় পাঁচ-ছ'হাজারের বেশী নয়) তাহাদের দিতে অনুরোধ জানাইলেন সেই সনাতন। এর বিনিময়ে আমাদের কন্যাশ্রী এবং তাহার মা পাইবেন বিস্তর সুবিধা।
১)অপুষ্টি নিবারক মাল্টিভিটামিন ক্যাপস্যুল ২) মখমলি ত্বকের জন্য অনন্য সাধারণ বডি লোশন ৩) রেশমী ও পশমী কেশের জন্য ভাইটালাইজিং শ্যাম্পু ৪) ব্রণ চিরতরে দূর করিবার ফেসপ্যাক ৫) মেনোপজের পর মেয়েদের মায়ের শরীর ঠিক রাখিবার জন্য "অল উইমেন ওয়েল বিইং" বটিকা এবং আরো কতকিছু থাকিবে সেই আট হাজারী গিফট হ্যাম্পারে।

বিধি সম্মত সতর্কীকরণ ঃ কাহাকেও বিক্রি না করিতে পারিলে নিজেরাই ব্যবহার করিয়া দেখুন এই প্রডাক্টের মাহাত্ম্য। পাইলেও পাইতে পারেন অমূল্য রতন!

গ্যাঁটের কড়ি ব্যয় করিয়া দলে দলে কন্যাশ্রীরা সনাতনের হাত থেকে মুক্ত করিয়া ফিরিয়া আসিয়াছে সেটাই রক্ষা। পিরামিড ব্যবসায়ের প্রলোভনের ফাঁদ পাতা এ ভুবনে। কখন কে ধরা পড়ে কে জানে! আটহাজারী চাকরি চাই। আটহাজারের বিনিময়ে। আর আছে রহস্যের মোড়কে আবৃত রূপলাগির বিজ্ঞাপন। যাহারা স্যানিটারি প্যাড কিনিতে পারেনা, যাহারা জ্বর হ‌ইলে প্যারাসিটামল চাহিয়া খায়, যাহারা কাজের বাড়ির দাতব্য করা সালোয়ার কামিজ টাঁকিয়া ল‌ইয়া পরে দিন চালায় তাহাদের এরূপ প্রলোভন সনাতনেরা আর কতদিন দেখাইবে? সনাতন পিরামিডের ব্যাবসা বুঝিয়া শীর্ষে উঠিয়াছে, বিদেশ যাইয়া দেশ উদ্ধার করিতেছে তাই বলিয়া সাধারণ এই মানুষগুলির মাথা আর কতদিন খাইবে তারা? সনাতন সাবধান! দিন আগত ঐ!

সনাতনরা সংখ্যায় বৃদ্ধি পাইবেই। ইহাতে আশ্চর্যের কিছু নাই। বেকারত্বের হাহাকার। উহাদের লোক ঠকাইয়া খাইতেই হ‌ইবে। কন্যাশ্রীরাও বেকার। উহাদেরো চাকুরী পাইতেই হ‌ইবে। অতএব সনাতন প্রথাগুলির বিনাশ হ‌ইবে না। আইন করিয়া সনাতন প্রথার বিনাশ অথবা সনাতনদের ধরপাকড় করিয়া লাভ নাই। সনাতন পদ্ধতিতে শিল্পে জোয়ার আনিতে হ‌ইবে। সনাতন প্রথায় চাকুরী দিতে হ‌ইবে।

২৪ জুলাই, ২০১৭

মঙ্গলচণ্ডী আজও

Ei Samay Bardhaman Suppliment 12th JUne 2017

বাঙলামায়ের বারোমাসে তেরো পার্বণ । আর সেই তেরো পার্বণে হাজারো বারব্রত । পূর্ববঙ্গে এই রীতির কিছুটা ছাড় কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মায়েরা নাছোড় এই বারব্রত পালনে । ঋতুর হাওয়াবদলের সাথে সাথে বর্ধমানের ঘরে ঘরে এই বাঙালীয়ানাটুকুকে সম্বল করে এখানকার মহিলারা বেশ  হুল্লোড়ে থাকেন ঐ দিনগুলোতে ।  যারা অফিস করেন তাঁরাও শুনি উপোসটুকুনি ছাড়তে নারাজ । ভোরবেলা ব্রতকথার ব‌ইখানিতে পেন্নাম ঠুকে কথকতায় চোখ বুলিয়ে তারপর দশটা-পাঁচটায় সামিল হন । সেদিন শিকেয় তোলা মাছের ঝোলভাত-ডাল-চচ্চড়ি। দুপুরে ফলাহার রাতে ময়দার ভাজা সব সুস্বাদু । কারোকে আবার বলতে শুনেছি মায়েদের মুখ বদলানোর সব উপায় করে দেওয়া হয়ে আসছে অনন্তকাল ধরে । কিন্তু সত্যি কি তাই? আসলে প্রতিটি ব্রতকথার আড়ালে যে ছোট উপাখ্যানগুলি আছে সেগুলি প্রচলিত হলেও লোকশিক্ষার মোড়কে হাজির করা হয় আমাদের সামনে । আর বিশেষ দিনগুলি পালনের অর্থ হল সেগুলিকে বারবার নিজেদের সাংসারিক টানাপোড়েনে ঝালিয়ে নেওয়া ।

মনে মনে তাঁরা বলেন "বারব্রত নিষ্ফল হয়না, ধর্মকর্ম যাই কর ঈশ্বরে বিশ্বাস চাই"

 জ্যৈষ্ঠমাসের প্রতি মঙ্গলবারে  কুমারী ও এয়োস্ত্রীরা সংসারের মঙ্গলকামনায় স্মরণ করেন মা মঙ্গল চণ্ডীকে।  বর্ধমানের মায়েরা এইদিন কাঁঠালপাতায় দুব্বোঘাস, ধান, যব ও মুগকলাই রেখে খিলি বানিয়ে মা চন্ডীকে নিবেদন করেন ও পরে কলার মধ্যে সেই ধান-যব পুরে "গদ"  গিলে খান। আমলা বাটা আর হলুদ দিয়ে স্নান করানো হয় মা'কে এবং পাঁচটি ফল দান করতে হয়। 
মঙ্গলচণ্ডীর এই  ব্রতকথায় আছে, জয়দেব ও জয়াবতীর কথা। দেবীমাহাত্ম্য বিস্তারের জন্য স্বয়ং মা দুর্গাই বুড়ী ব্রাহ্মণীর বেশ ধরে মর্ত্যে চলেন। 

"মায়া করি ধরে মাতা জরাতীর বেশ, হাতে লাঠি কাঁধে ঝুলি উড়ি পড়ে কেশ'  

উজানী নগরে এক সওদাগরের বাড়িতে তিনি হাজির হন। প্রখর রোদে হঠাত গিয়ে ভিক্ষা চাইলেন। বেনেবৌ থালায় করে চাল আর টাকা দিয়ে সিধে দিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণীর  সাতটি মেয়ে, একটিও পুত্র নেই। বুড়ি সেই শুনে আর ভিক্ষে নিলেন না।  দিনে দুপুরে ভিক্ষা না নিয়ে চলে যাওয়ায় সংসারের অকল্যাণ হবে জেনে বেনেবৌ কান্নায় ফেটে পড়লেন।  এদিকে সওদাগর খোঁজ করে সেই বুড়ির কাছে গেলেন । বুড়ি তার হাতে একটি ফুল দিয়ে বললে, সেই ফুলটি যদি তার বৌ ধুয়ে জল খায় তবে সে সুপুত্রের জননী হবে। বুড়ো বয়সে বেনেবৌ আবার গর্ভবতী হল। ফুটফুটে ছেলে হল তার। তার নাম রাখা হল জয়দেব।  এবার সেই ব্রাহ্মণী হাজির হল আরেক সওদাগরের গৃহে। তার সাতটি পুত্র, কন্যা নেই। তাই ভিক্ষে নিলেন না তাঁর ঘরে। এবারে কারণ হল কন্যাসন্তানকে প্রাধান্য দেওয়া। ঠিক আগের মত‌ই এই গৃহেও ফুল ধোয়া জলপান করে গৃহিণীর কন্যাসন্তান হল। তার নাম রাখা হল জয়াবতী। পাশাপাশি দুটি গ্রামে জয়দেব আর জয়াবতী বড় হয় । 
তারা খেলে বেড়ায়, আপনমনে ছেলেখেলার ছলে মঙ্গলচন্ডীর পুজো করে। জয়দেবের বিশ্বাস নেই কিন্তু জয়াবাতীর অগাধ বিশ্বাস। এভাবেই একদিন জয়দেবের পায়রা এসে বসে জয়াবতীর কোলে। জয়াবতী দিতে নারাজ । জয়দেব প্রশ্ন করে, সে কি পুজো করছে? জয়াবতী বলে এই চন্ডীপুজো করলে

"হারালে পায়, মলে জিওয় খাঁড়ায় কাটেনা। আগুণে জলে ফেলে দিলে মরণ ঘটে না। সতীন মেরে ঘর পায়, রাজা মেরে রাজ্য পায়'

জয়দেবের তা শুনে ভাল লাগে। জয়াবতীকে সে বিয়ে করতে চায়, মা'কে জানায়। জৈষ্ঠ্যমাসের মঙ্গলবারে তাদের বিয়ে হয় । সেদিন জয়াবতী আঁচল থেকে গদ বের করে গিলে খায়। এবার জয়দেবের জয়াবতীকে পরখ করার পালা। অঢেল ধনরত্ন, গয়নাগাটি নিয়ে জয়াবতী জলপথে শ্বশুরঘরে যাত্রা করে। মাঝপথে জয়দেব জয়াবতীকে বলে ডাকাতের উপদ্রবের কথা। কাপড়ের পুঁটুলিতে সব গয়নাগাটি বেঁধে জয়দেব সেটিকে জলে ফেলে দেয়। জয়াবতী তা দেখে মা চন্ডীকে স্মরণ করে।  শ্বশুরবাড়ি গিয়ে পরদিন বৌভাতে অতিথি আপ্যায়নের জন্য নদীতে জাল ফেলে যে মাছ ধরে আনা হয় সেই মাছ কাটতে গিয়ে লোকজন হিমশিম। বঁটি, দা, কুড়ুল কিছু দিয়েই সেই বোয়ালমাছ টি কাটা যায় না।  তখন জয়াবতীর ডাক পড়ে। জয়াবতী মা মঙ্গলচন্ডীকে স্মরণ করে অতি অনায়াসেই বঁটিতে মাছের পেট কেটে ফেলে আর তার গয়নাশুদ্ধ পুঁটুলিটা পায়। তখন জয়দেবও বুঝতে পারে দেবী মাহাত্ম্য। তাই বুঝি মঙ্গলচন্ডীর পুজোয় এখনো মেয়েরা আওড়ায় এই মন্ত্র

আটকাটি, আটমুঠি সোনার মঙ্গলচন্ডী রূপোর পা, কেন মাগো মঙ্গলচন্ডী হল এত বেলা?
হাসতে খেলতে, তেলহলুদ মাখতে, আঘাটায় ঘাট করতে, আইবুড়োর বিয়ে দিতে,
অন্ধের চক্ষু দিতে, বোবার বোল ফোটাতে, ঘরের ঝি বৌ রাখতে ঢাকতে হল এত বেলা। 

এভাবেই ব্রত উদযাপনের মাধ্যমে সংসারের রমণীটি সংসারের সার্বিক সুখ শান্তি কামনা করে থাকে ।

আরেকটা কারণ হল গ্রীষ্মের দাবদাহে ফুটিফাটা বাংলার মাঠঘাট। মা চন্ডীর পুজোয় যদি সময় মত বর্ষা নামে তবে বাংলার কৃষিপ্রধান বর্ধমান জেলাটির শস্যভান্ডারটিও ফুলে ফেঁপে উঠবে সেই আশায় বুঝি মা চন্ডীর শরণাপন্ন হওয়া।  অন্যদিকে এই সময়টা রোগভোগের প্রকোপও নিদারুণ। তাই সংসারে যাতে সেই প্রাদুর্ভাব না হয় তার খেয়াল ও রাখেন গৃহকর্ত্রী। বাকীটুকুনি মায়ের কৃপা। আসলে ঘরে ঘরে এই শীতলা, ষষ্ঠী, চন্ডীর প্রতিমাসে পুজো তো আর কিছুই নয়। মা দুর্গা  বা কালীর শরণ নেওয়া।  
মহাযানী বৌদ্ধধর্মের অবলোকিতেশ্বর কোয়াননের মধ্যে একটি দেবীমূর্তির পূজা হয়। জাপানীভাষায় এই দেবীর নাম “চনষ্টী”। এই চনষ্টী শব্দটি সংস্কৃত শব্দ চন্ডীর অনুরূপ। সুকুমার সেনের মতে চন্ডী শব্দটি এসেছে চান্ডী থেকে। চান্ডী একজন অনার্যা দেবী, যিনি ওঁরাও, বীর, হোড়দের দ্বারা পূজিতা।আর তাই বুঝি বিরচিত চন্ডীমঙ্গলে আমরা ওরাঁও উপজাতিদের দ্বারা পূজিতা দেবীদুর্গার এই চান্ডী রূপটিই পাই।  কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর এই চন্ডীমঙ্গল সর্বজনবিদিত।তাঁর জন্ম বর্ধমানের দামুন্যা গ্রামে। চন্ডীমঙ্গলে আমরা যে উজানি গ্রামের কথা পাই সেখানে একটি চন্ডীমন্দির আজো আছে। এছাড়া অজয়নদীর তীরে কোগ্রামেও রয়েছে বর্ধমানের পল্লীপ্রেমী কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বিখ্যাত চন্ডীমন্দিরটি। 

  

শ্রাবণী পূর্ণিমা এবং লুন্ঠন ষষ্ঠী

Ei Samay Bardhaman Suppliment, 24th July 2017


বর্ধমান মিউনিসিপালিটির অনতিদূরেই বর্ধমানেশ্বর শিবমন্দির খুব প্রাচীন নয় । বাংলার ১৩৭৯ সালের শ্রাবণমাসেই এঁকে আবিষ্কার করা হয়। বিশাল পরিধির এই শিবলিঙ্গটি না কি চাঁদসওদাগরের আরাধ্য গৃহদেবতা। এনাকে "মোটা শিব" ও বলা হয়। আরেকটি হল নবাবহাটের তালিতের ১০৮ শিব মন্দির। এটি ন্যাশানাল হাইওয়ের ধারেই। বর্ধমানের মহারাজা তিলকচাঁদের বিধবা স্ত্রী বিষ্ণুকুমারী নাকি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এই ১০৮ শিবমন্দির তৈরী করেছিলেন।
১৭৮৮সালে এই মন্দির নির্মাণ কার্য শেষ হয়।

শ্রাবণমাসে মনসাপূজা, অরন্ধন ছাড়াও বর্ধমানেশ্বর আর তালিতের ১০৮ শিব মন্দিরে সারাটা শ্রাবণমাস ধরে চলে বিশেষ শিব পূজা।

শ্রাবণের মেঘজাল ভেদ করে শুক্লা একাদশীর চাঁদ বেরিয়ে আসবে। ধীরে ধীরে তার ষোলকলা পূর্ণ করবে। তারপর সেই পূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্না চুঁইয়ে পড়বে সমস্ত চরাচরে। শ্রাবণের ধারাজলে ধৌত সবুজ প্রকৃতি, বৃষ্টি স্নানে আপ্লুত পাখীকুল সেই শেষ বর্ষার পূর্ণিমার আলো দেখবে । ধানচারা রোপণের আনন্দে কৃষকের মনে পরম তৃপ্তি আর তৃষ্ণার্ত চাতক চাতকীর মন যেন কানায় কানায় পূর্ণ ।
বিশ্বনাথের জন্মমাস নাকি শ্রাবণ। শ্রাবণীপূর্ণিমাতে সেই জন্মমাস উদযাপিত হয় শিবলিঙ্গে জলধারা বর্ষণ করে । আসেপাশের নদী, নালা, সমুদ্র, কুন্ড যা আছে সবই তো বর্ষার জল পেয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা জলাধার। এবার শিবভক্তদের বাঁক কাঁধে নিয়ে খালি পায়ে সেই জলাধার থেকে মাটির ঘটি কিম্বা কলসী ভর্তি করে আবারো পায়ে হেঁটে শিবমন্দিরে গিয়ে শিবলিঙ্গকে সেই জলে সিক্ত করা....এ তো চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। সোমবার নাকি শিবের বার । তাই শ্রাবণের সপ্তাহান্ত গুলো জমজমাট থাকে শিবভক্তদের কোলাহলে। নতুন গৈরিকবাস, নতুন মাটির কলস, বাঁক আরো আনুষাঙ্গিক কতকিছু! আবালবৃদ্ধবণিতা সামিল হয় কাঁবর কাঁধে এই পথচলায়। কিসের এই পথচলা? কিসের এই আকুতি? মহাদেব নাকি ভক্তের বয়ে আনা এই জলেই তুষ্ট হন। কাঁধে বাঁক নিলেই কঠোর সংযম। বাঁক রাখলেই আবার শুদ্ধ হয়ে তবেই পুনর্যাত্রা। ভাল, মন্দ, সৎ অসৎ সকলেই পাপ স্খালনের আশায় এই ব্রত করে।

"ভোলেবাবা পার লাগাও, ত্রিশূলধারী শক্তি জাগাও, ব্যোম্‌, ব্যোম্‌ তারক ব্যোম্‌, ভোলে ব্যোম্‌, তারক ব্যোম্‌ …' এই সম্মিলিত বাণী ছড়িয়ে যায় তারা। তাদের পথচলায় অনুরণিত হয় এই শব্দগুলো বারেবারে আর সেই সাথে থাকে টুং টাং ঘন্টাধ্বনি।

পুরাণে বলে সমুদ্র মন্থন হয়েছিল এই শ্রাবণেই। মহাদেব সেই মন্থনের ফলে উঠে আসা গরল নিজকন্ঠে ধারণ করে নীলকন্ঠ হয়েছিলেন। তাঁর এই বিষের জ্বালা নিরাময়ের কারণেই শিবলিঙ্গে অনর্গল জল ঢালার রীতি।দল বেঁধে প্রতিটি পাড়া থেকে জনায় জনায় কত মানুষ এই শিবলিঙ্গে জলঢালা আর শ্রাবণী পূর্ণিমার মেলায় সামিল হবার আশায় জমায়েত হন বছরের এই সময়টায়। জলযাত্রীদের জন্য পসরা নিয়ে আশপাশের গ্রাম থেকে দোকানিরাও বসে পড়ে। প্লাস্টিকের ঘট, মাটির কলসি, ফুল বেলপাতা, গেরুয়া পোশাক, বাঁক, গামছা, তোয়ালে, বাঁক সাজানোর উপকরণ হিসেবে ঘণ্টা, কী থাকে না সেখানে? এভাবেই বুঝি বছরের পর বছর টিকে থাকে হিন্দুদের শিবমহিমা, তাদের ধর্মবিশ্বাস। শ্রাবণ যে মহাদেবের বড়ো প্রিয় মাস। ভক্তের ঢল নামাতে তিনিও খুশি হন যে!

বৈষ্ণবদের ঝুলনপূর্ণিমার মহামিলনে অথবা শিবমন্দিরগুলির প্রাঙ্গণে শৈবদের এই শ্রাবণী পূর্ণিমাটিও মহামিলনের বার্তা দেয় ।

এছাড়াও মায়েদের হাতের পাঁচ হল শ্রাবণমাসের শুক্লপক্ষের তিথিতে ধুমধাম করে হয় লোটনষষ্ঠীর পুজো। এর ব্রতকথাটিও চমৎকার।
লোটন মানে নোটন, মানে ঝুঁটিওলা পায়রা। একপাল নাতিপুতি নিয়ে কাদম্বিনীর ভরভরন্ত সুখি গৃহকোণ।পাড়ার প্রৌঢ়া বিমলিমাসিও নিমন্ত্রিত।তিনি আবার একটু আধটু ক্লেপট্যোম্যানিয়াক। সকলের অজান্তে টুকটাক জিনিসপত্র সরানোর অভ্যেস আছে তাঁর। গাঁয়ের অনেক লোকের ভীড়ে বিমলিপিসি প্রসাদ খেয়ে বাড়ি ফেরেন। সাথে হাতসাফাই করেন কাদম্বিনীর সোনার তিনটি খুদে লোটন। এই ষষ্ঠীর পুজোতে মাষষ্ঠীর পায়ের কাছে রাখা থাকে ছটি সোনার লোটন । কৌটোর মধ্যেই থাকে লোটনগুলি। সকলে যখন প্রসাদ বিতরণে ব্যস্ত বিমলিপিসি তখনই কাজটি সেরে নেন। ওনার এই স্বভাবটির কথা জানেন গাঁয়ের সকলে। পুজো শেষে জিনিষপত্র গুছিয়ে রাখতে গিয়ে কাদম্বিনী টের পেলেন তিনটি লোটন কৌটোর মধ্যে থেকে চুরি গেছে। তখুনি কাদম্বিনীর সন্দেহ হয়। বিমলিপিসির তলব করলেন তিনি কিন্তু বিমলিপিসি মানলেন না। অতঃপর কাদম্বিনী মাষষ্ঠীকে ডেকে কেঁদে কেটে একশা। মা ষষ্ঠী ভক্তের আকুল আহ্বানে বিচলিত হলেন ও বিমলিপিসির তিনটি ছেলেকে কঠিন রোগে ফেললেন। স্বপ্নাদেশ পেলেন বিমলিপিসি এবং শীঘ্র ঐ চুরি করা লোটন তিনটিকে ফেরত দিতে বললেন। এবার বিমলিপিসি কাদম্বিনীর বাড়িতে লোটন ফেরত দিতে গেল আর ষষ্ঠীর পুজোর নিয়ম জানতে চাইল। টাইমট্রাভেল করে আবারো ফিরে এল শ্রাবণের শুক্লাষষ্ঠী। বিমলিপিসি লোটনষষ্ঠীর পুজো করে তার ছেলেদের নীরোগ শরীর পেল। লোটন চুরি গেছিল বলে এই ষষ্ঠীর আরেক নাম লুন্ঠন ষষ্ঠী।

সারা বাংলার অগণিত মন্দির চত্বরে ষষ্ঠীতলা থাকবেই। আর সেখানে বট, অশ্বত্থ কিম্বা পাকুড় গাছের নীচে, মাটীর বেদীতে, অথবা নদীর ধারে পড়ে থাকবেই পরিত্যক্ত, বিসর্জিত মা ষষ্ঠী, শীতলা, মনসার মূর্তি। মানুষের অগাধ বিশ্বাস, পুজো করে জলে ফেলতেও মন চায়না। আজকাল আবার জলদূষণের জন্য নদীতে ফেলতেও মানা আছে। আর সেই পরিত্যক্ত মাটীর মূর্তিতেই ষষ্ঠী পুজোর সুতো বেঁধে ফলমূল নিবেদন করে আসে মায়েরা। সংসারের মঙ্গল কামনায়। সন্তানের কল্যাণে। অথবা কেবলমাত্র মনের শান্তিতেই মা ষষ্ঠীর আরাধনাতে মগ্ন থাকেন একটি দিন। উপোস করে পয়সা তুলে রাখেন তাকের ওপর। ব্রতকথার পুঁথিটিতে মাথা ঠেকিয়ে সেদিনের মত ফলাহার করেন। প্রত্যেক ষষ্ঠীই আসলে মা দুর্গার পুজো। মায়ের এক অঙ্গে বহু রূপ। মা কখনো চন্ডী, কখনো ষষ্ঠী, কখনো শীতলা। তবে ষষ্ঠীমাতা শুধুই সন্তানবতীদের দেখেন সেটাই বড়ো একচোখোমি।

শ্রাবণমাসে শুধুই কি শিবের পুজো হবে? তাই মা দুর্গা এগিয়ে আসেন নিজের পুজো নিতে। আর তাই বুঝি এইমাসে লুন্ঠন ষষ্ঠীর এত চল। আর সেখানেই পুরুষ আর প্রকৃতির জয়।

৩ জুলাই, ২০১৭

সর্বমঙ্গলা বিপদতারিণী মা দুর্গা


Ei Samay Burdwan Suppliment 3rd July 2017


বর্ধমানের মানুষজনের বিশ্বাস দেবী বিপত্তারিণী হলেন মা দুর্গার অনেকগুলি অবতারের মধ্যে একটি। আষাঢ়মাসে শনি-মঙ্গলবারে মহা ধুম করে এখানে মেয়েরা বিপদতারিণীর পুজো করেন। অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন রীতিতে এ নির্মিত মন্দির হল বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দির । ১৭০২ খ্রীষ্টাব্দে বর্ধমানের মহারাজ কীর্ত্তিচাঁদ হলেন এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠিতা  । 
এখানে দেবী কষ্টি পাথরে অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী মহিষমর্দ্দিনী। এই সেই মন্দির যেখানে দুর্গাপুজোর সন্ধিপুজোয় কামান দাগার ক্ষণটিতে সারা জেলা জুড়ে একযোগে অষ্টমী-নবমী সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম বর্ধমানের কবি রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্যেও উল্লেখ আছে এই সর্বমঙ্গলা দেবীর । 

স্থানীয় মানুষদের কিংবদন্তী  বলে বর্ধমানের উত্তরে সর্বমঙ্গলা পল্লীতে ছিল বাগদী সম্প্রদায়ের বাস। সেখানেই নাকি ছিল এই কষ্টিপাথরের বিগ্রহটি। তারা না জেনে বুঝে এই পাথরটির ওপরে তাদের খাবার জন্য গেঁড়ি, গুগলি, শামুক, ঝিনুক রেখে ভাঙত প্রতিদিন। আর চুনোলী মানে যারা চুন তৈরী করে তারা এসে খোলাগুলি পরিষ্কার করে নিয়ে যেত। একদিন তারা খোলার সাথে সেই পাথরটিও নিয়ে যায় আর চুনভাটির মধ্যে পাথরটিকেও পুড়তে দেয়। কিন্তু পাথরটি পোড়ে না। পরে তারা দামোদর নদে পাথরটি ফেলে আসে। দামোদর নদের  বিছানায় পাথরটি পড়ে থাকতে দেখে এক ব্রাহ্মণ সেটিকে ধুয়ে মুছে এনে সেটির গায়ে দেবীমূর্তির সকল চিহ্ন দেখতে পান ও তক্ষুনি তাকে গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠা করেন ।  
প্রতিবছর এখানকার মেয়েরা নিজেদের বিশ্বাসে হাজির হয় এই জাগ্রত মন্দিরে। কেউ কেউ নদীতে স্নান করে দন্ডী কাটে বিপদ কেটে যাবার আশায়।  ভাবলে অবাক হতে হয়, এই বাংলায় দেবী দুর্গা তবে শুধুই আশ্বিন মাসে পূজিতা হন না । প্রতিমাসেই তাঁর আরাধনা নিয়ে থাকে বাঙালী, সংসারের মঙ্গলকামার্থে, বিপদের হাত থেকে বাঁচবে বলে।
বিপত্তারিণী পুজোর ব্রতকথাটি ঘাঁটলে দেখতে পাই তেমনি এক গল্প যেখানে ধর্মশীল বৈদর্ভ রাজ্যের রাজার রাণী সুরূপা অগাধ বিশ্বাসে মা বিপদতারিণীর ব্রত করেছিলেন । রাজা অনেক দান-ধ্যান,  যাগ-যজ্ঞ করতেন এবং প্রজাপালক রূপে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন । তাঁর রাণী  সুরূপাও ছিলেন ধর্মপরায়ণা। তিনি জাতপাঁতের বিচার না করে সমাজের আপামর স্ত্রীলোকের সাথে সমানভাবে  মিশতেন । এক নিম্ন শ্রেণীর চামার বৌয়ের সাথে তিনি স‌ই পাতিয়েছিলেন । ফলে রাজবাড়িতে এই চামার বৌটির খুব যাতায়াত ছিল । রাণী সুরূপা ভালোভালো খাদ্যদ্রব্য তাকে দিতেন এবং তার বিনিময়ে সেই চামার বৌ রাণীকে নানাবিধ ফলমূল এনে দিত । এইভাবে বেশ চলছিল উভয়ের বন্ধুতা ।

একদিন সুরূপার সাধ হ'ল গোমাংস কেমন হয় তা চাক্ষুষ দেখতে । চামার বৌ তাকে বারবার নিষেধ করল কিন্তু রাণী তাঁর জেদ ধরে বসে র‌ইলেন। অতঃপর চামার বৌ পরদিন একটি থালায় করে চাপা দিয়ে কিছুটা গোমাংস নিয়ে যেমনি রাজবাড়িতে প্রবেশ করবেন তখুনি দ্বারীর তা নজর পড়ল । রাজাকে গিয়ে তত্ক্ষণাত সে নালিশ করলে । প্রহরীকে বেঁধে রেখে রাজা স্বয়ং রাজ অন্দরমহলে গেলেন সত্যতা  যাচাই করতে। রাণী সেই সময় তাঁর স‌ই কে আদেশ দিচ্ছিলেন, সেই গোমাংস পূর্ণ থালাটি  খাটের নীচে লুকিয়ে রাখার জন্য ।
রাজা এসে রাণীকে জিজ্ঞাসা করলেন "তোমার স‌ই তোমার জন্য কি উপহার এনেছে আমাকে দেখাও"
রাণী তো রাজাকে দেখে ভয়ে চোখে অন্ধকার দেখলেন এবং বিপদগ্রস্ত হয়ে মা বিপদতারিণীকে স্মরণ করলেন । কারণ বাড়ীতে গোমাংস ঢুকেছে  জানলে রাজা  রাণীর গর্দান নেবেন।
মাদুর্গার আসন রাণী সুরূপার আর্তিতে টলে উঠল । তিনি রাণীকে যেন কানেকানে বললেন ঐ চাপা দেওয়া থালাটির মধ্যে তার স‌ইয়ের দেওয়া চৌদ্দটি ফল  রাজাকে দেখিয়ে দিতে এবং স্নান সেরে রাজাকে সেই ফলগুলি ব্রাহ্মণকে দান করতে ।  রাণী সুরূপা তো অবাক! থালার চাপা সরিয়ে রাজাকে দেখালেন সেই চৌদ্দটি ফল । মাদুর্গার কৃপায় গোমাংসের চৌদ্দটি ফলে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনা দেখে রাজা এবং  রাণী সুরূপা নিজে তো বিস্ময়ে হতবাক । মাদুর্গা রাণীকে আরো বললেন যে তিনি স্বয়ং বিপদতারিণী মা । যে তাঁকে স্মরণ করবে তার কোনো বিপদ আপদ হবেনা ।
রাণীকে যাবজ্জীবন এই ব্রত পালন করতে বলে তিনি অন্তর্হিত হলেন। রাণী এভাবে বিপদ থেকে মুক্তি পেলেন।
রাজা স্নান সেরে এসে সেই ফলগুলি ব্রাহ্মণসেবায় দিলেন । মা বিপদতারিণীর অলৌকিক ক্ষমতায় সেদিন সুরূপা প্রাণে বেঁচে গেছিলেন।   
সেই থেকে বর্ধমান তথা সারা বাংলার এয়োতিরা এই বিপদতারিণী পুজোয় সামিল হয়ে নিষ্ঠাভরে দেবী দুর্গার পুজো করেন।  শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া থেকে দশমী অবধি যে যে শনি ও মঙ্গলবার পড়ে সেগুলিতে এই ব্রত পালনের নিয়ম। একটি চুপড়িতে তেরো রকমের ফল (দুটি খণ্ড করা), তেরো গাছা লাল সুতো, তেরো রকমের ফুল, তেরোটি মিষ্টি, পান, সুপারী হল এই পুজোর উপাচার। পুজো শেষে ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা দিয়ে তেরোটি গাঁট দেওয়া লাল সুতো বা তাগা  মেয়েদের বাঁহাতে আর ছেলেদের ডান হাতে বেঁধে দেবার  নিয়ম।
আর পুজো শেষে যেনতেনপ্রকারেণ তেরোটি নুন না দেওয়া লুচি খেতেই হবে উপোসী ব্রতীকে। তাই দেখেছি এই পুজোর দিনে ছোট্ট ছোট্ট লুচি বানাতে, পেট ভরে গেলেও যাতে শেষ করা যায় তেরোটি।  আর সারাদিনে পুজো করে ঐ একবারই খেতে পারবে সে। কোনও তরকারী খাওয়া চলবে না ঐদিন।
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। এভাবেই মা বিপত্তারিণী একাধারে সংকট হারিণী আবার বাংলায় অবশ্য কর্তব্য আষাঢ় মাসের দুর্গা পুজোও বটে।

১৪ ফেব, ২০১৭

ভ্যালেন্টাইনস ডে

ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিল না আমাদের সময়ে । কিন্তু তখনো প্রেমে পড়ত ছেলেমেয়েরা । আর বসন্ত এলেই প্রেমের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিত তারা । যেমন এখনো দেয় সকলে।  পালন করত নিত্য নতুন ভ্যালেন্টাইনস ডে । কখনো হোলি, কখনো সরস্বতী পুজো কে উপলক্ষ করে। 
আর প্রণয়ের পারাবারে সাঁতার কাটতে কাটতে বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীরা ? দৈনন্দীন জীবনের একঘেয়েমিতে কেমন পাগল পাগল ভাব নিয়ে  তারাও মাঝে মাঝে পালন করত ভ্যালেন্টাইন্স ডে । স্বামী তার বিশেষ দিনটিতে স্ত্রীয়ের জন্য ছোট খাট সোনার গয়না কিনে উপহার দিতেন । অথবা আচমকা নিয়ে আসতেন বম্বেডাইং এর ফুলকাটা সুন্দর ডাবল বেডশিট। কোনও বার গিন্নীর জন্যে একটা ফুরফুরে পাতলা ডি সি এম এর ভয়েল কিম্বা  ফুলিয়ার টাঙ্গাইল।  অফিস থেকে ফেরার পথে, জলযোগের মাংসের প্যাটিস কিম্বা ফারপোর ফ্রেশলি বেকড কেক নিয়ে বাড়ি ফিরে বলতেন... 
"কি গো চা বসাও ? দেখ আজ কি এনেছি, তোমার জন্যে" 
কিম্বা পকেট থেকে বের করতেন বিশ্বরূপা, রঙমহল এর নাটকের সস্তার টিকিট দুটি। 
সদ্য শীতের আলস্য কাটিয়ে তাঁর গৃহিণীটি ঘরের মধ্যে থেকে গা ধুয়ে কিউটিকিউরার ফুলেল গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে নরম ছাপা শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে সলজ্জে যেন হাতে চাঁদ পেতেন। কত অল্পে খুশী ছিলেন এঁরা। এগুলি যেন সংসার করার পার্কস বা উপরি পাওনা, বোনাসের মত। এ সব দেখেছি আমাদের বাবা মায়েদের আমলে ।
মনে আছে এমনি মধুর নাতিশীতোষ্ণ সময়ে একবার কলকাতার বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের সারারাত ব্যাপী জলসার টিকিট এনেছিলেন বাবা। হেমন্ত-আরতির গান দুজনেরি খুব পছন্দ। আর তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় খ্যাতির শীর্ষে আর আরতি মুখোপাধ্যায় নবাগতা। এই সারপ্রাইজে মায়ের মুখের হাসিটুকু বাঁধিয়ে রাখা হয়নি কারণ আমি তখন মাত্র ক্লাস ফোর এ।   
স্কুল জীবনের সরস্বতী পুজোর স্মৃতিটা বেশ অন্য ধরণের । যত বড় ক্লাস তত দায়িত্ত্ব । আর ক্লাস টেনের পুজোটা সবচেয়ে সুখের । সেখানে ছোটোদের ওপর দিদিগিরি আর যারপরনেই ফতোয়া জারি করা । সরস্বতী পুজোটা যেন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পাসপোর্ট হাতে পাওয়া । মায়ের হলদে শাড়ি পরে সেজে গুজে একদম ফিল্মি লুক নিয়ে স্কুলের পুজোয় সামিল হওয়া । কিন্তু আমি যে কলেজে পড়েছি সেই কলেজে মা সরস্বতী কলেজ-কন্যাদের রক্ষণশীলতার বেড়াজালেই শুধু আবদ্ধ রেখেছিলেন । মা সরস্বতীর পুজো সে কলেজে ব্রাত্য । অগত্যা বাড়িতে নিজেদের মত করে পুজো করে যে যার গ্রুপ তৈরী করে বেরোনো । ঠাকুর দেখা, খাওয়াদাওয়া, সিনেমা দেখা ব্যাস্‌ ! ঐ অবধি । ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিলনা শেষ আশির দশকে । অতএব নো প্রেম-প্রেম খেলা বা ভ্যালেন্টাইন উত্সব । সরস্বতী পুজোই আমাদের বসন্তের একমাত্র বহু প্রতীক্ষিত বসন্ত উত্সব ছিল । ফাগুণ হাওয়ায়, রঙে রঙে বেশ ছিলাম আমরা । ডিজিটাল গোলাপ ছিলনা, মুঠোফোনের রিংটোনে সংক্ষিপ্ত সংবাদ আসতনা হয়ত কিন্তু ভালোবাসা ছিল সরস্বতীর প্রতি ।



আমাদের বিয়ের ঠিক আশপাশের সময় থেকে শুরু হ'ল ভ্যালেন্টাইন্স ডে । লেট আশির দশকে । ব্যাস! সেই থেকে শুরু "ভ্যালেন্টাইন প্যাকেজ"  ফুলের দোকান থেকে শুরু করে গ্রিটিংস কার্ড , গয়না থেকে কেক, মকটেল, কফি, আইস ক্রিম সর্বত্র সেই তীর বিদ্ধ হৃদয়ের ছবি !  শপিং মলে ঝুলছে বিশাল বিশাল রক্তাক্ত হৃদয়, টিভির পরদায় প্রেমের গান, প্রেমের ছবি, প্রেমের কবিতা আবৃত্তি । আর এসেমেসের চোটে আগের দিন মধ্য রাত থেকে সেলফোনের নেট ওয়ার্ক হ'ল বেজায় স্লো হওয়া... এসব ও দেখেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেলফোন হাতে নিয়ে মুচকি হেসে কথা বলা? এসব ও দেখেছি বহুত। আর ল্যাপটপে চ্যাটালাপ? আর ম-বাবার ঝটিতি আগমন এ কন্ট্রোল টি মেরে অন্য ট্যাব খুলে গা ঢাকা দেওয়া? তাও দেখেছি। 
সামনেই সব ছেলেপুলেদের বড় বড় পরীক্ষা ! তো কি ? পরীক্ষার আগে একটু ডাইভারশান চাই না ? তাই তো সাধু ভ্যালেন্টাইন এই উপায় বাতলেছেন ।
গতবছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে'র দিন সকালে মর্নিং ওয়াকে গেছি; এক ভদ্রলোক তার সহধর্মিনীকে বলছেন " এই রোজ রোজ তোমার পাল্লায় পড়ে সকালে হাঁটতে বেরোনো আমার জীবন বিষময় করে তুলছে" 
নীরব স্ত্রীটি হাঁটতে লাগলেন আরো জোরে জোরে । 
ভদ্রলোক বললেন " খাবার ওপর ট্যাক্স ও বসালে , আর হাঁটাও ধরালে ...তাহলে যেকোনো একটাই করো হয় খেতে দিও না, নয় হাঁটতে  বোলোনা"আমার মা বেঁচে থাকলে দেখিয়ে দিত তোমার মজা  সব কিছুতেই  কাঁটছাঁট ! চায়ে চিনি বন্ধ , সকালে একগাদা ফল খাও , দুপুরে ভাত নৈব নৈব চ ! রাতে মোটে একটা রুটি ! কি কুক্ষণে একটা সেমি-ডায়েটিশিয়ান বৌ এনেছিলাম" 
বেচারী বৌটি তখনো চুপ !  
স্বামীটি আবারো বললে " দাঁড়াও দেখাব মজা , অফিসের বেয়ারাকে দিয়ে ভাল ভাল খাবার আনিয়ে খাব, তুমি জানতেও পারবে না" 
তখন বৌটি আর থাকতে না পেরে মুখ খুলল "আজকের দিনে ঝগড়া করতে  নেই গো , আজ প্রেমের দিন, আজ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে আর তুমি কি না শুধুমুদু আমাকে সক্কালবেলা গালাগালি দিচ্ছ ? আমি যে তোমার ওয়ান এন্ড ওনলি ভ্যালেন্টাইন !" 
একটা সময় ছিল যখন বসন্তের প্রথমদিনে লালগোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কোর্টশিপ চালু  হত । দোল  রঙীন হত  নীল খামে পারফিউম মাখানো চিঠির ভাঁজে লিপষ্টিকের চুমু দিয়ে ।  লুকিয়ে চুরিয়ে পার্কে গিয়ে দেখা করে কিম্বা কলেজ পালিয়ে কফিহাউসের টেবিলে মুখোমুখি হয়ে, হেদুয়া থেকে শ্যামবাজার গা ঘেঁষে ঘেঁষে হেঁটে  বাসে ওঠা ; আবার মনখারাপের পার্টির তোড়জোড় । আবার কবে হবে দেখা ? বাড়ির বড়দের চোখ এড়িয়ে চুপিচুপি লেটারবাক্স হাতড়ে চিঠি খোঁজা । টানটান উত্তেজনায় চিলেকোঠার দুপুরগুলোয় সেই কফিহাউসের স্মৃতির লালন চলত আবার যতদিন না দেখা হয় দুটিতে ।

ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সাথে । ভালোবাসার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । কত চোখ এড়িয়ে প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত ।    এখন   ভালোবাসার বাতাস বয় অর্কুট অলিন্দে। ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা  ভালোবাসা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই প্রেম ।


 প্রেম ছিল তাই রক্ষে! প্রোপোজ ডে, কিসিং ডে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, হাগ ডে,  দোল   ... এই সব দিনগুলোতো  ঐ প্রেমকেই ঝালিয়ে নেবার জন্যেই। প্রেম না থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হত? সারারাত ধরে অনলাইন চ্যাট করে রাতে আধোঘুমে স্বপ্নসুন্দরীকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কোথা দিয়ে একটা সুন্দর সকাল এসে পড়ল ! আর এই মোবাইলফোন ? সেও তো প্রেমের একটা দারুন পজিটিভ ক্যাটালিস্ট । কত সহজে একটা কথা মেসেজ করে জানিয়ে শুরু হয়ে যায় প্রেম । আর ঐ বিশেষ দিন গুলোতে  মনের মানুষটির হাতের মুঠোয়   ভালোবাসার দুটো কথা টুক করে চলে যায় । আঙুলে আঙুলে এমন চটপট প্রেম কিন্তু আগে ছিল না । এখন অনেক সহজ হয়েছে দুনিয়া ।বাজারে   গ্রিটিংস কার্ডের হার্ডকপি  ফুরোল, ভালোবাসার নটেগাছ লকলক করে ডালপালা বিস্তার করে দিল ওয়েব দুনিয়ায় ।


ভালোবাসার উপহারের তালিকায় কাফলিঙ্ক, টাইপিন  এখন অবসোলিট ; আইপড কিম্বা পেনড্রাইভের কাটতি বেশী ।   ভালোবাসার কবিতার খাতা লুকিয়ে থাকত বালিশের নীচে । আর এখন সেই কবিতা ঝরে ঝরে পড়ছে ফেসবুকের বারান্দায়, কার্ণিশে সর্বত্র । তবে ভালোবাসা আছে ভালোবাসাতেই । ভালোবাসা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে । শুধু আগে  শাড়িতে ব্লাউজে ছিল এখন কুর্তি, কেপরি লেহেঙ্গা আর জিনসে ।
তখন ছিল তরতাজা সত্যি গোলাপ । আর এখন তা ডিজিটাল গোলাপ । ছিল বসন্ত কেবিনে দুজনে মুখোমুখি দুটো ডিমের ডেভিল কিম্বা ফাউল কাটলেট । এখনো সেই সংজ্ঞা বদলায়নি কিন্তু চপ-কাটলেট থেকে প্রেম এখন বার্গার-মকটেলে আছড়ে পড়েছে অবিরত । 


ভালোবাসার চুপকথারা তখনো ছিল এখনো আছে শুধু বদলেছে তার মোড়ক । এখন চুপকে চুপকে নয়, ওপেন সিকরেট ।   তখন এই কূলে আমি আর ঐ কূলে তুমি টাইপের একটা ব্যাপার ছিল আর এখন অর্কুটে আমি আর ফেসবুকে তুমি মাঝখানে একরাশ ডেজিটাল ঢেউ । কিন্তু এখন ভালোবাসা আরো স্মার্ট হয়েছে ।  গুরুজনের সামনে ধরা পড়ে গেলে  কন্ট্রোল টি মেরে পালাও । তখন কিন্তু কাপড়ে চোপড়ে টাইপের অবস্থা ছিল । ভালোবাসার আয়ু বেড়ে গেল ভ্যালেন্টাইন পুজোর দৌলতে, আন্তর্জালের কৃপায় । মাঝখান থেকে বসন্তের কোকিল এই টেক দুনিয়া ছেড়ে পালিয়ে গেল । মোবাইল  রিংটোনের  দাপটে তার নিজেরই আজ ভাল্লাগেনা কুহুতান  ধরতে ।

আর ভালোবাসার উষ্ণতার পারদও চড়ছে বসন্ত সমাগমে । কারণটা কি গ্লোবাল ওয়ার্মিং ???