১৬ অক্টোবর, ২০১৭

কার্তিক লক্ষ্মী দীপান্বিতা এবং ধনতেরস



এইসময় বর্ধমান সমাচার ১৬ই অক্টোবর ২০১৭
বর্ধমান হল পশ্চিমবাংলার অন্যতম বিজনেস সেন্টার। মাড়োয়ারি, গুজরাটি সহ বহু রাজ্যের মানুষের বাস এখানে। সেই সঙ্গে যে বাঙালীরা এখানকার প্রাচীন বাসিন্দা তাদের সকলের সংস্কৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে এই জেলায় কার্তিকমাসের অমাবস্যা তিথিতে কালীপুজোর দিনে ঘটিদের হয় দীপাণ্বিতা লক্ষ্মী পুজো। অবাঙালী ব্যবসায়ীরা বলে দীপাণ্বিতা কালীপুজো।

দীপাবলী বা দেওয়ালির সঙ্গে আমরা পরিচিত। তবে দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর কথা অনেকেই জানিনা। রামায়ণ অনুসারে দীপাবলী হল রামের রাবণ বধ করে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করা উপলক্ষে আলোক উৎসব। দীপাবলীর আলোকসজ্জা এবং শব্দবাজি সেই অধ্যায়কে সামনে রেখেই আজও সমাদৃত ।কোজাগরীর ঘোর কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর পরদিনেই ভূতচতুর্দশী। শুক্লপক্ষে আকাশ আলো করা রূপোর থালার মত চাঁদ, হিম ঝরানো জ্যোত্স্না আর শারদীয়ার মনখারাপ। দিন পনেরো কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণপক্ষের সূচনা। ভূত চতুর্দশীর প্রস্তুতি। পূর্ণিমার চাঁদ এখন ঘুমোতে গেছে। ঝুপসি অন্ধকার আকাশের গায়ে।আসন্ন দীপাবলীর আলোর রোশনাই আর আকাশছোঁয়া ঘরবাড়ির আলোয়, বাজির গন্ধকী গন্ধে ভরপুর বাতাস। হিমের পরশ, ঝিমধরা নেশাগ্রস্ত ... ঋতু বৈচিত্র্যময়তায়

কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয়। কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়। নবরাত্রি উৎসব শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলি শুরু হয়।
দীপাবলীর আগের দিন চতুর্দশীকে বলা হয়নরকা চতুর্দশী।দেবী কালী নাকি কার্তিকমাসের এই চতুর্দশীর রাতে ভয়ানক অত্যাচারী নরকাসুরকে বধ করেন।

চতুর্দশী পরের অমাবস্যা তিথি দীপাবলী উৎসবের দ্বিতীয় দিন শাক্ত ধর্মের অনুসারীগণ শক্তি দেবী কালীর পূজা করেন।
আলোকসজ্জার মাধ্যমে অন্ধকারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার দিন। সকল অজ্ঞতা তমোভাবকে দীপের আলোয় প্রজ্বলিত করার দিন। কেউ বলেন মহালয়ায় যমলোক ছেড়ে যে পিতৃপুরুষগণ মর্ত্যে এসেছিলেন, তাঁদের পথ প্রদর্শনার্থে দিন আলোকসজ্জা বাজি পোড়ানো হয়, দরজা-জানালায় মোম বাতি দেওয়া হয় কেউ বা জ্বালায় আকাশপ্রদীপ।

ধনাগমের জন্য মানুষ করে ধনতেরস লক্ষ্মী-গণেশের পুজো। মূল উদ্দেশ্য একটাই। শ্রীবৃদ্ধি আর উন্নতি।

পশ্চিমবাংলায় অনেকের রীতি কালীপুজোর বিকেলে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপূজো করে অলক্ষ্মী বিদেয় করা সংসারের শ্রীবৃদ্ধির আশায় লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজো পিটুলি বাটা দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরী হয় তিন পুতুল.... সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল নারায়ণ, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়

চাটাই বাজাতে বাজাতে বলা হয়,

"অলক্ষ্মী বিদেয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক্" আসলে কুললক্ষ্মীর পুজো এই দীপাণ্বিতা

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতেই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধ্বন্বন্তরী। তাই এই তিথির নাম হল ধনতেরস। তাই এই দিনটিতে ধনের উপাসনা করতে হয়। আর তার ঠিক পরেপরেই লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়। সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেদিন নাকি ছিল কার্তিক অমাবস্যা। তাই লক্ষ্মীকে বরণ করে স্বর্গে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুষ্ঠানটিতে আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল স্বর্গকে। এই দিনে ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী বরদাত্রী রূপে ভক্তের মনোস্কামনা পূর্ণ করেন।
দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজোর ব্রতকথায় আবারো উঠে আসে লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য
এক রাজার পাঁচ মেয়ে। একদিন তিনি সকলকে ডেকে জিগেস করলেন, তারা কে কার ভাগ্যে খায়? কনিষ্ঠা কন্যাটি ছাড়া প্রত্যেকেই সমস্বরে জানাল, রাজার ভাগ্যে তারা খায়। কিন্তু কনিষ্ঠা বলল সে নিজের ভাগ্যে খায়। আর মা লক্ষ্মী তার সহায়। সেই কথা শুনে রাজা অগ্নিশর্মা। ঠিক করলেন পরদিন ভোরে উঠে যার মুখ দেখবেন তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন। পরদিন রাজবাড়ির সামনে দিয়ে এক বামুন তার পুত্রকে নিয়ে যাচ্ছিল। তাকে ডেকে তিনি ছোটমেয়ের বিয়ে দিলেন। পুত্র রাজার জামাই হল বলে বামুন একাধারে খুশি আবার মহাচিন্তিত। রাজকন্যা তো মহানন্দে শ্বশুরবাড়ি চলল। অভাবের সংসার। মেয়েটি শ্বশুরকে বলল, রাস্তায় যা দেখবেন সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। বামুন একদিন একটি মরা কেউটে দেখতে পেল। বৌমার কথামত সেটি ঘরে নিয়ে এনে মাচায় তুলে রাখল। এবার সে দেশের আরেক রাজার ছেলের অসুখ করেছে। রাজবৈদ্য বলেছে মরা কেউটের মাথা আনলে ওষুধ তৈরী করতে পারে। সেইমত রাজা ঢেঁড়া পেটালেন। যে মরা কেউটের মাথা এনে দিতে পারবে সে যা চাইবে তাই দেবেন
সেই শুনে রাজকন্যা তখুনি সেই মরা কেউটের মাথাটা রাজার কাছে পাঠিয়ে দিল। আর সেই সঙ্গে তার শ্বশুরকেও বলে দিল, রাজা কিছু দিতে চাইলে যেন তিনি না নেন শুধু রাজার কাছে তার অর্জি হল একটাই। কার্তিক অমাবস্যায় রাজার রাজত্বের কোনো গ্রামে কেউ যেন ঘরে আলো না জ্বালায়। রাজকন্যার শ্বশুর তা জানিয়ে ফিরে এলেন খালি হাতে। অবশেষে কার্তিক অমাবস্যার রাতে রাজকন্যা নিজের ঘরে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে লক্ষ্মী পুজো করল।নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতে আলো জ্বেলে রাখল। মা লক্ষ্মী দেখলেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেবল তাঁর ব্রতীর ঘরেই আলো জ্বলছে। তাঁর কৃপায় বামুনের ঘরে আর কোনো অর্থাভাব ইল না। অবস্থা ভাল হতে বামুন পুকুর কাটালেন। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিন নিমন্ত্রিতদের মধ্যে রাজকন্যার বাবা ভূতপূর্ব রাজাও উপস্থিত। তিনি জানালেন তাঁর দুরবস্থার কথা। নিজের অহমিকায় তাঁর সর্ব নাশ হয়েছে। তিনি আজ ভিখারী। মেয়ে জানাল, "বাবা তুমি লক্ষ্মীপুজো কর। তুমি সেদিন রেগে গিয়েছিলে আমার ওপর। আজ দেখলে তো মা লক্ষ্মীর কৃপাতেই আমার সব হয়েছে"

কোন মন্তব্য নেই: