২৩ জুন, ২০২০

জগাদা-কোভিড সিরিজ

হ্যাঁ গা বিমলা! দু সপ্তা কোয়ারেন্টিনেই নাহয় থাকব। তুমি মাঝরাতে চলে আসবে তো আমার ঘরে? তোমায় না দেখলে, না ছুঁলে আমার জীবন বড়থা মনে হয়। জগা দা হোয়াটস্যাপ করল।  বিমলা টাইপ করে...কি জানি বাপু! এখন ছোঁয়া বারণ। আমার যদি কোভিড হয় তখন তুমি তো আমার মাথাটাও টিপে দিতে পারবেনা।ঠুঁটো নাগর থাকার যে কি যন্ত্রণা তা আমার চেয়ে আর কে ভালো বুঝবে? কি যে দরকার ছিল এবছর তোমার এই মহাস্নানের! বলে তাত সয় তো বাত সয় না। বারণ তো শোনো না। এবার জ্বর তো আসবেই। তারপর তুমি আবার ওষুধ গিলবে না। আমায় পাঁচন বানিয়ে মরতে হবে। আমার হল মহা জ্বালা।তারপর তোমার হলে তোমার ঐ সাগরেদ দুজনেরও হবে ছোঁয়া লেগে।     কিচ্ছু হবে না দেখো। আমি বলে দিলাম। আমার কাছে এসো রোজ রাতে একবার করে, আগের মতন। তোমার গায়ের গন্ধেই আমার সব টেনশন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।  আজ্ঞে মশাই গত তিনমাস আমার গায়ের ফুল চন্দন চর্চিত সেই গন্ধ আর নেই। আমি এখন সাফসুতরা শহুরে পটের বিবিদের মতন।বিমলা লিখল হোয়াটস্যাপে।    কিচ্ছু চিন্তা করোনা বিমলা। নারায়ণী শীর্ষদেশে, সর্বাঙ্গে বিমলা বাহিনী। জগা দা টাইপ করল। 
...
আমায় যেতিই হবে। আমায় যেতি দিতি হবেই।
সত্যিই তো! সম্বচ্ছর স্বেচ্ছায় নিভৃত যাপন করে তারা। বছরে একবার মোটে বাইরে পা দেয়। তাও আবার দিন সাতেকের জন্যি। তাদের বুঝি মনের ভেতরটা হু হু করেনা?
বেড়াতি যাবুই আমরা। তায় এবছর কতদিন বাইরের লোকের পর্যন্ত মুখ দেখিনা!

গতকাল রাত অবধি দোটানায় ছিল তিন ভাইবোন। একবার ব্যাগ গুছোয় তো আরেকবার সব ঢেলে ফেলে দেয় মনের দুঃখে। উত্তেজনা তার‌ই তুঙ্গে। কি পরবে? কি মাখবে? কি গয়নাগাটি সঙ্গে নেবে? আর উত্তেজনা বড়জনের। সঙ্গে যাবে সাতদিনের মত সোমরস। তার তোড়জোড় নিখুঁত করে। সঙ্গে মুখরোচক সব স্ন্যাক্স। নিমকিই হরেক কিসিমের। ভাজা মশলা দেওয়া শুকনো সিঙ্গারা। রকমারি বাদাম। শুকনো ফল। বেসনের ভাজাভুজি। জগা দা ভাইবোনের কথা ভেবে অস্থির ছিল এ ক'দিন। যাব কি যাব না। ভেবেই অস্থির সে। প্রতিবছর বিমলি যা ক্ষেপে থাকে তাদের তিন ভাইবোনের এই বেড়াতে যাওয়ার ধুম দেখে! এবার কি ভাগ্যি সে সিনে নেই! নিজেই কোয়ারিন্টিন করে রেখেছে নিজেকে তার কারণ অবিশ্যি কোভিড নয়। অম্বুবাচী পড়ে গেছে বলে। জগাদা বলে বলে থকে গেছে বিমলি কে।
বছরের ঐ চারদিন তুমি যে কি কর! এত্ত ছুঁতমার্গ এ যুগে হয়না বিমলি।
বিমলি নারাজ। চারদিনের চান হোক। আবার এসো আমার ঘরে।
এ যুগে আমার এসব ভালো লাগেনা বিমলি।
এই করতে করতে অবশেষে মধ্যরাতে অনুমতি এয়েচে। হেডাপিস বলেছে, তারা বেড়াতে যেতে পারে। ব্যাস! এবছর নিজের গাড়ী বের করার রাস্তা বৃষ্টি তে ধুতেও হবেনা জগাদা কে। বৃষ্টি এবার আষাঢ়ের আগেভাগেই এসে গেছে।কিন্তু মাস্ক? সুভদ্রার মনখারাপ। সব সাজ নষ্ট হয়ে যাবে। বলরাম অবিশ্যি বয়সে সবার বড় তাই মাস্কটা বেঁধেই নিয়েছে মুখে। কোভিডে ধরলে নাকি রক্ষে নেই। জগাদা বিন্দাস। মাস্ক নামিয়ে রেখেছে। একবার নাকের ফুটো বের করে তো একবার থুতনিতে ঝুলিয়ে নেয়। যাবার আগেই বিমলি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পরিয়েই ছেড়েছে। তোমার না দিন পনেরো আগেই চান যাত্রায় বেদম চান করে জ্বর এয়েচিল! আমি ছিলুম তাই পাঁচন গিলিয়ে পথ্যি করেছি। তাই আজ সুস্থ হয়েছ! নির্লজ্জ, বেহায়া মিনসে ! মাস্ক পর মাস্ক। আর শোনো তিনজনের হ্যান্ড স্যানিটাইজারটা দয়া করে পকেটের মধ্যে রেখো না। বাইরেই রেখে দাও।
জগাদা ভাবে শালা! এমন রথ এ জম্মে বের করিনি! এর চেয়ে না যাওয়াই ভালো ছিল!

৩ জুন, ২০২০

অভিশপ্ত বুধবার


একডজন লকডাউনের বুধবার পেরুবো আজ। গত দুটো বুধবারের সেই অভিশপ্ত ঝড়ের রাতের দগদগে ঘা এখনো শুকোয় নি আমার। আজ আবারো বুধবার এসে পড়লেই বুক চিন্‌ চিন্‌ করছে। আড়ষ্ট হয়ে আছি। তার মধ্যে মৌসুমী বায়ুর কেরালায় প্রবেশ। মনসুন এসে গেলেই অন্যবার মনে হয় একটা ফিলগুড ফ্যাক্টর কাজ করছে আমাদের সবার। ভালো চাষবাস হবে, দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। জিডিপি বাড়বে সেই আশায়। এবার সে গুড়ে বালি। একে একে বিয়ের মরশুম বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ পেরিয়ে আবারো ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক মাসে কোনো শুভকাজ হবেনা বাঙালীর। এই বিয়ের মরশুমে প্রচুর বিক্রিবাট্টা হত। গয়না থেকে শাড়ি, উপহার থেকে খাবারদাবার, মুদিখানা মায় দশকর্ম, প্রসাধনী দ্রব্য থেকে তত্ত্ব সাজানোর ট্রে, ফুল থেকে মালা এমন কি ডেকরেটার থেকে কেটারার... সব ছোটো, বড়, মাঝারি ব্যাবসায়ীদের অর্থনৈতিক মাস এই মরশুম। আবারো অপেক্ষা অঘ্রাণের জন্য। এবছর পুজো, দেওয়ালি তেমন জমবে না। কিছুই কেনাকাটি হয়ত হবেনা। পৌষ আবার মলোমাস।  মাঘ-ফাগুনের পর আবারো চৈত্র মাসে কোনো শুভ কাজ নেই। এসব ভাবছিলাম আমার ভাঙা কাচের আদিগন্ত বিস্তৃত সেই দেওয়ালের দিকে চেয়ে।  হঠাত দেখি উল্টোদিকের একটি বাড়িতে বাঁশ বাঁধা হচ্ছে বেশ সমারোহে। আহা! হোক, হোক। বেশ কিছু লোকজন কাজ করছে। বিয়ে হবে হয়ত ঘটা করে। সব‌ই হয়ত পূর্ব নির্ধারিত। রান্নার ঠাকুর, ডেকরেটার, ফুল, মালা, মাছ, মাংস, শাড়ি গয়না সব কিনবে এই বাড়ির লোকজন। আহা! কিনুক, খরচা করুক। কেন‌ই বা তারা বিয়ে দেবেনা? কিন্তু বর্ষা যেন আর না আসে দাপিয়ে। ঝড় যেন আর না আসে অভিসারে। কিন্তু আজ যে আবার বুধবার। সে কি শুনবে?
গতকালই তো বর্ষার প্রিওয়েডিং ফোটোশ্যুট ছিল। ঘন মেঘনীল শিফনশাড়ি, জলের ফোঁটার মত স্পার্কলিং মুক্তোর গয়নায় কাল দারুণ সেজেছিল মেয়েটা। সবচেয়ে সুন্দর ছিল চোখের মেকআপ। ঘনকালো চোখের পাতা ছুঁয়ে আকাশী রং লাইনার।বিয়ের আগের দিন সব মেয়েদের চোখ থাকে এমনই নরম। তারপর সব কেমন বদলে যাবে টুক করে। নরমে গরমে সেই চাউনিই হবে কাল। ভাবী বর মেঘও কাল ছিল অন্যপুরুষ। পরণে ছিল নেভিব্ল্যু রেশমি  শেরওয়ানি।সে ও বুঝি কঠিন হবে আগের থেকে। এই যেমন হঠাত এল করোনা, তার পেছন পেছন আমাপান। আবার আসছে নিসর্গ। কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগেনি বর্ষা আর মেঘের এবারের এই বিয়ের ভাবনা।

আমাদের জীবন কেমন বদলে বেরঙীন হয়ে গেল! সবটুকুনি কবে বর্ষার প্রিওয়েডিং ফোটোশ্যুটের মত আবারো রঙীন হয়ে উঠবে? 

১৪ মে, ২০২০

অতঃপর

সেদিন টিভিতে দুই অর্থনীতি বিশেষজ্ঞের আলোচনা শুনে বেশ ভালো লাগল। তাঁদের একজনের মতে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের সঞ্চিত কিছু পয়সাকড়ি রয়েছে। গত দুমাস তারাও খুব সীমিতভাবে নিজস্ব চাহিদা সীমাবদ্ধ রেখে খরচাপাতি করেছে।ব্যুটিকে যায়নি, গয়নার দোকানে, শপিংমলে যায়নি, মাল্টিপ্লেক্সে যায় নি, রেস্তোরাঁয় গিয়ে খায়নি, দেদার স্যুইগি জ্যোম্যাটোতে হোম ডেলিভারি নেয় নি। ক্লাবে গিয়ে মদ্যপান করেনি এমন কি গাড়িতে তেল ভরে কোথাও যায়নি।বিদেশে বা স্বদেশে বেড়ানোর জন্য প্লেন বা ট্রেনের টিকিট কাটেনি।খরচের মধ্যে ওষুধপালা, রোজকার গ্রসারি, ফলমূল, সব্জি, মাছ মাংস, ডিম আর সরকারি অনুদানে কিম্বা কাজের লোকেদের নেট ট্রান্সফারে পয়সাকড়ি পাঠিয়েছে। এবার সেই অর্থনীতিবিদ তাঁদের উদ্দেশ্যে বললেন, তাঁরা এবার জিনিষপত্র কেনা শুরু করুন। কারণ সেই চেইন টা অর্থাৎ তাঁদের টাকাকড়ি বাজারে আসুক। সংসারের জিনিষপত্র কিনেই হোক, কাউকে সাবানের প্যাকেট বা টয়লেট সোপ দান করেই হোক কিম্বা কেক কিনে হোক নিদেনপক্ষে স্যানিটাইজার অর্ডার দিয়েই হোক। তাহলে সেই টাকা বাজারে আসতে থাকলে একটা ভালো দিক তৈরী হবে, আমরা জিনিষ কিনলে সরকারের কিছু ট্যাক্স ঘরে আসবে, বিক্রেতার রেভিনিউ আসবে। ধীরে ধীরে এভাবেই চাঙ্গা হতে পারে কিন্তু অর্থনীতি। সেদিন এক নামকরা মিষ্টির দোকানে ফোন করে বলেছি, দোকান খুললে দোহাই আপনাদের দরবেশ, সন্দেশ করবেন না। রসগোল্লা, পান্তুয়া আর পনীর ভাজা, ছানাভাজা বানান। কাটতি হবে। আমরা কিনে ফুটিয়ে নেব। তিনি বললেন, "ভালো আইডিয়া দিলেন দিদি। দোকান খুল্লেই ফোন করব। দুধ তো নিতেই পারছি না কারিগরের অভাবে"
আমার একটি এসি খারাপ, ওয়াশিংমেশিনের একটি পার্টস লাগবে। কিচেন চিমনি, গ্যাস, ওয়াটার ফিলটারের সার্ভিসিং এর ছেলেটি পয়লা বৈশাখের আগে আসতে পারেনি। বছরে দুবার আসে ওরা। পুজো আর পয়লা বৈশাখের আগে। এসির মেকানিক আসতে চাইছে রিপেয়ারের জন্য । টাকার দরকার তার। কিন্তু আমি আসতে বলতে পারছি না তাকে। কারণ আবাসনে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। চোখে জল এসে গেল আমার। আমার চাই সার্ভিস। তার চাই কাজ কিন্তু আমি অপারগ। যোগব্যায়ামের ছেলেটি বেতন পেয়েই বলল, কেন দিলেন ম্যাম? আমি তো যেতেই পারছি না। বললাম এ দুমাস তো দেব। তারপর পারব কিনা জানিনা। তোমার চলছে কি করে? বলল যেটুকু জমি আছে বারুইপুরে সেটুকুন চাষাবাদ করছি আপাতত। হতদরিদ্র মালি আসতে চাইছে হেঁটে হেঁটে। বললাম টাকা পাঠিয়ে দেব। এসো না এই গরমে আর ঢুকতেও দেবেনা তোমায়। চিন্তা নেই কাজ থাকবে তোমার। মালী, যোগ শিক্ষক কেউ জরুরী পরিষেবা নয়। কিন্তু এই টেকনিক্যাল মানুষ গুলো? অনেক ভেবেচিন্তে তাই ঠিক করেছি ১৭ তারিখের পরে এসি মেকানিক কে আর চিমনি, ওয়াটার ফিলটার, গ্যাস মেকানিককে (একজনই করে এসে তাই রক্ষে) মাস্ক পরে ঘরে ঢোকাবো আর নিজেরাও মাস্ক পরে থাকব অন্য ঘরে বসে।আর তাদের প্রাপ্যটুকুনির সঙ্গে দুতিনশো বেশী দেব এবার।কতদিন বেড়াতে যেতে পারব না, রেস্তোরাঁয় খেতে পারব না। তারা তো আমার দেওয়া সেই সামান্য টাকায় বাঁচুক আগে। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মেনে, হাত, মুখ, কাপড়চোপড় সাবানে ধুয়ে, নিজে পরিচ্ছন্ন থাকব। এত ভয় পেলে চলবে না আমাদের। দেশের ও দশের ইকনমির কথা ভেবে।

৬ মে, ২০২০

রবিঠাকুর তোমাকে নিয়ে

ন্মের একশোটা বছর পেরিয়ে সালটা ১৯৬১। অভিজাত মহলে তখন রবীন্দ্রচর্চা হয়। গান, কবিতায় শিক্ষা নেয় তাদের ছেলেপুলেরা। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের জমানা তখন। ঠিক হল রবীন্দ্রজন্মোত্সব পালন হবে। শতবর্ষে সরকারী আনুকুল্যে রাজ্যজুড়ে রবীন্দ্রভবন, রবীন্দ্রসদন, রবীন্দ্র নামাঙ্কিত অডিটোরিয়াম হল।সুলভ মূল্যে সম্পূর্ণ রবীন্দ্র রচনাবলী প্রকাশিত হল মাত্র ৭৫টাকায়।  এই শতবর্ষ উদ্‌যাপনের হিড়িক হল সর্বত্র। কোচবিহার থেকে কলকাতা সহ প্রতিটি জেলাতেই রবীন্দ্র শতবর্ষ পালনে বেশ উত্সবের মেজাজ তখন। জারি হল সরকারী আদেশনামা। সরকারী আদেশনামা পাবার পর প্রতিটি জেলার বিডিওদের মত কোচবিহারের বিডিও এলাহী অয়োজন করলেন। ঢাক ঢোল পিটিয়ে সর্বত্র প্রচারিত হল যে,  আগামী ২৫শে বৈশাখ রবিঠাকুরের জন্মশতবর্ষ পালনের জন্য নির্দ্দিষ্ট সময়ে, নির্ধারিত স্থানে সব মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হল। ঐ দিন সকালে সেই উত্সবে উপস্থিত হয়ে বিডিও সাহেব দেখলেন, মানুষজনের ঢল নেমেছে। অতএব তাঁর প্রচার সার্থক। সমবেত জনতার সিংহভাগ মহিলা। মনে মনে তিনি খুশি হলেন আত্মতুষ্টিতে। কিন্তু অচিরেই তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হল। বিডিওসাহেবকে দেখেই মহিলারা জনায় জনায় প্রশ্ন করতে লাগলেনঃ 
" কোথায় তোমার ঠাকুর? কোথায় হবে পূজা? আমরা সেই কখন থেকে দুধভর্তি ঘটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এসব ঢালব কোথায়?" 
ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল বিডিও সাহেব তাদের বোঝালেন, এ ঠাকুর তোমাদের পুজো করার ঠাকুর নন।   
এনার পুজোর রকমসকম প্রথাগত পুজোর থেকে ভিন্ন। সেই শুনে উপস্থিত মহিলার দল নিরাশ হয়ে একে একে প্রস্থান করেছিলেন।    কারণ এমন ঠাকুরের  পুজোয় তাঁরা অংশ নিতে চান না। দুদিন পর আনন্দবাজার পত্রিকায় ছবিসহ খবরটি প্রকাশিত হয়। কোচবিহারের এই ঘটনার পর থেকেই নাকি রবি নামক ঠাকুরটিকে অভিজাত সরণী থেকে জনতার দরবারে নিয়ে আসার চেষ্টা শুরু হল সেদিন থেকে। মানুষের মনে তাঁকে স্থায়ীভাবে ঠাঁই দেবার প্রক্রিয়াকরণ আজো অব্যাহত। 
তিনি মিশে গেলেন আমজনতার মাঝে। আকাশেবাতাসে আজ শুনি রবীন্দ্রগানের অণুরণন। রবীন্দ্রকবিতায় আজ সাধারণ মানুষ বিভোর। আমাদের ড্র‌ইংরুম থেকে বেডরুম, গাড়ির সাউন্ড সিষ্টেম থেকে ট্রাফিক সিগনাল, কলেজ ফেষ্ট থেকে নবীনবরণ, চলচিত্র থেকে চালচিত্র সর্বত্র তাঁর অবাধ বিচরণ। কারণ তিনি রবীন্দ্রনাথ।    

তথ্যসূত্রঃ রবীন্দ্রনাথ ও মানুষ ছিলেন 
আবদুস শাকুর 
(দীপ প্রকাশন)    

রবিঠাকুর তোমাকে.......

তোমার ভাবনাগুলো আজ আমার সুরে গাইছে । আমার ব্যাথা যখন হানে আমায় তোমার দ্বারে/ তখন তুমিই এসে পথ দেখাও, দ্বার খুলে দাও, ডাকো তারে। ঠিক তখনই ঠাকুর আবারো তোমায় মনে পড়ে।  যখন সেই ছোট্টটি ছিলেম তখন থেকে শুনেছি তোমার নাম । আমাদের পুরোণো বাড়ির সেই তাকের ওপর তোলা ঢাউস রেডিও থেকে, মায়ের কাছে আর স্কুলের রচনার  খাতায় । সেই থেকে হাতে খড়ি ।  তারপর হোঁচট খেয়েছি ব‌ইয়ের পাতায় তোমার সঙ্গে । সাহিত্যের ধারাপাত অধরা তখনো । তারপর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে  মেঘের কোলে রোদ আর রোদের  উঠোনে কথা-কাহিনীর বৃষ্টি মেখেছি। তখন আমি মাধ্যমিক । জীবনস্মৃতি আমার ভালোলাগায়, মন্দলাগায়  আমার হয়ে উঠেছে । নতুন বছর আর বোশেখ মানেই তোমার পথ চাওয়া ।  কালবোশেখির বিকেল গড়িয়ে আমার গীতবিতানের পাতায় গানভাসি সাঁঝ  । আমারো সদ্য টিন-পেরোনো জীবনসিঁড়ি । ওঠানামা , স্কুলের নবীনবরণ, নতুন বর্ষার সবুজ উত্‌সব, আবার তোমার সঙ্গে  যেন মরুবিজয়ের আনন্দ বুকে, তোমার কবিতার বৃষ্টির ফোঁটা নতুন করে গায়ে মেখে। 

অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য্যের সম্পাদনায় “দশজন নারীকে লেখা রবীন্দ্রনাথঠাকুরের শ্রেষ্ঠ পত্রগুচ্ছ এর এক চিঠিতে  পেলাম তাঁর নিজের জন্মদিনেরই  কথা। 

চিঠিটি লেখা কবি অনুরাগী হেমন্তবালা দেবীকে এবং তারিখ হল ২৩শে বৈশাখ :
জন্মদিনের প্রভাতে ঘুম থেকে উঠতেই নানা লোকের কাছ থেকে নানা উপহার এসে পৌঁছ্ত । তখন জীবনের প্রভাতের আকাশ ছিল উজ্জ্বল, স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ; মন ছিল সুকুমার সরস , স্নেহের ছোঁয়া লাগলেই বেজে উঠত মনোযন্ত্রের তার ; তখন জন্মদিনগুলির সমস্ত দিনই গুঞ্জরিত হয়ে থাকত তার রেশ থামতে চাইত না। কারণ তখন পৃথিবী প্রায় ছিল আমার সমবয়সী, পরস্পর এক সমতলে ব‌ইত হৃদয়ের আদানপ্রদানের প্রবাহ; এখনকার জন্মদিন তো আর কাঁচা নয়, কচি নয় ,মন তার সকল প্রত্যাশার শেষসীমায় এসে পৌঁচেছে । সেই আমার অল্প বয়সের ২৫শে বৈশাখের স্নিগ্ধ ভোরবেলাটা মনে পড়ছে ….
শোবার ঘরে নিঃশব্দচরণে ফুল রেখে গিয়েছিল কারা প্রত্যুষের শেষ ঘুম ভরেগিয়েছিল তারি গন্ধে, তার পরে হেসেছি ভালবাসার এই সমস্ত সুমধুর কৌশলে, তারাও হেসেছে আমার মুখের দিকে চেয়ে,
সার্থক হয়েছে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ । 
শোকাতাপা সেই মানুষটির জন্ম হয় বারেবারে আমাদের অন্তরে। তাঁর লেখায়, গানে। 

৩ মে, ২০২০

দিনগোনা কফি






না না সোশ্যালমিডিয়ায় নেট নাগরিকদের তুফান না তোলা অবধি জানতাম না ডালগোনা শব্দটা কোরিয়ার এক জনপ্রিয় টফির নাম থেকে এসেছে। মৌচাকের মত দেখতে এই টফির নাম ডালগোনা। কফির ইতিহাস জানাচ্ছে ভারতেই এই কফির প্রচলন বেশি। একে সবাই "ফেঁতি হুই" বলত।কারণ তুমুল ফেটিয়ে ফেনার মত করে তা বানানো হয়। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় লকডাউনে ইচ্ছে কফি, হঠাত কফি কিম্বা আবারও কফির জন্য মন উচাটন হয়েই রাতারাতি সেলিব্রিটি হয়ে গেছে এই ডালগোনা কফি।অতএব ডালগোনা শব্দ কোরিয়া থেকে আমদানি হলেও ঐ সিঙ্গারার মতই কপি পেস্ট ইন্ডিয়ান কফি ছাড়া আর কিস্যু নয়। আমরা ছোটো থেকেই দেখে এসেছি ইনস্ট্যান্ট কফি এভাবে বানানো। মানে কাপের মধ্যে চিনি, কফি আর একটু গরম জল দিয়ে ফেটিয়ে ফেটিয়ে ক্রিমের মত হলেই ফুটন্ত দুধ বা গরমকালে ঠাণ্ডা দুধ ওপর থেকে ঢেলে কিম্বা কাপের মধ্যে দুধ নিয়ে সেই ফেটানো কফি ফেনার মত ওপরে ঢেলে দিলেই এমন ফ্রদি, টেস্টি কফি তৈরী হতে। 
তা বাপু সে ডালগোনাই হোক, চালগোনাই হোক কিম্বা সর্ষে গোনাই হোক আপাতত এর নাম আমি দিয়েছি দিনগোনা কফি। কারণ এখন আমরা সেই দিনটার দিকে সবাই তাকিয়ে রয়েছি যেদিন সত্যিই আমাদের দেশের তথা রাজ্যের কভিড-১৯ গ্রাফটি ফ্ল্যাট হবে, এবং হতেই থাকবে আর সেই আশায় বুক বেঁধে ততক্ষণ লকডাউনের দমবন্ধ করা বিকেলগুলোতে বানাতেই থাকি এই ডালগোনা কফি। আমি যেমন করে বানাই এই দিনগোনা কফি তার রেসিপি দিলাম।

এর জন্য নেসক্যাফের ১০০ গ্রামের একটা খালি শিশি লাগবে। তিনজনের কফি বানাতে আমি যা যা দিয়ে থাকি...
ইনস্ট্যান্ট কফি পাউডার ২ চামচ
চিনি ২ চামচ
ফুটন্ত গরমজল দুচামচ
ফিলটার কফি ২ চামচ ( যেটি দিয়ে কফিমেকারে দুকাপ জলে ব্ল্যাক কফি বানিয়ে নি)
ফুটন্ত দুধ ২ কাপ
ওপর থেকে কোকো পাউডার (ছড়ানোর জন্য)

এবার চিনি, ইনস্ট্যান্ট কফি আর দুচামচ গরম জল ঐ শিশির মধ্যে ভরে, ছিপি এঁটে ডুগডুগি বাজানোর মত নেড়েই চলতে হবে... হবে... এবং হয়...গুলে যেতে যেতে দিন বয়ে যায়...মানে ডালের দানা গুনতে যেমন ধৈর্য লাগবে আর কি...এবার শিশির ভেতরে তৈরী হল ফেনা বা ক্রিম বা ফেটানো মিশ্রণ যাই বল।
এবার লম্বা কফির কাপে প্রথমে ব্ল্যাক কফি, তারপর ফুটন্ত দুধ । তারমধ্যে এবার ওপর থেকে শিশির মধ্যে থেকে উজাড় করে টপ আপ কর সেই ক্রিম দিয়ে আর স্প্রিংকল কর উদার হস্তে কোকো পাউডার। এভাবে বানানো দিনগোনা কফিতে আমি খুব মিষ্টি দিই না বলে একটু তিতকুটে হয় কিন্তু টেস্ট হয় ফাটাফাটি।    

৩০ এপ্রিল, ২০২০

লকডাউন নামচা


হুরে পটের বিবিরা আজ বেশ পটু হয়ে গেছে ঘরকন্নায়। সংসার বেঁধে ফেলেছে তাদের আষ্টেপিষ্টে। সকাল সন্ধে খাটুনি তো কম হচ্ছেনা তাদের। সেইসঙ্গে মনোরঞ্জনের খামতি তো আছেই। এই কথায় কথায় সেজেগুজে বেরিয়ে যাওয়া। ছুতোয়নাতায় নিদেনপক্ষে গড়িয়াহাট কিম্বা শপিংমল। মানে দিদিমা ঠাকুমারা যাদের বলতেন সংসারে মন বসেনা তারাও বুক বেঁধে, মন দিয়ে নিত্যনতুন রান্নাবাড়া করে সংসারের সবার মন ভোলাচ্ছেন। 
বুড়ো বাবা মায়েরা দিন পনেরো হয়ে গেলেই অস্থির হতেন, কবে আসবি, কখন  আসবি করে মাথা খেতেন কিম্বা এটা দিয়ে যা, সেটা এনে দে করে। তারাও এখন মাথা খাচ্ছেন না। কপচাচ্ছেন না। 
সিরিয়াল প্রেমীরা? কোথায় গেল তাদের নেশা? আগে জিগাইলে ক‌ইতেন, ও বাবা! ঐ টাইমে আমি কারোর ন‌ই। ঐ এপিসোড মিস হলেই যেন জীবন শেষ তার। তাঁরা এখন বই পড়ছেন, খবর শুনছেন। 
কথায় কথায় চিকেন মাটন প্রেমীরা? বেশ তো পারছেন বাপু দিনের পর দিন ননভেজাসক্তি পরিত্যাগ করে।শুধু ডিম নিয়ে জীবন কাটাতে। 
গেলাসপ্রেমীরা? কথায় কথায় বোতল খুলে বসেন যারা? তাঁরাও তো বেশ আছেন ঘুমিয়ে, ভুঁড়ির ওপর হাত বুলিয়ে? 
আর ছোটোরা? তাদের নিয়ে তো মায়েদের জ্বালার শেষ ছিলনা এদ্দিন। তারাও তো দিব্য সোনা হেন মুখে ডাল ভাত তরকারি যা দিচ্ছেন গিলে নিচ্ছে। 
এদ্দিন যাদের বলতাম হাতে ক্যাশ মাইনে দেবনা। তারা বলত মরে যাব।মাইনের টাকা নাকি হাতে করে নিতেই হয়। তারা দূর থেকে এখন দিব্যি ফোনের মধ্যেই টাকা পাঠিয়ে দিতে বলছে। 
আর এই যে "জুম" অ্যাপে ভিডিও কোরোনা বলে বলে থকে যাওয়া পাবলিকরা? তাদের কথাও সেই ধর্মের কল বাতাসে নড়ার মত সত্যি হয়ে ফিরে এসেছে টিভির পর্দায়। এখন দিব্যি জীবন "জুম-বিহীন"হয়ে গেছে তাদের। অভ্যেস আর শিক্ষেয় কি না হয়। এই যে অশিক্ষে আর কুশিক্ষেয় দীক্ষিতরা আজ একবার পুলিশকে পেটায় তো একবার ডাক্তারবাবুদের পেটায় তারা তো জীবনেও মানুষ হবেই না।যারা ঘুরে ঘুরে বাজার করতে ভালোবাসে তারাও ঠিক এমনি। 
কিন্তু আমরা? মানে যারা পোড় খেতে খেতে, ঘষটে ঘষটে এদ্দূর জীবনটাকে কচলালাম মানে যারা কাছেপিঠে বেড়াতে গেলেও ওডোমস কিম্বা মশার ধূপ সঙ্গে রাখি? কলেরা, জন্ডিস বা আন্ত্রিকের ভয়ে মিনারেল ওয়াটার ছাড়া ফুচকা খাইনা কক্ষনো, অথবা আজন্মকাল ম্যালেরিয়ার ভয়ে আটতলার ওপরেও মশারী টাঙিয়ে শুই? 
সত্যিসত্যি করোনার অশৌচকালে অনেক কিছু লেসেন নিলাম যেগুলি মনে রাখবার মত। তবে যারা শুনবেনা তারা অন্য ধাঁচের, ভবি ভোলার নয়।

২৪ এপ্রিল, ২০২০

পত্রলেখা



মুক্তি

তোমায় অনেকদিন দেখিনি। এই ভিডিও কলে যেমন দেখছি তেমন নয়। তোমার ছোঁয়া পেতে চাইছে মন। আজকাল বড়ো মন কেমন করে তোমার জন্য। সেই কবে যেন ছুঁয়েছিলে আমায়।দুজনে পাশাপাশি বসে একে অপরের শ্বাসে-প্রশ্বাসে, হাসি-কান্নায়, সুখের প্রলাপে দুঃখের ঘায়ে একসঙ্গে মলম লাগিয়ে ঠান্ডা হতাম মনে পড়ে তোমার? সেই কাঠি আইসক্রিম নিয়ে নন্দনে গাছের নীচে? কিম্বা মাল্টিপ্লেক্সে মুভি দেখে হতাশ হয়ে কফিশপে ঢুকে? আমার হাত থেকে সিগারেটের বাট টা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তোমার রাগ দেখানো? অথবা আমার গল্পলেখার সময় তোমার খুনসুটি?কতবার গল্পটা টাইপ করে শোনাতেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলে? মনে পড়ে? কপট রাগ দেখিয়ে কথা বন্ধ করে দিনের পর দিন থেকেছি আমরা। তবুও পাশাপাশি তো থাকতাম। এক বিছানা, এক মাদুর, এক সোফা শেয়ার করে রাগে অনুরাগে আড়িআড়ি ভাবভাব খেলেছি আমরা দিনের পর দিন। হোয়াটস্যাপে তোমার বাড়ি ফেরার দেরীতে রাগের ইমোজি দেখিয়েই মনে করিয়েছি রাতে ডিনারের পরে সেই আইরিশ ক্রিম খোলার কথা?ব্যালকনিতে বৃষ্টির ছাঁট এলেই তুমি কেমন গান ধরতে মুক্তি! কতদিন তোমার সামনে বসে গান শুনিনি।কতদিন তোমার সঙ্গে লেকে হাঁটতে যাইনি।তোমার পেটে এক পেগ ভদকা পড়লেই তুমি বলতে এমনি বেঁধে বেঁধে থাকবে আমার সঙ্গে কিন্তু আজ কতদিন হয়ে গেল মুক্তি, আমরা দুজন দুজনকে ছেড়ে ছেড়ে রয়েছি। আমি ভালো নেই মুক্তি। কবে আবার সেই বিদ্যাপতির ভরা বাদর শোনাবে আমায়? কবে আবার তোমার হাতে খাব আমার প্রিয় সেই বালিনিজ কফি? ওপরে ফেনার পরে ফেনা আর নীচে দুধ। আর সেই আলতো হাতে তুমি তার ওপর স্প্রিংকল করে দেবে কোকো পাউডার? আমি লোভ সামলাতে না পেরে একটা ছবি তুলেই ফেসবুকে পোস্ট করে দেব আর উন্মাদের মত গরম সেই কফিতে চুমুক দিয়েই আমার জিভ পুড়িয়ে ফেলব। তুমি তখন সেই জিভ কে আরাম দেবে নিজের মুখের ভেতর পুরে। কিন্তু এখন তা আর হবেনা মুক্তি। এভাবে অনেক দিন তোমায় ছেড়ে আমাকে থাকতে হবে। সেই হ্যারি বেলাফন্টের গানের সেলরের মত। আমার লিটল প্রিন্সেস আমার কাছে আবার কবে আসবে জানিনা কিন্তু আমি তাকে খুব মিস করছি।

" বাট অ্যাম স্যাড টু সে... অন মাই ওয়ে... আই উইল বি ব্যাক ফর মেনি অ্যা ডে...”
আবার আমাদের পাহাড় চুড়োয় সোনাগলা রোদ উঠবে রোজ আর আমি আবারো সেই পালতোলা জাহাজটা নিয়ে তোমার কাছে ফিরবই মুক্তি। বৃষ্টির পর শহরের গোধূলি আকাশে আবারো বিশাল রামধনু দেখব দুজনে একসাথে, শুধু তুমি যদি আমার পাশে থাকো। অনেক দিনের জন্য আমরা একে অন্যের কাছে ফিরব না ঠিকই তবুও তোমায় তেমন করেই ভালোবেসে যাব।
আবার আমরা একসঙ্গে ভীড় বাজারে যাব। মাছ মাংস কিনব। ফিরে এসে রান্না করব দুজনে। হাওয়াতে তখন ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে ঠিক আগের মতন, দেখো মুক্তি।সবাই আবার হাসবে, নাচবে, গাইবে। নন্দনে আবারো আমি গল্প কবিতা পড়তে যাব। তুমি ছবি তুলে দেবে। গড়িয়াহাটের ফুটপাথে হকারদের সঙ্গে তুমি বচসা করে বারগেইন করে জিতবে। আমি আওয়াজ দেব তোমায়। দেখো আবার সব পারব আমরা এক সঙ্গে মিলে।
ভালো থেকো মুক্তি। এই চিঠি কোন ঠিকানায় উড়িয়ে দিলাম জানিনা। তবে আপাততঃ প্রযত্নে ফেসবুকে র‌ইল। তোমার উত্তরের অপেক্ষায়।

ইতি
তোমার


২০ এপ্রিল, ২০২০

লকডাউন মনোলোগ


কটা জিনিষ খুঁজতে গিয়ে আজ আলমারি খুলেছিলাম অনেকদিন বাদে। কেমন সুগন্ধী আবেশে যেন আবিষ্ট হয়ে গেলাম মূহুর্তের মধ্যে। প্রিয় শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে কিসের যেন মাদকতা! পরতে পরতে চেনা চেনা সব গন্ধ। সাহিত্য আড্ডা থেকে শপিংমল, বিয়েবাড়ি থেকে মাল্টিপ্লেক্স, পিকনিক থেকে আউটিং...সর্বত্র মাড়িয়ে আসা, আমাকে আদরে লেপটে জড়িয়ে রাখা শাড়িগন্ধ আমায় কেমন যেন এক মূহুর্তের জন্য আনমনা করে দিল। আমার জীবন্মৃত আত্মার ভেতর থেকে কেউ যেন বলে উঠল, এমনটা কি ভেবেছিলে কোনোদিনো? জীবনে অনেকবার নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছি কিন্তু দিন দশেকের মধ্যে বাড়ি ফিরে আলমারি খুলে মনে হত আমি বেঁচে আছি। আজ হঠাত মনে হল, কি হবে এমন বেঁচে থেকে? শাড়িগুলো, ম্যাচিং ব্লাউজগুলো আর হরেক কিসিমের হ্যান্ডব্যাগ, পার্স, ক্লাচ সব যেন গিলে খাচ্ছে মনে হল। ওরা কেন এমন কটমট করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে?  সত্যি‌ই তো নশ্বর আমাদের এই তুচ্ছ জীবনটা। শেষসময়ে শুধুই পড়ে থাকবে একমুঠো ছাই। তার জন্য এত্ত আয়োজন আমাদের্? বেশ তো চলছে একমাস ধরে । আমাদের চাহিদার লেখচিত্র হঠাত করেই নিম্নমুখী তাই নয় কি? আমরা শাড়ি-জামা-কাপড়-বেডশিট-পর্দা আরো আরো কতকিছু থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছি। এখন শুধুই চোখ যাচ্ছে চালের কৌটো, ডালের ডাব্বার দিকে। ফ্রিজে ক'টা ডিম বা দুধের প্যাকেট পড়ে আছে, আলু-পিঁয়াজের ঝুড়িতে ক'টা আরো আনতে হবে কিম্বা আদা-কাঁচালংকা? নাহ্! এতেই চালিয়ে নেব এই সপ্তাহটা। অথবা হঠাত করে ফ্রিজের কোণায় কুঁকড়ে, অবহেলায় পড়ে থাকা  এক প্যাকেট খেঁজুর কিম্বা একটা স্যুপের প্যাকেট মনটা কে খুশিতে ভরিয়ে দিচ্ছে। এখনো, মানে এই যুদ্ধের ঠিক একমাস আগেও যেমনটি দিচ্ছিল। এই একমাসে কোনোকিছুর পট পরিবর্তন হয়নি আমাদের। শুধু কয়েকটা মৃত্যু ছাড়া। নতুন সংক্রমণ? না কি গোষ্ঠীতে ছড়ালো ফাইনালি? চোখ এখন সেইদিকে শুধু সীমাবদ্ধ।কি হয়, কি হয়! 
পশুপাখিদের জীবনটাই বেশ|আহার, নিদ্রা, মৈথুন ছাড়া অন্য কোনও চিন্তা নেই তাদের। তাদের অতীত স্মৃতি নেই। ভবিষ্যতের চিন্তা নেই | আছে শুধুই বর্তমান। কিন্তু মানুষ তো আমি। তাই বুঝি আলমারি আজ বন্ধ না করে পাখা চালিয়ে হাওয়া খাওয়ালাম বেশ করে। আমার তো ভবিষ্যৎ আছে না কি!    

১৮ এপ্রিল, ২০২০

Lockdown Story - 1 / এভাবেও ফিরে আসা যায় ( ছোটোগল্প )

photo: https://unsplash.com/s/photos/lockdown

শুধু কালো দীঘির মত টলটলে চোখের মণি দুটো বের করা পেমলার । মাথা থেকে মুখ অবধি মুখটা দোপাট্টায় আষ্টেপিষ্টে মুড়ে নিয়েছে সে। নিজেদের কুঁড়ে সংলগ্ন একফালি জমি থেকে সেদিনের মত কি আনাজপাতি পাওয়া যায় খুঁজতে বেরিয়েছে। । আগের দিন রাতেই তার মা বলে রেখেছে, পরের দিনের রসদ বলতে ঘরে শুধু এক কুনকে চাল আর দুটো আলু পড়ে আছে। সরকার থেকে নাকি প্যাকেট বেঁধে সবেমাত্র চাল, ডাল, নুন, তেল আর আলু দেওয়া শুরু হচ্ছে। তারাও পাবে দু একদিনের মধ্যেই। তাই আশায় বুক বেঁধে বসে আছে বাড়ির চারজন। ফ্রি তে রেশন দেবে বলেছে। কবে দেবে তা জানেনা তারা। 
পেমলার খুব গোছ তাই রক্ষে। তার মা দুঃখ করে করোনার বাজারেও বলে উঠছে তা দেখে "অতি বড় ঘরুণী, না পেল ঘর"। টিভির খবরে ঘরবন্দীর কথা শুনেই রোজ বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে রাঁধাবাড়া করছে মেয়েটা। ধানজমিও আছে একটু। তবে সেটা তাদের ঘর থেকে বেশ অনেকটা দূরে। এখন পেমলা তার বাবা কে যেতে দিতে চায়না । 
নিদাঘ তাতে সব বোরো ধান জ্বলে হেজে গেল রে। ভালো ধান রুইয়ে ছিলুম এবার। দামী বীজ ছিল। পেকে ওঠার সময় হয়ে গেল তো। 
ধানচারার যা হয় হোকগে। তুমি যাবে না। একেই তোমার বয়েস হয়েছে তায় টিভিতে বলেছে হাঁপানি থাকলে এই রোগ নাকি চট করে ধরে যায়। পেমলার ছোট্ট মেয়ে আদুরী শ্লেট পেন্সিল নিয়ে দাদুর কোলের কাছে গিয়ে বসে বলে, মা একটুও মুড়ি নেই আর? না রে মা, বলে ওঠে পেমলার বাবা। পেমলা অমনি এক সানকি মুড়ি এনে বাবার কাছে দিয়ে বলে বাবা এই যে, কিছুটা তুলে রেখেছিলাম, তুমি আর আদুরী খাও দিকিনি। এই বলে শাকপাতার খোঁজ করতে বেরুচ্ছিল পেমলা।  

বাপ মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে হেসে বলে হ্যাঁ রে মা, আমাদের লালীটা আজ ঠিকমত দুধ দিল তো
 হ্যাঁ বাবা, আমাদের জন্যে রেখে বাকীটা পাশের ঘরে দিয়ে এসেছি। ওদের ঘরে চারটে বাচ্ছা। অনেকদিন হল তো লালীটার। বাছুরটাও বড় হয়ে গেল। দুধ কমে এসেছে। আর খোল, চুনি, ভুষি সব শেষ যে। খাবার বলতে বাড়ির মাড়, নুন দিয়ে। আনাজের খোসাও নেই যে দেব একটু।   

সেদিন নিজেদের জমি থেকে লকলকে কুমড়োশাক, দুটো পোকালাগা বেগুণ আর ক'টা কাঁচালংকা নিয়ে আসে পেমলা। গাছগুলোয় জল দিয়েও এল। বৃষ্টি এখন হবেনা। আরও দু চারটে ডগা বেরোলে কদিন বাদে আবার খেতে পারবে তাঁরা। ঝুড়িতে দুটো মোটে আলু পড়ে আছে। একটা চচ্চড়ি হয়ে যাবে সেদিনের মত।

চারটে মুরগী রয়েছে ওদের । তাদের ডেরায় উঁকিঝুঁকি মেরে লাভ হলনা। ডিম নেই সেদিন ওদের ভাগ্যে। 
পুকুরটাও একটু দূরে। নয়ত গামছা ফেললেই চুনোচানা মাছ পাওয়া যেত। অনেক লোক ঘাটে জড়ো হওয়া বারণ এখন।আগেরমত জটলা করা যাবেনা। খবর পেল পাশের বাড়ির জানলা দিয়ে। পুলিশ এসে মাঝেমাঝেই টহল দিচ্ছে পুকুড়পাড়ে। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে শাকপাতাগুলো নিয়ে ঘরের দিকে আসতেই আদুরী চেঁচিয়ে উঠে মায়ের দিকে এসে বলল, দাদু দেখ, মা আজকেও কত্ত বাজার এনেছে। পেমলা বলল, খুব মজা না? ইশকুল নেই, মিড ডে মিলের গরম ডিম ভাত নেই, অঙ্ককষা নেই, নামতা পড়া নেই। আজ আমি বানান ধরব কিন্তু । টিভি তে দেখ শহরের বাচ্চারা ঘরে বন্দী হয়েও কেলাস করছে কেমন! 
মা আজ রাতে কি খাব আমরা? আদুরী বলে ওঠে। 
সস্নেহে মেয়ের মাথায় হাত রেখে পেমলা বলল, কেন? কাল যে বললি পেয়াজকুচি দিয়ে গোলা রুটি ভালো লেগেছে তোর। 

ঘরের ভেতর থেকে পেমলার মায়ের সন্ধে দেবার শাঁখের ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসতেই পেমলার বাবা দুহাত জোড় করে মাথায় ঠেকালো। জয় মা শেতলা ! কবে এই রোগের থেকে মুক্তি হবে মানুষের! মা বলে ওঠে, আমি মানত করেছি গো। সব মিটলে দশটাকার বাতাসা দেব বসন্ত বুড়ীর থানে। নদীর জল তুলে এনে দণ্ডী কাটব মা। হরির লুঠ দেব হরিসভায়। সবাই কে সুস্থ রাখো। 

পেমলার বাবা চোখে একটু কম দেখে আজকাল। ছানি পড়ছে বোধহয়। সন্ধের আলো আঁধারিতে তবুও দূর থেকে একটা সাইকেল দুবার ক্রিং ক্রিং করে এসে ওদের বেড়ার ওপারে থামল দেখে বলে উঠল, কে ওখানে? কে রে? এখন লোকজনের আসা যাওয়া বারণ জানো না? সাইকেলারোহী নেমে সেখানে দাঁড়িয়েই বলল, আজ্ঞে আমি রতন। 
অনেকদিন পর গলাটা চেনা লাগল পেমলার। আদুরী হবার পর রতন তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করেছিল। বেদম নেশা করে মারধোর করত খুব। দিনের পর দিন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একদিন সে মেয়ে কোলে করে চলে এসেছিল বাপ-মায়ের কাছে। মাধ্যমিক পাশ পেমলা টিউশান পড়ানো ধরেছিল গ্রামের বাচ্চাদের। 

এইবার পেমলা মুখ খুলল। ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, কি মনে করে এদ্দিন বাদে আমাদের এখানে? 
রতন বলল, আদুরীটার জন্যে বড় চিন্তা হচ্ছিল। আর সত্যি বলতে কি তোমার জন্যেও। তাই সাইকেল চড়েই এতটা পথ এসে গেলুম। ঢুকতে দেবেনা? পেমলা বলল, টিভিতে দেখোনি? পাশের গ্রামে দূর থেকে এমন কত লোক এসে গাছের ওপর দু'হপ্তা ধরে রয়েছে? 
রতন বলল, আমার হাঁচি, কাশি, জ্বর কিছুই হয়নি। সত্যি বলছি, মা কালী। মা শেতলার দিব্যি। 
কেন তোমার বৌ? 
রতন ঘাবড়ে গিয়ে বলল, বউটা বোধহয় বাঁচবে না আর। যে কাজের বাড়িতে ঠিকের কাজ করে সেখান থেকে রোগ এনেছে। তেনারা  নাকি  বিদেশ থেকে এসেছিল কবে একটা। সরকারী গাড়ী এসে পরশু তুলে নে গেছে হাসপাতালে। দোহাই, তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও। 
ও তাই বলে এখানে দিতে রোগ এসেছো বুঝি? 
পেমলা তার বাবা আর মেয়েকে নিয়ে মুখের ওপর দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।  

১৩ এপ্রিল, ২০২০

লকডাউন নামচা

ই লকডাউনের দুঃসময়ে গতকাল সংবাদপত্রের খবরে আমাদের পন্ডিতিয়া আবার সেই ত্রাসের খপ্পরে যেন। আমাদের ডে ওয়ান থেকেই  ধর ধর ঠেকা ঠেকা অবস্থা। সেই  ছোটো বাচ্ছা প্রথম হাঁটতে শিখলে যেমন হয় আর কি।  এই পড়ে গেল।  মাথায় চোট লাগল। কোকিয়ে উঠল কেঁদে।  হটস্পট হয়ে গেল তবে? কে জানে বাপু? কি হবে তবে? নীলের পুজো? বেল যে চাই-ই। পাঁচটা অথবা তিনটে ফল যে দিতেই হয়। আর আকন্দফুল মাস্ট যে! মিস্টি? নিদেন বাতাসা?   
আরে ধুর মশাই উচিত তর্পণে গাঙ শুকোচ্ছে আর আপনি কিনা পাঁচ ফল, তিনফল আর আকন্দফুলে পড়ে রয়েছেন। যত্তসব! নিকুচি করেছে নীলষষ্ঠীর পুজো। সবটাই তো মনে। এই হটস্পট না হলেই তো আপনারা ভোরবেলায় ছুটতেন বাজারে। কোথায় বেল, কোথায় ফুটি, কোথায় ক্যাঁটালি কলা...সব্বো উপাচার চাই আপনাদের। বলি যখন যেমন তখন তেমন, জানেন না? মিষ্টির দোকান? আমি বাপু টোটালি বয়কট করেছি তাদের। আর ফুল? হ্যাঁ তাকেও। মানবো তো ভালো করে মানবো নয়ত বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ব এই বলে দিলুম সাফ।  জানেন? আজ সকালে বাসি ঘর ঝাঁটপোঁছ করে, নেয়েথুয়ে দুধের প্যাকেট কেটে দুধ (মানে যেটায় আমার সকালের চা হবে সেটার থেকেই)নিয়ে, তার মধ্যেই ঘরে পাতা টক দৈ (মানে যেটা আমরা খাব সেটার থেকেই), মধু( মানে যেটা আমার কাশি হলে খাই, সেটাই), ঘি (মানে যেটা আমরা খাই বা রান্নায় দি‌ই) আমার নীলের পুজো করেছি। বাগানে যা ফুল ছিল তাই দিয়ে। বেলপাতা নেই, তো কি করব! একে মা, ভাত দেয়না তায় আবার তপ্তা আর পান্তা!  নীলকন্ঠ কে বলেছি, তুমি যেমন করেছ, তেমনি আয়োজন। নো এঁটোকাঁটার বাছবিচার বস!। মুয়ে খেঁদির বে হয়না, তার চার পায়ে আলতা! হ্যাঁ, ছিল শুধু আসল জিনিষ।  বোতল থেকে ঢেলে নিয়েছি। না, না ইথাইল নেই এই বাজারে। কৈলাস-মানস সরোবরের জল, গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর সব গঙ্গার জল ঢেলে বলেছি পরেরবার বৃষোতসর্গ করব করোনার, যদি বেঁচে থাকি। কাল হটস্পট ঘোষণার আগেই ভোরবেলায় সেফ ডিসট্যান্স মেনে যা হোক করে বেল, কলার জোগাড় করেছি। লেবু দিতে গিয়ে বারেবারে সেই থুতুর ভিডিও মনে পড়েছে। বলেছি, সাবান জলে ধোয়া, আবার সাদা জলে ধোয়া, তারপর রোদে ফেলে রাখা, এবার তোমার যদি করোনা হয় তখন বুঝবো আপদ বিদেয় হল। জানো? কাল দুধ-ডিম-আলু-পিঁয়াজ পাঁউরুটি, নুডলস, চিঁড়ে সব পাড়ার দোকান থেকে নিয়ে স্যানিটাইজ করে, রোদ খাইয়ে ঘরে তুলে পরাণ আঁটুপাটু। রান্না করব না ঘর পরিষ্কার, ওয়াশিং মেশিনের কাপড় মেলবো না দৈ পাতব? রাতের তরকারি, ডালের সঙ্গে ভাজা...এসব করতে না করতেই পুলিশী লালবাত্তির হুংকার। বাজারে যাবেন না। পন্ডিতিয়া সিলড হচ্ছে। টিভিতে হাওড়ার ভিডিও। ব্যারিকেড পড়ছে। নীচ থেকে লোকাল মুদীর ফোন, ভাবি, আউর কুছ লে লিজিয়ে, কাল নেহি আনে দেঙ্গে ও লোগ। মানে? কি চাই কি চাই? আবার ভাবনা। এই করে বাদাবন হারভেস্টিং, কেভেন্টর...আছে মশাই? দেবেন আজ বিকেলের মধ্যে? সবাই আপনারা খুব ভালো। কি প্রচন্ড সহযোগিতা করলেন পন্ডিতিয়াবাসীর সঙ্গে তা বলার কথা নয়। আমি কেঁদে ফেলেছি গতকাল বড়, ছোট, মেজো, সব ব্যাবসায়ীদের কথা ভেবে। বলতে না বলতেই আবার বাদাবনের মেসেজ। দিদি, বারুইপুরের ফল আছে। জিরো পেস্টিসাইড, জিরো কার্বাইড। 
বলেন তো আবারো যেতে পারি। কি ভালো আপনারা ভাই! কে বলে বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী চলে গেচে বাংলা থেকে? বাঙালী জাগো। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের আদর্শে মন দাও দিকিনি। ভাবতে ভাবতে আবারো পুলিশের গাড়ীর টহল আমাদের রাস্তায়... ঘরে বসে বাচ্চাদের নিয়ে ইনডোর গেম খেলুন। বাড়ির সবার সঙ্গে চা খেতে খেতে আড্ডা দিন। বই পড়ুন... ছেলের হোয়াটস্যাপ... মা এখানে অনলাইন গ্রসারি অর্ডার নিচ্ছেনা...কি করব তবে? এভাবেই বাঁচব আমরা জানেন? ঠিক পারব... 
ছোট্ট বৌটা  আমার পাশ থেকে বলে উঠল... নিয়েছে অর্ডার কাছের একটা স্টোর... বড় ই-কমারস সাপ্লাই দিয়ে উঠতে পারছেনা তাই নিচ্ছেনা... তুমি কেন সব কথা মামামাম কে জানিয়ে আগেভাগে টেনশন বাড়িয়ে দাও, বুঝিনা... ম্যাচিওরড মেয়েটা আমার... ভালো থকিস তোরা দুটিতে... ঘর বন্দী হয়ে।

৬ এপ্রিল, ২০২০

করোনার গান

https://www.facebook.com/359880721279005/posts/586797121920696/

সুর - গৌতম চট্টোপাধ্যায় 
কথা- ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

এতটুকু এক চীনা ভাইরাস দুনিয়া কাঁপিয়ে মানুষকে আজ ঘরের মধ্যে করে ফেলে দিল বন্দী আহা হা হা, আহা, আহা হা 
সারাবিশ্বের মানুষ কে আজ করোনা বীজাণু গ্রাস করে দিয়ে মানুষ কে কাবু করে ফেলার এক ফন্দী আহা হা হা হা হা
ভেবে দেখেছো কি? শারীরিকভাবে আমরা কত যে দূরে, অনেক দূরে পাশাপাশি মোরা এক মিটার আজ ছেড়ে?
দেশকাল আজ ভালো নেই আর বিদেশের বুকে আত্মীয়েরা সত্যি সবাই বড় অসহায় আজকে আহা হা আ হা আহা হা 
ঘরে বসে বসে নিজের হবি কে কাজে লাগিয়েছি তবু একা একা দিন যাপনের নামতা গুলোকে পড়ছি আহা হা আ হা আহা হা
ভেবে দেখেছো কি? সামাজিকভাবে সবাই কত যে কাছে, বড়োই কাছে শারীরিকভাবে তবু দূরে দূরে আছে ...
দুঃসময়ের দুর্দিনে আজ, বন্ধু সবাই পাশে থেকো আজ, মনে মনে সব পাশেপাশে আছি আমরা, আহা হা হা হা হা ...
ভেবে দেখেছো কি? একদিন ঝড় আবার থেমেই যাবে, ঠিকই  যাবে, আগের মতোই ভালো হয়ে সব উঠবে...
দুনিয়া শুদ্ধু লকডাউন আজ, এটাই সবার ভালো থাকবার, পাসওয়ার্ড শিখে রাখাবার খুব দরকার আহা হা হা হা হা…
ভেবে দেখেছো কি? একদিন ঝড় আবার থেমেই যাবে, ঠিকই  যাবে, আগের মতোই ভালো হয়ে সব উঠবে... 

করোনার যুগে ভরসার রান্না

সবার সুবিধের জন্য এক ডজন সহজ রেসিপি রইল করোনার এই দুর্দিনে 

৩ এপ্রিল, ২০২০

লকডাউন মোনোলোগ

ভিশপ্ত বসন্ত পেরিয়ে চৈত্রের প্রখর রৌদ্রে আমাদের নিভৃতবাস গালভরা ইংরেজী নাম কোয়ারেন্টিন। সীতার বন্দীদশা বা যক্ষের রামগিরি পর্বতের অভিশপ্ত নির্বাসনের মতোই এ এক ভয়ংকর জীবন দুনিয়া জুড়ে। তফাত শুধু একটাই সীতা বা যক্ষের ছিল একাকী নিভৃতযাপন আর আমাদের পারিবারিক গৃহবন্দী দশা। তাঁদের ছিলনা সোশ্যালমিডিয়া আর আমাদের বন্দীদশায় সেই খুপরিটুকুনি এক পশলা সুবাতাস। শারীরিক দূরত্বে আমরা  একটু বেশীই সামাজিক হয়ে পড়ছি বরং। পৃথিবী তথা দেশ তথা রাজ্য জুড়ে করোনার জন্য আমাদের সমবেত অশৌচপালন এই লকডাউন। এবছর চৈত্রে চড়কে ঢাকে কাঠি পড়লনা আর। হাম-বসন্তের জন্য শীতলার জন্য মানতের পুজো তুলে রাখতে হল কারোর। যারা চলে গেলেন তাদের শ্মশানযাত্রায় কেউ সামিল হলেন না। এমন কি ফুলের একটি পাপড়িও জুটলনা তাঁদের। একটা সর্বগ্রাসী চিন্তা সারাক্ষণ কুরেকুরে খেল মানুষকে। তার মধ্যেও শিক্ষিত মানুষদের আচরণ অবাক করে দিল আমাদের। ততক্ষণে মহামারী অতিমারীতে পরিণত হল। সীমিত শস্য, সীমিত খাদ্যদ্রব্য তবুও আমাদের ঘরভর্তি করার এক অদম্য তাড়না তৈরী হল। আর যারা পেলনা? তাদের কথা ভুলে গেলাম না তো আমরা? স্বার্থপর মানুষ এর এই বাজারেও পঞ্চব্যঞ্জন চাই‌ই চাই। ভাতের পরে রুটি, রুটির পরে দুধ, দুধের পরে আবার ভাত, এভাবেই চলবে তবে? আসুন যে যার সাধ্যমত ত্রাণ নিয়ে জমা করি তাদের জন্য।
শরীরে, মনে খুব ক্লান্তি রয়েছে। অ-সুখ এমন অবস্থাকেও বলে বুঝি। আক্ষরিক অর্থে ব্যাধি নেই তবে আধি আছে যা ব্যাধির চেয়েও মারাত্মক। সংবাদের স্রোত নজরে আসতেই দুপুরের সোহাগী বিশ্রাম আপাত নিদ্রা কেড়ে নিচ্ছে। রাতে তাড়াতাড়ি বিছানায় গেলেও তন্দ্রা ও নিদ্রার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে হাত-পা আপাত জিরেন নিচ্ছে বটে কিন্তু স্বপ্নের ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে দোদুল্যমান জীবনের অজানা ঘূর্ণিপাকে। 
আমরা স্বার্থসর্বস্ব মানুষ যাদের সরকারী নির্দেশিকা মেনে বিধিসম্মতভাবে হোম আইসোলেশনে থাকার কথা তারাও কি ঠিকঠাক পালন করলাম? যাদের বিদেশ থেকে ফিরে ঘরবন্দী থাকার কথা ছিল তারা? যারা এর মধ্যেই বিয়েবাড়ি গিয়ে সংক্রমিত হয়ে আবারো দূর থেকে দূরে, ছড়িয়ে দিলেন সংক্রমণ, ধর্মীয় সম্মেলনে একে অপরকে দূর থেকে দূরান্তের মানুষকে আক্রান্ত করলেন। কেউ কেউ প্রাণ‌ও দিলেন এই মারণ ভাইরাসের প্রকোপে তাঁদের দেখেও সচেতন হবনা? রোগ চেপে রাখব? আড়াল করব নিজেকে? তারপর এক্সপোজড হলে সেই মুখ দেখাতে পারবো তো সমাজে? কেউ দেখলাম খুব নোংরা রাজনীতি করছেন। এটা কি সেই সময়?  একেই তো এখন আমরা সবাই আমাদের গৃহ পরিচারিকাদের অনির্দ্দিষ্টকালের জন্য ছুটি দিয়েছি। নিজেদের কাজ নিজের হাতে করার অভ্যেস শহরের মানুষদের নেই তার মধ্যেও অনেকে কাজের লোক ছাড়া বাঁচতে পারছেন না। এবার ভাবুন সেই কাজের লোকটি রোজ তার ঘরে ফিরে যাচ্ছে। সে কার স্অঙ্গে মিশছে কোথায় যাচ্ছে আমাদের তা অজানা। এবার সেই এসে আমাদের দিতেই পারে সেই রোগ। আমরা হয়ত বুঝলাম না। সে ছিল নীরব এক বাহক। যাকে দেখে বোঝা যাবেনা। নিজের চাহিদা, ইচ্ছেগুলো সীমিত রাখা এই মূহুর্তে খুব জরুরী। সে খাবারদাবারেই হোক আর কাজের লোকের ব্যাপারেই হোক। আরো কত ঘটনা দেখছি। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে সারাক্ষণের কাজের লোকের শরীরখারাপ হলে তাকে বাড়ির বাইরে বের করে দেবার মত অমানবিক ঘটনা। সে কোথায়  যাবে? পরিবহন নেই। তাকে ডাক্তার দেখিয়ে ব্যাবস্থা করুন তবে। করোনা অনেক কিছু শেখাচ্ছে প্রতিমূহুর্তে। আমরা একদিকে অমানবিক আচরণ করে ফেলছি আবার চূড়ান্তভাবে মানবিক হয়ে গৃহ পরিচারিকার খোঁজ নিচ্ছি। সে ত্রাণ পাচ্ছে কিনা। সে ঠিক আছে কিনা। নিজেদের একাহাতে সব  কাজকর্ম করতে হচ্ছে বলে হাড়েহাড়ে বুঝছি তাদের কদর। কথায় বলে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায় না। ঠিক তেমনি ব্যাপার । আমরা সামান্য ডাল ভাত, সেদ্ধ ভাত, খিচুড়ি, ডিম ভাতে দিনের পর দিন অভ্যস্ত হচ্ছি। ঘরের বাচ্ছারাও সোনা হেন মুখ করে খেয়ে নিচ্ছে তা। মা ঠাকুমার পুরনো, অত সাদামাটা কেজো রান্নাবান্না কে মান্যতা দিয়ে ঝালিয়ে নেবার সুযোগ দিল এই লকডাউন। এই ফাস্টফুডের্, ট্রান্সফ্যাটের রমরমায় সেটাও কম কথা নয়। হঠাত করেই প্রকৃতি দেখছি। ঘর থেকে দু' পা না ফেলেই চোখ রাখছি নীল আকাশে,পাখীর ডাকে, সবুজে, ফুলের রঙে। পরিবেশের দূষণমাত্রা ঝাঁ করে একধাক্কায় নেমে গেছে অনেকটাই। সারা বিশ্বজুড়েই। আমরা শিখলাম যে ধর্মের কল‌ও বাতাসে নড়ে। আমরা শিখলাম when resources are limited unlimited creativity দিয়ে সংসার করতে হয়। পরিবারের সবার জন্য খাদ্যবন্টন করতে হয়।  

২৮ মার্চ, ২০২০

করোনা পেয়িং ডিভিডেন্ড

(১) 
আলমবাজারে আমার বাবা মা দুদিন ধরে দুধ পাচ্ছিলেন না দেখে ফেসবুকে পোস্ট করতেই বান্ধবী অদিতি সেন চট্টোপাধ্যায় ফোন করে ব্যাবস্থা করতে গেলেন। ওদিকে আমার মা ততক্ষণে রিষড়ায় মাসীর ছেলেকে বলে রেখেছিল ওদিকে এলে দুধ ব্রেড নিয়ে আসতে কারণ রিষঢ়া পুরসভার কাউন্সিলর মাসীর পুত্রবধূ। এবার গতকাল প্রচুর দুধ এধার ওধার থেকে এসে পড়ায় আমার মা নিজেই এখন মাদার ডেয়ারী। অদিতি কে বারণ করলাম এত দূর থেকে লোক পাঠাতে। এবার যেটা হল তা আরো আনন্দের এবং প্রশংসার ও বটে। অদিতিকে মায়ের বাড়ির ঠিকানা ও মোবাইল দিয়েছিলাম। গতকাল থেকে বরানগর মিউনিসিপালিটির কাউন্সিলর নিজে ফোন করছেন। মাসীমা কিছু লাগবে এই বলে। আজ নিজে এসেছিলেন বাড়িতে। বলে গেলেন প্রয়োজন হলে জানাতে। চীন, ইউরোপ, আমেরিকা এমনকি ভারতেও এমন পরিষেবা কে কে পেলেন বা পাচ্ছেন জানান। করোনার যুগে আবিষ্কার করছি এই দেশে জন্মানোর মাহাত্ম্য।
(২) 
প্রচুর পরিশ্রমের ফলে দেহের অবাঞ্ছিত, অনাকাঙ্ক্ষিত মধ্যপ্রদেশের স্ফীতি বুঝি একটু ন্যায়দম খাচ্ছে।মেপে খাওয়াদাওয়া আর সেই সঙ্গে পরিশ্রম দুয়ে মিলে বেশ চাপে রেখেছে তাকে।
(৩) 
অনেকদিন বাদে বেশ ঝালিয়ে নেওয়া হচ্ছে মা, দিদা, ঠাম্মার কেজো সব রান্না। কাজের লোকেদের হাতে সেসব রান্না বলে করিয়ে নেওয়া যায় না কারণ (১) তখন ফ্রিজে এত আমিষ মজুদ থাকে আর (২) নিজের মাথাতেও আসেনা সেসব
(৪) 
ঈশ্বরকে শুধাই মনে মনে, এভাবেই তবে ঘরবন্দী করে তুমি শেষমেশ দুনিয়ার সব উগ্রপন্থী, নরখাদক, ধর্ষক, জঙ্গি, খুনী, চোরডাকাত, ছিনতাইবাজ সব দুষ্টুদের শান্ত করার উপায় বের করলে? ইন্ডিয়ার ক্রাইম রিসার্চ ব্যুরো অনুযায়ী অপরাধের মাত্রা এখন মাত্র ৭%। রেপ ভিক্টিম রিপোর্ট নেই !তাই বুঝি উপলব্ধি হয় ঈশ্বরই শাশ্বত এবং চরম সত্য।মানুষ যখন অপারগ তখন উত্তরোত্তর বেড়ে যাওয়া এই ক্রাইম রেটের লেখচিত্র কে তিনিই নিজের হাতে নিম্নমুখী করলেন। এর নাম ধর্মের কল বাতাসে নড়ে ওঠা। নাকি এভাবেই সমাজকে বাঁচানোর জন্য তিনি নিজেই গোকুলে বাড়াচ্ছিলেন এই মারণ ভাইরাসটিকে?
(৫) 
নাস্তিকেরা বিপদে পড়লে আমার মত আস্তিককে বলে তোমার ঠাকুরকে বোলো আমার কথা।
(৬)  
আমাদের বাড়িতে একটা কথা আছে "ঢেউচালানি" বলে মানে যারা আরকি সবসময়ই উঠল বাই তো কটক যাই টাইপ, ঘরে মন বসেনা মোটেও। সেই দলে মাঝেমাঝে আমিও পড়ি আর এখন শুধু ঠাম্মার কথা ভাবছি, মেয়েরা ঘরমুখো হলে সংসারের অনেক কাজ হয়, একথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে কিন্তু। ঘরের কোণে কোথায় ঝুল, বাগানে শুকনো গাছের ডালপালা, ফ্রিজটা অফ করে পরিষ্কার, রান্নাঘরের আনাচকানাচ, বাসনের র‍্যাক, মশলাপাতির শিশি ধোয়ামোছা, একটা করে বইয়ের তাক গোছানো, অবিন্যস্ত আলমারি গুলোর দিকে নজর দেওয়া, বাড়ির সব আয়নাগুলো একদিনে খবরের কাগজ ভিজিয়ে মুছে নেওয়া আর সেই সঙ্গে এখন সদর দরজা আর কলিংবেলে কলিন দিয়ে পরিষ্কার করা..... মানে বাড়িটাকে এই ফাঁকে একটু গুছিয়ে নেওয়া। সবকিছুর একটা ভালো দিক আছে কিন্তু।
(৭) 
এদ্দিন স্বার্থপর মানুষ শুধু দারা-পুত্র-পরিবারের অসুখে প্রার্থনা করত।এখন অপারগ হয়ে সারা বিশ্ববাসীর জন্য ভাবছে।মশাই এর নাম learning process!


(৮) 
প্রকৃতির দূষণ নিম্নমুখী। মানুষ হল পরিবেশের সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই অবলা, সর্বংসহা পৃথিবী আজ মানুষ নামক জীব কে গৃহপালিত করে ঘর বন্দী করেই ফেলেছে। গাড়িঘোড়া না চলায় পরিবেশের দূষণ, ধুলো, ধোঁয়া থেকে মুক্তি। প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছাচারে বিরতি। জঙ্গলের অরণ্যমেধ যজ্ঞ থেকে যত্রতত্র প্ল্যাস্টিক পতন ইত্যাদির মত বিষয় গুলো বেশ ভালো দিক।
(৯) 
সব অনলাইন খাবার সরবরাহকারীরা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘরে বানানো খাবারেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে সারা বিশ্ববাসীকে। শরীরের আপাত ধৌতিকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত। সবাই স্বাস্থ্য সম্মত খাবার খাচ্ছে।পরিমাণে কম খাচ্ছে কাজেই জাঙ্ক ফুডের, ট্রান্স ফ্যাটের রমরমা আপাতত শিকেয় তোলা।
(১০) 
ঘরে বসে, গৃহবন্দী হয়ে মধ্যবয়সী হোমমেকারদের শারীরিক ব্যাথা বেদনা, আর্থ্রাইটিস, গাউট, গেঁটে বাত, কোমরে ব্যাথা, গোড়ালি ব্যাথা, সাইনাস, মাইগ্রেন অনেকটাই কম এ যাবত। তবে ইনসমনিয়া গ্রাস করছে যেটা আমাকেও বেশ কষ্ট দিচ্ছে। ঘুমের ওষুধ খাচ্ছি। রাতে কোকো / ড্রিংকিং চকোলেট দিয়ে দিয়ে এক গ্লাস গরম দুধ আর বিকেলের দিকে চা কফি আর না খেলে ইনসম্নিয়ার উপশম হয় কিন্তু। তবে মনে পড়ছে আমাদের এক দুঁধে অভিজ্ঞ হাউজ ফিজিশিয়ানের কথা। মা, দিদিমারা বাড়িতে দেখতে এলে হাজার একটা রোগের কথা বলে ওষুধ দিতে বলতেন।ওপরে উল্লিখিত কোনো না কোনো ছোটোখাটো উপসর্গের কথা বলতেন তাঁরা। সেইসঙ্গে ছিল গায়ে হাতে পায়ে জ্বালা অথবা সামান্য চুলকুনি। সেই প্রাজ্ঞ ডাক্তারবাবু মুচকি হেসে বলতেন, এগুলি "হাউজওয়াইফস কমন সিনড্রোম" বলে গড়গড় করে একটা মাল্টিভিটামিন লিখে দিতেন। হোমিওপ্যাথির ডাক্তার দিতেন বিনা ওষুধের চিনির গুলি। এখনকার ডাক্তারবাবুরা বলেন প্রাণায়াম করতে। কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে, সেলাইফোঁড়াই করতে, রান্না করতে, ব‌ই পড়তে, গান করতে, বাগান করতে, কবিতা লিখতে। তবেই নাকি মধ্য থেকে প্রৌঢ় হাউজ ওয়াইফরা এই প্রবলেম গুলি থেকে অনায়াসে মুক্তি পাবেন। এসবের কোনো দাওয়াই নেই। প্ল্যাসিবো এফেক্টের কারণে সাদা চিনির গুলিতেও এমন হত আগেকার দিনে। সবটাই ছিল মনের ব্যাপার। আমার একমাস ধরে খুব কষ্ট হচ্ছিল সাইনাসের। সেই সঙ্গে কোমরে ছিল বেদম ফিক ব্যাথা। বলতে নেই, এখন সব গায়েব!!! করোনা পেয়িং ডিভিডেন্ড!  

২৭ মার্চ, ২০২০

করোনা ডায়েরী

 
দুপুরে একটু তন্দ্রা আসছে আজকাল। কায়িক পরিশ্রম বোধহয় এর কারণ। অথচ রাতে ঘুম আসছেনা। খুব ভোরে অ্যালারম ছাড়াই ঘুম ভেঙে যেতেই মনে হচ্ছে একটা বিস্তারিত স্বপ্নের ঘোরে ছিলাম। সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে এলেই মনে হচ্ছে আবার কি দুঃসংবাদ আসবে।  ছাদে বা বারান্দায় একটু চৈতি হাওয়া গায়ে মাখলেই মনে হচ্ছে ঠান্ডা অনুভূতি। জ্বর এল নাকি? কিম্বা কপালের রগদুটো কনকন করে উঠল কি? ভাবতে না ভাবতেই বাড়ির কেউ হয়ত হেঁচে ফেললেন। ৮৩ বছরের শাশুড়িমা দুবার কেশে উঠলেই শিরদাঁড়ায় কিসের যেন চোরাস্রোত ওঠানামা করে উঠছে। ভোরে উঠে এখনো দেখছি চরাচর জুড়ে গোলাপী কুয়াশা মাখা হিমেল আবহাওয়া। এমন হয় কি প্রতিবারের চৈত্রশেষে? তার মধ্যেও ছাদের আলসের ধারে বসন্তের অন্তিম নিঃশ্বাস মেখে ভুঁইচাঁপা তার উদ্ধত স্টক ফুঁড়ে মাটি ঠেলে বেরিয়ে এসে বলে ওঠে, আমায় দেখো একটু। কত রঙীন তার দেহ মন। ঠিক আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে আমাদেরো সবার যেমন ছিল। ফুলেল রক্তকরবী কে দেখে মনে হল তার সেই আত্মপ্রত্যয়েও যেন এবার কিছুটা হলেও ঘাটতি এবারের চৈত্রে। বসন্তের ফুল তুলে মালা গাঁথব বলেই না আমারা অনেকেই কোথাও না কোথাও পৌঁছে গেছিলাম হাজিরা দিতে। কেউ মিটিং এ, কেউ মিছিলে, কেউ সামাজিক দায়বদ্ধতায়। সেই সব তারিখগুলো মাথার ওপর এখন খাঁড়া হয়ে ঝুলছে। কেউ জানিনা। এতদিনে বুঝলাম মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা কি জিনিষ! সেদিন চৈত্রমাস! করোনার চোখে দেখব হয়ত আবারো আমাদের সর্বোনাশ! এবার চৈত্রে চড়কের ঢাকে কাঠি পড়ল না। বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে বলে চীৎকার করে সেই মাধুকরীর সিধে নিতে ওরা কেউ এল না এবার কেউ বাড়ি বয়ে। এবার আমাদের চৈত্র সেল নেই। ফুটপাথে হকারদের রমরমা নেই। আমাদের এখন উইকেন্ডের জন্য মনকেমন নেই। শুক্রবারের বিকেল থেকেই রবিবারের বায়নাক্কা নেই। কোনও প্ল্যান নেই আমাদের কারোর। ভোরে উঠলেই কাজের সহকারীর আমার বাড়িতে আসার কোনও অনিশ্চয়তা নেই। তার জন্য অপেক্ষাও নেই আমাদের। কি রান্না হবে তা নিয়ে বাজারের তাড়া নেই। অফিসের জন্য টিফিন নেই। তারমধ্যেও ছাদ বাগানের ফুল গাছেদের জল দিয়ে, ঘরের পোষ্যদের খাবারের ভাবনা আছে। নিজেদের সংসারের মাসকাবারির ফর্দ নেই। গল্প লেখার রসদ নেই। পঞ্চব্যঞ্জন ছেড়ে শুধু দিনগতে করোনা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে করতে কোনোরকমে গ্রাসাচ্ছদনের উপায় বের করা আছে। কোথায় সবজীর খোসা ফ্রিজে জমিয়ে ডালের সঙ্গে ভাজা খাওয়ার বিলাসিতা আছে। ভাতের ফ্যানের স্যুপ কে নতুন মোড়কে আবিষ্কার করার নতুন ভাবনা আছে। আলুভাতের চমকদার রেসিপি ইনোভেশনের কৃতিত্ব আছে। গেরস্থ আলু পেঁয়াজ হিসেব করে খরচ করেনি এতদিন। এখন যেন মঙ্গলগ্রহের কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মত খাবারের হিসেব নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। কটা আলু, কটা পিঁয়াজ রোজ রান্না হলে কতদিন যাবে । নতুন করে ঐকিক নিয়ম মাথা খাটিয়ে বের করছে সুগৃহিণী। যেন অর্ধভক্ষ ধনুর্গুণঃ। কিছু না পেলে আটা গুলে গোলা রুটিই খাব আমরা অথবা মাড়ভাতের স্যুপ । একটু সরষের তেল, কাঁচা লঙ্কা আর নুন ছড়িয়ে। খিদের মুখে তাই অমৃত হবে।
চৈতালী হাওয়া গায়ে মেখে ছাদে দাঁড়িয়ে দেখি ছাদ বাগান থৈ থৈ বাসন্তী ফুলে। আমার মনের অগোচরে। আজ বসন্তে আমার ফুল গাঁথার সময় নেই। তবুও ওরা সব ছাদ আলো করে দোল খাচ্ছে। কত আনন্দে, রঙীন হয়ে ফুটে রয়েছে। একে একে জড়াজড়ি করে, হাত ধরাধরি করে। আমার মনের খবর নেই ওদের কাছে।আমাদের এখন বেঁধে বেঁধে থাকার উপায়ও নেই। আমরা সবাই দূরে দূরে তবুও আমার কাছাকাছি ফুলেরা কাছে যেতেই বলে ওঠে
" কি গো দেখলে না আমায়?"
আমি বলে উঠলাম, দেখছিই তো কিন্তু পারবি তোরা সবাই মিলে সারাদেশের মানুষের মন ভালো করে দিতে? আচমকা দেখি রক্তকরবী খুব হাওয়ায় মাথা ঝুঁকিয়ে বলে উঠল, আছিই তো। চিন্তা কিসের?
অদৃশ্য সেই শক্তির কাছে বারেবারে নতজানু হই আমি। কে তিনি? শীতলা? রক্তকরবী? নাকি করোনার প্রতিষেধক?

২৩ মার্চ, ২০২০

করোনার কড়চা

ঠাত যেন আলোর ঝলাকানি তারই মাঝে। অভিভূত হয়ে পড়ছি সবাই। এদ্দিন স্বার্থপর মানুষ শুধু দারা-পুত্র-পরিবারের অসুখে প্রার্থনা করত। এখন অপারগ হয়ে সারা বিশ্ববাসীর জন্য ভাবছে। শিখছে সভ্য, শিক্ষিত মানুষ। পরিবার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব একে অপরের খবর নিচ্ছে, সেটাও আমাদের পরম পাওয়া। সব মানুষের পাখীর চোখ এখন করোনা দমন। রাজনীতির রঙ, জাতপাত সব ভুলে সবার লক্ষ্য এক । সেটাই বা কম কিসের? ভাবছিলেন তো মিলন হবে কত দিনে? এইতো এগিয়ে এল সেই বহু আশার মিলনক্ষণ। আমরা সবাই এখন এককাট্টা হয়েছি। মোরা মিলেছি আজ মায়ের সাথে।
ওদিকে রাস্তায় গাড়ি চলছেনা। সব বন্ধ। কেউ বাইরে বেরুচ্ছেনা। যেন বন্ধ উদযাপন চলছে দিনের পর দিন। অর্থাত প্রচুর এনার্জি কনজারভেশন হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। প্রকৃতি খুব খুশি । এজন্য‌ই বুঝি বলে রিসোর্সেস লিমিটেড, বুঝে চল।
আরেকদল শিক্ষিত মানুষ জেনেবুঝেও অন্ধ। এই একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের দাপটে রাজার ঘরেও যে অসুখ টুনির ঘরেও তাই। বিলেত ফেরত গায়ক গায়িকা এদ্দিন নিজেকে যত‌ই সেলেব ভাবুন না কেন উনি আসলে কিস্যু নন। গণ্ডমূর্খ। মোটেও সমাজ সচেতন নন। শিল্পী হবার কোনো যোগ্যতাই আসলে নেই তাঁদের, শুধু গান গাইলেই শিল্পী হওয়া যায় না। তাঁরা ছড়ালেন রোগ। ছড়াচ্ছেন‌ও প্রতিমূহুর্তে। মরছি আমরা, যারা সরকারি বিধি মেনে চলছি। দামী চিকিত্সক থেকে নামী আমলা, খেলোয়াড় থেকে অভিনেতা আজ আমি-আপনি কিন্তু সমান রিস্কে, সেটা অন্ততঃ বুঝুন। রাজার রোগ, টুনির রোগ এখন সমান।

আমাদের তো দিব্য চলছিল কবিতার আড্ডা, সাহিত্য‌আড্ডা, জনসমাবেশ, মাল্টিপ্লেক্সে হৈ হৈ হ্যাঙ‌আউট, শপিংমলের ফুডকোর্টে মস্তির দিনলিপি। ক্রমে চীন, জাপান, কোরিয়া আর তারপর দস্তুর মত ইউরোপ। ইতালি কে শেষ করে ইরান। আমেরিকাতেও অনুরূপ অবস্থা।  দাপিয়ে বেড়াতে বেড়াতে অবশেষে ভারতে ঢুকে এল করোনা ।  তখনও হুঁশিয়ার নয় আম বাঙালী। ওয়ার্ক ফর্ম হোম, অনলাইনে পড়ানো এসব করতে করতে ঘরে বোরড হয়ে ক্লাবে কিম্বা রেস্তোরাঁয় গিয়েছে তারা। নাহ! তারপর অ্যাটলাস্ট সেই অশৌচ পর্ব পালন আবশ্যিক হয়েই পড়ল। তবুও ভবি ভোলার নয়। কলকাতায় কাজের লোকেরা সবেমাত্র বলতে শুরু করেছে, কি একটা রোগ এইয়েচে গো?
এর মধ্যে ফুলেল শহরে বসন্তের কোকিলের কুহুতান । তার শুধু চিন্তা আহার-মৈথুনের আর বাঙালীর ভ্রমণের। তায় আবার পুরোদস্তুর ছুটির আমেজ। বাঙালীর ভ্রমণ পিপাসা পায়। ভাবতে অবাক লাগে। হোয়াটস্যাপে দী-পু-দার প্ল্যান হয়। ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ যেন। এরা আবার গাড়ির মধ্যে ঢুকে সেলফি তুলে এই ডামাডোলের বাজারে ফেসবুকে পোস্ট‌ দেবার লোভ সামলাতে পারেনা। বলে ওঠে, হ্যালো ফ্র্যান্দস...চললুম পলাশের দেশে। কারণ বসন্ত ফুরায়। বাঙালীর বেড়ানোর নেশা পৃথিবীর সব জাতের চেয়ে বেশী কিনা।
ততক্ষণে লন্ডন ফেরত শিক্ষার্থী, আমলা ও ডাক্তারের পুত্র ছড়িয়েই দিল সেই মারণ রোগ কলকাতায় । ঠিক তারপরেই দক্ষিণ কলকাতার ওয়েসিস আবাসনের ব্যাবসায়ী পুত্র। এরা সবাই লন্ডন ফেরত। কিন্তু কারোর কোনও হেলদোল নেই। নেই স্বাস্থ্য সচেতনতা। বাড়ির লোকেও ভাবল না নিজেদের কথা, পড়শির কথা। মশাই এরা মানুষ? মানুষের তো আক্ষরিক অর্থে মান এবং হুঁশ দুই থাকতে হয় জানি। আবার নির্লজ্জের মত কলকাতার বাপ মায়েরা তাদের বিদেশে পড়া ছেলেপুলেকে ডেকে ডেকে নিয়ে এলেন দেশে। আহা! বলুন তো! মায়ের প্রাণ! আয় তোরা আয় ফিরে অথবা বেটা তুরন্ত  বাপাস আ যা । সঙ্গে নিয়ে আয় দু' চারটে করোনা।
তাদের উদ্দেশ্যে বলি, আমাদেরও আছে মশাই বত্রিশ নাড়ী ছেঁড়া ধন সেদেশে পড়ে। তবু বলেছি বেরুবি না একদম। প্রয়োজন না হলে। ঘরে বসে পড়াশুনো। কনফারেন্স, মিটিং সব চলছে গবেষকদের। দুগগা নাম জপছি অহোরাত্র ঘরে বসে।

এখন অনলাইন ম্যানেজমেন্টের ছাত্রের পরীক্ষার ইন্টার্ভিউতেও করোনা ইস্যু। ম্যানেজমেন্ট গুরু শিষ্যকে শুধান " আচ্ছা বল দেখি স্যনাইটাইজারের খুব চাহিদা এখন। বাজারে পাওয়াই যাচ্ছেনা। তোমায় যদি একটা মডেল সেট আপ করতে বলা হয় কি হবে তার স্ট্র্যাটেজি?” তারপর তার সাপ্লাই আর ডিমান্ড নিয়েও ভাবনাচিন্তা । ভাব ম্যানেজমেন্ট ট্রেনী ভাব। গ্রুম কর নিজেকে। করোনার যুগে তোমাদের এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই হবে ম্যানেজমেন্ট পড়লে।

পরীক্ষাগারে সহজে রাসায়নিক স্যানিটাইজার তৈরী কিম্বা গ্রামে গঞ্জে ভেষজ পদ্ধতিতে। এমন সব ইনোভেশন দৌড়চ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তেই কলকাতার করোনা কথার জন্ম হল। শয়নে স্বপ্নে জাগরণে এভাবেই করোনা ঢুকে পড়েছে বাঙালীর জীবনযাত্রায়। ধীর গতিতে আমরা পেরিয়ে চলেছি একের পর এক স্টেজ গুলি। এক, দুই, তিন। কে জানে ততদিনে আমিই বা কেমন থাকি।

কলকাতা করোনা কথা - ৫ 
২৩ শে মার্চ, ২০২০
অবশেষে করোনার এপিসেন্টার দক্ষিণ কলকাতার পন্ডিতিয়ার আবাসন ওয়েসিসে গতকাল মধ্যরাতে চারজন আমেরিকার অভিবাসী ফিরলেন দীর্ঘ দিনের ছুটি কাটিয়ে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। এর মধ্যে দুজন আমাদের ব্লকে, দুজন পাশের ব্লকে। ফেসবুকেও তাঁরা আমার খুব ভালো বন্ধু দিদি। তারা সবাই বেশ বয়স্ক। সিনিয়ার সিটিজেন। বিদেশ থেকে ফিরে কিছুদিন এখানে থেকে তারপর ভারত পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন।প্রতিবারেই যান এমন। শুনলাম তাদের আইসোলেশনে থাকতে বলা হয়েছে। সরকারি নোটিশ। আমার প্রশ্ন হল রোগের সিম্পটম না দেখা দিলে টেস্ট করা হবেনা? না কি অপর্যাপ্ত টেস্ট কিট বেলেঘাটা আইডি তে এবং পিজি তে। আরো দুজনের পড়ুয়া কন্যা বিদেশ থেকে এসে ঘাপটি মেরে ঘরে বসে রয়েছে। ওয়েসিস টাওয়ারে করোনা আক্রান্ত চারজনের কথা তো সবার জানা। তাঁরা এখনও সবাই আইডিতে ভর্তি আছেন। তারপরেই শুনলাম এইমাত্র আমার নীচের তলায় একজন প্রৌঢ় ফিরেছেন কাতার থেকে একমাস আগে। তার নাকি জ্বর জ্বর ভাব আজ থেকে। তবে একমাস বোধহয় পেরিয়ে গেলে ভয়ের কিছু নেই। করোনার ইনকিউবেশন পিরিয়ড দু-সপ্তাহ ভাগ্যিস!
ধরিত্রী দেবী দ্বিধা হ‌ও। রিয়েল এস্টেট নিপাত যাক। ফ্ল্যাট কালচার আর নয়। পুনর্মুষিকো ভব। বাড়িই ভালো। বুঝবেন তো রিয়েল এস্টেটের মালিকরা? সম্বিত ফিরবে আপনাদের? বাড়ি ভেঙে, পুকুর বুজিয়ে বড় বড় আবাসন বানাবেন তো? এই শিক্ষাই করোনার কাছ থেকে নিতে হবে কিন্তু। 
বাকী চার পর্ব  আরও পড়ুন এখানে  CORONA EPICENTRE KOLKATA 

১০ মার্চ, ২০২০

ব্রহ্মা জানেন এসব তত্ত্ব


স্বয়ং ব্রহ্মা জানতেন না। এবার জানুন দয়া করে। 

হ্যাঁ, প্রজাপিতা ব্রহ্মাও জানেন মেয়েদের চেপে রাখা, চেপে দেওয়ার গোপন তত্বটি । আবহমানকাল ধরে সেটাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লেগাসি মশাই। পান থেকে চুন খসে যাবে তবুও ব্রহ্মা অনড়।

আমাদের আড়িয়াদহের বাড়ি ছিল রক্ষণশীল। দাদুর গঙ্গাস্নানে গিয়ে বারেবারে পায়ে ঠেকতে থাকা শিবলিঙ্গ মাথায় করে এনে নিত্য ফুল-বেলপাতা-জল আর বাতাসা দিয়ে পুজো এখনো হয় দুবেলা। ঐ সার্ধশতবছরের ধাতব শিব এখন আমার বাবা-মায়ের কাছে। সেই সূত্র ধরেই ছোটোবেলা থেকেই আমাদের বাড়ির মেয়েরা শিবপুজো ও অন্যান্য পুজোয় সামিল হয়েছি সেই ছোট্টবেলা থেকেই।  এ আমার সংস্কার। এ আমার অহংকার। একে আমার লালন করতেও মন্দ লাগেনা। দক্ষিণ কলকতার শ্বশুরবাড়িতে পুজোআচ্চা বড় একটা দেখিনি। ষষ্ঠী, বারব্রত তে গায়ে উপোস আর পয়সা তুলে রাখা ছাড়া। "ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মোটি" দেখতে দেখতে এসব খুব মনে পড়ছে কাল থেকে। পৈতে কেন পরব না, আমারো মনে হত বৈকি । পরে জেনেছি নবদুর্গার ব্রাহ্মণী রূপে আর সরস্বতী পুজোয় দেবীরাও উপবীত পরেন বৈকি। বাড়িতে মা অনেক ট্যাবু ভেঙেছিলেন । রোজ আমি বা মা কেবল সন্ধ্যে জ্বেলে শাঁখ বাজাব কেন? তাই ভাই আর বাবাও প্রক্সি দিত। বাড়ির প্রথম মেয়ে আমার জাঠতুতো দিদির প্রথম অসবর্ণ বিয়ে হল। বিয়ের পরে অষ্টমঙ্গলায় এসে দিদি বলেছিল আমি তো শিবঠাকুর ছোঁবনা, আমার তো ব্রাহ্মণত্ব ঘুচেছে। মা বলেছিল, আলবাত জল দিয়ে ছুঁয়ে পুজো করবি তুই। বাড়িতে সরস্বতী পুজো বা শিবরাত্রির পুজো বাবার সঙ্গে সমান তালে মাকে করতে দেখেছি। মন্ত্র বলে আমাদেরো পুজো করাতে শিখিয়েছে মা। শাঁখা-পলা আমাদের ঘটিবাড়িতে ঠাকুমাও পরতেন না। সিঁদুরও অতি সামান্য। তবে কেউ পরলে বাধা দেয়নি। এই যেমন আমার ভালো লাগে লোহা পরে থাকতে, একটু সিঁদুর ছোঁয়াতে সেটা আমার বিশ্বাস। সেটাও আমার সংস্কারের মধ্যেই পড়ে। তাই বলে কেউ না পরলে আমিও জোর করে চাপাতে রাজী ন‌ই। আমার আশেপাশের মানুষকে খুশি করাই নয়, আমারো ভালো লাগে। তবে আমি অত আড়ম্বরে পুজোআচ্চা করিনি কোনোদিনো। যতটুকুনি না হলে নয়। আর ঐ পাঁজির পুরুত? তাদের মৌলবাদ বা ফতোয়া জারি করা, এটা হবে না, ওটা করতে নেই, এসবকে আমিও এক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দি চিরকাল। সেইসঙ্গে বিজ্ঞান আমাকে অনেক যুক্তি দেয় এবং দিয়ে চলে। এই যেমন বাসিকাপড় ছেড়ে রান্না ঘরে ঢোকা। সেটার একটা হাইজিনের অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি। তাই বলে ভোরবেলায় স্নান করেই ঠাকুরঘরে বা রান্নাঘরে ঢুকতে হবে, তাই আবার একজন মেয়েকে সেটা আমার নাপসন্দ। গায়ত্রী মন্ত্র বা ওম্‌ কেন মেয়েরা উচ্চারণ করবেনা? সেটা নিয়েও আমার সঙ্গে তুমুল হয়েছে বাবার সঙ্গে এক আধবার। সত্যি‌ই তো পিতৃতান্ত্রিক সমাজ এসব ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করে রেখে দেবে আজন্মকাল? মেয়েরাই আজন্মকাল পুজো গোছাবে, ভোগ রাঁধবে, বাড়বে  অথচ প্রধান পুজোটা করবে একজন পুরুষ পুরোহিত? সেই সঙ্গে বিয়ের সময় পিঁড়ি করে মেয়ে কে ঘোরানো বা কন্যা সম্প্রদান কে বড়োই অহেতুক বলে মনে হয়েছে আমারো।
গতবছর আমর ঋতুমতী পুত্রবধূকে কালীমন্দিরে প্রবেশ করিয়েছি আমি ও আমার কর্তা দুজনে মিলে। সে নিজে অবাক হয়েছে। সে নিজে মানেনা কিন্তু সোজা একেবারে মন্দিরের গর্ভগৃহে  ঢুকতে আপত্তি করছিল, ভাবছিল হয়ত তার নতুন শ্বশুর শাশুড়ি কি ভাববে। কিন্তু আমরাই বলেছি, আয় তুই। তখন তার চোখ চিকচিক করে উঠেছে। এত লিবারাল তার আধুনিক শ্বশুর শাশুড়ি?
আমিও বলেছি সেদিন তাকে, এই পুরুত গুলোই তো অম্বুবাচীতে কামাখ্যায় যজ্ঞ করে আসে না? যত্ত জ্বালা তাদের রক্তমাংসের মেয়েদের নিয়ে? তাই বলে শবরীমালা প্রসঙ্গ কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য। খ্রিষ্টানদের হাত থেকে একটা হিন্দু মন্দির কে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় এত সরব তারা। এমনিতেই দক্ষিণে পুজোটুজোয়, আচার বিচারে আমাদের এক কাঠি ওপরে সেখানে আর এক শ্রেণীর মানুষরা সেই পিরিয়ডস নিয়েই এত সোচ্চার ।সেখানে আবার রাজনৈতিক কারণও আছে অতএব সিনেমায় এই প্রসঙ্গটি না এলেও পারত। আরেকটা ছোট্ট ভুল। ঊমা কে হোয়াটস্যাপ পাঠিয়েছিল শবরী। কিন্তু ঊমা এসে বলল, এসেমেস পেয়েছে। এছাড়া সুপার ফ্ল পেলুম না। সত্যি বলছি ভালো লেগেছে ছবিটি। আমাদের সবার প্রিয় কবি সম্রাজ্ঞীর সংলাপ, ঋতাভরীর চমৎকার অভিনয় এর জন্যই ১০০ তে ৮০ দিলাম। অতিকথনে দুষ্ট নয়, প্যানপ্যানে প্রেম নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা হল মেয়েদের উত্তরণের গল্পটি। বাঙালিদের জীবনে মেয়েদের তুলে আনার জন্য যিনি এই কাজটির পুরোধায় সেই গৌরী ধর্মপাল কে আবারো শ্রদ্ধা। খুঁটিনাটি সব বলে দিয়েছে ছবির চিত্রনাট্য। সবাইকে দেখে আসার অনুরোধ জানাই। মেয়েদের পৌরোহিত্য এর জয়জয়াকার হোক। কন্যা সম্প্রদান, লগ্নভ্রষ্টা, পুজোর তিথি এসবের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে এগিয়ে চলুক তাদের ধ্বজা উড়িয়ে।
সব শত্রুমুখে ছাই দিয়ে ব্রহ্মাদের আবহমানকালের লেগাসি কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিন মেয়েরা, মায়েরা, ঘরের ঝি বৌরা। ধর্ম ভীরু হবেন না দোহাই। ধর্ম প্রাণ হয়ে উঠুন। মানবিকতাই হোক আসল ধর্ম। সবার ওপরে মানুষ সত্য। অতএব লিঙ্গ বৈষম্য আর নয়!
স্বয়ং ব্রহ্মা জানতেন না। এবার জানুন দয়া করে।  দিন আগত ঐ! 

৬ মার্চ, ২০২০

ফালতু দিনের ঝরাপাতা / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়




ধুর মশাই ! আর এই প্রতিবছর এই নারীদিবসে আর হ্যাজাতে ভাল্লাগেনা আমার। এই বিশেষ দিনগুলো আসলে বড্ড দেখনদারির আর গ্লোবালাইজেশনের চক্করে পড়ে ঐ উইমেনস হরলিকস, কেলগস স্পেশাল কে, হীরের গয়নায় ছাড়, শড়িতে ফ্ল্যাট ডিসকাউন্ট আজকের জন্য অথবা বেকারী শপে শুধু মেয়েদের জন্য আজ কেক কিনলে চকোলেট ফ্রির শোয়িং অফ । এসবে আমার চিঁড়ে ভেজার নয়। আমি রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছি। রক্ষণশীল পরিবারে বিয়ে হয়ে এসেছি। মেয়েদের অধিকার টধিকার নিয়ে, আদ্দেক আকাশের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে দুই পরিবার বেশ সজাগ এবং সচেতন। তবে এদের সেই "ভবি ভোলার নয়" ব্যাপারটাকে আমি প্রায় ৮০ শতাংশ ভুলিয়েই ছেড়েছি। তাই ঐ সব নারীদিবস উদযাপন টুজ্জাপন আমার কাছে নয়। অধিকারের প্রশ্নে যে জন্য আজকের দিনটা পালন হয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সেটা বেশ স্পেশ্যাল বটেই।
শৈশব থেকে কৈশোর পদার্পণেই আমি দেখেছি চরম লিঙ্গ বৈষম্য। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে সংসারে মেয়ের কোলে কি করে ছেলে আনতে হয় অথবা মেয়ে জন্মালে শাঁখ বাজাতে নেই কিম্বা ছেলের জন্মদিনে কেমন পরিপাটি করে পায়েসের বাটি কিম্বা মাছের মুড়োটি আগেভাগে তুলে রাখা হয়। দেখে এসেছি । আমাদের বাড়িতেই বলতে শুনেছি "ছেলের মুতে কড়ি, মেয়ের গলায় দড়ি"

অথবা মাধ্যমিকে স্টার পেলে "হীরের টুকরো ছেলে" বলতে শুনেছি। হীরের টুকরো মেয়ে বলতে শুনিনি আজ অবধি। তা যা বলছিলাম, একটু বড় হতেই মেয়েবেলার স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে একাধিকবার। হাঁটু ঝাড়িয়ে ফ্রকের ঝুলেই হোক কিম্বা বুকের কাছে ফ্রিল দেওয়া ফ্রকেই হোক। ফ্যাশন নয় মোটেও। শ্যাম্পু করা চুলে একখাবলা তেল। সেটা নিজের অপছন্দ হলেও। একটা পনি টেল নয়, দুই বিনুনী‌ই মাস্ট কারণ "বড় হ‌ওনি এখনো" কিম্বা এখুনি "ব্রা" নয়। আরো পরে। মামারবাড়িতে দেখেছি পঙক্তিভোজে একপাল তুতো ভাইবোনদের মাঝে নাতনীদের বরাদ্দ আধখানা ডিম আর নাতিদের পুরো ডিম পরিবেশিত হতে ।এমনকি নিজের যখন সিজারিয়ান সেকশন করে ছেলে সবেমাত্র বেবিকটে তখনো সম্পূর্ণ জ্ঞান আসেনি। আধো ঘুমঘোরে আমি। আর আমার মাথায় হাত রেখে অভিভাবকরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন, "ছেলের সব কিছুই আলাদা"
আমার নিজের জন্মের ন'বছর পরে ভাই হওয়াতে ধুমধাম করে অন্নপ্রাশন হতে দেখেছিলাম। ভাই হতে স্কুলে ক্লাস শুদ্ধ বন্ধুদের লজেন্স খাওয়াতে দিয়েছিলেন বাবা মা। অথচ আমার নাকি সেভাবে ঘটাই হয় নি মুখেভাতে। কারণ আমাদের বাড়িতে নাকি মেয়েদের মুখে ভাত হয়না। আর যেহেতু আমার ভাই আমার থেকে অনেকটাই "ধলা" অর্থাত সাহেবদের মত ফর্সা তাই আজন্মকাল বাড়িতে শুনে এসেছি "মেয়েটা ছেলেটার মত "রং" পেল না"
আমার জন্য মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে একজন অংকের মাস্টারমশাই ছাড়া আর কোনো প্রাইভেট টিউটার ছিল না। তখন ভাবতাম বাবার সামর্থ্য নেই। সামান্য চাকরী। একটা বড় বাড়ি করেই তিনি ফতুর। আরেকটু লাইফ সায়েন্সটা যদি কেউ দেখিয়ে দিত! লেটার মিস করেছিলম চার নম্বরের জন্য। শুধু ভেবেই গেছি। মুখ ফুটে চাইতে পারিনি কখনো। তারপর ভাইয়ের মাধ্যমিক এগিয়ে আসতে দেখেছি  প্রতি বিষয়ের ওপর তার জন্য নিযুক্ত প্রাইভেট টিউটর। মনে মনে খুব আঘাত পেয়েছি কিন্তু ভাইয়ের প্রতি অকুন্ঠ স্নেহের জন্য কিছুই বলতে পারিনি। আবার তখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আগে আমি‌ই ওকে পড়তাম। অতএব শিক্ষক তো লাগবেই।এমনি ভেবে শান্ত হয়েছি। 
বিয়ের ঠিক করেছেন বাবা। বিদেশ যাত্রা হয়েছে তারপরেই। নিজের সংসার, ছেলের জন্ম, কেরিয়ারে ইতি ঘোষণা। শ্বশুরবাড়িতে এসে দেখেছি আরেকরকমের রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপ।

সেখানেও একবাড়ির মধ্যে মন্ত্রণাদাতা একপাল শাশুড়ির দল। কেউ সধবা, কেউ বিধবা, কেউ আজন্ম আইবুড়ো, কেউ হতবান্ধব। এবার আরো শুল্ক আরোপ। আরো বৈষম্য। বাড়ির ছেলে বৌয়ের কাপড় তুললে বা মেললে সেখানে রীতিমতো রে রে করে তেড়ে আসে কেউ। ছুটির দিনে বরের সঙ্গে বারান্দায় দাঁড়ালে বা দুপুরবেলায় দরজা বন্ধ করে শুলে মহাপাপ হয়। নাইট শো'তে সিনেমা গেলেও এক‌ই অবস্থা। অবিশ্যি আমার বর একহাত নিতেও ছাড়ে নি কখনো। আমার দিদা এদিকে রক্ষণশীল হলেও বলতেন, ওসব, "সহে রহে বাদ দাও, বুকে বসে দাড়ি ওপড়াতে হবে সেটাই নিজের অধিকার রক্ষার একমাত্র উপায়, মেয়েদের" তাই "আমারে কেহ দাবায়ে রাখতে পারবা না" সেই আপ্তবাক্যি মাথায় নিয়েই চলেছি এখনো অবধি। আমেরিকায় গিয়ে সেই মাত্র ২৩ বছরে স্টুডেন্ট পার্টির জন্য বর এবং তার বন্ধুদের সঙ্গে হৈ হৈ করে ওয়াইন শপে গিয়ে যখন ক্যান ক্যান বিয়ার আর লিকারের ক্রেট কিনে গাড়িতে উঠেছি তখন বন্ধুরা হাসতে হাসতে বলেছে" ছবি তুলে রেখে দে, বঙ্গবধূর এহেন পদস্খলন দেখলে আর দেখতে হচ্ছে না" অথবা প্যারিসের নাইটশো'তে ক্যাবারে, সেখানেও সেই এক কথা, বুঝেছ? বাড়ি গিয়ে এসব গল্প করে বোলো" তখন মনে হয়েছে মুখে আগুণ নারীস্বাধীনতার! মেয়েদের তো ছেলেরাই এভাবে জায়গা করে দেবে তা নয় আমাদের বাড়ির মেয়েরাই তো আজন্মকাল মেয়েগুলোর স্বাধীনতা খর্ব করে দিয়েছে। ডাক্তার জামাইবাবুর সঙ্গে সিনেমা দেখা নিয়ে অথবা গোপনে সব শালীদের নিয়ে চকোলেট ফ্লেবার্ড সিগার সেবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আর প্রশ্ন কিন্তু তুলেছেন মেয়েরাই। ছেলেরা বরং বলেছেন ছেড়ে দাও। 
তবে আমি অনেক বদল এনেই ছেড়েছি। মায়ের কাছেও, শাশুড়ির কাছেও। রীতিমত কাউন্সেলিং করে চলেছি এখনো। শাশুড়িকে স্লিভলেস ব্লাউজ থেকে হাউসকোটে উত্তরণ করতে সমর্থ হয়েছি। তাঁর সাধের পুত্রটিকে দিয়ে জামাকাপড় তোলানো থেকে মেলা অথবা নিজের মা'কে এমন মোল্ড করেছি যে বাবা এখন রান্নাঘরের চায়ের ডিপার্টমেন্ট এর দায়িত্ত্বে। 
আমার ছেলে আরো বদলে দিয়েছে। "ফুলকো লুচি আমি আর বাবা খাব না ঠাম্মা। ওগুলো মা আর তুমি খাবে। কিম্বা কাজের মাসী ছুটি চাইছে, সেটাই তো স্বাভাবিক মা, তুমি হলে পারতে রোজ রোজ কাজ করতে? অথবা আমাদের ঐ কুচকুচে কালীমায়ের ওপর তোমাদের এত দরদ অথচ বিয়েবাড়িতে গিয়ে নতুন বৌ "কালো" হয়েছে ব‌লে গাড়িতে উঠেই তোমরা সমালোচনায় মত্ত হ‌ও! কি হিপোক্রিট তোমরা, আই মিন এই মেয়েরা!" এমনো বলেছে।
আমি অবিশ্যি তার আগেই বদলে গেছি নিজের মত করে। ছেলের বিয়ের পর থেকেই প্রতি মা ষষ্ঠীর পুজোয় ছেলে-বউ দুজনের নামেই পয়সা তুলে রাখি ঠাকুরের কৌটোতে। সব পয়সা জমিয়ে সারাবছর পর দুর্গাষষ্ঠীতে পুজো দি‌ই।

আমার মা ও বদলেছেন। শুধু ছেলের জন্য নয়। মেয়ে, জামাই, বৌ সকলের জন্য পুজো তুলে রেখে ষষ্ঠীদেবীর কাছে মঙ্গল কামনা করেন সবার জন্য । তবে আমার শাশুড়ি মা কিন্তু এখনো পারলেন না। এবারেই শীতল ষষ্ঠীর দিন ছেলের কপালে কয়েন ছোঁয়ালেন। আমি বললাম তক্ষুণি, আমি বাদ? বললেন, আহা! ও তো আমার ছেলে বলো! বললাম "তো"? আমিও তো আপনার ছেলের ছেলেকেই গর্ভে ধারণ করেছি। বললেন ও আলাদা। আমার বত্রিশ নাড়ী ছেঁড়া ছেলে। তোমার মা তোমার জন্য তো করবেই । আমাকে আমার মত করতে দাও। তাই এই কিস্‌সার শেষ হবেনা জীবনেও। ভবিরা ভুলবেওনা কোনোদিনো। মেয়েরাই আজন্মকাল মেয়েদের দাবিয়ে রাখবে। আবার খবরের কাগজে, টিভি চ্যানেলে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গুরুগম্ভীর সব বক্তিমে শুনে হাততালি দেবে। পারলে নিজেদের লেডিসক্লাবে গিয়ে চুপুচুপি বন্ধুদের একটা করে লবেঞ্চুস খাইয়ে বলবে "হ্যাপ্পি উইমেন্স ডে" তবে ঐটুকুই। ভাগবত বা গীতার সারমর্মটুকু পাঠস্থানে রেখে এসেই খালাস তাঁরা। বাড়ি বাড়ির মতোই। সেখানে মেয়েদের নিজের টাঁইস্যে রাখতে হয়। কথাতেই তো বলে "লঙ্কা জব্দ শিলে,ব‌উ জব্দ কিলে" নয়ত বাড়ির নারী এগিয়ে যাবে তার স্বাধিকার লঙ্ঘনে।   
আজন্মকাল ধরে যদি আন্তর্জাতিক নারীদিবস পালন করে এই নারীদের নাড়িতে সামান্যতম বিদ্যুত খেলত! তবেই হত এইদিনের সার্থকতা!  
আর পারলাম না নিজের বাবাকেও। একমাত্র ভাই দূরে থাকে। নিজের কাজের জন্য আসতেও পারেনা। দেখভালও করেনা। তাদের সব দায়িত্ত্ব আমার ওপরেই বর্তেছে । মাঝেমাঝেই তিনি বলে ওঠেন "তুই আমার বড় ছেলের কাজ করছিস" খুব দুঃখে বলে উঠি, কেন গো বাবা? মেয়ে বলতে এখনো তোমার এত কষ্ট হয়? আমার যে খুব ক্লিশে লাগে শুনতে।

( যুগশঙ্খ ডিজিটালে প্রকাশিত ২০১৯ নারীদিবসে )  

২৮ ফেব, ২০২০

সুলতার শাড়ি - বম্বে Duck বইমেলা সংখ্যায় প্রকাশিত

সুলতার এখন মধ্যবয়স। এমনিতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে বেশ ফিট তিনি কিন্তু আগের মত তণ্বী নন আর। একসময় নিত্যনতুন শাড়িতে ক্লাবে গেলেই তাকে দেখে সবাই বলত ঐ যে এসে গেছে আমাদের হেড টার্নার। এখন ক্লাবে তিনি অনিয়মিত । আগের চেয়ে একটু পৃথুলা তাই শাড়ি বড় একটা পরা হয়না।


কিন্তু বাঙালীদের আড্ডায় শাড়ি মাস্ট। তখন শাড়ির আলমারীখানি খুলতেই হয়। আজকেই কিছু বন্ধুবান্ধব ক্লাবে ডেকেছে অতএব না গিয়ে উপায় নেই তাঁর ।

একসময় এই শাড়ি পরে সেজেগুজে ক্লাবে যাওয়া ছিল নেশার মত। সেই তাগিদটাও আর অনুভব করেন না সুলতা।

আলমারির দিকে এগিয়ে যান। পঙ্খের কাজ করা, মেহগিনি পালিশের কেতাদুরস্ত কাঠের আলমারীতে শাড়ী সম্ভার বন্দী হয়ে পড়েই থাকে। সুলতার মনখারাপ হয় ঐ শাড়ির আলমারীটির দিকে চোখ পড়লেই। এমনিতে আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড। আলমারী খুললেই শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা খুচরো গল্পের স্মৃতিরা বেরিয়ে আসে শাড়ির পরত খুলে। সুলতার মনখারাপ সজোরে যেন আছড়ে পড়ে বার্মাটিকের পাল্লায়, ড্রয়ারে এমন কি দামী শাড়ি ঝোলানোর রডের ওপরে। বাঁদিকের পাল্লার ওপরে আবার পেতলের ছোট্ট ছিটকিনি। সেটি খুলতে আঙুলের জোর লাগে এখন। সুলতা ভাবেন, কি যে হবে এত শাড়ি তাঁর! মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে ওঠে...

"কি আবার হবে? তুমি কেটে পড়লে শাড়িরাও ঠিক নিজেদের জায়গা করে নেবে, তাদের ভাবনা তারাই ভাববে, তুমি তখন বিন্দাস, সুখস্বপনের পারে, শ্মশানের ধারে"


সুলতা ভাবেন, যাক্‌ গে! সত্যি‌ই তো একসময় প্রয়োজন ছিল, নেশা ছিল শাড়ি কেনার। এখন আর নেই। তিনি চলে গেলে তো আর কেউ ভাববে না এই শাড়িগুলোর অবস্থা। যা হবার হবেখন। ছিটকিনি টা খুলেছেন। হাতে অল্প চোট পেলেন। আঙুলটা লাল হয়ে গেল। একটু জিভ দিয়ে চেপে ধরে র‌ইলেন কয়েক সেকেন্ড। মনে পড়ে গেল তমালের কথা। একসময় হাত কেটে গেলে তমাল এভাবেই নিজের ঠোঁটের মধ্যে পুরে নিত সুলতার নরম আঙুল। তমাল প্রসঙ্গ মাথায় এলেই মনে পড়ে কতকিছু ।


আলমারীর বাঁদিকের পাল্লা খুলতেই তমালের স্মৃতি সব। প্যান্ডোরার বাক্স যেন। চেপে রাখা যায়না তাদের। শাড়ি ঠাসাঠাসি । আলমারীর চাপে বশীভূত ছিল। চাপ মুক্ত হতেই একের পর এক পড়ে গেল মেঝের ওপর। শাড়ি, শাড়ি আর শাড়ি। সব তমালের দেওয়া। কোনোটা বিয়ের প্রথম বছরে। পিচ রঙের বালুচরী। আঁচলে পাড়ে মীনাকারীর কাজ। রাধাকৃষ্ণের গল্প। ঠিক সুলতা আর তমালের প্রেমের মতোই । একসময় মুক্তোর সেটের সঙ্গে খুব পরেছেন সুলতা। এখন বালুচরী অবসোলিট। ভাল্লাগেনা পরতে। তমাল সেবার বিষ্ণুপুর থেকে কিনে এনে চমকে দিয়েছিল। ক্লাবের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পরে গান গেয়েছিল সুলতা।


এবার চোখ পড়ে গেল প্রুশিয়ান ব্লু রঙের সিল্ক শিফনের দিকে। পিঁজে গেছে শাড়িখানা। মখমলি জমিন থেকে রেশমের পাড়খানি আলাদা হয়ে আসছে। ঠিক যেন এটাই চেয়েছিলেন সুলতা। এই শাড়ির প্রতি তাঁর কোনো দুর্বলতা অবশিষ্ট নেই। নিউমার্কেট গিয়ে সেবার বিয়ের তারিখে পছন্দ করেছিলেন ।

স্লিভলেস ব্লাউজের সঙ্গে অমন সি থ্রু শাড়ি পরে ক্লাবে যাবে তুমি? তমাল বলেছিল।

সুলতা বলেছিল, কেন আপত্তি আছে বুঝি?

তা আছে, আমার ব‌উয়ের শরীরের ভাঁজ, খাঁজ অন্য পুরুষ দেখুক আমি চাইনা।

তা মশাই? আপনি যখন বন্ধুর স্ত্রীয়ের চুলকাটার প্রশংসা করেন? সেটা বুঝি আমার খুব ভালো লাগে? এমন সব উত্তপ্ত বচসার পর ব্লেড দিয়ে সেই সিল্ক শিফনের কিছুটা চিরে ফেলেছিল সুলতা। ছিঁড়ুক শাড়ি। মরুক গে।

খুব শখ করে কেনা শাড়িখানা আর অঙ্গে তোলেনি সুলতা। পায়ের কাছে একটা শাড়ি অনেকক্ষণ পায়ের পাতা ছুঁয়েই চলেছে। হাতে তুলে নিল সুলতা তাকে। বাবা দিয়েছিলেন কলেজে পড়াকালীন তার জন্মদিনে। বাংলাদেশী ঢাকাই। হালকা গোলাপী রঙের ওপর ঘন গোলাপীর কাজ। মধ্যে মধ্যে রূপোলী জরির বুটি। এই শাড়িটার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তমালের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মূহুর্ত। দুইবাড়ির মধ্যে গ্রিন সিগনালের পরে ছাদে উঠে জীবনের প্রথম পুরুষের হাতের ছোঁয়া, চুমুর স্মৃতি। সেদিন রোমকূপের শিহরণ টের পেয়েছিল একমাত্র এই গোলপী ঢাকাইখানি। তমাল কেমন বদলে গেল তাইনা সুলতা? শাড়ি যেন তাকে প্রশ্ন করল। সুলতা বলল তাকে, এমনি হয় গোলাপী। সময় বদলে দেয় কতকিছু। এই যেমন তোকেও আমি কত্তখানি ভালোবেসেছিলাম আমার কলেজ জীবনে। তুইও তো একদিন নিজে থেকেই ঐ জরির বুটি থেকেই ফাটতে শুরু করলি। সুতো সরে সরে আমাকে কত কষ্ট দিয়েছিলি। সবাই এমনি হয় সংসারে। তোর কাজ সেদিন শেষ হয়ে গেছিল রে গোলাপী। সেদিন বিকেলের কনে দেখা আলোয় তোকে জড়িয়েছিলাম বলেই নাকি আমায় ওরা পছন্দ করেছিল। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা পাত্রীর জন্য কনে দেখা আলোয় গোলাপী রং নাকি উত্কৃষ্ট রে। মা বলেছিল। আমায় নিয়ে কত চিন্তা ছিল মায়ের! গায়ের রং কেন আরেকটু উজ্জ্বল হলনা মেয়ের। তা তুই আমায় উতরে দিয়েছিলি সেদিন, গোলাপী। তবুও তমালের সঙ্গে ঠিক জমল না আমার।


এবার চোখ গেল হ্যাঙারে ঝোলানো ইঁট রঙা মাইশোর জর্জেটের দিকে। সোনালী সুতোর পার্শি কাজ করা। জমিনে ঝকমকে চুমকী যেন আজো জ্ব্বলছে চিকমিক করে। এই শাড়িখানি পরে বিয়ের পরে নেমন্তন্ন খেতে গেছিল কটকটে রোদ্দুরে। তমালের সঙ্গে জোড়ে, মাসীর বাড়ি। ঘরে ঢোকা মাত্তর মাসীর মেয়েরা খুব হেসে উঠেছিল। তুই এই রোদে এমন ঝকমকে শাড়ি পরে এলি কি করে কলকত্তাওয়ালি? বারাকপুরে অবিশ্যি চলে এ সব। তবে তোদের ওখানে ভরদুপুরে এই শাড়িখানা পরলে সবাই আওয়াজ দেবে কিন্তু।

মাসীর ছোট মেয়ে ফিক করে হেসে বলেই ফেলল, "মেটিয়াবুরুজ"। জ্বলছিস পুরো। সোনার গয়না আর সোনালী জরি, সেই সঙ্গে চুমকি।

মেটিয়াবুরুজ? সে তো মুসলমানদের পাড়া। তমাল বলেছিল।

তাই তো বলছি মশাই। আপনারা খাস দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা হয়ে...

মাসি বলেছিল, আরে ওদের ঢুকতে তো দে আগে। শাড়ি প্রসঙ্গ ধামা দিয়ে চাপা পড়ে গেছিল।সেদিনের পর আর পরা হয়নি শাড়িখানা। শাড়ির আবার পাড়া হয়? জাতপাঁত হয় বুঝি?

এরপর কত শীত, বসন্ত পেরিয়ে এসেছে সুলতা-তমালের জীবন। শাড়ি জমা হয়েছে আলমারীর অন্দরে। উপলক্ষ্য পয়লা বোশেখ, পুজো, জন্মদিন, বিয়ের তারিখ। যেমন হয় সব মেয়েদের জীবনে। হাইফাই কর্পোরেট স্বামীর জীবনসঙ্গিনী সুলতা ক্লাব কালচারে অভ্যস্ত হয়েছে। শাড়ি কিনতে হয়েছে আরো আরো। বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ব্যোমকাই থেকে গাদোয়াল, ধর্মাভরম্‌ থেকে কলাক্ষেত্র কতরকমের শাড়িরা এসেছে জীবনে তার। ঠিক যেন মানুষের জীবনে কতরকমের, কত স্বভাবের মানুষের আনাগোনা হতেই থাকে সারাটা জীবন ধরে।

তবু এত সুখের জীবনে সুলতার মা হওয়া হয়ে ওঠেনি। শাড়ি জানে সেই দুঃখ। শাড়ি সাক্ষী আছে সব ঘটনার। প্রথমবার পেটে এসেছিল মেয়ে।

"সেক্স ডিটারমিনেশন ইজ নট ডান হিয়ার" লেখাটাকে এড়িয়েছিল তমাল। একবার নয় দুবার। দুবার‌ই মেয়ে ছিল যে। তাই ফেলে দিল তমাল। অমন সব নার্সিংহোমে লেখা থাকে। চুপ করে থাকো, বলেছিল তমাল। ডাক্তারবাবুরাও জেনেবুঝেই ফেলে দেন। কিন্তু ...সুলতার মুখটা চাপা দিয়েছিল তমাল। চল। আজ বেরিয়ে আমরা ক্লাবে গিয়ে খাব আর তোমায় সেই কি যেন বলছিলে? কোন্‌ শাড়িটার কথা? তোমার সেই ফেবারিট শাড়িটা?অনুসন্ধানে  রাখী পরেছিল যেটা? স্কার্ট পাড় পিওর সিল্ক তাই তো? মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল সুলতা। খুব দুর্বল ছিল শরীর। প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল দুমাসের বাচ্ছাটাকে ফেলতে। শরীরের কষ্টের চেয়েও প্রবল ছিল মনের কষ্ট, না পাওয়ার খেদ, তমালের ওপর ঘেন্না। নিকুচি করেছে অনুসন্ধানের শাড়ির।

সুলতার মায়ের ওপরেও ছিল প্রচ্ছন্ন অভিমান। কলেজের কেমিষ্ট্রি প্র্যাকটিকাল ক্লাসগুলোয় মায়ের ভালো ভালো তাঁতের শাড়িগুলো এক একদিন একএকটা পাট ভেঙে পরে যেত আর এসিডের ফোঁটায় ফুটো করে বাড়ি ফিরত। কপালে জুটত মায়ের বকুনি। এতকিছুর পরেও বিয়ের পরদিন চলে আসার সময় মায়ের পুরনো একটা সাধারণ শাড়ি বাক্সের মধ্যে ভরে নিয়েছিল সুলতা। সেটা ছিল মায়ের আর তার বৃষ্টিশাড়ি। অক্ষয় অব্যয়। বড়বাজারের সিন্থেটিক কোটা শাড়ি। কি অপূর্ব প্রিন্ট শাড়িটার। সুলতার আলমারীর সবচেয়ে সস্তার শাড়ি ছিল সেটা। পরীক্ষার দিন পরত। খুব পয়া ছিল তার। কি আর হল তাকে বয়ে শ্বশুরবাড়ি এনে? নতুন ব‌উয়ের উচ্চশিক্ষা, চাকরীর মুখে নুড়ো জ্বেলে দিয়ে শাশুড়ি ঠাকরুণ কিছুদিনের মধ্যেই গত হলেন।

এরপরে আরো একটা মেয়ের মুখ দেখা হলনা ঠিক আগের মতোই। সেই দুঃখ ঘোচাতে আরেকটা শাড়ি, দুটো শাড়ি, হঠাত শাড়ি, কারণে, অকারণে আরো শাড়ির আগমন হল বটে কিন্তু জীবনে আর মা হওয়া হলনা সুলতার।

কেমন বদলে গেছিল তমাল ঠিক সেই কথা জানার পরেই। আলমারীর ডানদিকের তাকে ন্যাপথলিন বল রেখেছিল সুলতা। পাতলা ন্যাকড়ার পুঁটলিতে ভরে। ও মা! কেমন দাগ লেগে গেছে শাড়ির ভাঁজে। কি শাড়ি এটা? ওহ্! সেই লাল পাড় গরদ। সুলতার মা দিয়েছিলেন সেবার পুজোয়। বলেছিলেন আমি থাকব কিনা তাই এটা রাখ। বাচ্চা পেটে সাধ দেবার দিন, লক্ষ্মীপুজোর ভোগ রাঁধার দিন এমন সব শাড়ি নাকি পরতে হয়। আর পরা হয়নি সেই শাড়ি। সাদা শাড়ি জুড়ে ন্যাপথলিন কলঙ্কের দাগ। মনখারাপ হল সুলতার। শাড়িখানা খুলতেই একটা লালচে হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরো পড়ে গেল টুক করে । পাখার হাওয়ায় উড়ে পালাচ্ছিল চিরকূটটা। সুলতার পায়ের জোর কমে গেছে। তবু ছুটে গিয়ে ধরে আনল হাতের মুঠোয়। কাগজের ভাঁজে ভাঁজে কত কথা। তমালের অফিসের সহকর্মী লগ্নজিতার চিঠি। সেই প্রেমপত্র আমূল বদলে দিয়েছিল সুলতার জীবনটাকে। তমাল কে আর ধরে রাখতে পারেনি সে। সংসারের অজস্র টানাপোড়েনের মধ্যেও টিকে থাকা সম্পর্কের সুতোটা টুক করে একদিন ছিঁড়ে ফেলেছিল সুলতা। গাছেরো খাব, তলারো কুড়োব করে আমার সঙ্গে থাকতে পারবে না তুমি। চলে যাও আমার কাছ থেকে।

তমাল বলেছিল, তাই যাব। একটা ছেলের জন্য যা করতে হয় তাই করব। গাড়িবাড়ি, ক্লাব মেম্বারশিপ সবকিছু থাক তোমার নামে। তবুও যা পড়ে থাকবে তা আমার ছেলের। লগ্নজিতা আমায় ছেলে তো দিল। তুমি আর পারলে ক‌ই ?

নিজের মনেই দু-হাত বাজিয়ে তালি দিয়ে সুলতা বলে উঠল

"সাবাস্! সাবাস্! গরদের শাড়ি, এইজন্যেই তোমার গায়ে বুঝি এত কলঙ্ক "


শাড়ি ঘাঁটতে ঘাঁটতে বেলা বাড়ল সেদিন। হঠাত কলিংবেল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন সুলতা। সুদর্শন এক যুবক দাঁড়িয়ে। হাতে একটি চিঠি।

কে আপনি? আমার নাম প্রত্যয়। বাবা চলে গেলেন। মা আগেই চলে গেছেন। বাকীটা চিঠিতেই লেখা আছে। এটা আপনার জন্য, বলে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল সে সুলতার দিকে।


সুলতা কিছুই বুঝতে পারলেন না। চিঠিখানি হাতে নিয়ে তিনি চমকে উঠলেন । তমালের হাতের লেখা। ছেলেকে দিয়ে গেছে সুলতার জন্য? একটা মধুবনী শাড়ি । যেটা খুব পছন্দ ছিল সুলতার একসময়। কেনা হয়ে ওঠেনি নানা কারণে।

প্রত্যয় বলল, আন্টি হ্যাপি বার্থ ডে।

ওহ! দ্যাট রিমাইন্ডস মি। সুলতা বলে উঠলেন । ভাবলেন, তাই বুঝি আজ ক্লাবে বন্ধুরা ডেকেছে তাকে। সারপ্রাইজ পার্টি তে তমালের দেওয়া জন্মদিনের সেই মধুবনী শাড়িখানাই পরেই তবে বন্ধুদের সারপ্রাইজ দেবেন তিনি ।