১৩ এপ্রিল, ২০২০

লকডাউন নামচা

ই লকডাউনের দুঃসময়ে গতকাল সংবাদপত্রের খবরে আমাদের পন্ডিতিয়া আবার সেই ত্রাসের খপ্পরে যেন। আমাদের ডে ওয়ান থেকেই  ধর ধর ঠেকা ঠেকা অবস্থা। সেই  ছোটো বাচ্ছা প্রথম হাঁটতে শিখলে যেমন হয় আর কি।  এই পড়ে গেল।  মাথায় চোট লাগল। কোকিয়ে উঠল কেঁদে।  হটস্পট হয়ে গেল তবে? কে জানে বাপু? কি হবে তবে? নীলের পুজো? বেল যে চাই-ই। পাঁচটা অথবা তিনটে ফল যে দিতেই হয়। আর আকন্দফুল মাস্ট যে! মিস্টি? নিদেন বাতাসা?   
আরে ধুর মশাই উচিত তর্পণে গাঙ শুকোচ্ছে আর আপনি কিনা পাঁচ ফল, তিনফল আর আকন্দফুলে পড়ে রয়েছেন। যত্তসব! নিকুচি করেছে নীলষষ্ঠীর পুজো। সবটাই তো মনে। এই হটস্পট না হলেই তো আপনারা ভোরবেলায় ছুটতেন বাজারে। কোথায় বেল, কোথায় ফুটি, কোথায় ক্যাঁটালি কলা...সব্বো উপাচার চাই আপনাদের। বলি যখন যেমন তখন তেমন, জানেন না? মিষ্টির দোকান? আমি বাপু টোটালি বয়কট করেছি তাদের। আর ফুল? হ্যাঁ তাকেও। মানবো তো ভালো করে মানবো নয়ত বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ব এই বলে দিলুম সাফ।  জানেন? আজ সকালে বাসি ঘর ঝাঁটপোঁছ করে, নেয়েথুয়ে দুধের প্যাকেট কেটে দুধ (মানে যেটায় আমার সকালের চা হবে সেটার থেকেই)নিয়ে, তার মধ্যেই ঘরে পাতা টক দৈ (মানে যেটা আমরা খাব সেটার থেকেই), মধু( মানে যেটা আমার কাশি হলে খাই, সেটাই), ঘি (মানে যেটা আমরা খাই বা রান্নায় দি‌ই) আমার নীলের পুজো করেছি। বাগানে যা ফুল ছিল তাই দিয়ে। বেলপাতা নেই, তো কি করব! একে মা, ভাত দেয়না তায় আবার তপ্তা আর পান্তা!  নীলকন্ঠ কে বলেছি, তুমি যেমন করেছ, তেমনি আয়োজন। নো এঁটোকাঁটার বাছবিচার বস!। মুয়ে খেঁদির বে হয়না, তার চার পায়ে আলতা! হ্যাঁ, ছিল শুধু আসল জিনিষ।  বোতল থেকে ঢেলে নিয়েছি। না, না ইথাইল নেই এই বাজারে। কৈলাস-মানস সরোবরের জল, গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর সব গঙ্গার জল ঢেলে বলেছি পরেরবার বৃষোতসর্গ করব করোনার, যদি বেঁচে থাকি। কাল হটস্পট ঘোষণার আগেই ভোরবেলায় সেফ ডিসট্যান্স মেনে যা হোক করে বেল, কলার জোগাড় করেছি। লেবু দিতে গিয়ে বারেবারে সেই থুতুর ভিডিও মনে পড়েছে। বলেছি, সাবান জলে ধোয়া, আবার সাদা জলে ধোয়া, তারপর রোদে ফেলে রাখা, এবার তোমার যদি করোনা হয় তখন বুঝবো আপদ বিদেয় হল। জানো? কাল দুধ-ডিম-আলু-পিঁয়াজ পাঁউরুটি, নুডলস, চিঁড়ে সব পাড়ার দোকান থেকে নিয়ে স্যানিটাইজ করে, রোদ খাইয়ে ঘরে তুলে পরাণ আঁটুপাটু। রান্না করব না ঘর পরিষ্কার, ওয়াশিং মেশিনের কাপড় মেলবো না দৈ পাতব? রাতের তরকারি, ডালের সঙ্গে ভাজা...এসব করতে না করতেই পুলিশী লালবাত্তির হুংকার। বাজারে যাবেন না। পন্ডিতিয়া সিলড হচ্ছে। টিভিতে হাওড়ার ভিডিও। ব্যারিকেড পড়ছে। নীচ থেকে লোকাল মুদীর ফোন, ভাবি, আউর কুছ লে লিজিয়ে, কাল নেহি আনে দেঙ্গে ও লোগ। মানে? কি চাই কি চাই? আবার ভাবনা। এই করে বাদাবন হারভেস্টিং, কেভেন্টর...আছে মশাই? দেবেন আজ বিকেলের মধ্যে? সবাই আপনারা খুব ভালো। কি প্রচন্ড সহযোগিতা করলেন পন্ডিতিয়াবাসীর সঙ্গে তা বলার কথা নয়। আমি কেঁদে ফেলেছি গতকাল বড়, ছোট, মেজো, সব ব্যাবসায়ীদের কথা ভেবে। বলতে না বলতেই আবার বাদাবনের মেসেজ। দিদি, বারুইপুরের ফল আছে। জিরো পেস্টিসাইড, জিরো কার্বাইড। 
বলেন তো আবারো যেতে পারি। কি ভালো আপনারা ভাই! কে বলে বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী চলে গেচে বাংলা থেকে? বাঙালী জাগো। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের আদর্শে মন দাও দিকিনি। ভাবতে ভাবতে আবারো পুলিশের গাড়ীর টহল আমাদের রাস্তায়... ঘরে বসে বাচ্চাদের নিয়ে ইনডোর গেম খেলুন। বাড়ির সবার সঙ্গে চা খেতে খেতে আড্ডা দিন। বই পড়ুন... ছেলের হোয়াটস্যাপ... মা এখানে অনলাইন গ্রসারি অর্ডার নিচ্ছেনা...কি করব তবে? এভাবেই বাঁচব আমরা জানেন? ঠিক পারব... 
ছোট্ট বৌটা  আমার পাশ থেকে বলে উঠল... নিয়েছে অর্ডার কাছের একটা স্টোর... বড় ই-কমারস সাপ্লাই দিয়ে উঠতে পারছেনা তাই নিচ্ছেনা... তুমি কেন সব কথা মামামাম কে জানিয়ে আগেভাগে টেনশন বাড়িয়ে দাও, বুঝিনা... ম্যাচিওরড মেয়েটা আমার... ভালো থকিস তোরা দুটিতে... ঘর বন্দী হয়ে।

কোন মন্তব্য নেই: