১৭ ডিসেম্বর, ২০১১

মা গঙ্গার বডিগার্ড শিব

 আনন্দবাজার পত্রিকা ১৭ই ডিসেম্বর ২০১১ ওয়ান স্টপ ট্র্যাভেলগ 

তাকিয়ে দেখি ভাগিরথী আমার চোখের সামনে । গঙ্গোত্রীর মন্দিরের বাজারের মধ্যে দিয়ে, মাগঙ্গাকে পুজো দেবার পসরা নিয়ে অলিগলি দিয়ে চলেছি আর ডানদিকে উঁকি মারছে ভাগিরথী । কি তার কলকলানি ! উত্তরকাশী থেকে ভোর ভোর বেরিয়েছিলাম গঙ্গোত্রীর পথে । উত্তরকাশী থেকে ৯৯কিমি দূরে ৩০৪৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গঙ্গোত্রী । ভাগিরথীর উত্সমুখ হল গঙ্গোত্রী গ্লেসিয়ার যার টার্মিনাস হল আরো ১৮কিমি দূরে গোমুখে । স্থান মাহাত্ম্য বলে, পুরাকালে রাজা ভগীরথ শিবের তপস্যা করে গঙ্গাকে শিবের জটা থেকে গঙ্গোত্রীতে নামিয়ে আনেন । এই ভাগিরথী দেবপ্রয়াগে অলকানন্দার সাথে মিলিত হয়ে গঙ্গা হয়েছে । ভাগিরথীর তীর ঘেঁষে চলতে লাগলাম অজস্র মন্দিরময় শহরতলীকে ফেলে । ভাটোয়াড়ি এল, সামনে অগণিত ভেড়ার পাল পাহাড় থেকে নেমে আসছে সমতলে । দীপাবলী অবধি তীর্থযাত্রা তারপরদিনই প্রবল তুষারপাতের জন্য রাস্তা বন্ধ । মেষশাবকরা আপাততঃ মাস ছয়েকের জন্য সমতলে ঘরকন্না করতে আসছে । সেই জ্যামে কিছুক্ষণ । প্রথমে নদীর সমতলে কিছুটা, আবার উঁচুতে উঠতে শুরু করল গাড়ি ।বীভত্স সরু পাহাড়ের চড়াই পথ । উল্টোদিক থেকে একটা বাস বা গাড়ি এলে বিপদে। অতি সন্তর্পণে পিছু হটে সামনের গাড়িকে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে আবার চলা । সাথে বুকধড়পড়ানি , এই বুঝি পড়ে যায় গাড়ি ! রাস্তার একপাশে পাথরের দেওয়াল আর অন্যদিকে গভীর খাদ । ততক্ষণে ভাগিরথী এক চিলতে নীল সূতোর মত হয়েছে । আর দুর্গম থেকে দুর্গমতর পাহাড়ী পথ । ১৯৯১ সালে ভূমিকম্পের ফলে উত্তরকাশীর রাস্তাঘাট এখনো ভয়ানক । অজস্র ল্যান্ডস্লাইড । বড় বড় পাথরের চাঙড় এখনো ঝুলে পাহাড়ের গা ঘেঁষে । রাস্তা যেন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে রয়েছে ! পরের পিটস্টপ গঙ্গনানী । উত্তরকাশী থেকে গঙ্গনানী ৩৯কিমি দূরে । নীল আকাশের গায়ে বরফের টুপি পরা হিমালয়ের চূড়ো । সামনে ঘন সবুজ পাহাড়, স্তরে স্তরে সাজানো । সম্ভবতঃ ঐ বরফচূড়োই গোমুখ গ্লেসিয়ার । গঙ্গনানীর পথ আরো দুর্গম । ভয়ে রক্ত হিম হয়ে গেল । গঙ্গোত্রী পৌঁছে আবার ফিরতে হবে এই ভয়ঙ্কর পথ দিয়ে ! আরো সরু রাস্তা আর মধ্যে মধ্যে ল্যান্ডস্লাইডের নজির ; ভরাবর্ষায় না জানি কি অবস্থা ছিল এখানকার ! একবার ভাগিরথীকে ওপর থেকে দেখতে পাই তো আবার সে হারিয়ে যায় বহুনীচে । উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে গায়ে গরম জামাকাপড়ের আস্তরণ একেএকে । গঙ্গনানীতে একটি গরমজলের কুন্ড ও পরাশর মুনির মন্দির আছে । পাহাড়ের ধাপে ধাপে ঝর্ণার জল গড়িয়ে পড়ছে অবলীলায় । পাহাড়ী ঝোরায় রাস্তা জলময় । এল লোহারীনাগ জলবিদ্যুত কেন্দ্র । কিছুদূরে পাহাড়ের ওপর শৈল শহর হর্ষিল । এবার আবার দেখা গেল ভাগিরথীকে এক ঝলক । ভাগিরথীর ওপর মানেরী ড্যাম আরো সুন্দর করেছে স্থানটিকে । কিছুটা সমতলের মত আর ধারে ধারে কোনিফেরাস পাইন, ক্যাসুরিনার দল সারে সারে । অনেকটা মনোরম রাস্তা ক্যাসুরিনার ছায়াবীথি ধরে । বেশ উপভোগ্য ড্রাইভ । চওড়া রাস্তা, রোদমাখা আকাশ অথচ আমরা চলেছি ছায়ার হাত ধরে । নীল আকাশ আর সবুজ পাহাড়ে মিলে মিশে একাকার । এল লঙ্কা ভিউ পয়েন্ট । খুব সুন্দর দেখায় এখান থেকে । এবার এক চমত্কার দৃশ্য । দুটি পাহাড়ের মধ্যে তৈরী গর্জ দিয়ে ফেনার মত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে ভাগিরথীর স্রোত । পাহাড়ের সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নামছে অবিরাম । অসাধারণ দৃশ্য! এতক্ষণের পথের দুর্গমতা, ভয় ভুলে ছবি নেওয়া শুরু । এবার এল ভৈরোঘাঁটির প্রাচীন শিবমন্দির সেখানে রয়েছেন আনন্দ ভৈরবনাথ, মাগঙ্গার পাহারায় । লেখা "ওয়েলকাম টু গঙ্গোত্রী" । মহাদেব এখানে মাগঙ্গার সিকিউরিটি গার্ড । ততক্ষণে সেই বরফের চূড়ার বেশ কাছে এসেছি । তাপমাত্রাও কমে গেছে অনেকটা । গঙ্গোত্রীর কাছাকাছি এসে মা গঙ্গাকে দেখবার জন্য আকুলি বিকুলি প্রাণ । সেদিন কালীপুজো আর দীপাবলী । গাড়ি গিয়ে নামিয়ে দিল সমতলে। । যার পাশ দিয়ে উঠে গেছে পাহাড়ের চড়াই পথ গোমুখের দিকে । সুদীর্ঘ ১৮ কিমি ট্রেক করতে হয় । আর নীচে চোখের সামনে তখন গঙ্গোত্রী। ভাগিরথীর হৈ হৈ করে বয়ে চলা । কি প্রচন্ড গর্জন তার । কি অপূর্ব রূপ তার । কত উপন্যাস, মানচিত্র, ভূগোল তখন বর্তমান হয়ে ভাসছে চোখের সামনে । বর্ণণা পড়েছি ভাগিরথীর, ছবি দেখেছি এতদিন অবধি এখন সে আমার সামনে; ভাগিরথীকে রাজা না রাণী কি আখ্যা দেওয়া যায় সে বিচার করার ধৃষ্টতা আমার নেই তবে তার যে রাজকীয়তা আছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না । সেই মূহুর্তে আমি তাকে রাণী ভেবে নিলাম । স্রোতস্বিনী তখন নীল ঘাগরার কুঁচি দুলিয়ে, সাদা ওড়না উড়িয়ে নেচে চলেছে আপন মনে । অবিরত তার কোলের কচিকাঁচা নুড়িপাথরকে চুম্বন করে চলেছে । জল নয়, নদী পান্নার কুচি বয়ে নিয়ে চলেছে । অবিরল কুলকুচি সেই পান্নাপাথরের । তার গর্জন ঢেকে ফেলেছে সবকিছু । তার সামনে রোদ্দুরকে মনে হচ্ছে কম তেজী ! দীপাবলীতেই এবছরের মত তাকে দেখে নিতে হবে । ঐদিন সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে সব মন্দির । সেদিন পাহাড়ের শেষরাত । দীপাবলীর রাত । পরদিন ঘরে ফিরবে সকলে মিলে । কেদারনাথ ফিরে আসবেন উখীমঠে । বদ্রীবিশাল যোশীমঠে । গঙ্গোত্রীর মাগঙ্গার ডুলি-পালকিও পৌঁছে গেল আমাদের সাথে সেই এক‌রাস্তায় । সূর্যের দক্ষিণায়নের সাথে সাথে পাহাড়চূড়োয় বরফ পড়বে। তুষারপাত হবে ওপরে । রাস্তা বন্ধ তাই শীতের ছ'মাস সকলে নীচে এসে ঘর পাতবে । আবার সূর্যের উত্তরায়নের সাথে সাথে এরা ওপরে উঠবে । কালীপুজোর দিন গঙ্গাস্নান । পাথর ভেঙে জলে দাঁড়াতেই মনে হল পা দুটো শিথিল । শূণ্য ডিগ্রীর কম বৈ তো বেশি নয় জলের তাপমাত্রা । কোনোক্রমে তিনডুব দিয়ে সকলে পারমার্থিক আনন্দ লাভ করছে । আবার পাথর নুড়ি, উপল সিঁড়ি ভেঙে জল থেকে উঠে ডাঙায় পা দিয়ে চেঞ্জরুম । তারপর গঙ্গারতি, গঙ্গাপুজো আর পিতৃতর্পণ । দেবী সুরেশ্বরী তখনো নাচের ভঙ্গীমায় । মাথার ওপর দুপুর সূর্য । তার ঝলক ভাগিরথীর বুকে । উত্তরদিকে ঘন সবুজ দুইপাহাড়ের মাঝখানে বরফঢাকা গোমুখ । ভাগিরথীর তরল তরঙ্গ নেমেছে সেখান থেকে ।

(কিভাবে যাবেনঃ হাওড়া থেকে হরিদ্বার ও সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে গুপ্তকাশী । পরদিন গুপ্তকাশী থেকে উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গোত্রী ।
 http://www.youtube.com/watch?v=RHq3VNix0R8&feature=player_embedded#!