১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আমাদের গোবর গণেশ

 

মজিলপুরের পুতুল "গণেশ জননী" 

স্কন্দপুরাণে একটি গল্প আছে গণেশের জন্ম নিয়ে।

মা দুর্গা একদিন কৈলাসে বসে স্নানের পূর্বে তেল হলুদ মেখে গাত্রমার্জণা করছিলেন। মায়ের দুই সহচরী জয়া-বিজয়া কাঁচা হলুদ বেটে তার মধ্যে সরষের তেল দিয়ে মায়ের সর্বাঙ্গে মাখিয়ে দিতে ব্যস্ত। মা সেই আরাম পাবেন কি, মনে তাঁর খুব দুঃখ। মহাদেব কত নারীকে পুত্র দিয়ে তাদের আকাঙ্খা পূর্ণ করেন আর দুর্গাই স্বপুত্র থেকে বঞ্চিত। কার্তিককে পেয়েছেন যদিও কিন্তু সে তো তাঁর গর্ভের নয়। সে শিবের ঔরসজাত, গঙ্গার কানীনপুত্র আর ছয় কৃত্তিকার দ্বারা পালিত।


আমাদের নিজেদের বংশের কেউ তো র‌ইলনা দেব। কে আমাদের পারলৌকিক ক্রিয়াদি সম্পন্ন করবে? অতএব একবার আমরা চেষ্টা করেই দেখি। আমার গর্ভে আপনার ঔরসে সন্তান আসুক একটা।


"অদৈব ময়ি সঙ্গম্য ঔরসং জনায়াত্মজম্‌"


বিবাগী শিব এমন কথা শুনে বিচলিত হয়ে বললেন, আমি তো গৃহস্থ ন‌ই, চালচুলো নেই আমার, তোমার সঙ্গে আমার বিয়েটাও তো দেবতাদের ইচ্ছায়। গৃহস্থ মানুষেরা বংশোলোপ পাবার ভয়ে পুত্র কামনা করে, আমি তো অমর। এই তো বেশ আছি আমরা বন্ধুর মতন। পার্বতীর মাতৃহৃদয় শান্ত হলনা।


গাত্রমার্জণা শেষের দিকে। মা জয়া-বিজয়াকে বললেন, তোরা যা দেখি একটু ওদিকে, বাবার সঙ্গে আমাকে একটু একা থাকতে দে। মা নিজের তেলহলুদ মাখা গায়ের ময়লাগুলি তুলতে তুলতে মহাদেবকে বলেই ফেললেন


" আজ আমার একটা ছেলে থাকলে..."


মহাদেব বললেন,


" তুমি ত্রিলোকের যত পুত্রসন্তান আছে তাদের সকলেরি মা"


মা বললেন,"তবুও, একটুতো দুঃখ হয়, বুঝলেনা"


মহাদেব বললেন" কত ঝামেলা করে চন্দ্রলোক থেকে কৃত্তিকাদের অমতেও কার্তিককে এনে দিলাম তাও তোমার দুঃখ ঘুচলোনা?"


মা বললেন " ঠিক আছে আর বলবনা" বলতে বলতে নিজের গায়ের ময়লাগুলি তুলে তুলে মাটিতে ফেলছিলেন মনের দুঃখে। হঠাত তাঁর কি মনে হল, সেই ময়লাগুলি দিয়ে একটি পুতুল গড়ে ফেললেন মাদুর্গা। নারায়ণ সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ঐ পুতুলের মধ্যে সূক্ষ্ম শরীরে প্রবেশ করা মাত্র‌ই পুতুলটি প্রাণ পেল আর মাদুর্গাকে "মা, মা" বলে ডেকে উঠল। মায়ের বুকের ওপরে উঠে তাঁর দুধ খেতে শুরু করে দিল। দুর্গা আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেই ছেলেকে কোলে নিলেন। মহাদেব আবার কার্তিককে এনে তাঁর আরেক কোলে দিলেন। । এবার কৈলাসে মহাভোজ। দুর্গার সুখ আর দ্যাখে কে! দুই পুত্র, দুই কন্যা নিয়ে সুখের সংসার শিব-দুর্গার। কৈলাসের সেই মহাভোজে সব দেবতারা নিমন্ত্রিত হলেন। সকলেই নির্ধারিত দিনে এলেন কেবল শনি মহারাজ ছাড়া। শিব ক্ষুণ্ণ হলেন শনি না আসায়। শনি সম্পর্কে দুর্গার ভাই। একবার দুর্গা শনিকে বর দিয়েছিলেন, সে যার দিকে চাইবে সঙ্গে সঙ্গে তার মাথাটা খসে পড়বে। মহাদেবের অসন্তোষের কারণে সেদিন শনি অবশেষে দুচোখ হাত দিয়ে ঢেকে প্রবেশ করলেন। এদিকে মহাদেব তো আর সেকথা জানেননা। তাঁদের ছেলেকে দেখছেন না শনি, সেও তো এক অপমানের বিষয়। শনি বাধ্য হয়ে চোখ খুলে সেই ছেলের দিকে চাইতেই ছেলের মুন্ডুটি খসে পড়ে গেল মাটিতে। মাদুর্গা কাঁদতে লাগলেন।


দুর্গা নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল দেবতারা বিচলিত হয়ে পড়লেন। মহাদেব বললেন, ভয়ানক গ্রহদোষে দুষ্ট তোমার ছেলে পার্বতী। দৈববাণী হল, "শিশুটি মায়ের কোলে উত্তরমুখী শুয়ে আছে অতএব উত্তরদিকে শয়নরত কোনো পশুর মাথা এনে জুড়ে দেওয়া হোক শিশুর ধড়ে, তাহলে বেঁচে যাবে শিশুটি। " মহাদেব নন্দীকে বললেন ত্রিভুবন ঘুরে উত্তরদিকে শয়নরত যে কোনো পশুর মুন্ডটা কেটে আনতে। নন্দী বেরিয়ে পড়ল। স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ঘুরে নন্দী স্বর্গের রাজধানী অমরাবতীতে গিয়ে উত্তরদিকে শয়নরত ইন্দ্রের হাতি ঐরাবতের মাথাটি‌ই কেটে নিয়ে এল । সেই হাতীর মাথাটা মহাদেব তখুনি মাথাটা ছেলের কাঁধে জোড়া দিলেন ছেলে আবার মা, মা করে ডাকতে শুরু করে দিল।যদিও ছেলেটি একটু বেঁটেখাটো ও মোটা তবুও ঐ গজমুখে তাকে দিব্যি মানিয়ে গেল।


"খর্বস্থূলতরদেবো গজেন্দ্রবদনাম্বুজঃ"


মা দুর্গার একাধারে মা ডাক শুনে আনন্দ হল আবার অন্যথায় ছেলের হাতীর মাথা দেখে দুঃখে প্রাণ কেঁদে উঠল। তাঁর দুঃখ দেখে দেবতারা বললেন, মা তুমি দুঃখ কোরোনা, তোমার এই ছেলের নাম দিলাম গণপতি। সকল দেবতার পুজোর আগে এঁর পুজো হবে সর্বাগ্রে। মা দুর্গা ছেলের এই সম্মানে গর্বিত হলেন।


ব্রহ্মা বিশাল এ ছেলের হাতির মাথা বলে নাম দিলেন গজানন আর বীজমন্ত্রে তার নাম দিলেন হেরম্ব।ভুঁড়ির জন্য লম্বোদর আর একটি দাঁতা ভাঙা (নন্দী মাথা আনতে গিয়ে একটি দাঁত ভেঙে ফেলেছিল) বলে নাম দিলেন একদন্ত।


অচিরেই সেই গণেশ সরস্বতীর হাত থেকে পেল তার প্রথম উপহারস্বরূপ একটি লেখনী। ব্রহ্মা দিলেন জপমালা। ইন্দ্র দিলেন গজদন্ত। লক্ষ্মী দিলেন সম্পদের প্রতীকি স্বরূপ একটি পদ্মফুল। শিব দিলেন ব্যাঘ্রচর্ম। বৃহস্পতি দিলেন যজ্ঞোপবীত। আর পৃথিবী দিলেন একটি মূষিক। মা ছেলের হাতে দিলেন প্রচুর মিষ্টি।


পৃথিবী প্রদত্ত ঐ মূষিকটিই কিন্তু ঐ মিষ্টান্নের ভাগ প্রথম পেয়েছিল।


দক্ষিণে আবার গণেশের জন্মের অন্য কাহিনী আছে। একবার শিব-পার্বতী হিমালয়ের পাদদেশে ভ্রমণ করতে করতে দুটি রমণে রত হস্তী-হস্তিনীকে দেখতে পেলেন। এই মিলন দৃশ্যে তাঁরাও যারপরনেই উত্তেজিত হলেন এবং ইচ্ছাপূরণ করলেন। এবং এর ফলে যে শিশুটি জন্ম নিল তার মাথাটি হাতির এবং ধড়টি মানুষের।


মা-বাপ অর্থাত দুর্গা-শিবের বুড়ো বয়সের "মেঘ না চাইতেই জল" এর মত এই গণেশ পুত্রটি। বাবা যদিও একটু উদাসীন এহেন পুত্রের ব্যাপারে। মায়ের আদিখ্যেতা যেন ধরেনা এই পেটমোটা, বেঁটেখাটো হাতিমুখো ছেলেটির জন্য। এদ্দিন বাদে একটা ছেলে এসে তার অপূর্ণ মাতৃত্বের হাহাকারকে কিছুটা হলেও ভরিয়ে তুলেছে। মাদুর্গার এই "গোবর গণেশ" ছেলেটিকে নিয়ে বড়োই গর্ব। দেবতারা সকলে মিলে একে সব দেবতাদের মাথায় রেখেছেন বলে কথা। তাই এক কথায় গণেশ হলেন প্যাম্পার্ড ব্র্যাট বলতে যা বোঝায় তাই। মায়ের গায়ের সঙ্গে লেপটে থাকে সে। মায়ের আঁচলধরা এই ছেলেকে মা কথায় কথায় একদিন বলেই ফেললেন "এবার একটা বিয়ে দিতে হবে তোর"


গণেশ বলল, তোমার মত মেয়ে চাই কিন্তু মা। মাদুর্গা তো হেসেই খুন! তিনি বললেন, তা আবার হয় না কি বাবা!


শিব মা-ছেলের বন্ধুত্ব দেখে একটু একটু ঈর্ষাও করেন মনে মনে। কারণ তাঁর বুঝি স্ত্রীর আদরে একটু হলেও ভাটা পড়ে। স্ত্রী বুঝি ছেলেকে নিয়ে বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েন।


কেউ কেউ আবার কানাঘুষো বলতেও থাকেন


মা-ছেলের এই সম্পর্কটা ঠিক ভালো নয়, নিশ্চয়‌ই ওরা "খারাপ" ।


দুর্গা সেই শুনে মনে মনে হাসেন।


ফ্রয়েড বলেন "ইডিপাস" বিপরীত লিঙ্গের ওপর স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হওয়াটা দোষের কিছুই নয়। বাংলার ছেলের মায়েরা জানে এ জিনিষের আসল তত্ত্ব। তাই বহুদিন বাদে ছেলে ঘরে এলে মা বলে ওঠেন "আমার গণেশ এল" !


এই ছেলে বেশ এঁচোড়ে পাকা, ডেঁপো বলতে যা বোঝায়। আর হবেনাই বা কেন? জন্মের পরেই মা-বাপের সামনেই সব দেবতারা তাকে গণাধিপত্য দিয়েছে। সে তাই মাথার ওপরেই চড়ে বসে সকলের। এহেন পরিস্থিতিতে একদিন পরশুরাম তাঁর প্রভু শিবের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। শিব-দুর্গা তখন ঘরের মধ্যে মৈথুনে রত। গণেশ পরশুরামের পথ আটকে দেয়। বলে " এখন বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করা যাবেনা" পরশুরাম রেগে আগুণ হয়ে নিজের হাতের কুঠারটি ছুঁড়েই মেরে দেয় গণেশের দিকে। গণেশ জানে ঐ কুঠারটি শিবপ্রদত্ত। একবার পরশুরাম কঠোর তপস্যায় শিবকে তুষ্ট করে শিবের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন। গণেশের কাছে সেই কুঠারটি তাই বেশ গুরুত্ব বহন করছে। কুঠারটি সজোরে এসে লাগে গণেশের বাঁদিকের গজদন্তে। দাঁতটি ভেঙে যায় । তাই বুঝি সে হয় একদন্ত।


গবেষকরা বলেন, শূকর বা হস্তীর দাঁত ভেঙে দেওয়ার অর্থ হল তার পৌরুষ ভেঙে দেওয়া আর সে যাতে পুরুষত্ব হারায় তার ব্যবস্থা করা। মাদুর্গার প্রতি শিবের ঈর্ষার থেকেই নাকি জন্ম নিয়েছিল এরূপ আক্রোশ। তাই নিজ শিষ্য পরশুরামকে দিয়ে অমন কাজ করিয়েছিলেন শিব। কি জানি বাপু! গণপতির পৌরুষ তো আজন্ম অক্ষত থাকতেই দেখেছি। যিনি নিজেই লিঙ্গেশ্বর তিনি‌ই আবার নিজপুত্রের ক্যাস্ট্রেশানের ব্যবস্থা করলেন এভাবে? একটি দাঁত তো ভেঙে দিলেন পরশুরাম আর অন্যটি যে আমাদের সর্ব শক্তি দিয়ে সর্বদা রক্ষা করে চলেছে, সিদ্ধি-বুদ্ধি সব যুগিয়ে চলেছেন তার কি ব্যাখ্যা দেবেন গবেষকরা? বরং বলা যেতে পারে ইন্দ্রিয় সংযম করে আজীবন ব্রহ্মচর্য পালনের ব্রত পালনে মন দিলেন তিনি। কিন্তু তাও তো নয়। বিশ্বকর্মার দুই শুভকারিণী শক্তি কন্যা বুদ্ধি আর সিদ্ধির সঙ্গে তাঁর বিয়েও হয়েছিল আর দুটি সন্তানও জন্ম নিয়েছিল। সিদ্ধির গর্ভে গণেশের পুত্র লক্ষ্য আর বুদ্ধির গর্ভে লাভ এর জন্ম হয়।


গণেশের এই রূপকধর্মী বংশপরম্পরা থেকে বোঝা যায় ব্যবসায়ীদের দোকানে "শুভলাভ" লেখা থাকার কারণটি।   


তিনি হলেন গিয়ে "গণানাং পতি", গণশক্তির প্রতীক, গণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ (গণ+ঈশ) । বিনায়ক (বি+নী+অক) তাঁর অপর নাম। আর প্রমথগণ হলেন শিবের অনুচর এবং সঙ্গী। তাঁরা নাচগানে পারদর্শী । সন্ধ্যার অন্ধকার প্রমথগণের আশ্রয়। বিনায়ক হলেন সেই প্রমথগণের পতি। সন্ধ্যার অধিপতি দেবতা বলে সন্ধ্যারূপিণী লক্ষ্মীদেবীর পাশে গনেশের অবস্থান। ভূতপ্রেতদের দৌরাত্ম্যি ও সকলপ্রকার বাধাবিঘ্ন নাশ করার জন্য প্রমথগণ গণপতিকে সন্তুষ্ট রাখতেন তাই গণপতির অপর নাম বিঘ্নেশ। তাঁকে পুজো করলে সিদ্ধিলাভ হয় তাই তিনি সিদ্ধিদাতা গণেশ। গ্রীসে ও রোমে গণেশ "জুনো(Juno)" নামে পুজো পান। হিন্দুধর্ম ছাড়া বৌদ্ধধর্মেও গণপতিকে "ওঁ রাগ সিদ্ধি সিদ্ধি সর্বার্থং মে প্রসাদয় প্রসাদয় হুঁ জ জ স্বাহা" মন্ত্রে পুজো করা হয়। কিন্তু তফাত হল হিন্দুদের গণপতি সিদ্ধিদাতা আর বৌদ্ধদের সিদ্ধিনাশক যা সম্পূর্ণ বিপরীত। হিন্দুদের দেবী অপরাজিতা মা দুর্গার ডানদিকে থাকেন গণপতি। কিন্তু মহাযানী বৌদ্ধদের অপরাজিতা দেবীর সাধনায় লক্ষ্য করা যায় গণপতি চিরবিঘ্ন প্রদায়ক। সেখানে দেবীর বাঁ পা গণেশের উরুতে আর ডান পা ইন্দ্রের ওপরে ন্যস্ত। বিনায়ক দেবীর পদভারে আক্রান্ত। আবার পুরাণের মতে গণেশ কেবলমাত্র শিব-দুর্গার পুত্ররূপে পরিচিত। বহুযুগ আগে সমাজে দুধরণের সম্প্রদায় ছিল যাঁরা দুটি ভিন্ন মতবাদে গণেশের পূজা করত। একদল নাগ-উপাসক ছিল তাই গণেশের গলায় যে যজ্ঞ-উপবীত বা পৈতেটি রয়েছে সেটি নাগোপবীত তথা নাগের অলঙ্কারের পরিচায়ক। আর অন্য সম্প্রদায় আবার স্কন্দ বা কার্তিকের পূজারী। তারা নাগ-উপাসনার বিরোধী হয়ে কার্তিকের বাহন ময়ূরকেই বেশী প্রাধান্য দিত । ময়ূর হল নাগেদের শত্রু।


বর্তমান দুর্গাপুজোতে আমরা মা দুর্গার দুই পাশে কার্তিক ও গণেশ উভয়েরি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান লক্ষ্য করি। অর্থাত নাগ-উপবীতধারী গণেশও র‌ইলেন আবার ময়ূরবাহন কার্তিকও র‌ইলেন। আর সেই রূপটি‌ই সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে আজো সমাদৃত।



এবার গণেশ, গণাধিপতি, গণপতি সব নামগুলিতে "গণ" শব্দটি কেন? গণ'র আভিধানিক অর্থ হল অনেকের সমাহার। বেদের মধ্যে যে সব দেবতাদের নাম পাওয়া যায় অর্থাত রুদ্রগণ, বসুগণ, আদিত্যগণ, সকলের মাথার ওপরে দেবাশীর্বাদ প্রাপ্ত এই গণেশের ওপরে যে গণাধিপত্য বর্তালো তার জেরেই তিনি হলেন সকল দেবতাগণের পতি বা শ্রেষ্ঠ।


"ভবতোপি গণা যে তু তেষামপ্যাধিকো ভবেত্‌"



বিশালাকার গণপতির বাহন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুষিক । আর তার অনুপাতে অতি ক্ষুদ্র ইঁদুর জীবের ছোট ছোট কর্মফলের কর্তনকারী । অর্থাত অতি বৃহত শুভ কর্মের দ্বারা কৃত সুফল বিনষ্ট হয়ে যায় ছোট্ট কোনো মন্দ কর্মের দ্বারা । তাই ষড়রিপু বা কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ ইত্যাদির মত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কর্মফল বিনাশ করে ইঁদুর যাতে কিনা বৃহত সিদ্ধিলাভে বাধা না ঘটে ।


আমরা ছোট থেকে গণেশের পাশে যে কলাবৌটি দেখে অভ্যস্ত সেটিকে মনেমনে গণেশের বৌ বলেই জানি। আচ্ছা এই কি সেই বৃক্ষবধূ? যে কিনা আমাদের কৃষিপ্রধান দেশের বর্ষবরেণ্যা এক দেবী যার নাম নবপত্রিকা। তাঁকেই তো জানি মাদুর্গা রূপে পাঁচদিন অর্চনা করা হয়। তাহলে গণেশের পাশে কেন তিনি? আবারো উঠে আসে মা-ছেলের সেই প্রগাঢ় সম্পর্কের কথা। এখানেও মায়ের আঁচলধরা সেই ছেলেটি। আসলে আমাদের ঘরের মেয়ে দুর্গার এই সপরিবারে আসাটা আমাদের মেনে নেওয়াটাই কাল হয়েছে। এক চালচিত্রের লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ নিয়ে মা দুর্গা...এরা কেউ মায়ের পেটের সন্তানতো নন। সেটাই ভুলে যাই আমরা। বিভিন্ন শক্তির প্রতিমূর্তি এঁরা। এই যে কলাবৌ বা উদ্ভিদবধূটি, এতো শস্যশালিনী পৃথিবী-মাতৃকার প্রতীক। অতএব আদি অনন্তকাল থেকে আমাদের ঐ "মা"য়ের ওপরে অবসেশানটা থেকেই যায়।


সত্যি কি বৃহদাকার গণপতির বাহন ঐ মূষিক? তাহলে ঐ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুষিকের ওপরে চড়ে বসলে তো সে মরেই যাবে। তাহলে বাহন কেন বলি আমরা? জন্মের পরেই গনেশ সব দেবতাদের কাছ থেকে একগুচ্ছ দৈবী উপহার পেয়েছিলেন আগেই বলেছি। তার মধ্যে পৃথিবীমায়ের দেওয়া এই ইঁদুরটি কেন? হস্তীমুখ গজাননের প্রচন্ড ক্ষুধা আর ইঁদুরের শস্যদানা ভক্ষণের প্রবল ইচ্ছা দুয়ে মিলেমিশে এক সেইখানে।

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

কৌশিকী অমাবস্যা

 পার্বতী তাঁর আগের জন্মে সতী রূপে দক্ষ যজ্ঞ স্থলেই আত্মাহুতি দেন। তাই পরের জন্মে ওঁর গায়ের রঙ কালো মেঘের মতো হয়ে যায়। মহাদেব তাই তাঁকে কালিকা নামে ডাকতেন। একদিন দৈত্য দ্বারা পীড়িত দেবতারা যখন কৈলাসে আশ্রয় নিলেন, মহাদেব সব দেবতাদের সামনেই পার্বতীকে বললেন, “কালিকা, এসো। তুমি ওদের উদ্ধার করো।”

আবার একদিন সবার সামনে বউকে আদর করে 'কালী' বলে ডাকায় পার্বতী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, অপমানিত ও ক্রোধিত হলেন।
এদিকে কৈলাসে পা দিয়ে দেবতারা নতুন বউয়ের গায়ের রঙ দেখে মুখ চাওয়াচাউয়ি করলেন।
মহাদেব জানতে পেরে বললেন, "তা বাপু, আমি দেখেশুনে ফর্সা না কালো বৌ আনবো তাতে তোমাদের এত মাথাব্যাথা কিসের?" দেবতারা মুচকি হাসলেন।
গায়ের রঙ নিয়ে বারেবারে এসব চাপানউতোর কালীর মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না।
কৈলাসে পৌঁছে দেবতাদের বড় আনন্দ তখন। একে প্রাকৃতিক শোভা তায় নতুন বউয়ের সম্মানার্থে বেশ সাজো সাজো রব।
মহাদেবের মনোরঞ্জনের জন্য ইন্দ্র অপ্সরাকে এনেছেন নাচাগানার জন্য। মাঝখান থেকে এত সব অতিথি আপ্যায়নে কালিকার একেই নাভিশ্বাস ওঠে তায় আবার গায়ের রঙ নিয়ে সবার কানাঘুষো।
অপ্সরাদের সামনেই মহাদেব আবার আদরের সঙ্গে ডাক দেন বউকে,
-হে অঞ্জনসদৃশ শ্যামলী, আমার রূপসী কুচকুচে কালী, ওগো বধূ ব্ল্যাক-বিউটি ! ক‌ই ? এসো একটিবার সামনে, দ্যাখো কারা এসেচেন তোমার সঙ্গে আলাপ করতে, তোমাকে নাচগান শোনাতে!
ফর্সা অপ্সরাদের সামনে এরূপ কুরুচিকর সম্বোধনে কালিকা গেলেন ক্ষেপে। একে নতুন বৌ, তায় আবার রাসভারী, মেজাজী, দাপুটে এক মেয়ে। তাঁর মোটেও সহ্য হলনা।
তিনি মনে মনে বললেন, " কি এত বড় আস্পর্ধা! আবার আমাকে বাইরের নারীর সামনে কালো বলা! ধ্যুত্তোর গায়ের রঙ! আমিও দেখিয়ে দেব আমার প্রকৃত স্বরূপ। আমি ছাড়া তোরা সবাই অচল।"
মনের দুঃখে পাশের মানস সরোবরে গিয়ে তপস্যা শুরু করলেন। নিজের গায়ের কৃষ্ণকোষগুলি একে একে পরিত্যাগ করলেন। যেন খোলস ছাড়ছেন তিনি। দ্বিখণ্ডিত ব্যাক্তিত্ত্ব বা স্প্লিট পার্সোনালিটি হলেন বোধহয়। কালো রং অনায়াসে বদলে ফেলে কালিকা হলেন গৌরী ।
তপস্যান্তে শীতল মানস সরোবরের জলে স্নান করে দেখলেন নিজের দেহের রঙ হয়েছে পূর্ণিমার চাঁদের মতো। ইনিই দেবী কৌশিকী। পার্বতী বা কালিকার আরেক রূপ। তাইতো এই অমাবস্যার নাম কৌশিকী অমাবস্যা। আজ ভরা ভাদ্রের সেই তিথি, যে দিন এই দেবীর উৎপত্তি হয় এবং তিনিই পরে শুম্ভ ও নিশুম্ভকে বধ করেন। শুরুতেই বলেছি, যে কারণে দেবতাদের অত কাঠখড় পুড়িয়ে কৈলাসে আসা।

বটতলার উপন্যাস বলতে কী বোঝায় ?

আজ আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা ‘বটতলা সাহিত্য’ বলতে ঠিক কী বোঝায়। এই বটতলা টা কোথায়? বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ক্রমবিবর্তন ধারায় বটতলার প্রকাশন ও সাহিত্য কে কিন্তু মোটেও ভুলে যাওয়ার নয়।  উত্তর কলকাতার শোভাবাজার-চিৎপুর এলাকার এক বিশাল বটগাছকে কেন্দ্র করে এই নামের উৎপত্তি। উনিশ শতকের বাংলার মুদ্রণ ও প্রকাশনাশিল্প এখানেই শুরু হয়েছিল। এই বটগাছ এবং তাঁকে কেন্দ্র করে তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্প গড়ে উঠেছিল তা মূলত কম শিক্ষিত আর অত্যন্ত সাধারণ মানের পাঠকের চাহিদা মেটাতে। বটতলার ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে সুকুমার সেন তাঁর ‘বটতলার বই’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন—

“সেকালে অর্থাৎ আজ থেকে দেড়শ বছরেরও বেশি কাল আগে শোভাবাজার কালাখানা অঞ্চলে একটা বড় বনস্পতি ছিল। সেই বটগাছের শানবাঁধানো তলায় তখনকার পুরবাসীদের অনেক কাজ চলত। বসে বিশ্রাম নেওয়া হত। আড্ডা দেওয়া হত। গানবাজনা হত। বইয়ের পসরাও বসত। অনুমান হয় এই বই ছিল বিশ্বনাথ দেবের ছাপা, ইনিই বটতলা অঞ্চলে এবং সেকালের উত্তর কলকাতায় প্রথম ছাপাখানা খুলেছিলেন, বহুকাল পর্যন্ত এই ‘বান্ধা বটতলা’ উত্তর কলকাতায় পুস্তক প্রকাশকদের ঠিকানা চালু ছিল... ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ছোট সস্তার প্রেস গড়ে ওঠে। এগুলির চৌহদ্দি ছিল দক্ষিণে বিডন স্ট্রিট ও নিমতলা ঘাট স্ট্রিট, পশ্চিমে স্ট্র্যান্ড রোড, উত্তরে শ্যামবাজার স্ট্রিট এবং পূর্বে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট”।

বাংলা ছাপাখানার আঁতুড় ঘর যদি হয় হুগলির শ্রীরামপুর, তবে তার যৌবনের উপবন বটতলা।  সে যুগে এই বটতলার প্রকাশন সংস্থা সমূহ সত্যি সত্যি সস্তার বই ছেপে বের করে ফিরিওয়ালা মারফত পাঠকের হাতে তুলে দিত।শুধু বাংলাভাষার প্রসার আর পাঠকমনের ক্ষুধা মেটাতে। উত্তর কলকাতার নিমু গোস্বামী লেন এবং আহিরিটোলার জংশনে এক প্রকাণ্ড বটগাছ ছিল। তার নীচেই এই বটতলা প্রকাশনার জন্ম। বিশ্বনাথ দেব, বাণেশ্বর ঘোষ ছিলেন এর রূপকার। এভাবেই আমাদের কলকাতা যাবতীয় জ্ঞানজনিত কর্ম কাণ্ডের সাক্ষী তথা বইপোকা বাঙালির জ্ঞানার্জনের পীঠস্থান হয়ে দাঁড়ায়। 

বটতলার আশেপাশের অলিগলি ‘বটতলা’ এবং এসব অঞ্চল থেকে প্রকাশিত বইপত্র ‘বটতলার পুঁথি’ নামে পরিচিত। সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পুঁথি, পাঁচালি, পঞ্জিকা, পুরাণ, লোককাহিনি, ধর্মগ্রন্থ, দেবদেবীর পূজা পদ্ধতি, আয়ুর্বেদ, গার্হস্থ্য স্বাস্থ্য, সচিত্র রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি এখান থেকে প্রকাশিত হত। বটতলার লেখক ও প্রকাশকেরা বৈষয়িক লাভের কথা চিন্তা করেই শুধু পুরাণকাহিনি, লোককাহিনি, পাঁচালি এবং পত্রিকা প্রকাশ করতেন। কারণ, সাধারণ পাঠকের কাছে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা ছিল। 

কিন্তু ১৮৫০-এর দশক থেকে মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে এর গুরুত্ব কমতে থাকে। জ্ঞানবিজ্ঞান এবং উন্নতরুচির গ্রন্থসমূহ এই অঞ্চলের ছাপাখানার বাইরে থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। 

আদৌ কি অতখানি অবজ্ঞার যোগ্য বটতলার সাহিত্য? বোধ হয় না। এখনও বহুলোকের মনে ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, এখান থেকে শুধুই ষড়রিপুর উসকানিমূলক বই ছাপা হত। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যে না হলেও অনেকাংশেই ভুল ধারণা। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যেমন এরকম বই অনেক বেরিয়েছিল, তার থেকে কিন্তু অনেক বেশি সংখ্যায় প্রকাশিত হত সাধারণ মানুষের ব্যবহারিক জীবনের চাহিদাকে মাথায় রেখে লেখা বইগুলি। তৎকালীন বঙ্গজীবনের তৃণমূল স্তরের মানুষের চাওয়া-পাওয়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেছিল বটতলার সাহিত্যে। শুধুমাত্র সাহিত্যচর্চা বললে ভুল হবে, সাধারণ এবং সামান্য শিক্ষিত মানুষদের সাংসারিক ও সামাজিক চাহিদা পূরণ করত এই বটতলার বইগুলি।

আবার লাভের কথা চিন্তা করে বটতলার বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হতে থাকে এমন কিছু বই যার মূল উপজীব্য শহরের বহু নামী পরিবার কিংবা সমাজপতিদের পরিবারের কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির কথা। কারও-কারও মতে, ‘কেচ্ছার বই’ মানেই নাকি ‘বটতলা সাহিত্য’। বটতলায় ছাপা পঞ্জিকা সেই আমলে কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় ঝাঁকায় করে বিক্রি করত ফেরিওয়ালারা। আর সেই পঞ্জিকার ফাঁকেই অন্তঃপুরে ঢুকে পড়ে তখনকার নানা কেচ্ছা কাহিনি। এই কারণে তৎকালীন প্রগতিশীল সমাজ বটতলার প্রকাশনা সংস্থাকে উচ্চাঙ্গ সাহিত্যের মর্যাদা দেয়নি। 

বাংলায় পঞ্চাননের হরফ তো ছিল কিন্তু বইয়ের মধ্যে চিত্র সংযোজন এবং নানারকম অলংকরণ বটতলারই অবদান। ইউরোপের কাঠখোদাই ও প্রস্তরখোদাই প্রযুক্তির অনুকরণে চিত্র সংযোজনের মাধ্যমে বটতলার মুদ্রাকররা গ্রন্থের গুণাগুণ বৃদ্ধি করতেন, যা আগে এ দেশে কারও জানা ছিল না। দেবদেবীর এবং অন্যান্য পৌরাণিক ছবি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করত। 

বিশেষ করে তৎকালীন সমাজের বেশ কিছু কেচ্ছাকাহিনির রগরগে উপস্থাপন করে বটতলার কিছু প্রকাশনা সংস্থা যেভাবে লক্ষ্মীলাভে তৎপর হয়ে উঠেছিল, তাতে বটতলার বইমাত্রেই ‘নিম্নরুচির বই’ ভাবতে শুরু করে সচেতন বঙ্গসমাজ। সামগ্রিকভাবে প্রগতিশীল সমাজের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্যতা আর মান দুইই হারিয়ে ফেলে বটতলার প্রকাশনা কেন্দ্রগুলো এবং কালেকালে নিম্নমানের সাহিত্যের সমার্থক হিসেবে ‘বটতলা’ রীতিমতো প্রবাদে পরিণত হয়। তাই বটতলা নিছক কেচ্ছা-প্রকাশক নয়, সে আদতে এই বাংলারই এক ঐতিহ্য।



বাংলার প্রথম ছাপা বই এর নাম জানো?

 ওয়ারেন হেস্টিংস শিক্ষার অনুরাগী ছিলেন। খুব লেখাপড়া পছন্দ করতেন। বিশেষতঃ ইষ্টার্ণ ইন্ডিয়ার এই কলকাতার সম্বন্ধে ওনার জানার খুব আগ্রহ  ছিল। তিনি  নাথানিয়াল ব্রাসি হ্যালহেড সাহেব কে দিয়ে ইংরেজিতে বাংলাভাষার গ্রামার ব‌ই লিখিয়েছিলেন। সেটা ছিল ১৭৭৮ সাল। কেন লেখালেন? নিজেদের সুবিধে হবে তাই। বাংলা লিখতে পড়তে পারলে ওদেরই শাসনকার্যে সুবিধে তখন। আর হ্যালহেড সাহেব কী সুন্দর বাংলাভাষাটা সে যুগে রপ্ত করেছিলেন!  তাই তরতর করে বাংলা গ্রামারের ব‌ইখানি লিখে ফেলার সাহসও দেখিয়েছিলেন। ব‌ই তো লেখা হল। কিন্তু ছাপা হবে কি করে? বাংলা হরফ ক‌ই? হেস্টিংস অর্ডার করলেন উইলকিনস সাহেবকে । বাংলা হরফ বানাতে। প্রিন্টিং প্রেসে বাংলা ব‌ই ছাপা হবে। ব্যাস! এবার হ্যালহেডের সেই গ্রামার ব‌ইয়ের পাণ্ডুলিপি চার্লস উইলকিনস প্রিন্ট করিয়েছিলেন বাংলা হরফে। বাংলাদেশের প্রথম ছাপাখানা এই হেস্টিংসের ইচ্ছেতেই হয়েছিল কিন্তু। শুধু তাই নয় উইলকিনসকে দিয়ে তিনি প্রথম ইংরেজীতে অনুবাদ করিয়েছিলেন শ্রীমদ্ভাগবত্গীতা । 

কলকাতার কাছেই হুগলীতে ছাপাখানাটি খুললেন চার্লস উইলকিনস। তাঁকে সাহায্য  করলেন একজন বাঙ্গালী পন্ডিত মানুষ। নাম পঞ্চানন কর্মকার। এদের দুজনের প্রচেষ্টায় জন্ম নিল প্রথম বাংলা ব‌ইয়ের ছাপার হরফ। 

সে যুগে শিক্ষার প্রসারে সবচেয়ে বেশী সহায়ক হয়েছিল মুদ্রা যন্ত্র বা প্রিন্টিং প্রেস। বাংলা ভাষায় ছেপে বেরনো প্রথম বই হিসেবে প্রসিদ্ধি পাওয়া ‘আ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ’-এর সব কটা বাংলা হরফ এই পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি। তাতে কালি লেপেই বাংলা অক্ষরের ছাপ তোলা হয়েছিল কাগজে। হুগলী তে সূত্রপাত আর তারপরেই কলকাতা শহর মুদ্রণের পীঠস্থান হয়ে ওঠে। সমাজের ওপর ছাপাখানার প্রভাব পড়ার শুরু তখন থেকেই। ছাপাখানা থেকে স্রোতের মত বই বেরুতে লাগল। ছাপা বই বেরিয়েছিল বলেই এদেশে শিক্ষার প্রসার সুগম হয়েছিল।

১০ আগস্ট, ২০২১

ভাঙা আয়না / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

  



ভাঙা আয়না  

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

(১)

সল্টলেকের বহুতল অফিসবিল্ডিং টা অনেক কষ্ট করে মনে পড়েও পড়ে না তন্ময়ের। বিশাল লম্বা কাচের দেওয়ালের পাশেই ছিল তার ডেস্ক। পূর্ব শহরতলীর বেশ সুন্দর স্কাইভিউ পেত সেখান থেকে। কাজের ফাঁকে চোখের আরাম হত নীল-সবুজের মাখামাখি দেখে। 

তন্ময়ের জীবনটা ওলটপালট হয়ে আছে এখন। সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের এক কেবিনের মধ্যে সে । কখনও বিছানায় বসে থাকে হাঁটু মুড়ে অথবা শুয়ে। ঘর অন্ধকারই বেশী ভালো লাগে তার। উল্টোদিকের দেয়ালের ওপর কোথাও থেকে একটা  তির্যক আলোর রেখা উঁকি মারে। তন্ময়ের আলো ভালো লাগেনা। তার চোখ  আলোর দিকে নয়। নিজের হাতের আঙ্গুলগুলো বারবার এক দুই তিন করে গুনছে আর হিসেব ভুল হয়ে যাচ্ছে। একবার সামনের দিকে গোনে তো আরেকবার উল্টোদিক থেকে। তন্ময়ের বয়স তিরিশের কমই তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্দাজ করা মুস্কিল। খোঁচা খোঁচা দাড়িতে ঢাকা মুখ, উসকোখুসকো চুল। পরনে স্ট্রাইপড নীল শার্ট আর নীল পাজামা। হাসপাতালের  রুগীদের ড্রেসকোড যেমন হয় আর কি। 

দুহাতের দশটি আঙ্গুল বারবার এক দুই তিন করে গুণেই চলেছে তন্ময় আর হিসেবে কেবলই ভুল হয়ে যাচ্ছে। হাতের নখ বেড়েছে বেশ। দেখতে পায়না তন্ময় সেসব। 

মাঝেমাঝে নিজের মনেই বকে চলে অসংলগ্ন সংলাপ। গোনাতে খেই হারিয়ে গেলেই মনে পড়ে পুরনো কথা। আবছা স্মৃতি অফিসের। সেই নীল-সবুজ দৃশ্যপট। ল্যাপটপের কিবোর্ডে ঝড় তোলা সেই শব্দ। আবার হারিয়ে যায় সব। এর মধ্যেই সেই দেওয়ালের ওপর অস্বস্তিকর আলোর রেখা। তা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই  ক্ষীণ হতে থাকে প্রতিদিন। একইভাবে। একইসময়ে। সে হুঁশ নেই তন্ময়ের। ঘড়ির সঙ্গে অনেকদিন কোনও সম্পর্ক নেই তার। 

কেউ যেন কেবিনের দরজা খোলে। সেই শব্দে চেয়ে দেখে তন্ময়। একজন মধ্যবয়স্কা নার্স এগিয়ে আসেন। তাঁর বুকে স্টিলের পাতে ইংরেজীতে নাম লেখা "অলকা"। পড়তে পারল তন্ময়। কিন্তু তাঁকে দেখেও না দেখার ভান করে। নিজের মনে আঙুল গোনায় ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। অলকার চোখে পড়ে তন্ময়ের হাতের নখগুলো। ভাবেন, কেটে দিতে হবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে। 

অলকার খুব পছন্দের কর্মস্থল এই সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতালের মানসিক নিরাময় কেন্দ্রটি। 

তন্ময় কে মৃদু স্বরে ডাকলেন নাম ধরে। নাহ! কোনও ইচ্ছেই নেই সাড়া দেবার। এবার আরও কাছে গিয়ে তার মাথার চুলে হাত দিলেন অলকা। 


তন্ময় তাঁর মুখের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। 

অলকা বললেন, খেতে যাবে আমার সঙ্গে? অনেক বেলা হল তো। 

তন্ময় বুঝে উঠতে পারেনা, কোথায় যেতে হবে তাকে। কেনই বা খেতে হবে? খিদে তো পায়নি তার। 

অলকা বললেন, না কি এখানেই খাবার দিতে বলব? 

তন্ময় ভাবে, এখানে? খাটের ওপরে বসে রোজ খায় সে? মনে করতে পারেনা। 

অলকা বললেন, কি খেতে ইচ্ছে করছে বল আমাকে। 

তন্ময় বলে সেই বিস্কিট টা? যেটা অফিসে খেতাম রোজ। একটা কৌটোয় রাখা থাকত আমাদের ডেস্কের পাশে। 

অলকা বললেন, কি বিস্কিট? ক্রিম দেওয়া? চকোলেট না কি নোনতা ক্র্যাকার? 

তন্ময় বলল, না, না মোটা মোটা। 

অলকা বললেন, বুঝেছি। কুকিজ? 

তন্ময় বলল, তুমি কি করে জানলে? 

আমাকে সব জানতে হয়। বুঝেছ? আমারও ঘরে তোমার বয়সী একজন ছিল  কিনা। তারও পছন্দ ছিল এইসব। বলে হাসিমুখে তন্ময়ের অবাধ্য  চুলগুলো ঘেঁটে মাথার ওপর পাতিয়ে দিলেন। তন্ময়ের আবছা মনে পড়ল মায়ের কথা। এমন করেই দিত তার মা। 

অলকার ব্যাগে সবসময় একটা করে কালোজিরে দেওয়া বেকারী বিস্কিটের প্যাকেট রাখা থাকে। মনে পড়তেই সেটি এনে তন্ময়ের হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনি। খাবে নাকি তন্ময়? 

খুব খুশিতে তন্ময় হাত বাড়িয়ে দিল। আপাতত আঙুল গোনার থেকে নিষ্কৃতি পেল ছেলেটা। মনে মনে ভাবেন অলকা। কি গুণে চলে সে অবিরাম? সেদিন দুপুরে তন্ময়ের মুখোমুখি সেই ঘরেই বসে লাঞ্চ সারলেন দুজনেই। তন্ময়ের চোখেমুখে বেশ পরিতৃপ্তির চিহ্ন দেখলেন অলকা। 

ভাবলেন, কোথা থেকে কি হয়ে যায়! এই ছেলের আজ কত আনন্দে থাকার কথা। কী  ই বা এমন বয়স তার। মেদিনীপুরের গ্রামের ছেলে। বাবা, মায়ের সঙ্গে বড় হয়ে পড়াশুনো করে মোটের ওপর কলকাতায় একটা ভালোই চাকরি জুটিয়েছিল।এই কদিনেই তাঁর বেশ মায়া পড়ে গেছে ছেলেটার ওপর। 

 

অলকা ভালোই বোঝেন যৌবনে পদার্পণ করা ছেলেপুলের মনস্তত্ত্ব। খুব সেন্সটিভ ইস্যু এসব পেশেন্ট কে ডিল করা। 

(২) 

এখানে ভর্তি হবার দিনেই তন্ময়ের বাবা দিয়ে গেছেন একটা ডায়েরি। সেটির ওপর অলকা কে নজর দিতে বলেছেন ডাক্তারবাবু। কাজের ফাঁকে সময় পেলেই অলকা চোখ রাখছেন ডায়েরির পাতায়। 


অলকার চোখের সামনে সেই ডায়েরী খানা খোলা । একের পর এক পাতা উলটে চলেন তিনি । স্তম্ভিত হয়ে যান আর ভাবেন জগতে এত সৃষ্টিশীল মানুষের মধ্যে এই ছেলেটিও তো নাম করতে পারত । কী অপূর্ব হাতের লেখা! কী অপূর্ব কবিতা লেখে । দু-এক লাইনের ফাঁকে ফাঁকে নীল পেন দিয়ে আবার ছোট্ট ছোট্ট ছবিও তার হাতের । অলকার ঘুম পালিয়ে গেল । 

কোথাও লেখা, 

আমি কেমন জানি ফুরিয়ে আসছি মা। কেন এমন হল আমার? 

এতো ডায়েরীর শেষের দিকের লেখা । এবার অলকা পাতা উল্টে সামনের দিকে আসেন।

 

একটা পাতায় লেখাঃ

উফ্‌ ! আর পারছিনা সহ্য করতে। মা, ওদের তুমি ঢুকতে দিওনা বাড়িতে । ওরা তুলসীগাছের কাছে দাঁড়িয়ে আছে এখনো । ওরা কী সংযুক্তা কে নিয়ে এল মা? 


আরেকটা পাতায় লেখাঃ

আমার মনে হচ্চে জ্বর এসেছে, এই দ্যাখো দ্যাখো আমার গায়ে হাত দিয়ে, হ্যাঁগো, আমি সত্যি বলছি । আলোটা নিভিয়ে দাও মা । সংযুক্তা এলে আমায় জানিও প্লিজ মা। আই বেগ অফ ইউ। 


অলকা আবারো পাতা উলটে চলেন । একটা পাতায় গিয়ে চোখ আটকে গেল তাঁর । 

বিশ্বাস করো তুমি, আমি মিথ্যে বলছিনা । তোমাকে সত্যি সত্যিই খুব ভালোবেসেছিলাম সংযুক্তা । আমাকে ভুল বুঝোনা। প্লিজ, সংযুক্তা প্লিজ। 


এতসব অসংলগ্ন টুকরো চিঠির ভীড়ে অলকার মাথায় একটাই কথা বারবার ঘুরছে তখন । ভাবতে লাগলেন তন্ময়ের এখানে আসার কারণ ।


আরও আগের কথা... 

পড়ে ফেলে নিজের মত করে ভাবতে বসলেন অলকা। 

তখন তার শেষের দিকের স্কুলবেলা । উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান শাখা । যারপরনেই পড়ার চাপ । মধ্যবিত্ত পরিবারের একরত্তি শিবরাত্তিরের সলতে । তার ওপরেই যত আশা তার মা বাপের । ছেলেটাও খুব উজ্জ্বল । চোখে মুখে বুদ্ধিদীপ্ততার ছাপ । ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড না হোক ওপরের দিকেই আছে সে । কিন্তু আজকের বাজারে অমন ওপরের দিকে থেকেও কত স্বপ্ন হারিয়ে যায় । হতে চাইলেই হওয়া যায়না অনেক কিছু । তন্ময় মোটামুটি ঠিক করেই ফেলেছিল জেনারেল স্ট্রিমে কিছু একটা অনার্স নিয়ে ভর্তি হবে ভালো একটা । এখনো তো কোলকাতার কলেজের ছেলেরাও কলার তুলে ঘুরে বেড়ানোর ক্ষমতা রাখেরে বাবা ! বাবা তাকে টিউটরও দিয়েছিলেন প্রতিটি বিষয়ে । এজন্য বাবার কাছে খুব লজ্জিত । খেতে বসে এক একদিন বাবা পড়াশুনোর কথা জানতে চাইলে সে কেমন আড়ষ্ট হয়ে ওঠে । সে ভাবে, বাবা উদয় অস্ত পরিশ্রম করছেন । সারাটাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম সেরে বাবার মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারলেই সে কৃতার্থ । কোন্‌দিন আবার বাবা ছেলের জন্য ধর্মতলার মোড় থেকে একটা ছাতা নিয়ে আসেন । কোনোদিন তাঁর হাতে থাকে ঘিয়ের পান্তুয়া । কোনোদিন আবার চারটে বড় বড় ইম্পোর্টেড আপেল নিয়ে ছেলের মা'কে বলেন টিফিন দিতে। বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছে তন্ময়, প্র্যাকটিকাল করতে হয় দাঁড়িয়ে দাঁডিয়ে । এইভাবে চলতে থাকে তন্ময়ের  যুদ্ধ তার লক্ষ্য নিয়ে আর তার বাবার চাকরী সামাল দিতে দিতে ।

আজ ডাঃ সেনের ফোন এসেছিল অলকার কাছে। পেশেন্ট তন্ময়ের আপডেটস  জানতে। অলকা ডায়েরীর পাতার তন্ময়ের সঙ্গে সেদিনের তন্ময় কে মেলাতে চান । তন্ময়ের চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা। ঘোলাটে চাহনি। যেন পৃথিবী থেকে তার সব পাওয়া ফুরিয়ে গিয়েছে, আর কিছুই নেই বাকি। আজ অবধি তন্ময় একটি কথাও বলেনি। অলকা ডায়েরীর পাতা উল্টে আবার ফিরে যান  তার স্কুলের সেই দিনগুলিতে।

ডায়েরীর পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে চোখে পড়ে... 

" যদি আমি কোনো কিছুতেই না পাই তবে আমার কি হবে? বাবা, মা আমার জন্যে এত চেষ্টা করে চলেছে ।

বন্ধুরা তো বলেই দিয়েছে একবার না পাই আবার বসব জয়েন্টে। 

সেবন্তী তো বলেই দিয়েছে কিছু না পেলে বাংলায় অনার্স পড়বে ।

কিন্তু আমি যদি সায়েন্স সাবজেক্টে ভালো ফল না করি তাহলে তো অনার্সও পড়তে পারব না "

পরের পাতাতে আবার বিষাদের লেশমাত্র নেই। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার টুকটাক। পকেটমানি বাঁচিয়ে আধখানা এগরোলের হিসেব দেখে হাসি পায় অলকার। 

যার অর্থ হল, বন্ধুদের আওতায় যখন থাকে তখন নিজেকে বেশ কম্পোজড লাগে তন্ময়ের। স্কুল টিউশান সেরে বাড়ি এলেই আবার কেমন যেন ছন্নছাড়া ভাবটা পেয়ে বসে । মাঝে মাঝে মনে হয় ছাদে বসে কবিতা লিখতে । ছুটির দিনে মনে হয় একটা ভালো ছবি আঁকতে । কিন্তু এই সিলেবাস আর দমবন্ধ করা চাপটা তাকে গ্রাস করে ক্রমশঃ । 

তন্ময় নিজেও জানেনা এর থেকে মুক্তি পাবে কি করে । উচ্চমাধ্যমিকের আর ঠিক দশ মাস বাকী । মাথার বাঁদিকটা দপদপ করে ওঠে।

এই টানাপোড়েনের মাঝে এক পশলা সুবাতাস দেয় নীপা। তার সমবয়সী । এবার কেঁপে ওঠেন অলকা। 

তার মেয়ের নামও নীপা। কোচিং ক্লাসে বন্ধুত্ব হয়েছিল তবে এই ছেলেটির সঙ্গেই । দুজনে একসঙ্গে বাসস্টপে হেঁটে যেত রোজ । একসঙ্গে এইটুকুনি হাঁটাতেই  কিছুক্ষণের ভালোলাগা জন্মাত তাদের পড়াশুনোর চাপের মাঝে । দমবন্ধ হওয়া থেকে নিস্তার। মিষ্টি মেয়েটাও খুব পছন্দ করে ফেলেছিল তন্ময় কে ।

এখন ভাবেন তিনি। ভালোলাগার মতোই ছেলে তন্ময়।  

একজায়গায় সে লিখেছে... 

" নীপা, তোর চেহারায় কি যে যেন একটা আছে, মনে হয় অনেকটা পথ হেঁটে যেতে পারি তোর সঙ্গে। তুই বুঝেও বুঝলি না।    

তুই না আমার না মেলা সব অংক মিলিয়ে দিতি? কোচিং ক্লাসের ফাঁকে, পথ হাঁটতে হাঁটতে। তুই তো খুব প্র্যাক্টিকাল ছিলি। তোর যেমন গভীরতা পড়াশুনোয় তেমনই চাহনিতে।

আচ্ছা, নীপা তুই আমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসিস তো? ঠিক যেমন আমি বাসি তোকে?” 


শেষ লাইনে গিয়ে আটকে যান অলকা। তন্ময়ের লেখায় অনিশ্চয়তার সুর। 


শেষমেশ অলকা মিলিয়েছেন অংকটা । একমাত্র মেয়ের জীবনের সমীকরণ উল্টোপথে মেলাতে গেছেন। তিনি। আজ তিনি তন্ময়ের কাছে অপরাধী। কী করে আর দাঁড়াবেন এই ছেলেটার সামনে? নীপা কে তন্ময়ের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার মূলে তো তিনিই । হাসপাতালের সেবিকা সিঙ্গল মাদার অলকার লড়াই আর কেই বা বুঝবে? 

তিনিই তো মেয়েকে বোঝাতে গিয়েছিলেন এসব। এখন কী তার ভালোবাসাবাসির সময়? আগে পড়াশুনো তারপর প্রেম। ঠিক যেমন অতি স্মার্ট সংযুক্তার বেলাতেও তন্ময়ের মা বলেছিল, "আগে গুছিয়ে নাও জীবনের চলার নুড়িপাথরগুলোকে। সবে তো চাকরীর শুরু। একবার সময় নষ্ট হয়ে গেলে আর ফিরে আসবেনা ।"  


কিন্তু এসব তো বুঝে হজম করে ফেলেছে তন্ময় ।  তবুও বুঝলনা তার মন।  এত এত মোটা মোটা ব‌ই, কঠিন পরীক্ষা পেরিয়ে সংযুক্তা বা নীপা কারোর সঙ্গেই  দুটো ভালোলাগার  মূহুর্ত্ত পাওয়া হলনা তার জীবনে। তন্ময় তো হারবার পাত্র নয় কোনোদিনো । একটা ছবি শুরু করলে শেষ না করে ও ভাত খেতনা ছুটির দিনে । একটা কবিতা শুরু করলে ঘুমোতে যেত না রাতে । তাই বুঝি পাকাপাকি একটা চাকরীও শুরু করেছিল কেরিয়ার গড়তে। 


অলকা হঠাৎ পড়তে পড়তে থেমে গেলেন । অনেকটা লেখা কলম দিয়ে খুব যত্ন করে কেটে দেওয়া হয়েছে। ঠিক কি লিখেছিল তন্ময়? বারেবারে প্রেম ভেঙে যাওয়ার জন্য হয়ত দায়ী করেছে কাউকে। কিম্বা লিখেছে, আমাকে আমার মত থাকতে দাও... 

অলকা সেরাতের মত তন্ময়ের ডায়েরীখানা মাথার শিয়রে রেখে ঘুমোতে চেষ্টা করলেন । ভোরে উঠে আবার তার মাথায় পাক খেতে লাগল সেই কথা । কি এমন লিখেছিল ছেলেটা যে কেটে দিতে হল! প্রশ্ন করলে সে আরো অস্বস্তিতে পড়তে পারে । এসব নিয়ে বেশী সন্দেহ, কৌতুহল প্রকাশ পেলে তার ভালোর চেয়ে মন্দ হবেনা । চিন্তার জটগুলো গ্রাস করে অলকা কে । কোথায় গেল স্মার্ট সংযুক্তা? আর কোথায়ই বা হারিয়ে গেল তাঁর ব্রাইট নীপা? মেয়েটাও চলে গেছে তার মায়ের কাছ থেকে। বহু দূরে। কোথায় পাবেন তিনি এখন সে নীপার ঠিকানা? তার সঙ্গে অলকার একটিবার কথা বলতে পারলে ভালো হত । কিন্তু কোথায় খুঁজবেন তিনি নীপা কে? নীপা তো নিজের জীবনকে নিজেই মুক্তি দিয়েছিল সেদিন। নিজের অদৃষ্ট কে ধিক্কার দিতে দিতে তন্ময়ের বিছানার দিকে এগিয়ে গেলেন অলকা । 

যুগশঙ্খ ( রবিবারের বৈঠক, ১ লা আগস্ট, ২০২১) 



৪ জুলাই, ২০২১

কোভিড ডায়েরি

 


প্রিল মাসের মাঝামাঝি। সাবধানেই ছিলাম। একটা ভ্যাকসিনের ডোজ ঢুকেছে আমার দেহে। দু সপ্তাহ আগেই। আচমকা অতিমারীর দ্বিতীয় ঢেউ সজোরে আছড়ে পড়ল আমার শরীরে। গলার মধ্যে, নাসারন্ধ্রে কাঠি ঢুকিয়ে আমারও তবে লালারস পরীক্ষায় যাবে? হ্যাঁ, গেল। ততক্ষণে উপসর্গ দেখেশুনে বুঝে গেছি। সারা বিশ্ব তথা আমার দেশ,তথা আমার রাজ্য, তথা আমার কলকাতা শহরের কোভিড মহামারীর পরিসংখ্যানে আমার নাম থাকবে। স্বাদ গন্ধহীন উত্তাল দেহ পরিস্থিতি, উত্তপ্ত দেহ, ঘন ঘন কাশির দমক, শরীরে প্রচণ্ড ব্যথাবিষ। তার মাঝেই ডাক্তারবন্ধুদের সঙ্গে হোয়াটস্যাপে ঘন ঘন পরামর্শ। সাগরপারে বৈজ্ঞানিক পুত্রবধূর ভিডিও কলে কেবলই জিজ্ঞাসা একটাই, অক্সিজেন স্যাচুরেশন জানতে চেয়ে। কিপ ইয়োরসেলফ হাইড্রেটেড। ছেলের প্রশ্ন একই, শুধু মজার কথা বলে আমায় ভালো রাখে তারা। আর প্রোটিন খাওয়ার আর্জি জানায় আমার সেই অরুচির মুখে। দরজায় টোকা দিয়ে আমার কর্তামশাই পানীয়, পথ্য, খাবার রেখে চলে যান। আমি কেবলই তার মাঝেই আলো খোঁজার চেষ্টা করি। আমার স্টাডি টেবিলেই কিছু বই ছিল ভাগ্যিস। ডুবে যাই বইয়ের পাতায়। পারিনা ক্লান্তিতে। জ্বর ছাড়লে, মন ভালো লাগলে ল্যাপটপ খুলে বসি। লিখতে শুরু করেও পারিনা। গিয়ে লম্বা হই বিছানায়। স্পিকারে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে দিই। একটু ভালো তো আধটু খারাপ।  

আমার আটতলার বন্দীদশার নিভৃতবাসের লম্বা কাচের জানলায় সন্ধের কলকাতায় ফুটফুটে আলোজ্বলা দেখি। দূরে শাঁখের আওয়াজ। বাড়ির লাগোয়া মন্দিরে কাঁসর ঘণ্টা বাজেনা এখন। ঈশ্বর স্বয়ং দুয়ার এঁটে বসে আছেন অতিমারীর প্রথম ঢেউয়ের মতোই। উত্তর দিতে পারবেন না বলেই হয়ত। দিকে দিকে অতিমারির প্রকোপে আমার মতও সবাই অছ্যুত। আমার নিজের ধোয়া বাসনগুলো বারান্দায় রেখে আসি সাবান জলের মধ্যে ডুবিয়ে। পরদিন আমার কাজের মেয়ে ধোবে। ভালো থাকুক সে। সেই আশায়। 

আমার নীচের ঘরেই তিরাশি বছরের শাশুড়িমা আছেন। শোয়া রোগী। পড়ে গিয়ে স্মৃতিভ্রষ্ট। শুধু আমার খোঁজ নেওয়া চাইই তাঁর। কারণ আমি হলাম সংসারের ত্রাণকর্ত্রী। আমার এহেন ব্যাধির কারণে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত নেই দিন চারেক হল। সবসময়ের পরিচারিকার কাছে সদুত্তর পেয়েছিলেন কিনা জানা নেই। তবে হঠাত করেই তাঁর শারীরিক অবনতি ঘটল। খাওয়া বন্ধ হল। কথা বন্ধ হল। অন্যান্য শারীর বৃত্তীয় কাজকর্ম নিশ্চুপ এক্কেবারে। ওপর থেকে ভিডিও কলে আমি এটা, ওটা সেটার পরামর্শ দিয়ে চলেছি তখনও। কিন্তু তিনি বুঝি ক্রমশই অত্যন্ত দ্রুত খারাপ থেকে খারাপতর র দিকেই এগিয়ে চলেছেন তখন। মনে ভাবছি শুয়ে শুয়ে। উদ্বেগ মানুষকে কিভাবে শেষ করে দেয়! হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছিলাম সেদিন। 


টুং করে নোটিফিকেশন এল হোয়াটস্যাপে। আমার রিপোর্ট পজিটিভ এল কোভিড পঞ্চমীর সন্ধেয়। দূরে আকাশের ব্যাকড্রপে মহানগরের ফুটফুটে আলো দেখতে দেখতে ডাউনলোড করছি রিপোর্টের পিডিএফ। ফরোয়ার্ড করতেই হাজারও ফোনকল। কাশির দাপটে পারছিনা রিসিভ করতে। নীচে তখন মা ক্রিটিকাল। কম্পাউন্ডার এসে স্যালাইন, ক্যাথিটার ইন্সটল করতে ব্যস্ত। আমি কিছুই করতে পারছিনা। শুধু ভিডিও কলে দেখছি আর শুনছি। মুঠোফোনে একের পর এক কাছে দূরে বন্ধুবান্ধব, নিকট আত্মীয়ের সংক্রমণের খবর। কেউ চলে গেলেন তক্ষুনি। কেউ সংকটজনক। অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছেনা। খাস দক্ষিণ কলকাতার বুকে আমাদের এক আত্মীয় অক্সিজেন না পেয়েই চলে গেলেন ততক্ষণে। আমার কিছুই করার নেই সেই মুহূর্তে। আমি আলো খুঁজে চলেছি তখনও । ভালোর দিকে যাওয়ার পথ খুঁজছি। ছেলে বৌমা পজিটিভ ভাইবস দিয়ে আমায় ভালো রাখার চেষ্টা করে চলেছে। 

গর্ভধারিণী মায়ের সিওপিডি আমার টেনশনে বেড়ে চলেছে ক্রমান্বয়ে। ওরে ঠিকমত খাচ্ছিস তো? ফোন ধরছিস না কেন মা? তোর মাথায় হাত রাখতেও পারলাম না। দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে, আমি নারায়ণ কে রোজ তুলসী দিচ্ছি তোর নামে। মায়ের তো প্রাণ! এমনি হয় বুঝি। 

মাঝরাতে ফোন। আমি অবিশ্যি কোভিডের প্রকোপে পড়ে থেকে আদ্দেক রাত জেগেই থাকছিলাম। অত ওষুধপালা! ইনসমনিয়া আমায় তখন গ্রাস করেছে। 

শাশুড়ি মা কে ভিডিও কলে দেখলাম হাপর টানার মত। শ্বাস উঠেছে তাঁর। মাল্টি অরগ্যান ফেলিওরের দিকেই তিনি তখন। তাঁর গীতাখানি নিয়ে কর্তামশাই কে বললাম পাঠ করতে। ব্রাহ্ম মুহূর্ত এগিয়ে এল। পাশের কাচের জানলায় অন্ধকার চরাচর ফেটে সূর্যের রঙ বেরিয়ে আসছে, একটু নীল। একটু কমলা। এক চিলতে লালের আভা আকাশের বুক চিরে। মায়ের মুখে তাঁর ছেলে গঙ্গাজল দিল। বিদেশ থেকে নাতির ভিডিও কল আসতেই তিনি শেষবারের মত শ্বাস ছাড়লেন। বুকের ওঠানামা চিরকালের মত থেমে গেল। মায়ের সঙ্গে আমার আর দেখা হল না। শেষবারের মত প্রণাম করাও হল না। তাঁর জন্য আমার আনা প্রিয় লেমন টার্ট ফ্রিজের মধ্যেই আমার মতোই বন্দী হয়ে পড়ে রইল। আমার হাতে খেতে চাইতেন। হলনা। ওপর থেকে দেখলাম কাচের গাড়ী আবাসনের বাইরে বেরিয়ে গেল। মা কে নিয়ে ওরা তখন শেষ যাত্রায়। আমি দূর থেকে প্রণাম জানালাম। আমার কোভিড ষষ্ঠী সেদিন পড়ে গেছে। জানলা দিয়ে নীচের তলায় মায়ের জন্য জ্বালা ধূপের গন্ধ পেলাম যেন। এ কি! এ এক আশ্চর্য সমাপতন! সংসারের শুভাকাঙ্ক্ষী আমার অশীতিপর শাশুড়িমা তাঁর সব আয়ুটুকু বুঝি আমায় দিয়ে চলে গেছেন ততক্ষণে। হোয়াটস্যাপে ডাক্তারবাবু কে জানালাম ক্ষীণ ঘ্রাণশক্তি ফিরে আসার কথা। তিনি জানালেন আমি নাকি হিলিংপাথে প্রবেশ করছি এবার। কেউ আবার লিখছে সপ্তম-অষ্টম দিন না পেরুলে কিছুই বোঝা যাবে না। ওষুধের প্রভাবে হই হই করে ইমিউনিটি বাড়তে বাড়তে রক্তে সাইটোকাইন ঝড় উঠতে পারে। শংকায় প্রহর গুনি আমি। 

কেউ বলে দশমী পেরুলে আর ভয় নেই। তবে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। নাহ! সব ঝড় কে জয় করবই আমি। আমার পরমায়ু দিয়ে এ যাবত আশীর্বাদ করা আমার সংসারের শুভার্থী নেই। হাইসেনবারগ আনসারটেন্টি প্রিন্সিপল মানি আমি। মনের জোরে আমি বাঁচবই। অক্সিজেন লেভেল ৯৭-৯৮। আমি নিয়মিত প্রাণায়াম করি । করি ডিপ ব্রিডিং এক্সারসাইজ। আমায় ভালো থাকতেই হবে। কিন্তু কাশির জেরে আমি খান খান। বন্ধু ডাক্তার বদলে দেন ওষুধ। কোভিড একাদশীর দিনে সামান্য রুচি ফেরে। সেই এক নাগাড়ে প্রবল ১০৩ জ্বর আসনা  না আর। গরম খিচুড়ি ভালো লাগে মুখে। দ্বাদশী থেকে বুঝি দুর্বলতার জের। কিন্তু শাশুড়ি মা চলে যাবার পরেই তাঁর সেবায় ব্রতী পরিচারিকা নিজের কোভিডের ভয়ে বাড়ি চলে যায়। তবে সংসারের কোনও কাজ কি পড়ে থাকে? ঈশ্বরের অঙ্গুলি হেলনে সব ঠিক হয়ে যায়। এ আমার বিশ্বাস। একদিকে চরম স্বার্থপরতা সেই পরিচারিকার অন্যদিকে আমার ঠিকের রাঁধুনি সব ফেলে দুবেলা এসে সংসারের হাল ধরে। নীচের তোলায় রোগীর ফল কাটা থেকে দুধ জ্বাল, রান্নাবাড়া করে  রোগীর পথ্যি সাজিয়ে গুছিয়ে টেবিলে রেখে কর্তামশাই কে বলে বুঝিয়ে চলে যায় সে। চোখে জল আসে আমার। রবিঠাকুর সেই যুগে প্রবাসে প্রভুর দায়িত্ব নেওয়া পুরাতন ভৃত্যের কথা লিখেছিলেন। আমার রান্নার দিদি আমায় ছেড়ে চলে যায়নি সেদিন। দুই পরিচারিকার দুই বৈপরীত্যের পরিচয় পেলাম সেদিন আমি। 

আমার বন্দীদশা মুক্ত হতেই রান্নার দিদি তার জ্বর আসার কথা জানাতে আমি আরও ভালোবেসে ফেললাম তাকে। দুর্বল শরীরে মনের জোরে, বুক বেঁধে নিজে রান্নাঘরে ঢুকেছিলাম সেদিন। একমাস পরে সে কাজে এল। আমি এবার তার পোষ্ট কোভিড খেয়াল রাখতে শুরু করলাম। দুজনে একত্রে সেলফি তুলে আত্মীয় পরিচিতের হোয়াটস্যাপে পাঠাতে লাগলাম। দু মাস হতে চলল আমার। এখনও ও আমাকে জল খাওয়ার কথা মনে করায়। আমিও ওকে গরম দুধে এনসিওর গুলে দিই। ও রান্নাঘরে গরমে থকে গেলে আমি গিয়ে ওকে পাখার হাওয়ায় বসতে বলি। আমি ততক্ষণে সামাল দিই খুন্তি কড়াইয়ের লড়াইয়ে। মা'কে জানাই এই দেখ, আগের থেকে আমরা ভালো আছি মা। কোভিড মায়োপ্যাথি শুরু হয় আমার। কোমর থেকে সারাক্ষণ ঝিনঝিনে কাঁপুনি। নার্ভের ওষুধ দিলেন ডাক্তারবাবু। আবারও ভালো হই। ভালো থাকার চেষ্টা করি। শরীরে দুর্বলতার খামতি নেই পেট পুরে খেয়েদেয়েও। রান্নার দিদি কে জিগেস করি, ভিটামিন খাচ্চো তো রোজ? ফ্রিজ থেকে পাওরুটি আর চিকেনের টুকরো বের করে দিয়ে কৌটো ভরে দিয়ে বলি স্যুপ করে খেও। এভাবেই পেরিয়ে চলেছি অতিমারির ঢেউয়ের দাপট। এখনও সে ফুঁসছে। আগের থেকেও নাকি বেশী। দ্বিতীয় ভ্যাকসিনের ডোজ পিছিয়ে গেল আমার। এখন নাকি শরীরে অ্যান্টিবডি থইথই। এমন সেফ পিরিয়ড যদি আজীবন চলত! রান্নার দিদি হেসে বলে সত্যিই তাই গো দিদি। আমরা কেউ কারোর হাসি দেখতে পাইনা কারণ এখনও দুই করোনা ওয়ারিয়ার, আমাদের মুখের মুখবন্ধনী আছে যে!   


বন্ধুবান্ধবের শুভেচ্ছা, সুস্থতার বার্তা তো ছিলই আমার সঙ্গে। এমনকি কিছু ঈর্ষাকাতর মানুষও কোত্থেকে জেনেশুনে আমায় সুস্থতার বার্তা পাঠিয়েছিল সেসময়। আবার অনেক বন্ধু, আত্মীয়স্বজন(?) সব জেনেও মুখে কুলুপ এঁটে বসেছিল। চিনে নিয়েছিলাম তাদেরও! এই তো মানুষের নশ্বর জীবন ! সেখানেও এত দ্বন্দ্ব! এত পরশ্রীকাতরতা! কোভিড আমার চোখনাক, কান খুলে দিল আবারও!        



১৬ জুন, ২০২১

জগাদা-কোভিড সিরিজ



জগাদা-কোভিড সিরিজ / ইস্যু রথযাত্রা 

ওরা আজ বেড়াতে বেরুবে। ভোর থেকেই তার তোড়জোড়। একলাটি বিমলা বসে বসে ভাবছে ছাইপাঁশ। প্রতিবারের মতোই তার মন উচাটন। উৎকল দেশের সংস্কৃতি বলে কথা। যে দেশের নামের মূলে হল উৎকৃষ্ট কলা। তা বাপু, কলাই হোক আর মুলোই হোক অতিমারীর মধ্যে এসব কলাকৃষ্টি তে না সামিল হলে চলছিল না? জগাদা বলেছে, না চলে না, জানোই তো। দিন পনেরো নিভৃতবাসে থেকে তিন ভাইবোনের ক্যাটারপিলার ইন দ্যা গতর। অর্থাৎ গতরে শুঁয়োপোকা ধরে গেছে। না বেরিয়ে বেরিয়ে সুভদ্রার সাজপোশাকে বাহুল্য নেই। মদিরাসক্ত বলরামের ভুঁড়িটা যেন আরও বেড়েছে। তবে বলাই বাহুল্য বদ্ধ ঘরে বসে বসে শুধু ভালোমন্দ খেয়ে খেয়ে আর নিত্যি পাঁচন সেবন করে জগাদার অ্যাপেটাইট রসেবশে রয়েছে। 
কে জানে যাবার সময় সবাই মুখবন্ধনী পরল তো? বিমলা সুদর্শন কে বলে রেখেছিল কাল রাতে। মনে করে যেন মুখবন্ধনী গুলো নেওয়া হয়। সুভদ্রা আবার না কাঁদতে বসে। গতবারেও এমন বায়না ধরেছিল মেয়েটা। সে কিছুতেই মুখবন্ধনী চড়াবে না মুখে। সব সাজ ঢাকা পড়ে যাবে। একে বেরুনো হয়না। তায় একদিন বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে । তো মুখবন্ধনী পরবে না সে। ওষ্ঠরঞ্জনী চাপা পড়ে যাবে। তার স্টাইল স্টেটমেন্ট সবার চেয়ে আলাদা। ভীড়ের মাঝে হেড টার্নার সে। নাক মাটামাটা চোখ ভাসা। বৌদি হল গিয়ে লড়াকু, উগ্র জাত সুন্দরী। আর ননদ হল নরম স্বভাবের ঘরোয়া মেয়ে। বিমলার সেই নিয়ে ননদিনীর সঙ্গে একটু আধটু ইগো ক্ল্যাশ আছে অবিশ্যি। জগা দা বলেছে ননদ ভাজে অমন হয়। তাই নিয়েই বাঁচতে হবে তোমাদের। দুই সুন্দরী কে নিয়ে মাঝেমধ্যেই টানাপোড়েন চলে। জগাদা অভ্যস্ত এসব রাজনীতি তে। বলরামের অবিশ্যি এসব তরজায় হেলদোল নেই। তিনি বুঁদ হয়ে থাকেন সোমরসের মৌতাতে। জগাদা বৌ আর বোন কে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে মাঝেমধ্যেই বলে ওঠেন, যার নেই উত্তরপুব তার মনে সদাই সুখ। 
এই তো সেবারেই  বোনের সে কী কান্না! তোমাদের সবার মাথার মুকুট কত্ত বড়! আর আমারটা দেখ। অথচ লোকসমাজে কী আদিখ্যেতা আমায় নিয়ে। সে আমার ছোটো বোন, বড় আদরের ছোটো বোন... বিরক্ত লাগে এসবে তার। মনে মনে বলে ওঠে সে, হু হু বাবা, মেয়ে সন্তান বলে কথা! জানা আছে সব হিপোক্রেসি তোমাদের। 
জগাদা ভাবে, নিরীহ বোনটা আমাদের ছোটো থেকেই ঝগড়া করতে পারেনা। চেঁচাতে পারেনা। বৌদির অপোজিট এক্কেরে। বিমলা কে বোঝাতে কালঘাম ছুটে যায় তার। শোনো বিমলি, ও কিন্তু সাক্ষাত আদ্যাশক্তির অংশ।বাবা বলতেন। ওকে একদম হেনস্তা করবেনা কেউ। গা জ্বলে যায় বিমলার। কে কাকে কী শোনাচ্ছে? জগাদা বলেছিল সেদিন। তুমি হলে ওয়ান অ্যান্ড ওনলি শুধু শ্রী অর্থাৎ মহালক্ষ্মী। আরেকজন হল ভগিনী শ্রী। এসব শুনে বিমলার গা জ্বলে যায় আজকাল। সব শ্রী য়ের ব্র্যান্ড ডাইলুশ্যান হয়ে গেছে মিনসে অতবড় বড় চোখ দিয়েও দেখতে পায়না। 
। 
বাইরে কলরব শুনতে পেয়ে বিমলা দুয়ারের খিল খুলে উঁকি দিয়ে দেখতে পায়। সেই সম্বচ্ছরিক রথযাত্রায় যাচ্ছে তিন মক্কেল। বারণ শুনলো না। যাবেই। নিভৃতবাসে থেকে দম বন্ধ হয়ে আসছে তাদের। কিন্তু গতর আর নড়েই না তাদের। বাব্বা ! খেয়েদেয়ে, শুয়েবসে আরাম করে করে বদ অভ্যেস হয়ে গেছে গুষ্টির! সব্বার ওজন বেড়েছে। তায় আবার ভরা বর্ষায় ১০৮ ঘড়া উপর্যুপরি স্নানে সারা শরীর রসস্থ। পেইন কিলার আর পাঁচনের সম্মিলিত বুস্টার ডোজে শরীরের গাঁটে গাঁটে বাতজ বেদনা। এক পক্ষকালে নব যৌবন পেয়েছেন বাবুরা। মহালক্ষ্মী বিমলা ভাবে বসে বসে সাতপাঁচ। জ্বরের কারণে ইমিউনিটি কমে গেছে। বাইরে না গেলেই নয়? জগাদা কাল রাতেও বলে গেছে এসে, আহা! ওরম কোরোনা বিমলি! যেতে আমাদের হবেই। একটানা  অনশরে তো থাকোনি জীবনে, বুঝবে কী করে মুক্তির স্বাদ? বিমলা তার উত্তরে বলেছে, জানোনা? সব পেলে নষ্ট জীবন? 
জগাদা বলেছে না, পনেরো দিনের বিরহ কী জিনিষ তুমি বুঝবে কেমন করে? তোমার সঙ্গে তো আমার রোজ রাতে দেখা হয়েছে, আমার এই সোশ্যাল ডিটক্সে ফ্যান ফলোয়ারস দের পরাণ আটুপাটু। 
বিমলা তার উত্তরে বলেছে, ভ্যাকসিনের দুটো ডোজ হলনা কারোর, তাই তো চিন্তা এত। এসব ভাবতে ভাবতেই সিংহদুয়ার দিয়ে তিন ভাইবোন একে একে বেরিয়ে আসে। বিমলার তখন দুয়ারে রথ। রাতের অন্ধকারে দেখতে পায়নি সে। এ কী! জগাদার চোখের চারিপাশে টুকটুকে লাল আভা কিসের? ব্ল্যাক ফাঙ্গাস না কী সব শুনছিল সেদিন। নাহ! ওনার তো অতিমারী সংক্রমণ হয়নি এখনও। তার মানে ফ্যানেদের বিরহে কেঁদে কেঁদে উতলা হয়েছে চিত্ত। তাই চোখ লাল। মনে হল চীৎকার করে বলে, "তা বলি যাদের জন্য এত দরদ উঠলে উঠছে তারা তোমার কোমরে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে কেন নে যায়?" 
শুনতে পায়না জগাদা। আবারও বলে ওঠে সে। "বলি হ্যাঁগা? তুমি কী চোর না ডাকাত?"  
জগাদার এহেন টানা ও পোড়েনে বিমলা বড় ব্যথা পায় প্রতিবার। কী জানি? জগাদা বুঝি শুনতে পেয়েও পায় না সেই কোলাহলের মাঝে। 
বিমলার পরক্ষণেই মনে পড়ে যায়। ঠিকই করছে ওরা। 
"মিনসে সেই ছোটো থেকেই পাক্কা হয়ে উঠেছে চৌর্যবৃত্তিতে। শৈশবে পড়শিদের ননী চুরি করে খাওয়া থেকে কৈশোরে সঙ্গিনীদের কাপড় চুরি? আর ফাইনালি যৌবনে গোপিনীদের মন চুরি? জানিনা বুঝি? সব মনে আছে আমার। শুধু আমায় কব্জা করতে পারেনি লোকটা। একচুল সরিনি আমার পাওনাগণ্ডা আর অধিকার থেকে।"   

স্নান যাত্রা 
হ্যাঁ গা বিমলা! দু সপ্তা কোয়ারেন্টিনেই নাহয় থাকব। তুমি মাঝরাতে চলে আসবে তো আমার ঘরে? তোমায় না দেখলে, না ছুঁলে আমার জীবন বড়থা মনে হয়। জগা দা হোয়াটস্যাপ করল।  বিমলা টাইপ করে...কি জানি বাপু! এখন ছোঁয়া বারণ। আমার যদি কোভিড হয় তখন তুমি তো আমার মাথাটাও টিপে দিতে পারবেনা।ঠুঁটো নাগর থাকার যে কি যন্ত্রণা তা আমার চেয়ে আর কে ভালো বুঝবে? কি যে দরকার ছিল এবছর তোমার এই মহাস্নানের! বলে তাত সয় তো বাত সয় না। বারণ তো শোনো না। এবার জ্বর তো আসবেই। তারপর তুমি আবার ওষুধ গিলবে না। আমায় পাঁচন বানিয়ে মরতে হবে। আমার হল মহা জ্বালা।তারপর তোমার হলে তোমার ঐ সাগরেদ দুজনেরও হবে ছোঁয়া লেগে। কিচ্ছু হবে না দেখো। আমি বলে দিলাম। আমার কাছে এসো রোজ রাতে একবার করে, আগের মতন। তোমার গায়ের গন্ধেই আমার সব টেনশন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।  আজ্ঞে মশাই গত তিনমাস আমার গায়ের ফুল চন্দন চর্চিত সেই গন্ধ আর নেই। আমি এখন সাফসুতরা শহুরে পটের বিবিদের মতন।বিমলা লিখল হোয়াটস্যাপে। কিচ্ছু চিন্তা করোনা বিমলা। নারায়ণী শীর্ষদেশে, সর্বাঙ্গে বিমলা বাহিনী। জগা দা টাইপ করল। 
...
আমায় যেতিই হবে। আমায় যেতি দিতি হবেই।
সত্যিই তো! সম্বচ্ছর স্বেচ্ছায় নিভৃত যাপন করে তারা। বছরে একবার মোটে বাইরে পা দেয়। তাও আবার দিন সাতেকের জন্যি। তাদের বুঝি মনের ভেতরটা হু হু করেনা?
বেড়াতি যাবুই আমরা। তায় এবছর কতদিন বাইরের লোকের পর্যন্ত মুখ দেখিনা!

গতকাল রাত অবধি দোটানায় ছিল তিন ভাইবোন। একবার ব্যাগ গুছোয় তো আরেকবার সব ঢেলে ফেলে দেয় মনের দুঃখে। উত্তেজনা তার‌ই তুঙ্গে। কি পরবে? কি মাখবে? কি গয়নাগাটি সঙ্গে নেবে? আর উত্তেজনা বড়জনের। সঙ্গে যাবে সাতদিনের মত সোমরস। তার তোড়জোড় নিখুঁত করে। সঙ্গে মুখরোচক সব স্ন্যাক্স। নিমকিই হরেক কিসিমের। ভাজা মশলা দেওয়া শুকনো সিঙ্গারা। রকমারি বাদাম। শুকনো ফল। বেসনের ভাজাভুজি। জগা দা ভাইবোনের কথা ভেবে অস্থির ছিল এ ক'দিন। যাব কি যাব না। ভেবেই অস্থির সে। প্রতিবছর বিমলি যা ক্ষেপে থাকে তাদের তিন ভাইবোনের এই বেড়াতে যাওয়ার ধুম দেখে! এবার কি ভাগ্যি সে সিনে নেই! নিজেই কোয়ারিন্টিন করে রেখেছে নিজেকে তার কারণ অবিশ্যি কোভিড নয়। অম্বুবাচী পড়ে গেছে বলে। জগাদা বলে বলে থকে গেছে বিমলি কে।
বছরের ঐ চারদিন তুমি যে কি কর! এত্ত ছুঁতমার্গ এ যুগে হয়না বিমলি।
বিমলি নারাজ। চারদিনের চান হোক। আবার এসো আমার ঘরে।
এ যুগে আমার এসব ভালো লাগেনা বিমলি।
এই করতে করতে অবশেষে মধ্যরাতে অনুমতি এয়েচে। হেডাপিস বলেছে, তারা বেড়াতে যেতে পারে। ব্যাস! এবছর নিজের গাড়ী বের করার রাস্তা বৃষ্টি তে ধুতেও হবেনা জগাদা কে। বৃষ্টি এবার আষাঢ়ের আগেভাগেই এসে গেছে।কিন্তু মাস্ক? সুভদ্রার মনখারাপ। সব সাজ নষ্ট হয়ে যাবে। বলরাম অবিশ্যি বয়সে সবার বড় তাই মাস্কটা বেঁধেই নিয়েছে মুখে। কোভিডে ধরলে নাকি রক্ষে নেই। জগাদা বিন্দাস। মাস্ক নামিয়ে রেখেছে। একবার নাকের ফুটো বের করে তো একবার থুতনিতে ঝুলিয়ে নেয়। যাবার আগেই বিমলি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পরিয়েই ছেড়েছে। তোমার না দিন পনেরো আগেই চান যাত্রায় বেদম চান করে জ্বর এয়েচিল! আমি ছিলুম তাই পাঁচন গিলিয়ে পথ্যি করেছি। তাই আজ সুস্থ হয়েছ! নির্লজ্জ, বেহায়া মিনসে ! মাস্ক পর মাস্ক। আর শোনো তিনজনের হ্যান্ড স্যানিটাইজারটা দয়া করে পকেটের মধ্যে রেখো না। বাইরেই রেখে দাও।
জগাদা ভাবে শালা! এমন রথ এ জম্মে বের করিনি! এর চেয়ে না যাওয়াই ভালো ছিল!

জগাদা কোভিড সিরিজ / ইস্যু জামাইষষ্ঠী 
রোজ রাতে টুক করে একটিবার বিমলা কে চোখের দেখা না দেখলে জগাদার ঘুম আসেনা। 
জামাইষষ্ঠীর আগের রাতেও তাই হবারই কথা। সবার চোখে ধুলো দিয়ে টুক করে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।দ্বাররক্ষী, দয়িতাপতি, মোহন্ত কেউ জানল না। বিমলার কাছে গিয়ে জগাদা দেখলেন রোজ রাতের মত সেও জেগে বসে আছে। একটু স্বামী সোহাগ, একটু ফষ্টিনষ্টি। তবে আসার আগে স্যানিটাইজ করে মাস্ক পরে আসতে হয় সেটাই চাপের। তবুও গেলেন নিশুতিরাতে। 
কি গো? আজ মন ভার মনে হচ্ছে? জগাদা বললেন। 
বিমলা বলল, এবছরেও বাড়ি যাওয়া হলনা। জামাইষষ্ঠীর খাওয়া, পাওনাগণ্ডা কিছুই হলনা গতবারের মতই। 
জগাদা বললেন, আহা, দুঃখ্যু কোরোনা বিমলা। আমরা এখন বেরুলেই লোকজনও বেরিয়ে পড়বে। কোভিডের তৃতীয় ঢেউ আগতপ্রায়। এখন সব আম আদমির মত আমরাও দুয়ার এঁটে বসে আছি, জানোনা? গতবার রথেও মাসীর বাড়ি যাই নি তেমন করে।এবারেও হয়ত যাওয়া হবেনা। সব হবে। আবার সব মিটুক প্রিয়ে! 

তোমার আর কি? এতগুলো শ্বশুরবাড়ি! কোনটাই তেমনই আইনতঃ বিয়ে নয়। সবার সঙ্গে সারাটা জীবন থাকাথাকির খেলা খেলে গেলে তুমি। সন্তানও দিলে তাদের। আমি তো হাতের পাঁচ। বিয়েও করলে অথচ ঘর করলে না। সন্তান দিলে না। সবাই জানলো লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ আমার পেটের ছেলেপুলে। আমি তো জানি সেসব মিথ্যে। তোমার এখানে পড়ে থেকে থেকে আমার রক্তাল্পতা ধরে গেল। কি না, পুরীক্ষেত্র বৈষ্ণব থান। সেখানে আমিষ ঢুকবে না। আর কত ত্যাগ স্বীকার করি বলতে পারো? 

আরে শোনো। এই জন্যই তোমাকে বলেছিলাম বাপের বাড়ি থাকতে। শুনলে না। সারাক্ষণ চোখ ঘুরছে তোমার। আমি কোথায় কি ফষ্টিনষ্টি করি সেদিকে খেয়াল রাখবে বলে এখানে এলে। জগাদার গলায় আক্ষেপের সুর। 

বছরে একবার এই জামাইষষ্ঠীর সময় বাবা মায়ের কাছে যেতে চাই। একটু খেয়েদেয়ে সুখ করে আসব বলে। বিমলা গর্জে ওঠে। 
আমি তো শ্রীক্ষেত্রে দুর্গাপুজোর সময় বলির ব্যবস্থা করেইছি। শুধু তোমার জন্যে। নয়ত তোমার ওই সময় রাগ চরমে ওঠে। আরও মাংস চাই তোমার? জগাদা এবার রেগে গেলেন। 

বিমলা বলল, বছরে মোটে একদিন? দেখছ না? অতিমারীতে ইমিউনিটি না বাড়িয়ে কেমন ঝিমিয়ে পড়েছি রোজ রোজ শাকপাতা, ফলমূলে খেয়ে খেয়ে? এসবে নাহয় ভিটামিন, মিনারেল আছে কিন্তু... এখন তোমারও কিন্তু শরীলে একটু আমিষ এর প্রয়োজন। হ্যাঁগো, যদি আমাদেরও অতিমারী তে ধরে? 

   
 


৭ মে, ২০২১

আমার কোভিডদিন

 আজ ১৪ দিন আটতলার ঘরে বন্ধ। প্রচুর আলো, হাওয়া। পাখির ডাক। সবুজ গাছপালা। তবু আমি বড় নিঃস্ব যেন। হঠাত কাল্পনিক এক কথোপকথন এসে আজ দুপুরে ভর করল আমায়। এ ক'দিনে নিজেকে চণ্ডালিকার মত অছ্যুত মনে হয়। যদিও তা মানুষের মনগড়া জাতপাত।আমার প্রিয় চরিত্র চিরকালের। খুব ইচ্ছে হত চণ্ডালিকা হতে। বিশেষ করে ওর টপ নট আর কাঁচুলি, হাঁটুর ওপরে শাড়ি, ওপর হাতে তাগা। পায়ে মল। তাইই হয়েছি যেন বেশ কিছুদিনের জন্য। 

সেই সঙ্গে ঘুমের ঘোরে শ্রীচৈতন্যের বুকে টেনে নেওয়া যবন হরিদাসের মুখটা মনে পড়ল একবার। আমার দরজার বাইরে রাখা টেবিলে আমার চায়ের কাপে চা ঢেলে দেয় ওরা। প্লেটে রেখে যায় খাবার ও দাবার।


ঘুমের ঘোরে মা শুধালেন, কি হয়েছে তোমার? সারাদিন একলাটি পড়ে আছো কেন? চল, আমায় খেতে দেবে না? 

বললাম, মা, আমার সেই মারণ রোগ হয়েছে। এর থেকে মুক্তি পেতে আমায় এভাবেই থাকতে হবে। আমার ছোঁয়া কেউ খাবে না। আমার জামাকাপড় বাড়ির কারোর সঙ্গে কাচা যাবে না। আমার বাথরুম কেউ সরবে না। আমার পরম শ্রদ্ধেয় অমরজ্যতি কবিরাজ আর বন্ধু চিকিৎসক পুপুরাণীর বিধান। আমাকে শুনতেই হবে ওদের কথা। জানেন মা? ওরা ভীষণ কড়া। ওরাই আমার ঈশ্বর এখন। 


শাস্ত্রে বলছে, পৈত্তিকান্‌ সন্নিপাতজান্‌ কফবাতসমুদ্‌ভবান্‌—

ওসব রাখো তো। মা বললেন। 

কিন্তু মা, আমি তো ঠাণ্ডা লাগাই নি। 


অমর কোবরেজ বললেন, এই গ্রীষ্মকালীন রৌদ্র আর বায়ু দুই-ই ঐ নাকি আমার পক্ষে বিষবৎ— কারণ শাস্ত্রে বলছে, অপস্মারে জ্বরে কাশে কামলায়াং হলীমকে—


আমার শাস্ত্রের কড়া কড়া কথা শুনলে খুব ভয় করে মা। এসব শুনেই সেদিন আপনার ছেলে আমার ঘরের দরজা সেই যে বন্ধ করে দিল... 

আমি অমর কোবরেজ কে বলেছি, থাক্‌ থাক্‌, আপনার শাস্ত্র থাক্‌। আমার ওসব শুনলে বড় ভয় করে যে। 

তা সেই শুনে আপনার ছেলে আর কবিরাজ মশাই দুজনে যুক্তি করে বললেন, ওকে বন্ধ করেই রেখে দিতে হবে —অন্য কোনো উপায় নেই? মা বললেন। 

পুপুরাণীও ওদের তালে তাল দিল, জানেন মা? বলল যে রোগের যা নিয়ম। মানতেই হবে। কারণ, পবনে তপনে চৈব –

মা বললেন, ওরা কত বড় ডাক্তার বল! ওদের কথা তো শুনতেই হবে তোমাকে। আর তো মোটে ক'টা দিন। তা বলি, পথ্যি হচ্ছে তোমার? 

তার খামতি নেই । জল-ফল-প্রোটিন আবার জল। দুধ-ডিম-ডাল। আবার জল। কিন্তু আমার তো আর বন্দীদশা ভালো লাগছে না মা। 

আবার কবে আমরা যাদবের দোকানে যাব? আবার কবে পার্ক স্ট্রীটের সেই কোটাশাড়ির দোকানগুলোয় যাব? আবার কবে আমরা ক্যালকাটা ক্লাবে গিয়ে চা খেয়ে বেকারী তে ঢুঁ মারব? আমি আবার পারব তো যেতে? এসব করতে? আমি যে বড় দুর্বল আর হাক্লান্ত হয়ে গেছি মা।

৪ মে, ২০২১

আমার কোভিড, তোমার কোভিড

গতকাল ছিল আমার কোভিড একাদশী। জীবনে প্রথমবার আক্রান্ত আমার  অতিমারীর অভিজ্ঞতা। অবশেষে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যেও লোহার বাসর ঘরে ঢুকে পড়ল মারণ ভাইরাস। তাই ভাববেন না খুব সতর্ক আছেন। আমার মত সাবধানে অনেকেই থাকেন না। তার একটাই কারণ ছিল ঘরে ৮৩ বছরের শাশুড়ি মা। একটু বেশী সতর্কই ছিলাম আমরা। তবুও কেউ হয়ত ঘরের মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবেই দিয়ে গেছে এসে। সে নিজেও হয়ত জানত না যে সে চিহ্নহীন ধারক ও বাহক। এটাই এ রোগের সবচেয়ে মুশকিল। আমার গত ৫ই এপ্রিল প্রথম ভ্যাক্সিন নেওয়া হয়ে গেছিল। তারপর ভালো রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। তারপরেও হয়ত শরীরে সাফিসিয়েন্ট এন্টিবডি তৈরী হয়নি। তার ফাঁকেই কেউ সেই মহামূল্য অমূল্যরতন মারণ ভাইরাস আমায় দান করে গেছিল। তেইশ তারিখ সকাল থেকেই জ্বর আসে। সঙ্গে শুকনো কাশি। গায়ে হাতে ব্যাথা। গতিক ভালো নয় দেখে নীচের থেকে প্রিলের পাউচ প্যাক, স্কচ ব্রাইট, নিজের ঘর থেকে গুচ্ছের নাইটি, হাউজকোট, পেটিকোট, ওষুধের বাক্স সব নিয়ে একটা ঘরে নিজেকে আইসোলেট করলাম আগেভাগেই। একটা পুরনো ঝ্যাঁটা, ঘর মোছার কাপড় সব নিলাম। মা তখনও বেঁচে। কি জানি আমি ওনার ঘরে যাচ্ছিনা, কেন, কি বৃত্তান্ত এসব ভাবছিলেন কি মনের মধ্যে? ওনার খাওয়া দাওয়া ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর থেকে ক্ষীণতম হয়ে গেল। এটা অবিশ্যি গত এক মাস ধরেই চলছিল। আমার তখন কাজ শুধু শুয়ে শুয়ে এক ঘণ্টা অন্তর অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপা। জ্বর বাড়তেই থাকল। রাতে ১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট উঠছিল। সারারাত ঘুম হয়না এ রোগে। শুধু প্রহর গুনে জেগে বসে থাকা ভোরের অপেক্ষায়। খুশখুশে কাশি তে ব্রেথলেসনেস যে কি কষ্টের হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। নাকে গন্ধ, স্বাদ, রুচি সব চলে গেল। বন্ধু ডাক্তার রা পাশে ছিল আমার। সেটাই একমাত্র আশার। খাওয়াটাই বড় চাপের হয়ে দাঁড়ালো। সোয়াব টেস্ট এর স্যাম্পেল নিল ২৫ শে। রিপোর্ট আসবে ৭২ ঘণ্টা পর। তার আগেই সিম্পটমস দেখে  সবরকম ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিলেন ডাক্তার বন্ধু। এর মাঝে মা দুম করে ২৮ তারিখ ব্রাহ্ম মুহূর্তে চলে গেলেন। ভাবলাম মায়ের সর্বক্ষণের মেয়েটি আছে। আমার খাবার নীচ থেকে ওপরে দিয়ে যাবে যেমন যাচ্ছে। পৃথ্বীশ কে ভাত জল দেবে। আমার ফল কাটাকুটি... আমার ঘর আমি কোনোমতে হাফাতে হাফাতে ঝাড়ু পোছা করে নিই। বাসন ধুয়ে নিই। সাতদিন অন্তর মেশিনে আমার জামাকাপড় কেচে নিয়ে মেলে দিই। 

মেয়েটির বাড়ির লোক বোধহয় ভয় পাচ্ছিল। বুঝছিলাম ওর অস্থিরতা।  সেই সঙ্গে তার তুমুল ভূতের ভয়। যেহেতু মা কে নাড়াচাড়া করত তাই। তার বাড়ি যাবার পিছটান বুঝলাম। ছেড়ে দিলাম তাকে। আমার জন্য তার যদি করোনা হয়? সেটাই তার বুঝি একমাত্র চিন্তা। এদিকে মুখে সকালে বিকেলে হরিরলুঠ চড়াচ্ছে সে আমার জন্য। ততদিনে আমার ১০ দিন হতে চলল। টেলিমেডিসিন এ ডাক্তার কন্সাল্টেশনও শুরু হল। রোজ একবার করে ফোন করেন ডায়েটিসিয়ান, ডাক্তার। কি খাচ্ছি, কেমন আছি। কি ওষুধ এইসব রুটিন ডায়ালগ। অশৌচ ডায়েট পালন করছিনা আমি। আমার শুধু ওষুধ হল খাওয়া। ইচ্ছে না করলেও । জল দিয়ে গিলে। 

এভাবেই চলবে কোভিড একাদশী থেকে পূর্ণিমা। আবার ফিরবে  অমাবস্যাও। ঠিক পেরিয়ে যাব একদিন। মাঝখানে মায়ের ডিজিটাল শ্রাদ্ধশান্তি আছে। মা আমার হাতে খেতে বড় ভালোবাসতেন। একটু হলেও সেদিন রান্না আমায় করে ওনার ছবির সামনে ধরতেই হবে আমাকে। 

এখন নাকে গন্ধ এলেও মুখের রুচি ফেরেনি। শারীরিক দুর্বলতা যে কি জিনিষ তা বুঝছি নতুন করে। জীবনে ৬ বার মেজর সার্জারি হয়েছে। এমন কষ্ট উপভোগ হয়নি। কি জানি তখন বয়সটা কম ছিল বলেই হয়ত টের পায়নি। রক্তের জোর ছিল বলেই হয়ত অনুভূত হয়নি। যারা গতবছর "গোষ্ঠী সংক্রমণ" হয়েছে লিখেছিলুম বলে আমাকে রীতিমত ফেসবুকে ট্রোল করেছিলেন তারা এবছর সাবধানে থাকুন। এবারের স্ট্রেইন টা সত্যিই মারাত্মক। এত সাবধানে থেকে সেই গতবছর থেকেও "কোভিডচঞ্চু", "কোভিবিশারদ" এতসব গালভরা নামে আমায় ভূষিত করেছিলেন  যারা?  তারা জানলে খুশি হবেন এত সাবধানে থেকেও আমার ভাইরাল লোড বেশ মডারেট। তাই ফুসফুসের রিস্ক ফ্যাক্টর থেকেই যাচ্ছে। এ মারণ ভাইরাস একবার থাবা বসালে দগ্ধে দগ্ধে মারে। মানুষকে কাবু করে দিয়ে নিজে মজা দেখে। 

২৮ ফেব, ২০২১

রেওয়া পত্রিকা, অভিজিৎ দত্ত গল্প পুরষ্কার ২০২০ "পাসপোর্ট"

 


 

পাসপোর্ট

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

তদিন বাদে প্রণতি পিসি কে দেখে চমকে উঠেছিল রূপা। কি আশ্চর্য! মানুষটার বিয়েই হলনা কোনোদিন আর সে কি না বিধবার বেশে? দেখেই জিগেস করেছিল সে, কেন গো এমন সাদা শাড়ি পরে রয়েছ তুমি? আমার কিন্তু মোটেও ভালো লাগছে না তোমায় এমন দেখে।  

প্রণতি বলেছিলেন, বয়স তো ভালোই হল রে। তুই যখন বিদেশ চলে গেলি তখন তোর বয়স কত বল তো? 

কেন ? চার বছর। আর তোমার আঠেরো বছর বোধহয় । এই তো? দেখো দিব্যি মনে আছে আমার। তাই বলে বুড়োরা কেউ রঙ্গিন শাড়ি পরে না?  

প্রণতি বললেন, হ্যাঁ। আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছিলাম সেবছরেই। 

রূপা বলল, আমায় কিন্তু চিঠে লিখে জানাওনি পাশের খবরটা। বাবা বলেছিল আমায়, দেখও আমার বোন লেটার নিয়ে পাশ করেছে । তখন তো কেমন রঙীন শাড়ি পরতে গো। এখন কেন এমনি পর? 

আরে চল্‌, চল্‌ দিকিনি। কত বছর পর এলি বলত? তোর দিকে চেয়ে দেখি, দাঁড়া তুই! চকচক করছে স্কিন একেবারে। সেদেশে জারাই থাকে তাদেরই এমন। 

তুমি থামবে? রূপা বলে 

হ্যাঁ রে, তোর বর কবে আসবে? 

আমি ঠিক একমাস থাকব পিসি । যাবার সাতদিন আগে তিনি আসবেন ছেলে কে নিয়ে। বাবার অফিস, ছেলের কলেজ । সেদেশে ছুটি অত সুলভ নয় পিসি। বুঝেছ? 

আচ্ছা, বেশ। নে, নে চল, চল এবার। জামা প্যান্ট ছাড়। কিছু মুখে দে। 

সত্যি কি গরম এখানে! 

রূপার কষ্ট দেখে প্রণতি বললেন, তবু তো শীতকালে এলি রে। এখন তো বেশ আরাম আমাদের। 

রূপা বলল, আচ্ছা মন্টু কাকা কোথায় ? দেখছি না যে। 

 

প্রণতি এড়িয়ে যান। তুই হাত মুখ ধুয়ে আয়। রাত হয়েছে। ডিনার খেতে খেতেই সব কথা হবে। তোরা ওখানে শুনেছি খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে নিস। 

হ্যাঁ, আর্লি ডিনার সেদেশে। বলে রূপা তার স্ট্রলি ব্যাগ টানতে টানতে বলে, এই ফ্ল্যাট টা কিন্তু বেশ ছোট যাই বল পিসি। আমাদের আগের বাড়িটা অনেক বড় ছিল। 

প্রণতি কিচেনের দিকে এগিয়ে যান। প্রশ্নগুলি কিছুটা এড়িয়ে। 

বাড়ির সঙ্গে কি ফ্ল্যাটের তুলনা চলে রে? বাড়ি হল বাড়ি আর ফ্ল্যাট হল ফ্ল্যাট। কোনও তুলনাই চলে না। 


রূপা যখন সেই ছোটবেলায় এ শহর ছেড়েছিল তখন তাদের সেই পুরনো বড় বাড়িটায় কত মানুষ একসঙ্গে, এক ছাদের নীচে বাস করতেন। রূপার ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, বাবা, মা, আরো এক পিসি আর মন্টুকাকা। বাবা সবার বড়। প্রণতি তারপরেই । সবচেয়ে সুন্দরী বাড়ির মধ্যে। মন্টু সকলের ছোট। মাঝে রূপার আরেক পিসি। রূপার বাবা পরিতোষ শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরী পেলেন কলকাতায়। তখন পাত্রী দেখে তাকে বিয়ে দেওয়া হল। বিদেশ থেকে আরো ভালো চাকরীর অফার এল। এর মধ্যে জন্মেছে রূপা। বছর চারেকের মেয়ে নিয়ে তারা বিদেশে সেটল করল।  দেশে থাকাকালীন প্রণতি পিসির সঙ্গেই ছিল রূপার যত দোস্তি, যত বায়না। বাবা, মায়ের সঙ্গে বিদেশে যাবার বেশ কিছুদিন পরে ছোট পিসি শম্পার  বিয়ে হল। রূপারা আসতে পারেনি বিয়েতে। শম্পা এম এ, বিএড করে ইস্কুলে পড়াতেন। তারপর পোষ্ট এন্ড টেলিগ্রাফে বেশ কিছুদিন চাকরি করার পর তার বিয়ে । রূপা এসব শুনেছে বাবার মুখে।  

প্রণতি টেবিল সাজালেন ভাইঝির জন্য। পিসির হাতে এতদিন পর গরম ভাত, আলুপোস্ত আর মাছের ঝোল খেয়ে তৃপ্তিতে সুখঢেকুর তুলতে তুলতে রূপা বলে, এবার তোমার জন্যে সেদেশ থেকে কি এনেছি দেখবে চল।  

প্রণতি বললেন, আমি কি ছাই বেরোই নাকি? রূপা তার ঢাউস ব্যাগ খুলে পিসির জন্যে একে একে সুগন্ধী সাবান, বডি লোশন, ঘরে পরার নরম চটি আর চকোলেট বের করে।   

প্রণতি বলেন, যাক! এগুলো সব কাজের জিনিষ। চকোলেটের মোড়ক খুলে পিসির মুখে আদরে একটা ডার্ক চকোলেট পুরে দেয় রূপা। অনেকদিন বাদে কেউ এমন আদর করে কিছু দিল প্রণতি কে। । পরিতৃপ্তিতে মন ভরে ওঠে তাঁর । আশীর্বাদ করেন রূপাকে। 

আজ রাতে তোমার কাছে শোব কিন্তু পিসি । সেই ছোটবেলাকার মত। রূপার আবদারে শুখোরুখো মনের ভেতরে অনেকদিন পর যেন নতুন করে বৃষ্টি ঝরে তাঁর। কি আনন্দ সেই ভেজায়।  

বলেন, সে আর বলতে! আমার কাছে শুবি না তো কার কাছে আর শুবি? এ বাড়িতে আর কে আছে? 

মন্টুকাকার খবর কি বললে না তো? 

প্রণতি বললেন, সব খবর এক্ষুণি চাই মেয়ের। আগে চল। এবার কোমর ফেটে যাচ্ছে আমার। শুয়ে শুয়ে সব বলব। রূপা বলল, তা ভাল। আমার তো এখন জেট ল্যাগ। ঘুম আসবে না।  

তবে চল শুয়ে শুয়েই দেদার আড্ডা দেব আজ।  

যা বলছিলাম,তোর  মন্টু কাক আর বিয়েই  করেনি রে। সে আমার কাছেই ছিল এতদিন। দুই ভাইবোনে থাকতাম সেই বড় বাড়িটায়। তারপর তোর দাদু যেমন উইল করে গেল । সেই অনুযায়ী সব ভাগ হল। তবে বাড়ি আর রাখা গেল না। যখন আমাদের বাড়ি প্রোমোটারকে দিয়ে দিলাম তখন মন্টুর আর আমার প্রাপ্য আলাদা ফ্ল্যাট বা টাকা। বাবা কি আর জানত যে মন্টু জীবনে বিয়েই করবে না? 

মন্টুকাকা গান শেখাত না? 

হ্যাঁ, এখনো শেখায় সেই ফ্ল্যাটবাড়িতেই। ওটাই তো তার একমাত্র রুজিরোজগার। তোর বাবা আর ছোট পিসি বাড়ির অংশ ছেড়ে দিয়ে টাকা নিয়ে নিল তখন। আর আমি এসে উঠলাম এই ছোট্ট ফ্ল্যাটে। আমার প্রাপ্য বাকী টাকা ব্যাঙ্কে রেখেছি। বড় ফ্ল্যাট নিয়ে কি করব। শেষ বয়সে টাকা থাকলে সে আমাকে দেখবে। 

এই ফ্ল্যাট প্রণতি রূপাকে দিয়ে যাবেন। এবারে সেই সব কাগজেকলমে করতেই রূপার আসা। তার পিসির ইচ্ছে ।

তা বাবা, ছোটপিসিকে অত পড়াশুনো করালো আর তুমি হায়ার সেকেন্ডারির পর আর পড়লে না কেন পিসি? তুমি পড়াশোনায় অত ভাল ছিলে শুনেছি । 

কি আর করি বল? বাড়িতে পড়তে দিল না কেউ। তখন বাড়ি থেকে বেরুনো বারণ। 

তা তোমার বোন যে বেরুলো?  

আমার কপালটাই খারাপ রে। 

তোমার বিয়ে দিলেন না কেন ঠাম্মা, দাদু?  

সারাজীবন ধরে এত টানাপোড়েন সহ্য করে এতবছর পর এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে ভাল না লাগলেও রূপা কে তিনি বলেই দেবেন সব। এই ভাবলেন।  

কি হল পিসি? চুপ করে র‌ইলে যে।  

আমাদের বাড়ি সে অর্থে কনসারভেটিভ ছিল না। নয়ত আমার বোন অতদূর পড়ে, চাকরী করে তারপর বিয়ের পিঁড়িতে বসে? 

তবে?  

তবে আর কি? এই যেমন তুই সেদেশে তোর বরকে ভালোবেসেছিলি, তোর বাবা মা বিয়েও দিয়ে দিলেন।  

রূপা বলল, সেটাই তো ন্যাচারাল।


জানিস? আমার জীবনটা অনেকের থেকে আলাদা রে। 

কেন পিসি? 

আর কেন? তাঁর জন্য আমিই দায়ী। 

তার মানে? 

আমাদের মস্ত সেই পুরোনো বাড়িটার পাশেই থাকত সুবিমলরা। দুই পরিবারে আসা যাওয়াও ছিল। তবে ঐ যেমন হয় সুবিমল আর আমি তখন ভেসে গেলাম। আমরা প্রেম করতাম ছাদে উঠে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এইরকম চলছিল। সে পড়ত কলেজে। আমি তখন ক্লাস টেন। 

তো ? কি হল তারপর? রূপা বলে 

তার পিসি বলল, মা একদিন মাসীদের সঙ্গে থিয়েটার দেখতে গেল রংমহলে। শম্পা কে সঙ্গে নিয়ে গেল।আর আমাকে রেখে দিয়ে গেল কারণ আমার সামনেই টেস্ট পরীক্ষা। বাবা অনেক রাতে ফিরতেন অফিস থেকে। তোর বাবা তখন শিবপুরের হষ্টেলে। 

রূপা বলল তারপর ? 

সুবিমল সেদিন আমাদের বাড়ির মধ্যেই সোজা চলে এসেছিল। তারপর যা হয়। এতদিনের দূর থেকে প্রেম হঠাত অত কাছাকাছি এসে আর বাঁধ মানেনি। আর কি বলি? সব তো বুঝিস । 

আই মিন গুড তো। ক্ষতি কি তাতে? রূপা বলল। 

তোরা বলবি কি আর হয়েছে এসবে? যাকে বিয়ে করবেই ঠিক করেছ তার সঙ্গে শোয়াই যায়। প্রণতি বললেন। 

ইয়েস। অফ কোর্স। নো  ঢাক ঢাক গুড়গুড় । 

আমি চুপচাপ ছিলাম। পরীক্ষার রেজাল্টও ভাল হল। কিন্তু আমার শরীরের হাবভাব দেখে মা বুঝে ফেলল মাস তিনেক পর। আমার পেটে তখন সুবিমলের সন্তান। মা চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে আমাকে বাবার কাছে নিয়ে গেল। আর তারপরেই সব খালাস হয়ে আমায় মুক্ত করল। তবে মা'কে সুবিমলের কথা আমি খুলে জানিয়েছিলাম সব। বাবা, মায়ের চরম আপত্তি। ভ্যাগাবন্ড ছেলে। পাড়ার লোক। পাশেই থাকে। তাদের সঙ্গে প্রবল অশান্তি, ঝগড়াঝাটি কিছুই বাকী র‌ইল না। তদ্দিনে সুবিমল চুপিচুপি বম্বে পাড়ি দিয়ে সিনেমা করতে গেছে। রাগে, ঘেন্নায় আমার তখন সুবিমলের প্রতি প্রেম উধাও। 


রূপার চোখে তখন জল টলটল করছে। ও তাই জন্যে এমন বৈধব্য বেশ তোমার? সেই কাপুরুষ লোকটার জন্যে? এত্ত মায়া? এটা আমি মেনে নিতে পারলাম না কিন্তু।  

প্রণতি বললেন, মোটেও না। আমার অভিমান অন্যখানে। এই ঘটনার পর অষ্টাদশীর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হল বাড়িতে। আর জারি করল কারা? তার বাবা আর মা। বাড়ির বড় মেয়ে, সুন্দরী বুদ্ধিমতী মেয়ে তাদের সব আশায় জল ঢেলে দিয়েছে তাই। বাবা আলমারী খুলে আমার রঙীন সব শাড়ি পুড়িয়ে দিল। আর সাদাশাড়িগুলো এনে আমাকে বলল, কাল থেকে বাইরে বেরুনো বন্ধ। পড়াশুনো আর চলবে না। এখন থেকে যেন বাড়ির সব রান্নাবান্না আমি‌ই দেখি। মা'কে সাহায্য করি। যেমন আগেকারদিনে হত। ভাইবোনদের পড়াশুনো দেখতে হবে। অনেক কষ্টে হায়ারসেকেন্ডারি পরীক্ষাটা দিলাম। ভাবলাম বাবা-মায়ের মন গলবে। আবারো পড়তে দেবে। কিন্তু নাহ্! পরীক্ষার পর থেকেই মা খুব অসুস্থ হয়ে বিছানায় শোয়া। তাও নাকি আমার দোষে। বাবা বলত প্রায়শঃই। মন ভেঙ্গে গিয়ে মা শয্যা নিয়েছে নাকি।  আর আমার দায়িত্ত্বে এই পুরো সংসার। দুটো ভাইবোনের ইস্কুল, পড়াশুনো, রান্নার মাসীর যোগাড়, ধোপা, নাপিত বাজারের হিসেব সবকিছু। ভাল রেজাল্ট করেও আর ভর্তি হওয়া হলনা কলেজে। আর সেইথেকেই এমনি আছে রে তোর প্রণতি পিসি।  


রূপা বলল

- হাউ স্যাড পিসি। জাষ্ট ভাবতে পারছিনা যে বাবা, মা কি করে এমন ক্রুয়েল হতে পারে। 

- আর কি হবে এসব ভেবে? রাখ তো।  

- আর সেই লোকটা? সে ই বা কি করে পারল এমন করতে? 

- কাপুরুষ একটা। ওকে একবার পেলে আমি বুঝিয়ে ছাড়তুম । লোকটা পালিয়ে বাঁচল। জানিস? সেদিন কেউ আমার পাশে দাঁড়ায় নি। এমন কি তোর বাবাও না। 

- এস্কেপিস্ট একজন। তোমার জীবনটা নষ্ট করল। রূপা বলে ওঠে। 

- নে, নে এবার বাদ দে ওসব কথা। এবার ছবি দেখা দিকিনি সেদেশের। তোর ঘর সংসার, ছেলে, বর সকলের। 

রূপা এবার তার হাতের সেলফোন খুলে নিজের শহরের ছবি দেখাতে শুরু করে দিল। সেদেশের ছবি কি সুন্দর। কোন্‌টা ছেড়ে কোন্‌টা দেখে? 

ওদেশের আকাশ বড্ড নীল রে। আর জলবায়ু কত ভাল বল্‌ তো! এখানকার মত এত গরম নেই। 

রূপা বলল, তুমি এবার আমার সঙ্গে চলে চলো প্লিজ। খুব আরামে থাকবে বাকী জীবনটা। 

এই মধ্য ষাটে নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাব? কি যে বলিস বাপু! 

তোমার নিজের দেশের পুরনো স্মৃতিগুলো কি খুব সুখের ? সেই বিশাল বাড়িও নেই। না আছে লোকজন। কিসের জন্য মায়া তোমার? 

প্রণতি চুপ করে থাকেন। সত্যিসত্যি তাঁর কোনোই পিছুটান নেই। কিন্তু এত বয়সে সেদেশের জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা কি মুখের কথা? কথায় বলে পর ভাতী হয়ো কিন্তু পর ঘরী হয়ো না। 


সেলফোনের ফোটো অ্যালবামের পাতা উল্টে যায় রূপা একে একে। দুজনের খুচরো, এলোমেলো সংলাপ চলতে থাকে। হঠাত একটি ছবিতে গিয়ে চোখ আটকে যায় প্রণতির। এ কি! এ ছবি কার? কোথায় পেলি তুই?  


রূপা বলে, কেন? তুমি চেনো নাকি এনাকে? আরে সেবার বঙ্গ সম্মেলনে আলাপ হল। মুম্বাই থেকে এসেছিলেন। ওখানে স্ক্রিন প্রেজেন্স ছিল ওনার। বাঙালী অভিনেতা বিমল দা। দারুণ দোস্তি হয়ে গেছে । আমাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড হয়ে গেছেন তারপর থেকে। উনি অ্যামেরিকায় আমাদের বাড়িতে এসে দুরাত ছিলেন। কি ভাল অভিনয় করেন গো পিসি। এখনো যোগাযোগ আছে। 


ঝটকা মেরে প্রণতি উঠে পড়েন বিছানা থেকে। আমি তোর সঙ্গে সেদেশে চলেই যাব রূপা। সেদেশেই গিয়ে থাকব তবে। চল তবে পাসপোর্ট, ভিসার সব ব্যবস্থা করে ফেলি। যদি সেই লোকটার সঙ্গে আরেকটি দেখা হয়! 

রূপা বলল কে? কার কথা বলছ তুমি?  

প্রণতি বললেন ঐ যে, সুবিমল থেকে এখন শুধু বিমল হয়েছে যে। মুম্বাই গিয়ে ভোল বদলেছে তার । এইবার এতদিন বাদে তার সঙ্গে বোঝাপড়াটা সেরে নেওয়া দরকার।     



৫ ফেব, ২০২১

ইমিউনিটি কারে কয়?

 

সেই যে লকডাউনে শেফ সঞ্জীব কাপুর লাখ কথার এক কথা কয়েছিলেন নাইন্ডিয়ান কিচেনে মশলার তাকটি হল ইমিউনিটি বুস্ট্যার এর জায়গা। খুব মনে ধরেছিল কথাগুলি। কথাগুলো কিয়দাংশে কিন্তু সত্যি প্রমাণিত হয়েছেও । তাইনাআমাদের ছেলেপুলেদের আমরা ছোটো থেকে অত হাত ধোয়াইওরা হামা দিতে শুরু করলেই খুঁটে খায়। তা সে আরশোলার পা হোক কিম্বা টিকটিকির গু। দু চারদিন নলিখলি যায় হেগে। তারপর ঠিক হয়ে যায় চিঁড়েকাঁচকলাআপেল সেদ্ধ খেয়ে। আমরা একটু বড় হলেই স্কুল কলেজে এক আকাশের নীচেখোলা হাওয়ায় হজমি,আলুকাবলিফুচকারোল খেয়ে অভ্যস্ত। এটা শুধু আমার রাজ্যেই নয়। আসমুদ্র হিমাচলেই এমন। তাই আমাদের এই HARD immunity কি HERD immunity তে গিয়ে ঠেকলএই অভিশাপ আজ আমাদের আশীর্বাদ। আমাদের ন্যাংটা খোকার শিঙনি ঝরা নাকথুতু মাড়িয়ে রাস্তা থেকে এসে জুতো না ধুয়েই গটমট করে ঘরে ঢুকে পড়াথুতু দিয়ে বড়বাজারের গদির ব্যাবসায়ীর নোট গোনা আর বাজারের চকচকে আপেল বা পেয়ারা না ধুয়েই নোংরা জিনসের প্যান্টে ডিউস বলের মত দুবার ঘষে নিয়ে কামড় দেওয়া... এসবের একটা মাহাত্ম্য আছে কি বল?

১ ফেব, ২০২১

"এবং রংপুর লাইম" পথের আলাপ পত্রিকার আয়োজনে সেরা দশে পুরস্কৃত গল্প

 



(১) 

নমস্কার! আমার নাম সুতনুকা রায়। আপনাদের নাম্বার পেলাম এক বন্ধুর কাছ থেকে । 

হাঁসের ডিম আছে তো এখনও? নাকি ফুরিয়ে গেছে? জানান তবে। 

আচ্ছা সোনারপুরে  ডেলিভারি করবেন? 


এতসব লিখেই খটখট নিজের ঠিকানা টাইপ করে ফেললেন। 

একতরফাই যেন বকে চলেছেন সুতনুকা। মনখারাপের মেঘ এক নিমেষে উড়িয়ে দেবার এ এক উপায় হল বেশ। কিন্তু ওদিকের প্রাপক কথা বলেনা কেন যে ? দুটো টিক নীল হয়ে গেল। 


অনেকক্ষণ হয়ে গেছে হোয়াটস্যাপের ওদিক থেকে কোনও উত্তর না আসায় সুতনুকা বিচলিত হলেন। মধ্যবয়সীর শরীর মনে খুব টানাপোড়েন। মায়ের সঙ্গে একা থাকেন। বাবার কেনা ফ্ল্যাট আর সঞ্চিত বেশ কিছু টাকাপয়সা আছে তাই এখনও দিব্য চলে যায়। সমস্যা একটাই। ঘরে কেউ নেই কথা বলার মত। অশীতিপর প্যারালিটিক মা দীর্ঘদিন বিছানায় শয্যাশায়ী। কথাবার্তাও জড়ানো। সুতনুকা কোভিডের লকডাউনে মায়ের দিনেরাতের কাজের লোকটিকেও কাছে পায়নি। সে রাতারাতি কানাঘুষো লকডাউনের কথা শুনেই পালিয়েছিল বাড়ি। ট্রেনে করে আসা যাওয়া করত। অগত্যা মা কেও দেখতেই হয়। ফেলে তো আর দেওয়া যায় না। একাই রাঁধে বাড়ে। ঘরের কাজ কোনোমতে সারে। টিভি দেখলে মন খারাপ লাগে। মনোবল কমে যায়। দু একজন আত্মীয় বন্ধু থাকলেও কোভিডের কালে কেউ আগ বাড়িয়ে কিছু জিগ্যেস করেনা সুতনুকা কে, এমনি স্বার্থপর মানুষ এখন। যদি রাতবিরেতে মায়ের জন্য তাদের কোনও দরকার পড়ে । তাই হয়ত। দিন দিন আত্মীয়, পরিজন সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে সুতনুকা একদিন খুব একা হয়ে পড়লেন এই মারণ কোভিডের রাজত্বকালে। এবছরটায় শুধু নিজেকে বাঁচতে হবে আর মা কে নিয়ে বন্দী হয়ে ঘরে থাকতে হবে। এ আর এমন কি? বন্দীই তো ছিলেন তিনি । তবে কোভিডের আগে কাজের মেয়েটা আসত যেত দিনে দু বার। বিকেলে সে চা করতে এসে। টিভি দেখতে দেখতে গল্পগাছা করত। এখন কেমন দম বন্ধ হয়ে আসে সুতনুকার সেইসব ভাবলে। 


আবার টাইপ করলেন... 

আর কি কি আইটেম আছে আপনাদের? জানালে ভালো হয়। অবিশ্যি ডেলিভারি না করলে আলাদা কথা... 

অতঃপর উত্তর আসে ও প্রান্ত থেকে। সুতনুকা উৎফুল্ল হোয়াটস্যাপে "টাইপিং" দেখে।  

নমস্কার। আপনি কি ফেসবুকে আছেন ম্যাম? তাহলে আমাদের পেজটি লাইক করলে জানতে পারবেন। 


 না আমি ফেসবুকে নেই। "হাটেবাজারে" র  সুন্দরবনের ভালো হাঁসের ডিমের কথা জেনে মনে হল। 

আপনি আমায় এখানেই জানাতে পারেন কি কি জিনিষ আছে হাটেবাজারে তে । আপনাদের প্রডাক্ট রেঞ্জ জানলে আমার অর্ডার দিতে সুবিধা হয় একটু। 


ওদিকে হাটেবাজারে আবারো টাইপিং... 

আপনার কি লাগবে ম্যাম? চাল থেকে চালতা, ডাল থেকে ডালডা, আম থেকে আমড়া সব রাখি আমরা। 

বাহ! কি সুন্দর কথা বলেন আপনি! 

হাসির ইমোটিকন আসে ওপ্রান্ত থেকে। 

খুশি হন সুতনুকা। লিখে ফেলেন ঝপাঝপ... 

তার মানে দুধ থেকে দুধেরসর চাল, গাছপাঁঠা থেকে কচি পাঁঠা সব? 

ইয়েস ম্যাম। এভরিথিং । আপনার কি লাগবে শুধু বলুন। হাজার টাকার ওপরে ফ্রি হোম ডেলিভারি। প্রথম কাস্টমার হিসেবে আপনি অ্যাডিশানাল টেন পারসেন্ট ডিসকাউন্টও পাবেন। 

আরও খুশি সুতনুকা। তড়িঘড়ি বলেন 

সুন্দরবন থেকে সোনারপুর কাছেই হবে আপনাদের  

আবারো হাটেবাজারে টাইপিং ... 

আমরা দক্ষিণ থেকে উত্তর সর্বত্র ডেলিভারি করে থাকি ম্যাম। 

"বেশ"  

শব্দটা লেখার পরেই মায়ের গোঙানিতে সুতনুকার মেসেজিংয়ে ভাটা পড়ে। 

মায়ের ঘরে যেতেই সুতনুকার চোখে পড়ে মা অনেকক্ষণ বিছানা ভিজিয়ে পড়ে আছে তেমনি। বোধহয় শীত করছিল তাই চেঁচিয়ে মেয়েকে জানান দিয়েছেন। মা কে হাগিস পরিয়ে রাখেনা সে। এক হল তার দাম আর দুই মায়ের অ্যালারজি। খুব র‍্যাশ বেরুতো আগে আগে। তাই মা কে উঠিয়ে সে নিজেই বেড প্যান দেয় নিয়মিত। 

ওদিকে হাটেবাজারে তাদের প্রডাক্ট প্রোমোশানের খবরাখবর দিয়েই চলে... 

আমাদের সব প্রডাক্ট আমাদের নিজস্ব ফার্মের। কয়েকটা ফলের ছবি, মাছের ছবি। ম্যাম, ইফ ইউ আর ইন্টারেস্টেড প্লিজ ভিজিট আওয়ার ফার্ম ওয়েবসাইট। লিংক দিয়েই সে যাত্রায় কথোপকথনে ইতি টানে হাটেবাজারে। 

এসেই তাকে অফলাইন দেখে মন খারাপ হয় সুতনুকার। ডাউনলোড করে ছবিতে চোখ রাখেন। 

কাঁঠালিকলাও? কাগচি লেবু, ছড়া তেঁতুল, রংপুরের লেবুর ছবি দেখে মোহিত হন সুতনুকা। তার মানে লকডাউনে মামাবাড়ির সেই স্পেশ্যাল হাতঅম্বল অ্যাসিওরড। কি ভালো রাঁধত তাঁর মা। হাতায় করে তেলের মধ্যে সর্ষে লংকা ফোড়ন দিয়েই ঢেলে দিত তেঁতুলগোলা, নুন, মিষ্টি । লেবুর রস আর লেবুপাতা দিয়েই ফুটে উঠলে নামিয়ে ঢেলে দিত সুতনুকার  কাঁঠালিকলা চটকানো ঠাণ্ডা ভাতের মধ্যে।গরমকালে ইশকুল থেকে ফিরে এই হাত অম্বল খেতে খুব ভালো লাগত তাঁর। তাই কাঁঠালিকলা আর রংপুর লেবু একসঙ্গে দেখে চোখ চকচক করে উঠল সুতনুকার।  

হাটেবাজারের নিজস্ব ফার্মের ওয়েবসাইটের লিংকে ক্লিক করেই নিমেষের মধ্যে হাজির হলেন তিনি খোলা আকাশের নীচে । যেখানে রঙিন, ঝলমলে সব টাটকা আনাজপাতি, মুদিখানা, মাছমাংস, ডিমের পসরা থরেথরে সাজানো । 

মনের আনন্দে ওপারে  ছুঁড়ে দিলেন একগুচ্ছ প্রশ্ন  । 


পায়েসের গোবিন্দভোগ খুঁজে পেলাম না। আচ্ছা মুরগীর ডিম দিশী? তাহলে হাঁসের ডিমের সঙ্গে এটাও দবেন । মানে হাঁস, মুরগী মিলিয়ে ছ' টি করে মোট এক ডজন। 

ছড়া তেঁতুল দেখেই লোভ লাগছে। বাজারে তো পাইই না আর । ওটা দেবেন আড়াইশো গ্রাম। 

গন্ধরাজ লেবুর পাশে রংপুর লাইমস দেখলাম । কতদিন পর নাম শুনেই জিভে জল এল! বাংলাদেশের রংপুরের লেবু? আমার মামারবাড়ি জানেন? দু দুটো লেবুগাছও ছিল সেখানে। সব কেমন ছেড়ে আসতে হয়েছিল দাদুদের। নাম শুনেছি মায়ের মুখে । খুব টক অথচ ভীষণ রস ঐ লেবুর। বাইরেটা ঘন সবুজ, ভেতরটা মুসাম্বীর মত হলুদ। তাইতো ছবি দেখেই চিনতে পেরেছি। ওটার বড্ড দাম। তবুও দেবেন দুটো। বাপের বাড়ির লেবু শুনলে মা একটু খুশি হবেন। 


ওপ্রান্তে  কেউ আর তখন অনলাইন হয়না দেখে বিফল মনোরথ সুতনুকা মনের দুঃখে হোয়াটস্যাপের ঝাঁপি বন্ধ করে দেন। সেরাতের মত । 

ভোরে উঠেই দেখেন উত্তর এসেছে। 

আমাদের সব নিজস্ব ফার্মের প্রোডাক্ট ম্যাম। গোবিন্দভোগ চালের মত আমাদের নিজস্ব একটা সুগন্ধি চাল আছে। নাম গোপালভোগ। ওটা নিয়ে দেখুন। এক কেজি দিচ্ছি তবে। 

সুতনুকা ঝটিতি টাইপ করতে শুরু করে দেন... 

তাহলে মুরগীর ডিম, হাঁসের ডিম মিলিয়ে একডজন, পাঁচ কেজি দুধের সর চাল, এক কেজি গোপালভোগ। ও হ্যাঁ, সোনামুগ ডাল দেবেন এক কিলো। আড়াইশো তেঁতুল, দুটো গন্ধরাজ লেবু আর দুটো রংপুর লাইমস। মোট কত হয় জানাবেন। আমি কিন্তু ক্যাশে পেমেন্ট করব। আমার দ্বারা ওসব নতুন ডিজিটাল ওয়ালেট হবেনা।  

ফোন রেখেই এবার মনে হল কোভিডের যুগে খুচরো নেওয়া যাবে না। অতএব রাউন্ড ফিগারে দুহাজার টাকার মত জিনিষ নিতে হবে। তাই আবার ঢুকে দেখতে হবে সাইটে। 

কিন্তু ও প্রান্তে নীরব। কোনও উত্তর আসেনা। 

ধুস! সকাল সকাল অনেক কাজ। মায়ের কাজ, নিজের কাজ। রাঁধাবাড়া। টবের গাছ থেকে তুলসী পাতা তুলে এনে মধুর শিশি হাঁটকাতে গিয়ে দেখেন  তলানিতে ঠেকেছে। মনে পড়ে গেল। 

আচ্ছা ওদের মধুও তো দেখলাম মনে হল। সুন্দরবনের চাক ভাঙা খাঁটি মধু। তাহলে তো দু' হাজার হয়েই যাবে। এবার সোজা ফোন করেই ফেললেন তিনি। কেউ ধরল না ফোন। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল... 

স্যরি! দিস ইজ হোয়াটস্যাপ নং। শ্যাল কন্ট্যাক্ট ইউ সুন... 

কি যন্ত্রণা রে বাবা! আবার টাইপ করতে বসলেন সুতনুকা। এক কেজি মধু দেবেন। আচ্ছা এই মধু চিনির রসে ক্যারামেলাইজড নয় তো? তাহলে নেব না। 

খটখট উত্তর এল ওদিক থেকে। 

কি যে বলেন ম্যাম! সুন্দরবনের খাঁটি মধুর নাম সারা বিশ্বে। আমাদের মধু এক্সপোর্ট হয়। 

সুতনুকার মনে পড়ে, রংপুরের মামাবাড়ির লোকজনের মুখে সুন্দরবনের মধুর নাম শুনেছে। বাংলাদেশে সুন্দরবনের যে অংশটা ঢুকে আছে সেখানেও এই মধু পাওয়া যেত। 

আবার লিখলেন... 

দেখুন যা যা জিনিষ অর্ডার করলাম সব মিলিয়ে ২০০০ পুরো হয় যেন। আমি খুচরো নেব না কিন্তু। 

ওকে ম্যাম। শ্যাল রাউন্ড আপ উইথ লেবু কিম্বা তেঁতুল। 

(২) 

সেদিন মা মেয়ের চা-টোস্ট পর্ব শেষে ভাত রেঁধে বসে রইলেন সুতনুকা। এমন প্রায়ই হয় আজকাল তাঁর। কোনদিন ডালটা প্রেসারে সেদ্ধ করে গ্যাস নিভিয়ে দিয়ে টিভি খোলেন। কোনদিন আনাজপাতি কেটে নিয়ে হাঁফিয়ে মরেন। কোনদিন মিক্সারে পোস্তটা কাঁচালঙ্কা দিয়ে দুবার ঘুরিয়ে ক্ষান্ত দেন। ভাবেন আর কদ্দিন এভাবে? মায়ের জীবনটাও তেমনি। কোভিডও তেমনি। এই দুয়ের টানাপোড়েনে বিধ্বস্ত হতে হতে আজ ক্লান্ত এই অবিবাহিতা। আর কদ্দিন নিজের জন্য রান্না করে চলবেন তিনি? মা তো নামমাত্র বেঁচে আছেন। তাঁর খাওয়াদাওয়া শুধু বাঁচার জন্য। তিনি কি খান, কেন খান তাও সবসময় বোঝেন না। সর্বগ্রাসী এক মনখারাপ ঘিরে ধরে কুয়াশার মতন। এসে দাঁড়ান মায়ের বিয়ের ড্রেসিং মিররের সামনে ।  পুবের রোদ এসে আছড়ে পড়েছে  পুরনো পলকাটা আয়নার কাচে । সুতনুকার সিঁথির পাশের আরও আরও চুলগুলিতে রঙ ধরে গেছে এই কোভিডের কালে। অর্থাৎ আরেকটু বয়স বেড়ে গেল বুঝি। আগে শখের নেল পালিশ লাগানো সব ঘুচে গেছে । বেরুনোর সময় লিপস্টিক, ম্যাচিং ব্লাউজ, শখের শাড়ি সব শিকেয় তোলা রইল। কিসের জন্য তবে এই বেঁচে থাকা? দিনের পর দিন। 

এখন আবার আরেকটা ভয় কুরেকুরে খায় তাঁকে। তাঁকে  যদি কোভিড ধরে? তিনি যদি মায়ের আগে চলে যান এই দুনিয়া থেকে? মায়ের কি হবে তবে? এর নাম ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনের আরেক নাম মনখারাপ। কেউ যেন বলে ওঠে নেপথ্যে। 


একটা ফোন এসে সেই চিন্তায় ভাটা পড়ে তখনকার মত। অচেনা নম্বর। 

হাটেবাজারে থেকে বলছি। আপনার টোটাল বিল অ্যামাউন্ট ২০১০ টাকা। এক্সপেক্টেড ডেলিভারি টাইম, কাল সকাল ১০টা। 

কথাগুলো বলেই ফোন কেটে যায় না কেউ কেটে দেয় বুঝতে পারেন না । পরেই মনে হল ভয়েস মেসেজ ছিল সেটি। 

মানুষের সঙ্গে আর ইন্টারঅ্যাক্ট করা যাবেনা তবে? কি মারাত্মক অতি যান্ত্রিক হয়ে উঠল জীবন! তবে বাবা একটা কথা বলতেন বটে। "প্ল্যানেট  আর্থ ইজ সিক। অ্যান্ড দ্যা ডিজিজ ইজ ম্যান"  মানুষের থেকে দূরে থাকতে শেখ । ভালো থাকবি। 

সেদিন অনেক তর্ক হয়েছিল বাবার সঙ্গে।  কি যে বল তুমি! মানুষ কি জন্তু জানোয়ার? মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। 

বাবা বলেছিলেন পশুপাখিদের অতীত নেই, ভবিষ্যতের চিন্তা নেই। আছে কেবল বর্তমান। যত মানুষের সঙ্গে মিশবি তত বুঝবি। আনন্দ যেমন পাবি তেমনি ততটাই আঘাত পাবি, দুঃখ পাবি।

 

ভূপেনবাবুর বিখ্যাত গান "মানুষ মানুষের জন্যে" মিথ্যে তবে? সুতনুকা বলেছিল। 


আত্মীয়পরিজন, বন্ধুবান্ধব সবার থেকে বাবা ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন একদিন। তখন ইন্টারনেট আসছে সবেমাত্র। সোশ্যাল মিডিয়াও ছিলনা। বাবা একা হয়ে পড়লেন অবসর নেওয়ার পরেই। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে বয়স্ক ছেলেরা অনেকেই  এমন অবসাদগ্রস্ত  হয়ে পড়ছে আজকাল। এর নাম মেল মেনোপজ। কাগজে পড়েছেন তিনি। গুমরে গুমরে নিজের খোলসের মধ্যেই গুটিয়ে রাখতে রাখতে একদিন দুম করে বাবা চলে গেলেন। সুতনুকার তখন কলেজ জীবন। তারপর এম এ ক্লাসে ঢুকেই মায়ের স্ট্রোক হল। পড়া শেষ হল তারমাঝেই কিন্তু সুতনুকার জন্য জীবনের আর কিছু নতুন ইশারা রইল না। নাথিং টু লুক ফরোয়ার্ড। কেউ তার বিয়ের চেষ্টাও করেনি কোনোদিন । আর প্রেমে পড়তেও শেখেননি সুতনুকা। ঐ যে বাবার কথাই মাথায় গেঁথে ছিল বোধহয়। মানুষের থেকে দূরেই থেকে গেলেন তিনি। নতুন করে নিজের জীবনে বিপদ ডেকে আনার কোনও ইচ্ছেই মাথায় আর আসেনি।  

ফোন হাতে নিয়েই দেখতে পেলেন হোয়াটস্যাপে মেসেজ এসেছে আবারো। যে কথাগুলি তখন ফোনে শোনালো সেটাই আরও একবার। তিনি শুধু থ্যাংক্স জানালেন তখনকার মত। 

মনে মনে বলে উঠলেন, উফ! কি নিরুত্তাপ সারা দুনিয়া!

(৩) 

এভাবেই চলছিল বেশ। কাঁঠালি কলায়, থোড়-বড়ি-মোচায়।  দুধেরসর থেকে দুধকচু সবের মধ্যেও ঐ অচেনার সঙ্গে কথোপকথন সুতনুকাকে এক পশলা সুবাতাস দিয়ে যায়। গলার স্বর শুনে অভ্যস্ত ও প্রান্তের মানুষটিকে খুব দেখতে, জানতে ইচ্ছে করলেও উপায় নেই তার। আরও কথা বলারও ইচ্ছে থেকেই যায়। 

হঠাত একদিন গ্রসারী আইটেমের অর্ডার দিয়ে সুতনুকা ঝাঁঝের সঙ্গে লিখেই ফেলেন, এত এত জিনিষ কিনছি কিছু ফ্রি দেন না তো?  


সঙ্গেসঙ্গে ওদিক থেকে উত্তর আসে। 

আপনার কি চাই বলুন? নেক্ট টাইম ফর শিওর। 

সুতনুকা কি বলবেন ভেবে পান না। 

ওদিক থেকে আবারো প্রশ্ন আসে... 

বলবেন ম্যাম। কি দিতে পারি ফ্রি হিসেবে। 

সুতনুকা স্মাইলি পাঠান খুশি হয়ে

প্রত্যুত্তরে হাটেবাজারের করজোড়ে নমস্কারের ইমোজি ফুটে ওঠে স্ক্রিনে।  

থেমে যায় বার্তালাপ। 


(৪) 

ইলিশমাছ বড্ড দাম। তার চেয়ে চিংড়ি দিন। মাছের ডিম আছে? এইসব আদুরে খুচরো সংলাপে বানভাসি হয় সুতনুকার হোয়াটস্যাপ। তবে আগে যেমন বেশীটাই কেজো কথা হত এখন আরেকটু আবেগ মাখানো সেই সংলাপের ভাষা। হাটেবাজারের ভাষাতেও  বেশ আত্যিশ্যের ছোঁয়া।  

বিজনেস ডিল বাদ দিয়ে সুপ্রভাত, শুভরাত্রির সঙ্গে দিব্য জায়গা করে নিল সুন্দরবনের আমফানের ক্ষয়ক্ষতি । সুতনুকা একদিন লিখেই ফেললেন, 

আপনাদের ফার্মের ঘরবাড়ির কোনও ক্ষতি হয় নি তো? জানাবেন। যদি সাধ্যমত কিছু সাহায্য করতে পারি। 

ওদিক থেকে উত্তর আসে বিনয়ের সঙ্গে, 

সো নাইস অফ ইউ ম্যাম।

উদ্বেল হয়ে পড়েন সুতনুকা। 

এসব কথা ছাড়াও "কি টাটকা মাছ ছিল" অথবা "খুব মিষ্টি ছিল পেয়ারা” ...এসব শুনে  হাটেবাজারেও তাদের ব্যাবসায়ী  মনোবৃত্তি, নিক্তিতে ওজন মাপা ছেড়ে সুতনুকা ম্যামের জন্য স্পেশ্যাল ডিল দিতে শুরু করল অচিরেই। 

দু কিলো আলুর সঙ্গে কাঁচা হলুদ ফ্রি, এক কিলো সোনামুগ ডালের সঙ্গে একশো হলুদ গুঁড়ো ফ্রি আবার কোনদিন একডজন কলা দিল দশটার দামে। 

সুতনুকা ছেড়েই দিয়েছেন প্রায় পাড়ার দোকান থেকে বাজার আনা। এই বেশ ভালো ব্যাবস্থা। আজকাল প্রতিদিন ভোরে উঠেই তিনি হাটেবাজারের মেসেজ পান। নতুন কি ফল এল, কি শাক এল, কোন মাছ এল ... মন ভালো হয়ে যায় তাঁর। ইচ্ছে হয় সামনাসামনি মানুষটির সঙ্গে একটিবার আলাপ করার। 

(৪) 

ম্যাম ইউ উইল লাভ দিজ গুডি ব্যাগ ফর্ম আওয়ার ফার্ম! শ্যাল ডেলিভার ইউ টুডে। 

সুতনুকা হতবাক। কিছু তো অর্ডার করেন নি তবু কেন? হয়ত ভ্যালিউড ক্লায়েন্ট ভেবে কিছু দিচ্ছে। 

সেদিন গুডি ব্যাগ খুলতেই চোখে পড়ল রংপুর লাইমস, কাঁচা হলুদ, তুলসীপাতা, আদা, ছোট্ট মধুর শিশি আর গোলমরিচের প্যাকেট। বেশ অবাক হলেন খুলে। বেশ দামী সব জিনিষ। আর সঙ্গে একটা চিরকুটে লেখা "স্টে হেলদি, স্টে সেফ" 

হাটেবাজারে তার মানে তাদের ক্লায়েন্টের কোভিড কেয়ারের জন্য বেশ সচেতন। ফার্ম ফ্রেশ গুডিজ পাঠিয়েছে তাই। 

হোয়াটস্যাপ খুলে সুতনুকা লেখেন খুব ভালো লাগছে এইসময় এত কিছু দরকারি জিনিষ হাতে পেয়ে। নিশ্চয়ই পাঁচন বানিয়ে খাব। থ্রোট কেয়ার হবে আমাদের। মনে করার জন্য থ্যাংকস। বাই দ্যা ওয়ে জ্যান্ত কাতলার কি স্টেট্যাস? ল্যাজা মুড়ো বাদ দিয়ে সলিড মাছ দেবেন এবার এক কেজি । ঘাড়ের বা নীচের দিকের মাছ নেব না অ্যাজ ইউজ্যুয়াল। মা কে কাঁটা বেছে দিতে হয় আমার।  

ওপাশ থেকে উত্তর আসে জানি তো ম্যাম। তবে এবার আরেকটা সারপ্রাইজ দি? 

প্লিজ... 

ইয়োর ফেবারিট মালাবার স্পিনাচ ফাইনালি অ্যারাইভড। কাতলা মাছের সঙ্গে ওটা ফ্রি যাবে, সঙ্গে আড়াইশো হরিণা চিংড়ি ফ্রি। অসুবিধে নেই তো ? বাই দ্যা ওয়ে, একফালি কুমড়ো দেব কি তবে? উইকেন্ডে পুঁইশাক দিয়ে চিংড়ি চচ্চড়ি জমে যাবে ম্যাম। 

সুতনুকা ভাবেন, আমার আবার উইকেন্ড! আমি কি চাকরী করি ছাই? তবে কি করে জানলো ওরা? দিন কয়েক ধরে পুঁইশাকের জন্য বড্ড মনকেমন করছিল তার। মা ও খুব ভালো রাঁধতেন একসময়। 

হাটেবাজারের সঙ্গে কেনাকাটিতে মন ভালো করতে করতে একসময় ডিপ্রেশন একটু একটু করে মুক্তি দিয়েছিল সুতনুকা কে। ফেসবুকে ঢুকে নিজেই একটা অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলেছিলেন তিনি। প্রোফাইলের ছবিও একই আছে মানে যেটি হোয়াটস্যাপে লাগানো। মানুষ কে হঠাত করেই ভালো লাগতে শুরু করেছে তাঁর। বাবা ভুল বলতেন। বাবার কপাল সেটা। খুঁজে পেয়েছেন  ইশকুল, কলেজ, ইউনিভারসিটির কয়েকজন বন্ধু বান্ধব কে। 

বেশ কাটছিল দিন। অসুস্থ মা ঘরে। তবুও অভ্যেসে সব সয়ে গেছে। কোভিড ও বশে আছে এখনও অবধি। 

হঠাত করেই একদিন রাতে মায়ের শ্বাস উঠল। পাশে শুয়েই টের পেলেন সুতনুকা। মায়ের নাড়ী ছেড়ে দিচ্ছে। ভোর রাতে মা চলে গেলেন। পাড়ার ছেলেদের খবর দিলেন। মা কে তারা নিয়ে গেল।  সুতনুকার গাল বেয়ে দু ফোঁটা জল বেরিয়ে এল। ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নতজানু হয়ে জানালেন ধন্যবাদ। মা কে মুক্তি দিলেন তিনি। কোভিডও ধরতে পারেনি তাই  মায়ের শেষ যাত্রায় তিনিই সঙ্গী হলেন। মুখাগ্নি করলেন। 


বাড়ি ফিরে দেখেন হাটেবাজারের ডেলিভারি পড়ে আছে তাঁর দরজার সামনে। একমধ্যে কিছু অর্ডার দিয়েছেন বলে  তো মনে পড়ছে না। তাহলে? 

প্যাকেট খুলে দেখতে পেলেন একটি চিরকুটে লেখা শোকবার্তা ..মে ইওর মাদার'স সোল বি অ্যাট পিস! ওম শান্তি! ফ্রম টিম  হাটেবাজারে। 

চিরকুটের সঙ্গে এসব আবার কি? হবিষ্যির আয়োজন? সুতনুকার জন্য? আতপ চাল, মটর ডাল, সৈন্ধব লবণ, ঘিয়ের শিশি আর কাঁচকলা। ওরা জানলো কি করে? তিনি তো এখনও মায়ের মৃত্যুর কথা বলেন নি ওদের সঙ্গে। 


কোভিডের যুগে সংক্রমণের "ট্রেস দ্য পাথ" এ অভ্যস্ত শিক্ষিত মানুষজন। হঠাত মাথায় এল তাঁর। মা চলে যাবার পরেই ভোর রাতে ফেসবুকে স্টেট্যাস দিয়েছিলেন বটে। বন্ধুদের জানাতে । হাটেবাজারেও সেখানে সুতনুকার প্রকৃত বন্ধু কিনা!