১১ অক্টোবর, ২০২১

দশপ্রহরণ দেবীর দিব্যায়ুধ / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


ছবিসূত্র - আমাজন 


দুর্গা পুজোর অঞ্জলির মন্ত্রে আমরা বলি "সায়ুধায়ৈ নমঃ" । সায়ুধা ( স+ আয়ুধ) অর্থ আয়ুধ বা অস্ত্রের সহিত। 

এবার দেখি কোন্‌ কোন্‌ দেবতারা মা দুর্গাকে কি কি অস্ত্র দিয়ে "সায়ুধা"করলেন?   

  • মহাদেব তাঁর স্বীয় শূল থেকে সৃষ্ট একটি ত্রিশূল দিলেন। ত্রিশূলের তিনটি ফলা মানুষের তিনটি গুণ যথা সত্ত্ব, রজ এবং তম কে ব্যাখ্যা করে। 
  • বিষ্ণু তাঁর সুদর্শণ চক্র থেকে সৃষ্ট চক্র দিলেন। এই সুদর্শন চক্রের ১০৮ ফলা। চক্রের আবর্তন এর অর্থ হল থেমে না থাকা। হাতে চক্র থাকার অর্থ হল সমস্ত সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন দুর্গা আর তাঁকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে চলেছে সমস্ত বিশ্ব।
  • বরুণ দিলেন শঙ্খ ও নিজের পাশ থেকে তৈরী করে আর একটি পাশ। জীব জগতের স্পন্দন স্বরূপ এই শঙ্খ সৃষ্টির প্রতীক।পুরাণ মতে শঙ্খ থেকে উৎপন্ন শব্দেই প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে জীব জগতে।শঙ্খের ধ্বনি মঙ্গলময়। আবার যুদ্ধের আহ্বান জানাতে দেবী ব্যবহার করেছিলেন শাঁখ। 
  • অগ্নিদেব দিলেন আগুণ রূপ শক্তি যা জ্ঞান এবং বিদ্যার প্রতীক।তিনি প্রাকৃতিক শক্তির প্রতিভূ। মানব সভ্যতার শুরুতেই রয়েছে আগুনের মহিমা। অগ্নি আজ পর্যন্ত পূজিত হন হোমশিখায়, দেবারতির প্রদীপে। দেবীর হাতে ধরা অগ্নি এক দিকে যেমন অস্ত্র, তেমনই আবার প্রজ্জ্বলিত অগ্নি দেবীর নিজস্ব শক্তিকেও বোঝায়। শাস্ত্র মতে অগ্নি যাবতীয় ক্লেদ থেকে জগৎকে উদ্ধার করে, শুদ্ধ করে। 
  • পবনদেবতা দিলেন একটি ধনুক ও দুটি বাণপূর্ণ তূণীর। তীর ও ধনুক উভয়ই ইতিবাচক শক্তির প্রতীক ৷ মানব শরীরের অন্তর্নিহিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে ধনুর টঙ্কারে। ধনুকের সঙ্গে জুড়ে থাকে তীর যা ধনুর টঙ্কারে প্রকাশিত শক্তির ভারকে বহন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানে। ধনুক এখানে সম্ভাব্য শক্তির প্রতীক আর তীর প্রকাশিত গতিশক্তিকে বোঝায়। 
  • দেবরাজ ইন্দ্র দিলেন বজ্র ও ঐরাবত নামক স্বর্গের হাতির গলদেশের ঘন্টা থেকে ঘন্টা তৈরী করে দিলেন ঘন্টান্তর। মা দুর্গার হাতের এই বজ্র দৃঢ়তার প্রতীক। এর মাধ্যমেই জীবনে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হন মানুষ। দেবীর বাম হস্তের তুমুল ঘণ্টা ধ্বনি অসুরদের তেজকে দুর্বল করেছিল। বজ্র অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক শক্তি। দুর্গার বর্তমান রূপটির পিছনে বৌদ্ধতান্ত্রিক প্রভাব যথেষ্ট। বৌদ্ধ ব্যাখ্যা অনুসারে, বজ্র জাগতিক বন্ধন থেকে চেতনাকে মুক্ত করে।
  • মৃত্যুরাজ যম দিলেন কালদন্ড বা গদা যা আনুগত্য, ভালবাসা এবং ভক্তির প্রতীক। আবার এই গদা মানুষের মোহকে চূর্ণ করে বলে ব্যক্ত করে বিভিন্ন শাস্ত্র।
  • প্রজাপতি ব্রহ্মা দিলেন একটি রুদ্রাক্ষের মালা ও কমন্ডলু। কমণ্ডলুর মধ্যে ধৃত জল সৃষ্টির প্রতীক। শান্তির প্রতীক। 
  • দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার ও নানাপ্রকার অস্ত্র ও অভেদ্য কবচ।পুরাণে বিশ্বকর্মাকে অসংখ্য দিব্যাস্ত্র নির্মাণ করতে দেখা যায়। যার মধ্যে কুঠার একাধারে নির্মাণ ও ধ্বংসের প্রতীক। কুঠার দিয়ে কাঠ কেটে তৈরি হয় বিবিধ আসবাব থেকে শুরু করে বাড়িঘরও। সে দিক থেকে দেখলে, এটি সৃজনের প্রতীক। আবার কুঠার একটি প্রাণঘাতী অস্ত্রও বটে।
  • সূর্যদেব দেবীর লোমকূপে তাঁর তেজরাশি সমর্পণ করলেন। 
  • কালের দেবতা দিলেন একটি উজ্জ্বল ধাতব ঢাল ও প্রদীপ্ত খড়্গ। তলোয়ার বা খড়গ হল মানুষের বুদ্ধির ধারের প্রতীক ৷ যার জোরে সমস্ত বৈষম্য এবং অন্ধকারকে ভেদ করতে পারে মানুষ৷
  • দেবীর ডান হস্তে খড়গ বা খাঁড়া উদ্দত হয়ে থাকে। খড়গ হল বলি প্রদানের অস্ত্র। বলি হল, বিবেক বুদ্ধির মধ্যে নিহিত অশুভের নিধন যজ্ঞ। হিংসা, গ্লানি, ক্রোধ, অহং সহ ষড় রিপু থেকে নিজের আত্ম শক্তিকে পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া। তাই দেবীর হস্তে সজ্জিত খড়গ হল, পরম মোক্ষের প্রতীক। এই খড়গ সর্বদা উদ্দত অভয় প্রদানকারী। 
  • ক্ষীরসমুদ্র দিলেন পদ্মের মালা ও হাতে দিলেন পদ্মফুল। পাঁকে জন্মায় সুন্দর পদ্ম। তেমনই মায়ের আশীর্বাদে যেন অন্ধকারের মধ্যেও আলোর আবির্ভাব হয় সেই বার্তাই দেয় পদ্ম ফুল যা পূর্ণ চৈতন্যকে ব্যক্ত করে। দেবীকে তন্ত্রশাস্ত্র প্রকাশিত জগৎশক্তি হিসেবেই জ্ঞান করে। সেই কারণে তাঁর হাতে ধরা পদ্ম সামূহিক চৈতন্যকেই বোঝায়। 

  • হিমালয় দিলেন দেবীর বাহন সিংহকে।  
  • কুবের দিলেন একটি সুরাপূর্ণ পানপাত্র। 
  • নাগরাজ বাসুকি দিলেন একটি মহামণিশোভিত নাগহার। চেতনার নিম্ন স্তর থেকে উচ্চ স্তরে প্রবেশ এবং বিশুদ্ধ চেতনার চিহ্ন এই সাপ। সাপ হিন্দু ধর্মে কুলকুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক। যা জাগরিত হলে সাধকের সাধনা পূর্ণ হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। শাক্তধর্মে সর্পপ্রতীক বার বার ব্যবহৃত হয়। 
এছাড়াও নানাবিধ অলঙ্কার যেমন, মুক্তামালা, দিব্যচূড়ামণি, কর্ণকুন্ডল, হাতের বলয়, ললাটভূষণ, বাজু, নির্মল নূপুর, অত্যুত্তম কন্ঠহার ও সমস্ত অঙ্গুলিতে শ্রেষ্ঠ অঙ্গুরীয়। 

এইরূপে দিব্য আয়ুধে দশভুজা দেবীমূর্তি সজ্জিত হয়ে  প্রস্তুত হলেন সেই মহাসংগ্রামের জন্য। দশ হাতে ধৃত অস্ত্রগুলি বিভিন্ন ভাবে দশভুজা দুর্গার সাধনতত্ত্বকেই ব্যক্ত করে। হিন্দু অথবা বৌদ্ধ, যা-ই হোক না কেন, দেবীর এই দশপ্রহরণের আসল কাজ মানুষকে আসুরিক চেতনা থেকে মুক্ত করে ব্রহ্মাণ্ডস্বরূপ প্রদর্শন, পূর্ণজ্ঞান লাভের পথে নিয়ে যাওয়া।


কোন মন্তব্য নেই: