৩১ ডিসেম্বর, ২০০৯

হে নূতন !


কাল রাত বারোটা ;
সেন্টপলস্‌ ক্যাথিড্রালের ২০০৯ এর শেষ ঘন্টাধ্বনির
অনুরণন এখনো যেন লেগে র‌ইল কানে,
ভিক্টোরিয়ার পরী থমকে গেল কয়েক মূহুর্তের জন্যে,
সেকেন্ড হুগলী ব্রিজের সার সার গাড়ি নেমে এসে দাঁড়াল সিগন্যালে,
আলোর মালায় সাজানো পার্কস্ট্রীটে তখনো চলছে লেটনাইটের উদ্দামতা,
কোলকাতার আকাশে জমকালো ফায়ার ওয়ার্কস, বাজির শব্দ,
যেন সকলের ততপরতায় একটু তড়িঘড়ি...
বর্ষবিদায় আর নতুন বছরের আগমনীবার্তা ঘোষণা ....
আমরা সম্মোহিত ;
আমরা আবেগ তাড়িত হয়ে কুলো-বরণডালা সজিয়ে সকলে

দূর থেকে দেখি দেবশিশু আসে ছুটে নিয়ে রঙমশাল ।
খিলখিল হাসি ঠোঁটে আলোর কণা চোখের কোণে তার;
নতুন ইশারা চোখের মাঝে ভুলিয়ে দেয় কতকিছু,
ব্যথার গায়ে সুখের প্রলেপ লাগিয়ে দিল তার নরম চাহনি,
কত কান্নাহাসির দোলদোলানো স্রোতে,
অচিরেই ভেসে চলে গেল ২০০৯য়ের আবর্জনা, জঞ্জালপূর্ণ,
একখানা ডিঙিনৌকো; ক্লান্ত তার চেহারা, করুণ তার চাহনি;
নতুন ভোরের নতুন সূর্য তখনো নবদিগন্তে উদিত হয়নি
অন্ধকারের উত্সারিত আলো দিশা দেখালো,
আমরা দেখতে পেলাম ২০১০ কে উঁকি দিছে জানলা দিয়ে,
পা রাখলাম নতুন বছরের দরজার চৌকাঠে;
কত চাওয়া পাওয়ার শেষ হল,
কত বেগ-আবেগের টানাপোড়েনের পরিসমাপ্তি ঘটল ।
কত না বলা কথারা আজও গলার কাছে দলা পাকিয়ে রয়ে গেল;
আবার নতুন করে পাওয়ার প্রত্যাশায় আমরা জাগি নতুন ভোরে,
খুলে দিই পূবের বদ্ধ জানলা, জাগি নতুন ভোরে,
এক কলসী জল ঢেলে দিই চৌকাঠে, আমরা যেন নতুন যুগের ভোরে,
শেষ ট্রেন চলে গেছে কাল রাতে, আবার উঠি নতুন ট্রেনে।


২৫ ডিসেম্বর, ২০০৯

"অবতার বরিষ্ঠায়"

২০০৯ শেষের মুখে... বিগত বছরের অনেক ঘটনার মত আরো একটি ঘটনা নাড়া দিল মনকে। ক্রিসমাস ইভ বর্নময় হয়ে উঠল,নতুন করে আবিষ্কার করলাম জেমস ক্যামেরুন কে। যখন টাইটানিকের ভরাডুবির মধ্যে যে মানুষটি বাঁচিয়ে তুলেছিলেন অনবদ্য এক প্রেমকাহিনী কে সেই মানুষটি আবার নতুন করে রচনা করলেন ইতিহাস। "অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি" সেই রবীন্দ্র সঙ্গীতের সাহায্য নিয়ে বলি এক‌ই অঙ্গে এত রূপের মত অনেক কিছু পেলাম "অবতার " ছবিতে । নেই সস্তার মেলোড্রামা, নেই অহেতুক নাচাকোঁদা । নির্ভেজাল, সংক্ষিপ্ত, "একটুকু ছোঁয়া লাগা" প্রেমকাহিনী । অরণ্য-মঞ্জিলমাঝে একদল উপজাতির প্রকৃতির বুকে স্বাধীন ভাবে বাঁচা, প্রকৃতির অকৃপণ সম্পদকে আঁকড়ে ধরে স্বতন্ত্র অথচ সঙ্ঘবদ্ধভাবে জীবনযাপন এবং ঠিক তার পরেই ঘটমান বর্তমানে যা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে অর্থাত কোথা থেকে তাদের সুস্থ জীবন যাপনে এল এক ঘূর্নিঝড় ...একদল শত্রুপক্ষ চাইলো তাদের শেষ করে উদ্ধার করবে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ আর একদল মিত্রপক্ষ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে একজন প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্য দিয়ে অবিকল সেই উপজাতির মত অবতার তৈরী করে সেই জঙ্গলমহলে প্রেরণ করলো । রোবটের সাহায্য নিল শত্রুপক্ষ আর একধার থেকে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের সাহায্যে অরণ্যের সবকিছু শেষ করতে চাইলো। অন্যথায় মিত্রপক্ষ যে অবতার কে প্রেরণ করলো সে অতি অনায়সেই মন জয় করে নিল সেই উপজাতিগোষ্ঠীর ... সহজ কয়েকটি পরীক্ষায় রাজা বলে ঘোষিত হল সেই বীরপুরুষ, প্রেমেও পড়ে গেল একটি মেয়ের | নাতিদীর্ঘ অথচ মনছোঁয়া এক রোমান্স | তবে সব থেকে মনকে নাড়া দিল এই অবতারটিকে যেখানে সে একটি পূর্নাঙ্গ মানুষ, নেই তার কোনো প্রতিবন্ধকতা , তার হৃদয়ের সকল কোমল মনোবৃত্তি তে সাড়া দিল সেই অরণ্য-তনয়া । কিন্তু কি করে হল তার এই অবতারত্বে পদার্পণ? একি সত্যি সফটওয়ারের খেলা নাকি সনাতন ভারতের আদি অকৃত্তিম প্রবাদ পুরুষ শঙ্করাচার্যের "পরকায়া প্রবেশ" ? যা এই ব্রহ্মচারী প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন দক্ষিণের পন্ডিত মন্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয়াভারতী কে । নিজের আত্মিকসত্ত্বা কে এক রাজার দেহে ধারণ করেছিলেন এবং নাবালক, ব্রহ্মচারী শঙ্কর গৃহীর মত তাঁর অনভিজ্ঞ অনাবিষ্কৃত যৌনজীবনকে বুঝে সেই বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করে মন্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয়াভারতীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন | কারণ মাত্র বার বছর বয়সে সকল শাস্ত্রে তিনি পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন ঐ একটি বিষয় ছাড়া ; তিনি হার স্বীকার করতে রাজী নন অথচ সেক্স সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান নেই ; তার উপায় বার করেছিলেন যা জেমস ক্যামেরুনের সফটওয়ারের ভাষায় "অবতার" আর শঙ্করাচার্যের "পরকায়া প্রবেশ" । শঙ্কর যা পেরেছিলেন ঐশ্বরিক মায়ার সাহায্য নিয়ে ক্যামেরুন তা প্রমাণ করেছেন বিজ্ঞানের সাহায্যে। মূল কথা "আত্মা অবিনশ্বর" ঠিক যেমন ছোট থেকে আমরা শুনে আসছি কৃষ্ণের দশ অবতারের গল্প । এক এক বার এক একটি কাজের জন্য এই ধরাধামে অবতীর্ণ হন তাঁরা । ভাগবত গীতার সেই বিখ্যাত উক্তি "পরিত্রাণায় সাধুনাম বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে" আবার মনে করিয়ে দিল স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তার যৌক্তিকতা ।

১৯ ডিসেম্বর, ২০০৯

গীতাঞ্জলি শতবর্ষ পুরষ্কার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের শতবর্ষ পূর্ত্তি উপলক্ষে দ্বাদশ বেহালা ব‌ইমেলা প্রাঙ্গণে বাংলা কবিতা আর্কাইভের পক্ষ থেকে সদ্যপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ "মোর ভাবনারে" শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ রূপে নির্বাচিত হ'ল । গত ১৫ই ডিসেম্বর বড়িশা হাইস্কুলে ব‌ইমেলা প্রাঙ্গণে কবি বিষ্ণু দে-কথা সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ উপমঞ্চে ইন্দিরা মুখার্জি কে এই পুরষ্কার প্রদান করা হল।



১২ ডিসেম্বর, ২০০৯

রেখোনা আঁখিজলে



মনোরম উদ্যান, ম্যাডক্স স্কোয়ার, লিচুপার্ক যাই বলো তোমরা ।
প্রতিদিনের মর্নিংওয়াকের আর কেতাদুরস্ত সান্ধ্যভ্রমণের,
কিম্বা নিরিবিলির কিশোরপ্রেমের অথবা একান্ত আপনজনের প্রতীক্ষার বেঞ্চিপাতা;
কিছুটা গোলাপের কেয়ারি করা, কিছুটা রেলিং দিয়ে ঘেরা মরশুমি ফুল।
ঘিরে দিলেই মনে হয় প্রোটেক্টিং ইন্ডিয়া ফ্রম ইন্ডিয়ানস!
দম আটকে আসে, আবার খোলা হাওয়ায় দম নেয় অনেকে।

আমি এক অর্বাচীন! বুড়ো হাবড়াদের দলে,
তোমাদের কলরব মুখরিত এই পার্কের একপাশে, মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ ;
আজ শোকস্তব্ধ আমি !
বুঝি আমি রাত পোহালো, বুঝি যে পূবের আলো,
আমাকে তোমরা দিলে শহরের নরম মাটি, আভিজাত্যের আস্তানা
আমি তোমাদের দিয়েছি সন্ধ্যাফুলের মিষ্টি মধু,
দুপুর পাতার ঠান্ডা ছায়া, আর নিশুতরাতের স্তব্ধ মায়া ;
আমি স্বজাত্যের অহমিকা আঁকড়ে ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পার্কের এককোণে,
যেন দারিদ্রের অহঙ্কারে জর্জরিত ভিখিরী বুড়ির লোটা কম্বল সম্বল করে পড়ে থাকা ।
তবে এক লহমায় দেখে নিলে নজর কাড়ি সকলের ।
কিন্তু কথা ছিল ভেসে যাবো এই বাটে, তোমাদের কলকাকলিতে, হাসিতে,
পাখির গানেতে, পথের ধূলোতে, ধোঁয়াতে ;
আর তোমাদের খালি দিয়ে যাবো একরাশ প্রাণবায়ু,
আর হাত ভর্তি করে একমুঠো সবুজ ।

বিগত কত শতকের দোল-দুর্গোত্সব, কত মেলা, চড়ুইভাতি, সভা, মিটিং,
কত না বলা প্রেম, কত অপেক্ষার সাক্ষী হয়ে র‌ইল আমার মৌনতা !
আমি কাঁদলাম আর হাসলাম ;
জীবনপুরের পথিকের পসরা নিলাম ভাগ করে ।
আজ বৃষ্টি এসে মেশে আমার চোখের জলে, আজ শিশির এসে পড়ে আমার শুকনো ফলে,
একদিন নিষ্ঠুর নিয়তি এসে করাত চালাল আমার শরীরে, নবকিশলয় আজো আমার অঙ্গের ভূষণ ।
আমি পুরোটাই বাঁচতে চেয়েছিলাম তোমাদের মধ্যে,
আজ আমার একহাতে মুষ্ঠিবদ্ধ লোহার রেলিং আর এক হাতে আমার অঙ্গীকার !

ওগো তিলোত্তমা ! তোমার রূপের বড় অহংকার !
চেয়ে দেখ একটিবার !
আষ্টেপিষ্টে বেঁধেছি নিজেকে,
জড়িয়েছি ম্যাডক্সের মায়ায়, স্কোয়ারের কোণায়,
শুধু একটু বাঁচতে দাও আমায় !


২ ডিসেম্বর, ২০০৯

তুমি এলেনা


############################################################



ফোনটা বেজে গেল একবার, দুবার, তিন বার...
কেটেও গেল নিজে নিজে, তুমি ছুটে গিয়ে ধরলে না তো!
আমার ছেঁড়া ক্যানভাসে আমি নীরবে আজ এঁকে চলি
আমার অধরা প্রেমের মাধুরী ;
পথ আমাকে বয়ে নিয়ে চলে একঘেয়েমির রাস্তা,
সময়ের খেয়া আমাকে পার করে দেয়,
উল্টে দেয় ক্যালেন্ডারের পাতা,
প্রকৃতির ঋতুবৃত্ত সমাপ্ত হয় ঠিক সময়ে,
আমার কালের মন্দিরা আমি একলা বাজিয়ে চলি,
প্রতিদিনের রোজনামচার ফাঁকে ফাঁকে,
তুমি এসে ধরা দাও একবার করে ;
আনমনা বর্ষায়, উদাসী বসন্তে,
কখনো স্বপ্নের সূতো ছিন্ন করে ঘুম ভাঙা ভোরে,
কখনো কল্পনার ঘুঁড়ির সূতোয় রাতজাগা ঘরে,
আমি শেষ হেসেছিলাম,
যেদিন তোমার আকাশ আমার আকাশে
মিশিয়েছিল তার নীল,
আমি সাগরের সব জলটুকু দিতে চেয়েছিলাম তোমায় ;
ঘাসের সব সবুজটুকু দিয়ে হতে চেয়েছিলাম নতুন কবি,
শুধু তোমার জন্য।
ধানক্ষেতের সব হলুদটুকু জমিয়ে,
একখানা আটপৌরে শাড়ি কিনেছিলাম তোমার জন্যে,
দেওয়া হল না...
ফোনটা বেজে গেল একবার, দুবার বহুবার....

##############################################

Photograph by Ajoy De