২৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্লিজ, পজ এন্ড পার্ডন !!!

সেবারও অতিবৃষ্টি হয়েছিল । থৈ থৈ শ্রাবণের পথঘাট । উপছে পড়া জলের ভারে নদীনালা বানভাসি । গাছপালা ফুলপাতার মনে হয়েছিল হাঁফ ছেড়ে বাঁচি ।  আর চাইনে বৃষ্টি ! এবার থামবি তোরা ? মেঘ বিদায় দিবি? টুপটাপ, ঝরা বকুলও সিক্ত, কদম ঝরা সন্ধ্যে নিঝুম শান্ত  । মাটি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ছিল জলের থেকে ।   মেঘ মিনারে ফাটল ধরেছিল । বৃষ্টি কেঁদে চলেছিল অঝোরে । রোদের মুখ দেখেনি সবুজ ঘাস বহুদিন । এই বার্তা বোধহয় পৌঁছে গেছিল  বৃষ্টির দেবতার কাছে । মেঘের কাছে চিরকূট পৌঁছেছিল । তাই বুঝি বৃষ্টি এবার থেমেছে । বুকের কষ্ট চেপে রেখেছে মেঘ অতিকষ্টে । কোথায় থামতে হবে বুঝতে পেরেছে এতদিনে । প্রকৃতির এমনটি যদি প্রাণীকুল বুঝে নিত ! কোন্‌ এক অদৃশ্য মেল এসে যদি জীবজগতকে বুঝিয়ে দিত ! তাহলে না হত কোনো অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন বা মনকষাকষি ।   তাহলে সব সম্পর্কের খুঁটিনাটিগুলো নিয়ে সারাজীবন নিয়ে চলা যেত । আর সম্পর্কের কাঁটাতারের বেড়া না ডিঙিয়েও বেশ সুন্দর বেঁচে থাকা যেত ।   
এই সম্পর্কের "কাঁটাতারের বেড়া" শব্দযুগল প্রথম পড়েছিলাম জয় গোস্বামীর "জলঝারি" ব‌ইখানিটিতে। কাঁটাতারের বেড়া বড়ো ভয়ানক বস্তু।  ক্রস করতে গেলেই বিপদ । ক্রস করলে জয় হলেও হতে পারে কিন্তু জয় না করেও তো এপারেও দিব্যি কাটানো যায়। রামায়ণের লক্ষণরেখা ক্রস করে সীতার কি বিপদ হয়েছিল তা আমাদের সকলেরি জানা। কিন্তু আমরা হলাম জ্ঞানপাপী। প্রতিনিয়ত সামাজিক, রাজনৈতিক এমনকি নিজেদের আপনজনের সাথেও ডিল করার সময় সেই লক্ষণরেখা ক্রস করে যাই। ফলে নেমে আসে বিপর্যয়, মন কষাকষি, সম্পর্কের টানা ও পোড়েন। 

এখন না হয় ছেলেবুড়ো অনুপম রায়ের জন্য বলতে শিখেছে "আমাকে আমার মত থাকতে দাও"

আদতে সব মানুষেরি কিন্তু মনের কথা এটি। সে শিশু বা কিশোর, যুবক বা বৃদ্ধ সকলেই মনে মনে চায় এই স্বাধীনতা। 
 আমার ছেলে যখন খুব ছোট এক ডাক্তারবাবুর কাছে ওকে নিয়ে গেছিলাম পেটখারাপের চিকিত্সা করাতে। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন একটা দামী কথা।
-বাচ্ছাকে মানুষ করতে গিয়ে একটা কথা মাথায় রাখুন, "কেয়ারফুলি কেয়ারলেস" !
আমি বললাম -মানে?
ডাক্তারবাবু বলেছিলেন "মানে সে সারাক্ষণ কি করছে সে ব্যাপারে নাক না গলিয়ে কেয়ারফুলি তাকে আড়াল থেকে অবসার্ভ করুন কেয়ারলেস ভাবে যাতে সে বুঝতে না পারে যে আপনি ওর ওপর খেয়াল রেখেছেন।"
খুব কাজে দিয়েছিল কথাগুলো।

 শৈশব পেরোনো , কৈশোরের শিশুটিও কি চায় এমনটি? তার পড়ার টেবিল এলোমেলো, ব‌ইয়ের তাক অগোছালো। তার নিজের বৃত্তের মধ্যে একভুবন পৃথিবী আর বাইরের জগতে আপনজন। কিন্তু আপনজন তার ঐ অন্তর্বৃত্তটিতে নাক গলাতে গেলেই  বিপদ। হঠাত সদ্য টিন পেরোনো কিশোরের সেলফোনে চোখ রাখতে যান অনেক অভিভাবক। বিস্তর আর এন্ড ডি করেন সে কাকে ফোন করছে, কাকে কি মেসেজ পাঠাচ্ছে, বন্ধুদের সাথে কোথায় যাচ্ছে...এইসব নিয়ে। মানছি সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করার দায়িত্ব তাদের কিন্তু কোথায় থামতে হবে আর লক্ষণরেখা পেরিয়ে তার অন্তর্বৃত্তে প্রবেশ করব কিনা সেটা ভেবেচিন্তে করলেই কিন্তু অনেক মুশকিল আসান। সারাক্ষণ কানের কাছে কানাইয়ের বাসা যেন! মায়ের রাতে ঘুম নেই। ছেলেটা আমার কি করছে, কার সাথে মিশছে.....প্লিজ সেটা একটু দূর থেকে খেয়াল রাখুন মা, অত কাছ থেকে নয়। ছেলের সাথে সম্পর্কটা একবার খারাপ হয়ে গেলে পস্তাবেন পরে। বন্ধু হয়ে উঠুন, অভিভাবক নয়। 
ছেলে আরো বড়ো হয়ে যখন চাকরী পেল তখন তার রোজগারের টাকায় সে অহোরাত্র অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কি কিনছে জানতে চাইবার দরকার নেই আপনার। দেখবেন সে নিজে থেকেই দেখাবে আপনাকে। বারবার তার কাঁধের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে জানবার দরকারো নেই সে ফেসবুকে কার সাথে কি চ্যাট করছে। তার ক'জন গার্লফ্রেন্ড হল, তার উইকএন্ডের কি প্ল্যান, কোন রেস্তোঁরায় সে হ্যাঙাউটে যাচ্ছে সে....কি হবে আপনার নাক গলিয়ে? আপনি নিজের নিয়ে থাকুন। একটা সময়ের পর যার যার নিজের জীবন তার‌ই। বেশী প্রশ্ন করলে আপনার অপমানিত হবার সম্ভাবনাই বেশী। সেই থেকে আপনি ভুগবেন আত্মগ্লানিতে। বরং ডিনার টেবিলে একসাথে খেতে বসার সময়  একটু আধটু পুছতাছ হোক হাসিমুখে...ঠিক যেন সাপো মরলো অথচ লাঠিও ভাঙলোনা তেমন করে।  বেশী খোঁচানোর প্রয়োজন নেই। বেশী কিউরিওসিটি কিন্তু তাকে আপনার থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেবে। সে কি কখনো জানতে চেয়েছে আপনার কাছ থেকে আপনি কতবার কলেজ কেটে এ মার্কা ছবি দেখতে গিয়েছিলেন কিম্বা ইউনিভার্সিটির ক'জন ছেলেকে ফ্লার্ট করেছিলেন?  বরং আপনিও চলে যান তার সাথে হ্যাঙাউটে। জমিয়ে মুভি দেখুন, কব্জি ডুবিয়ে খান একসাথে। কিন্তু সেদিন বান্ধবীর সাথে সে বিয়ার খেয়েছিল কিনা বা রোজ রোজ পাবে যাস কেন, এসব কথা নৈব নৈব চ!  

তারপর সেই ছেলেটির টেটুম্বুর যৌবনে যখন তার সঙ্গী হয়ে এল অন্য পরিবারের একটি মেয়ে তখনো কিন্তু নিজেকে প্রতিমূহুর্তে গ্রুম করুন। 
এমনো অনেকের কথা শুনেছি স্বামী সারাদিন পর অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে তার মা পুত্রবধূটিকে অন্য কাজে পাঠিয়ে দিয়ে ছেলের সাথে গল্পগুজব করতেই থাকেন...দুটি প্রাণ খুব কষ্ট পায় তখন। মা ছাড়তে পারেননা তাঁর অধিকারবোধ। এতে কিন্তু তিনি ছেলে-বৌ দুজনের কাছ থেকেই অনেকটা দূরে সরে যান...সেটা বুঝতে পারেন না। 

নারীশিক্ষার প্রসার হয়েছে আমাদের দেশে । বালিকা আর বধূ হয় না শিক্ষিত সমাজে । শাশুড়িমাও কিন্তু শিক্ষিতা আজকের যুগে, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়ায় উভয়ই হিমশিম খান আজকের যুগেও । তার মূল কারণ কিন্তু এই লক্ষণরেখা ডিঙিয়ে অহেতুক অশান্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা।
ছেলে-বৌ কোথায় গেল, কি খেয়ে বাড়ি ফিরল অথবা শ্বশুরবাড়ির জন্য কি উপহার নিয়ে এল বিদেশ থেকে এসব জেনে আপনার কি লাভ মশাই? একবার ভাবুন তো আপনার শাশুড়ি যদি আপনাদের দাম্পত্য জীবনে এভাবে অহোরাত্র মাথা গলাতেন ভালো লাগত কি আপনার?

এবার আসি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে।  নিজেদের পারষ্পরিক বোঝাপড়ায় সম্পর্কের ঘানি টানতে টানতে ফেসবুকে আপনাদের বন্ধু হল অনেক। এবার স্বামীটির গার্লফ্রেন্ড তাকে কি মেসেজ পাঠাচ্ছে বা স্ত্রীয়ের বয়ফ্রেন্ড তার সাথে রাতে কতক্ষণ অনলাইন হচ্ছে, জানতে চাইলেই কিন্তু বিপদ হতে পারে। তার চেয়ে বলি আবারো বন্ধুতার মধ্য দিয়ে জেনে নিন কোনো দুর্ঘটনার আভাস-ইঙ্গিত পাচ্ছেন কিনা। সকলেই সকলের কমন ফ্রেন্ড হয়ে যান, রিস্ক ফ্যাক্টর কমে যাবে। আর কখনোই একে অন্যের মেলবক্সে কোথা থেকে মেইল উড়ে এল কিম্বা চ্যাটবক্সে কার মেসেজ সবচেয়ে বেশী আছে এসব নিয়ে আর এন্ড ডি মোটেও নয় কিন্তু। 
একবার এক আত্মীয়ের  বাড়িতে গেছি তার ছেলের বিয়ে উপলক্ষে। সেদিন তার বৌভাতের সকালবেলা। নবপরিণীতা বৌটির বাড়ির থেকে ফোন এসেছে। বৌটি তার সেলফোনটি নিয়ে যত‌ই আড়ালে যায়, তার শাশুড়িমাটি ছুতোয়নাতায় তত‌ই তার আশেপাশে ঘুর ঘুর করতে থাকে। আমি আর না পেরে সেই শাশুড়িমাটিকে অন্য ঘরে নিয়ে চলে এলাম এক অছিলায়। এখনতো তবু মোবাইল ফোনের যুগে। আমার বিয়ের পর আমার স্বামীকে তখন প্রায়শ‌ই অফিসের কাজে বিদেশ যেতে হত। তখন নব্ব‌ইয়ের গোড়ার দিকে মোবাইল ফোন নেই। ল্যান্ডলাইনে বিদেশ থেকে বহুমূল্যের ফোন কলটির  অপেক্ষায় থাকতাম আমি। আর ফোন এলেই সব কাজ ফেলে যেই সেই ফোনটি ধরতে যেতাম আমার দুই পিসিশাশুড়ি, জ্যেঠিশাশুড়ি সকলে সব কাজ ফেলে রেখে আমার কাছে মানে ঐ টেলিফোনটির চৌহর্দ্দির মধ্যে ঘুরপাক খেতেন।  অবশেষে আমি খুব ডিষ্টার্বড হয়ে ফোন রেখে দিতাম। 
বিয়ের সময় আমার বয়স ২৩ আর আমার স্টুডেন্ট স্বামীর ২৭।  একান্নাবর্তী বাড়ির এরা আমাকে দেখেশুনেই এনেছিলেন বৌ করে। বাড়িতে আমার শ্বশুরমশাই আর শাশুড়ি ছাড়াও ছিলেন নিঃসন্তান জ্যেঠশ্বশুর ও জ্যেঠিশাশুড়ি আর দুজন অবিবাহিত পিসিশাশুড়ি। আর ছিলেন শ্বশ্রুমাতার দিদি মানে আমার মাসীশাশুড়ি আর তাঁদের মা অর্থাত দিদিশাশুড়ি। এঁরা কিছুটা দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোল করতেন ।   আমরা ছিলাম বাড়ির মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ দম্পতি তাই কেন জানিনা আমাদের ওপর সকলেই ছড়ি ঘুরিয়ে অপার আনন্দ পেতেন সেই সময়ে মানে ১৯৮৯-৯০ সালে।  দক্ষিণের খোলা বারান্দায় দুজনে পাশাপাশি দাঁড়ালে সমালোচনা হত। অফিস থেকে তিনি ল্যান্ডলাইনে ফোন করলে প্যারালাল লাইনে কেউ একজন আমাদের ট্যাপ করত। এছাড়া অফিস থেকে তিনি ফিরলে তাঁর সামনে দাঁডানোর জো ছিলনা। আমাকে কেউ সেখানে দেখলেই তুরন্ত রান্নাঘরে খাবার গরম করতে পাঠিয়ে দিতেন। সে অফিস যাবার সময় আমার বাই করার তো কোনো কোশ্চেন নেই! নো ওয়ে!   টিফিনের সুস্বাদু খাবার খেয়ে আমার স্বামী ফোন করলেন একবার দুপুরে। কেউ একজন বললেন" যত্তসব! আদিখ্যেতা!" রবিবারের সকালে তাঁরা একজোট হয়ে মহাভারত দেখছেন। আমরা তখন আমাদের ঘরে গল্পে-আড্ডায় মশগুল। ছুতোয় নাতায় ঘরে ঢুকে  আমাদের অনাবিল শান্তি হরণ করে নিতেন। এমনকি নবদম্পতির ছুটির দুপুরে দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য ফোন করে অযাচিত অতিথিকে আপ্যায়ণ করতেও  ছাড়তেন না তাঁরা। উদ্দেশ্য একটাই আমাদের অবাধ মেলামেশায় যতিচিহ্ন টেনে দেওয়া।  আমি যেন পরপুরুষের সাথে গল্প করছি নিজের বেডরুমে বসে। আজ ভাবি তখন কেন whatsapp ছিলনা রে? শত্রুমুখে ছাই উড়িয়ে দেদার প্রেমালাপ করতে পারতি দুজনে!!! 

 সবশেষে বলি 
জীবনে এমনিতেই অনেক কমপ্লিকেশনস। তাই চারিপাশের আপনজনের সাথে বোঝাপড়াটাও একটু বুদ্ধি করে করুন। তাহলেই সকলের কাছেই আপনার ওয়ার্ম অ্যাকসেপটেন্স।
জয়জয়ন্তী সিনেমার  বিখ্যাত গানটি মনে আছে? "আমরা তো আর ছোট নেই, আর ছোট নেই, যেখানেই থাকি সেখানেই ভালো থাকব....."
সত্যি সত্যিই ভালো থাকব তাহলে ।  আর এত কথা শোনার পরেই যদি ভবি ভোলার না হয় তবে চালাও পানসি বেলঘরিয়া। ক্রস করেই ফেলুন লক্ষণরেখা, বিপদের ঝুঁকি নিয়ে। হয় এস্পার, নাহয় ওস্পার..য়া থাকে কপালে, একটাই তো জীবন, লড়ুন নিজেনিজেই, ডিঙিয়ে ফেলুন কাঁটাতারের অতিকষ্টের বেড়া। পা দিয়েই ফেলুন মনের মানুষটির, কাছের মানুষটির একান্ত আপন ঘেরাটোপের অন্তর্বৃত্তে। তবে মাথায় রাখুন 
"চলো লেটস গো" সিনেমায় রূপম ইসলামের সেই গানটি...

কাম ক্রস দ্যা লাইন,
মনের চৌকাঠ  
কাম ক্রস দ্যা লাইন
সময়ের বিভ্রাট
কাম ক্রস দ্যা লাইন
আমার হাতটা ধরো
কাম ক্রস দ্যা লাইন  
তুমি চাইলেই পারো ।  


প্রকাশিত কলকাতা ২৪x৭  

২২ ডিসেম্বর, ২০১৬

আমার ইলশে স্মৃতি

   টিপটিপ, টুপটাপ, ঝমঝম, ঝিরঝির... অপেক্ষার অবসান, বর্ষা এসেছে। আবার এসেছে আষাঢ় আমাদের শহরে। মেঘকালো করা সকালে মন বলে আয় কবিতা লিখি, উজাড় করি ফেসবুকের দেওয়ালে বৃষ্টিকাব্য। ওদিকে রান্নাঘর ডাকে আয়, ছুটে আয় । টেষ্টবাড গুলো লকলক করে বলে খিচুড়ি আর ইলিশমাছ ভাজা। 
ইলিশমাছের গন্ধে ভাতের খিদে একধাপ বেড়ে যায়। ভাত খেয়ে ছুটির দিনে দিবানিদ্রা কিম্বা অলসদুপুরে মাছের স্তুতিগান, এও বাঙালীর আরেক রসনা। মনে হয় কি এমন স্নেহ আছে এই ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডে? যার মোহে ইলশে পদ্যরাও ধরা দেয় ইলশেগুঁড়ির সাথে। বলে উঠি নিজের মনে 

ভাই ইলিশ, তুই খলবল কর জলে,
বড় হয়ে ওঠ, তারপর আয় দেখি !
রান্নাঘরে সর্ষে বাটি,  নুন-হলুদ-তেলে
জমিয়ে রাঁধি, তোকে ভাপাই লঙ্কা দুটি ডলে;

ভাতের হাঁড়ির মুখে কৌটো বন্দী ইলিশভাপা
নরম চালের গরম ভাতে মাছের কৌটো চাপা ।
সরষে ঝাঁঝে পরাণ গেল ইলিশ ম’ল দুখে
বেজায় কাঁটা, রূপোর মাছে  তবুও খাব সুখে ।

 কথায় বলে হালকা হাওয়া দেবে, ঝিরঝির করে অবিরাম ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেই থাকবে আর ঠিক তখনি ঝাঁকেঝাঁকে গভীর জলের এই ইলিশমাছ সমুদ্রের নোনা জল সাঁতরে, জোয়ারের অনুকূলে স্বল্প পরিশ্রমে,   নদীর কাছে আসবে, আমাদের ধরা দিতে। 
ছোটবেলায় সবচেয়ে মজা ছিল  রেনিডেতে  হঠাত ইলিশের গন্ধটা। হঠাত ছুটির সাথে বৃষ্টি আর হঠাত পাওয়া ইলিশের অনুষঙ্গে মন কানায় কানায় !
মায়ের সারপ্রাইজ। উনুনের পিঠে হাঁড়ির মধ্যে গরম ভাত আর তার মুখে চাপা দেওয়া একটা টিফিনকৌটোর মধ্যে বন্দী ইলিশমাছের ভাতে বা ভাপা । হলুদ পড়বেনা এই পদে।টাটকা মাছের গন্ধ নষ্ট হয়ে যাবে।  কৌটোর মধ্যেই নুন মাখানো ইলিশের গাদা-পেটি সর্ষে, কাঁচালঙ্কা বাটা, কাঁচা সর্ষের তেল আর বেশ কয়েকটি চেরা কাঁচালঙ্কার সাথে জারিয়ে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে মিনিট দুয়েক রেখে দিলেই এই অমূল্য পদ তৈরী।  আমার রন্ধন পটিয়সী দিদিমা তার বিশাল সংসারে বিরাট এক হাঁড়ির মুখে বিশাল এক কচুপাতার মধ্যে মাছগুলিকে ম্যারিনেট করে পাতাটি সুতো দিয়ে বেঁধে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে রাখতেন। মা বলত, সে ভাপা ইলিশের নাকি অন্য স্বাদ। দিদিমার নাতনী মানে এহেন আমি একটু ইম্প্রোভাইজ করে এই কায়দাটি করি লাউপাতায় মুড়ে এবং ননস্টিক প্যানে অর্থাত পাতুড়ির স্টাইলে। যাই করো এ কানুর তুলনা নেই। কাঁচা তেলঝাল, ভেজে ফোড়ন দিয়ে ঝাল, গায়ে মাখামাখা হলুদ সর্ষেবাটার ঝাল, বেগুন দিয়ে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বাঙালদেশের পাতলা ঝোল...সব‌ই যেন এই বর্ষায় দৌড়তে থাকে গরম ভাতের সঙ্গে। 
ইলিশমাছের কথায় মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। আমার বাড়ী গঙ্গার ধারে। বর্ষা এলেই  মোটা, কালো, দশাশয়ী চেহারার এক  হিন্দুস্তানী বুড়ো ধবধবে পোষাকে "হিলিস মাছ গোঙ্গা'  বলে চিল চীত্কার করতে করতে আমাদের পাড়ায় ঢুকত  । বুড়োটা কুচকুচে কালো । দুকানের কালো লতিতে  সোনার চকচকে মাকড়িটা দেখতে বড্ড ভাল লাগত । সে বাড়ির সামনে এলেই আমরা ভাইবোনে মিলে মাকে ধরে এনে ইলিশমাছ কিনিয়েই ছাড়তাম । ইলিশ মাছ আমাদের দুজনেরি ভীষণ প্রিয়।  সেই হিন্দুস্তানী মাছওয়ালা শীতকালে সন্ধ্যের ঝুলে গান ধরত, "বাদাম ভাজা খাইও, আউর ভুখে গুণ গাইও, ইয়ে ঝাল বানানেওয়ালা, ইসমে নমক ডালা হুয়া ...... ইয়ে গরম মুমফালি-ই-ই-ই " 
তখন বুঝতামনা শীতকালে বাদাম আর বর্ষায় ইলিশের কেমিস্ট্রিটা । মা বলেছিল, শীতে ইলিশ পাওয়া যায়না তাই পেট চালানোর জন্যে বাদাম ভাজতে হয় তাকে।
বাবার মুখে শুনেছি বিস্ময়কর ইলিশ উপাখ্যান। বাবা বলেছেন,
" প্রতিবছর বর্ষা শুরু হলেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি মাথায় করে চানে বেরোতাম ছুটির দিনে । যাবার সময় মা চার আনা পয়সা দিয়ে বলতেন নদী থেকে সদ্য ওঠা ইলিশ মাছ কিনে আনতে । সেই চার আনাটিকে অতি সন্তর্পণে ট্যাঁকে গুঁজে ঝাঁপিয়ে পড়তাম জলে । মাঝ নদীতে সাঁতার কেটে গিয়ে যখন মাছধরার জেলের নৌকো দেখতে পেতাম তখন উঠে পড়তাম নৌকায় । চার আনা পয়সা দিয়ে ইয়া বড় এক ইলিশ কিনে নৌকায় করে আবার ঘাটে ফিরে এসে বাড়ি যেতাম নাচতে নাচতে ।
পরবর্তী আকর্ষণ ইলিশের ভোজবাজি । যা দেখাতে  সিদ্ধহস্ত ছিলেন আমার মাতাঠাকুরাণী ।  এখন সে বড় ইলিশও আর নেই আর নেই সেই দামও'

প্রতিবছর আমার ছোটপিসিমা আসতেন বিহারের দ্বারভাঙা থেকে। বাবা তাঁর আবদারে দুটি বড় বড় ইলিশমাছ কিনে আনতেন। মা তাঁর ননদিনীর জন্য আহ্লাদে আটখানি হয়ে বঁটি নিয়ে বসে পড়তেন সেই মাছ নিজে কাটতে। জলে ধুয়ে নিয়ে এই মাছ কাটার রীতি নয়ত স্বাদ নষ্ট হয়। তারপর সেই মাছ একটি হাঁড়িতে করে নুন, হলুদ দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখা হত। পিসিমা তা নিয়ে মহানন্দে ট্রেনে উঠতেন। বিহারে ইলিশমাছ অপ্রতুল আর পিসিমা ইলিশের বড়‌ই ভক্ত। তাই এরূপ ব্যাবস্থা। এর দিন দশেক পর একখানি পোষ্টকার্ডে সেই ইলিশের জয়গান করে বার্তা আসত পিসিমার কাছ থেকে। টাটকা ইলিশ নাকি একরকম আর এই নোনা ইলিশ নাকি আরেক রকম। অনেকদিন রেখে খাওয়া যায়। 
বিশ্বে ইলিশমাছের সর্বোচ্চ উত্পাদন নাকি হয় বাংলাদেশে। কিন্তু একবার বিদেশ থেকে বাংলাদেশ হয়ে ফিরছিলাম।ভেবেছিলাম সত্যি পদ্মার ইলিশের স্বাদ নেব ভাগ করে।  ট্রানজিট ভিসায় দুপুরবেলা ঢাকার  একটি বেশ উচ্চমানের হোটেলে গিয়ে শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা দুপুরে ইলিশ মাছ চেয়ে পাইনি। তার বদলে বাঙালীর "চিলি চিকেন'  খেয়ে পেট ভরাতে হয়েছিল। 
বহুবার বাঙালবাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়ে সরস্বতী এবং কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোতে জোড়া ইলিশের পুজো দেখেছি । ধানদুব্বো, তেল-সিঁদুর মাখিয়ে বরণ করে নতুন শাড়ি পরিয়ে  জোড়া ইলিশের পুজোর পর জমিয়ে ইলিশমাছ ভোগ দেওয়া হয়।  আগে বলা হত সরস্বতীপুজোর দিনে শুরু আর ঐ লক্ষ্মীপুজোর দিনে শেষ । মধ্যিখানে আশ্বিন থেকে মাঘ অবধি আর ইলিশ খাওয়া যাবেনা। এর বিজ্ঞানসম্মত কারণটি হল মাছকে সংরক্ষণ করা । মাছকে আকারে বাড়তে দেওয়া।বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠের মধ্যে যুবতী থেকে গর্ভবতী হয়ে তবে সে বর্ষার জল পেয়ে নধর হবে। আর গুটিগুটি সেই পোয়াতি মাছ সাঁতরে সাঁতরে জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা জল থেকে  যত নদীর দিকে এগিয়ে আসবে তত তার শরীর থেকে আয়োডিন আর নুন ঝরে ঝরে মিষ্টতা বাড়বে। সেই অর্থে ইলিশ হল পরিযায়ী মাছ।মরশুমি সজীব শস্য। বর্ষার বিশেষ তিথিতে ধরা দেয়। বাকী সময় থাকে গভীর জলে। তখন তার মনের তল পাওয়া দুষ্কর। এইসময় সে খায় বিশেষ ধরণের জলজ শ্যাওলা। খেতে খেতে যত বাড়তে থাকে তত সে পুষ্ট ও নধর হয়। রূপে লাবণ্যে থৈ থৈ তার গর্ভিণী যৌবন যেন স্নেহ পদার্থের আধিক্যে ঢলঢল হয়। সেই বিশেষ ধরণের স্নেহপদার্থ বা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড সব মাছে থাকেনা তাই বুঝি ইলিশের এত কদর, অনন্য স্বাদ । হৃদরোগী থেকে ছোট শিশু সকলেই খেতে পারে এই মাছ। 

আজকাল খোকা ইলিশ ধরে নেওয়া হয় বলে আগেকার সেই বড় ইলিশের রমরমা নেই অন্ততঃ কলকাতার বাজারে। আর পাওয়া গেলেও তার দাম আকাশছোঁয়া। তাই বলতে ইচ্ছে করে  

অধরা এই জলজ শস্য, রূপোলী রঙের রূপসী পোষ্য
খেতেন পিতামহরা তস্য, পরিবেদনা কা কস্য !
খাচ্ছি যদিও চর্ব্যচূষ্য, তবুও অধরা বর্ষাশষ্য !   

 মনে পড়ে যায় রবিঠাকুরের গান "মেঘ বলেছে যাব যাব, রাত বলেছে যাই......'  এই যাই যাই করতে করতে বর্ষাও ফুরিয়ে যাবে আমাদের । আবারো  হাপিত্যেশ করে বসে থাকা পরের বছরের তরতাজা ইলিশের জন্যে।

আমার ঠাম্মা ছিলেন সাতখীরার মেয়ে। উনি বলতেন বর্ষার ক্ষুধামান্দ্য কাটাতে, ডিপ্রেশান কাটাতে ইলিশের জুড়ি নেই। তিনি ছিলেন রসেবশে ৫০% বাঙাল ও ৫০% ঘটি। তাই ছ্যাঁচড়া, অম্বল, কচুশাক দিয়ে ইলিশমাছের সব পদ‌ই সমান তালে রাঁধতেন জমিয়ে। আর বলতেন, যতদিন না দুগ্গাপুজো আসছে বর্ষায় হয় দুগ্গারুচি। দুর্গার জন্য উতলা, পুজোর জন্য এই পথ চাওয়ার প্রতীক্ষা আর একঘেয়ে খাওয়াদাওয়ার অরুচির দাওয়াই হল ইলিশ মাছ। এখন শুনছি ডাক্তারবাবুরাও এইকথা বলছেন....."যতদিন পারুন এই মাছ খেয়ে নিন। এ হল সোনার গৌর। একবার ছেড়ে দিলে আর পাবেন না। হৃদমাঝারে লালন করুন একে। হার্ট ভাল থাকবে, মন ও ভাল হবে' । 

কয়েকবছর আগে গঙ্গাবক্ষে এক ইলিশ উত্সবে গান গাইবার সুযোগ পেয়ে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম এই রূপোলী শস্যবিলাসে। 
সেদিন ছিল শ্রাবণের ঘন মেঘাচ্ছন্ন সকাল। কখনো ইলশেগুঁড়ি কখনো ঝমঝম বৃষ্টি । কেউ মিলেনিয়াম পার্ক, কেউ কয়লাঘাটা, কেউ আবার বাবুঘাট থেকে এসে সোজা জমায়েত হল ঐ জেটির কাছে।  স্টীমারে উঠে পড়লাম আমরা। স্টিমারের নীচে ইলিশমাছ ভাজার গন্ধে ম ম করছিল আশপাশ। আমরা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম। শুরু হল ঘাট পরিক্রমা আর সাথে লোকগান, বর্ষার কাজরী গান, বাউলগান ।  চোখ রাখতে থাকলাম গঙ্গার দুপাশের ঘাটে। কোনোটি ভগ্নপ্রায়, কোনোটি নিয়মিত সংস্কারের ফলে সেজেগুজে, বর্ষার জল পেয়ে ঝকঝকে ।  কোনোটি আবার ভেঙেচুরে   নিশ্চিহ্ন। মনে হল  বর্ষা, বৃষ্টি, ইলিশমাছ আর গঙ্গা এই অনুষঙ্গগুলি বাঙালীর প্রাণের। কিন্তু সেই গঙ্গার ঘাট আর সেই ইলিশের স্বাদ আজ আর অবশিষ্ট নেই  । সেটাই বড় কষ্টের। ছোট ছোট মাছগুলিকে ধরে ফেলার নিষেধাজ্ঞা কেউ মানছেনা। গঙ্গার ঘাটগুলিরও সংস্কার প্রয়োজন। নদীর নাব্যতা নিয়েও সংশয় রয়েছে।  তবে কি ইলিশও অবলুপ্তির পথে?  এই দোলাচলে বাড়ি ফিরে শান্তি পাইনি। তারপর বছর তিনেক কেটে গেছে। গঙ্গা ও ইলিশ দুইকে বাঁচা তে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ দেখলাম কি আমরা? গঙ্গাই তো সুস্বাদু ইলিশের ঘরবাড়ি। গঙ্গার জলেই তার সঙ্গীর সাথে প্রতিনিয়ত মৈথুন, জীবনযাপন ও সহমরণ । তবুও বাঙালীর কোনো হেলদোল নেই।  


অবসর ( তথ্য ও বিনোদনের ওয়েবসাইট )

২০ ডিসেম্বর, ২০১৬

শীতকালীন জার্নাল



পিকনিক-১








তুণীর বাসে উঠেই চটপট সকলের মাথা গুণে নিয়ে বলল মোট বত্রিশ জন আমরা। গুণ গুণ করে উঠল নিজের মনে ...একদিন দল বেঁধে কজনে মিলে... এবার  দেখি তো তোরা ক'জন জানিস "পিকনিক" শব্দের অর্থটা।
অঙ্কিতা বেশ সচকিত হয়ে জবাব দিল, চড়ুইভাতি।
বিপাশা বাসের কোণা থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠল বনভোজন।
তুণীর বলল ওটা তো প্রতিশব্দ বাংলায়। পিকনিক শব্দটার উত্সটা জানিস কেউ?
তিতলি বলল, জানতাম একটা ফ্রেঞ্চ শব্দ।
তুণীর অমনি বলল, স্পেলিং বল দিকিনি । 
তিতলি সপ্রতিভ হয়ে জবাব দিল, picque-nique। 
এবার মানে বল দেখি। তুণীর বলল।
তিতলি আমতা আমতা করে বলল, ফার্স্ট পার্ট picque মানে pick আর সেকেন্ড পার্ট nique মানে ? 

তিতলি বলল, ঐ আর কি, টুকটাক তুলে নিয়ে মুখে পুরে দাও যেখানে, তার নাম‌ই পিকনিক। 
অঙ্কিতা আর বিপাশা বলল, তোরা কত কিছু জানিস রে!
অতএব খাওয়াটাই পিকনিকে প্রধান। আরেকটা হল বাড়ির বাইরে। সেটা রান্না করেই নিয়ে যাও সকলে মানে যাকে বলে পটলাক অথবা গিয়ে রান্না করে খাও, আক্ষরিক অর্থে বনভোজন যাকে বলে। তুণীর বলল।   
আগে ছিল নিজেরাই হাত পুড়িয়ে খাওয়া। কি ভাগ্যিস এখন কেটারার সঙ্গে যায়! তিতলি বলে ওঠে। একদিন আউটিং এ যাও, আবার রান্নার যোগাড় দাও। এখন টোটাল ব্লিস বস্‌! 
তবে যাই বল বাপু, কাঠকুটো জ্বেলে মাংসের ঝোল আর ভাত রান্না করবার মজাটাই ছিল অন্য রকমের। অঙ্কিতা বলল। 
বিদিশা বলল, একটা ছুটির দিন শনিবার, আবার পিকনিকের জোগাড়? রক্ষে করো বাপু!

সেদিন ছিল সোনা রোদ গলে পড়া এক শীতভোর। সেদিন ছিল নদীর জলের ঠান্ডা ভোর। কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে পোষের পিঠে চড়ে রোদ এসে নেমেছিল গড়চুমুকে। হাওড়ার মৃগদাব গড়চুমুকে। তূণীর এন্ড কোম্পানির চড়ুইভাতির সকাল তখন বনভোজনের দেশে পাড়ি দিয়েছিল । সাদাসাদা ফুলকো লুচি আর নতুন আলুর সাদা চচ্চড়ির গন্ধে মাত গড়চুমুকের নদীর ধার। সেক্টর ফাইভের একদল টেকি  গিয়ে হাজির হল নদীর ধারে । শীতের সব অনুষঙ্গ যেমন নলেনগুড়, কমলালেবু, মটরশুঁটি, লেপ-বালাপোষ, পশমিনা-পুলওভার নিমেষে উধাও চড়ুইভাতির আনন্দে। হফতা ভর কাজের চাপে শীত ফুরায়। ভাবতে ভাবতেই দোল ফুরোয় । অমৃত কমলার মিঠে রোদ, উলকাঁটার দুপুর গড়িয়ে যদি চৈত্র এসে যায়? তার আগেই চল প্ল্যান করি, তূণীর হল অফিসের পিকনিক প্ল্যানার।
এখন শুধুই শান্তি জলের ধার। শুধুই শান্তি নীল আকাশ। নীল আকাশ গিয়ে চুমু খেয়ে নিল দামোদরের পাড়কে। নদের জল উছলে উঠল ছলাত করে। সকলে একটু ছুঁয়ে নিল নদের পাড়ের ক্যাসুরিনার নুয়ে পড়া সবুজ পাতা ভরা ডালকে। ডিজিটাল ক্লিকে মুখর হল আশপাশ। এখানেও সেই পোষমাস। যা এসেছিল  আমাদের শহরেও। এখানেও সেই শীত ছিল যা ছিল আমাদেরো। এখানেও পারদ নামে প্রতিবারের মত। শীত আসে, শীত যায়। চড়ুইভাতি ফুরিয়ে যায়। সকলেই  পরিযায়ীর মত ঘরে ফিরে যায় । শীতঘুমিয়ে ফুরিয়ে যায় শীত।
ভাগীরথী ও দামোদর মিশেছে হাওড়া জেলার গড়চুমুকে। ৫৮ গেট বলে জল ধরে রাখার ও ছাড়ার বিশাল স্লুইসগেট। ডিয়ারপার্ক। জমপেশ উদরপূর্তি, গানের লড়াই, কুইজ,খেলা । সবমিলিয়ে শীতের অমৃত কমলার দুপুর জমজমাট!

পিকনিক-২ 


 
"আপ্‌কো কিতনা বার বোলা থা, জলদি আনেকে কে লিয়ে? হমলোগ ব্রেকফাস্ট খায়েঙ্গে ন'বাজে। যাইহোক অব স্টার্ট তো কি জিয়ে।" গাড়ী ভর্তি লোকজন বন্দনাদির হিন্দি শুনে হাসিতে ফেটে পড়ল।   সাড়ে আটটায় ছাড়ল টাটা উইঙ্গার। সদলবলে ব্যান্ড মাষ্টার চললেন পাঠচক্রের সদস্যাদের নিয়ে। সিনিয়ার সিটিজেনরা সবেতেই বিরক্ত, অধৈর্য বুঝি! মনে মনে ভাবলেও পরক্ষণে গাড়ি ছাড়তেই তাদের মুখে স্বর্গসুখ যেন।

সাদার্ণ এভিনিউ আসতেই গাড়ি বাঁদিকে ঘুরছে। কেন? কেন আবার? ডানদিকে ফলতা যদিও কিন্তু ডায়মন্ডহারবার দিয়ে গেলে "গঙ্গাসাগর মে হমারা গাড়ি পাকড় লেগা" মতলব? বারুইপুর, আমতলা ঘুমকে জানা হ্যায়। তার মানে? কড়াইশুঁটির কচুরী-কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা দিয়ে আলুর তরকারী, চা, নলেনগুড়ের সন্দেশ ভোগে? পেছনের সিট থেকে প্রবাসী শুভশ্রীদির হুঙ্কার শিট্‌! আমার বাঁদিক থেকে মনীষামাসীর অনুযোগ...আপনার তো বোলনা চাহিয়ে থা! ডান দিক থেকে বন্দনাদি তখন তারস্বরে গেয়ে চলেছে..." আমার পরাণো যাহা চায়....তুমি তাই...." অমিতামাসী বলে উঠল, তুই চুপ্‌ করবি বন্দনা? আমার মাইগ্রেন শুরু হয়ে গেল। বাড়ি থেকে শুধু এককাপ চা খেয়ে বেরিয়েছি আমি" আবার শুভশ্রীদি রোদচশমাটা মাথার ওপরে তুলে বলে উঠল, ডিসগাস্টিং! দিস ইস কলকাতা! ব্যান্ড মাষ্টার তখন ড্রাইভারের সাথে বলে চলেছে একনাগাড়ে... এডভান্স লেনে কা টাইম মে ইয়ে মালুম নেহি থা? বলতে না বলতেই হুশ্‌ করে গাড়ি এসে পড়ল। ড্রাইভার বলে কিনা উতর যাইয়ে! হমারা গাড়ি নেহি হ্যায়! মালিকনে বাতা দিয়া....ব্লা, ব্লা, ব্লা....তখন উনি মানে আমার হিরোটি বলে উঠলেন

" অগর হমলোগ উতর জায়েঙ্গে তো আপ জিন্দা নেহি ঘর পৌঁছেঙ্গে....." উরিব্বাস! একদম অক্ষয়কুমার মার্কা ডায়লগ! পেছন থেকে মিসেস বালসারা তো ভয়ে, কুঁকড়ে অস্থির।
তাদের আরেকটি প্রাইভেট কার তখন ফোন করে বলেই চলেছে, এই শোনো,  আমরা না ডায়মন্ডহারবারের পথ দিয়েই চললাম...কচুরিটা না ফাটাফাটি খেলাম।

এক মাসীমা সেই শুনে বলে উঠলেন, তো? আমরা যাবার আগেই কচুরি খেয়ে নিলি?
 ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের আদরের পিকনিক স্পট ফলতা এসে পড়ল।

ফলতা আসতেই আরেক মাসীমা  বলে উঠলেন, "ইতনা সংকীর্ণ গলি মে কিঁউ ঘুসা?"
আর বাকীরা হেসে কুটি আর পাটি।

এই করতে করতে অবশেষে ফলতা পৌঁছে ওনাদের যেন মনে হল বিশ্বজয় করেচেন । কে যেন গাড়িতে বলছিলেন তাঁর অম্বল হয়েছে। কার যেন গ্যাসের ব্যাথাটা বাড়ছিল। কেউ একজন মাইগ্রেনে কষ্ট পাচ্ছিলেন। আর ব্যান্ড মাষ্টারের  টেনশনযুক্ত এহেন মনের অবস্থা, পেটের ভিতর ছুঁচোবাবুর ডন-বৈঠক দেওয়া....সবকিছুর আগুণে জল পড়ল। গঙ্গার ধারে টেবিল পাতা লোকনাথ রেসর্টে কি ভালোই আয়োজন করেছিল তাদের কলকাতার ঠাকুর(ওরফে কেটারার)..টোপা টোপা, পুর ঠাসা, বটলগ্রীন রংয়ের কড়াইশুঁটির কচুরী পেয়ে মুখে সব কুলুপ এঁটে বসে গেল চুপচাপ। ঝগড়া তখন মাথায়। গাড়ির কাজিয়া রণে ভঙ্গ দিয়েছে ততক্ষণে। তাপ্পর ছোট ছোট জগদীশবাবুর বাড়ি দেখতে।
আঃ মলো যাঃ! বোস ইন্সটিট্যুটের সরকারমশাইরা তাদের ঢুকতে পর্যন্ত দিলনি! বজ্র  আঁটুনি সেথায়।
আমরা এতোই অছ্যুত! শুভশ্রী দি তো বলেই বসলেন।
তা বাপু তোরা সব তোদের মত সব গেম খেলার ব্যবস্থা কর দিকিনি। সিনিয়ার একজন বললেন। হাই টেম্পো তাঁর।
তারপর বন্দনার ফোনে লাইভ কমেন্টারি...
 সিনিয়র সিটিজেন মাসীমাদের স্মৃতিতে শান দি‌ইয়েচি বাপু...মেমারি গেম খেলিয়েচি, ক্যুইজ হল, ডাম্ব-শারড, হাউজি, ছোট্ট ক্লু থেকে  ৫ মিনিটে পাঁচ লাইনে অণুগল্প, সব করিচি। খেলতে খেলতে সেকেন্ড রাউন্ড চা আর পকোড়া এল। মাসীমাদের কি খুশি! তাপ্পর হেব্বি লাঞ্চ করিচি...মেইন কোর্সে দ‌ইমাছে আখাম্বা কাতলা ছিল আর চিকেন চাঁপ। ও হ্যাঁ, মধুরেণ সমাপয়েত আমসত্ত্ব-আলুবখরার চাটনী আর নলেন গুড়ের রসোগোল্লা!
জেরিয়াট্রিক এই মহানগরে এই মানুষগুলি ব্যান্ডামাস্টারের বড্ড ওয়েল উইশার। এরা বছরের এই একটি দিন বসে থাকেন তার  মুখ চেয়ে। কবে সে একটু নিয়ে যাব এদের পিকনিকে!

পিকনিক-৩


 

এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার রায়পুর। গঙ্গার ধার, মাঘের শীত বাঙালীর তসরে, পুলওভারে, টুপিতে, পশমিনা চাদরে। কনকনে হাওয়া, মিঠে রোদে ভেসে যাওয়া সকালে বনভোজন। কলেজের প্রফ দের বার্ষিক পিকনিক  ! কেউ লেট করতে করতে অবশেষে আরও কিছুকে তুলে নেয়  লাস্ট  গাড়িতে। তারপর চারটে গাড়ির কনভয় অবশেষে নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছয় । ফুলকো ফুলকো লুচি আর কড়াইশুঁটি দেওয়া সাদা আলুচচ্চড়ি।
" সারাবছর আমরা এইদিনটার জন্য মুখিয়ে থাকি স্যার"  ডাব কেটে দিতে দিতে অফিস বেয়ারা বলে ওঠে।  তারপরেই ডাবের জল আর ভদকা কিম্বা পাতি বিয়ার।সঙ্গে শীতসব্জীর পকোড়া, চিকেন পকোড়া আর রুইমাছ ভাজা। নদীর ধার দিয়ে ডিঙিনৌকায় চলে মাছওয়ালা....
" কি মাছ আছে?”  উত্তর এল খোকা ইলিশ।
" খেলবনা " 
" কেন ম্যাডাম?”
" ধরেছো কেন?”
" কি খাব? আপনারা কিনলে একটু রোজগার হয়, ভালো দাম পাব, এই দেখুন, একদম লড়ছে, ডিম হয়নি।কুমারী ইলিশ। আজ যেকটা ধরেছি সব আপনাদের দি‌ই তবে?”
বললাম, " কথা দিতে হবে, আর ধরবেনা।"

" এই শীতকালেই তো পিকনিক পার্টির রমরমা, তারপরেই হাতখালি। কিছুই নেই বাংলায়। ছেলেপুলেদের পড়াশুনো করিয়েও লাভ নেই । চাকরী কই? অগত্যা মাছ ধরেই বেচি। তারপর অসুখবিসুখ, নৌকো মেরামতি, ঘরের খড়, জমির ধান, মেয়ের বিয়ে...কোথায় যাই? মাগঙ্গার সাথেই ওঠবোস, গঙ্গার কাছেই সারাদিন মিনতি জানাই, শরীল থাকতি নিয়ে নাও মা "

মাছ ছিল সর্বসাকুল্যে এককেজি দুশো গ্রাম। তাই স‌ই। কেটেকুটে খাবি খাওয়া মাছভাজা সকলেই খেল চেটেপুটে। মন মানলোনা। কামড় দিয়েই মনে হল হায়রে দারিদ্র্য! কোথায় মাগঙ্গা! কোথায় সেই ছোটবেলা? এককিলোর কম ইলিশ আমরা চোখেই দেখিনি। জেলেটির কথাগুলো‌ও তো ফেলতে পারিনা। খোকা ইলিশ ধরা বন্ধ করা হল কিন্তু এই জেলেটির সেদিনের ভাত কে জোটাবে? তবুও তো পেল পাঁচশোটা টাকা। এরপরেই সবশুদ্ধু নৌকাবিহার। ম্যাডামদের হাতে ডাবেরজল মিশ্রিত ভদকার গ্লাস, স্যারেদের হাতে বিয়ার আর পেপার ন্যাপকিনে মোড়া গরম ভেজ পকোড়া আর মাছভাজা.....কত গান,কত কবিতা আর  কত ফূর্তি ! ভেসে গেলাম গঙ্গাবক্ষে নৌকায় টানা একটা ঘন্টা । কনকনে উত্তুরে হাওয়ায় আমাদের শাল-দোশালা, জ্যাকেট, সোয়েটার টুপি, মাফলার আরো কতকিছু শীত অনুষঙ্গে মাঘী শীত জমে দৈ!
যথাসময়ে গরম ভাত আর মাটনকারিতে ভরাপেটে আবার ভরা মানে তেলা মাথায় তেল বা Carrying Coal to New Castle । তারপরেই জয় মা বলে গঙ্গার ধারে ভাসাও থার্মোকলের থালার তরী! পরপর গঙ্গার ধারে পিকনিক স্পট। পিকনিক স্পটের মালিক পয়সা নিয়েছে। রসিদ দিয়েছে। কিন্তু কোনো ট্র্যাশ ফেলার জায়গা নেই।
মাননীয় সরকারী অফিসাররা, আপনারা কি নৌকাবিহারে যান? তবে দেখে আসুন গঙ্গার ধারের আবর্জনাগুলো। এখনো কত জাহাজ চলে এই গঙ্গায়। এখনো কত জল, কত সুন্দর তার রূপলালিত্য! আজও  ডিজিটাল ক্লিকে মুখর হয়  নৌকাবিহার, গঙ্গার বিস্তীর্ণ দুপার, রঙ্গীন জাহাজ।, পালতোলা নৌকা।

পিকনিক-৪

 

এবার কাকভোরে বেরিয়ে হাজার ঘড়ি গ্রামের কুমোরপাড়ায়। বাড়ীর কাজের মেয়ের পিকনিকের নেমন্তন্ন বলে কথা! দক্ষিণবাংলার নদীমাতৃক অঞ্চল। আরো কিছুটা এগুলেই সমুদ্রের নোনা জল আর বালিয়াড়ি দেখা যাবে । গ্রামবাংলা অনেকটাই শহুরে হয়েছে নগরায়নের দৌলতে। অরণ্যমেধ যজ্ঞের সামিল হয়ে । কিন্তু গ্রামবাংলার মানুষের সেই দারিদ্র, সেই অতিবৃষ্টির জন্য বানভাসি ঘর দুয়ার অথবা খরায় বৃষ্টির হাহাকারে ধান লাগাতে না পারার কষ্ট রয়েই গেল । যারা পারল তার মধ্যে থেকেই পালিয়ে গেল চেন্নাই অথবা হায়দ্রাবাদে কিম্বা ব্যাঙ্গালোরে, যা হোক একটা চাকরী নিয়ে আর যারা নিতান্ত‌ই সাদাসিধে, অল্পে সন্তুষ্ট তারা পড়েই থাকল বদ্বীপের ফাঁকে অধঃক্ষিপ্ত নাগরিক হয়ে । পঞ্চায়েত আপিসে হানা দিল। পার্টি আপিসে দৌড়ালো অথবা ভোটও দিল কথামত ঠিক সময়ে, সঠিক চিহ্নে । তবুও তাদের উত্তরণ হলনা । তারপর চল বৌদি, মন্দিরে। একাদশ শতাব্দীতে তৈরী অতি প্রাচীন একটি মন্দির দেখতে যাওয়া  ।
 মন্দিরের নাম জটার দেউল । স্বয়ংভূ শিব মন্দির । আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার দেখভালে  মন্দির ও তার আশপাশ বেশ সংরক্ষিত তবে তৃতীয় বিশ্বের চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিকরা যথারীতি পর্যাপ্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক পূর্ণ করে ফেলেছে ঐ সুন্দর এবং নিরিবিলি স্থানটিকে । ঐ একটি কাজে আমরা খুব পটু। তা হল নিয়ম ভাঙা । সেখানে গার্বেজ ফেলার ব্যাবস্থা করে রেখেছে এ এস আই তবুও সংবরণ করা যায়না যত্রতত্র জঞ্জাল ফেলার অভ্যাসকে ।  মন্দিরের গায়ে পোড়া ইঁটের ওপর নিখুঁত স্থাপত্য ।  অনেকটাই সময়ের ভারে নষ্ট হয়ে গেছে । অভ্যন্তরে গর্ভগৃহের মধ্যে তাকালে দেখা যায় কত উঁচুতে দেওয়ালের গায়ে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানোর ব্যাবস্থা ।
ঐ গ্রামের বৌটি আমাদের জন্য লুচি আর আলুর দম বানিয়ে হাজির হয়েছিল রায়দীঘিতে । তারপর গরম চা । সেখান থেকে আমরা গেলাম সেই গ্রামের আতিথেয়তার স্বীকার হতে । পূর্ব পরিকল্পিত চড়ুইভাতি বা প্রকৃত অর্থে বনভোজনের মেজাজ নিয়ে । ধানজমির সরু আলের মধ্যে দিয়ে ডাইনে পান্নাপুকুরের সবুজ জলে ভাসমান গোলাপী শালুক আর বাঁয়ে গোলা ভরা ধান চলল সাথে ।  কোথাও হলুদ সর্ষে ক্ষেত কোথাও আলু, একফালি সবুজ কচি ধানগাছের পিছনে সয়াবিনের ক্ষেত অথবা ফুলকপি ।
বড় সুন্দর এই অনুভূতি। শহর থেকে গিয়ে শুধু সবুজে চোখ জুড়োনো যে কি ভালো লাগে! বারবার এই  মাটির রূপ দেখতে ইচ্ছে করে । দীঘিভরা জল করে টলমল।শীতকালে খেজুরগাছে হাঁড়িবাঁধার ধুম । আর স্নানের অছিলায় গ্রাম্য বধূর পুকুর সাঁতরে গামছা দিয়ে চিংড়ি-কাঁকড়া নিয়ে ভিজে কাপড়ে ঘরে ফেরা । 

এখনকার প্রজন্মের কাছে শীত-পিকনিক মানেই কেটারিংয়ে কব্জি ডোবানো, দুটো সাউন্ডবক্স থেকে জোরদার গানের সাথে উদ্দাম নৃত্য আর ইবিজা, কান্ট্রিক্লাব বা বেদিক ভিলেজের মত বিলাসবহুল আপ্যায়নে অবগাহন। এর থেকে অব্যাহতি পেতে গতকাল আমরা বনভোজনে গেলাম দক্ষিণবঙ্গের রায়দিঘীর কাছেই এক গ্রামে ।পালবংশের আমলে তৈরী অতি প্রাচীন মন্দির "জটার দেউল" দেখা একটি বিশেষ পাওয়া ।
খাড়ির জল যত্রতত্র খেলে বেড়ায় সেগ্রামে ।   মাটীর নীচে কাঁকড়ার বাসা যেখানে আর ধানক্ষেতের আলের ওপর দিয়ে দিয়ে হেঁটে আসা যায় সেখানে । কুড়োনো যায় নোনাবালির মধ্যে থেকে ঝিনুক আর শামুকের খোলা । সুন্দরী আর গরাণ গাছও আছে কিছু । কচি কচি টোপা কুল ধরেছে গাছে । কচি নারকেল পাড়িয়ে তেষ্টা মেটানো।খেজুর গাছে হাঁড়ি এখনো বাঁধেনি তারা । ঠান্ডা নেই । কুয়াশা নেই তাই । বড় বড় কাঁকড়া ধরানো হল গর্তর মধ্যে থেকে । দাম পেয়ে গ্রামের মানুষ ও বেজায় খুশী । আমাদের পিকনিকের  গরম ভাত মাটির উনুনে ফুটতে লাগল । আমরা পৌঁছতেই মাটির ঘরের দালানে রেডি দুপুরের আহার ।গরম ভাত, ডালের সাথে নদী থেকে সদ্য ধরা চুনোমাছ ভাজা, ক্ষেতের টাটকা শাকসব্জীর চচ্চড়ি, দিশী মুরগীর ঝোল আর টমেটোর চাটনী ।

তেলা মাথায় তেল না দিয়ে তোমরাও ভেবে দেখতে পারো গ্রামের মানুষদের সাথে কি করে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মাটির গন্ধ নিয়ে পিকনিক করে আসা যায় । প্রকৃত অর্থে চড়ুইভাতির মজা পাবে। মাটির উনুনে রান্নাবান্না আর টিউকলের জলে আঁচানো সব মিলিয়ে আমি ও আমার সর্বক্ষণের ওঠাবসার সাথীরা বেজায় খুশি । আর অতিথি আপ্যায়নে গ্রামের মানুষের কোনো খামতি নেই । ফেরার পথে তাদেরি বাড়ির একজন প্রত্যেকের হাতে একঠোঙা করে মুড়ি, আলুর চপ আর বেগুনী দিয়ে দিল গরম গরম । তারপর গাছের কলাটা, মুলোটাও। ওরাও খুশি একটু বিক্রিবাটরায়  আর আমরাও খুশী তরতাজা প্রাকৃতিক বনভোজন সেরে ।

পিকনিক-৫ 





জায়গাটা কলকাতার খুব কাছেই। নাম "বনের হাট'। আর এটা বারুইপুরে একটি ছোট ঘরোয়া বনভোজনের স্পট।সবুজ গাছগাছালি ঘেরা, একটুকরো জলের ঠাণ্ডা ধার, তক্তপোশে শীতলপাটি বিছানো একটা ছোট্ট বিশ্রামের কুঁড়ে, রান্নাবাটির জন্য টালির শেড, বাথরুম সব আছে তবে নেই ইলেকট্রিক। তাতে অবিশ্যি অসুবিধেও নেই। দিনে দিনেই ফিরে এসেছি আমরা।
কলকাতা থেকে  সোজা বাইপাস দিয়ে বারুইপুর স্টেশন। তারপর ফ্লাইওভার পেরিয়ে ওপারে গিয়ে নেমে সোজা যে রাস্তা ক্যানিং এর দিকে গেছে সেটা ধরা। পেরুবে ফুলতলা, রামনগর হাইস্কুল তারপরেই রাস্তার ওপরেই ডানদিকে পড়বে ঝাঁ চকচকে রেসর্ট যার নাম বনের হাট। যাবার রাস্তা খুব ভাল (টাচ্‌ উড্‌) । ভোরবেলা গড়িয়াহাট থেকে সময় লাগল মাত্র ৫০-৫৫ মিনিট। বেলা বাড়লে বাজারের ভীড় পড়ে তাই বেশী সময় লাগে। এহেন বনভোজন @ বনের হাট ছিল গতকাল  অর্থাত অঘ্রাণের অলস ছুটির দিনে।  শীত পড়তে না পড়তেই বাঙালীর কফি আর স্যুপ প্রেম যেমন উথলে ওঠে তেমনি আর কি পিকনিক প্রেমেও ভেসে যায় অমৃত কমলার ভোর। সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে দুপুরের চাইনিজ লাঞ্চ সব কিছুই হল ঠিকঠাক। আবারো কেউ ভুললেন হাঁফের টান, কেউ আরথাইটিস, কেউ বা COPDর কষ্ট, কেউ ডিপ্রেশান, কেউ আবার পিকনিকের এক্সাইটমেন্টে রাতের ঘুমটুকুনিও।

আমার কাছে বৈচিত্র্যময় রূপসী বাংলার শীতের উইকএন্ড মানেই বেরিয়ে পড়বার সুখ। বেরিয়ে পড়া মানেই সদলবলে কাছেপিঠে পিকনিকের আনন্দ। বেরিয়ে পড়া মানেই অফুরান হৈ চৈ তে সামিল হয়ে ওঠা। যে ঐশ্বর্য্য এখনো অধরা  তার দিকে দু চোখ মেলে দেওয়া। আর তারিয়ে তারিয়ে আমার বাংলার রূপলাবণ্য উপভোগ করা।  

গ্রীষ্মে যাই উত্তরবাংলায় হিমালয়ের কোলে দুটিপাতা-একটি কুঁড়ির স্বর্গরাজ্যে তো শীতের রোদের গনগনে আঁচে ছুটে যাই সাগরের দিকে । কোনোবার বসন্তের পিকনিকের ভোরে ছুটে গেছি দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে লালমাটির দেশে কিম্বা বাসন্তী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা ইছামতীর ধারে বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টাকীতে। অথবা বসন্তের পাহাড়ে পলাশের আগুণ লাগা মুকুটমণিপুর কিম্বা শঙ্করপুরের সমুদ্রসৈকতে । 
রূপসীবাংলার বুকে পিকনিকের গল্প এক বৈচিত্র্যময় রূপকথার মত। এ গল্প ফুরোয়না। কালেকালে আরো যেন রূপবতী হয় আমার বাংলা। থৈ থৈ তার রূপ লাবণ্য নিয়ে। মানুষ পিকনিকে আসে, পিকনিকে যায় প্রতি বছর। একটু জিরেন আধটু নিরালার খোঁজে।   
প্রতিবার বাংলার সবুজে বনভোজনের মজা পাই আর ফেরার সময় তাকে বলি...
তোমার সবুজে সবুজ আর নীলিমায় নীল দিগন্তে আমি মোহিত আবারো । আক্ষেপ কেবল একটাই.. শুধু চাই ভালো ও চওড়া রাস্তা যাতে শহর থেকে গ্রামের মানুষগুলো সহজেই আসা-যাওয়া করতে পারে আর চাই একটু শিল্প । গ্রামবাংলার যা আছে তা অনেকের কাছে ঈর্ষার । শুধু চাই দক্ষ পরিচালনা  আর পরিকাঠামো । চাষের জমি থাকুক । পাশাপাশি ফ্যাক্টরি  হোক দু-চারটে ।  ঐ মানুষগুলোর কর্মসংস্থান হোক  ! শুধু চাষ করে আর মাছ কাঁকড়া ধরে ওদের বালবাচ্চাগুলোর দুবেলা পেটটা হয়ত ভরে কিন্তু কুঁজোরও তো চিত হয়ে শুতে ইচ্ছে হয় !

Truly your's হয়েই থাকলাম পশ্চিমবাংলা।

কলকাতা ২৪x৭ রোববার

অঘ্রাণের সুঘ্রাণে


হেমন্তে কোন্‌ বসন্তেরই বাণী শুনছ কি? অমি কিন্তু শুনছি দিব্যি।  ভোরের গোলাপী কুয়াশায় আর সন্ধ্যের হিমঝরা নেশায় আমি শুনতে পাচ্ছি অঘ্রাণের পদধ্বনি।  আমার অঘ্রাণের অনুভূতিমালা কখনো বেশ মায়ামাখানো কখনো আবার করুণ। ঠিক যেন তার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার মত।  তাই তার পাতাঝরার টুপটাপ শব্দ পেলেই  সদা ভয় হয়, তারে হারাই হারাই । এখন  ঠান্ডা তো আর পড়েইনা আর এসেই যাই যাই করে। শীতফুলগুলো চোখ মেলে চাইতে না চাইতেই শীত ফুড়ুত। রবীন্দ্রসরোবরের বিদেশী পাখীগুলোর মত শীতও এখন পরিযায়ী আমাদের শহরে। তাইতো তাকে হারিয়ে ফেলি চকিতে। আর যেটুকুনি পাই সেটুকুনি চেটেপুটে নি আহ্লাদে। এ আমাদের সোনার গৌর। একবার চলে গেলে আর তো পাবনা। তাই অঘ্রাণে রাজ্যের বাইরে নৈব নৈব চ। বরং চোখ ফেলে যেটুকুনি দেখা বাকী সেটুকুনি চেঁচেপুঁছে নিয়ে নি। 
ওরে ওরে! কলকাতার এত কাছেই সাগরদ্বীপ, বকখালি। যাবি নাকি সুন্দরবন কিম্বা শান্তিনিকেতন? কিম্বা চল বাংলাদেশের সীমানা অবধি, বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টাকীতে? আহা! ইছামতীর কি রূপ! নৌকাবিলাসে কি আনন্দ! আর তার টাটকা তাজা মাছের ব্যাঞ্জন? ছেড়ে আসতে মন চায়না। তবুও ফিরে আসতে হয় নিজের ডেরায় । টাকী থেকে আসার পথে পাটালী কেনা হয়েছে বলে কথা! এ পাটালী নাকি বিখ্যাত।  মাঘ পড়লেই পিঠেপুলির রসনায় মত্ত হওয়া আমবাঙালীর অবশ্য কর্তব্য। অঘ্রাণে খেঁজুরগাছ ছুলে দিয়ে মাটীর হাঁড়ি বেঁধে দেয় গ্রামের মানুষ। তারপরেই খেজুরগুড়, পাটালী, তক্তি, মোয়ার গন্ধে পাগল আমরা। 
অতএব অঘ্রাণ জমে কুলফিমালাই । এ আমার দেশের বিদেশ যেন। কে বলে মকরসংক্রান্তিতেই যেতে হবে সাগরে? কে বলে পৌষমেলার ভীড়েই পৌঁছতে হবে শান্তিনিকেতনে? শীতের আমেজ পাবি, বেড়ানোর আনন্দে যাবি। টেষ্টবাডগুলো লকলক করে বলে ওঠে, তাজা মাছ, কাঁকড়া খাবি সুন্দরবনের? তবে রাতারাতি প্ল্যান। চলো লেটস গো!
যদি ভেসে যায় আদরের শীত? 


এই তো কেমন দিন ছোট তার, রাতটা বড়োই বড়।
তবে কি এবার শীত পড়ল, না কি লোকদেখানোয় দড়ো?

শীতের কলকাতার জন্য সারাটা বছর ধরে ঠিক যেন হাপিত্যেশ করে বসে থাকা আমাদের।
কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে আমাদের ঘুম ভাঙে কোলকাতায় । আমি কান পেতে র‌ই । উশখুশ প্রাণ । খবরের কাগজ ছিনিয়ে শীতের কলকাতার কোথায় কি! আজ নন্দনে ছায়াছবি উৎসব তো কাল আইসিসিআর এ চিত্র প্রদর্শনী । একাডেমিতে নাটক কিম্বা মিলনমেলায় টেরাকোটা-ডোকরার সার্বজনীন আবেদনে । মেলায় মেলায় ছয়লাপ মহানগর! খবরের কাগজ হাতে তুললেই শয়ে শয়ে পিকনিক স্পট । এখন আর কেউ চড়ুইভাতি বলেনা । এখন গিয়ে মেয়েদের মাঠেঘাটে রান্নাবান্না করতে হয়না । জমিয়ে কেটারিং হয় পিকনিকে । শুধু চাই একফালি সোনালী রোদের সকাল, নীল আকাশ আর একচিলতে সবুজ খোলা মাঠ ।  অঘ্রাণে লংড্রাইভ জমে আইসক্রিম আবারো । অমৃত কমলার সকাল ।
পাড়ায় পাড়ায় ব্যাডমিনটন । শুরু এই আঘ্রাণেই  । আবার কখনো রাস্তা ব্লক করে বারোয়ারি ক্রিকেট ।
ছোটবেলায় দক্ষিণের বারান্দায় মায়ের পিঠের  ভেজা চুল রোদের দিকে মেলা আর সামনে দুহাতে উল কাঁটা ? শীতের এই মিঠে রোদ পিঠে নিয়ে কমলালেবুর দুপুরগুলো ছিল বেশ টেনশনের  । কারণ  স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার দিনগুলো, ক্লাসে ওঠাউঠির ক্ষণও ঠিক এই সময়েই । শীতের ভালো ও মন্দ, সার্কাস-মেলা কিম্বা চিড়িয়াখানা-চড়ুইভাতি সব নির্ভর করছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের ওপর ।
অঘ্রাণে উত্তরের হাওয়া ব‌ইতে শুরু করলেই মনে হয় নজর না লাগে। আমাদের শহরের শীত বড়‌ই ক্ষণস্থায়ী। তার মধ্যেই কাশ্মীরি শালওয়ালাদের বাড়িবাড়ি ঘুরে বেড়ানো আর ওয়েলিংটনে গোলগাল ভুটিয়ামাসীদের উলের শীতপোষাক নিয়ে পসরা সাজানোর কথা মনে পড়ে যায়।  তবে এখন আমাদের তেমন একটা শীতপোষাকের চাহিদা নেই। হালকাপুলকা ট্রেন্ডি শীতবস্ত্র মিলে যায় হাতের কাছের শপিংমলে। তাই জমিয়ে আর কাশ্মিরী শাল, ফিরান অথবা জম্পেশ কার্ডিগান, পুলওভার কেনার সৌভাগ্য হয়না। আর দুটোমাস তো ব‌ই শীত। গরম কাপড়চোপড় আবার মথবল এর গন্ধে বাক্সবন্দী হয়ে যায়। তবে শীত যতটুকুনি‌ই থাকুক, শীতের রকমারী সব্জি, উচ্চ হজমশীলতা আর মেলা, পার্টি ইত্যাদির দৌরাত্ম্যে আমাদের গ্যাস্ট্রোনমিক ফূর্তি কিন্তু জমিয়ে চলতে থাকে।    
বাঙালীর শীতকাল মানেই একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। অঘ্রাণের নতুন চাল, মটরশুঁটি, মূলো, কমলালেবু আর খেজুরের গুড়ের পাটালী দিয়ে মা ঠাকুরঘরে "নতুন" দিতেন। দুধের মধ্যে সব নতুন জিনিস দিয়ে পাথরের বাটিতে ঠাকুরকে নিবেদন করা আর কি! আর পুজোর পর সেই প্রসাদের কি অপূর্ব স্বাদ! তখন মনে হত, 
আহা শীতকাল, থাক্‌না আমার ঘরে। বারেবারে ফিরে আসুক নবান্ন, ঠিক এমনি করে । 
অঘ্রাণের শুক্লপক্ষে "বড়িহাত" করতেন মা।  নতুন বিউলির ডাল ভিজিয়ে রেখে শীলে বেটে নিয়ে তার মধ্যে চালকুমড়ো কুরে দিয়ে, হিং, মৌরী সব মিশিয়ে  মা অঘ্রাণের রোদে পিঠ দিয়ে ভিজে এলো চুলে বড়ি দিতেন। একটি বড় কুলোর ওপরে পাতলা পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে সুচারু হস্তে এই বড়ি হাত অর্থাত বড়ি দেওয়ার রীতি অনেকেরি আছে। ঝোলে খাবার বড় বড়ি, ছোট্ট ছোট্ট ভাজাবড়ি এসব আজকাল স্মৃতি। আমরা দোকান থেকে কিনে খাই। আর ডালের সাথে পরিবেশিত হওয়া এই ভাজাবড়ির অন্যতম অঙ্গ ছিল কালোজিরে আর পোস্ত। কেনা বড়িতে পাইনা তেমন আর। এই বড়িহাতের দিন দুটি বড় বড়ি গড়ে তাদের বুড়ো বুড়ি করা হত। বুড়ি-বড়িটির মাথায় সিঁদুর আর দুজনের মাথাতেই ধানদুব্বো দিয়ে, পাঁচ এয়োস্ত্রীর হাতে পান, কপালে সিঁদুর ছুঁইয়ে, শাঁখ বাজিয়ে তাদের রোদে দেওয়া হত। একে বলে বড়ির বুড়োবুড়ির  বিয়ে দেওয়া।  


অঘ্রাণের প্রত্যেক রবিবারে মা-মেয়েরা মিলে করে ইতু ঠাকুরাণীর পুজো। ইতুপুজো হল মিত্র বা সূর্যের পুজো।
মাটি কিম্বা পেতলের সরায় মাটির ঘট পাতা হত। সরার মধ্যে মাটি ফেলে পঞ্চশস্য ছড়িয়ে দেওয়া হত। মন্ত্রবলে পুজো করে ঝি-বৌরা ইতুব্রতকথা পাঠ করত আর সেদিন নিরামিশ খেতে হত। সারাটা অঘ্রাণ মাস ধরে প্রত্যেক রবিবারে ইতুপুজো করে সংক্রান্তির দিনে ইতু ভাসানো হত গঙ্গায়। আর ততদিনে সেই সরার মধ্যে পঞ্চশস্যদানার অঙ্কুরোদগম হয়ে সেই মাটির সরা কি অপূর্ব এক সবুজ সজীবতা পেত । মায়ের সাথে
 আমিও বলতাম মায়ের সাথে সাথে...  
অষ্টচাল, অষ্টদূর্বা কলসপাত্রে থুয়ে
শোন সবে ইতুর কথা এক মন দিয়ে, 
ইতু দেন বর,
ধনধান্যে পুত্রপৌত্রে ভরে উঠুক ঘর। 
আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে ইতুদেবীর পুজো বোধহয় দুর্গাপুজোর নবপত্রিকার মত । কৃষির জন্য সূর্যদেবতার অবদান অনস্বীকার্য তাই বুঝি "ইদম্‌ অর্ঘ্যম্‌ নমো শ্রী সূর্যায় নমঃ" বলে অর্ঘ্য দেওয়া হয় ইতুর ঘটে।  সূর্যদেবতা এবং ইতুদেবী উভয়কেই তুষ্ট রাখা হয়।  
গ্রীষ্মের সময় যেমন মঙ্গলচন্ডীর ব্রত হয় অঘ্রাণে আমাদের আছে কুলুইমঙ্গলচন্ডীর ব্রত।
অঘ্রাণমাসের শুক্লাষষ্ঠীতে ব্রতকথা পড়ে জল খেতে হয় ।  অঘ্রাণ মাসের শুক্লপক্ষের মঙ্গলবারে কেন মেয়েরা কুলুই চন্ডীর ব্রত করে মা?
এমন প্রশ্ন জাগত ছোটবেলায় ।
মা শোনাতেন ব্রতকথা আর  বলতেন " বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর "
ইতুপুজোর উমনো-ঝুমনো কিম্বা মঙ্গলচন্ডীর আকুলি-সুকুলি সেই চিরাচরিত মেয়েদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে  আড়াল করে রাখার গল্প আবার মেয়েদের হাত ধরেই  কখনো ইতুদেবী কখনো মঙ্গলচন্ডীকে স্মরণ করে সে যাত্রায় উদ্ধার। 
প্রতিবছর অঘ্রাণের ভোরে যখন শীত দরজায় কড়া নাড়ে তখন মনে পড়ে এইসব। পাল্টায়না ব্রতকথার গল্পগুলো। শুধু পাল্টে যায় সমাজের চিত্রকল্পটা। বদলে যায় চরিত্রগুলো। ব্রতের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলে এ যুগেও  । সমাজে মেয়েগুলো আজো ব্রাত্য । শীতপোষাকে জানু-ভানু-কৃশাণু তারা শীতের হাত থেকে রক্ষে পাবে বলে। 
তবুও প্রকৃতির নির্ঘন্ট মেনে শীত আসে।  পালংশাকের ঘন সবুজে, কমলালেবুর ঘ্রাণের মধ্যে দিয়ে। বাঁধাকপির হালকা সবুজের পরতে পরতে শীত খুলতেই থাকে। রঙীন বাজার সরগরম হয় শীতসবজীর রামধনুতে।  
বাংলার মেয়েগুলো বাবা-ভাই-স্বামীর মঙ্গলের জন্য বছরের পর বছর ব্রতের উপবাসী হয়ে নতুন অঘ্রাণের ঠান্ডায় পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান করে পুজোর যোগাড় করে কিন্তু তাদের কথা কে মনে রাখে? যারা এই নতুন শীতকে ওয়েলকাম করতে পারেনা? তারাই বা কি করে এই অঘ্রাণে?  যে বা যারা পারল না এই অঘ্রাণের অনুভূতিগুলো ভাগ করে নিতে?  তাদের বাজারের থলি থেকেও উঁকি দেয় পিঁয়াজকলি কিম্বা হাতে ঝোলানো দিশী ফুলকপি। তাদেরো সাধ হয় একটা দুধের প্যাকেটে একটু সুজি ছড়িয়ে গুড় দিয়ে গরম পায়েস খাবার।  কারণ শীত তো বারেবারে আসেনা বছরে।  
এইসব অনুভূতিতে পার হয়ে যায় আমার অঘ্রহায়ণ । আমার শীতের সূচনা। শীত আসে, শীত যায়। আমাদের ঘুম ভাঙে কলকাতায়। 
সবশেষে আবার রবিঠাকুরের শরণাপন্ন হয়ে বলি, "অঘ্রাণ তবে ফাগুন রহিত ব্যেপে"। অতএব,  কিছুক্ষণ আরো নাহয় রহিতে কাছে। 


কলকাতা ২৪x ৭ "রোববার"

১ ডিসেম্বর, ২০১৬

ষোড়শী সই এর ষোলোকলা পূর্ণ

বনীতা দেব সেনের হাতে তৈরী "স‌ই" পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের সৃষ্টিশীল মেয়েদের একটি সংগঠন। "স‌ই" এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আজ থেকে ষোলো বছর আগে ২০০০ সালের ৩০ শে নভেম্বর। এই দিনটি নবনীতাদির মা কবি রাধারাণী দেবীর জন্মদিনও। "স‌ই" এর ষোলো বছর পূর্তিতে হৈ হৈ করে "স‌ই" এর ওয়েবসাইট www.soicreativewomen.org উদ্বোধন হয়ে গেল গতকাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা বিভাগের বিবেকানন্দ হলে। প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করলেন শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষ, ভারতী রায় এবং মানবীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ ঐশিকা চক্রবর্তী। স‌ই এর ওয়েবসাইট তৈরীর কৃতিত্ব Argentum Web Solutions এর মহাশ্বেতা রায়ের। কবি শঙ্খ ঘোষ মহাশ্বেতার সাহায্যে ওয়েবসাইট উদ্বোধন করলেন। স‌ই এর সভাপতি সাহিত্যিক নবনীতা দেব সেন উপস্থিত সকলকে ওয়েবসাইটের ব্যাপারে অবগত করলেন। লেখিকাদের স্বাধীন মত প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম এই ওয়েবসাইটে র‌ইল যার নাম "ব্লগবগম্‌"। 
"স‌ই" এর পূর্ব প্রকাশিত প্রিন্ট ম্যাগাজিন "স‌ই-সাবুদ" ও এবার ই-পত্রিকার আকারে দেখতে পাওয়া যাবে।  রাজ্যের গন্ডী পেরিয়ে দেশ এবং আন্তর্জাতিক স্তরের বহু স্বনামধন্য লেখিকারাও স‌ই এর সাথে যুক্ত আছেন।আন্তর্জাতিক স্তরে চমত্কার একটি ডেটাবেস তৈরী হল সই এর সব লেখিকাদের। এ যাবত স‌ই এর সমস্ত অনুষ্ঠান, কর্মকান্ড সবকিছুর ছবিও আর্কাইভ করে রাখা রয়েছে ওয়েবসাইটে। 



গতকাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা বিভাগের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন স‌ই শর্মিষ্ঠা। স‌ই এর ভালবাসার মৌসুমী ভৌমিক এবং রঞ্জিনী-ইন্দ্রানী-সোহিনীর অভিনব সঙ্গীত পরিবেশনা এক অপূর্ব মাত্রা যোগ করল।  এরপর ছিল নবনীতাদির বাড়িতে স‌ইদের নৈশভোজের নিমন্ত্রণ। কারণ স‌ই এর প্রতিষ্ঠা দিবস ও কবি রাধারাণী দেবীর জন্মদিন। সব মিলিয়ে আমাদের বেশ অন্যরকমের পাওয়া ।   
সমগ্র অনুষ্ঠাটির সুচারু এবং দৃষ্টিনন্দন পরিবেশনার দায়িত্ত্বে থাকা সব স‌ইরা হলেন স‌ইয়ের সেক্রেটারি গার্গী রায়চৌধুরী, ওয়েব এডিটর, চৈতালি চট্টোপাধ্যায়, যশোধরা রায়চৌধুরী, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং দেবলীনা ত্রিপাঠী । এছাড়াও বাকী স‌ইদের জন্য অঢেল কৃতজ্ঞতা জানাই যারা ছাড়া অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ হতনা। তাদের মধ্যে আছেন সাহিত্যিক কণা বসু মিশ্র, চুমকী চট্টোপাধ্যায়, রূপা মজুমদার, সুস্মেলী দত্ত, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, জয়া চৌধুরী, কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়, পৃথা বল, সুতপা  বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোত্স্না কর্মকার, বনানী দাস চক্রবর্তী, দীপাণ্বিতা রায়, কৃষ্ণা রায় প্রমুখ সই সকল  । 

২৮ নভেম্বর, ২০১৬

বনভোজন @ বনের হাট



জায়গাটা কলকাতার খুব কাছেই। নাম "বনের হাট'। আর এটা বারুইপুরে একটি ছোট ঘরোয়া বনভোজনের স্পট।সবুজ গাছগাছালি ঘেরা, একটুকরো জলের ঠাণ্ডা ধার, তক্তপোশে শীতলপাটি বিছানো একটা ছোট্ট বিশ্রামের কুঁড়ে, রান্নাবাটির জন্য টালির শেড, বাথরুম সব আছে তবে নেই ইলেকট্রিক। তাতে অবিশ্যি অসুবিধেও নেই। দিনে দিনেই ফিরে এসেছি আমরা। 
কলকাতা থেকে  সোজা বাইপাস দিয়ে বারুইপুর স্টেশন। তারপর ফ্লাইওভার পেরিয়ে ওপারে গিয়ে নেমে সোজা যে রাস্তা ক্যানিং এর দিকে গেছে সেটা ধরা। পেরুবে ফুলতলা, রামনগর হাইস্কুল তারপরেই রাস্তার ওপরেই ডানদিকে পড়বে ঝাঁ চকচকে রেসর্ট যার নাম বনের হাট। যাবার রাস্তা খুব ভাল (টাচ্‌ উড্‌) । ভোরবেলা গড়িয়াহাট থেকে সময় লাগল মাত্র ৫০-৫৫ মিনিট। বেলা বাড়লে বাজারের ভীড় পড়ে তাই বেশী সময় লাগে। এহেন বনভোজন @ বনের হাট ছিল গতকাল  অর্থাত অঘ্রাণের অলস ছুটির দিনে।  শীত পড়তে না পড়তেই বাঙালীর কফি আর স্যুপ প্রেম যেমন উথলে ওঠে তেমনি আর কি পিকনিক প্রেমেও ভেসে যায় অমৃত কমলার ভোর। প্রতি শীতের অবশ্যকরণীয় দায়িত্ব রূপে আমাদের দক্ষিণ কলকাতা পাঠচক্রের সব বরিষ্ঠ নাগরিক মাসীমাদের এই বাত্সরিক ভ্রমণের আনন্দদানটাও যেন সর্বকনিষ্ঠা এহেন আমির ওপরে বর্তায়।  বেশী শীতের দাপুটে বৃদ্ধারা আবার একটু কাতরে পড়েন তাই এবার অঘ্রাণেই পালন করলাম সেই দায়িত্ত্বটি। সর্বসাকুল্যে ৩০-৩৫ জন, কিছু গেষ্ট আর সকলের বাহনচালক। সেই সাথে ছিল পাঠচক্রের সেক্রেটারী মাসীমা মনীষা দের ৫০ তম বিয়ের তারিখ। অসুস্থ মেশোমশাই ও সামিল ছিলেন এই পিকনিকে।কেক কাটা, মোমবাতি জ্বালা, কোনো অনুষ্ঠানের ত্রুটি ছিল না কাল। ওনাদের ৫০ বছর টিকে থাকার অভিনন্দন জ্ঞাপনে কবিতা থেকে শুরু করে হালকা হাসি, জোকস, অন্ত্যাক্ষরী, রবীন্দ্রগানের সাথে নাচ, আরো আরো কবিতাপাঠ, নাটকের নির্বাচিত অংশ, চিরকূট তুলে "যে যেমন খুশি পারো" এইসব নিয়ে কেটে গেল দুপুর। সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে দুপুরের চাইনিজ লাঞ্চ সব কিছুই হল ঠিকঠাক। কেউ ভুললেন হাঁফের টান, কেউ আরথাইটিস, কেউ বা COPDর কষ্ট, কেউ ডিপ্রেশান, কেউ আবার পিকনিকের এক্সাইটমেন্টে রাতের ঘুমটুকুনিও।
আর যে ছাড়া "বনের হাট' আমাদের কাছে অজানা থেকে যেত সে হল আমার পাড়ার, আমার স্কুলের বন্ধু, আমার প্রতিদিনের অঙ্ক কষার সাথী, রোজ স্কুল যাওয়ার দুই বিরুণীর সঙ্গী চুনচুন ।


আর এহেন আমি এনাদের প্রতিবছর এভাবে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারি বলে বেশ লাগে আমারো। কারোর জন্যে কিছু বেশী ভাল কিছু করতে না পারি, মন্দ তো করিনা তাই মনটা বেশ লাগল সারাদিন। এই মাসীমাদের মধ্যে একজন আমার শাশুড়িমাও। তিনিও সারাদিন বেশ ফুরফুরে ছিলেন গতকাল। এভাবেই বেঁচে থাকেন কলকাতার কিছু সিনিয়ার সিটিজেনরা আমাদের সঙ্গে। এঁদের ছেলেপুলেরাও তো বেশীরভাগ বাইরে। জেরিয়াট্রিক এই মহানগরের ফ্ল্যাটবন্দী এঁরাও একটু মুক্তির আলো দেখেন। আর ব্লগ লেখার মত ঘরের খেয়ে বনের হাটে বনের মোষ তাড়িয়ে আমিও নির্মল আনন্দ পাই কারণ আমার প্রাপ্তি মাসীমাদের নির্ভেজাল হাসিটুকুনি আর তাঁদের অকুণ্ঠ আশীর্বাদ।

১৮ নভেম্বর, ২০১৬

সাম্প্রতিক কালের হাবুডুবু এবং ধামাচাপা

  • (১) মিষ্টার ঝুনঝুনওয়ালার স্ত্রী বলছেন তাঁর ড্রাইভারকেঃ
"তুম তো আপনা প‌ইসা জমা করোগে, হমারা ভি জমা দে দো না বাবা! “
  • (২) এক নামকরা ডাক্তারবাবু ব্যাঙ্কে এসেছেন । প্রাইভেট ব্যাংকের পার্সোনাল রিলেশানশিপ ম্যানেজারকে বলতে শুনলাম ফিসফিস করে,” বস্‌, কিছু একটা উপায় তো করো! মারা পড়ে যাব যে।"
ম্যানেজার বললেন, আপনার নার্সিংহোমের নামে জমা করে দিন। ব্যাস্! ট্যাক্স দিয়ে দেবেন আবার কি! আপনার টাকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে আমার চাকরীটা আর খোয়াতে পারিনা স্যার!
  • (৩) ছবির দোকানে ছবি বাঁধাতে গেছি, মালিক বলছে, "দিদি জানেন? প্রতি হাজারে ৮টি ১০০ দিলে আমাকে ২০০ দেবে বলছে, এমন ২৬ লক্ষ টাকা দিতে চাইছেন একজন নিজের লস করে"
বেচারা ছবির দোকানের মালিকের অত টাকা কোথায়? সে বলল, "লোভ লাগছিল , জানেন তো? ২৬ লাখ একশোর নোট দিতে পারলে আমার লাভ থাকত নেট ৫লাখ কুড়ি হাজার। একটা মালতী গাড়িও হয়ে যেত"
  • (৪) বড় বড় সব আবাসনের বাসিন্দারা ইলেকট্রিক বিল, মাসিক মেন্টেনেন্স বাকী রেখে দেন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। তারা সব ছুটে গিয়ে নোটের তাড়া জমা করছে। ইলেকট্রিক সাপ্লাই বলেছে, "আলবাত নেব, না নিলে আমাদেরি লস তো!"
  • (৫) "হামারা রুপয়া জমা কর দো দিদি, তুমহারা একাউন্ট মে। হর দশহাজার রুপয়া মে ১০০০ তুমহরা"
  • রান্নার মাসীর অবাঙালী কাজের বাড়ির গিন্নী বলল তাকে। সে বলল, উসকে বাদ? তুমহরা রুপয়া ক্যায়সে তুমহরে পাস যায় গা? গিন্নীর সপ্রতিভ উত্তর কুছ দিনো কে বাদ, তুম থোড়া থোড়া করকে হামকো বাপাস কর দোগে। রান্নার মাসী বলল, আমার একাউন্ট একলাখ টাকা চোখে দেখেনি। আর আমি সেখানে গিয়ে গিয়ে ১০ লাখ টাকা জমা দেব? মাফ করো আমাকে!
  • (৬) স্থানীয় বস্তিতে থাকে রামের মা। লোকের বাড়ি কাজ করে মাসিক আয় প্রায় ৭-৮ হাজার। সেদিন তাড়াহুড়ো করে ব্যাঙ্কে গিয়ে জমানো হাজার পনের টাকা দিয়ে বদল করে এনেছে তার কষ্টের রোজগার। এবার তাদের বস্তিতে যেই রটে গেল রামের মায়ের অনেক একশো টাকা তখন প্রত্যেকে রামের মা'কে বলতে লাগল, মাসী ৫০০ নোটের বদলে ৪টে ১০০ দাও। তোমারি তো লাভ । রামের মা কাজে যায়নি সারাদিন ঘরে বসে এই ব্যবসায় মন দিল। স্বল্প পুঁজিতেও ব্যবসা হয় তবে। অভাবের সংসারে যা আসে তাই ভাল। সে তো আর ভুল কিছু করছে না। মানুষের উপকার করেছে মাত্র।
  • (৭)অগ্রবালবাবুরা পঞ্জাবের লোক। সেখানকার প্রত্যন্ত গ্রামে প্রধানমন্ত্রীর জনধন একাউন্ট খুলে এসেছিল ভাগ্যিস! ১০ জনের নামে থাকা এমন একাউন্টে ব্রিফকেস, এটাচি ভরে টাকা নিয়ে রাখতে গেছে রেলভাড়া করে। অগ্রবাল পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের হাতে এমন ব্রিফকেস।
  • (৮) আবাসনের এক অবাঙালী ব্যাবসাদার তার কাজের মাসী সহ সকল স্টাফদের বাধ্য করেছেন সচিত্র পরিচয়পত্র দিতে। সেই পরিচয়পত্র তিনি খান কুড়ি করে জেরক্স করিয়ে প্রত্যেকের হাতে নোটের তাড়া গুঁজে দিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে জমা দিতে বলছেন। ভিন্নভিন্ন একাউন্টে বেচারা স্টাফেরা জমা দিয়েই চলেছে, দিয়েই চলেছে...আর তিনি বলেছেন, যা সময় লাগে লাগুক, কাজে না আসলেও চলবে আর এর জন্য আলাদা বখশিস‌ও দিব্যি মিলবে।
  • (৯) পুরণো কাগজওয়ালাদের খুব মজা। প্রচুর লোকজন বাড়ি সাফাই যজ্ঞে মেতে উঠেছে। কোথায় কি পাওয়া যায় সেই লক্ষ্যে। এবার তাকের ওপরে, তাকিয়ার নীচে, গদির তলায়, কাগজের বান্ডিলে পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য ৫০০-১০০০। অতএব অঘ্রাণেই কাগজওয়ালাদের পোষমাস চলিতেছে।

১৭ নভেম্বর, ২০১৬

টুনটুনির নতুন গল্প


লি গেল গেল রব উঠল ৫০০/১০০০ বাতিল হল বলে কিন্তু সত্যি তো বাতিল কেউ নয়। এ কথা আমাদের সকলেরি জানা। রাস্তায় ঘাটে সবাই ঊর্ধ্বমুখে জোড় হাত তুলে কয় নমো নমোহ! যে আদার ব্যাপারী সে এদ্দিন পাত্তা দেয়নি নরেনকে। আর এই নরেনই রক্ষে করল তাদের। হোয়াটস্যাপে ঠাট্টার ঝড়। রামকৃষ্ণ বলেছিলেন টাকা মাটি, মাটি টাকা। আর তাঁর প্রিয় নরেনই প্রমাণ করেছেন এদ্দিনে। আমি বলি টাচ উড! আগে শেষ রক্ষে হোক বাপু
 
এইবার শুরু খেলা। রাজার ঘরে যে ধন আছে, টুনির ঘরেও সে ধন আছে। শুধু রাজার ঘরে বেশী আছে, টুনির বাসায় অনেক কম আছে। রাজা হলেন জাহাজের কারবারি আর টুনি বেচারা আদার ব্যাপারী। কিন্তু যে ৫০০/১০০০ এর নোট টুনির আছে সেটাই রাজার ভল্টেও আছে। সেই এক, অবিনশ্বর গান্ধীর ছবি ওলা। রাজার কত উপায়ে সেই প্রাচুর্য লাভ হয়। আর টুনি বেচারা দিনাতিপাত করে কোনোক্রমে একটা নোট মুখে করে এনে বাসার মধ্যে রাখে। রাজার অনেক আছে তাই টাকা শুকোতে দিতে হয়। আর টুনি বেচারা একটা এনেই কি ঝামেলা হল সেবার। কিন্তু এবারে টুনি মুখ্য নয়। উলুখাগড়ার মত ব্রাত্য টুনি দিব্যি আছে মনের সুখে। এখন রাজারাজড়ার পরাণ যায়।

টুনি এখন মগডালে বসে মনের সুখে গাইছে বেহাগ

" কালো টাকা, সাদা টাকা, টাকা নানান জাতের,
এত টাকার মধ্যে শুয়ে ঘুম গেল তার বাপের"

টুনির মা তাই শুনে ধরে

"বুঝলেন, বুঝলেন, বুঝলেন বাবুমশাই?
টাকা গোনে, কেন গোনে, কিসের এত টাকা?
আশেপাশে সবাই গোনে, আমার বাসাই ফাঁকা"

টুনি বলে, ও মা? আজ চলো যাই উড়ে, রাজার বাড়ির বারান্দার দিকে আরেকবার। যদি পেয়ে যাই একটা ৫০০ কিম্বা ১০০০ ? টুনির মা বলল, অতি লোভ ভাল নয় টুনি। টাকা থাকার অনেক জ্বালা। দেখলি তো ? টুনি বলল, মা তবে যে ৫০০ টাকার নোটটা আমাদের বাসায় পড়ে রয়েছে সেটা গিয়ে রাজার বারান্দার কোণে রেখে আসিগে, কি বলো?
টাকা এমনি জিনিস! মায়া বাড়ায়। আর টুনির মা টুনির চেয়ে বয়স্ক, দুঁধে, পোড় খাওয়া এক পাখী। সে বলে, পাগল না মাথাখারাপ? ওটা রেখে দে, কাজে আসবে। টুনি বলে, ওটা ক'দিন বাদে চলবে নি গো, বাতিল হবে। তখন ভাঙাবে কি করে?
টুনি ফুড়ুত করে উড়ে গিয়ে বসে মাছ বাজারে। সেখানে জলের দরে মাছ বিকোচ্ছে । আর দোকানি বলছে, মাছ নিয়ে যান, পয়সা পরে দেবেন। ৫০০, ১০০০ নেবনা। অন্য আরেকটা বাজারে গিয়ে টুনি দেখল সেখানে দিব্যি নিচ্ছে ৫০০-১০০০। ক্রেতা বিক্রেতাকে বলছে, মশাই, টাকা হল টাকা। আপনার হোক কিম্বা আমার । ব্যাঙ্কে দিয়ে দিলে সবই এক জায়গায় যাবে। টাকা আটকে থাকলে ব্যাবসা করব কিভাবে? আরেকটা বাজারে গিয়ে শোনে সেখানে দোকানি বলছে, আগের ধার শোধেনি এখনো। ধারবাকীতে কি মাছ বেচা যায়?
বিভ্রান্ত টুনি এবার উড়ে যায় শহরের এক ব্যস্ত পেট্রোল পাম্পে। রাতে তোপ দাগার পরেও মাথায় আসেনি কারোর। এবার মাথায় হাত। এমন লাইন কেন সেখানে? তারপরেই বচসা শুনে বুঝতে পারল, ভোর হতেই সবাই তেল কিনে গাড়িতে ভরছে, কেউ বাড়িতেও মজুত রাখছে। তেলের তো অনেক দাম। সোনার মতোই প্রায়। তাই কিছু ৫০০-১০০০ সরকারের ঘরে চালান করে দেওয়াই শ্রেয়। ও মা গো
 
এখানে তো সকলে জেরিক্যান ভরে পেট্রোল নিচ্চে গো! এ আবার কেমন তর? পেট্রোলের গন্ধে ম ম করছে আশপাশ। সেই তেলের গন্ধ নিয়ে আবার ফুড়ুত টুনি রেলের স্টেশনে। নিচ্ছে, নিচ্ছে, নিচ্ছে, এখানেও নিচ্ছে বড় নোট। তবে ছোট টিকিটের জন্য বড় নোট কেন নেবে তারা? আগেও নিতনা এখনো নেবেনা। প্যান্ট্রিকার, টিকিট কাউন্টার সবজায়গায় নিচ্ছেই তো । এবার টুনি চলল বিমানবন্দরে। সেখানে যারা যাওয়া আসা করে তাদের পার্সে, ওয়ালেটে ক্রেডিট কার্ড থাকে, ডেবিট কার্ডও থাকে অতএব নো ঝঞ্জাট। কিন্তু প্রিপেইড ট্যাক্সিবুথে একটু বাকবিতন্ডা চলছে। ওরা অমনি। চিরকাল। নমো-ই হোক, মম-ই হোক। এরা আর বদলাবেনা। টুনি তো আর আজকের লোক নয়। এ শহর তার অতি পরিচিত। টুনি ভাবে, বিদেশীদের সামনে না লজ্জায় পড়তে হয়। অতিথি দেব ভব। তাদের সামনে এমন ঝগড়াঝাটি না করলেই নয়? সেই এক কথা। আরে মশাই নিন না বাবা। আপনি বা আমি যে কেউ কাল গিয়ে এই নোট তো ব্যাঙ্কেই জমা করে আসব।
তার চেয়ে শেখো তোমরা ভলভো বাস সার্ভিস, ওলা, উবেরের কাছ থেকে। এরা কেমন ব্যাওসাপাতি বোঝে বাপু! টুনির মনে হয় ঘাড় ধরে শিখিয়ে দিক ওদের। 
 
টুনি যায় গুটি গুটি। একটু ফুড়ুত তো একটু মজা লুটি। যারা নেই উত্তর-পুব, তার মনে সদাই সুখ। এবার গন্তব্য শপিংমলে। বিশাল কাঁচের দরজার সামনে চুপটি করে ঘাপটি মেরে বসে থাকে সে। এই বাগানে তার প্রবেশ মানা। সময়ে অসময়ে সে পিচিক করে পটি করে ফ্যালে। তখন রামপেয়াদা এসে তাড়া করে মেরেও ফেলতে পারে একরত্তি টুনিকে। মানুষের তাড়া খেলে যা বুক ধুকপুকুনি হয়! তার চেয়ে দরজার বাইরে থাকাই ভাল।
এ বাবা, এখানেও হোঁচট কেন? কার্ড না থাকলে জিনিস কেনা যাবেনা? নো বড় নোট লেনদেন। প্রবেশের মুখেই জিগেস করে নিচ্ছে সিকিউরিটি। আচ্ছা এর নামই কি "অচ্ছে দিন"? এর নামই কি "গো ডিজিটাল"? টুনি ভাবে বসে বসে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মলের দরজা খুলে মানুষ ঢোকে আবার কেউ কেউ ঢুকেই পত্রপাঠ বেরিয়ে যায়। ঠান্ডা হাওয়ায় শীত করে টুনির। সেদিন সকালেই টুনি খবরের কাগজের প্রথম পাতায় জোরালো বিজ্ঞাপন দেখেছে বটে। অব এ.টি.এম ছাড়ো, পে.টি.এম করো। এটাই কি তবে ডিজিটাল দেশ গড়ার পূর্বলক্ষণ?

টুনি সেদিন বাসায় ফিরে গিয়ে মা কে বলল
 
- মা, ঐ টাকার নোটটা রেখেই আসি রাজার ঘরেতে। টাকা থাকার অনেক হ্যাপা। এই বেশ খুঁটে খাই আমরা। দিব্য চলে যায় আমাদের।
টুনির মা সেই শুনে বলল,
- মার খেয়ে মরবি এবারে। আমি কত কায়দা করে সেই উপেনবাবুর আমল থেকে যত্ন করে টাকাটা বাসায় সামলিয়ে আসছি আর তুই কিনা এদ্দিনের সঞ্চিত ধন বিকিয়ে দিবি? নানা টুনি যাসনা। আমি মরে গেলে ঐ টাকাটাই তোকে দেখবে।
- কিন্তু মা, ওই টাকাটা এখুনি ফেরত না দিলে আর কোনও কাজে আসবেনা আমাদের। ওটা বাতিল হয়ে যাবে।
- রাজার বাড়ী ঢুকবি আবারো? জানিস না? রাজাকে রাগিয়ে দিয়ে কি বিপত্তি হয়েছিল আর তারপরেই তরোয়াল থেকে শুরু করে ব্যাঙ ভাজার কাহিনী কে না জানে?
- আর সেই বেচারা সাতরাণীর গল্প তুমি যে ফলাও করে বলতে ! শুধু একটা নোটের জন্যে ওদের নাকগুলো যখন কেটে দিল তরোয়াল দিয়ে? সে কি দৃশ্য! রক্তারক্তি কাণ্ড!
- বেচারা রাণীরা কিন্তু আমাকে খুব আদর যত্ন করেছিল জানিস ? ওমা কি সুন্দর পাখী ! কত মিষ্টি পাখীটা!
টুনি সেই শুনে বলল,
- মা আবার যাবে নাকি রাজার বাড়ি গিয়ে সেই পুরণো কাসুন্দি ঘাঁটতে?

১৩ অক্টোবর, ২০১৬

পুজোসাহিত্য ২০১৬

৪ অক্টোবর, ২০১৬

নিদ্রারূপেণ


যা দেবী সর্বভূতেষু নিদ্রারূপেণ সংস্থিতা ! 

 

মানুষের চোখ থেকে সব ঘুম কেড়ে নিয়ে তুমি নিদ্রারূপেণ বিরাজিতা। আর তাই বুঝি আমাদের এত অনিদ্রার প্রকোপ। ঘুম নেই কারোর চোখে।

এমনকি স্বয়ং ব্রহ্মার আটচোখেও ঘুম নেই। তিনিও ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত। কি আর করেন! মা দুর্গার আদেশ।

কুমোর পাড়ায় ধরপাকড় চলছে। মা দুর্গার আদেশে ব্রহ্মা স্বয়ং তলব করেছেন কুমোর পাড়ায়। কিছুদিন ধরেই তিনি নালিশ শুনছিলেন । প্রজাপিতাকে বলেছিলেন দুর্গা। 

 

- আপনি আর বুঝবেন কেমন করে? আপনার তো আর বারোমেসে পুজোটুজো করেনা কেউ। যত বিপদ আমাদের। মহেশ্বরও কিছুটা অবগত আছেন। কারণ শিবরাত্রিতে বিশাল শিবমূর্তি গড়ে ওনার পুজোরও চল হয়েছে আজকাল। আপনারা তিন মক্কেল মানে আপনি, বিষ্ণু আর মহেশ্বরই স্বর্গের মাথা। তার মধ্যে একজন সিদ্ধি- গাঁজা-আফিমের ঘোরে অহোরাত্র। বিষ্ণুর তেমন একটা হেলদোল নেই । নিজের আবতারত্বের প্রচারে মত্ত। তাই আপনার শরণ নিলাম পিতাশ্রী।

ব্রহ্মা তখনকার মত তথাস্তু বলে তক্কে তক্কে ছিলেন। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগেনি তাঁরও। একদিন ভরদুপুরে তিনি হাজির হলেন কুমোর পাড়ায়।

সেখানে শয়ে শয়ে কুমোর মূর্তি গড়ায় ব্যস্ত। পুজোর সিজনেই যা রোজগার পাতি তাদের।

একজন পায়ে ধরে বসল । " হে প্রভু, আমাদের মূর্তি না গড়তি দিলে বালবাচ্চা নিয়ে না খেতি পেয়ে যে মরে যাব" 

ব্রহ্মা কুমোরকে বললেন, তা ভায়া পেছনে বাঁশ দিয়ে মূর্তি গড়িস তোরা, ভাবলি কি করে যে ভগবান তোদের রক্ষে করবে ? মূর্তি গড়বার সময় মনে থাকেনা সে কথা?

গরীব কুমোরটি বলল, বাঁশের কাঠামো না হলে খড় দিয়ে মূর্তি গড়ব কেমনে ঠাকুর?

ব্রহ্মা বললেন, কেন? আসল তো ঘট। ঘটের পুজোই তো করতে পার।

কুমোর বলল, ঘট? তাহলে আমাদের রুজি রোজগার যে বন্ধ হয়ে যাবে। ঘট গড়ে আর ক'টাকাই বা পাব আমরা?

ব্রহ্মা বললেন একে তো বাঁশ তার ওপর ঐ মৃন্ময়ী মূর্তিগুলো সব গঙ্গার জলে ফেলে দূষণ বাড়াস তোরা। জানিস মা গঙ্গা এতে ক্ষুব্ধ হন?

মা দুর্গা মনে মনে বললেন, আমাকে জলে ফেলে তো খুব মজা করিস সব, এবার বোঝ ঠ্যালা! ব্রহ্মা স্বয়ং কেসটা টেক ওভার করেছেন, আর কি চিন্তা আমাদের!

'দিন থেকেই দুর্গা কানাঘুষো শুনছিলেন... 

মনে মনে বললেন, তোরা কি ভাবিস? আমি সারাদিনই কেবল নিদ্রারূপেণ সংস্থিতা?

 

কে জানি বলছে, "মায়ের হাজার হাত"

তা বাপু আমি দশভুজা, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লড়াই করি। আমি কি তাই বলে জল ঘাঁটি যে আমার হাতে হাজা হবে? আমার এই দশ হাত তোদের আস্থার, ভরসার স্থল আর তোরা কিনা "হাজার হাত, হাজার হাত" করে মরছিস? আমি ঠাণ্ডার দেশে থাকি। আমার আবার চর্মরোগ হবে কেন বাপু?

কি যে সব শুরু করল আমাকে নিয়ে!  

এই তো সেবার একদল আমার গগনচুম্বী মূর্তি গড়ল অথচ দেহানুপাতে আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দিকে খেয়াল রাখলনা। আরো বড়? সত্যি? সবচেয়ে বড়? এইসব গোলেবাকুলির গপ্পো বলে তুমুল লোক জড়ো করল অথচ... এ আবার কেমন তর? মাইকে পুরুত "পীনোন্নত ঘটোস্তনী", "পীনোন্নতপয়োধরম্‌" এইসব সংস্কৃত আওড়ে চেঁচিয়ে মরছে, অথচ দেখো কি কিম্ভূত আমাকে লাগছিল। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। সেইজন্যেই তো আমি বন্ধ করে দিলুম ঐ পুজো। বাপ্‌রে! পালিয়ে বেঁচেছিলুম যেন! তার চেয়ে বাপু ব্রহ্মা যেমন বলছেন তেমনি হোক্‌না। ঘট পুজো করো তোমরা।

পাড়ায় পাড়ায় পুজোর টিজারের রেষারেষিতে আমার পরাণ আঁটুপাটু। অগত্যা আমি পাড়ি দিলাম কৈলাসে। পড়ে থাক তোরা মৃন্ময়ী দুর্গা নিয়ে।

৩ অক্টোবর, ২০১৬

কাউন্ট ডাউন বিগিনস...

র্বভূতে তিনি চেতনায় আছেন? হায়রে! তাই মানুষ আজ অচৈতন্য? মানুষের সব কোমলপ্রবৃত্তি আজ কোথায় অন্তর্হিত হল? কোথায় লুকোল মানুষের চেতনা? মানুষ তো এখন জড় পদার্থ গো মা। এর মূলে কিন্তু তুমি। আমাদের সর্বভূতের সর্ব চেতনা তোমার মধ্যে তাই আমরা আজ চেতনা-চৈতন্যহীন হয়ে নিঃস্ব।

তুমি বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতা। তাই বলে মানুষের সব বোধবুদ্ধি কি তোমার কাছে গচ্ছিত ? তাই কি আজ সমাজের সর্বস্তরে মানুষের মধ্যে এত বুদ্ধির অভাব ? অথচ বুদ্ধিজীবিতে ছয়লাপ চারিদিক।

তুমি ক্ষুধারূপেণ সংস্থিতা। তবুও কেন মানুষের ক্ষুধা দূর করোনা? এযুগেও পৃথিবীতে খাদ্যের অভাব এখনো ।

তুমি নাকি লজ্জারূপেণ সংস্থিতা? তাই কি মেয়েদের সব লাজলজ্জা, বসন ভূষণ হরণ করেছ? তাই বুঝি আজ তারা দেশের আনাচেকানাচে, পথেঘাটে, অলিতেগলিতে, দিনেদুপুরে নির্লজ্জের মতো ধর্ষিতা? অপমানিতা, লাঞ্ছিতা?

তিনি শান্তিরূপেণ সংস্থিতা, তাই বুঝি ভুবনব্যাপী শান্তির বড়োই অভাব। সব শান্তি হরণ করে তিনি নিজেই আজ তুরীয়া নন্দিনী যে। তোমরা চাইলে উনি থোড়ি দেবেন। তোমরাই তো যুগ যুগ ধরে বলে আসছ, তাই উনি দুনিয়ার সব শান্তির ভান্ডার থেকে শান্তি হরণ করলেন কি? তাই বুঝি শান্তির এত হাহাকার।

তুমি শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, কিন্তু তাই বলে সব জাগতিক শক্তির আধার থেকে সব শক্তি কেড়ে নিয়ে বসে রইলে তুমি? এ তুমি কেমন তুমি? প্রকৃত শক্তির এত অভাব কেন ঘটালে মা?

তুমি স্মৃতিরূপেণ, নিদ্রারূপেণ, ভ্রান্তিরূপেণ সংস্থিতা.....ব্লা, ব্লা, ব্লা...

তাই বলে মানুষের স্মৃতির আগার থেকে সব স্মৃতিটুকুনি আর সেই সঙ্গে আমাদের ভুল ভ্রান্তি সব ঝেড়েপুঁছে নিয়ে বসে আছ? তাহলেও আমাদের এত ভুলভ্রান্তি হয় কেন গো মা? আর মানুষের এত ভুলে যাওয়ার রোগ ক্রমাগতঃ বেড়েই চলেছে। ঘরে ঘরে ডিমেনশিয়া। মানুষের চোখ থেকে সব ঘুম নিয়ে তুমি নিদ্রারূপেণ বিরাজিতা। আর তাই বুঝি এত অনিদ্রার প্রকোপ। ঘুম নেই কারোর চোখে।