২৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্লিজ, পজ এন্ড পার্ডন !!!

সেবারও অতিবৃষ্টি হয়েছিল । থৈ থৈ শ্রাবণের পথঘাট । উপছে পড়া জলের ভারে নদীনালা বানভাসি । গাছপালা ফুলপাতার মনে হয়েছিল হাঁফ ছেড়ে বাঁচি ।  আর চাইনে বৃষ্টি ! এবার থামবি তোরা ? মেঘ বিদায় দিবি? টুপটাপ, ঝরা বকুলও সিক্ত, কদম ঝরা সন্ধ্যে নিঝুম শান্ত  । মাটি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ছিল জলের থেকে ।   মেঘ মিনারে ফাটল ধরেছিল । বৃষ্টি কেঁদে চলেছিল অঝোরে । রোদের মুখ দেখেনি সবুজ ঘাস বহুদিন । এই বার্তা বোধহয় পৌঁছে গেছিল  বৃষ্টির দেবতার কাছে । মেঘের কাছে চিরকূট পৌঁছেছিল । তাই বুঝি বৃষ্টি এবার থেমেছে । বুকের কষ্ট চেপে রেখেছে মেঘ অতিকষ্টে । কোথায় থামতে হবে বুঝতে পেরেছে এতদিনে । প্রকৃতির এমনটি যদি প্রাণীকুল বুঝে নিত ! কোন্‌ এক অদৃশ্য মেল এসে যদি জীবজগতকে বুঝিয়ে দিত ! তাহলে না হত কোনো অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন বা মনকষাকষি ।   তাহলে সব সম্পর্কের খুঁটিনাটিগুলো নিয়ে সারাজীবন নিয়ে চলা যেত । আর সম্পর্কের কাঁটাতারের বেড়া না ডিঙিয়েও বেশ সুন্দর বেঁচে থাকা যেত ।   
এই সম্পর্কের "কাঁটাতারের বেড়া" শব্দযুগল প্রথম পড়েছিলাম জয় গোস্বামীর "জলঝারি" ব‌ইখানিটিতে। কাঁটাতারের বেড়া বড়ো ভয়ানক বস্তু।  ক্রস করতে গেলেই বিপদ । ক্রস করলে জয় হলেও হতে পারে কিন্তু জয় না করেও তো এপারেও দিব্যি কাটানো যায়। রামায়ণের লক্ষণরেখা ক্রস করে সীতার কি বিপদ হয়েছিল তা আমাদের সকলেরি জানা। কিন্তু আমরা হলাম জ্ঞানপাপী। প্রতিনিয়ত সামাজিক, রাজনৈতিক এমনকি নিজেদের আপনজনের সাথেও ডিল করার সময় সেই লক্ষণরেখা ক্রস করে যাই। ফলে নেমে আসে বিপর্যয়, মন কষাকষি, সম্পর্কের টানা ও পোড়েন। 

এখন না হয় ছেলেবুড়ো অনুপম রায়ের জন্য বলতে শিখেছে "আমাকে আমার মত থাকতে দাও"

আদতে সব মানুষেরি কিন্তু মনের কথা এটি। সে শিশু বা কিশোর, যুবক বা বৃদ্ধ সকলেই মনে মনে চায় এই স্বাধীনতা। 
 আমার ছেলে যখন খুব ছোট এক ডাক্তারবাবুর কাছে ওকে নিয়ে গেছিলাম পেটখারাপের চিকিত্সা করাতে। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন একটা দামী কথা।
-বাচ্ছাকে মানুষ করতে গিয়ে একটা কথা মাথায় রাখুন, "কেয়ারফুলি কেয়ারলেস" !
আমি বললাম -মানে?
ডাক্তারবাবু বলেছিলেন "মানে সে সারাক্ষণ কি করছে সে ব্যাপারে নাক না গলিয়ে কেয়ারফুলি তাকে আড়াল থেকে অবসার্ভ করুন কেয়ারলেস ভাবে যাতে সে বুঝতে না পারে যে আপনি ওর ওপর খেয়াল রেখেছেন।"
খুব কাজে দিয়েছিল কথাগুলো।

 শৈশব পেরোনো , কৈশোরের শিশুটিও কি চায় এমনটি? তার পড়ার টেবিল এলোমেলো, ব‌ইয়ের তাক অগোছালো। তার নিজের বৃত্তের মধ্যে একভুবন পৃথিবী আর বাইরের জগতে আপনজন। কিন্তু আপনজন তার ঐ অন্তর্বৃত্তটিতে নাক গলাতে গেলেই  বিপদ। হঠাত সদ্য টিন পেরোনো কিশোরের সেলফোনে চোখ রাখতে যান অনেক অভিভাবক। বিস্তর আর এন্ড ডি করেন সে কাকে ফোন করছে, কাকে কি মেসেজ পাঠাচ্ছে, বন্ধুদের সাথে কোথায় যাচ্ছে...এইসব নিয়ে। মানছি সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করার দায়িত্ব তাদের কিন্তু কোথায় থামতে হবে আর লক্ষণরেখা পেরিয়ে তার অন্তর্বৃত্তে প্রবেশ করব কিনা সেটা ভেবেচিন্তে করলেই কিন্তু অনেক মুশকিল আসান। সারাক্ষণ কানের কাছে কানাইয়ের বাসা যেন! মায়ের রাতে ঘুম নেই। ছেলেটা আমার কি করছে, কার সাথে মিশছে.....প্লিজ সেটা একটু দূর থেকে খেয়াল রাখুন মা, অত কাছ থেকে নয়। ছেলের সাথে সম্পর্কটা একবার খারাপ হয়ে গেলে পস্তাবেন পরে। বন্ধু হয়ে উঠুন, অভিভাবক নয়। 
ছেলে আরো বড়ো হয়ে যখন চাকরী পেল তখন তার রোজগারের টাকায় সে অহোরাত্র অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কি কিনছে জানতে চাইবার দরকার নেই আপনার। দেখবেন সে নিজে থেকেই দেখাবে আপনাকে। বারবার তার কাঁধের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে জানবার দরকারো নেই সে ফেসবুকে কার সাথে কি চ্যাট করছে। তার ক'জন গার্লফ্রেন্ড হল, তার উইকএন্ডের কি প্ল্যান, কোন রেস্তোঁরায় সে হ্যাঙাউটে যাচ্ছে সে....কি হবে আপনার নাক গলিয়ে? আপনি নিজের নিয়ে থাকুন। একটা সময়ের পর যার যার নিজের জীবন তার‌ই। বেশী প্রশ্ন করলে আপনার অপমানিত হবার সম্ভাবনাই বেশী। সেই থেকে আপনি ভুগবেন আত্মগ্লানিতে। বরং ডিনার টেবিলে একসাথে খেতে বসার সময়  একটু আধটু পুছতাছ হোক হাসিমুখে...ঠিক যেন সাপো মরলো অথচ লাঠিও ভাঙলোনা তেমন করে।  বেশী খোঁচানোর প্রয়োজন নেই। বেশী কিউরিওসিটি কিন্তু তাকে আপনার থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেবে। সে কি কখনো জানতে চেয়েছে আপনার কাছ থেকে আপনি কতবার কলেজ কেটে এ মার্কা ছবি দেখতে গিয়েছিলেন কিম্বা ইউনিভার্সিটির ক'জন ছেলেকে ফ্লার্ট করেছিলেন?  বরং আপনিও চলে যান তার সাথে হ্যাঙাউটে। জমিয়ে মুভি দেখুন, কব্জি ডুবিয়ে খান একসাথে। কিন্তু সেদিন বান্ধবীর সাথে সে বিয়ার খেয়েছিল কিনা বা রোজ রোজ পাবে যাস কেন, এসব কথা নৈব নৈব চ!  

তারপর সেই ছেলেটির টেটুম্বুর যৌবনে যখন তার সঙ্গী হয়ে এল অন্য পরিবারের একটি মেয়ে তখনো কিন্তু নিজেকে প্রতিমূহুর্তে গ্রুম করুন। 
এমনো অনেকের কথা শুনেছি স্বামী সারাদিন পর অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে তার মা পুত্রবধূটিকে অন্য কাজে পাঠিয়ে দিয়ে ছেলের সাথে গল্পগুজব করতেই থাকেন...দুটি প্রাণ খুব কষ্ট পায় তখন। মা ছাড়তে পারেননা তাঁর অধিকারবোধ। এতে কিন্তু তিনি ছেলে-বৌ দুজনের কাছ থেকেই অনেকটা দূরে সরে যান...সেটা বুঝতে পারেন না। 

নারীশিক্ষার প্রসার হয়েছে আমাদের দেশে । বালিকা আর বধূ হয় না শিক্ষিত সমাজে । শাশুড়িমাও কিন্তু শিক্ষিতা আজকের যুগে, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়ায় উভয়ই হিমশিম খান আজকের যুগেও । তার মূল কারণ কিন্তু এই লক্ষণরেখা ডিঙিয়ে অহেতুক অশান্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা।
ছেলে-বৌ কোথায় গেল, কি খেয়ে বাড়ি ফিরল অথবা শ্বশুরবাড়ির জন্য কি উপহার নিয়ে এল বিদেশ থেকে এসব জেনে আপনার কি লাভ মশাই? একবার ভাবুন তো আপনার শাশুড়ি যদি আপনাদের দাম্পত্য জীবনে এভাবে অহোরাত্র মাথা গলাতেন ভালো লাগত কি আপনার?

এবার আসি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে।  নিজেদের পারষ্পরিক বোঝাপড়ায় সম্পর্কের ঘানি টানতে টানতে ফেসবুকে আপনাদের বন্ধু হল অনেক। এবার স্বামীটির গার্লফ্রেন্ড তাকে কি মেসেজ পাঠাচ্ছে বা স্ত্রীয়ের বয়ফ্রেন্ড তার সাথে রাতে কতক্ষণ অনলাইন হচ্ছে, জানতে চাইলেই কিন্তু বিপদ হতে পারে। তার চেয়ে বলি আবারো বন্ধুতার মধ্য দিয়ে জেনে নিন কোনো দুর্ঘটনার আভাস-ইঙ্গিত পাচ্ছেন কিনা। সকলেই সকলের কমন ফ্রেন্ড হয়ে যান, রিস্ক ফ্যাক্টর কমে যাবে। আর কখনোই একে অন্যের মেলবক্সে কোথা থেকে মেইল উড়ে এল কিম্বা চ্যাটবক্সে কার মেসেজ সবচেয়ে বেশী আছে এসব নিয়ে আর এন্ড ডি মোটেও নয় কিন্তু। 
একবার এক আত্মীয়ের  বাড়িতে গেছি তার ছেলের বিয়ে উপলক্ষে। সেদিন তার বৌভাতের সকালবেলা। নবপরিণীতা বৌটির বাড়ির থেকে ফোন এসেছে। বৌটি তার সেলফোনটি নিয়ে যত‌ই আড়ালে যায়, তার শাশুড়িমাটি ছুতোয়নাতায় তত‌ই তার আশেপাশে ঘুর ঘুর করতে থাকে। আমি আর না পেরে সেই শাশুড়িমাটিকে অন্য ঘরে নিয়ে চলে এলাম এক অছিলায়। এখনতো তবু মোবাইল ফোনের যুগে। আমার বিয়ের পর আমার স্বামীকে তখন প্রায়শ‌ই অফিসের কাজে বিদেশ যেতে হত। তখন নব্ব‌ইয়ের গোড়ার দিকে মোবাইল ফোন নেই। ল্যান্ডলাইনে বিদেশ থেকে বহুমূল্যের ফোন কলটির  অপেক্ষায় থাকতাম আমি। আর ফোন এলেই সব কাজ ফেলে যেই সেই ফোনটি ধরতে যেতাম আমার দুই পিসিশাশুড়ি, জ্যেঠিশাশুড়ি সকলে সব কাজ ফেলে রেখে আমার কাছে মানে ঐ টেলিফোনটির চৌহর্দ্দির মধ্যে ঘুরপাক খেতেন।  অবশেষে আমি খুব ডিষ্টার্বড হয়ে ফোন রেখে দিতাম। 
বিয়ের সময় আমার বয়স ২৩ আর আমার স্টুডেন্ট স্বামীর ২৭।  একান্নাবর্তী বাড়ির এরা আমাকে দেখেশুনেই এনেছিলেন বৌ করে। বাড়িতে আমার শ্বশুরমশাই আর শাশুড়ি ছাড়াও ছিলেন নিঃসন্তান জ্যেঠশ্বশুর ও জ্যেঠিশাশুড়ি আর দুজন অবিবাহিত পিসিশাশুড়ি। আর ছিলেন শ্বশ্রুমাতার দিদি মানে আমার মাসীশাশুড়ি আর তাঁদের মা অর্থাত দিদিশাশুড়ি। এঁরা কিছুটা দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোল করতেন ।   আমরা ছিলাম বাড়ির মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ দম্পতি তাই কেন জানিনা আমাদের ওপর সকলেই ছড়ি ঘুরিয়ে অপার আনন্দ পেতেন সেই সময়ে মানে ১৯৮৯-৯০ সালে।  দক্ষিণের খোলা বারান্দায় দুজনে পাশাপাশি দাঁড়ালে সমালোচনা হত। অফিস থেকে তিনি ল্যান্ডলাইনে ফোন করলে প্যারালাল লাইনে কেউ একজন আমাদের ট্যাপ করত। এছাড়া অফিস থেকে তিনি ফিরলে তাঁর সামনে দাঁডানোর জো ছিলনা। আমাকে কেউ সেখানে দেখলেই তুরন্ত রান্নাঘরে খাবার গরম করতে পাঠিয়ে দিতেন। সে অফিস যাবার সময় আমার বাই করার তো কোনো কোশ্চেন নেই! নো ওয়ে!   টিফিনের সুস্বাদু খাবার খেয়ে আমার স্বামী ফোন করলেন একবার দুপুরে। কেউ একজন বললেন" যত্তসব! আদিখ্যেতা!" রবিবারের সকালে তাঁরা একজোট হয়ে মহাভারত দেখছেন। আমরা তখন আমাদের ঘরে গল্পে-আড্ডায় মশগুল। ছুতোয় নাতায় ঘরে ঢুকে  আমাদের অনাবিল শান্তি হরণ করে নিতেন। এমনকি নবদম্পতির ছুটির দুপুরে দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য ফোন করে অযাচিত অতিথিকে আপ্যায়ণ করতেও  ছাড়তেন না তাঁরা। উদ্দেশ্য একটাই আমাদের অবাধ মেলামেশায় যতিচিহ্ন টেনে দেওয়া।  আমি যেন পরপুরুষের সাথে গল্প করছি নিজের বেডরুমে বসে। আজ ভাবি তখন কেন whatsapp ছিলনা রে? শত্রুমুখে ছাই উড়িয়ে দেদার প্রেমালাপ করতে পারতি দুজনে!!! 

 সবশেষে বলি 
জীবনে এমনিতেই অনেক কমপ্লিকেশনস। তাই চারিপাশের আপনজনের সাথে বোঝাপড়াটাও একটু বুদ্ধি করে করুন। তাহলেই সকলের কাছেই আপনার ওয়ার্ম অ্যাকসেপটেন্স।
জয়জয়ন্তী সিনেমার  বিখ্যাত গানটি মনে আছে? "আমরা তো আর ছোট নেই, আর ছোট নেই, যেখানেই থাকি সেখানেই ভালো থাকব....."
সত্যি সত্যিই ভালো থাকব তাহলে ।  আর এত কথা শোনার পরেই যদি ভবি ভোলার না হয় তবে চালাও পানসি বেলঘরিয়া। ক্রস করেই ফেলুন লক্ষণরেখা, বিপদের ঝুঁকি নিয়ে। হয় এস্পার, নাহয় ওস্পার..য়া থাকে কপালে, একটাই তো জীবন, লড়ুন নিজেনিজেই, ডিঙিয়ে ফেলুন কাঁটাতারের অতিকষ্টের বেড়া। পা দিয়েই ফেলুন মনের মানুষটির, কাছের মানুষটির একান্ত আপন ঘেরাটোপের অন্তর্বৃত্তে। তবে মাথায় রাখুন 
"চলো লেটস গো" সিনেমায় রূপম ইসলামের সেই গানটি...

কাম ক্রস দ্যা লাইন,
মনের চৌকাঠ  
কাম ক্রস দ্যা লাইন
সময়ের বিভ্রাট
কাম ক্রস দ্যা লাইন
আমার হাতটা ধরো
কাম ক্রস দ্যা লাইন  
তুমি চাইলেই পারো ।  


প্রকাশিত কলকাতা ২৪x৭  

২২ ডিসেম্বর, ২০১৬

আমার ইলশে স্মৃতি

   টিপটিপ, টুপটাপ, ঝমঝম, ঝিরঝির... অপেক্ষার অবসান, বর্ষা এসেছে। আবার এসেছে আষাঢ় আমাদের শহরে। মেঘকালো করা সকালে মন বলে আয় কবিতা লিখি, উজাড় করি ফেসবুকের দেওয়ালে বৃষ্টিকাব্য। ওদিকে রান্নাঘর ডাকে আয়, ছুটে আয় । টেষ্টবাড গুলো লকলক করে বলে খিচুড়ি আর ইলিশমাছ ভাজা। 
ইলিশমাছের গন্ধে ভাতের খিদে একধাপ বেড়ে যায়। ভাত খেয়ে ছুটির দিনে দিবানিদ্রা কিম্বা অলসদুপুরে মাছের স্তুতিগান, এও বাঙালীর আরেক রসনা। মনে হয় কি এমন স্নেহ আছে এই ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডে? যার মোহে ইলশে পদ্যরাও ধরা দেয় ইলশেগুঁড়ির সাথে। বলে উঠি নিজের মনে 

ভাই ইলিশ, তুই খলবল কর জলে,
বড় হয়ে ওঠ, তারপর আয় দেখি !
রান্নাঘরে সর্ষে বাটি,  নুন-হলুদ-তেলে
জমিয়ে রাঁধি, তোকে ভাপাই লঙ্কা দুটি ডলে;

ভাতের হাঁড়ির মুখে কৌটো বন্দী ইলিশভাপা
নরম চালের গরম ভাতে মাছের কৌটো চাপা ।
সরষে ঝাঁঝে পরাণ গেল ইলিশ ম’ল দুখে
বেজায় কাঁটা, রূপোর মাছে  তবুও খাব সুখে ।

 কথায় বলে হালকা হাওয়া দেবে, ঝিরঝির করে অবিরাম ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেই থাকবে আর ঠিক তখনি ঝাঁকেঝাঁকে গভীর জলের এই ইলিশমাছ সমুদ্রের নোনা জল সাঁতরে, জোয়ারের অনুকূলে স্বল্প পরিশ্রমে,   নদীর কাছে আসবে, আমাদের ধরা দিতে। 
ছোটবেলায় সবচেয়ে মজা ছিল  রেনিডেতে  হঠাত ইলিশের গন্ধটা। হঠাত ছুটির সাথে বৃষ্টি আর হঠাত পাওয়া ইলিশের অনুষঙ্গে মন কানায় কানায় !
মায়ের সারপ্রাইজ। উনুনের পিঠে হাঁড়ির মধ্যে গরম ভাত আর তার মুখে চাপা দেওয়া একটা টিফিনকৌটোর মধ্যে বন্দী ইলিশমাছের ভাতে বা ভাপা । হলুদ পড়বেনা এই পদে।টাটকা মাছের গন্ধ নষ্ট হয়ে যাবে।  কৌটোর মধ্যেই নুন মাখানো ইলিশের গাদা-পেটি সর্ষে, কাঁচালঙ্কা বাটা, কাঁচা সর্ষের তেল আর বেশ কয়েকটি চেরা কাঁচালঙ্কার সাথে জারিয়ে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে মিনিট দুয়েক রেখে দিলেই এই অমূল্য পদ তৈরী।  আমার রন্ধন পটিয়সী দিদিমা তার বিশাল সংসারে বিরাট এক হাঁড়ির মুখে বিশাল এক কচুপাতার মধ্যে মাছগুলিকে ম্যারিনেট করে পাতাটি সুতো দিয়ে বেঁধে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে রাখতেন। মা বলত, সে ভাপা ইলিশের নাকি অন্য স্বাদ। দিদিমার নাতনী মানে এহেন আমি একটু ইম্প্রোভাইজ করে এই কায়দাটি করি লাউপাতায় মুড়ে এবং ননস্টিক প্যানে অর্থাত পাতুড়ির স্টাইলে। যাই করো এ কানুর তুলনা নেই। কাঁচা তেলঝাল, ভেজে ফোড়ন দিয়ে ঝাল, গায়ে মাখামাখা হলুদ সর্ষেবাটার ঝাল, বেগুন দিয়ে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বাঙালদেশের পাতলা ঝোল...সব‌ই যেন এই বর্ষায় দৌড়তে থাকে গরম ভাতের সঙ্গে। 
ইলিশমাছের কথায় মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। আমার বাড়ী গঙ্গার ধারে। বর্ষা এলেই  মোটা, কালো, দশাশয়ী চেহারার এক  হিন্দুস্তানী বুড়ো ধবধবে পোষাকে "হিলিস মাছ গোঙ্গা'  বলে চিল চীত্কার করতে করতে আমাদের পাড়ায় ঢুকত  । বুড়োটা কুচকুচে কালো । দুকানের কালো লতিতে  সোনার চকচকে মাকড়িটা দেখতে বড্ড ভাল লাগত । সে বাড়ির সামনে এলেই আমরা ভাইবোনে মিলে মাকে ধরে এনে ইলিশমাছ কিনিয়েই ছাড়তাম । ইলিশ মাছ আমাদের দুজনেরি ভীষণ প্রিয়।  সেই হিন্দুস্তানী মাছওয়ালা শীতকালে সন্ধ্যের ঝুলে গান ধরত, "বাদাম ভাজা খাইও, আউর ভুখে গুণ গাইও, ইয়ে ঝাল বানানেওয়ালা, ইসমে নমক ডালা হুয়া ...... ইয়ে গরম মুমফালি-ই-ই-ই " 
তখন বুঝতামনা শীতকালে বাদাম আর বর্ষায় ইলিশের কেমিস্ট্রিটা । মা বলেছিল, শীতে ইলিশ পাওয়া যায়না তাই পেট চালানোর জন্যে বাদাম ভাজতে হয় তাকে।
বাবার মুখে শুনেছি বিস্ময়কর ইলিশ উপাখ্যান। বাবা বলেছেন,
" প্রতিবছর বর্ষা শুরু হলেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি মাথায় করে চানে বেরোতাম ছুটির দিনে । যাবার সময় মা চার আনা পয়সা দিয়ে বলতেন নদী থেকে সদ্য ওঠা ইলিশ মাছ কিনে আনতে । সেই চার আনাটিকে অতি সন্তর্পণে ট্যাঁকে গুঁজে ঝাঁপিয়ে পড়তাম জলে । মাঝ নদীতে সাঁতার কেটে গিয়ে যখন মাছধরার জেলের নৌকো দেখতে পেতাম তখন উঠে পড়তাম নৌকায় । চার আনা পয়সা দিয়ে ইয়া বড় এক ইলিশ কিনে নৌকায় করে আবার ঘাটে ফিরে এসে বাড়ি যেতাম নাচতে নাচতে ।
পরবর্তী আকর্ষণ ইলিশের ভোজবাজি । যা দেখাতে  সিদ্ধহস্ত ছিলেন আমার মাতাঠাকুরাণী ।  এখন সে বড় ইলিশও আর নেই আর নেই সেই দামও'

প্রতিবছর আমার ছোটপিসিমা আসতেন বিহারের দ্বারভাঙা থেকে। বাবা তাঁর আবদারে দুটি বড় বড় ইলিশমাছ কিনে আনতেন। মা তাঁর ননদিনীর জন্য আহ্লাদে আটখানি হয়ে বঁটি নিয়ে বসে পড়তেন সেই মাছ নিজে কাটতে। জলে ধুয়ে নিয়ে এই মাছ কাটার রীতি নয়ত স্বাদ নষ্ট হয়। তারপর সেই মাছ একটি হাঁড়িতে করে নুন, হলুদ দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখা হত। পিসিমা তা নিয়ে মহানন্দে ট্রেনে উঠতেন। বিহারে ইলিশমাছ অপ্রতুল আর পিসিমা ইলিশের বড়‌ই ভক্ত। তাই এরূপ ব্যাবস্থা। এর দিন দশেক পর একখানি পোষ্টকার্ডে সেই ইলিশের জয়গান করে বার্তা আসত পিসিমার কাছ থেকে। টাটকা ইলিশ নাকি একরকম আর এই নোনা ইলিশ নাকি আরেক রকম। অনেকদিন রেখে খাওয়া যায়। 
বিশ্বে ইলিশমাছের সর্বোচ্চ উত্পাদন নাকি হয় বাংলাদেশে। কিন্তু একবার বিদেশ থেকে বাংলাদেশ হয়ে ফিরছিলাম।ভেবেছিলাম সত্যি পদ্মার ইলিশের স্বাদ নেব ভাগ করে।  ট্রানজিট ভিসায় দুপুরবেলা ঢাকার  একটি বেশ উচ্চমানের হোটেলে গিয়ে শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা দুপুরে ইলিশ মাছ চেয়ে পাইনি। তার বদলে বাঙালীর "চিলি চিকেন'  খেয়ে পেট ভরাতে হয়েছিল। 
বহুবার বাঙালবাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়ে সরস্বতী এবং কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোতে জোড়া ইলিশের পুজো দেখেছি । ধানদুব্বো, তেল-সিঁদুর মাখিয়ে বরণ করে নতুন শাড়ি পরিয়ে  জোড়া ইলিশের পুজোর পর জমিয়ে ইলিশমাছ ভোগ দেওয়া হয়।  আগে বলা হত সরস্বতীপুজোর দিনে শুরু আর ঐ লক্ষ্মীপুজোর দিনে শেষ । মধ্যিখানে আশ্বিন থেকে মাঘ অবধি আর ইলিশ খাওয়া যাবেনা। এর বিজ্ঞানসম্মত কারণটি হল মাছকে সংরক্ষণ করা । মাছকে আকারে বাড়তে দেওয়া।বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠের মধ্যে যুবতী থেকে গর্ভবতী হয়ে তবে সে বর্ষার জল পেয়ে নধর হবে। আর গুটিগুটি সেই পোয়াতি মাছ সাঁতরে সাঁতরে জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা জল থেকে  যত নদীর দিকে এগিয়ে আসবে তত তার শরীর থেকে আয়োডিন আর নুন ঝরে ঝরে মিষ্টতা বাড়বে। সেই অর্থে ইলিশ হল পরিযায়ী মাছ।মরশুমি সজীব শস্য। বর্ষার বিশেষ তিথিতে ধরা দেয়। বাকী সময় থাকে গভীর জলে। তখন তার মনের তল পাওয়া দুষ্কর। এইসময় সে খায় বিশেষ ধরণের জলজ শ্যাওলা। খেতে খেতে যত বাড়তে থাকে তত সে পুষ্ট ও নধর হয়। রূপে লাবণ্যে থৈ থৈ তার গর্ভিণী যৌবন যেন স্নেহ পদার্থের আধিক্যে ঢলঢল হয়। সেই বিশেষ ধরণের স্নেহপদার্থ বা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড সব মাছে থাকেনা তাই বুঝি ইলিশের এত কদর, অনন্য স্বাদ । হৃদরোগী থেকে ছোট শিশু সকলেই খেতে পারে এই মাছ। 

আজকাল খোকা ইলিশ ধরে নেওয়া হয় বলে আগেকার সেই বড় ইলিশের রমরমা নেই অন্ততঃ কলকাতার বাজারে। আর পাওয়া গেলেও তার দাম আকাশছোঁয়া। তাই বলতে ইচ্ছে করে  

অধরা এই জলজ শস্য, রূপোলী রঙের রূপসী পোষ্য
খেতেন পিতামহরা তস্য, পরিবেদনা কা কস্য !
খাচ্ছি যদিও চর্ব্যচূষ্য, তবুও অধরা বর্ষাশষ্য !   

 মনে পড়ে যায় রবিঠাকুরের গান "মেঘ বলেছে যাব যাব, রাত বলেছে যাই......'  এই যাই যাই করতে করতে বর্ষাও ফুরিয়ে যাবে আমাদের । আবারো  হাপিত্যেশ করে বসে থাকা পরের বছরের তরতাজা ইলিশের জন্যে।

আমার ঠাম্মা ছিলেন সাতখীরার মেয়ে। উনি বলতেন বর্ষার ক্ষুধামান্দ্য কাটাতে, ডিপ্রেশান কাটাতে ইলিশের জুড়ি নেই। তিনি ছিলেন রসেবশে ৫০% বাঙাল ও ৫০% ঘটি। তাই ছ্যাঁচড়া, অম্বল, কচুশাক দিয়ে ইলিশমাছের সব পদ‌ই সমান তালে রাঁধতেন জমিয়ে। আর বলতেন, যতদিন না দুগ্গাপুজো আসছে বর্ষায় হয় দুগ্গারুচি। দুর্গার জন্য উতলা, পুজোর জন্য এই পথ চাওয়ার প্রতীক্ষা আর একঘেয়ে খাওয়াদাওয়ার অরুচির দাওয়াই হল ইলিশ মাছ। এখন শুনছি ডাক্তারবাবুরাও এইকথা বলছেন....."যতদিন পারুন এই মাছ খেয়ে নিন। এ হল সোনার গৌর। একবার ছেড়ে দিলে আর পাবেন না। হৃদমাঝারে লালন করুন একে। হার্ট ভাল থাকবে, মন ও ভাল হবে' । 

কয়েকবছর আগে গঙ্গাবক্ষে এক ইলিশ উত্সবে গান গাইবার সুযোগ পেয়ে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম এই রূপোলী শস্যবিলাসে। 
সেদিন ছিল শ্রাবণের ঘন মেঘাচ্ছন্ন সকাল। কখনো ইলশেগুঁড়ি কখনো ঝমঝম বৃষ্টি । কেউ মিলেনিয়াম পার্ক, কেউ কয়লাঘাটা, কেউ আবার বাবুঘাট থেকে এসে সোজা জমায়েত হল ঐ জেটির কাছে।  স্টীমারে উঠে পড়লাম আমরা। স্টিমারের নীচে ইলিশমাছ ভাজার গন্ধে ম ম করছিল আশপাশ। আমরা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম। শুরু হল ঘাট পরিক্রমা আর সাথে লোকগান, বর্ষার কাজরী গান, বাউলগান ।  চোখ রাখতে থাকলাম গঙ্গার দুপাশের ঘাটে। কোনোটি ভগ্নপ্রায়, কোনোটি নিয়মিত সংস্কারের ফলে সেজেগুজে, বর্ষার জল পেয়ে ঝকঝকে ।  কোনোটি আবার ভেঙেচুরে   নিশ্চিহ্ন। মনে হল  বর্ষা, বৃষ্টি, ইলিশমাছ আর গঙ্গা এই অনুষঙ্গগুলি বাঙালীর প্রাণের। কিন্তু সেই গঙ্গার ঘাট আর সেই ইলিশের স্বাদ আজ আর অবশিষ্ট নেই  । সেটাই বড় কষ্টের। ছোট ছোট মাছগুলিকে ধরে ফেলার নিষেধাজ্ঞা কেউ মানছেনা। গঙ্গার ঘাটগুলিরও সংস্কার প্রয়োজন। নদীর নাব্যতা নিয়েও সংশয় রয়েছে।  তবে কি ইলিশও অবলুপ্তির পথে?  এই দোলাচলে বাড়ি ফিরে শান্তি পাইনি। তারপর বছর তিনেক কেটে গেছে। গঙ্গা ও ইলিশ দুইকে বাঁচা তে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ দেখলাম কি আমরা? গঙ্গাই তো সুস্বাদু ইলিশের ঘরবাড়ি। গঙ্গার জলেই তার সঙ্গীর সাথে প্রতিনিয়ত মৈথুন, জীবনযাপন ও সহমরণ । তবুও বাঙালীর কোনো হেলদোল নেই।  


অবসর ( তথ্য ও বিনোদনের ওয়েবসাইট )

২০ ডিসেম্বর, ২০১৬

শীতকালীন জার্নাল



পিকনিক-১








তুণীর বাসে উঠেই চটপট সকলের মাথা গুণে নিয়ে বলল মোট বত্রিশ জন আমরা। গুণ গুণ করে উঠল নিজের মনে ...একদিন দল বেঁধে কজনে মিলে... এবার  দেখি তো তোরা ক'জন জানিস "পিকনিক" শব্দের অর্থটা।
অঙ্কিতা বেশ সচকিত হয়ে জবাব দিল, চড়ুইভাতি।
বিপাশা বাসের কোণা থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠল বনভোজন।
তুণীর বলল ওটা তো প্রতিশব্দ বাংলায়। পিকনিক শব্দটার উত্সটা জানিস কেউ?
তিতলি বলল, জানতাম একটা ফ্রেঞ্চ শব্দ।
তুণীর অমনি বলল, স্পেলিং বল দিকিনি । 
তিতলি সপ্রতিভ হয়ে জবাব দিল, picque-nique। 
এবার মানে বল দেখি। তুণীর বলল।
তিতলি আমতা আমতা করে বলল, ফার্স্ট পার্ট picque মানে pick আর সেকেন্ড পার্ট nique মানে ? 

তিতলি বলল, ঐ আর কি, টুকটাক তুলে নিয়ে মুখে পুরে দাও যেখানে, তার নাম‌ই পিকনিক। 
অঙ্কিতা আর বিপাশা বলল, তোরা কত কিছু জানিস রে!
অতএব খাওয়াটাই পিকনিকে প্রধান। আরেকটা হল বাড়ির বাইরে। সেটা রান্না করেই নিয়ে যাও সকলে মানে যাকে বলে পটলাক অথবা গিয়ে রান্না করে খাও, আক্ষরিক অর্থে বনভোজন যাকে বলে। তুণীর বলল।   
আগে ছিল নিজেরাই হাত পুড়িয়ে খাওয়া। কি ভাগ্যিস এখন কেটারার সঙ্গে যায়! তিতলি বলে ওঠে। একদিন আউটিং এ যাও, আবার রান্নার যোগাড় দাও। এখন টোটাল ব্লিস বস্‌! 
তবে যাই বল বাপু, কাঠকুটো জ্বেলে মাংসের ঝোল আর ভাত রান্না করবার মজাটাই ছিল অন্য রকমের। অঙ্কিতা বলল। 
বিদিশা বলল, একটা ছুটির দিন শনিবার, আবার পিকনিকের জোগাড়? রক্ষে করো বাপু!

সেদিন ছিল সোনা রোদ গলে পড়া এক শীতভোর। সেদিন ছিল নদীর জলের ঠান্ডা ভোর। কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে পোষের পিঠে চড়ে রোদ এসে নেমেছিল গড়চুমুকে। হাওড়ার মৃগদাব গড়চুমুকে। তূণীর এন্ড কোম্পানির চড়ুইভাতির সকাল তখন বনভোজনের দেশে পাড়ি দিয়েছিল । সাদাসাদা ফুলকো লুচি আর নতুন আলুর সাদা চচ্চড়ির গন্ধে মাত গড়চুমুকের নদীর ধার। সেক্টর ফাইভের একদল টেকি  গিয়ে হাজির হল নদীর ধারে । শীতের সব অনুষঙ্গ যেমন নলেনগুড়, কমলালেবু, মটরশুঁটি, লেপ-বালাপোষ, পশমিনা-পুলওভার নিমেষে উধাও চড়ুইভাতির আনন্দে। হফতা ভর কাজের চাপে শীত ফুরায়। ভাবতে ভাবতেই দোল ফুরোয় । অমৃত কমলার মিঠে রোদ, উলকাঁটার দুপুর গড়িয়ে যদি চৈত্র এসে যায়? তার আগেই চল প্ল্যান করি, তূণীর হল অফিসের পিকনিক প্ল্যানার।
এখন শুধুই শান্তি জলের ধার। শুধুই শান্তি নীল আকাশ। নীল আকাশ গিয়ে চুমু খেয়ে নিল দামোদরের পাড়কে। নদের জল উছলে উঠল ছলাত করে। সকলে একটু ছুঁয়ে নিল নদের পাড়ের ক্যাসুরিনার নুয়ে পড়া সবুজ পাতা ভরা ডালকে। ডিজিটাল ক্লিকে মুখর হল আশপাশ। এখানেও সেই পোষমাস। যা এসেছিল  আমাদের শহরেও। এখানেও সেই শীত ছিল যা ছিল আমাদেরো। এখানেও পারদ নামে প্রতিবারের মত। শীত আসে, শীত যায়। চড়ুইভাতি ফুরিয়ে যায়। সকলেই  পরিযায়ীর মত ঘরে ফিরে যায় । শীতঘুমিয়ে ফুরিয়ে যায় শীত।
ভাগীরথী ও দামোদর মিশেছে হাওড়া জেলার গড়চুমুকে। ৫৮ গেট বলে জল ধরে রাখার ও ছাড়ার বিশাল স্লুইসগেট। ডিয়ারপার্ক। জমপেশ উদরপূর্তি, গানের লড়াই, কুইজ,খেলা । সবমিলিয়ে শীতের অমৃত কমলার দুপুর জমজমাট!

পিকনিক-২ 


 
"আপ্‌কো কিতনা বার বোলা থা, জলদি আনেকে কে লিয়ে? হমলোগ ব্রেকফাস্ট খায়েঙ্গে ন'বাজে। যাইহোক অব স্টার্ট তো কি জিয়ে।" গাড়ী ভর্তি লোকজন বন্দনাদির হিন্দি শুনে হাসিতে ফেটে পড়ল।   সাড়ে আটটায় ছাড়ল টাটা উইঙ্গার। সদলবলে ব্যান্ড মাষ্টার চললেন পাঠচক্রের সদস্যাদের নিয়ে। সিনিয়ার সিটিজেনরা সবেতেই বিরক্ত, অধৈর্য বুঝি! মনে মনে ভাবলেও পরক্ষণে গাড়ি ছাড়তেই তাদের মুখে স্বর্গসুখ যেন।

সাদার্ণ এভিনিউ আসতেই গাড়ি বাঁদিকে ঘুরছে। কেন? কেন আবার? ডানদিকে ফলতা যদিও কিন্তু ডায়মন্ডহারবার দিয়ে গেলে "গঙ্গাসাগর মে হমারা গাড়ি পাকড় লেগা" মতলব? বারুইপুর, আমতলা ঘুমকে জানা হ্যায়। তার মানে? কড়াইশুঁটির কচুরী-কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা দিয়ে আলুর তরকারী, চা, নলেনগুড়ের সন্দেশ ভোগে? পেছনের সিট থেকে প্রবাসী শুভশ্রীদির হুঙ্কার শিট্‌! আমার বাঁদিক থেকে মনীষামাসীর অনুযোগ...আপনার তো বোলনা চাহিয়ে থা! ডান দিক থেকে বন্দনাদি তখন তারস্বরে গেয়ে চলেছে..." আমার পরাণো যাহা চায়....তুমি তাই...." অমিতামাসী বলে উঠল, তুই চুপ্‌ করবি বন্দনা? আমার মাইগ্রেন শুরু হয়ে গেল। বাড়ি থেকে শুধু এককাপ চা খেয়ে বেরিয়েছি আমি" আবার শুভশ্রীদি রোদচশমাটা মাথার ওপরে তুলে বলে উঠল, ডিসগাস্টিং! দিস ইস কলকাতা! ব্যান্ড মাষ্টার তখন ড্রাইভারের সাথে বলে চলেছে একনাগাড়ে... এডভান্স লেনে কা টাইম মে ইয়ে মালুম নেহি থা? বলতে না বলতেই হুশ্‌ করে গাড়ি এসে পড়ল। ড্রাইভার বলে কিনা উতর যাইয়ে! হমারা গাড়ি নেহি হ্যায়! মালিকনে বাতা দিয়া....ব্লা, ব্লা, ব্লা....তখন উনি মানে আমার হিরোটি বলে উঠলেন

" অগর হমলোগ উতর জায়েঙ্গে তো আপ জিন্দা নেহি ঘর পৌঁছেঙ্গে....." উরিব্বাস! একদম অক্ষয়কুমার মার্কা ডায়লগ! পেছন থেকে মিসেস বালসারা তো ভয়ে, কুঁকড়ে অস্থির।
তাদের আরেকটি প্রাইভেট কার তখন ফোন করে বলেই চলেছে, এই শোনো,  আমরা না ডায়মন্ডহারবারের পথ দিয়েই চললাম...কচুরিটা না ফাটাফাটি খেলাম।

এক মাসীমা সেই শুনে বলে উঠলেন, তো? আমরা যাবার আগেই কচুরি খেয়ে নিলি?
 ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের আদরের পিকনিক স্পট ফলতা এসে পড়ল।

ফলতা আসতেই আরেক মাসীমা  বলে উঠলেন, "ইতনা সংকীর্ণ গলি মে কিঁউ ঘুসা?"
আর বাকীরা হেসে কুটি আর পাটি।

এই করতে করতে অবশেষে ফলতা পৌঁছে ওনাদের যেন মনে হল বিশ্বজয় করেচেন । কে যেন গাড়িতে বলছিলেন তাঁর অম্বল হয়েছে। কার যেন গ্যাসের ব্যাথাটা বাড়ছিল। কেউ একজন মাইগ্রেনে কষ্ট পাচ্ছিলেন। আর ব্যান্ড মাষ্টারের  টেনশনযুক্ত এহেন মনের অবস্থা, পেটের ভিতর ছুঁচোবাবুর ডন-বৈঠক দেওয়া....সবকিছুর আগুণে জল পড়ল। গঙ্গার ধারে টেবিল পাতা লোকনাথ রেসর্টে কি ভালোই আয়োজন করেছিল তাদের কলকাতার ঠাকুর(ওরফে কেটারার)..টোপা টোপা, পুর ঠাসা, বটলগ্রীন রংয়ের কড়াইশুঁটির কচুরী পেয়ে মুখে সব কুলুপ এঁটে বসে গেল চুপচাপ। ঝগড়া তখন মাথায়। গাড়ির কাজিয়া রণে ভঙ্গ দিয়েছে ততক্ষণে। তাপ্পর ছোট ছোট জগদীশবাবুর বাড়ি দেখতে।
আঃ মলো যাঃ! বোস ইন্সটিট্যুটের সরকারমশাইরা তাদের ঢুকতে পর্যন্ত দিলনি! বজ্র  আঁটুনি সেথায়।
আমরা এতোই অছ্যুত! শুভশ্রী দি তো বলেই বসলেন।
তা বাপু তোরা সব তোদের মত সব গেম খেলার ব্যবস্থা কর দিকিনি। সিনিয়ার একজন বললেন। হাই টেম্পো তাঁর।
তারপর বন্দনার ফোনে লাইভ কমেন্টারি...
 সিনিয়র সিটিজেন মাসীমাদের স্মৃতিতে শান দি‌ইয়েচি বাপু...মেমারি গেম খেলিয়েচি, ক্যুইজ হল, ডাম্ব-শারড, হাউজি, ছোট্ট ক্লু থেকে  ৫ মিনিটে পাঁচ লাইনে অণুগল্প, সব করিচি। খেলতে খেলতে সেকেন্ড রাউন্ড চা আর পকোড়া এল। মাসীমাদের কি খুশি! তাপ্পর হেব্বি লাঞ্চ করিচি...মেইন কোর্সে দ‌ইমাছে আখাম্বা কাতলা ছিল আর চিকেন চাঁপ। ও হ্যাঁ, মধুরেণ সমাপয়েত আমসত্ত্ব-আলুবখরার চাটনী আর নলেন গুড়ের রসোগোল্লা!
জেরিয়াট্রিক এই মহানগরে এই মানুষগুলি ব্যান্ডামাস্টারের বড্ড ওয়েল উইশার। এরা বছরের এই একটি দিন বসে থাকেন তার  মুখ চেয়ে। কবে সে একটু নিয়ে যাব এদের পিকনিকে!

পিকনিক-৩


 

এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার রায়পুর। গঙ্গার ধার, মাঘের শীত বাঙালীর তসরে, পুলওভারে, টুপিতে, পশমিনা চাদরে। কনকনে হাওয়া, মিঠে রোদে ভেসে যাওয়া সকালে বনভোজন। কলেজের প্রফ দের বার্ষিক পিকনিক  ! কেউ লেট করতে করতে অবশেষে আরও কিছুকে তুলে নেয়  লাস্ট  গাড়িতে। তারপর চারটে গাড়ির কনভয় অবশেষে নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছয় । ফুলকো ফুলকো লুচি আর কড়াইশুঁটি দেওয়া সাদা আলুচচ্চড়ি।
" সারাবছর আমরা এইদিনটার জন্য মুখিয়ে থাকি স্যার"  ডাব কেটে দিতে দিতে অফিস বেয়ারা বলে ওঠে।  তারপরেই ডাবের জল আর ভদকা কিম্বা পাতি বিয়ার।সঙ্গে শীতসব্জীর পকোড়া, চিকেন পকোড়া আর রুইমাছ ভাজা। নদীর ধার দিয়ে ডিঙিনৌকায় চলে মাছওয়ালা....
" কি মাছ আছে?”  উত্তর এল খোকা ইলিশ।
" খেলবনা " 
" কেন ম্যাডাম?”
" ধরেছো কেন?”
" কি খাব? আপনারা কিনলে একটু রোজগার হয়, ভালো দাম পাব, এই দেখুন, একদম লড়ছে, ডিম হয়নি।কুমারী ইলিশ। আজ যেকটা ধরেছি সব আপনাদের দি‌ই তবে?”
বললাম, " কথা দিতে হবে, আর ধরবেনা।"

" এই শীতকালেই তো পিকনিক পার্টির রমরমা, তারপরেই হাতখালি। কিছুই নেই বাংলায়। ছেলেপুলেদের পড়াশুনো করিয়েও লাভ নেই । চাকরী কই? অগত্যা মাছ ধরেই বেচি। তারপর অসুখবিসুখ, নৌকো মেরামতি, ঘরের খড়, জমির ধান, মেয়ের বিয়ে...কোথায় যাই? মাগঙ্গার সাথেই ওঠবোস, গঙ্গার কাছেই সারাদিন মিনতি জানাই, শরীল থাকতি নিয়ে নাও মা "

মাছ ছিল সর্বসাকুল্যে এককেজি দুশো গ্রাম। তাই স‌ই। কেটেকুটে খাবি খাওয়া মাছভাজা সকলেই খেল চেটেপুটে। মন মানলোনা। কামড় দিয়েই মনে হল হায়রে দারিদ্র্য! কোথায় মাগঙ্গা! কোথায় সেই ছোটবেলা? এককিলোর কম ইলিশ আমরা চোখেই দেখিনি। জেলেটির কথাগুলো‌ও তো ফেলতে পারিনা। খোকা ইলিশ ধরা বন্ধ করা হল কিন্তু এই জেলেটির সেদিনের ভাত কে জোটাবে? তবুও তো পেল পাঁচশোটা টাকা। এরপরেই সবশুদ্ধু নৌকাবিহার। ম্যাডামদের হাতে ডাবেরজল মিশ্রিত ভদকার গ্লাস, স্যারেদের হাতে বিয়ার আর পেপার ন্যাপকিনে মোড়া গরম ভেজ পকোড়া আর মাছভাজা.....কত গান,কত কবিতা আর  কত ফূর্তি ! ভেসে গেলাম গঙ্গাবক্ষে নৌকায় টানা একটা ঘন্টা । কনকনে উত্তুরে হাওয়ায় আমাদের শাল-দোশালা, জ্যাকেট, সোয়েটার টুপি, মাফলার আরো কতকিছু শীত অনুষঙ্গে মাঘী শীত জমে দৈ!
যথাসময়ে গরম ভাত আর মাটনকারিতে ভরাপেটে আবার ভরা মানে তেলা মাথায় তেল বা Carrying Coal to New Castle । তারপরেই জয় মা বলে গঙ্গার ধারে ভাসাও থার্মোকলের থালার তরী! পরপর গঙ্গার ধারে পিকনিক স্পট। পিকনিক স্পটের মালিক পয়সা নিয়েছে। রসিদ দিয়েছে। কিন্তু কোনো ট্র্যাশ ফেলার জায়গা নেই।
মাননীয় সরকারী অফিসাররা, আপনারা কি নৌকাবিহারে যান? তবে দেখে আসুন গঙ্গার ধারের আবর্জনাগুলো। এখনো কত জাহাজ চলে এই গঙ্গায়। এখনো কত জল, কত সুন্দর তার রূপলালিত্য! আজও  ডিজিটাল ক্লিকে মুখর হয়  নৌকাবিহার, গঙ্গার বিস্তীর্ণ দুপার, রঙ্গীন জাহাজ।, পালতোলা নৌকা।

পিকনিক-৪

 

এবার কাকভোরে বেরিয়ে হাজার ঘড়ি গ্রামের কুমোরপাড়ায়। বাড়ীর কাজের মেয়ের পিকনিকের নেমন্তন্ন বলে কথা! দক্ষিণবাংলার নদীমাতৃক অঞ্চল। আরো কিছুটা এগুলেই সমুদ্রের নোনা জল আর বালিয়াড়ি দেখা যাবে । গ্রামবাংলা অনেকটাই শহুরে হয়েছে নগরায়নের দৌলতে। অরণ্যমেধ যজ্ঞের সামিল হয়ে । কিন্তু গ্রামবাংলার মানুষের সেই দারিদ্র, সেই অতিবৃষ্টির জন্য বানভাসি ঘর দুয়ার অথবা খরায় বৃষ্টির হাহাকারে ধান লাগাতে না পারার কষ্ট রয়েই গেল । যারা পারল তার মধ্যে থেকেই পালিয়ে গেল চেন্নাই অথবা হায়দ্রাবাদে কিম্বা ব্যাঙ্গালোরে, যা হোক একটা চাকরী নিয়ে আর যারা নিতান্ত‌ই সাদাসিধে, অল্পে সন্তুষ্ট তারা পড়েই থাকল বদ্বীপের ফাঁকে অধঃক্ষিপ্ত নাগরিক হয়ে । পঞ্চায়েত আপিসে হানা দিল। পার্টি আপিসে দৌড়ালো অথবা ভোটও দিল কথামত ঠিক সময়ে, সঠিক চিহ্নে । তবুও তাদের উত্তরণ হলনা । তারপর চল বৌদি, মন্দিরে। একাদশ শতাব্দীতে তৈরী অতি প্রাচীন একটি মন্দির দেখতে যাওয়া  ।
 মন্দিরের নাম জটার দেউল । স্বয়ংভূ শিব মন্দির । আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার দেখভালে  মন্দির ও তার আশপাশ বেশ সংরক্ষিত তবে তৃতীয় বিশ্বের চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিকরা যথারীতি পর্যাপ্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক পূর্ণ করে ফেলেছে ঐ সুন্দর এবং নিরিবিলি স্থানটিকে । ঐ একটি কাজে আমরা খুব পটু। তা হল নিয়ম ভাঙা । সেখানে গার্বেজ ফেলার ব্যাবস্থা করে রেখেছে এ এস আই তবুও সংবরণ করা যায়না যত্রতত্র জঞ্জাল ফেলার অভ্যাসকে ।  মন্দিরের গায়ে পোড়া ইঁটের ওপর নিখুঁত স্থাপত্য ।  অনেকটাই সময়ের ভারে নষ্ট হয়ে গেছে । অভ্যন্তরে গর্ভগৃহের মধ্যে তাকালে দেখা যায় কত উঁচুতে দেওয়ালের গায়ে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানোর ব্যাবস্থা ।
ঐ গ্রামের বৌটি আমাদের জন্য লুচি আর আলুর দম বানিয়ে হাজির হয়েছিল রায়দীঘিতে । তারপর গরম চা । সেখান থেকে আমরা গেলাম সেই গ্রামের আতিথেয়তার স্বীকার হতে । পূর্ব পরিকল্পিত চড়ুইভাতি বা প্রকৃত অর্থে বনভোজনের মেজাজ নিয়ে । ধানজমির সরু আলের মধ্যে দিয়ে ডাইনে পান্নাপুকুরের সবুজ জলে ভাসমান গোলাপী শালুক আর বাঁয়ে গোলা ভরা ধান চলল সাথে ।  কোথাও হলুদ সর্ষে ক্ষেত কোথাও আলু, একফালি সবুজ কচি ধানগাছের পিছনে সয়াবিনের ক্ষেত অথবা ফুলকপি ।
বড় সুন্দর এই অনুভূতি। শহর থেকে গিয়ে শুধু সবুজে চোখ জুড়োনো যে কি ভালো লাগে! বারবার এই  মাটির রূপ দেখতে ইচ্ছে করে । দীঘিভরা জল করে টলমল।শীতকালে খেজুরগাছে হাঁড়িবাঁধার ধুম । আর স্নানের অছিলায় গ্রাম্য বধূর পুকুর সাঁতরে গামছা দিয়ে চিংড়ি-কাঁকড়া নিয়ে ভিজে কাপড়ে ঘরে ফেরা । 

এখনকার প্রজন্মের কাছে শীত-পিকনিক মানেই কেটারিংয়ে কব্জি ডোবানো, দুটো সাউন্ডবক্স থেকে জোরদার গানের সাথে উদ্দাম নৃত্য আর ইবিজা, কান্ট্রিক্লাব বা বেদিক ভিলেজের মত বিলাসবহুল আপ্যায়নে অবগাহন। এর থেকে অব্যাহতি পেতে গতকাল আমরা বনভোজনে গেলাম দক্ষিণবঙ্গের রায়দিঘীর কাছেই এক গ্রামে ।পালবংশের আমলে তৈরী অতি প্রাচীন মন্দির "জটার দেউল" দেখা একটি বিশেষ পাওয়া ।
খাড়ির জল যত্রতত্র খেলে বেড়ায় সেগ্রামে ।   মাটীর নীচে কাঁকড়ার বাসা যেখানে আর ধানক্ষেতের আলের ওপর দিয়ে দিয়ে হেঁটে আসা যায় সেখানে । কুড়োনো যায় নোনাবালির মধ্যে থেকে ঝিনুক আর শামুকের খোলা । সুন্দরী আর গরাণ গাছও আছে কিছু । কচি কচি টোপা কুল ধরেছে গাছে । কচি নারকেল পাড়িয়ে তেষ্টা মেটানো।খেজুর গাছে হাঁড়ি এখনো বাঁধেনি তারা । ঠান্ডা নেই । কুয়াশা নেই তাই । বড় বড় কাঁকড়া ধরানো হল গর্তর মধ্যে থেকে । দাম পেয়ে গ্রামের মানুষ ও বেজায় খুশী । আমাদের পিকনিকের  গরম ভাত মাটির উনুনে ফুটতে লাগল । আমরা পৌঁছতেই মাটির ঘরের দালানে রেডি দুপুরের আহার ।গরম ভাত, ডালের সাথে নদী থেকে সদ্য ধরা চুনোমাছ ভাজা, ক্ষেতের টাটকা শাকসব্জীর চচ্চড়ি, দিশী মুরগীর ঝোল আর টমেটোর চাটনী ।

তেলা মাথায় তেল না দিয়ে তোমরাও ভেবে দেখতে পারো গ্রামের মানুষদের সাথে কি করে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মাটির গন্ধ নিয়ে পিকনিক করে আসা যায় । প্রকৃত অর্থে চড়ুইভাতির মজা পাবে। মাটির উনুনে রান্নাবান্না আর টিউকলের জলে আঁচানো সব মিলিয়ে আমি ও আমার সর্বক্ষণের ওঠাবসার সাথীরা বেজায় খুশি । আর অতিথি আপ্যায়নে গ্রামের মানুষের কোনো খামতি নেই । ফেরার পথে তাদেরি বাড়ির একজন প্রত্যেকের হাতে একঠোঙা করে মুড়ি, আলুর চপ আর বেগুনী দিয়ে দিল গরম গরম । তারপর গাছের কলাটা, মুলোটাও। ওরাও খুশি একটু বিক্রিবাটরায়  আর আমরাও খুশী তরতাজা প্রাকৃতিক বনভোজন সেরে ।

পিকনিক-৫ 





জায়গাটা কলকাতার খুব কাছেই। নাম "বনের হাট'। আর এটা বারুইপুরে একটি ছোট ঘরোয়া বনভোজনের স্পট।সবুজ গাছগাছালি ঘেরা, একটুকরো জলের ঠাণ্ডা ধার, তক্তপোশে শীতলপাটি বিছানো একটা ছোট্ট বিশ্রামের কুঁড়ে, রান্নাবাটির জন্য টালির শেড, বাথরুম সব আছে তবে নেই ইলেকট্রিক। তাতে অবিশ্যি অসুবিধেও নেই। দিনে দিনেই ফিরে এসেছি আমরা।
কলকাতা থেকে  সোজা বাইপাস দিয়ে বারুইপুর স্টেশন। তারপর ফ্লাইওভার পেরিয়ে ওপারে গিয়ে নেমে সোজা যে রাস্তা ক্যানিং এর দিকে গেছে সেটা ধরা। পেরুবে ফুলতলা, রামনগর হাইস্কুল তারপরেই রাস্তার ওপরেই ডানদিকে পড়বে ঝাঁ চকচকে রেসর্ট যার নাম বনের হাট। যাবার রাস্তা খুব ভাল (টাচ্‌ উড্‌) । ভোরবেলা গড়িয়াহাট থেকে সময় লাগল মাত্র ৫০-৫৫ মিনিট। বেলা বাড়লে বাজারের ভীড় পড়ে তাই বেশী সময় লাগে। এহেন বনভোজন @ বনের হাট ছিল গতকাল  অর্থাত অঘ্রাণের অলস ছুটির দিনে।  শীত পড়তে না পড়তেই বাঙালীর কফি আর স্যুপ প্রেম যেমন উথলে ওঠে তেমনি আর কি পিকনিক প্রেমেও ভেসে যায় অমৃত কমলার ভোর। সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে দুপুরের চাইনিজ লাঞ্চ সব কিছুই হল ঠিকঠাক। আবারো কেউ ভুললেন হাঁফের টান, কেউ আরথাইটিস, কেউ বা COPDর কষ্ট, কেউ ডিপ্রেশান, কেউ আবার পিকনিকের এক্সাইটমেন্টে রাতের ঘুমটুকুনিও।

আমার কাছে বৈচিত্র্যময় রূপসী বাংলার শীতের উইকএন্ড মানেই বেরিয়ে পড়বার সুখ। বেরিয়ে পড়া মানেই সদলবলে কাছেপিঠে পিকনিকের আনন্দ। বেরিয়ে পড়া মানেই অফুরান হৈ চৈ তে সামিল হয়ে ওঠা। যে ঐশ্বর্য্য এখনো অধরা  তার দিকে দু চোখ মেলে দেওয়া। আর তারিয়ে তারিয়ে আমার বাংলার রূপলাবণ্য উপভোগ করা।  

গ্রীষ্মে যাই উত্তরবাংলায় হিমালয়ের কোলে দুটিপাতা-একটি কুঁড়ির স্বর্গরাজ্যে তো শীতের রোদের গনগনে আঁচে ছুটে যাই সাগরের দিকে । কোনোবার বসন্তের পিকনিকের ভোরে ছুটে গেছি দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে লালমাটির দেশে কিম্বা বাসন্তী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা ইছামতীর ধারে বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টাকীতে। অথবা বসন্তের পাহাড়ে পলাশের আগুণ লাগা মুকুটমণিপুর কিম্বা শঙ্করপুরের সমুদ্রসৈকতে । 
রূপসীবাংলার বুকে পিকনিকের গল্প এক বৈচিত্র্যময় রূপকথার মত। এ গল্প ফুরোয়না। কালেকালে আরো যেন রূপবতী হয় আমার বাংলা। থৈ থৈ তার রূপ লাবণ্য নিয়ে। মানুষ পিকনিকে আসে, পিকনিকে যায় প্রতি বছর। একটু জিরেন আধটু নিরালার খোঁজে।   
প্রতিবার বাংলার সবুজে বনভোজনের মজা পাই আর ফেরার সময় তাকে বলি...
তোমার সবুজে সবুজ আর নীলিমায় নীল দিগন্তে আমি মোহিত আবারো । আক্ষেপ কেবল একটাই.. শুধু চাই ভালো ও চওড়া রাস্তা যাতে শহর থেকে গ্রামের মানুষগুলো সহজেই আসা-যাওয়া করতে পারে আর চাই একটু শিল্প । গ্রামবাংলার যা আছে তা অনেকের কাছে ঈর্ষার । শুধু চাই দক্ষ পরিচালনা  আর পরিকাঠামো । চাষের জমি থাকুক । পাশাপাশি ফ্যাক্টরি  হোক দু-চারটে ।  ঐ মানুষগুলোর কর্মসংস্থান হোক  ! শুধু চাষ করে আর মাছ কাঁকড়া ধরে ওদের বালবাচ্চাগুলোর দুবেলা পেটটা হয়ত ভরে কিন্তু কুঁজোরও তো চিত হয়ে শুতে ইচ্ছে হয় !

Truly your's হয়েই থাকলাম পশ্চিমবাংলা।

কলকাতা ২৪x৭ রোববার

অঘ্রাণের সুঘ্রাণে


হেমন্তে কোন্‌ বসন্তেরই বাণী শুনছ কি? অমি কিন্তু শুনছি দিব্যি।  ভোরের গোলাপী কুয়াশায় আর সন্ধ্যের হিমঝরা নেশায় আমি শুনতে পাচ্ছি অঘ্রাণের পদধ্বনি।  আমার অঘ্রাণের অনুভূতিমালা কখনো বেশ মায়ামাখানো কখনো আবার করুণ। ঠিক যেন তার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার মত।  তাই তার পাতাঝরার টুপটাপ শব্দ পেলেই  সদা ভয় হয়, তারে হারাই হারাই । এখন  ঠান্ডা তো আর পড়েইনা আর এসেই যাই যাই করে। শীতফুলগুলো চোখ মেলে চাইতে না চাইতেই শীত ফুড়ুত। রবীন্দ্রসরোবরের বিদেশী পাখীগুলোর মত শীতও এখন পরিযায়ী আমাদের শহরে। তাইতো তাকে হারিয়ে ফেলি চকিতে। আর যেটুকুনি পাই সেটুকুনি চেটেপুটে নি আহ্লাদে। এ আমাদের সোনার গৌর। একবার চলে গেলে আর তো পাবনা। তাই অঘ্রাণে রাজ্যের বাইরে নৈব নৈব চ। বরং চোখ ফেলে যেটুকুনি দেখা বাকী সেটুকুনি চেঁচেপুঁছে নিয়ে নি। 
ওরে ওরে! কলকাতার এত কাছেই সাগরদ্বীপ, বকখালি। যাবি নাকি সুন্দরবন কিম্বা শান্তিনিকেতন? কিম্বা চল বাংলাদেশের সীমানা অবধি, বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টাকীতে? আহা! ইছামতীর কি রূপ! নৌকাবিলাসে কি আনন্দ! আর তার টাটকা তাজা মাছের ব্যাঞ্জন? ছেড়ে আসতে মন চায়না। তবুও ফিরে আসতে হয় নিজের ডেরায় । টাকী থেকে আসার পথে পাটালী কেনা হয়েছে বলে কথা! এ পাটালী নাকি বিখ্যাত।  মাঘ পড়লেই পিঠেপুলির রসনায় মত্ত হওয়া আমবাঙালীর অবশ্য কর্তব্য। অঘ্রাণে খেঁজুরগাছ ছুলে দিয়ে মাটীর হাঁড়ি বেঁধে দেয় গ্রামের মানুষ। তারপরেই খেজুরগুড়, পাটালী, তক্তি, মোয়ার গন্ধে পাগল আমরা। 
অতএব অঘ্রাণ জমে কুলফিমালাই । এ আমার দেশের বিদেশ যেন। কে বলে মকরসংক্রান্তিতেই যেতে হবে সাগরে? কে বলে পৌষমেলার ভীড়েই পৌঁছতে হবে শান্তিনিকেতনে? শীতের আমেজ পাবি, বেড়ানোর আনন্দে যাবি। টেষ্টবাডগুলো লকলক করে বলে ওঠে, তাজা মাছ, কাঁকড়া খাবি সুন্দরবনের? তবে রাতারাতি প্ল্যান। চলো লেটস গো!
যদি ভেসে যায় আদরের শীত? 


এই তো কেমন দিন ছোট তার, রাতটা বড়োই বড়।
তবে কি এবার শীত পড়ল, না কি লোকদেখানোয় দড়ো?

শীতের কলকাতার জন্য সারাটা বছর ধরে ঠিক যেন হাপিত্যেশ করে বসে থাকা আমাদের।
কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে আমাদের ঘুম ভাঙে কোলকাতায় । আমি কান পেতে র‌ই । উশখুশ প্রাণ । খবরের কাগজ ছিনিয়ে শীতের কলকাতার কোথায় কি! আজ নন্দনে ছায়াছবি উৎসব তো কাল আইসিসিআর এ চিত্র প্রদর্শনী । একাডেমিতে নাটক কিম্বা মিলনমেলায় টেরাকোটা-ডোকরার সার্বজনীন আবেদনে । মেলায় মেলায় ছয়লাপ মহানগর! খবরের কাগজ হাতে তুললেই শয়ে শয়ে পিকনিক স্পট । এখন আর কেউ চড়ুইভাতি বলেনা । এখন গিয়ে মেয়েদের মাঠেঘাটে রান্নাবান্না করতে হয়না । জমিয়ে কেটারিং হয় পিকনিকে । শুধু চাই একফালি সোনালী রোদের সকাল, নীল আকাশ আর একচিলতে সবুজ খোলা মাঠ ।  অঘ্রাণে লংড্রাইভ জমে আইসক্রিম আবারো । অমৃত কমলার সকাল ।
পাড়ায় পাড়ায় ব্যাডমিনটন । শুরু এই আঘ্রাণেই  । আবার কখনো রাস্তা ব্লক করে বারোয়ারি ক্রিকেট ।
ছোটবেলায় দক্ষিণের বারান্দায় মায়ের পিঠের  ভেজা চুল রোদের দিকে মেলা আর সামনে দুহাতে উল কাঁটা ? শীতের এই মিঠে রোদ পিঠে নিয়ে কমলালেবুর দুপুরগুলো ছিল বেশ টেনশনের  । কারণ  স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার দিনগুলো, ক্লাসে ওঠাউঠির ক্ষণও ঠিক এই সময়েই । শীতের ভালো ও মন্দ, সার্কাস-মেলা কিম্বা চিড়িয়াখানা-চড়ুইভাতি সব নির্ভর করছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের ওপর ।
অঘ্রাণে উত্তরের হাওয়া ব‌ইতে শুরু করলেই মনে হয় নজর না লাগে। আমাদের শহরের শীত বড়‌ই ক্ষণস্থায়ী। তার মধ্যেই কাশ্মীরি শালওয়ালাদের বাড়িবাড়ি ঘুরে বেড়ানো আর ওয়েলিংটনে গোলগাল ভুটিয়ামাসীদের উলের শীতপোষাক নিয়ে পসরা সাজানোর কথা মনে পড়ে যায়।  তবে এখন আমাদের তেমন একটা শীতপোষাকের চাহিদা নেই। হালকাপুলকা ট্রেন্ডি শীতবস্ত্র মিলে যায় হাতের কাছের শপিংমলে। তাই জমিয়ে আর কাশ্মিরী শাল, ফিরান অথবা জম্পেশ কার্ডিগান, পুলওভার কেনার সৌভাগ্য হয়না। আর দুটোমাস তো ব‌ই শীত। গরম কাপড়চোপড় আবার মথবল এর গন্ধে বাক্সবন্দী হয়ে যায়। তবে শীত যতটুকুনি‌ই থাকুক, শীতের রকমারী সব্জি, উচ্চ হজমশীলতা আর মেলা, পার্টি ইত্যাদির দৌরাত্ম্যে আমাদের গ্যাস্ট্রোনমিক ফূর্তি কিন্তু জমিয়ে চলতে থাকে।    
বাঙালীর শীতকাল মানেই একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। অঘ্রাণের নতুন চাল, মটরশুঁটি, মূলো, কমলালেবু আর খেজুরের গুড়ের পাটালী দিয়ে মা ঠাকুরঘরে "নতুন" দিতেন। দুধের মধ্যে সব নতুন জিনিস দিয়ে পাথরের বাটিতে ঠাকুরকে নিবেদন করা আর কি! আর পুজোর পর সেই প্রসাদের কি অপূর্ব স্বাদ! তখন মনে হত, 
আহা শীতকাল, থাক্‌না আমার ঘরে। বারেবারে ফিরে আসুক নবান্ন, ঠিক এমনি করে । 
অঘ্রাণের শুক্লপক্ষে "বড়িহাত" করতেন মা।  নতুন বিউলির ডাল ভিজিয়ে রেখে শীলে বেটে নিয়ে তার মধ্যে চালকুমড়ো কুরে দিয়ে, হিং, মৌরী সব মিশিয়ে  মা অঘ্রাণের রোদে পিঠ দিয়ে ভিজে এলো চুলে বড়ি দিতেন। একটি বড় কুলোর ওপরে পাতলা পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে সুচারু হস্তে এই বড়ি হাত অর্থাত বড়ি দেওয়ার রীতি অনেকেরি আছে। ঝোলে খাবার বড় বড়ি, ছোট্ট ছোট্ট ভাজাবড়ি এসব আজকাল স্মৃতি। আমরা দোকান থেকে কিনে খাই। আর ডালের সাথে পরিবেশিত হওয়া এই ভাজাবড়ির অন্যতম অঙ্গ ছিল কালোজিরে আর পোস্ত। কেনা বড়িতে পাইনা তেমন আর। এই বড়িহাতের দিন দুটি বড় বড়ি গড়ে তাদের বুড়ো বুড়ি করা হত। বুড়ি-বড়িটির মাথায় সিঁদুর আর দুজনের মাথাতেই ধানদুব্বো দিয়ে, পাঁচ এয়োস্ত্রীর হাতে পান, কপালে সিঁদুর ছুঁইয়ে, শাঁখ বাজিয়ে তাদের রোদে দেওয়া হত। একে বলে বড়ির বুড়োবুড়ির  বিয়ে দেওয়া।  


অঘ্রাণের প্রত্যেক রবিবারে মা-মেয়েরা মিলে করে ইতু ঠাকুরাণীর পুজো। ইতুপুজো হল মিত্র বা সূর্যের পুজো।
মাটি কিম্বা পেতলের সরায় মাটির ঘট পাতা হত। সরার মধ্যে মাটি ফেলে পঞ্চশস্য ছড়িয়ে দেওয়া হত। মন্ত্রবলে পুজো করে ঝি-বৌরা ইতুব্রতকথা পাঠ করত আর সেদিন নিরামিশ খেতে হত। সারাটা অঘ্রাণ মাস ধরে প্রত্যেক রবিবারে ইতুপুজো করে সংক্রান্তির দিনে ইতু ভাসানো হত গঙ্গায়। আর ততদিনে সেই সরার মধ্যে পঞ্চশস্যদানার অঙ্কুরোদগম হয়ে সেই মাটির সরা কি অপূর্ব এক সবুজ সজীবতা পেত । মায়ের সাথে
 আমিও বলতাম মায়ের সাথে সাথে...  
অষ্টচাল, অষ্টদূর্বা কলসপাত্রে থুয়ে
শোন সবে ইতুর কথা এক মন দিয়ে, 
ইতু দেন বর,
ধনধান্যে পুত্রপৌত্রে ভরে উঠুক ঘর। 
আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে ইতুদেবীর পুজো বোধহয় দুর্গাপুজোর নবপত্রিকার মত । কৃষির জন্য সূর্যদেবতার অবদান অনস্বীকার্য তাই বুঝি "ইদম্‌ অর্ঘ্যম্‌ নমো শ্রী সূর্যায় নমঃ" বলে অর্ঘ্য দেওয়া হয় ইতুর ঘটে।  সূর্যদেবতা এবং ইতুদেবী উভয়কেই তুষ্ট রাখা হয়।  
গ্রীষ্মের সময় যেমন মঙ্গলচন্ডীর ব্রত হয় অঘ্রাণে আমাদের আছে কুলুইমঙ্গলচন্ডীর ব্রত।
অঘ্রাণমাসের শুক্লাষষ্ঠীতে ব্রতকথা পড়ে জল খেতে হয় ।  অঘ্রাণ মাসের শুক্লপক্ষের মঙ্গলবারে কেন মেয়েরা কুলুই চন্ডীর ব্রত করে মা?
এমন প্রশ্ন জাগত ছোটবেলায় ।
মা শোনাতেন ব্রতকথা আর  বলতেন " বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর "
ইতুপুজোর উমনো-ঝুমনো কিম্বা মঙ্গলচন্ডীর আকুলি-সুকুলি সেই চিরাচরিত মেয়েদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে  আড়াল করে রাখার গল্প আবার মেয়েদের হাত ধরেই  কখনো ইতুদেবী কখনো মঙ্গলচন্ডীকে স্মরণ করে সে যাত্রায় উদ্ধার। 
প্রতিবছর অঘ্রাণের ভোরে যখন শীত দরজায় কড়া নাড়ে তখন মনে পড়ে এইসব। পাল্টায়না ব্রতকথার গল্পগুলো। শুধু পাল্টে যায় সমাজের চিত্রকল্পটা। বদলে যায় চরিত্রগুলো। ব্রতের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলে এ যুগেও  । সমাজে মেয়েগুলো আজো ব্রাত্য । শীতপোষাকে জানু-ভানু-কৃশাণু তারা শীতের হাত থেকে রক্ষে পাবে বলে। 
তবুও প্রকৃতির নির্ঘন্ট মেনে শীত আসে।  পালংশাকের ঘন সবুজে, কমলালেবুর ঘ্রাণের মধ্যে দিয়ে। বাঁধাকপির হালকা সবুজের পরতে পরতে শীত খুলতেই থাকে। রঙীন বাজার সরগরম হয় শীতসবজীর রামধনুতে।  
বাংলার মেয়েগুলো বাবা-ভাই-স্বামীর মঙ্গলের জন্য বছরের পর বছর ব্রতের উপবাসী হয়ে নতুন অঘ্রাণের ঠান্ডায় পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান করে পুজোর যোগাড় করে কিন্তু তাদের কথা কে মনে রাখে? যারা এই নতুন শীতকে ওয়েলকাম করতে পারেনা? তারাই বা কি করে এই অঘ্রাণে?  যে বা যারা পারল না এই অঘ্রাণের অনুভূতিগুলো ভাগ করে নিতে?  তাদের বাজারের থলি থেকেও উঁকি দেয় পিঁয়াজকলি কিম্বা হাতে ঝোলানো দিশী ফুলকপি। তাদেরো সাধ হয় একটা দুধের প্যাকেটে একটু সুজি ছড়িয়ে গুড় দিয়ে গরম পায়েস খাবার।  কারণ শীত তো বারেবারে আসেনা বছরে।  
এইসব অনুভূতিতে পার হয়ে যায় আমার অঘ্রহায়ণ । আমার শীতের সূচনা। শীত আসে, শীত যায়। আমাদের ঘুম ভাঙে কলকাতায়। 
সবশেষে আবার রবিঠাকুরের শরণাপন্ন হয়ে বলি, "অঘ্রাণ তবে ফাগুন রহিত ব্যেপে"। অতএব,  কিছুক্ষণ আরো নাহয় রহিতে কাছে। 


কলকাতা ২৪x ৭ "রোববার"

১ ডিসেম্বর, ২০১৬

ষোড়শী সই এর ষোলোকলা পূর্ণ

বনীতা দেব সেনের হাতে তৈরী "স‌ই" পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের সৃষ্টিশীল মেয়েদের একটি সংগঠন। "স‌ই" এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আজ থেকে ষোলো বছর আগে ২০০০ সালের ৩০ শে নভেম্বর। এই দিনটি নবনীতাদির মা কবি রাধারাণী দেবীর জন্মদিনও। "স‌ই" এর ষোলো বছর পূর্তিতে হৈ হৈ করে "স‌ই" এর ওয়েবসাইট www.soicreativewomen.org উদ্বোধন হয়ে গেল গতকাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা বিভাগের বিবেকানন্দ হলে। প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করলেন শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষ, ভারতী রায় এবং মানবীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ ঐশিকা চক্রবর্তী। স‌ই এর ওয়েবসাইট তৈরীর কৃতিত্ব Argentum Web Solutions এর মহাশ্বেতা রায়ের। কবি শঙ্খ ঘোষ মহাশ্বেতার সাহায্যে ওয়েবসাইট উদ্বোধন করলেন। স‌ই এর সভাপতি সাহিত্যিক নবনীতা দেব সেন উপস্থিত সকলকে ওয়েবসাইটের ব্যাপারে অবগত করলেন। লেখিকাদের স্বাধীন মত প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম এই ওয়েবসাইটে র‌ইল যার নাম "ব্লগবগম্‌"। 
"স‌ই" এর পূর্ব প্রকাশিত প্রিন্ট ম্যাগাজিন "স‌ই-সাবুদ" ও এবার ই-পত্রিকার আকারে দেখতে পাওয়া যাবে।  রাজ্যের গন্ডী পেরিয়ে দেশ এবং আন্তর্জাতিক স্তরের বহু স্বনামধন্য লেখিকারাও স‌ই এর সাথে যুক্ত আছেন।আন্তর্জাতিক স্তরে চমত্কার একটি ডেটাবেস তৈরী হল সই এর সব লেখিকাদের। এ যাবত স‌ই এর সমস্ত অনুষ্ঠান, কর্মকান্ড সবকিছুর ছবিও আর্কাইভ করে রাখা রয়েছে ওয়েবসাইটে। 



গতকাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা বিভাগের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন স‌ই শর্মিষ্ঠা। স‌ই এর ভালবাসার মৌসুমী ভৌমিক এবং রঞ্জিনী-ইন্দ্রানী-সোহিনীর অভিনব সঙ্গীত পরিবেশনা এক অপূর্ব মাত্রা যোগ করল।  এরপর ছিল নবনীতাদির বাড়িতে স‌ইদের নৈশভোজের নিমন্ত্রণ। কারণ স‌ই এর প্রতিষ্ঠা দিবস ও কবি রাধারাণী দেবীর জন্মদিন। সব মিলিয়ে আমাদের বেশ অন্যরকমের পাওয়া ।   
সমগ্র অনুষ্ঠাটির সুচারু এবং দৃষ্টিনন্দন পরিবেশনার দায়িত্ত্বে থাকা সব স‌ইরা হলেন স‌ইয়ের সেক্রেটারি গার্গী রায়চৌধুরী, ওয়েব এডিটর, চৈতালি চট্টোপাধ্যায়, যশোধরা রায়চৌধুরী, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং দেবলীনা ত্রিপাঠী । এছাড়াও বাকী স‌ইদের জন্য অঢেল কৃতজ্ঞতা জানাই যারা ছাড়া অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ হতনা। তাদের মধ্যে আছেন সাহিত্যিক কণা বসু মিশ্র, চুমকী চট্টোপাধ্যায়, রূপা মজুমদার, সুস্মেলী দত্ত, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, জয়া চৌধুরী, কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়, পৃথা বল, সুতপা  বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোত্স্না কর্মকার, বনানী দাস চক্রবর্তী, দীপাণ্বিতা রায়, কৃষ্ণা রায় প্রমুখ সই সকল  । 

২৮ নভেম্বর, ২০১৬

বনভোজন @ বনের হাট



জায়গাটা কলকাতার খুব কাছেই। নাম "বনের হাট'। আর এটা বারুইপুরে একটি ছোট ঘরোয়া বনভোজনের স্পট।সবুজ গাছগাছালি ঘেরা, একটুকরো জলের ঠাণ্ডা ধার, তক্তপোশে শীতলপাটি বিছানো একটা ছোট্ট বিশ্রামের কুঁড়ে, রান্নাবাটির জন্য টালির শেড, বাথরুম সব আছে তবে নেই ইলেকট্রিক। তাতে অবিশ্যি অসুবিধেও নেই। দিনে দিনেই ফিরে এসেছি আমরা। 
কলকাতা থেকে  সোজা বাইপাস দিয়ে বারুইপুর স্টেশন। তারপর ফ্লাইওভার পেরিয়ে ওপারে গিয়ে নেমে সোজা যে রাস্তা ক্যানিং এর দিকে গেছে সেটা ধরা। পেরুবে ফুলতলা, রামনগর হাইস্কুল তারপরেই রাস্তার ওপরেই ডানদিকে পড়বে ঝাঁ চকচকে রেসর্ট যার নাম বনের হাট। যাবার রাস্তা খুব ভাল (টাচ্‌ উড্‌) । ভোরবেলা গড়িয়াহাট থেকে সময় লাগল মাত্র ৫০-৫৫ মিনিট। বেলা বাড়লে বাজারের ভীড় পড়ে তাই বেশী সময় লাগে। এহেন বনভোজন @ বনের হাট ছিল গতকাল  অর্থাত অঘ্রাণের অলস ছুটির দিনে।  শীত পড়তে না পড়তেই বাঙালীর কফি আর স্যুপ প্রেম যেমন উথলে ওঠে তেমনি আর কি পিকনিক প্রেমেও ভেসে যায় অমৃত কমলার ভোর। প্রতি শীতের অবশ্যকরণীয় দায়িত্ব রূপে আমাদের দক্ষিণ কলকাতা পাঠচক্রের সব বরিষ্ঠ নাগরিক মাসীমাদের এই বাত্সরিক ভ্রমণের আনন্দদানটাও যেন সর্বকনিষ্ঠা এহেন আমির ওপরে বর্তায়।  বেশী শীতের দাপুটে বৃদ্ধারা আবার একটু কাতরে পড়েন তাই এবার অঘ্রাণেই পালন করলাম সেই দায়িত্ত্বটি। সর্বসাকুল্যে ৩০-৩৫ জন, কিছু গেষ্ট আর সকলের বাহনচালক। সেই সাথে ছিল পাঠচক্রের সেক্রেটারী মাসীমা মনীষা দের ৫০ তম বিয়ের তারিখ। অসুস্থ মেশোমশাই ও সামিল ছিলেন এই পিকনিকে।কেক কাটা, মোমবাতি জ্বালা, কোনো অনুষ্ঠানের ত্রুটি ছিল না কাল। ওনাদের ৫০ বছর টিকে থাকার অভিনন্দন জ্ঞাপনে কবিতা থেকে শুরু করে হালকা হাসি, জোকস, অন্ত্যাক্ষরী, রবীন্দ্রগানের সাথে নাচ, আরো আরো কবিতাপাঠ, নাটকের নির্বাচিত অংশ, চিরকূট তুলে "যে যেমন খুশি পারো" এইসব নিয়ে কেটে গেল দুপুর। সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে দুপুরের চাইনিজ লাঞ্চ সব কিছুই হল ঠিকঠাক। কেউ ভুললেন হাঁফের টান, কেউ আরথাইটিস, কেউ বা COPDর কষ্ট, কেউ ডিপ্রেশান, কেউ আবার পিকনিকের এক্সাইটমেন্টে রাতের ঘুমটুকুনিও।
আর যে ছাড়া "বনের হাট' আমাদের কাছে অজানা থেকে যেত সে হল আমার পাড়ার, আমার স্কুলের বন্ধু, আমার প্রতিদিনের অঙ্ক কষার সাথী, রোজ স্কুল যাওয়ার দুই বিরুণীর সঙ্গী চুনচুন ।


আর এহেন আমি এনাদের প্রতিবছর এভাবে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারি বলে বেশ লাগে আমারো। কারোর জন্যে কিছু বেশী ভাল কিছু করতে না পারি, মন্দ তো করিনা তাই মনটা বেশ লাগল সারাদিন। এই মাসীমাদের মধ্যে একজন আমার শাশুড়িমাও। তিনিও সারাদিন বেশ ফুরফুরে ছিলেন গতকাল। এভাবেই বেঁচে থাকেন কলকাতার কিছু সিনিয়ার সিটিজেনরা আমাদের সঙ্গে। এঁদের ছেলেপুলেরাও তো বেশীরভাগ বাইরে। জেরিয়াট্রিক এই মহানগরের ফ্ল্যাটবন্দী এঁরাও একটু মুক্তির আলো দেখেন। আর ব্লগ লেখার মত ঘরের খেয়ে বনের হাটে বনের মোষ তাড়িয়ে আমিও নির্মল আনন্দ পাই কারণ আমার প্রাপ্তি মাসীমাদের নির্ভেজাল হাসিটুকুনি আর তাঁদের অকুণ্ঠ আশীর্বাদ।

১৮ নভেম্বর, ২০১৬

সাম্প্রতিক কালের হাবুডুবু এবং ধামাচাপা

  • (১) মিষ্টার ঝুনঝুনওয়ালার স্ত্রী বলছেন তাঁর ড্রাইভারকেঃ
"তুম তো আপনা প‌ইসা জমা করোগে, হমারা ভি জমা দে দো না বাবা! “
  • (২) এক নামকরা ডাক্তারবাবু ব্যাঙ্কে এসেছেন । প্রাইভেট ব্যাংকের পার্সোনাল রিলেশানশিপ ম্যানেজারকে বলতে শুনলাম ফিসফিস করে,” বস্‌, কিছু একটা উপায় তো করো! মারা পড়ে যাব যে।"
ম্যানেজার বললেন, আপনার নার্সিংহোমের নামে জমা করে দিন। ব্যাস্! ট্যাক্স দিয়ে দেবেন আবার কি! আপনার টাকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে আমার চাকরীটা আর খোয়াতে পারিনা স্যার!
  • (৩) ছবির দোকানে ছবি বাঁধাতে গেছি, মালিক বলছে, "দিদি জানেন? প্রতি হাজারে ৮টি ১০০ দিলে আমাকে ২০০ দেবে বলছে, এমন ২৬ লক্ষ টাকা দিতে চাইছেন একজন নিজের লস করে"
বেচারা ছবির দোকানের মালিকের অত টাকা কোথায়? সে বলল, "লোভ লাগছিল , জানেন তো? ২৬ লাখ একশোর নোট দিতে পারলে আমার লাভ থাকত নেট ৫লাখ কুড়ি হাজার। একটা মালতী গাড়িও হয়ে যেত"
  • (৪) বড় বড় সব আবাসনের বাসিন্দারা ইলেকট্রিক বিল, মাসিক মেন্টেনেন্স বাকী রেখে দেন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। তারা সব ছুটে গিয়ে নোটের তাড়া জমা করছে। ইলেকট্রিক সাপ্লাই বলেছে, "আলবাত নেব, না নিলে আমাদেরি লস তো!"
  • (৫) "হামারা রুপয়া জমা কর দো দিদি, তুমহারা একাউন্ট মে। হর দশহাজার রুপয়া মে ১০০০ তুমহরা"
  • রান্নার মাসীর অবাঙালী কাজের বাড়ির গিন্নী বলল তাকে। সে বলল, উসকে বাদ? তুমহরা রুপয়া ক্যায়সে তুমহরে পাস যায় গা? গিন্নীর সপ্রতিভ উত্তর কুছ দিনো কে বাদ, তুম থোড়া থোড়া করকে হামকো বাপাস কর দোগে। রান্নার মাসী বলল, আমার একাউন্ট একলাখ টাকা চোখে দেখেনি। আর আমি সেখানে গিয়ে গিয়ে ১০ লাখ টাকা জমা দেব? মাফ করো আমাকে!
  • (৬) স্থানীয় বস্তিতে থাকে রামের মা। লোকের বাড়ি কাজ করে মাসিক আয় প্রায় ৭-৮ হাজার। সেদিন তাড়াহুড়ো করে ব্যাঙ্কে গিয়ে জমানো হাজার পনের টাকা দিয়ে বদল করে এনেছে তার কষ্টের রোজগার। এবার তাদের বস্তিতে যেই রটে গেল রামের মায়ের অনেক একশো টাকা তখন প্রত্যেকে রামের মা'কে বলতে লাগল, মাসী ৫০০ নোটের বদলে ৪টে ১০০ দাও। তোমারি তো লাভ । রামের মা কাজে যায়নি সারাদিন ঘরে বসে এই ব্যবসায় মন দিল। স্বল্প পুঁজিতেও ব্যবসা হয় তবে। অভাবের সংসারে যা আসে তাই ভাল। সে তো আর ভুল কিছু করছে না। মানুষের উপকার করেছে মাত্র।
  • (৭)অগ্রবালবাবুরা পঞ্জাবের লোক। সেখানকার প্রত্যন্ত গ্রামে প্রধানমন্ত্রীর জনধন একাউন্ট খুলে এসেছিল ভাগ্যিস! ১০ জনের নামে থাকা এমন একাউন্টে ব্রিফকেস, এটাচি ভরে টাকা নিয়ে রাখতে গেছে রেলভাড়া করে। অগ্রবাল পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের হাতে এমন ব্রিফকেস।
  • (৮) আবাসনের এক অবাঙালী ব্যাবসাদার তার কাজের মাসী সহ সকল স্টাফদের বাধ্য করেছেন সচিত্র পরিচয়পত্র দিতে। সেই পরিচয়পত্র তিনি খান কুড়ি করে জেরক্স করিয়ে প্রত্যেকের হাতে নোটের তাড়া গুঁজে দিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে জমা দিতে বলছেন। ভিন্নভিন্ন একাউন্টে বেচারা স্টাফেরা জমা দিয়েই চলেছে, দিয়েই চলেছে...আর তিনি বলেছেন, যা সময় লাগে লাগুক, কাজে না আসলেও চলবে আর এর জন্য আলাদা বখশিস‌ও দিব্যি মিলবে।
  • (৯) পুরণো কাগজওয়ালাদের খুব মজা। প্রচুর লোকজন বাড়ি সাফাই যজ্ঞে মেতে উঠেছে। কোথায় কি পাওয়া যায় সেই লক্ষ্যে। এবার তাকের ওপরে, তাকিয়ার নীচে, গদির তলায়, কাগজের বান্ডিলে পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য ৫০০-১০০০। অতএব অঘ্রাণেই কাগজওয়ালাদের পোষমাস চলিতেছে।

১৭ নভেম্বর, ২০১৬

টুনটুনির নতুন গল্প


লি গেল গেল রব উঠল ৫০০/১০০০ বাতিল হল বলে কিন্তু সত্যি তো বাতিল কেউ নয়। এ কথা আমাদের সকলেরি জানা। রাস্তায় ঘাটে সবাই ঊর্ধ্বমুখে জোড় হাত তুলে কয় নমো নমোহ! যে আদার ব্যাপারী সে এদ্দিন পাত্তা দেয়নি নরেনকে। আর এই নরেনই রক্ষে করল তাদের। হোয়াটস্যাপে ঠাট্টার ঝড়। রামকৃষ্ণ বলেছিলেন টাকা মাটি, মাটি টাকা। আর তাঁর প্রিয় নরেনই প্রমাণ করেছেন এদ্দিনে। আমি বলি টাচ উড! আগে শেষ রক্ষে হোক বাপু
 
এইবার শুরু খেলা। রাজার ঘরে যে ধন আছে, টুনির ঘরেও সে ধন আছে। শুধু রাজার ঘরে বেশী আছে, টুনির বাসায় অনেক কম আছে। রাজা হলেন জাহাজের কারবারি আর টুনি বেচারা আদার ব্যাপারী। কিন্তু যে ৫০০/১০০০ এর নোট টুনির আছে সেটাই রাজার ভল্টেও আছে। সেই এক, অবিনশ্বর গান্ধীর ছবি ওলা। রাজার কত উপায়ে সেই প্রাচুর্য লাভ হয়। আর টুনি বেচারা দিনাতিপাত করে কোনোক্রমে একটা নোট মুখে করে এনে বাসার মধ্যে রাখে। রাজার অনেক আছে তাই টাকা শুকোতে দিতে হয়। আর টুনি বেচারা একটা এনেই কি ঝামেলা হল সেবার। কিন্তু এবারে টুনি মুখ্য নয়। উলুখাগড়ার মত ব্রাত্য টুনি দিব্যি আছে মনের সুখে। এখন রাজারাজড়ার পরাণ যায়।

টুনি এখন মগডালে বসে মনের সুখে গাইছে বেহাগ

" কালো টাকা, সাদা টাকা, টাকা নানান জাতের,
এত টাকার মধ্যে শুয়ে ঘুম গেল তার বাপের"

টুনির মা তাই শুনে ধরে

"বুঝলেন, বুঝলেন, বুঝলেন বাবুমশাই?
টাকা গোনে, কেন গোনে, কিসের এত টাকা?
আশেপাশে সবাই গোনে, আমার বাসাই ফাঁকা"

টুনি বলে, ও মা? আজ চলো যাই উড়ে, রাজার বাড়ির বারান্দার দিকে আরেকবার। যদি পেয়ে যাই একটা ৫০০ কিম্বা ১০০০ ? টুনির মা বলল, অতি লোভ ভাল নয় টুনি। টাকা থাকার অনেক জ্বালা। দেখলি তো ? টুনি বলল, মা তবে যে ৫০০ টাকার নোটটা আমাদের বাসায় পড়ে রয়েছে সেটা গিয়ে রাজার বারান্দার কোণে রেখে আসিগে, কি বলো?
টাকা এমনি জিনিস! মায়া বাড়ায়। আর টুনির মা টুনির চেয়ে বয়স্ক, দুঁধে, পোড় খাওয়া এক পাখী। সে বলে, পাগল না মাথাখারাপ? ওটা রেখে দে, কাজে আসবে। টুনি বলে, ওটা ক'দিন বাদে চলবে নি গো, বাতিল হবে। তখন ভাঙাবে কি করে?
টুনি ফুড়ুত করে উড়ে গিয়ে বসে মাছ বাজারে। সেখানে জলের দরে মাছ বিকোচ্ছে । আর দোকানি বলছে, মাছ নিয়ে যান, পয়সা পরে দেবেন। ৫০০, ১০০০ নেবনা। অন্য আরেকটা বাজারে গিয়ে টুনি দেখল সেখানে দিব্যি নিচ্ছে ৫০০-১০০০। ক্রেতা বিক্রেতাকে বলছে, মশাই, টাকা হল টাকা। আপনার হোক কিম্বা আমার । ব্যাঙ্কে দিয়ে দিলে সবই এক জায়গায় যাবে। টাকা আটকে থাকলে ব্যাবসা করব কিভাবে? আরেকটা বাজারে গিয়ে শোনে সেখানে দোকানি বলছে, আগের ধার শোধেনি এখনো। ধারবাকীতে কি মাছ বেচা যায়?
বিভ্রান্ত টুনি এবার উড়ে যায় শহরের এক ব্যস্ত পেট্রোল পাম্পে। রাতে তোপ দাগার পরেও মাথায় আসেনি কারোর। এবার মাথায় হাত। এমন লাইন কেন সেখানে? তারপরেই বচসা শুনে বুঝতে পারল, ভোর হতেই সবাই তেল কিনে গাড়িতে ভরছে, কেউ বাড়িতেও মজুত রাখছে। তেলের তো অনেক দাম। সোনার মতোই প্রায়। তাই কিছু ৫০০-১০০০ সরকারের ঘরে চালান করে দেওয়াই শ্রেয়। ও মা গো
 
এখানে তো সকলে জেরিক্যান ভরে পেট্রোল নিচ্চে গো! এ আবার কেমন তর? পেট্রোলের গন্ধে ম ম করছে আশপাশ। সেই তেলের গন্ধ নিয়ে আবার ফুড়ুত টুনি রেলের স্টেশনে। নিচ্ছে, নিচ্ছে, নিচ্ছে, এখানেও নিচ্ছে বড় নোট। তবে ছোট টিকিটের জন্য বড় নোট কেন নেবে তারা? আগেও নিতনা এখনো নেবেনা। প্যান্ট্রিকার, টিকিট কাউন্টার সবজায়গায় নিচ্ছেই তো । এবার টুনি চলল বিমানবন্দরে। সেখানে যারা যাওয়া আসা করে তাদের পার্সে, ওয়ালেটে ক্রেডিট কার্ড থাকে, ডেবিট কার্ডও থাকে অতএব নো ঝঞ্জাট। কিন্তু প্রিপেইড ট্যাক্সিবুথে একটু বাকবিতন্ডা চলছে। ওরা অমনি। চিরকাল। নমো-ই হোক, মম-ই হোক। এরা আর বদলাবেনা। টুনি তো আর আজকের লোক নয়। এ শহর তার অতি পরিচিত। টুনি ভাবে, বিদেশীদের সামনে না লজ্জায় পড়তে হয়। অতিথি দেব ভব। তাদের সামনে এমন ঝগড়াঝাটি না করলেই নয়? সেই এক কথা। আরে মশাই নিন না বাবা। আপনি বা আমি যে কেউ কাল গিয়ে এই নোট তো ব্যাঙ্কেই জমা করে আসব।
তার চেয়ে শেখো তোমরা ভলভো বাস সার্ভিস, ওলা, উবেরের কাছ থেকে। এরা কেমন ব্যাওসাপাতি বোঝে বাপু! টুনির মনে হয় ঘাড় ধরে শিখিয়ে দিক ওদের। 
 
টুনি যায় গুটি গুটি। একটু ফুড়ুত তো একটু মজা লুটি। যারা নেই উত্তর-পুব, তার মনে সদাই সুখ। এবার গন্তব্য শপিংমলে। বিশাল কাঁচের দরজার সামনে চুপটি করে ঘাপটি মেরে বসে থাকে সে। এই বাগানে তার প্রবেশ মানা। সময়ে অসময়ে সে পিচিক করে পটি করে ফ্যালে। তখন রামপেয়াদা এসে তাড়া করে মেরেও ফেলতে পারে একরত্তি টুনিকে। মানুষের তাড়া খেলে যা বুক ধুকপুকুনি হয়! তার চেয়ে দরজার বাইরে থাকাই ভাল।
এ বাবা, এখানেও হোঁচট কেন? কার্ড না থাকলে জিনিস কেনা যাবেনা? নো বড় নোট লেনদেন। প্রবেশের মুখেই জিগেস করে নিচ্ছে সিকিউরিটি। আচ্ছা এর নামই কি "অচ্ছে দিন"? এর নামই কি "গো ডিজিটাল"? টুনি ভাবে বসে বসে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মলের দরজা খুলে মানুষ ঢোকে আবার কেউ কেউ ঢুকেই পত্রপাঠ বেরিয়ে যায়। ঠান্ডা হাওয়ায় শীত করে টুনির। সেদিন সকালেই টুনি খবরের কাগজের প্রথম পাতায় জোরালো বিজ্ঞাপন দেখেছে বটে। অব এ.টি.এম ছাড়ো, পে.টি.এম করো। এটাই কি তবে ডিজিটাল দেশ গড়ার পূর্বলক্ষণ?

টুনি সেদিন বাসায় ফিরে গিয়ে মা কে বলল
 
- মা, ঐ টাকার নোটটা রেখেই আসি রাজার ঘরেতে। টাকা থাকার অনেক হ্যাপা। এই বেশ খুঁটে খাই আমরা। দিব্য চলে যায় আমাদের।
টুনির মা সেই শুনে বলল,
- মার খেয়ে মরবি এবারে। আমি কত কায়দা করে সেই উপেনবাবুর আমল থেকে যত্ন করে টাকাটা বাসায় সামলিয়ে আসছি আর তুই কিনা এদ্দিনের সঞ্চিত ধন বিকিয়ে দিবি? নানা টুনি যাসনা। আমি মরে গেলে ঐ টাকাটাই তোকে দেখবে।
- কিন্তু মা, ওই টাকাটা এখুনি ফেরত না দিলে আর কোনও কাজে আসবেনা আমাদের। ওটা বাতিল হয়ে যাবে।
- রাজার বাড়ী ঢুকবি আবারো? জানিস না? রাজাকে রাগিয়ে দিয়ে কি বিপত্তি হয়েছিল আর তারপরেই তরোয়াল থেকে শুরু করে ব্যাঙ ভাজার কাহিনী কে না জানে?
- আর সেই বেচারা সাতরাণীর গল্প তুমি যে ফলাও করে বলতে ! শুধু একটা নোটের জন্যে ওদের নাকগুলো যখন কেটে দিল তরোয়াল দিয়ে? সে কি দৃশ্য! রক্তারক্তি কাণ্ড!
- বেচারা রাণীরা কিন্তু আমাকে খুব আদর যত্ন করেছিল জানিস ? ওমা কি সুন্দর পাখী ! কত মিষ্টি পাখীটা!
টুনি সেই শুনে বলল,
- মা আবার যাবে নাকি রাজার বাড়ি গিয়ে সেই পুরণো কাসুন্দি ঘাঁটতে?

১৩ অক্টোবর, ২০১৬

পুজোসাহিত্য ২০১৬

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

KOL-e-KATA published in ABP internet edition

  •  তিলোত্তমার মেয়ের বিয়ে (পুজো২০১৩) 


আমাদের দুর্গোত্সব কিন্তু খুঁটিপুজো ছাড়াই ঝাক্কাস ছিল— প্রথা অনুযায়ী রথের দিন বাঁধা হয় মা দুগ্গার কাঠামো। সেই অনুষঙ্গ নিয়েই বুঝি এখন হয় খুঁটিপুজো— শ্রাবণ-ভাদ্রের জলভাসি শহরের প্রাক্ পুজো টেম্পো— পাড়ায় পাড়ায় যেন মায়ের আগমন বার্তা জানানোর আগাম হুল্লোড়। নাগরিক মহাকাশ ছয়লাপ খুঁটিপুজোর হোর্ডিংয়ে। ছাপা কাগজে তাবড় ‘সেলেব’দের ছবি খুঁটিপুজোর উদ্বোধনীতে। পাল্লা দিয়ে নক্ষত্র আনা হবে প্রতি পাড়ায়। যার যত ‘খুঁটি’র জোর তার তত রথী-মহারথী। বাবুদের দুগ্গাপুজো বলে কথা! তাও আবার খাস কলকাতার। যেন মায়ের নাম ভাঁড়িয়ে নতুন পণ্যের ‘প্রোমোশন’ বা ক্লাবের ‘ব্র্যান্ড’ বাজানো। তার চেয়ে ক্লাবগুলো যদি পাড়ার মোড়ের পার্কটাকে পরিচ্ছন্ন করে আবর্জনা মুক্ত রাখত, তা হলে শহরটার ভাল হতো।
মা আসেন প্রতি বছর। তিনি জানতেও পারেন না দেশের কী অবস্থা, দশের কী হাল! তবুও দেশ ও দশ প্রতি অণু-পল শুনতে থাকে মায়ের আগমনের প্রতিধ্বনি। এ বার মা দ্বিতীয় বার আসছেন ‘বদলের বঙ্গে’! সেটাই বড় কথা। মায়েরও হাওয়াবদল হবে আশা করা যায়। কিন্তু প্রতি বছরের মতোই বাজারের দাম বদলায় না। রাস্তাঘাট সারাই হয় না। রাজনীতির অশুভ আঁতাত, খরা-অতিবৃষ্টির টানাপোড়েনে রোগের হ্রাস-বৃদ্ধি, প্লাস্টিক না পেপার, পরীক্ষার পাশ-ফেল, পেঁয়াজের বাজারদর, রিসেশান-ইনফ্লেশান চাপানউতোর— সব কিছু চাপা পড়ে যায় ‘কৈলাস অ্যান্ড কোম্পানি’র আগমনে। ধর্ষণে, বিস্ফোরণে, দুঃখের যজ্ঞে আহুতি দেয় শহরবাসী। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক... সব জটিল প্রশ্নের টেস্ট পেপারের মুখোমুখি হতে হয় কৈলাস পরিবারকে। পুণ্যতোয়া গঙ্গার জল বয়ে চলে প্রতি দিনের নিয়মে...

থিম থিম করে পাগলু হয়ে পুজোয় চমক হয়। দেবদেবীদের চক্ষু চড়কগাছ। হিংসায় উন্মত্ত ধরায় শান্তির বাণী বরষাতে এসে সব ‘প্ল্যান’ ভণ্ডুল। পিচঢালা ঝকঝকে রাস্তায় গর্ত খুঁড়ে খুঁটি পোঁতা হয়। মা চলে যাওয়ার পর সেই গর্তগুলোর কী হবে তা নিয়ে কেউ ভাবেন না। একই পাড়ায় চারটে দলের আলাদা আলাদা পুজো— দলবাজির মা, রকবাজির মা, রংবাজির মা, দাদাগিরির মা— ‘ভাগের মা’ বলে কথা। গঙ্গা পাবেন অবশ্য। কিন্তু গঙ্গার কী হবে? একেই তো বুজে আছে পর্যাপ্ত প্লাস্টিকে। ক্লিন কলকাতা, গ্রিন কলকাতা থিম তত ক্ষণে বিসর্জন। মহানগরের নর্দমাগুলি আবার ভর্তি হয়। ঠাকুর দেখে প্রচুর দর্শনার্থী। জলের বোতল, কোল্ড ড্রিঙ্কস-এর বোতল, কফির কাপ, আইসক্রিমের কাপ, আরও কত কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে তারা চলে যায় এই মহানগরের রাস্তাঘাটে। তেরঙ্গা, গুটখা, শিখরময় হয় এই মহানগর। চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙে মাইক্রোফোনের স্পিকারে গান বাজতেই থাকে উচ্চৈঃস্বরে। আলোর রোশনাই কোজাগরীর জোছনাকে আড়ালে রাখে। বিদ্যুত্— কত চাই এ সময়! জয়েন্ট পরীক্ষার আগের দিন না হয় অন্ধকারে ডুববে বঙ্গ, তাই বলে পুজোতে আঁধার ভাল লাগবে কি?
রমরমিয়ে ব্যবসা চলবে ট্রান্সফ্যাটের। আবার ওজন বাড়বে বাঙালির। তাই বলে কি রসনা অতৃপ্ত থাকবে? পুজো তো আর রোজ রোজ হবে না! চক্ষুশুদ্ধি হবে প্যান্ডেল হপিং করে। জিনস-কুর্তা, কুর্তি-কেপরি, স্কার্ট-লাচ্ছায় লাস্যময়ী, হাস্যময়ীরা মাতাবেন ম্যাডক্স স্কোয়্যার, ত্রিকোণ, দেশপ্রিয়, বাদামতলা, মুদিয়ালি। মানুষ ভিড় করবে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে। তত ক্ষণে মা উধাও সেই প্যান্ডেল থেকে, পড়ে থাকবে মৃন্ময়ী মূর্তি। চিন্ময়ী মায়ের বিরহী আত্মাটুকু ভিড়ভাট্টা থেকে রক্ষা পাবে বলে পাড়ি দেবে ভোলেবাবার কাছে। কলকাতার ভূষণ হবে দূষিত। মাননীয় নেতারা বিজয়া-টিজয়া সেরে সিদ্ধান্ত নেবেন মহানগরকে দূষণমুক্ত করার। অনেক মিটিং হবে। তত ক্ষণে শারদ সম্মান ‘সেরিমনি’ও শেষ।

আপামর কলবাতাবাসীর পুজোর এই উদ্যম হিড়িক দেখেশুনে মনে হয়, ফি বছরের এনার্জি বাঙালি কেন উন্নয়নে কাজে লাগায় না? কোনও ‘কংক্রিট’ কাজে যদি কলকাতার বাঙালির এই উদ্যম দেখতাম তা হলে শহরটার বুঝি একটু একটু করে উন্নতি হতে পারত। প্রতি পাড়ায় দু’কিলোমিটার ব্যবধানে দু’টো করে পুজো না করে চারটে পাড়া এক সঙ্গে পুজো করুক না! ইকোসিস্টেমের সঙ্গে ভিড়ভাট্টাও কমবে আর সেই সঙ্গে বন্ধ হবে অপচয়। পুজোর সংখ্যা না বাড়িয়ে কী ভাবে শহরটার একটু উন্নতি হয় সে দিকে দাদারা মাথা ঘামালে বড় ভাল হতো। পাড়ায় পাড়ায় কম্পিউটার সেন্টার তৈরি হোক, যেগুলি আছে সেগুলির তদারকি হোক। বস্তির ছেলেমেয়েগুলো আরও সুযোগ পাক এই প্রযুক্তির। ব্যায়ামাগার তৈরি করুক কলকাতার স্বনামধন্য সব ক্লাব, যাদের টিকি কেবল দুর্গাপুজোতেই দেখা যায়। কিশোর স্বাস্থ্য তৈরি করুক তারা। নতুন কিছু হোক— পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি, পুরনো লেখকদের বইয়ের আর্কাইভ। নতুন প্রজন্ম কম্পিউটারের পাশাপাশি বই পড়তে শিখুক।

মহানাগরিক ভিড় শুরু হয়ে যাবে পুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই। ফুটপাথে হকাররাজ চলছে, চলবে। কারণ ভোটের রাজনীতির সমীক্ষা বলে সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নাকি কিছুই নেই! চাকরি-বাকরি নেই শহরে। অতএব বেকারগুলো যাবে কোথায়? মাগো, তাদের পুজোর কথা ভেবে বসতে দিও ফুটপাথে। ভোটের সময় ওরা অনেক খাটে। অটোওয়ালাদের বাড়বাড়ন্ত শহরে। মাগো, যেতে দিও ওদেরও। ট্রাম উঠে যায় যাক, অটো যেন চলে পর্যাপ্ত সংখ্যায়, কারণ ওরাই ভোটের ভবিষ্যত্। এই ভাবেই চলে কলকাতা। এ ভাবেই চলে কলকাতার মেয়ের বিয়ে— পাঁচ দিনের দুর্গোত্সব। বাঙালির গর্বের একটা কিছু তো বটেই। দুর্গাপুজোকে ঘিরে কত জলসার আয়োজন। কত গায়ক গান গেয়ে পয়সা পাবে। কিছু শিল্পী, কারিগর, স্টলওয়ালা, দোকানির অল্প হলেও তো ব্যবসা হবে এ সময়। তাই এসো দেবী এসো এ আলোকে, এক বার তোরে হেরি চোখে!
চার দিন কাটল। নাড়ু মুখে, পান হাতে, সিঁদুর খেলে মা মুচকি হেসে বলবেন, ‘আবার আসিব ফিরে...’
সিংহমশাইয়ের পিঠে চেপে মা, মায়ের দু’জোড়া ছেলেপুলে, একাই একশো উগ্রপন্থী মহিষাসুর আর এক গণ্ডা নির্বিবাদী পশুপাখি বাক্স প্যাঁটরা প্যাক করে রেডি হয়ে জুলজুল করে দেখছে তখন। কোথায় পাব বলরাম-যুগল? কোথায় পাব বাঞ্ছারামের পান্তুয়া? সেনমশাইয়ের মিষ্টি দই? যাদবের দিলখুশ আর কেসি দাসের রসোমালাই? মা বলবেন—
‘চলো চলো চলো সবে,
কৈলাসে গিয়ে হবে,
চমরীর দুধে মিষ্টিমালাই,
বানাবো সকলে খাবে’


আমার ছোটবেলা কেটেছে বরাহনগরের আলমবাজারে। পুজোর মাস দুয়েক আগে কোনও একটা সপ্তাহান্তে বাবা আমাদের কলকাতায় নিয়ে যেতেন পুজোর বাজার করতে। সে ছিল আমাদের সব চাইতে বড় উত্তেজনার দিন— সারাদিনের ‘প্রোগ্রাম’। সকালবেলা ভারী জলখাবার খেয়ে বেরোনো হত আর ফেরা হত সেই রাতে। বাড়ির সামনে থেকে সরকারি স্পেশাল বাস ‘এস ১৭’য় চেপে বসতাম আমরা চার জন। তার পর গিয়ে নামা হত লিন্ডসে স্ট্রিট। প্রথমেই ঠান্ডা পানীয়— ক্যাম্পাকোলা। তার পর সোজা হেঁটে বেন্টিঙ্কট স্ট্রিটে গিয়ে চিনে বাজারের জুতো কেনা হত। চিনেপাড়ার উস্তাদদের হাতে বানানো জুতোতে নাকি পা ভাল থাকে, তাই এত কষ্ট করা! সেই জুতোর বাক্স বয়ে যাওয়া হত নিউমার্কেটে। আমার ফ্রক কেনা হত স্টাইল টেক্স থেকে। মা প্রতিটি ফ্রকের ঝুল আর ডিজাইন খুঁটিয়ে দেখতেন যাতে পোশাকে শালীনতার মাত্রা বজায় থাকে। ভাইয়েরটা কেনা হত রহমান স্টোর্স থেকে। গঙ্গাদীন গুপ্তার অর্গ্যান্ডি আর কোটা শাড়ি, জয়সওয়াল স্টোর্স থেকে মায়ের তাঁতের শাড়ি, ঠাম্মার দুধ সাদা ফাইন থান, দিদিমার ইঞ্চিপাড়ের সাদা শাড়ি, মা দুর্গার লালপেড়ে শাড়ি, জ্যাঠামশাইদের জন্য ফাইন ধুতি— সব কিনে যাওয়া হত নাহুম’স-এ। নিউমার্কেটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নাহুম’স-এর চিজ প্যাটি আর ডি গামার কেক। কেক, প্যাটি খাওয়ার পর বাড়ির জন্যও কিছু নিয়ে নেওয়া হত। তার পর যাওয়া হত লিন্ডসে স্ট্রিটের হ্যান্ডলুম হাউসে। এখানে তখন তো আর আনাচে কানাচে এত বুটিক ছিল না! তাই এক্সক্লুসিভ পিওর সিল্ক শাড়ি কিনতে মা ওখানেই যেতেন। আর সেখানে এক ঢিলে দুই পাখি! পর্দার কাপড়, বেডশিট সব কিছুই মিলত ন্যায্য দামে। বাবার জন্য প্রায় জোর করে মহাদেবী এন্ড মেহতা থেকে শার্ট প্যান্টের পিস কিনতেন মা।

তখন শহর কলকাতায় হাতে গোনা খাবারের দোকান ছিল। কিন্তু এ পাড়ায় সঠিক দামের ছোট বড় রেস্তোরাঁ ছিল বেশ কিছু। ছোলা বাটুরে আর স্পেশাল কুলফি মালাই খেতাম ইন্দ্রমহলে। র‌্যালি’স-এর সিরাপ আর সিমাইয়ের পায়েস সহযোগে এমন সুন্দর কুলফি মালাই বোধহয় আর কোথাও তখন পাওয়া যেত না। এর পর সিম্ফনিতে আমাদের অভিযান। নতুন পুজোর গানের এলপি রেকর্ড। আর তখন এইচএমভি থেকে শিল্পীদের গানের রেকর্ড কিনলে একটা গানের লিরিকসের বই দিত। মায়ের নজর থাকত ওই বইয়ের দিকেই। তত ক্ষণে ফুটপাতের দোকান থেকে ভাই মায়ের আঁচলে গেরো দিয়ে একটা গাড়ি বা মোটরসাইকেল বা একটা ক্যাডবেরি বাগিয়ে বসে আছে। আমার একটা হেয়ারব্যান্ড, জামার সঙ্গে ম্যাচ করে দু’টো ক্লিপ আর রিবনও কেনা হয়ে গিয়েছে। বাবা রেগেমেগে বলছেন ‘‘এ বছরই শেষ। তোমাদের নিয়ে আর আসা যাবে না এখানে। এত বায়না!” কথাগুলো বাবা যে এমনিই বলতেন সেটা আমি বুঝতাম। কিন্তু ভাই বেচারা খুব ভয় পেয়ে যেত।

বিকেলের চায়ের জন্য ঢোকা হত অনাদি কেবিনে। সঙ্গে অবশ্যই অনাদির স্পেশাল মোগলাই পরোটা। এই একটা দিন বাবা বাইরের খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আমাদের লাগাম ছেড়ে দিতেন। আর তখন কলকাতা এত পরিচ্ছন্ন ছিল যে বাইরের খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ভয় কম ছিল। এখন বাইরে খেতে গেলেই ভাবি ভাল জায়গায় যেতে হবে, এসি থাকতে হবে, ভাজাভুজি মোটেই না— হেলথ রুল মেনে খেতে হবে। খোলা জিনিস খাওয়া চলবে না ইত্যাদি।

এক বার বাবা আমাদের চাইনিজ রেস্তোরাঁ কারকো-য় নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন কলকাতায় চিনে খাবারের চল সবে হচ্ছে। চাংওয়া, জিমিস কিচেন, পিপিং আর কারকো— এই ক’টি রেস্তোরাঁতেই সাবেকি চিনে খাবার মিলত। আর চাইনিজ খাবারে ইন্ডিয়ানত্বের ছোঁয়াও ছিল অল্প, তাই আমাদের বরং অসুবিধেই হত। কেবল গোল্ডেন ফ্রায়েড প্রন ছাড়া আর কোনও পদই ভাল লাগত না। বাবা বলতেন, চাইনিজ খাবারের অভ্যেস করতে— সহজ পাচ্য, তেল মশলাও কম। আর সস্ ভিত্তিক রান্না, তাই মুখ বদলানোর পক্ষে আদর্শ। কিন্তু আমরা তিন জন সে কথা মানতাম না। শুধুই গোল্ডেন ফ্রায়েড প্রনের দিকে হাত বাড়াতাম।

আমাদের স্কুল ছুটি পড়ে যেত পঞ্চমীর দিন। আর খুলত ভাইফোঁটার পর। পুজোর ক’দিন বইপত্র শিকেয় তোলা থাকত।

পুজোর প্রতি দিন সকালে বাবা নিয়ম করে চালাতেন গ্রামাফোন চেঞ্জার। আর একে একে সানাই, শরদ, সেতার, নতুন গানের এলপি রেকর্ড— কলের গান বাজত। বছরের এই সময়টা নিয়ম করে বাবা সেই শব্দ যন্ত্রটির পরিচর্যা করতেন পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই। আজও সেই পুরনো আধুনিক গানগুলো রেডিওতে শুনলে মনটা যেন কেঁদে ওঠে। শিউলির গন্ধ, পুজোর ঢাকের আওয়াজ, শিশির ভেজা শরত্কাল ছুট্টে এসে মনের দরজায় কড়া নাড়ে। এক বার কেনা হয়েছিল হেমন্ত, মান্না, আরতি, প্রতিমা, শ্যামল, সন্ধ্যা, অনুপ ঘোষালের সাতটা ছোট ৪৫ আরপিএম-এর রেকর্ড, এইচএমভি থেকে বেরিয়েছিল। আর সবচেয়ে মজা হল দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সাতটা ছোট রেকর্ড এক সঙ্গে ওই চেঞ্জারে বসিয়ে সেট করে ঘুমিয়ে পড়লে নিজের থেকেই একটা একটা করে বাজতে থাকবে। খুব মজা হত— নতুন গান যা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজছে তা আবার আমাদের বাড়িতেও বাজছে। অনুপ ঘোষালের ‘বিয়ে করবই না’, আরতি মুখোপাধ্যায়ের ‘বন্য বন্য এ অরণ্য ভাল’, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘আমিও পথের মতো হারিয়ে যাব’, মান্না দের “ক’ ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ”, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘গহন রাতি ঘনায়’— এই গানগুলো আমাকে তখন ছুঁয়ে গিয়েছিল, তাই বোধ হয় আজও মনের কোটরে পড়ে রয়েছে। সে বার এই গানগুলোই কিন্তু বেরিয়েছিল পুজোর গান হিসেবে, সালটা বোধ হয় ১৯৭৩ কি ১৯৭৪ হবে, ঠিক মনে নেই। এখনকার ছোটরা দেখি পুজোর সময়েও কম্পিউটার গেম খেলছে নয়তো টিভি খুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কার্টুন দেখছে। তাদের ঠেলেঠুলে প্যান্ডেলে পাঠাতে হয় আরতি দেখতে আর অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ খেয়ে আসার জন্য।

সপ্তমীর দিন সকাল থেকেই সব প্যান্ডেলে পড়ে যেত নবপত্রিকার স্নান করানোর ধুম। আলমবাজার গঙ্গার ঘাট খুব কাছে বলে সকাল থেকেই শোনা যেত ঢাকের আওয়াজ। প্রত্যেক বার মা বলতেন নবপত্রিকার পুজো মানে আসলে মা দুর্গার পুজোই। অত বড় মৃন্ময়ী মূর্তি তো আর গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে স্নান করানো যায় না, তাই নব পত্রিকা বা কলাবউকে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ভাই কেবল বলত, ওটা তো গণেশের পাশে থাকে তাই গণেশের বৌ। মা দুর্গা কেমন করে গাছ হবে? মা তখন আবার ব্যাখ্যা করে দিতেন যে ন’রকমের উদ্ভিদ, যেমন, বেল, ডালিম, কচু, মান কচু, হরিদ্রা, অশোক, ধান, কদলী, আর জয়ন্তী গাছের চারাকে শ্বেত অপরাজিতা গাছ দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকা বানানো হয়। শস্যপূর্ণ বসুন্ধরার প্রতীক রূপে চার দিন ধরে মা পূজিত হন।

সপ্তমীর দিন বিশেষ আমিষ পদ রান্না হত— মাছের মাথা দিয়ে ডাল, ফুলকপি দিয়ে ভেটকি মাছ, চিংড়ির মালাইকারি, আরও কত কি! সে দিন বিকেলে আড়িয়াদহে আর দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর দেখতে যেতাম রিকশা ভাড়া করে। বিরাট বিরাট পুজো হয় ওই দু’টি অঞ্চলে। মাঝে মাঝে ‘হল্ট’ দেওয়া হত মামারবাড়িতে আর জ্যাঠামশায়ের বাড়িতে। জল যোগ এবং বিয়োগ করে ঠাকুর দেখার পর্ব চলত।
অষ্টমীর দিন ভোর থেকেই চলত অঞ্জলির প্রস্তুতি। একে একে স্নান সেরে সবচেয়ে ভাল আর দামি জামাটি পরে অঞ্জলি দিতে যেতাম। বিয়ের আগে পর্যন্ত এ ভাবেই কাটত ষষ্ঠী, সপ্তমী আর অষ্টমী।

বিয়ের পর প্রথম বছর কেটেছিল দক্ষিণ কলকাতার পুজো দেখে। ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজমের বাসে চেপে দেখতে গিয়েছিলাম কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজো। আধুনিক থিমের দুর্গাপুজোর চেয়ে অনেক মন কাড়ে এই পুজোগুলি। সে বার সপ্তমীর দিন ধর্মতলা থেকে বাসে চড়ে দেখেছিলাম বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের পুজো, জানবাজারে রানি রাসমণির বাড়ির পুজো, শোভা বাজারের রাজবাড়ির পুজো, উত্তর কলকাতার বিখ্যাত লাটুবাবু-ছাতুবাবুদের পুজো। ডাকের সাজের প্রতিমা, চণ্ডীমণ্ডপে সুদৃশ্য চালচিত্রে বিশাল আয়োজন, বাড়ির মহিলাদের সাবেকি গয়না ও বেনারসি শাড়ি পরে মায়ের পুজো গোছানো— সব কিছুতেই ঐতিহ্যের ছাপ।
আর এক বার আমরা একটা গাড়ি নিয়ে বেলুড় মঠে কুমারী পুজো দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানেও খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো হয়। তবে আজকাল ধর্মের নামে যে হুজুগের স্রোতে আপামর বাঙালি মেতে উঠেছে তা বেলুড় মঠের ভিড় দেখলেও বোঝা যায়।

পুজো এখন ফ্যাশানেবল হয়ে উঠেছে। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে আলোর রোশনাইয়ের সঙ্গে অনুরণিত হয় এক দিকে মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্র আর ডিজিট্যাল এলসিডি স্ক্রিনে রংচঙে বিজ্ঞাপন। আর সেই সঙ্গে থরে থরে সাজানো ফাস্টফুডের গরমাগরম হাতছানি। এক একটি বারোয়ারি পুজো এখন ‘স্পনসর্ড’ পুজো— কোনও এক কোম্পানির সম্পত্তি, কোনও একটি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের কিনে নিয়েছে ওই পাঁচটি দিনের জন্য। প্রতিযোগিতার মাপকাঠিতে মা আসেন একটা প্যাকেজে! সেরা প্যান্ডেল, সেরা প্রতিমা, সেরা দর্শক শ্রীমতি, সেরা আরও কত কিছুর ভিড়ে কিন্তু আসল পুজো একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। সরে যাচ্ছে পুজোর মূল, অনাদি আবেদন।



আমাদের দোল ছিল কিছুটা অন্যরকম— শহুরে দোল যেমন হয়।

আগের দিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখতাম ফাঁকা মাঠে শুকনো গাছপালা কেটে ন্যাড়াপোড়ার আয়োজন। সূর্য ডোবার আগেই প্রস্তুত পাড়ার কচিকাঁচারা। তারপর ঝুপ করে সন্ধে নামলেই সবাই লাইন করে বারান্দায়। আর চারপাশ থেকে ঐক্য সুরে দোলযাত্রার ট্যাগলাইন—
আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল,
পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠবে বল হরিবোল!
এ যেন ন্যাড়াপোড়ার রিয়্যালিটি শো!
পরদিন সত্যনারায়ণের পায়ে ঢিপ করে পেন্নাম করে আবির, পিচকারি, বালতি ভরে রঙের গোলা আর বারান্দা দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে রং ভর্তি বেলুন মারা— কাউকে না পাও তো ধোপ দুরস্ত ফতুয়া পরা বাজার অভিমুখী বাবা-দাদাকেই রং দাও কিম্বা বেচারা কাজের মাসিকে একেবারে চুবিয়ে দাও রঙে। এর সঙ্গে অবিরত মুখ চালানো— ঠাকুর ঘর থেকে ঠাম্মার পুজো করা ফুট কড়াই, মুড়কির চুড়ো ক্রমশ নিম্নগামী হতে থাকে, হাতে রঙিন মঠ। তখন কেউ ফতোয়া জারিও করেনি মঠের রঙের ওপর। লাল মঠে এলিজারিন, হলুদে মেটানিল... এটা খেও না, সেটা করো না!

ক্রমে যখন স্কুল পেরিয়ে কলেজ-গেট তখন দোল বেশ সিরিয়াস, অনার্সের চাপে। তবে দোল ছিল প্রকৃত দোলের মতো— অন্য রকমের মাদকতা আর একটা বিশেষ ছুটির দিন পাওয়া। তখন না ছিল ইন্টারনেট, না মোবাইল ফোন, বা হাজারো কেবল চ্যানেল। অগত্যা দূরদর্শনের দোলের বৈঠকি! তবে মায়ের হাতে স্পেশাল রান্না ছিল সেদিনের মুখ্য আকর্ষণ। দুপুরে পোলাও-মাংস কিম্বা রাতে লুচি-আলুর দম ছিল দোলের ‘স্পেশালিটি কুইজিন’।

কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটির এক লাফে ট্রানজিশান, কো-এড বাতাবরণ। রঙিন চশমা চোখে আর সদ্য ফুটিফুটি যৌবনে পা রাখার আনন্দ। হেদোর মোড়ের ফুচকা ততদিনে পার্শিবাগানে পাড়ি দিয়েছে। বিধান সরণির চাচার রোল তখন রাজাবাজারে উত্তীর্ণ। সেবার প্রচুর ফাগ খেলা হল এক পাল ছেলেমেয়ে মিলে। সেই প্রথম ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে দোল খেলে লজ্জায় লাল টুকটুকে হয়ে মিনিবাসে বাড়ি ফেরা। তবুও আনন্দ আকাশে বাতাসে। মা যেন খুশিই হলেন। একরত্তি মেয়েটা কেমন বড়ো হয়ে গেল! এই তো জগতের নিয়ম। প্রকৃতির গাছে পাতা ঝরে নতুন পাতা আসবে। আম গাছে মুকুল আসবে। বাদাম গাছের পাতা ঝরে গিয়ে লাল ফুল সর্বস্ব গাছ হবে এই তো বসন্তের নিয়ম!

তখন প্রাপ্তবয়স্ক হবার পাসপোর্ট যেন পাওয়া হয়েই যেত সরস্বতী পুজোতে। তার পরেই দোল। অত এব সেই পাসপোর্ট হাতে পেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসা পেয়ে যাওয়া। তাই সব কিছুতেই মায়ের সায়। লালগোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কোর্টশিপ চালু হতে না হতেই বিরহিনী যক্ষের মত দোল রঙিন হত নীল খামে পারফিউম মাখানো চিঠির ভাঁজে লিপস্টিকের চুমু পাঠিয়ে সাগরপারে। তখনও হিমেল বসন্তে ই-মেল নেই। দোলের দিনে এক টুকরো চিরকুটের নীরব প্রতীক্ষা। অপ্রত্যাশিত ভালোবাসার সেই নীল খাম পেলাম দোলে। তারপর একে একে গায়েহলুদ, সপ্তপদী আর দোলের গালের লাল রং উঠল সিঁথিতে।

এখন ফাগুনের ফুল ঝরতে না ঝরতেই চকোলেট-ডে, প্রোপোজ ডে, হাগ-ডে, কিসিং-ডে, ভ্যালেন্টাইনস-ডে পেরিয়ে দোল ডে। দোলের আবিরগুঁড়ো অহোরাত্র উড়তেই থাকে ফেসবুক জানলায়, দেওয়ালে, বারান্দায়। দোলের রং গড়িয়ে পড়তে লাগল অরকুট অলিন্দ দিয়ে। সেই রং গিয়ে পড়ল ফেসবুক উঠোনে।

এখন দোলের রঙের ওপরেও ‘টেকশো’! রূপ সচেতন বঙ্গ তনয়ারা ‘স্কিন-ফ্রেন্ডলি’ রং চায়— ইকো-ফ্রেন্ডলি আবির, ভেষজ গুলাল! দোলের উপহারের তালিকায় আইপড কিম্বা পেনড্রাইভের কাটতি বেশি। দোলের কবিতার খাতা লুকিয়ে থাকত বালিশের নীচে। আর এখন সেই কবিতা ঝরে ঝরে পড়ছে ফেসবুকের বারান্দায়, কার্নিশ থেকে সর্বত্র। তবে দোল আছে দোলেতেই। একটু অন্য আঙ্গিকে। তখন ছিল তরতাজা সত্যি গোলাপ, এখন তা ডিজিটাল। ছিল বসন্ত কেবিনে দুজনে মুখোমুখি দুটো ডিমের ডেভিল বা ফাউল কাটলেট। প্রেম এখন বার্গার-মকটেলে আছড়ে পড়ছে অবিরত। দোলের দিনেও সেই ‘হ্যাং আউট’— শুধু বসন্ত কেবিন এখন নীল ফেসবুকের কফিহাউস কিম্বা ডিজিটাল ঠান্ডাই শরবতি মেসেজ আদানপ্রদানে।

আমরা দোলবাজি করি অন্য ভাবে। কিছুটা ফেসবুকি দলবাজিতে অথবা ব্লগবাজির ঠেকে। তবে দোলের সেই আনন্দ আর খুঁজে পাই না। ফুটকড়াই মুড়কি-মঠ হারিয়ে গেছে। হারিয়েছে দোলের আটপৌরে আভিজাত্য। দোলবাজি এখন স্মার্ট হয়েছে। দোলা লাগছে ফেসবুক-বনে কিন্তু দোলের রং লাগে না মনে। দোলের ব্র্যান্ড ডাইলুশান হল!

মকটেল থেকে চকোলেট, কফি থেকে কেক, সোনা থেকে জাঙ্ক— সর্বত্র হিয়ার মাঝে লুকোনো ‘হ্যাপি হোলি’— হোলি ধামাকা, হোলি বাম্পার, হোলি হ্যায়। শপিং মল, মেট্রোরেল, সুইমিং পুল, তন্ত্রে-মন্ত্রে হোলি হ্যায়।

সেই কবে কবি বলেছিলেন ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’। তারা পলাশ চিনুক না চিনুক, দোলের দিন আগতপ্রায়। দোলের রং লাগতে না লাগতেই ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট করতে হবে...


ওহ্ ক্যালকাটা! প্রথমে ছিল বেহুলার ভেলা, চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙা, সপ্তদ্বীপের রাজকুমারের ময়ূরপঙ্খী নৌকা, গৌরমাঝির চৌদিকে পালতোলা নৌকা। তার পর দেবী চৌধুরানির বজরা, পর্তুগিজ জলদস্যুদের ছিপ নৌকা, সেই সঙ্গে স্টিমার। আরও পরে রবার্ট ক্লাইভের মাল বোঝাই বড় জাহাজ— এ হল জলযানের ফিরিস্তি।

তার সঙ্গে ছিল কুলীনদের পালকি করে বৌ আনা। ভোরবেলায় হাটের দিকে যাত্রা করা কুমোরপাড়ার মাটির জিনিস ভর্তি গরুরগাড়ি, বিকেল হলেই টুং-টাং শব্দ করে শোভাবাজার কিংবা জানবাজার রাজবাড়ির গজগামিনী ঘোড়ার গাড়ি বা সাহেব-বিবিদের ফিটন গাড়ি। তার পর এল ঘোড়ায় টানা রাজকীয় ট্রাম বা স্ট্রিট-কার— হেনরি ফোর্ডের মডেলটি। ক্রমে ইলেকট্রিক ট্রাম, দেহাতিদের টানা রিকশা। অনেক পরে সাইকেল-রিকশা, বাস, মিনিবাস, মেট্রোরেল, দম আটকানো অটো। এর পরে আয়েস করে অস্টিন অথবা হিন্দুস্তান ফোর্টিন, কখনও সাপের আওয়াজ বের করে স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড কিংবা বেসুরো হর্নের স্টুডিবেকার— যা আজকের যুগে ‘ভিন্টেজ কার’-এর মর্যাদা নিয়ে কোথাও না কোথাও এখনও এই শহরের বুকে বেঁচে আছে। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাঁই পাঁই করে ফিয়াট আর আরাম করে অ্যাম্বাসাডর চলত। আর এখন? ম্যারাথনে মারুতির সঙ্গে মার্সিডিজ, হৈ হৈ করে হুন্ডাই, হা হা করে হন্ডা, শোঁ শোঁ করে শেভরোলে আর টগবগ করে টয়োটা ধুলোমাটির শহরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এ হল স্থলযানের বিবর্তনের গল্প!
       
কত ছোটাছুটি হল। পায়ে হেঁটে পানিহাটি থেকে সুতানুটি, পালকি চেপে ব্যারাকপুর থেকে গোবিন্দপুর, বজরায় চাঁদপালঘাট থেকে কুঠিঘাট, বাসে করে খড়দহ থেকে শিয়ালদহ, ট্রামে চেপে শ্যামবাজার থেকে বড়বাজার, ট্রেনে করে সোনারপুর থেকে বারুইপুর,আবার খানিক হেঁটে তালতলা থেকে তারাতলা। ঠিক এমন করেই পায়ের তলায় সরষে নিয়ে কলকাতার মানুষজন নিয়ে বেঁচেবর্তে আজও কলকাতা আছে কলকাতাতেই। ‘কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে’—এ যুক্তির যথার্থতা কলকাতার সব বাঙালি না বুঝলেও অন্য প্রদেশের বাঙালি-অবাঙালি সকলেই বোঝে। ১৬৯০ সালে জোব চার্নক কলকাতা মহানগরীর গোড়াপত্তন করেছিলেন। যদিও মহামান্য আদালতের নির্দেশে কলকাতার এখন আর কোনও জন্মদিন নেই, শহরের প্রতিষ্ঠাতার গৌরব থেকেও জোব চার্নক বাদ পড়েছেন। তখন শিয়ালদহে সত্যি সত্যি শেয়াল প্রতি সন্ধ্যায় সুর সাধনা করত, বাগবাজারে বেরোত বাঘ, হাতিবাগানে হস্তিকূল না থাক হায়না হা হা করে হাসত, আর গোবিন্দপুরের জঙ্গলে ছিল সাপেদের আধিপত্য। জোব চার্নক অনুধাবন করেছিলেন এ শহরের মাহাত্ম্য। এ শহরের মৃত্তিকার কণায় কণায় কনক-দানা, যার প্রমাণ স্বরূপ কলকাতার নাড়ি নক্ষত্র এখন প্রোমোটারের কব্জায়। শ্রীরামকৃষ্ণ সেই কবে বলেছিলেন না ‘টাকা মাটি, মাটি টাকা’! মহাপুরুষের বাণী কি বিফলে যাবে? আহা! ঠাকুর দেখে যেতে পারলেন না!

কলকাতা এই মুহূর্তে সেতু-নগরী। আগে ছিল হাওড়া ব্রিজ মানে রবীন্দ্র সেতু, একাই। এখন তো ব্রিজ-ফ্লাইওভারের দায়ে আকাশ দেখাই যায় না! ব্র্যাবোর্ন রোড ফ্লাই ওভার, শিয়ালদার উড়ালপুল, হেমন্ত সেতু, বিজন সেতু, অরবিন্দ সেতু, আরও পরে শম্বুকগতিতে তৈরি হওয়া বিদ্যাসাগর সেতু... তার পর আর ফিরে দেখতে হয়নি। প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় সেতুতে-সেতুতে ছয়লাপ। বেচারা রামচন্দ্র! কী কষ্ট করে সেতু বেঁধেছিলেন! তিনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই রামেশ্বর স্টাইলের আরও দু-চারটে সেতু গঙ্গাবক্ষে এত দিনে নির্মাণ হয়ে যেত!

যোগাযোগ ব্যবস্থায় কলকাতার জন্মলগ্নেই বৃহস্পতি তুঙ্গে। ভৌগলিক সীমারেখা আদি অনন্তকাল থেকেই একে বর্গি, জলদস্যুর হাত থেকে যেমন রেহাই দেয়নি, ঠিক তেমনি ইউরোপীয় বণিকদের আশ্রয় দিয়ে তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের পথও সুগম করে দিয়েছিল। সেই জন্যই সাহেব-সুবো বুঝতে পেরেছিল তাদের এই প্রাণের জায়গাটি অর্থাত্ ‘ক্যালকাটা’ সারা ভারতবর্ষের রাজধানী হওয়ার যোগ্য। এর অন্যতম ও প্রধান কারণ এ নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আর সহজলভ্য শ্রমিক, যারা অন্যের হাতে মার খেয়ে কাজ করতে প্রস্তুত, আর তার সঙ্গে বিদেশি বণিকের মোসায়েবি করতে পিছপা নয় এ রূপ বাঙালিবাবু।
   
প্রায় অর্ধশত বছর পূর্বে দেশবরেণ্য চিকিত্সক বিধান রায় তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর সুপরিকল্পিত স্বপ্ননগরী সল্টলেক। কলকাতার লবণহ্রদ আজকের বাংলার সিলিকন ভ্যালি। আহা! বিধানচন্দ্র দেখে যেতে পারলেন না। তিনি আরও কিছু দেখে গেলেন না, নিজের হাতে গড়া তাঁর এ শহরের চিকিত্সা ব্যবস্থা এখন ঢেলে সাজানো হয়েছে। আধুনিক কলকাতার হাসপাতালের কি ‘দশা’ আজ! রাজারহাটে যে চাঁদের হাট বসেছে তাও দেখে যেতে পারলেন না বিধানচন্দ্র। এ দিকে কেষ্টপুর ক্যানেলে গন্ডোলা চলল বলে!

এ শহরের লোকের মজ্জায় মজ্জায় মাছের সুবাস, হাড়ে হাড়ে হাওয়াবদলের জন্য সদা-ব্যাকুলিত প্রাণ, রক্তের প্রতিটি কণায় কণায় নৃত্য-গীত-বাদ্যানুরাগ। বাঙালি দিনের বেলায় মাছ, ভাত খেয়ে ভুঁড়ি উঁচিয়ে যতটা না ঘুম দিতে পারে, সন্ধেবেলায় মুড়ি-তেলেভাজা সহযোগে ততধিক আড্ডার আরাধনা করে। এ শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্ধ ভালবাসা, যার গন্ধে গন্ধে বিজাতীয় মানুষ এখানে ভিড় করে, চৌম্বকীয় আবেশে বশ করে কাছে টানে। সস্তার এ শহরে এক বার কেউ এসে ব্যবসা ফাঁদলে ধনী হয়,পস্তায় না। এ শহর পারে শুধু পরকে আপন করতে, নিজেকে পেছনে ফেলে পরকে এগিয়ে দিতে। নিজের ব্যবসায় ইতি টেনে ভিন্ দেশিদের স্বাগত জানাতে।

শত-সহস্র তারকাখচিত এ শহরের আকাশ। যার রূপে সুচিত্রা, রসে ভানু, বর্ণে সৌমিত্র, কণ্ঠে শানু। মানুষের শয়নে উত্তমকুমার, স্বপনে হেমন্তকুমার আর জাগরণে কিশোরকুমার। কলকাতাবাসীর ছন্দে আনন্দ-তনুশ্রী, সুরে শচীনকর্তা-কৃষ্ণচন্দ্র, সঙ্গীতে নজরুল-রবীন্দ্র, সাহিত্যে বঙ্কিম-শরত্চন্দ্র, স্পর্শে সিনিয়র-জুনিয়র সরকার, শিল্পকলায় যামিনী-গগনেন্দ্র, স্বর্ণে পিসিচন্দ্র আর সর্বোপরি মিষ্টান্নে যাদবচন্দ্র— এদের নিয়েই বাঙালি বহাল তবিয়তে কাল যাপন করছে। যুগ যুগ ধরে এ শহর তৈরি করেছে ব্রান্ডেড-ব্যাক্তিত্ব— অফুরান হাসিতে ঘনাদা, রহস্যে ফেলুদা, রোমাঞ্চে টেনিদা।

আধুনিক কলকাতার জলে এখন আর্সেনিক, নবনির্মিত নর্দমার মুখে প্ল্যাস্টিক যা কিনা পরিবেশবিদের উদ্বেগের কারণ। মিষ্টান্নে মেটানিল-ইয়েলো এবং সরবতে এলিজারিন-রেড রসায়নবিদের গবেষণার বিষয়। আজকের বহুতলে বর্ণময় কলকাতার বুকেপিঠে শপিংমল, মাল্টিপ্লেক্স।

যে শহরের আকাশে-বাতাসে মাছের আঁশটে গন্ধ, কেন তার কাছে অবাঙালির ভিড়? চিংড়িহাটায় জ্যাম নিয়ে, ট্যাংরার চাইনিজ নিয়ে আমরা আজও আছি ও থাকব। ভেতো বাঙালির বাজারের থলি থেকে সজনেডাঁটা আর পুঁইশাক উঁকি দেবেই। বাঙালির পোস্ত চচ্চড়ি ছাড়া ডাল রুচবে না। বাঙালি যুত করে মাছের কাঁটা চচ্চড়ি চিবোবে, বাঙালি মজা করে মৌরলার টক খাবে আর সরষের তেল ছাড়া ইলিশ রাঁধবে না। এই নিয়ে তারা শান্তিতে থাক না, ক্ষতি তো নেই! তাতে যদি অন্যের ক্ষতি না হয়! রোজ সন্ধ্যায় তুলসীতলায় আলো দিয়ে রেডিও খুলে অনুরোধের আসরে প্রতিমা-আরতি শুনুক। অথবা বিকেলে ভোরের শুকনো ফুল ফেলে শাঁখ বাজিয়ে বাড়ির মঙ্গল কামনা করুক।
       
নৈশাহারের পরে দিলখুশের জন্যে মন উসখুস করবে, নতুন প্রজন্ম লোডশেডিং-এ অঙ্ক কষে বিদেশ যাবে, বাংলা ব্যান্ডের ‘ফাজলামি’ আর নেতাদের ‘পাগলামি’ নিয়েই পড়ে থাকবে— ক্ষতি কি? শুধু দফতরের ডেস্কে বসে ঘুমোব না আর নিজের পায়ে কুড়ুল মারব না। তা হলেই আমাদের মোক্ষলাভ হবে। সৃজনশীল বঙ্গসন্তান বুদ্ধি বেচে বড় হবে, অদূর ভবিষ্যতে কলকাতা হবে ‘বিশ্বের বিনোদন হাব’— যেথায় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সৃষ্টি সুখের উল্লাসে উদ্দাম নৃত্য-গীত-বাদ্যের সমন্বয়ে জগতের মনোরঞ্জন করে ‘কলিযুগ কি কলিউড’-এর আখ্যা পাবে। এখানেই তার সার্থকতা। কলকাতার মানুষ দোল-দুর্গোত্সবের দক্ষযজ্ঞ নিয়ে, বামে-ডানে দলাদলি করে, নন্দনে সত্যজিতের বন্দনা, রবীন্দ্রসদনে রবির আরাধনা আর রবীন্দ্র সরোবরে প্রেমের উপাসনা নিয়ে যদি কোনও এক দিন জগতের আনন্দযজ্ঞে নিমন্ত্রণ পায়! আমাদের কল্লোলিনী কলকাতা যেন ভারতবর্ষের রাজধানী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। উপর থেকে নেতাজি-নেহরু-গাঁধীরা দিল্লির মসনদের ঘাড় ধরে কলকাতায় নিয়ে আসার আদেশ দেন!

এই জনমেই ঘটাতে চাই জন্ম-জন্মান্তর... সুন্দর, হে সুন্দর!

কলকাতার বোশেখ, বোশেখের কলকাতা (১লা বৈশাখ ২০১৪)

আবার দেখতে দেখতে আমরা নতুন বছরের দোরগোড়ায়। নতুন বাড়ির হাউস ওয়ার্মিং পার্টির তোড়জোড় শুরু। সারা বছরের পুরনো খাতাপত্তর ঝেড়েঝুড়ে তাকে গুছিয়ে, সকলের বাড়িতেই এখন বসন্ত বিদায়ের তোড়জোড়। আবার গরমের বিকেলে গা ধুয়ে পরে নেব মলমল শাড়িখানা, বরষার সান্ড্যাক চটিজোড়া যত্ন করে রেখে দেব, ভাদ্রের রোদে পুরনো বালুচরি রোদ খাওয়াব, শীতের পশমিনা-বালাপোশ মথ বলের গন্ধে ভরপুর করবে। ফাগুনের আগুন নিভে যাবে দোলের সঙ্গে সঙ্গে আর তার সঙ্গেই চৈত্রসেলের চিত্কার! চৈত্রমাস পড়তে না পড়তেই পুরনো বছরটার পাততাড়ি গোটানোর ধান্ধা। নতুন বছর আসবে বলে ঘর ঝাড়াপোঁছা, সেই অছিলায় নতুন জামা, আনন্দে হইহই করে হ্যাং আউটের প্ল্যান, নবপঞ্জিকা, হালখাতা আর নতুন ক্যালেন্ডার। সেইসঙ্গে বাঙালির ঝালিয়ে নেওয়ার পালা সেই বং-কানেকশন। কী করে ভুলি আমরা? যত‌ই ইংরেজি ছবি দেখি, ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে অনর্গল কথা বলি আর গোগ্রাসে কন্টিনেন্টাল খাবারদাবার গিলি না কেন, আদতে আমরা ঝোল-ঝাল-অম্বলের ভক্ত।

চৈত্রশেষে অকালবোশেখি পাওয়ার মতো বাঙালির আরও একটা বড় প্রাপ্তি হল পয়লা বৈশাখের অপ্রত্যাশিত নতুন জামাকাপড়, নিদেন একটা গানের সিডি অথবা একখানা ব‌ই। ঠিক তক্ষুণি মনে হয় ছোটবেলার কথা। মনে মনে আমাদের বয়স কিন্তু বাড়ে না। সেই পয়লা বৈশাখের দিন বাবার সঙ্গে দোকানের হালখাতার চিঠি নিয়ে, বরফকুচি দেওয়া কাচের গ্লাস ওপচোনো অরেঞ্জ স্কোয়াশ আর সঙ্গে বগলদাবা করে মিষ্টির বাক্স। ঠাকুমার জন্য বাড়ি নিয়ে যেতে হবে সোনার গয়নার দোকানে নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার। দিদিমার জন্য বুকস্টল থেকে নতুন পঞ্জিকা, তা-ও নিতে হবে মনে করে। কমপক্ষে চারটি দোকানের মিষ্টির বাক্স একত্র জড়ো করে বাড়ি ফিরে বসবে আমাদের সান্ধ্য বৈঠকি। সঙ্গে গান তো হাতের পাঁচ। সবচেয়ে মজা লাগত মাছের বাজারেও হালখাতার মৌরসী পাট্টা দেখে। সে দিন মাছবাজার ধুয়েমুছে সাফ এক্কেবারে। মাছের আঁশটে গন্ধ কাটানোর জন্য ফিনাইল, ধূপ-ধুনো কত্ত সব কায়দা। আর মাছওয়ালাও ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি চড়িয়ে বসেছেন জম্পেশ করে। আমি আছি বাবার হাত ধরে লেসের ফ্রিল দেওয়া, নতুন ছিটের নরম ফ্রকে। প্রথম বার গিয়ে ভেবেছিলাম সে বুঝি মাছ দেবে ফ্রি-তে। সে গুড়ে বালি! পয়লা নম্বর মিষ্টির বাক্স নিয়ে থরে থরে বসে আছে সে-ও!

পয়লা বোশেখের কথা মনে হলেই বেশি করে মনে পড়ছে হাতিবাগান বাজারের কথা। আমার কলেজবেলার পাঁচ-পাঁচটা বছরে এই হাতিবাগানের শাড়ির দোকানগুলো থেকে হইহই করে ভিড় মাথায় নিয়ে বন্ধুরা মিলে শাড়ি কিনতে যাওয়া, সে-ও এক দারুণ অভিজ্ঞতা। আর সেই সঙ্গে রূপবাণী-তে উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখে সিলভার ভ্যালির মুচমুচে কবিরাজি কাটলেট? ফড়িয়াপুকুরের টকি শো হাউসে তখন ভাল ভাল ইংরেজি ছবিগুলো আসত। বাবা নিয়ে যেতেন দেখাতে। টাওয়ারিং ইনফার্নো, টোয়েন্টি থাউসেন্ডস লিগস আন্ডার দ্য সি, টেন কমান্ডমেন্টস, বেনহার— কত ছবি না দেখা হয়েছে ওই হলে। আর ফেরার পথে ফড়েপুকুরের সেই অমৃতর পয়োধি?

আর মনে পড়ে স্টার থিয়েটারের কথা। সে বার কলেজ থেকে ফেরার পথে সুপ্রিয়াদেবীর "বালুচরী" নাটকের টিকিট কেটে নিয়ে এলাম বাড়ির সকলের জন্য। পর দিন পয়লা বৈশাখে সকলে মিলে নাটক দেখে বাড়ি আসা হল। কি দারুণ নাটক! যেমন কাহিনি তেমনই অভিনয়। ফিনিক্স পাখীর মতো আগুনে ভস্মীভূত হয়ে আবার সেই ছাই থেকে উঠে এসেছে স্টার। স্টার থিয়েটারের সিনেমায় উত্তরণ হয়েছে। ভাবলেও নস্ট্যালজিয়ায় সেই নাটক শুরু হওয়ার মিউজিকাল সোনাটা কানে বাজে।

হেদুয়ায় কলেজ গেটের পাশে রোজ সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা অবধি দাঁড়িয়ে থাকত মতিদা। এ পাড়ার বিখ্যাত ফুচকাওয়ালা। তার ফুচকা যেমন বড় বড়, গোল্লা গোল্লা ও মুচমুচে আর তেমনই সুস্বাদু তার যাবতীয় অনুপান। একদম ঠিকঠাক টক, ঝাল ও নুনের কম্বিনেশন। আমাদের অনেক গবেষণা হত সেই তেঁতুল জলের রসায়ন নিয়ে। বাড়িতে অনেক বকুনিও খেতাম রোজ রোজ ফুচকা খাওয়া নিয়ে। কিন্তু মতিদা মানুষটা আর তার ফুচকার টানকে কিছুতেই এড়াতে পারতাম না। মতিদার ছিল একটাই স্লোগান, "ইয়ে ফুচকা খাইয়ো তো মতিদাকা গুণ গাইও", "আমার ফুচকায় অসুখ করবে না। কলেজের ফিল্টারের জলে তৈরি এই তেঁতুলজল।"

আমার দিদি তখন পড়ত অন্য কলেজে। দিদিকে বলতাম "এক দিন তোকে মতিদার ফুচকা খাওয়াব।" তা সে আর হয়ে উঠত না। সে বার পয়লা বোশেখের ঠিক আগে মা নতুন জামাকাপড় কেনার টাকা দিলেন। আমরা দু'বোনে হাতিবাগান থেকে জামাকাপড় কিনে একটা চায়ের দোকানে এসে চা-জলখাবারের অর্ডার দিয়ে দেখি, পার্সের সব টাকা শেষ। মাত্র একটা কয়েন পড়ে আছে। এই হল পয়লা বৈশাখের হাতিবাগান! যেখানে অজস্র জিনিস আর তার হাতছনিকে উপেক্ষা করা যায় না। এ দিকে প্রচন্ড খিদে পেয়েছে আর বাড়িও ফিরতে হবে। হাঁটা লাগালাম কলেজের দিকে। বাসে উঠব যে সে পয়সাও নেই। হাঁটতে হাঁটতে দুজনে পৌঁছলাম কলেজ অবধি। সেখানে মতিদা তখনও দাঁড়িয়ে। দিদিকে দেখামাত্রই মতিদা যথারীতি তার স্লোগান আওড়াল, "ইয়ে ফুচকা খাইয়ো তো..."

দিদিকে কথা দিয়েছিলাম এক দিন ফুচকা খাওয়াব। মতিদা শালপাতা ভাঁজ করে এগিয়ে দিল আমাদের সামনে। আমি বললাম, "না, মানে একটা কথা ছিল মতিদা।" মতিদা বলল, "খাও খাও, কিচ্ছু হবে না।" বললাম, "না না, সে কথা নয়।" মতিদা  বলল, "মা বকবে?” বললাম, "না না, পয়সা ফুরিয়ে গেছে যে।" মতিদা বলল, "কাল দিও, আগে তো খাও।" আমি বললাম, "বাড়ি ফেরার পয়সাও নেই।" মতিদা বলল, "আমি দিচ্ছি, কাল দিও।" আমরা পেট পুরে ফুচকা খেলাম। এত ভাল বোধ হয় আগেও লাগেনি কখনও। আরও যেন বড়বড়, গোল্লা গোল্লা, মুচমুচে ফুচকা! আরও পার্ফেক্ট টক-ঝাল-নুনের কম্বিনেশন!

এই পয়লা বোশেখ এলেই আমার মতিদার কথাও ভীষণ মনে পড়ে!

 

বেঙ্গল পুজো লিগ-এর প্রস্তুতি ম্যাচ  

(পুজো ২০১৪) 


‘পুজোটা এ বার বড্ড তাড়াতাড়ি, ধুস ভাল্লাগে না, জলে-কাদায় এ বার যে কি হবে! জলে ডুবে কলকাতার প্যাচপ্যাচে পথঘাটে পা মচকে সে বার আমার কি করুণ অবস্থা হল। আগের বছরের খুঁটিপোঁতার গর্ত এখনও বোজায়নি আর সেখানেই না পড়ে...। তার পর সেখানে প্রোমোটার রাজের কৃপায় রাস্তায় চলায়ই দায়। স্টোনচিপস, বালি, ইট-কাঠ বোঝাই রাস্তার দু’পাশ, ফুটপাথে হকার, খালপাড়ে ঝুপড়ি। তবে সেখানকার মানুষজন তোমাকে বড় ভক্তিছেদ্দা করে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে একটা বট কিংবা অশ্বত্থ গাছ হলেই তোমাকে পিতিষ্ঠা করে ওরা। আমি তো সেখানে পাত্তাই পাই না। এই বছরে এক বার যা পুজোর সময় আমাকে ওরা ফুলবেলপাতা ছোড়ে।’ মা দুর্গা বললেন মহাদেবকে।

মহাদেব বললেন, ‘গিন্নি, তোমার যাবার যে কী দরকার, তাই বুঝি না... বাপের বাড়ি, বাপের বাড়ি। প্রতি বছর এই আদিখ্যেতা আমারও পোষায় না।’

‘সারাটা বছর তো এই ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে আছি আমরা। ন যজৌ, ন তস্থৌ অবস্থা। বলি তোমার অসুবিধেটা কোথায় বাপু? তোমার আফগারি বিলাসের তো ব্যবস্থা থাকছেই। আর ওই ষাঁড় দুটো তো রইলই পাহারায়। থরে থরে সিদ্ধি-গাজা-আফিম-ভাঙ সব কিনেকেটে রেখে দিয়ে যাই তো।’ দুর্গা বললেন।

এ বছর সুদূর ইতালি থেকে মহাদেবের এক ভক্ত ইলারিও এলাতজি কৈলাস মানস সরোবর বেড়াতে গিয়ে মহাদেবকে একটি গন্ডোলা উপহার দিয়ে এসেছেন। এতক্ষণ ধরে মা-বাবার কথোপকথন শুনতে পেয়ে প্রত্যুৎপন্নমতি সরো বললে, ‘আইডিয়া! এ বার তা হলে গন্ডোলাটা আমরা কলকাতায় নিয়ে যাব।’

লক্ষ্মী বললে, ‘বেঁড়ে বললি বোন আমার।’

গণশা ভুঁড়ি চুলকোতে চুলকোতে শুঁড়টা দুলিয়ে সম্মতি দিল। আর কেতো সেই কথা শুনে ঘরের বাইরে পার্ক করে রাখা গন্ডোলাটিকে ঘষেমেজে সাফ করতে উঠেপড়ে লেগে গেল। বলল, ‘ইয়েস! এ বার আমরা আমাদের মতো থিমসর্বস্ব গমন শুরু করব কৈলাস থেকে। গন্ডোলায় আগমন ও প্রত্যাবর্তন। দাঁড়াও সে গন্ডোলা এখন বরফের আস্তরণে বন্দি হয়ে আছে। তকে চেঁচে নিয়ে, রং চং করে তবে আমাদের যাওয়া।’

গণশা শুঁড় নাচিয়ে বিজ্ঞের মতো বললে, ‘নীল-সাদা রং লাগাস ভাই, নয়তো কলকাতায় আমাদের ল্যান্ডিংটা সুখের হবে না। আর সরো তুই সারা রাস্তায় আর যাই গান গাস না কেন পশ্চিমবাংলায় ঢুকে রোবিন্দসংগীত ধরিস বাপু। কলা-কৃষ্টি-সঙ্গীত-বাদ্যের সর্বজনীন পীঠস্থান পশ্চিমবাংলা।’

দুর্গা সহাস্যে বললেন, ‘দেখ, কেমন ছেলে বিইয়েছি! লোকে সাধে আমায় বলে রত্নগর্ভা!  কিন্তু কৈলাস থেকে কলকাতা এই গন্ডোলা বয়ে নিয়ে যাবে কে?’

সরো বললে, ‘গুগল ম্যাপস খুলে দেখে নিচ্ছি রুটটা। পালোয়ান সিংহ অসুর সামনে বসে দাঁড় বাইবে গন্ডোলার। আর মা তোমার সিংহকে বোলো তার সামনের হাত দু’টো গন্ডোলার বাইরে রেখে জল কাটতে কাটতে যাবে সে। উল্টো দিকে কেতোর ময়ূরটা মুখ বের করে থাকবে। বাংলায় এমন নৌকো তো ছিল আবহমান কাল ধরে।’

লক্ষ্মী বলল, ‘ময়ূরপঙ্খী যাকে বলে। শুধু রুটটা দেখে নে ভাল করে। কৈলাস টু কলকাতা।’

সরো বললে, ‘আমাদের গন্ডোলার নাম দেব সিংহ-ময়ূরপঙ্খী। আর বাকিরা কোথায় বসবে?’

মাদুর্গা উল্লসিত হয়ে বললেন, ‘কেন অসুরের পেছনে আমি। আমার দু’পাশে তোরা দুই বোন যেমন থাকিস।’

কেতো বললে, ‘ভাল বলেছ। আমরা দুই ভাই উল্টো দিকে মুখ করে ময়ূরের দিকে বসবখন। গণশা একাই ব্যালেন্স করে দেবে তোমাদের।’

সরো বললে, ‘হোয়াট অ্যাবাউট ইঁদুর?’

লক্ষ্মী বললে, ‘আমার রাজহাঁসের আর তোর প্যাঁচার বাবা কোনও জ্বালা নেই। সুন্দর ডানা মেলে গন্ডোলার উপর দিয়ে উড়তে উড়তে যাবে প্যাঁচা। আর রাজহাঁস জল কেটে কেটে ঠিক সাঁতরে ম্যানেজ করে দেবে। মুশকিল হল ইঁদুরটাকে নিয়ে। তেনার আবার সারা দিন দাঁত বেড়ে চলেছে। কিছু কাটতে না পারলে আমাদের জামাকাপড় সব যাবে ওর পেটে।’

গণশা বললে, ‘বেশ, আমার ইঁদুরকে নিয়ে তোমাদের যখন এত জ্বালা...।’

লক্ষ্মী বললে, ‘আহা, রাগ করছিস কেন? আমার ধানের ঝাঁপি থেকে ধান ছড়িয়ে দেব গন্ডোলার মধ্যে, ও সারাটা রাস্তা খুঁটে খেতে খেতে পৌঁছে যাবে।’

সরো বললে, ‘গন্ডোলায় উঠে মাঝিকে গান গাইতে হয় কিন্তু। অসুর কি ওই সব সূক্ষ্ম, রুচির অধিকারী?’

দুর্গা বললেন, ‘সরো, তুই বাবা ওটুকুনি ম্যানেজ করে দিস।’

‘আমার রুদ্রবীণা অবসোলিট। আমাকে বেস গিটার কিনে দাও তবে।’

মা দুর্গা বললেন, ‘ও সরো, খালি গলাতেই গলা ছেড়ে গান গেয়ে দে মা এ বারটার মতো। কলকাতা পৌঁছে তোর বেস গিটারের অর্ডার দেব।’

‘রবীন্দ্রসঙ্গীতকে অপেরার মতো গাইতে দেবে ওরা? গন্ডোলায় অপেরা সঙ্গীত কিন্তু অবশ্য কর্তব্য। ইলারিও বলে দিয়েছে বাবাকে। নয়তো গন্ডোলার ভরাডুবি। গলা ছেড়ে চিৎকার করে গাইতে হবে গান। আমাদের মাঝিমল্লার প্যানপ্যানে ভাটিয়ালি গাইলে হবে না। ইতালির লোকগীতি কি যেন নামটা তার, ভুলে গেছি।’ সরো বলে।

কেতো ঝাঁ করে সার্চ করে বলল, ‘বার্কারোল।’

‘হ্যাঁ, আমাদের লোকগীতির সঙ্গে আকাশপাতাল তফাত। আমায় ডুবাইলিরে, ভাসাইলিরে মার্কা গান ওরা গায় না। ওরা থাকুক ওদের বার্কারোল নিয়ে। আমরা আমাদের মতো করে গাইব, ব্যস।’ সরো বলল।

কেতো বলল, ‘এ সব তো ঠিক আছে। কলকাতায় পৌঁছে বানভাসি পথঘাটে গন্ডোলা চড়ে আমাদের হোল ব্যাটেলিয়ান যখন নামবে তখন ভিড়টা আন্দাজ করতে পারছ? প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে তখন থিম পুজোর মাতলামি, আমাদের নিয়ে হইচই... সব মিলিয়ে আমরা ঘেঁটে ঘ।’

‘যা বলেছিস। এ দিকে বৃষ্টি রিমঝিম, ও দিকে পুজোর থিম। এ পাড়ায় জল থই থই, ও পাড়ায় শুধু হইচই...। তার পরে তারস্বরে মাইক, ভিড়ে ছয়লাপ মোটরবাইক। কলকাতার হকারময়তা, আর হকারদের কলকাতাময়তা। তার চেয়ে বরং এই বেশ ভাল আছি আমরা। ওই ক’টা দিন জমিয়ে খাই, চমরীর দুধের মালাই। ব্রাহ্মণী হাঁসের রোস্ট। এ বারে পুজোয় যাওয়াটা পোস্টপন্ড কর! লেট আস প্ল্যান ফর এ প্লেজার অটাম ট্রিপ!’ লক্ষ্মী বললে চিন্তিত হয়ে।

তা হলে আমাদের গন্ডোলা প্ল্যান? মা দুর্গা কেঁদেই ফেললেন।

‘মা তোমাকে বেড়াতে নিয়ে যাব বলেছি যখন যাবই আমরা। আর গন্ডোলা চড়েই যাব। তবে কলকাতায় নয়। এ বার অন্য কোথাও।’

কেতো বললে, ‘সেখানে শিল্পীদের খুব সম্মান বুঝলি সরো। আমাদের মতো আম আদমি পাত্তাই পাবে না। তার উপর এ বার শুরু হয়েছে বেঙ্গল পুজো লিগ (বি পি এল)-এর হুজ্জুতি।’

‘সেটা আবার কী রে?’ লক্ষ্মী বলল।

‘শোন, ইংল্যান্ডের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। তার নকলে আমাদের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ। যার ধাক্কায় ক্রিকেট প্লেয়াররা ক্রিকেট ভুলে গিয়ে ফ্যাশন মডেল ও টেলিভিশন স্টার হয়ে গেল। এখন ক্রিকেটের কভার ড্রাইভের বদলে সেক্সি মন্দিরা বেদীর হল্টার বেশি পাত্তা পেল।’ কেতো বললে।

‘তার সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক?’ সরো বললে।

‘শোন, তবে বলছি। প্রিমিয়ার লিগে ক্রিকেটারদের খাতির দেখে হকিওয়ালারা করল হকি লিগ, ব্যাডমিন্টনে করল ব্যাডমিন্টন লিগ। এর পরে পেশাদারি ফুটবল লিগ ও কবাডি লিগও হচ্ছে।’

‘কিন্তু তার সঙ্গে শারদীয়া উৎসবের কী সম্পর্ক?’

‘ওটাও বোঝো না? কাগজ পড়ো না? এখন আর পুজোর প্যান্ডেলে গিয়ে হাত পা গুটিয়ে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে পাঁচ দিন অহোরাত্র বসে থাকলে চলবে না। কমার্শিয়াল ব্রেকের ফাঁকে ফাঁকে হাত-পা ছুড়ে কিছু একটা তামাশা দেখাতে হবে। তবেই না দর্শকরা থুড়ি ভক্তরা আনন্দ পাবে আর পুজো এনজয় করবে। আর তবেই না প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ফুটফল হবে। তবেই না চ্যানেলের টিআরপি বাড়বে। আর তবেই না স্পনসররা পয়সা ঢালবে আর তবেই না উদ্যোক্তারা সেই টাকায় মোচ্ছব করবে।’

‘তার মানে আমরা নিছক এন্টারটেইনার?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ মশাই। ঠিক যেমন খোলায়াড়দের খেলায় পারদর্শিতার চেয়ে চিত্তবিনোদেন করা বেশি জরুরি, তেমনই আমাদের জ্ঞান, বিবেক, বৈরাগ্য, ভক্তির আর কোনও প্রয়োজন নেই। ও সব এখন অবসোলিট। আম আদমিকে খুশ করো, তা হলেই জুটে যাবে সারদশ্রী মার্কা একটা অ্যাওয়ার্ড।’

‘তা হলে আমাদের এখন কী করণীয় সেটা বল।’

‘আমাদের তিন মহিলাকে বোল্ড অ্যান্ড বিউটিফুল ড্রেস পরতে হবে। ওই সব আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ির বেনারসী শাড়ি আর ব্লাউজ পরা চলবে না। পারলে আইপিএলের চিয়ার লিডারদের মতো উদ্ভিন্ন যৌবনা হয়ে নাচতে হবে, নাচাতে হবে পাবলিককে। কেতো আর অসুরকে চুলবুল পান্ডে মার্কা ভায়োলেন্ট নাচ নাচতে হবে। পারলে মহিলা কনস্টেবলকে পাঁজাকোলা করে।’ লক্ষ্মী বলল।

গণশা বললে, ‘আমি বাপু নাচাকোঁদায় নেই।’

কেতো বললে, ‘ঠিক আছে, তোমাকে বীরাক্কেল কিংবা হাস্যকবি সম্মেলনের মতো কাতুকুতু দিয়ে হাসাতে হবে। এই এ বারের বি পি এল।’

সো উই আর গোয়িং। দিস পুজো গন্না বিপিএল! থ্রি চিয়ার্স ফর বিপিএল। হিপ হিপ হুররে। মা দুর্গার চার ছেলেপুলে মহা আনন্দে চিৎকার করে উঠল। 

 

আদরের শীতে ভাসমান শহর ( শীত- ২০১৫ )
শীতের জন্য সারাটা বছর ঠিক যেন হাপিত্যেশ করে বসে থাকা!

ভোরে উঠে চোখ রগড়িয়ে কুয়াশার ফাঁক দিয়ে সূর্যকে চোখ মারব বা লেপ-বালাপোশ নরম করে গায়ে টেনে নিয়ে আরও একটু বিছানার ওম নিচ্ছি। কর্তা জিজ্ঞাসা করলেন, “আজও বাজার যেতে হবে?” গিন্নির গলায় আদুরে মেজাজ, “আজ একটু ওলকপি এনো প্লিজ! ফ্রিজে অনেকটা চিংড়ি আছে, কড়াইশুঁটি দিয়ে রাঁধব।” অথবা “খেজুরের গুড় ওঠেনি গো? দু’টো নারকেল এনো তা হলে। বাবার জন্য একটু পাটিসাপটা বানিয়ে নিয়ে যাব।” এই হল শীতের কলকাতায় আম বাঙালিবাড়ির ভোর।

কুয়াশার পরত ছিঁড়ে ঘুম ভাঙে কলকাতার। হ্যালোজেন নিভে যায়। আমি কান পেতে র‌ই। উশখুশ প্রাণ। খবরের কাগজ ছিনিয়ে নিয়ে দেখা শীতের কলকাতার কোথায় কী আছে! আজ নন্দনে সিনেমা তো কাল আইসিসিআর-এ চিত্র প্রদর্শনী। অ্যাকাডেমিতে নাটক কিংবা মিলনমেলায় টেরাকোটা-ডোকরার আমন্ত্রণ। আর কয়েক দিন পরেই তো শীতের কলকাতার বড় পার্বণ ‘ব‌ইমেলা’। রবিবার ভোরে ঘুম ভাঙে কড়াইশুঁটির কচুরি আর আলুরদমের গন্ধে অথবা সরু-চাকলির সঙ্গে স্রেফ পয়রা গুড়ের মাখামাখিতে। খবরের কাগজ হাতে তুলতেই কয়েকশো পিকনিক স্পট। এখন আর যেমন কেউ চড়ুইভাতি বলে না, তেমনই বাড়ির মেয়েদেরও মাঠে-ঘাটে-জঙ্গলে গিয়ে রান্নাবান্নাও করতে হয় না। কেটারিং-এর ঘাড়েই সব দায়িত্ব। চাই শুধু একফালি সোনালি রোদের সকাল, নীল আকাশ আর একচিলতে সবুজ খোলা মাঠ। ঠান্ডায় লং ড্রাইভ পুরো জমে ক্ষীর। অমৃত কমলালেবুর সকাল। বেগুনি-মুড়ি অথবা জয়নগরের মোয়া। শীতকাল হল বাঙালির কফি অ্যান্ড কেক মাস। তাই ওই কম্বোতে শীত-বাঙালির ফ্যাশন ইন। শীতের কলকাতায় বাঙালি চা কম খায়। ঊর্দ্ধমুখী হয় কফির চাহিদা। তবে ব্ল্যাক কফি নয়। অপর্যাপ্ত দুধ-চিনির কফি ছাড়া রোচে না তাদের। সন্ধেয় চাই স্যুপ। এটা নাকি শীতকালীন পানীয়! পাড়ায় পাড়ায় চলে ব্যাডমিন্টন। কখনও বা রাস্তা আটকে বারোয়ারি ক্রিকেট।
ছোটবেলায় মা দক্ষিণের বারান্দায় পিঠে ভেজা চুল রোদের দিকে মেলে উল বুনতেন। এক কাঁটা সোজা, পরের কাঁটা উল্টো। ঘর বন্ধ করা শিখেছিলাম উলকাঁটায়। এখন সেই ঘর খুলতেই ভুলে যাই। শীতের মিঠে রোদ পিঠে নিয়ে কমলালেবুর দুপুরগুলো খুব মনে পড়ে। আর মনে পড়ে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার কথা। ক্লাসে ওঠার ক্ষণও পড়ত ঠিক বড়দিনের প্রাক্কালে। শীতের ভাল-মন্দ, সার্কাস, মেলা, চিড়িয়াখানা কিংবা চড়ুইভাতি— সবই নির্ভর করত সেই মাহেন্দ্রক্ষণের উপর।

দুটো মাস ব‌ই তো নয়, যেন সম্বত্সরের পরম প্রাপ্তির আবহাওয়া। প্রবাসের বন্ধুদের বলে ফেলি, “শীতকালে আসছিস তো তোরা?”  আমার গর্বের মহানগরের রাজমুকুট যেন বড্ড বেশি ঝলমলে হয়ে ওঠে এই শীতে। মাঘের শীত, পৌষের পিঠে, লেপের ওম— সব আমাদের। তোরা দেখে যা একটি বার, কী সুখেই আছি আমরা! বিদেশে ঝোলাগুড় পাবি? টাকির পাটালি পাবি? রুপোর মতো চকচকে দেশি পার্শে পাবি? বাজারের থলি ভর্তি করে মৌরলা আর তোপসে আনব তোদের জন্য। কলকাতার মাছের মতো স্বাদ আর কোথায় পাবি! ভায়ের মায়ের স্নেহের চেয়েও বেশি শীতের টাটকা মাছ। নলেন গুড়ের সন্দেশ পাবি। আছে তোদের দেশে? কলকাতায় আছে। ফ্লুরিসে বসে কেক দিয়ে কফি খাওয়াব। ভিন্টেজ কার দেখাব। গঙ্গাবক্ষে স্টিমার চড়াব। কল্পতরু উত্সব দেখাব। হর্টিকালচারের ফুলের মেলায় নিয়ে যাব। চামড়াজাত জিনিসের মেলা লেক্সপোতেও নিয়ে যেতে পারি। ওয়েলিংটনে গোলগাল ভুটিয়া মাসির শীতপোশাকের অস্থায়ী দোকানে যাবি? খুব সস্তা। সস্তার ফুটপাথও আছে আমাদের।  আন্ডার এস্টিমেট করিস না মোটেই। আমরা নিপাট আতিথেয়তার ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছি সারা বছর তোদের জন্য। অতিথি দেব ভব!

একটি বার দেখে যা তোরা! বিশ্বায়নের ঢেউতে হাবুডুবু খাচ্ছি আমরা। আমাদেরও শপিং মল আছে। প্রচুর ফ্লাইওভার আছে। মাল্টিপ্লেক্সের রমরমা দেখে যা। বড়দিনের কলকাতার আলোর রোশনাই? পার্ক স্ট্রিটের ট্রিঙ্কাস-এর ঊষা উত্থুপরা এখন আরও গ্লিটসি হয়েছে রে। কলকাতার টিন-রা এখন তন্ত্র-মন্ত্রে দীক্ষিত। শীতে আরও রঙিন হয় পার্ক স্ট্রিট। রেস্তোরাঁতে ক্রিসমাস ডিনারে জায়গা মেলে না জানিস! এত ভিড় সেখানে। প্রিন্সেপ ঘাটে শীতের ওম নিয়ে, গঙ্গায় ভাসমান বয়াগুলোর মতো জেরিয়াট্রিক সব নাগরিক নিয়ে, জানু-ভানু-কৃশানু পথশিশুদের নিয়ে আমরা বেশ ভাল আছি। কফিহাউসের বাড়বাড়ন্ত দেখলে তোরা অবাক হবি। হরেক কিসিমের কফির ঠেক এখন শহরে।

আমাদের বাপ-ঠাকুর্দা অনেক ঠাটঠমক শিখেছিলেন সাহেবদের কাছ থেকে। সওদাগরি অফিসে কাজ করেছেন। এক আধ পেগ হুইস্কি বা ভ্যাট সিক্সটি নাইন তাঁরাও খেতে শিখেছিলেন সাহেবদের হাত ধরেই। স্যুট-বুট পরেছেন শীতকালে। সেই স্যুট বানানোর ট্র্যাডিশন টিকিয়ে রেখেছিল তাঁদের সন্তানসন্ততিরাও। শীত পড়লে দূরে কোথাও, বহু দূরে তাঁরা যান হাওয়াবদলে। ব্যাগ গুছিয়ে পৌষমেলা বা বকখালি। 

আর এই শীতে যে জিততে পারল না, তার জন্য পড়ে র‌ইল রোয়াকের আড্ডা। গিন্নিদের দুপুর গড়াল পুরনো পুজোবার্ষিকী ঘেঁটে আর বালাপোষে রোদ খাইয়ে। রান্নাঘরে গন্ধ ওঠে তলা লেগে যাওয়া নলেন গুড়ের পায়েসের। কলকাতার আম আদমি এখন ই-মেল বোঝে। সোশ্যাল নেটে নাম লেখায়। গৃহবধূরা ফেসবুকে মাতে অলস দুপুরে। তবুও তো তোরা ফিরলি না! আসলে শহরের মনটাকেই বুঝলি না যে!       

বেশ করেছি! মাই চয়েস! ( পয়লা পার্বণ-১৪২২, ২০১৪ )           



মনে পড়ে কবীরসুমনের সেই বিখ্যাত গান "সব আমাদেরি জন্যে, আমাদেরি জন্যে..."  । ভিনরাজ্যে গিয়ে থেকে তো দেখেছি মশাই। এই চৈত্তসেলের জন্যে ফাগুণ পড়তেই মন কেমন উশখুশ করে!  এমন সেলের পসরা কোথাও পাবে না কো তুমি। সেবার সেই বাম জমানায় সুভাষবাবুর তাড়ায় অপারেশন সানশাইনের কবলে পড়ে রাতারাতি গড়িয়াহাট খালি । ফাগুণে সে বিরহব্যথা যে কি জিনিষ তা আমি বুঝি।  । কোথায় আমার পায়জামার দড়ি! কোথায় গেল জামাকাপড় শুকোনোর ক্লিপ্! কোথায় পাই আমার সাধের জাঙ্ক জুয়েলারি, টিপ-ক্লিপ আর কুশন কভার? আর পয়লাবৈশাখে বাড়ির দোরে নতুন ডোরম্যাট? কিনব‌ই তো ! মাই চয়েস! 

কি ভালো ছিল আমার সেই হকার ভাইটা! মাঝবয়সী আমাকে এখনো বৌদি বলে ডাকে।  একবাক্যে জিনিষের দাম আর্ধেক করে হাসিমুখে বলে, নিয়ে যান, পরে দাম দেবেন। এত আন্তরিকতা কোথায় পাব বলতে পারো? তাই ওকেই আমার এত পছন্দ। মাই চয়েস! 

মায়ের মলমল ছাপাশাড়ি আর শ্বশুরমশাইয়ের হাফপাঞ্জাবি না হয় কিনলাম দোকান থেকে। তাই বলে নিজের হাউসকোট কিম্বা কাজের মেয়ের ম্যাক্সি? কক্ষণো নয়। বেঁচে থাক ফুটপাথ! আর ওখানে কেনার চার্মটাই আলাদা!  কত্ত চয়েস! কত্ত আন্তরিকতা হকার ভাইদের!চাকরী জোটেনি তাই টিউশানির পয়সায় আমার গুড টাইমপাস। আমি বড়বড় দোকানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত উইন্ডোয় চোখ রাখি আর উইন্ডো শপিং করি। কিন্তু কিনি ফুটপাথ থেকে। আমার হকার ভাইটিও বিএ পাস করে হকার হয়েচে। গর্বের সাথে বলে সে।    হকারকেই আমার দরকার এই চৈত্তসেলে, কুর্তির ঝুলে। এইজন্যেই তো পড়ে র‌ইলাম কলকাতায়।  তাও মাই চয়েস! 

এই শহরটার জন্মলগ্নে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৃহস্পতি তুঙ্গে জানেন তো? তাই কর্তা নামেন বালিগঞ্জ স্টেশনে, গিন্নী নামেন গড়িয়াহাটে।  তারপর ছুঁচোর ডন বৈঠক  দেওয়া পেটে ঐ ফুটপাথের এগরোল কিম্বা চাউমিন, মোমো কিম্বা ফিশফ্রাই সাবাড় করে চৈত্তসেলে পথ পেরোন তাঁরা। আহা কি আনন্দ তখন সেই পথচলায়! যিনি মেট্রো করে নামেন রাসবিহারী তাঁর জন্য আছে রাসবিহারীর বিস্তীর্ণ দুপারের প্লাসটিক বালতি, মেলামিনের বাসন থেকে কাটগ্লাসের সুরাপাত্র, বাথরুম সেট, পুরণো ম্যাগাজিন থেকে পাইরেটেড সিডি, রেডিমেড ব্লাউজ, সায়া থেকে শার্ট-প্যান্টের পিসে ঢালাও সেল। কি চাই! রাসবিহারীর মোড় থেকে রসা রোডের দিকে কালীঘাট  পেরিয়ে হাজরা আর এপাশে দেশপ্রিয় পার্ক পর্যন্ত সেলে ডুবে আছে মহানগরী। ভেতরের জামা, বাইরের জামা, পর্দার কাপড়  সবেতেই সেল। গয়নার মজুরি ফ্রি। আবার সোনা কিনলে সম ওজনের রূপো ফ্রি! ভাবা যায় এই পয়লা বৈশাখের কি মহিমা? 
 
ওদিকে বঙ্গললনার এখন টেলিভিশনে মাস্টারশেফ দেখে দেখে বড় সাধ জাগে একবার কন্টিনেন্টাল কিম্বা ইটালিয়ান বানানোর। বিশ্বায়নের  ঢেউ লাগা সাফসুতরা রাস্তায় এখন বাটন মাশরুম থেকে বেবিকর্ণ, সুইট কর্ণ থেকে ব্রকোলি, তেরঙ্গা সিমলা মির্চ কি না পাওয়া যায়! 
 কেউ নামেন শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনে। তাঁর গার্ল ফ্রেন্ড হয়ত কলেজ ফেরত আসেন সেথায়। তারপর শুরু হয় সেল পরিক্রমা। আদিগন্ত হাতীবাগান জুড়ে সেল, সেল, সেল। আর সে যুগে যারা স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের অমোঘ বাণীকে পাথেয় করে ব্যবসায় নেমেছিলেন  তাদের দোকানে হাহুতাশ!  নিউমার্কেটে তারা নাকি অবস্থান করছেন হকারদের বিরুদ্ধে। আরে বাবা ! বোঝেনা সে বোঝেনা।  তার বাপ-ঠাকুরদার এদ্দিনের ব্যাবসাপাতি নাকি হকারদের কল্যাণে লাটে ওঠার উপক্রম! ক্রেতা বলেন  যেখানে সস্তা পাব, সেখানে যাব। বিক্রেতা বলেন এসি দেব, ভ্যাট নেব, রসিদ দেব। আর নেতা বলেন হকার আমার মাটি। হকার আমার ভোট। হকার আমার ভাগ্যনিয়ন্তা। "সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই".... সেই কোন্‌ যুগে চন্ডীদাস বলে গেছেন।  সুভাষবাবুর অপারেশন সানশাইনের পর হকার পুনর্বাসন হয়েছিল। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি জানেন? কেউ যায়নি নতুন বাড়িতে। ক্রেতা খোঁজে সস্তার জিনিষ। বিক্রেতা চায় বিকোতে। কারণ এ শহরে শিল্প আসেনি তেমন করে। তাই ইকনমিক গ্রোথ হয়নি বুঝি। তাই ক্রয় ক্ষমতা বাড়লনা বোধহয়। তাই ফুটপাথেই উঁকিঝুঁকি আর হাতড়ে মরা সাধের জিনিষগুলোর জন্যে। 
ওদিকে উঁচু উঁচু শপিং মলের বাতানুকুল বায়ুমন্ডলে ম্যানেকুইন ডুকরে কাঁদে। পথিক আসে দর্শক হয়ে। চোখ বুলায়, হাত বুলায়। পিছন পানে চায়। সেখানেও সেই এক অছিলা। মাই চয়েস!  

এতো গেল পথেঘাটে প্রাক্‌বৈশাখী প্রস্তুতি।  চাদ্দিকের  চৈত্তসেলের হাতছনি। এবার আসি ডিজিটাল সেল প্রসঙ্গে। সেখানেও নানান অফার। সবকিছুই বর্ষবিদায়ের আনন্দে।  গড়িয়াহাটার মোড়ে, হাতিবাগানের ধারে কিম্বা নিউমার্কেটের আশেপাশে নয় কিন্তু।  শ্যামবাজারে বা কসবাতেও নয়। এ হল আমাদের ডিজিটাল চৈত্তসেল। সেল, সেল, সেল, ফেসবুক পাড়ার সেল । দুটাকা বাঁচানোর সেল, পয়লা বৈশাখী সেল।  এই এক হয়েচে বাপু। প্রতিবছরে চৈত্র গিয়ে বৈশাখ আসবে আর তার জন্যে বছরের বস্তাপচা জিনিষ পত্তরের স্টক ক্লিয়ারেন্স সেল হবে। তুমি বাপু বিক্কিরি কত্তে পারছোনা তাই দাম বাড়িয়ে সেল ঘোষণা করেছ আর আম-আদমী ভাবছে কি সস্তা! কোথায় লেডিজ প্রিমিয়াম টপস পাওয়া যাচ্ছে দুটো, একটার দামে।  "বাই ওয়ান, গেট ওয়ান" যাকে বলে।  কোথাও আবার বিক্রি বাড়াতে হবে বলে বাই টু গেট টু।   ঐ দোকানে বেষ্ট ডিল অফ ইয়ারিংস। আসলি মুক্তো, আসলি জারকোন  মাত্র ঐ দামে? নো ওয়ে! এমন স্বপ্ন কখনো দেখিনি আমি!  কুর্তা, কুর্তি অনবরত দৃষ্টি কেড়ে নেয় । কারে ছেড়ে কারে ধরি!  আনারকলি, নূরজাহান সকলেই আছেন এক ছাদের নীচে। শুধু অপেক্ষা একটা ক্লিকের। 
পোলকা ডটের কুশন কভার, হালকা-পুলকা কস্টিউম জ্যুয়েলারি, প্যাস্টাল শেডের সুদৃশ্য বেডস্প্রেড এমন কি গৃহসজ্জার দৃষ্টিনন্দন আর্টিফ্যাক্টসও, বুদ্ধ-গান্ধী-বিবেকানন্দ সকলেই উপস্থিত!  সখের পোশাকী চটি জোড়া থেকে হাঁটার জন্য  গুরুগম্ভীর স্নিকার্স, রান্নাঘরের ঘটিবাটি থেকে পড়বার ঘরের তাক, ময়লা ফেলবার ভ্যাট। সবেতেই সেল দিচ্ছে তারা সারা বছর ধরে। শুধু তোমার ক্লিকের অপেক্ষা। আর তারপর এড টু কার্ট, ব্যস! বেশ করব কিনব। মাই চয়েস!  

চৈত্রসেল পেরোতে পেরোতেই বৈশাখী হেঁশেলের তোড়জোড়। মোচ্ছব সেখানেও। হোটেলে হোটেলে রসিক বাঙালীর খাদ্য বিলাস। শুরুতেই কাঁচা আমের জুসের সাথে ভদকার অভিনব ককটেল।অথবা তরমুজের লাল রসে পুদিনার সবুজ। ওপর থেকে আধ পেগ হোয়াইট রাম।   যাকে বলে ফিউশান শরবত। তারপরেই লুচি, বেগুনভাজা, শাক-শুক্তো-ছ্যাঁচড়া-মুড়িঘন্ট। পরের দফায় ঘি ভাত, তপসে ফ্রাই। নির্গুণ, নির্গন্ধা বেগুণ দিয়ে বেগুণ বাসন্তী থেকে শুরু করে সারাবছর অচল পটলের দোলমা। ঘিভাতের কত রকম নাম হয় আজকাল! সে কখনো দারুচিনিদেশে, কখনো মখমলি জুঁইফুলের বাগিচায়। গাছপাঁঠার মুইঠ্যা তো পনীর পসন্দ।  যশুরে তেল কৈ কিম্বা বরিশালী ইলিশ। কোথাও মৈথিলী ভেটকি, কোথাও আবার মাটন মনোহরা। শুধু চমকে যাওয়া নামের অভিনবত্বে।  মধুরেণ সমাপয়েত ম্যাজিক মিহিদানা অথবা রসোগোল্লার পুডিং দিয়ে। আরো ভালো যদি থাকে  জলভরা জলপরী কিম্বা  দৈ কলসের ঠান্ডা ছোঁয়া।  আর তারপরেও চালিয়ে দেওয়া যায় কেশরীয়া মালপোয়া কিম্বা যুবতী এক জিলিপিকে। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব স্বয়ং বলেছিলেন ভরাপেটেও জিলিপি জিভ থেকে টুকুস করে, অতি অনায়াসে গলার মধ্যে দিয়ে সোজা পেটে চালান করা যায় । যেমন খুব ভীড়ে লাটসাহেবের গাড়ির চাকা ফাঁকফোকর দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে যায় সাবলীল গতিতে। 
সব শেষে বলি এবারের বৈশাখী শ্লোগান হল পুরভোটের। থুড়ি মেয়েদের জন্যে। স্থলে-জলে-অন্তরীক্ষে আমি আছি আমার পছন্দ নিয়ে। মাই চয়েস! বেশ করেছি, ফুটপাথ থেকে জিনিস কিনেছি, মাই চয়েস! বেশ করেছি হকারকে প্রশ্রয় দিয়েছি। মাই চয়েস! ডিজিটাল শপিংও করেছি অনেক। কারণ মাই চয়েস। পার্সে ক্রেডিট আর ডেবিট কার্ড। আমাকে আর পায় কে? বৈশাখে খাদ্যবিলাসেও সামিল হয়েছি কারণ মাই চয়েস! হোমমেকারের হেঁশেলের চাক্কা বন্ধ পয়লা বৈশাখে। কারণ মাই চয়েস! রাঁধছিনা, রাঁধবনা। আজ স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ সব তোমাকে দিলাম পয়লা বৈশাখ। কারণ মাই চয়েস!          

ট্রাম, প্রেম ও আমি  ( আগষ্ট ২০১৫ )  

কলকাতায় প্রেম হেঁটে বেড়ায় মাইলের পর মাইল, মনের আনন্দে।
কত অজানা মন্দিরের অলিগলি, গুরুদ্বারের শান্ত পাঁচিল অথবা গির্জার নিরালা সেমেট্রি কিংবা জুম্মা পীরের দরগা সাক্ষী থেকে যায় প্রেমের কলকাতার।  ভালবাসার-মন্দবাসার কলকাতার। শহুরে হাওয়ায়, নীরব প্রেমের পথচলায় সঙ্গী হয় দূর থেকে ভেসে আসা আজানের সুর, কালীমন্দিরের আরতির ঘণ্টাধ্বনি যুগপত ভাবে। উত্তর কলকাতার হেদুয়ার পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় রোজ কত কত প্রেম-অপ্রেম। এই প্রেম গিয়ে আছড়ে পড়ে কলেজ স্কোয়্যারে। যার নাম বদলে হয় বিদ্যাসাগর উদ্যান। এই কলেজ স্কোয়্যারের পুরনো নাম গোলদিঘি। গোলপাতা জন্মাত বলে অমন নাম বোধহয়। যাই হোক গোল হোক বা স্কোয়্যার এই পুকুর অনেক প্রেমের দলিল বহন করে চলেছে। কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট ধরে কলেজ স্ট্রিট ছাড়িয়ে ওয়েলিংটন মোড়ে গেলে এখনও ধাক্কা খাই গোলগাল ভুটিয়া মাসিদের রংবেরঙের শীত পোশাকের পসরায়। সকলকে জায়গা দেয় আমাদের কলকাতা।
প্রেমের পাতা উল্টে চলে কল্লোলিনী। কত প্রেমের বর্ণপরিচয় হয় গোলদিঘিতে এখনও।  ব্রা-ব্রেসিয়ারের কিশোরীর যুগ বদলে যায়। বদলায় না আমাদের প্রেম।
মামারবাড়ি দক্ষিণেশ্বরে। মায়ের ডেলিভারি পেন থেকে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় পেরিয়েই পলাশির যুদ্ধ খ্যাত রাজবল্লভদের বাড়িতে বহু দিনের পুরনো নর্থ ক্যালকাটা নার্সিংহোমে জন্মেই যেন উত্তর কলকাতার সঙ্গে প্রেম হয়ে গেল আমার। আরে তখন কি জানতাম আমার স্কুল কলেজ, ইউনিভার্সিটি, সিনেমা, থিয়েটার, শপিং— সবকিছু জুড়ে থাকবে এই উত্তর কলকাতা!  পুরনো কলকাতার মেয়েদের স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম বরাহনগর রাজকুমারী বালিকা বিদ্যালয়ে টেন প্লাস টু। ওই স্কুলে নাকি প্রথম চালু হয়েছিল বিজ্ঞান শাখা! আর ছিল কেতাদুরস্ত ল্যাবরেটারি। লাইব্রেরিতেও ছিল বিশাল ব‌ইয়ের সম্ভার। ছিল খেলার মাঠ।

তার পর আমরা একপাল মেয়ে জড়ো হয়েছিলাম কলকাতার হেদুয়ার পাড়ে  এক ঐতিহ্যবাহী মেয়েদের রক্ষণশীল কলেজে। সেই ছাব্বিশ নম্বর ঘরটা! কাচের সার্শি সরিয়ে, পুরনো গন্ধ বুকে নিয়ে, খড়খড়ির দরজা ঠেলে অন্ধকার ঘরে ঢুকেছিলাম হুড়মুড় করে।  কিছুটা উচ্চাশা নিয়ে, আর কিছুটা দুরুদুরু বুকে। ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই পচা ডিমের হাইড্রোজেন সালফাইডের সেই চেনা উচ্চমাধ্যমিক-গন্ধটা অবশ করে দিল সুষুম্না স্নায়ুগুলোকে। বিবেকানন্দের সিমলে স্ট্রিটের পাশে বিডন স্ট্রিটের উপর জন ডিঙ্কওয়াটার বেথুন সাহেবের কলেজে। উল্টো দিকে হেদুয়ার সরোবর আর স্কটিশচার্চ কলেজ। আবারও প্রেম উত্তর কলকাতার সঙ্গে। সে বার সিমলেপাড়ায় স্বামীজির বাড়ি দেখতে গিয়ে ছেলে জিগেস করল, ‘‘মা, হেদো নাম কেন?’’ সত্যি তো ভাবিনি কখনও। তিন বছর পড়েছি হেদুয়ার কাছে বিখ্যাত কলেজে। হেঁটেছি অহোরাত্র। এই কলকাতার বুকেই রচিত অদ্রীশ বর্ধনের ‘আমার মা সব জানে’। অতএব আমার মা বললেন, ‘‘হেদো মানে মজা পুকুর।’’ বাংলায় আটপৌরে নাম হেদো আর পোশাকি নাম হেদুয়া। আর কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের উপর অত্ত বড় পুকুরের ইংরেজি নাম কর্নওয়ালিশ স্কোয়্যার। এখন স্কটিশচার্চ কলেজের দর্শনের নাম করা অধ্যাপক আর্কহার্ট-এর নামে আর্কহার্ট স্কোয়্যার বলা হয়।   

আমার কলেজবেলায় কলকাতা ছিল ট্রামময়। কি কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট, কি সার্কুলার রোড— এই ট্রাম যানের নেটওয়ার্কটি ছিল বড় বন্ধুতায় ভরা, মায়াময়। এখন তো গ্যালিফ স্ট্রিট থেকে চিত্পুরের দিকে হাতে গোনা এই ‘স্ট্রিট কার’ উত্তর কলকাতার বুক চিরে ধুঁকতে ধুঁকতে চলে ঠিক কলকাতার সিনিয়র সিটিজেনদের মতো। সেই সিনিয়র সিটিজেনরাও এই কলকাতার প্রতি তাদের প্রেমটাকে নিয়েই শুধু বেঁচে থাকেন দিনের পর দিন এই শহরে। কি ভাগ্যি গত শতাব্দীর কলকাতার সার্কুলার ও ইস্টার্ন ক্যানাল সমূহের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ও ক্যানালের টোল কালেকটর এই গ্যালিফ সাহেবের রাস্তাটি এখনও টেনেটুনে বাঁচিয়ে চলেছে পুরনো কলকাতার  ট্রামলাইনের টুংটাং ঘণ্টি নাড়া। ৯ নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটে তাঁর অফিস বাড়িটি এখনও আছে, যার নাম ক্যানাল ভিলা। আমরা ধরে রাখতে পারি না সেটা আমাদের ধর্ম, কিন্তু গর্ব করে বলতেও ছাড়ি না তার কথা।

কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের ফুটপাথ ধরে আমাদের কলেজের গল্প-পথ আনন্দে হেঁটে পাড়ি দিয়েছিল রাজাবাজারের দিকে। পুরনো কলকাতার গন্ধ নাকে। উত্তর কলকাতার বনেদি সব গলি ছায়াময় আর রহস্যময়। গল্প ফুরোত না। ধাক্কা খেত আপার সার্কুলার রোডে সায়েন্স কলেজের পাশের রাস্তা পারসিবাগান স্ট্রিটে। কি নিরিবিলি আর নিঝুম ছিল পারসিবাগান স্ট্রিট। রুস্তমজি কাওয়াসজিরা ছিলেন কলকাতার বনেদি এক ব্যবসায়ী পারসি পরিবার। এঁর নামে বরাহনগর কাশীপুরে একটি রাস্তা আছে রুস্তমজি পারসি রোড। দক্ষিণ কলকাতায় বিয়ে হয়ে দেখি গড়িয়াহাট রোড থেকে বেরিয়েছে আর এক রাস্তা যার নাম রুস্তমজি স্ট্রিট। মাঝে মাঝে কলকাতার উদারতা আর ব্যাপ্তি দেখে বিস্মিত হ‌ই আজও। রুস্তমজির পুত্র মানেকজি রুস্তমজি তাঁর পিতার মতো কলকাতার পারসি সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন। শেরিফ হয়েছিলেন তিনি। তাঁর নামেই মানিকতলার নাম হয়েছিল। পারসিবাগান এখনও অনেক প্রেমের ওঠাপড়া আর অপ্রেমের চোখের জলের ফোঁটায় বেঁচে রয়েছে।

ছুটে চলত আমাদের উচ্ছ্বাসেরা, ফুটে উঠত ছোট ছোট উল্লাস। চাহিদা ছিল কম। প্রেম এখনকার মতো অত দুর্মূল্য ছিল না। আধখানা এগরোল কিম্বা দু’টাকার ফুচকাই সম্বল ছিল বন্ধুতার। কাঠফাটা রোদ্দুর মাথায় করে প্যারামাউন্টের ঠান্ডা রঙিন শরবত নিয়ে আড্ডা জমত কলেজ স্কোয়্যারে। কিন্তু, দাঁড়িয়েই থাকত প্রেম আমাদের। একান্ত মুখোমুখি বসে একটু পড়াশোনার চেষ্টা বা নোট তৈরির অছিলায় কফিহাউস ছিল হাতের পাঁচ... যে ধরত মাথার ওপর বিশাল  ছাতা। আমাদের রোদ-বৃষ্টি-ঝড়  সব কিছুর থেকে আগলে রাখার ঠেক।

মায়ের মুখে শুনেছি, বেথুন কলেজের তন্বী তনয়ারা ষাটের দশকে সুইমস্যুট পরে হেদোর সুইমিং পুলে সাঁতার কাটত কলেজের পর। কলেজ কেটে প্রেমিকের সঙ্গে মুখ লুকোত সার্কুলার রোডে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পাশের রাস্তা দিয়ে গিয়ে বেপট এক নিরালায় পরেশনাথ জৈন মন্দিরে।  তা হলেই বুঝুন, কত আধুনিক ছিল এই কল্লোলিনী!  এখনও সেই ট্র্যাডিশন চলেছে একই রকম ভাবে। কত প্রেম, কত কথা আর প্রতিশ্রুতিতে সেই নিস্তব্ধ জৈন মন্দিরের আনাচকানাচ অবিরত মুখর হয় আজও। সে দিন নিজের চোখে গিয়ে দেখে এলাম। 

কলকাতার সত্যিকারের লম্বা ও চওড়া রাস্তা হল এই সার্কুলার রোড। আমার রোজের ট্রামচড়ার পথ। শ্যামবাজার থেকে সায়েন্স কলেজ অবধি ১২ নম্বর লেডিজ ট্রাম চলত তখন। আপার সার্কুলার রোডের নাম আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড। বিধান সরণির সঙ্গে সমান্তরাল। এটি  নাকি ছিল প্রথম পাকা রাস্তা।  আজ সেখানে ওই ১২ নম্বর ট্রামের অভাবটা ভীষণ প্রকট। কলকাতা ট্রাম ওয়েজ কোম্পানির এই বিশাল নেটওয়ার্কের অবনমন আমার কলকাতা প্রেমকে একটু একটু করে কমিয়ে দেয়। 

আর সেই অলিগলি, কানাগলি, বাই লেন? আর সাহেবসুবোর নামের রাস্তাগুলো? গ্রে স্ট্রিট মানেই হাতিবাগান আর তার সঙ্গে উঠে আসে ডাইনে বাঁয়ে সিনেমা হল আর থিয়েটারশালা! ঘোষ-কাজিনের গলি থেকে গোলবাড়ির কষামাংস-রুটির প্রেম! আর জলযোগের কি রমরমা তখন! পয়োধিও মিলত জলযোগে, যা খেয়ে রবিঠাকুর স্বয়ং জলযোগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন। মাত্র এক টাকায় মাংসের প্যাটিস। ভাবা যায়! কি অনবদ্য সেই স্বাদ! সেই থেকেই যেন শহরটা সস্তা হয়ে গেল। সকলের কাছে সস্তা। যে আসে সে যেতে চায় না। বাঙালি ব্যবসার পাততাড়ি গোটায়। অবাঙালির শহর হয়ে উঠে ক্রমশ। কেমন যেন রোমান্টিক হয়ে যাই আজও। রাস্তার নামগুলো বদলে যায় আমার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। মানতে পারি না। ভীষণ কষ্ট পাই। আপার সার্কুলার রোড, বিধান সরণি আর সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ কেমন সুন্দর সমান্তরাল এখনও। কত ভীড়, কত মিছিল তবুও আমার কলকাতা, আমাদের কলকাতা। আজও যখন চৌরঙ্গী থেকে শ্যামবাজার ক্রশ করি... চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউ, গিরীশ অ্যাভিনিউ, ভূপেন বোস অ্যাভিনিউ... ক্যালকাটা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্টকে মনে মনে ধন্যবাদ জানাই।