২০ ডিসেম্বর, ২০১৬

শীতকালীন জার্নাল



পিকনিক-১








তুণীর বাসে উঠেই চটপট সকলের মাথা গুণে নিয়ে বলল মোট বত্রিশ জন আমরা। গুণ গুণ করে উঠল নিজের মনে ...একদিন দল বেঁধে কজনে মিলে... এবার  দেখি তো তোরা ক'জন জানিস "পিকনিক" শব্দের অর্থটা।
অঙ্কিতা বেশ সচকিত হয়ে জবাব দিল, চড়ুইভাতি।
বিপাশা বাসের কোণা থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠল বনভোজন।
তুণীর বলল ওটা তো প্রতিশব্দ বাংলায়। পিকনিক শব্দটার উত্সটা জানিস কেউ?
তিতলি বলল, জানতাম একটা ফ্রেঞ্চ শব্দ।
তুণীর অমনি বলল, স্পেলিং বল দিকিনি । 
তিতলি সপ্রতিভ হয়ে জবাব দিল, picque-nique। 
এবার মানে বল দেখি। তুণীর বলল।
তিতলি আমতা আমতা করে বলল, ফার্স্ট পার্ট picque মানে pick আর সেকেন্ড পার্ট nique মানে ? 

তিতলি বলল, ঐ আর কি, টুকটাক তুলে নিয়ে মুখে পুরে দাও যেখানে, তার নাম‌ই পিকনিক। 
অঙ্কিতা আর বিপাশা বলল, তোরা কত কিছু জানিস রে!
অতএব খাওয়াটাই পিকনিকে প্রধান। আরেকটা হল বাড়ির বাইরে। সেটা রান্না করেই নিয়ে যাও সকলে মানে যাকে বলে পটলাক অথবা গিয়ে রান্না করে খাও, আক্ষরিক অর্থে বনভোজন যাকে বলে। তুণীর বলল।   
আগে ছিল নিজেরাই হাত পুড়িয়ে খাওয়া। কি ভাগ্যিস এখন কেটারার সঙ্গে যায়! তিতলি বলে ওঠে। একদিন আউটিং এ যাও, আবার রান্নার যোগাড় দাও। এখন টোটাল ব্লিস বস্‌! 
তবে যাই বল বাপু, কাঠকুটো জ্বেলে মাংসের ঝোল আর ভাত রান্না করবার মজাটাই ছিল অন্য রকমের। অঙ্কিতা বলল। 
বিদিশা বলল, একটা ছুটির দিন শনিবার, আবার পিকনিকের জোগাড়? রক্ষে করো বাপু!

সেদিন ছিল সোনা রোদ গলে পড়া এক শীতভোর। সেদিন ছিল নদীর জলের ঠান্ডা ভোর। কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে পোষের পিঠে চড়ে রোদ এসে নেমেছিল গড়চুমুকে। হাওড়ার মৃগদাব গড়চুমুকে। তূণীর এন্ড কোম্পানির চড়ুইভাতির সকাল তখন বনভোজনের দেশে পাড়ি দিয়েছিল । সাদাসাদা ফুলকো লুচি আর নতুন আলুর সাদা চচ্চড়ির গন্ধে মাত গড়চুমুকের নদীর ধার। সেক্টর ফাইভের একদল টেকি  গিয়ে হাজির হল নদীর ধারে । শীতের সব অনুষঙ্গ যেমন নলেনগুড়, কমলালেবু, মটরশুঁটি, লেপ-বালাপোষ, পশমিনা-পুলওভার নিমেষে উধাও চড়ুইভাতির আনন্দে। হফতা ভর কাজের চাপে শীত ফুরায়। ভাবতে ভাবতেই দোল ফুরোয় । অমৃত কমলার মিঠে রোদ, উলকাঁটার দুপুর গড়িয়ে যদি চৈত্র এসে যায়? তার আগেই চল প্ল্যান করি, তূণীর হল অফিসের পিকনিক প্ল্যানার।
এখন শুধুই শান্তি জলের ধার। শুধুই শান্তি নীল আকাশ। নীল আকাশ গিয়ে চুমু খেয়ে নিল দামোদরের পাড়কে। নদের জল উছলে উঠল ছলাত করে। সকলে একটু ছুঁয়ে নিল নদের পাড়ের ক্যাসুরিনার নুয়ে পড়া সবুজ পাতা ভরা ডালকে। ডিজিটাল ক্লিকে মুখর হল আশপাশ। এখানেও সেই পোষমাস। যা এসেছিল  আমাদের শহরেও। এখানেও সেই শীত ছিল যা ছিল আমাদেরো। এখানেও পারদ নামে প্রতিবারের মত। শীত আসে, শীত যায়। চড়ুইভাতি ফুরিয়ে যায়। সকলেই  পরিযায়ীর মত ঘরে ফিরে যায় । শীতঘুমিয়ে ফুরিয়ে যায় শীত।
ভাগীরথী ও দামোদর মিশেছে হাওড়া জেলার গড়চুমুকে। ৫৮ গেট বলে জল ধরে রাখার ও ছাড়ার বিশাল স্লুইসগেট। ডিয়ারপার্ক। জমপেশ উদরপূর্তি, গানের লড়াই, কুইজ,খেলা । সবমিলিয়ে শীতের অমৃত কমলার দুপুর জমজমাট!

পিকনিক-২ 



"আপ্‌কো কিতনা বার বোলা থা, জলদি আনেকে কে লিয়ে? হমলোগ ব্রেকফাস্ট খায়েঙ্গে ন'বাজে। যাইহোক অব স্টার্ট তো কি জিয়ে।" গাড়ী ভর্তি লোকজন বন্দনাদির হিন্দি শুনে হাসিতে ফেটে পড়ল।   সাড়ে আটটায় ছাড়ল টাটা উইঙ্গার। সদলবলে ব্যান্ড মাষ্টার চললেন পাঠচক্রের সদস্যাদের নিয়ে। সিনিয়ার সিটিজেনরা সবেতেই বিরক্ত, অধৈর্য বুঝি! মনে মনে ভাবলেও পরক্ষণে গাড়ি ছাড়তেই তাদের মুখে স্বর্গসুখ যেন।

সাদার্ণ এভিনিউ আসতেই গাড়ি বাঁদিকে ঘুরছে। কেন? কেন আবার? ডানদিকে ফলতা যদিও কিন্তু ডায়মন্ডহারবার দিয়ে গেলে "গঙ্গাসাগর মে হমারা গাড়ি পাকড় লেগা" মতলব? বারুইপুর, আমতলা ঘুমকে জানা হ্যায়। তার মানে? কড়াইশুঁটির কচুরী-কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা দিয়ে আলুর তরকারী, চা, নলেনগুড়ের সন্দেশ ভোগে? পেছনের সিট থেকে প্রবাসী শুভশ্রীদির হুঙ্কার শিট্‌! আমার বাঁদিক থেকে মনীষামাসীর অনুযোগ...আপনার তো বোলনা চাহিয়ে থা! ডান দিক থেকে বন্দনাদি তখন তারস্বরে গেয়ে চলেছে..." আমার পরাণো যাহা চায়....তুমি তাই...." অমিতামাসী বলে উঠল, তুই চুপ্‌ করবি বন্দনা? আমার মাইগ্রেন শুরু হয়ে গেল। বাড়ি থেকে শুধু এককাপ চা খেয়ে বেরিয়েছি আমি" আবার শুভশ্রীদি রোদচশমাটা মাথার ওপরে তুলে বলে উঠল, ডিসগাস্টিং! দিস ইস কলকাতা! ব্যান্ড মাষ্টার তখন ড্রাইভারের সাথে বলে চলেছে একনাগাড়ে... এডভান্স লেনে কা টাইম মে ইয়ে মালুম নেহি থা? বলতে না বলতেই হুশ্‌ করে গাড়ি এসে পড়ল। ড্রাইভার বলে কিনা উতর যাইয়ে! হমারা গাড়ি নেহি হ্যায়! মালিকনে বাতা দিয়া....ব্লা, ব্লা, ব্লা....তখন উনি মানে আমার হিরোটি বলে উঠলেন

" অগর হমলোগ উতর জায়েঙ্গে তো আপ জিন্দা নেহি ঘর পৌঁছেঙ্গে....." উরিব্বাস! একদম অক্ষয়কুমার মার্কা ডায়লগ! পেছন থেকে মিসেস বালসারা তো ভয়ে, কুঁকড়ে অস্থির।
তাদের আরেকটি প্রাইভেট কার তখন ফোন করে বলেই চলেছে, এই শোনো,  আমরা না ডায়মন্ডহারবারের পথ দিয়েই চললাম...কচুরিটা না ফাটাফাটি খেলাম।

এক মাসীমা সেই শুনে বলে উঠলেন, তো? আমরা যাবার আগেই কচুরি খেয়ে নিলি?
 ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের আদরের পিকনিক স্পট ফলতা এসে পড়ল।

ফলতা আসতেই আরেক মাসীমা  বলে উঠলেন, "ইতনা সংকীর্ণ গলি মে কিঁউ ঘুসা?"
আর বাকীরা হেসে কুটি আর পাটি।

এই করতে করতে অবশেষে ফলতা পৌঁছে ওনাদের যেন মনে হল বিশ্বজয় করেচেন । কে যেন গাড়িতে বলছিলেন তাঁর অম্বল হয়েছে। কার যেন গ্যাসের ব্যাথাটা বাড়ছিল। কেউ একজন মাইগ্রেনে কষ্ট পাচ্ছিলেন। আর ব্যান্ড মাষ্টারের  টেনশনযুক্ত এহেন মনের অবস্থা, পেটের ভিতর ছুঁচোবাবুর ডন-বৈঠক দেওয়া....সবকিছুর আগুণে জল পড়ল। গঙ্গার ধারে টেবিল পাতা লোকনাথ রেসর্টে কি ভালোই আয়োজন করেছিল তাদের কলকাতার ঠাকুর(ওরফে কেটারার)..টোপা টোপা, পুর ঠাসা, বটলগ্রীন রংয়ের কড়াইশুঁটির কচুরী পেয়ে মুখে সব কুলুপ এঁটে বসে গেল চুপচাপ। ঝগড়া তখন মাথায়। গাড়ির কাজিয়া রণে ভঙ্গ দিয়েছে ততক্ষণে। তাপ্পর ছোট ছোট জগদীশবাবুর বাড়ি দেখতে।
আঃ মলো যাঃ! বোস ইন্সটিট্যুটের সরকারমশাইরা তাদের ঢুকতে পর্যন্ত দিলনি! বজ্র  আঁটুনি সেথায়।
আমরা এতোই অছ্যুত! শুভশ্রী দি তো বলেই বসলেন।
তা বাপু তোরা সব তোদের মত সব গেম খেলার ব্যবস্থা কর দিকিনি। সিনিয়ার একজন বললেন। হাই টেম্পো তাঁর।
তারপর বন্দনার ফোনে লাইভ কমেন্টারি...
 সিনিয়র সিটিজেন মাসীমাদের স্মৃতিতে শান দি‌ইয়েচি বাপু...মেমারি গেম খেলিয়েচি, ক্যুইজ হল, ডাম্ব-শারড, হাউজি, ছোট্ট ক্লু থেকে  ৫ মিনিটে পাঁচ লাইনে অণুগল্প, সব করিচি। খেলতে খেলতে সেকেন্ড রাউন্ড চা আর পকোড়া এল। মাসীমাদের কি খুশি! তাপ্পর হেব্বি লাঞ্চ করিচি...মেইন কোর্সে দ‌ইমাছে আখাম্বা কাতলা ছিল আর চিকেন চাঁপ। ও হ্যাঁ, মধুরেণ সমাপয়েত আমসত্ত্ব-আলুবখরার চাটনী আর নলেন গুড়ের রসোগোল্লা!
জেরিয়াট্রিক এই মহানগরে এই মানুষগুলি ব্যান্ডামাস্টারের বড্ড ওয়েল উইশার। এরা বছরের এই একটি দিন বসে থাকেন তার  মুখ চেয়ে। কবে সে একটু নিয়ে যাব এদের পিকনিকে!

পিকনিক-৩


 

এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার রায়পুর। গঙ্গার ধার, মাঘের শীত বাঙালীর তসরে, পুলওভারে, টুপিতে, পশমিনা চাদরে। কনকনে হাওয়া, মিঠে রোদে ভেসে যাওয়া সকালে বনভোজন। কলেজের প্রফ দের বার্ষিক পিকনিক  ! কেউ লেট করতে করতে অবশেষে আরও কিছুকে তুলে নেয়  লাস্ট  গাড়িতে। তারপর চারটে গাড়ির কনভয় অবশেষে নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছয় । ফুলকো ফুলকো লুচি আর কড়াইশুঁটি দেওয়া সাদা আলুচচ্চড়ি।
" সারাবছর আমরা এইদিনটার জন্য মুখিয়ে থাকি স্যার"  ডাব কেটে দিতে দিতে অফিস বেয়ারা বলে ওঠে।  তারপরেই ডাবের জল আর ভদকা কিম্বা পাতি বিয়ার।সঙ্গে শীতসব্জীর পকোড়া, চিকেন পকোড়া আর রুইমাছ ভাজা। নদীর ধার দিয়ে ডিঙিনৌকায় চলে মাছওয়ালা....
" কি মাছ আছে?”  উত্তর এল খোকা ইলিশ।
" খেলবনা " 
" কেন ম্যাডাম?”
" ধরেছো কেন?”
" কি খাব? আপনারা কিনলে একটু রোজগার হয়, ভালো দাম পাব, এই দেখুন, একদম লড়ছে, ডিম হয়নি।কুমারী ইলিশ। আজ যেকটা ধরেছি সব আপনাদের দি‌ই তবে?”
বললাম, " কথা দিতে হবে, আর ধরবেনা।"

" এই শীতকালেই তো পিকনিক পার্টির রমরমা, তারপরেই হাতখালি। কিছুই নেই বাংলায়। ছেলেপুলেদের পড়াশুনো করিয়েও লাভ নেই । চাকরী কই? অগত্যা মাছ ধরেই বেচি। তারপর অসুখবিসুখ, নৌকো মেরামতি, ঘরের খড়, জমির ধান, মেয়ের বিয়ে...কোথায় যাই? মাগঙ্গার সাথেই ওঠবোস, গঙ্গার কাছেই সারাদিন মিনতি জানাই, শরীল থাকতি নিয়ে নাও মা "

মাছ ছিল সর্বসাকুল্যে এককেজি দুশো গ্রাম। তাই স‌ই। কেটেকুটে খাবি খাওয়া মাছভাজা সকলেই খেল চেটেপুটে। মন মানলোনা। কামড় দিয়েই মনে হল হায়রে দারিদ্র্য! কোথায় মাগঙ্গা! কোথায় সেই ছোটবেলা? এককিলোর কম ইলিশ আমরা চোখেই দেখিনি। জেলেটির কথাগুলো‌ও তো ফেলতে পারিনা। খোকা ইলিশ ধরা বন্ধ করা হল কিন্তু এই জেলেটির সেদিনের ভাত কে জোটাবে? তবুও তো পেল পাঁচশোটা টাকা। এরপরেই সবশুদ্ধু নৌকাবিহার। ম্যাডামদের হাতে ডাবেরজল মিশ্রিত ভদকার গ্লাস, স্যারেদের হাতে বিয়ার আর পেপার ন্যাপকিনে মোড়া গরম ভেজ পকোড়া আর মাছভাজা.....কত গান,কত কবিতা আর  কত ফূর্তি ! ভেসে গেলাম গঙ্গাবক্ষে নৌকায় টানা একটা ঘন্টা । কনকনে উত্তুরে হাওয়ায় আমাদের শাল-দোশালা, জ্যাকেট, সোয়েটার টুপি, মাফলার আরো কতকিছু শীত অনুষঙ্গে মাঘী শীত জমে দৈ!
যথাসময়ে গরম ভাত আর মাটনকারিতে ভরাপেটে আবার ভরা মানে তেলা মাথায় তেল বা Carrying Coal to New Castle । তারপরেই জয় মা বলে গঙ্গার ধারে ভাসাও থার্মোকলের থালার তরী! পরপর গঙ্গার ধারে পিকনিক স্পট। পিকনিক স্পটের মালিক পয়সা নিয়েছে। রসিদ দিয়েছে। কিন্তু কোনো ট্র্যাশ ফেলার জায়গা নেই।
মাননীয় সরকারী অফিসাররা, আপনারা কি নৌকাবিহারে যান? তবে দেখে আসুন গঙ্গার ধারের আবর্জনাগুলো। এখনো কত জাহাজ চলে এই গঙ্গায়। এখনো কত জল, কত সুন্দর তার রূপলালিত্য! আজও  ডিজিটাল ক্লিকে মুখর হয়  নৌকাবিহার, গঙ্গার বিস্তীর্ণ দুপার, রঙ্গীন জাহাজ।, পালতোলা নৌকা।

পিকনিক-৪

 

এবার কাকভোরে বেরিয়ে হাজার ঘড়ি গ্রামের কুমোরপাড়ায়। বাড়ীর কাজের মেয়ের পিকনিকের নেমন্তন্ন বলে কথা! দক্ষিণবাংলার নদীমাতৃক অঞ্চল। আরো কিছুটা এগুলেই সমুদ্রের নোনা জল আর বালিয়াড়ি দেখা যাবে । গ্রামবাংলা অনেকটাই শহুরে হয়েছে নগরায়নের দৌলতে। অরণ্যমেধ যজ্ঞের সামিল হয়ে । কিন্তু গ্রামবাংলার মানুষের সেই দারিদ্র, সেই অতিবৃষ্টির জন্য বানভাসি ঘর দুয়ার অথবা খরায় বৃষ্টির হাহাকারে ধান লাগাতে না পারার কষ্ট রয়েই গেল । যারা পারল তার মধ্যে থেকেই পালিয়ে গেল চেন্নাই অথবা হায়দ্রাবাদে কিম্বা ব্যাঙ্গালোরে, যা হোক একটা চাকরী নিয়ে আর যারা নিতান্ত‌ই সাদাসিধে, অল্পে সন্তুষ্ট তারা পড়েই থাকল বদ্বীপের ফাঁকে অধঃক্ষিপ্ত নাগরিক হয়ে । পঞ্চায়েত আপিসে হানা দিল। পার্টি আপিসে দৌড়ালো অথবা ভোটও দিল কথামত ঠিক সময়ে, সঠিক চিহ্নে । তবুও তাদের উত্তরণ হলনা । তারপর চল বৌদি, মন্দিরে। একাদশ শতাব্দীতে তৈরী অতি প্রাচীন একটি মন্দির দেখতে যাওয়া  ।
 মন্দিরের নাম জটার দেউল । স্বয়ংভূ শিব মন্দির । আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার দেখভালে  মন্দির ও তার আশপাশ বেশ সংরক্ষিত তবে তৃতীয় বিশ্বের চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিকরা যথারীতি পর্যাপ্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক পূর্ণ করে ফেলেছে ঐ সুন্দর এবং নিরিবিলি স্থানটিকে । ঐ একটি কাজে আমরা খুব পটু। তা হল নিয়ম ভাঙা । সেখানে গার্বেজ ফেলার ব্যাবস্থা করে রেখেছে এ এস আই তবুও সংবরণ করা যায়না যত্রতত্র জঞ্জাল ফেলার অভ্যাসকে ।  মন্দিরের গায়ে পোড়া ইঁটের ওপর নিখুঁত স্থাপত্য ।  অনেকটাই সময়ের ভারে নষ্ট হয়ে গেছে । অভ্যন্তরে গর্ভগৃহের মধ্যে তাকালে দেখা যায় কত উঁচুতে দেওয়ালের গায়ে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানোর ব্যাবস্থা ।
ঐ গ্রামের বৌটি আমাদের জন্য লুচি আর আলুর দম বানিয়ে হাজির হয়েছিল রায়দীঘিতে । তারপর গরম চা । সেখান থেকে আমরা গেলাম সেই গ্রামের আতিথেয়তার স্বীকার হতে । পূর্ব পরিকল্পিত চড়ুইভাতি বা প্রকৃত অর্থে বনভোজনের মেজাজ নিয়ে । ধানজমির সরু আলের মধ্যে দিয়ে ডাইনে পান্নাপুকুরের সবুজ জলে ভাসমান গোলাপী শালুক আর বাঁয়ে গোলা ভরা ধান চলল সাথে ।  কোথাও হলুদ সর্ষে ক্ষেত কোথাও আলু, একফালি সবুজ কচি ধানগাছের পিছনে সয়াবিনের ক্ষেত অথবা ফুলকপি ।
বড় সুন্দর এই অনুভূতি। শহর থেকে গিয়ে শুধু সবুজে চোখ জুড়োনো যে কি ভালো লাগে! বারবার এই  মাটির রূপ দেখতে ইচ্ছে করে । দীঘিভরা জল করে টলমল।শীতকালে খেজুরগাছে হাঁড়িবাঁধার ধুম । আর স্নানের অছিলায় গ্রাম্য বধূর পুকুর সাঁতরে গামছা দিয়ে চিংড়ি-কাঁকড়া নিয়ে ভিজে কাপড়ে ঘরে ফেরা । 

এখনকার প্রজন্মের কাছে শীত-পিকনিক মানেই কেটারিংয়ে কব্জি ডোবানো, দুটো সাউন্ডবক্স থেকে জোরদার গানের সাথে উদ্দাম নৃত্য আর ইবিজা, কান্ট্রিক্লাব বা বেদিক ভিলেজের মত বিলাসবহুল আপ্যায়নে অবগাহন। এর থেকে অব্যাহতি পেতে গতকাল আমরা বনভোজনে গেলাম দক্ষিণবঙ্গের রায়দিঘীর কাছেই এক গ্রামে ।পালবংশের আমলে তৈরী অতি প্রাচীন মন্দির "জটার দেউল" দেখা একটি বিশেষ পাওয়া ।
খাড়ির জল যত্রতত্র খেলে বেড়ায় সেগ্রামে ।   মাটীর নীচে কাঁকড়ার বাসা যেখানে আর ধানক্ষেতের আলের ওপর দিয়ে দিয়ে হেঁটে আসা যায় সেখানে । কুড়োনো যায় নোনাবালির মধ্যে থেকে ঝিনুক আর শামুকের খোলা । সুন্দরী আর গরাণ গাছও আছে কিছু । কচি কচি টোপা কুল ধরেছে গাছে । কচি নারকেল পাড়িয়ে তেষ্টা মেটানো।খেজুর গাছে হাঁড়ি এখনো বাঁধেনি তারা । ঠান্ডা নেই । কুয়াশা নেই তাই । বড় বড় কাঁকড়া ধরানো হল গর্তর মধ্যে থেকে । দাম পেয়ে গ্রামের মানুষ ও বেজায় খুশী । আমাদের পিকনিকের  গরম ভাত মাটির উনুনে ফুটতে লাগল । আমরা পৌঁছতেই মাটির ঘরের দালানে রেডি দুপুরের আহার ।গরম ভাত, ডালের সাথে নদী থেকে সদ্য ধরা চুনোমাছ ভাজা, ক্ষেতের টাটকা শাকসব্জীর চচ্চড়ি, দিশী মুরগীর ঝোল আর টমেটোর চাটনী ।

তেলা মাথায় তেল না দিয়ে তোমরাও ভেবে দেখতে পারো গ্রামের মানুষদের সাথে কি করে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মাটির গন্ধ নিয়ে পিকনিক করে আসা যায় । প্রকৃত অর্থে চড়ুইভাতির মজা পাবে। মাটির উনুনে রান্নাবান্না আর টিউকলের জলে আঁচানো সব মিলিয়ে আমি ও আমার সর্বক্ষণের ওঠাবসার সাথীরা বেজায় খুশি । আর অতিথি আপ্যায়নে গ্রামের মানুষের কোনো খামতি নেই । ফেরার পথে তাদেরি বাড়ির একজন প্রত্যেকের হাতে একঠোঙা করে মুড়ি, আলুর চপ আর বেগুনী দিয়ে দিল গরম গরম । তারপর গাছের কলাটা, মুলোটাও। ওরাও খুশি একটু বিক্রিবাটরায়  আর আমরাও খুশী তরতাজা প্রাকৃতিক বনভোজন সেরে ।

পিকনিক-৫





জায়গাটা কলকাতার খুব কাছেই। নাম "বনের হাট'। আর এটা বারুইপুরে একটি ছোট ঘরোয়া বনভোজনের স্পট।সবুজ গাছগাছালি ঘেরা, একটুকরো জলের ঠাণ্ডা ধার, তক্তপোশে শীতলপাটি বিছানো একটা ছোট্ট বিশ্রামের কুঁড়ে, রান্নাবাটির জন্য টালির শেড, বাথরুম সব আছে তবে নেই ইলেকট্রিক। তাতে অবিশ্যি অসুবিধেও নেই। দিনে দিনেই ফিরে এসেছি আমরা।
কলকাতা থেকে  সোজা বাইপাস দিয়ে বারুইপুর স্টেশন। তারপর ফ্লাইওভার পেরিয়ে ওপারে গিয়ে নেমে সোজা যে রাস্তা ক্যানিং এর দিকে গেছে সেটা ধরা। পেরুবে ফুলতলা, রামনগর হাইস্কুল তারপরেই রাস্তার ওপরেই ডানদিকে পড়বে ঝাঁ চকচকে রেসর্ট যার নাম বনের হাট। যাবার রাস্তা খুব ভাল (টাচ্‌ উড্‌) । ভোরবেলা গড়িয়াহাট থেকে সময় লাগল মাত্র ৫০-৫৫ মিনিট। বেলা বাড়লে বাজারের ভীড় পড়ে তাই বেশী সময় লাগে। এহেন বনভোজন @ বনের হাট ছিল গতকাল  অর্থাত অঘ্রাণের অলস ছুটির দিনে।  শীত পড়তে না পড়তেই বাঙালীর কফি আর স্যুপ প্রেম যেমন উথলে ওঠে তেমনি আর কি পিকনিক প্রেমেও ভেসে যায় অমৃত কমলার ভোর। সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে দুপুরের চাইনিজ লাঞ্চ সব কিছুই হল ঠিকঠাক। আবারো কেউ ভুললেন হাঁফের টান, কেউ আরথাইটিস, কেউ বা COPDর কষ্ট, কেউ ডিপ্রেশান, কেউ আবার পিকনিকের এক্সাইটমেন্টে রাতের ঘুমটুকুনিও।

আমার কাছে বৈচিত্র্যময় রূপসী বাংলার শীতের উইকএন্ড মানেই বেরিয়ে পড়বার সুখ। বেরিয়ে পড়া মানেই সদলবলে কাছেপিঠে পিকনিকের আনন্দ। বেরিয়ে পড়া মানেই অফুরান হৈ চৈ তে সামিল হয়ে ওঠা। যে ঐশ্বর্য্য এখনো অধরা  তার দিকে দু চোখ মেলে দেওয়া। আর তারিয়ে তারিয়ে আমার বাংলার রূপলাবণ্য উপভোগ করা।  

গ্রীষ্মে যাই উত্তরবাংলায় হিমালয়ের কোলে দুটিপাতা-একটি কুঁড়ির স্বর্গরাজ্যে তো শীতের রোদের গনগনে আঁচে ছুটে যাই সাগরের দিকে । কোনোবার বসন্তের পিকনিকের ভোরে ছুটে গেছি দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে লালমাটির দেশে কিম্বা বাসন্তী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা ইছামতীর ধারে বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টাকীতে। অথবা বসন্তের পাহাড়ে পলাশের আগুণ লাগা মুকুটমণিপুর কিম্বা শঙ্করপুরের সমুদ্রসৈকতে । 
রূপসীবাংলার বুকে পিকনিকের গল্প এক বৈচিত্র্যময় রূপকথার মত। এ গল্প ফুরোয়না। কালেকালে আরো যেন রূপবতী হয় আমার বাংলা। থৈ থৈ তার রূপ লাবণ্য নিয়ে। মানুষ পিকনিকে আসে, পিকনিকে যায় প্রতি বছর। একটু জিরেন আধটু নিরালার খোঁজে।   
প্রতিবার বাংলার সবুজে বনভোজনের মজা পাই আর ফেরার সময় তাকে বলি...
তোমার সবুজে সবুজ আর নীলিমায় নীল দিগন্তে আমি মোহিত আবারো । আক্ষেপ কেবল একটাই.. শুধু চাই ভালো ও চওড়া রাস্তা যাতে শহর থেকে গ্রামের মানুষগুলো সহজেই আসা-যাওয়া করতে পারে আর চাই একটু শিল্প । গ্রামবাংলার যা আছে তা অনেকের কাছে ঈর্ষার । শুধু চাই দক্ষ পরিচালনা  আর পরিকাঠামো । চাষের জমি থাকুক । পাশাপাশি ফ্যাক্টরি  হোক দু-চারটে ।  ঐ মানুষগুলোর কর্মসংস্থান হোক  ! শুধু চাষ করে আর মাছ কাঁকড়া ধরে ওদের বালবাচ্চাগুলোর দুবেলা পেটটা হয়ত ভরে কিন্তু কুঁজোরও তো চিত হয়ে শুতে ইচ্ছে হয় !

Truly your's হয়েই থাকলাম পশ্চিমবাংলা।

কলকাতা ২৪x৭ রোববার

কোন মন্তব্য নেই: