৩০ এপ্রিল, ২০১৬

ভোটের আমি, ভোটের তুমি

 কি মজা! কি মজা! আজ পরীক্ষা শেষ হল। আবার সারাবছর পড়বনা। মা মন্দিরে ফুল চড়াবে আর বলবে, এবারটার মত পাস করিয়ে দিও ঠাকুর। পরেরবার থেকে আমি নিজে দেখব ওর পড়াশুনো। মা অমন হামেশাই বলে। মা তো নিজেই জানে। তিনি নিজেও কখনো পড়াশুনো করতেন না। আমি এবারেও মা'কে প্রমিস করে বলব, আর ফাঁকি দেবনা। বাবা যখন প্রতিমাসে তার কষ্টার্জিত নোটগুলো দিয়ে টিউশান-ফি দেবে তখন বলব, এবার দেখো আমি ঠিক মন দিয়ে পড়াশুনো করব। তারপর? তারপর একবার যদি আমি টিচারের চোখের মণি হয়ে যাই, আমাকে আর কে পায়? না পড়েই পাস করে আসছি এ যাবত। তাই সেটাই আমার স্বভাবটা খারাপ করে দিয়েছে। নয়ত বিশ্বাস করুন, মা-বাবা কারোকে বলতে হত না পড়, পড়। কোশ্চেনগুলো কমন এসেচে। কিন্তু তবুও অনেক ছেলেরা টুকলি করার চেষ্টা করেছে জানেন্? আমি অবিশ্যি ভালো ছেলে। অনেক আটঘাট বেঁধে রেখেছিলাম। তাই মনে হয় উতরে যাব এবারেও। বেশ খেয়ে, পরে, ঘুমিয়ে, ছবি এঁকে, কবিতা লিখে, সিনেমা দেখে, ব‌ই পড়ে থাকি। পরীক্ষার চাপ থাকেনা। ভাল্লাগেনা এই পরীক্ষার সময়টা। বড্ড চাপ হয়ে যায়। মা-বাবার টেনশান বেড়ে যায়। তবুও পরীক্ষা দিতেই হয়। নয়ত মানুষ হব কি করে?    

......

কাল সকাল চান সেরে উপোস করে অঞ্জলি দি প্রতিবার। আমার আবার ধম্মেকম্মে খু‌উব মতি কিনা! নির্জ্জলা উপোস করে পুজো না দিতি পারলে মনটা যেন সাফসুতরো হয়না। যবে থেকে নাবালিকা নাম ঘুচেছে তবে থেকে এইপুজোর ব্রত করছি। তবে কিছু পাবার আশায় নয়। পেত্থম পেত্থম ভাবতি কত অদলবদল হবে নাজানি। দেশটা আমার ফুলছোঁড়াতেই আমূল বদলে যাবে! ও হরি! এতো ঢপের চপ! রাস্তার ফুটপাথে রোজ পা মচকায় তবুও এই পুজো করি আমি। ছেলেগুলো কত্ত পড়ে এসেও চাকরী পায়না এখানে তবুও এই পুজো করে মরি আমি। মায়ের চিকিত্‌সা করতে ভেলোরে যাই আমি তবুও নাকটিপে পুজো করব । আমার বাড়ির সামনের রাস্তায় টাইমকলের জল উপচে পড়ে তবুও আবাসনে ডিপ টিউবওয়েল। তাও আমার শিক্ষে হয়নি, এই পুজো আমি করে ছাড়ব‌ই। রাস্তাঘাট আলোয় আলোয় ছয়লাপ তবুও শিল্পের হাহাকার। তো কি? লোডশেডিং তো নেই! কাল সারা রাত ধরে সব ভেবে দেখনু, এই পুজো করেই ছাড়ব কারণ এ পুজোয় আমার জন্মগত অধিকার।
আর এবার বাপু উপোস করিনি। দিব্যি চা-টা খেয়ে টেয়ে, সেজে আর গুজে গেনু।  
আম্মো এই গরমে পাট ভেঙে একখান মলমলি ছাপাশাড়ী পরে দিয়ে এনু । তবে শাড়ির রং সম্বন্ধে খুউব সন্দিহান সকলে । কমলা নয়, লাল নয়, নীল নয়, সবুজ নয়। স্রেফ সাদা পরে। কানে গুঁজে  ফুল। তবে পদ্ম, ঘাসফুল নৈব নৈব চ! পিঠে বেঁধে  কুলো। থুড়ি হাতে বেঁধে কুলো, পড়শীরা সব দেখে আমায় বলল এ কি হল? 
আর? ছোট্ট টিপ, হালকা লিপিস্টিক আর? চোখের চারপাশের কমনীয় ত্বক ঢাকিনি রোদচশমাতে। কারণ অত সকালে দরকার নেই। পোষাক তো হালকা রংয়ের আছেই। ছাতা শুনলাম অনেকেই ফোকটে পেয়েছে। শুনলাম SPF 15 সমেত সানস্ক্রিন লোশানও দিচ্ছে মহিলা ভোটারদের । আর যে যাচ্ছে বিরিয়ানিও পাচ্ছে অতএব দুপুরের খাওয়ায় নো চাপ!কারণ সাথে আছে চিকেন চাপ।  সব মিলিয়ে its Vote time! party time! long weekend celebration ahead ! ভোটপুজো বলে কতা!    

...
 

ভোলা/ভুলু/? শুনতে পাচ্ছিস্‌? রাত পুইলেই পরীক্ষে না? তা না পড়ে পড়ে শুধু ঘুম আর ঘুম। যে গুলো পরীক্ষেয় ইম্পটেন্ট সেগুলো ভুলিসনি যেন বাপ্‌ আমার।  এই গরমে তোর মাথার ঘিলুতে শুধু যে কোশ্চেনগুলো গেঁথে দিলুম সেগুলোই আসবে কিন্তু। ঠিকমত পোশ্নের উত্তর দিস বাপ্‌ আমার। আর রাতে হালকাপুলকা খাবার খেয়ে নে বাপ্‌। বেশী খেলে বদহজম হবে। তাপ্পর সব ভুল করে আসবি তুই। আর শোন্‌ আরেকটা কথা। আজ এট্টু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়িস বাপধন! হক্কাল হক্কাল উইঠ্যা, চিঁড়া-গুড় খাইয়্যা, হাওয়াই চটি পৈরে পরীক্ষে দিতে যাস বাপ্‌। বেশী অন্ধকারে যাস্‌না ভুলু/ভোলা।  পুলিশেরা নাকি পুছতাছ করতে পারে। কপালে দৈয়ের ফোঁটাটা পরিয়ে দেব আমি। হলুদ-সিঁদুরে চাল দিয়ে দৈয়ের ফোঁটা খুব শুভ। কিন্তু তুই মুছে নিস বাপ্‌। পেন্সিলবাক্স নিস্‌না যেন। পকেটের মধ্যেই পেন রাখিস। ওরা নিয়ে নিতে পারে। রঙীন জামা পরিসনি যেন ভোলা/ভুলু। ওরা সন্দেহ কত্তে পারে। মোবাইলটা বাড়িতে রেখে যাস। ওরা নিয়ে নিতে পারে। ঐ যে কোন্‌ পার্টির থেকে ছাতা দেছিল, ওটাও নিয়ে যাস্‌নি বাবা। কি দরকার? কোত্থেকে কি হয়ে যায়? ভোলা বললে, আমাকে হাওয়াই চটি পরতি বলছ আর নিজে তো কপালে ইয়া বড় কালোজামের মত টিপ প‌ইরেছো। রাতেই টিপটা খুলে রাকো দিকিনি। নয়ত ওরা সন্দেহ করবে।

 .......

২৪ এপ্রিল, ২০১৬

c/o সীতায়ণ



 "সীত" বা লাঙলের ফলায় মাটি থেকে উত্পন্ন সেই সীতার কাহিনী নিয়ে সীতায়ণ বা অন্য রামায়ণ লিখেছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। জন্ম থেকে বিলীন হয়ে যাওয়া এই কন্যার দুর্ভাগ্যের আঁধার ছিল নিবিড় ছায়াসঙ্গী। আদর্শবাদকে দূরে সরিয়ে রেখে সেই কন্যার অন্ধকার পরিবৃত জীবনে আলো ফেলেছিলেন লেখক। এই ধ্রূপদী উপন্যাস যখন মঞ্চের আলোআঁধারে জনকনন্দিনীর প্রতিবাদী লালিত্যে উদ্ভাসিত হয় তখন তা সত্য সীতায়ন। শুধু রামায়ণের স্তুতিগীতিতে মুখর নয় তা। জনকদুহিতার আড়ম্বরহীন, ব্যসনে-ভূষণে সীতাকন্ঠ বারেবারে প্রতিধ্বনিত হয়ে একটাই কথা বলে" জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা, জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্তটীকা" । কি হবে বিবাহের প্রলোভনে পা দিয়ে? কি হবে নিজের বহু আকাঙ্খিত প্রিয়তম পুরুষের বীজ গর্ভে ধারণ করে? কি‌ই বা হবে আজীবন সেই পুরুষের হাতের ক্রীড়ানক হয়ে মধুচন্দ্রিমার ভোগ্যবস্তু হয়ে? জীবনের সর্বোত্তম মূহুর্তে ভুলে যাও মধুযামিনী যাপনচিত্রকথা। সেই চিত্রকূটে, সেই নৈমিষারণ্যেই হয়ত হতে পারে তোমার নির্বাসন। তাই এই সীতাকে আজ হতে হয়নি বাক্যহীনা। সতীত্বের পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত সে সীতা। তার জীবনের প্রথম পুরুষ, শেষ পুরুষ, উত্তর পুরুষ, মধ্যম পুরুষ সব‌ই অযোধ্যার আদর্শবান রাজা রামচন্দ্র নামে এক আর্য যুবক। যে রাজা শুধু সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া। সবার উপরে পিতৃসত্য, প্রজাসত্য। চুলোয় যাক মাতা, পত্নী।
একটাই তো ব‌ই জীবন। একটাই তো ব‌ই যুগ। যার নাম ত্রেতা। তিনি না ত্রাণ করতে এসেছেন। কার ত্রাণ? কিসের ত্রাণ? স্ত্রী, মাতা এরা সামান্য নারী। ত্রাণ যদি করতেই হয় তবে প্রজাই মুখ্য ত্রেতাযুগে। প্রজাবত্সল হলেই পরজন্মে আবার অবতারত্বের গ্যারান্টি । তাই না তিনি যুগেযুগে আদর্শ ভ্রাতা, আদর্শ পুত্র, আদর্শ রাজার তকমা লাগিয়ে মহত হলেন। কিন্তু সীতা নামের মেয়েটি? যে মধ্যবয়সে সেই আদর্শবানের বীজ গর্ভে ধারণ করে , নিজের গর্ভিণী জীবন একাকী লালন করে আশ্রমবাসী হয়ে। লঙ্কা থেকে ফেরার পর যাকে রাবণ রূপ খলনায়কের দূষণ, কালিমা, পাপ মোছার জন্য সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হয়। মনে মনে সেই সীতার কেবল একটাই প্রশ্ন জাগে সীতায়ণে। নারীর কলঙ্ক মোচনের জন্য আগুণ‌ই কি প্রকৃষ্ট পরীক্ষক? কালিমা-কলঙ্ক কি আগুণের লেলিহান শিখাতেই ধুয়েমুছে সাফ করে নারীকে আবার পরিচ্ছন্ন করে দেয়? যে স্বামী একদিন তার কন্ঠলগ্না হয়ে, আলিঙ্গন করে স্বেচ্ছায় তার যোনিপথে ঢেলে দিয়েছিল উষ্ণবীর্য। সেই নারীর মুখের কথা, চোখের ভাষাই কি সব নয়? কেন তাকে বিশ্বাস করা যায়না? কারণ সে নারী বলে? তেজোদৃপ্ত, পেশীবহুল পুরুষের কাছে এই সীতার প্রশ্ন সেটাই। এই সীতা সোচ্চার সেই প্রতিবাদে।এই পুরুষের পৌরুষ কি কাপুরুষতায় পর্যুবাসিত? "কানপাতলা" তো মেয়েদের হয়। পুরুষদেরো হয় নাকি? তাই বুঝি প্রজাসর্বস্ব এই রাজা বারেবারে স্ত্রীকে দূরে সরিয়ে আত্মতুষ্টিতে নিজের মহত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। আর তাই বুঝি নৈমিষারণ্যে বাল্মিকীর আশ্রমে সীতার মুখ থেকেই স্বয়ং বাল্মিকী শুনতে চান সীতার জীবনের করুণ কাহিনী। কিন্তু কবি বাল্মিকীও ভারতবর্ষের এক সনাতন আদি কবি। মস্যাধারে খাগের কলম ডুবিয়ে ভুর্জপত্রে সীতার মুখনিঃসৃত সত্যি কথাগুলি আড়াল করে বলেন, "না, মা, ভুলে যেওনা। তিনি তো অবতার। তিনি আদর্শ রাজা রামচন্দ্র। তোমার অনেক সৌভাগ্য যে তুমি তাঁর সন্তানের জননী। ইক্ষ্বাকু বংশের মর্যাদায় তুমি তাঁর ধর্মপত্নী।"
গল্পের শুরুতেই শুনি নদীতে নৌকার ছলাত ছলাত শব্দ। হোমশিখার মত পবিত্র মাতৃত্বে বিভোর হয়ে বহুদিন পর সীতা চলেছেন লক্ষণের সঙ্গে। কিন্তু যেইমাত্র জানলেন যে রামচন্দ্রের আদেশে বাল্মিকীর আশ্রমে শুরু হবে তাঁর এই গর্ভিণী জীবন তখনি শুরু সীতায়ণ। তিনি হয়ে উঠলেন প্রগলভ, প্রতিবাদী এক নারীকন্ঠ। তাঁর স্বামীর হৃদয়ে সীতা নামের নারীটির জন্য কোনো স্থান নেই। সে শুধু রাষ্ট্রতত্ত্বকে প্রতিপালন করে। চিরদুঃখের পথে হাঁটতে গিয়ে সেই নারী নিজে রচনা করলেন নতুন এক পথ। নতুন পথে ধরে র‌ইলেন সেই অমোঘ আলোকবর্তিকা। সেই পথে হাঁটবেন দর্শক। সেই পথের নামকরণ করেছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। সেই পথের আজকের ঠিকানা c/o সীতায়ণ।
আমিও সেই প্রজননকারী নারীর এককণা। তাই আমি জননী। আমার দ্বারাও পুরুষের রমণ হয়েছে। তাই আমি রমণী। আমার প্রতিবাদীনি রূপের চেয়ে মহলে মহলে থাকাটাই পুরুষের সর্বকালের পছন্দের তাই আমি মহিলা। রাজার রাজ্যশাসনের আওতায় কি স্ত্রীর প্রতিপালন পড়েনা? স্ত্রী শুধুই বংশরক্ষার্থে যুগে যুগে আবির্ভূতা হন? এ তুমি কেমন রাজা রামচন্দ্র? লোকে তোমায় মান্যিগণ্যি করে। লোকে তোমার আদর্শ নিয়ে স্তুতিগান করে । রামায়ণের হিরো তুমি হতে পারো কবির কলমে। আমার মনে নয়।
প্রতিবাদী সীতার মেনে নিতে কষ্ট হয়। সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ। তিনি বারেবারে মঞ্চ কাঁপিয়ে আজকের নারীর উদ্দেশ্যে সেই কথা ছুঁড়ে দিতে লাগলেন। আর আমার মত এহেন নারীদর্শক সেই অণুরণন কানে নিয়ে ফিরে এল গতকাল শিশিরমঞ্চ থেকে।

শাঁওলি মিত্রের দ্রৌপদীর আখ্যান নিয়ে "নাথবতী অনাথবতের" পর রোকেয়া রায়ের সীতায়ণ। ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে এলে সম্পূর্ণ হয় একপাক। যেমন উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ণ।

আদর্শরাজা (?) রামচন্দ্রের জীবনের সম্পূর্ণ নিয়ে বাল্মিকীর কলমে রামায়ণ। আর মল্লিকা সেনগুপ্তর বহুচর্চিত এই সীতায়নের সম্পূর্ণতার রূপায়ণ বল চরিত্রায়ণ বলো সবটুকুনি‌ই হল তোমার অভিনয়ে, রোকেয়া রায়। তোমার মঞ্চ পরিকল্পনা অনবদ্য। নাটকের নির্দেশনায় মলয় রায় অত্যন্ত পটুতা দেখিয়েছেন। বহু অভিনয়ে একক চরিত্রে সুমন অত্যন্ত দাপুটে। কখনো সে অত্যাচারী রাবণ, কখনো ন্যায়নিষ্ঠ দেবর লক্ষণ, কখনো সেই ইক্ষাকুনৃপতি রাঘবেন্দ্র রাম, আবার কখনো বয়সের ভারে কুব্জ, ন্যুব্জ বাল্মিকী মুণি, আবার এক ঝলকে ছোট্ট কিশোর লব। কি অপূর্ব ট্রানজিশান তার স্বরক্ষেপণে, ব্যাক্তিত্ত্বে। তবে মঞ্চে সীতার পোশাক আরো অন্যরকম হতে পারত। রামের কাপুরুষতা একটু প্রচ্ছন্ন লেগেছে। আর সংলাপে এক‌ই কথার বারবার প্রয়োগ একটু অস্বস্তির কারণ। কে জানে? হাতুড়ি দিয়ে আমাদের সমাজের মানুষগুলোর মাথায় বোধহয় এইকথাগুলোই প্রোথিত করতে চেয়েছেন স্বয়ং পরিচালক। আর নয় পুরুষের জয়গান। ভুলে যাও রামগান। শুরু হোক সীতায়ন। মোটের ওপর প্রখর গ্রীষ্মের চোখরাঙানি ভুলে, ভোটরঙ্গ শিকেয় তুলে পয়সা উশুল সন্ধ্যেনাটক। আরো একবার দেখার ইচ্ছে র‌ইল। টিম সীতায়ণ যুগ যুগ জিও!

১৭ এপ্রিল, ২০১৬

নূতন রতনে-১

পাতপেড়ে খেতে কার না ভালো লাগে! তাই আবারো সুরজিত ও বন্ধুরা কবিতাক্লাবের নতুন বছরের আমন্ত্রণে "নতুন"থিমে মুক্তগদ্যের পংক্তিভোজনে আমিও।
http://www.kobitaclub.com/tomar_kobita_comment.php?tkid=17689  


১৪ এপ্রিল, ২০১৬

বারাণস্যাং অন্নপূর্ণাং



বারাণসী বা কাশী মহাতীর্থে দেবাদিদেব বিশ্বেশ্বর বিরাজ করেন। বিশ্বনাথের মন্দিরের পাশেই অন্নপূর্ণার মন্দির। বারাণসী একান্ন সতীপীঠের অন্যতম কারণ এখানে দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর কুন্ডল পড়েছিল। কথিত আছে বারাণসীর গঙ্গার অন্যতম মণিকুন্ডল ঘাটের নাম এই থেকেই। তাই কাশীর বিশ্বেশ্বর হলেন এখানে মায়ের ভৈরব এবং দেবী অন্নপূর্ণা হলেন তাঁর প্রকৃতি। পীঠ হয়ে ওঠার পেছনে যে স্থান মাহাত্ম্য থাকে অর্থাত উত্তরবাহিনী নদী, সংলগ্ন শ্মশান সবকিছুই বর্তমান এখানে। তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থে আছে, 

বারাণস্যাং বিশালাক্ষী দেবতা কালভৈরবঃ 
মণিকর্ণীতি বিখ্যাতা কুন্ডলঞ্চ মম শ্রুতেঃ।।
 যদিও এখানে বলা হয়ৈছে দক্ষযজ্ঞের সময় দেবীর কুন্ডল পড়ার কথা স্কন্দপুরাণের কাশীখন্ডে আছে একদা বিষ্ণু এখানে মহাতপস্যা করেন। তপস্যার পর তিনি তাঁর চক্র দিয়ে একটি পুকুর খনন করেন এবং নিজের স্বেদ দিয়ে তা পূর্ণ করেন। মহেশ্বর তা দেখে খুশি হয়ে মাথা নাড়তে থাকেন ও তাঁর মাথা নাড়ার ফলে কানের কুন্ডল ঐ পুকুরে পতিত হয়। তাই ঐ স্থানের নাম মণিকর্ণিকা। শিবপুরাণে বলা হয় তপস্যার সময় বিষ্ণুর কান থেকে বিবিশ রত্নে ভূষিত কর্ণকুন্ডল পতিত হবার আখ্যান । পীঠনির্ণয় তন্ত্রে দেবীর কর্ণকুন্ডল পতিত হবার জন্য দেবী হলেন মণিকর্ণী বা বিশালাক্ষী আর তাঁর ভৈরব হলেন কালভৈরব।

আদ্যাস্তোত্রে আমরা পাই "বারাণস্যাং অন্নপূর্ণা" । কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গলে পাই এখানে দেবীর বক্ষদেশ পতিত হবার কথা।

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের ছত্রে ছত্রে দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য কীর্তণের গল্প পাই। শিব ও পার্বতীর সংসারের ঘোর দারিদ্রের বর্ণনা দিয়ে শুরু এই কাহিনী। মা অন্নপূর্ণা তখনো অন্নপূর্ণা হয়ে ওঠেননি। এহেন দেবী পার্বতী একদিন শিবকে বললেন মনের কথা। দারিদ্র্য তাঁর আর সহ্য হয়না। মাথার চুলে ও সর্বাঙ্গে তেল না পড়ে রুক্ষ ও শুষ্ক হয়ৈছে তাঁর গাত্র ও কেশরাজি। শিবের জন্য নিত্য সিদ্ধিপাতা বেটে বেটে হাতে পড়েছে কড়া। এক পুত্র গজানন, চারহাতে খায় ও অন্য পুত্র ষড়ানন ময়ূর নিয়ে অহোরাত্র খেলে বেড়ায়। এতজনের সংসারে অন্ন নেই। তাই পার্বতীর হাহুতাশ দেখে মহাদেব ভিক্ষায় বেরুলেন।

আর পার্বতী তাঁর সখী জয়ার কাছে মনের দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন..


কি করিব একা ঘরে রয়ে বৃথা

কেন দুঃখ পাই বাপের মন্দিরে যাই

গণপতি কার্তিকেয় লহে।।

যে ঘরে গৃহস্থ হেন সে ঘরে গৃহিণী কেন

নাহি ঘরে সদা খাই খাই

কি করে গৃহিণী পানে ক্ষণক্ষণ ঝন্‌ঝনে

আসে লক্ষ্মী বেড় বান্দে নাই।।

মনস্তাপ করতে করতে দেবী বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন ভাবলেন। জয়া তাঁকে নিরস্ত করে বললেন" দ্যাখো, স্বামী ধনহীন হলে বাপের বাড়িতে মেয়েদের কোনো সম্মান নেই" তার চেয়ে তুমি অন্নপূর্ণা রূপ ধারণ কর। সারা বিশ্বের যত অন্ন আছে তা তোমার সংগ্রহে রাখো। মহাদেব ভিক্ষা করে কোথাও যখন অন্ন পাবেননা তুমিই তাঁকে অন্ন যোগাবে" দেবী অন্নপূর্ণার রূপ ধারণ করলেন। সারা বিশ্বের সমস্ত অন্ন একত্র করে নিজের সংগ্রহে রাখতে শুরু করলেন। এদিকে মহাদেব আর ভিক্ষা পান না। অবশেষে তিনি লক্ষ্মীর কাছে গেলেন অন্নের জন্য। লক্ষ্মী তাঁকে বললেন, " অন্ন তুমি কোথায় পাবে? তোমার ঘরণী সব অন্ন নিজের কাছে রেখেছেন যে! তাই তো বিশ্ব সংসারে অন্ন অপ্রতুল" মহাদেব তখন ঘরে ফিরে দেবীর কাছে ভিক্ষা চাইলেন। পরিতৃপ্তি সহকারে উদরপূর্তি করে বিশ্বকর্মাকে অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য কাশীতে স্বর্ণ দেউল মদির নির্মাণের আদেশ দিলেন। চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমীতিথিতে দেবীর পূজা চালু হল।





দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য ও প্রকাশ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গলের পরের পর্বে আরেক লৌকিক কাহিনীর অবতারণা করলেন। দেবীর দুই সখী জয়া ও বিজয়া দেবীকে বললেন, ধনপতি কুবের নিত্য তোমার পুজো করে। পূজার ফুল সংগ্রহ করেন কুবের অনুচর বসুন্ধর । বসুন্ধরকে শাপগ্রস্ত করো। এবং তবেই বসুন্ধরের মাধ্যমে তোমার পূজার প্রচলন হবে। ধনপতি কুবের পূজার ফুল সংগ্রহ করলেন। কিন্তু দেবীর মায়ায় ফুলের বাগানে তার স্ত্রী বসুন্ধরার সঙ্গে সাক্ষাত হল। বসুন্ধরের স্ত্রী তার স্বামীকে বললে, এই এত ফুলে পুজো করে কি হবে স্বামী? তার চেয়ে আমরা এই ফুল দিয়ে বাসর রচনা করে প্রেমালাপ করি"

এদিকে কুবের ভবনে বসুন্ধরের বিলম্ব দেখে দেবী ক্রুদ্ধ হলেন। এবং বসুন্ধরকে অভিশাপ দিয়ে মর্ত্যে প্রেরণ করলেন। মর্ত্যে বসুন্ধর বাংলাদেশের গঙ্গার তীরে বরগাছি গ্রামে হরি হোড় রূপে জন্ম নিলেন । খুব দুঃখ কষ্টে তার জীবন কাটে। বনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে কাঠ কেটে, ঘুঁটে কুড়িয়ে তার বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য অন্নের জোগাড় করে হরি হোড়। একদিন দেবী অন্নপূর্ণা এক বুড়ির বেশ ধরে তার সামনে উপস্থিত হলেন। হরি হোড় দেখল, সেই বুড়ি তার সংগৃহীত কাঠ-ঘুঁটে সব একত্র করছে।


কোথা হতে আসে বুড়ি, ঘুঁটে পায় ভরে ঝুড়ি সর্বনাশ করিল আমার।

কাড়ি নিলে হবে পাপ, বুড়ি পাছে দেয় শাপ এ দুঃখের নাহি দেখ পার।।

বুড়ি তখন তাকে বললে, বাছ, আমি এত ব‌ইতে পারছিনা, তুমি যদি আমার বোঝাটি বয়ে দাও এর অর্ধেক কাঠ ও ঘুঁটে আমি তোমাকে দান করব"

বৃদ্ধারূপিণী দেবী এত ধীরগতিতে হাঁটতে শুরু করলেন যে হরির বাড়ির কাছে যেতেযেতেই সন্ধ্যে নেমে এল। বুড়ি বলল" এখন তো আর চলতে পারিনে বাবা, তোমার ঘরেই থেকে যাই" হরি বললে" বুড়িমা, আমরা যে হতদরিদ্র, তোমাকে কি খাওয়াব?"

বুড়ি বললে

"বাছা, তোমার মা'কে বল, অন্নপূর্ণার নাম করে ভাতের হাঁড়ি বসাতে"

হরির মা তখন বুড়ির আদেশ মত ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে দেখেন তার মধ্যে নানাবিধ সুখাদ্য রয়েছে। এবার হরি বুঝতে পারলেন বৃদ্ধাবেশী দেবী অন্নপূর্ণার ছলনার কথা। দেবী হরি হোড়কে বরদান করতে উদ্যত হলে হরি বলল, "এই বর দিন, যাতে দেবীর পাদপদ্মে যেন আজীবন ঠাঁই হয়" দেবী তথাস্তু বলে অন্তর্হিত হলেন। এরপর হরির তিনবার বিয়ে হল। ধন সম্পদের অভাব র‌ইলনা। প্রত্যহ তার ঘরে অন্নপূর্ণার পূজা হতে থাকল। কিন্তু এক গৃহে বেশীদিন বাধা পড়ে থাকলে বসুন্ধরের শাপমুক্তি ঘটবে কিভাবে? তাই দেবী আবারো ফন্দী আঁটলেন। এদিকে দেবী হরিকে কথা দিয়েছেন যে তার গৃহ ছেড়ে অন্যত্র যাবেননা। স্বর্গে বসুন্ধরের স্ত্রী বসুন্ধরা ব্যস্ত হলেন তার স্বামীর জন্য। দেবীকে সে কাতর হয়ে প্রার্থনা জানালো। একে পতি বিরহে সে আকুল, অন্যদিকে তিন সতীনের কষ্ট সে আর সহ্য করতে না পেরে দেবীকে বলল" আমাকে রক্ষা করুন, অনেকদিন তো হল আমার স্বামীর মর্ত্যবাস। এদিকে আমি যে আর স‌ইতে পারিনে"

দেবী ভাবলেন বসুন্ধরাকেও যদি মর্ত্যে বদুন্ধর অর্থাত হরি হোড়ের গৃহে পাঠাই তাহলে ওদের ঘরে চরম অশান্তি সৃষ্টি হবে আর সেই অছিলায় তিনি অন্যত্র গমন করবেন।

কিন্তু হরি হোড়ের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে অন্নপূর্ণার ব্রতী হবে কে? তাই নিত্যপূজা চালু রাখার জন্য দেবী গমন করলেন ভবানন্দ মজুমদারের গৃহে। হরি হোড়ের পূজার সময় দেবী তার মেয়ের রূপ ধরে এসে বললেন, " বাবা, আমি তবে যাই?" হরি বললেন, " হ্যাঁ, যাও।" ব্যাস্! সেই অপেক্ষাই করছিলেন দেবী। তিনি ভক্তের সাথে ছলনা করে ভবানন্দের গৃহে পা বাড়ালেন।

হরি হোড়ের বাড়ি থেকে ভবানন্দের বাড়ি যেতে হলে নৌকায় নদী পেরুতে হবে দেবীকে। নদী পার হবার জন্য ঈশ্বরী পাটনীর সাহায্য চাইলেন তিনি। একা মেয়েছেলেকে নৌকা পার হতে দেখে মাঝি ঈশ্বরী তার পরিচয় জানতে চাইলেন। দেবী রহস্যাবৃত করে বলতে লাগলেন সেই বিখ্যাত কবিতা।


গোত্রের প্রধান পিতা মুখ্য বংশজাত।

পরম কুলীন স্বামী বন্দ্যো বংশখ্যাত।।

পিতামহ দিলা মোরে অন্নপূর্ণা নাম।

অনেকের পতি তেই পতি মোর বাম।।

এইভাবে যুগ যুগান্ত ধরে অন্নদামঙ্গলের এই সাধারণ লৌকিক কাহিনীগুলি হরি হোড় থেকে ভবানন্দ মজুমদার, বাংলার একগ্রাম থেকে অন্য গ্রাম দেবী অন্নপূর্ণার দেবী মাহাত্ম্য প্রচার করে আসছে ।

১২ এপ্রিল, ২০১৬

নীলষষ্ঠী কথা

 

অশোকষষ্ঠী বা বাসন্তীদুর্গাপুজো হয় চৈত্রমাসের শুক্লাতিথিতে। মহাদেবের নীলের পুজোর দিনটা বরাদ্দ চড়ক বা গাজনের দিনক্ষণ অনুযায়ী, বর্ষশেষের সংক্রান্তির আগের দিনে। প্রতিবছর এই নিয়ে দুগ্গার সঙ্গে শিবের বেশ ঠান্ডা লড়াই চলে।  তা এবার সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে বাসন্তী-অশোকষষ্ঠী আর নীল একদিনে পড়েছে। শিবের ফন্দী আর কি দুগ্গার জানা নেই? দুগ্গা একটু বাপেরবাড়ি আসতে চান নিরিবিলিতে কিন্তু এবার সেই গাঁটছড়া বেঁধে নেশাখোরটা সঙ্গী হল।  
আসার পথে দুগ্গা বলেছিল একবার, এবার ভোটের হাওয়া গরম, বোশেখ না পড়তেই হাওয়াবাতাস গরম। তুমি চুল-দাড়ি-জটা-গোঁফ কেটে চলো। শিব বলল, আমি মেয়েছেলের কথায় কান দি‌ই না। 
দুগ্গা বলল, ক'দিন আগেই তো ঠান্ডায় ঠান্ডায় শিবরাত্তিরে কত ক'দিন আগেই তো মহা ধূমধাম করে কত্ত পুজো পেলে । ফাগুনদিনের মাগ্যির বেলের পানা, তরমুজ, ফুটি খেয়ে পথ্যি করলে। সিদ্ধি-মধু-ঘিয়ের ফেসপ্যাক নিলে । ডাবের জলে মুখ আঁচালে । ঠান্ডার পর নতুন গরমে টক দৈয়ের ঘোল খেয়ে ব্যোম্‌ ব্যোম্‌ করে ত্রিভুবন শান্তি কল্লে । মাথা ঠান্ডা তো তোমার গুরু! আবার নীলষষ্ঠী ? ষষ্ঠী তো এতদিন জানতাম একবগ্গা মেয়েদের সম্পত্তি। এবার সেখানেও ভাগ বসালে তো আমাদের ব্র্যান্ড ডাইলুশান হয়। 
শিব বলল, নিজের আত্মতুষ্টিতে বিভোর তুমি। জানবে কি করে প্রজারঞ্জনের মাহাত্ম্য? 
আবার ষষ্ঠীর পেছনে নীল জোড়া কেন বাপু? ক‌ই আমরা তো লাল,সবুজ, হলুদ ষষ্ঠীর দোহাই দি‌ই না মানুষকে।
পাশ থেকে সাওকড়ি মেরে নন্দী বলল, মা ঠাকরুণ তো ঠিক‌ই বলেচে বাবা।   
নীলষষ্ঠী নীল কেন ? লাল বা সবুজ নয় কেন?
নীল কথাটি নীলকন্ঠ মহাদেবের সাথে সাযুজ্য রেখে... এতদিন আমার কাছে আচিস এটাও জানিস নে?  মহাবাবা বলেন । সেই যে সেই সমুদ্রমন্থনের  সময়  আমি দুনিয়ার  সব বিষ আমার কন্ঠে ধারণ করেছিলাম । তাই তো সকলে আমাকে নীলকন্ঠ বলে ডাকে রে ।
তার সঙ্গে ষষ্ঠী জুড়লো কে বাবা ? নন্দী বললে
তাহলে শোন্‌ বলি:
এক বামুন আর বামনীর পাঁচছেলে আর দুটি মেয়ে । ( ফ্যামিলি প্ল্যানিং তো আর ছিলনা সে সময়ে )তারা খুব পুজোআচ্চা করত । কিন্তু এত পুজো, বারব্রত করেও তাদের সব ছেলেমেয়েগুলো একে একে মরে গেল । তখন বামনীর ঠাকুরদেবতায় বিশ্বাস চলে গেল । তাদের আর সেই জায়গায় থাকতেও ভালো লাগল না । বামুন-বামনী ঠিক করল  সব ছেড়েছুড়ে তারা মনের দুঃখে কাশীবাসী হল । দশাশ্বমেধ ঘাটে স্নান করে অন্নপূর্ণার পুজো করে মণিকর্ণিকার ঘাটে বসে আছে , এমন সময় মা-ষষ্ঠী বুড়ি এক বামনীর বেশে এসে বললে " কি ভাবছ গো মা?" বামনী বললে " আমার সব ছেলেমেয়েদের হারিয়েছি । এত পুজোআচ্চা সব বিফলে গেল আমাদের । সব অদৃষ্ট। ঠাকুর দেবতা বলে কিছ্ছু নেই । "
ষষ্ঠীবুড়ি বললেন " বারব্রত নিষ্ফল হয়না মা, ধর্মকর্ম যাই কর ঈশ্বরে বিশ্বাস চাই । তুমি মা-ষষ্ঠীকে মানো? তাঁর পুজো করেছ কখনো?  তিনি সন্তানদের পালন করেন । বামনী বললে " আমি এযাবতকাল সব ষষ্ঠী করে আসছি কিন্তু তবুও আমার ছেলেরা র‌ইল না ।
ষষ্ঠীবুড়ি বললেন্" তুমি নীলষষ্ঠীর পুজো করেছ কখনো? চৈত্র সংক্রান্তির  আগের  দিন উপোস করে শিবের পুজো করবে । শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে জল খাবে । সন্তান্‌দের মঙ্গলকামনা করবে"
বামনী সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে  পুনরায় মাতৃত্ব লাভ করলে । নন্দী সব শুনে বললে" বাবা, এ তো তবে তোমার নিজের ব্র্যান্ড ক্রিয়েট করলে তুমি । আর সবষষ্ঠীর পুজোয়তো মাষষ্ঠীর পাল্লা ভারী হয়ে যাচ্ছিল তাতে যদি তোমার নামডাকে ভাটা পড়ে তাই বুঝি এমনটি কল্লে তুমি?"মহাবাবা বললেন " দেখ নন্দী, এখন যা যুগ এয়েচে তাতে নিজের ব্র্যান্ড যে মূল্যেই হোক ক্রিয়েট করতে হবে । নয়ত তুই স্থান পাবিনা জগতে , যা কম্পিটিটিভ মার্কেট এয়েচে! লাখলাখ দেবদেবীর ভিড়ে মহাদেবকে কেউ আর মানবেনা ।          
আর এবার সেজন্যেই একসঙ্গে এসেচি আমরা। বাসন্তী-অশোক ষষ্ঠীও থাক। নীলষষ্ঠীও থাক। মানুষ জানুক রসায়নের জারণ-বিজারণের মত, পদার্থবিদ্যার স্থিতি-গতির মত শিব-দুগ্গার স্মরণ-মনন যুগপত ঘটে।  

১১ এপ্রিল, ২০১৬

বাসন্তীপুজো এবং অথ অশোকষষ্ঠী কথা


মাদের দেশে শীতের শেষে চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে মাদুর্গার পুজোকে বাসন্তীপুজো বলে। শাস্ত্রে শরত ও বসন্ত এই দুই ঋতুকে বলা হয় "যমদংষ্ট্রা" অর্থাত এই দুই ঋতুতে মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধি ভোগ করে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। শরত এবং বসন্ত এই দুই ঋতুর আগমনেই ভারতবর্ষের মত গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী তাই আবির্ভূতা হন এই দুই সময়ে।
সূর্যের গতিপথে সূর্য ছয়মাস উত্তরদিকে ও ছয়মাস দক্ষিণদিকে গমন করে। উত্তরায়নের সময় দেবকুলের দিন আর দক্ষিনায়নে তাদের রাত্রি। 
 বসন্তকালেই দুর্গাপূজা নির্দ্দিষ্ট ছিল কারণ এই সময় সূর্যের উত্তরায়ণের ফলে দেবতারা জাগ্রত থাকেন। কিন্তু  শরতকাল হল সূর্যের দক্ষিণায়নের সময়। রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য এইসময় দেবতাগণকে জাগ্রত করে দুর্গাপূজা করেছিলেন। তাই রামচন্দ্র প্রবর্তিত শরতকালীন দুর্গাপুজোকে অকালবোধন বলা হয়।   
শস্যাধিষ্ঠাত্রী দেবীর আরেক নাম শাকম্ভরী।  একবার দুর্ভিক্ষের সময় দেবী দুর্গা তাঁর অর্থাত পৃথিবীর সমস্ত উত্পন্ন শাক দিয়ে জগত পালন করেছিলেন। শাককে এখানে সমস্ত প্রকার শস্যের প্রতিনিধি বলা হযেছে।  দেবী শাকম্ভরীর আরেক প্রকাশ হল অন্নপূর্ণা বা অন্নদা। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।  
পন্ডিতেরা আমাদের অন্নপূর্ণা ও দুর্গার সাথে মিশরের আইসিস ও গ্রীসের সিরিসের সাদৃশ্য খুঁজে পান। সিরিয়া, গ্রীস, সাইপ্রাস, এথেন্স ও ক্রীটে আমাদের দেশের মত শস্যদেবীর পূজা দেখা যায়। শরতকালে বাসন্তী বা দুর্গাপূজার মত পাশ্চাত্যে ইস্তারাদেবীর পূজা হয়। এই ইস্তারাদেবীর রূপটি অনেকাংশেই আমাদের দুর্গার মত। তিনিও সিংহারূঢ়া ও অসুর নিধনে মগ্ন। এই ইস্তারাদেবীর উত্সব সেখানে হয় বসন্তকালে ইষ্টারের সময়। মন্ডি থার্সডে , গুডফ্রাইডে, হোলি স্যাটারডে, ইষ্টার সানডে ও ইষ্টার মানডে এই পাঁচদিন ধরে আমাদের দুর্গাপুজোর মত উত্সব চলে।  


বাসন্তীপূজার দিন পশ্চিমবাংলার রীতি অশোক ষষ্ঠী পালনের। কি এবং কেন এই অশোক ষষ্ঠী?   




বহুযুগ আগে অশোকবনের মধ্যে এক ঋষির পর্ণকুটীর ছিল ।

একদিন সেই ঋষি স্নান সেরে ফেরার পথে অশোকগাছের নীচে এক সদ্য প্রসূতা কন্যাকে কাঁদতে দেখলেন । দৈবযোগে ধ্যানের মাধ্যমে ঋষি জানতে পারলেন কন্যাটি এক শাপভ্রষ্টা হরিণী মায়ের । ঋষি মেয়েটিকে আশ্রমে এনে লালন করতে লাগলেন । তার নাম দিলেন অশোকা । ঋষিকন্যা বড় হতে লাগল । যৌবনে উত্তীর্ণ হল  ।

এক রাজপুত্র মৃগয়ায় বেরিয়ে ঐ পরমাসুন্দরী অশোকাকে একদিন দেখতে পেয়ে তার পরিচয় জানতে পারলেন । ঋষিকন্যার সঙ্গে রাজপুত্রের কথোপকথনের মধ্যেই ঋষির আগমন হল সেই স্থানে । রাজপুত্র অশোকার পাণিপ্রার্থী হয়ে ঋষিকে অনুরোধ জানালে ঋষি যারপরনাই আনন্দিত হয়ে তাতে সম্মতি দিলেন ।

অশোকাকে রাজপুত্রের হাতে সঁপে দিয়ে ঋষি বললেন  :

" আজ থেকে তুমি রাজার ঘরণী হ'লে কন্যা । যদি কখনো বিপদে পড় আশ্রমে চলে এস । আর রাজপুরী থেকে চিনে একাএকা এই আশ্রমে যাতে আসতে পারো তাই এই অশোকফুলের বীজ তোমাকে দিলাম । এখন যাবার সময় এই বীজ ছড়াতে ছড়াতে যেও । পরে কখনো প্রয়োজন হলে এই বীজ থেকে উত্পন্ন অশোকগাছ বরাবর   চিনে পায়েহেঁটে তুমি চলে আসতে পারবে "

অশোকফুলের বীজ  সযত্নে আঁচলে বেঁধে নিয়ে অশোকা রাজপুত্রের সাথে পতিগৃহে যাত্রা করল । যাত্রাপথে বীজ ছড়াতে ছড়াতে চলল অশোকা । রাজপুরীতে পৌঁছালে রাজা-রাণী সস্নেহে তাদের বরণ করে ঘরে তুললেন । অশোকা আর রাজপুত্রের বাড়বাড়ন্ত সংসারে সুখের বন্যা । অশোকা ক্রমে সাত ছেলে ও এক মেয়ের মা হল । অশোকার শ্বশুর রাজামশাই মারা গেলেন শ্রাদ্ধের দিন অশোকষষ্ঠীর কথা বিস্মৃত হল অশোকা । ভাত মুখে দিয়েই মনে পড়ল ষষ্ঠীর কথা । রাতে শুয়ে পড়ল মনখারাপ নিয়ে । পরদিন ভোরে উঠে দেখল সাতছেলে-বৌ যার যার ঘরে মরে পড়ে আছে আশোকা তা দেখে ঋষির কথা ভাবলে । রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আশ্রম বরাবর চলতে লাগল ।

ততদিনে বীজ থেকে অশোকগাছ মহীরুহের আকার ধারণ করেছে । চৈত্রমাসে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে তার শাখাপ্রশাখা । ঋষির আশ্রমের কাছে এসেই  অশোকা ঋষিকে দেখে কেঁদে উঠলো । ঋষি ধ্যানের বলে সব অবগত ছিলেন । কন্যাকে সাথে করে রাজবাড়ী ফিরে গেলেন । কমন্ডুলু থেকে জল ছিটিয়ে  দিলেন  অশোকার মৃত ছেলে বৌ নাতিপুতির গায়ে  । দৈবগুণে সকলে চোখ মেলে চাইল ।

ঋষি বললেন অশোকষষ্টীর ব্রত পালন করলে  কখনো শোক প্রবেশ করবেনা সংসারে ।