৫ আগস্ট, ২০২২

চাকরী বিক্রি / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 রোজকার মতন দরজার কোণায় মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে থাকে লীলা। মুখে রা'টি কাড়ে না। গৃহকর্ত্রী পল্লবী চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে থেমে একসময় ক্লান্ত হয়ে যান। এই সময়টায় তাঁর অফিস যাবার তাড়া। যদিও একটু দেরীতে বেরোন তবুও এ হল অপ্সরা আবাসনের দু' নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে, চারতলার তিননম্বর ফ্ল্যাটের রোজনামচা। পল্লবীর অফিসের দেরী হয়ে যায়। লীলা কে কাজ বুঝিয়ে তবে চান সেরে খেয়েদেয়ে তাঁর বেরুনো। পুরনো লোক লীলা। তবুও রোজ কিছু না কিছু বলার থাকেই। আজ সিল্কের শাড়িটা ইজিতে ভিজিও কিম্বা দাদার শার্টে নীল দিও।কালকের জন্য পোস্ত টা বেটে ফ্রিজে তুলে রেখো অথবা মায়ের ফলটা চাপা দেওয়া আছে। মনে করে হাতে ধরিয়ে দিও এমন সব কেজো কথা।

তার আগে পল্লবীর অশোক কে টিফিন করে দেওয়া। আগেরদিনের লাঞ্চবক্স অধিকাংশ দিন পল্লবী কিম্বা অশোক কেই ধুয়ে নিতে হয়। এই নিয়ে অশোকের সঙ্গে বচসা হয়। সেটা আগেভাগে এসে লীলার ধোয়ার কথা। পল্লবীরা রান্নার লোক রাখেনা। লীলা পরের দিনের টা সব কেটে কুটে  ধুয়ে, মশলা বেটে রেখে দিয়ে যায়। পল্লবী সকালে রেঁধে বেড়ে গুছিয়ে রেখে অফিস যায়। 


- কতবার বলেছি, আরেকটা লাঞ্চবক্স অনলাইন কিনে ফেল। 

- রাখব কোথায় এত জিনিষ? ফ্ল্যাটবাড়িতে সীমিত জায়গায় আর অনলাইন জঞ্জাল বাড়িও না। 

- অফিস যাওয়ার আগে রোজরোজ এই লীলার আসার দেরী নিয়ে আমারো খিটিমিটি শুনতে ভালো লাগেনা। কোথায় আরাম করে ব্রেকফাস্ট খাব কাগজ পড়তে পড়তে তা নয়, রোজ একেবারে চিল চীত্কার করতে থাকো।  

পল্লবী বলে ওঠে, আমার বেরুনোর আগে ওকে সব বুঝিয়ে না গেলে পারবেন মা? ওকে ডিল করতে? 

- বোর্ডে লিখে রেখে যাও তবে। অশোক বলে। 

 - অত পারব না সকালবেলায়। লীলার‌ই বা এত জেদ কিসের্? আমরা কি মাইনে কম দি? কেন‌ই বা সে আসবে না টাইম মত? 

- জানোই তো, কবরডাঙার রাস্তার কি অবস্থা। আমি তো রোজ যাই ঐ পথে।  

- তাহলে? আমি কি করব বলতে পারো অশোক? 

-তবে এমনি চলবে নিত্যি ঝগড়া? লীলাও কাজ ছাড়বে না, টাইম মত আসবেও না আর তুমিও চেঁচিয়ে যাবে এভাবে? অন্য লোক দেখে লীলাকে তবে স্যাক কর ইমিডিয়েটলি। 

- বিশ্বস্ত লোক পাওয়া মুশকিল বুঝলে?  আমরা থাকিনা সারাদিন। মা কিছুই পারেন না। নিজের ঘরে ঢুকে শামুকের মত গুটিয়ে রাখেন নিজেকে। কতবার বলেছি, একটু বাইরের ঘরে বসে লীলাকে চালনা করলেও তো হয়। উনি পারবেন না। বিশ্বযুদ্ধ থেকে দেশীয় রাজনীতির খবরে ডুবে থাকেন যে কি এত বুঝিনা বাপু। সারাটা জীবন এভাবেই কারোর কাছ থেকে কোনো হেল্প পেলাম না। চাকরিটা যে কিভাবে টিকিয়ে রেখেছি আমি‌ই জানি শুধু।

অশোক আর কথা বাড়ায় না। পল্লবী নিজের কোর্টে বলটা নিয়ে চানঘরের দিকে পা বাড়ায়।   

লীলা কাজ শুরু করবে কি, রোজ এই সময়ে তার ফোন আসে। 

ঘরে পা দিতে না দিতেই তার ব্যাগের মধ্যে রাখা মোবাইল টা বেজে ওঠে। চার্চের প্রার্থনা সঙ্গীত। অর্গ্যান, পাইপ, বেল সমন্বিত গুরু গম্ভীর রিং টোন। সচারচর শোনা যায়না এমন গান। পল্লবীর মাথাটা রোজ গরম হয়ে যায় এটা শুনলে। এত দেরী করে এসে আবার ফোন বাজে কেন গো তোমার? লীলা কোনো উত্তর দেয়না। 

আরেকদিন পল্লবী বলেছিল এই সুরটা অসহ্য। হাটাও তো ছেলে কে বলে। 

তখন লীলা বলেছিল। এই দেখোনা, গ্রামের ঘর ঘর লোকের মোবাইলের রিং টোন ওরা সেদিন এসে সব বদলে দিয়ে গেছে। কার ছিল মা মনসার গান, কার ছিল হরেকেষ্ট কেত্তন একধার থেকে সেই সাহেবগুলো এসে বদল করে চার্চের ঘন্টা আর ওদের সব গান করে দিয়ে গেল।   

ততক্ষণে লীলা মুখে কুলুপ এঁটে কাজে মন দেয়। লীলার সংসারে তার দোজবরে স্বামী। প্রতিরাতে মদ চাই‌ই তার। তারপর হাতের পাঁচ সাট্টা কিম্বা জুয়ার নেশা। সেই কবে জানি লীলার শ্বশুরদের ক্রীশ্চান করে গেছিল অষ্ট্রেলিয়ার সাহেবরা এসে। তা বেশ বহু বছর আগের কথা। ওদের অভাবের গ্রামে সবাই ছিল খুব গরীব। সাহেবগুলো এসে পাখীপড়া করে বুঝিয়ে বুঝিয়ে একদিন গ্রামশুদ্ধ বেশ কয়েকঘর পরিবার কে যীশুর বাণী শুনিয়ে ধর্মান্তরিত করেই একপ্রকার ছেড়েছিল। হাতে বাইবেল ধরিয়ে দিয়ে ওরা বলেছিল কাজ দেবে।  ছেলেপুলেদের ইংরেজী মিডিয়াম ইশকুলে ফ্রি তে পড়ার সুযোগ করে দেবে। 

পল্লবীর শাশুড়ি সেই শুনে বলেছিলেন, কাজ দিয়েছিল তোদের? 

কি জানি? আমার শ্বশুর ওদের গির্জায় মালীর কাজ করত শুনেছি। গ্রামের বাচ্ছাগুলোকে ইংরেজী ইশকুলে ভর্তি টা এখনও করে দেয় অবিশ্যি, সেটা চোখের সামনে দেখা। রুটি বেলতে বেলতে বলেছিল লীলা। আমার নাতিটাও পড়ে ইংরেজী ইশকুলে। 

সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোত আমাদের গ্রামের সবার। একদিন কুড়িহাজার টাকার ফাঁদে ফেলে নিজেদের ধম্মো গছিয়ে দিয়ে তবে সহেবগুলোর শান্তি হল। 

তারপর? চাকরী? 

লীলা বলেছিল, চাকরীবাকরী কি গাছে ফলে মা? গ্রামের সবাই রবিবার করে চার্চে যাওয়া শিখল, গোরু শুয়োর খাওয়া থেকে বড়দিনে কেক, নিউইয়ার সব শিখে গেল। আমার শাশুড়ি তবুও ঘরের মধ্যে কুলুঙ্গীতে রাখা রাধাকৃষ্ণর ছবিতে ফুল জল দিত, দেখেছি। গ্রামের দুর্গাপুজোতেও চুপিচুপি দু-চারটাকা দিয়ে ভোগ নিয়ে ঘরে এসে খাই। এত দিনের সংস্কার, কি করে ভুলি বলত মা? আমরা সরস্বতীপুজোতেও অঞ্জলি দিয়ে আসি। কালীপুজোতেও নাতি কে বাজি কিনে দি। গ্রামের মুসলমানরাও তাই করত। তবে ওদের আড়ালে ঘরে বসে আজান দিলেও ভুলেও ওরা শুয়োরের মাংস ছুঁতো না।  

আচ্ছা মা, বল দিকিনি? আমরা পয়সার জন্য ধম্মো বিক্কিরি করেছি বলে কোনো স্বাধীনতা থাকবে না আমাদের ? আমার বর বলে, না, থাকবে না। কেনা গোলাম হয়ে থাকতে হবে। ওরা আমাদের টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছে না? তাই। 

সেই কবে আমার শ্বশুর কে মাত্র কুড়ি হাজার টাকা দিয়েছিল, সেই টাকায় এতগুলো বালবাচ্ছা, এতগুলো পেট। আমরা মুখ্যু তো কি বুঝিনা যেন। 


সেদিন পল্লবীর অফিসের ছুটি। একটু নিরিবিলিতে কথা না বললে আর যেন চলছে না তার। পল্লবীকে ডাক দেয় লীলা। বৌদি আরো ক'টা হ্যাঙার এনো। দাদার শার্টগুলোয়... বলেই চেঁচিয়ে ওঠে, উজালা ফুরিয়েছে। অনেকদিন বলেছি। আর শোনো ঐ কি যেন শাড়িতে মাড় দেওয়ার ঐ পাওডারটাও এনো মনে করে। 

হঠাত মায়া হয় তার লীলার জন্য।  

ছাদে গিয়ে লীলার কাচা কাপড়গুলো টেনেটুনে ঠিক করতে করতে পল্লবী বলে ওঠে, কেন আসছ না গো একটু সকাল সকাল? রোজরোজ বলি তবুও...আমারো ভাল্লাগে না এসব নিয়ে একঘেয়ে কচকচানি।  যখন তোমার টাকার দরকার হয় আমি দি‌ই কিনা? সুবিধে অসুবিধেয় ছুটি? তাও দি‌ই, তবুও...লীলা কাপড়গুলো দড়িতে মেলে, ক্লিপ দেয় পরম যত্নে। তারপরেই ছাদের ওপর বসে পড়ে রোদের মধ্যে। শীতকালে আর রোদে বসার ফুরসত ক‌ই তার? পল্লবীও ভাবে আহা, বসুক একটু। তবে লীলা আজ রোদে বসেছে সব খোলসা করে বৌদিকে বলবে বলে।  

 তার‌ও রোজরোজ ভালো লাগছে না কাজে আসামাত্তর এত ঝগড়াঝাটি। 

- হ্যাগো, তোমার বরের কাজটা হল শেষমেশ? পল্লবী বলে ওঠে। আর ছেলের সেই কাজটা করছে এখনো?

- বর সেই কাজটা বিক্কিরি করে দিয়েছে গো বৌদি। আমাদের পাড়ার আরেকটা লোক বহুদিন কাজ কাজ করছিল।  

- কাজ বিক্কিরি?

- আমার বর বলে তুমি খাটছ, ছেলে কাজ করছে, আমি আর কি করব কাজ করে? তাই যার কাজের দরকার তাকে...

- মানে? অবাক হয় পল্লবী।

- এই দালালির ব্যবসাই তো করে আমার বর টা। খিষ্টান সাহেবদের দেওয়া শ্বশুরের মালির চাকরিটা শ্বশুর মারা যাবার পর ও কিছুদিন কাজ করেই তো বিক্কিরি করে দিল আরেকজন কে।  তারপর কিছুদিন বাড়িতে মাছ, মাংস, কাপড়চোপড়, বড়দিনে ঘর রং সব হল তাই দিয়ে। মদের আড্ডায় হাঁস, মুরগি পোড়ানো হল। দিনকয়েক ফূর্তির পরেই পকেটে টান পড়তেই আবার কাজ জুটিয়ে নিল সে। ক'দিন করতে না করতেই সেই চাকরিটাও বিক্কিরি করে দিল আরেকজন কে। সেটা ভালো কাজ ছিল গো বৌদি। অনেকবার বলেছিলুম আমরা। ছেড়ো না। কাজের মধ্যে থাকো। শরীর ভালো থাকবে।  কাজ না থাকলেই তো বদমায়েসি সব বুদ্ধিশুদ্ধি মাথায় ভর করে তার। সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি ছিল । আবার বেচে দিল সে।

পল্লবী বলল, এই যে বারেবারে চাকরিগুলো বিক্রি করে দেয় তাতে তার লাভ কি লীলা? 

মাস মাইনে তো কম গো বৌদি। বিক্রি করলে মাস মাইনের ছ' গুণ এককালীন পাবে। কাজ না করে বসে বসে টাকা পেতে কার না ভলো লাগে বল? কুঁড়ের মরণ আমার বর টা। মাথায় যত দুষ্টু বুদ্ধি। তাও টাকাগুলো ব্যাংকে বা পোস্টাপিসে ফিক্স করে রাখলেও হত। তাও রাখবে না।  আর কতদিন আমি কাজ করতে পারব বল তো বৌদি?  

কথায় কথায় খেঁই হারিয়ে যায় পল্লবীর। লীলার বরের চাকরি রহস্য শুনে আপাদমস্তক জ্বলে যায় তার। আবার মায়াও হয় লীলার জন্যে। মনে মনে ভাবে নিজের ধর্ম কে বিক্রি করেছে যার বাবা সে তো এমন হতেই পারে। গোড়াতেই গলদ যে। পল্লবীর সঙ্গে সেদিনের মত কথাবার্তায় ছেদ পড়ে যায়।  

আবারো ঘরে ঢুকে পল্লবীর মনে পড়ে, আচ্ছা লীলার বর চাকরি বিক্রি করছে বারেবারে তার সঙ্গে লীলার রোজ রোজ কাজে দেরী করে আসার কি সম্পর্ক হতে পারে? নিকুচি করেছে। যত্তসব। মাথায় ঢোকেনা তার। নিজের ঘরে ল্যাপটপ খুলে বসেছে পল্লবী। অফিসের কিছু কাজ বাকী আছে। আজ সারতেই হবে তাকে। তার আগে চাকরি বিক্রির এই অভিনব গল্প টা সংক্ষেপে হোয়াটস্যাপ করে দেয় অশোক কে। হাসিও পায়, কান্নাও আসে। 

অশোক টাইপ করে, 

- ওমা এই কদিন আগেই কাগজে পড়লে না? একটা লোক দু'জায়গায় সারাজীবন চাকরী বজায় রেখে মাইনে নিত। কতদিন বাদে ধরা পড়ে কেস খেল।   

পল্লবী বলে,  কি বুদ্ধি এদের! এরা পড়াশুনো করলে দেখিয়ে দিত। 

এবার হোয়াটস্যাপ বন্ধ। পল্লবীকে অফিসের কাজ সারতেই হবে।  

লীলার ঘরমোছার বালতিতে সিট্রোনেলার গন্ধে পল্লবীর হুঁশ হয়। টেবিলের নীচটা মুছবে লীলা। রোজ সে বাড়ি থাকেনা। দেখতেও পায়না। কি যে মোছে লীলাই জানে। সরে এসে দাঁড়ায় পল্লবী। আবারো সেই পুরনো কিসস্যা। 

- কাল থেকে তবে একটু তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু, বুঝেছ? 

ঘর মুছতে মুছতে এবার লীলা বলে, 

- তুমি বরং অন্য লোক দেখে নাও বৌদি। আমার এমনি হবে।

পল্লবী ভাবে, এতদিনের লোক লীলা, আজ এমন বলছে কেন? লীলা কে ছাড়া ভাবতেই পারেনা সে কিছু। ঘরের সব কাজগুলো গুছিয়ে করে রেখে যায় তো। এইজন্যেই বুঝি মা বলেন, স্যাকরার ঠুকঠাক ভালো, কামারের এক ঘায়ের চেয়ে। সে কি তবে আজ একটু বেশীই কথা বলে ফেলল লীলার সঙ্গে?  

অমনি সে বলে, 

- এখন পৌষমাস। এখন লোক ছাড়াই না আমরা। ওহ্! তুমি আবার এসব জানবে কি করে? হিন্দুধর্মের আগা-পাশ-তলা সর্বস্ব তো বেচে দিয়েছ জন্মের মত? 

লীলা বলে 

- আমায় বোল না এসব বউদি। তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি হিন্দুর মেয়ে, এসব এখনও মানি। বিজয়ায় তোমাদের পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করি।  

পল্লবী বলে 

- ঠিক আছে, ঠিক আছে। কাজ শেষ কর তো। আমি কাজ নিয়ে বসব এবার। 

ঘর মুছতে মুছতে লীলা বলে, 

- মাঘমাসেই দেখে নাও তবে লোক। যে তোমার টাইমে আসবে।

পল্লবী আর কথা বাড়ায় না। বাকী কথাগুলো লীলাই বলে চলে নিজের মনে, একনাগাড়ে। তোমাদের তো লোক নাহলে চলবে না। আমার এই কাজ টা না হলেও চলে যাবে। ইশকুলের চাকরি টা আমার পাকা। 

পল্লবী শুনে চলে সেসব। 

- ইশকুল? 

- হ্যাঁ, আমি আমাদের গ্রামের ইশকুলে মিড ডে মিলে বহুদিন রান্না করি। সেখানে চাকরী টা বজায় রাখতে সকালবেলায় হাজিরা দিয়ে, খাতায় নাম স‌ই করে, রান্নার জোগাড়টা দিয়ে তবেই তোমার এখানে কাজে আসি। 

- তবে ইশকুলের রান্না কে করে? পল্লবী বলে 

- আমার হয়ে আরেকজন গিয়ে বেলায় করে। তাকে আমি আদ্দেক মাইনে দিয়ে দিই। সেইজন্যেই তো তোমাদের বাড়ি আসতে আমার দেরী হয়ে যায় বুঝেছ? দুটো চাকরি না করলে এই আগুণ বাজারে সংসারটা কি করে চালাব বলতে পারো?

অফিসের কাজ মাথায় উঠল পল্লবীর । তার আকাশবাতাসে তখন একটাই কথা, চাকরি বিক্কিরি, ধর্ম বিক্কিরি, মিড ডে মিলের চাকরি এইসব আর কি!  

হঠাত অশোকের নাম ফুটে ওঠে তার মোবাইলে।  রিং টোনে সেই পছন্দের গান। অঞ্জন দত্ত মিহি সুরে বলে চলেন, চাকরী টা আমি পেয়ে গেছি, বেলা শুনছ? 

ফোনটা কেটে দেয় পল্লবী। আবার চাকরী? 

( যুগশংখ রবিবারের বৈঠক এ প্রকাশিত) 

১৫ মে, ২০২২

বাংলার লৌকিক দেবদেবী / গন্ধেশ্বরী

কলকাতায় গন্ধেশ্বরী পুজো / সূত্র ইন্টারনেট 

 বুদ্ধ পূর্ণিমা আসে যায়। কিন্তু এই দিনে গন্ধেশ্বরীর পুজো হয় তা জানতাম না। বাঁকুড়ায় 
গন্ধেশ্বরী নদী আছে জানতাম। সেখানে গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের খুব রমরমা। তাঁরা গন্ধদ্রব্যের ব্যাবসা করেন। কিন্তু বাকীটুকু মানে পুরাণকথা অজানা ছিল। ব্রতপিডিয়া-২ তে বাংলার লৌকিক দেব দেবী নিয়ে লিখতে গিয়ে জানলাম এতসব। 

গন্ধবণিক সম্প্রদায় গন্ধেশ্বরী পুজোর দিন তাঁদের হিসেব খাতা এবং ওজন পরিমাপের যন্ত্র দেবীর সামনে সাজিয়ে রাখেন।সারা বছরের বিভিন্ন সুগন্ধি প্রসাধনী, ধূপ, দেশবিদেশের মশলাপাতির কারবারে যাতে সমৃদ্ধি হয় । ধনপতি, শ্রীমন্ত, চাঁদসওদাগরের সময় থেকেই বাংলায় বাণিজ্যে খ্যাতি অর্জন করেছে এই গন্ধবণিক সম্প্রদায়। বৌদ্ধ ধার্মালম্বীরাও এই পুজো পালন করে থাকেন। বাংলাদেশের পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে, অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর সঙ্গে গন্ধেশ্বরীরও একটি মূর্তি আছে। 


বেদব্যাস রচিত, মহানন্দীশ্বর পুরাণে গন্ধেশ্বরীর একটি আখ্যান আছে। 

গন্ধাসুর নামে এক দানব সমগ্র বণিককুলের ওপর যাকে বলে ক্ষেপে ব্যোম একেবারে। তার এমন বেনে-বিদ্বেষী হয়ে ওঠার মূলে তার বাবা সুভুতি। তাই সে প্রতিজ্ঞা করেছিল বেনে সম্প্রদায়ের শেষ রাখবেনা। প্রবল তপস্যায় শিবকে সন্তুষ্ট করে বর পেয়ে যারপরনাই বলবান হয়ে উঠল সে।

সুভুতি মোটেও সুবিধের ছিলনা। নিজের বউ থাকতেও সে বেনেবাড়ির মেয়ে সুরূপাকে হরণ করতে গেল কিন্তু ধরা পড়ে গিয়ে মারধর খেয়ে চূড়ান্ত বিড়ম্বনার স্বীকার হল। বাবার এই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই গন্ধাসুর উগ্রচণ্ডা।  

একদিন গন্ধাসুরের নির্দেশে তার সঙ্গোপাঙ্গরা সুবর্ণবট নামে এক গোবেচারা বেনেবাড়িতে হানা দিয়ে সুবর্ণকে তো হত্যা করলই, সেইসঙ্গে তার বউ চন্দ্রাবতীকেও হত্যার জন্য উদ্যত হল। তখন চন্দ্রাবতী পূর্ণগর্ভা। বেনেবংশ ধ্বংস হবে সেই আশায়। 

বাড়িতে অসুরদের হানায় চন্দ্রাবতী তার গর্ভস্থ সন্তানটিকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হল। সে খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে এক গহীন অরণ্যে গিয়ে প্রবেশ করল। ছুটছিল সেই আসন্নপ্রসবা গর্ভের সন্তান নিয়ে। 

অতঃপর তলপেটের অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বুনো ঘাসের ওপর শয্যা নিল। কিছুক্ষণ পর সেই অসহ্য যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তার একটি ফুটফুটে কন্যা জন্মাল। কিন্তু প্রসবের পরিশ্রমে চন্দ্রাবতীর মৃত্যু হল। 


ঋষি কশ্যপের তপোবন ছিল অনতিদূরেই।   

ধ্যানযোগে দেবী মহামায়ার আদেশ পেয়েছেন কশ্যপ। জানলেন, দেবী বসুন্ধরা সেই অরণ্যে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। জন্মলগ্নেই মাতৃহীনা পিতৃহীনা এই অভাগিনীকে আশ্রমে এনে কশ্যপ যেন নিজকন্যার মতো লালনপালন করেন, তেমনি আদেশ দেবীর। তপোবন ছেড়ে ঋষি জঙ্গলের মধ্যে গেলেন সেই সদ্যোজাতা কে আশ্রমে এনে প্রতিপালন করবেন বলে। 

তপোবন থেকে বেরোতেই আচমকা এক দিব্য সুগন্ধ ঋষিকে চরম আকৃষ্ট করল। সেই সুগন্ধ যেন সমগ্র অরণ্যকে আমোদিত করে রেখেছে। ঋষিকেও টেনে নিয়ে গেল সেই উৎসের দিকে। 


নাড়ী বন্ধন ছিন্ন অপূর্ব, নিষ্পাপ কন্যা তখন মৃত মায়ের পাশে খেলা করছে। মুগ্ধ কশ্যপ তাকে আদরে কোলে তুলে নিতেই কন্যার শরীর থেকেই যে সেই সুগন্ধ আসছিল, বুঝলেন!


আশ্রমিকরা চন্দ্রাবতীর সৎকার করল। কন্যাটি আশ্রমজীবন শুরু হল। সুগন্ধার দেহটি মন মাতানো গন্ধের আকর । তাই ঋষি তার নাম দিলেন গন্ধবতী। 

ঋষির বাৎসল্য ও শিক্ষাদীক্ষায় গন্ধবতী ধীরে ধীরে একদিন শৈশব পেরিয়ে যৌবনে পা দিল। রূপেগুণে, লাবণ্যে দশদিক আলো করল।

ঋষি তাকে জানালেন তার জন্মদাতা পিতা-মাতার মৃত্যুর নৃশংস কারণ। অসুরদের সেই নৃশংসতা জেনে গন্ধবতীর বুকেও ভয়ানক প্রতিশোধস্পৃহা জন্মালো। তপোবনের মধ্যে যজ্ঞাগ্নি জ্বেলে সে এক কঠোর তপস্যায় রত  হল।

ওদিকে গন্ধাসুরের অত্যাচারে বেনে সম্প্রদায় অতিষ্ঠ হয়ে প্রায় শেষ হতে বসেছে। তাদের ত্রাহি আর্তরবে দেবতাদের দোরে হত্যে দিয়ে নিত্যই চলছে উদ্ধারের উপায়। ঠিক তখনই গন্ধাসুরের কানে গেল অসামান্যা গন্ধবতীর অঙ্গসৌরভ ও অপরূপ সৌন্দর্যের কথা। 


সে তখন আকুল হয়ে গন্ধবতী কে খুঁজতে খুঁজতে ঋষি কশ্যপের আশ্রমে এসে দাঁড়ালো। 

ধ্যানমগ্ন গন্ধবতীকে নিজের চোখে দেখেই সে বাকরহিত। কিন্তু গন্ধবতীর ধ্যান ভাঙল না। 


অধৈর্য গন্ধাসুর বারবার ব্যর্থ হতেহতে তার ক্ষমতাপ্রদর্শনে ব্যস্ত হল। টেনে হিঁচড়ে তাকে নিয়ে যাবার জন্য তেড়ে গিয়ে গন্ধবতীর চুলের মুঠি ধরল বটে কিন্তু গন্ধবতীকে একচুল নড়াতে পারল না। গন্ধবতী তখনও অটল ধ্যানে। ধূমায়িত হয়ে উঠল তার যজ্ঞকুণ্ড। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল সমস্ত চরাচর।তা দেখে ভয় পেল অসুরকুল। গন্ধবতীর কেশ ছেড়ে গন্ধাসুর হতচকিত হয়ে দূরে গিয়ে দাঁড়াল।

তখন যজ্ঞকুণ্ডের ধোঁয়া ভেদ করে সিংহের পিঠে চড়ে এক জ্যোতির্ময়ী চতুর্ভুজা দেবীর আবির্ভাব হল। 


গন্ধবতীর ধ্যানভঙ্গ হল। সম্মুখে আবির্ভুতা দেবীকে সে প্রণাম করে বন্দনা করতেই দেবী তাকে অভয় দিয়ে ক্রুদ্ধনয়নে  তাকালেন গন্ধাসুরের দিকে। বিশালাকায় গন্ধাসুর প্রচণ্ড হুঙ্কারে দেবীকে আক্রমণ করল। শুরু হল ঘোরতর যুদ্ধ। ত্রিভুবন কেঁপে উঠল। অসুরেরা ভয়ে লুকিয়ে পড়ল। সমগ্র বণিক সম্প্রদায় গন্ধাসুরের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে করজোড়ে দেবীর নিকট প্রার্থনা জানালেন। 


তুমুল যুদ্ধের শেষে অপরাজেয় দেবীর ত্রিশূলে বিদ্ধ হয়ে অচিরেই দুরাচারী গন্ধাসুরের মৃত্যু হল। দিনটা ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা।  


গন্ধাসুরকে বধ করে জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠার কারণে আদ্যাশক্তি দুর্গার নতুন অবতার 'গন্ধেশ্বরী' খ্যাত হলেন বণিক সম্প্রদায়ের কাছে। 

দেবীর ইচ্ছায় সমুদ্রে পতিত গন্ধাসুরের বিশাল মৃতদেহ পরিণত হল একটি বিশাল দ্বীপে। যেখানে উদ্ভূত হল মশলা ও সুগন্ধদায়ী বৃক্ষ-লতা-বিটপী । দেবী সেই দ্বীপের নাম দিলেন, গন্ধদ্বীপ। বেনে-সম্প্রদায়ের একটি গোষ্ঠীকে দেবী এই দ্বীপ থেকে গন্ধদ্রব্য আহরণ করে বাণিজ্যের অধিকার দিয়ে তাদের নাম দিলেন 'গন্ধবণিক'।


প্রাচীনকালে বণিকরা ময়ূরপঙ্খী ভাসিয়ে আড়ম্বরপূর্ণ বাণিজ্যযাত্রায় যেতেন। পথে ঝড়বৃষ্টি, দুর্যোগ ছাড়াও জলদস্যু ও বন্য জীবজন্তুর ভয় ছিল। এই সবের থেকে মা গন্ধেশ্বরী তাঁদের রক্ষা করবেন, এই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় গন্ধেশ্বরীর পুজো।

সিংহবাহিনী, অসুরদলনী, শঙ্খ, চক্র, ধনুর্বান ধারী গন্ধেশ্বরী অনেকটাই জগদ্ধাত্রীর মতই। 



















২২ মার্চ, ২০২২

রসনামঙ্গল / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 রসনামঙ্গল বইটি রান্নাবান্নার রেসিপি ছাড়াও আরও অনেককিছু। সংগ্রহ করতে রা প্রকাশনার ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করতে হবে। 


বাংলার ব্রত, পার্বণের পুরাণভিত্তিক লোকগাথার ১ম খণ্ড ব্রতপিডিয়া

বইটি পাওয়া যাবে কলিকাতা লেটারপ্রেসের কলেজস্ট্রীট দফতরে। প্রকাশক - পলাশ বর্মণ । যোগাযোগের নাম্বার+91 7439791511, 9831402331 (whatsapp)  


১৪ ফেব, ২০২২

আমার প্রথম ভ্যালেন্টাইন / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়




এই তো সেদিন তার সাথে কফিহাউজের 
দুধসাদা টেবিল লিনেনে হাত রেখে। 
এই তো সেদিন ট্রামের সিটে... 
মিউজিয়ামের করিডোরে। বইমেলার চাঁদের হাটে। 
ল্যাবের প্রতিটি দরজা, কাচ সর্বস্বতা ছুঁয়ে, 
দিব্যি দিয়ে। ছিল তবু সে আমার হয়ে। হাত ধরে। 
 
আমার ইগো, পাগলামি, পাপপুণ্যের ফিরিস্তি, 
ধোপা-কাগজওয়ালার হিসেব থেকে শুরু করে সব কিছুই 
আমাপা দিয়েছিলাম তাকে উপুড় করে ।  

অস্পষ্ট কৈশোরের আবছায়ায় এসেছিল না একদিন? 
পাগলের মত নীল খুঁজে চলেছিলাম তখন কপার সালফেটে
বিষ ভেবে নয়। ফুল ভেবে। 
সবুজ খুঁজে চলেছি তখন হিরাকষের ক্রিস্টালে। 
রঙের মোহে, তার চিকন স্ফটিকে। 
নিউমার্কেটে হাতড়ে মরছি নিকেল সালফেট রঙা শাড়ি। 
প্যারামাউন্টের শরবতে খুঁজছি পার্কিন সাহেব কে। 
আলাদা আলাদা ফ্রুটি স্মেল চিনছি কুলে, কলায়... 
পচা আমণ্ড বাদামের তেতো গন্ধ? সেও তো তার জন্যেই। 
সুগন্ধি মাথা ধরার বাম? উইন্টার গ্রিন তেলের? 
তাও আমার বাঁহাতের খেল তখন। 
আমি সবই দিয়েছিলাম তাকে উজাড় করে। তবু সে আর আমার রইল কই? 
মঙ্গলকাব্য সে রঙ চেনে না। ম্যাজিক রিয়ালিজম সেই মজা বোঝে না। 
সাইফাই গল্প? সে তো সেসব সূক্ষ্ম গন্ধও পায়না। 
সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর ধুলোপড়া জার্নালে খুঁজেলে হয়ত পাবে তারা।  
কফিহাউসের নিঃস্ব টেবিলেও 
কিন্তু আমায় তো আর পাবেনা সে। 
যদিও সে ই ছিল আমার প্রথম ভ্যালেন্টাইন। 





 


৫ ফেব, ২০২২

একলা একলা গোটাসেদ্ধ

 মা, আমি এই প্রথম না গতবারেও একাহাতে সব বাজার করে গোটাসেদ্ধ করেছিলাম। তুমি তখন বিছানায় পড়ে।বারব্রত, স্ত্রীআচার, বিচার কিছুতেই হুঁশ ছিলনা। তবুও ছিলে একপাশটায় পড়ে। এবছর আমি আরও একা। তবুও সব মেনেছি মা। ঠিক যেমনটি শিখেছি তোমার কাছে। সব পেলেছি একাহাতে ঠিক যেমনটি এবাড়ির আচারবিচার। আমি বেছে বেছে ছোটো ছোটো গোল আলু, লাল আলু, শিম, কড়াইশুঁটি, কুলি বেগুণ সব এনেছি মা। একটার গায়েও দাগ নেই। বেঁকা ট্যারা নয়। তোবড়ানো বা ঠসকে যাওয়া নয় কেউ। সবুজ গোটা মুগ আনিয়েছি মা। সঙ্গে টকটকে লাল বড়বড় শুকনো লঙ্কা। ঠিক যেমন তুমি বলতে। নতুন সরষের তেলের প্যাকেট কেটেছি দিন কয়েক আগেই। নুনও তাই। অত তুমি মানতে না। বলতে সংসারের জিনিষই তো মা ষষ্ঠীর। এঁটোকাঁটা আবার কী? তোমার নিষ্ঠা ছিল কিন্তু ছুতমার্গ ছিলনা একদম। সেটাই আমার ভালো লাগত বড়। 

মা আমি পঞ্চমী তিথি না পেরোতেই গোটা সেদ্ধ, আতপচালের ভাত আর সজনে ফুল ছড়ানো কুলের অম্বল রেঁধে নিয়েছি। আমি ভাতের মধ্যে দুটো গোটা আলু সেদ্ধও দিয়েছি মনে করে। তুমি বলতে একটা তোমার ছেলের জন্য আরেকটা আমার ছেলের। রাতে শোওয়ার আগে ঠাণ্ডা ভাতে আজ জল ঢেলে দেব মনে করে ঠিক। তুমি তো নেই মনে করিয়ে দেবার তাই মনে রেখেছি গতবারের মত। কুলের অম্বলে সর্ষে ফোড়ন ভুলিনি মা। এবার সজনেফুলগুলো বাছতে হয়নি মা। কলেজ থেকে দিয়ে গেছে একদম জুঁইফুলের চেয়েও সাদা। গতকালের বৃষ্টিতে এক্কেবারে তাজা। আমি গোটাসেদ্ধর একটা আনাজ কিম্বা ডাল হাতায় করে টিপে দেখিনি মা। তুমি বকুনি দিতে। মনে আছে। বলতে ওগুলো আজ মা ষষ্ঠীর ছানা। টিপে মেরে ফেলবে না। ঢাকাচাপা দিয়ে রেখে দাও সারারাত। কাল দেখবে কেমন ন্যায়দম খেয়েছে। মুখ থেকে পাছে থুতু পড়ে তাই আমি কথা বলিনি মা, গোটাসেদ্ধ করতে গিয়ে। 

ও হ্যাঁ, মিষ্টি দই এনেছি মা। কাল ষষ্ঠীর শেষপাতের জন্য। মনে করে। সব ঠাণ্ডা। সব ঠান্ডাঠুন্ডি করলে এই ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীর খারাপ হবেনা। গোটাসেদ্ধ দিয়ে পান্তা খেয়েই তুমি ছটফট করতে সেদিন দুপুরঘুমের জন্য। শেষবার মানে ২০২০ তে আমি যাব বইমেলায়। তুমি বললে, এই চলল মেয়ে আবার। কোথায় পান্তা খেয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে জম্পেশ ঘুম দেবে তা না। মনে পড়ছে সব। মনে আছে সব। ভুলতে তো পারছিই না আমি। কাল ভোরে আবার কনকনে ঠাণ্ডায় শিলনোড়া চান করিয়ে তেল, হলুদ, সিঁদুর জল...ভেজা গামছা গায়ে শিল... তাঁর কোলের কাছে জোড়া শিম, কড়াইশুঁটি... সব করতে পারি এখন একা একা। আমার একলা ঘরে। 

তবে আমি কিন্তু আমার ছেলে, বৌ দুজনের জন্যেই ষষ্ঠীর পয়সা তুলে রাখি কৌটোয়। দুর্গাষষ্ঠীতে একসঙ্গে সব ষষ্ঠীর পুজো দেব বলে। তুমি কিন্তু শুধু তোমার ছেলের মাথায় কয়েন ঠেকিয়ে কৌটোবন্দী করতে। আমার তাই দেখে খুব অভিমান হত মা। তুমি বলেছিলে সেবার "তোমার জন্য তোমার মা আছে"। বুক ফেটে গেছিল আমার সেদিন।    

১৩ জানু, ২০২২

ধাপধাড়া গোবিন্দপুর টা ঠিক কোথায়?

ধাপধাড়া গোবিন্দপুর টা ঠিক কোথায়? 

ধাপধাড়া বা ধ্যাধধেড়ে সে যাইহোক না কেন বাংলা সাহিত্যে গোবিন্দপুর জায়গাটির পেছনে এমন বিশেষণ বসে সেই স্থানকে অখ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বহুকাল আগে থেকেই। এমন কী ঠাকুমা, দিদিমার মুখে কোনও জ্ঞাতির বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে যাবার অনীহা প্রকাশেও ব্যাঙ্গার্থে এই শব্দবন্ধের প্রয়োগ হতে দেখেছি। বিশেষ করে বিয়ের কনে দেখতে গিয়ে পাত্রপক্ষের যেন পাত্রীপক্ষের সেই পিত্রালয়ের অক্ষাংশ - দ্রাঘিমাংশ কে হেয় না করলেই নয়। অথচ তাঁরা জেনে বুঝেই যাচ্ছেন সেখানে। প্রত্যন্ত শহরতলী বা অচেনা, অনামা কোনও জায়গায় যাবার আগে আমরা আর এখন এসব বলিনা কারণ এখন আমাদের হাতের মুঠোয় গুগল ম্যাপ আছে দিশা দেখানোর জন্য। 

আমাদেরই এই কোলকাতার অন্যতম একটি গ্রাম ছিল এই গঙ্গার ধারের গোবিন্দপুর। এখনকার বউবাজারের আশপাশের অঞ্চলই সেসময়ের গোবিন্দপুর। সেখান থেকে একটা খাল প্রবাহিত ছিল অধুনা ইস্টার্ন মেট্রোপ্লিটান বাইপাসের পাশে ধাপা অবধি। এই খাল ধাপার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যুক্ত ছিল বিদ্যেধরী নদীর সঙ্গে। আজকের বাইপাসে চিংড়িহাটা অঞ্চলে এই খালটির পাশে ধাড়া (একরকম ট্যাক্স) আদায় করার জন্য জমিদারের পেয়াদা পাহারায় থাকত। সব বাণিজ্য নৌকোকেই এই অঞ্চলের ক্যানাল দিয়ে যাওয়ার সময় এই ট্যাক্স দিত।

এ স্থান ছিল সেসময় বেশ দুর্গম, তাই ক্রমে ধাপধাড়া গোবিন্দপুর হয়ে ওঠে পাণ্ডববর্জিত জায়গা। 

আজ যেখানে উত্তর কলকাতার ক্রিক রো, সেখান দিয়েই বয়ে গেছিল এই খাল। ক্রিক শব্দের অর্থ হল সংকীর্ণ নদী বা খাল। তখন বিদ্যেধরী বড় নদী ছিল। মাতলা নদীতে গিয়ে পড়ত। কালে কালে তা মজে গেছে। বর্তমানের দ্রুত শহরায়নের ফলে এসব রাস্তাঘাট ভরাট হতে হতে আগেকার সেই প্রত্যন্ত জায়গা বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে ঠিকই কিন্তু সে যুগে মানুষ সেসব জায়গায় যেতে বেশ ভাবনাচিন্তা করত। আজ হয়ত আমরা তুমুল শহরায়নের সামিল হয়ে জল জঙ্গলের বিপদসংকুল কোলকাতা কে ভুলেছি কিন্তু এই শব্দবন্ধ আজও মনে করায় পুরনো কলকাতা কে। 


৭ জানু, ২০২২

রম্যরূপেণ সংস্থিতা / বই আলোচনা করলেন রীতা ঘোষ


অতিমারীর এই ভয়ানক সময়ে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের রম্যরূপেণ সংস্থিতা মনকে ভারী আরাম দিল। লেখিকা অত্যন্ত সহজ ভাষায় ও সূক্ষ্ম কৌতুকের ছোঁয়ায় আমাদের প্রতিদিনের নানা রকমের ঘটনাকে মেলে ধরেছেন।  অতি সাধারণ ঘটনাও অসাধারণ হয়ে গিয়েছে লেখিকার কলমের জোরে। সকাল থেকে রাত অবধি কত অভিজ্ঞতাই না আমরা সঞ্চয় করে থাকি, কিন্তু সেই ঘটনাগুলিকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপনা করা ক' জনই বা পেরে থাকেন? শুধুমাত্র রচনা বা গল্প নয়, বইয়ের প্রতিটি রম্যগল্পের শিরোনামগুলি খুবই আকর্ষণীয়। শিরোনাম দেখেই মূল গল্পটি পড়তে ইচ্ছে করে।  

জগাদা covid  সিরিজ, কিংবা ঘটি ভার্সেস বাঙাল জ্যাঠামশাই, শিবদুগ্গার আধার কার্ড, ফেসবুকেন সংস্থিতা, হায়রে হিপোক্রিসি, কিংবা পেঁয়াজ পেয়াজির কিস্সা - কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি। হেডঅফিসের বড়োবাবু যেন আমাদেরই আশেপাশের কেউ।  

এই বইটা একবার পড়তে শুরু করলে আর ছাড়তে ইচ্ছে করতে করেনা, আর শেষ হলে? তখনও মনের মধ্যে চরিত্রগুলি ঘুরঘুর করতে থাকে, বলতে থাকে, আমরা যে তোমাদেরই মনের এক্সটেনশন, তাই তো তোমরা আমাদের এতো ভালোবাসো। 

ফেসবুকেই ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের পোষ্ট থেকে জানতে পেরেছিলাম এই অভিনব বইটির কথা।  তখন থেকেই  ভাবছি কবে বইটি হাতে পাবো, তা অনলাইন অর্ডার করে হায়দ্রাবাদে পেতে পেতে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।  ইন্দিরার লেখা আগেও পড়েছি, ওর লেখা বই আমাদের বইয়ের আলমারিতে সামনের সারিতেই শোভা পায়।  ফেসবুকে তো মাঝে মাঝে অনেকের স্টেট্যাস আপডেটে হাস্যরসের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়।কিন্তু কজন এমন একের পর এক গুছিয়ে মজার রচনাগুলি নিয়ে বই লিখে ফেলেন? 

শুধুমাত্র বিনোদন না, ইন্দিরা আমাদের দেখাচ্ছেন সমাজের করুণ দিকটাও, মানুষ কোথায় এসে থেমেছে আজ।  পয়মন্তী গল্পের শেষে -  জন্মেও কেউ সঞ্চয় করো না। যাবৎ বাঁচো তাবৎ খরচ করে চল। অর্থই অনর্থের মূল।  এমন সব মজার নীতিকথা বেশ সুখপাঠ্য। Covid আনন্দর গানখানি মনে পড়ছে। বিখ্যাত দ্বিজেন্দ্রগীতি তাও আবার করোনা ভাইরাসদের নিয়ে?  "আমরা এমনি এসে ভেসে যাই / হাওয়াতে জড়িয়ে , ফুলের রেণুতে / নিশ্বাসে আর প্রশ্বাসে ভাই। বাপরে বাপ, কী জব্বর গান।  

মনের ভেতর বাজতে থাকে এই প্রবাদ টি, a pen is mightier than a sword । সত্যি সত্যি সত্যি, একদম সত্যি।  

বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য শিল্পী শ্রী শুভম ভট্টাচার্য কে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আকর্ষণীয় প্রচ্ছদটি, ঝকঝকে প্রিন্ট কোয়ালিটি আর নির্ভুল বানান দেখে খুব ভালো লাগল।  

সবশেষে আমার এই সময়ের প্রিয় লেখিকা শ্রীমতি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কে অভিনন্দন ও অনেক শুভেচ্ছা, প্রার্থনা করি, উনি সুস্থ থাকুন, আনন্দে থাকুন ও সারাজীবন এমনি রসবোধে টইটুম্বুর থাকুন।

পাণ্ডুলিপি পাবলিশিং এর ওয়েবসাইট ছাড়াও বইটি পাওয়া যাচ্ছে আমাজন এবং ফ্লিপকার্টে । 







লেখক পরিচিতি 

রীতা ঘোষ, হায়দরাবাদ  এর বাসিন্দা , একটি LPO তে কর্মরত এবং তার সঙ্গে অনেক সৃষ্টিশীল কাজেও যুক্ত আছেন