৮ জুলাই, ২০১৮

যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক


যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক


যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক


যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক


২১ মে, ২০১৮

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক" / জেনে শুনে বিষ করেছি পান




ভোর ভরেছি ভেজালে । শুরু ভেজাল দুধ দিয়ে । তাতে নাকি মিশ্রিত চকের গুঁড়ো, ডিটারজেন্ট,এমোনিয়াম সালফেট, বোরিক এসিড, কস্টিক সোডা। হাঁস মুরগীর খাবারে Astaxanthin মিশিয়ে ডিমের কুসুম টুকটুকে কমলা করার পদ্ধতিও বহুদিনের। আর ব্রেড?  ময়দা নাকি সবচেয়ে বড় শত্রু  আমাদের শরীরের। কারণ প্রোসেসিং এর সময় সব নিউট্রিয়েন্টস ঝেড়ে পুছে ফেলে দেওয়া হয়। তবে ব্রাউন ব্রেড ? বেশীর ভাগ দোকানেই ব্রাউন ব্রেড ময়দা দিয়েই বানান হয় । আর বাদামীর কারণ ক্যারামেল। জানতেন না? কি করে জানবেন? উইক এন্ডে লঙ ড্রাইভে গিয়ে ধাবার খাটিয়ায় বসে মনের সুখে তন্দুরি রুটি আর মাংস খেয়ে সুখ ঢেকুর তোলেন নি? তখন জানতেন ওই মাংস ভাগাড়ের মৃত পশুর? 
তাহলে মুড়িই খান। সেখানেও মুড়িভাজার আগে নাকি ইউরিয়া মেশানো হয়। লম্বা লম্বা ধবধবে সাদা, ফুরফুরে জুঁইফুলের মত মুড়ি দেখেই ঝাঁপিয়ে পড়ি আমরা। অথচ গ্রামের মেয়েরা যে মুড়ি নিয়ে বাজারে বসে সেগুলি অপেক্ষাকৃত মোটা, লাল মুড়ি। সেগুলোর দিকে ফিরে চাই না। পহেলে দর্শণধারী চাই যে আমাদের।       
চা' পাতায় রং করা কাঠের গুঁড়ো, লোহার গুঁড়ো । এবার চাল সেখানেও পাউডার মেশানো । নয়ত পোকা লেগে যাবে । সবজী তে পর্যাপ্ত পেস্টিসাইড। ফলন হবেনা যে। তুঁতে গোলা জলে সবজী ? টাটকা, সবুজ দেখাবে যে বহুক্ষণ। মাছ? সেখানেও বাইরে থেকে রোডামিন বি  ইঞ্জেক্ট করা কানকোর মধ্যে। মাছ কে তাজা দেখাবে তাই।
আর বিশেষ রোগে আক্রান্ত মরা মাছ সস্তায় কিনে এনে সস্তায় বিক্রি করা?  বা মরা চিকেন ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখার কৌশল? ব্যাবসায়ীরা খুব ভালই আয়ত্ত করেছেন এসব।
মাংস? যাকে খাসি বলে ভাবছ, সে আসলে মেয়ে ছাগল। সরকারি নীল ছাপ মেরে ঝুলছে চোখের সামনে। মুরগী? তার মৃত্যু যে কবে হয়েছে না জেনে কিনলেই মরেছ তুমি। নতুন হাইপ। তাহলে খাবটা কি? হাওয়া খেয়ে থাকব?  পওহারী বাবার মত।

এই সেবার ম্যাগি নিয়ে গেল গেল রব উঠল। হেলে ধরতে পারিনা, কেউটে ধরতে যাই আমরা।

ফুড সেফটি এন্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথোরিটি অফ ইন্ডিয়া নামে একটি খাদ্য নিয়ামক সংস্থা আছে।  কিছুদিন আগে যারা ম্যাগির মধ্যে নিষিদ্ধ সীসে আর আজিনামোতোর উপস্থিতিতে ম্যাগির গুষ্টির তুষ্টি করে ছাড়ল।  আচ্ছা তারা দেখতে পান না রাস্তার মোড়ের তেলেভাজা কিম্বা কচুরিভাজার দোকানের তেলের রং? বারেবারে উচ্চ তাপমাত্রায় তেল কে গরম করলে HNE(বা ৪-হাইড্রক্সি ট্রান্স-২ ননেনাল্) নামক যৌগটি ডিপ ফ্রায়েড ফুডে শোষিত হতে থাকে যা দীর্ঘদিন সেবন করলে কার্ডিওভাসকুলার এবং নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের সৃষ্টি করে।
সব্জির বাজারে উচ্ছে, পটল বা কাঁকরোল কে তুঁতের জলে ডোবানো ?  তুঁতে মানে কপার সালফেট। নির্ভেজাল বিষ মশাই। পোকা মারার অব্যর্থ দাওয়াই। মানে যাকে বলে ইনসেকটিসাইড। 
মাঝেমাঝেই কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেন খাদ্যের মান নির্ধারণ নিয়ে। কমিটি গঠন হয়। সব্জিতে রং মিশিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে ব্যাপারী।  টিভি চ্যানেলে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।  এগুলি জামিন অযোগ্য অপরাধ বলে। তারপর চুপচাপ । কোয়ালিটি কন্ট্রোল হবে, অপরাধীর সাজা হবে। স্তোক দেওয়া অব্যাহত থাকে। পরিকাঠামোর অভাব আছে বুঝি? কেন্দ্র দেবেন না অনুদান? ভাইটাল ব্যাপার।

নাগরিক স্বাস্থ্য বলে কথা। আর অনুদান পেলে বেসরকারী সংস্থারা এগিয়ে আসছেন না কেন? ফুটপাথীয় ফার্ষ্টফুডের রমরমা চলতেই থাকবে?  মরুক মানুষ। মরুক সমগ্র জাতি। তৃতীয় বিশ্বে এমনি হবেক। বিদেশে কিন্তু খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিশেষ সেল থাকে। তারা গুণমান দেখে। আর আমরা কিনা দেখি হোটেলের সিংকের নীচে স্তূপীকৃত নুডলস সেদ্ধ তে আরশোলার সানন্দে চরে বেড়ানো।  নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব প্রায়শ‌ই দেখি নড়েচড়ে বসেন। লম্বাচওড়া বাতেলা আওড়ান । কিন্তু তারপরেও কচুরীর ভাজার তেলটি বদলানো হয় না দিনের পর দিন। আমাদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিটা এমনি থাকবে মশাই?  আমরাও  ঘুমে অচেতন থাকব।  আমাদের উচিত তর্পণে গাঙ শুকোয় । এত কাজ কে করবে বলুন তো?

হলুদ গুঁড়োর সঙ্গে মিশ্রিত থাকে হলুদের চেয়েও উজ্জ্বল কার্সিনোজেনিক লেড ক্রোমেট। আর টকটকে লাল লঙ্কার গুঁড়োয়  ? লাল cayenne পাউডার মেশানো হয়।  এই রং না মেশালেই নয়? আজ কি তাই ঘরে ঘরে এত কিডনির অসুখ ?  রান্নাঘরে এমন থৈ থৈ ভেজাল আমাদের। এছাড়া ঐ সব মনোহারী শরবত, দর্শনধারী বোতলবন্দী পানীয়? গ্রিন ম্যাঙ্গোয় ম্যালাকাইট গ্রিন, টুকটুকে লাল গোলাপের মত পানীয়ে কঙ্গো রেড বা এলিজারিন? এ সব রাসায়নিক আমাদের শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক । ভোজ্য সর্ষের তেলে রেড়ির তেল, শিয়ালকাঁটার তেল, আর্জিমোন অয়েলের  উপস্থিতি তো সর্বজনবিদিত।? সেও তো ড্রপসি, অষ্টিও আরথাইটিসের কারণ। বেসনের মধ্যে খেসারির ডালের গুঁড়ো? সেও তো মারাত্মক। গোলমরিচের মধ্যে পেঁপের শুকনো বীজ মিশিয়ে দেওয়া? জানেন এইসব কারণেই লিভারের সমস্যা থেকে দৃষ্টিশক্তি, নার্ভ থেকে আর্থাইটিস এসব রোগ অপ্রতিরোধ্যভাবে বেড়েই চলেছে। মিষ্টির দোকানে রূপোলী তবক দেওয়া মিস্টিগুলি দেখেই কিনতে ছোটেন তো? একদম না। ওগুলি তো ক্রেতা কে আকৃষ্ট করার উপায়। যাহা চকচক করে তাহা বিষ। জেনেশুনে বিষ পান করবেন কেন? অন্য মিষ্টি নিন। এই এলুমিনিয়াম ফয়েলে পেটের সমস্যা হয়। এযুগের আরেকটা হাইফাই ব্যাপার হল সুগারফ্রি মিষ্টি? চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যাবহৃত স্যাকারিন সস্তা কিন্তু ব্যানড বহুদিন। আর এসপার্টেম অথবা সুক্রালোজ? কোনোটাই দরকার নেই আমাদের শরীরে। চিনি বাদ দিন। বিকল্প খাবেন না। আর মন না মানলে একটু চিনি ই খান। সুগার ফ্রি নৈব নৈব চ। 
টালা থেকে টালিগঞ্জে, বালি থেকে বালিগঞ্জে, খিদিরপুরে অথবা ভবানীপুরে, মল্লিকবাজার কিম্বা বাগবাজারে সর্বত্র‌ই জেনেশুনে বিষ পানের বিশাল আয়োজন কিন্তু। টিভি বলবে জাগো গ্রাহক জাগো। ক্রেতা সুরক্ষার কচকচি আওড়াবেন নেতারা। কিন্তু শরীর আমার। স্বাস্থ্য‌ও আমার। সেখানে নো কম্প্রোমাইজ। 

বিশ্বসংস্থার স্বাস্থ্য রিপোর্টে আবারো হুঁশিয়ারি। চাপান উতোর। জলঘোলা। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশেও ভবি ভোলার নয়। অতএব জুভেনাইল হৃদরোগ, স্নায়ুরোগ, ক্যানসার ইত্যাদি মারণরোগের বাড়বাড়ন্ত, এটাই সত্য। ওবেসিটি আজকের সমাজের অভিশাপ। এও সত্য।

এখন আবার শুনছি একজনের এঁটো পাতকুড়োনোও দিব্য চালান হচ্ছে অন্যের প্লেটে। রেস্তোঁরার ফ্রিজের খাবারদাবারে নাকি পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাংগাস। টেলিভিশনে টক শো। হট কেক টপিক। দেখেছেন তো? হ্যান করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা। রেস্তোঁরার ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করেঙ্গা। চার্জশিট পেশ। জরিমানা, কারাবাস। আবার সব ধামাচাপা। 
আরো কত বলব? স্বনামধন্য ফুড ব্র্যান্ডে চানাচুরে নাকি বহুদিন কুড়মুড়ে রাখার জন্য মার্বেল ডাস্ট মেশানো হয়? অথবা কেশরী বিরিয়ানী কিম্বা রাবড়ি তে মেটানিল ইয়েলো? এটি ক্যানসারকারক কেমিক্যাল। তবে এবার যারা সক্কলকে ঘোল খাইয়েছেন ভাগাড়ের পচা মাংস বেচে তাদের রাজ্য-শ্রী এওয়ার্ড দেওয়াই যায় সত সাহসের জন্য।
হিমঘরে উদ্ধার হওয়া এই মাংসের মধ্যে কুকুরের মাংসও রয়েছে। বজবজ থেকে রাজাবাজার, ধাপার মাঠ থেকে সোনার পুর, এমনকি বিহার অবধি ব্যাপ্তি এই মাংস চক্রের।   এজেন্ডা হল এমনি। পশুর মৃত্যু, কোল্ড স্টোরেজ, কেমিক্যালস প্রয়োগ, আবারো হিমঘর তারপর প্যাকেজিং। ব্যাস! আম আদমীর ঘরে পৌঁছে যাবার সুনিপুণ ব্যবস্থা।
লজ্জা, ঘেন্না, ভয়, এই তিনের কোনোটিই নেই এই চক্রের। অতএব ব্যবসার খাতিরে গো এহেড!  যতদিন না ধরা পড়ছি লজ্জাই বা কিসের্, ভয় ই বা কেন আর ঘেন্না? ওসব থাকলে কেউ ভাগাড়ের মাংস মানুষের খাবারের জন্য ভাবতে পারে?  ছিঃ আমার তো ভেবেই ঘেন্না করছে। 
কিছু মানুষের অবিশ্যি ভাবখানা এমন যে, ভাগাড় থেকে মৃত পশুর টন টন মাংস সস্তায় বিকোচ্ছে বুঝি? ঠিক আছে ক'দিন মাংস খাব না বাবা। তারপর? তার আর পর নেই। পচন ধরা আমিষ অথবা কৃত্রিম রং মেশানো খাবারদাবার। সব গা সওয়া আমাদের। অতএব যা চলছে চলুক। তৃতীয় বিশ্বের চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিকদের এমনি প্রাপ্য।
আবার স্যাম্পেল এনালিসিস হবে। ঠগ বাছার প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে । কসাই ধরপাকড় হবে । ফরেনসিক এক্সপেরিমেন্ট হবে। উদ্দিষ্ট চক্র ছাড়াও পাবে। আপনার আমার নাকের ডগায় আবার বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে তারা । একদিন এ ঝড় ঠিক থেমে যাবেই। পৃথিবী আবার শান্ত হবেই। 
মাংসাশী মানুষ তখন আবার জোর কদমে ঘেন্না, ভয় ভুলে মাংসের ঝোল খাবে কব্জি ডুবিয়ে। বলবে খেয়ে তো নি আগে, তারপর দেখা যাবে। জেনে শুনে বিষ পান? ওসব রবিঠাকুরের কাব্যেই হয়। আমাদের কি এসে যায়?

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক"

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক" / কে দেবে গো মায়েদের বেকারভাতা ?

মায়ের দিন? সে ত রোজদিন। মা-দিবসের প্রাক্কালে এ আর এমন কি? দেশের অগণিত মায়েদের জন্যই এ লেখা।  সেই আসনতলে, মাটির পরে তাদের স্থানটি বেশ শক্তপোক্ত তো এখনো? না মানে আজ কেবলই গৃহবধূ মায়েদের কথাই মনে করছি। এক একটা দিন এই অবলা গৃহবধূদের কথা খবরের কাগজে শিরোনামে স্থান পায়। মনে পড়ে? উত্তরপ্রদেশের গৃহবধূ রেণু আগরওয়ালের রোড একসিডেন্টে মৃত্যু? তার স্বামী অরুণ আগরওয়াল আদালতের দ্বারস্থ হয়ে ইন্সিওরেন্স কোম্পানির থেকে  ক্ষতিপূরণ স্বরূপ ১৯.২ লক্ষ টাকা দাবী করেন আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে। এলাহাবাদ হাইকোর্ট, এবং মোটর একসিডেন্ট ক্লেম ট্রাইব্যুনাল সেটি মেনে নিল না এবং তখনই শুরু গৃহবধূ ওরফে হোমমেকার চ্যাপটার । একজন গৃহবধূর ন্যাজ্য মূল্য কি হতে পারে সেই নিয়ে চাপানউতোর ।  গৃহবধূর প্রাণের মূল্য থেকে একজন হোমমেকারের income potential সব উঠে এল। পার্লামেন্টে ও চিন্তা ভাবনা শুরু হল।  এই হোমমেকারের সঠিক মূল্য কত হওয়া উচিত?  আর সংসারে তার অবদান কড়ায় গন্ডায় হিসেব করে একটি ন্যাজ্য মাপকাঠিতে তার জন্য একটি পে-রোল স্ট্রাকচার খাড়া করা যায় না কি?  তাহলে রেণুর মত কোনো গৃহবধূর পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলে তার স্বামী যাতে ন্যাজ্যমূল্যের অঙ্কটি ক্ষতিপূরণ রূপে পান ।
অন্যথায় সেনসাস 2001 অনুযায়ী ৩৬কোটি এরূপ গৃহবধূ মা' কে ভিখারিণী, বারবণিতা এবং বন্দিনীর সঙ্গে একই আসনে সেবার রাখা হল কারণ এই চার ধরণের মায়েরা নাকি অকর্মার ঢেঁকি এবং দেশের nonproductive population এর মধ্যে পড়ে তারা । এর অর্থ মায়েরা তবে র‌ইলেন অবহেলিতা, স্থান পেলেন না সেই আসনতলে? পেলেন না তাঁর কাজের প্রাপ্য মূল্য ।

ভিখারীনি মা দেশের অর্থনীতিতে কিছু contribute করেনা। কিন্তু ভিখারীনি তার লোটা-কম্বল সম্বল করে ফুটপাথের স্নিগ্ধ সুশীতল ছায়াতরু তলে লালন করেন তার সংসার। কেউ কি স্বেচ্ছায় ভিক্ষা করে ? তাঁর প্রাপ্য মর্যাদাটুকু কে দেবেন?
বন্দিনী মা ? সেও তো অর্থনীতিতে এক নয়া পয়সা contribute করে না বরং উল্টে তার জন্য সরকারের প্রচুর টাকা ব্যয় হয় । বারবণিতা মা, ত স্টেজ পারফর্মারের মত মনোরঞ্জন করছেন জনতার । তিনি  সমাজে না থাকলে ঘরের মায়েদের রাস্তায় টেনে আনা হত। তিনি নৈতিক না অনৈতিক কাজ করছেন সেটা আলোচনার বিষয় বস্তু নয় কিন্তু তিনি উত্‌পাদনে তথা দেশের জিডিপিতে পরোক্ষভাবে কিছু contribute করছেন  । তাকে আন-প্রোডাক্টিভ বললে তো সিগারেট বা লিকার মার্চেন্টদেরও সেই পর্যায়ে ফেলতে হয়  ।
এদের সঙ্গে একবার হোমমেকারদের পঙতিভোজনে বসানো হয়েছিল সেবার। আজ মা দিবসের প্রাক্কালে কেবলই এই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে। দেশের গ্রস ডোমেষ্টিক প্রোডাক্ট বাড়া কমায় একজন হোমমেকারের অবদান তবে কি শূন্য ?
এবার বলি ?  "শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত'।  তা বলি এই শিশুদের দশমাস দশদিন নিজের জঠরে ধারণ করে, তারপর জন্মের পর থেকে  মায়ের স্নেহটি দিয়ে লালন করেন সেই মা । আবার তাকে স্কুলের জন্য তৈরী করে, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করে তাকে কত টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে মানুষ করেন কে শুনি ? আর ঘর গেরস্থালী? বাড়িতে কাজের লোক না এলে, বাড়ির সব লোকের দেখাশুনো করা থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক বিল, টেলিফোনবিল জমা দেওয়া, ডাক্তার ডাকা, প্রত্যেক সদস্যের জন্য কাস্টমাইজড সার্ভিস দেন এই মা । কথায় বলে "খুজরো কাজের মুজরো নেই' । তাই  গৃহবধূ মা'দের কাজের কোনো দাম নেই । অনেকে বলেন  "বাড়িতে থাকো, কি আর কর, আমাদের মত  দশটা-পাঁচটা তো আর করতে হয়না'  বা "বুঝতে ঠেলা যদি বাইরে বেরোতে হত, তুমি আর কি কর, রান্না ? সে  কাজ তো সবাই পারে'।
অতএব মা তার দৈনন্দীন কৃতকর্মের জন্য  অর্থনৈতিক ভাবে উতপাদনশীল বলে আখ্যা পাক অন্ততঃ । নয়ত তারা কেবলই দেশের জনসংখ্যা বিস্ফোরণের দায়টি মাথায় তুলে নিয়ে তাদের উত‌পাদনহীনতার মুকুট পরে বসে থাকবে  আজন্মকাল । একটি কোম্পানির সারাবছরের হিসাবের খাতাটিকে বলে অ্যানুয়াল রিপোর্ট যেখানে দুটি টেবল থাকে একটি ব্যালেন্সড শিট অন্যটি লাভ-ক্ষতির হিসাব; এই মা  সেই দেশের অর্থনৈতিক হিসাবের খাতায় ভবিষ্যত প্রজন্মের প্রতিপালন করে জাতীয় সম্পদ বা capital asset তৈরী করছেন । চুলোয় যাক বাসন মাজা, ঘরপোঁছা, রান্না করা, ঝুল ঝাড়া । লাভ-ক্ষতির একাউন্টে তাকে না আনাই শ্রেয় । তিল তিল করে সঞ্চিত হচ্ছে সেই সব ধনরত্ন সেই শিশু নাগরিকের মধ্যে । যার মধ্যে থেকেই কেউ গিয়ে নাসায় রকেট চড়ছে, কেউ বৈজ্ঞানিক হয়ে জীবনদায়ী ওষুধ তৈরী করছে, কেউ বানাচ্ছে  অটোমোবাইল, কেউ বা হচ্ছে সৌরভ, লিয়েন্ডার-বিশ্বনাথনের মত কিম্বা রবীন্দ্রনাথ, অমর্ত্য সেনের মত নোবেল লরিয়েট !
আর সেই মা যিনি নেপথ্যের নায়িকা? ভোর থেকে রাত্রি পর্যন্ত সংসারের স্টিয়ারিংটি হাতে নিয়ে সংসারটিকে চালনা না করতেন তাহলে জানিনা কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়াত । তাঁর প্রতিপক্ষ বলবে কারোর জন্য কারোর আটকায় না কিন্তু যতক্ষণ দাঁত থাকে ততক্ষণ দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায় না । বাড়ির যে খরচাগুলি সেই মহিলা বাঁচান ততটাই টাকা রোজগারের সমতুল্য ।

আর মা তাঁর সেই ব্যস্ততায় ছেলের জ্বরে মাথায় জলপটিতে ওডিকোলন, নুন-হলুদ মাখা আঁচলে পোঁছেন মেয়ের টিফিনকৌটোটি, স্বামীর ওয়ালেট্, রুমাল, কলম হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন অফিসের তাড়ায়, তারপর বাজারের ব্যাগ হাতে বেরোন ইলেকট্রিক, টেলিফোন বিল, গ্যাসের দোকান, ওষুধের দোকান,  আর এটিএম মেশিনের লাইনে ।

মায়েদের জীবন অনেকটাই বহুজন হিতায়, সুখায় চ। এ নারীর বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না । তাই চালু হোক গৃহবধূ মায়ের বেকারভাতা।

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক"

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক" / তথ্যচুরি ভুরিভুরি


গেল গেল রব উঠল। সব ডেটা নাকি উধাও। ফেসবুক থেকে সব তথ্য নাকি চুরি হচ্ছে। এমন কি অ্যান্ড্রয়েড ফোনে লোকেশান অন্  করলেও গুগল আমাদের সব গতিবিধি জেনে যাচ্ছে। জি-মেইল এর প্রত্যেকটি ই মেইলের অ্যালগরিদম নাকি ওরা পড়ে । আর সেই বুঝে আমাকে অ্যাড দেখায়।  হোয়াটস্যাপের প্রত্যেকটি মেসেজ নাকি ফেসবুক কর্তাদের রেকর্ডে থাকে। কি জ্বালা রে বাবা! অথচ আমরা এখন প্রত্যেকেই সোশ্যালনেটওয়ার্কিং সাইটের দলদাস। আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা। তাই বলে আমার একান্ত আপন জীবনপঞ্জীতে নাক গলানোর কে হে তুমি ? কোথাকার হরিদাস পাল ই বা আমি যে আমার সবকিছু ডেটা তোমার নখদর্পণে রাখাটা জরুরী? সেদিন এই নিয়ে একজন ডেটা সায়েন্টিস্ট এর পোস্ট টা মনে রাখার মত । “if you are not paying for the product then you are the product” আর তাই বুঝি এইসব ফ্রি সার্ভিস। যা কিছু ফ্রি তাই সস্তার। কথায় বলে সস্তার তিন অবস্থা। তাই বলে আলাপচারিতার তথ্যও সস্তা। হ্যাঁ, ওদের মারফত তথ্য যখন অবাধে বিকোচ্ছে তখন সস্তা ত বটেই । যত্তসব ধান্দাবাজের কারবারি। ফ্রি তে পাওয়া বলেই এত বাড়বাড়ন্ত ওদের। অতএব  যখনি ফ্রি কোনো পরিষেবা পাচ্ছ তখনি কেয়ারফুল। আমাকে কেন সে দিচ্ছে এই পরিষেবা? নিশ্চয়‌ই বিনিময়ে আমাকে ইউজ করছে। আমাকে মানে আমার প্রোফাইল সম্বলিত ডেটাকে বা তথ্যপঞ্জী কে।

হঠাত সেদিন ঘুম ভেঙে গেল মাঝরাত্তিরে। চোর ঢুকেছে। রাতবিরেতে চোর ঢুকলে চীত্কার করে সিকিউরিটি ডেকে, থানায় ফোন করে কিছু একটা ব্যবস্থা নিতে পারি। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখছি গুগল, ট্যুইটার, ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ এ আমার ডেটা বেস থেকে আমার ডেটাগুলো নিয়ে ওরা কিসব করছে। শুধু আমার নয়। সকলেরি এই প্রবলেম। ইউজারদের তথ্য ভান্ডারে উঁকি দিচ্ছে ওরা প্রতিনিয়ত। শুধু উঁকি নয়। রীতিমত হানা দিয়ে তথ্য চুরি করে বিজনেস অ্যানালিসিস করাই ওদের কাজ। ডেটা পরখ করেন এইসব ডেটা অ্যানালিস্ট রা।  কি করেন ডেটা পরখ করে? মেঘের মধ্যে বসে আছি আমি আর আমার সোশ্যাল নেটের বন্ধুবান্ধবরা। আড্ডা জমে উঠেছে। কেউ ব্লগ লিখছিলাম মনের সুখে। কেউ ইমেইল পাঠাচ্ছি দরকারে। কেউ ফেসবুক অলিন্দে কমেন্টের ফোয়ারা ছোটাচ্ছি। কেউ হোয়াটস্যাপে গুলতানি । আর ডেটা সায়েন্টিস্ট রা আমাদের আড্ডা মহলের প্রলোভন দেখানোর সুযোগে সব ডেটা মাইনিং করে ফেলছে। আসলে এটাই তাদের রুজি রোজগার। থৈ থৈ ডেটা চাই তাদের।
আমরা কি তবে এদের হাতে বিক্রী হয়ে যাচ্ছি প্রতি মূহুর্তে?  
এইসব ছাইপাঁশ ভাবছিলাম আর ঘন নীল মেঘ সমুদ্রে বোঝাই করছিলাম তথ্য। কেউ কবিতা, কেউ গল্প, ভ্রমণবেত্তান্ত, কেউ রাজনীতির কূটকাচালী আর ছবি। তথ্য প্রযুক্তির ভাষায় একেই কয় ক্লাউড কম্পিউটিং। নিজের মেশিনে ডেটা না বোঝাই করে মেঘের মধ্যে মানে ডিজিটাল মেঘ সমুদ্রে থরে থরে ভরে দাও তথ্য। দরকার মত ঘাড় ধরে মেঘের মধ্যে ঢুকে বের করে নাও তোমার ডেটা। সবই ত ক্লাউড কম্পিউটিং।  ওরা জানছে। আর সেইজন্যেই তো আমাকে টার্গেট করে সুতীক্ষ্ণ বিজ্ঞাপন দেখিয়ে প্রভাবিত করছে। ক্লিক করলেই রেভিনিউ পাচ্ছে। ব্যাবসার প্রোটোকল। ধরুণ আমি একটি বিশেষ ব্র্যান্ডের পোষাক পচ্ছন্দ করি। ফেসবুকে ঢুকলেই তাদের রঙচঙে সেই বিজ্ঞাপনে ক্লিক করি। আর সেই সুযোগ নেয় ওরা। যতবার আমি ফেসবুকে ঢুকি সেই বিজ্ঞাপন ওরা আমাকে দেখাতে বাধ্য। ই কমার্সের সুযোগ নেব কি নেব না সেটা অন্য কথা।জিনিষটি কিনলে লাভ সেই কোম্পানির।কিন্তু এক ক্লিকেই তথ্য প্রযুক্তির কৌশল "আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স' প্রযুক্ত হল আমার ওপর। এ আই এর চোখ ঘুরছে অহোরাত্র। ফেসবুক ইউজারের ক্লিক ক্লিক মানেই তাদের ফেসবুক থেকে রেভিনিউয়ের ঝুড়ি উপচে ওঠা। এই ত সুযোগ মুরগী করার।
আসলে "ব্যাবসার জাল পাতা যন্ত্রজালে, কখন কে ধরা পড়ে তলে তলে'  
এর সঙ্গে রয়েছে  গরগরে প্রলোভনে পা দেবার তথ্যচক্র। তোমার প্রিয়, প্রিয়তর, প্রিয়তম বন্ধু কে,  মানের ক্রমানুসারে উঠে আসবে মাত্র একটি ক্লিকে। তুমি যাকে যত বেশী মেসেজ কর সে প্রিয়তম হতে বাধ্য। যার ছবি বা স্টেটাস আপডেটে নিয়মিত কমেন্ট কর সে প্রিয়তর আর যার পোষ্ট কেবল বুঝে বা না বুঝে লাইক মেরে পালাও সে থাকছেই প্রিয়র তালিকায়। জানো কি? 
আরো আছে। তুমি কোন বলিউড সুন্দরীর মত দেখতে অথবা কোন সেলিব্রিটি কে তোমার সবচেয়ে পছন্দ, শচীন না সৌরভ এসব জানতে চেয়েও ফাঁদে ফেলা যায়। একটাই উদ্দেশ্য কাজের ফাঁকে মুঠোফোনের এক ক্লিকে ফেসবুক বা গুগল আইডি দিয়ে লগ ইন, দেন স্টার্ট(ওদের কাছে তোমার ডেটা পৌঁছচ্ছে কিন্তু)। আর তারপর বিন্দাস! উতল হাওয়া। ঝলমল করে উঠল চিত্ত। উত্তর দেখে চমকিত আমি ও তুমি। আর মাঝখান থেকে ওদের ডেটা কালেকশান আর তারপর মাইনিং বা হান্টিং যাই বল।
মেঘের কোলে বসে ভাবছিলাম আবারো। তবে কে আমি ? বা আমার মত নগন্যের এহেন ডেটাবেস? হাতে স্মার্ট ফোন, কোলে ল্যাপটপ, ব্লগ লিখছি আমি। হাত নিশপিশ ক্লিকের জন্য। কিন্তু আর নয়। ক্লাউডে ভাসছে সব ডেটা। ওরা খুঁড়ে ফেলছে ডেটার খনি। ফেসবুকের নীল স্ক্রীনে আমার চোখ। মেঘের আড়াল থেকে বিভীষণ যুদ্ধ করেছিলেন না? আমিও তাই করি? নক্ষত্রপুঞ্জ ধেয়ে আসছে আমার দিকে। মহাস্থবির গ্রহেরা হাঁ করে গিলছে আমাকে।  সতর্কবাণী তাদেরঃ বুঝেসুঝে চলো হে! কেয়ারফুল্! তাই বলে কেয়ারলেস নয় কিন্তু'
 আমি কি তবে চুরি হয়ে গেলাম? ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নের জাল ছিঁড়ে দেখি ধুস্! আমার মত নগন্য পাবলিকের গোলাপ না পলাশ কি প্রিয় জানতে চেয়ে প্রশ্নবাণ আবারো ধেয়ে আসছে আমার দিকে। আমি এড়িয়ে যাই এবার। কারণ কয়েক বছর আগেই  নীল রং না লাল রং সেটা সাধারণ লোকেদের কাছে জানতে চেয়েই ক্ষুদ্রতর স্বার্থ বৃহত্তর স্বার্থে প্রতিপন্ন হয়েছিল। সে ডেটা হান্টিং ছিল নীল পার্টি না লাল পার্টির পক্ষে না বিপক্ষে জানার কৌশল। আর তলে তলে আমেরিকার ভোটযুদ্ধে ফেসবুক ইউজারদের রাজনৈতিক প্রেম কোন দলে সেই তথ্যটুকুনি ওরা কাজে লাগিয়ে নিল সুকৌশলে। অর্থাত ভোটদাতারা প্রভাবিত হল এভাবেই। বিজ্ঞাপনের দ্বারা। এবার বুঝুন আপনি। কি করবেন। 
যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক"

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক" / পরীক্ষা বাতিল

 
এখন পরীক্ষা হয়ে যাবার পর ক্যান্সেল শুনলেই  মনে পড়ে যায় ১৯৮৪ সালের কথা। সে আশির কথা ভাবলে এখনো বিস্ময়ে হতবাক হ‌ই। আশি না আশীবিষ এ শহরের বুকে? আমি তখন ঊণিশ-কুড়ি। আমার গর্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পরীক্ষা পার্ট ওয়ান অনার্স শুরু। তারিখ ৫ইজুন, সাল ১৯৮৪। ৪ঠা জুন থেকে প্রচন্ড বৃষ্টির দাপটে পুরো শহর জলমগ্নতায় ।  সিট পড়েছিল কলেজস্ট্রীটের জলজমার আড়ত সংস্কৃত কলেজে। খবরে শেষ অবধি কোনো ঘোষণা হলনা পরীক্ষা স্থগিতের। অগত্যা চাল-চিঁড়ে বেঁধে সব বন্ধুরা হাজির হতে শুরু করলাম সংস্কৃত কলেজের দোরগোড়ায়। পরীক্ষা দিয়ে উদ্ধার হব আমরা। উদ্ধার করবেন আমাদের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়। 
হরিপাল থেকে দত্তপুকুর, আলমবাজার থেকে বাগবাজার, নিমতলা থেকে শ্যামবাজার....সকলেই চলেছি এক‌ই দিকে। মাথায় অনার্স পরীক্ষার চিন্তার জটগুলো ক্রমশঃ পাকিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নপত্র সোজা না কঠিন হবে সে প্রশ্নটা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়ে আপাততঃ শ্যামবাজারে বাস থেকে নেমে পড়তে হল। বাস আর যাবেনা। বিধানসরণী, ভূপেন বোস এভিন্যু, সার্কুলার রোড, সর্বত্র জলময়। পরীক্ষা শুরু দুপুর বারোটায়। চারঘন্টা মেয়াদ তার।  সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কি ভয়! কলকাতায় জন্মে অবধি জলজমা দেখে আসছি, তাই বানভাসি শহর নতুন নয়।  
এক টানা রিকশোতে চড়ে বসলাম। রিকশার পাদানিতে জল থৈ থৈ । আকাশটা থমথমে। বৃষ্টি নেই কিন্তু মেঘ আছে । আমাদের পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে  আকাশেরো যেন চাপা দুঃখ । ব্যাগে এক্সট্রা পোষাক আছে অতএব চিন্তা নেই। এখন ধ্যান, জ্ঞান শুধু সংস্কৃত কলেজে আমার জন্য নির্ধারিত বেঞ্চিটি। হাজির হলাম ফড়িয়াপুকুর, হাতিবাগান, হেদুয়ার বন্যা পেরিয়ে। তখন বাজে সকাল সাড়ে দশটা। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে থাকল। বারোটার আশেপাশে পরীক্ষা শুরু হবার কোনো লক্ষণ দেখলাম না। এবার ঘোষণা হল, প্রশ্নপত্র হাজির হয়নি তাই পরীক্ষা মনে হচ্ছে স্থগিত হবে। তখন দেখি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বন্ধুবান্ধবরা জলে ভিজে এসে গেছে ঠিক সময় মত। বাড়ি চলে যাবার ধান্দা করছি, তখন ঘোষণা হল প্রশ্নপত্র এসেছে, পরীক্ষা শুরু হবে বেলা দুটোর সময়। আমাদের পেটে তখন ভুখছানি। চারঘন্টা ধরে মাথা খাটিয়ে কেমিষ্ট্রি অনার্স পেপার ওয়ান দেব। জীবনে প্রথম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা, পার্ট ওয়ান বলে কথা!
ঠিক দুটোর সময় যখন হলে প্রবেশ করলাম তখন ইলেকট্রিকের কেবল ফল্ট হল। ঝুপসি অন্ধকার ক্লাসরুম। টেবিলে একটা করে মোমবাতি এল। পরীক্ষা শুরু হল। জানা জিনিষগুলো তখন মনে হতে লাগল অজানা। সোজা উত্তরগুলো মনে হচ্ছিল ভীষণ কঠিন। পেরোলাম চারটে ঘন্টা। খাতা জমা দিয়ে এলাম । খাওয়াদাওয়া নেই। জল জমে আছে তখনো। বাড়ি ফিরলাম একরাশ মনখারাপ নিয়ে। শরীরটাও যেন ট্রমাটাইজড। পার্ট ওয়ান শুরুটা মনের মত হলনা। বাড়ি ফিরে দূরদর্শনের খবরে ঘোষণা করা হল সেদিনের সেই কাঠ খড় পোড়ানো পাহাড়ে ওঠার  পার্ট ওয়ান পরীক্ষা ক্যানসেল হয়েছে।  এই হল আমাদের  শিক্ষা ব্যবস্থা। নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়নি রক্ষে!
উতরেছিলাম ঠিকই কিন্তু সেবারের পার্টওয়ান এই ঘটনা আমার জীবনকে নাড়া দিয়েছিল।  পরেরবছর পার্ট টু পরীক্ষা। থিওরির পর প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার সিট পড়েছিল আরেক নাম করা ছেলেদের কলেজে।  সেখানে পৌঁছে রোল নাম্বার অনুয়ায়ী লটারীতে নির্ধারিত স্যাম্পল সল্ট অ্যানালিসিসের শিশিটি  হাতে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে প্রবেশ করতে যাব, এমন সময় ল্যাবের একজন অ্যাসিট্যান্ট আমাকে চুপুচুপি ডেকে বলল
"তোমার অজানা সল্টের স্যাম্পলে কি আছে জানতে চাও? পার সল্ট চল্লিশ টাকা লাগবে।" তাহলে আমি আর টেস্ট না করেই শুধু লিখে খাত জমা দিয়ে ফুল মার্ক্স পেয়ে বেরিয়ে যাব। রোল নাম্বার সাঁটা শিশির গায়ে। রেজিষ্টার খুলে সেই ল্যাব অ্যাসিট্যান্ট যেন হাঁ করে বসে আছে। প্রত্যেককেই সে এমন প্রস্তাব দিচ্ছিল। কেউ টোপ গিলছে কেউ গিলছেও না। সাদা, লাল, নীল, সবুজ, কমলা...কত রংবেরংয়ের সল্ট স্যাম্পল। দুটি করে রাসায়নিক যৌগ আছে যার মধ্যে । নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টেস্ট করে বের করতে হবে সেই দুই যৌগের নাম। কেমিষ্ট্রি যারা পড়েছে তারা জানে এ হল সবচেয়ে কঠিনতম প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা।  
অন্যায়ের সঙ্গে কোনোদিনো আপোষ করিনি তাই নিজে নিজেই লড়ে সেই সল্ট অ্যানালিসিস উতরে গেছিলাম কিন্তু মনের কোণায় সেই যে একটা খেদ, গ্লানি আর ন্যায়ের জন্য  যুদ্ধ শুরু হল সেই যুদ্ধ আমার এখনো চলছে। মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে গেছে সেদিন থেকে, অন্যায়ের সঙ্গে  আপোষ না করা । সেদিন পরীক্ষা হলের বাতাবরণে হয়ত প্রতিবাদী হয়ে উঠিনি কিন্তু যতটুকুনি পড়াশুনো করেছি সেটুকুনি কাজে লাগিয়েছি, তাই মনে মনে আজো গর্ববোধ করি।  আশীর দশকের এই দুটো শিক্ষা সম্বন্ধীয়  ঘটনা মনকে আজো নাড়া দেয় আর এখনো ভাবি কিসের শিক্ষা? কেন এই শিক্ষা? সেখানেও রাজনীতি না কি অন্য কোনো ছক কষাকষি থাকে? উত্তরটা খুঁজে চলেছি এখনো ।
তাই আজ যখন বোর্ডের প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য পরীক্ষা ক্যান্সেল হল তখন মনের মধ্যে তোলপাড়। বেচারা পড়ুয়াদের জন্য। যারা কেউ ভেবেছে পরীক্ষা দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচবে। কেউ ভেবেছে বেড়াতে বেরুবে, তা না তাদের আজ ট্রমায় দিন কাটছে। উপযুক্ত শাস্তি পাক এই চক্র তবে রিএক্সাম কি এর সমাধান? জানি হয়ত রিটেস্ট তাদের দিতেই হবে কিন্তু যারা নির্বিবাদে পরীক্ষা দিল, যারা ঘুণাক্ষরে টের পেল না তারা কেন এই যজ্ঞে আবার সামিল হবে? রিএক্সামের ট্রমা যে কি জিনিষ তা আমার মত সেই ৮৪ র পরীক্ষার্থীরা সকলেই হাড়েহাড়ে বুঝি।
যারা এই প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ডের  মধ্যমণি তাদের যেনতেনপ্রকারেণ জবরদস্ত শাস্তি হোক। আর যাই করুণ ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না দয়া করে। এবছরের প্রশ্নপত্রে যা সম্ভাব্য ছিল তা  ত এসেই গেল। পরীক্ষা দেওয়া হয়েই গেছে। আবার পরীক্ষা হলে ওরা পারবে ত?    
যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক"

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক" / কালবোশেখি

 প্রতীক্ষা এক অদ্ভূত রকমের প্রচ্ছন্ন আবেগ। আর সে যদি অনিশ্চিত প্রতীক্ষা হয় তবে উথালপাথাল। চৈত্র বৈশাখ মাসের অপরাহ্নিক ঝড়, ঈশান কোণে কালো মেঘ জড়ো হওয়া আর সেই নিকষ কালো, ঘুটঘুটে ঘন মেঘ ? এদের সমন্বয়ে যদি শান্তিধারা নামে তাহলে বাঙালীর বছরের প্রথম বরফ কুচি ছড়ানো আমপান্নায় কে যেন জল ঢেলে দেয়। আচমকা বহু কাঙ্খিত নাভিশ্বাস আবার সর্বনাশ! 
দুপুর থেকেই ছমছমে আকাশ, গুমরে মরছিল।তারপরেই কালভৈরব ঝড়ের তান্ডব আর কিছুপরেই শান্তির ধারাবর্ষণ। পুরুষ আর প্রকৃতির খেলা যেন। সবুজ আর সজীবের প্রাণ ফিরে পাওয়া। দরজার পাল্লা পড়ছে, জানলার কাঁচ ভাঙছে। কত শব্দ। আর সবচেয়ে দাপট দেখায় শালপ্রাংশু বৃক্ষগুলি। একবার আটকে গেছিলাম  চিলেকোঠায়। নীচে নামতে না পেরে দু চার লাইন কাব্যি করেছিলাম। কবিতার নাম দিয়েছিলাম কালবোশেখি। অকালবোশেখির মত আমার কাছে সব কালবোশেখিই যেন বড় অকালে আসে। তাকে বুঝতে না বুঝতেই সে এসে চলে যায় দুমদাম পা ফেলে।    
এখনো কালবোশেখির স্মৃতি মেদুর বিকেলগুলোয় চোখ বুঁজলে কিউটিকিউরা পাউডারের হালকা গন্ধ পাই কালবৈশাখীর বিকেলে । গা ধুয়ে নরম ছাপা শাড়ি পরে মায়েদের দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই মাদুর নিয়ে ছাদ সংসার পাতার তোড়জোড় । মায়ের হাতে একটা হাতপাখা আর অন্যহাতে বাড়িতে পাতা টক দ‌ইয়ের ঘোল। ওপরে কাগচিলেবুর সুবাস । ফ্রিজ তখনো ঢোকেনি বাড়িতে। বরফ যেন আমাদের কাছে সোজা হিমালয় পৌঁছনোর মত ব্যাপার। বাজারে একটা দোকানে সন্ধ্যের ঝুলে বরফ বিকত। সেখান থেকে বরফ কিনে এনে শরবত খাওয়া হত। সেদিন যেন চাঁদ হাতে পাওয়া। তখন "হিমক্রিম' পাওয়া যেত।  সেও যেন এক অতি আশ্চর্য রকমের প্রাপ্তি। মিষ্টির দোকানে আইসক্রিম মিলত। কোয়ালিটির আইসক্রিমের কাপ।কোনোকোনো দিন দুধের বড় ক্যানের মধ্যে বরফ দিয়ে সেই আইসক্রিম আসত গরমের ছুটির বিকেলে। ছাদের ওপর হয়ে যেত আমাদের ছোট্টবেলার আইসক্রিম পার্টি। বাবা একবার সেই আইসক্রিম আনতে গিয়ে কালবোশেখির ঝড়ে পড়লেন। কি চিন্তা আমাদের! যত না চিন্তা মানুষটির জন্য তত চিন্তা আইসক্রিমের জন্য। মা খুব বকুনি দিয়েছিলেন। আগে বাবা না আগে আইসক্রিম এই বলে।

তখন আমাদের স্কুলজীবনে গরমকালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল লোডশেডিং।  ইনভার্টার ছিলনা । রোজ নির্দ্দিষ্ট সময়েই পাওয়ার কাটের পূর্বাভাস পেয়ে যেতাম আমরা। আর কালবোশেখি হলেও ঝড়ের তাণ্ডবে পাওয়ার চলে যেত। তখন দখিণের খোলা বারান্দাই ভরসা। সেখানেই জ্যামিতি, পরিমিতি আর উপপাদ্যে নিয়ে জোর কসরত চলত । সকাল থেকেই হ্যারিকেনে কেরোসিন ভরে, ঝেড়ে পুঁছে রেখে, তার সলতে ঠিকমত কেটে সমান করে দেওয়া হত । এখন শিল্পের বাড়বাড়ন্ত অতটা নেই তাই বিদ্যুতের চাহিদাও নেই। অবশ্য বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে শপিং মলে, মেট্রো রেলে। মাল্টিপ্লেক্সে, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে, সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে।  বিশ্বায়নের স্বীকার আমাদের শহর।আর সেই সঙ্গে আমরাও। তবে কলকারখানাও নেই বড় একটা তাই লোডশেডিং মুক্ত আমরা । তাই স্কুলের শিশুরা আরামেই গ্রীষ্মের ছুটির হোমওয়ার্ক করে । হোম মেকারের বাতানুকূল দিবানিদ্রা দিব্য যাপন।

রাতে লোডশেডিংয়ে মা টানতেন হাতপাখা। শাড়ির পাড় দিয়ে মোড়া থাকত হাতপাখাটি। টেঁকশ‌ই হবে বলে । ছোটদের বেয়াদপির দাওয়াই ছিল এই পাখার বাড়ি। যে খায়নি এই পাখার বাড়ি সে জানেওনা তা কেমন খেতে । সেই তালপাতার পাখাখানি টানতে টানতে বাইচান্স আমাদের গায়ে ঠুক করে লেগে গেলেই মায়ের যেন একরাশ মনখারাপ। যেন কি ভুলই না করেছেন। সেই পাখা সাথে সঙ্গে সঙ্গে ঠকাস করে মাটিতে ঠুকে তিনবার আমাদের কপালে, চিবুকে হাত রেখে চুক চুক করে ক্ষমা চাইতেন। দোষ কাটিয়ে নিতেন। সন্তানের গায়ে হাতপাখা লেগে যাওয়া যেন দন্ডনীয় অপরাধ।  মাটির কুঁজো বা জালার জল ছিল আরেক প্রাণদায়ী বন্ধু সে গরমে। মা আবার এক ফোঁটা কর্পূর দিয়ে রাখতেন জালার জলে। জীবাণুনাশক আবার সুন্দর গন্ধ হবে বলে। জলের লীনতাপকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দেবার জন্য সকাল থেকেই লাল শালু ভিজিয়ে জড়িয়ে দেওয়া হত মাটির জালার বাইরে। এখন গর্বিত বাঙালির ঘরে ঘরে ফ্রিজ। সে মাটির কুঁজোও নেই আর নেই সেই হাতপাখা। 

এখন সকলে বলে গরম বেড়েছে। কারণ নাকি বিশ্ব উষ্ণায়ণ। পরিবেশের নাকি বেজায় দম্ভ। বাড়ীর গরম, গাড়ীর গরম। সেই সঙ্গে মানুষের মাথাও গরম। টিভির চ্যানেলে অহোরাত্র ঘটি গরম। তাই মেঘ জমে কালবোশেখি হবার আগেই সব মেঘ বাষ্পমুক্ত হয়ে শুকিয়ে যায়। মায়ের এখন থাইরয়েড তাই গরম আরো বেশি। হোমমেকারের হটফ্লাশ তাই গরম বেশি। বাজারদরের আগুণ নেভেনা তাই বাবার কপালের ঘাম শুকোতে চায়না। ছেলেপুলেরা জন্মেই ফ্রিজ দেখেছে তাই ফ্রিজে জল না থাকলে তারাও অগ্নিশর্মা। ওরা শিখল মকটেল। পেপসি। বাড়ীতে সফট ড্রিংক্স রাখা যায় এসব ছিল আমাদের ধারণার বাইরে। বাড়ীতে পাতা টক দৈয়ের ঘোলের স্বাদ ওরা পেল না। কি জানি লোডশেডিং, মাটির জালা, হাতপাখার বাতাস, ছাদে বসে বরফকুচি দেওয়া সীমিত শরবত এগুলোই বোধ হয় ভালো ছিল। তাই বুঝি এত গরম অনুভূত হতনা। আর কালবোশেখির প্রতীক্ষাও ছিল না। তিথি নির্ঘণ্ট মেনে ঠিক ঈশানকোণে মেঘ জমে উঠত। 
আর কালবোশেখি এলেই কাঁচা আম ঝরে পড়া? ঝড়ে আম কুড়োয় এখনো কোনো দস্যি ছেলে। তবে পথেঘাটে নয়। শিলাজিতের গানেই। এখন ওদের আর রাখাল সাজা হয় না। কারণ তারাও এখন চাপে। তাই ঠাম্মার কপালে ভাঁজ। আমকাসুন্দি বানাতে হবে। আমবারুণীর পুজো করতে হবে না গঙ্গায় গিয়ে?  কিন্তু কে কুড়োবে সেই আম। আম পাড়ার নেশা যে কি জিনিষ তা যে পেড়েছে সেই জানে। এখন রিয়েল এস্টেটের রমরমায় নেই সেই আমগাছ। নেই সেই আম রাজত্ব। বাজারের কেনা আমে সাধ মেটাও হে বঙ্গললনা। 
তাই কালবোশেখি আসুক আর না আসুক গ্রীষ্মকাল সমাগত!

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক"

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক" / পহেলা নেশা

আবার পহেলা নেশা। বাঙালীর বৈশাখ বিলাস। কি পেয়েছি আর কি যে পেলাম ভাববার অবকাশ নেই। 
একদিকে রাজনীতির রঙ্গ । পহেলা উত্তেজনার পারদ তুমুলে । অন্যদিকে তাপমাত্রার পারদ চড়চড় করে উঠছে সেই ভয়ে কুপোকাত বাঙালী। তবুও  বিরিয়ানি, পোলাও কালিয়া, কোর্মা, পটলের দোলমা, নতুন জামা, নতুন ছবি, নতুন ম্যাগাজিন আত্মপ্রকাশ, সিডি রিলিজ, বর্ষ বরণের ঢালাও আয়োজন । বৈশাখের আগমনী আর চৈত্রের স্মৃতি ঝেড়ে ফেলে আবার রবীন্দ্রজয়ন্তীর রিহার্সাল। কেন বাপু কাজকম্ম নেই ? পাড়ায় পাড়ায় রাজনৈতিক এজেন্ডা। মঞ্চ প্রস্তুত। শিল্পীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে প্রোগ্রাম। নামীদামী শিল্পীকে পার্টি ফান্ড থেকে সাম্মানিক দেওয়া হয় অবশ্যি। ছোট ছোট ম্যাগাজিনের বর্ষ পূর্তি সংখ্যা প্রকাশেও তাই। ছোট ছোট লেখক নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখবেন বলে কিনছেন । কি জ্বালা!
আর আছে অকালবোশেখির হঠাত মেঘ কিম্বা কালবৈশাখির পরিকল্পনা।সেটা অবিশ্যি ওপরওয়ালার। ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে বানভাসি বৈশাখ বিলাস বেল-জুঁই এর গন্ধ এ ভরপুর । বর্ষবরণ বা বৈশাখ-উত্সব চৌপাট তখন। যতসব!

আমরা বাপু নববর্ষের শুভ মহরত বুঝি নতুন খাওয়াদাওয়ায়। বাঙালির ঝালিয়ে নেবার পালা সেই চিরাচরিত বং-কানেকশান । যত‌ই ইংরেজী ছবি দেখি, ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করে অনর্গল কথা বলি আর গোগ্রাসে কন্টিনেন্টাল খাবারদাবার গিলি না কেন আদতে আমরা ঝোল-ঝাল-অম্বলের ভক্ত ।
আমারা যেমন নিউইয়ারে কেকও কাটি, দোলে ঠাণ্ডাইতেও চুমুক দি আবার পহেলা বৈশাখে কব্জি ডুবিয়ে বাঙ্গালী খানা খাই। এ বোধহয় আমাদের মত হুজুগে বাঙালির পক্ষেই সম্ভব ।কিন্তু হুজুগই কি শেষ কথা বাঙ্গালীর?
সেই পয়লা বৈশাখের দিন বাবার সঙ্গে দোকানের হালখাতার চিঠি নিয়ে, বরফকুচি দেওয়া কাঁচের গ্লাস উপচোনো অরেঞ্জ স্কোয়াশ আর বগল দাবা করে মিষ্টির বাক্স নিয়ে ফেরা? ঠাকুমার জন্য নিয়ে যেতে হবে সোনার গয়নার দোকানে নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার । দিদিমার জন্য বুকষ্টল থেকে নতুন পঞ্জিকা । সবচেয়ে মজা লাগত মাছের বাজারেও হালখাতার মৌরসী পাট্টা দেখে । সেদিন মাছবাজার ধুয়ে মুছে সাফ এক্কেবারে । লক্ষ্মী গণেশের একযোগে পুজোয় মাছের আঁশটে গন্ধ কাটানোর জন্যে ফিনাইল, ধূপ ধুনো । আর মাছওয়ালাও ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবী চড়িয়ে বসেছে জম্পেশ করে । আমি বাবার হাত ধরে লেসের ফ্রিল দেওয়া,  নতুন ছিটের নরম ফ্রকে ।   প্রথমবার গিয়ে ভেবেছিলাম সে বুঝি মাছ দেবে ফ্রি তে । সে গুড়ে বালি! পয়লা নাম্বার মিষ্টির বাক্স নিয়ে থরে থরে বসে আছে সেও ! তার মানে বুঝলাম মিষ্টিমুখ না করলে বাঙালির শুভ কাজ হয়না । এই ছোটখাটো বাঙালিয়ানা গুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে বহুযুগ ধরে। নিকুচি করেছে। এই নিয়েই পড়ে থাকল বাঙ্গালী। শুধু ধুয়ে ধুয়ে জল খেল আর পেট ফোলাল।

রেস্তোরাঁয়  বৈশাখী হেঁশেলের তোড়জোড়। মোচ্ছব সেখানেও। রসিক বাঙালীর বৈশাখী রসনা বিলাস। শুরুতেই কাঁচা আমের জুসের সঙ্গে ভদকার অভিনব ককটেল। অথবা তরমুজের লাল রসে পুদিনার সবুজ। ওপর থেকে আধ পেগ হোয়াইট রাম। যাকে বলে ফিউশান শরবত। তারপরেই লুচি, বেগুনভাজা, শাক-শুক্তো-ছ্যাঁচড়া-মুড়িঘন্ট। পরের দফায় ঘি ভাত, তপসে ফ্রাই। নির্গুণ, নির্গন্ধা বেগুণ দিয়ে বেগুণ বাসন্তী থেকে শুরু করে সারাবছর অচল পটলের দোলমা। ঘিভাতের কত রকম নাম হয় আজকাল! মোরগ পোলাও থেকে আফগানী জাফরানি মোতি পলান্ন। মানে পল অর্থাৎ মাংস মিশ্রিত অন্ন মানে যাকে বিরিয়ানি বলি আমরা। একই অঙ্গে ভাতের কত রূপ! সে কখনো দারুচিনি দেশে, কখনো মখমলি জুঁইফুলের বাগিচায়। মানে যাকে বলে সিনামন রাইস অথবা জেসমিন রাইস।
চিতলমাছের অনুকরণে গাছপাঁঠার মুইঠ্যা তো পনীর পসন্দ।  যশুরে তেল কৈ কিম্বা বরিশালী ইলিশ। কোথাও মৈথিলী ভেটকি, কোথাও আবার মাটন মনোহরা। শুধু চমকে যাওয়া নামের অভিনবত্বে।  আবার কোথাও মশলা মাখানো ভেটকি ফিলের পাতুড়ি কলাপাতায় আবার কোথাও লাউপাতায় ।
বাঙালী রেস্তোরাঁগুলো এই একটা মাস ষোলো আনা বাঙালী । মধুরেণ সমাপয়েত ম্যাজিক মিহিদানার বেকড ভার্সন  অথবা রসোগোল্লার পুডিং দিয়ে। অথবা  কোকো দিয়ে চোকোগোল্লার পাশাপাশি কফি গোল্লাও চলছে দিব্যি । এমন ইনোভেশনে আছে বাঙালী! সন্দেশের সঙ্গে ফ্রুট ফিউশানে কিম্বা জলভরা জলপরী কিম্বা দৈ কলসের ঠান্ডা ছোঁয়ায় । মাটির ছোট্ট কলসে প্রথমে দৈ, তারপর মাখা সন্দেশ আর টপিং এ গারণিশ করা এক চামচ রাবড়ি। পেস্তা কুচিয়ে দাও ব্যাস! অনবদ্য বং মিষ্টি । আর তারপরেও চালিয়ে দেওয়া যায় কেশরীয়া মালপোয়া কিম্বা গুলাবী জিলিপিকে। রামকৃষ্ণদেবের কথায় ভরাপেটেও জিলিপি জিভ থেকে টুকুস করে, অতি অনায়াসে গলার মধ্যে দিয়ে সোজা পেটে চালান করা যায় । যেমন খুব ভীড়ে লাটসাহেবের গাড়ির চাকা ফাঁকফোকর দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে যায় সাবলীল গতিতে। 
এসব রেস্তোঁরায় খেতে যায় বহু মানুষ পয়লা বৈশাখে। আমাদের তো আসলে রোজ রোজ বৈশাখী। রোজ রোজ পয়লা নম্বর ভুরিভোজ চাই-ই। মাদার্স ডে, ফাদার্স ডে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে' র মত বেঙ্গলি নিউইয়ার্স ডে আমাদের রোজ রোজ। বাকী যেটুকু করি সবটাই হুজুগে। তবে যাই বলুন মিডিয়ার দৌলতে পয়লা বৈশাখের একটা দিব্যি ব্র্যান্ড তৈরী হয়ে গেছে। সেটাই যা ভালোলাগার। গর্ব বোধ করার। কিন্তু এসব আর কদ্দিন! উত্তিস্থিত জাগ্রত বাঙ্গালী! বেলা বয়ে যায় যে!

এবারের বৈশাখী শ্লোগান ছিল নোট বাতিলের একবছর পর বাঙালির উত্থান । থুড়ি কেউ বলছে পতন । ডিজিটাল ভারতের স্বপ্ন দেখতে দেখতে  ডিজিটাল শপিংও করেছে বাঙ্গালী । বৈশাখে খাদ্যবিলাসেও সামিল হয়েছে । আমিও  হোমমেকারের হেঁশেলের চাক্কা বন্ধ করেছি পয়লা বৈশাখে। রাঁধছিনা, রাঁধবনা। স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ সব সঁপেছি  পয়লা বৈশাখকে।
এসব ত ভাল কথা কিন্তু এবার নতুন বছরের পহেলা রেজলিউশান কি হবে জানেন কেউ?

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক"

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক" / যদি মন চৈত্র সেলে, ফ্রকের ঝুলে

 " যদি মন মেঘলা দিনে ওড়ায় নিজের মন পাখীকে?' অথবা "যদি মন গড়িয়াহাটে চৈত্র সেলে ফ্রকের ঝুলে?'  
মনে পড়ে রূপঙ্করের সেই বিখ্যাত গান? আর হ্যাঁ, বছরের এই একটা সময় যদি মন আস্কারা পায় যখন তখন মাথায় চড়ে হাত পা ছোঁড়ে। চৈত্রসেলের জন্য । ভিনরাজ্যে গিয়ে থেকে তো দেখেছি । এই চৈত্তসেলের জন্যে ফাগুণ পড়তেই মন কেমন উশখুশ করে! আনচান করে। এমন সেলের পসরা কোথাও দেখিনি আমি ।
সেবার সেই বাম জমানায় সুভাষ চক্কোত্তির তাড়ায় অপারেশন সানশাইনের কবলে পড়ে রাতারাতি গড়িয়াহাট খালি। ফাগুণে সে বিরহব্যথা যে কি জিনিষ তা আমি হাড়েহাড়ে বুঝেছিলাম । কোথায় বাবার পায়জামার দড়ি! কোথায় গেল জামাকাপড় শুকোনোর ক্লিপ্! কোথায় পাই আমার সাধের জাঙ্ক জুয়েলারি, টিপ-ক্লিপ আর কুশন কভার? আর পয়লাবৈশাখে বাড়ির দোরে নতুন ডোরম্যাট? কিনব‌ না? বলুন ত? সব চাই যে আমাদের এই চৈত্রেই।
পথেঘাটে প্রাক্‌বৈশাখী প্রস্তুতি। চাদ্দিকে চৈত্তসেলের হাতছানি। নানান অফার বর্ষবিদায়ের আনন্দে। এক চিত্র গড়িয়াহাটার মোড়ে, হাতিবাগানের ধারে কিম্বা নিউমার্কেটের আশেপাশে । বছরের বস্তাপচা জিনিষ পত্তরের স্টক ক্লিয়ারেন্স সেল।  কোথায় লেডিজ প্রিমিয়াম টপস  "বাই ওয়ান, গেট ওয়ান' । কুর্তা, কুর্তি কেপরি, প্যালাজোয় প্রচুর ছাড় । কারে ছেড়ে কারে ধরি!  আনারকলি, নূরজাহান সকলেই আছেন এক ছাদের নীচে। শুধু অপেক্ষা পার্স খোলার।
পোলকা ডটের কুশন কভার, হালকা-পুলকা কস্টিউম জ্যুয়েলারি, প্যাস্টাল শেডের সুদৃশ্য বেডস্প্রেড এমন কি গৃহসজ্জার দৃষ্টিনন্দন আর্টিফ্যাক্টসও।  বুদ্ধ-গান্ধী-বিবেকানন্দ সকলেই উপস্থিত! সখের পোশাকী চটি জোড়া থেকে গুরুগম্ভীর স্নিকার্স, রান্নাঘরের ঘটিবাটি থেকে ময়লা ফেলবার ভ্যাট। সবেতেই সেল ।

কি ভালো আমার সেই হকার ভাইদের অমায়িক আমন্ত্রণ !  থরে থরে সাজানো সেলের পসরা। আর মধ্যে মধ্যে গলা ফাটিয়ে চীৎকার। মাঝবয়সী একজন আমাকে এখনো বৌদি বলে ডাকে। একবাক্যে জিনিষের দাম আর্ধেক করে হাসিমুখে বলে, নিয়ে যান, পরে দাম দেবেন। এত আন্তরিকতা কোথায় পাব বলুন ত ? তাই ওদেরি আমার এত পছন্দ।
মায়ের জন্য ফাইন মলমলের ফুল ফুল ছাপাশাড়ি আর শ্বশুরমশাইয়ের হাফপাঞ্জাবি না হয় কিনলাম দোকান থেকে। তাই বলে নিজের হাউসকোট কিম্বা কাজের মেয়ের ম্যাক্সি? কক্ষণো নয়। বেঁচে থাক আমার ফুটপাথ! আমার প্রাণের মাঝে চলে গেলে আর পাব না তারে। আর ওখানে কেনার চার্মটাই আলাদা! কত্ত চয়েস! কত্ত আন্তরিকতা হকার ভাইদের! এদের চাকরীবাকরী জোটেনি তাই হকার দলে নাম লিখিয়েছে এরা। এই আমিও ত টুকটাক লিখি আর টিউশানির পয়সায় আমার গুড টাইমপাস করি চৈত্র সেলে ।বড়বড় দোকানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত উইন্ডোয় চোখ রাখি আর উইন্ডো শপিং করি। কিন্তু কিনি ফুটপাথ থেকে। আমার হকার ভাইটিও বি এ পাস করে হকার হয়েচে। গর্বের সঙ্গে বলে সে। তাই আমি এদেরকেই পেট্রনাইজ করি। আমার এই হকার ভাইকেই খুব দরকার এই চৈত্তসেলে, কুর্তির ঝুলে। এইজন্যেই তো পড়ে র‌ইলাম কলকাতায়। ম্যাটিনি শোয়ে সিনেমা দেখে লেবু চা খেয়ে বিকেলে নন্দন চত্বরে কবিতা পড়ব আর ফেরার পথে সেলের পসরায় ঢুঁ মারব একটিবার। এই ত জীবন।

এই শহরটার জন্মলগ্নে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৃহস্পতি তুঙ্গে জানেন তো? তাই কর্তা অফিস ফেরত নামেন বালিগঞ্জ স্টেশনে, গিন্নী নামেন গড়িয়াহাটে। তারপর ছুঁচোয়  ডন বৈঠক দেওয়া পেটে ঐ ফুটপাথের এগরোল কিম্বা চাউমিন, মোমো কিম্বা ফিশফ্রাই সাবাড় করে চৈত্তসেলে পথ পেরোন তাঁরা। আহা কি আনন্দ তখন সেই পথ চলায়! যিনি মেট্রো করে নামেন রাসবিহারী তাঁর জন্য আছে রাসবিহারীর বিস্তীর্ণ দুপারের প্লাসটিক বালতি, মেলামিনের বাসন থেকে কাটগ্লাসের সুরাপাত্র, বাথরুম সেট, পুরণো ম্যাগাজিন থেকে পাইরেটেড সিডি, রেডিমেড ব্লাউজ, সায়া থেকে শার্ট-প্যান্টের পিসে ঢালাও সেল। কি চাই! রাসবিহারীর মোড় থেকে রসা রোডের দিকে কালীঘাট  পেরিয়ে হাজরা আর এপাশে দেশপ্রিয় পার্ক পর্যন্ত সেলে ডুবে আছে মহানগরী। ভেতরের জামা, বাইরের জামা, পর্দার কাপড়  সবেতেই সেল। গয়নার মজুরি ফ্রি। আবার সোনা কিনলে সম ওজনের রূপো ফ্রি! ভাবা যায় এইআসন্ন পয়লা বৈশাখে চৈত্র সেলের  কি মহিমা?

ওদিকে গেরস্ত বঙ্গললনার এখন টেলিভিশনে মাস্টারশেফ দেখেবড় সাধ জাগে একবার কন্টিনেন্টাল বানানোর। বিশ্বায়নের ঢেউ লাগা রাস্তার আনাচেকানাচে  এখন বাটন মাশরুম থেকে বেবিকর্ণ, সুইট কর্ণ থেকে ব্রকোলি, তেরঙ্গা সিমলা মির্চ কি না পাওয়া যায়!
কেউ নামেন শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনে। তাঁর গার্ল ফ্রেন্ড হয়ত কলেজ ফেরত আসেন সেথায়। তারপর শুরু হয় সেল পরিক্রমা। আদিগন্ত হাতীবাগান জুড়ে সেল, সেল, সেল।
আর সে যুগে যারা স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের অমোঘ বাণীকে পাথেয় করে ব্যবসায় নেমেছিলেন তাদের দোকানে হাহুতাশ! নিউমার্কেটে তারা নাকি অবস্থান করছেন হকারদের বিরুদ্ধে। আরে বাবা ! বোঝেনা সে বোঝেনা।  তার বাপ-ঠাকুরদার এদ্দিনের ব্যাবসাপাতি নাকি হকারদের কল্যাণে লাটে ওঠার উপক্রম! ক্রেতা বলেন  যেখানে সস্তা পাব, সেখানে যাব। বিক্রেতা বলেন এসি দেব, জিএসটি নেব, রসিদ দেব। আর নেতা বলেন হকার আমার মাটি। হকার আমার ভোট। হকার আমার ভাগ্যনিয়ন্তা। "সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই".... চন্ডীদাসের অমোঘ বাণী । সুভাষবাবুর অপারেশন সানশাইনের পর হকার পুনর্বাসন হয়েছিল। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি জানেন? কেউ যায়নি নতুন বাড়িতে। ক্রেতা খোঁজে সস্তার জিনিষ। বিক্রেতা চায় বিকোতে। কারণ এ শহরে শিল্পের জোয়ার আসেনি তেমন করে। তাই ইকনমিক গ্রোথ নেই । তাই ক্রয় ক্ষমতা বাড়লনা বোধহয়। তাই ফুটপাথেই উঁকিঝুঁকি আর হাতড়ে মরা সাধের জিনিষগুলোর জন্যে।
ওদিকে উঁচু উঁচু শপিং মলের বাতানুকুল বায়ুমন্ডলে ম্যানেকুইন ডুকরে কাঁদে। পথিক আসে দর্শক হয়ে। চোখ বুলায়, হাত বুলায়। পিছন পানে চায়।

যুগশঙ্খ "রবিবারের বৈঠক"

৩ এপ্রিল, ২০১৮

কর্ণাটকের আনেগুডি গ্রামে মধ্যাহ্ন ভোজনে

তুঙ্গভদ্রা নদী

কিস্কিন্ধ্যা হেরিটেজ ট্যুর। আদিবাসীদের প্রত্যন্ত আনেগুডি গ্রামে পায়ে হেটে ঘুরে দেখা। জোয়ার বাজরার খেত। একটু সবুজ ধান জমি। আধটু আখের বন, কলাগাছের সারি। ভাঙ্গা পরিত্যক্ত মন্দির। আর তারপরেই স্থানীয় ননদ ভাজের একটুকরো ঘরে ঢুকে আতিথেয়তা প্রাপ্তি। হাত ধোয়ার জল, গামছা। তারপর দ্বিপ্রাহরিক ভোজে আপ্যায়ন। কড়িবরগার ঘরের মাথায় আকাশ আলো থেকে চুইয়ে পড়া রোদে ভেসে যাওয়া খাবার টেবিল। সারে সারে তামার ঘড়া, কলসী তাকে তোলা। আর তারপর? থালার ওপর কলাপাতায় লেবুর মিষ্টি আচার, বাদাম গুঁড়ো। বাজরার তুলতুলে পরোটা।আর পঞ্চ ব্যঞ্জন, লেবু ভাত, টক দই, স্টার ফ্রায়েড স্প্রাউট উইথ তড়কা " উসলি", রসম, রেড সয়াবিন বা লোবিয়া র পদ, কারামনি কাড়লু আর সদ্য খেত থেকে তুলে আনা অনবদ্য খুদে বেগুণের গা মাখা কারী। মধুরেণসমাপয়েৎ শুকনো খোলায় নেড়ে নেওয়া অড়হর ডাল বাটা আর গুড় এর পুর ভরা ঘিয়ে ভাজা পরোটা মিষ্টি বা পূরণ পলি দিয়ে। মেয়েটি হাল্কা হাতে নরম চোখে একটু ঘিয়ের ছিটে দিয়ে দিল।



১৯ মার্চ, ২০১৮

যিনি বাসন্তী তিনিই অন্নপূর্ণা আবার তিনিই মা দুর্গাশোকা

এইসময় ১৯ শে মার্চ ২০১৮

 বাসন্তীপুজো এবং অথ অশোকষষ্ঠী কথা

আমাদের দেশে শীতের শেষে চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে মাদুর্গার পুজোকে বাসন্তীপুজো বলে। শাস্ত্রে শরত ও বসন্ত এই দুই ঋতুকে বলা হয় "যমদংষ্ট্রা" অর্থাত এই দুই ঋতুতে মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধি ভোগ করে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। শরত এবং বসন্ত এই দুই ঋতুর আগমনেই ভারতবর্ষের মত গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী তাই আবির্ভূতা হন এই দুই সময়ে।
সূর্যের গতিপথে সূর্য ছয়মাস উত্তরদিকে ও ছয়মাস দক্ষিণদিকে গমন করে। উত্তরায়নের সময় দেবকুলের দিন আর দক্ষিনায়নে তাদের রাত্রি।
 বসন্তকালেই দুর্গাপূজা নির্দ্দিষ্ট ছিল কারণ এই সময় সূর্যের উত্তরায়ণের ফলে দেবতারা জাগ্রত থাকেন। কিন্তু  শরতকাল হল সূর্যের দক্ষিণায়নের সময়। রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য এইসময় দেবতাগণকে জাগ্রত করে দুর্গাপূজা করেছিলেন। তাই রামচন্দ্র প্রবর্তিত শরতকালীন দুর্গাপুজোকে অকালবোধন বলা হয়।  
শস্যাধিষ্ঠাত্রী দেবীর আরেক নাম শাকম্ভরী।  একবার দুর্ভিক্ষের সময় দেবী দুর্গা তাঁর অর্থাত পৃথিবীর সমস্ত উত্পন্ন শাক দিয়ে জগত পালন করেছিলেন। শাককে এখানে সমস্ত প্রকার শস্যের প্রতিনিধি বলা হযেছে।  দেবী শাকম্ভরীর আরেক প্রকাশ হল অন্নপূর্ণা বা অন্নদা। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। 
পন্ডিতেরা আমাদের অন্নপূর্ণা ও দুর্গার সাথে মিশরের আইসিস ও গ্রীসের সিরিসের সাদৃশ্য খুঁজে পান। সিরিয়া, গ্রীস, সাইপ্রাস, এথেন্স ও ক্রীটে আমাদের দেশের মত শস্যদেবীর পূজা দেখা যায়। শরতকালে বাসন্তী বা দুর্গাপূজার মত পাশ্চাত্যে ইস্তারাদেবীর পূজা হয়। এই ইস্তারাদেবীর রূপটি অনেকাংশেই আমাদের দুর্গার মত। তিনিও সিংহারূঢ়া ও অসুর নিধনে মগ্ন। এই ইস্তারাদেবীর উত্সব সেখানে হয় বসন্তকালে ইষ্টারের সময়। মন্ডি থার্সডে , গুডফ্রাইডে, হোলি স্যাটারডে, ইষ্টার সানডে ও ইষ্টার মানডে এই পাঁচদিন ধরে আমাদের দুর্গাপুজোর মত উত্সব চলে। 

বাসন্তীপূজার দিন পশ্চিমবাংলার রীতি অশোক ষষ্ঠী পালনের। কি এবং কেন এই অশোক ষষ্ঠী?  




বহুযুগ আগে অশোকবনের মধ্যে এক ঋষির পর্ণকুটীর ছিল ।

একদিন সেই ঋষি স্নান সেরে ফেরার পথে অশোকগাছের নীচে এক সদ্য প্রসূতা কন্যাকে কাঁদতে দেখলেন । দৈবযোগে ধ্যানের মাধ্যমে ঋষি জানতে পারলেন কন্যাটি এক শাপভ্রষ্টা হরিণী মায়ের । ঋষি মেয়েটিকে আশ্রমে এনে লালন করতে লাগলেন । তার নাম দিলেন অশোকা । ঋষিকন্যা বড় হতে লাগল । যৌবনে উত্তীর্ণ হল  ।

এক রাজপুত্র মৃগয়ায় বেরিয়ে ঐ পরমাসুন্দরী অশোকাকে একদিন দেখতে পেয়ে তার পরিচয় জানতে পারলেন । ঋষিকন্যার সঙ্গে রাজপুত্রের কথোপকথনের মধ্যেই ঋষির আগমন হল সেই স্থানে । রাজপুত্র অশোকার পাণিপ্রার্থী হয়ে ঋষিকে অনুরোধ জানালে ঋষি যারপরনাই আনন্দিত হয়ে তাতে সম্মতি দিলেন ।

অশোকাকে রাজপুত্রের হাতে সঁপে দিয়ে ঋষি বললেন  :

" আজ থেকে তুমি রাজার ঘরণী হ'লে কন্যা । যদি কখনো বিপদে পড় আশ্রমে চলে এস । আর রাজপুরী থেকে চিনে একাএকা এই আশ্রমে যাতে আসতে পারো তাই এই অশোকফুলের বীজ তোমাকে দিলাম । এখন যাবার সময় এই বীজ ছড়াতে ছড়াতে যেও । পরে কখনো প্রয়োজন হলে এই বীজ থেকে উত্পন্ন অশোকগাছ বরাবর   চিনে পায়েহেঁটে তুমি চলে আসতে পারবে "

অশোকফুলের বীজ  সযত্নে আঁচলে বেঁধে নিয়ে অশোকা রাজপুত্রের সাথে পতিগৃহে যাত্রা করল । যাত্রাপথে বীজ ছড়াতে ছড়াতে চলল অশোকা । রাজপুরীতে পৌঁছালে রাজা-রাণী সস্নেহে তাদের বরণ করে ঘরে তুললেন । অশোকা আর রাজপুত্রের বাড়বাড়ন্ত সংসারে সুখের বন্যা । অশোকা ক্রমে সাত ছেলে ও এক মেয়ের মা হল । অশোকার শ্বশুর রাজামশাই মারা গেলেন শ্রাদ্ধের দিন অশোকষষ্ঠীর কথা বিস্মৃত হল অশোকা । ভাত মুখে দিয়েই মনে পড়ল ষষ্ঠীর কথা । রাতে শুয়ে পড়ল মনখারাপ নিয়ে । পরদিন ভোরে উঠে দেখল সাতছেলে-বৌ যার যার ঘরে মরে পড়ে আছে আশোকা তা দেখে ঋষির কথা ভাবলে । রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আশ্রম বরাবর চলতে লাগল ।

ততদিনে বীজ থেকে অশোকগাছ মহীরুহের আকার ধারণ করেছে । চৈত্রমাসে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে তার শাখাপ্রশাখা । ঋষির আশ্রমের কাছে এসেই  অশোকা ঋষিকে দেখে কেঁদে উঠলো । ঋষি ধ্যানের বলে সব অবগত ছিলেন । কন্যাকে সাথে করে রাজবাড়ী ফিরে গেলেন । কমন্ডুলু থেকে জল ছিটিয়ে  দিলেন  অশোকার মৃত ছেলে বৌ নাতিপুতির গায়ে  । দৈবগুণে সকলে চোখ মেলে চাইল ।

ঋষি বললেন অশোকষষ্টীর ব্রত পালন করলে  কখনো শোক প্রবেশ করবেনা সংসারে ।

২৬ ফেব, ২০১৮

চাঁচর

দোলের আগের দিন চাঁচরের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছি সেখানে বাপ-বেটার ইগো, পিসির মায়াচাদর বা invisible cloak, অধুনা suicide bomber ব্যাবহারে উদ্দিষ্ট কে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র..... সব মিলিয়ে মিশিয়ে...
এইসময় ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০১৮

৪ ফেব, ২০১৮

ত্রিধারা উপন্যাস বইমেলা ২০১৮


স্বনামধন্য সাহিত্যিক সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ধানসিড়ির কর্ণধার শুভ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে 

সেবন্তী ঘোষ, যশোধরা রায়চৌধুরী এবং সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে 

নব্ব‌ইয়ের দশকের দুই লেখকের সঙ্গে 
নবনীতা দি' র সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া ত্রিধারার আনন্দ
প্রখ্যাত সাহিত্যিক অমর মিত্র এবং জয়ন্ত দের সঙ্গে ধানসিড়ির স্টলে

প্রিয় কবি জয় গোস্বামী প্রথম কবিতার ব‌ইপ্রকাশ করেছিলেন ২০০৯ এ। আবারো ২০১৮ ব‌ইমেলায় দ্বিতীয় উপন্যাসের সঙ্গে
দেশ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন 
দৈনিক যুগশঙ্খে ত্রিধারার প্রথম রিভিউ 

  



দ্বিতীয় রিভিউ- সংবাদনজর দৈনিক এ ৬ই ফেব্রিয়ারি ২০১৮
ব‌ইমেলা বাইট(১)

ব‌ইমেলা বাইট(২) 

৩১ জানু, ২০১৮

ও চাঁদ !!!

রেকটু বাকী। কিসের? চাঁদটাকে এইবারে পুরোটা ঢেকে দিল রে! কে ঢেকে দিল? কে আবার?পৃথিবীকে ঘুরতে ঘুরতে যখন চাঁদ ও সূর্যের মাঝে চলে আসে তখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে। কলায় কলায় প্রকাশিত পূর্ণচন্দ্রের ষোলো কলা পূরণ হল আর তারপরেই ক্রমে ক্রমে তা অমাবস্যার চাঁদের মত হয়েও গেল। ব্যাস্! আর দেখা গেল না চাঁদটাকে। চাঁদ তুমি এবার সামলে রেখো তোমার জোছনা কে। নয়ত হবে পূর্ণগ্রাস। 
নিথর নিস্পন্দ প্রকৃতি। গাছের পাতা নড়ছেনা। পাখীরা বাসায় ফিরে গেছে অনেক আগেই। তাদের নেই কোনো কিচিরমিচির। গরু বাছুর, ছাগল কুকুর যে যেখানে ছিল তারাও কেমন করে বুঝতে পারে গ্রহণের পূর্বাভাস। ভরা পূর্ণিমার এ কি বিষণ্ণতা? অমাবস্যার মত ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিক। কোথায় গেল আমাদের চন্দ্রবিলাস? পূর্ণচাঁদের মায়া? ও আমার চাঁদের আলো! আমার পূর্ণশশী, তোমার দেহের সব কলঙ্ক মোচন হয় এভাবেই।
চন্দ্র শুনেছি মাতৃকারক গ্রহ। তোমার কলঙ্ক মোচনের সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার সব মায়েদের কলঙ্ক মুছিয়ে দাও হে চাঁদ। কেউ বাজাল শাঁখ। কেউ ফেলে দিল রান্নাঘরের ঘড়া ভর্তি জল। কেউ রান্নাবান্না করবে না। কোনো শৌচালয়ে প্রবেশ নিষেধ। মল-মূত্র ত্যাগ চলবেনা। কত্ত নিয়ম গেরণ লাগলে।  ভরা পোয়াতি মায়েরা কেউ সেলাই ফোঁড়াই করবে না। তাহলে সন্তানের অঙ্গের কোথাও না কোথাও সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকবে। কেউ খাবার মুখে দেবে না। খাবারদাবারে তুলসীপাতা ছাড়াবেই ঠানদিদিরা। তারপর শুদ্ধ হবে গঙ্গার জল ছিটিয়ে। চাঁদে গেরণ লেগেছে। সাইরেন বাজল বুঝি। গ্রহণ লাগল। গ্রহণ ছাড়লে আবার রান্না খাওয়া, জল ভরা। ওরে চাঁদ আছে বলেই আছে আমাদের মন। চাঁদ আছে বলেই আমাদের যত আলো-আঁধারি। একে মাঘী পূর্ণিমা তায় চন্দ্রগ্রহণ। এর তিথিমাহাত্ম্য নাকি জোরালো। তাই তো এ চাঁদ যে সে নয়। সুপারমুন বা নীলচাঁদ। তবে চাঁদ মোটেও নাকি নীল হবে না। জ্যোতির্বিদরা কত ছবি তুলবেন। চান্দ্র গহ্বরের গুরুত্ব অপরিসীম এঁদের কাছে।
সৌরজগতের গঠন পর্বে প্রচুর গ্রহাণু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। পরে এদের বেশির ভাগকেই নিজেদের বুকে টেনে নেয় দেবগুরু বৃহস্পতি ও শনি। বাকিরা এখনও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সেগুলি মাঝেমধ্যেই ছিটকে চন্দ্রের গায়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে। পৃথিবীর দিকে উল্কা ছুটে এলে বায়ুমণ্ডলে ঢোকার পরেই তা দ্রুত জ্বলে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু চাঁদে বায়ুমণ্ডল না-থাকায় তুলনায় ছোট মাপের উল্কা বা গ্রহাণুও প্রবল গতিতে ছুটে গিয়ে আছ়ড়ে প়ড়ে এবং প্রবল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তৈরি করে নানা মাপের গহ্বর।তাই সদ্যজাত গহ্বরের ছবি উঠছে এখন। কি বাঙ্গালি বলবেন না? হ্যাপি লুনার এক্লিপ্স কিম্বা হ্যাপি ওয়ালি সুপার মুন? কিম্বা ব‌ইমেলা প্রাঙ্গণ থেকে সুপারমুনের সঙ্গে সেল্ফি তুলে পোষ্টাবেন না? থেমে আছেন কেন? এই তো সুযোগ ছবি পোষ্টানোর।

১৩ জানু, ২০১৮

পোষের শীত পিঠের গায়


ত্তুরে হাওয়ায় ভাসতে শুরু হয়েই ফুরিয়ে যায় আদরের শীতের পৌষের ডাক। লেপ বালাপোষের ওম নিতে নিতেই উধাও হয় অমৃত কমলার মিষ্টি দুপুর। তবে শীতের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে বসে চষি পাকানো, মোয়া গড়া কিম্বা পুলিপিঠে গড়তে গড়তে মেয়েলি গল্প? তা কিন্তু ফুরোয়না। বছরের পর বছর জি‌ইয়ে থাকে বাংলার গৃহিণীদের হাতের যাদুতে আর জয়নগরের মোয়ার শীতের প্যাকেজে।  কথায় বলে "মাঘের শীত বাঘের গায়'  আর পোষের শীত ? খেজুরের গুড়ে, পিঠেপুলিতে, নলেনগুড়ের পায়েসে আর পাটালীতে। 

আমাদের দুই বাংলাতেই অপর্যাপ্ত খেজুর গাছ আর তার হাত ধরে কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে  ঘুম ভাঙে কোলকাতায় । হ্যালোজেন নিভে যায় । আমি কান পেতে র‌ই । উশখুশ প্রাণ বলে, খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন  । মফস্বলের দিকে ভোরবেলায় অন্ধকার থাকতেই "চাই রস"  বলে সেই বিখ্যাত হাঁক? এখন আর শুনি ক‌ই?  রোদ বাড়ার সাথেসাথেই খেজুর রস গেঁজে তাড়ি হয় । সেই খেজুর রস জাল দিয়ে প্রথম দফায় পয়রা বা পয়লা গুড় আমাদের বড্ড প্রাণের। এ যেন অল্পদিনের অতিথি। একে ছেড়ে দিলে আর পাবনা সারাটি বছর তাই যতই  দাম হোক গেরস্থ তার সাধ্যমত একটি ছোট্ট মাটির নাগরী  খড়ের বিঁড়ের ওপর বসিয়ে বাড়ি বয়ে আনবেই। রান্নাবান্নার ঝুটঝামেলা নেই। রুটি, লুচি, পরোটা দিয়ে দিব্য চলবে পয়লাগুড়। বিদেশের মেপল সিরাপ যেন। ওরা খায় প্যানকেক, ওয়েফল দিয়ে। 
তারপর সেই খেজুর রস জাল দিয়ে ঘন করে মাটির সরার মধ্যে থরে থরে পাটালি গুড় তৈরী হয়। কিছুটা আধাঘন গুড় বিক্রী হয় খেজুরের গুড় হিসেবে। সেটা বেশ অনেকদিন রেখে খাওয়া যায়। মূলতঃ পৌষমাসের সেরা উত্সব মকরসংক্রান্তিতে সেই খেজুরের গুড় দিয়েই পিঠেপুলি বানানো হয়। মোয়া তৈরী হয় হরেক কিসিমের। নবান্নের নতুন ধানের গন্ধ তখনো লেগে থাকে চিঁড়ে, মুড়ি আর খ‌ইয়ের গায়ে। নতুন ধান আর নতুন গুড়ের সুঘ্রাণে পরতে পরতে শীতের রূপ হয় খোলতাই।  পৌষলক্ষীর বরণডালা উপচোয়  সোনার ফসলে। আনন্দে কবি বললেন, মরি হায় হায় হায়। এতে মরার একটাই কারণ কাজের চাপে শীত ফুরায়। আর শীত ফুরোলে কি আর থাকে বাঙালীর কপালে? চলে যায় মরি হায় নলেন গুড় আর চালের গুঁড়ির জম্পেশ কেমিষ্ট্রি।  
 আমাদের ঘটিবাড়ি খুলনা জেলার সাতক্ষীরার ঐতিহ্য মেনে এখনো পৌষসংক্রান্তিতে নতুন ধান দিয়ে পৌষলক্ষীর পুজো করে। আর সেই পুজোয় মুখ্য ভোগ হল নতুন গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে  নলেন গুড়ের পায়েস আর তার মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া তুলতুলে নরম দুধপুলি। মা লক্ষী কৃপা করলে সারাজীবন ধরে বংশ পরম্পরায় যেন এই ভোগ নিবেদন করা যায়, এমনি বিশ্বাস ছিল আমাদের ঠাকুমার। নতুন গুড়ের পায়েসের গন্ধে শিকেয় উঠত জ্যামিতি পরিমিতি ।
পুলিপিঠে বানাতে বসে ঠাকুমা বলতেন রিভেঞ্জ নেবার এক গল্প। 
এক দজ্জাল শাশুড়ি তার নিরীহ বৌমাটিকে অত্যাচার করত। দাপুটে শীতে গাদা গাদা পিঠে বানাতেই হত। একদিকে সংসারের সমস্ত কাজ, তায় আবার একাধিক কাচ্চাবাচ্চা সামলিয়ে নিদারুণ শীতে নিজের পিঠে পিঠে রাঁধার চাপ নিতে হত। বৌটি মুখে প্রতিবাদ করতে পারতনা। এক শীতে সে ঠিক করল দুধ ঘন করে, পাটালী দিয়ে ফুটিয়ে নিয়ে এক জব্বর দুধপুলি বানিয়ে শাশুড়িকে খাইয়েই ছাড়বে। রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘরের আশপাশ থেকে ছোট্ট ছোট্ট দুধসাদা নেংটি ইঁদুর ধরে এনে সেই ফুটন্ত দুধের পায়েসের মধ্যে ফেলে দিল ইঁদুরগুলিকে। অন্ধ শাশুড়িকে শীতের রাতে জামবাটি ভরে সেই দুধপুলি খেতে দিল। শাশুড়ি হাত ডুবিয়ে সেই নরম তুলতুলে পুলি খায় আর ইঁদুরের লেজগুলি ছুঁয়ে বলতে থাকল,
' কালে কালে কত‌ই হল, পুলিপিঠের লেজ গজালো '  
এমন কাহিনী আজ হয়ত অচল । বদলেছে শাশুড়ি-বৌয়ের গল্প অন্য আঙ্গিকে। তবে পিঠেপুলি বানাতে বানাতে এমন মুখরোচক গল্প শোনাটাও ছিল আমাদের উপরি পাওনা। 
আর এইসব কাহিনীর জন্যেই বুঝি লোকমুখে ছড়িয়ে গেল
 "কারও পোষ মাস, কারও সব্বনাশ " এর মতন প্রবাদ।

পৌষসংক্রান্তির আগের দিন থেকে পরের দিন অর্থাত মোট তিনদিন ধরে চলে আমবাঙালীর পিঠে-উত্সব। দুধ, নারকেল আর নতুনগুড়ের বিক্রিবাটরায় হৈ হৈ  তলা লেগে যাওয়া ঘন দুধের গন্ধে ম ম করা ঘরবাড়ি আর বার্কোশ পেতে কুরুনিতে নারকেল কোরার খসখস শব্দ?
  
মামারবাড়িতে দিদিমার সে এক হৈ হৈ জগ্যি পৌষসংক্রান্তির দিনে।  বিশাল রান্নাঘরের মধ্যে কয়লার উনুন জ্বলছে গাঁকগাঁক করে। দুটো  ষন্ডামার্কা লোক বড়বড় কাঠের বার্কোশে কলাপাতা বিছিয়ে নারকেল কুরছে। উনুনে কালো লোহার কড়াইতে দুধ ঘন হচ্ছে।  আগের রাতে ভেজানো নতুন চাল শিলে বাটছে দুজন মেয়ে। এবার সেই চালের গুঁড়ি ঠাণ্ডা জলে মসৃণ করে গুলে ঘি দিয়ে উনুনে বসিয়ে নাড়া । এবার সোনার মত চকচকে করে মাজা পেতলের পরাতে ঘি মাখিয়ে সেই চালের মণ্ড ঢেলে দিলেন দিদিমা । সাথেসাথে ঠাণ্ডা হাতে গরমের ওম মেখে, ময়দা মাখার মত ঠেসে নিলেন সেই চালের মণ্ড। ছোট ছোট লেচি বানিয়ে ভেজা মসলিন কাপড়ে ঢেকে রাখলেন তা। ততক্ষণে কালো লোহার কড়াইতে খেজুরের গুড় জাল দিয়ে নারকেল মিশিয়ে ছেঁই প্রস্তুত। বাড়ীর কচিকাঁচাদের হাতে নারকেল নাড়ু সম সেই ছেঁই চাখার জন্য একটু করে দেওয়াও হল । এই ছেঁই হল পিঠের পুর। এই বানিয়ে রাখা হল। চলবে একমাস ধরে। ছেঁই ঠাণ্ডা হতেই চালের মণ্ডের লেচি হাতের তেলোয় নিয়ে একটু করে ছেঁই ভরে পুলিপিঠের মুখ বন্ধ করার পালা। ফিডিং বোতলের আকারে আলতো হাতে ছোট্ট ছোট্ট পুলি গড়ে ফেললেন দিদিমা তাঁর শৈল্পিক অনুভূতিতে।   আধাঘন  ফুটন্ত দুধে সেই  পুলিগুলো ছাড়লেন  ধীরে ধীরে । আর হাতা দিয়ে  আলতো করে মাঝেমাঝে নেড়ে দিলেন ।  কি সুন্দর হেঁশেল পারিপাট্য! খেজুরের গুড় ভর্তি বয়াম থেকে পরিমাণ মত গুড় দুধে ফেলে সমান ভাবে মিশিয়ে দিলেন ।  সারাবাড়ি ম ম করছে দুধপুলির আগাম আগমনীবার্তায়  ।  ক্ষীরসমুদ্রে ভাসমান পুলি নিয়ে তখনো সংশয়ে দিদিমা। পুলি ফেটে গেলে চূড়ান্ত ডিস্ক্রেডিট।  সেই দুজন ষন্ডামার্কা লোক এসে পেল্লায় লোহার কড়াইটাকে নামিয়ে দিল মাটিতে।

কিছু পুলিপিঠে  গড়ে রাখা হল সেদ্ধ বা ভাপানো হবে বলে। সেদ্ধপুলি হল বাঙালীর মিষ্টি মোমো। পেল্লায় হাঁড়ির মুখে জল ফুটবে। আর সাদা নরম কাপড়ে পুলিগুলোকে বেঁধে হাঁড়ির মুখে স্টীমারে ভাপানো  হবে। তারপর সেদ্ধপুলি খাওয়া হবে বাটি ভর্তি করে পাতলা পয়রাগুড়ে চুবিয়ে। 

কিছুটা চালবাটা আর কলাইয়ের ডালবাটা মিশিয়ে রাখা হল একটি গামলায়। তা দিয়ে বানানো হবে সরুচাকলি। দক্ষিণী দোসার অনুরূপে পাতলা পাতলা সেই দোসা খাওয়া হবে পৌষসংক্রান্তির রাতে। আবারো পয়রাগুড়ে চুবিয়ে। পিঠে উত্সবের মধ্যমনি হল পাটিসাপটা। ঐ যে নারকোল আর খেজুর গুড়ের ছেঁই বানিয়ে রাখা হল সেই ছেঁইতে একটু খোয়া ক্ষীর মিশিয়ে মসৃণ করে আরেকটা রাজকীয় কেমিষ্ট্রি তৈরী হল । সেটি হল পাটিসাপটার পুর। এবার পাটিসাপটার ব্যাটার বা গোলা তৈরীর পালা।  আমাদের ঘটিবাড়ির পাটিসাপটা এতটাই নরম ও তুলতুলে হয় যে তা পরেরদিনও দিব্যি গরম করে নিয়ে খাওয়া যায়। আর এখন ফ্রিজের দৌলতে গোলা বানিয়ে ঠান্ডায় রেখে দিলে রোজ বানিয়ে খাওয়া যেতেই পারে গরমাগরম এই পিঠে। গোলার কেমিষ্ট্রি তৈরী হয়  ঠান্ডা দুধ, সম পরিমাণ সুজি-ময়দার মসৃণ মিশ্রণে সামান্য চালের গুঁড়ো, একটু পাতলা খেজুর গুড় আর অল্প ঘি দিয়ে ।  ঠিক ভাজার পূর্ব মূহুর্তে গোলায় ছড়িয়ে দাও বড়দানার সামান্য চিনি।  কারণ  গোলারুটিতে একটা ফুটোফুটো ভাব আনার জন্য। এখন ছুটছি সকলে। তাই টেফলন‌ই ভরসা। বেশ করে ননস্টিক তাতিয়ে নিয়ে বেগুনের বোঁটায় করে ঘি মাখিয়ে নেওয়া আর হাতায় করে গোল দেওয়ার পর দেশলাই বাক্সের খোলের ভেতরটা  দিয়ে সেটিকে ডিম্বাকৃতি রুটির আকার দেওয়া। এবার পাতলা সেই গোলারুটির ধার দিয়ে সামান্য ঘিয়ের ছিটে দিয়ে কম আঁচে ভেজে নিয়ে  আগে থেকে বানিয়ে রাখা রাজকীয় পুর চালান হল। তারপর কাঠের তাড়ু দিয়ে হাতের কৌশলে পাশবালিশের আকারে পাটিসাপটা মুড়ে নিতে পারলেই হল বাঙালীর মিষ্টি প্যানকেক।  আজকাল বাজারে যে পাটিসাপটা বিক্রি হয় সেগুলি ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যায়। এর কারণ হল ময়দা বা সুজির পরিবর্তে জলে গোলা চালের গুঁড়ি। 

কখনো খাও ক্ষীর সাঁতারে ডুব দেওয়া দুধপুলি। কখনো কামড় বসাও পাটিসাপটায় অথবা হালকা মিস্টির স্বাদ নিতে সরুচাকলিতে।  আমাদের আড়িয়াদহের বাড়ীতে  ঠাকমা বানাতেন রসবড়া।  বিউলির ডাল বাটার ঘন ব্যাটারে, মৌরী আর সামান্য চিনি ছড়িয়ে ( ফাঁপা করার জন্য) সরষের তেলে ভেজে নিতেন বাদামী রংয়ের টোপা টোপা রসবড়া। এটা হল ভাজার গুণ। কম আঁচে মুচমুচে করে ভাজতে হবে, যাতে খেজুরগুড়ের পাতলা রসে ফেললে বড়া আরামে না নেতিয়ে পড়ে । এবার খাও কে কত খাবে।
আরেকটি পিঠে আমাদের ঘটিবাড়ির স্পেশ্যাল। তা হল মুগসামালী। শুকনো খোলায় ভাজা সোনামুগ ডাল সেদ্ধ করতে হবে এমনভাবে যাতে ডাল গলে ঘ্যাঁট না হয় আর শুকনো শুকনো সেই ডালসেদ্ধ ঘিয়ের হাতে আলতো চাপে সামান্য ময়দা আর চালের গুঁড়ো মাখিয়ে নিয়ে গড়তে হবে পুলির আকারে। মধ্যে দিতে হবে সেই আদি, অকৃত্রিম খেঁজুর গুড় আর নারকেলের ছেঁই। এবার পুলির মুখ বন্ধ করে গরম সর্ষের তেলে ভেজে নিতে হবে। পয়রা গুড়ে চুবিয়ে কিম্বা এমনি এমনি‌ ই খাওয়া যায় এই মুগসামালী। অনেক পিঠের মাঝখানে একটু মুখ বদল করতে ময়ান দিয়ে মাখা ময়দার খোলে ঐ ছেঁই চালান করে বানানো হত সিঙাড়া পিঠে।  কেউ মনের আনন্দে পরিপাটি করে গড়েই চলত এই সিঙাড়া পিঠে আর কেউ ভাজত গরম খোলা চাপিয়ে। এক‌ই অঙ্গে কত রূপ পিঠের! সৃষ্টিসুখে সামিল হওয়া বাংলার ঘরণীদের কত আইডিয়া মাথায়! অফুরন্ত সময় ছিল তাদের। সংসার ছিল যৌথ। পরিবারের সকলকে নিজের হাতে খাওয়ানো ছিল নেশা।

 ওদিকে বাংলার আদিবাসীদের ঘরে সেদিন টুসু পরবের গানের সাথে শোনা যায় মাদলের দ্রিমি দ্রিমি। আমরা গঙ্গসাগরে মকর স্নান করে পুণ্যি কুড়োই আর ওরা শোভাযাত্রা করে টুসু ভাসায়।  কেউ নতুন ধানের আউনি-বাউনি বেঁধে পিঠে বানাতে বসে। সেই পিঠে ঠাকুরকে দিয়ে তবে খায়। কেউ ওড়ায় ঘুড়ি। আটপৌরে বাঙালীর এই পিঠে সংস্কৃতি যেন তাদের বাৎসরিক সংস্কার। একজনের কাছে গুড়পিঠের কথা শুনেছি। মালপোয়ার মত ভাজা পিঠে গুড়ের রসে ফেলে খাওয়া আর কি! সাধ আর সাধ্যের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে পিঠের রেসিপিতে, রসনায় কত বৈচিত্র্য এসেছে যুগ যুগ ধরে। আমাদের প্রিয় গোকুলপিঠেও এমনি এক বৈচিত্র্য। আর এই একটি পিঠেতে খোয়া ক্ষীর, নারকেল অর খেজুরের গুড়ের সঙ্গে ছানার রসায়ন জমে যায় একেবারে।
পিঠেপুলির পরিবারে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে রাঙা আলুর পুলি।  এখন ক্যানসার রুখতে রাঙা আলুর জুড়ি নেই তাই বেশ কদর এই পুলির। সেদ্ধ করে নিয়ে চালের গুঁড়ি আর ময়দা আর ঘিয়ের হাতে রাঙা আলুর পুলির মধ্যে আবারো চালান করো নারকেলের ছেঁই আর পুলির মুখ বন্ধ করে ভেজে নাও তেলে। এবার এমনি খাও অথবা গুড়ের রসে ফেলে খাও। সেটা নিজের চয়েস।      
মনে পড়ে যায় পিঠের প্রসঙ্গে ইতু পুজোর ব্রতকথা। অঘ্রাণের শীতেই প্রতি রবিবারে ইতুপুজো করতে গিয়ে মা শোনাতেন সেই ব্রতের কথা। গরীব বামুন ভিক্ষে করে পিঠের উপকরণ যোগাড় করে বৌকে এনে দেয় আর বলে, দ্যাখ বামনী, এই যে মাগ্যির পিঠে বানাবি তা যেন তোর ঐ অলুক্ষুণে মেয়েদুটো মানে উমনোঝুমনোর পেটে না যায়।  বামনী পিঠে ভাজে আর বামুন একটা করে তেঁতুলে বিচি দিয়ে গুনতি করে রাখে মোট ক'খানা পিঠে সবশুদ্ধ ভাজা হল। বামুনের কাছে দুই কন্যাসন্তান সংসারে ব্রাত্য। এদিকে বামনীর প্রাণ পারেনা মেনে নিতে। উনুনপিঠেয় রাখা চোঁয়া, পোড়া, কাঁচা পিঠেগুলো সে মেয়েদের গিয়ে চুপিচুপি দিয়ে আসে। বামুন তা জানতে পেরে উমনোঝুমনোকে বনবাসে দিয়ে আসে। তারপর একদিন ঐ ইতুপুজো করার কারণেই তার মেয়েরা রাজরাণী হয়ে বামুনের দুঃখ ঘোচায়। এখনো তাই পিঠে বানালেই মনে পড়ে যায় এইসব। ফিরে ফিরে অসে কাহিনীরা নতুন গল্পের মোড়কে। 

 শিলাদিত্য  জানুয়ারি সংখ্যা ২০১৭

৮ জানু, ২০১৮

মহাপ্রভু জিন্দা হ্যায়




শীতের ভোর। পুবের মিঠে রোদ গায়ে মেখেই বেরিয়ে পড়া নবদ্বীপের দিকে। কলকাতা থেকে কোনা এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে ডানকুনি, বৈদ্যবাটি হয়ে নবদ্বীপের পথ। প্রথম পিটস্টপ রাস্তার ধারে এক পথ রেস্তোঁরায়।  ছোট্টছেলে তার দাদুর মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেল। নিতান্ত‌ই ছোট সে। তার নাম জিগেস করলে বলল, প্রীতম শিকদার রোবট। আমি বললাম রোবট কেন? সে দর্পের সঙ্গে জানাল, ভিনগ্রহ থেকে আসা এক এলিয়েন সে। পৃথিবীর সবকিছু দেখেশুনে আবার নিজের গ্রহে ফিরে যাবে। তার বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়েই নাকি অন্যগ্রহে যাওয়ার পথ। বিশ্বায়নের কি মাহাত্ম্য! কেবল টিভি এবং ইন্টারনেটের যুগে গ্রামের এই সপ্রতিভ বালকটিও কত পরিণত আজকের যুগে। স্টেট হাইওয়ের ধারে তার দাদুর হোটেলে বসতে দিল। কিছুপরেই টেবিলে এল গরম ছেঁড়া পরোটা আর ধূমায়িত আলুর সবজী। শেষপাতে গুড়ের রসগোল্লা। অমৃতকমলার পৌষের সকাল জমে গেল সেই মূহুর্তে। 
আমরা চললাম সদ্য ধান ওঠা খেতের পাশে একরের পর একর জমিতে সর্ষেফুলে ছয়লাপ হলুদকে সঙ্গী করে। আমন্ত্রণে চলেছি কীর্তণ পরিবেশনের। কলকাতার এক আশ্রম নবদ্বীপে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে আমাদের। পথে বেরিয়েই মনে পড়ল নানান ব্যস্ততায় আমন্ত্রণপত্রটি বাড়িতে ফেলে এসেছি। অতএব নবদ্বীপের কোন্‌ ঠিকানায় যাচ্ছি তা অজানা। শুধু আছে দুটি ফোন নাম্বার। অতএব সে যাত্রায় নিশ্চিন্ত।

এদিকে স্টেশন পৌঁছতেই হাতের মুঠোয় খোলা গুগল ম্যাপ জানাতে থাকল এখুনি সেই স্টেশনে কোন্‌ কোন্‌ ট্রেনের আগমন এবং প্রস্থানের খবর। ধ্যুত্‌ তেরি! এই এক জ্বালা কৃত্তিম বুদ্ধিমতার। আমার গুগল সব জানে। আমি এযাবত আমার এন্ড্রয়েড ফোন থেকে যত মেসেজ করেছি সেখানে নবদ্বীপ কথাটি সে পড়ে বুঝে ফেলেছে ইতিমধ্যে। আর আসার পথে পথ নির্দেশিকা গুগলম্যাপের অ্যাপটিতে গন্তব্য নবদ্বীপ তাও জানা তার। অতএব অংক কষে ফেলেছে তার কৃত্রিম মস্তিষ্ক । একেই বলে এ আই মাহাত্ম্যম্‌ । আমাকে হেল্প করতে চায় সে।

 কিন্তু বিধি বুঝি হল বাম! নবদ্বীপ স্টেশনের কাছে আসতেই ফোন ঘোরালাম আশ্রমের একজনকে। যথারীতি মোবাইল উপলব্ধ নেই সেখানে। আরেকটি নাম্বারেও সংযোগ হলনা কিছুতেই। আর স্টেশনের দুধারে শুধু চোখে পড়ছে "টাইগার জিন্দা হ্যায়" এর বিজ্ঞাপন। নিকুচি করেছে। আমি কোথায় হাতড়ে মরছি ঐ ঠান্ডায় রাতে কোথায় গিয়ে উঠব তা জানিনা আর কেবলি চক্ষুশূল হচ্ছে সলমন খানের বাইসেপস আর ক্যাটরিনার ভ্যাঙচানো শ্রীমুখ।   সঙ্গে আমার অশীতিপর বৃদ্ধা। অতরাতে প্রোগ্রাম সেরে তিনিই বা কোথায় থাকবেন? আর প্রোগ্রামটাই বা কোন্‌ মঞ্চে কিছুই জানিনা।  অবশেষে পুছতাছ শুরু করি।এক ব্যক্তি জানাল জন্মস্থানের দিকে আজ রাতে অনুষ্ঠান আছে।গাড়ি থেকে মুখ বের করে স্থানীয় মানুষকে জিগেস করতেই  তারা বলে, এ পাড়ায় কিস্যুটি হয় না। প্রাচীন মায়াপুর অর্থাত গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর খোদ জন্মস্থান যেতে হবে । সেখানেই যা কিছু। স্বাভাবিক। আজ যাঁর জন্য সেই একদা সংস্কৃতচর্চার অন্যতম পীঠস্থান এই নবদ্বীপ "ধাম" হয়ে উঠেছে সেখানেই সব মাতামাতি হওয়াটাই উচিত। একটি কলেজ পড়ল। স্থানীয় স্মার্ট সব ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে জটলা করছে। জিগেস করলাম, মহাপ্রভুর জন্মস্থানটি কোন্‌ দিকে? তারা ঠোঁট উল্টিয়ে বলল "জানিনা' । চোখমুখের ভাবও বলল মহাপ্রভুর নাম শোনেনি তারা। আবার অলিগলি চলি রাম।  "আচ্ছা দাদা জন্মস্থান?" "কার জন্মস্থান?'  রেগে গিয়ে একহাত নিয়ে ফেলি। আরে মশাই কার আবার? আমার, আপনার নয় নিশ্চয়‌ই। এখানে এসে মানুষ কার জন্মস্থানে যায়? অতএব আবার চলি কানাগলি, পোড়া গলি। এবার এসে পড়ল বুড়োশিব তলা। বেশ প্রাচীন মন্দির। নেমে পুরোহিতকে জিগেস করলাম। তিনিও সেই এক কথা মহাপ্রভুর জন্মস্থানের খোদ পাড়া প্রাচীন মায়াপুরেই সব। অতএব আর কোনোদিকে নয়। পুরী গিয়ে জগন্নাথ, কলকাতা পৌঁছে কালীঘাট আর নবদ্বীপ পৌঁছে জন্মস্থানে না হাজিরা দিলে কোনোকিছুই হবেনা। এদিকে গাড়ির সকলে মিলে অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ফোন ঘুরিয়ে, মেসেজ পাঠিয়েই চলেছি। নো পাত্তা। অবশেষে হাজির হলাম সেই প্রাচীন মায়াপুরে। পরে নির্মিত বিশাল গেট, মন্দিরের আভিজাত্যের মধ্যে অলঙ্কৃত করে রেখেছে সেই সাড়ে পাঁচশো বছরের পুরোনো প্রকাণ্ড নিমগাছ আর তার কোল ঘেঁষে এক ঘর। সেই ঘরে "জনমিলা গোরাচাঁদ শচীর উদরে'। 
সেই নিমগাছে এখন মানুষ লাল সুতো বেঁধে মানত করে। কিন্তু আমার তেমন কোনো ইচ্ছে নেই তখন। দূর থেকে নিমগাছকে প্রণাম জানিয়ে বললাম "আমার ফোনে আজকের অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যেন যোগাযোগ করতে পারি"  প্রণাম জানিয়ে ফিরে আসছি । মন্দিরের বাইরেও পা দি‌ই নি তখন। আমার মোবাইলে কর্মকর্তাদের বহু প্রতীক্ষিত সেই ফোনটি এল। "দিদি আপনি পৌঁসেসেন? আমরাও আসতেসি" 
তারা জানাল আমাদের জন্য  দুদিনের আশ্রমের ঘর, প্রোগ্রামের আয়োজন এই জন্মস্থানের পাশেই। নরহরি আশ্রমে।

আমি বুঝলাম সত্যি সত্যি "টাইগার জিন্দা হ্যায়' ।


১ জানু, ২০১৮

কেকের আমি কেকের তুমি

শিলাদিত্য ডিসেম্বর ২০১৭

না, না। কেক কি আর সুকুমার রায় সৃষ্ট গোঁফচুরি নাকি? কেকের আমিও নেই বা তুমিও অবান্তর। তবে কেকের সেকাল আর একাল আছে কিন্তু। আর সেই কেক দিয়ে বেকার কে চেনা যাবেই। কেকের বিবর্তনের মধ্যেই কেক বেঁচে রয়েছে নানাভাবে।

বাঙালীর শীতের সঙ্গে কেকের অনুষঙ্গটি কিন্তু বহুদিনের।

কেকমাস আজ মধুমাস, ক্রিসমাস পোষমাসে
একাকার হল হাড়মাস, শীতমাস ভালোবেসে !
বাকী তিনমাস পর পচামাস তাই বাঁচো বেশ কশে
শীত এলে ঝোলাগুড় আর কেক খেও বসে বসে ।

উলটে দ্যাখো শীতকে। পালটে গেছে কলকাতার শীত । মুঠোমুঠো রোদের কণায় একভর্তি শীতের ব্যালকনি । রোদের উঠোনে আরাম চেয়ারে হেলান দিয়েছ । গায়ে ওষ জড়ানো পশমিনা । পায়ে মোজা । ব্যালকনির সামনের ফুটপাথে সারেসারে পথশিশু । আদুড় গা কারো। কারো সোয়েটারের হাত ছেঁড়া । নাক দিয়ে দুরন্ত গতিতে শ্লেষ্মা । ভ্রুক্ষেপ নেই কারো । খেলে বেড়াচ্ছে । রাত হলে ঘরে গিয়ে খাবে দুপুরের দুমুঠো জলঢালা ভাত আর সঙ্গে পাড়ার দোকানের আধখানা গরম ফুলুরি হয়ত । কপালে থাকলে এককুটি চারামাছ ।
আমাদের শিশুরা এসব বোঝেনা । তাদের জীবন জুড়ে টিফিনে কাপ কেক, বার্থ ডে কেক আর শীতকালের ছুতোয় নাতায় বাড়ীর কেক।
কাকার সঙ্গে কেকের কি সম্পর্ক তা জানা নেই তবে কেক শব্দটি এসেছে স্ক্যন্ডেনেভিয়ান শব্দ কাকা থেকে।

"কারো শীতমাস কারো সর্বনাশ' !

কে যেন সেদিন এক আড্ডায় বলছিলেন বাঙালী শীতকালে কফি আর কেক খায়। আসলে এই একটা ঋতুর জন্য আমরা মুখিয়ে থাকি সারাটা বছর। তাই শীতকে কাছে পেতে গরম পানীয় সে কফি হোক কিম্বা স্যুপ তাকে বরণ করে নিই । কারণ এই শীতে গরম পানীয় দেয় সেই ওম যার স্বাদ পেতে তো ঠান্ডার দেশে যেতে হয় বছরের বাকী সময়ে। আর আগেই বলেছি শীতমাস মানেই কেক মাস।
তবে বড়দিনের প্রাক্কাল হোক না হোক, শীত পড়ুক না পড়ুক কেক বানানোর জন্য কোনো ছুতো লাগেনা। সে যুগে আমাদের ঠাকুমা, দিদিমারাই উনুনের মরা আঁচে সারাদিনের রান্নাবান্নার পর এলুমিনিয়ামের হাঁড়ি, লোহার বড় কড়াইয়ে কিম্বা ডেকচিতে বালি বিছিয়ে তার মধ্যে এলুমিনিয়ামের বাটিতে কেক বানাতেন শুনেছি। মায়ের মুখে শুনেছি সে কেক বাড়িতে বসলেও সারাবাড়ি গন্ধে ম ম করত। ঠিক যেন কাঁঠাল বা তালের মত। "এ পাড়ায় বুড়ি মলো, ও পাড়ায় গন্ধ পেল'
তখন নিউমার্কেট থেকে ভ্যানিলা এসেন্স আনা হত। এখন অবিশ্যি পাড়ার দোকানেও মেলে। ওরা তখন কেক ফোলানোর জন্য দিতেন খাবার সোডা বা সোডিয়াম বাই কার্বোনেট। পরে অবিশ্যি আরেকটু সফিষ্টিকেশনের ছোঁয়ায় মা কে দেখতাম বেকিং পাউডার ব্যাবহার করতে। কিছুই না বেকিং পাউডারে সোডি বাইকার্বের সঙ্গে থাকে পটাশিয়াম হাইড্রোজেন টার্টারেট। টার্টারিক এসিডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সোডি বাইকার্ব থেকে সহজেই প্রচুর কার্বন ডাই অক্সাইড বেরোয় তাই কেক বেশ ফ্লাফি হয়। এখন তার আরো বিবর্তন হয়েছে। আমরা কেকের ব্যাটারে বেকিং সোডা বা পাউডার দিই সেই সঙ্গে আভেনে ঢোকানোর ঠিক পূর্ব মূহুর্তে আধা চামচ সাদা ভিনিগার কিম্বা লেবুর রস দিয়ে বেশ করে নেড়েচেড়ে দি। আরো ফুলবে ব্যাটার। এবং এটি কিন্তু ব্রাউনি, মাফিন বা অন্য যে কোনো ধরণের ফ্রুট কেক, পেস্ট্রি বানানোর সময় দেওয়া যেতে পারে। অতএব কেক বানানোর মধ্যমণি হল এই লিভনিং এজেন্ট । কেক কে ফোলানোর বা ঝাঁঝরা করবার অন্যতম উপকরণ। ব্রেডের ক্ষেত্রে যে কাজটি করে ইষ্ট।
আমার মা ডেকচি বা হাঁড়ির মধ্যে বালি পর্বে কেক বানাতে না বানাতেই বাবা একবার রন্ধন পটীয়সী মায়ের জন্য সুদূর বম্বে থেকে নিয়ে এলেন একটি অভূতপূর্ব কেক বানানোর এলুমিনিয়ামের পাত্র। তার নীচে ছোট্ট বালির জায়গা। আর পাত্রের মধ্যিখানটা চোঙাকৃতি ভাবে খোলা। ফলে গ্যাসা অভেনের সুনীল শিখাটি সেই চোঙের মধ্যে দিয়ে তির তির করে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ পাত্রের কেকটিকে বেকড হতে সাহায্য করে। আর নীচের বালি গরম করে নিয়ে তবেই আসল পাত্রটি বসানো হয়। এ যেন প্রিহিটেড আভেনের পূর্বতন প্রযুক্তি। ফলে নীচটাও সুষ্ঠুভাবে তাপ পেয়ে বেকড হয়। সম্পূর্ণ ফুলে উঠলে ওপরটা একটু লালচে ভাব আনার জন্য গ্যাসের সর্বোচ্চ শিখায় মিনিট দুয়েক দিলেই লাজে রাঙা হয়ে ওঠে এই মনোহরা মিষ্টান্ন। মায়ের রান্নাঘরে থাকত একটি উল বোনার সরু কাঁটা। সেটি ফুটিয়ে সন্তর্পণে দেখা হত ভেতরে কোথাও কাঁচা আছে কিনা।
মা কে দেখতাম প্রথমেই সেই বালি চেলে নিয়ে কাঁকর বেছে নিয়ে তারপর সমান করে সেই নীচের ছোট পাত্রে রাখতেন শুকনো বালি। প্রধান পাত্রটিতে বেশ করে মাখন মাখিয়ে নিতেন । আরেকটি বড় বাটিতে হাঁসের ডিম ফেটিয়ে তার মধ্যে চিনি দিতেন যতক্ষণ না চিনি গলে মসৃণ পেষ্ট তৈরী হয়। এরপর খবরের কাগজে চালনী দিয়ে পরিমাণ মত ময়দা ও বেকিং পাউডার একসঙ্গে চেলে নিতেন যাতে সম্পূর্ণ মিশে যায়। এবার সেই ময়দাটিকে পরিমাণ মত গলানো মাখন দিয়ে মেখে নিতেন ঠিক যেমন করে ময়দা ময়ান দিয়ে মাখা হয়। এরপর সেই ময়দা মাখা টি ধীরে ধীরে ডিম-চিনির মিশ্রণে দিতেন আর ফ্যাটাতেন। সব শেষে ভ্যানিলা এসেন্স দিয়ে ঐ পাত্রে ঢেলে দিয়ে আগে থেকে গরম করে নেওয়া বালির পাত্রে বসিয়ে দিয়ে গ্যাস কমিয়ে রাখতেন প্রথম মিনিট দশেক। এরপর আগে থেকে জলে ভেজানো কাজু-কিশমিশ পাত্রের ঢাকা খুলে ছড়িয়ে দিতেন কেক মিশ্রণের ওপরে।

এবার শুরু ধুকপুকুনি। ঠিক না ফুললে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। তলা পুড়ে গেলে লোকে নিন্দে করবে। সোডা কম হলে ভেতর কাঁচা থাকবে। এইসব কানাঘুষো শুনতে শুনতে আমিও কেমন করে ঐ বিশেষ পাত্রটিতে অবলীলায় কেক বানানো শিখে গেলাম। একটু গ্যাসের আঁচ বাড়ানো আবার কমানো আর সব শেষে দুমিনিট হাই ফ্লেমে ওপরটায় রং ধরানো। ব্যাস! এই কথা? হ্যাঁ, এই টুকুই। কেক বানানোয় এমন কিছু হাতিঘোড়া রকেট সায়েন্স এর প্রযুক্তি নেই। কেক বানানোয় আহামরি কিছু উপকরণ ও লাগেনা। শুধু আছে ঠিকঠাক পরিমাপ আর একাগ্রতা।

মা কে অবিশ্যি দেখতাম এই রেসিপি কে সামান্য ইম্প্রোভাইজ করতে। শীতকালে কমলালেবুর খোসা শুকিয়ে কেকের ব্যাটারে মিশিয়ে দিলে তৈরী হয় অরেঞ্জ ফ্লেভার্ড কেক। আর কাজু কিশমিসের সঙ্গে মা দিতেন কচকচি বা পেঠা। দিল্লীতে রাস্তায় খুব বিক্রি হয় যেটা অর্থাত ঘন চিনির রসে উগরে নেওয়া চালকুমড়োর মেঠাই বা মোরব্বা । এখন যা সুদৃশ্য রঙে ফাইন কুচোনো টুটি ফ্রূটি। শপিং মলের গালভরা নাম। এইভাবে গ্যাস আভেনে কেক শিখে এসে শ্বশুরবাড়িতে দেখলাম শাশুড়ি মা কে ইলেকট্রিক গোল আভেনে কেক বানাতে। আমার অসুবিধে হচ্চে দেখে প্রচুর খুঁজলাম বাজারে। সেই বোম্বাইওয়ালি স্পেশ্যাল কেকপাত্রের দেখা পেলাম না। "আমি তাঁরেই খুঁজে বেড়াই যে রয় মনে আমার মনে...'
অগত্যা বাবা খুঁজে পেতে এনে দিলেন হাতিবাগান বাজার থেকে। তদ্দিনে বাঙালীর মডিউলার কিচেনে রমরমিয়ে জায়গা করে নিয়েছে ওটিজি (আভেন, টোষ্টার ও গ্রিলার) বা একই অঙ্গে ত্রিরূপী বৈদ্যুতিক যন্ত্র। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসেছে মাইক্রোওয়েভ আভেন। সেখানেও কনভেকশান মোডে কেক বেকিং হয় তবে সেটি কে আমি বলি কেকের অপভ্রংশ। যারা অভেনে কেক বেক করতে অভ্যস্ত এবং দক্ষ তাদের কাছে মাইক্রোওয়েভে কেকে বেকিং নিছক ছেলেখেলা । কারণ আভেনে কেক বেকিং এর সেই স্বাদ বা গন্ধ কোনটি থাকেনা এতে। বরং দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে। সময়ের অভাবে চটপট কেক মিক্স ফেটিয়ে বসিয়ে দিতে পারলেই কেক হয় এতে।
এখন ছোট কেক বানালে ওটিজি আর বড় বানালে গ্যাস আভেনে বেক করি। আর কেকের টপিং এ আইসিং দিয়ে অযথা খাটুনি এবং ক্যালরি বৃদ্ধি আমার নাপসন্দ। বরং বাড়িতে হঠাত অতিথি আপ্যায়ণে মিক্সার গ্রাইন্ডারের ছোট্ট ব্লেন্ডারটিতে প্রথমে মাথা কাটা এককাপ চিনি গুঁড়ো করে তার মধ্যেই দুটো ডিম ভেঙে দি। হাই স্পিডে মিক্সি চালিয়ে মসৃণ মিশ্রণ রেডি। এবার একটি স্টিলের গ্লাসে এককাপ ভর্তি ভর্তি চেলে নেওয়া ময়দা আর দু চা চামচ বেকিং সোডা নিয়ে মিক্সি থেকে ডিম চিনির মিশ্রণ গ্লাসে ঢালি আর কেক ফ্যাটানোর বিশেষ বিটার দিয়ে যে কোনো একই দিকে ফেটাই । যে পাত্রটিতে কেক বেকিং হবে সেটি টিনের হলে খুব ভাল। সেটি তে দু-টেবিল চামচ মাখন গলিয়ে মাখন টি গ্লাসের মিশ্রণে দিয়ে আরো ফেটাই। এতে কি হয় যে পাত্রটিতে কেক বেকিং হবে সেটি খুব ভাল করে গ্রিজড বা তৈলাক্ত হয়ে যায়। এবার মোট দুশো বার হওয়া চাই এই ফ্যাটানো। এবার দুচামচ যেকোনো এসেন্স (ভ্যানিলা, পাইন্যাপল, অরেঞ্জ) মিশিয়ে বেকিং পাত্রটিতে পুরো মিশ্রণটি ঢেলে দি। এবার দু ফোঁটা হোয়াইট ভিনিগার অথবা লেবুর রস দিয়ে আবার নেড়ে চেড়ে প্রিহিটেড ওটিজি তে ২০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে মাঝখানের র‍্যাকে পাত্রটি বসিয়ে দি।
ভরা থাক হাতের যাদু সুধায় কেকের এই পাত্রখানি! এভাবেই তৈরী হয়ে যায় চটজলদি কেক।
ওটিজির চোখরাঙানিতে রাগে, ক্ষোভে ফুলতেই থাকে কেক। ওপর থেকে আলগা হাতে ছড়ানো ড্রাইফ্রুটস এর মর্মে যেন রং লাগে, আমার মনেও চিন্তা জাগে ঠিক সেই মায়ের যেমন লাগত।সব অনিশ্চয়তার শেষ কিছু পরেই।
উলের কাঁটা দিয়ে ফুটিয়ে যখন দেখি কেক আর নেই কাঁচা, তখন দুহাত তুলে পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা! এমনি অবস্থা হয় এহেন বেকার হোম মেকারের।
বেশি পরিমাণে কেক বানালে হ্যান্ড ব্লেন্ডারের সাহায্য নি। তবে পদ্ধতি হরে দরে একই । চারটে ডিম হলে আগের মাপের দ্বিগুণ সবকিছু। শুধু একটা করে ডিম বেশী দিলে কেক সুস্বাদু হয়। অর্থাত চারটে ডিমে চারকাপ ময়দা, চারকাপ চিনি, চার টেবিল চামচ গলানো মাখন আর একটি ডিম বেশী। ময়দা আর চিনি এক ধরণের কাপে মাপতে হবে। শুধু ময়দা উঁচু করে নিতে হবে আর গুঁড়ো করা চিনি কম কম মাথা কাটা কাপে। তবে কেকের মিষ্টতা ঠিক থাকবে। অতিরিক্ত চিনিতে কেক রসালো হয়ে ভিজে যায়। এবার এই কাপের মাপটি বিশাল কফি মাগ হলে হবেনা আবার ছোট্ট চায়ের পেয়ালা হলেও হবেনা। মাঝারি সাইজের কাপ হতে হবে। আর বাকীটা? এক টুসকি মনোযোগ আর হালকা অধ্যাবসায়। সুখী গৃহকোণে আনন্দের জোয়ার। গৃহিণীর কনফিডেন্স লেভেল একধাপ বাড়ানোয় এই রেসিপির জুড়ি নেই। আমার কাছে কেক এক সুচারু শিল্প যা নিমেষেই সত্য হয়ে প্রতিভাত হয় চোখের সামনে। তাই শীত আসুক না আসুক, ঠান্ডা পড়ুক না পড়ুক সব মাস‌ই কেক মাস।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাজার আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। সবকিছুই হাতের নাগালের মধ্যে এখন। ছত্রে ছত্রে কেকের হরেকরকম রেসিপি ছড়ানো ইন্টারনেটে। সেগুলোকে নিজের মত করে নিয়ে বানিয়ে ফেলতে পারলেই হল। শুধু চাই তিন "' এর মেলবন্ধন। পছন্দসই পাত্র, সঠিক পদ্ধতির পরিমাপ আর পর পর প্র্যাকটিস চাই সফল কেক তৈরীর পেছনে। রাম কেক থেকে প্লাম কেক, ওয়ালনাট থেকে আমন্ড কেক, চকোলেট চিপস দেওয়া থেকে মিক্সড ফ্রুট কেক যাই বানানো হোক বেসিক পন্থা একটাই। বৈচিত্র্য টপিংয়ে, হরেক কিসিমের শুকনো ফলের বিচিত্রতায়। আর এখন বিশ্বায়নের বানভাসি শপিং মলে শুকনো কিউয়ি থেকে ক্র্যানবেরি সবকিছুই মেলে অতএব সেই সত্য যা রচিবে তুমি!
ছোটবেলার স্মৃতির সরণী বেয়ে কেবল ছিল নিউমার্কেটের ডি গামা, নাহুমস, ফারপো, ফেরিনি, গ্রেট ইষ্টার্ণ এর কেক । তারপর কলেজবেলার ফ্লুরিজের কেক। এরপর জলযোগের কেক। মনজিনিস বদলে মিও আমোর, কেকস, কুকি জার, ব্রিটানিয়া, সুগার অ্যান্ড স্পাইস, বিস্কফার্ম, আনমোল, রাজা, বাপুজি, নানা ব্র্যান্ডের কেক। এছাড়াও রয়েছে স্থানীয় সব বেকারির কেক। খিদিরপুরে যে লোকটি প্রতিদিন আমার বাড়িতে ফ্রেশলি বেকড ব্রেড দেয় প্রতিবছর শীতে সেও একবার অন্ততঃ কেক দিয়ে যাবেই। ইস্কনের কৃষ্ণপ্রেমীদের গোবিন্দা বেকারীতেও কেক বিক্রি হচ্ছে। হ্লদিরামও নিরামিষ কেক বানাচ্ছে তবে এগুলি ডিম ছাড়া। সেটি কে আদৌ কেক বলা হবে কিনা সেটা বেশ সংশয়ের ব্যাপার। কারণ যাকে কেক বলছি আমরা তার প্রধান অঙ্গ হল ডিম।
তবে একটাই হটকেক বার্তা। আগে বঙ্গ ললনারা শীতকালে শুধু পিঠে বানাতেন এখন টেলিভিশন আর ইন্টারনেটের দৌলতে তারা কেকপিঠেতেও সামিল হয়েছেন। তাই এই শীতে কেককে অন্তর্ভুক্ত করা যেতেই পারে বিদেশী পিঠে হিসেবে পৌষপার্বণে। আর রসের সাগরে ভাসমান রসবড়া, ক্ষীর সমুদ্রে ভাসমান দুধপুলি আর তুলতুলে নরম পাটিসাপটার পাশাপাশি গরম কেক পিঠের মৌতাত কিন্তু জমিয়ে দেবে শীতকাল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।