১৪ নভেম্বর, ২০১৫

ভাইফোঁটা


কার্তিকের শুক্লা প্রতিপদ কিম্বা দ্বিতীয়া । নরকাসুর বধ করে কেষ্টাদা সবেমাত্র ফিরেছেন ঘরে। বোন সুভদ্রা দাদার মুড বুঝে নিল চটপট। আগের দিন দেওয়ালির রান্নাঘর থেকে ঘিয়ের গন্ধ তখনো পুরোপুরি যায়নি চলে। রান্নাঘরে গিয়ে দুখানা মুচমুচে নিমকি, গোটাকতক ম্যাওয়া কুচোনো লাড্ডু, সোহন পাপড়ি আর এক ভাঁড় রাবড়ি এনে দাদার মুখের সামনে ধরল। কেষ্টদা তো মহা খুশি। একে মিশন সাকসেসফুল...দুষ্কৃতের বিনাশ করে সাধুদের পরিত্রাণ করতে চলেছেন বলে মহা ফূর্তি মনে আর দুই দেওয়ালির সুহাগ রাতে অগণিত গার্লফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে ছাদে গিয়ে কখন ফষ্টিনষ্টি করবেন সেই অহ্লাদে ভরপুর তাঁর মেজাজ। বিদ্যুতলতারা সকলে শৃঙ্গারে ব্যস্ত তখন। কেউ কেতকী-কুর্চি-কদম্ব প্রলম্বিত জলে স্পা নিচ্ছেন। কেউ আবার কর্পূর-কেওড়া-অগরুর জলে গাত্রমার্জনা করে সুগন্ধা হচ্ছেন। কেউ ধূপের ধুনোয় কেশ শুষ্ক করে ফুলের মালা জড়াতে ব্যস্ত।

কেষ্টদার দুই গৃহিণী সত্যভামা আর রুক্মিনী বৌদির মেজাজ একটু ক্ষেপে আছে আজ। একে বহুদিনের অদর্শণে প্রাণের ভেতরটা আঁকুপাঁকু অন্যথায় আসামাত্র‌ই ননদিনী সুভদ্রা কেষ্টদাকে চিলের মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে গেল তাদের কাছ থেকে। তারপর যদিও ননদিনী ছাড়বে তাদের কর্তামশায় তো এবার যাবেন ছাদের ওপর কিম্বা নদীর তীরে। একে কার্তিকের আকাশে রাসপূর্ণিমার হাওয়া ব‌ইল বলে !
সুভদ্রা বলল, দাদা মনে আছে কালকের কথা? এবারে কিন্তু আরো বড় উপহার চাই। ঐ ময়ূরের পালক, কদমফুলের আর্মলেট আর জাঁতিফুলের মুকুটে কিন্তু চলবেনা বলে দিলাম। এবার ডাবল ধামাকা কিন্তু। একে ভাই ফোঁটা তায় নরকাসুর বধ হয়েছে। অতএব ট্রিট চাই বস!
কেষ্টাদা মুখটা বেঁকিয়ে বললেন, তা আমাকেই বা কেন বধ করা বারেবারে? আরো একজন দাদাও তো আছে নাকি। সুভদ্রা বলল, তুমি তো গেছ নরকাসুর নিধন করতে। বলরাম দাদা? তিনি তো দ্রাক্ষারসে অবগাহন করে পড়ে রয়েছেন সেই ধনতেরস থেকে।

কেষ্টাদা প্রমাদ গনলেন। চটপট স্মার্টফোনে দেখে নিলেন ব্যাংকে কিছু পড়ে আছে কিনা। সুভদ্রাকে বললেন, ঠিক হ্যায় তব। মানাও ভাই দুজ, ঘটা করে ভাইফোঁটা হোউক! !!!

রুক্মিনী, সত্যভামা বৌদিদ্বয় শশব্যস্ত হয়ে গাত্রোত্থান করে বাজারের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।হাজার হৌক রান্নাবাটিতো তাদেরি করতে হবেক। আরতো সকলে সুখের পায়রা! যদি আবার নন্দাই বাবু অর্জুন এসে পড়েন তাহলে আর কথাই নেই! জামাই বলে কথা! বৌদিরা আবার নন্দাইকেও ভাইফোঁটা দেয়।

১২ নভেম্বর, ২০১৫

দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো


কালীপুজোর অমাবস্যার দিনে পশ্চিমবঙ্গীয়দের রীতি  দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো করার। ব্রতকথা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম অনেক কিছু। লক্ষ্মীপুজো করলেই যে অর্থাগম হবে, ঐশ্বর্য্যপ্রাপ্তি হবে এ বিশ্বাস আমি করিনা তবে সব ধর্মের মূল কথা "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর" এই আপ্তবাক্যটি আমি মানি। আর গল্পটি এযুগেও বেশ যুক্তিসম্মত বলে মনে হল। কারণ আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। ঈশ্বর, মানুষ, পুজোআর্চা এসবকিছুই  তো মানুষের মনগড়া। এই অনুষঙ্গগুলি জীবনযাপনের উপলক্ষ্যমাত্র। 

দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো ব্রত কথা
 
এক রাজার পাঁচ মেয়ে ছিল। একদিন সকলকে একত্র করে রাজা তাঁদের জিগেস করলেন, তোমরা কে কার ভাগ্যে খাও? ছোটমেয়েটি অত্যন্ত সপ্রতিভ উত্তর দিল।

সে বলল "মা লক্ষ্মী খাওয়ান আমাদের। মানুষের কি সাধ্য যে সে নিজে খাবে। মানুষতো উপলক্ষ্য মাত্র। আমরা সকলেই নিজের ভাগ্যে খাই বাবা"

কন্যার কথায় রাজা তো অগ্নিশর্মা। সাথেসাথে তিনি জ্বলে উঠে বললেন, "রাজার মেয়ে তাই কিছু বুঝতে পারলিনা। এ জীবনে অর্থ, যশ প্রতিপত্তির জোরেই আমরা সকলে বেঁচে আছি। ঠিক আছে, ভালো কথা। কাল সকালে আমি যার মুখ আগে দেখব তার সাথে তোর বিয়ে দেব। তখন দেখব তুই কি করে আর কার ভাগ্যে খাস"

রাণী সেই কথা শুনতে পেয়ে প্রমাদ গনলেন। রাজপুরীতে সকলকে সাবধান করে দিলেন, কেউ যেন পরদিন রাজবাড়ির মুখো না হয় আর রাজধানীর সব দোকানপাট সব বেশ বেলায় খোলার পরামর্শ দিলেন। যাতে রাজার চোখের সামনে কোনো ব্যক্তি এসে পড়ে। প্রজারা ঢেঁড়া পিটিয়ে সেই খবর চালু করে দিল। সেই কথা জানতে পেরে অন্য একপ্রদেশের গরীব বামুন তার ছেলেকে সঙ্গে করে চুপিচুপি রাজ অন্তঃপুরে এসে লুকিয়ে থাকল সেদিনের মত। পরদিন ঘুম ভাঙতে রাজার চোখে পড়ল সেই গরীব বামুনের ছেলেটি। রাজা তাঁর ছোটমেয়ের বিয়ের আয়োজন করলেন সেই ছেলের সাথে আর বিদায়বেলায় মেয়েকে বললেন, "দেখি এবার কেমন তুই নিজের ভাগ্যে খাস!”

গরীব বামুন রাজকন্যাকে ছেলের বৌ করে, পুত্র আর বৌমাকে সাথে নিজের কুঁড়েতে ফিরে এল। রাজকন্যা স্বামী-শ্বশুরকে বলে রাখল, যখনি তারা বাড়ির বাইরে থেকে ঘরে ফিরবে রাস্তায় যা পাবে তা যেন কুড়িয়ে নিয়ে আসেন, খালি হাতে যেন না ফেরেন। একদিন বামুন ফেরার পথে রাস্তায় একটি মরা কালকেউটে পড়ে থাকতে দেখল। সেটিকে ঘরে এনে রাজকন্যাকে দেখালো। রাজকন্যা বললে ওটিকে ঘরের চালে ফেলে রাখুন, কাজে আসবে। এবার সেদেশের আরেক রাজার ছেলে কঠিন অসুখে পড়েছে। রাজবৈদ্য এসে জানালো কালকেউটের মাথাটা পেলে তিনি রাজপুত্রকে সারিয়ে তুলতে পারেন। রাজা ঢেঁড়া পিটিয়ে খবর করলেন, যে ব্যক্তি তাঁকে মরা কালকেউটের মাথা দিতে পারবে সে যা চাইবে তাই পাবে।

রাজকন্যা সেই কথা শুনে শ্বশুরকে বললে, "ঢ্যাঁড়াদারদের ডেকে আমাদের ঘরের চালে যে মরা কেউটে রাখা আছে তার মাথাটা রাজাকে দিয়ে আসুন তবে তার বিনিময়ে কিছু চাইবেননা"

রাজবৈদ্য সেই মরা কেউটের মাথা থেকে ওষুধ তৈরী করে রাজ্পুত্রকে তা খাওয়াতে সে সুস্থ হয়ে উঠল। রাজা মহা খুশিতে বামুনকে ডেকে পাঠালেন। যাবার আগে রাজকন্যা শ্বশুরকে বলে দিল যে কার্তিকমাসের অমাবস্যা তিথিতে রাজধানীর কোথাও যেন বিন্দুমাত্র আলো না জ্বলে। এইকথাটুকু রাখলেই হবে, বিনিময়ে কিছু চাইনা তাদের। বামুন সেকথা রাজাকে জানালো। রাজা বললেন কার্তিকমাসের অমাবস্যায় রাজধানীতে যেন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার থাকে। যে আলো জ্বালাবে তাকে দন্ড পেতে হবে।

এদিকে রাজকন্যা সেদিন নিজে উপোস করে তার কুঁড়েটি গোবর দিয়ে নিকিয়ে পিটুলিগোলার আলপনা দিয়ে ফুলচন্দন-মালা, ধূপ-ধুনো দিয়ে যতসামান্য আয়োজনে মালক্ষ্মীর জন্য ঘট পেতে তাঁর আগমনের অপেক্ষায় বসে র‌ইল।

ঐদিনে সর্বত্র ঘোর আঁধার আর রাজকন্যার কুঁড়েতে প্রদীপের আলো জ্বলা দেখে মালক্ষ্মী সেখানে অবতরণ করলেন। তুষ্ট হয়ে নিজের পায়ের নূপুরটি রেখে গেলেন কমলাসনে। এরপর যা হয় বামুনের ঐশ্বর্য আর দেখে কে! ধীরে ধীরে তাদের মালক্ষ্মীর কৃপায় অবস্থা ফিরে গেল। একদিন বামুন ঠিক করল বাড়ির পাশে একটি পুকুর কাটাবে। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিনে দলেদলে লোক এল। রাজকন্যা জানলা দিয়ে হঠাত দেখতে পেল তার একদা রাজ-চক্রবর্তী বাপকে। তিনি আজ হতদরিদ্র। পুকুর খননের কাজে এসেছেন তাদের গ্রামে। পুকুর খননের কাজ শেষ হলে রাজকন্যা সকলকে খাওয়ালে। দরিদ্র পিতাকে যখন ভাত বেড়ে দিতে যাবে তখন তিনি কেঁদে বললেন, আমার ঠিক তোমার মত একটি মেয়ে ছিল। এদ্দিনে সে কোথায় আছে, কেমন আছে কিছুই জানিনা আমি। রাজকন্যা বাবার কন্ঠস্বর চিনে ফেলেছে এর মধ্যে। বাবাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললে, বাবা, তুমি যে আমায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছিলে , এই দ্যাখো আমি কেমন এখনো নিজের ভাগ্যেই খেয়ে পরে বেঁচে আছি। সেই পরীক্ষার শেষ হয়েছে বাবা। দরিদ্র বাপ তখন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোর কথাই ঠিক মা, আজ আমি নিজের অহঙ্কারে সর্বস্বান্ত। সত্যি‌ই বলেছিলি তুই। মানুষ নিজের ভাগ্যেই খায়।অর্থ-যশ-প্রতিপত্তি থাকলেই হয়না রে। মানুষের ভাগ্য‌ই মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। নয়ত আমি আজ ফকির হয়ে গেছি আর তুই আজ রাজরাণী! ঈশ্বরবিধাতাই সব মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন।

রাজকন্যা বললে, "বাবা এবার থেকে তোমার ঘরে কার্তিকমাসের অমাবস্যার দিনে লক্ষ্মীপুজো করো। আবার তোমার হৃত ঐশ্বর্য্য সব ফেরত পাবে।"

......
শেষলাইনটি কতটা সত্যি জানিনা তবে ভাগ্যে আমিও কিছুটা বিশ্বাসী। আর তোমরা?

১১ নভেম্বর, ২০১৫

কালী কালী বলো রে আজ...

  • কালী কালী বলো রে আজ...

দুর্গাপুজো নিয়ে মাতামাতি কাটতে না কাটতেই  আবারো উত্সবের প্রস্তুতি সারা দেশ জুড়ে। কার্তিকমাসের অমাবস্যা যত এগিয়ে আসে তত‌ই উন্মাদনা বাড়তে থাকে। বাজারহাটের  উপহার কেনাবেচা, দেওয়ালীর পসরা, বাজি-উত্সব, ভূতচতুর্দশী, কালীপুজোর দশকর্ম্ম, আবার ঐদিনে অলক্ষ্মী বিদায়ের তোড়জোড়, এক‌ই সাথে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতি, আলোর উত্সব, মিলন উত্সব সবকিছু নিয়ে বাঙালী-অবাঙালী নির্বিশেষে যেন রমরমা তখন আকাশে বাতাসে।

দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধের পর ফিরে গেছেন কৈলাসে। দেবতারা মহাখুশিতে তাঁকে স্তবমন্ত্রে বন্দনা করলেন। বললেন, ভবিষ্যতে আবারো যদি দেবকুল বিপদে পড়ে তবে আপনি আবার আমাদের বিপন্মুক্ত করবেন। দেবী সুপ্রসন্না হয়ে বললেন,"তথাস্তু"  । এরপর বেশ কিছু যুগ কেটে গেল নির্বিঘ্নে। শুম্ভ আর নিশুম্ভ আবারো উত্পাত শুরু করল দেবলোকে।  দেবতারা আবার দেবীর তপস্যা করতে লাগলেন। জাহ্নবীর জলে স্নানরতা দেবী পার্বতী তখন তাঁর দেহের কৃষ্ণকোষগুলি ত্যাগ করছিলেন। আর সেই কৃষ্ণকোষ দিয়ে আবির্ভূতা হলেন দেবী কৌষিকী। অতি সুন্দরী কৌষিকীর গায়ের রং হল নীলচে। পার্বতী দেবগণের কাছে তখন দেবী কৌষিকীর মহিমা বর্ণনা করলেন। শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের জন্য দেবীর স্বীয় শরীর থেকে সৃষ্ট এই দেবী যে কতখানি ক্ষমতার অধিকারিণী তা দেবতারা কার্যকালে জানতে পারলেন। এই কৌষিকীদেবী‌ই দেবী কালিকা বা কালী নামে পরিচিতা। কালের দেবী এই কালী। যুগ যুগান্ত ধরে ভারতবর্ষের কোণায় কোণায় শক্তিসাধনার প্রতীকরূপে বন্দিতা।


সদানন্দময়ী কালী মহাকালের মনমোহিনী তুমি আপনি নাচ, আপনি গাও, আপনি দাও মা করতালি...

এই কালীকে তন্ত্রে বিশ্বমাতৃত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কারণ মহামায়ার এইরূপটি বিশ্বের মানুষের চেতনার চৈতন্যস্বরূপিণী। এই মহাকালী একাকিনী-অসঙ্গা-আনন্দস্বরূপা। নিজেই নিজের স্বরূপে বিমোহিতা।

কালী নিয়ে বহু কাহিনী প্রচলিত। মাদুর্গার স্প্লিট পার্সোনালিটি। কখনো গৌরী কখনো শ্যামা। যখন যেমন তখন তেমন। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা তাঁর। গৌরী হল তাঁর আদুরে, স্বামী সোহাগিনী রূপ। শ্যামা হল পুরুষসংসর্গরহিত করাল রূপ। দক্ষরাজের মহাযজ্ঞে পতি নিন্দা শুনতে না পেরে মনের দুঃখে সতী দেহত্যাগ করেছিলেন। হিমালয় পত্নী মেনকা আবারো এক কন্যার জন্য  তপস্যা শুরু করলেন। যথাসময়ে মেনকার গর্ভে এক অপরূপা কন্যাসন্তান জন্মালো। এই কন্যা সুন্দরী হলেও তার গায়ের রং ছিল নীলপদ্মের মত শ্যামবর্ণের। কন্যার গাত্রবর্ণ দেখে গিরিরাজ নাম রাখলেন কালী। যথাসময়ে কালীর সাথে শিবের বিবাহ হল।

শ্রীশ্রীচন্ডীতে আছে অন্য কাহিনী। মহিষাসুরকে বধ করার পর দেবী দুর্গা দেবতা, মানব সকলকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন যখন তোমরা বিপদে পড়বে  তাঁকে স্মরণ করলেই তিনি আবারো দস্যুবধে অবতীর্ণ হবেন।  এদিকে আবার বহুযুগ পর কাশ্যপমুনির স্ত্রী দনুর গর্ভে শুম্ভ আর নিশুম্ভের জন্ম হল। যৌবনে দুইভাই তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেল যে তাদের কোনো দেবতা বা মানব বধ করতে পারবেনা । তারা অজেয় হয়ে উঠল। তাদের দৌরাত্ম্যে আবারো সমগ্র দেবকুল ক্ষেপে উঠল। দেবতারা দেবী দুর্গার স্মরণ নিলেন। ইতিমধ্যে গঙ্গায় স্নান কালে দেবী পার্বতী তাঁর শরীরের কৃষ্ণকোষগুলো থেকে একটি অপূর্ব দেবীমূর্তি  তৈরী করলেন। এই নীলাভরংয়ের দেবী মূর্তির নাম কৌষীকি বা কালী। এই করালবদনা কালিকা হিমালয়ে বেড়াচ্ছিলেন।  হঠাত চন্ড আর মুন্ডের নজরে এল এই অসামান্য দেবীমূর্তির রূপ। জনবিরল স্থানে এমন নারীমূর্তিকে দেখে শুম্ভ-নিশুম্ভকে তারা দেবীমূর্তির কথা জানালো। শুম্ভ-নিশুম্ভর তা শুনে জেদ চেপে গেল।  বললে, ঐ নারীকে তাদের সামনে যেকোনো মূল্যেই হাজির করা হোক। তাঁকে তারা  বিয়ে করতে চায়। চন্ড-মুন্ড দেবীকে সেইকথা জানাতেই  দেবী বললেন, ছোটবেলায় তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে পুরুষ তাঁকে যুদ্ধে হারাতে পারবে তাকেই তিনি স্বামীরূপে বরণ করবেন।   শুম্ভ সেইকথা শুনে আরো রেগে গিয়ে দেবীর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হল।

শুম্ভ দেবীর দিকে ছুটে যেতেই তাঁর কৃষ্ণবর্ণের ভ্রুকুটিদ্বয়এর মধ্যস্থিত কপালের অংশ থেকে খড়্গধারা, পাশহন্তা কালী নির্গত হলেন  ।  নরকঙ্কালধারিণী, নরমুন্ডমালা পরিহিতা ভীষণা, লোলজিহ্বা, বিশাল মুখমন্ডলে কোটরাগত রক্তিম চক্ষু দেখে ভয়ে দানবকুল  বেগে পলায়ন করল।  দেবীর এই রূপটি হল দশমহাবিদ্যার অন্যতম রূপ যা কালী নামে পরিচিত। এই সেই ভয়ানক দেবী যিনি কোনো কিছু অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননা। এই সেই কালের উপাস্য দেবী যাঁর একহাতে বরাভয় অন্যহাতে নরমুন্ড। পিশাচ-পিশাচী ঘিরে থাকে এই দেবীকে। অমাবস্যা যাঁর অতিপ্রিয়। শ্মশানেমশানে যিনি ঘুরে বেড়ান মনের সুখে।   অন্যহাতে সুখ আর বাকী হাতটিতে দুঃখ নিয়ে যিনি দেখান ভানুমতীর খেল। সৃষ্টি আর লয়ের সব রহস্য যাঁর জলভাত সেই কালের দেবী কালী। 

বিন্দুতে মা'র সিন্ধুখানি,  ঠিকরে পড়ে রূপের মানিক, বিশ্বেমায়ের রূপ ধরেনা, মা আমার তাই দিগবসন, দেখে যা আলোর নাচন...

ষোড়শ শতাব্দী (১৫০০ সালে) নবদ্বীপে মাতৃসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ প্রথম কালীর মূর্তি গড়ে পুজো করেছিলেন। তাঁর মাতৃসাধনার চরম মূহুর্তে ইষ্টদেবীর একটি রূপ তাঁর মনে ধরা দিল। নিরাকার দেবীকে নিয়ে আরাধনা আর ভালো লাগছিলনা তাঁর।  এক অমাবস্যার নিশ্ছিদ্র অন্ধকার রাতে শ্মশানে ধ্যানমগ্ন কৃষ্ণানন্দের চেতনায় দেবী এসে ধরা দিলেন। নিরাকার দেবীর সাকার রূপ দেখতে পেলেন সাধক। অনাবিল পরিতৃপ্তিতে কৃষ্ণানন্দের দুইচোখ ভেসে গেল জলে। দেবী বললেন "বাছা, ভোর হলেই চোখ খুলে তুমি যেরূপ স্ত্রীলোকের মূর্তি সর্বপ্রথম দেখতে পাবে তেমনি মূর্তি গড়ে আমার পূজাপাঠ করো।"  কৃষ্ণানন্দ ভোর হতেই আসন ত্যাগ করে লোকালয়ের দিকে পা বাড়াতেই প্রথমেই দেখতে পেলেন অন্ত্যজশ্রেণীর স্বল্পবসনা  এক কালোমেয়েকে। যার শাড়িটি বেশ উঁচু করে পরা।  খোলাচুলে দুহাতের একটিতে একতাল গোবর ও অন্যহাতে সেই গোবর থেকে কিছুটা তল নিয়ে যেন ঘুঁটে দেবার জন্য প্রস্তুত সে।তার একটি পা মাটিতে আর অন্য পা'টি ঘরের উঠোনের মধ্যে । কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় সেই মেয়ে জিভ কাটলে। সাধক ভাবলেন "এই তো সেই মাতৃরূপ! যা তিনি হাতড়ে বেরিয়েছেন এতদিন ধরে, এই মেয়ের মতোই হবে দেবীমূর্তির রূপ।" মস্তিষ্কে তাঁর বৈদ্যুতিক শিহরণ খেলে গেল।

এবার প্রশ্ন হল আমরা যে কালীমূর্তির পুজো করি তিনি নগ্না, দিগবসনা। সন্তানদের হাত দিয়ে তৈরী মেখলা বা কোমরবন্ধনী পরিহিতা। কৃষ্ণানন্দতো শাড়ী পরিহিতা মেয়েকে দেখেছিলেন তবে কেন এমন হল?
ইতিহাস, পুরাণ, লোকগাথার ভিন্ন ভিন্ন কাহিনী অনুধাবন করলে জানা যায় দেবীমূর্তির ভিন্ন ভিন্ন উত্পন্নের কথা। কালীমূর্তির অদ্ভূত বৈশিষ্ট্যগুলি সেখানে প্রকট। তাঁর লাল টুকটুকে জিভটি বের করে রাখা হল পন্ডিতদের মতে রজোগুণের প্রতীকস্বরূপ। যুদ্ধে উন্মত্ত দেবী সেই লাল জিভ শুভ্র দাঁতগুলি দিয়ে চেপে রেখেছেন যা তাঁদের মতে সত্ত্বগুণের প্রতীক। অর্থাত সত্ত্বগুণ দিয়ে রজোগুণকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন দেবী।  দেবীর গলায় একান্নটি মুন্ডমালা বর্ণমালার একান্নটি বর্ণের প্রতীক। তাঁর আলুলায়িত, কুঞ্চিত  ও মুক্ত কেশরাজি মানুষের অন্যতম ষড়রিপু মোহের প্রতীক। তাঁর একহাতে খড়গ হল শত্রুদলনের প্রতীক আর অন্যহাতে বরাভয় হল শান্তির প্রতীক, সন্তানের পালিতা রূপ। দেবী বাইরে করালরূপিণী, ভয়ঙ্করী কিন্তু অন্তরে স্নিগ্ধা, সন্তান বাত্সল্যে উন্মুখ।তাঁর কটিবন্ধে মেখলার মত হাত ঝুলতে দেখি। এগুলি বোধহয় মানুষের কর্মফল স্বরূপ যা আমরা সঁপে দিয়েছি দেবীর কাছে। 

আর তিনি দিগবসনা অর্থাত নগ্না।  তার কারণ স্বরূপ বলি, আমরা বাইরে থেকে শাড়ী জড়ানো সকল দেবীমূর্তির যে রূপ দেখি তা কল্পনাপ্রসূত। আবরণ ও আভরণের মোড়কে দেবীর আসল রূপটি চাপা পড়ে যায়। যেমন পরম ব্রহ্মের অরূপ-স্বরূপ সবটুকুনি‌ই মায়ায় আবৃত।  সেই অমোঘ মায়াজালকে ছিন্ন করে পরম ব্রহ্মের স্বরূপটি উপলব্ধি করতে পারি, কালীমূর্তির নিরাবরণ রূপটিও কালীর আসল ভাব ও তাত্পর্যকে  ফুটিয়ে তোলে। আবার তাঁর ব্যাপ্তিটি এত‌ই অসীম ও আদিগন্ত যে কোনো কিছু ঐহিক আবরণে তাঁকে ঢাকা দেওয়া যায়না। তাই বুঝি এক মাতৃসাধকের কথায়,

"মা আমার নয় খড় জড়ানো, নয় মাটির উপর রং মাখানো।
বিশ্বজোড়া মূর্তিমায়ের আকাশেতে প্রাণ জড়ানো।" 


  • অন্ধকারের উত্স হতে উত্সারিত আলো...

পুরাণকথায় পাই দেবী কালী নাকি কার্তিকমাসের এই চতুর্দশীর রাতে ভয়ানক অত্যাচারী নরকাসুরকে বধ করেন। তাই তামিলনাডুতে এই চতুর্দশীর রাতেই দীপাবলি পালিত হয়। কিন্তু অন্য সব রাজ্যে পরের দিন অর্থাত অমাবস্যার রাতেই কালীপুজো হয়। গোয়ায় নরকাসুরের কুশপুত্তলি পোড়ানো হয় মহা সমারোহে। কাগজের তৈরী এই কুশপুতুলে নানারকম বাজি বেঁধে তাতে অগ্নিসংযোগ করে জ্বালানি হয়। কারণ কিংবদন্তীর কড়চা বলে গোমন্তেশ্বর বা গোয়াতেই নাকি নরকাসুরের দাপট অতিবৃদ্ধির জন্য স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তা রুখতে সেখানে হাজির হন সুদর্শন চক্র সমেত। তবে নরকাসুর বলি হন মা কালীর হাতে।

গুজরাট, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র উত্তরপ্রদেশ সহ সর্বত্র দেওয়ালী পালন করা হয় আলোর উত্সব, ধনতেরস ইত্যাদির সাথে । আত্মীয় বন্ধুদের সাথে উপহার আদানপ্রদান হয়, মোমবাতি, প্রদীপের আলো দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয়।

দক্ষিণ ভারতে যেমন নরকাসুর বধের আনন্দোত্সব হল দীপাবলী উত্তর ভারতে রামচন্দ্রের রাবণ বধ করে অযোধ্যায় ফিরে আসার বিজয়োত্সব।আলো দিয়ে অযোধ্যা নগরীর কোণা কোণা সাজানো হয়েছিল। তাই আলোর উত্সব দীপাণ্বিতা বা দীপাবলী বা দেওয়ালি। মূল কথা আলো আর তাকে কেন্দ্র করেই নতুন পোষাক, সুখাদ্য আর উপহার আদানপ্রদান। সেই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীকা, কামরূপ থেকে কাথিয়াবাড় সর্বত্রই অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির বরণোত্সব হল দীপাবলীর মদ্যা কথা।

ধনাগমের জন্য মানুষ করে ধনতেরস ও লক্ষ্মী-গণেশের পুজো। মূল উদ্দেশ্য একটাই। শ্রীবৃদ্ধি আর উন্নতি। আলোয় আলোয় সব ঘুচে যাক্‌, মুছিয়ে দে মা মনের কালি।
 সংসারে সারাবছর যাতে শ্রীবৃদ্ধি হয়, ধনাগম হয় সেই আশায় । লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজো হয় । পিটুলি বাটা দিয়ে মা তাঁর নিপুণ হাতে তৈরী করেন তিন পুতুল.... সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী পুতুল, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল নারায়ণ পুতুল, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের পুতুল । কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন । আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী । চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয় ।
চাটাই বাজাতে বাজাতে বলা হয়,
"অলক্ষ্মী বিদেয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক্" আসলে কুললক্ষ্মী তথা ভাগ্যলক্ষ্মীর পুজো এই দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো। সূর্যাস্তের আগেভাগে প্রদোষকালে হয় অলক্ষ্মীর পুজো। তারপর শুরু হয় দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীর পুজো। ব্রতকথা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম  ঈশ্বর, মানুষ, পুজোআর্চা এসবকিছুই  তো মানুষের মনগড়া। এই অনুষঙ্গগুলি জীবনযাপনের উপলক্ষ্যমাত্র। উপযুক্ত চেষ্টা এবং ভাগ্যের জোরে মানুষের সংসারে শ্রীবৃদ্ধি হয়। যাকে আমরা বলি লক্ষ্মীর আগমন। তাই ভাগ্যলক্ষ্মীকে বরণ করা হয় দীপাণ্বিতার দিনে।  

১০ নভেম্বর, ২০১৫

ভূতচতুর্দশী

  • আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে....

কোজাগরীর ঘোর কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর পরদিনেই ভূতচতুর্দশী। শুক্লপক্ষে আকাশ আলো করা রূপোর থালার মত চাঁদ, হিম ঝরানো জ্যোত্স্না আর শারদীয়ার মনখারাপ। দিন পনেরো কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণপক্ষের সূচনা। ভূত চতুর্দশীর প্রস্তুতি। অল সোলস ডে যাপিত হচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়ে। আত্মার দিন বা প্রেতাত্মার দিন।আমেরিকার হ্যালোউইন আর ভারতবর্ষের আকাশ প্রদীপ জ্বলা ভূত চতুর্দশীর ঘোর অন্ধকার। সেই পূর্ণিমার চাঁদ এখন ঘুমোতে গেছে। ঝুপসি অন্ধকার আকাশের গায়ে। শহরে অবিশ্যি আসন্ন দীপাবলীর আলোর রোশনাই আর আকাশছোঁয়া ঘরবাড়ির আলোয়, বাজির গন্ধকী গন্ধে ভরপুর বাতাস। হিমের পরশ, ঝিমধরা নেশাগ্রস্ত ... ঋতু বৈচিত্র্যময়তায় । কার্তিক মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী। আকাশের ফুটফুটে তারা সেই অন্ধকারে দৃষ্টিগোচর হয়। হ্যালোউইন পালিত হয় সেদেশে মৃত আত্মার শান্তি কামনায়। ঠিক যেমন আমরা আমাদের মহলায়ায় প্রিয়জনের মৃত আত্মার প্রতি স্মৃতিতর্পণ জানিয়ে পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের শুরু করি।
মহালয়ার পনেরো দিন আগে পিতৃপক্ষের সূচনায় দেবলোক থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেছিলেন তাঁরা।

পিতৃপুরুষকে স্মরণ করে  তাঁদের পিন্ডদান, তর্পণ করে আত্মার তৃপ্তিদান করেছিলাম আমরা। ঠিক একমাস পরের অমাবস্যায় তাঁদের আবার স্বর্গে ফিরে যাবার কথা। তাঁদের যাত্রাপথকে আলো দেখানোর জন্য এই একমাস আকাশপ্রদীপ জ্বলেছে প্রতিবাড়ির ছাদে। এবার তাঁদের যাত্রাপথকে আলোকিত করার জন্য দীপাবলী উত্সব। তাঁরা আবারো শান্তিতে আলোয় আলোয় ফিরে যাবেন স্বর্গলোকে।  ভূত চতুর্দশীর অন্ধকারে মৃত আত্মারা নাকি ঘুরে বেড়ায়। তাদের আত্মার শান্তি কামনায় চৌদ্দ রকম শাক (ওল, কেঁউ, বেতো, সরিষা, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাটঁপাতা, সুষণী ) ভেজে খাওয়ার রীতি। আর সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির আনাচে কানাচে চৌদ্দ প্রদীপ জ্বালার নিয়ম। কোথাও যেন কোনো অন্ধকার না থাকে। বৈদিক মতে এর ঠিক একমাস আগে মহালয়ার দিন পরিবারের আত্মীয় বন্ধুদের মৃত আত্মার শান্তি কামনা করে তর্পণ করা হয় তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। আবার তন্ত্র মতে ঠিক এক মাস পরে এই কার্তিক অমাবস্যার আগের দিন মৃত আত্মাদের আলো জ্বালিয়ে স্মরণ করা হয়। মূল কথা একটাই ,তোমরা সুখে থাকো, ভালো থাকো। কারো কোনো অনিষ্ট কোরোনা।

৯ নভেম্বর, ২০১৫

ধন-তেরস

আকাশে বাতাসে ধ্বনির ত্রাস, পালন করছি ধন-তেরস 
ধন কিনতে পকেট হ্রাস, সোনারূপোয় গিলছি গ্রাস  !   

  • সকল দ্বন্দ বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো, সেই তো তোমার ভালো....

সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চতুর্দশীর আগের দিন অর্থাত ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস নামে উত্সব পালন হয় । পুরাণের গল্পে আছে সমুদ্রমন্থনের সময়কালীন এক গল্প। ঐশ্বর্যের ভারে অহংকারী দেবরাজ ইন্দ্র সকলকে খুব হেয় করছিলেন। একদিন দুর্বাশা মুনি তাঁর গলার পারিজাতের মালাটি অত্যন্ত স্নেহের সাথে হাতির পিঠে চড়া ইন্দ্রকে গলায় পরিয়ে দিতে যান। মালাটি ইন্দ্রের গলায় না পড়ে হাতির দাঁতের ওপর গিয়ে পড়ে ও হাতি ততক্ষণাত সেই মালাটিকে শুঁড়ে করে মাটিতে ফেলে দেয়। তা দেখে দুর্বাসা অতীব ক্রুদ্ধ হন ও দেবরাজকে "লক্ষ্মী চ্যুত হও" এই বলে অভিশম্পাত করেন। মুনির এই অভিশাপে দেবরাজ ইন্দ্র অসুরদের পরাজয় লাভ করেন ও রাজ্য, সিংহাসন, লোকবল সব হারান। অসুররা তখন স্বর্গের মালিকানা পান ও লক্ষ্মীদেবী সহ সমগ্র দেবতাকুল পালিয়ে গিয়ে সমুদ্রের অতলে আশ্রয় নিলেন। দেবকুলের এহেন সমূহ বিপদে দেবরাজ ইন্দ্র প্রজাপিতা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। তিনি সব শুনে বললেন একমাত্র বিষ্ণুই পারেন দেবতাদের বিপন্মুক্ত করতে। আর তখনি শুরু হল সেই মহাকার্য যার নাম সমুদ্রমন্থন। সমুদ্রের গভীরে নাকি "অমৃত" নামে এক অমোঘ সঞ্জিবনী সুধা আছে যা পান করলে দেবতারা অমরত্ব লাভ করবেন। বিষ্ণুর আদেশে মন্দার পর্বত হল সমুদ্রমন্থনের দন্ড। আর নাগরাজ বাসুকী হল মন্থনের রজ্জু। মন্দার পর্বতকে বাসুকী তার সমগ্র শরীর দিয়ে বেষ্টন করে র‌ইল আর দেবতারা দুইদিক থেকে তার মুখ ও লেজ ধরে টানতে লাগলেন। শুরু হল ভয়ানক সমুদ্রমন্থন প্রক্রিয়া। ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত নামে হস্তী, চন্দ্র, উচ্চৈঃশ্রবা নামক অশ্ব, বৈচিত্রময় মণিমাণিক্য, পারিজাত নামক স্বর্গের নান্দনিক পুষ্পবৃক্ষ সব উঠে আসতে লাগল একে একে । এরপর অমৃতের ভান্ড হাতে উঠলেন দেবতাদের চিকিত্সক ধ্বন্বন্তরী। আর সবশেষে বাসুকীরাজের সহস্র ফণারূপ ছত্র মাথায় উঠে এলেন মা লক্ষ্মী।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতেই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধ্বন্বন্তরী। তাই এই তিথির নাম হল ধনতেরস। তাই এই দিনটিতে ধনের উপাসনা করতে হয়। আর তার ঠিক পরেপরেই লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়। সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেদিন নাকি ছিল কার্তিক অমাবস্যা। তাই লক্ষ্মীকে বরণ করে স্বর্গে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুষ্ঠানটিতে আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল স্বর্গকে।
  • ডুব দে রে মন কালী বলে, হৃদি রত্নাকরের অগাধ জলে...

দীপাণ্বিতাই বল কিম্বা দীপাবলী অথবা ধনতেরসে লক্ষ্মী-গণেশের পুজো...উদ্দেশ্য একটাই ধনাগম ও শ্রীবৃদ্ধি। তবে কোথাও যেন কালীর সাথে সবকিছু একাত্ম হয়ে যায়। বাজি পোড়ানো, আলোর উত্সব, মিষ্টিমুখ, উপহারের আদানপ্রদান সবকিছুই যেন সেই সনাতন ধর্মের সৌহার্দের বার্তা বহন করে আনে।  কালী করেন অশুভ শক্তির বিনাশ আর লক্ষ্মী ঘটান শ্রীবৃদ্ধি। দেওয়ালী হল মিলনোত্সব, দীপাণ্বিতা সেই উত্সবে আলোর রোশনাই। 

২৬ অক্টোবর, ২০১৫

কোজাগরীর চিঠি

সুজনেষু সব ব্রতীরা 

মি আজ জেগেই থাকব সারাটা রাত। যতক্ষণ না পূর্ণিমার চাঁদ ডুবে যায় আকাশের মধ্যে। যতক্ষণ না আমার চোখের পাতা ক্লান্ত হয়। যতক্ষণ না আমি তার দেখা পাই। কেউ ঘুমিওনা আজ রাতে। ঘুমিয়ে পড়লেই আমার শব্দ শুনতে পাবে। কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে আমি চুপিচুপি বলব "জাগদেরহো"! আমার ঘুম নেই চোখে।  আর আমিও ঘুমোতে দেবনা কারোকে। শারদপূর্ণিমা আমার যে ভীষণ প্রিয়। আশ্বিন-কার্তিকের এই পূর্ণিমার সময় বর্ষা ঋতু ফিরে যায় একবছরের মত। মৌসুমীবায়ু বিদায় নেয়। শস্যশ্যামলা মাটিতে নতুন আউস ধানের গন্ধ ওঠে। তোমাদের ঘরে ঘরে পরব আর আমি তখন কোজাগরী।  আমার তখন কৌমুদী-উত্সব। চাঁদের আলোয় তখন আমার রাত পরিক্রমার শুরু। আমি কোজাগরী হয়ে দেখব কে আমাকে চায়। কে আমার পালন করে। কে আমাকে বেঁধে রাখে আজীবন।   
জানো ? আমরা দুই যমজ বোন। লক্ষ্মী আর অলক্ষ্মী। আমার সব সোজাসাপটা, সাধাসিধে  । আমার ধীরস্থির চলনবলন। আমি শান্তশিষ্ট, বেশী আওয়াজ আমার নাপসন্দ। বেশী খাওয়া দেখলেই আমার বমি আসে। আমি মিষ্টি, দুধের খাবার পছন্দ করি। আর আমার বোন অলক্ষ্মীর সব উল্টো। সে যেমন কলহপ্রিয়া তেমনি কোলাহল প্রিয়া। সে বড্ড বেশী খায় আর যতসব টক, ঝাল আর বিদঘুটে সব খাবার তার পছন্দের। সে যেমনি বাচাল তেমনি চঞ্চল।
আমাকে ছাড়তে নাছোড় সে। আমারো খুঁতখুঁতানি থাকে তাকে নিয়ে । নিজের সংস্কারটা শুদ্ধ রাখতে চাই যে! ওর সঙ্গদোষে যদি আমি খারাপ হয়ে যাই! ভয় হয়।  
অলক্ষ্মী যেমনি হোক, আমার আশেপাশেই থাকে। বোন তো! ফেলতে পারিনা, গিলতেও পারিনা তাকে। তবে আমার দাপটে সে একটু হলেও চাপে থাকে সর্বদা।  সাধারণ মানুষ বিষ্ণুর অবতারত্ব নিয়ে কতকিছু বলে কিন্তু আমি মেয়ে বলে আমার কথা কেউ বলেনা। আমি ত্রেতায় রামের সহধর্মিণী সীতা, দ্বাপরে কৃষ্ণের পত্নী রুক্মিনী।  পুরাণে বলে সমুদ্রমন্থনের সময় ক্ষীরসাগর থেকে পদ্মফুল হাতে আমি উঠে এসেছিলাম। তাই আমার অপর নাম পদ্মা।  আমি আবার নাকি পদ্মফুলে বসি তাই আমার নাম কমলা।  আমি বিষ্ণুর প্রেমিকা তাই আমার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া।  এমন সব কত আদরের, আহ্লাদের নাম আমার ।
  সমুদ্রমন্থনের সময় উঠে এসেছিলাম তাই কেউ আমায় বলে সমুদ্রকন্যা। কেউ আবার ডাকে ভূদেবী অর্থাত সারা পৃথিবীর, সমগ্র প্রকৃতির পালনকর্ত্রী নাকি আমি। 
ঐ দ্যাখো সকলেই বলে "বিশ্বরূপস্য ভার্য্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে সর্বতো পাহি মাং দেবী মহালক্ষ্মী নমোহস্তুতে"
তবুও দেখো আমার না আছে পিতামাতা। না আছে স্বামীসন্তানের সুখ। তাই তো আমি সেই দুঃখ ভুলে গিয়ে জগতের পালন করতে তোমাদের ধনদৌলত আগলাতে সর্বদা ব্যস্ত থাকি। আমার আর কে আছে তোমরা ছাড়া!  আর কোজাগরীর দিনে মানে বছরের ঐ একটি বিশেষ পূর্ণিমা তিথিতে আমার কাজ হল ঘুরে ঘুরে দেখা  কোথায় নষ্ট হল ধান, কার গৃহে অলক্ষ্মী বাস করল, কে খেতে পেয়েও রাখতে পারলনা আর কে তিলতিল করে সঞ্চয় করে ঘরে আনল লক্ষ্মী।
উজ্জয়িনীর এক ধার্মিক রাজা তাঁর প্রজাপালনের জন্য খুব সুখে কাল যাপন করতেন। একবার তিনি ঢেঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে দিলেন যে তাঁর রাজ্যের হাটে কোনো অবিক্রিত জিনিষ যেন না পাড়ে থাকে। দিনের শেষে  তিনি‌ই সেই জিনিষটি কিনে নেবেন দোকানীর কাছ থেকে। রটে গেল খবর। জানা গেল এক কামারের কাছে এক ভয়ানক চেহারার বিশ্রী নারীমূর্তি পড়ে রয়েছে। কামারকে জিগেস করতেই সে বলল, মহারাজ এটি নাকি অলক্ষ্মী মূর্তি তাই কেউ কিনতে চাইছেনা। মহারাজ বললেন, তিনি যখন কথা দিয়েছেন তখন সেটি কিনে নিয়েই বাড়ি ফিরবেন। নয়ত অধার্মিক রাজা হিসেবে তাঁকে রাজ্যের মানুষ চিনে যাবে। রাজা অগত্যা সেই লোহার মূর্তিটি কিনে এনে নিজের ঠাকুরবাড়িতে তাকে আশ্রয় দিলেন। মাঝরাতে নিজের রাজপুরীর মধ্যে মেয়েলি কান্নার কন্ঠস্বর শুনে রাজা দেখতে পেলেন এক ক্রন্দনরতা নারীমূর্তিকে। রাজা তাকে জিগেস করলেন" তুমি কাঁদছো কেন মা?" সেই নারী  বললে," মহারাজ, আমি আপনার রাজলক্ষ্মী, আজ আপনার বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি" রাজা বললেন, কেন মা? আমি কি অন্যায় করেছি?  জানতে পারি? " সেই নারীমূর্তি বললে," আপনি রাজবাড়িতে অলক্ষ্মীকে ঠাঁই দিয়েছেন। অতএব আমি আর এখানে থাকতে পারবনা। " এই বলে অন্তর্হিতা হলেন। আবার কিছুপরে রাজা দেখলেন আরেক সুন্দরী, সুশীলা নারী প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে হল ভাগ্যলক্ষ্মী। তার কিছুপরেই যশোলক্ষ্মী, কুললক্ষ্মী, সকলেই একে একে রাজপুরী থেকে বিদায় নিল। রাজার সেরাতে ঘুম এলনা। এবং সকলেরি বিদায় নেবার কারণ হল সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি যেটি রাজা কিনে এনেছিলেন।
এভাবেই তাঁর দিন কাটে।
তবুও শিল্পীর হাতে বানানো সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি ফেলে দিতে রাজার মন চায়না। শিল্পীতো আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরী করেছে তাকে। 
শিল্পীর শিল্পীসত্তায় আঘাত করতে মন চায়না রাজার। তাই প্রাসাদ থেকে একটু দূরেই সরিয়ে রাখেন তাঁকে কিন্তু ফেলতে পারেন না। ক্রমে তিনি দরিদ্র হতে থাকলেন। ধন, মান, যশ, সাফল্য ভাগ্য তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। একদিন রাজা দেখতে পেলেন ধর্মরাজ তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।  রাজা তখন নিরূপায় হয়ে ভাবলেন এটা মেনে নেওয়া যায়না। ধর্ম তাঁকে ত্যাগ করলে তিনিতো অধার্মিক রাজা রূপে পরিগণিত হবেন। রাজা তখন ধর্মকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেন।   
ধর্মরাজা রাজার যুক্তি শুনে খুব খুশি হলেন। ধর্মরজের কথায় আশ্বিনমাসের পূর্ণিমায় রাণীকে কোজাগরী ব্রত পালন করতে বললেন । রাণী সারারাত জেগে বসে র‌ইলেন।  আর নিষ্ঠাভরে লক্ষ্মীর পুজো করে রাজা সব ফিরে পেলেন। আবার আগের মত তাঁর রাজবাড়ি ভরে উঠল জাঁকজমকে, ধনসম্পত্তিতে।
এইগল্পটা শুনে তোমরা বলবেতো নিজের ঢাক নিজে পেটালাম? আসলে কি জানো? আমি তো চাই তোমাদের ঘরে আটকে থাকতে। তোমাদের ভালোর জন্যে অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি সব দিয়ে তোমাদের ধনী করতে। কিন্তু তাই বলে অলক্ষ্মীর জন্যে সত্যকে, অধর্মকে তো আর মেনে নিতে পারিনা। ঐ রাজার চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো গুণ হল তিনি সত্‌ এবং ধার্মিক। আর তাইতো ধর্মরাজা সবকিছু ফিরিয়ে দিলেন রাজাকে। অলক্ষ্মীর প্রতিও অবিচার করেননি রাজা আর শিল্পীর প্রতি তো নয়‌ই। 

আমার জীবনের কত গল্পের কথা আর বলি তোমাদের? নারায়ণের পাশে আজীবন সদা সুহাসিনী লক্ষ্মীকে দেখে তোমরা ভাবো এই দম্পতির কত সুখ! আদর্শ স্বামীস্ত্রী ইত্যাদি ইত্যাদি। তাহলে শোনো আমার সপত্নীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গল্প। কত ঝড় বয়ে গেলে একটা মেয়ে লক্ষ্মীমেয়েতে পরিণত হয় দ্যাখো তোমরা!
কত অসহনীয় টানাপোড়েন একজন নারীকে লক্ষ্মী করে তোলে!   
পুরাণের আরেকটি গল্পের মতে সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং গঙ্গা ছিলেন বিষ্ণুর তিন পত্নী । বিষ্ণু কিন্তু গঙ্গার প্রতি একটু বেশিমাত্রায় আসক্ত ছিলেন ।  নম্রস্বভাবের লক্ষ্মী এই ঘটনায় মনে মনে খুব দুখঃ পেতেন কিন্তু কিছু প্রকাশ করতেন না । সরস্বতী কিন্তু বিষ্ণুর এই অতিরিক্ত গঙ্গাপ্রেমকে প্রশ্রয় না দিয়ে অশান্ত এবং রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন ।  একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল । প্রচন্ড উগ্রমূর্তি ধরলেন তিনি । গঙ্গার মুখোমুখি হলেন । লক্ষ্মী একটি ভয়ানক কলহের পূর্বাভাস পেয়ে সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালেন । সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিয়ে একটি গাছে পরিণত করলেন । লক্ষ্মী আবার সেই অভিশাপে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সরস্বতীকে নদীতে রূপান্তরিত করলেন । সরস্বতী নিজেও তখন উগ্রচন্ডা । নিজে নদীতে পরিণত হয়েছেন বলে গঙ্গাকেও নদী হতে অভিশাপ দিলেন । ইতিমধ্যে বিষ্ণু সেইখানে হাজির হলেন । এতসব ঝগড়া বিবাদ দেখে ও শুনে স্থির করলেন সরস্বতী ও গঙ্গার সাথে আর নয় । এখন থেকে তিনি কেবলমাত্র লক্ষ্মীর সাথেই ঘর করবেন । সরস্বতীকে ব্রহ্মার হাতে এবং গঙ্গাকে শিবের হাতে সমর্পণ করে বিষ্ণু  হলেন লক্ষ্মীর প্রিয় পতিদেবতা । আর  সরস্বতী ও গঙ্গার ওপর এরূপ অন্যায় শাস্তির জন্য  লক্ষ্মী মনে মনে ব্যথিত হলেন আবার বিষ্ণুকে একান্ত নিজের স্বামীরূপে বরণ করে আনন্দিতও হলেন  । বিষ্ণুকে শান্ত হতে বললেন এবং তাদের দুজনের আশীর্বাদে লক্ষ্মী ও গঙ্গা মর্ত্যের ওপর দিয়ে নিজ নিজ গতিপথে ব‌ইতে লাগল ।   স্বর্গে তাদের দুজনার একটি করে শাখা বিষ্ণুর হাত ধরে র‌ইল।
তবে যাই বলো সেই বৈদিকযুগ থেকে আমি স্বীকৃতি পেয়ে আসছি সৌভাগ্য ও ঋদ্ধিদায়িনী দেবী রূপে। আমি যখন শুভদায়িনী তখন কল্যাণী বা পুণ্যলক্ষ্মী আর অশুভদায়িনী যখন তখন আমি অলক্ষ্মী।    
কেউ বলেন আমি মাদুর্গার কন্যা । কেউ বলেন আমি মায়ের অন্য একটি রূপ । মহাদেব নিজের দেহ থেকে সৃষ্টি করেছিলেন ঊমাকে এবং ঊমা পরে সৃষ্টি করেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, দুর্গা এবং কালীকে । শ্রী শ্রী চন্ডীতে দুর্গাদেবীকেই মহালক্ষ্মী  রূপে আখ্যা দেওয়া হয় । বাঙালী কল্পনাপ্রবণ জাতি । সপরিবারে মা দুর্গাকে না দেখলে তাদের যে মন ভরেনা । তাই তো দুই শক্তি লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে দুপাশে আমরা দেখি এবং মহানন্দে বরণ করি । লক্ষ্মীদেবী হলেন বিষ্ণুপ্রিয়া বা নারায়ণী যিনি সৌভাগ্য, ঐশ্বর্য্য এবং সমৃদ্ধির প্রতীক আর সরস্বতী হলেন বাগদেবী, বিদ্যা-বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী, জ্ঞানদায়িনী। অর্থাত এই দুই নারীশক্তি সকল শুভ, সৃজনশীল, গঠনমূলক ক্রিয়াকলাপের উত্স । তাই শুভ শক্তির প্রতীকও বটে ।
আমার বাহন পেঁচা। তাই বলে ঐটুকুনি পেঁচার ওপরে আমি  বসে থাকি আর সে আমাকে নিয়ে উড়ুক আর কি!  এসব বাহন তত্ত্ব মনগড়া। 
লক্ষ্মীর বাহন নিশাচর পেঁচা । অন্ধকার যার আশ্রয় । লক্ষ্মী সৌভাগ্য-সমৃদ্ধির আলোর দিশা দেখান পেঁচাকে সাথে নিয়ে  অর্থাত অন্ধকার ও আলোর মধ্য থেকে জীবজগত আলোর দিশা খুঁজে নেবে । কারণ জীবনে ঘাত-প্রতিঘাতের লড়াইতে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য উভয়ই থাকবে কিন্তু  সব পরিস্থিতিতেই অবিচল থেকে আলোর পথ যাত্রী হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলতে হবে । জাগতিক সত্ত্ব ও তমগুণের মধ্য থেকে সত্ত্বটুকুকে বেছে নিতে হবে । তাই বলে তমকে বাদ দিলেও বাদ দেওয়া যাবে না তাই এই নিশাচর ।
এত জ্ঞান দিলাম চিঠিতে কিন্তু কেউ কি জানবে আমার কথা? 

ইতি
আমি কোজাগরী
 
 

২১ অক্টোবর, ২০১৫

সন্ধিপূজা? তার আবার বিশেষত্ব কি ?


রামায়ণে আছেঃ 

শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পুজো চলতে লাগল । সপ্তমীর দিন দেবী স্বয়ং রামের ধনুঃশ্বরে প্রবেশ করলেন । অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নিলেন । অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করলেন রামচন্দ্র ।
দেবী দুর্গা নাকি এই দুইতিথির মিলনক্ষণেই আবির্ভূতা হন দেবী চামুন্ডারূপে । চন্ড এবং মুন্ড এই দুই উগ্রমূর্ত্তি ভয়ানক অসুরকে বধ করেছিলেন এই সন্ধিক্ষণে । আশ্বিনমাসে রামচন্দ্রের অকালবোধন এবং অপ্রতিরোধ্য রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করার জন্য যে দুর্গাপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায় কৃত্তিবাসের রামায়ণে সেখানেও দেখি রামচন্দ্র সন্ধিপূজা সমাপন কালে দেবীর চরণে একশো আট পদ্ম নিবেদন করার আশায় হনুমানকে দেবীদহ থেকে একশো আটটি পদ্মফুল তুলে আনতে বলেন । হনুমান একশোসাতটি পদ্ম পেলেন । দেবীদহে আর পদ্ম ছিলনা । এবার প্রশ্ন কেন দেবীদহে একটি পদ্ম কম ছিল । তার কারণ স্বরূপ কথিত আছে , দীর্ঘদিন অসুর নিধন যজ্ঞে মাদুর্গার ক্ষত বিক্ষত দেহের অসহ্য জ্বালা দেখে মহাদেব কাতর হলেন । মায়ের সারা শরীরে একশো আটটি স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল । মহাদেব তাঁকে দেবীদহে স্নান করতে বললেন সেই জ্বালা জুড়ানোর জন্য । দেবীদহে মায়ের অবতরণে একশো সাতটি ক্ষত থেকে সৃষ্টি হয়েছিল একশো সাতটি পদ্মের । মহাদেব দুর্গার এই জ্বালা সহ্য করতে না পারায় তাঁর চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু নিক্ষিপ্ত হল মায়ের একশো আটতম ক্ষতের ওপর । দেবীদহে স্নানকালে সেই অশ্রুসিক্ত ক্ষতটির থেকে যে পদ্মটি জন্ম নিয়েছিল সেটি মা নিজে হরণ করেছিলেন । কারণ স্বামীর অশ্রুসিক্ত পদ্মফুলটি কেমন করে তিনি চরণে নেবেন । আবার কৃত্তিবাসের রামায়নে পাই রাবণ নিধন যজ্ঞের প্রাক্কালে রামচন্দ্র বলছেন

” যুগল নয়ন মোর ফুল্ল নীলোত্পল
সংকল্প করিব পূর্ণ বুঝিয়ে সকল ।।

রাম ধনুর্বাণ নিয়ে যখন নিজের নীলোত্পল সদৃশ একটি চক্ষু উত্পাটন করতে উদ্যত তখন দেবী রামচন্দ্রের হাত ধরে তাঁকে নিবৃত্ত করে বলেন

“অকালবোধনে পূজা কৈলে তুমি, দশভুজা বিধিমতে করিলা বিন্যাস।
লোকে জানাবার জন্য আমারে করিতে ধন্য অবনীতে করিলে প্রকাশ ।।
রাবণে ছাড়িনু আমি, বিনাশ করহ তুমি এত বলি হৈলা অন্তর্ধান ”

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ হল এই সন্ধিপুজো। অষ্টমীতিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীতিথির শুরুর ২৪ মিনিট....এই মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যেই  অনুষ্ঠিত হয়। মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধের সময় দেবী দুর্গার পিছন দিক থেকে আক্রমণ করেছিল দুই ভয়ানক অসুর চন্ড ও মুন্ড। দেবী তখন এক অদ্ভূত রূপ ধারণ করেন। কেশরাজিকে মাথার ওপরে সু-উচ্চ কবরীতে বেঁধে নিয়ে, কপালে প্রজ্জ্বলিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি টিপ ও তিলক এঁকে, গলায় বিশাল মালা ধারণ করে, কানে সোনার কুন্ডল ও হলুদরঙা শাড়িতে নিজেকে সজ্জিত করেন। তাঁর রক্তচক্ষু, লাল জিহ্বা, নীলাভ মুখমন্ডল  এবং ত্রিনয়ন থেকে অগ্নি বর্ষণ করতে থাকেন। ঢাল ও খড়্গ নিয়ে চন্ড ও মুন্ডকে বধ করেছিলেন দেবী এই সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণে।  

সন্ধিপূজার এই মাহেন্দ্রক্ষণে কেউ বলি দেন । কেউ সিঁদুর সিক্ত একমুঠো মাসকলাই বলি দেন । সবকিছুই প্রতিকী । সর্বকালের সর্বক্ষণের দুষ্টের দমন হয় দেবীর দ্বারা । রক্তবীজ অসুর কুল বিনষ্ট হয় । ঢাকের বাদ্যি বেজে ওঠে যুদ্ধজয়ের ভেরীর মত । একশো আট প্রদীপের আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয় ভারতবর্ষের আনাচকানাচ । উত্তিষ্ঠত ভারতবাসীর জাগ্রত মননে দুষ্কৃতের বিনাশিনী এবং সাধুদের পরিত্রাণ কারী মা দুর্গা কান্ডারী হয়ে প্রতিবছর অবতীর্ণ হন মর্ত্যলোকে ।

২০ অক্টোবর, ২০১৫

মহাসপ্তমীঃ নবপত্রিকা স্নান করায় কেন?


ছোটবেলায় জ্ঞান হবার পর থেকে আমরা সকলেই দুর্গাপুজোর সপ্তমীর ভোরে মহা সমারোহে ঢাকের বাদ্যির সাথে সাথে গঙ্গায় বা নদীতে “কলা-বৌ” স্নান করানোর আয়োজন দেখি । স্নান করিয়ে সেই কলাবৌটিকে নতুন লালপাড় শাড়ি পরিয়ে মাদুর্গার পাশে রাখা হয় এবং পুজোর পাঁচটাদিন পুজো করা হয় ঐ কলাবৌটিকে । বিসর্জনের দিন প্রতিমার সাথে তাকে ও বিসর্জন দেওয়া হয় । ছোটবেলায় প্রশ্ন করলে বলা হত ওটি গণেশের কলা-বৌ । আদতে গণেশ কিন্তু বিয়েই করেন নি ।  মা দুর্গাকেই ঐ রূপে পুজো করা হয় । আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে এই কলাবৌটির পুজোটি এই প্রসঙ্গে যথেষ্ট তাতপর্য পূর্ণ । বেদে আছে ভূমি হল মাতা, মৃত্শক্তি  যা ধারণ করে জীবনদায়িনী উদ্ভিদকে । আযুর্বেদের  ঐতিহ্যবাহী ভারতবর্ষে রোগভোগের প্রাদুর্ভাব ও কিছু কম নয় । এবং মা দুর্গার চিন্ময়ীরূপটি এই কলা-বৌয়ের অবগুন্ঠনেই যে প্রতিস্থাপন করা হয় সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । এই কলাবৌকে বলা হয় নবপত্রিকা । নয়টি প্রাকৃতিক সবুজ শক্তির সঙ্গে আধ্যাত্মিক চেতনশক্তির মিলন হয় দেবীবন্দনায় । সম্বচ্ছর যাতে দেশবাসীর রোগ ভোগ কম থাকে এবং  দেশ যেন সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠে সেই বাসনায় এই নবপত্রিকাকে দুর্গারূপে পুজো করা হয় । ন’টি উদ্ভিদের প্রত্যেকটির গুরুত্ব আছে । প্রত্যেকটি উদ্ভিদ ই দুর্গার এক একটি রূপ এবং তার কারিকাশক্তির অর্থ বহন করে । এরা সমষ্টিগত ভাবে মাদুর্গা বা মহাশক্তির প্রতিনিধি ।  যদিও পত্রিকা শব্দটির অর্থ হল পাতা কিন্তু নবপত্রিকায় নয়টি চারাগাছ থাকে । আবক্ষ অবগুন্ঠনের আড়ালে নববধূর একটি প্রতিমূর্তি কল্পনা করা হয় । বাসন্তী এবং দুর্গা এই দুই পুজোতেই নবপত্রিকা অর্চনার নিয়ম আছে । যে ক’টি চারাগাছের সমষ্টিকে একত্রিত করে অপরাজিতার রজ্জু দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকা তৈরী করা হয় সেই নয়টি উদ্ভিদের নাম শ্লোকাকারে লেখা আছে  আর এই ন’টি গাছের প্রত্যেকের আবার অধিষ্ঠাত্রী দেবী আছেন

রম্ভা, কচ্বী, হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িমৌ। অশোক মানকশ্চৈব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা ।।

অর্থাত

(১) কলা–ব্রহ্মাণী(শক্তিদাত্রী)

(২) কালো কচু– কালিকা (দীর্ঘায়ুদাত্রী)

(৩) হলুদ– ঊমা( বিঘ্ননাশিনী)

(৪) জয়ন্তী–জয়দাত্রি,  কার্তিকী( কীর্তিস্থাপয়িতা )

(৫) বেল–শিবাণী(লোকপ্রিয়া)

(৬) ডালিম–রক্তবীজনাশিনী( শক্তিদাত্রী)

(৭) অশোক–দুর্গা(শোকরহিতা)

(৮) মানকচু– ইন্দ্রাণী( সম্পদদায়ী)

(৯) ধান–মহালক্ষ্মী( প্রাণদায়িনী)

মহাসপ্তমীর সূচনা হয় নবপত্রিকার স্নানপর্ব দিয়ে । নবপত্রিকা দেবীদুর্গার প্রতিনিধি । শ্বেত অপরাজিতা লতা এবং হরিদ্রাক্ত সূতা দিয়ে এই ন’টি উদ্ভিদ একসাথে বেঁধে নদীতে স্নান করানো হয় । দেবীর প্রিয় গাছ বেল বা বিল্ব । নদীতে নবপত্রিকা স্নানের পূর্বে কল্পারম্ভের শুরুতে দেবীর মুখ ধোয়ার জন্য যে দাঁতন কাঠি ব্যাবহৃত হয় তাও আট আঙুল পরিমিত বিল্বকাঠেরই তাছাড়া মন্ত্রে সম্বোধন করে নবপত্রিকাকে দেবীজ্ঞান করা হয় । শস্যোত্পাদনকারিণি দেবী দুর্গা স্বয়ং কুলবৃক্ষদের প্রধান অধিষ্ঠাত্রীদেবতা ও যোগিনীরা দেবীর সহচরী । স্নানান্তে নতুন শাড়ি পরিয়ে তিনটি মঙ্গলঘটে আমপাতা, সিঁদুর স্বস্তিকা এঁকে জল ভরে একসাথে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ, ঘন্টা এবং উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে, মন্ডপে মায়ের মৃন্ময়ীমূর্তির সাথে স্থাপন করা হয় । এই তিনটি ঘটের একটি মাদুর্গার ঘট, একটি গণেশের এবং তৃতীয়টি শান্তির ঘট । নবপত্রিকার পূজা একাধারে কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষের বৃক্ষপূজা অন্যদিকে রোগব্যাধি বিনাশকারী বনৌষধির পূজা । মহাসপ্তমীর ভোরে বিল্ববৃক্ষের পূজা, নবপত্রিকা এবং জলপূর্ণ ঘটস্থাপন এর দ্বারাই দেবীপূজার সূচনালগ্ন ঘোষিত হয় ।


ওঁং চন্ডিকে চল চল চালয় চালয় শীঘ্রং ত্বমন্বিকে পূজালয়ং প্রবিশ।

ওঁং উত্তিষ্ঠ  পত্রিকে দেবী অস্মাকং হিতকারিণি”

 
এঁরাই আবার নবদুর্গা রূপে পূজিতা হ’ন । তাই দুর্গাপূজার মন্ত্রে পাই 


“ওঁ পত্রিকে  নবদুর্গে ত্বং মহাদেব-মনোরমে”

ভবিষ্যপুরাণে পাওয়া যায়.. 

"অথ সপ্তম্যং পত্রিকাপ্রবেশন বিধিঃ" 


নবপত্রিকাকে জনপদে মঙ্গলের দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে পূজা করা হয় । একাধারে এটি কৃষিপ্রধান দেশের চিরাচরিত কৃষিলক্ষ্মী যা প্রাক্‌-আর্যসভ্যতার নিদর্শন অন্যাধারে জীবজগতের কল্যাণকর এই উভিদগুলির রোগনিরাময়ক গুণাবলীর জন্য  বনৌষধিও বটে । তাই এই ন’টি গাছকে অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে দেওয়ার অর্থ হল জনকল্যাণকর এই উদ্ভিদগুলি যেন রোগ-ব্যাধির হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে বা মানুষ যেন এই পুজার মাধ্যমে রোগ ব্যাধিকে জয় করতে পারে ।

১৯ অক্টোবর, ২০১৫

মহাষষ্ঠীর বোধন আবার কি?

  
 


সীতাহরণের পর রামচন্দ্র বানরসেনাদের সাহায্যে সেতুবন্ধ করে লঙ্কায় হাজির হলেন । ব্রহ্মা তখন রামকে আদেশ করলেন অপরাজিতা দুর্গার পুজো করে জগতের উদ্ধারে নেমে পড়তে । সমগ্র রাক্ষসকুলকে ধ্বংস না করতে পারলে যে ধরিত্রীর নিস্তার নেই । তাই কৃষ্ণপক্ষেই নিদ্রিতা দেবীকে অকালে জাগ্রত করে অকালে অর্থাত শরতকালে  (পূর্বে বসন্তকালে শুক্লপক্ষে দেবলোক জাগ্রত অবস্থায় পুজো হত)   কাজে নেমে পড়েছিলেন রামচন্দ্র স্বয়ং । তাই তো অকাল বোধন । ব্রহ্মার পরামর্শে দেবী দুর্গার দশভুজা মূর্তি মাটি দিয়ে গড়ে ব্রহ্মা স্বয়ং বিল্ব বৃক্ষমূলে সিংহবাহিনী সেই দেবীর বোধন করেছিলেন । সেই দিনটিই ছিল শুক্লপক্ষের মহাষষ্ঠী ।
রামচন্দ্র স্তব করলেন :

নমস্তে ত্রিজগদ্বন্দ্যে সংগ্রামে জয়দায়িনী
প্রসীদ বিজয়ং দেহি কাত্যায়নি নমোহস্তুতে ।।

পূজা শুরু হল । পিতামহ  ব্রহ্মা  রামচন্দ্রের সাথে বললেন
“হে দেবী! যত দিন না পর্যন্ত রাবণ বধ হয়, রাক্ষসকুল ধ্বংস না হয় আমাদের পূজা গ্রহণ করে তুষ্ট হোন ”   

মিথিলার কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী গ্রন্থে ষষ্ঠীতে মায়ের বোধনের উল্লেখ আছেঃ ষষ্ঠ্যাং বিল্বতরৌ বোধঃ সায়ংসন্ধ্যাসুকারয়েত্‌। বসন্তকালের দুর্গাপুজোয় বোধনের প্রয়োজন হয়না কারণ দেবতারা ঐ সময়  জাগ্রত থাকেন। সমগ্র দেবকুলকে শরতকালে জাগানোর উদ্দেশ্যেই এই বোধন। বোধনের অর্থ হল জাগরণ। কালিকাপুরাণে পাওয়া যায় এই বোধন নিয়ে...

"বোধয়েদ্বিল্ব্শাখায়াং ষষ্ঠ্যাং দেবীফুলেষু চ"

১৮ অক্টোবর, ২০১৫

কাউন্টডাউনঃ৬- এক মেয়ের এত নাম???

নামদুর্গা
মাদুর্গার এক অঙ্গে বহুরূপ। এক রূপে বহুনাম্মী আমাদের মা দুর্গা ।
অদ্রিজা মাদুর্গার আরেক নাম । অদ্রি অর্থাত পর্বত হিমালয়ের কন্যা বলে তাঁকে এই নামে ভূষিত করা হয় ।
দুর্গা শব্দটির অর্থে আসা যাক ।
দুর্গা =  দুর্গ + আ =  দ্+উ+র্+গ্ +আ


দ এর অর্থ দৈত্যনাশ
উ এর অর্থ বিঘ্ননাশ
র এর অর্থ রোগনাশ
গ এর অর্থ পাপনাশ এবং
আ এর অর্থ ভয় ও শত্রুবিনাশ ।


দুর্গ শব্দের অর্থ দৈত্য, বাধাবিঘ্ন,  দুঃখশোক, নরকযন্ত্রণা, রোগব্যাধি… এহেন নানাবিধ অশুভকিছু  আর “আ” অর্থটি বাংলাভাষায় নাশ করা বা বধ করা বোঝায় । সেই কারণে দুর্গা শব্দের অর্থ দাঁড়ায়  জীবের জীবন থেকে যা কিছু অশুভ শক্তির বিনাশ কারী দেবী শক্তি । নিজের নাম প্রসঙ্গে দেবী বলেছেন চন্ডীতে


“তত্রৈব চ বধিষ্যামি দুর্গমাখ্যং মহাসুরং
দুর্গা দেবীতি বিখ্যাতং তন্মে নাম ভবিষ্যতি” ।।


কিন্তু দুর্গা নাম এল কিভাবে? পুরাকালে দুর্গম নামক এক অত্যাচারী অসুর দেবতাদের পরাজিত করে বেদ শাস্ত্রকে হরণ করে । তার উদ্দেশ্য ছিল জীবজগতে ধর্মের বিনাশ ঘটানো । সমাজে এমন বিশৃঙ্খলা দেখে দেবতারা সমবেত ভাবে মহামায়ার শরণাপন্ন হন । কোনো অসুর যাতে ভবিষ্যতে এমন অনিষ্ট সাধন না করতে পারে তাই দেবী দেবতাদের আরাধনায় তুষ্ট হয়ে সমগ্র “বেদ”কে স্বীয় দেহে ধারণ করেন । বেদময়ী দেবীকে দেবগণ “দুর্গা”  নামে ভূষিত করেন । দেবী পুরাণ মতে দুর্গা নাম স্মরণ করলেই ত্রিতাপ দুঃখ, জ্বালা যন্ত্রণা মুক্ত হয়  এবং এরূপে তিনি জীবের কল্যাণদায়িনী, রোগ-শোক বিনাশিনী রূপে জীবকে অশুভ শক্তির হাত থেকে উদ্ধার করেন  । অথবা বলতে পারি মহাশক্তিকে লাভ করার দুর্গম পথকে যিনি সুগম করে দেন তিনিই দুর্গা ।
  শিবঘরণী, শিবসোহাগীনি দুর্গা হিমালয় পর্বতের কন্যা বলে তাঁর এক নাম পার্বতী। তিনি বিশ্বচরাচরের অন্নদায়িনী তাই অন্নপূর্ণা, সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। স্যার ফ্রেজার তাঁর  Adonis গ্রন্থে  প্রাচ্যের এক বৃষভবাহন দেবতা ও সিংহবাহিনীদেবীর উল্লেখ করেছেন। তিনি শিব বা দুর্গার নাম উল্লেখ করেননি কিন্তু তারাই যে আদতে আমাদের হর-গৌরী তা একেবারে সুস্পষ্ট। A short history of religion গ্রন্থে কেলেট সাহেব মুক্তকন্ঠে প্রকাশ করেছেন শস্যাধিষ্ঠাত্রী দেবতা সর্বপ্রথম প্রাচ্যেই বিকাশ লাভ করেছিলেন। তাঁর ব‌ইতে বোনদিয়া (Bona Dea) নামক এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায় যিনি a deity of fertility বলে প্রচলিত এবং এই বোনদিয়া আমাদের সুন্দরবনের বনদুর্গা বা বনবিবি যিনি আমাদের শাকম্ভরী দুর্গা সে কথা বুঝে নিতে আমাদের অসুবিধা হয়না ।  এই শাকম্ভরী হল মাদুর্গার অনেকগুলি নামের মধ্যে অন্যতম।
শরতঋতুতে আবাহন হয় বলে দেবীর আরেক নাম শারদীয়া। এছাড়া মহিষাসুরমর্দিণী, কাত্যায়নী, শিবাণী, ভবানী, আদ্যাশক্তি, চন্ডী  এইসব নামগুলি বাংলাদেশেই প্রচলিত। নেপালে দেবী নবরাত্র, কাশ্মীরে অম্বা, গুর্জরে হিঙ্গলা বা রুদ্রাণী, কনৌজে কল্যাণী, দাক্ষিণাত্যে অম্বিকা , মিথিলায় ঊমা নামে তিনি পূজিতা ।  এছাড়া বাংলাদেশের সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা মাটির বুকে শক্তির আরাধ্যারূপে পূজিতা দেবী শীতলা, মনসা, বাশুলি, ষষ্ঠী, মঙ্গলচন্ডী সকলেই মা দুর্গার অংশ বিশেষ। শ্রীশ্রীচন্ডীর একাদশ অধ্যায়ে আছে অনাবৃষ্টির সঙ্কটে পৃথিবী যখন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে তখন ঋষিদের স্তবে তুষ্ট হয়ে শক্তিময়ী দেবী নিজের দেহ থেকে উত্পন্ন শাকসব্জীর দ্বারা বিশ্ববাসীর প্রতিপালনে সচেষ্ট হন। সেই শাক ভক্ষণ করে মানুষ প্রাণ ফিরে পায়। ইনিই দেবী শাকম্ভরী।  যতদিন না পর্যন্ত বৃষ্টি হয় ততদিন সমগ্র বিশ্বের মানুষকে দেবী নয়রকম শাক খাইয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাই এই শাকম্ভরী ই শতাক্ষী, দুর্গা, ঊমা, গৌরী, সতী, চন্ডী, কালিকেশা ও পার্বতী নামে বিদিতা। রাজস্থানের কাছে আজমীরে শাকম্ভরী তীর্থে এই কাহিনী বর্ণিত আছে। শ্যামল সবুজবর্ণ শাকসব্জীর রঙে ভূষিতা বলেই দেবী শাকম্ভরী নীলোত্পল বর্ণা। পশ্চিমবাংলার কাটোয়া থেকে আট মাইল দূরে মঙ্গলকোট থানার অন্তর্গত মাজিগ্রামে শাকম্ভরী দেবীর পুজো হয়।
সতী, পার্বতী, ঊমা এবং গৌরী দুর্গার এই চারটি রূপ হল শিবের পত্নী রূপ। তাই শিবাণী, রুদ্রাণী, অদ্রিজা,  এই নামগুলি হল আমাদের মনগড়া এবং বাংলাসহিত্যের অভিধানে বর্ণিত মাদুর্গার নামান্তর মাত্র। দক্ষযজ্ঞের প্রলয়ের কারণে  দক্ষকন্যা সতীর অপর নাম দাক্ষায়নী। এবার বেদের সপ্তমাতৃকায় আসি। দুর্গার এই সপ্তমাতৃকার নামগুলি হল ব্রহ্মাণী, মাহেশ্বরী, বৈষ্ণবী ইন্দ্রাণী বা ঐন্দ্রী বা কৌমারী, নারসিংহী, বারাহী এবং চন্ডী  ।  এই মহাশক্তিময়ী দেবীরা অগ্নিরূপী শিবের বা সূর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। শ্রী শ্রী চন্ডীতে দেবীকবচে একাদশ মাতৃকার উল্লেখ আছে। এই একাদশ মাতৃকা পূর্বে উল্লিখিত  নবদুর্গা ও সপ্তদুর্গার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ।
ঘুরেফিরে সব রূপগুলিতেই সর্বকালে চামুন্ডা শবাসনা, বারাহী মহিষারূঢ়া, ইন্দ্রাণী গজাসনা, বৈষ্ণবী গরুড়াসনা ও  মহাবীর্যা নারসিংহী, মহাবলা শিবদূতি, বৃষাঢ়া মাহেশ্বরী, শিখিবাহনা কৌমারী , পদ্মাসনা লক্ষ্মী, বৃষবাহনা ঈশ্বরী, হংসারূঢ়া ব্রাহ্মী এবং এঁরা সকলেই একাদশ মাতৃকার বৈচিত্রময়ী রূপ।  দুর্গার এই নামগুলি ছাড়াও শ্রীশ্রীচন্ডীতে মহালক্ষ্মী, মহামায়া, মহাবিদ্যা, মহাবাণী, ভারতী, বাক্‌ সরস্বতী, আর্যা, ব্রাহ্মী, কামধেনু, বেদগর্ভা, ধীশ্বরী, সুরেশ্বরী, দেবেশী, অশোকা, বিপদতারিণী, শতাক্ষী প্রভৃতি অগণিত নামের উল্লেখ আছে। এছাড়া দুর্গাপূজার পর বিজয়াদশমীতে এ অপরাজিতা পূজা হয় সেই অপরাজিতা এবং দুর্গা এক ও অভিন্ন। এই অপরাজিতা দেবী দুর্গার চৌষট্টি যোগিনীদের মধ্যে অন্যতমা। এমনকি জগদ্ধাত্রী পুজোতেও নবশক্তির অর্চনারপর দেবতাদের পুজোর মধ্যেও “অপরাজিতায়ৈঃ” মন্ত্রে দেবীপূজা করা হয়। মত্স্যপুরাণে এই অপরাজিতাকে মায়ানুচরী বলা হয়েছে। বামনপুরাণে ইনি গৌতম মুনি ও অহল্যার চারকন্যা জয়া, বিজয়া, জয়ন্তী ও অপরাজিতা। সেখানে আবার এই চারভগ্নী শিবজায়া সতীর সহচরী সখী রূপে অভিহিত। দেবী অপরাজিতা প্রণাম মন্ত্রে রুদ্রলতা নাম পাওয়া যায়। তাই তিনিই যে শিবসঙ্গিনী দুর্গা সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই ।
দেবীপুরাণে দেবীর আরো নানাবিধ নামের উল্লেখ আছে। দেবী দুর্গার সন্ধিপূজায় দেবীর চামুন্ডারূপের পূজা হয়। দেবর্ষি নারদ সেখানে দেবীকে অর্চণা করছেন নিম্নলিখিত নাম ধরে। দুর্গা, শাকম্ভরী, গৌরী ছাড়াও বিন্ধ্যবাসিনী, কাত্যায়নী, কৌষিকী, কৈটবেশ্বরী, মহাদেবী, মহাশ্বেতা, মহেশ্বরী, ত্রিদশবন্দিনী, ঈশানী, ভবানী, ভূতভবানী, জ্যেষ্ঠ্যা, ব্রহ্মবাদিনী, অপর্ণা, কপালা, সুবর্ণা, গায়ত্রী, সাবিত্রী, ত্রিশূলিনী, ত্রিনয়না, ত্রিপদা, ত্রিগুণাত্মিকা, শ্রদ্ধা, স্বাহা, সর্বজ্ঞা, সর্বতোভদ্রা, সর্বোতক্ষী, সর্বভূতাদিমধ্যান্তা, সর্বলোকেশস্বরূপা, কামরূপিণী, যাদবী, যোগীন্দ্রা, বৈষ্ণবী, অরূপা, ভদ্রকালী, স্কন্দমাতা, শ্রুতি, স্মৃতি, কালরাত্রি, মহারাত্রি, কপালিনী, চামুন্ডা, চন্দ্রিকা, চন্ডী, চন্ডমুন্ডবিনাশিনী, রুদ্রাণী, পার্বতী, ইন্দ্রাণী, দাক্ষায়নী, নারী, নারায়নী, শুম্ভ-নিশুম্ভ দলনী, মহিষাসুরমর্দিণী, সহস্রলোচনা, ধীরা, রেবতী, সিংহবাহিনী, বিশ্ববতী, বেদমাতা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, মায়াবতী, ভোগাবতী, সতী, সত্যবতী, ভীমা, উগ্রা, ধূম্রা, অম্বিকা, ত্রম্ব্যকপ্রিয়া, জটা, বিজয়া, অজিতা, অপরাজিতা, পাপনাশিনী প্রভৃতি । মহিষাসুরমর্দিণী দুর্গার সবচেয়ে রুদ্ররূপ যেখানে তিনি একাধারে  দনুজদলনী আবার অন্যদিকে কল্যানী এবং বরাভয়দায়িনী। তিনি ঘোরা আবার প্রসন্না। আসলে বিশ্বমাতা মা দুর্গা এই সকল রূপের সমষ্টি মূর্তি। একই দেবী দুর্গা আবার কামেশ্বরী ও ভদ্রকালী। উভয়েই শাক্তদেবী, এক ও অভিন্না। দশমহাবিদ্যা কালীর দশটি রূপ কিন্তু তত্ত্বগত ও আদর্শগত দিক থেকে এক ও অদ্বিতীয়। কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী, কমলা  এই দশটি রূপ কিন্তু একাধারে কালী অন্যধারে দুর্গাকে বর্ণিত করে।
এছাড়া শ্রীশ্রী চন্ডীতে নবদুর্গার নয়টি নামের উল্লেখ আছে। এই নয়টি নাম হল
শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘন্টা, কুষ্মান্ডা, স্কন্দমাতা,কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী । 

১৭ অক্টোবর, ২০১৫

কাউন্টডাউন ৫ঃ চালচিত্তির আবার কেন?


মাদুর্গার চালচিত্র যেন দুর্গাপূজার অন্যতম অঙ্গ । বহু দেবতার সমাবেশ লক্ষ্য করা যায় এই চালচিত্রে । শিল্পীর রং তুলির টানে এই চালচিত্রের  সুষমা যেন মায়ের মূর্তিকে আরো সম্পূর্ণ এবং উজ্জ্বল করে তোলে । আমরা কেবল দেবী দুর্গাকে সপরিবারে পূজা হতে দেখি কিন্তু আসলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সকল দেবদেবীরাই কিন্তু উপস্থিত থাকেন ঐ চালচিত্রতে ।



  • শিব

দুর্গাপূজা যেন কলিকালের অশ্বমেধ যজ্ঞ । শিব ছাড়া যেমন সকল যজ্ঞ অসম্পূর্ণ তাই মায়ের চালচিত্রের মধ্যমণি হলেন মহাদেব । তিনি যেন এলাহী বৈচিত্রের মাঝে নির্বিকার স্বামীরূপে বিরাজমান । মহামায়া মা দুর্গাকে যেন তিনি সৃষ্টি ও প্রলয়ের ভার দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছেন তাঁর মাথার ওপর । মা অসুর বিনাশ করলে শিবপ্রদত্ত আশীর্বাদে আর তাই আমরা শিবকে বন্দনা করি আর মা এর কারণে প্রসন্ন হন । শিব ও শক্তির সম্মিলিত সত্তায় প্রকৃতির সর্বক্ষণের ভাঙাগড়া অব্যাহত থাকে ।

  • রাইরাজা

চালচিত্রে শিবের ডানদিকে উপবিষ্টা শ্রীরাধা । শক্তিবাদী আরাধনার সাথে সেখানে বৈষ্ণববাদের মেলবন্ধন । বিষ্ণুর শক্তি লক্ষ্মী । শ্রীরামের অবতারে তিনি সীতা আর শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গীনী শ্রীরাধিকা । দেবী-ভাগবতে বলা আছে  যে জগতের উত্পত্তিকালে বিশুদ্ধ শক্তিরূপিণী রাধিকা এবং বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী দুর্গা আবির্ভূতা হন তাই একত্রে এই দুই শক্তিযুগলের আরাধনা একান্ত কর্তব্য ।

  • নারসিংহী

রাইরাজার ডানদিকে নারসিংহী থাকেন ।  অষ্টশক্তির অন্যতম হলেন নারসিংহী । ভগবান শ্রীহরি দেবতাদের কার্যসিদ্ধির জন্য  নৃসিংহ রূপে অবতীর্ণ হয়ে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন । সেই কারণে অসুরগণের বিনাশ ও দেবতাদের কল্যাণার্থে দেবগণের মহাবল শক্তিসমূহ তাদের শরীর থেকে বহির্ভূতা হয়ে নারসিংহী নামক দেবীমূর্তিতে প্রবেশ করে ।  এই দেবীমূর্তি শ্রীচন্ডীর সমীপে উপস্থিত হন । এবং মাদুর্গার সঙ্গে অসুরের যুদ্ধের সময় এই নারসিংহী দুর্গার শরীরে লীন হয়ে যান ও মা’কে  অসুর নিধনের জন্য  আরো শক্তি দান করেন ।

  • রক্তবীজ

নারসিংহীর ডানদিকে আছেন রক্তবীজ । রম্ভাসুরের মৃত্য্র পর তার চিতার আগুণ থেকে এক বিশালাকায় দৈত্য নির্গত হয় যার নাম রক্তবীজ । চন্ডও মুন্ড বধের পর দাবরাজ শুম্ভ মহাসুর রক্তবীজকে বলে মাদুর্গাকে সংহার করতে । রথে আরোহণ করে রক্তবীজ শৈলশিখরে মাদুর্গার কাছাকাছি পৌঁছতেই দেবীদুর্গা শঙ্খধ্বনি করতে লাগলেন । সেই শঙ্খধ্বনিতে রক্তবীজ বিন্দুমাত্র ভীত না হয়ে দেবীর নিকট গিয়ে দেবীকে শুম্ভ অথবা নিশুম্ভকে বিবাহ করতে বলে । দেবী উগ্র থেকে উগ্রতর হয়ে ওঠেন । প্রচ্ন্ড যুদ্ধ হয় দুজনের মধ্যে । পাপমতি রক্তবীজ দেবীর বাণে বিদ্ধ হয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়ে । মূর্ছা ভঙ্গ হলে তার শরীরের প্রতিটি ফোঁটা রক্ত থেকে সেই দানবের অনুরূপ বলশালী দৈত্য উত্পত্তি হয় । শত সহস্র অসুরে ধরিত্রী ছেয়ে যায় । দেবগণ তখন বিপদ দেখে চন্ডিকা রূপিণিদেবীকে বলেন রক্তবীজের দেহনিঃসৃত প্রতিটিরক্তের ফোঁটাকে পান করতে তাহলে দৈত্যের উত্পত্তি রোধ হবে । চামুন্ডারূপিণিদেবী তাই করতে লাগলেন এবং অতঃপর সেই রক্তহীন রক্তবীজকে অস্ত্রাঘাতে নিহত করলেন ।

  • চামুন্ডা

রক্তবীজের ডানদিকে আছেন দেবী চামুন্ডা ধূম্রলোচন বধের পর শুম্ভের আদেশে চন্ড ও মুন্ড পদাতিক, অশ্ব, হস্ত ও রথ এই চতুরঙ্গ সৈন্য সহ দেবীর উদ্দেশ্যে ধাবিত হয় । দেবী ক্রোধে অতিশয় কৃষ্ণবর্ণ হলে তাঁর ললাট থেকে করালবদনা, লোলজিহ্বা কালী নির্গত হন । দেবী কালী চন্ডের মস্তক ছিন্ন করেন এবং পরে মুন্ডকেও অসির আঘাতে বধ করেন । সেই দেখে চন্ডিকাদেবী কালীকে চামুন্ডা রূপে অভিহিত করেন ।  তাই দুর্গার চালচিত্রে চামুন্ডার অবস্থান যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত ।

  • মাহেশ্বরী

চামুন্ডার ডানদিকে আছেন দেবী মাহেশ্বরী ।  অষ্টশক্তির অন্যতমা এই দেবী চতুর্ভুজা, ত্রিনেত্রা, বৃষভারূঢ়া ।

  • ইন্দ্রাণী

মাহেশ্বরীর ডানদিকে আছেন ইন্দ্রাণী ।  তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের পত্নী, ইন্দ্রের শক্তি । গজবাহনা, চতুর্ভুজা, বজ্রধারিণী ।

  • রামচন্দ্র

চালচিত্রে মহাদেবের বাঁদিকে আছেন রামচন্দ্র ।
সীতাহরণের পর রামচন্দ্র বানরসেনাদের সাহায্যে সেতুবন্ধ্ন করে লঙ্কায় হাজির হলেন । ব্রহ্মা তখন রামকে আদেশ করলেন অপরাজিতা দুর্গার পুজো করে জগতের উদ্ধারে নেমে পড়তে । সমগ্র রাক্ষসকুলকে ধ্বংস না করতে পারলে যে ধরিত্রীর নিস্তার নেই । তাই কৃষ্ণপক্ষেই নিদ্রিতা দেবীকে অকালে জাগ্রত করে অকালে অর্থাত শরতকালে (পূর্বে বসন্তকালে শুক্লপক্ষে দেবলোক জাগ্রত অবস্থায় পুজো হত) কাজে নেমে পড়েছিলেন রামচন্দ্র স্বয়ং । তাই তো অকাল বোধন । ব্রহ্মার পরামর্শে দেবী দুর্গার দশভুজা মূর্তি মাটি দিয়ে গড়ে সিংহবাহিনী সেই দেবীর বোধন করেছিলেন ব্রহ্মা স্বয়ং বিল্ব বৃক্ষমূলে । সেই দিনটিই ছিল মহাষষ্ঠী । শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পুজো চলতে লাগল । সপ্তমীর দিন দেবী স্বয়ং রামের ধনুঃশ্বরে প্রবেশ করলেন । অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নিলেন । অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করলেন রামচন্দ্র । নবমীর দিন সীতা উদ্ধার করলেন রাম । আর দশমীর দিন প্রাতে যুদ্ধে জয়লাভের পর দেবীমূর্তি নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে বিসর্জন মন্ত্র পাঠ হল । সেদিন পালিত হল বিজয়া দশমীর বিজয়োত্সব ।


  • জগদ্ধাত্রী

শ্রীরামচন্দ্রের বঁদিকে আছেন দেবী জগদ্ধাত্রী । তিনি মাদুর্গার অন্যতম রূপ । দেবী চতুর্ভুজা এবং কবীন্দ্রাসুর নিসূদিনী । দেবীর সাথে যুদ্ধের সময় মহিষাসুরের ছদ্মরূপ হল কবীন্দ্রাসুর । মা দুর্গা অঘটন পটীয়সী মায়ার বলে মহিষাসুরের আবরণ উন্মোচন করে কবীন্দ্রাসুরের শিরশ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছিলেন ।
  • নিশুম্ভ-শুম্ভ

চালচিত্রে জগদ্ধাত্রীর বাঁদিকে থাকে নিশুম্ভ আর নিশুম্ভের বাঁদিকে থাকে শুম্ভ ।  রক্তবীজ নিহত হবার পর নিশুম্ভ সসৈন্যে দেবীর দিকে তেড়ে যায় ।দেবীর সঙ্গে শুম্ভ ও নিশুম্ভের ভয়ানক যুদ্ধ হয় । দেবী নিশুম্ভকে বাণ দিয়ে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেন । সেই দেখে শুম্ভ কুপিত হয় । তখন দেবী শুম্ভকে শূলের দ্বারা আঘাত করেন । ইতিমধ্যে নিশুম্ভ জ্ঞান ফিরলে বাণ দিয়ে দেবীকে ও বাহন সিংহকে আঘাত করে । তারপর চলে গদাযুদ্ধ । শেষে দেবী চন্ডিকা শূলের দ্বারা নিশুম্ভের হৃদয় বিদীর্ণ করেন ।
শুম্ভকে বধ করতে দেবীর সময় লেগেছিল ।  একসময় শুম্ভ দেবতীর্থ পুষ্করে তপস্যা করে । ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর দান করেন যে কোনো পুরুষের হাতে তোমার মরণ হবেনা । চন্ডিকার সঙ্গে যুদ্ধের সময় শুম্ভ দেবীকে বলেহে উদ্ধত দেবী দুর্গা, তুমি গর্ব কোরোনা । তুমি অন্যান্য দেবীর সাহায্যেই তো যুদ্ধ করছ । সেই শুনে দেবী বলেন,    সমস্ত দেবীর প্রকাশ তাঁর শরীরেই । এরপরেই তিনি যেইমাত্র শুম্ভকে শূল দিয়ে বক্ষে আঘাত করেন সাথে সাথেই শুম্ভর মৃত্যু হয় ।


  • বারাহী

দৈত্যরাজ শুম্ভের বাঁদিকে থাকেন বারাহী । ইনি বরাহ অবতারের শক্তি । বরাহবদনা, কৃষ্ণা, পীতাম্বরী, সালঙ্কারা, বরাভয়, হল ও মুষলধারিণী । ইনিও অষ্টশক্তির এক শক্তি যিনি দাঁত দিয়ে ধরণীকে ধরে রেখে উদ্ধার করেছিলেন ।

  • ব্রহ্মাণী

ইনি ব্রহ্মার সৃষ্টিশক্তি । কমন্ডলুর  মন্ত্রপূত জল কুশ দিয়ে ছিটিয়ে দৈত্যদের হীনবীর্য করেছিলেন । ইনি রক্তবর্ণা, বিশালনয়না, বর ও অভয় মুদ্রাধারিণী, হংসারূঢা ।

  • কাত্যায়নী

দেবী ব্রহ্মাণীর বাঁদিকে আছেন দেবী কাত্যায়নী । তিনি অপরূপা, শান্ত । কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে আশ্বিনমাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে আবির্ভূতা ও পালিতা এই কন্যা দেবতাদের তেজে প্রকাশিত হন ।  তাঁর ত্রিনয়ন থেকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর সৃষ্টি হয়েছিল । তাই সকল প্রকার জাগতিক ও পারমার্থিক বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য দেবতারা কাত্যায়নীর সাহায্য নেন ।

এছাড়াও চালচিত্রে রয়েছেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, গণেশ, কার্তিক, সূর্য, চন্দ্র, পবন, ইন্দ্রাদি দেবতারা । নারীশক্তির মধ্যে অন্যতমা কালী, অন্নপূর্ণা, লক্ষ্মী সরস্বতীও আছেন সেই সাথে । সুতরাং চালচিত্রে আঁকা মূর্তিগুলি  যথেষ্ট ইঙ্গিত বহন করে এবং এই মূর্তিগুলির মধ্যে দিয়েই মায়ের সার্বিক শক্তির প্রকাশ ঘটে ।







তথ্যসূত্রঃ
(১) মহিষাসুরমর্দিণী- দুর্গা – স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ
(২)  শারদীয়া সংখ্যা উদ্বোধন ১৪১৮

১৬ অক্টোবর, ২০১৫

কাউন্টডাউন-৪ঃ সায়ুধায়ৈ




  • কে এই মহিষাসুর? কিভাবেই বা তার জন্ম?

হিষাসুরমর্দ্দিণি দুর্গা বৃত্তান্তের খলনায়ক হলেন অপরাজেয় দোর্দ্দন্ডপ্রতাপ মহিষাসুর।  
বরাহপুরাণের মতে বিপ্রচিত্তি নামক দৈত্যের মাহিষ্মতী নামে একটি মেয়ে ছিল। ছোট মেয়ে খেলার ছলে সিন্ধুদীপ নামে এক তপস্যারত ঋষির সামনে গিয়ে মহিষীর বেশে তাকে ভয় দেখাতে লাগল। ঋষির তপস্যাতো লাটে উঠল। ক্রুদ্ধ ঋষি ছোট মেয়েটিকে তখন “তাহলে মহিষী‌ই হয়ে যাও” বলে অভিশাপ দিলেন। সেই মহিষীরূপী মাহিষ্মতীর গর্ভে যে পুত্রসন্তান হল তার নাম মহিষাসুর।
কালিকাপুরাণে বলে মহিষাসুর হল রম্ভাসুরের পুত্র। প্রবল ক্ষমতাশালী রম্ভাসুর মহানন্দে এক সুন্দর মহিষীকে বিবাহ করে। বিবাহ করে ফেরার পথে আর এক অসুরের দ্বারা রম্ভাসুর নিহত হয় আর তার নবপরিণীতা স্ত্রী কিছুদিন পর জন্ম দেয় মহিষাসুরের। যে কিনা মহাদেবের আরাধনা করে দেবীর সাযুজ্যলাভের বর লাভ করে। কঠোর তপস্যার দ্বারা ব্রহ্মার কাছ থেকে অমরত্ব পায় । ব্রহ্মা যেমন মহিসাসুরকে অমরত্ব দিলেন তেমনি বললেন একমাত্র নারীশক্তির দ্বারাই এই মহিষাসুর বধ হবে।
একের পর এক বরলাভের পর এই মহিষাসুরের দাপট ক্রমশঃ বাড়তেই থাকে।
পুরাণ আর শাস্ত্রের পাতায় আমরা দেখি আবির্ভূতা হতে এক অসামান্যা নারীর যিনি একহাতে বরাভয় অন্যহাতে তুলে নেন অস্ত্র। দশপ্রহরেণ সেই দেবীশক্তির হাতে পরাজিত হন মহিষাসুর। এবার দেখা যাক এই দেবীশক্তির রহস্যের পেছনে কোন্‌ ঘটনা ছিল।

  • মেধাঋষির মুখে মহামায়ার উত্পত্তি সমূহ আখ্যান : কিসের বলে মাদুর্গার এত শক্তি? 

হিষাসুর তখন অসুরগণের রাজা। দেবতাদের বলে অমরত্ব লাভ করে তার বিশাল প্রতিপত্তি। অত্যাচারী মহিষাসুর তখন দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে ঠিক করেছে । স্বর্গ তার পাখির চোখ। যেনতেনপ্রকারেণ দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য তার দখলে আনতেই হবে। একশো বছর ধরে যুদ্ধ করে স্বর্গরাজ্য নিজের করায়ত্বে আনল সে। দেবসেনাবাহিনী পরাজিত হল আর মহিষাসুর হল স্বর্গের রাজা। দেবতাগণ একত্র হয়ে বিষ্ণু ও মহাদেবকে সঙ্গে নিয়ে প্রজাপিতা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হল। একজন অসুরের কাছে তাঁরা কি করে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন সব কাহিনী জানালেন ব্রহ্মাকে। দেবতাদের মুখে মহিষাসুরের দ্বারা এমন লাঞ্ছনার ঘটনা শুনে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহাদেব যারপরনাই ক্রুদ্ধ হলেন। তাঁদের মুখমন্ডল থেকে এক মহাতেজ নির্গত হল। হিমালয় অঞ্চলে ঋষি কাত্যায়ণের আশ্রমে সেই মহাতেজ থেকে জন্ম নিল এক দেবী। আশ্বিনমাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে তাঁর আবির্ভাব হল আর ঋষি কাত্যায়ণের আশ্রমে জন্ম বলে তাঁর নাম হল কাত্যায়ণি। এই দেবীর শরীরের এক একটি অংশ এক একজন দেবতার তেজে তেজোপ্রাপ্ত হল।
শিবের তেজে দেবীর মুখ, যমের তেজে কেশপাশ, বিষ্ণুর তেজে বাহুসমূহ, চন্দ্রের তেজে কুচযুগ, ইন্দ্রের তেজে শরীরের মধ্যভাগ, বরুণের তেজে জঙ্ঘা ও উরুদ্বয়, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, ব্রহ্মার তেজে পদযুগল, সূর্যের তেজে পায়ের অঙ্গুলিসমূহ, এবং কুবেরের তেজে তৈরী হল উন্নত নাসিকা। অষ্টাবসুর তেজে তার হাতের আঙুল তৈরী হল। দক্ষাদি প্রজাপতিগণের তেজে তাঁর দন্তসকল এবং বহ্নির তেজে দেবীর ত্রিনয়ন সৃষ্টি হল। সন্ধ্যাদেবীদ্বয়ের তেজে ভ্রূযুগল ও বায়ুর তেজে উত্পন্ন হল কর্ণদ্বয় । দেবী এরূপে তেজসম্ভূতা হলেন কিন্তু মহিষাসুরকে বধ করবার জন্য তো তেজই যথেষ্ট নয়। তাই সকল দেবতারা এই দেবীকে অসুর বধের জন্য নানাবিধ দিব্যাস্ত্র যোগাতে লাগলেন। 


  • কোন্‌ কোন্‌ দেবতারা মাদুর্গাকে কি কি অস্ত্র দিয়ে মা'কে "সায়ুধা"(আয়ুধ-অস্ত্র) করলেন?   

  • হাদেব তাঁর স্বীয় শূল থেকে সৃষ্ট একটি ত্রিশূল দিলেন । 
  • বিষ্ণু তাঁর সুদর্শণ চক্র থেকে সৃষ্ট চক্র দিলেন। 
  • রুণ দিলেন শঙ্খ ও নিজের পাশ থেকে তৈরী করে আর একটি পাশ। 
  • গ্নিদেব দিলেন শক্তি। 
  • বনদেবতা দিলেন একটি ধনুক ও দুটি বাণপূর্ণ তূণীর । 
  • দেবরাজ ইন্দ্র দিলেন বজ্র ও ঐরাবত নামক স্বর্গের হাতির গলদেশের ঘন্টা থেকে ঘন্টা তৈরী করে দিলেন ঘন্টান্তর। 
  • মৃত্যুরাজ যম দিলেন কালদন্ড। 
  • প্রজাপতি ব্রহ্মা দিলেন একটি রুদ্রাক্ষের মালা ও কমন্ডলু। 
  • দেশিল্পী বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার ও নানাপ্রকার অস্ত্র ও অভেদ্য কবচ। 
  • সূর্যদেব দেবীর লোমকূপে তাঁর তেজরাশি সমর্পণ করলেন। 
  •  কালের দেবতা দিলেন একটি উজ্জ্বল ধাতব ঢালও প্রদীপ্ত খড়্গ। 
  • ক্ষীরসমুদ্র দিলেন পদ্মের মালা, হাতে দিলেন পদ্মফুল এবং নানাবিধ অলঙ্কার যেমন, মুক্তামালা, দিব্যচূড়ামণি, কর্ণকুন্ডল, হাতের বলয়, ললাটভূষণ, বাজু, নির্মল নূপুর, অত্যুত্তম কন্ঠহার ও সমস্ত অঙ্গুলিতে শ্রেষ্ঠ অঙ্গুরীয়। 
  • হিমালয় দিলেন দেবীর বাহন সিংহকে।  
  • কুবের দিলেন একটি সুরাপূর্ণ পানপাত্র। 
  • নাগরাজ বাসুকি দিলেন একটি মহামণিশোভিত নাগহার। 

এইরূপে দিব্য আয়ুধে দশভুজা দেবীমূর্তি সজ্জিত হয়ে উঠলেন। এবং প্রস্তুত হলেন সেই মহাসংগ্রামের জন্য।
যেহেতু ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর দেবাসুর-দানবের অবধ্য হলেও স্ত্রীবদ্ধ হবে তাই বুঝি ঋষি কাত্যায়ণ সকল দেবতার তেজ এবং ক্রোধানলের শক্তি ও দিগন্তব্যাপী সংহত তেজ দিয়ে তৈরী করলেন এই কাত্যায়ণীকে।
গভীর গর্জণে আকাশবাতাস ধ্বনিত হল। দেবীর সিংহনাদে দশদিশি কম্পিত হল। পৃথিবী ও পর্বতসকল বিচলিত হল। দেবগণ সানন্দে সিংহবাহিনী দেবীর জয়ধ্বনি দিলেন। মুণিগণ দেবীর স্তব শুরু করলেন। অসুরগণ ত্রিলোকবাসী দেবতাদের উদ্দেশ্যে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ধেয়ে এল। যুদ্ধ শুরু হল প্রবল।
বিন্ধ্যপর্বতে এই তিলোত্তমা দেবী মহামায়া বা কাত্যায়ণি সসৈন্যে অগ্রসর হয়ে অচিরেই বধ করলেন মহিষাসুর নামক দোর্দ্দন্ডপ্রতাপ ঐ দৈত্যটিকে। আর এই মহিষাসুরকে বধ করে দেবীর অপর নাম হল মহিসাসুরমর্দ্দিণি ।

১৫ অক্টোবর, ২০১৫

কাউন্টডাউন-৩ : নবরাত্রি



ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র শারদীয়া দুর্গাপূজার  প্রচলন করেন  । রাবণবধ ও সীতাউদ্ধারের জন্য রামচন্দ্র দুর্গতিনাশিনী দুর্গার অকালবোধন করে নবরাত্র ব্রত পালন করেছিলেন। নবরাত্র ব্রত আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত । মা দুর্গা এই সময় অর্থাত আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ তিথি থেকে নবমী অবধি মোট ন’দিন নয়টি রূপ ধারণ করেন। পিতামহ ব্রহ্মা দেবীর এই নয়টি রূপের নামকরণ করেছিলেন। নয়টি নামের নয়টি বৈচিত্রময় রূপভেদ। এঁরা প্রত্যেকেই দেবীর নয়টি কায়াব্যূহ মূর্তি। নবদুর্গা নামে এঁরা বিশেষ পরিচিত। শ্রীশ্রী চন্ডীতে এই নয়টি নামের উল্লেখ আছে। নবদুর্গার এই নয়টি নাম হল
  • শৈলপুত্রী ( পর্বতের কন্যা)
  • ব্রহ্মচারিণী (যিনি ব্রহ্মাকে স্বয়ং জ্ঞান দান করেন, ভক্তকেও ইনি ব্রহ্মপ্রাপ্তি করান )
  • চন্দ্রঘন্টা ( দেবীদুর্গার মহিষাসুর বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের প্রদত্ত ঘন্টা যার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি নিহিত ছিল, চন্দ্রের চেয়েও লাবণ্যবতী ইনি  )
  • কুষ্মান্ডা ( উষ্মার অর্থ তাপ । দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা। আর যিনি এই ত্রিতাপ নিজের উদরে বা অন্ডে ধারণ করেন অর্থাৎ সমগ্র সংসার ভক্ষণ করেন ইনি  )
  • স্কন্দমাতা ( দেব সেনাপতি কার্তিকেয় বা স্কন্দের মা )
  • কাত্যায়নী ( কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে দেবকার্যের জন্য আবির্ভূতা ইনি বৃন্দাবনে দেবী গোপবালা রূপে পূজিতা। ব্রজের গোপবালারা এই কাত্যায়নীর কাছে প্রার্থণা করেছিলেন নন্দের নন্দন শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য তাই ব্রজের দুর্গার নাম কাত্যায়নী )  
  • কালরাত্রি ( ঋগ্বেদের রাত্রিসুক্তে পরমাত্মাই রাত্রিদেবী। মহাপ্রলয়কালে এই রাত্রিরূপিণী মাতার কোলেই বিলয় হয় বিশ্বের।অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহ থেকেই আবির্ভূতা ইনি দেবী যোগনিদ্রা মহাকালিকা বা কালরাত্রি নামে আখ্যাত )
  • মহাগৌরী (তিনি সন্তানবত্সলা, শিবসোহাগিনী, বিদ্যুদ্বর্ণা  মা দুর্গার প্রসন্ন মূর্তি) এবং
  • সিদ্ধিদাত্রী ( অপরূপ লাবণ্যময়ী চতুর্ভুজা, ত্রিনয়নী, প্রাতঃসূর্যের মত রঞ্জিতা যোগমায়া মাহেশ্বরী ইনি সকল কাজে সিদ্ধি প্রদান করেন
শ্রীশ্রীচন্ডীর দেবীকবচ অধ্যায়ের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্লোকে নবদুর্গার উল্লেখ আছেঃ

প্রথমং শৈলপুত্রীতি দ্বিতীয়ং ব্রহ্মচারিণী।
তৃতীয়ং চন্দ্রঘন্টেতি কুষ্মান্ডেতি চতুর্থকম্‌।।
পঞ্চমং স্কন্দমাতেতি ষষ্ঠং কাত্যায়নী তথা।
সপ্তমং কালরাত্রীতি মহাগৌরীতি চাষ্টমম্‌।।
নবমং সিদ্ধিদাত্রী চ নবদুর্গা প্রকীর্তিতাঃ।
উক্তোন্যেতানি নামানি ব্রহ্মনৈবমহাত্মানা।। 

শ্রীশ্রীচন্ডীতেই প্রথম মহিষাসুরমর্দ্দিণী মাদুর্গার নয়টি রূপের বর্ণনা ও মহিমা প্রকাশিত। 

মহালয়ার সাথেসাথে কৃষ্ণপক্ষের অবসান হয়। দেবীপক্ষের সূচনা হয়। পরদিন অর্থাত শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত ন'টি রাত্রি অবধি মাদুর্গার নয়টি রূপের পুজো চলে।  শরতকালীন এই নবরাত্রি উত্সবকে বলা হয় শারদ নবরাত্রি।  মূলত এটি শক্তির আরাধনা।  নবরাত্রির পরদিন বিজয়াদশমীর সাথে সাথে এই শক্তিপূজার সমাপন হয়। 

১৪ অক্টোবর, ২০১৫

কাউন্টডাউন-২ : বলি মায়ের আশেপাশে একগন্ডা পশুপাখী কেন??

স্বজন পরিবৃতা মাদুর্গার সাথে আমরা দেখি একগন্ডা পশুপাখীকে। দেবীর বাহনরূপে পশুরাজ সিংহ, মহিষের দেহ থেকে নির্গত অসুর, লক্ষ্মীর পায়ের কাছে পেঁচা, সরস্বতীর রাজহাঁস, গণেশের পায়ের কাছে ছোট্ট ইঁদুর আর কার্তিকের পাশে ময়ূরকে। আদতে ঐ একরত্তি পাখীগুলি বা ইঁদুরের ওপরে চড়ে বসলে দেবতার ভারে তাদের প্রাণ বেরিয়ে যাবার কথা। মাদুর্গা না হয়  সিংহবাহিনী হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। অসুর না হয় স্ত্রী মহিষের পেটে জন্মেছিলেন আর পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে মায়ের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। তাই বলে অন্যদের সাথে এত পশুপাখীর কি সম্পর্ক?   


মহিষাসুর =  মহিষ + অসুর
পুরাণে বর্ণিত আছে রম্ভাসুর ও গর্ভবতী এক মহিষীর মিলনে জন্ম হয়েছিল মহিষাসুরের । তার বৈশিষ্ট্য হল তার হাত-পা সব মানুষের মত কিন্তু মুখটি শিং সহ মহিষের মত । সে জন্মের  পরেই স্বর্গরাজ্য লাভের আশায় তপস্যা শুরু করেছিল । বহুকাল কঠোর তপস্যার পর ভগবান ব্রহ্মা তুষ্ট হয়ে তাকে অমরত্ব ছাড়া যেকোনো  বরদান করতে সম্মত হলেন । এই বরে দেবতা, যক্ষ, রক্ষ, গন্ধর্বাদি কেউই তাকে হত্যা করতে পারবেনা  এবং কেবল কোনো অবলা নারীর হাতেই  সে ধ্বংস হবে এরূপটিই চাইলেন মহিষাসুর । তাই  তুমুল যুদ্ধের পর মা দুর্গাই একমাত্র পেরেছিলেন একে বধ করতে । মহিষ তমোগুণের প্রতীক । মহিষাসুর মহিষ থেকে জাত বলে সে ভয়ংকর এবং যুদ্ধে দুর্গার সত্ত্বগুণের দ্বারা সেই তমোগুণের বিনাশ হয়  ।
সিংহারূঢ়া দেবী
দেবীর বাহন সিংহ । তাঁর পায়ের নীচে সিংহের অবস্থান । দুর্গা হলেন সমস্ত শুভ শক্তির কান্ডারী । আর এমন গুণকে ধারণ করে দেবীর মন ।  সিংহ মানুষের জৈবপ্রবৃত্তি তথা পশুভাবকে লালন করে  । অরণ্যে ঘুরে শিকার সংহার করে । এহেন জৈব প্রবৃত্তির বিনাশ ঘটান মা দুর্গা । আর এরূপ পুরুষসিংহই  মা’কে শুভ কার্যে বহন করে নিয়ে চলে  । সে থাকে পায়ের নীচে অর্থাত দুর্গা হলেন জয়ী আর অশুভ সেই সংহার মনোবৃত্তি মায়ের পায়ের তলায় ধ্বংস হয় । সিংহরূপী মনকে বয়ে বেড়ান মা দুর্গা এবং অবশেষে তার পাশবিক স্বার্থপরতাকে গ্রাস করে তার শুভবুদ্ধির উদয় ঘটান ।
পেঁচা
লক্ষ্মীর বাহন নিশাচর পেঁচা । অন্ধকার যার আশ্রয় । লক্ষ্মী সৌভাগ্য-সমৃদ্ধির  আলোর দিশা দেখান  পেঁচাকে সাথে নিয়ে  অর্থাত অন্ধকার ও আলোর মধ্য থেকে জীবজগত আলোর দিশা খুঁজে নেবে । কারণ জীবনে ঘাত-প্রতিঘাতের লড়াইতে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য উভয়ই থাকবে কিন্তু  সব পরিস্থিতিতেই অবিচল থেকে আলোর পথ যাত্রী হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলতে হবে । জাগতিক সত্ত্ব ও তমগুণের মধ্য থেকে সত্ত্বটুকুকে বেছে নিতে হবে । তাই বলে তমকে বাদ দিলেও বাদ দেওয়া যাবে না তাই এই নিশাচর ।
রাজহাঁস
সরস্বতীর বাহন শ্বেত রাজহংস ।  সরস্বতী পুরাণে বর্ণিত গঙ্গার মত এক পুতঃসলিলা নদী । তাই সরস্বতীর সাথে রাজহংস অনুষঙ্গটি  মনে করিয়ে দেয় নদীর জলপ্রসঙ্গকে । এবার রাজহংস জল ও দুধের মিশ্রণ থেকে সারটুকু অর্থাত কেবলমাত্র দুধটুকু গ্রহণ করে । তাই বিবেকমান জীবজগত সংসারের অসার বা অনিত্যকে সারটুকু গ্রহণ করার বারতাই বোধহয় ছড়ায় রাজহাঁস । আর সবকিছু সাদা রং বহন করে অমলিনতা যে শ্বেত রাজহংসের গায়ে কখনো অবিদ্যারূপ মলিনতা স্পর্শ করতে পারেনা ।
ইঁদুর
বিশালাকার গণপতির বাহন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুষিক । এখানে গণেশ নেতা বা গণশক্তির প্রতীক । আর তার অনুপাতে অতি ক্ষুদ্র ইঁদুর জীবের ছোট ছোট কর্মফলের কর্তনকারী । অর্থাত অতি বৃহত শুভ কর্মের দ্বারা কৃত সুফল বিনষ্ট হয়ে যায় ছোট্ট কোনো মন্দ কর্মের দ্বারা । তাই ষড়রিপু বা কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ ইত্যাদির মত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কর্মফল বিনাশ করে ইঁদুর যাতে কিনা বৃহত সিদ্ধিলাভে বাধা না ঘটে ।
ময়ূর
কার্তিকের বাহন আমাদের জাতীয় পাখী আলস্যহীন ময়ূর । ময়ূর অত্যন্ত সজাগ এবং কর্মচঞ্চল পাখী । সৈনিক কার্তিকের সবগুণ গুলি সে বহন করে ।   মেঘ দেখলেও সে  উত্ফুল্ল হয় এবং তার মত ধীর স্থির হয়ে  যুদ্ধক্ষেত্রে নিরলস লড়াই করে যাবেন সৈনিক কার্তিক ।  এবং লোকশিক্ষাও যোগাবে তার কর্মোদ্দীপনা ।

১৩ অক্টোবর, ২০১৫

কাউন্টডাউন- ১ : তা সদলবলে কেন গো মা? একা এলেই বা কি ক্ষতি?

তোমাদের কি মত???

এরা কেউ মায়ের পেটের ছেলেমেয়ে নয়। এরা যে কি করে সব উড়ে এসে জুড়ে বসল দুর্গার পরিবারের সাথে! মাদুর্গা কি সকলকে ঠাঁই দেন এভাবেই? নাকি নিজের সুবিধার্থে? মনে মনে ভাবি, এই কি তবে আমাদের সংস্কার? 

মহিষাসুরমর্দিণী দুর্গাপূজার সূত্রপাত ঘটে গুপ্তযুগে । বাঙালী কল্পনাপ্রবণ জাতি । সপরিবারে মা দুর্গাকে না দেখলে তাদের যে মন ভরেনা । তাই তো দুই শক্তি লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে দুপাশে আমরা দেখি এবং মহানন্দে বরণ করি । গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী সকলেই তো অন্যসময়ে আসেন একবার করে তাহলে মায়ের সাথে কেন তাদের আসা চাই-ই??? অথচ দুর্গাপুজোর সময় চালচিত্রের মাথায় ছোট্ট করে লুকিয়ে থাকেন মহাদেব। উনি কি তবে নাটের গুরু? 
কার্তিক না হয় দেবসেনাপতি। সে তরুণ সদৃশ, সুকুমার, শক্তিধর এবং সর্বসৈন্যের পুরোভাগে অবস্থান করে । তাই মাদুর্গার যুদ্ধযাত্রায় এমন শৌর্যবীর্য সম্পন্ন পুত্র সঙ্গী না হয়ে যায় কোথায় ! অসুরের সাথে যুদ্ধের সময় তাকে মায়ের খুব প্রয়োজন। 
গণেশ না হয় ত্রিকাল জ্ঞানী, সিদ্ধিদাতা, বিঘ্নেশ অর্থাত সকল বাধা বিঘ্ন নাশ কারী । যুদ্ধের মত ভয়ানক পরিস্থিতিতে তাঁর স্মরণ অবশ্য কর্তব্য কিন্তু বাকীরা? অর্থাত লক্ষ্মী-সরস্বতী? তাঁদের কি ভূমিকা এই দুর্গাপুজোতে?
কেউ বলেন এঁরা মায়ের অন্য দুটি রূপ। শ্রী শ্রী চন্ডীতে দুর্গাদেবীকেই মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী রূপে আখ্যা দেওয়া হয় । লক্ষ্মীদেবী হলেন বিষ্ণুপ্রিয়া বা নারায়ণী যিনি সৌভাগ্য, ঐশ্বর্য্য এবং সমৃদ্ধির প্রতীক আর সরস্বতী হলেন বাগদেবী, বিদ্যা-বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী, জ্ঞানদায়িনী। অর্থাত এই দুই নারীশক্তি সকল শুভ, সৃজনশীল, গঠনমূলক ক্রিয়াকলাপের উত্স । তাই শুভ শক্তির প্রতীকও বটে ।

২ অক্টোবর, ২০১৫

কলাবতী কথা সম্পর্কে কে কি বলছেন ?


সানন্দা পুজোসংখ্যা-২০১৫ এ প্রকাশিত উপন্যাস  

প্রত্যুষা চক্রবর্তীঃ  
অপেক্ষা করছি অনেক অনেক দিন ধরেই ...
হাতে আসামাত্র পড়ে ফেললাম একটু ও দেরি না করে,
ঘড়ির কাঁটা কি করে তিরিশ মিনিট ঘুরে গেল, টের পেলাম না!
পটশিল্পের কি অসাধারণ কথামালা বোনা হয়েছে বাংলার রীতি আচার অনুষ্ঠান আর ব্রতকথার সুতো দিয়ে ।মেদিনীপুর এর প্রত্যন্ত গ্রাম তাদের কথা নিয়ে উঠে এসেছে অবলীলায়। নয়াগ্রাম , খড়্গেশ্বর , পিংলা, পাথরা , কুকাই , নানকারচক , কুরুম্ভেরা গনগনি কত নাম না জানা গাঁয়ের গন্ধ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে বৈশাখী অশোক ষষ্ঠীর ব্রতকথা থেকে মঙ্গলচণ্ডী, ভৈমীএকাদশী,বিপত্তারিণী , লোটন ষষ্ঠীর কথার সাথে ।আর চরিত্রেরা ! মাটির গন্ধ পাচ্ছি যেন ।
সবশেষে লেখিকার উদ্দেশ্যে বলি, আপনি লুপ্তপ্রায় একটি শিল্পকে পুনঃজীবিত করার প্রয়াস করেছেন ।
অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ 
কাছের মানুষদের নাম যখন বহুল প্রচারিত পত্রিকার পুজোসংখ্যায় দেখি, গর্বে ও খুশিতে ভরে ওঠে।
প্রিয় মানুষ, বন্ধু ও দিদি ইন্দিরাদির প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে সানন্দা পুজো সংখ্যায়। ‘কলাবতী কথা’। পড়া শেষ করলাম কাল।
মেদিনীপুর নিয়ে রীতিমত রিসার্চ করা এ উপন্যাস। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম গঞ্জের অলিগলি, গ্রামীন সংস্কৃতি ও তার রীতিনীতি, ব্রতকথার নানা হারিয়ে যাওয়া গল্প, গ্রামীন মেলা ও উতসব, নানা পার্বন ও গ্রামীন মানুষের জীবনের এত ডিটেইলস এ উপন্যাসে পেলাম যে অবাক হতে হয় লেখকের পরিশ্রম ও গবেষনায়। উপন্যাসের পটভূমিকা হল গ্রাম বাঙলার পট শিল্প। এই পটশিল্পীদের জীবন, তাদের মনস্তত্ব, দারিদ্র, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধা, তাদের স্বপ্ন, অপ্রত্যাশিত সুযোগ, সাফল্য সবকিছুই এসেছে এ উপন্যাসের সাজানো ইটের সারিতে। লতু, কনক,  কলাবতী, মিকি, আকিও এবং আরো নানা চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে লেখক বলেছেন অনেক অনেক গ্রামীন সংস্কারের গল্প, তাদের বিচিত্র জীবন চর্চা, প্রতিবাদ, বেঁচে থাকার স্বপ্ন। নিবিড় গ্রাম বাংলার সাহচর্য্য, ক্ষয়ে যেতে থাকা এক শিল্পী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ও তাদের লড়াই হয়ে উঠেছে এ উপন্যাসটির উপজীব্য।
অর্ণব রায়চৌধুরীঃ 
কলাবতী কথা পড়লাম। বাংলার পটশিল্পীদের জীবন নিয়ে এরকম লেখা আগে পড়িনি। গ্রামবাংলার এত মেলার কথাও জানা ছিল না। কুরুম্ভেরা মেলা বা ময়নাগড়ের রাসমেলার বর্ণনা পড়ে ইচ্ছা করে ঘুরে আসতে। তবে যে জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করেছে তা হল সহজ সরল ভাষায় কথকতার গল্প। পুরাণ নিয়ে তোমার গল্প সম্ভার আমাকে মোহিত করেছে। যদিও 'অহল্যা' নিয়ে তোমার বিশ্লেষণ পড়ে জেনেছিলাম পুরাণ নিয়ে তোমার অগাধ আগ্রহ ও knowledge। উপন্যাসের শেষে নোট থেকে জানলাম মেদিনীপুরের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকার সময় তুমি এই পটশিল্পীদের সান্নিধ্যে এসেছিলে। অনেক ধন্যবাদ তাদের কথা এরকম সুন্দর উপন্যাসের রূপ দেওয়ার জন্য। দু একটা জায়গায় একটু প্রশ্ন এসেছে মনে। এক জায়গায় পড়ে মনে হয়েছে আকিও বাংলা ভাষা জানে না। আবার সে রাতেই সে দিব্যি পরিষ্কার বাংলায় কলাবতীর সাথে কথা বলে। মনে হল এখানে কথোপকথন টা না থাকলেও চলত। আর উপন্যাসের শেষ লগ্নে যখন কলাবতী জাপানে নিজের সংসার শুরু করেছে তখন জানা গেল না তার স্বামী রামু বা তার শ্বাশুড়ি কনকের মনের অবস্থা কেমন হল বা তারা এত সহজে কি করে মেনে নিল ব্যাপারটা। আর জানতে ইচ্ছা করছে এখন কি গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে এইসব পটশিল্পীদের জন্য কম্পিউটার পৌঁছেচে নাকি তোমার উপন্যাসে ভবিষ্যতের রূপরেখার ইংগিত আছে। সব শেষে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম একটা উপন্যাস আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। আশাটা এবার বেড়ে গেল।
সুনন্দা চক্রবর্তীঃ 
দিদি আজ আমি সারা দুপুর ধরে লেখাটি পড়েছি । প্রথমেই বলি তোমার ধৈর্য অপরিসীম । তোমার লেখা ১) খুব ক্লাসি, ২) ঐতিহাসিক তথ্য সমৃদ্ধ , ৩) বাংলার বার ব্রত যা অনেকেই জানেনা তা সুচারুরূপে ব্যক্ত করেছ, ৪) বাংলার একটা শিল্প তোমার লেখনীতে স্থান পেয়েছে বলে খুব ভালো লেগেছে। এবার আসি কলাবতীর কথায়, তিনটে একই সংসারে থাকা নারী যেখানে ঝগড়া ঝাঁটি আর গালাগালিতেই পার করে সেখানে সুন্দর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর একে অপরের পরিপূরক , উদার হৃদয় চরিত্রগুলো অপূর্ব এঁকেছ । পুরো উপন্যাসটাই আসলে রূপকথা । যা বেঁচে থাকার রসদ দেবে । 
শর্বরী ব্যানার্জিঃ
কলাবতী কথা পড়লাম। গ্রামীন শিল্পীদের অনেক অনেক সম্মান ও মর্যাদা প্রাপ্য। আমরা শহরে বসে তাঁদের শিল্পীমন বা শিল্পের কথা জানতেই পারিনা তাই হয়ত প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিতে পারিনা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই শিল্পীদের তুলে ধরার জন্য।

শ্রাবণী দাশগুপ্তঃ
কলাবতীকথা - অনেক যত্নের বহু পরিশ্রমের ফসল উঠেছে লেখিকার কর্ষণে। প্রয়োজনীয় বৃষ্টি দিয়েছে সজীবতা, শ্যামল হয়ে উঠেছে উপন্যাস - বারব্রত, সংস্কার মিলেমিশে। একেক সময়ে মন ভার হয়ে উঠেছে, কত দ্রুত এসব হারিয়ে গিয়েছে শহুরে জীবন থেকে, নিষ্প্রাণ দেখনদারী এসে দখল করে নিয়েছে সজল আত্মীয়তা - আত্মার কাছাকাছি, মনের কাছাকাছি থাকা মানুষদের। হয়ত আছে গ্রামে-গঞ্জে এখনো - থাকুক, বেঁচে থকুক। বেঁচে থাকুক পটচিত্র আর স্বরচিত গান নিয়ে কলাবতীরা। শহরায়ন বিশ্বায়ন - অনেক কিছু শুকিয়ে দিয়েছে, কোথাও বাঁধ দরকার...। নইলে আমাদের নিজস্বতা হারিয়ে যাবে।
টানাপোড়েন আছে উপন্যাসে, কিন্তু তেমনটা নয়, খুব সাবলীল ভাবে ঘটে যায় ওঠা-পড়া। জটিলতা ধরা যায়না তেমন।

নন্দিতা ভট্টাচার্যঃ
এত ডিটেলিং ভাবা যায়না।  অনেকদিনের প্রয়াস মনে হচ্ছে। বাংলাকে এভাবে  একেবারে টেনে তুলে এনেছ, তুলে ধরেছ ভুলে যাওয়া সব কথা।

অমৃতা ঘোষঃ
অনেক কিছু জানতে পারলাম বাঙলার পটচিত্রও কিংবদন্তীর ব্যাপারে। অসাধারণ শুধুই কলাবতী নয়। কনক, লতু প্রত্যেকেই। আরো একটি ব্যাপার যেটি খুব ভালো লেগেছে সেটি হল একজন নারী হয়ে অন্য আরেকজনকে অণুপ্রাণিত করা। লতু, তার পুত্রবধূ কনককে আর কনক তার পুত্রবধূ কলাবতীকে।  আমাদের জীবন এমন হলে বরতে যেতাম।

রুচিরা চ্যাটার্জিঃ 
কলাবতী কথা পড়ে পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারলাম আগে যা অজানা ছিল। ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস জেনে ভালো লেগেছে। সত্যি অনেক অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে লড়াই করে ওঁরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বাংলার সব ব্রতকথার ছোতছোট গল্পগুলি বিশেষতঃ উমনোঝুমনোর কথা জেনে অনেকদিন বাদে খুব মজা পেলাম। আবারো নস্টালজিক হয়ে পড়লাম।

শর্মিলা দাশগুপ্তঃ
খুব ভালো লাগল কলাবতী কথা পড়ে। পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অজানা কথা, ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস, আমাদের গ্রামবাংলার এতসব ব্রতকথা আর পুজোআর্চার গল্প জানতামনা। কনক আর কলাবতীর সম্পর্কটা এত সুন্দর ভাবে দেখিয়েছ খুব ভালো লাগছে। কনকের প্রতিবাদী চরিত্রটি দারুন। কিন্তু শেষের দিকটা পড়ে মনে হল কলাবতী কেন এত স্বার্থপর হয়ে গেল? যে শাশুড়িমা তার জন্য এতকিছু করল তাকে ছেড়ে, স্বামীকে ছেড়ে সে চলে গেল কি করে? হতেই পারে এটাই বাস্তব কিন্তু কনক এত পুজো করে কি পেল? খুব‌ই বাস্তবিক পটভূমি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পুরোটাই নিঃসন্দেহে উপভোগ্য। 

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা ২০১৫ আসছে...

সোনারতরী থেকে প্রকাশিত "প্যাপিরাস" ই-পত্রিকার পুজোসংখ্যা আসছে কয়েকদিনের মধ্যেই । "চক্রবৈঠক" এবার জমজমাট আলোচনা নিয়ে। বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত মানুষদের মুক্ত কলমে উঠে আসছে বিতর্ক। "সংস্কার না সংস্কৃতি? কোনটির প্রয়োজন এ যুগে "...তা নিয়ে। আর আছে মেয়েদের লেখা একগুচ্ছ থিম অণুগল্প। বিষয়ঃ দুর্গাপুজো। এছাড়াও থাকছে নিয়মিত বিভাগ স্মৃতিকণা, রম্যরচনা এবং ভিন্নস্বাদের নিবন্ধ।

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

জয় বাবা গণেশ !

তিনি হলেন গিয়ে "গণানাং পতি", গণশক্তির প্রতীক, গণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ (গণ+ঈশ)  । বিনায়ক (বি+নী+অক) তাঁর অপর নাম।  প্রমথগণ হলেন শিবের অনুচর এবং সঙ্গী। তাঁরা নাচগানে পারদর্শী । সন্ধ্যার অন্ধকার প্রমথগণের আশ্রয়। বিনায়ক হলেন সেই প্রমথগণের পতি। সন্ধ্যার অধিপতি দেবতা বলে সন্ধ্যারূপিণী লক্ষ্মীদেবীর পাশে গনেশের অবস্থান। ভূতপ্রেতদের দৌরাত্ম্যি ও সকলপ্রকার বাধাবিঘ্ন নাশ করার জন্য প্রমথগণ গণপতিকে সন্তুষ্ট রাখতেন তাই গণপতির অপর নাম বিঘ্নেশ।  তাঁকে পুজো করলে সিদ্ধিলাভ হয় তাই তিনি সিদ্ধিদাতা গণেশ। গ্রীসে ও রোমে গণেশ "জুনো(Juno)" নামে পুজো পান। হিন্দুধর্ম ছাড়া বৌদ্ধধর্মেও গণপতিকে " ওঁ রাগ সিদ্ধি সিদ্ধি সর্বার্থং মে প্রসাদয় প্রসাদয় হুঁ জ জ স্বাহা" মন্ত্রে পুজো করা হয়।  কিন্তু তফাত হল হিন্দুদের গণপতি সিদ্ধিদাতা আর বৌদ্ধদের সিদ্ধিনাশক যা সম্পূর্ণ বিপরীত। হিন্দুদের দেবী অপরাজিতা মা দুর্গার ডানদিকে থাকেন গণপতি। কিন্তু মহাযানী বৌদ্ধদের অপরাজিতা দেবীর সাধনায় লক্ষ্য করা যায় গণপতি চিরবিঘ্ন প্রদায়ক। সেখানে দেবীর বাঁ পা  গণেশের উরুতে আর ডান পা ইন্দ্রের ওপরে ন্যস্ত। বিনায়ক দেবীর পদভারে আক্রান্ত। আবার পুরাণের মতে গণেশ কেবলমাত্র শিব-দুর্গার পুত্ররূপে পরিচিত। বহুযুগ আগে সমাজে দুধরণের সম্প্রদায় ছিল যাঁরা দুটি ভিন্ন মতবাদে গণেশের পূজা করত। একদল নাগ-উপাসক ছিল তাই গণেশের গলায় যে যজ্ঞ-উপবীত বা পৈতেটি রয়েছে সেটি নাগোপবীত তথা নাগের অলঙ্কারের পরিচায়ক। আর অন্য সম্প্রদায় আবার স্কন্দ বা কার্তিকের পূজারী। তারা নাগ-উপাসনার বিরোধী হয়ে কার্তিকের বাহন ময়ূরকেই বেশী প্রাধান্য দিত । ময়ূর হল নাগেদের শত্রু।
বর্তমান দুর্গাপুজোতে আমরা মা দুর্গার দুই পাশে কার্তিক ও গণেশ উভয়েরি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান লক্ষ্য করি। অর্থাত নাগ-উপবীতধারী গণেশও র‌ইলেন আবার ময়ূরবাহন কার্তিকও র‌ইলেন।  আর সেই রূপটি‌ই সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে আজো সমাদৃত।  
ছবিঃ রুচিরা চ্যাটার্জি 
মা দুর্গা  একদিন কৈলাসে বসে স্নানের পূর্বে তেলহলুদ মেখে গাত্রমার্জণা করছিলেন। মায়ের দুই সহচরী  জয়া-বিজয়া কাঁচা হলুদ বেটে তার মধ্যে সরষের তেল দিয়ে মায়ের সর্বাঙ্গে  মাখিয়ে দিতে ব্যস্ত। মা সেই আরাম পাবেন কি, মনে তাঁর খুব দুঃখ। মহাদেব কত নারীকে পুত্র দিয়ে তাদের আকাঙ্খা পূর্ণ করেন আর দুর্গাই স্বপুত্র থেকে বঞ্চিত। কার্তিককে পেয়েছেন যদিও কিন্তু সে তো তাঁর গর্ভের নয়। সে শিবের ঔরসজাত, গঙ্গার কানীনপুত্র আর ছয় কৃত্তিকার দ্বারা পালিত।  গাত্রমার্জণা শেষের দিকে। মা জয়া-বিজয়াকে বললেন, তোরা যা দেখি একটু ওদিকে, বাবার সাথে আমাকে একটু একা থাকতে দে। মা নিজের তেলহলুদ মাখা গায়ের ময়লাগুলি তুলতে তুলতে মহাদেবকে বলেই ফেললেন" আজ আমার একটা ছেলে থাকলে..." মহাদেব বললেন, তুমি ত্রিলোকের যত পুত্রসন্তান আছে তাদের সকলেরি মা"  মা বললেন,"তবুও, একটুতো দুঃখ হয়, বুঝলেনা" মহাদেব বললেন" কত ঝামেলা করে চন্দ্রলোক থেকে কৃত্তিকাদের অমতেও কার্তিককে এনে দিলাম তাও তোমার দুঃখ ঘুচলোনা?"  মা বললেন " ঠিক আছে আর বলবনা" বলতে বলতে নিজের গায়ের ময়লাগুলি তুলে তুলে মাটিতে ফেলছিলেন মনের দুঃখে। হঠাত তাঁর কি মনে হল, সেই ময়লাগুলি দিয়ে একটি পুতুল গড়ে ফেললেন মাদুর্গা। নারায়ণ সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ঐ পুতুলের মধ্যে সূক্ষ্ম শরীরে প্রবেশ করা মাত্র‌ই পুতুলটি প্রাণ পেল আর মাদুর্গাকে "মা, মা" বলে ডেকে উঠল। মায়ের বুকের ওপরে উঠে তাঁর দুধ খেতে শুরু করে দিল। দুর্গা আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেই ছেলেকে কোলে নিলেন। মহাদেব আবার কার্তিককে এনে তাঁর আরেক কোলে দিলেন। । এবার ঐলাসে মহাভোজ। দুর্গার স্উখ আর দ্যাখে কে! দুই পুত্র নিয়ে, দুই কন্যা নিয়ে সুখের সংসার শিব-দুর্গার। কৈলাসের সেই মহাভোজে সব দেবতারা নিমন্ত্রিত হলেন। সকলেই নির্ধারিত দিনে এলেন কেবল শনি মহারাজ ছাড়া। শিব ক্ষুণ্ণ হলেন শনি না আসায়। শনি সম্পর্কে দুর্গার ভাই।  একবার দুর্গা শনিকে বর দিয়েছিলেন, সে যার দিকে চাইবে সাথে সাথে তার মাথাটা খসে পড়বে। মহাদেবের অসন্তোষের কারণে সেদিন শনি অবশেষে দুচোখ হাত দিয়ে ঢেকে প্রবেশ করলেন। এদিকে মহাদেব তো আর সেকথা জানেননা। তাঁদের ছেলেকে দেখছেন না শনি, সেও তো এক অপমানের বিষয়। শনি বাধ্য হয়ে  চোখ খুলে সেই ছেলের দিকে চাইতেই ছেলের মুন্ডুটি খসে পড়ে গেল মাটিতে। মাদুর্গা কাঁদতে লাগলেন। 
দুর্গা নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল দেবতারা বিচলিত হয়ে পড়লেন। তাঁদের আদেশে মহাদেব নন্দীকে বললেন ত্রিভুবন ঘুরে উত্তরদিকে শয়নরত যে কোনো ব্যক্তির মুন্ডটা কেটে আনতে। নন্দী বেরিয়ে পড়ল। স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ঘুরে দেখতে পেল উত্তরদিকে মাথা করে একটা সাদা হাতি শুয়ে আছে।  সেই হাতীর মাথাটা কেটে এনে সে মহাদেবের কাছে নিয়ে এল। মহাদেব তখুনি মাথাটা ছেলের কাঁধে জোড়া দিলেন ছেলে আবার মা, মা করে ডাকতে শুরু করে দিল। মা দুর্গার একাধারে মা ডাক শুনে আনন্দ হল আবার অন্যথায় ছেলের হাতীর মাথা দেখে দুঃখে প্রাণ কেঁদে উঠল। তাঁর দুঃখ দেখে দেবতারা বললেন, মা তুমি দুঃখ কোরোনা, তোমার এই ছেলের নাম দিলাম গণপতি। সকল দেবতার পুজোর আগে এঁর পুজো হবে সর্বাগ্রে।  মা দুর্গা ছেলের এই সম্মানে গর্বিত হলেন।আর মর্ত্যলোকে  ভাদ্রমাসের শুক্লা চতুর্থীতে গণেশের জন্মদিন পালন করা হয়।   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

হ্যাপি কন্যা সংক্রান্তি!


তিনি সব্বোঘটে ক্যাঁটালি কলা। তিনি সব কাজ করতে পারেন। তিনি জ্যাক অফ অল ট্রেডস আবার মাষ্টার অফ অল ও। সবেতেই পারদর্শী।  তিনি একাধারে আর্কিটেক্ট অন্যধারে প্রোমোটার। একাধারে ইঞ্জিনিয়ার অন্যদিকে কার্পেন্টার। আবার তিনি নাকি ছিলেন ফ্যাশান কাম জুয়েলারি ডিজাইনার । তাঁর আবার অস্ত্রশস্ত্র বানানোর ফ্যাক্টরিও আছে। তাই বুঝি তিনি দেবলোকের স্থপতি, কারিগর, শিল্পী। মর্ত্যে যাকে বলে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার  কিম্বা ওয়েল্ডার, বা আর্কিটেক্ট বা পাতি মিস্ত্রী।  সমুদ্রমন্থনের একটি অনবদ্য ফলস্বরূপ তাঁর জন্ম।  সত্যযুগে যিনি স্বর্গ, ত্রেতায় লঙ্কাপুরী, দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী দ্বারকা ও পান্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থের রাজধানী নির্মাণ করেছিল। তিনি যেন ত্রিযুগের পারদর্শী এক স্থপতি।   প্রতিবছর ১৭ই সেপ্টেম্বর তাঁর পুজো হয়। কেন হয়? সেদিন নাকি তাঁর জন্মদিন। বিশ্বকর্মাজয়ন্তী বলে অন্য প্রদেশে।  একাধারে তিনি ডিজাইনার আবার একাধারে তিনি  স্থপতি। দেবতাদের রথ থেকে অস্ত্রশস্ত্র, অলঙ্কার থেকে নানাবিধ ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পের প্রস্তুতকারক।  বিশ্বকর্মার চারহাতের একটিতে জলভর্তি কমন্ডলু, অন্যহাতে কুঠার। অপরদুটি হাতে ফাঁসযুক্ত দড়ি এবং ব‌ই থাকে।  ঠিক যেমন বাস্তব জগতের মিস্ত্রির মত।  পুরাণের মতে বাস্তু হল বিশ্বকর্মার পিতা।   প্রতিবছর কন্যাসংক্রান্তির দিনে, ১৭ই সেপ্টেম্বর বা ভাদ্রমাসের শেষদিনে তাঁর পুজো হয়। সূর্য সেইদিন থেকে কন্যারাশিতে গমন করে তাই এই সংক্রান্তির অপর নাম কন্যাসংক্রান্তি। 
বেদে বলা হয়, বিষ্ণুর সুদর্শণ চক্র, মহাদেবের ত্রিশূল, দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্র এবং পুষ্পক রথ তিনি বানিয়েছিলেন। সীতার স্বয়ংবর সভায় যে বিশাল ধনুকটিতে জ্যা পরিয়ে ধনুকটি ভঙ্গ করে  রামচন্দ্র সীতাকে পেয়েছিলেন সেই  হরধনুটিও বিশ্বকর্মার হাতে তৈরী।  


 দক্ষিণবঙ্গে বর্ষার পরে  সরীসৃপের বাড়বাড়ন্ত হয়। জলে জঙ্গলে মানুষদের কাল কাটানো, বিশেষতঃ সাপখোপেদের সাথে তাদের অহোরাত্র ওঠাবসা। একটু অসতর্ক হলেই বনে জঙ্গলে সাপেকাটার খবর। তাই বর্ষা গিয়ে ভাদ্রের জল থৈ থৈ গ্রামবাংলায় শরতের নীল আকাশের আবাহনে আগমনীর সুর যেন সবে শুনতে পায় গ্রামবাসীরা। ভাদ্রমাসের সংক্রান্তিতে তারা করে রান্না পুজো। রাঁধে ভাদ্রের শেষ দিনে। আর সেই বাসি খাবার খায় আশ্বিনের প্রথমদিনে। তাদের বিশ্বাস তাদের প্রত্যেকের ঘরের নীচে যে বাস্তুসাপ আছে , যে সারাবছর তাদের বালবাচ্ছাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, যার নজরদারিতে তারা সম্বচ্ছর বেঁচেবর্তে রয়েছে তাকে এবছরের একটা দিন মনে করে পুজো করা। সাপেদের দেবী মা মনসার পুজো এটাই। মা মনসা তুষ্ট করলে তবেই সাপেরা উত্পাত করবেনা। এই তাদের বিশ্বাস। গোবরছড়া দিয়ে রান্নাঘর, উঠোন নিকিয়ে, শুকনো করে,  ধোয়ামোছা করে, ঘর রং করে ষোড়শ উপচারে সংক্রান্তির দিন রাতে তারা নতুন উনুনে রান্না করে। 
ভাত, তরকারি, ডাল চচ্চড়ি, কচুশাক, ইলিশমাছ, চিংড়িমাছ, চালতার টক, পাঁচ রকম ভাজা, আবার পিঠেপুলি, পায়েস...সব রেঁধে বেড়ে মনসাদেবীকে উত্সর্গ করে তারপর দিন সব ঠান্ডা খাবে তারা। যদি রান্নাবান্নায় কোনো অসংগতি থাকে কিম্বা পরিচ্ছন্নতায় দোষত্রুটি থাকে তবে ঐ দিন মনসাদেবী সাপকে পাঠিয়ে সব খাবার বিষাক্ত করে দেন তাই দক্ষিণবাংলার মানুষদের এই পুজোতে নিষ্ঠা চোখে দেখবার মত।
তারা কাঁটা মনসার ঝোঁপেঝাড়ে এখনো রেখে আসে দুধের বাটি আর কলা। সাথে কিছু রান্নাপুজোর ভোগদ্রব্য।   দক্ষিণবঙ্গের মেয়েরা অনেকে আজো বলে আন্নাপুজো। তারা "র" উচ্চারণে অক্ষম। তারা বলে আন্নাপুজোয় পান্না খাওয়া। পান্না হল পান্তাভাত।  ভাদ্রের পচা গরমে কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি। তাই বাসিভাতে ঠান্ডা জল ঢেলে রাখার রেওয়াজ। পরদিন ভাত টাটকা থাকবে। আর এই পান্তাও নাকি খুব স্বাস্থ্যকর।  সাথে কেউ রাঁধে ডালবড়া, মাছভাজা। কেউ উচ্ছেচিংড়ি, গাঁটিকচুর দম। কেউ আবার মহা উদ্যমে রাঁধে  ঘেঁটুফুল ও কচুপাতা বাটা, নারকোল কোরা, সর্ষে-বাটা আর সর্ষের তেল দিয়ে মাখা,  সর্ষে দিয়ে কচুর লতি আর শাপলা ডাঁটার ডাল ।  তবে ডালচচ্চড়ি, কচুরশাক, ইলিশ-চিংড়ি রাঁধতেই হয়। আর অগাধ বিশ্বাস নিয়ে তারা সেই পঞ্চ ব্যঞ্জন নিবেদন করে মনসা ঠাকুরাণী আর তাঁর চ্যালা নাগনাগিনীদের।     
বিশ্বকর্মাপুজোর দিনে এই উত্সবকে বলা হয় অরন্ধন বা রান্না পুজো।  


এই বিশ্বকর্মা তথা মনসাপুজোর পর আমাদের আর কোনো উত্সব নেই। আবার সেই শরত্কালের দুর্গোত্সব হবে মহালয়ার পর, সুপর্বে।  তখন হবে সুসময়, পুণ্যকাল। আমাদের পরবের দিন শুরু হবে। তাই তো মাদুর্গার অরেক নাম "সুপর্বা"। তাই বুঝি আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, বিশ্বকর্মা পুজো শেষ হল মানেই দুর্গাপুজোর ধুম লেগে গেল হৃদিকমলে। আর হিন্দুদের এই পরব চলবে চৈত্রের সংক্রান্তিতে চড়কপুজো অবধি । পুরণো বছর চলে যাবে আবার নতুন বাংলা সন পড়বে তারপর। 
 
 এই দিনে বাংলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উত্সব হল ঘুড়ি উত্সব। সব কলকারখানা বন্ধ বিশ্বকর্মা পুজোর কারণে। সব যন্ত্রপাতি ধোয়া মোছা করে তাদের সম্বচ্ছরি বিশ্রাম ঐদিন। আর তাই বুঝি সেই আনন্দযজ্ঞে মেতে ওঠে ছোটবড় সকলেই। অনাবিল আনন্দ। অফুরন্ত সময় ঘুড়ি ওড়ানোর। শরতের নীল, মেঘমুক্ত আকাশে রং বেরংয়ের ঘুড়ি আর ঘুড়ি। কত রকমের নাম তাদের। কত রং তাদের।  দুদিন আগে থেকে ঘুড়ি তৈরী আর সেই সাথে ঘুড়ি ওড়ানোর সূতোয় মাঞ্জা দেওয়া। কাঁচের গুঁড়োর সাথে গদের আঠা মিশিয়ে কড়কড়ে করে সেই মিশ্রণ সূতোয় লাগানো। এ প্রান্তে একটা গাছের গুঁড়িতে সুতো বেঁধে ও প্রান্তে আরেকটা গাছের গায়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পাক দিয়ে সুতোয় মাঞ্জা দেবার পালা। তারপর সেই সুতো গুটিয়ে নেওয়া কাঠের লাটাইয়ে। রান্নাবান্না বন্ধ। মেয়েদের আজ জিরেন। আর ছেলেদের মনের সুখে ঘুড়ি ওড়ানো। নীল আকাশে ঘুড়ির মেলা। আর এ পাড়ার টুবলুর দল ও পাড়ার বাপ্পার দল। কে কাকে কাটবে আজ? অসীম আকাশে উভয়েরি ঘুড়ির রাজ্যপাট । কে কার এক্তিয়ার অতিক্রম করে কাকে কাটতে পারে সেই হল গোল। একবার কাটতে পারলেই চীতকার..."ভোকাট্টা....দুয়ো, দুয়ো" আর সাথে সাথেই যারা অন্যপক্ষের ঘুড়ি কাটলো তাদের বাঁশী, কাঁসি, ঢাক, ঢোল পিটিয়ে প্রতিপক্ষকে হিউমিলিয়েট করা। সেই ফাঁকে মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় হাত কেটে রক্তারক্তি। রোদ্দুরে ঘুড়ি উড়িয়ে ছাদ থেকে তরতর করে নেমে গিয়ে ঠান্ডা জলে ঢকঢক। ব্যাস্! সর্দ্দিগর্মি। মায়ের বকুনি। পেটকাটি,  চাঁদিয়াল, একতে, দোতে, বাতিয়াল,  ঘয়লা, ময়ূরপঙ্খী,  শতরঞ্চি,  বামুনপেড়ে,
রসোগোল্লা,  মুখপোড়া, চৌখোপ্পি, জয়হিন্দ...   আরো কত নাম সব ঘুড়ির।  আর আছে হরেক কিসিমের ঘুড়ির সুতো.. ডেক্রণ, স্পেকট্রা, ডিকট। কাজ সকলের এক‌ই কিন্তু  কোন্‌ ঘুড়ি যে কাকে কাটবে ঐদিনে আর কার সুতোয় যে কত জোর অথবা পাড়ার কোন ছেলে সেদিন সবচেয়ে বেশী ঘুড়ি কাটবে আর গলা ফাটিয়ে তার বন্ধুরা তার জন্য চীতকার করবে তা ছিল দেখার মত।  
মফঃস্বলে আজো দেখি ঘুড়ির দোকান।  কিন্তু নিজের বাড়ির ছাদ তো অপ্রতুল শহরে। তাই শহুরে ছেলেপুলেদের ঘুড়ি ওড়ানোয় সেই মাদকতা চোখে পড়েনা। ঘুড়ির পাতলা, ফিনফিনে রঙীন কাগজের বদলে এখন পলিথিন হয়েছে ঘুড়ির অঙ্গশোভা। আজ সে আমাকে তেমন করে টানেওনা। আর শহরের হাইরাইজের ছেলেপুলের এখন সময়‌ই বা কোথায় ঘুড়ি ওড়ানোর? সব ফ্ল্যাটবাড়ির ছেলেরা তো একত্র হয়ে মেতে উঠতেই পারে এই ঘুড়ি উত্সবে??