১৪ আগস্ট, ২০১৪

স্বাধীনতা ???

আমার স্বাধীন কলম  ৬৭ বছরের পুরোণো স্বাধীনতার পরেও  প্রতি মূহুর্তে প্রশ্নবাণে ক্ষতবিক্ষত করে আমাকে   ।
স্বাধীনদেশে জন্মেছি তাই ভাগ্যবতী কিন্তু প্রশ্নের জটগুলো ছিঁড়ে বেরোব কবে? বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে উল্লিখিত দেশমাতৃকা যাকে আমরা প্রণাম করে বলি "বন্দেমাতরম্‌"  !   সেই মা ছিলেন, আছেন ও থাকবেন  । কিন্তু কতটা ভালো থাকবেন আর কেমন করে আমাদের ভালো রাখবেন সেটাই হল প্রশ্ন । 
সেসময়  রক্তমাংসের মা ছিলেন ধূলোমুঠি শাড়িতে, কোলজুড়ে ছেলেপুলের বাত্সল্যে উথলে ওঠা নিপাট ঘরের বৌটি । সংসার সামলানো যার জীবনজুড়ে । ম্যাটিনি শোয়ের সিনেমা যার বিলাসিতা  আর সরাদিনের তেলহলুদ মাখা শাড়ি পরা হেঁশেল অন্তপ্রাণ । হাসিমুখে থোড়-বড়ি-ডাঁটার জঞ্জাল সামলাতে সিদ্ধহস্ত এহেন মা'টি  ছিলেন ঈষত লাজুক স্বভাবের ।
কালের চক্রে অবগুন্ঠনা মায়ের উত্তরণ ঘটল । মা অসূর্যম্পশ্যা থেকে আলোর মুখ দেখলেন । শিক্ষার ধারাপাত তাঁর হাতে । মুখে প্রচ্ছন্ন বুদ্ধিদীপ্ততা , চোখে উদ্ভাসিত উচ্চাকাঙ্খা । আধুনিকা তিনি আবার পুরাতনীও কিছুটা ।
আবার উত্তরণ এই মায়ের । আলোর দিশা নিজেতো দেখলেনই আবার পৃথিবীকেও দেখালেন ।
কিন্তু প্রাপ্য সম্মনটুকুনি কি আদায় করতে পারলেন সেই মা ?   আর তাই বুঝি আমাদের সমাজে মায়ের এত অবহেলা ? কন্যাভ্রূণের প্রতি অবিচার থেকে নারীপাচার, কিশোরী ধর্ষণ থেকে  স্বাধীনভাবে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হতে হয় সেই মা'কে? আবার এই বিশ্বায়নের যুগে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়
"বেকার হোমমেকার" "মা" টিকে ভিখারি, বারবণিতা, এবং বন্দীর সাথে একই আসনে রাখা হয় কারণ এরা সকলে "নন প্রোডাক্টিভ" পপুলেশনের আওতায় পড়ে ।  এই মা'র জন্য‌ই কেউ গিয়ে নাসায় রকেট চড়ছে, কেউ জীবনদায়ী ওষুধ তৈরী করছে, কেউ বানাচ্ছে  অটোমোবাইল, কেউ বা হচ্ছে সৌরভ, লিয়েন্ডার-বিশ্বনাথনের মত  কিম্বা রবীন্দ্রনাথ, অমর্ত্য সেনের মত নোবেল লরিয়েট অথবা অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ আনছে মেরি কমের মত !  
তাই আমার অন্তঃসলিলা মনের ধারা বলে উঠলঃ

এই কি আমার স্বাধীনতা, যা বলে "উন্নত মম শির"
এই কি সেই স্বাধীনতা, সে তো পদ্মপাতায় নীর !
এই কি আমার স্বাধীনতা, না কি নিছক দেশপ্রেম ?
এই কি আমার স্বাধীনতা
যা তোমার আমার ভালোয় মন্দে রোদের কণায় হেম?

দূর থেকে সেই স্বাধীনতা আমরা উপভোগ করে যাব ? রোদের কণা যেমন ছোঁবার স্বাধীনতা আমাদের নেই ঠিক তেমনি?  

৭ আগস্ট, ২০১৪

বাইশে শ্রাবণ

জ অরণ্যমেধ যজ্ঞের সামিল হয়ে মানুষ যখন পরিবেশ সচেতনতার বাণী আওড়ায় তখন মনে হয় বাইশে শ্রাবণের কথা। মরণশীল রবিঠাকুরের মৃত্যুদিন বাইশে শ্রাবণকে তার আশ্রমের বৃক্ষরোপণের দিন হিসেবে ধার্য করেছে বিশ্বভারতী। যেন তিনি ঐ উত্সবের মধ্যে দিয়ে নবজীবন লাভ করেন প্রতিবছর। ১৯৪২ সাল থেকে এমনটি হয়ে আসছে অথচ বিষয়টির ওপর বিশেষ আলোকপাত দেখিনা। 
শ্রাবণের ধারায় সিক্ত মাটিতে উদ্ভিদ তার সঞ্জিবনী শক্তি পায় ও ধীরে ধীরে  মহীরুহে রূপান্তরিত হয়। তাই তার নবীন জীবন বরণের এই উত্সবে কবির গতজীবন স্মরণ-মননের এবং বৃক্ষের নবজীবন বরণের। শান্তিনিকেতনে বিগত এই এতগুলি বছর ধরে কত নামী মানুষের হাতে পোঁতা বৃক্ষের তালিকাসূচি পাওয়া যায় । শ্রাবণ যেন দিনের শেষে যেতে গিয়েও যেতে পারেনা। বাইশেও তাকে নতুন করে ফিরে পাওয়া আমাদের। প্রকৃতিপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তাঁর ছিন্নপত্রে তার উল্লেখ পাই আমরা। 
কবি বলছেন্" এই পৃথিবীটি আমার অনেক দিনকার এবং অনেক জন্মকার ভালোবাসার লোকের মত আমার কাছে চিরকাল নতুন। আমি বেশ মনে করতে পারি, বহুযুগ পূর্বে তরুণী পৃথিবী সমুদ্রস্নান থেকে সবে যখন মাথাতুলে উঠে তখনকার নবীন সূর্যকে বন্দনা করছেন তখন আমি এই পৃথিবীর  নূতন মাটিতে কোথা থেকে এক প্রথম জীবনোচ্ছ্বাস গাছ হয়ে পল্লবিত হয়ে উঠেছিলেম।"
 বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠানের সূচনা কবি প্রথম করেছিলেন তাঁর জন্মদিনে। আর কেন এই উত্সব সেই কারণ হিসেবে কবি বলেন" পৃথিবীর দান গ্রহণ করবার সময় মানুষের লোভ বেড়ে উঠল। অরণ্যের হাত থেকে কৃষিক্ষেত্রকে সে জয় করে নিলে, অবশেষে কৃষিক্ষেত্রের একাধিপত্য অরণ্যকে হটিয়ে দিতে লাগল। নানা প্রয়োজনে গাছ কেটে কেটে পৃথিবীর ছায়াবস্ত্র হরণ করে তাকে নগ্ন করে দিতে লাগল। তার বাতাস হল উত্তপ্ত, মাটির ঊর্বরতার ভান্ডার নিঃস্ব হল।"
 এই কথা মাথায় রেখেই বৃক্ষরোপণ বা বনমহোত্সব্ বা তাঁর ভাষায় " অপব্যায়ী সন্তান কতৃক মাতৃভান্ডার পূরণের কল্যাণ উত্সব"  

 তথ্যসূত্রঃ রবীন্দ্রনাথ ও মানুষ ছিলেন, আবদুস শাকুর ( দীপ প্রকাশন্ )