২৭ জুলাই, ২০১৪

"লাউপাতায় ইলিশ পাতুড়ি"


শাউড়ি কটা কচি কচি লাউপাতা তুলে আনল মাচা থেকে। বৌ ততক্ষণে জ্যান্ত ইলিশমাছটাকে বঁটিতে কাটতে বসল। আর নাতবৌটা বসল কালো সরষে, পোস্ত আর নারকেল কোরা নিয়ে শিলে বাটতে। গিন্নী চেঁচিয়ে বললে" ওরে তুলসী মঞ্চের পাশে লঙ্কাগাছটা থেকে কটা টাটাকা কাঁচালঙ্কা তুলে আন দিকি। নাতবৌ চেয়ে নিল খান ছয়েক। বৌ বললে মাছের পিস পিছু একটা করে লঙ্কা নিবি বৌ। আর কটা লঙ্কা চিরে রাখবি। সরষের তেল বের করেছিস কৌটো থেকে? বৌ মাছগুলো ধুতে যাবে, শাউড়ি বললে, উঁহু কেটে ধুতে বলেছিলাম।  একবারের পর আর ধুবিনে বৌ। এবার ধবধবে সাদা সেই রূপোলী শস্যগুলো বৌয়ের হাত থেকে সোজা এল একটা টিফিনকৌটোর মধ্যে। তারপর তাতে পড়ল নুন ছিটেফোঁটা হলুদ, সর্ষে-পোস্ত-নারকেল-কাঁচালঙ্কা বাটা। বৌ মাখতে লাগল আর নাতবৌ ওপর থেকে ঢেলে দিল এক খাবলা সরষের তেল। এভাবে পড়ে র‌ইল সেই রূপোলী শস্য ঘন্টা দুয়েক। তারপর শাউড়ির পেড়ে আনা লাউপাতার মধ্যে একটা করে মাছ, একটা করে চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে বন্দী হল পাতার মোড়কে। তারপর খড়কে কাঠি আটকে তাওয়ায় তেল মাখিয়ে রেখে দিল বৌ। দুমিনিট পরে উল্টে দিল। তারপর আবার পাল্টে  দিল বৌ খুন্তি দিয়ে আরো দুমিনিট ঐ ভাবে। সবশেষে গরম গরম ভাতের মাছে সোজা সেই রূপোলী শস্য এসে পড়ল ওদের থালার পরে। 
আমার দিদিমা নাম দিয়েছিলেন "লাউপাতায়  ইলিশ পাতুড়ি" দিদিমা অবিশ্যি গরমভাতের মধ্যে লাউপাতা গুলোকে রেখে দিতেন। তাতেই সেদ্ধ হয়ে যেত। পাতা-মাছ-মশলা-তেল শুদ্ধ ভাতে মেখে খেয়ে ফেলা যায়। কিছুই যায়না ফেলা। আমি তাওয়ার বদলে টেফলন কোটেড ননস্টিক প্যানে করলাম আজ। নাম দিলাম "হিলসা-টেফ্লোরা"  খুব সহজপাচ্য এই  ইলিশ পাতুড়ির  । আর তেল খুব কম লাগে ।

২৩ জুলাই, ২০১৪

আমার স্কুলের স্মৃতি


বৃষ্টির গন্ধে মন কানায় কানায় ভরপুর। মনে পড়ে যায় স্কুলের বনমহোত্সবের কথা। নামকরা মেয়েদের স্কুল ।

স্কুলের নাম : বরানগর রাজকুমারী মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল

ঠিকানাঃ ২ এবং ৩ শশীপদ ইনস্টিট্যুট লেন

কলকাতা ৭০০০৩৬



মফঃস্বলের স্কুল কিন্তু পুরোণো কোলকতার মেয়েদের স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম । মেয়েদের স্কুলে এখানেই প্রথম চালু হয়েছিল বিজ্ঞান শাখা । আর ছিল কেতাদুরস্ত ল্যাবরেটারি । লাইব্রেরীতেও ছিল বিশাল ব‌ইয়ের সম্ভার । ছিল খেলার মাঠ । একটা প্রকান্ড চেরী গাছ, আর ছিল ডালিম,জামরুল আর আতাগাছ । বড়দির ঘরের পেছনে ছিল লিলিপুল । মাঠের একদিকে গ্রিণ হাউস । অনামা সব ফুলেল ক্যাকটাস থাকত সেই গ্রিণহাউসে। স্কুলের দুটো গেট । একটা কেবল সকালে খুলত প্রাথমিক সেকশানের জন্য আর দুপুরে খুলত দুটোই । দুই গেটের মাথায় জুঁইফুল গাছের আর্চ আর গেট পেরিয়ে স্কুল অফিসে ঢোকার মুখে দুপাশে গোলাপের কেয়ারি । কি সুন্দর পরিবেশ !
স্কুলের দুটো বিল্ডিং । একটা পুরোণো আর একটা নতুন । পুরোণো বিল্ডিংয়ে সকালবেলায় প্রাইমারীর ক্লাস হয় আর দুপুরে সেকেন্ডারির । নতুন বিল্ডিংয়ে হায়ার সেকেন্ডারির ক্লাস হয় আর সেই সাথে ল্যাব, অফিস সব চলতে থাকে । দুই বিল্ডিংয়ের মাঝে বেশ কিছুটা জমি আছে স্কুলের । সেখানটা বন্ধ । ছোট্ট একটা গেটও আছে এবাড়ি থেকে ওবাড়ি যাবার ; টিফিনের সময় ফুচকা-আলুকাবলি ওয়ালারা ঐ গেটের কাছটাতেই হেলান দিয়ে বিক্রি করে সব । কিন্তু সেই গেটটা সচারচর খোলা থাকেনা । ছুটির দিনে বোধ হয় মালি গিয়ে সেই জমির আগাছা সাফ করে আসে ।
ঐ জায়গাটায় একটা ফ্যামিলি সেমেটরি । স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা খ্রীষ্টান ছিলেন। রাজকুমারী দেবীর স্মৃতি রক্ষায় ঐ স্কুল।
ওনাদের পরিবারের সকলের কবরখানা ঐটে ।
ওনার ভাই বোনেদের ও কত ছোট ছোট সব ক্রস দেওয়া সিমেন্টের বেদী করা রয়েছে । ভালো করে দেখলে ওনাদের পুরো ফ্যামিলি ট্রি টা লক্ষ্য করা যায় । কত ধূপের কাঠি আর মোমবাতির টুকরো পড়ে থাকত। আমরা টিফিন খেতাম সেখানে। ওনার নাকি খুব গাছপলার শখ ছিল । আর তাই তো প্রতিবছর বর্ষার সময় আমাদের স্কুলে বনমহোত্সব বা বৃক্ষরোপণ হয় ঘটা করে ।গ্রীষ্মের ছুটির পরেই বৃক্ষরোপণ উত্সবের তোড়জোড় চলত ।
দস্তুর মত রিহার্সাল চলত কমন রুমে । বনমহোত্সবের একটা স্ক্রিপট বছর বছর হয়ে আসছে । একটু রদ বদল করে কয়েকটা গান এদিক ওদিক করে নৃত্যনাট্য দাঁড় করানো হয়। সবুজ গাছ লাগানো হয় । খুব উত্সাহে মেয়েরা নাচ গান প্র্যাকটিস করে প্রতিবছর । অনুষ্ঠান শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের গান 'আয় আমাদের অঙ্গনে, অতিথিবালক তরুদল ' দিয়ে আর শেষ হয় 'মরুবিজয়ের কেতন ওড়াও, এ শূন্যে ওড়াও ওড়াও হে প্রবল প্রাণ' দিয়ে । প্রথম দৃশ্যে একদল মেয়ে নেচে নেচে মঞ্চে এসে প্রবেশ করে আর শেষ দৃশ্যে তারাই আবার প্রত্যেকে হাতে একটা করে সবুজ চারা গাছ নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে খোলা স্কুল মাঠের ধার দিয়ে নেচে নেচে চলে । গাইতে থাকে বাকি সকলে যারা এতক্ষণ ধরে গান পরিবেশন করছিল । নাচের মেয়েদের মেঘ রংয়ের শাড়ি আর সবুজ উড়নি মাথায় । গানের মেয়েরা কচিকলাপাতা রঙের শাড়ি আর মেঘ নীল ব্লাউজে । আগে থেকে স্কুলের মালি যেখানে যেখানে নতুন গাছ পোঁতা হবে তার জন্য মাটি খুঁড়ে নির্দ্দিষ্ট ব্যাবধানে গর্ত করে রাখে । নাচের মেয়েরা নাচ করতে করতে একে একে গাছগুলি সেইখানে রেখে দেয় আর গানের মেয়েরা জলঝারি দিয়ে জল দান করে সেই নতুন গাছের চারায় । এভাবেই হয়ে আসছে বছরের পর বছর ।


আমার রবীন্দ্রনাথের গানের চর্চা স্কুল দিয়েই শুরু। ধরণীর গগনের মিলনের ছন্দে, এক আকাশের তলায গীতবিতানের ছন্দে গন্ধে মুখর হয়ে উঠত তিনটে মাস। কিশোরী হৃদয়ে মেঘের ডমরু, আসন্ন শরতের জন্য উশখুশানি আর পড়াশুনোর ভার তো ছিল‌ই। এখনো বর্ষায় রবীন্দ্রনাথকে আমার মত করে ফিরে পাই সেই বনমহোত্সবের গানে, কবিতায়। নিজের মনে আবৃত্তি করে উঠি.... ত্রস্তপায়ে চুপিচুপি চলে যাওয়া রাইকিশোরীর বনে-উপবনে অভিসার যাত্রার সাক্ষী হয়ে। আমার ভাবনাগুলো বর্ষার হাওয়ায় এখনো মেতে ওঠে মুকুলিত গাছের মত, কেঁপে ওঠে কচি কিশলয়গুলো, জলভেজা জুঁইয়ের গন্ধ, শ্রাবণের ধারার সাথে চুঁইয়ে পড়ে মনের কার্ণিশে।

photo courtesy: Google

১২ জুলাই, ২০১৪

দিন বদলের পালা


প্রথমে বেড়ানো ছিল রেলগাড়ি করে । কুঝিকঝিক করতে করতে বিশাল ট্রেনকে টেনে নিয়ে যেত স্টিম ইঞ্জিন । তারপর এল ইলেকট্রিক ট্রেন ।  ডিজেল থেকে বিদ্যুত উত্পাদন করে তা দিয়ে ট্রেন  যা  আমরা এখনো চড়ছি । তবে স্থান কাল পাত্রভেদে ট্রেনের জার্ণি বড্ড আরামদায়ক হয়ে ওঠে যখন রিজার্ভড আসন থাকে এবং ট্রেনটি পরিচ্ছন্ন থাকে । আশপাশের অনবরত বদলে যাওয়া দৃশ্যপট এই যাত্রার আনন্দকে আরো বাড়িয়ে তোলে ।  সেই সবুজ ধানক্ষেত বা গ্রামের চালাঘর কিম্বা দূরের সেই তালদীঘি কেমন যেন নস্ট্যালজিক করে তোলে । এখন সময়ের অভাবে ট্রেনে না গিয়ে হয়ত প্লেনে যেতে হয় আমাদের কিন্তু যে যাই বলুক ট্রেনে চলার সাথে সাথে কেমন যেন গ্রাম্যগন্ধ ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে থাকে আর ষ্টেশন এলেই সেই চা'ওয়ালার ডাক কিম্বা নিষিদ্ধ সব ডিপফ্রায়েডের হাতছানি ?  এখন চা ওয়ালার সফিষ্টিকেশন লেভেল অনেক ওপরে । ফোটানো চায়ের পরিবর্তে টিব্যাগ এসেছে । জনগণের কল্যাণার্থে, চা-কফির পাশে জায়গা করে নিয়েছে ঠান্ডা পানীয়ের বোতল ও খনিজলবণ সমৃদ্ধ পানীয় জল । মনে মনে ভালোলেগেও যায় এই সব দেখেশুনে । নিজের দেশটাকে কে না ভালো দেখতে চায় ! 
আমাদের ঠাকুমা দিদিমারা রেলগাড়িতে চড়ে হাওয়া পরিবর্তনের যেতেন, দেওঘর কিম্বা জসিডি, ঘাটশিলা কিম্বা দার্জিলিংয়ে। সাথে যেত ইকমিক কুকার। দেদার রান্নাবাটিও চলত রেলগাড়িতে। ম্যারিনেটেড মাংস, ডাল, চাল সব স্তরে স্তরে সাজিয়ে দিয়ে ইকমিক কুকারে বন্দী করে তারা তাসের আড্ডায় মেতে উঠতেন ট্রেন ছাড়ার পর। আমাদের প্রজন্মে লুচি-তরকারী-মিষ্টি বাড়ি থেকে বানিয়ে নিয়ে ট্রেনে ওঠা হত। আর এখন স্টুডেন্টরা মহা খুশিতে ইন্সট্যান্ট কাপ-ও-নুডলসে কিম্বা ডিহাইড্রেটেড বিরিয়াণির প্যাকেট খুলে দিব্যি গরম জল ঢেলে খেতে অভ্যস্ত । আরো ব্যাস্ততা বাড়ছে। জীবন হয়ে উঠছে শর্টকাট। তারা কিচেনের তেলকালিকে বাইপাস করে জয় মা বলে ভাসায় তরী।   

প্লেনে কেমন যেন একটু বেশি শহর-শহর গন্ধ ।  চেনা শহরটা হুস করে পেরিয়ে যাবার আগেই একফালি বিকিনি জানলায় চোখ রেখে একচিলতে নীল নদীটাকে সি অফ করে চলা । শহরের আলুলায়িত নীলচে সবুজ নিকেল সালফেটের মত ল্যান্ডস্কেপটাকে টপকে টপকে মেঘের মধ্যে দিয়ে ভাসতে ভাসতে মনে হত এই যে নীচের শহরটাকে দেখছি সেখানে কোথাও একটা বিন্দুর মত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আমার বাড়ি  । ভাবতে ভাবতেই নিমেষের মধ্যে হারিয়ে যেত আমার শহর, নীল নদী, সবুজ গড়ের মাঠ,  সবুজ ঘেরা লেকের জল । মেঘের বাড়ির জানলা একে একে বন্ধ হয়ে যেত । পাইলট প্লেন ঘুরিয়ে দিত গন্তব্যের নিশানায় ।  আরবান ল্যান্ডস্কেপ, ব্যস্ত জীবনযাত্রা আমার চোখের আড়ালে তখন ।  প্রথম প্রথম প্লেনে উঠে মনে হ'ত সত্যি সত্যি এটা  আমার শহর ছিল তো ! এছিল শেষ আশির দশকের ভাবনা ।

তারপর হাইরাইজ, শপিং মল আরো ঝকঝকে সবুজ ল্যান্ডস্কেপ্, ম্যানিকিওর্ড টাউনশিপের সবুজ, তারমধ্যে একরত্তি সুইমিংপুলের নীল প্লেনের জানলায় ধরা দিল । এরোপ্লেনে উঠে  ককপিটে গিয়ে  পাইলটের কেরামতি দেখা হত ।   দক্ষিণদিকে যাবার সময় পাইলট আর কেবিন ক্রু'কে রিকোয়েষ্ট করা হত বঙ্গোপসাগর এলেই জানান দিতে, যেন পুরীর মন্দিরকে ওপর থেকে একটা ঢিপ করে পেন্নাম করে নিতে পারি কিম্বা উত্তর দিকে গেলে বেনারসের কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরকে ।    তখন পাইলটের দুনিয়া, প্লেন চালানোর কেরামতি আর ঐ এক স্কোয়ার ফুট জানলার মধ্যে দিয়ে নিজের দেশের খুঁটিনাটি ঐশ্বর্য্যটাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করাটাই ছিল বিরাট আনন্দের ।  আর রোদঝলমলে দিনে হিমালয়ের মাথায় রূপোর ঝালর ? সেটা দেখলে মনে হ'ত প্লেনে চড়ার পয়সা উশুল । মনে মনে বিজ্ঞানকে ধন্যবাদ দিতাম ।

মুঠোফোনের দুনিয়াটা কেমন ধীরে ধীরে বদলে দিল জীবনকে ।

এল বেশ গোদামাপের  মুঠোফোন ।  তখন এয়ারপোর্ট পৌঁছে বাড়িতে সংবাদ দেওয়াটা ছিল আরো রোমাঞ্চকর ব্যাপার । তারপর প্লেন ছাড়ার ঠিক আগের মূহুর্তে সেলফোন অফ করার আগে আরেকবার ফোন করে  জানানো... এ কথাই শেষ কথা নয়তো!

তারপর সংক্ষিপ্ত বার্তাবিনিময় বা এসেমেস চালু হল । আরো সুবিধে হল । কম খরচে যোগাযোগ । মনে মনে বিজ্ঞানের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই ।

এবার রঙীন সেলফোন । স্লিম এন্ড ট্রিম ।  ক্যামেরাও আছে । ছবি তুলে এমএমএস  পাঠানো যায় । অপব্যবহারে বেশী কাটতি হলনা এই এমএমএস প্রযুক্তির । মনে মনে বিজ্ঞানকে কটাক্ষ করলাম ।   

হাতের তালুতে সেলফোনটি নিয়ে কেন জানি বারবার মনে পড়ে যায়,কোনো এক টেলিকম কোম্পানির একদশকের পুরোণো সেই বিখ্যাত শ্লোগানটিকে.... "কর‌ লো দুনিয়া মুঠ্ঠি মে"

সত্যি তো এই মুঠোফোন পুরো দুনিয়াটাকে হাজির করেছে আজ আমাদের হাতের নাগালের মধ্যে । মোবাইলের জন্মলগ্নে তার আকৃতি ছিল বেশ বড়সড় । তারপর টেকনোলজির উন্নতির সাথে সাথে সেটিও স্লিম হতে শুরু করল ।

সেলফোন হল যন্ত্র । মোবাইল পরিষেবা তার যন্ত্রী । দুটিই উপচে পড়ছে কারিগরী কৌশলে । এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমাকে । এই দুটি প্রযুক্তির মেলবন্ধনে গ্রাহক নানারকম সুযোগ সুবিধে পেয়ে থাকেন ।

গোড়ার দিকে সেলফোন পরিষেবার যে প্রযুক্তি ছিল সেটি ভয়েস বা কথা বহন করত । পরিষেবাটি1Gবা প্রথম জেনারেশান । সেই যুগের হ্যান্ডসেটের প্রযুক্তি কেবল একটি রঙ(মোনোক্রোম্যাটিক)অক্ষর এবং সংখ্যা(আলফা নিউমারিক তথ্য)স্ক্রিনে দেখাত । এরপরে পরিষেবার প্রযুক্তি উন্নত হয়ে2Gবা দ্বিতীয় জেনারেশনে পৌঁছল । এই2Gপরিষেবা কথার সঙ্গে ডেটা বা তথ্য বহন করল । সমতুল্য ভাবে হ্যান্ডসেট প্রযুক্তি একরঙা স্ক্রিন এবং অক্ষর ও অঙ্কের যুগপত গন্ডী পেরিয়ে কম্পিউটারের মতন গ্রাফিকাল আইকন ব্যবহার শুরু করল ।

কিন্তু যেহেতু পরিষেবা প্রযুক্তি তথ্য বহনে সক্ষম সেই কারণে কিছু নতুন সুযোগ সুবিধে পেল গ্রাহক । যেমন এসেমেস এবং সীমিতভাবে ইন্টারনেট ব্রাউসিং ।

এইভাবে আন্তর্জালের সাথে মোবাইল ফোনের গাঁটছড়া বাঁধা হল;মুঠোফোন হ্যান্ডসেট নির্মাতারা নতুন সুযোগ সুবিধে দেওয়া শুরু করল যেমন ব্রাউসিং এর সাথে সাথে ইমেল বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং । অসুবিধে হল একটাই । এই সব আকর্ষণীয় সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করতে গেলে যতটুকু তথ্য বিনিময় করতে হয় সেটি2Gপরিষেবা প্রযুক্তি সামাল দিতে পারল না । পরিষেবা প্রযুক্তি আরো একধাপ এগুলো ।

2Gগন্ডী পেরিয়ে এইবার মাঠে নামল3Gবা তৃতীয় জেনারেশান মোবাইল পরিষেবা।3Gপরিষেবার বিশাল তথ্যবহনকারী ক্ষমতাকে উপযুক্ত কাজে লাগানোর জন্য হ্যান্ডসেট প্রযুক্তি উন্নত হল;আইফোন এবং এন্ড্রয়েড ভিত্তিক মুঠোফোন বাজারে ছেয়ে গেল । এই আইফোন বা এন্ড্রয়েড ভিত্তিক স্মার্টফোনগুলি আদতে এক একটি ন্যানো কম্পিউটার যা ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের তুলনায় কোনো অংশে কম নয় ।

3Gবা2Gপরিষেবা ব্যবহার করে ইন্টারনেটের সমস্ত সুযোগ সুবিধে যেমন ফেসবুক,ইউটিউব,গুগল ম্যাপস,গুগল সার্চ,জি মেল,ট্যুইটার ও অসম্ভব মনোরঞ্জন কারক গেম গ্রাহকের হাতের মুঠোয় পৌঁছে গেল ।3Gতথ্যবহনকারী ক্ষমতার পরিষেবা থাকলে সুবিধা বেশী কিন্তু পুরোণো2Gতেও কাজ চলতে লাগল । এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কম্পিউটারের দুটো অসুবিধে । তার ছোট স্ক্রিন আর ছোট কিবোর্ড ।

কিন্তু'কুছ খোয়া কুছ পায়া'। কিন্তু কেয়া পায়া?

যদি বলি"নখদর্পণ" ?কারণ কিবোর্ডের অভাবে এখন সমস্ত হ্যান্ড সেট নির্মাতারা অত্যাধুনিক টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি এনে দিয়েছেন যার ফলে আঙুলের একটুকু ছোঁয়াতেই নদী-পাহাড়-সমুদ্র আমাদের নখদর্পণে ।

প্রাচীনকালে যে অলৌকিক বিদ্যার সাহায্য নিয়ে কোনো দূরের বস্তু বা ব্যক্তির প্রতিবিম্ব নিজের নখে প্রতিবিম্বিত করে দেখার গল্প শোনা যায় সেই কি এই প্রযুক্তি?

তুফানি আড্ডার ফাঁকে,সেদিনের তিথি নক্ষত্র নিয়ে তুমুল তর্ক বেঁধে গেলে,সন্দেহ নিরসনের কায়দায় এই মুঠোফোনটি পঞ্জিকার ভূমিকাও পালন করতে পারেল হিন্দু ক্যালেন্ডার এপ্লিকেশনটির কৃপায় ।

"ইউরেকা"বলে জিতে গিয়ে বলেও দিতে পারেন"হাতে পাঁজি মঙ্গলবার" !

বেড়াতে গিয়ে সমুদ্রের ধারে সূর্যোদয় দেখার কাঙাল আমি । কিন্তু ভোরের ঘুমও যে ছাড়েনা দুচোখকে । তাই গুগল সার্চ করে টাইম এন্ড ডেট ডট কম থেকে সানরাইজ@পুরী পেয়ে গেলাম আগের দিন রাতে । ঐ স্থানের সূর্যোদয়ের নির্ঘন্ট জেনে রেখে ঘড়িতে এলার্ম । ফলে সমুদ্রের ধারে গিয়ে ঘুমচোখে সূর্যদেবের আরাধনা করতে হ'লনা । আমি গেলাম সময়মত । উনিও টুক করে উঠে আমাকে দেখা দিলেন । রঙ ছড়াতে শুরু করলেন আকাশের ভাঁজে ভাঁজে ।

মনে মনে বললাম "ভাগ্যি স্মার্টফোন ছিলি আমার হাতে"!!!

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়, দিন আগত ঐ! 
ক্রমে খুলে যাচ্ছে  2G জট। 3G হাতের মুঠোয়। আর 4G ধরে ফেলেছে তাদের।  নেটওয়ার্কের মধ্যে আমরা ক্রমশঃ প্রবেশ করে যাচ্ছি। বদলে যাচ্ছে জীবন।