১৪ নভেম্বর, ২০১৫

ভাইফোঁটা


কার্তিকের শুক্লা প্রতিপদ কিম্বা দ্বিতীয়া । নরকাসুর বধ করে কেষ্টাদা সবেমাত্র ফিরেছেন ঘরে। বোন সুভদ্রা দাদার মুড বুঝে নিল চটপট। আগের দিন দেওয়ালির রান্নাঘর থেকে ঘিয়ের গন্ধ তখনো পুরোপুরি যায়নি চলে। রান্নাঘরে গিয়ে দুখানা মুচমুচে নিমকি, গোটাকতক ম্যাওয়া কুচোনো লাড্ডু, সোহন পাপড়ি আর এক ভাঁড় রাবড়ি এনে দাদার মুখের সামনে ধরল। কেষ্টদা তো মহা খুশি। একে মিশন সাকসেসফুল...দুষ্কৃতের বিনাশ করে সাধুদের পরিত্রাণ করতে চলেছেন বলে মহা ফূর্তি মনে আর দুই দেওয়ালির সুহাগ রাতে অগণিত গার্লফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে ছাদে গিয়ে কখন ফষ্টিনষ্টি করবেন সেই অহ্লাদে ভরপুর তাঁর মেজাজ। বিদ্যুতলতারা সকলে শৃঙ্গারে ব্যস্ত তখন। কেউ কেতকী-কুর্চি-কদম্ব প্রলম্বিত জলে স্পা নিচ্ছেন। কেউ আবার কর্পূর-কেওড়া-অগরুর জলে গাত্রমার্জনা করে সুগন্ধা হচ্ছেন। কেউ ধূপের ধুনোয় কেশ শুষ্ক করে ফুলের মালা জড়াতে ব্যস্ত।

কেষ্টদার দুই গৃহিণী সত্যভামা আর রুক্মিনী বৌদির মেজাজ একটু ক্ষেপে আছে আজ। একে বহুদিনের অদর্শণে প্রাণের ভেতরটা আঁকুপাঁকু অন্যথায় আসামাত্র‌ই ননদিনী সুভদ্রা কেষ্টদাকে চিলের মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে গেল তাদের কাছ থেকে। তারপর যদিও ননদিনী ছাড়বে তাদের কর্তামশায় তো এবার যাবেন ছাদের ওপর কিম্বা নদীর তীরে। একে কার্তিকের আকাশে রাসপূর্ণিমার হাওয়া ব‌ইল বলে !
সুভদ্রা বলল, দাদা মনে আছে কালকের কথা? এবারে কিন্তু আরো বড় উপহার চাই। ঐ ময়ূরের পালক, কদমফুলের আর্মলেট আর জাঁতিফুলের মুকুটে কিন্তু চলবেনা বলে দিলাম। এবার ডাবল ধামাকা কিন্তু। একে ভাই ফোঁটা তায় নরকাসুর বধ হয়েছে। অতএব ট্রিট চাই বস!
কেষ্টাদা মুখটা বেঁকিয়ে বললেন, তা আমাকেই বা কেন বধ করা বারেবারে? আরো একজন দাদাও তো আছে নাকি। সুভদ্রা বলল, তুমি তো গেছ নরকাসুর নিধন করতে। বলরাম দাদা? তিনি তো দ্রাক্ষারসে অবগাহন করে পড়ে রয়েছেন সেই ধনতেরস থেকে।

কেষ্টাদা প্রমাদ গনলেন। চটপট স্মার্টফোনে দেখে নিলেন ব্যাংকে কিছু পড়ে আছে কিনা। সুভদ্রাকে বললেন, ঠিক হ্যায় তব। মানাও ভাই দুজ, ঘটা করে ভাইফোঁটা হোউক! !!!

রুক্মিনী, সত্যভামা বৌদিদ্বয় শশব্যস্ত হয়ে গাত্রোত্থান করে বাজারের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।হাজার হৌক রান্নাবাটিতো তাদেরি করতে হবেক। আরতো সকলে সুখের পায়রা! যদি আবার নন্দাই বাবু অর্জুন এসে পড়েন তাহলে আর কথাই নেই! জামাই বলে কথা! বৌদিরা আবার নন্দাইকেও ভাইফোঁটা দেয়।

১২ নভেম্বর, ২০১৫

দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো


কালীপুজোর অমাবস্যার দিনে পশ্চিমবঙ্গীয়দের রীতি  দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো করার। ব্রতকথা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম অনেক কিছু। লক্ষ্মীপুজো করলেই যে অর্থাগম হবে, ঐশ্বর্য্যপ্রাপ্তি হবে এ বিশ্বাস আমি করিনা তবে সব ধর্মের মূল কথা "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর" এই আপ্তবাক্যটি আমি মানি। আর গল্পটি এযুগেও বেশ যুক্তিসম্মত বলে মনে হল। কারণ আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। ঈশ্বর, মানুষ, পুজোআর্চা এসবকিছুই  তো মানুষের মনগড়া। এই অনুষঙ্গগুলি জীবনযাপনের উপলক্ষ্যমাত্র। 

দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো ব্রত কথা
 
এক রাজার পাঁচ মেয়ে ছিল। একদিন সকলকে একত্র করে রাজা তাঁদের জিগেস করলেন, তোমরা কে কার ভাগ্যে খাও? ছোটমেয়েটি অত্যন্ত সপ্রতিভ উত্তর দিল।

সে বলল "মা লক্ষ্মী খাওয়ান আমাদের। মানুষের কি সাধ্য যে সে নিজে খাবে। মানুষতো উপলক্ষ্য মাত্র। আমরা সকলেই নিজের ভাগ্যে খাই বাবা"

কন্যার কথায় রাজা তো অগ্নিশর্মা। সাথেসাথে তিনি জ্বলে উঠে বললেন, "রাজার মেয়ে তাই কিছু বুঝতে পারলিনা। এ জীবনে অর্থ, যশ প্রতিপত্তির জোরেই আমরা সকলে বেঁচে আছি। ঠিক আছে, ভালো কথা। কাল সকালে আমি যার মুখ আগে দেখব তার সাথে তোর বিয়ে দেব। তখন দেখব তুই কি করে আর কার ভাগ্যে খাস"

রাণী সেই কথা শুনতে পেয়ে প্রমাদ গনলেন। রাজপুরীতে সকলকে সাবধান করে দিলেন, কেউ যেন পরদিন রাজবাড়ির মুখো না হয় আর রাজধানীর সব দোকানপাট সব বেশ বেলায় খোলার পরামর্শ দিলেন। যাতে রাজার চোখের সামনে কোনো ব্যক্তি এসে পড়ে। প্রজারা ঢেঁড়া পিটিয়ে সেই খবর চালু করে দিল। সেই কথা জানতে পেরে অন্য একপ্রদেশের গরীব বামুন তার ছেলেকে সঙ্গে করে চুপিচুপি রাজ অন্তঃপুরে এসে লুকিয়ে থাকল সেদিনের মত। পরদিন ঘুম ভাঙতে রাজার চোখে পড়ল সেই গরীব বামুনের ছেলেটি। রাজা তাঁর ছোটমেয়ের বিয়ের আয়োজন করলেন সেই ছেলের সাথে আর বিদায়বেলায় মেয়েকে বললেন, "দেখি এবার কেমন তুই নিজের ভাগ্যে খাস!”

গরীব বামুন রাজকন্যাকে ছেলের বৌ করে, পুত্র আর বৌমাকে সাথে নিজের কুঁড়েতে ফিরে এল। রাজকন্যা স্বামী-শ্বশুরকে বলে রাখল, যখনি তারা বাড়ির বাইরে থেকে ঘরে ফিরবে রাস্তায় যা পাবে তা যেন কুড়িয়ে নিয়ে আসেন, খালি হাতে যেন না ফেরেন। একদিন বামুন ফেরার পথে রাস্তায় একটি মরা কালকেউটে পড়ে থাকতে দেখল। সেটিকে ঘরে এনে রাজকন্যাকে দেখালো। রাজকন্যা বললে ওটিকে ঘরের চালে ফেলে রাখুন, কাজে আসবে। এবার সেদেশের আরেক রাজার ছেলে কঠিন অসুখে পড়েছে। রাজবৈদ্য এসে জানালো কালকেউটের মাথাটা পেলে তিনি রাজপুত্রকে সারিয়ে তুলতে পারেন। রাজা ঢেঁড়া পিটিয়ে খবর করলেন, যে ব্যক্তি তাঁকে মরা কালকেউটের মাথা দিতে পারবে সে যা চাইবে তাই পাবে।

রাজকন্যা সেই কথা শুনে শ্বশুরকে বললে, "ঢ্যাঁড়াদারদের ডেকে আমাদের ঘরের চালে যে মরা কেউটে রাখা আছে তার মাথাটা রাজাকে দিয়ে আসুন তবে তার বিনিময়ে কিছু চাইবেননা"

রাজবৈদ্য সেই মরা কেউটের মাথা থেকে ওষুধ তৈরী করে রাজ্পুত্রকে তা খাওয়াতে সে সুস্থ হয়ে উঠল। রাজা মহা খুশিতে বামুনকে ডেকে পাঠালেন। যাবার আগে রাজকন্যা শ্বশুরকে বলে দিল যে কার্তিকমাসের অমাবস্যা তিথিতে রাজধানীর কোথাও যেন বিন্দুমাত্র আলো না জ্বলে। এইকথাটুকু রাখলেই হবে, বিনিময়ে কিছু চাইনা তাদের। বামুন সেকথা রাজাকে জানালো। রাজা বললেন কার্তিকমাসের অমাবস্যায় রাজধানীতে যেন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার থাকে। যে আলো জ্বালাবে তাকে দন্ড পেতে হবে।

এদিকে রাজকন্যা সেদিন নিজে উপোস করে তার কুঁড়েটি গোবর দিয়ে নিকিয়ে পিটুলিগোলার আলপনা দিয়ে ফুলচন্দন-মালা, ধূপ-ধুনো দিয়ে যতসামান্য আয়োজনে মালক্ষ্মীর জন্য ঘট পেতে তাঁর আগমনের অপেক্ষায় বসে র‌ইল।

ঐদিনে সর্বত্র ঘোর আঁধার আর রাজকন্যার কুঁড়েতে প্রদীপের আলো জ্বলা দেখে মালক্ষ্মী সেখানে অবতরণ করলেন। তুষ্ট হয়ে নিজের পায়ের নূপুরটি রেখে গেলেন কমলাসনে। এরপর যা হয় বামুনের ঐশ্বর্য আর দেখে কে! ধীরে ধীরে তাদের মালক্ষ্মীর কৃপায় অবস্থা ফিরে গেল। একদিন বামুন ঠিক করল বাড়ির পাশে একটি পুকুর কাটাবে। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিনে দলেদলে লোক এল। রাজকন্যা জানলা দিয়ে হঠাত দেখতে পেল তার একদা রাজ-চক্রবর্তী বাপকে। তিনি আজ হতদরিদ্র। পুকুর খননের কাজে এসেছেন তাদের গ্রামে। পুকুর খননের কাজ শেষ হলে রাজকন্যা সকলকে খাওয়ালে। দরিদ্র পিতাকে যখন ভাত বেড়ে দিতে যাবে তখন তিনি কেঁদে বললেন, আমার ঠিক তোমার মত একটি মেয়ে ছিল। এদ্দিনে সে কোথায় আছে, কেমন আছে কিছুই জানিনা আমি। রাজকন্যা বাবার কন্ঠস্বর চিনে ফেলেছে এর মধ্যে। বাবাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললে, বাবা, তুমি যে আমায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছিলে , এই দ্যাখো আমি কেমন এখনো নিজের ভাগ্যেই খেয়ে পরে বেঁচে আছি। সেই পরীক্ষার শেষ হয়েছে বাবা। দরিদ্র বাপ তখন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোর কথাই ঠিক মা, আজ আমি নিজের অহঙ্কারে সর্বস্বান্ত। সত্যি‌ই বলেছিলি তুই। মানুষ নিজের ভাগ্যেই খায়।অর্থ-যশ-প্রতিপত্তি থাকলেই হয়না রে। মানুষের ভাগ্য‌ই মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। নয়ত আমি আজ ফকির হয়ে গেছি আর তুই আজ রাজরাণী! ঈশ্বরবিধাতাই সব মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন।

রাজকন্যা বললে, "বাবা এবার থেকে তোমার ঘরে কার্তিকমাসের অমাবস্যার দিনে লক্ষ্মীপুজো করো। আবার তোমার হৃত ঐশ্বর্য্য সব ফেরত পাবে।"

......
শেষলাইনটি কতটা সত্যি জানিনা তবে ভাগ্যে আমিও কিছুটা বিশ্বাসী। আর তোমরা?

১১ নভেম্বর, ২০১৫

কালী কালী বলো রে আজ...

  • কালী কালী বলো রে আজ...

দুর্গাপুজো নিয়ে মাতামাতি কাটতে না কাটতেই  আবারো উত্সবের প্রস্তুতি সারা দেশ জুড়ে। কার্তিকমাসের অমাবস্যা যত এগিয়ে আসে তত‌ই উন্মাদনা বাড়তে থাকে। বাজারহাটের  উপহার কেনাবেচা, দেওয়ালীর পসরা, বাজি-উত্সব, ভূতচতুর্দশী, কালীপুজোর দশকর্ম্ম, আবার ঐদিনে অলক্ষ্মী বিদায়ের তোড়জোড়, এক‌ই সাথে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজোর প্রস্তুতি, আলোর উত্সব, মিলন উত্সব সবকিছু নিয়ে বাঙালী-অবাঙালী নির্বিশেষে যেন রমরমা তখন আকাশে বাতাসে।

দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধের পর ফিরে গেছেন কৈলাসে। দেবতারা মহাখুশিতে তাঁকে স্তবমন্ত্রে বন্দনা করলেন। বললেন, ভবিষ্যতে আবারো যদি দেবকুল বিপদে পড়ে তবে আপনি আবার আমাদের বিপন্মুক্ত করবেন। দেবী সুপ্রসন্না হয়ে বললেন,"তথাস্তু"  । এরপর বেশ কিছু যুগ কেটে গেল নির্বিঘ্নে। শুম্ভ আর নিশুম্ভ আবারো উত্পাত শুরু করল দেবলোকে।  দেবতারা আবার দেবীর তপস্যা করতে লাগলেন। জাহ্নবীর জলে স্নানরতা দেবী পার্বতী তখন তাঁর দেহের কৃষ্ণকোষগুলি ত্যাগ করছিলেন। আর সেই কৃষ্ণকোষ দিয়ে আবির্ভূতা হলেন দেবী কৌষিকী। অতি সুন্দরী কৌষিকীর গায়ের রং হল নীলচে। পার্বতী দেবগণের কাছে তখন দেবী কৌষিকীর মহিমা বর্ণনা করলেন। শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের জন্য দেবীর স্বীয় শরীর থেকে সৃষ্ট এই দেবী যে কতখানি ক্ষমতার অধিকারিণী তা দেবতারা কার্যকালে জানতে পারলেন। এই কৌষিকীদেবী‌ই দেবী কালিকা বা কালী নামে পরিচিতা। কালের দেবী এই কালী। যুগ যুগান্ত ধরে ভারতবর্ষের কোণায় কোণায় শক্তিসাধনার প্রতীকরূপে বন্দিতা।


সদানন্দময়ী কালী মহাকালের মনমোহিনী তুমি আপনি নাচ, আপনি গাও, আপনি দাও মা করতালি...

এই কালীকে তন্ত্রে বিশ্বমাতৃত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কারণ মহামায়ার এইরূপটি বিশ্বের মানুষের চেতনার চৈতন্যস্বরূপিণী। এই মহাকালী একাকিনী-অসঙ্গা-আনন্দস্বরূপা। নিজেই নিজের স্বরূপে বিমোহিতা।

কালী নিয়ে বহু কাহিনী প্রচলিত। মাদুর্গার স্প্লিট পার্সোনালিটি। কখনো গৌরী কখনো শ্যামা। যখন যেমন তখন তেমন। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা তাঁর। গৌরী হল তাঁর আদুরে, স্বামী সোহাগিনী রূপ। শ্যামা হল পুরুষসংসর্গরহিত করাল রূপ। দক্ষরাজের মহাযজ্ঞে পতি নিন্দা শুনতে না পেরে মনের দুঃখে সতী দেহত্যাগ করেছিলেন। হিমালয় পত্নী মেনকা আবারো এক কন্যার জন্য  তপস্যা শুরু করলেন। যথাসময়ে মেনকার গর্ভে এক অপরূপা কন্যাসন্তান জন্মালো। এই কন্যা সুন্দরী হলেও তার গায়ের রং ছিল নীলপদ্মের মত শ্যামবর্ণের। কন্যার গাত্রবর্ণ দেখে গিরিরাজ নাম রাখলেন কালী। যথাসময়ে কালীর সাথে শিবের বিবাহ হল।

শ্রীশ্রীচন্ডীতে আছে অন্য কাহিনী। মহিষাসুরকে বধ করার পর দেবী দুর্গা দেবতা, মানব সকলকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন যখন তোমরা বিপদে পড়বে  তাঁকে স্মরণ করলেই তিনি আবারো দস্যুবধে অবতীর্ণ হবেন।  এদিকে আবার বহুযুগ পর কাশ্যপমুনির স্ত্রী দনুর গর্ভে শুম্ভ আর নিশুম্ভের জন্ম হল। যৌবনে দুইভাই তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেল যে তাদের কোনো দেবতা বা মানব বধ করতে পারবেনা । তারা অজেয় হয়ে উঠল। তাদের দৌরাত্ম্যে আবারো সমগ্র দেবকুল ক্ষেপে উঠল। দেবতারা দেবী দুর্গার স্মরণ নিলেন। ইতিমধ্যে গঙ্গায় স্নান কালে দেবী পার্বতী তাঁর শরীরের কৃষ্ণকোষগুলো থেকে একটি অপূর্ব দেবীমূর্তি  তৈরী করলেন। এই নীলাভরংয়ের দেবী মূর্তির নাম কৌষীকি বা কালী। এই করালবদনা কালিকা হিমালয়ে বেড়াচ্ছিলেন।  হঠাত চন্ড আর মুন্ডের নজরে এল এই অসামান্য দেবীমূর্তির রূপ। জনবিরল স্থানে এমন নারীমূর্তিকে দেখে শুম্ভ-নিশুম্ভকে তারা দেবীমূর্তির কথা জানালো। শুম্ভ-নিশুম্ভর তা শুনে জেদ চেপে গেল।  বললে, ঐ নারীকে তাদের সামনে যেকোনো মূল্যেই হাজির করা হোক। তাঁকে তারা  বিয়ে করতে চায়। চন্ড-মুন্ড দেবীকে সেইকথা জানাতেই  দেবী বললেন, ছোটবেলায় তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে পুরুষ তাঁকে যুদ্ধে হারাতে পারবে তাকেই তিনি স্বামীরূপে বরণ করবেন।   শুম্ভ সেইকথা শুনে আরো রেগে গিয়ে দেবীর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হল।

শুম্ভ দেবীর দিকে ছুটে যেতেই তাঁর কৃষ্ণবর্ণের ভ্রুকুটিদ্বয়এর মধ্যস্থিত কপালের অংশ থেকে খড়্গধারা, পাশহন্তা কালী নির্গত হলেন  ।  নরকঙ্কালধারিণী, নরমুন্ডমালা পরিহিতা ভীষণা, লোলজিহ্বা, বিশাল মুখমন্ডলে কোটরাগত রক্তিম চক্ষু দেখে ভয়ে দানবকুল  বেগে পলায়ন করল।  দেবীর এই রূপটি হল দশমহাবিদ্যার অন্যতম রূপ যা কালী নামে পরিচিত। এই সেই ভয়ানক দেবী যিনি কোনো কিছু অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননা। এই সেই কালের উপাস্য দেবী যাঁর একহাতে বরাভয় অন্যহাতে নরমুন্ড। পিশাচ-পিশাচী ঘিরে থাকে এই দেবীকে। অমাবস্যা যাঁর অতিপ্রিয়। শ্মশানেমশানে যিনি ঘুরে বেড়ান মনের সুখে।   অন্যহাতে সুখ আর বাকী হাতটিতে দুঃখ নিয়ে যিনি দেখান ভানুমতীর খেল। সৃষ্টি আর লয়ের সব রহস্য যাঁর জলভাত সেই কালের দেবী কালী। 

বিন্দুতে মা'র সিন্ধুখানি,  ঠিকরে পড়ে রূপের মানিক, বিশ্বেমায়ের রূপ ধরেনা, মা আমার তাই দিগবসন, দেখে যা আলোর নাচন...

ষোড়শ শতাব্দী (১৫০০ সালে) নবদ্বীপে মাতৃসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ প্রথম কালীর মূর্তি গড়ে পুজো করেছিলেন। তাঁর মাতৃসাধনার চরম মূহুর্তে ইষ্টদেবীর একটি রূপ তাঁর মনে ধরা দিল। নিরাকার দেবীকে নিয়ে আরাধনা আর ভালো লাগছিলনা তাঁর।  এক অমাবস্যার নিশ্ছিদ্র অন্ধকার রাতে শ্মশানে ধ্যানমগ্ন কৃষ্ণানন্দের চেতনায় দেবী এসে ধরা দিলেন। নিরাকার দেবীর সাকার রূপ দেখতে পেলেন সাধক। অনাবিল পরিতৃপ্তিতে কৃষ্ণানন্দের দুইচোখ ভেসে গেল জলে। দেবী বললেন "বাছা, ভোর হলেই চোখ খুলে তুমি যেরূপ স্ত্রীলোকের মূর্তি সর্বপ্রথম দেখতে পাবে তেমনি মূর্তি গড়ে আমার পূজাপাঠ করো।"  কৃষ্ণানন্দ ভোর হতেই আসন ত্যাগ করে লোকালয়ের দিকে পা বাড়াতেই প্রথমেই দেখতে পেলেন অন্ত্যজশ্রেণীর স্বল্পবসনা  এক কালোমেয়েকে। যার শাড়িটি বেশ উঁচু করে পরা।  খোলাচুলে দুহাতের একটিতে একতাল গোবর ও অন্যহাতে সেই গোবর থেকে কিছুটা তল নিয়ে যেন ঘুঁটে দেবার জন্য প্রস্তুত সে।তার একটি পা মাটিতে আর অন্য পা'টি ঘরের উঠোনের মধ্যে । কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় সেই মেয়ে জিভ কাটলে। সাধক ভাবলেন "এই তো সেই মাতৃরূপ! যা তিনি হাতড়ে বেরিয়েছেন এতদিন ধরে, এই মেয়ের মতোই হবে দেবীমূর্তির রূপ।" মস্তিষ্কে তাঁর বৈদ্যুতিক শিহরণ খেলে গেল।

এবার প্রশ্ন হল আমরা যে কালীমূর্তির পুজো করি তিনি নগ্না, দিগবসনা। সন্তানদের হাত দিয়ে তৈরী মেখলা বা কোমরবন্ধনী পরিহিতা। কৃষ্ণানন্দতো শাড়ী পরিহিতা মেয়েকে দেখেছিলেন তবে কেন এমন হল?
ইতিহাস, পুরাণ, লোকগাথার ভিন্ন ভিন্ন কাহিনী অনুধাবন করলে জানা যায় দেবীমূর্তির ভিন্ন ভিন্ন উত্পন্নের কথা। কালীমূর্তির অদ্ভূত বৈশিষ্ট্যগুলি সেখানে প্রকট। তাঁর লাল টুকটুকে জিভটি বের করে রাখা হল পন্ডিতদের মতে রজোগুণের প্রতীকস্বরূপ। যুদ্ধে উন্মত্ত দেবী সেই লাল জিভ শুভ্র দাঁতগুলি দিয়ে চেপে রেখেছেন যা তাঁদের মতে সত্ত্বগুণের প্রতীক। অর্থাত সত্ত্বগুণ দিয়ে রজোগুণকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন দেবী।  দেবীর গলায় একান্নটি মুন্ডমালা বর্ণমালার একান্নটি বর্ণের প্রতীক। তাঁর আলুলায়িত, কুঞ্চিত  ও মুক্ত কেশরাজি মানুষের অন্যতম ষড়রিপু মোহের প্রতীক। তাঁর একহাতে খড়গ হল শত্রুদলনের প্রতীক আর অন্যহাতে বরাভয় হল শান্তির প্রতীক, সন্তানের পালিতা রূপ। দেবী বাইরে করালরূপিণী, ভয়ঙ্করী কিন্তু অন্তরে স্নিগ্ধা, সন্তান বাত্সল্যে উন্মুখ।তাঁর কটিবন্ধে মেখলার মত হাত ঝুলতে দেখি। এগুলি বোধহয় মানুষের কর্মফল স্বরূপ যা আমরা সঁপে দিয়েছি দেবীর কাছে। 

আর তিনি দিগবসনা অর্থাত নগ্না।  তার কারণ স্বরূপ বলি, আমরা বাইরে থেকে শাড়ী জড়ানো সকল দেবীমূর্তির যে রূপ দেখি তা কল্পনাপ্রসূত। আবরণ ও আভরণের মোড়কে দেবীর আসল রূপটি চাপা পড়ে যায়। যেমন পরম ব্রহ্মের অরূপ-স্বরূপ সবটুকুনি‌ই মায়ায় আবৃত।  সেই অমোঘ মায়াজালকে ছিন্ন করে পরম ব্রহ্মের স্বরূপটি উপলব্ধি করতে পারি, কালীমূর্তির নিরাবরণ রূপটিও কালীর আসল ভাব ও তাত্পর্যকে  ফুটিয়ে তোলে। আবার তাঁর ব্যাপ্তিটি এত‌ই অসীম ও আদিগন্ত যে কোনো কিছু ঐহিক আবরণে তাঁকে ঢাকা দেওয়া যায়না। তাই বুঝি এক মাতৃসাধকের কথায়,

"মা আমার নয় খড় জড়ানো, নয় মাটির উপর রং মাখানো।
বিশ্বজোড়া মূর্তিমায়ের আকাশেতে প্রাণ জড়ানো।" 


  • অন্ধকারের উত্স হতে উত্সারিত আলো...

পুরাণকথায় পাই দেবী কালী নাকি কার্তিকমাসের এই চতুর্দশীর রাতে ভয়ানক অত্যাচারী নরকাসুরকে বধ করেন। তাই তামিলনাডুতে এই চতুর্দশীর রাতেই দীপাবলি পালিত হয়। কিন্তু অন্য সব রাজ্যে পরের দিন অর্থাত অমাবস্যার রাতেই কালীপুজো হয়। গোয়ায় নরকাসুরের কুশপুত্তলি পোড়ানো হয় মহা সমারোহে। কাগজের তৈরী এই কুশপুতুলে নানারকম বাজি বেঁধে তাতে অগ্নিসংযোগ করে জ্বালানি হয়। কারণ কিংবদন্তীর কড়চা বলে গোমন্তেশ্বর বা গোয়াতেই নাকি নরকাসুরের দাপট অতিবৃদ্ধির জন্য স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তা রুখতে সেখানে হাজির হন সুদর্শন চক্র সমেত। তবে নরকাসুর বলি হন মা কালীর হাতে।

গুজরাট, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র উত্তরপ্রদেশ সহ সর্বত্র দেওয়ালী পালন করা হয় আলোর উত্সব, ধনতেরস ইত্যাদির সাথে । আত্মীয় বন্ধুদের সাথে উপহার আদানপ্রদান হয়, মোমবাতি, প্রদীপের আলো দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয়।

দক্ষিণ ভারতে যেমন নরকাসুর বধের আনন্দোত্সব হল দীপাবলী উত্তর ভারতে রামচন্দ্রের রাবণ বধ করে অযোধ্যায় ফিরে আসার বিজয়োত্সব।আলো দিয়ে অযোধ্যা নগরীর কোণা কোণা সাজানো হয়েছিল। তাই আলোর উত্সব দীপাণ্বিতা বা দীপাবলী বা দেওয়ালি। মূল কথা আলো আর তাকে কেন্দ্র করেই নতুন পোষাক, সুখাদ্য আর উপহার আদানপ্রদান। সেই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীকা, কামরূপ থেকে কাথিয়াবাড় সর্বত্রই অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির বরণোত্সব হল দীপাবলীর মদ্যা কথা।

ধনাগমের জন্য মানুষ করে ধনতেরস ও লক্ষ্মী-গণেশের পুজো। মূল উদ্দেশ্য একটাই। শ্রীবৃদ্ধি আর উন্নতি। আলোয় আলোয় সব ঘুচে যাক্‌, মুছিয়ে দে মা মনের কালি।
 সংসারে সারাবছর যাতে শ্রীবৃদ্ধি হয়, ধনাগম হয় সেই আশায় । লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজো হয় । পিটুলি বাটা দিয়ে মা তাঁর নিপুণ হাতে তৈরী করেন তিন পুতুল.... সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী পুতুল, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল নারায়ণ পুতুল, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের পুতুল । কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন । আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী । চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয় ।
চাটাই বাজাতে বাজাতে বলা হয়,
"অলক্ষ্মী বিদেয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক্" আসলে কুললক্ষ্মী তথা ভাগ্যলক্ষ্মীর পুজো এই দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো। সূর্যাস্তের আগেভাগে প্রদোষকালে হয় অলক্ষ্মীর পুজো। তারপর শুরু হয় দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীর পুজো। ব্রতকথা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম  ঈশ্বর, মানুষ, পুজোআর্চা এসবকিছুই  তো মানুষের মনগড়া। এই অনুষঙ্গগুলি জীবনযাপনের উপলক্ষ্যমাত্র। উপযুক্ত চেষ্টা এবং ভাগ্যের জোরে মানুষের সংসারে শ্রীবৃদ্ধি হয়। যাকে আমরা বলি লক্ষ্মীর আগমন। তাই ভাগ্যলক্ষ্মীকে বরণ করা হয় দীপাণ্বিতার দিনে।  

১০ নভেম্বর, ২০১৫

ভূতচতুর্দশী

  • আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে....

কোজাগরীর ঘোর কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর পরদিনেই ভূতচতুর্দশী। শুক্লপক্ষে আকাশ আলো করা রূপোর থালার মত চাঁদ, হিম ঝরানো জ্যোত্স্না আর শারদীয়ার মনখারাপ। দিন পনেরো কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণপক্ষের সূচনা। ভূত চতুর্দশীর প্রস্তুতি। অল সোলস ডে যাপিত হচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়ে। আত্মার দিন বা প্রেতাত্মার দিন।আমেরিকার হ্যালোউইন আর ভারতবর্ষের আকাশ প্রদীপ জ্বলা ভূত চতুর্দশীর ঘোর অন্ধকার। সেই পূর্ণিমার চাঁদ এখন ঘুমোতে গেছে। ঝুপসি অন্ধকার আকাশের গায়ে। শহরে অবিশ্যি আসন্ন দীপাবলীর আলোর রোশনাই আর আকাশছোঁয়া ঘরবাড়ির আলোয়, বাজির গন্ধকী গন্ধে ভরপুর বাতাস। হিমের পরশ, ঝিমধরা নেশাগ্রস্ত ... ঋতু বৈচিত্র্যময়তায় । কার্তিক মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী। আকাশের ফুটফুটে তারা সেই অন্ধকারে দৃষ্টিগোচর হয়। হ্যালোউইন পালিত হয় সেদেশে মৃত আত্মার শান্তি কামনায়। ঠিক যেমন আমরা আমাদের মহলায়ায় প্রিয়জনের মৃত আত্মার প্রতি স্মৃতিতর্পণ জানিয়ে পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের শুরু করি।
মহালয়ার পনেরো দিন আগে পিতৃপক্ষের সূচনায় দেবলোক থেকে মর্ত্যে অবতরণ করেছিলেন তাঁরা।

পিতৃপুরুষকে স্মরণ করে  তাঁদের পিন্ডদান, তর্পণ করে আত্মার তৃপ্তিদান করেছিলাম আমরা। ঠিক একমাস পরের অমাবস্যায় তাঁদের আবার স্বর্গে ফিরে যাবার কথা। তাঁদের যাত্রাপথকে আলো দেখানোর জন্য এই একমাস আকাশপ্রদীপ জ্বলেছে প্রতিবাড়ির ছাদে। এবার তাঁদের যাত্রাপথকে আলোকিত করার জন্য দীপাবলী উত্সব। তাঁরা আবারো শান্তিতে আলোয় আলোয় ফিরে যাবেন স্বর্গলোকে।  ভূত চতুর্দশীর অন্ধকারে মৃত আত্মারা নাকি ঘুরে বেড়ায়। তাদের আত্মার শান্তি কামনায় চৌদ্দ রকম শাক (ওল, কেঁউ, বেতো, সরিষা, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাটঁপাতা, সুষণী ) ভেজে খাওয়ার রীতি। আর সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির আনাচে কানাচে চৌদ্দ প্রদীপ জ্বালার নিয়ম। কোথাও যেন কোনো অন্ধকার না থাকে। বৈদিক মতে এর ঠিক একমাস আগে মহালয়ার দিন পরিবারের আত্মীয় বন্ধুদের মৃত আত্মার শান্তি কামনা করে তর্পণ করা হয় তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। আবার তন্ত্র মতে ঠিক এক মাস পরে এই কার্তিক অমাবস্যার আগের দিন মৃত আত্মাদের আলো জ্বালিয়ে স্মরণ করা হয়। মূল কথা একটাই ,তোমরা সুখে থাকো, ভালো থাকো। কারো কোনো অনিষ্ট কোরোনা।

৯ নভেম্বর, ২০১৫

ধন-তেরস

আকাশে বাতাসে ধ্বনির ত্রাস, পালন করছি ধন-তেরস 
ধন কিনতে পকেট হ্রাস, সোনারূপোয় গিলছি গ্রাস  !   

  • সকল দ্বন্দ বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো, সেই তো তোমার ভালো....

সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চতুর্দশীর আগের দিন অর্থাত ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস নামে উত্সব পালন হয় । পুরাণের গল্পে আছে সমুদ্রমন্থনের সময়কালীন এক গল্প। ঐশ্বর্যের ভারে অহংকারী দেবরাজ ইন্দ্র সকলকে খুব হেয় করছিলেন। একদিন দুর্বাশা মুনি তাঁর গলার পারিজাতের মালাটি অত্যন্ত স্নেহের সাথে হাতির পিঠে চড়া ইন্দ্রকে গলায় পরিয়ে দিতে যান। মালাটি ইন্দ্রের গলায় না পড়ে হাতির দাঁতের ওপর গিয়ে পড়ে ও হাতি ততক্ষণাত সেই মালাটিকে শুঁড়ে করে মাটিতে ফেলে দেয়। তা দেখে দুর্বাসা অতীব ক্রুদ্ধ হন ও দেবরাজকে "লক্ষ্মী চ্যুত হও" এই বলে অভিশম্পাত করেন। মুনির এই অভিশাপে দেবরাজ ইন্দ্র অসুরদের পরাজয় লাভ করেন ও রাজ্য, সিংহাসন, লোকবল সব হারান। অসুররা তখন স্বর্গের মালিকানা পান ও লক্ষ্মীদেবী সহ সমগ্র দেবতাকুল পালিয়ে গিয়ে সমুদ্রের অতলে আশ্রয় নিলেন। দেবকুলের এহেন সমূহ বিপদে দেবরাজ ইন্দ্র প্রজাপিতা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। তিনি সব শুনে বললেন একমাত্র বিষ্ণুই পারেন দেবতাদের বিপন্মুক্ত করতে। আর তখনি শুরু হল সেই মহাকার্য যার নাম সমুদ্রমন্থন। সমুদ্রের গভীরে নাকি "অমৃত" নামে এক অমোঘ সঞ্জিবনী সুধা আছে যা পান করলে দেবতারা অমরত্ব লাভ করবেন। বিষ্ণুর আদেশে মন্দার পর্বত হল সমুদ্রমন্থনের দন্ড। আর নাগরাজ বাসুকী হল মন্থনের রজ্জু। মন্দার পর্বতকে বাসুকী তার সমগ্র শরীর দিয়ে বেষ্টন করে র‌ইল আর দেবতারা দুইদিক থেকে তার মুখ ও লেজ ধরে টানতে লাগলেন। শুরু হল ভয়ানক সমুদ্রমন্থন প্রক্রিয়া। ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত নামে হস্তী, চন্দ্র, উচ্চৈঃশ্রবা নামক অশ্ব, বৈচিত্রময় মণিমাণিক্য, পারিজাত নামক স্বর্গের নান্দনিক পুষ্পবৃক্ষ সব উঠে আসতে লাগল একে একে । এরপর অমৃতের ভান্ড হাতে উঠলেন দেবতাদের চিকিত্সক ধ্বন্বন্তরী। আর সবশেষে বাসুকীরাজের সহস্র ফণারূপ ছত্র মাথায় উঠে এলেন মা লক্ষ্মী।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতেই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধ্বন্বন্তরী। তাই এই তিথির নাম হল ধনতেরস। তাই এই দিনটিতে ধনের উপাসনা করতে হয়। আর তার ঠিক পরেপরেই লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়। সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেদিন নাকি ছিল কার্তিক অমাবস্যা। তাই লক্ষ্মীকে বরণ করে স্বর্গে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুষ্ঠানটিতে আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল স্বর্গকে।
  • ডুব দে রে মন কালী বলে, হৃদি রত্নাকরের অগাধ জলে...

দীপাণ্বিতাই বল কিম্বা দীপাবলী অথবা ধনতেরসে লক্ষ্মী-গণেশের পুজো...উদ্দেশ্য একটাই ধনাগম ও শ্রীবৃদ্ধি। তবে কোথাও যেন কালীর সাথে সবকিছু একাত্ম হয়ে যায়। বাজি পোড়ানো, আলোর উত্সব, মিষ্টিমুখ, উপহারের আদানপ্রদান সবকিছুই যেন সেই সনাতন ধর্মের সৌহার্দের বার্তা বহন করে আনে।  কালী করেন অশুভ শক্তির বিনাশ আর লক্ষ্মী ঘটান শ্রীবৃদ্ধি। দেওয়ালী হল মিলনোত্সব, দীপাণ্বিতা সেই উত্সবে আলোর রোশনাই।