২১ অক্টোবর, ২০১৫

সন্ধিপূজা? তার আবার বিশেষত্ব কি ?


রামায়ণে আছেঃ 

শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পুজো চলতে লাগল । সপ্তমীর দিন দেবী স্বয়ং রামের ধনুঃশ্বরে প্রবেশ করলেন । অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নিলেন । অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করলেন রামচন্দ্র ।
দেবী দুর্গা নাকি এই দুইতিথির মিলনক্ষণেই আবির্ভূতা হন দেবী চামুন্ডারূপে । চন্ড এবং মুন্ড এই দুই উগ্রমূর্ত্তি ভয়ানক অসুরকে বধ করেছিলেন এই সন্ধিক্ষণে । আশ্বিনমাসে রামচন্দ্রের অকালবোধন এবং অপ্রতিরোধ্য রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করার জন্য যে দুর্গাপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায় কৃত্তিবাসের রামায়ণে সেখানেও দেখি রামচন্দ্র সন্ধিপূজা সমাপন কালে দেবীর চরণে একশো আট পদ্ম নিবেদন করার আশায় হনুমানকে দেবীদহ থেকে একশো আটটি পদ্মফুল তুলে আনতে বলেন । হনুমান একশোসাতটি পদ্ম পেলেন । দেবীদহে আর পদ্ম ছিলনা । এবার প্রশ্ন কেন দেবীদহে একটি পদ্ম কম ছিল । তার কারণ স্বরূপ কথিত আছে , দীর্ঘদিন অসুর নিধন যজ্ঞে মাদুর্গার ক্ষত বিক্ষত দেহের অসহ্য জ্বালা দেখে মহাদেব কাতর হলেন । মায়ের সারা শরীরে একশো আটটি স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল । মহাদেব তাঁকে দেবীদহে স্নান করতে বললেন সেই জ্বালা জুড়ানোর জন্য । দেবীদহে মায়ের অবতরণে একশো সাতটি ক্ষত থেকে সৃষ্টি হয়েছিল একশো সাতটি পদ্মের । মহাদেব দুর্গার এই জ্বালা সহ্য করতে না পারায় তাঁর চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু নিক্ষিপ্ত হল মায়ের একশো আটতম ক্ষতের ওপর । দেবীদহে স্নানকালে সেই অশ্রুসিক্ত ক্ষতটির থেকে যে পদ্মটি জন্ম নিয়েছিল সেটি মা নিজে হরণ করেছিলেন । কারণ স্বামীর অশ্রুসিক্ত পদ্মফুলটি কেমন করে তিনি চরণে নেবেন । আবার কৃত্তিবাসের রামায়নে পাই রাবণ নিধন যজ্ঞের প্রাক্কালে রামচন্দ্র বলছেন

” যুগল নয়ন মোর ফুল্ল নীলোত্পল
সংকল্প করিব পূর্ণ বুঝিয়ে সকল ।।

রাম ধনুর্বাণ নিয়ে যখন নিজের নীলোত্পল সদৃশ একটি চক্ষু উত্পাটন করতে উদ্যত তখন দেবী রামচন্দ্রের হাত ধরে তাঁকে নিবৃত্ত করে বলেন

“অকালবোধনে পূজা কৈলে তুমি, দশভুজা বিধিমতে করিলা বিন্যাস।
লোকে জানাবার জন্য আমারে করিতে ধন্য অবনীতে করিলে প্রকাশ ।।
রাবণে ছাড়িনু আমি, বিনাশ করহ তুমি এত বলি হৈলা অন্তর্ধান ”

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ হল এই সন্ধিপুজো। অষ্টমীতিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীতিথির শুরুর ২৪ মিনিট....এই মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যেই  অনুষ্ঠিত হয়। মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধের সময় দেবী দুর্গার পিছন দিক থেকে আক্রমণ করেছিল দুই ভয়ানক অসুর চন্ড ও মুন্ড। দেবী তখন এক অদ্ভূত রূপ ধারণ করেন। কেশরাজিকে মাথার ওপরে সু-উচ্চ কবরীতে বেঁধে নিয়ে, কপালে প্রজ্জ্বলিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি টিপ ও তিলক এঁকে, গলায় বিশাল মালা ধারণ করে, কানে সোনার কুন্ডল ও হলুদরঙা শাড়িতে নিজেকে সজ্জিত করেন। তাঁর রক্তচক্ষু, লাল জিহ্বা, নীলাভ মুখমন্ডল  এবং ত্রিনয়ন থেকে অগ্নি বর্ষণ করতে থাকেন। ঢাল ও খড়্গ নিয়ে চন্ড ও মুন্ডকে বধ করেছিলেন দেবী এই সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণে।  

সন্ধিপূজার এই মাহেন্দ্রক্ষণে কেউ বলি দেন । কেউ সিঁদুর সিক্ত একমুঠো মাসকলাই বলি দেন । সবকিছুই প্রতিকী । সর্বকালের সর্বক্ষণের দুষ্টের দমন হয় দেবীর দ্বারা । রক্তবীজ অসুর কুল বিনষ্ট হয় । ঢাকের বাদ্যি বেজে ওঠে যুদ্ধজয়ের ভেরীর মত । একশো আট প্রদীপের আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয় ভারতবর্ষের আনাচকানাচ । উত্তিষ্ঠত ভারতবাসীর জাগ্রত মননে দুষ্কৃতের বিনাশিনী এবং সাধুদের পরিত্রাণ কারী মা দুর্গা কান্ডারী হয়ে প্রতিবছর অবতীর্ণ হন মর্ত্যলোকে ।

২০ অক্টোবর, ২০১৫

মহাসপ্তমীঃ নবপত্রিকা স্নান করায় কেন?


ছোটবেলায় জ্ঞান হবার পর থেকে আমরা সকলেই দুর্গাপুজোর সপ্তমীর ভোরে মহা সমারোহে ঢাকের বাদ্যির সাথে সাথে গঙ্গায় বা নদীতে “কলা-বৌ” স্নান করানোর আয়োজন দেখি । স্নান করিয়ে সেই কলাবৌটিকে নতুন লালপাড় শাড়ি পরিয়ে মাদুর্গার পাশে রাখা হয় এবং পুজোর পাঁচটাদিন পুজো করা হয় ঐ কলাবৌটিকে । বিসর্জনের দিন প্রতিমার সাথে তাকে ও বিসর্জন দেওয়া হয় । ছোটবেলায় প্রশ্ন করলে বলা হত ওটি গণেশের কলা-বৌ । আদতে গণেশ কিন্তু বিয়েই করেন নি ।  মা দুর্গাকেই ঐ রূপে পুজো করা হয় । আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে এই কলাবৌটির পুজোটি এই প্রসঙ্গে যথেষ্ট তাতপর্য পূর্ণ । বেদে আছে ভূমি হল মাতা, মৃত্শক্তি  যা ধারণ করে জীবনদায়িনী উদ্ভিদকে । আযুর্বেদের  ঐতিহ্যবাহী ভারতবর্ষে রোগভোগের প্রাদুর্ভাব ও কিছু কম নয় । এবং মা দুর্গার চিন্ময়ীরূপটি এই কলা-বৌয়ের অবগুন্ঠনেই যে প্রতিস্থাপন করা হয় সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । এই কলাবৌকে বলা হয় নবপত্রিকা । নয়টি প্রাকৃতিক সবুজ শক্তির সঙ্গে আধ্যাত্মিক চেতনশক্তির মিলন হয় দেবীবন্দনায় । সম্বচ্ছর যাতে দেশবাসীর রোগ ভোগ কম থাকে এবং  দেশ যেন সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠে সেই বাসনায় এই নবপত্রিকাকে দুর্গারূপে পুজো করা হয় । ন’টি উদ্ভিদের প্রত্যেকটির গুরুত্ব আছে । প্রত্যেকটি উদ্ভিদ ই দুর্গার এক একটি রূপ এবং তার কারিকাশক্তির অর্থ বহন করে । এরা সমষ্টিগত ভাবে মাদুর্গা বা মহাশক্তির প্রতিনিধি ।  যদিও পত্রিকা শব্দটির অর্থ হল পাতা কিন্তু নবপত্রিকায় নয়টি চারাগাছ থাকে । আবক্ষ অবগুন্ঠনের আড়ালে নববধূর একটি প্রতিমূর্তি কল্পনা করা হয় । বাসন্তী এবং দুর্গা এই দুই পুজোতেই নবপত্রিকা অর্চনার নিয়ম আছে । যে ক’টি চারাগাছের সমষ্টিকে একত্রিত করে অপরাজিতার রজ্জু দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকা তৈরী করা হয় সেই নয়টি উদ্ভিদের নাম শ্লোকাকারে লেখা আছে  আর এই ন’টি গাছের প্রত্যেকের আবার অধিষ্ঠাত্রী দেবী আছেন

রম্ভা, কচ্বী, হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িমৌ। অশোক মানকশ্চৈব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা ।।

অর্থাত

(১) কলা–ব্রহ্মাণী(শক্তিদাত্রী)

(২) কালো কচু– কালিকা (দীর্ঘায়ুদাত্রী)

(৩) হলুদ– ঊমা( বিঘ্ননাশিনী)

(৪) জয়ন্তী–জয়দাত্রি,  কার্তিকী( কীর্তিস্থাপয়িতা )

(৫) বেল–শিবাণী(লোকপ্রিয়া)

(৬) ডালিম–রক্তবীজনাশিনী( শক্তিদাত্রী)

(৭) অশোক–দুর্গা(শোকরহিতা)

(৮) মানকচু– ইন্দ্রাণী( সম্পদদায়ী)

(৯) ধান–মহালক্ষ্মী( প্রাণদায়িনী)

মহাসপ্তমীর সূচনা হয় নবপত্রিকার স্নানপর্ব দিয়ে । নবপত্রিকা দেবীদুর্গার প্রতিনিধি । শ্বেত অপরাজিতা লতা এবং হরিদ্রাক্ত সূতা দিয়ে এই ন’টি উদ্ভিদ একসাথে বেঁধে নদীতে স্নান করানো হয় । দেবীর প্রিয় গাছ বেল বা বিল্ব । নদীতে নবপত্রিকা স্নানের পূর্বে কল্পারম্ভের শুরুতে দেবীর মুখ ধোয়ার জন্য যে দাঁতন কাঠি ব্যাবহৃত হয় তাও আট আঙুল পরিমিত বিল্বকাঠেরই তাছাড়া মন্ত্রে সম্বোধন করে নবপত্রিকাকে দেবীজ্ঞান করা হয় । শস্যোত্পাদনকারিণি দেবী দুর্গা স্বয়ং কুলবৃক্ষদের প্রধান অধিষ্ঠাত্রীদেবতা ও যোগিনীরা দেবীর সহচরী । স্নানান্তে নতুন শাড়ি পরিয়ে তিনটি মঙ্গলঘটে আমপাতা, সিঁদুর স্বস্তিকা এঁকে জল ভরে একসাথে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ, ঘন্টা এবং উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে, মন্ডপে মায়ের মৃন্ময়ীমূর্তির সাথে স্থাপন করা হয় । এই তিনটি ঘটের একটি মাদুর্গার ঘট, একটি গণেশের এবং তৃতীয়টি শান্তির ঘট । নবপত্রিকার পূজা একাধারে কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষের বৃক্ষপূজা অন্যদিকে রোগব্যাধি বিনাশকারী বনৌষধির পূজা । মহাসপ্তমীর ভোরে বিল্ববৃক্ষের পূজা, নবপত্রিকা এবং জলপূর্ণ ঘটস্থাপন এর দ্বারাই দেবীপূজার সূচনালগ্ন ঘোষিত হয় ।


ওঁং চন্ডিকে চল চল চালয় চালয় শীঘ্রং ত্বমন্বিকে পূজালয়ং প্রবিশ।

ওঁং উত্তিষ্ঠ  পত্রিকে দেবী অস্মাকং হিতকারিণি”

 
এঁরাই আবার নবদুর্গা রূপে পূজিতা হ’ন । তাই দুর্গাপূজার মন্ত্রে পাই 


“ওঁ পত্রিকে  নবদুর্গে ত্বং মহাদেব-মনোরমে”

ভবিষ্যপুরাণে পাওয়া যায়.. 

"অথ সপ্তম্যং পত্রিকাপ্রবেশন বিধিঃ" 


নবপত্রিকাকে জনপদে মঙ্গলের দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে পূজা করা হয় । একাধারে এটি কৃষিপ্রধান দেশের চিরাচরিত কৃষিলক্ষ্মী যা প্রাক্‌-আর্যসভ্যতার নিদর্শন অন্যাধারে জীবজগতের কল্যাণকর এই উভিদগুলির রোগনিরাময়ক গুণাবলীর জন্য  বনৌষধিও বটে । তাই এই ন’টি গাছকে অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে দেওয়ার অর্থ হল জনকল্যাণকর এই উদ্ভিদগুলি যেন রোগ-ব্যাধির হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে বা মানুষ যেন এই পুজার মাধ্যমে রোগ ব্যাধিকে জয় করতে পারে ।

১৭ অক্টোবর, ২০১৫

কাউন্টডাউন ৫ঃ চালচিত্তির আবার কেন?


মাদুর্গার চালচিত্র যেন দুর্গাপূজার অন্যতম অঙ্গ । বহু দেবতার সমাবেশ লক্ষ্য করা যায় এই চালচিত্রে । শিল্পীর রং তুলির টানে এই চালচিত্রের  সুষমা যেন মায়ের মূর্তিকে আরো সম্পূর্ণ এবং উজ্জ্বল করে তোলে । আমরা কেবল দেবী দুর্গাকে সপরিবারে পূজা হতে দেখি কিন্তু আসলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সকল দেবদেবীরাই কিন্তু উপস্থিত থাকেন ঐ চালচিত্রতে ।



  • শিব

দুর্গাপূজা যেন কলিকালের অশ্বমেধ যজ্ঞ । শিব ছাড়া যেমন সকল যজ্ঞ অসম্পূর্ণ তাই মায়ের চালচিত্রের মধ্যমণি হলেন মহাদেব । তিনি যেন এলাহী বৈচিত্রের মাঝে নির্বিকার স্বামীরূপে বিরাজমান । মহামায়া মা দুর্গাকে যেন তিনি সৃষ্টি ও প্রলয়ের ভার দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছেন তাঁর মাথার ওপর । মা অসুর বিনাশ করলে শিবপ্রদত্ত আশীর্বাদে আর তাই আমরা শিবকে বন্দনা করি আর মা এর কারণে প্রসন্ন হন । শিব ও শক্তির সম্মিলিত সত্তায় প্রকৃতির সর্বক্ষণের ভাঙাগড়া অব্যাহত থাকে ।

  • রাইরাজা

চালচিত্রে শিবের ডানদিকে উপবিষ্টা শ্রীরাধা । শক্তিবাদী আরাধনার সাথে সেখানে বৈষ্ণববাদের মেলবন্ধন । বিষ্ণুর শক্তি লক্ষ্মী । শ্রীরামের অবতারে তিনি সীতা আর শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গীনী শ্রীরাধিকা । দেবী-ভাগবতে বলা আছে  যে জগতের উত্পত্তিকালে বিশুদ্ধ শক্তিরূপিণী রাধিকা এবং বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী দুর্গা আবির্ভূতা হন তাই একত্রে এই দুই শক্তিযুগলের আরাধনা একান্ত কর্তব্য ।

  • নারসিংহী

রাইরাজার ডানদিকে নারসিংহী থাকেন ।  অষ্টশক্তির অন্যতম হলেন নারসিংহী । ভগবান শ্রীহরি দেবতাদের কার্যসিদ্ধির জন্য  নৃসিংহ রূপে অবতীর্ণ হয়ে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন । সেই কারণে অসুরগণের বিনাশ ও দেবতাদের কল্যাণার্থে দেবগণের মহাবল শক্তিসমূহ তাদের শরীর থেকে বহির্ভূতা হয়ে নারসিংহী নামক দেবীমূর্তিতে প্রবেশ করে ।  এই দেবীমূর্তি শ্রীচন্ডীর সমীপে উপস্থিত হন । এবং মাদুর্গার সঙ্গে অসুরের যুদ্ধের সময় এই নারসিংহী দুর্গার শরীরে লীন হয়ে যান ও মা’কে  অসুর নিধনের জন্য  আরো শক্তি দান করেন ।

  • রক্তবীজ

নারসিংহীর ডানদিকে আছেন রক্তবীজ । রম্ভাসুরের মৃত্য্র পর তার চিতার আগুণ থেকে এক বিশালাকায় দৈত্য নির্গত হয় যার নাম রক্তবীজ । চন্ডও মুন্ড বধের পর দাবরাজ শুম্ভ মহাসুর রক্তবীজকে বলে মাদুর্গাকে সংহার করতে । রথে আরোহণ করে রক্তবীজ শৈলশিখরে মাদুর্গার কাছাকাছি পৌঁছতেই দেবীদুর্গা শঙ্খধ্বনি করতে লাগলেন । সেই শঙ্খধ্বনিতে রক্তবীজ বিন্দুমাত্র ভীত না হয়ে দেবীর নিকট গিয়ে দেবীকে শুম্ভ অথবা নিশুম্ভকে বিবাহ করতে বলে । দেবী উগ্র থেকে উগ্রতর হয়ে ওঠেন । প্রচ্ন্ড যুদ্ধ হয় দুজনের মধ্যে । পাপমতি রক্তবীজ দেবীর বাণে বিদ্ধ হয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়ে । মূর্ছা ভঙ্গ হলে তার শরীরের প্রতিটি ফোঁটা রক্ত থেকে সেই দানবের অনুরূপ বলশালী দৈত্য উত্পত্তি হয় । শত সহস্র অসুরে ধরিত্রী ছেয়ে যায় । দেবগণ তখন বিপদ দেখে চন্ডিকা রূপিণিদেবীকে বলেন রক্তবীজের দেহনিঃসৃত প্রতিটিরক্তের ফোঁটাকে পান করতে তাহলে দৈত্যের উত্পত্তি রোধ হবে । চামুন্ডারূপিণিদেবী তাই করতে লাগলেন এবং অতঃপর সেই রক্তহীন রক্তবীজকে অস্ত্রাঘাতে নিহত করলেন ।

  • চামুন্ডা

রক্তবীজের ডানদিকে আছেন দেবী চামুন্ডা ধূম্রলোচন বধের পর শুম্ভের আদেশে চন্ড ও মুন্ড পদাতিক, অশ্ব, হস্ত ও রথ এই চতুরঙ্গ সৈন্য সহ দেবীর উদ্দেশ্যে ধাবিত হয় । দেবী ক্রোধে অতিশয় কৃষ্ণবর্ণ হলে তাঁর ললাট থেকে করালবদনা, লোলজিহ্বা কালী নির্গত হন । দেবী কালী চন্ডের মস্তক ছিন্ন করেন এবং পরে মুন্ডকেও অসির আঘাতে বধ করেন । সেই দেখে চন্ডিকাদেবী কালীকে চামুন্ডা রূপে অভিহিত করেন ।  তাই দুর্গার চালচিত্রে চামুন্ডার অবস্থান যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত ।

  • মাহেশ্বরী

চামুন্ডার ডানদিকে আছেন দেবী মাহেশ্বরী ।  অষ্টশক্তির অন্যতমা এই দেবী চতুর্ভুজা, ত্রিনেত্রা, বৃষভারূঢ়া ।

  • ইন্দ্রাণী

মাহেশ্বরীর ডানদিকে আছেন ইন্দ্রাণী ।  তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের পত্নী, ইন্দ্রের শক্তি । গজবাহনা, চতুর্ভুজা, বজ্রধারিণী ।

  • রামচন্দ্র

চালচিত্রে মহাদেবের বাঁদিকে আছেন রামচন্দ্র ।
সীতাহরণের পর রামচন্দ্র বানরসেনাদের সাহায্যে সেতুবন্ধ্ন করে লঙ্কায় হাজির হলেন । ব্রহ্মা তখন রামকে আদেশ করলেন অপরাজিতা দুর্গার পুজো করে জগতের উদ্ধারে নেমে পড়তে । সমগ্র রাক্ষসকুলকে ধ্বংস না করতে পারলে যে ধরিত্রীর নিস্তার নেই । তাই কৃষ্ণপক্ষেই নিদ্রিতা দেবীকে অকালে জাগ্রত করে অকালে অর্থাত শরতকালে (পূর্বে বসন্তকালে শুক্লপক্ষে দেবলোক জাগ্রত অবস্থায় পুজো হত) কাজে নেমে পড়েছিলেন রামচন্দ্র স্বয়ং । তাই তো অকাল বোধন । ব্রহ্মার পরামর্শে দেবী দুর্গার দশভুজা মূর্তি মাটি দিয়ে গড়ে সিংহবাহিনী সেই দেবীর বোধন করেছিলেন ব্রহ্মা স্বয়ং বিল্ব বৃক্ষমূলে । সেই দিনটিই ছিল মহাষষ্ঠী । শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পুজো চলতে লাগল । সপ্তমীর দিন দেবী স্বয়ং রামের ধনুঃশ্বরে প্রবেশ করলেন । অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নিলেন । অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করলেন রামচন্দ্র । নবমীর দিন সীতা উদ্ধার করলেন রাম । আর দশমীর দিন প্রাতে যুদ্ধে জয়লাভের পর দেবীমূর্তি নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে বিসর্জন মন্ত্র পাঠ হল । সেদিন পালিত হল বিজয়া দশমীর বিজয়োত্সব ।


  • জগদ্ধাত্রী

শ্রীরামচন্দ্রের বঁদিকে আছেন দেবী জগদ্ধাত্রী । তিনি মাদুর্গার অন্যতম রূপ । দেবী চতুর্ভুজা এবং কবীন্দ্রাসুর নিসূদিনী । দেবীর সাথে যুদ্ধের সময় মহিষাসুরের ছদ্মরূপ হল কবীন্দ্রাসুর । মা দুর্গা অঘটন পটীয়সী মায়ার বলে মহিষাসুরের আবরণ উন্মোচন করে কবীন্দ্রাসুরের শিরশ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছিলেন ।
  • নিশুম্ভ-শুম্ভ

চালচিত্রে জগদ্ধাত্রীর বাঁদিকে থাকে নিশুম্ভ আর নিশুম্ভের বাঁদিকে থাকে শুম্ভ ।  রক্তবীজ নিহত হবার পর নিশুম্ভ সসৈন্যে দেবীর দিকে তেড়ে যায় ।দেবীর সঙ্গে শুম্ভ ও নিশুম্ভের ভয়ানক যুদ্ধ হয় । দেবী নিশুম্ভকে বাণ দিয়ে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেন । সেই দেখে শুম্ভ কুপিত হয় । তখন দেবী শুম্ভকে শূলের দ্বারা আঘাত করেন । ইতিমধ্যে নিশুম্ভ জ্ঞান ফিরলে বাণ দিয়ে দেবীকে ও বাহন সিংহকে আঘাত করে । তারপর চলে গদাযুদ্ধ । শেষে দেবী চন্ডিকা শূলের দ্বারা নিশুম্ভের হৃদয় বিদীর্ণ করেন ।
শুম্ভকে বধ করতে দেবীর সময় লেগেছিল ।  একসময় শুম্ভ দেবতীর্থ পুষ্করে তপস্যা করে । ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর দান করেন যে কোনো পুরুষের হাতে তোমার মরণ হবেনা । চন্ডিকার সঙ্গে যুদ্ধের সময় শুম্ভ দেবীকে বলেহে উদ্ধত দেবী দুর্গা, তুমি গর্ব কোরোনা । তুমি অন্যান্য দেবীর সাহায্যেই তো যুদ্ধ করছ । সেই শুনে দেবী বলেন,    সমস্ত দেবীর প্রকাশ তাঁর শরীরেই । এরপরেই তিনি যেইমাত্র শুম্ভকে শূল দিয়ে বক্ষে আঘাত করেন সাথে সাথেই শুম্ভর মৃত্যু হয় ।


  • বারাহী

দৈত্যরাজ শুম্ভের বাঁদিকে থাকেন বারাহী । ইনি বরাহ অবতারের শক্তি । বরাহবদনা, কৃষ্ণা, পীতাম্বরী, সালঙ্কারা, বরাভয়, হল ও মুষলধারিণী । ইনিও অষ্টশক্তির এক শক্তি যিনি দাঁত দিয়ে ধরণীকে ধরে রেখে উদ্ধার করেছিলেন ।

  • ব্রহ্মাণী

ইনি ব্রহ্মার সৃষ্টিশক্তি । কমন্ডলুর  মন্ত্রপূত জল কুশ দিয়ে ছিটিয়ে দৈত্যদের হীনবীর্য করেছিলেন । ইনি রক্তবর্ণা, বিশালনয়না, বর ও অভয় মুদ্রাধারিণী, হংসারূঢা ।

  • কাত্যায়নী

দেবী ব্রহ্মাণীর বাঁদিকে আছেন দেবী কাত্যায়নী । তিনি অপরূপা, শান্ত । কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে আশ্বিনমাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে আবির্ভূতা ও পালিতা এই কন্যা দেবতাদের তেজে প্রকাশিত হন ।  তাঁর ত্রিনয়ন থেকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর সৃষ্টি হয়েছিল । তাই সকল প্রকার জাগতিক ও পারমার্থিক বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য দেবতারা কাত্যায়নীর সাহায্য নেন ।

এছাড়াও চালচিত্রে রয়েছেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, গণেশ, কার্তিক, সূর্য, চন্দ্র, পবন, ইন্দ্রাদি দেবতারা । নারীশক্তির মধ্যে অন্যতমা কালী, অন্নপূর্ণা, লক্ষ্মী সরস্বতীও আছেন সেই সাথে । সুতরাং চালচিত্রে আঁকা মূর্তিগুলি  যথেষ্ট ইঙ্গিত বহন করে এবং এই মূর্তিগুলির মধ্যে দিয়েই মায়ের সার্বিক শক্তির প্রকাশ ঘটে ।







তথ্যসূত্রঃ
(১) মহিষাসুরমর্দিণী- দুর্গা – স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ
(২)  শারদীয়া সংখ্যা উদ্বোধন ১৪১৮

২ অক্টোবর, ২০১৫

কলাবতী কথা সম্পর্কে কে কি বলছেন ?


সানন্দা পুজোসংখ্যা-২০১৫ এ প্রকাশিত উপন্যাস  

প্রত্যুষা চক্রবর্তীঃ  
অপেক্ষা করছি অনেক অনেক দিন ধরেই ...
হাতে আসামাত্র পড়ে ফেললাম একটু ও দেরি না করে,
ঘড়ির কাঁটা কি করে তিরিশ মিনিট ঘুরে গেল, টের পেলাম না!
পটশিল্পের কি অসাধারণ কথামালা বোনা হয়েছে বাংলার রীতি আচার অনুষ্ঠান আর ব্রতকথার সুতো দিয়ে ।মেদিনীপুর এর প্রত্যন্ত গ্রাম তাদের কথা নিয়ে উঠে এসেছে অবলীলায়। নয়াগ্রাম , খড়্গেশ্বর , পিংলা, পাথরা , কুকাই , নানকারচক , কুরুম্ভেরা গনগনি কত নাম না জানা গাঁয়ের গন্ধ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে বৈশাখী অশোক ষষ্ঠীর ব্রতকথা থেকে মঙ্গলচণ্ডী, ভৈমীএকাদশী,বিপত্তারিণী , লোটন ষষ্ঠীর কথার সাথে ।আর চরিত্রেরা ! মাটির গন্ধ পাচ্ছি যেন ।
সবশেষে লেখিকার উদ্দেশ্যে বলি, আপনি লুপ্তপ্রায় একটি শিল্পকে পুনঃজীবিত করার প্রয়াস করেছেন ।
অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ 
কাছের মানুষদের নাম যখন বহুল প্রচারিত পত্রিকার পুজোসংখ্যায় দেখি, গর্বে ও খুশিতে ভরে ওঠে।
প্রিয় মানুষ, বন্ধু ও দিদি ইন্দিরাদির প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে সানন্দা পুজো সংখ্যায়। ‘কলাবতী কথা’। পড়া শেষ করলাম কাল।
মেদিনীপুর নিয়ে রীতিমত রিসার্চ করা এ উপন্যাস। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম গঞ্জের অলিগলি, গ্রামীন সংস্কৃতি ও তার রীতিনীতি, ব্রতকথার নানা হারিয়ে যাওয়া গল্প, গ্রামীন মেলা ও উতসব, নানা পার্বন ও গ্রামীন মানুষের জীবনের এত ডিটেইলস এ উপন্যাসে পেলাম যে অবাক হতে হয় লেখকের পরিশ্রম ও গবেষনায়। উপন্যাসের পটভূমিকা হল গ্রাম বাঙলার পট শিল্প। এই পটশিল্পীদের জীবন, তাদের মনস্তত্ব, দারিদ্র, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধা, তাদের স্বপ্ন, অপ্রত্যাশিত সুযোগ, সাফল্য সবকিছুই এসেছে এ উপন্যাসের সাজানো ইটের সারিতে। লতু, কনক,  কলাবতী, মিকি, আকিও এবং আরো নানা চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে লেখক বলেছেন অনেক অনেক গ্রামীন সংস্কারের গল্প, তাদের বিচিত্র জীবন চর্চা, প্রতিবাদ, বেঁচে থাকার স্বপ্ন। নিবিড় গ্রাম বাংলার সাহচর্য্য, ক্ষয়ে যেতে থাকা এক শিল্পী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ও তাদের লড়াই হয়ে উঠেছে এ উপন্যাসটির উপজীব্য।
অর্ণব রায়চৌধুরীঃ 
কলাবতী কথা পড়লাম। বাংলার পটশিল্পীদের জীবন নিয়ে এরকম লেখা আগে পড়িনি। গ্রামবাংলার এত মেলার কথাও জানা ছিল না। কুরুম্ভেরা মেলা বা ময়নাগড়ের রাসমেলার বর্ণনা পড়ে ইচ্ছা করে ঘুরে আসতে। তবে যে জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করেছে তা হল সহজ সরল ভাষায় কথকতার গল্প। পুরাণ নিয়ে তোমার গল্প সম্ভার আমাকে মোহিত করেছে। যদিও 'অহল্যা' নিয়ে তোমার বিশ্লেষণ পড়ে জেনেছিলাম পুরাণ নিয়ে তোমার অগাধ আগ্রহ ও knowledge। উপন্যাসের শেষে নোট থেকে জানলাম মেদিনীপুরের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকার সময় তুমি এই পটশিল্পীদের সান্নিধ্যে এসেছিলে। অনেক ধন্যবাদ তাদের কথা এরকম সুন্দর উপন্যাসের রূপ দেওয়ার জন্য। দু একটা জায়গায় একটু প্রশ্ন এসেছে মনে। এক জায়গায় পড়ে মনে হয়েছে আকিও বাংলা ভাষা জানে না। আবার সে রাতেই সে দিব্যি পরিষ্কার বাংলায় কলাবতীর সাথে কথা বলে। মনে হল এখানে কথোপকথন টা না থাকলেও চলত। আর উপন্যাসের শেষ লগ্নে যখন কলাবতী জাপানে নিজের সংসার শুরু করেছে তখন জানা গেল না তার স্বামী রামু বা তার শ্বাশুড়ি কনকের মনের অবস্থা কেমন হল বা তারা এত সহজে কি করে মেনে নিল ব্যাপারটা। আর জানতে ইচ্ছা করছে এখন কি গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে এইসব পটশিল্পীদের জন্য কম্পিউটার পৌঁছেচে নাকি তোমার উপন্যাসে ভবিষ্যতের রূপরেখার ইংগিত আছে। সব শেষে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম একটা উপন্যাস আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। আশাটা এবার বেড়ে গেল।
সুনন্দা চক্রবর্তীঃ 
দিদি আজ আমি সারা দুপুর ধরে লেখাটি পড়েছি । প্রথমেই বলি তোমার ধৈর্য অপরিসীম । তোমার লেখা ১) খুব ক্লাসি, ২) ঐতিহাসিক তথ্য সমৃদ্ধ , ৩) বাংলার বার ব্রত যা অনেকেই জানেনা তা সুচারুরূপে ব্যক্ত করেছ, ৪) বাংলার একটা শিল্প তোমার লেখনীতে স্থান পেয়েছে বলে খুব ভালো লেগেছে। এবার আসি কলাবতীর কথায়, তিনটে একই সংসারে থাকা নারী যেখানে ঝগড়া ঝাঁটি আর গালাগালিতেই পার করে সেখানে সুন্দর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর একে অপরের পরিপূরক , উদার হৃদয় চরিত্রগুলো অপূর্ব এঁকেছ । পুরো উপন্যাসটাই আসলে রূপকথা । যা বেঁচে থাকার রসদ দেবে । 
শর্বরী ব্যানার্জিঃ
কলাবতী কথা পড়লাম। গ্রামীন শিল্পীদের অনেক অনেক সম্মান ও মর্যাদা প্রাপ্য। আমরা শহরে বসে তাঁদের শিল্পীমন বা শিল্পের কথা জানতেই পারিনা তাই হয়ত প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিতে পারিনা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই শিল্পীদের তুলে ধরার জন্য।

শ্রাবণী দাশগুপ্তঃ
কলাবতীকথা - অনেক যত্নের বহু পরিশ্রমের ফসল উঠেছে লেখিকার কর্ষণে। প্রয়োজনীয় বৃষ্টি দিয়েছে সজীবতা, শ্যামল হয়ে উঠেছে উপন্যাস - বারব্রত, সংস্কার মিলেমিশে। একেক সময়ে মন ভার হয়ে উঠেছে, কত দ্রুত এসব হারিয়ে গিয়েছে শহুরে জীবন থেকে, নিষ্প্রাণ দেখনদারী এসে দখল করে নিয়েছে সজল আত্মীয়তা - আত্মার কাছাকাছি, মনের কাছাকাছি থাকা মানুষদের। হয়ত আছে গ্রামে-গঞ্জে এখনো - থাকুক, বেঁচে থকুক। বেঁচে থাকুক পটচিত্র আর স্বরচিত গান নিয়ে কলাবতীরা। শহরায়ন বিশ্বায়ন - অনেক কিছু শুকিয়ে দিয়েছে, কোথাও বাঁধ দরকার...। নইলে আমাদের নিজস্বতা হারিয়ে যাবে।
টানাপোড়েন আছে উপন্যাসে, কিন্তু তেমনটা নয়, খুব সাবলীল ভাবে ঘটে যায় ওঠা-পড়া। জটিলতা ধরা যায়না তেমন।

নন্দিতা ভট্টাচার্যঃ
এত ডিটেলিং ভাবা যায়না।  অনেকদিনের প্রয়াস মনে হচ্ছে। বাংলাকে এভাবে  একেবারে টেনে তুলে এনেছ, তুলে ধরেছ ভুলে যাওয়া সব কথা।

অমৃতা ঘোষঃ
অনেক কিছু জানতে পারলাম বাঙলার পটচিত্রও কিংবদন্তীর ব্যাপারে। অসাধারণ শুধুই কলাবতী নয়। কনক, লতু প্রত্যেকেই। আরো একটি ব্যাপার যেটি খুব ভালো লেগেছে সেটি হল একজন নারী হয়ে অন্য আরেকজনকে অণুপ্রাণিত করা। লতু, তার পুত্রবধূ কনককে আর কনক তার পুত্রবধূ কলাবতীকে।  আমাদের জীবন এমন হলে বরতে যেতাম।

রুচিরা চ্যাটার্জিঃ 
কলাবতী কথা পড়ে পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারলাম আগে যা অজানা ছিল। ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস জেনে ভালো লেগেছে। সত্যি অনেক অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে লড়াই করে ওঁরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বাংলার সব ব্রতকথার ছোতছোট গল্পগুলি বিশেষতঃ উমনোঝুমনোর কথা জেনে অনেকদিন বাদে খুব মজা পেলাম। আবারো নস্টালজিক হয়ে পড়লাম।

শর্মিলা দাশগুপ্তঃ
খুব ভালো লাগল কলাবতী কথা পড়ে। পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অজানা কথা, ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস, আমাদের গ্রামবাংলার এতসব ব্রতকথা আর পুজোআর্চার গল্প জানতামনা। কনক আর কলাবতীর সম্পর্কটা এত সুন্দর ভাবে দেখিয়েছ খুব ভালো লাগছে। কনকের প্রতিবাদী চরিত্রটি দারুন। কিন্তু শেষের দিকটা পড়ে মনে হল কলাবতী কেন এত স্বার্থপর হয়ে গেল? যে শাশুড়িমা তার জন্য এতকিছু করল তাকে ছেড়ে, স্বামীকে ছেড়ে সে চলে গেল কি করে? হতেই পারে এটাই বাস্তব কিন্তু কনক এত পুজো করে কি পেল? খুব‌ই বাস্তবিক পটভূমি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পুরোটাই নিঃসন্দেহে উপভোগ্য।