১৩ জানু, ২০১৭

পোষের শীত পিঠের গায়


ত্তুরে হাওয়ায় ভাসতে শুরু হয়েই ফুরিয়ে যায় আদরের শীতের পৌষের ডাক। লেপ বালাপোষের ওম নিতে নিতেই উধাও হয় অমৃত কমলার মিষ্টি দুপুর। তবে শীতের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে বসে চষি পাকানো, মোয়া গড়া কিম্বা পুলিপিঠে গড়তে গড়তে মেয়েলি গল্প? তা কিন্তু ফুরোয়না। বছরের পর বছর জি‌ইয়ে থাকে বাংলার গৃহিণীদের হাতের যাদুতে আর জয়নগরের মোয়ার শীতের প্যাকেজে।  কথায় বলে "মাঘের শীত বাঘের গায়'  আর পোষের শীত ? খেজুরের গুড়ে, পিঠেপুলিতে, নলেনগুড়ের পায়েসে আর পাটালীতে। 

আমাদের দুই বাংলাতেই অপর্যাপ্ত খেজুর গাছ আর তার হাত ধরে কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে  ঘুম ভাঙে কোলকাতায় । হ্যালোজেন নিভে যায় । আমি কান পেতে র‌ই । উশখুশ প্রাণ বলে, খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন  । মফস্বলের দিকে ভোরবেলায় অন্ধকার থাকতেই "চাই রস"  বলে সেই বিখ্যাত হাঁক? এখন আর শুনি ক‌ই?  রোদ বাড়ার সাথেসাথেই খেজুর রস গেঁজে তাড়ি হয় । সেই খেজুর রস জাল দিয়ে প্রথম দফায় পয়রা বা পয়লা গুড় আমাদের বড্ড প্রাণের। এ যেন অল্পদিনের অতিথি। একে ছেড়ে দিলে আর পাবনা সারাটি বছর তাই যতই  দাম হোক গেরস্থ তার সাধ্যমত একটি ছোট্ট মাটির নাগরী  খড়ের বিঁড়ের ওপর বসিয়ে বাড়ি বয়ে আনবেই। রান্নাবান্নার ঝুটঝামেলা নেই। রুটি, লুচি, পরোটা দিয়ে দিব্য চলবে পয়লাগুড়। বিদেশের মেপল সিরাপ যেন। ওরা খায় প্যানকেক, ওয়েফল দিয়ে। 
তারপর সেই খেজুর রস জাল দিয়ে ঘন করে মাটির সরার মধ্যে থরে থরে পাটালি গুড় তৈরী হয়। কিছুটা আধাঘন গুড় বিক্রী হয় খেজুরের গুড় হিসেবে। সেটা বেশ অনেকদিন রেখে খাওয়া যায়। মূলতঃ পৌষমাসের সেরা উত্সব মকরসংক্রান্তিতে সেই খেজুরের গুড় দিয়েই পিঠেপুলি বানানো হয়। মোয়া তৈরী হয় হরেক কিসিমের। নবান্নের নতুন ধানের গন্ধ তখনো লেগে থাকে চিঁড়ে, মুড়ি আর খ‌ইয়ের গায়ে। নতুন ধান আর নতুন গুড়ের সুঘ্রাণে পরতে পরতে শীতের রূপ হয় খোলতাই।  পৌষলক্ষীর বরণডালা উপচোয়  সোনার ফসলে। আনন্দে কবি বললেন, মরি হায় হায় হায়। এতে মরার একটাই কারণ কাজের চাপে শীত ফুরায়। আর শীত ফুরোলে কি আর থাকে বাঙালীর কপালে? চলে যায় মরি হায় নলেন গুড় আর চালের গুঁড়ির জম্পেশ কেমিষ্ট্রি।  
 আমাদের ঘটিবাড়ি খুলনা জেলার সাতক্ষীরার ঐতিহ্য মেনে এখনো পৌষসংক্রান্তিতে নতুন ধান দিয়ে পৌষলক্ষীর পুজো করে। আর সেই পুজোয় মুখ্য ভোগ হল নতুন গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে  নলেন গুড়ের পায়েস আর তার মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া তুলতুলে নরম দুধপুলি। মা লক্ষী কৃপা করলে সারাজীবন ধরে বংশ পরম্পরায় যেন এই ভোগ নিবেদন করা যায়, এমনি বিশ্বাস ছিল আমাদের ঠাকুমার। নতুন গুড়ের পায়েসের গন্ধে শিকেয় উঠত জ্যামিতি পরিমিতি ।
পুলিপিঠে বানাতে বসে ঠাকুমা বলতেন রিভেঞ্জ নেবার এক গল্প। 
এক দজ্জাল শাশুড়ি তার নিরীহ বৌমাটিকে অত্যাচার করত। দাপুটে শীতে গাদা গাদা পিঠে বানাতেই হত। একদিকে সংসারের সমস্ত কাজ, তায় আবার একাধিক কাচ্চাবাচ্চা সামলিয়ে নিদারুণ শীতে নিজের পিঠে পিঠে রাঁধার চাপ নিতে হত। বৌটি মুখে প্রতিবাদ করতে পারতনা। এক শীতে সে ঠিক করল দুধ ঘন করে, পাটালী দিয়ে ফুটিয়ে নিয়ে এক জব্বর দুধপুলি বানিয়ে শাশুড়িকে খাইয়েই ছাড়বে। রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘরের আশপাশ থেকে ছোট্ট ছোট্ট দুধসাদা নেংটি ইঁদুর ধরে এনে সেই ফুটন্ত দুধের পায়েসের মধ্যে ফেলে দিল ইঁদুরগুলিকে। অন্ধ শাশুড়িকে শীতের রাতে জামবাটি ভরে সেই দুধপুলি খেতে দিল। শাশুড়ি হাত ডুবিয়ে সেই নরম তুলতুলে পুলি খায় আর ইঁদুরের লেজগুলি ছুঁয়ে বলতে থাকল,
' কালে কালে কত‌ই হল, পুলিপিঠের লেজ গজালো '  
এমন কাহিনী আজ হয়ত অচল । বদলেছে শাশুড়ি-বৌয়ের গল্প অন্য আঙ্গিকে। তবে পিঠেপুলি বানাতে বানাতে এমন মুখরোচক গল্প শোনাটাও ছিল আমাদের উপরি পাওনা। 
আর এইসব কাহিনীর জন্যেই বুঝি লোকমুখে ছড়িয়ে গেল
 "কারও পোষ মাস, কারও সব্বনাশ " এর মতন প্রবাদ।

পৌষসংক্রান্তির আগের দিন থেকে পরের দিন অর্থাত মোট তিনদিন ধরে চলে আমবাঙালীর পিঠে-উত্সব। দুধ, নারকেল আর নতুনগুড়ের বিক্রিবাটরায় হৈ হৈ  তলা লেগে যাওয়া ঘন দুধের গন্ধে ম ম করা ঘরবাড়ি আর বার্কোশ পেতে কুরুনিতে নারকেল কোরার খসখস শব্দ?
  
মামারবাড়িতে দিদিমার সে এক হৈ হৈ জগ্যি পৌষসংক্রান্তির দিনে।  বিশাল রান্নাঘরের মধ্যে কয়লার উনুন জ্বলছে গাঁকগাঁক করে। দুটো  ষন্ডামার্কা লোক বড়বড় কাঠের বার্কোশে কলাপাতা বিছিয়ে নারকেল কুরছে। উনুনে কালো লোহার কড়াইতে দুধ ঘন হচ্ছে।  আগের রাতে ভেজানো নতুন চাল শিলে বাটছে দুজন মেয়ে। এবার সেই চালের গুঁড়ি ঠাণ্ডা জলে মসৃণ করে গুলে ঘি দিয়ে উনুনে বসিয়ে নাড়া । এবার সোনার মত চকচকে করে মাজা পেতলের পরাতে ঘি মাখিয়ে সেই চালের মণ্ড ঢেলে দিলেন দিদিমা । সাথেসাথে ঠাণ্ডা হাতে গরমের ওম মেখে, ময়দা মাখার মত ঠেসে নিলেন সেই চালের মণ্ড। ছোট ছোট লেচি বানিয়ে ভেজা মসলিন কাপড়ে ঢেকে রাখলেন তা। ততক্ষণে কালো লোহার কড়াইতে খেজুরের গুড় জাল দিয়ে নারকেল মিশিয়ে ছেঁই প্রস্তুত। বাড়ীর কচিকাঁচাদের হাতে নারকেল নাড়ু সম সেই ছেঁই চাখার জন্য একটু করে দেওয়াও হল । এই ছেঁই হল পিঠের পুর। এই বানিয়ে রাখা হল। চলবে একমাস ধরে। ছেঁই ঠাণ্ডা হতেই চালের মণ্ডের লেচি হাতের তেলোয় নিয়ে একটু করে ছেঁই ভরে পুলিপিঠের মুখ বন্ধ করার পালা। ফিডিং বোতলের আকারে আলতো হাতে ছোট্ট ছোট্ট পুলি গড়ে ফেললেন দিদিমা তাঁর শৈল্পিক অনুভূতিতে।   আধাঘন  ফুটন্ত দুধে সেই  পুলিগুলো ছাড়লেন  ধীরে ধীরে । আর হাতা দিয়ে  আলতো করে মাঝেমাঝে নেড়ে দিলেন ।  কি সুন্দর হেঁশেল পারিপাট্য! খেজুরের গুড় ভর্তি বয়াম থেকে পরিমাণ মত গুড় দুধে ফেলে সমান ভাবে মিশিয়ে দিলেন ।  সারাবাড়ি ম ম করছে দুধপুলির আগাম আগমনীবার্তায়  ।  ক্ষীরসমুদ্রে ভাসমান পুলি নিয়ে তখনো সংশয়ে দিদিমা। পুলি ফেটে গেলে চূড়ান্ত ডিস্ক্রেডিট।  সেই দুজন ষন্ডামার্কা লোক এসে পেল্লায় লোহার কড়াইটাকে নামিয়ে দিল মাটিতে।

কিছু পুলিপিঠে  গড়ে রাখা হল সেদ্ধ বা ভাপানো হবে বলে। সেদ্ধপুলি হল বাঙালীর মিষ্টি মোমো। পেল্লায় হাঁড়ির মুখে জল ফুটবে। আর সাদা নরম কাপড়ে পুলিগুলোকে বেঁধে হাঁড়ির মুখে স্টীমারে ভাপানো  হবে। তারপর সেদ্ধপুলি খাওয়া হবে বাটি ভর্তি করে পাতলা পয়রাগুড়ে চুবিয়ে। 

কিছুটা চালবাটা আর কলাইয়ের ডালবাটা মিশিয়ে রাখা হল একটি গামলায়। তা দিয়ে বানানো হবে সরুচাকলি। দক্ষিণী দোসার অনুরূপে পাতলা পাতলা সেই দোসা খাওয়া হবে পৌষসংক্রান্তির রাতে। আবারো পয়রাগুড়ে চুবিয়ে। পিঠে উত্সবের মধ্যমনি হল পাটিসাপটা। ঐ যে নারকোল আর খেজুর গুড়ের ছেঁই বানিয়ে রাখা হল সেই ছেঁইতে একটু খোয়া ক্ষীর মিশিয়ে মসৃণ করে আরেকটা রাজকীয় কেমিষ্ট্রি তৈরী হল । সেটি হল পাটিসাপটার পুর। এবার পাটিসাপটার ব্যাটার বা গোলা তৈরীর পালা।  আমাদের ঘটিবাড়ির পাটিসাপটা এতটাই নরম ও তুলতুলে হয় যে তা পরেরদিনও দিব্যি গরম করে নিয়ে খাওয়া যায়। আর এখন ফ্রিজের দৌলতে গোলা বানিয়ে ঠান্ডায় রেখে দিলে রোজ বানিয়ে খাওয়া যেতেই পারে গরমাগরম এই পিঠে। গোলার কেমিষ্ট্রি তৈরী হয়  ঠান্ডা দুধ, সম পরিমাণ সুজি-ময়দার মসৃণ মিশ্রণে সামান্য চালের গুঁড়ো, একটু পাতলা খেজুর গুড় আর অল্প ঘি দিয়ে ।  ঠিক ভাজার পূর্ব মূহুর্তে গোলায় ছড়িয়ে দাও বড়দানার সামান্য চিনি।  কারণ  গোলারুটিতে একটা ফুটোফুটো ভাব আনার জন্য। এখন ছুটছি সকলে। তাই টেফলন‌ই ভরসা। বেশ করে ননস্টিক তাতিয়ে নিয়ে বেগুনের বোঁটায় করে ঘি মাখিয়ে নেওয়া আর হাতায় করে গোল দেওয়ার পর দেশলাই বাক্সের খোলের ভেতরটা  দিয়ে সেটিকে ডিম্বাকৃতি রুটির আকার দেওয়া। এবার পাতলা সেই গোলারুটির ধার দিয়ে সামান্য ঘিয়ের ছিটে দিয়ে কম আঁচে ভেজে নিয়ে  আগে থেকে বানিয়ে রাখা রাজকীয় পুর চালান হল। তারপর কাঠের তাড়ু দিয়ে হাতের কৌশলে পাশবালিশের আকারে পাটিসাপটা মুড়ে নিতে পারলেই হল বাঙালীর মিষ্টি প্যানকেক।  আজকাল বাজারে যে পাটিসাপটা বিক্রি হয় সেগুলি ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যায়। এর কারণ হল ময়দা বা সুজির পরিবর্তে জলে গোলা চালের গুঁড়ি। 

কখনো খাও ক্ষীর সাঁতারে ডুব দেওয়া দুধপুলি। কখনো কামড় বসাও পাটিসাপটায় অথবা হালকা মিস্টির স্বাদ নিতে সরুচাকলিতে।  আমাদের আড়িয়াদহের বাড়ীতে  ঠাকমা বানাতেন রসবড়া।  বিউলির ডাল বাটার ঘন ব্যাটারে, মৌরী আর সামান্য চিনি ছড়িয়ে ( ফাঁপা করার জন্য) সরষের তেলে ভেজে নিতেন বাদামী রংয়ের টোপা টোপা রসবড়া। এটা হল ভাজার গুণ। কম আঁচে মুচমুচে করে ভাজতে হবে, যাতে খেজুরগুড়ের পাতলা রসে ফেললে বড়া আরামে না নেতিয়ে পড়ে । এবার খাও কে কত খাবে।
আরেকটি পিঠে আমাদের ঘটিবাড়ির স্পেশ্যাল। তা হল মুগসামালী। শুকনো খোলায় ভাজা সোনামুগ ডাল সেদ্ধ করতে হবে এমনভাবে যাতে ডাল গলে ঘ্যাঁট না হয় আর শুকনো শুকনো সেই ডালসেদ্ধ ঘিয়ের হাতে আলতো চাপে সামান্য ময়দা আর চালের গুঁড়ো মাখিয়ে নিয়ে গড়তে হবে পুলির আকারে। মধ্যে দিতে হবে সেই আদি, অকৃত্রিম খেঁজুর গুড় আর নারকেলের ছেঁই। এবার পুলির মুখ বন্ধ করে গরম সর্ষের তেলে ভেজে নিতে হবে। পয়রা গুড়ে চুবিয়ে কিম্বা এমনি এমনি‌ ই খাওয়া যায় এই মুগসামালী। অনেক পিঠের মাঝখানে একটু মুখ বদল করতে ময়ান দিয়ে মাখা ময়দার খোলে ঐ ছেঁই চালান করে বানানো হত সিঙাড়া পিঠে।  কেউ মনের আনন্দে পরিপাটি করে গড়েই চলত এই সিঙাড়া পিঠে আর কেউ ভাজত গরম খোলা চাপিয়ে। এক‌ই অঙ্গে কত রূপ পিঠের! সৃষ্টিসুখে সামিল হওয়া বাংলার ঘরণীদের কত আইডিয়া মাথায়! অফুরন্ত সময় ছিল তাদের। সংসার ছিল যৌথ। পরিবারের সকলকে নিজের হাতে খাওয়ানো ছিল নেশা।

 ওদিকে বাংলার আদিবাসীদের ঘরে সেদিন টুসু পরবের গানের সাথে শোনা যায় মাদলের দ্রিমি দ্রিমি। আমরা গঙ্গসাগরে মকর স্নান করে পুণ্যি কুড়োই আর ওরা শোভাযাত্রা করে টুসু ভাসায়।  কেউ নতুন ধানের আউনি-বাউনি বেঁধে পিঠে বানাতে বসে। সেই পিঠে ঠাকুরকে দিয়ে তবে খায়। কেউ ওড়ায় ঘুড়ি। আটপৌরে বাঙালীর এই পিঠে সংস্কৃতি যেন তাদের বাৎসরিক সংস্কার। একজনের কাছে গুড়পিঠের কথা শুনেছি। মালপোয়ার মত ভাজা পিঠে গুড়ের রসে ফেলে খাওয়া আর কি! সাধ আর সাধ্যের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে পিঠের রেসিপিতে, রসনায় কত বৈচিত্র্য এসেছে যুগ যুগ ধরে। আমাদের প্রিয় গোকুলপিঠেও এমনি এক বৈচিত্র্য। আর এই একটি পিঠেতে খোয়া ক্ষীর, নারকেল অর খেজুরের গুড়ের সঙ্গে ছানার রসায়ন জমে যায় একেবারে।
পিঠেপুলির পরিবারে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে রাঙা আলুর পুলি।  এখন ক্যানসার রুখতে রাঙা আলুর জুড়ি নেই তাই বেশ কদর এই পুলির। সেদ্ধ করে নিয়ে চালের গুঁড়ি আর ময়দা আর ঘিয়ের হাতে রাঙা আলুর পুলির মধ্যে আবারো চালান করো নারকেলের ছেঁই আর পুলির মুখ বন্ধ করে ভেজে নাও তেলে। এবার এমনি খাও অথবা গুড়ের রসে ফেলে খাও। সেটা নিজের চয়েস।      
মনে পড়ে যায় পিঠের প্রসঙ্গে ইতু পুজোর ব্রতকথা। অঘ্রাণের শীতেই প্রতি রবিবারে ইতুপুজো করতে গিয়ে মা শোনাতেন সেই ব্রতের কথা। গরীব বামুন ভিক্ষে করে পিঠের উপকরণ যোগাড় করে বৌকে এনে দেয় আর বলে, দ্যাখ বামনী, এই যে মাগ্যির পিঠে বানাবি তা যেন তোর ঐ অলুক্ষুণে মেয়েদুটো মানে উমনোঝুমনোর পেটে না যায়।  বামনী পিঠে ভাজে আর বামুন একটা করে তেঁতুলে বিচি দিয়ে গুনতি করে রাখে মোট ক'খানা পিঠে সবশুদ্ধ ভাজা হল। বামুনের কাছে দুই কন্যাসন্তান সংসারে ব্রাত্য। এদিকে বামনীর প্রাণ পারেনা মেনে নিতে। উনুনপিঠেয় রাখা চোঁয়া, পোড়া, কাঁচা পিঠেগুলো সে মেয়েদের গিয়ে চুপিচুপি দিয়ে আসে। বামুন তা জানতে পেরে উমনোঝুমনোকে বনবাসে দিয়ে আসে। তারপর একদিন ঐ ইতুপুজো করার কারণেই তার মেয়েরা রাজরাণী হয়ে বামুনের দুঃখ ঘোচায়। এখনো তাই পিঠে বানালেই মনে পড়ে যায় এইসব। ফিরে ফিরে অসে কাহিনীরা নতুন গল্পের মোড়কে। 

 শিলাদিত্য  জানুয়ারি সংখ্যা ২০১৭

৮ জানু, ২০১৭

মাছে ভাতে বাঙ্গালী

"ও বৌমা, ও বৌমা আঁশবটিটা বার করোগো শিকার ধরেছি'
ছোটবেলার রূপকথার গল্প বলতেন বাবা।
যেখানে এক ডাইনি বুড়ি একটি ছোট ছেলেকে তার আঁশ বটিতে কুপিয়ে কাটবে বলে মনের আনন্দে নাচতে নাচতে ছেলের বৌকে কথাগুলো বলছিল।
শুধু রূপকথা কেন?  বাঙালী বাড়ির বনেদিয়ানা ছিল বিশাল এই আঁশবটি। আমবাঙালীর গরীব গেরস্থ, সকলেরি ঘরে থাকত একখানা আঁশবটি। এই আঁশবটির সংগে মাছের নিবিড় সম্পর্ক। তাই মত্স্যপ্রিয় বাঙালীর পেল্লায় আঁশবটি ছিল রান্নাঘরের ঐতিহ্য। আমাদের ঘটিবাড়িতে আঁশ-নিরামিষের ছুঁতমার্গ বেশ দাপটের সঙ্গে মানা হত। ঠাকুমার ঝুলকালির রান্নাঘরের কুলুঙ্গীর মধ্যে মাছভাজার লোহার আঁশ কড়া আর সেই আঁশবটি খানি থাকত। আঁশবটির ইজ্জত মাছের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলনা। কোনো বৃহষ্পতিবারে বাড়িতে মাছ না এলে ঠাকুমা তাঁর ছেলের বৌদের বলতেন, আঁশবটি ধুয়ে জল খেতে।  এয়োতির বেষ্পতিবারে মাছ না খেলে  পাছে ঠাকুমার ছেলেদের অকল্যাণ হয় তাই এই ব্যবস্থা। মায়েরা অবিশ্যি তা খেত না। ঐ আঁশবটিতে পেঁয়াজ কেটে ভাতের সঙ্গে খেয়ে নিত। 
অথবা দুপুরবেলায় মা তার নিজের দুই হাঁটুর মধ্যে আমাকে নিয়ে দোল খাওয়াতে খাওয়াতে বলতেন,

ঘুঘু ঘুঘু মতি স‌ই, পুত কই ?
হাটে গেছে।
কি মাছ আনতে?
সরলপুঁটি
কি দিয়ে কুটি?
বোঁচা বঁটি।

কিম্বা

মাছ কুটলে মুড়ো দেব
ধান ভাঙলে কুলো দেব,
কালো গরুর দুধ দেব,
দুধ খাবার বাটি দেব....

এসব ছড়া আজকের ছোটরা শোনেনা তাই রান্না ঘরে আঁশবটি কি জিগেস করলে তারা হয়ত উত্তর দিতেও পারবেনা। তারা জানে মাছ বাজার থেকে কেটে এনেই রান্না করা হয়। আমার বাপু বাবার মুখে এইসব ছড়ার গান না শুনলে একসময় ঘুম আসতনা ছুটির দুপুরে। 
বাবা গাইতেন,

আয়রে আয় ছেলের দল মাছ ধরতে যাই,
মাছের কাঁটা পায় ফুটেছে দোলায় চেপে যাই,
দোলায় আছে স্বপনকড়ি গুনতে গুনতে যাই....তখন কড়ি দিয়ে মাছ কেনা যেত। 

এই মাছ ধরার প্রসংগে মনে পড়ে আমাদের বাড়ির সবচেয়ে বড়দাদার কথা। আমরা বলতাম দাদাভাই। নিজে ছিলেন স্পোর্টসম্যান। পড়াশুনো শেষে চাকরী সামলিয়ে তাঁর যত ছিল ফুলগাছের নেশা তত ছিল মাছ ধরার নেশা। ঠিক ছুটির সকালে মাছ ধরবার জিনিষপত্র যেমন  মাছের চার অর্থাত আটামাখার গুলি, জ্যান্ত কেঁচো, ভাতের মন্ড ইত্যাদি, ছিপ, ফাতনা, সুতো নিয়ে তিনি চলে যেতেন গঙ্গার ধারে। মাছ উঠলেই হত আমাদের পারিবারিক মহামেছো ভোজ। 
বাবা আরো জানতেন ছড়ার গান। সেখানেও ঐ মাছ প্রসঙ্গ যেন এসেই পড়ত।


ও পাড়ার ঐ ছেলেগুলো নাইতে নেমেছে
দুইদিকে দুই রুইকাতলা ভেসে উঠেছে...    

কীর্তণে কানু বিনে গীত নাই আর বাঙালীর মত্স্য বিনে গতি নাই। তাই বুঝি শয়নে, স্বপনে, জাগরণে মাছ অনুষঙ্গটি এড়াতে পারেনা তারা।  

মাছ শুভ। মাছ পুণ্যতার প্রতীক। তাই বিয়ে, পৈতে, অন্নপ্রশনের তত্ত্বে মাছকে তেল, হলুদ, সিঁদুর লাগিয়ে তত্ত্বের তালিকায় রাখা হয়।  এমনকি শ্রাদ্ধের পিন্ডদানের পরেও মৃতের আত্মার রসনা তৃপ্তিতে কলাপাতার ওপরে এক টুকরো মাছ ভেজে দেওয়ার রীতিও দেখেছি। যেন তাঁকে নিবেদন করে অশৌচের পর বাড়ির লোকজন আবার মত্স্যমুখী হতে পারে।
তারপর সেই ছড়ার গানটি? আয়ঘুম যায় ঘুম বাগদীপাড়া দিয়ে বাগদীদের ছেলে ঘুমোয় জালমুড়ি দিয়ে। সেসময়  জেলে, বাগদী এদের এত‌ই আর্থিক অনটন এতটাই প্রবল  ছিল যে মাছ ধরার বাতিল জাল গুলিও তারা বুঝি ফেলত না । গায়ে দেবার কাঁথার কাজ করত সেই মাছ ধরবার জাল। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের সেই মেছুনির গল্প। মাছ নিয়ে যাদের কারবার সেই মেছুনির নাকি  রাতে শোবার সময় মাছের ঝুড়িটা মাথার শিয়রে না রাখলে ঘুম আসেনা। অর্থাত মানুষের যেমন আধার তেমন কর্ম। মেছুনির ভাল লাগে মাছের আঁশটে গন্ধ। ঐ গন্ধ না পেলে তার ঘুম‌ই আসবেনা ঠিক যেমন ছোট ছেলেকে গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ানোর অভ্যেস  অথবা শোবার সময় ব‌ইপড়ার অভ্যেস।

এই মীন শরীরের  সব ভাল কেবল ঐ আঁশটে গন্ধটা ছাড়া। এই আঁশের কথাতে মনে পড়ে দিদিমার কথা। কালো ভেলভেটের ওপর ক‌ইমছের আঁশ দিয়ে যে অপূর্ব শিল্পকর্মের গল্প শুনেছি তা বুঝি আজ হারিয়ে গেছে। ক‌ইমাছের আঁশ তো রূপোর মত চকচকে আর ছোট্টছোট্ট। আর এতো নষ্ট হবার নয়।  কোনো বাড়িতে কতগুলি ক‌ইমাছ এলে অমন শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তোলা যায় তা ভেবে কুল পাইনা। এখন তো বাজারে বড় ক‌ইমাছ অর্ডার না দিলে মেলেনা। ছোটোগুলিতে এত কাঁটা যে কেউ খাবেনা।
এহেন "আমি'র  শিরা-উপশিরায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বাঙাল রক্ত ও বাকী পঞ্চাশ ভাগ ঘটি রক্ত বহমান । আমার মায়ের বাবা এবং বাবার মা দুজনের বাংলাদেশের খুলনাজেলার সাতক্ষীরায় জন্ম। তাই এহেন "আমি" সেই অর্থে  হাফ বাঙাল ও হাফ ঘটি । অন্তত: আমার শ্বশুরালায়ের মন্তব্য তাই । ইলিশ আর চিংড়ি দুইয়ের সাথেই আমার বড় দোস্তি ।
বাঙালদের সেই চিতলামাছের মুইঠ্যা একবগ্গা মাছের এক্সোটিক ডিশ ফর গ্যাস্ট্রোনমিক তৃপ্তি । আর আছে কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বেগুণ দিয়া বাদলা দিলে কাদলা মাছের পাদলা ঝোল। ঘটির হল জিরে-মরিচ-ধনে বাটা দিয়ে আলু-পটল-ফুলকপি দিয়ে কাটাপোনার ঝোল, হিং,আদাবাটা, টামেটো আর ডুমোডুমো আলু দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি পোনার কালিয়া ? আমাশা রোগীর জন্য সেই ঝোলে একটুকরো কাঁচকলা ফেলে দিলেও মন্দ নয়। এই শিলে বাটা জিরে-ধনে-গোলমরিচের যে কত গুণ তা আয়ুর্বেদ পড়লে জানা যায়।
এক টুসকী কাগজী লেবুর রস দিয়ে এই পাতলা ঝোল যেন গ্রীষ্মেবর্ষায় অমৃত। বাটির ঝোলে আবার বাকী লেবুটুকুনি নিংড়ে স্যুপের মত খেলেও পুষ্টি। এত রিফ্রেশিং এই ঝোল ভাত যে খেলেই মনে হয় পুকুরে ডুব দেবার অনুভূতি। তবে মা বলতেন ঝোলের মাছ যেন খুব টাটকা হয়। আর সবজীগুলো ভেজে নিয়ে জিরে অথবা পাঁচফোড়ন দিয়ে ভাজা মাছ, সবজী সেদ্ধ হবার পর নামানোর ঠিক আগে দেবে ঐ জিরে-ধনে-গোলমরিচ বাটা। তবেই হবে ঝোলের আসল স্বাদ। মশলার গুণও বজায় থাকবে।
 এছাড়া এই একেঘেয়ে রুই কাতলার বাঙালী ঘরোয়া পার্টিতে আরো অনেকভাবে ধরা দেয়। মাছ সেদ্ধ করে মাছের কাঁটা বেছে নিয়ে চপের মত পুর বানিয়ে ফিশ ক্রোকে, মাছের কচুরী, মাছের চপ,  টাটকা রুই- কাতলার পেটি দিয়ে দৈ-মাছ, কোর্মা, মাছের পোলাও, আরো কত বলব ! ঘটি হেঁশেলে শুঁটকি ফুটকির নো এন্ট্রি !  তাই বেশীরভাগ ঘটিবাড়িতেই রুই-কাতলা-ভেটকি-পার্শ্বে, চিংড়ি, ইলিশ, ক‌ই, ট্যাংরা আর মৌরলা নিয়ে মজে থাকতে হয় বারোমাস। 

আমার দিদিমা খাস উত্তর কলকাতার কুটিঘাটের ব্যানার্জি পরিবারের মেয়ে। বয়স মাত্র এগারো। ঐটুকুনি মেয়ে বিয়ের কি বোঝে! সে আবিষ্কার করতে শুরু করেছিল গ্রাম্য পরিবেশের মাধুর্য্য। গাছের ফলপাকড়, টাটকা শাকসব্জী, নদী-পুকুর থেকে মাছ ধরে আনা সেই বিবাহিতা কিশোরীর কাছে যেন বিস্ময় তখন। শ্বশুরবাড়িতে  দুপুর হলেই পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা ছিল তার কাছে এক আশ্চর্য্যের বিষয়।
দিদিমার মুখে গল্প শুনেছি শাশুড়ি, ননদ ভাজের মধুর সম্পর্কের কথা।  নতুন বৌ হয়ে তিনি  শ্বশুরবাড়ি যাবার পর তাঁকে এত যত্ন তাঁরা করেছিল যে তিনি মারা যাবার শেষদিন বধি বলে গেছেন সে কথা। দিদা ছিল বাড়ির মেজবৌ। ননদরা নদী থেকে সদ্য ধরা ট্যাংরামাছ ভাজা আর তেল দিয়ে একথালা ভাত দিয়ে নতুন বৌকে বসিয়ে আদর করে খেতে দিয়েছিল। নদীর টাটকা মাছ আর অমন যত্ন দিদার মাও বুঝি করেনি তাকে..তিনি বলতেন।
অনেকেই এই ট্যাংরামাছ পিঁয়াজ দিয়ে খান তবে আমাদের ঘটিবাড়িতে রাঁধবার ধরণটা সম্পূর্ণ আলাদা। মাছ ভাল করে ভেজে নিয়ে সরষের তেলে পাঁচফোড়ন দিয়ে টমেটো কুচি, কাঁচালঙ্কা, কড়াইশুঁটি আর সর্ষে-শুকনো লঙ্কাবাটা দিতেন মা। মাছ সেদ্ধ হলে বেশ গায়ে মাখামাখা এই ট্যাংরার ঝালে এবার সর্ষের তেল ছড়িয়ে  গরগরে করে নামিয়ে যে পাত্রে রাখবে তার মধ্যে ছড়াও একটু গরমমশলা। ব্যাস! দিদিমার হাতে এই রান্নার স্বাদ আর কোথাও পাইনি। শীতকালে গরমমশলার বদলে ধনেপাতা কুচিয়েও দেওয়া যায় ওপর থেকে। 
মামাবাড়িতে এক প্রকান্ড বাঁধানো পুকুর ছিল। আমার দিদিমার নেশা ছিল লাল শান বাঁধানো পুকুরের ঘাটের সিঁড়িতে বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরা। সেই টাটকা মাছের কাঁচা ঝাল দিয়ে গরম ভাত হত সেদিন রাতের আহার। মায়েরা তাদের ছোটবেলায় ঐ পুকুরে গরমের ছুটিতে সব তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে চানে নামত। প্রত্যেকের লাল গামছা পুকুরের জলে ফেলে ছোট ছোট চিংড়িমাছ ধরত। এবার চান সেরে যে যার মত বাগানের কোনে কাঠকুটো জ্বেলে ছোট কলাইয়ের বাটিতে সেই মুঠোমুঠো  জ্যান্ত চিংড়িমাছ, ঝিরিঝিরি  আলুর কুচি, কাঁচা সর্ষের তেল, নুন, হলুদ আর চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে বসিয়ে দিত। বাটিতে হয় বলে এর নাম বাটিচচ্চড়ি। পংক্তিভোজে দুপুরের খাবার সময় যে যার নিজের বাটি নিয়ে বসে পড়তে মাটিতে। বাড়ির বড়রা তা দেখে তাজ্জব হয়ে যেতেন। এখনো বাটিচচ্চড়ি রাঁধি তবে জ্যান্ত মাছ আর পাই ক‌ই? 
দাদামশাই এই বাটিচচ্চড়ি খেতেন আর বলতেন, তোমাদের কোফতা কালিয়া চুলোয় যাক্‌! আজ এটা আর খাবনা, খেলেই তো ফুরিয়ে যাবে। বরং বাটিটা মাথার বালিশের পাশে নিয়ে শুই। কত সম্মান ছিল এই বাটিচচ্চড়ির মত সাধারণ পদটির। 
রবিঠাকুরের প্রিয় খাবারের তালিকায় ছিল পান্তাভাত আর চিংড়িমাছ ভাজা। তাঁর লেখা কবিতাতেও প্রচুর পাই এমন চিংড়ির কথা। 

তিমি ওঠে গাঁ গাঁ করে
চিঁ চিঁ করে চিংড়ি
ইলিস বেহাগ ভাঁজে
যেন মধু নিংড়ি।
অথবা 
মাছ এল সব কাৎলাপাড়া, খয়রাহাটি ঝেঁটিয়ে ,
মোটা মোটা চিংড়ি ওঠে পাঁকের তলা ঘেঁটিয়ে ।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে সহজপাঠ দ্বিতীয় ভাগের সেই কথা...
"কাংলা, তোর ঝুড়িতে কী? ঝুড়িতে আছে পালং শাক, পিড়িং শাক, ট্যাংরা মাছ, চিংড়ি মাছ। সংসারবাবুর মা চেয়েছেন'

সে ছিল অনুঃস্বরের অধ্যায়। চিংড়ি আমাদের নিজের হাতে বেছে খেতে দেওয়া হতনা। কারণ সহজপাঠ পড়ুয়াদের পেটখারাপ হবে তাই।  
আজকাল হোটেলে ডাবচিংড়ি নামে একটি মাগ্যির ডিশ সার্ভ করা হয়। মামারবাড়িতে ডাব দিয়ে নয়। নারকোলের শাঁসসুদ্ধ দুটি মালার মধ্যে বাগদাচিংড়ি সর্ষে-পোস্ত-কাঁচালঙ্কা বাটা দিয়ে মেখে, কাঁচা সর্ষের তেল, হলুদ, লঙ্কা, নুন দিয়ে নারকোলের মালায় রেখে এবার নারকোলটিকে বন্ধ করে সেই ফাটা অংশে ময়দার পুলটিশ লাগিয়ে মরা উনুনের আঁচে ঐ নারকোলটি রেখে দেওয়া হত ছাইয়ের ভেতরে । ঘন্টা দুই পরে তাক লাগানো স্বাদ ও গন্ধে ভরপুর ভাপা চিংড়ি নাকি খুঁড়লেই বেরিয়ে আসত নারকোলের শাঁসের সঙ্গে। চিংড়ির মালাইকারীও এভাবে রাঁধা হয়েছে বহুবার। সেখানে সর্ষের বদলে পিঁয়াজ, আদা-রসুন গরমমশলা বাটা আর তেলের বদলে ঘি দেওয়া হত। পোলাও সহযোগে এই মালাইকারী জমে যেত। 
চিংড়ি মাছের কথা উঠলেই মনে পড়ে যায় আমার এক মামার কথা। উনি খুব রগুড়ে ছিলেন। ওনাদের সময় কত্তবড় চিংড়ি খেয়েছিলেন তা বোঝানোর জন্য উনি একবার বলেছিলেন" জানিস? এ আর কি চিংড়ি? এ তো লবস্টার কো বাবালোগ। আমরা যে চিংড়ি খেয়েছি তার খোলাগুলো ডাস্টবিনে পড়ে থাকলে তার মধ্যে দিয়ে কুকুরের বাচ্ছা ঢুকতো আর বেরুত।"  
চিংড়ি আর কাঁকড়া মাছ নয় বলে আর সম্পূর্ণ অন্যজাতের সজীব বলে বুঝি ওদের এত স্বাদ। আঁশটে ব্যাপরটা নেই । আছে এক অন্য রসায়ন। সংস্কৃত শ্লোকে পর্যন্ত চিংড়ি নিয়ে ঠাট্টা পড়েছিলাম কল্যাণী দত্তের "থোড় বড়ি খাড়া' য়। 

গলদাং বাগদাং রস্যাং নারিকেল সমণ্বিতাম্‌
অলাবু লোভানাং কৃত্বা তক্ষিতব্যং শুভে যোগে।। 

অর্থটি খুব সহজ। নারকেল অথবা লাউয়ের সঙ্গে চিংড়ির কেমিস্ট্রিটা সবচেয়ে ভাল জমে যে কোনও শুভযোগে।

ঘটির হেঁশেলে সবকিছুতে চিংড়ি। রোজকার পদে একটি কুচো বা ঘুষো, চাবড়া (ধানক্ষেতের জলে হয়)   কিম্বা বাগদার পদ থাকবেই। সেটি হল সাইড ডিশ। বড় চিংড়ি দিয়ে মোচা, এঁচোড় কিম্বা ফুলকপি দিয়ে ডালনা হল রাজভোগ্য। সবকিছুর রেসিপিতেই সবজী ভেজে নিয়ে আদাবাটা, টমেটো, লঙ্কা দিয়ে গরগরে কালিয়া আর নামানোর আগে মোক্ষম অস্ত্র ঘি আর গরমমশলার কম্বিনেশান।   
আমার ঠাকুমার হাতের আরেকটি বিশেষ পদ হল চিংড়ি দিয়ে পটলপোস্ত। শুধু পাঁচফোড়নের মহিমা আর লঙ্কাবাটার প্রশ্রয়ে পোস্তর সাথে ভেজে নেওয়া কুচোনো পটল, আলু আর নামানোর সময় কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে শুকনো ভাতে মেখে খাও।  
 চিংড়ির পরেই মনে পড়ে কাঁকড়ার কথা। কেউ বলে দশরথ। সকালবেলায় এর নাম নিলে নাকি দিন খারাপ যাবে,  যত্তসব কুসংস্কার বাঙালীর।  অথচ তার স্বাদ নেয়নি  এমন বাঙালীর সংখ্যা বিরল। 
রসিক রবির গল্পে  পাকড়াশীদের কাঁকড়াডোবা অথবা ডিমভরা কাঁকড়ার কথায় মনে পড়ে মেয়ে কাঁকড়ায় ডিম হয় বলে ছেলে কাঁকড়া কিনলে নাকি মাস বেশী পাওয়া যায়। যাদের এলার্জি তারা এ স্বাদের ভাগ পাবেনা। দাঁড়াগুলো ভেঙে নিয়ে চুষে রস বের করতে ছোটবেলায় আমাদের সারাটা দুপুর কাবার হত। হাতের এঁটো শুকিয়ে যেত। ভাত শেষ হয়ে যেত। কাঁকড়ার এমনি মোহ। কেউ রাঁধে পিঁয়াজ-রসুন-আদা দিয়ে রসা। তার এক স্বাদ। তবে সর্ষে কাঁকড়ার ঝাল অন্যরকম। কাঁকড়ার গন্ধটা পুরো পাওয়া যায়। আর তার পা গুলো দিয়ে পুঁইশাক চচ্চড়ির স্বাদ অনবদ্য।
বৈষ্ণবরা নাকি এ রসে বঞ্চিত তাই ঠাট্টা করে ট্রেনে এক বৈষ্ণবের পাশে বসে একজন শৈব গেয়েছিলেন
"বোষ্টম টমটম, হাঁড়ির ভেতর কাঁকড়া রেখে যায় বৃন্দাবন' 
মানে শৈব গায়ক বোঝালেন, বোষ্টমরা চুপিচুপি সব‌ই খায় তাদের যত্তসব হিপোক্রেসি। 
আমরা বলি কাঁকড়া অযাত্রা অথচ সংস্কৃতের পঞ্চতন্ত্রের গল্পে রয়েছে এই কাঁকড়াই নাকি সাপকে মেরে এক বণিকের পুত্রের জীবন বাঁচিয়েছিল । 
বিদেশের ট্রাউটের সমগোত্রীয় হল আমাদের ভেটকী। ভেটকীর ফ্রাই বা ব্যাটারে ডুবিয়ে ফিশ ওরলি নেমন্তন্ন বাড়ির মোষ্ট ফেবারিট।  ফিশ ফিঙ্গার হল কেতাদুরস্ত ককটেল স্ন্যাক। দুধসাদা টার্টার সসে একটি একটি করে ডুবিয়ে মুখের মধ্যে পুরে আলতো চাপ দিলে আদা-রসুন সমন্বয়ে ভেটকিফিলের এই  স্লিম আঙুল তখন ফুলে উঠেছে ডিম আর বেডক্রাম্বের কোটিঙয়ে ।  কিন্তু ভেটকীর সর্ষেবাটা ও আদা দিয়ে ঝাল অথবা শীতের মরশুমী ফুলকপি দিয়ে কালিয়া কিম্বা কাঁটাচচ্চড়ি হল আটপৌরে বাঙালীর আভিজাত্যপূর্ণ সাবেকী ডিশ। এখন কলাপাতায় মুড়ে ভেটকীর ফিলে দিয়ে পাতুড়ির খুব চল। আমি এই রেসিপিকে একটু মডিফাই করেছি। কলাপাতার বদলে পুঁইশাকের পাতায় কিম্বা লাউপাতায় মুড়ে ননস্টিকে এই পাতুড়ি করলে পাতার মধ্যে লেগে থাকা তেলমশলা সমেত এই পাতুড়িটা ভাতে মেখে খেয়ে ফেলা যায়।
ঘটিবাড়ির আরেকটি প্রধান মাছের রান্না হল মৌরলার টক। তেঁতুল অথবা আমের টক করে নিয়ে তার মধ্যে মুচমুচে করে ভাজা মৌরলা ভেসে থাকবে। আর সরষে ফোড়নের সঙ্গে তার রসায়নে যে রসনা সৃষ্টি হবে তা যেকোনো ঋতুতেই শেষপাতে দৌড়বে। অরুচির রুচি আনবে। এই মৌরলা মাছ শানের মেঝেতে রেখে একপ্রকার ডলে নিতেন মা। তার ন্যানো সাইজের আঁশগুলো বেরিয়ে যাবে আর পেটটা ধরে আলতো করে চাপ দিলে পিত্তিটা বেরিয়ে যাবে।  পিত্তিসমেত রান্না করলে দশসের দুধে একফোঁটা গো-চোনার সামিল হবে সেই তেতো পদটি।
এবার আসি বাঙ্গালীর আদরের রূপোলী সজীব শস্যে।  ঝিরঝির করে অবিরাম ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেই থাকবে আর ঠিক তখনি ঝাঁকেঝাঁকে গভীর জলের এই ইলিশমাছ সমুদ্রের নোনা জল সাঁতরে, জোয়ারের আনুকূল্যে  স্বল্প পরিশ্রমে,  নদীর কাছে আসবে, আমাদের ধরা দিতে। বলবে, বাঙ্গালী, তোমার জলকে নেমেছি।
ছোটবেলায় সবচেয়ে মজা ছিল রেনিডেতে  হঠাত ইলিশের গন্ধটা। হঠাত ছুটির সাথে বৃষ্টি আর হঠাত পাওয়া ইলিশের অনুষঙ্গে মন কানায় কানায় !
মায়ের সারপ্রাইজ। উনুনের পিঠে হাঁড়ির মধ্যে গরম ভাত আর তার মুখে চাপা দেওয়া একটা টিফিনকৌটোর মধ্যে বন্দী ইলিশমাছের ভাতে বা ভাপা । হলুদ পড়বেনা এই পদে।টাটকা মাছের গন্ধ নষ্ট হয়ে যাবে।  কৌটোর মধ্যেই নুন মাখানো ইলিশের গাদা-পেটি সর্ষে, কাঁচালঙ্কা বাটা, কাঁচা সর্ষের তেল আর বেশ কয়েকটি চেরা কাঁচালঙ্কার সাথে জারিয়ে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে মিনিট দুয়েক রেখে দিলেই এই অমূল্য পদ তৈরী।  আমার রন্ধন পটিয়সী দিদিমা তার বিশাল সংসারে বিরাট এক হাঁড়ির মুখে বিশাল এক কচুপাতার মধ্যে মাছগুলিকে ম্যারিনেট করে পাতাটি সুতো দিয়ে বেঁধে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে রাখতেন। মা বলত, সে ভাপা ইলিশের নাকি অন্য স্বাদ। দিদিমার নাতনী মানে এহেন আমি একটু ইম্প্রোভাইজ করে এই কায়দাটি করি লাউপাতায় মুড়ে এবং ননস্টিক প্যানে অর্থাত পাতুড়ির স্টাইলে। যাই করো এ কানুর তুলনা নেই। কাঁচা তেলঝাল, ভেজে ফোড়ন দিয়ে ঝাল, গায়ে মাখামাখা হলুদ সর্ষেবাটার ঝাল, বেগুন দিয়ে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বাঙালদেশের পাতলা ঝোল...সব‌ই যেন এই বর্ষায় দৌড়তে থাকে গরম ভাতের সঙ্গে। 
তাবে আমি বাপু রসুন-পেঁয়াজ-আদা সহযোগে ইলিশমাছের স্বাদ ও গন্ধ কোনোটাই পাইনা। এমনকি কাঁটা বেছে খেতে যারা ভয় পায় তাদের স্মোকড হিলসা অথবা ইলিশ বিরিয়ানীর স্বাদেও আমি বঞ্চিত কারণ সেক্ষেত্রে যেন মনে হয় মাছটাই নষ্ট হল। 
ইলিশমাছের কিছুই যায়না ফেলা। মাথা আর তেল দিয়ে ছ্যাঁচড়াও আমাদের ঘটি হেঁশেলের একটি অভিনব বর্ষার পদ। সাদাভাত অথবা খিচুড়ি দিয়ে জমে যায় এই চচ্চড়ি। সর্ষের তেলে মুচমুচে করে মাথা ভেজে নিয়ে ঐ তেলের মধ্যেই পাঁচফোড়ন আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে দুনিয়ার সবজী অর্থাত আলু, মূলো, কুমড়ো, ঝিঙে বেশ করে নেড়ে নিয়ে পুঁইশাক ডাঁটা ও পাতা দিয়ে ঢেকে দাও। নুন, হলুদ ছড়িয়ে দাও। কুচোনো থোড়, বাঁধাকপিও দিতে পারো সাথে। তারপর নুন, হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো, চিনি আর নামানোর আগে সর্ষেবাটা দিয়ে নাড়তে থাকবে। এটাই হল সফল ছ্যাঁচড়া টেষ্টি হবার উপায়। মা বলতেন, যতক্ষণ না অবধি কড়ায় "লাগা লাগা' অর্থাত একটু পোড়া পোড়া হবে ততক্ষণ রাখতে হবে আঁচে। সিল্ক পিওর কিনা পরখ করতে গিয়ে দাদু বলতেন, শাড়ির কোল আঁচল থেকে একগাছি সুতো পুড়িয়ে যদি "ছ্যাঁচড়া পোড়া' অর্থাত একটা মেছো অথচ পোড়া গন্ধ পাওয়া যায় তবেই সেটি আসল সিল্ক। তার মানে বুঝেছিলাম ছ্যাঁচড়া কড়ায় একটু লেগে গেলে তবেই হবে অথেন্টিক।আর যেহেতু পিওর সিল্ক হল ফাইব্রাস প্রোটিন জাতীয় তা পোড়ালে ঐ গন্ধ পাওয়াটা কিছু অস্বাভিক নয়। 
ঘটি হেঁশেলে রুই বা কাতলার মুড়ো দিয়ে সোনামুগ ডাল ভেজে নিয়ে করা হয় মুড়িঘন্ট বা মাছের মাথা দিয়ে ডাল। এ এক উপাদেয় যজ্ঞ্যিবাড়ির পদ। বাঙালবাড়িতে এটাই রাঁধা হয় সুগন্ধী আতপচাল দিয়ে। বাকীটুকু এক‌ই রকম। শুরুতে মাথা ভেজে নিয়ে পিঁয়াজ, রসুন আদা, টমেটো কষে ওরা দেয় সেদ্ধ করা ভাত আর আমরা তার মধ্যে দি সেদ্ধ করা সোনামুগ ডাল। তারপর ঘি, গরমমশলার ছোঁয়া আর চিনির স্পর্শে তা যেন হয়ে ওঠে অমৃত ডাল। একঘেয়ে ডালের থেকে ধোঁয়া ওঠা এই ডাল বরং ক্ষুধার উদ্রেক করে। আর মাছের মুড়োয় যেন অল্প মাছ থাকে আর ডাল ফোটার সময়  মুড়ো একটু ভেঙে দিতে হয়। হলুদ সোনামুগ ডালের মধ্যে চেরা সবুজ কাঁচালঙ্কার অনুষঙ্গে এই ডাল শুধু ডাল নয় বরং একটি সম্পূর্ণ পদ। 
মনে পড়ে কোনও এক পৈতেবাড়ি আর সাধভক্ষণের দ্বিপ্রাহরিক নিমন্ত্রণে এই ডাল দিয়ে তপসে মাছের ফ্রাই খেয়েছিলাম।  অতুলনীয়  সেই যুগলবন্দী। এই তপসে মাছ সন্ন্যাসীর মত শ্বশ্রুগুম্ফ যুক্ত আর তপস্বীর মত গেরুয়া পোষাক পরিহিত অর্থাত তার ল্যাজা মুড়ো, পাখনা, দেহের রং সবেতেই গেরুয়া রঙের ছোঁয়া। এ মাছের ভাজা বানানো অতীব সহজ। আমার শাশুড়িমা বাড়িতে এনে মাথার কাঁটা দিয়ে এর পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুঁড়ি, পিত্তি টেনে বের করতেন। কারণ কেটে ফেললে মাছ ভাজতে গিয়ে ভেঙে যাবে তাই। তারপর ড্রেশ করা সেই মাছ রগড়ে নিয়ে আঁশ বের হয়ে গেলে, ধুয়ে এক টুসকী পাতিলেবুর রস, নুন আর সামন্য হলুদ দিয়ে জারিত করতেন।  কিছু পরে এর মধ্যেই আদা-রসুন কাঁচালঙ্কা বাটা নরম হাতে মাখিয়ে দিতেন । পড়ে থাক তেমনি করে অন্ততঃপক্ষে ঘন্টাখানেক। ওদিকে ব্যাটার তৈরী হল দুরকমের বেসন (ছোলা ও মটরের), ঠান্ডা জল,  নুন, হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো, পোস্তদানা আর কালোজিরে দিয়ে। এবার ব্যাটারটি হবে নাতি পাতলা নাতি ঘন অর্থাত মাঝামাঝি। এবার সে মিশ্রণ ফ্রিজে রাখতে হবে। তারপর খাবার সময় কড়াইতে সর্ষের তেল গনগনে করে গরম করে ঐ মিশ্রণে চালের গুঁড়ো ছড়িয়ে একটি একটি করে মাছের গায়ে অতি সন্তর্পণে কোটিং করে ভাজতে হবে আঁচ কমিয়ে বাড়িয়ে। ছোট সাইজের গুর্জাওলি মাছও এমন করে ফ্রাই করলে মন্দ লাগেনা খেতে। 
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে এই অনুপম তপসে মাছের কথা। 

তপ্ত তপ্ত তপসে মাছ, গরম গরম লুচি,
অজামাংস ভাজাকপি আলু কুচি কুচি।
শীতের দিনে খাবে যদি তুলে থাবা থাবা
দশ নম্বর পদ্মপুকুর দৌড়ে এস বাবা। 

আরেকটি সামুদ্রিক মাছ হল ফ্যাঁশা। ইলিশের মত রূপোলী, ঝকঝকে দেখতে। দামও বেশ কম। নদীর ফ্যাঁশার স্বাদ সমুদ্রের চেয়ে ঢের ভাল। সমুদ্রের গুলো হয় বড় আর নদীর গুলো হয় অপেক্ষাকৃত ছোট। এই ফ্যাঁশামাছ ডালের সাথে প্রথম পাতে মুচমুচে ভাজা আর বড়ি আর সর্ষেবাটা দিয়ে গায়ে মাখা ঝাল ঘটিদের আরেকটি প্রিয় পদ। 
 
মাছভাজার কথা বললেই মনে পড়ে যায় অরুচির রুচিকারক ঘুষোচিংড়ির বড়ার কথা। এর দোষ একটাই বড্ড তেল লাগে ভাজার সময়। তবে যারা এই ঘুষোচিংড়ির বড়া খায়নি তারা একবার খেলে আর ভুলতে পারবেনা। অনেকের কাছেই এ হল সস্তার মাছ, গরীবের খাবার অথবা খেলে "পেটের অসুখ করবে' টাইপ। কিন্তু ভাল করে ধুয়ে বেছে নুন, হলুদ, পোস্তদানা, কাঁচালঙ্কা কুচি আর বেসন ছড়িয়ে এই বড়া ডালের সাথে অথবা অম্বলে ফেলে খেতে বড়ো ভাল লাগে। 
ঘুষোচিংড়ির কথাতে মনে পড়ে কবি ঈশ্বর গুপ্তকে।

"দীনের তারণকারী চিংড়ির ঘুষো
সুমধুর বাতহর পয়সায় দুশো'


আজকের সফিষ্টিকেটেড মডিউলার কিচেনে মাছকাটা কিম্বা আঁশবটি ব্রাত্য কারণ স্থানাভাব। কিন্তু বাবা বলতেন পরিপাটি করে মাছকে কেটে সাজিয়ে রান্নার উপযুক্ত করে তোলাটাও হল এক শিল্প। তাইতে মনে হয় তখনকার দিনে মেয়েরা  বেশীর ভাগ বাড়িতেই আটকে থাকতেন। কর্তামশাই বাজার থেকে মাছ এনে দিলে তবে তিনি সেই কর্তণ পারিপাট্য দেখাবেন। কারণ যে রাঁধে সে মাছও কাটে। আর কথাতেই বলে মাছ ধুলে মিঠে, মাংস ধুলে রিঠে। তাই তেল, পোঁটা, আঁশ ফেলে কাটা মাছ ভালো করে ধুলে তবেই তা হবে সুস্বাদু। বাড়ির গিন্নীরাই সেই কাজটি করতেন সে যুগে।  এসব আজকের বদলে যাওয়া গতিশীল দুনিয়ায় স্বপ্ন। বিশ্বায়নের যুগে  হংকং থেকে হনললু, টরোন্টো থেকে টেক্সাস কিম্বা লন্ডন থেকে লাসভেগাস সর্বত্র মাছ কিচেনে প্রবেশ করে বরফের সমাধি থেকে। কখনো বা ক্যানবন্দী হয়ে। এমনকি আমাদের ভারতেও ডিপারটমেন্টাল স্টোরসের দুর্গন্ধময় ফিশকর্ণার থেকে কেটেকুটে সোজা প্রবিষ্ট হয় বাড়ির ফ্রিজে। রান্নার মাসী তাকে কিভাবে ধুয়েছে তা দেখবার সময় নেই বাড়ির ব্যস্ত গৃহিণীর। এখনকার চালানীর মাছে শুনছি আধিক্য রয়েছে পর্যাপ্ত কীটনাশক অথবা মাছকে বহুদিন তাজা রাখবার রাসায়নিক। তাই বারেবারে ধোয়াটাও খুব জরুরী। তার চেয়ে মনে হয় বাজার থেকে জিওল মাছ খাওয়া অনেক বেশী পুষ্টিকর। আর অল্পসংখ্যক চুনোচানা মাছ নিয়ে যারা বাজারে বসে সেগুলি বোধহয় স্বাস্থ্যকর । এদের মাছের স্বাদও ভাল আর রিস্কফ্যাক্টরও কম।

শিলাদিত্য ডিসেম্বর সংখ্যা ২০১৬