২৩ জুন, ২০২০

জগাদা-কোভিড সিরিজ

হ্যাঁ গা বিমলা! দু সপ্তা কোয়ারেন্টিনেই নাহয় থাকব। তুমি মাঝরাতে চলে আসবে তো আমার ঘরে? তোমায় না দেখলে, না ছুঁলে আমার জীবন বড়থা মনে হয়। জগা দা হোয়াটস্যাপ করল।  বিমলা টাইপ করে...কি জানি বাপু! এখন ছোঁয়া বারণ। আমার যদি কোভিড হয় তখন তুমি তো আমার মাথাটাও টিপে দিতে পারবেনা।ঠুঁটো নাগর থাকার যে কি যন্ত্রণা তা আমার চেয়ে আর কে ভালো বুঝবে? কি যে দরকার ছিল এবছর তোমার এই মহাস্নানের! বলে তাত সয় তো বাত সয় না। বারণ তো শোনো না। এবার জ্বর তো আসবেই। তারপর তুমি আবার ওষুধ গিলবে না। আমায় পাঁচন বানিয়ে মরতে হবে। আমার হল মহা জ্বালা।তারপর তোমার হলে তোমার ঐ সাগরেদ দুজনেরও হবে ছোঁয়া লেগে।     কিচ্ছু হবে না দেখো। আমি বলে দিলাম। আমার কাছে এসো রোজ রাতে একবার করে, আগের মতন। তোমার গায়ের গন্ধেই আমার সব টেনশন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।  আজ্ঞে মশাই গত তিনমাস আমার গায়ের ফুল চন্দন চর্চিত সেই গন্ধ আর নেই। আমি এখন সাফসুতরা শহুরে পটের বিবিদের মতন।বিমলা লিখল হোয়াটস্যাপে।    কিচ্ছু চিন্তা করোনা বিমলা। নারায়ণী শীর্ষদেশে, সর্বাঙ্গে বিমলা বাহিনী। জগা দা টাইপ করল। 
...
আমায় যেতিই হবে। আমায় যেতি দিতি হবেই।
সত্যিই তো! সম্বচ্ছর স্বেচ্ছায় নিভৃত যাপন করে তারা। বছরে একবার মোটে বাইরে পা দেয়। তাও আবার দিন সাতেকের জন্যি। তাদের বুঝি মনের ভেতরটা হু হু করেনা?
বেড়াতি যাবুই আমরা। তায় এবছর কতদিন বাইরের লোকের পর্যন্ত মুখ দেখিনা!

গতকাল রাত অবধি দোটানায় ছিল তিন ভাইবোন। একবার ব্যাগ গুছোয় তো আরেকবার সব ঢেলে ফেলে দেয় মনের দুঃখে। উত্তেজনা তার‌ই তুঙ্গে। কি পরবে? কি মাখবে? কি গয়নাগাটি সঙ্গে নেবে? আর উত্তেজনা বড়জনের। সঙ্গে যাবে সাতদিনের মত সোমরস। তার তোড়জোড় নিখুঁত করে। সঙ্গে মুখরোচক সব স্ন্যাক্স। নিমকিই হরেক কিসিমের। ভাজা মশলা দেওয়া শুকনো সিঙ্গারা। রকমারি বাদাম। শুকনো ফল। বেসনের ভাজাভুজি। জগা দা ভাইবোনের কথা ভেবে অস্থির ছিল এ ক'দিন। যাব কি যাব না। ভেবেই অস্থির সে। প্রতিবছর বিমলি যা ক্ষেপে থাকে তাদের তিন ভাইবোনের এই বেড়াতে যাওয়ার ধুম দেখে! এবার কি ভাগ্যি সে সিনে নেই! নিজেই কোয়ারিন্টিন করে রেখেছে নিজেকে তার কারণ অবিশ্যি কোভিড নয়। অম্বুবাচী পড়ে গেছে বলে। জগাদা বলে বলে থকে গেছে বিমলি কে।
বছরের ঐ চারদিন তুমি যে কি কর! এত্ত ছুঁতমার্গ এ যুগে হয়না বিমলি।
বিমলি নারাজ। চারদিনের চান হোক। আবার এসো আমার ঘরে।
এ যুগে আমার এসব ভালো লাগেনা বিমলি।
এই করতে করতে অবশেষে মধ্যরাতে অনুমতি এয়েচে। হেডাপিস বলেছে, তারা বেড়াতে যেতে পারে। ব্যাস! এবছর নিজের গাড়ী বের করার রাস্তা বৃষ্টি তে ধুতেও হবেনা জগাদা কে। বৃষ্টি এবার আষাঢ়ের আগেভাগেই এসে গেছে।কিন্তু মাস্ক? সুভদ্রার মনখারাপ। সব সাজ নষ্ট হয়ে যাবে। বলরাম অবিশ্যি বয়সে সবার বড় তাই মাস্কটা বেঁধেই নিয়েছে মুখে। কোভিডে ধরলে নাকি রক্ষে নেই। জগাদা বিন্দাস। মাস্ক নামিয়ে রেখেছে। একবার নাকের ফুটো বের করে তো একবার থুতনিতে ঝুলিয়ে নেয়। যাবার আগেই বিমলি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পরিয়েই ছেড়েছে। তোমার না দিন পনেরো আগেই চান যাত্রায় বেদম চান করে জ্বর এয়েচিল! আমি ছিলুম তাই পাঁচন গিলিয়ে পথ্যি করেছি। তাই আজ সুস্থ হয়েছ! নির্লজ্জ, বেহায়া মিনসে ! মাস্ক পর মাস্ক। আর শোনো তিনজনের হ্যান্ড স্যানিটাইজারটা দয়া করে পকেটের মধ্যে রেখো না। বাইরেই রেখে দাও।
জগাদা ভাবে শালা! এমন রথ এ জম্মে বের করিনি! এর চেয়ে না যাওয়াই ভালো ছিল!

৩ জুন, ২০২০

অভিশপ্ত বুধবার


একডজন লকডাউনের বুধবার পেরুবো আজ। গত দুটো বুধবারের সেই অভিশপ্ত ঝড়ের রাতের দগদগে ঘা এখনো শুকোয় নি আমার। আজ আবারো বুধবার এসে পড়লেই বুক চিন্‌ চিন্‌ করছে। আড়ষ্ট হয়ে আছি। তার মধ্যে মৌসুমী বায়ুর কেরালায় প্রবেশ। মনসুন এসে গেলেই অন্যবার মনে হয় একটা ফিলগুড ফ্যাক্টর কাজ করছে আমাদের সবার। ভালো চাষবাস হবে, দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। জিডিপি বাড়বে সেই আশায়। এবার সে গুড়ে বালি। একে একে বিয়ের মরশুম বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ পেরিয়ে আবারো ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক মাসে কোনো শুভকাজ হবেনা বাঙালীর। এই বিয়ের মরশুমে প্রচুর বিক্রিবাট্টা হত। গয়না থেকে শাড়ি, উপহার থেকে খাবারদাবার, মুদিখানা মায় দশকর্ম, প্রসাধনী দ্রব্য থেকে তত্ত্ব সাজানোর ট্রে, ফুল থেকে মালা এমন কি ডেকরেটার থেকে কেটারার... সব ছোটো, বড়, মাঝারি ব্যাবসায়ীদের অর্থনৈতিক মাস এই মরশুম। আবারো অপেক্ষা অঘ্রাণের জন্য। এবছর পুজো, দেওয়ালি তেমন জমবে না। কিছুই কেনাকাটি হয়ত হবেনা। পৌষ আবার মলোমাস।  মাঘ-ফাগুনের পর আবারো চৈত্র মাসে কোনো শুভ কাজ নেই। এসব ভাবছিলাম আমার ভাঙা কাচের আদিগন্ত বিস্তৃত সেই দেওয়ালের দিকে চেয়ে।  হঠাত দেখি উল্টোদিকের একটি বাড়িতে বাঁশ বাঁধা হচ্ছে বেশ সমারোহে। আহা! হোক, হোক। বেশ কিছু লোকজন কাজ করছে। বিয়ে হবে হয়ত ঘটা করে। সব‌ই হয়ত পূর্ব নির্ধারিত। রান্নার ঠাকুর, ডেকরেটার, ফুল, মালা, মাছ, মাংস, শাড়ি গয়না সব কিনবে এই বাড়ির লোকজন। আহা! কিনুক, খরচা করুক। কেন‌ই বা তারা বিয়ে দেবেনা? কিন্তু বর্ষা যেন আর না আসে দাপিয়ে। ঝড় যেন আর না আসে অভিসারে। কিন্তু আজ যে আবার বুধবার। সে কি শুনবে?
গতকালই তো বর্ষার প্রিওয়েডিং ফোটোশ্যুট ছিল। ঘন মেঘনীল শিফনশাড়ি, জলের ফোঁটার মত স্পার্কলিং মুক্তোর গয়নায় কাল দারুণ সেজেছিল মেয়েটা। সবচেয়ে সুন্দর ছিল চোখের মেকআপ। ঘনকালো চোখের পাতা ছুঁয়ে আকাশী রং লাইনার।বিয়ের আগের দিন সব মেয়েদের চোখ থাকে এমনই নরম। তারপর সব কেমন বদলে যাবে টুক করে। নরমে গরমে সেই চাউনিই হবে কাল। ভাবী বর মেঘও কাল ছিল অন্যপুরুষ। পরণে ছিল নেভিব্ল্যু রেশমি  শেরওয়ানি।সে ও বুঝি কঠিন হবে আগের থেকে। এই যেমন হঠাত এল করোনা, তার পেছন পেছন আমাপান। আবার আসছে নিসর্গ। কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগেনি বর্ষা আর মেঘের এবারের এই বিয়ের ভাবনা।

আমাদের জীবন কেমন বদলে বেরঙীন হয়ে গেল! সবটুকুনি কবে বর্ষার প্রিওয়েডিং ফোটোশ্যুটের মত আবারো রঙীন হয়ে উঠবে?