১০ সেপ্টেম্বর, ২০১০

ডাকপাড়ি


Lyrics: The Call by Regina Spektor: Chronicles of Narnia: Prince Caspian
অনেকদিন ধরে গানটি শুনে একটি কবিতার রূপ দিতে চেষ্টা করছিলাম । তোমরা প্লিজ ভিডিওটা শুনে আমার লেখাটি পড়ো । কারোর মতামত থাকলে জানিও|


এক টুকরো ছোট্ট অনুভূতি মনের কোণা বেয়ে বেয়ে
একটা ছোট্ট আশায় পরিণত হল,
ছোট্ট আশার চারাগাছ বুকের মাঝে ঢেউ তুলল এক শান্ত চিন্তার ।
জন্ম নিল একটি কথাগাছে, কথাগাছের শব্দলতারা ডালপালা মেলে
বিস্তার করল ভাষার মধ্যে,
বুকের মাঝে কথার কথায় সোচ্চারিত হল কথাটি
বার বার অনুরনিত হল কথাদের প্রতিধ্বনি শব্দকণায়, গানের মালায় ।
আমি আবার আসব ফিরে কথায় কথায়, গানের সুরে,
যখন তুমি ডাকবে মোরে,
শুধু বিদায় বোলোনা, বিদায়ের কোনো চিহ্ন রেখো না |

দেখ পাল্টেছে সবকিছু, কিন্তু তাই বলে ভেবোনা আগে এমন ছিল না

শুধু চিনতে চেষ্টা করো বন্ধুদের
যখন জীবনযুদ্ধে নামবে তুমি
সুদূর অন্ধকার দিগন্তে একটি তারার আলোকে অনুসরণ করে
পথ চলো, পিছু নাও তার
আর ফিরে এসো তখন যখন শেষ হবে তোমার কাজ
শুধু বিদায় বলো না, বিদায়ের কোনো চিহ্ন রেখো না |

আর ঐ যে শুরুতে বলেছিলাম সেই টুকরো অনুভূতির কথা,

তারা হয়ত জানেনা যে আমি বুঝি
আর তারা বোঝেনা বলে ভেব না অমি বুঝি না
তোমার স্মৃতিকণাগুলি তীক্ষ্ণ হতে তীক্ষ্ণতর হোক শুধু চাই এইটুকু |
যতক্ষণ তারা তোমার চোখের সামনে এসে ধরা দেয়
তুমিও এসে ধরা দিও যখন তোমাকে ডাকবে তারা
শুধু বিদায় বলো না, বিদায়ের চিহ্ন মুছে দিও |

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১০

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০

অর্কুট-আগমনী-পাঁচালী



সোনারতরীর পক্ষ থেকে সকলকে জানাই আগমনী শারদীয়ার অভিনন্দন 
 
 শুভেন্দু দাস
মন উদাসী 
মন চলে যায় দিগন্ত উড়ে..
বহুদূরে, অদ্রিজার হাত ধরে..
কোন ঠিকানায় কোন সে পারে..
অকূল আমি বুঝি নারে..
তবুও চলি, অদ্রিজার পায়ে পায়ে..
 ...
মন উদাসী, হাওয়ায় ভাসি,
এলোমেলো আগুণ 
বর্ষা নেই ভরসা নেই
সুদ চড়ছে দ্বিগুণ 

এলো খরা, মাথা ভরা
ফুটিফাটা চারধার
নেই আকাশে, মুখ ফ্যাকাশে
বন্ধ কাজ-কারবার  

এল আশ্বিন, বুকে নিযে ঋণ
চাষি খুজে ফেরে দেশলাই
হয়নিকো জামা কষ্ট যে জমা
দুর থেকে ডাকে রোশনাই 

মা যে আসেন, (মোদের) ভালোওবাসেন
(তবু) সবখানে কেনো হাসি নেই
এমনো তো হয় আনন্দেতে রয়
সক্কলে মিলে... সব্বাই !         

সুশান্ত কর
 শিশির ভেজা শিউলি তলে
রোদের লুটোপুটি;
পুজো মানেই ভিড়ের ট্রেনে
জানালা তোলা ছুটি

পুজো মানেই ঘরের টানে
বাঁধন যত ছেঁড়া;
কাশের বনে পথ হারিয়ে
ছেলে বেলায় ফেরা।

পুজো মানেই সে কবেকার
প্রেমতলার মোড়;
তনুদীপুর সাথে সেবার
মিশন রোডে ভোর

ছোট বৌদি চায়ের কাপে
কত দিনের পর;
পুজো মানেই, কোথায় থাকে
তরুণিমার বর?

এবং তারপর...

বিসর্জনে ঢাকের কাঠি
বেলুন সাদা লালে;
স্টেশন জুড়ে ধোঁয়া এবং
টোল পড়ে না গালে। 
 
 সঙ্ঘমিত্রা নাথ
এই শরতে
বৃষ্টিশেষে নীল আকাশে,
আলো হাসে শরত কাশে

শিশিরভেজা শিউলিবোঁটা,
প্রভাতবেলা উদ্ভাসিতা

এই শরতে প্রাণের মেলায়,
ভাসব আমার গানের ভেলায়

ছেলেবেলার ফুল কুড়োনোর দিন,
দুর্গাপুজোর আনন্দে রঙীন

শরত তোমার পুজোর গন্ধে,
ফিরে যাই কৈশোর আনন্দে
  
ইন্দিরা মুখার্জি
আমি বৃষ্টিভেজা বিকেল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম জেনো,

তুমি শিশির ভেজা পায়ে এসে আমার শব্দ শোনো,

আমি আগমনীর সুর তুলেছি শরত্‌ আলোর প্রাতে,

তুমি সেই সুরে যে সুর মেলালে আমার সাথে সাথে।

আমি অস্তরাগের রাগ-রাগিনী তোমার কান্না হাসি,

তুমিই আমার ইমন-বেহাগ তোমার কাছে আসি,

আমি তোমার দুখে দুখী, সুখের নতুন পাখী,

তুমিই আমার সুখের দোসর দুখ ভোলাতে ডাকি।

আমি অবাক হয়ে ভাবছি বসে আসছো তুমি রাণী,

তুমি সাজো নিজে, সাজাও আমায় ওগো আগমনী
বর্ণালী কর
শরত আলোর সকালবেলা শিউলিফুলের সুবাস ঢালা
কমলা সাদা রঙের মেলা শুরু হল তবে নেটের খেলা
দারুন ভালো লাগছে এমন কবিতাতে খেলা
যদি এমন করেই কেটে যেত আমার সকল বেলা
সুর বসিয়ে এ সব কথায় হতেই পারে গান
দরাজ গলায় গাইতে হবে জুড়ায় যেন প্রাণ
কল্যাণ মিত্র
কোন এক বিরহিণীর প্রতি শিউলি যখন হাসে
তখন তোমার চোখেতে জল আসে।
শিউলি মানেই তোমার বুকে জমাটবাঁধা ব্যথা -
সোনার আলো হারিয়ে যাওয়ার কথা।
শিউলি তোমায় নিজের সাথে সে-সব কথা বলায়,
চুপিসাড়ে তাই কি আসো শিউলিগাছের তলায় ?
...
পূজো এলে ছেলেদের যায়-যায় জান ,
সবুর সয় না বউ শাড়িগত প্রাণ ।
শাড়িতেই শেষ নয় হাত ধরে টানে –
শাড়ির ম্যাচিং জামা আছে কোনখানে ?
দিন কতো বদলায় চোখ মেলে চাই,
শাড়ি-গয়নার খিদে একই আছে ভাই !
কবিতা-কবিতা খেলা দেখ বেশ চলছে।
সবাই সবার কথা সবাইকে বলছে।
চলুক না এই খেলা এতো নয় মন্দ,
সব কবিতায় আছে পূজো-পূজো গন্ধ।
শরতের ওই হাসি চারধারে ঝরছে-
মিল-মিল এই খেলা ঝিলমিল করছে ।
...
পূজো ভীরু পায়ে আসছে।
হঠাৎ-হঠাৎ বৃষ্টিতে নেয়ে
পথঘাট সব ভাসছে।
এবার পূজোর থিম কি তাহলে
দেরি করে আসা বর্ষা ?
কলকাতা হলে জল কলকল
সব আনন্দ ফরসা !
কি খেল্ দেখাবে আকাশ এবারে ?
আঁটছে কি যে সে ফন্দি !
একগলা জলে একাকী প্রতিমা ?
দর্শক ঘরবন্দী ?
জলতরঙ্গে পূজো মাটি হলে
করার নেই তো কিছুর-ই!
শরৎকালের বর্ষা জমাতে
ঘরে-ঘরে হবে খিচুড়ি
অঝোর বারি নামছে
তাই অতএবমেজাজ গরম
কাব্যটাব্য থামছে!!
জলের ভেতর পা ডুবিয়ে
কেনাকাটায় কাঁটা
বলছে সবাই বৃষ্টিকে
তোর মুখে মারবো ঝাঁটা
কে কে রাজি ?ধরতে বাজি?
দেখবো কেমন দূরদৃষ্টি !
পূজোর দিনে রোদ থাকবে?
না কি ঝরবে ভারী বৃষ্টি?
দারুণ মজায় দিনগুলো সব
ফুচকা-রোলে লাগবে মিঠে?
না কি শাড়ি চুড়িদারে
উঠবে পথের কাদার ছিটে?
ফেলে আসা দিন হয়তো রঙিন
পথ যে অনেক বাকি,
ভ’রে মনপ্রাণ গাই তাই গান
এসো একসাথে থাকি।

আমরা এখানে স্বজন সবাই
একসুরে বাঁধা তার,
দূরে রাখি সব হতাশা-বিষাদ
মানি নাকো তাই হার,
হাতে ধরে হাত আমরা চলেছি
একপালকের পাখি।
 পূর্ণেন্দু চক্রবর্তী
শিউলিফুলের গন্ধ মানেই বাজলো পূজোর ঘন্টা
কাশ দুলিয়ে শরৎ এলো ভিজিয়ে দিলো মনটা
নড়বড়ে দাঁত কোমর ব্যাথা বুকের মধ্যে চিন চিন
পূজোর মধ্যে সেই ছেলেটা নাচবে তবু চারদিন ।।
মাগো এবার সামলে এসো , আবহাওয়াটা নয়কো ভালো
বর্ষাকালে খটখটে রোদ , শরৎকালে আকাশ কালো
জিনিপত্র বেজায় আগুন , এবার মাগো কি ভোগ নিবি
হাত পেতেছি তোর দুয়ারে , দু চার মুঠো ভাত তো দিবি ।।
ভয় নেই ভয় নেই বৃষ্টিতে ভাসবে
মেঘ জল থৈ থৈ তাই নিয়ে আসবে
ঢাক ঢ্যাম কুর কুর ঢং ঢং বাদ্যি
ধেই ধেই বাদ দেয় নেই কারো সাদ্ধি
আইস্ক্রিমের সাথে ফুচকাও জমবে
প্যান্ডেলে রোশনাই কলকাতা বোম্বে
ঝির ঝির ঝর ঝর ঝরছে তো ঝরছেই
এইবার রোদ্দূর মন মন করছে ।
...
সবাই বলে চিনি চিনি ক'জন পারে চিনতে
মুক্তো মানিক ছড়িয়ে আছে ক'জন পারে কিনতে ?
সবার মাঝে ঘুরে বেড়ায় তবু সবার নজর এড়ায়
"মুখের গড়ন দুর্গা যেন শিউলিছোপা শাড়ি
ও মেয়ে তুই কোথায় থাকিস কোনখানে তোর বাড়ি"
মধুমিতা ভট্টাচার্য
কাশ বনে হাওয়া খেলা দেখেছি সে কবে ...
মনে নেই আজ আর সেরকম ভাবে!
এখন সে খোলা মাঠে, নদির কিনারে
কাশ নয়, শুধু যে আকাশ চুম্বি খেলা করে ;
তবু করি করজোরে মায়ের বোধন
শিউলি গন্ধ ঢেলে পূজা আয়োজন
সোনালী শর্ত এল আবার জীবনে
দিব্য সুরের রেশ আগমনী গানে....
বাতাসে আজ শিউলি ফুলের গন্ধ
আকাশ জুড়ে শর্ত মেঘের আলো.
মা আসবেন, সেজেছে তাই ধরা
বাজাও শঙ্খ, লক্ষ প্রদীপ জ্বালো.
উঠোনে শিউলি পুকুরে পদ্ম কলি
কাশ বনে আজ হালকা বাতাস ছোটে
হৃদয়ে পুজোর আগমনী সুর বাজে
ভোরের আকাশে সোনালী সূর্য্য ওঠে
মহাশ্বেতা রায়
ওষ জড়ানো শরত ভোরে জানলা আধেক বন্ধ
বাগান থেকে ডাক দিয়ে যায় ভোরের শিউলি গন্ধ,
বড় হয়ে বদলাতে হয় চেনা জীবন ছন্দ
কিছু জানলা খোলা, আর কিছু জানলা বন্ধ।
মনের দরজা হয়ত খোলা, হয়ত আধা বন্ধ
ছোট্টবেলা ফিরিয়ে আনে সাঁঝের শিউলি গন্ধ।

অধরা মাধুরী
ও মেয়ে তুই থাকিস কোথায়, কোনখানে তোর বাড়ি?
মুখের গড়ন দূর্গা যেন শিউলিছোপা শাড়ি।
ও মেয়ে তোর এই অবেলায় চোখে কিসের জল
কাশের বনে নদীর কাঁপন করিস নে আর ছল।
ও মেয়ে তোর বুক গুড়গুড় মেঘলা আকাশ ডাকে
আয় তো দেখি বোস এখানে পদ্মবনের পাঁকে।

সিক্তা দাস
কৈ কৈ শরত কৈ মেঘজল সব থৈ থৈ
 ইন্দিরা মুখার্জি
দেখেছিস মা তুই কখনো মহালয়ার ভোর ?
সেই আদ্যিকালের বাদ্যিবাজা  শিউলিফুলের ঘোর! 
শিউলিছোপা দশহাতি তোর কমলা রঙের শাড়ি!
মা তোর কাশের ঝালর ঢাকের গায়ে পেঁজাতুলোর বাড়ি !
দেখেছিস মা তুই কখনো মহালয়ার ভোর ?    
সেই মাঝরাতের ঐ আগমনী-ভৈরবীর ঐ দোর !
শিশিরফোঁটায় দুব্বোঘাসে সবুজ কথা তোর 
খালিপায়ে একরত্তি মেয়ের  কত জোর ?
দেখেছিস মা তুই কখনো মহালয়ার ভোর ?

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১০

ফুলেদের কথা


একটা নিবিড় বন্ধুত্বের হাতছানিতে কাছে এসেছিল সাতজন ।
কি জানি কেমন করে কাছে এসে গেছিল এরা ।
হয়ত প্রকৃতির চালচিত্রের বদলানো রঙয়ের খেলায় মেতে উঠবে বলেই
কিম্বা সাতজনের মনে কিছু মিল হয়ত ছিল,
হয়ত বা ছিল পূর্বজন্মের কোনো ঋণ !
ত্রিতালের ঝঙ্কারে আগুণ তুলেছিল তারা সেই ফাগুণে,
সপ্তসুরের অণুরণনে কম্পিত হয়েছিল বোকাবাক্সের পর্দা !
সৃষ্টিসুখের উচ্ছ্বাসে, সুরসৃষ্টির উল্লাসের জোয়ারে,
তাদের মনোবীণায় বেজে উঠেছিল একটিমাত্র তান,
যা বলে দেয় প্রাণের কথা সেই গানের বার্তায় ।
হঠাত একটা তাল কেটে গেছিল ।
আজকের তিনটিকে ফেলে ঝরে গেছিল বাকী ফুলেরা।
কত বিনিদ্র রাত, কত অসহায়তার স্বীকার হয়েছিল তিনটিতে মিলে ।
কত ঝড়, কত বৃষ্টি দেখেছিল তারা ! 
তিল তিল করে বাঁচিয়ে রেখেছিল ফুলটির কুঁড়িকে
কেউ দিয়েছিল আড়াল, কেউ করেছিল আপন,
কেউ বাড়িয়েছিল অনুকম্পার হাত ।
আগলে রেখেছিল তারা তিনজন তিনফুল ।
আজ ছেঁড়া তার জোড়া হল আবার |
গোল ভূমন্ডলের একই মানচিত্রের অঙ্গনে,
অ-তিথি ছিল সেদিনের বাদলকালোয় ঝরাফুলেরা  
আর তিথি মেনে এসেছিল সেই বাকী তিনফুল
তাজা ফুলের মত, তারা হয়ে ।
সাক্ষী হয়ে র‌ইল লাল ফিতে, চিকন কাগজে মোড়া সেই অমূল্য রতন,
সেই শোধ না হওয়া পূর্ব জন্মের ঋণ !!!


১ সেপ্টেম্বর, ২০১০

জন নায়ক শ্রীকৃষ্ণ



মহাভারতের ইতিহাস, পুরাণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ও ভারতীয় জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সজ্গে তথ্যগুলিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করলে দেখা যায় যে মহাভারতের যুদ্ধ হয়েছিল খৃষ্টপূর্ব ৩০৬৭ তে। এই সালটি তাত্পর্য পূর্ণ ও ভারতের ইতিহাসের কালঘন্ট নিরূপণে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য । মহাভারতের যুদ্ধের দিন স্থির করার প্রথম ধাপ হল পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তারিখ নির্নয় করা। ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, ভাদ্রপদ মাসের কৃষ্ণাষ্টমীর পুণ্যলগ্নে যখন সোমশুভ্র চন্দ্র, রোহিণী নক্ষত্রে পদার্পণ করেছে, সময় তখন মধ্যযাম, প্রকৃতি তখন ভরাভাদ্রের অনাবিল আনন্দে রোরুদ্যমানা; মহামানবের আগমনবার্তা ঘোষণার তাগিদে অবিরাম বর্ষণ করে চলেছে আনন্দাশ্রু | তখনই জন্ম নিলেন শ্রীকৃষ্ণ যার বৃষরাশিস্থ লগ্নে চন্দ্র ছিল বিরাজমান। জন্মের পূর্ব মূহুর্তে অন্যান্য গ্রহগুলির মধ্যে পাঁচটি তাদের তেজোদৃপ্ত রূপ প্রদর্শন পূর্বক তুঙ্গস্থানগুলিতে এবং বাকী দুটি যেন নিজেদের মহিমা দীপ্তি অবগুন্ঠন করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে আশ্রয় নিল। কেউ একটু শীঘ্র, কেউ একটু বিলম্ব করল তাদের আবর্তনের গতি। এর ফলস্বরূপ মহামানবের সম্মিলিত গ্রহ-নক্ষত্রের জন্মকালীন অবস্থান অর্থাত সম্পূর্ণ ছকটি হল এক ও অদ্বিতীয়। লগ্ন এবং চন্দ্র ৫২ ডিঃ ১৫মিঃ রোহিণী নক্ষত্রে বৃষ রাশিতে । দেবগুরু বৃহস্পতি ৯১ডিঃ১৬মিঃ পুনর্বসু নক্ষত্রে, কর্কট রাশিতে । মহাদ্যুতি সম্পন্ন নক্ষত্ররাজ ভাস্কর ১৪৮ডিঃ১৫মিঃ উত্তরফাল্গুনী নক্ষত্রে সিংহ রাশিতে । শশীসুত, বালখিল্য, সৌম্যমূর্ত্তি বুধ ১৭২ডিঃ৩৩মিঃ কন্যা রাশির হস্তা নক্ষত্রে। ভৃগুর পুত্র, সর্বশাস্ত্রজ্ঞ, দৈত্যগুরু শুক্র ১৮০ডিঃ১৫মিঃ তুলা রাশিস্থ চিত্রা নক্ষত্রে । রবির ঔরসজাত, ছায়ার গর্ভসম্ভূত, গ্রহরাজ শনি ২০৯ডিঃ৫৭মিঃ তুলা রাশিস্থ বিশাখা নক্ষত্রে। ধরণীর গর্ভসম্ভূত কুমারমঙ্গল ২৭০ডিঃ০১মিঃ মকর রাশিস্থ উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্রে। রাহু মেষরাশিতে ১৬ডিঃ০১মিঃ ভরণী নক্ষত্রে এবং কেতু তুলা রাশিতে। শ্রীকৃষ্ণের জন্মসময় হল রাত ১১টা ৪০মি, শুক্রবার , ইংরাজি ২৭ জুলাই খৃষ্টপূর্ব ৩১১২ তে।[*]


মহাভারতের কাহিনীর আদিপর্বের শেষে আমরা কৃষ্ণের দেখা পাই দ্রৌপদীর স্বয়ংবরার বিশেষ শুভক্ষণেইতিমধ্যে কৃষ্ণ কংস নিধন করেছেন, যাদবরা কংসের শ্বশ্রুপিতা প্রবল পরাক্রমশালী জরাসন্ধের শত্রু হয়ে উঠেছে। যমুনার তীর থেকে বিতাড়িত যাদবরা, সমুদ্রতটে দ্বারকানগরীতে রাজ্য স্থাপন করেছে। যেখানে স্বয়ং দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ রাজত্ব করছেন। দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় রাজা রাজড়া উপস্থিত হয়েছেন। হাজির হয়েছেন দ্বারকারাজ শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর দাদা বলরাম---- দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবগত হওয়ার তাগিদে। এদিকে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন ব্রাহ্মণবেশী পঞ্চ পাণ্ডব। যদিও আত্মীয়তার সূত্রে কৃষ্ণ আবদ্ধ এদের সাথে,তবুও দরিদ্র ব্রাহ্মণের বেশভূষা দেখে এদের প্রথমে চিনতে পারেন নি তিনি। এবার তদানীন্তন ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর অর্জুনের শর নিক্ষেপের সাফল্যে উদ্বেলিত কৃষ্ণ পাণ্ডবদের পরিচিতি বুঝতে পারলেন। ঠিক এমনটি ই যেন চেয়েছিলেন তিনি। প্রাণাধিক পার্থ'র জন্য কৃষ্ণা দ্রৌপদী ই তো নির্ধারিত হয়ে রয়েছে। কিন্তু দ্রৌপদীর এত বিশাল সৌভাগ্য! না, পর্ণকুটিরে ফিরে এসে মাতৃ আজ্ঞাবহ পঞ্চপাণ্ডব একটি ফলের ন্যায় ভাগ করে নিলেন অর্জুনের পরম আকাঙ্খিত ,প্রিয়তমা নবোঢ়া কে। দ্বারকাধীশ, পিতৃস্বসা পৃথা কে শুভকামনা জানিয়ে পুনরায় ফিরে এসেছেন দ্বারকায়। শুধুমাত্র ক্ষণেকের উপস্থিতি, শুধু একটুকু ছোঁয়া দিয়ে দ্রুপদের রাজসভায় ক্ষণিকের অতিথি শ্রীকৃষ্ণ, সামান্য কৃপার দ্বারা বদলে দিলেন পাঁচ দরিদ্র ব্রাহ্মণভ্রাতার জীবন। পাঞ্চালী কে লাভ করে তাঁরা জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন। নির্মাণ হল ইন্দ্রপ্রস্থের রাজনগরী, রাজন্যবর্গের মধ্যে পঞ্চপাণ্ডব ,তাঁদের বীরত্ব, সততা, সাহস, সুকর্মের দ্বারা এবং সর্বোপরি রাজসূয় যজ্ঞের মাধ্যমে বিপুল খ্যাতি অর্জন করলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের জোগালেন শুভবুদ্ধি,চালনা করলেন শুভপথে। কিন্তু পাণ্ডবদের প্রতি কৌরবপক্ষের আমরণ অসূয়া এবং শ্রীকৃষ্ণের পাণ্ডবদের জন্য সদা ব্যাকুলিত হৃদয়, কৌরবদের ঈর্ষাকে উত্তরোত্তর বাড়িয়ে দিয়েছিল। যার ফলস্বরূপ ভারতবর্ষের ইতিহাসে রচনা হয়ে গেল ভয়াবহ সেই ঘটনাবহুল যুদ্ধ, কুরুক্ষেত্রের প্রাঙ্গণে দীর্ঘ আঠারো দিন ব্যাপী বয়ে চলল শোণিতের স্রোত, আর শ্যেন-শকুনের সোরগোলে সরগরম রণক্ষেত্রে কেবল পড়ে রইল শৃগালের অট্টহাসি, স্বামীহারানো নারীদের ক্রন্দন, আর পুত্রহারা ময়েদের বিলাপবহুল আর্তনাদ। শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে দূত রূপে অবতীর্ণ হয়ে পাণ্ডব ও কৌরবদের শুভবুদ্ধি উজ্জীবিত করে এই ভীষণ যুদ্ধকে এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু উভয়পক্ষের সমঝোতা হ্'ল না। অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। কারণ সর্বশাস্ত্রজ্ঞ , ভবিষ্যতদ্রষ্টা কৃষ্ণ বুঝেছিলেন যে যুদ্ধ বিনা গতি নেই। তাই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অনুঘটক রূপে কাজ করে ছিলেন তিনি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সকলের উদ্দেশ্যে প্রক্ষিপ্ত "মা ফলেষু কদাচন" --এই বাণীর সত্যতা ব্যর্থ হয়ে যাবে । সেখানেই তাঁর সার্থকতা একজন কূটনৈতিক রাজনীতিবিদ হিসাবে।

কিন্তু কি লাভ হ'ল? যুদ্ধের পরিনামে শ্মশানের শ'য়ে শ'য়ে জ্বলন্ত চিতার লেলিহান শিখায় পুড়ে ভস্মীভূত হ'ল অধোগতি মানুষের কলঙ্কিত,পঙ্কিল,পরশ্রীকাতরতা,ঈর্ষাপরায়ণতা, কলহপ্রবণতা, নীচতা,মূর্খতা আর যা কিছু ঘৃণ্য সবকিছু। শাস্ত্রকারের ভাষায়, ধর্মগ্লানি হলে অধর্মকে বিনাশ করার জন্য,ধর্মকে পুনরায় স্থাপন করার উদ্দেশ্যে ভগবান, অবতারের রূপ ধরে এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে থাকেন | অবতার ভগবানের একটি অংশ মাত্র। বিশেষ বিশেষ যুগে বিশেষ বিশেষ ধর্মগ্লানি হয়। তাই যুগের প্রয়োজনে ,ভিন্ন ভিন্ন রূপে তিনি অবতীর্ণ হ'ন এবং তাঁর বিচিত্র রূপ ও শক্তির প্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে।

মহাভারতের রচয়িতা বিশালবুদ্ধি ব্যাসদেব কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকে কেবলমাত্র অবতার বলে অভিহিত করেন নি। শৌর্য,বীর্য,ত্যাগ,প্রেম,অনাসক্তি এবং অন্যান্য দিব্যগুণে বিভূষিত কৃষ্ণকে 'কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং' [#] বলে চিহ্নিত করেছেন।

সাধারণ মানুষের কৃষ্ণচরিত্র সম্বন্ধে যে ধারণা আছে অর্থাত গোপিনীদের প্রেমিক কৃষ্ণ ,বংশীধারী,রাখালবালক রূপী কৃষ্ণ --এ সবের চেয়ে কৃষ্ণচরিত্র অনেকটাই ঊর্ধে। সকল অবতারত্বের সারটুকু দিয়ে তৈরী তিনি, বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সার্বজনীন নেতা। জগতের মঙ্গলের জন্য নিবেদিত প্রাণ তাঁর। যাঁর জন্য ধৃতরাষ্ট্রের পরামর্শদাতা সঞ্জয় উজাড় করে দিয়েছিলেন একরাশ স্তবকুসুমাঞ্জলি। যার অনুরণনে ধৃতরাষ্ট্রের সভাগৃহ একদিন হয়ে উঠেছিল কৃষ্ণ-স্তবস্তুতির এক মন্দির।

তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ বলে 'বসু'ও দেবের ও কারণ বলে 'দেব' অর্থাত বাসুদেব, তিনি বিশ্বের বিস্তার বলে বিষ্ণু, মায়াকে দূর করেন বলে মাধব, মধু নামক দৈত্যের হন্তারক বলে মধুসূদন, 'কৃষ্' মানে সত্তা আর 'ণ্' এর অর্থ হল আনন্দ-- এই দুয়ের সমারহে তিনি কৃষ্ণ । শ্বেতপদ্মের ন্যায় আঁখি বিশিষ্ট বলে তিনি হলেন পুণ্ডরীকাক্ষ, 'জন' নামক অসুরের দমনকর্তা বলে জনার্দন, সত্ত্বগুণ থেকে বিচ্যুত নয় বলে সাত্ত্বত। আবার যশোদা কর্ত্তৃক দাম অর্থাত রজ্জু দ্বারা উদরে আবদ্ধ হয়েছিলেন বলে তিনি দামোদর, নরগণের মুক্তির স্থান বলে নারায়ণ, পুরুষের শ্রেষ্ঠ বলে পুরুষোত্তম | তিনি ই সব বলে সর্ব,সত্যে প্রতিষ্ঠিত বলে 'সত্য' ।

যাঁর সহস্র কিরণের ছটায় একদা আলোকিত হয়েছিল সনাতন ভারতভূমি। যিনি ধর্মরাজ্য স্থাপনের বাণী প্রচার করেছিলেন সমগ্র ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে। তাঁর পাঞ্চজন্যের বজ্রনিনাদে অনুরণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধপ্রান্তর চতুর্দিকে অধর্মের বিনাশ আর ধর্মের উত্থানের কম্পন অনুভব করলেও তা ছিল সাময়িক। নতুন ধর্ম রাজ্যের নবজাগরিত মনুষ্যগণের রাজা হলেন জ্যেষ্ঠ পান্ডব যুধিষ্ঠির ,যিনি আজন্মকাল ধর্মরাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলেন , কিন্তু সত্যি ই কি ধর্মরাজ্য স্থাপিত হয়েছিল ভারতবর্ষে? যা হয়েছিল তা হল নিতান্ত ই এক শূন্যতায় পূর্ণ অলীক কল্পনামাত্র। যার নেপথ্যের নায়ক ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং | যুদ্ধের পরে পড়ে রইল কিছু ক্ষমতাহীন প্রতিবন্ধী মানুষ, কিছু ক্ষমতাশীল, ছদ্ম গাম্ভীর্যপূর্ণ মানুষ আর কিছু নপুংসক,মেরুদণ্ডহীন পুরুষ যারা রাজনীতির ভন্ডামিকে পাথেয় করে ,'মাত্সন্যায়' এর নীতিকে আঁকড়ে ধরে বুজরুকির ভেলকি দেখিয়ে সমগ্র জাতির কান্ডারী হল। ফলে সামাজিক অবক্ষয় হতে শুরু হল, মানুষ আরো অন্ধকারের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে বেঁচে রইল। এইখানেই কলিযুগের সূচনা । এক মূহুর্ত কালবিলম্ব না করে কলিযুগ নির্দিষ্ট সময়েই হাজির হল। ভগবান কৃষ্ণও স্বয়ং পারলেন না সেই কালচক্রের অমোঘ গতিকে রুদ্ধ করতে। এখানেই তাঁর মতো রাজনৈতিক অবতারের ব্যার্থতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনো আমরা তাঁকে স্মরণ করি কেন? কারণ পৃথিবীতে কেউ কেউ সেই অলৌকিক শক্তি র অধিকারী হয়ে মাঝে মাঝে এসে ধরাধামে অবতীর্ণ হ'ন, সাধুদের পরিত্রাণ আর দুষ্কৃতদের বিনাশ ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের ত্রাণকর্তা রূপে।

বাস্তবিক জীবনে আমরা শুনেছি দুটি বিশ্ব যুদ্ধের কথা,দেখেছি তার ফল, এখন তৃতীয়টির অপেক্ষায় দিন গুনছি। কিন্তু একদা অন্ধকারের মধ্যে আলো দেখিয়েছিলেন যিনি সেই প্রবাদপুরুষ পার্থসারথির বাণী কে পাথেয় করে এখনো আমরা সহস্র প্রতিকূলতার মধ্যে লড়াই করে এগিয়ে চলেছি । কারণ কর্ম ই জীবন।। ফলের আশা করবো না, সর্বতোভাবে আত্মনিয়োগ করবো কর্মযজ্ঞে। শ্রীমদ্ভাগবত্গীতার শাশ্বতবাণী কে মাথায় করে ,"আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা চল রে"-এই মন্ত্রে দুর্গমগিরি,দুস্তর মরুপ্রান্তর লঙ্ঘন করবো।



(*) “The Date of the Mahabharata War”, K Srinivas Raghavan, 1969, Srinivas Gandhi Nilayam, Srigam Press, Madras 18. Available at Adyar Library Chennai.

[#] উদ্যোগপর্ব (৬৬/৪৭)