১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

মনসুন মোমেন্টস-২


ভেজা টাওয়েলটা আবার বিছানার ওপর রেখেছিস? ….সরি মা! তুমি তো আছো তাই।
দাদাই বলল, পরের বারে এসে হয়ত আমার সাথে আর দেখাই হবেনা তোর।.... ধুস্! দাদাই! কি যে বলো! 
দিদা বলল, আর কি পরের বার তোকে নিজের হাতে মাংস রেঁধে খাওয়াতে পারব? ….ঠিক পারবে দিদা। 
ঠাম্মা বলল, কি রে আরেকবার আজ দেশপ্রিয় পার্ক খেলনার দোকানে যাবি নাকি? হট-হুইলসের গাড়ি কিনতে? ….এখন আর অত ছোট্ট গাড়িতে হবেনা ঠাম্মা। রিয়েল মডেল চাই ফর্মুলা ওয়ান কারের।  

.....আইনক্সের সেই মুভিটা? মানিস্কোয়ারের সেই আইসক্রিমটা? গড়িয়াহাটের মোড়ের সেই রোলকর্ণার? মনে পড়ছে কি তোমার বলো? বলো? চুপ করে আছো কেনো মা? নিউমার্কেট যাবে যে বলেছিলে? সেই কত কত ফেক ঘড়ি ছিল ! পার্কস্ট্রীটের চেলো কাবাবটা খাওয়ানো হলনা তোমাকে আজো! প্রিয়ার কাছে সেই দুপুরগুলো? তুমি ফুটপাথী মোমো খেতে দিতেনা, বলতে বানিয়ে দেবো। মায়ের কেবিনের চপ আজো খাওয়া হলনা আমাদের্! এখনো ফুটপাথে বিরিয়ানির হাঁড়িগুলো বসানো থাকে মা? কি উগ্র গন্ধ বেরোয় আশপাশ থেকে। 
….
তোমাদের ধর্মের সংজ্ঞাটা আজো ক্লিয়ার না আমার কাছে। জানো মা ? আজ আমাদের দেশে এত রেপ হয় কেন?
এই তোমাদের মত অর্থডক্স যারা সংস্কারের বশে হাত ধুয়ে পুজো করো, পুজোর ফুল মাথায় ঠেকাও তাদের জন্য। মেয়েদের জন্যে যারা একটুও ভাবোনা তাদের জন্যে।  ঠাম্মা-দিদাই তো বলে ফুলো লুচিগুলো আমার পাতে দিতে। আর তোমরা সব মিয়োনো, ন্যাতন্যাতে, পোড়াগুলো নাও নিজেদের পাতে। ছেলেদের উচ্চাসনে বসিয়ে কি লাভ মা? সমান করতে শিখলেনা আজো? আমের আঁটিটা তুমি‌ই কেন খাবে? বাবার পাতে কেন দেবেনা মা? মেয়েদের এত নীচু করে রেখে আসার মাশুল দাও এবার। 
….
মা, আবার তুমি আজ সেই চিকেনটা বানিয়েছো? জিও! বেশী রুটি করেছ তো ?   
মা, জিনসের এই বাটনটা  একটু সেলাই করে দিও প্লিজ! কতবার বললাম এই নিয়ে!
ঘুম থেকে উঠবনা, ব্যাস্! আজ রোববার! আজ দেরী করব‌ই।
মা, রান্নার মাসী আসেনিতো কি? আজ তাহলে রান্না কোরোনা। কাবাব খেতে যাব চলো। প্লিজ মা, কাবাব এন্ড বিয়ার !!!
ফাটাফাটি হয়েছিল কালরাতের  পুডিংটা। আবার বানিও। ওজন বাড়ছে বাড়ুক, নো চাপ! চিল, চিল! কুল, কুল!
….
এই উইকএন্ডে তবে শান্তিনিকেতন ফাইনাল তো ?... ইয়েস!
মা শুনেছো? ইউটিউবে শানের রবীন্দ্রসংগীত! হোয়াট এন ইম্প্রোভাইজেশান! কর্ডগুলো ফলো করলে? এই নেক্সট উইকেন্ডে কিন্তু উইকেন্ডার কলকাতায়। ফসিলস থাকছে। যাবে তুমি?
নজরুল মঞ্চে ইন্দ্রায়ুধের বাবা তেজেন্দ্র নারায়ণ আছেন, সাথে জাকির হোসেনের তবলা। যাবে তো ? 
ঐ দ্যাখো মা, আমার সেন্ট জেভিয়ার্সের বন্ধু কবীর তোমার তারা মিউজিকে পারফর্ম করছে!
….
মা, রান্নার মাসীরো তো ছুটির দরকার আছে? সপ্তায় সাতদিন তোমার ছেলে যদি কাজ করত?
চিনি-দুধ না দিয়ে ঐ অখাদ্য চা যে তোমরা কি করে খাও?  
আমার ডিমের পোচে "মোলগরিচ" মাস্ট কিন্তু!    
….
 বিয়েবাড়ি থেকে ফিরে বাড়ির মেয়েরা বলাবলি করছিলাম "বৌ কিন্তু বেশ ময়লা। রং টা আমাদের বাড়ির মতো নয়" ব্যস! ঝাড় খেলাম সক্কলে ছেলের কাছে।
আচ্ছা মা গায়ের "কমপ্লেকশান"টা কি  মেয়েটার দোষ? গায়ের ওপরে কি কোনো ট্যাগ লাগানো থাকে? "ফর্সা", "কালো" এইসব? তোমরা কতবড়ো হিপোক্রিট বলো! মাকালীর পুজো করো আবার কালো বৌ বাড়িতে এলে ক্রিটিসাইজ করো! 
….
অবশেষে ভরে গেল তার স্ট্রলি ব্যাগ। মামা-মামীর আদরে উপচে পড়া সেই হাসিটা ডোরবেল শুনে দৌড়ে গিয়ে রিসিভ করতেই থাকল সুদূর ব্যাঙ্গালোর থেকে পাঠানো  একের পর এক গিফ্ট...পারকার পেন, টাই, লেদার ওয়ালেট, ফার্ষ্টট্র্যাক ঘড়ি ....মায়ের চুপিচুপি ওয়েষ্টসাইডে গিয়ে  কিনে আনা পুজোর জামা, টিশার্ট- ব্লু জিন্স, মোজা, রুমাল, ভেস্ট, ড্রয়ার, ট্র্যাকস্যুটস, মেডিসিন, আর বাবার  ওয়ালেটে পড়ে থাকা কিছু খুচরো ডলার নোটস। ঠাকুমা, দাদু-দিদারা আলমারী ঘেঁটে আরো কয়েকটা ছোট নোট।
…..
মামাদাদুর ওভারকোর্টটাই নেব আমি। ড্রাই ক্লিন করিয়ে দাও। ওটা উইসকনসিন থেকে এবার ফিলি যাবে আমার সাথে।  তনুমা লাস্ট-ইয়ার  পুজোতে যে ব্লু শার্টটা দিয়েছিল? আর সেই ফুলস্লিভ রেড গেঞ্জীটা? দিয়েছো তো মা? 
….
ঠাম্মা, আজ বাজারে তপসে মাছ পেলে নাকি?  মৌরলাটা পেলেও এনো প্লিজ!
দিদা, তোমার সব লুচিগুলো গোল হয় কি করে? 
দাদাই,  তুমি তো কানে শুনতে পাবেনা, বরং আবার বলো সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের গল্পগুলো। 
কাজের মেয়ে বলে, ও বৌদি, খুব ভালো করে উজালা দিয়ে দিলাম গেঞ্জীগুলোতে....ওখানে বেচারার কি হবে কে জানে?
রান্নার মাসী বললে, ও দিদি? ওকে সহজে চিকেন স্ট্যু-টা শিখিয়ে দি চলো।
বাবু, কিচেনে ঢোকার আগে হাতটা ওয়াশ করে নিস। কুকিং রেঞ্জে হাত দেবার আগে গ্লাভস পরে নিস।  কি যে করবি তুই একা একা!  বাবু, ওখানে একটা মিক্সার-গ্রাইন্ডার কিনে নিস কিন্তু। মাসী নেই যে শিলে তোর মাংসের মশলা বেটে দেবে। 
দ্যাখ, এমনি করে স্ক্রেপার নিয়ে আলু ছাড়িয়ে, চপিং বোর্ডে রেখে তারপর ছুরি দিয়ে.....ব্যাস, ব্যাস! আর বলতে হবেনা মা, তোমার রান্নার ব‌ইটাতে এসব আছে তো ?
আমি বললাম, ধুস্! সেখানে তো শুধুই রেসিপি! এগুলো আস্তে আস্তে শিখে যাবি দেখিস!দেখিস বাবা হাতটা কেটে ফেলিসনি যেন! তুই যা ধড়পড়ে!  
আর তোমার সেই প্রেসারকুকারে ফেমাস চিকেন বিরিয়ানির রেসিপি? ওটাতো লাইফসেভার, মামু বলেছিল ফার্গোতে পৌঁছেই। 

সত্যি খুব ইজিরে ওটা। সকালবেলা কলেজ যাবার আগে চিকেনটা মশলাপাতি দিয়ে ম্যারিনেট করে, ইয়োগার্টে ভিজিয়ে ফ্রিজে রেখে দিবি।  সন্ধ্যেবেলা ঘরে এসেই প্রেসারকুকারে রিফাইন্ড তেলে গরমমশলা, আলু, পেঁয়াজটা বাসমতী চালের সাথে ভেজে নিয়ে চিকেনটা দিয়েই একটা সিটি ব্যাস! আর্সেনালের ম্যাচ আর আর্সেলানের বিরিয়ানি জমে দৈ এক্কেরে! ও হ্যাঁ, জলটা দিবি ডাবল অফ রাইসের একটু কম।
মা আমার দ্বারা এত্তসব হবেনা। ঠিক হবে দেখিস! একদিন বানিয়ে দু দিন খাবি। আর খিচুড়ি, ফ্যানেভাতে, ডাল সেদ্ধ, ওমলেট, আলুভাজা তো এতবার শেখালাম। 

কোন মন্তব্য নেই: