৭ এপ্রিল, ২০১৫

সুচিত্রা সেন তোমাকে...



ই চিঠিখানা লিখে রেখেছিলাম অনেকদিন ধরে। ভেবেছিলাম রেখে আসব তোমার লেটার বক্সে। আমার বাড়ির খুব কাছেই ছিলে এদ্দিন কিন্তু সময় হয়নি। তাই আরো একটু মনের কথা লিখে পাঠিয়ে দিলাম শূন্যের মাঝে, শান্তির বুকে, যেখানে তুমি আছো এখন... c/oসেই ঠিকানায় ।

সত্যি বলতে কি জানো ? সিনেমার বড় একটা ভক্ত আমি ন‌ই। তবে বাংলা সিনেমাকে ভালোবাসতে শেখা উত্তম-সুচিত্রার হাত ধরে। মা জোর করে পড়ার ব‌ই, গল্পের ব‌ই আর অঙ্কের খাতা থেকে মুখটা ঘেঁটি ধরে খানিকটা ঘুরিয়ে দিতেন রোববারের দূরদর্শনের ইভনিং শোয়ে। আর মাঝেমধ্যেই টিকিট কেটে সেই বেকার হোমমেকারকে ম্যাটিনী শোয়ের কম্পানি দিতে দিতে চিনে গেলাম সেই সিনে আইডল, বাংলাছবির গ্রেটা গার্বোকে। মনে মনে তারিফও করলাম সেই অতি প্রচলিত "নাক মাটামাটা চোখ ভাসা, সেই মেয়ে খাসা " প্রবাদটির। আলগা চটক, লালিত্য, ব্যাক্তিত্ত্ব এই সব শব্দগুলো সদ্য যৌবনা আমার জীবনের ধারাপাতে তখনো অধরা জানো? শিখতে লাগলাম।

মা-মাসীরা নাকি রফ্ত করত তোমার চলন-বলন, কথা বলার সময় কম্বুকন্ঠীর সূক্ষকৌণিক গ্রীবা হেলন আর সর্বোপরি তোমার গুরুগম্ভীর চাহনি। আমার এক মাসী ছিল জানো? তিনি তো আজীবন তোমার মত রামগড়ুরের ছানা হয়েই থেকে গেল। আমৃত্যু হাসলোনা একটুও! এই ছদ্ম গাম্ভীর্য্য নাকি রূপের একটা আলাদা মাত্রা এনে দেয়। তুমি কি সেই কারণে অত্ত গম্ভীর থেকেছ আজীবন? এখন মনে হয় আরেকটু চটুল তুমি হলেও হতে পারতে ! দা ভিন্সির মোনালিসার মত এক টুসকি হাসিও দেখতে পেলামনা আমরা । জাস্ট ভাবা যায়না! তুমি হাসছ তাও বিনিপয়সায়? মানে এমনি এমনি! এটাই বোধহয় জাদুকাঠি বা ট্রাম্পকার্ড যা ছিল তোমার হাতে। কি ঠিক বললাম তো? রহস্যময়ীর রসিকতা আবার পছন্দ হবেনা হয়ত! প্লিজ, রাগ কোরোনা। আমি কিন্তু মস্ত ফ্যান তোমার! শুধু একটু যদি বাইরে আসতে। ধরা দিতে! পথে হল দেরীর সেই সূক্ষ্ম, সি-থ্রু ডেক্রণ শাড়ি আর সাথে এয়ারহোষ্টেস ব্লাউজ! আমরাতো পলিমারের যুগের মানুষ! সে সময়ের ডেক্রণ আর এসময়ের পলিয়েষ্টারে আকাশ পাতাল ফারাক। মায়েরা সকলে কিনে ফেলল নিউমার্কেটে গিয়ে। বানিয়ে ফেলল তোমার স্টাইলে ব্লাউজ! আমি সেই ব্লাউজ টেঁকে নিয়ে কলেজ কেটে রূপবাণীতে "পথে হল দেরী" দেখতে বন্ধুদের সাথে! সাগরিকার বোট-নেক ব্লাউজ? আর দীপ জ্বেলে যাই ছবির শাড়ির পাড়-আঁচলে ছিটকাপড়ের প্যাচ ওয়ার্ক আর ম্যাচিং ব্লাউজ ? এখনকার নায়িকারা তোমাকে নকল করছে ভাবলেও সুখ হয় । ভাবো তোমার ব্র্যান্ড!

পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ায় আগুণ জ্বালিয়ে দিলে তুমি সেই ১৯৫৩ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত ! কিন্তু ঐ পর্দার আড়ালেই। ফোটোগ্রাফের সেই মুখ মানুষ সামনাসামনি দেখবে বলে কত কসরত করল! তবুও তুমি সামনে এলেনা একটিবার। তোমার জীবন রসায়ন আজো অধরাই থেকে গেল তোমার হার্টথ্রবদের কাছে । কিন্তু তা তো হবার ছিলনা । সিলভার স্ক্রিনের সাক্ষ্য ও অলক্ষ্যের তুমিকে তো পাওয়া হলনা আমাদের!

আমি তখন ক্লাস এইট । দত্তা দেখেছিলাম। মোর বীণা ওঠে কোন্‌ সুরে বাজি গানের সাথে পর্দা উড়ছিল আর মধ্যে দিয়ে ঢেউ তুলে হেঁটে চলেছিলে তুমি লিপ দিতে দিতে। অত রাবিন্দ্রিক আর কারোকে মনে হয়নি । আমাদের স্কুলের অফ পিরিয়ড তখন ভরপুর সেই চাল-চলন নকলের মধ্যে দিয়ে। আমরা গাইছি, হাসছি ঠোঁটদুটো একটুকু ফাঁক করে আর কল্পনার রাজ্যে ভেসে ভেসে প্রত্যেকে সেই মহানায়িকার আসনে নিজেকে বসিয়ে চলেছি। তারপর দেবীচৌধুরাণী। দৃপ্ততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তার সেই রূপ, আর আমাদের মুগ্ধতা।

আমার শাশুড়িমায়ের মুখে শুনেছিলাম, "হারাণো সুর দেখতে দেখতে ওনার লেবার পেন উঠেছিল। উনি সেই আসি আর যাই যন্ত্রণা চেপে রেখেও গুণগুণিয়ে উঠেছিলেন "তুমি যে আমার" এর সাথে। বসুশ্রী সিনেমা হল থেকে সোজা শিশুমঙ্গলে ভর্তি হয়েছিলেন সেরাতে। পুরোটা সিনেমার কিছু বাকী ছিল। তারপর সেযাত্রায় খালাস হওয়ার পর সদ্যপ্রসূতির সন্তান বাত্সল্য উথলে উঠবে কি তার তখন কি মনখারাপ হারাণো সুর শেষ হয়নি বলে। সেদিন তুমি চলে যাবার পর আবারো দেখলেন হারাণো সুর আর গল্প বলছিলেন তারিয়ে তারিয়ে।

আমার মায়ের মুখে শুনেছি আরেক গল্প। দক্ষিণেশ্বরে কালীমন্দিরের পাশেই মামার বাড়ি ছিল আমার। মায়েদের বন্ধুরা খুব সিনেমা দেখত হলে গিয়ে কিন্তু বাড়ির রক্ষণশীলতাকে ফাঁকি দিয়ে মায়েদের মাট্যিনি বায়োস্কোপ সেই অর্থে ব্রাত্য। এদিকে বন্ধুবান্ধবরা গল্প বলে উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখে এসে, ফ্যাক্টস এন্ড ফিগার্স তাদের নখদর্পণে কিন্তু মায়েরা চার বোন যেন লজ্জায় সেই কথোপকথনে অংশ নিতে পারেনা। দিদিমার মাধ্যমে দাদুর কানে তুলতে লাগল কানাঘুষো। দক্ষিণেশ্বর থেকে বরানগরে সিনেমা দেখতে যাওয়া মনে বিগ প্রজেক্ট। এদিকে উত্তম-সুচিত্রা জুটি কাঁপিয়ে তুলছে বাংলার আকাশ বাতাস! সিনেমা আসে, সিনেমা চলে যায়। কখনো কোনো হলে চলতেই থাকে গৌরবময় দশ-বারো-কুড়ি সপ্তাহ। দাদুও বুঝতে পারেন যে আর মেয়েদের আটকে লাভ নেই । সকলেই এখন মুক্ত ! হঠাত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এগিয়ে আসে। সিনেমাহলের পাসপোর্ট পেয়ে মায়েদের কপালে সুপারডুপার হিট অগ্নিপরীক্ষার টিকিট আসে দাদুর মারফত, ড্রাইভারের হাতে করে। মায়েরা তো আহ্লাদে ন'খানা ! থুড়ি! নয়জনা...তুতো বোনেদের ফোন করে আনিয়ে সকলের কানে কানে তখন গানে মোর ইন্দ্রধনু !

তারপর একে একে সাড়ে চুয়াত্তর, সবার উপরে, গৃহপ্রবেশ, দীপ জ্বেলে যাই, সাগরিকা । রেডিওতে অনুরোধের আসরে ফিল্মিগানের নোটেশন অব্যাহত থাকে।

মা সেবার ফার্স্ট ইয়ার। গরমের ছুটির ভোরবেলায় দাদু দক্ষিণেশ্বর গঙ্গায় স্নান করে এসে মায়েদের সংবাদ দিলেন

" কালীমন্দির চত্বরে তিল ধারণের জায়গা নেই, তোদের সুচিত্রা সেন এসেছে বিকাশ রায়ের সাথে কি যেন এক বাংলাছবির শুটিং চলছে সেখানে"

মায়েরা একপ্রকার নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে একছুটে মন্দিরে। গিয়ে শোনে উত্তর ফাল্গুনীর শুটিং চলছে। বিদেশ থেকে তখন সদ্য ফিরেছেন সুচিত্রা, সাত পাকে বাঁধার জন্য পুরষ্কৃত হয়ে। তাই খুব ভীড়। কালীমন্দিরের সিঁড়ির সামনে বিকাশ রায় ও তিনি তখন পুজো দিয়ে নেমে আসছেন মায়ের চোখের সামনে । দুহাত দূরে তিনি। কিন্তু ঐ মুখে একটুও হাসি নেই। সেই ছদ্ম গাম্ভীর্য ভরা সুখ চোখে মুখে আর উপছে পড়া ব্যাক্তিত্ত্ব গড়িয়ে পড়ছে সারা শরীর দিয়ে । তবে তাঁর মুখে হাসি থাক আর না থাক মায়েরা তো ফিদা সেই অর্থে!

এমন ফিল্মি নবজাগরণ তুমিই আনতে সক্ষম হয়েছিলে। কনসার্ভেটিজমের লক্ষণরেখা ডিঙিয়ে মধ্যবিত্ত যুবতীদের মনে সেই আঁধি আনলে ! কিন্তু সব ছিল ভালো যদি শেষটুকুনি আরো ভালো হত। সেযুগের আরো এক মহানায়িকা ঊমাশশী বা থিয়েটারমঞ্চ কাঁপানো নটী বিনোদিনীর মত সেই যে আড়ালে চলে গেলে অর এলেনাকো! কেউ বলল, তোমার নাকি আধ্যাত্মিক চেতনা এসেছে। কেউ বলল, তুমি সংসার জগতের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছ। কেউ আবার বলল তোমার শেষ ছবি প্রণয়পাশার বিফলতা তোমাকে হতাশ করেছে বলে তুমি আর ফিরতে পারলেনা। তদ্দিনে উত্তম-সুচিত্রা জুটি ভেঙে খান খান। তাই চলচিত্র জগতের ওপর বীতরাগ । তাই বলে যে দর্শক তোমাকে এত দিল তাদের জন্য একটি বার সাড়া দিলেনা তুমি! এ তোমার কেমন মহান আদর্শ! তুমি কি এমনি মহতী? জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে চলে বিলীন হয়েছ চিতার আগুণে । আত্মা অবিনশ্বর তাই তুমিও সর্বভূতে বিলীন হলে ঠিক‌ই কিন্তু আমার চোখে বহুদিন আগেই তুমি নিরালম্ব, নিরাশ্রয় আত্মার মত সেই কিংবদন্তী রূপসী হয়ে র‌ইলে । তোমার চলার পথ যদি এভাবে না শেষ হত!

আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার জীবনের সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়. সূর্য ডোবার পালা যদি আরো অন্যরকমভাবে আসত !

তুমি না হয় রহিতে কাছে, কিছুক্ষণ আরো না হয় রহিতে কাছে !

ইতি

...