২৪ এপ্রিল, ২০১৬

c/o সীতায়ণ



 "সীত" বা লাঙলের ফলায় মাটি থেকে উত্পন্ন সেই সীতার কাহিনী নিয়ে সীতায়ণ বা অন্য রামায়ণ লিখেছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। জন্ম থেকে বিলীন হয়ে যাওয়া এই কন্যার দুর্ভাগ্যের আঁধার ছিল নিবিড় ছায়াসঙ্গী। আদর্শবাদকে দূরে সরিয়ে রেখে সেই কন্যার অন্ধকার পরিবৃত জীবনে আলো ফেলেছিলেন লেখক। এই ধ্রূপদী উপন্যাস যখন মঞ্চের আলোআঁধারে জনকনন্দিনীর প্রতিবাদী লালিত্যে উদ্ভাসিত হয় তখন তা সত্য সীতায়ন। শুধু রামায়ণের স্তুতিগীতিতে মুখর নয় তা। জনকদুহিতার আড়ম্বরহীন, ব্যসনে-ভূষণে সীতাকন্ঠ বারেবারে প্রতিধ্বনিত হয়ে একটাই কথা বলে" জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা, জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্তটীকা" । কি হবে বিবাহের প্রলোভনে পা দিয়ে? কি হবে নিজের বহু আকাঙ্খিত প্রিয়তম পুরুষের বীজ গর্ভে ধারণ করে? কি‌ই বা হবে আজীবন সেই পুরুষের হাতের ক্রীড়ানক হয়ে মধুচন্দ্রিমার ভোগ্যবস্তু হয়ে? জীবনের সর্বোত্তম মূহুর্তে ভুলে যাও মধুযামিনী যাপনচিত্রকথা। সেই চিত্রকূটে, সেই নৈমিষারণ্যেই হয়ত হতে পারে তোমার নির্বাসন। তাই এই সীতাকে আজ হতে হয়নি বাক্যহীনা। সতীত্বের পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত সে সীতা। তার জীবনের প্রথম পুরুষ, শেষ পুরুষ, উত্তর পুরুষ, মধ্যম পুরুষ সব‌ই অযোধ্যার আদর্শবান রাজা রামচন্দ্র নামে এক আর্য যুবক। যে রাজা শুধু সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া। সবার উপরে পিতৃসত্য, প্রজাসত্য। চুলোয় যাক মাতা, পত্নী।
একটাই তো ব‌ই জীবন। একটাই তো ব‌ই যুগ। যার নাম ত্রেতা। তিনি না ত্রাণ করতে এসেছেন। কার ত্রাণ? কিসের ত্রাণ? স্ত্রী, মাতা এরা সামান্য নারী। ত্রাণ যদি করতেই হয় তবে প্রজাই মুখ্য ত্রেতাযুগে। প্রজাবত্সল হলেই পরজন্মে আবার অবতারত্বের গ্যারান্টি । তাই না তিনি যুগেযুগে আদর্শ ভ্রাতা, আদর্শ পুত্র, আদর্শ রাজার তকমা লাগিয়ে মহত হলেন। কিন্তু সীতা নামের মেয়েটি? যে মধ্যবয়সে সেই আদর্শবানের বীজ গর্ভে ধারণ করে , নিজের গর্ভিণী জীবন একাকী লালন করে আশ্রমবাসী হয়ে। লঙ্কা থেকে ফেরার পর যাকে রাবণ রূপ খলনায়কের দূষণ, কালিমা, পাপ মোছার জন্য সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হয়। মনে মনে সেই সীতার কেবল একটাই প্রশ্ন জাগে সীতায়ণে। নারীর কলঙ্ক মোচনের জন্য আগুণ‌ই কি প্রকৃষ্ট পরীক্ষক? কালিমা-কলঙ্ক কি আগুণের লেলিহান শিখাতেই ধুয়েমুছে সাফ করে নারীকে আবার পরিচ্ছন্ন করে দেয়? যে স্বামী একদিন তার কন্ঠলগ্না হয়ে, আলিঙ্গন করে স্বেচ্ছায় তার যোনিপথে ঢেলে দিয়েছিল উষ্ণবীর্য। সেই নারীর মুখের কথা, চোখের ভাষাই কি সব নয়? কেন তাকে বিশ্বাস করা যায়না? কারণ সে নারী বলে? তেজোদৃপ্ত, পেশীবহুল পুরুষের কাছে এই সীতার প্রশ্ন সেটাই। এই সীতা সোচ্চার সেই প্রতিবাদে।এই পুরুষের পৌরুষ কি কাপুরুষতায় পর্যুবাসিত? "কানপাতলা" তো মেয়েদের হয়। পুরুষদেরো হয় নাকি? তাই বুঝি প্রজাসর্বস্ব এই রাজা বারেবারে স্ত্রীকে দূরে সরিয়ে আত্মতুষ্টিতে নিজের মহত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। আর তাই বুঝি নৈমিষারণ্যে বাল্মিকীর আশ্রমে সীতার মুখ থেকেই স্বয়ং বাল্মিকী শুনতে চান সীতার জীবনের করুণ কাহিনী। কিন্তু কবি বাল্মিকীও ভারতবর্ষের এক সনাতন আদি কবি। মস্যাধারে খাগের কলম ডুবিয়ে ভুর্জপত্রে সীতার মুখনিঃসৃত সত্যি কথাগুলি আড়াল করে বলেন, "না, মা, ভুলে যেওনা। তিনি তো অবতার। তিনি আদর্শ রাজা রামচন্দ্র। তোমার অনেক সৌভাগ্য যে তুমি তাঁর সন্তানের জননী। ইক্ষ্বাকু বংশের মর্যাদায় তুমি তাঁর ধর্মপত্নী।"
গল্পের শুরুতেই শুনি নদীতে নৌকার ছলাত ছলাত শব্দ। হোমশিখার মত পবিত্র মাতৃত্বে বিভোর হয়ে বহুদিন পর সীতা চলেছেন লক্ষণের সঙ্গে। কিন্তু যেইমাত্র জানলেন যে রামচন্দ্রের আদেশে বাল্মিকীর আশ্রমে শুরু হবে তাঁর এই গর্ভিণী জীবন তখনি শুরু সীতায়ণ। তিনি হয়ে উঠলেন প্রগলভ, প্রতিবাদী এক নারীকন্ঠ। তাঁর স্বামীর হৃদয়ে সীতা নামের নারীটির জন্য কোনো স্থান নেই। সে শুধু রাষ্ট্রতত্ত্বকে প্রতিপালন করে। চিরদুঃখের পথে হাঁটতে গিয়ে সেই নারী নিজে রচনা করলেন নতুন এক পথ। নতুন পথে ধরে র‌ইলেন সেই অমোঘ আলোকবর্তিকা। সেই পথে হাঁটবেন দর্শক। সেই পথের নামকরণ করেছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। সেই পথের আজকের ঠিকানা c/o সীতায়ণ।
আমিও সেই প্রজননকারী নারীর এককণা। তাই আমি জননী। আমার দ্বারাও পুরুষের রমণ হয়েছে। তাই আমি রমণী। আমার প্রতিবাদীনি রূপের চেয়ে মহলে মহলে থাকাটাই পুরুষের সর্বকালের পছন্দের তাই আমি মহিলা। রাজার রাজ্যশাসনের আওতায় কি স্ত্রীর প্রতিপালন পড়েনা? স্ত্রী শুধুই বংশরক্ষার্থে যুগে যুগে আবির্ভূতা হন? এ তুমি কেমন রাজা রামচন্দ্র? লোকে তোমায় মান্যিগণ্যি করে। লোকে তোমার আদর্শ নিয়ে স্তুতিগান করে । রামায়ণের হিরো তুমি হতে পারো কবির কলমে। আমার মনে নয়।
প্রতিবাদী সীতার মেনে নিতে কষ্ট হয়। সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ। তিনি বারেবারে মঞ্চ কাঁপিয়ে আজকের নারীর উদ্দেশ্যে সেই কথা ছুঁড়ে দিতে লাগলেন। আর আমার মত এহেন নারীদর্শক সেই অণুরণন কানে নিয়ে ফিরে এল গতকাল শিশিরমঞ্চ থেকে।

শাঁওলি মিত্রের দ্রৌপদীর আখ্যান নিয়ে "নাথবতী অনাথবতের" পর রোকেয়া রায়ের সীতায়ণ। ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে এলে সম্পূর্ণ হয় একপাক। যেমন উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ণ।

আদর্শরাজা (?) রামচন্দ্রের জীবনের সম্পূর্ণ নিয়ে বাল্মিকীর কলমে রামায়ণ। আর মল্লিকা সেনগুপ্তর বহুচর্চিত এই সীতায়নের সম্পূর্ণতার রূপায়ণ বল চরিত্রায়ণ বলো সবটুকুনি‌ই হল তোমার অভিনয়ে, রোকেয়া রায়। তোমার মঞ্চ পরিকল্পনা অনবদ্য। নাটকের নির্দেশনায় মলয় রায় অত্যন্ত পটুতা দেখিয়েছেন। বহু অভিনয়ে একক চরিত্রে সুমন অত্যন্ত দাপুটে। কখনো সে অত্যাচারী রাবণ, কখনো ন্যায়নিষ্ঠ দেবর লক্ষণ, কখনো সেই ইক্ষাকুনৃপতি রাঘবেন্দ্র রাম, আবার কখনো বয়সের ভারে কুব্জ, ন্যুব্জ বাল্মিকী মুণি, আবার এক ঝলকে ছোট্ট কিশোর লব। কি অপূর্ব ট্রানজিশান তার স্বরক্ষেপণে, ব্যাক্তিত্ত্বে। তবে মঞ্চে সীতার পোশাক আরো অন্যরকম হতে পারত। রামের কাপুরুষতা একটু প্রচ্ছন্ন লেগেছে। আর সংলাপে এক‌ই কথার বারবার প্রয়োগ একটু অস্বস্তির কারণ। কে জানে? হাতুড়ি দিয়ে আমাদের সমাজের মানুষগুলোর মাথায় বোধহয় এইকথাগুলোই প্রোথিত করতে চেয়েছেন স্বয়ং পরিচালক। আর নয় পুরুষের জয়গান। ভুলে যাও রামগান। শুরু হোক সীতায়ন। মোটের ওপর প্রখর গ্রীষ্মের চোখরাঙানি ভুলে, ভোটরঙ্গ শিকেয় তুলে পয়সা উশুল সন্ধ্যেনাটক। আরো একবার দেখার ইচ্ছে র‌ইল। টিম সীতায়ণ যুগ যুগ জিও!

কোন মন্তব্য নেই: