২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

আনন্দনাড়ু পর্ব



কেমন যেন স্বপ্নের মত একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম কয়েকটা সপ্তাহ। এখনো মনে হচ্ছে ঘোর কাটেনি। ওরা এল, দেখল, জয় করল আবার ফিরে চলেও গেল। শাশুড়ি নামক এহেন ভিনগ্রহের জীবটির কি বিশেষত্ব থাকে, তার পদোন্নতিতে কি পরিবর্তন হয় এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি কখনো। এখন খুব সন্তর্পণে ভাবতে বসেছি এতসব। আয়নার সামনে নিজেকে দেখছি আর ভাবছি হস্ত-পদ-স্কন্দ-মাথা যথাস্থানে আছে কিনা। আমার কি ইস্পেশ্যাল গ্রুমিং দরকার? অথবা লেসেন নিতে হবে ভেটারান কোনো শ্বশ্রূমাতার কাছ থেকে? তা যাইহোক আমার মতন এহেন শ্বশ্রূমাতার শারীরিক ধকলটি ছিল বেশ ঘটনাবহুল এবং উত্তেজনাপূর্ণ। শুরুরদিনেই ছাদে প্যান্ডেল বাঁধতে এসে  ডেকরেটারের লোকজন দিল খানকয়েক ফুলের টব ভেঙ্গে। তারপর আদ্যোপান্ত ছাদটাকে মুড়ে ফেলে রং মিলিয়ে কাপড় সেলাই করে চলে যাচ্ছে। আমার ঘরমোছার মেয়ে চেঁচিয়ে বলল, আমার ন্যাতা-বালতি?
ডেকরেটরের লোকটা বললে "কাপড়টা একটু তুলুন, ওখানেই আছে'
ব্যাস! বিয়েবাড়িতে হাসির রোল। বাড়ি ভর্তি লোক জন  সকলে হেসে খুন।

তারপর রোজ সকালে দুধ চা না লাল চা? এই কটা দিন দুধ-চিনির ফতোয়া জারি ছিল না। অতএব চালাও পানসি দুধ চা।  শাশুড়ি হবার আগে একটু শক্তি সঞ্চয় প্রয়োজন কিনা। তারপর একটু ফাটা গোড়ালি, ফ্রুট ফেসিয়াল, এক্সট্রা সাইন হেয়ার ট্রিটমেন্ট। সবটাই ঘরোয়া যদিও। বিউটি স্যালোঁ আমার পোষাতা নেহি হ্যায়।   শীতের সকাল। ছোট দিন। পরাণ আঁটুপাটু।



হঠাত আমার মায়ের চীত্কার। ওরে কাল আনন্দনাড়ুর বাজার ? বললাম, সব রেডি আছে। ঘটিবাড়ির আরেক রীতি। শুভকাজে আনন্দনাড়ু বানানো। সে এক যজ্ঞ। আত্মীয় স্বজন মুখিয়ে থাকেন সেই নাড়ুর জন্য। সত্যনারায়ণের শিরণির মত মাপ তার। যত প্রিসিশন তত সুস্বাদু হবে সেই নাড়ু। আমার মায়ের মাপ মুখস্থ। সেইমত বাজার করেছি। সে এক যজ্ঞ আমাদের। বিয়ের আগের দিন বিশাল পরাতে নারকোল কোরা হল। চারটে বড় বড় নারকোলের জন্য  এক কিলো আটশো আতপচালের মিহি গুঁড়ো, আটশো গ্রাম সাদা তিল আর দেড়কিলো শুকনো আখের গুড় এর জোগাড় হল। আর ভাজার জন্য সরিষার তেল। এবার আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি, মাখিব নাড়ু সবে ভাজিব তায়। প্রথমে নারকোলের ওপর চালের গুঁড়ো আর গুড় দিয়ে ঠাসা। ভাগে ভাগে পেতলের গামলায় এক একটি অংশ নিয়ে ঠাসল বাড়ির মেয়েরা, বৌয়েরা। তারপর তিল ছড়িয়ে আবার ঠাসো। মোলায়েম করে, মসৃণ করে। এবার পাকানোর পালা। ঘন্টা তিনেক কাবার এই ঠাসাঠাসিতে। বিশাল গ্যাস আভেনে বিশাল পিতলের কড়াই। সরষের তেলে ধোঁয়া উঠতেই প্রথম খোলায় একুশটা নাড়ু আমাকে মানে পাত্রের মা'কে ভেজে তুলে রাখতে হবে মাটির হাঁড়িতে। এর নাম শ্যামের হাঁড়ি। বিয়ে মিটলে নারায়ণের পুজোয় এই নাড়ু নিবেদন করতে হবে। এই একুশটি নাড়ুর অদ্ভূত সব আকার প্রকার। আমাকেই গড়তে হল। জ্যামিতিক আকৃতি। কোনটা গোলক, কোনটা চৌকো, কোনটা ত্রিকোণ,কোনটা তারা, কোনটা আবার চোঙাকৃতি। গনগনে আঁচে গরম তেলে নাড়ু ভাজা শুরু হল। শাঁখ বাজল।  সেইসঙ্গে ছিল অঘ্রাণের কালো মেঘ করা আকাশের অন্তহীন বৃষ্টি। মা বললেন এ হল আশীর্বাদ। নাড়ুভাজার সময় বৃষ্টি নাকি আনন্দের বার্তা বহন করে।।

কোন মন্তব্য নেই: