১৪ এপ্রিল, ২০১১

মহাদেবের আর্জি : মধুমিতা ভট্টাচার্য



স্থান- কৈলাশকাল- প্রত্যুষপাত্র- দেবাদিদেব মহাদেব. 

এটুকু বললেই যে ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা হল ভোলেনাথ মহাদেব তাঁর অতি প্রিয় ব্যাঘ্রচর্ম আসনে বসে ধ্যান মগ্ননাগরাজ তাঁর গলায় ডিজাইনার গয়নার মত দোদুল্যমাননন্দী-ভৃঙ্গী মাতোয়ারা হয়ে ব্যোম..ব্যোম.. শব্দে চারিদিক মাতিয়ে তুলেছে এবং বলাই বাহুল্য যে গঞ্জিকা ধূমের প্রতিক্রিয়া সকলেই আমোদিত ভোলেনাথের গঞ্জিকা না হলে দিন ভালো যায়নাতা ভোর বেলাতেই দু-এক ছিলিমের সেবা হয়ে গেলে পোয়াবারো সারাদিন বুঁদ হয়ে থাকা যায় জাগতিক সুখসুবিধা আশা-নিরাশার পরোয়া না করেই এমনিতেই কৈলাশের এই বরফ ঢাকা পাহাড়ি প্রান্তরে এন্টারটেইনমেন্ট এর কোনো ব্যবস্থা নেইঅপ্সরারাও কেবল দেবরাজ ইন্দ্রের সভাঘরে নৃত্যগীতের পারদর্শিতা দেখাবার জন্যে চুক্তিবদ্ধ এই ঠান্ডায় এবড়োখেবড়ো পাহাড়ে নাচা-গানা করার জন্যে তাদের ভারী বয়ে গেছে! তাই নন্দী ভৃঙ্গীর গালবাদ্যের যুগলবন্দী আর ভোলানাথের ডমরুধ্বনীই  ভরসা মহাদেব অসাধারণ নৃত্যপটু কিন্তু তাঁর নৃত্যের অর্থ সমূহ বিপদ প্রলয় নাচন শুরু হলে আর রক্ষা নেই পৃথিবী যাবে রসাতলে যতক্ষন তিনি গঞ্জিকাচ্ছ্ন্ন  হয়ে নিমীলিত নেত্রে ইষ্টনাম জপে মগ্ন থাকেন ততক্ষনই সবার পক্ষে মঙ্গল মা দুর্গাও বারবার বলে দিয়েছেন কোনমতেই যেন মহাদেবের রক্তচাপ বৃদ্ধি না হয় যদি হয়, তবে মা জননীর ত্রিশুলের খোঁচায় অথবা খড়্গাঘাতে নন্দী ভৃঙ্গীর মুন্ড কাটা পরবে। সে রিস্ক নিয়ে যে লাভ নেইতাই এভাবেই দিন কাটানো শ্রেয়ঃ  

কাল পয়লা বৈশাখ, ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো কোনো রাজ্যের মানুষ খুব ধুমধাম করে এই দিনটি পালন  করেন তাদের মধ্যে বঙ্গপ্রদেশ অন্যতম তবে সমস্যা সেটি নয়সমস্যা কারণ আজ নীল পূজা বাঙালি জাতির ধর্মপ্রাণা মহিলাকূল খুবই নিষ্ঠাভরে দিনটি পালন করেন শিবার্চনা করে কিন্তু এবারের মুশকিলটা একটু অন্যরকম বাবার মেজাজও তিরিক্ষি দুচার দিন হল থানা পুলিশের চক্করে মনের শান্তি যার-পর-নাই ভ্রষ্টআজকালকার পুলিশ পেয়াদাগুলো লজ্জা-শরমের মাথা খেয়েছেঘুষ খেয়ে খেয়ে এতই অভ্যস্ত যে মহাদেব কেও রেহাই দেয়নি ভোলানাথ ট্যাঁকে ক্যাশ  টাকা রাখেন নাতাই ওরা তাঁর শখের ছিলিমটি জব্দ করেছে গন্ডারের সিং দিয়ে বানানোখাস অসমের কাজিরাঙ্গা থেকে এনে এক ভক্ত উত্সর্গ করেছিল বছর কয়েক আগে    

তা মোদ্দা কথায় আসা যাক ওই যে বললাম আজ নীল পুজোবাবার না হলেওনন্দী ভৃঙ্গীর মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে চালকলাডাবদুধগাঁজাভাঙ্গ ...ইত্যাদির নতুন সাপ্লাই আসবে ভেবে কিন্তু আসল মানুষ, থুড়ি, দেবতার মেজাজ চটে আছে ওই পুলিশের চক্করে ভোলেনাথ মুক্তপুরুষসোনাদানার ধার ধারেন না কস্মিনকালেও  রুদ্রাক্ষের গয়নাসাপের মালা...এই তাঁর সিগনেচার সাজ পরনেও কেবলমাত্র বাঘছালের কটিবন্ধ কৈলাশের এই ঠান্ডায় গায়ে একটি জামা পর্যন্ত দেন না মা জননী এ নিয়ে কতই না গঞ্জনা করেছেন! রাগেদুঃখে জল চোখে সারাদিন গোঁসাঘরে কাটিয়েও দেখেছেনকা কস্য পরিবেদনা!...কোনো লাভ হয়নি   

শুধু ছিলিম নয়পুলিশের নজর বাবার বাঘছাল এবং গঞ্জিকার ওপরেও এই দুটি জিনিসই বাবার সারাক্ষণে সঙ্গীদেখতে সাধার মনে হলেও এদের কর্ম অসাধারণকটিবন্ধের বাঘছালটি  বাবার লাজ রাখনেওয়ালা  এবং মনমোহক গঞ্জিকার পুরিয়াটি দিব্যদৃষ্টি দেনেওয়ালাতাও সে ব্যাটাদের প্রাণে সয়না! একদিকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের  নিয়মকানুন অন্যদিকে নেশাদ্রব্য ব্যবহারের জন্যে আবগারী আইন...যাকে বলে সাঁড়াশি আক্রমণ জেরবার করে দিচ্ছে নানারকম কমিশন টমিশন বসিয়ে এতেও রক্ষা নেইপুজো উপলক্ষ্যে ঘটি ঘটি জলদুধ আর ডাবের জলে স্নান করিয়ে সর্দিজ্বরের উপক্রম করেছেসেগুলো পৃথিবীর নানা প্রান্তে যে জায়গাতেই ঢালুকএফেক্ট তো সোজা কৈলাশেই এসে হয়তাও এই হাড় কাঁপানো ঠান্ডায়! মন মেজাজ ভালো থাকবে কি করেতাই আজ বাবার কপালে ভাঁজতৃতীয় নয়নে  রোষের আভাসআলুথালু জটাজাল, মস্তিষ্কে আগ্নেয়গিরি       

সন্ধ্যা অতিক্রান্তমহাদেব ধ্যান ভাঙতেই হুহুঙ্কার দিলেন..."সব তফাত যাও... (রেগে গেলে বাবা ভোলানাথ দেবভাষা ছেড়ে বাংলা ও দেবনাগরীর ককটেল বলেন) সবকো ভস্ম কর দুঙ্গা...ঠান্ডা মেরা জান নিকাল রহা হ্যায় আউর তুমলোগ সারাদিন ধরকে পানী আউর দুধ ঢেলে আমাকে চান করাতা হ্যায়! এদিকে তেষ্টায় মেরা ছাতি ফাতা হ্যায়ও নেহি দেখতা! যতসব মর্কটকা দল...খতম কর দুঙ্গা সবকো....!... (এবার কিঞ্চিত নরম সুরে..)  দে ভাই, শান্তিসে একটু ব্যায়ঠনে!...আরে বাপ আমার, দেনা বাপু আমাকে থোড়া নিজের মত থাকতে,ভাগো সব  হিঁয়াসে...খালি যাবার আগে ছিলিমটা দিয়ে যাস!!!

মধুমিতা ভট্টাচার্য
হোমমেকার, লেখিকা  












[ ১ম পাতায় ফেরত ]

৫টি মন্তব্য:

indira mukerjee (ইন্দিরা মুখার্জি) বলেছেন...

মধুমিতা প্রমাণ করেছে " আমাকে আমার মত থাকতে দাও " টপিকে এত সুন্দর রম্য রচনা লেখা যায় ! হ্যাপি ব্লগিং মধুমিতা !

Mahasweta বলেছেন...

বেশ মজা লাগল পড়ে। নববর্ষের শুভেচ্ছা নেবেন।

সুশান্ত কর বলেছেন...

হা ! হা! হা! সত্যিত্যো নিজের মঙ্গল চাইতে চাইতে ভক্তেরা বেচারার শ্বাস নেবার সুযোগটুকুও কেড়ে নেয়! দারুণ ! হাসালেন বটে!

সংঘমিত্রা বলেছেন...

Madhumita tomar lekhata khub upabhogya hoyechhe.subhechhe roilo.

সুশান্ত কর বলেছেন...

ইন্দিরাদি, যে পত্রিকার জন্যে আপনার কবিতা নিলাম, সেই একই পত্রিকার জন্যে মধুমিতা ভট্টাচার্যের এই রম্যরচনাটা নিলে উনার আপত্তি থাকবে না তো? উনাকে জিজ্ঞেস করে জানাবেন তো?