১১ মার্চ, ২০১১

"ইতি কৃষ্ণা"



দৈনিক জনকন্ঠ , করিমগঞ্জ আসামের এই পত্রিকায় ২০শে ফেব্রুয়ারি ২০১১ তে " ইতি কৃষ্ণা" কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছে । 

৯ মার্চ, ২০১১

গতকাল, ৮ই মার্চ ছিল মেয়েদের দিন

নারী, তোর জন্য দেখল জীবন কত পুরুষ
তোর জন্য ছেলেপুলেরা হ'ল মানুষ
তোর জন্য পুরুষ সাজাল শক্তিপুজোর ডালি
আমার দেশকে তুই কত কিছু শেখালি,
কত কিছু করলি !
কিন্তু বলতে পারিস তুই কেন আজো পেছনে রয়ে গেলি?
আজো পথে পড়ে থাকে মৃত মেয়েটা ,
সদ্যোজাতা, পরিত্যক্তা, ধর্ষিতা, লাঞ্ছিতা ।
আমি বলি তুই শুধু বেঁচে থাক "নারী" হয়ে
বেঁচে থাক তোর মত , তোর জন্যে শুধু ।


সুমঙ্গলী বধূ, তোমার মঙ্গলের জন্য দেখ,
সুমঙ্গলী কন্যা, তোমার শান্তির জন্য ভেব
সুমঙ্গলী নারী , তোমার সুখের জন্য বাঁচো একটু
যদি আকাশ থাকে তবে বেঁচে থাকবে নারী তুমি
যদি বাতাস থাকে তবেও বেঁচে থাকবে তুমি,
যদি পুরুষ থাকে তবেও বেঁচে থাকবে নারী
শুধু নারী হয়ে বেঁচে থেকো 
শুধু নিজের জন্যে, নারীর জন্যে, তোমার জন্যে 

৮ মার্চ, ২০১১

কচি-কাঁচার ওয়ার্কশপ, ৬ই মার্চ ২০১১




৬ই মার্চ ২০১১ কচিকাঁচা তথা "দিয়ালা" ওয়েব ম্যাগাজিনের আয়োজনে দক্ষিণ কলকাতার কৌশিক হলে হয়ে গেল ছোট ছোট কচি-কাঁচাদের পেন্টিং এবং মাস্ক মেকিং ওয়ার্কশপ  । 

প্রদীপ জ্বালিয়ে  অনুষ্ঠানের সূচনা করলেন ডায়রেক্টরেট অফ টেকনিকাল এডুকেশানের ডিরেক্টর ডাঃ সজল দাশগুপ্ত । তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে আমরা ঋদ্ধ হলাম ।ছোট শিশুদের পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে ক্রিয়েটিভিটির জোয়ারে ভাসানোর উদ্দেশ্যে দিয়ালা ওয়েবজিনের কর্মকান্ডের ভূয়সী প্রশংসা করলেন তিনি ।

দিয়ালার দুই সম্পাদক অনন্যা ব্যানার্জি এবং সঞ্জীব শিকদার দিয়ালার সক্রিয় সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন । ছোটদের মাস্ক মেকিং ওয়ার্কশপ কন্ডাক্ট করলেন শ্রীমতি মধুছন্দা মজুমদার এবং পেন্টিং ওয়ার্কশপ কন্ডাক্ট করলেন আর্ট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র   শ্রী স্নেহাশিস মাইতি । আমার সাথে দিয়ালা ওয়েব ম্যাগাজিনের অন্য লেখক লেখিকারাও উপস্থিত ছিলেন ঐ অনুষ্ঠানে । অন্যতম কবি শ্রী সুবীর বোস, গল্পকার অতনু ব্যানার্জি,  শ্রী কল্যানবন্ধু মিত্র , শ্রীমতী রেখা মিত্র,  শ্রী উতপল চক্রবর্তী  এবং ঋত্বিকা ভট্টাচার্য ছিলেন ঐদিনের অনুষ্ঠানে । 

১৬ বছরের অনুর্দ্ধ কিশোরদের জন্য ত্রৈমাসিক দ্বিভাষিক ওয়েব ম্যাগাজিন হিসেবে দিয়ালা ইতিমধ্যেই অনেক প্রতিষ্ঠা পেয়েছে  । ভবিষ্যতে এর আরো সাফল্য  কামনা করি আর সমাজমূলক কাজকর্মে কচিকাঁচার এই প্রয়াসকে কুর্ণিশ জানাই ।




৩ মার্চ, ২০১১

তারাক্লাবের প্রথম পিকনিক, ২০শে ফেব্রুয়ারি ২০১১


সেদিন ছিল একটা সজনেফুলের গন্ধ সকাল । নলবনের পাশে ওয়েষ্টবেঙ্গল ফিশারিজ প্রজেক্টের পিকনিক স্পটে আমাদের " তারা ক্লাবের " প্রথম পিকনিক হয়ে গেল । দিনটা ছিল ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ , রবিবার । আমরা যে যার মত পৌঁছে গেছিলাম চড়ুইভাতি-চত্বরে ।  কেউ বোসপুকুর, কেউ বারাসাত , কেউ  উলোটোডাঙা থেকে । অনেকেই চিনতাম একে অপরকে আবার অনেকেই ছিল অপরিচিত ।  ঠিক যেমন শীতের পরিয়ায়ী পাখিরা আসে লেকের ধারে । কেউ কাউকে চেনে না কিন্তু মিলেমিশে গলা ছেড়ে ডাকতে শুরু করে যেন কত চেনা তারা একে অপরের । আমের মুকুল এসে গেছে তখন নলবনের গাছে । কোকিল গলা ছেড়ে গাইতেও শুরু করেছিল সে সকালের ভৈরবী ।   পলাশের কুঁড়ি ঝরা মিষ্টি সেই সকালে আমাদের প্রাতরাশ খেতে যাওয়া হল ছোট্ট সাঁকো পেরিয়ে তারার বনভোজন দফতরে । লুচি, তরকারি, মিষ্টি আর চা খেতে খেতে জনপ্রিয় টেলিভিশন এন্কর রিনির সাথে  কথা হ'ল ।

তারা মিউজিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেশমি রায়  আর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ডা: ছন্দা গুহ আমাদের সাথে ছিলেন সেদিন । 

   সেদিন সকলে যে যার মত " যেমন খুশি পারো " এই ভাবে কত কিছু করল । কেউ নাচল, কেউ গান করল, কেউ আবৃত্তি করল  স্বরচিত কবিতা । ক্যুইজ হল খানিকক্ষণ |  ততক্ষণে ছোটরা ক্রিকেট ম্যাচ শুরু করে দিয়েছে । সূর্য তখন মধ্য গগনে কিন্তু আগের রাতের মেঘ-বৃষ্টির টানাপোড়েনে মাঝেমাঝেই ধাকা পড়ে যাচ্ছিল মেঘের মধ্যে । পাশের ঝিল আর মাছের ভেড়ির ওপর দিয়ে তখন ব‌য়ে চলেছিল বসন্তের হাওয়া । আমার কয়েকজন সেই হাওয়া গায়ে মাখতে মাখতে কোথায় যেন পাড়ি দিয়েছিলাম সে দিন ! মাঝখানে এল গরমাগরম স্ন্যাকস । তার কিছুপরেই দুপুরের খাওয়া । গরম ভাত, সুক্তো, ডাল, বেগুনি, পাঁঠার মাংস, বাঁধাকপি আর চাটনী ;
খাওয়ার পর অন্ত্যাক্ষরী ।   আর তারপর গানের সাথে জমাটি নাচ । রেশমি আমাকে ছড়া লিখে পড়তে বলেছিল । সেটাও ছিল আমার কাছে অনেক পাওয়ার মধ্যে একটা । 
হাতের মুঠোয় সজনেফুল, কোকিল সুরভাসি 
নলবনের বনভোজনে তারার পাশাপাশি  ।
মেঘপিওনের জল-লেফাফা, ভোরের রাতে হ'ল সাফা 
তারার ডাকে পেলাম সাড়া, বৃষ্টিগায়ে সারাপাড়া ।
মাছের ভেড়ি, দামী শাড়ি, মেঘে ঢাকা সূয্যিবাড়ি
চড়ুইভাতি চড়ুইভাতি আজকে শুধুই মাতামাতি
উড়ছে ফাগুন্, জ্বলছে পলাশ, শীতের বাড়ি করছি খালাস ।
ঘটিবাটি, রান্নাছুটি মেঘের কোলে খেলনাবাটি ।
পিকনিকে তোর ধূলোমুঠি , রোদের সাথে খুনসুটি ।
আজ আমাদের ছুটিছুটি হৈহৈ,গান লুটোপুটি ।
" মনের কথা মন খুলে বল " দেখনা কেমন আলো সকাল ।
মন দিয়েছে স্বপ্নপাড়ি, ওলো স‌ই তোর আমার বৃষ্টি শাড়ি !
ঝাঁকঝাঁক উড়ো মিতেনী, ও ভাই আমরা কি তোরে চিনি?
নে না চিনে বন্ধু আমার তারার আলোয় দেখ একবার !
স‌ই পাতালাম ! বন্ধু হলাম ! কথা দিলাম! বৃষ্টিকথার শব্দ নিলাম ।

বিকেলের চায়ের পর আমরা যে যার মত বাড়ি ফিরেছিলাম সে বিকেলে । এই প্রথম কোনো টিভি চ্যানেলের ক্লাব মেম্বার হয়ে পিকনিক যাওয়ার সৌভাগ্য হ'ল আমার ।

বেশ সুন্দর অনুভূতি ! নতুন বসন্তের গন্ধের মত, নতুন শীতের ওমের মত, নতুন বৃষ্টির ছন্দের মত ! নতুন করে ফিরে পাওয়া কলেজ জীবনের ছোঁয়া  যেন লেগে র‌ইল মনের মধ্যে । 

২৭ ফেব, ২০১১

"খড়গপুর" নাম কেন হ'ল ?


খড়গপুর আইআইটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে উত্তর দিকে ৫ কিলোমিটার গেলে পড়বে ইন্দা বাজারের মোড় । সেখান থেকে পূবদিকে আরো খানিকটা গেলে পড়বে ইন্দা দুর্গা মন্দির আর তারপরই বাঁদিকে খড়গেশ্বরের শিব মন্দির । এই মন্দিরের নামেই এই জায়গার নাম খড়্গপুর । কারো মতে,   রাজা খড়্গসিংহ তৈরী করেছিলেন এই মন্দির । আবার কারো মতে বিষ্ণুপুরের রাজা খড়্গমল্ল ২০০ বছর আগে এই মন্দির তৈরী করেছিলেন ।


মন্দিরের অভ্যন্তরে  গর্ভগৃহে প্রোথিত  খড়্গেশ্বর শিবলিঙ্গ  । শিবরাত্রি, আর গাজনের সময উতসব হয় এখানে ।


মন্দির চত্বরে বহু প্রাচীন একটি অশ্বত্থ গাছের বেদীমূলে রয়েছে আদিবাসীদের আরাধ্যা কোনো দেবতার প্রস্তর মূর্ত্তি । দক্ষিণবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার এই অঞ্চলগুলি প্রধানত:আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা ছিল । তবে  এখন সূর্য দেব রূপে ইনি পূজিত হন ।
মন্দিরের নাট মন্দিরে এখন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়েছে । স্থানীয় মানুষ জন আর মন্দিরের পুরোহিত বিদ্যালয়টি চালনা করেন । মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণও তাঁরাই করেন আর মন্দিরের মধ্যে অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এই স্কুলটি করেছেন তাঁরা ।


জটাজুটো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই বহু পুরোণো অশ্বত্থ বৃক্ষ আর বহন করছে সময়ের সাক্ষ্য ।


 পুরো মন্দিরটী তৈরী পাথর দিয়ে । কোনো ইঁট নেই এর গায়ে । এখন সাদা রঙ করা হয়েছে ।

১৮ ফেব, ২০১১

ঘুরে এলাম পাথরা ও কর্ণগড়


১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০১১ । একটা ছুটির দিন ছিল । তার আগের দিন রাতে আমাদের আরো এক বন্ধুর সাথে হঠাতই প্ল্যান হ’ল বেরোনোর । ” একে তো ফাগুন মাস , দারুন এ সময় ” ! আর খড়গপুরে এসে অবধি আমরা  নেট সার্ফ করে চলেছি এর আশপাশ নিয়ে । সময় পেলেই বন্ধুরা মিলে আর এন্ড ডি করছি …ছুটির দিনের অপেক্ষা করছি । হঠাতই মিলে গেল আরো একটি ট্যুরিস্টস্পটের  । বাতাসে সজনে ফুলের গন্ধ আর পলাশের রঙ সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়লাম আমরা চারজন মিলে..
মেদিনীপুর থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে মন্দিরময়ে পাথরা গ্রামের ।


কংসাবতী (কাঁসাই) নদীর ধারে, মন্দিরের পর মন্দির রয়েছে পাথরায় । মন্দির, নাট মন্দির , কাছারিবাড়ি, রাসমঞ্চ, ঠাকুরদালান । পাশেই পাথরা গ্রাম । গ্রামের বাড়ি, পুকুর, ধানক্ষেত,  আলুর ক্ষেত,  সবজীর ক্ষেত, বাঁশঝাড় সবকিছুর মধ্যেই মন্দিরময় এই পাথরা ।  সবমিলিয়ে চৌত্রিশটি অসাধারণ সব মন্দির আছে ।  এগুলি প্রায় ২০০ বছরের পুরোণো ।


১৭৩২ সালে বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ ঐ পাথরা গ্রামের  রত্নাচক পরগণার রাজস্ব আদায়ের জন্য বিদ্যাসুন্দর ঘোষাল নামে একজনকে নিযুক্ত করেন । ঐ বিদ্যাসুন্দর বাবু তাঁর নিজের শখে একের পর এক এইখানে মন্দির বানান । মন্দির গুলির ধ্বংসাবশেষ দেখলে মন খারাপ হয়ে যায় । সব শিবলিঙ্গের ভাঙা করুন অবস্থা ..




একটি এনজিও সংস্থা "পাথরা আর্কিওলজিকাল প্রিজার্ভেশন কমিটি",  আইআইটি খড়গপুরের সাথে সম্মিলিত ভাবে এই সুন্দর মন্দিরগুলির তত্ত্বাবধানে ব্রতী হয়েছে । মন্দিরের কারুকার্য পোড়ামাটির ইটের ; স্টাইলটা বিষ্ণুপুরের বাংলার  চালাঘরের মত আর অভিনব শিল্পশৈলি তার গায়ে ।



সেখান থেকে আরো কিছুটা গিয়ে হাতিওলকা গ্রাম পেরিয়ে গেলাম কর্ণগড় । 


পুরোণো গড় আজ আর নেই । নতুন মন্দির হয়েছে অনেকগুলি ।

সেইখানে মন্দিরের প্রসাদ খেয়ে দুপুরের মধ্যেই আবার ফিরে এলাম খড়গপুরে |

১৩ ফেব, ২০১১

খুশির প্রেমদিবস






ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিল না আমাদের সময়ে । কিন্তু তখনো প্রেমে পড়ত ছেলেমেয়েরা । আর বসন্ত এলেই প্রেমের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিত তারা । পালন করত নিত্য নতুন ভ্যালেন্টাইনস ডে । কখনো হোলিতে কখনো সরস্বতী পুজোতে । আর প্রণয়ের পারাবারে সাঁতার কাটতে কাটতে বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীরা  ? দৈনন্দীন জীবনের একঘেয়েমিতে কেমন পাগল পাগল ভাব নিয়ে  তারাও মাঝে মাঝে পালন করত ভ্যালেন্টাইন্স ডে । স্বামী তার বিশেষ দিনটিতে স্ত্রীয়ের জন্য ছোট খাট গয়না 
কিনে উপহার দিতেন । অফিস থেকে ফেরার পথে, জলযোগের কেক-প্যাটিস নিয়ে বাড়ি ফিরে বলতেন " কি গো চা বসাও ? দেখ আজ কি এনেছি, তোমার জন্যে " কিম্বা  চলো দু'দিন পুরী বেড়িয়ে আসি" এ সব দেখেছি আমাদের বাবা 
মায়েদের আমলে । আমাদের বিয়ের ঠিক আশপাশের সময় থেকে শুরু হ'ল ভ্যালেন্টাইন্স ডে । লেট আশির দশকে । ব্যাস! সেই থেকে শুরু "ভ্যালেন্টাইন প্যাকেজ"  ফুলের দোকান থেকে শুরু করে গ্রিটিংস কার্ড , গয়না থেকে কেক, মকটেল, 
কফি , আইস ক্রিম সর্বত্র সেই তীর বিদ্ধ হৃদয়ের ছবি !  শপিং মলে ঝুলছে বিশাল বিশাল রক্তাক্ত হৃদয় , টিভির পরদায় প্রেমের গান, প্রেমের ছবি, প্রেমের কবিতা আবৃত্তি  । আর এসেমেসের চোটে আগের দিন মধ্য রাত থেকে সেলফোনের 
নেট ওয়ার্ক হ'ল বেজায় স্লো।   সামনেই সব ছেলেপুলেদের বড় বড় পরীক্ষা ! তো কি ? পরীক্ষার আগে একটু ডাইভারশান চাই না ? তাই তো সাধু ভ্যালেন্টাইন এই উপায় বাতলেছেন ।
গতবছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে'র দিন সকালে মর্নিং ওয়াকে গেছি; এক ভদ্রলোক তার সহধর্মিনীকে বলছেন " এই রোজ রোজ তোমার পাল্লায় পড়ে সকালে হাঁটতে বেরোনো আমার জীবন বিষময় করে তুলছে" 
নীরব স্ত্রীটি হাঁটতে লাগলেন আরো জোরে জোরে । 
ভদ্রলোক বললেন " খাবার ওপর ট্যাক্স ও বসালে , আর হাঁটাও ধরালে ...তাহলে যেকোনো একটাই করো হয় খেতে দিও না, নয় হাঁটতে  বোলোনা"আমার মা বেঁচে থাকলে দেখিয়ে দিত তোমার মজা  সব কিছুতেই  কাঁটছাঁট ! চায়ে চিনি বন্ধ , সকালে একগাদা ফল খাও , দুপুরে ভাত নৈব নৈব চ ! রাতে মোটে একটা রুটি ! কি কুক্ষণে একটা সেমি-ডায়েটিশিয়ান বৌ এনেছিলাম" 
বেচারী বৌটি তখনো চুপ !  
স্বামীটি আবারো বললে " দাঁড়াও দেখাব মজা , অফিসের বেয়ারাকে দিয়ে ভাল ভাল খাবার আনিয়ে খাব, তুমি জানতেও পারবে না" 
তখন বৌটি আর থাকতে না পেরে মুখ খুলল "আজকের দিনে ঝগড়া করতে  নেই গো , আজ প্রেমের দিন, আজ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে আর তুমি কি না শুধুমুদু আমাকে সক্কালবেলা গালাগালি দিচ্ছ ? আমি যে 
তোমার ওয়ান এন্ড ওনলি ভ্যালেন্টাইন !" 
তাদের এই মৃদু প্রেম মিশ্রিত ঝগড়ার সুর উঠল আমার প্রাণে । অঞ্জন দত্তের গান মনে পড়ে গেল " তুমি না থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হত না .. " 
আর  আমি তাদের কথাগুলো নিয়ে একটা গান লিখেছিলাম অঞ্জন দত্তের গানের সুরে .. যারা জানেন গানটি তারা বুঝতে পারবেন আশাকরি ;


 বৌটি বলছে 
"আমি না থাকলে তোমার জীবন আরো মধুময় হত, রাগঝাঁঝ আর ঝগড়াঝাটির অবসান আজ হোত । 
আমি না  থাকলে থোড়-বড়ি-খাড়া রান্নাঘরের মেনু, চামচ হাতে, প্লেট বাজিয়ে বাজাতে বসে বেণু  
আমি না থাকলে প্রতিসন্ধ্যায় কাঁচের গেলাস হাতে, শুধু ঘন ঘন চুরুট আর চাট দিতে তুমি শুধু দাঁতে । 
আমি না থাকলে ল্যাপটপ খোলা শুধু তুমি আর তুমি, চ্যাট, ইমেল খেয়েছে তোমায় (যা) আমার চেয়েও দামী । 
আমি না থাকলে ব্যাঙ্কের টাকা দ্বিগুণ হয়ে যেত, সকালে চিংড়ি, বিকেলে মাটন বন্ধুরা এসে খেত । 
রোজ সকালে হাঁটার জন্য উঠিয়ে দিত না কেউ, হত না এমন মন কষাকষি ঝগড়াঝাটির ঢেউ ! 
খাবার ওপর ট্যাক্স বসিয়ে জিমে পাঠালাম আমি, এখন ভুঁড়ি কমল তোমার, 
সুফল পেলে তুমি"

১২ ফেব, ২০১১

"তখন ২৩"..আমার চোখে




দৈনিক স্ট্যেটসম্যান ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০১১ তে প্রকাশিত এই আলোচনা  



"তখন ২৩" একটি সময়োপযোগী বাংলাছবি । বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে যা ঘটে চলেছে  তাকে সঙ্গে নিয়ে অত্যন্ত নিপুণ ভাবে ছবির কাহিনীকার এবং পরিচালক অতনু ঘোষ চরিত্রগুলিকে এঁকেছেন  । 
বয়সন্ধির সমস্যা প্রকটভাবে না হলেও প্রচ্ছন্নভাবে স্থান পেয়েছে । স্থান পেয়েছে একটি একমাত্র সদ্য টিন পেরোনো ছেলের মায়ের অতি অধিকারবোধ । মূল চরিত্র তমোদীপ । যে কি না বাবা-মায়ের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা পূরণ করেছে, ডাক্তার হয়ে  । যে তমোদীপের জীবনে তার মা ছিল সবচেয়ে বড় বন্ধু তিনি ধীরে ধীরে সরে গেছেন তার কাছ থেকে যখন তার জীবন ঘিরে তার বায়োলজি টিচার মেঘনার  প্রতি   ইনফ্যাটুয়েশান । মেঘনার সাথে ঘনিষ্ঠতায় মা হয়েছেন বিরক্ত ।  মেঘনাকে তমোদীপের মা অনুরোধ করলেন তার ছেলের জীবন থেকে দূরে চলে যেতে । আবার পরক্ষণেই তিনি ভাবেন যে মেঘনাকে দূরে সরিয়ে দিয়েই বুঝি তার ছেলের সাথে  দূরত্ব তৈরী হল । তাই আবার মেঘনাকে অনুরোধ করেণ ফিরে যেতে যাতে তাঁর ছেলের সাথে সম্পর্ক সহজ হয় ।   
সোশ্যালনেটওয়ার্কে  তমোদীপের আলাপ হয়েছে শ্রীপর্ণার সাথে যে আবার চিনে ফেলে মেঘনাকে যিনিও উপস্থিত ফেসবুক নামক সোশ্যালনেট ওয়ার্কিং সাইটে ।  এমন সময় তমোদীপ আসক্ত হয়েছে পর্ণোগ্রাফিক ছবিতে । যেখানে পর্ণস্টার মোহিনী ওরফে শম্পা দাশগুপ্তার  লাস্যময়তার রঙীন ফ্যান্টাসিতে ডুবে গেছে তমোদীপ । এই তিন বাইরের জগতের নারীর আকর্ষণে দূরে সরে গেছে একসময়ের সবচেয়ে কাছের বন্ধু অন্দরমহলের "মা" নারীটি । তিনি বুঝতে পারেন না নিজের সেই ছোট্টটিকে । তমোদীপ  বুঝতে পারছে যে তার মায়ের কাছ থেকে সে দূরে সরে গেছে । তার বায়োলজি টিচার মেঘনার সঙ্গ তার ভালো লাগে কারণ তার মনের বয়স সেই ভালোলাগাকে  প্রাধান্য দিয়েছে । তার মা তাতে ভয় পেয়েছেন আর পাঁচটা মায়ের মত । কিন্তু মেঘনা নিজে একজন ডিভোর্সি এবং জীবনকে তমোদীপের থেকে বেশিদিন দেখেছে তাই মেঘনা কিন্তু আদ্যোপ্রান্ত শিক্ষিকার ভূমিকা পালন করেছে এবং সেই চরিত্রটির জন্য ইন্দ্রাণী হালদারকে নির্বাচন যথাযথ বলে আমার মনে হয়েছে ।  তমোদীপের জীবনে এসেছে চ্যাট ফ্রেন্ড শ্রীপর্ণা যার জীবনে সোশ্যালনেট ওয়ার্কিং শেষ কথা এবং নিজের জীবনকে ভালো করে উপলব্ধি করার জন্য সে সব চ্যাট ফ্রেন্ডকে মিট করে । ডিজিটাল সম্পর্ককে রিয়েলিটির মুখোশ পরিয়ে দেখবে বলে হয়ত । কিন্তু যখন সে চ্যাট-বন্ধু রজতাভ দত্তের সংস্পর্শে আসে তখন রজতাভ নিপুণ হস্তে তাকে বুঝিয়ে দেন যে এই বয়সে যখন তখন চ্যাট ফ্রেন্ডকে চর্মচক্ষে আলাপ করে তার সঙ্গে সময় কাটানোটা কতটা ক্ষতিকারক হতে পারে ।   আবার মন ছুঁয়ে যায় রজতাভর চরিত্রটির অপূর্ব চিত্রায়ণ । এই দুটো দিক বিচার করে আমার মনে হয়েছে ছবিটি শিক্ষামূলক । আজকের যুগের সোশ্যালনেটওয়ার্কে চিটে গুড়ের মত আটকে থাকা স্কুল-কলেজ পড়ুয়াগুলির দেখা দরকার ছবিটি আবার দেখা দরকার তাদের মায়েদেরও যারা বুঝতে পারছেন না বয়ঃসন্ধির সমস্যাটি কোথায়  ?  ঠিক এমন সময় তমোদীপের ফ্যান্টাসির জগতের নায়িকা পর্ণস্টার মোহিনীর আবির্ভাব হয়  বাইপাসে রোড এক্সিডেন্ট হয়ে সরাসরি তমোদীপের পেশেন্ট রূপে ; মোহিনী হয়ে নয় " শম্পা দাশগুপ্তা " যার আসল পরিচয় ; হসপিটালে কয়েকটাদিন কাছের থেকে মোহিনীকে দেখার সুযোগ করে দেন তমোদীপের ভাগ্যলক্ষী ।   উঠে আসে শম্পার মোহিনী হবার গল্প । এবার শুরু হয় তমোদীপের টানাপোড়েন । পরিচালক অতনু ঘোষ ঠিক সেই সময় মেঘনা চরিত্রটিকে সঠিক ভাবে রূপায়িত করেন একজন " মনের কথা মন খুলে " বলার মত কাউন্সিলারকে যিনি অল্পবয়সীদের মনের ছবি দেখেন  তার এফএম চ্যানেলের লাইভ টক-শো তে । ধীরে ধীরে কাউন্সেলিং করেন তমোদীপকে আর সেই সাথে তমোদীপের মা'টিকে  । তমোদীপের মনের টানাপোড়েনের পরত গুলি একটি একটি করে খুলে যায় । সে শক্ত করে ধরে থাকে জীবনের সম্পর্ক-যুদ্ধের স্টিয়ারিংটি । ধীরে ধীরে এগুতে থাকে পজিটিভিটির দিকে । দেখতে পায় আলো । ঝকঝকে রাস্তায় তার নিজের  কেনা  প্রথম লাল রঙের গাড়ির চাবি মায়ের হাতে দিয়ে প্রমাণ করে যে সে বদলায় নি একটুও । এখানে গাড়িটিও সিম্বলিক কারণ জীবনের গতিময়তার প্রতীক রূপে, নতুন রাস্তায় জীবন মোড় নেবে বলে  । আর পাওলি দামের অভিনয়ে মোহিনী চরিত্রটি আমার চোখ দিয়ে দেখে মনে হল শম্পার আর পাঁচটা পতিতার মত  অতীত ছিল ; শম্পার  শিল্পীসুলভ গায়নশৈলী ছিল আর ছিল কবিতাকে উপলব্ধি করার মন । কিন্তু  তমোদীপ, মেঘনা আর শ্রীপর্ণার বন্ধুত্বের স্পর্শে সে ফিরে এল আলোর জগতে । ভালোবাসার ছোঁয়ায় উন্মোচিত হ'ল তার হৃদয়ের কোমল মনোবৃত্তি । তাই সে  হলুদফুল রাখল তমোদীপের গাড়ির ওপর   । এখানে হলুদ ফুল আবারো " গোল্ডেন হার্টে"র প্রতীক গল্পের শুরুতে আমরা দেখি আমাদের দেশের তথাকথিত হিপোক্রেসীর শিক্ষা ব্যাবস্থায় গালভরা "সেক্স এডুকেশন"  কেমন সুন্দর ভাবে  তুলে ধরেছেন পরিচালক । আর যেহেতু তমোদীপ, মেঘনা, শ্রীপর্ণা এরা ফেসবুক ও অর্কুটের মাধ্যমে সোশ্যালাইট করে তাই প্রতিনিয়ত অতনু বুঝিয়ে দিয়েছেন রিয়েল আর ভারচুয়াল চরিত্র সব সময় এক হতেও পারে আবার না হতেও পারে । তাই এসেছে ডাঃ রূপক সেনের জীবন সঙ্গিনী পিঙ্কি প্রসঙ্গ । আবার ফেসবুকে রজতাভর ছবি দেখে শ্রীপর্ণার বিস্ময় ! আর মোহিনী চরিত্রটি ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে না ঘুরলেও রিয়েল লাইফে তার দুটো আইডেন্টিটি । একটি মোহিনী অন্যটি শম্পা ।    সেখানে রিয়েল লাইফের সাথে ভার্চুয়াল লাইফ মিলে মিশে এক ! সব শেষে বলি " তখন ২৩" একটি মনের সমুদ্রে সাতাঁর কেটে চলা " ইনফ্যাটুয়েশানের্" ছবি যেখানে যৌবনে পদার্পণ হওয়া তমোদীপের ফ্যান্টাসিগুলো একসময় ফিরিয়ে দেয় তাকে নিজের একান্ত আপন জীবনে ।  জীবন চতুষ্কোণে চার নারীর  সম্পর্কের টানাপোড়েনে বিদ্ধস্ত তমোদীপ নিজের চোখ দিয়ে মনের ভেতরকে দেখে  উপলব্ধি করে মনের কোণে থিতিয়ে পড়ে থাকা জীবনদর্শন |
সব মিলিয়ে বলা যায় এই জেনারেশানের ছবি, পরিচ্ছন্ন ছবি যেখানে অহেতুক নাচ-গান নেই । আর সব শেষে বলি তমোদীপের ভূমিকায় যীশু সেনগুপ্ত, মোহিনীর ভূমিকায় পাওলি দাম, শ্রীপর্নার ভূমিকায় অপরাজিতা ঘোষদাস,    মেঘনার ভূমিকায় ইন্দ্রাণী হালদার এবং তমোদীপের মায়ের ভূমিকায় তনুশ্রী শঙ্কর এক্কেবারে সঠিক নির্বাচন । কেবল লকেট   চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রটির তাতপর্য আমার কাছে একটু প্রশ্ন জাগিয়েছে । আর অতুলপ্রসাদের গান " তুমি গাও" এ জয়তী চক্রবর্ত্তির গায়কী আরো একবার মন ছুঁয়ে গেল । এ যাবত কাল পরিচালক অতনু ঘোষের কাছ থেকে ঊনিশটি টেলিছবি আমরা দেখেছি তারা মিউজিকের পর্দায় । বড়পর্দায়  অতনু ঘোষের ২য় ছবি " তখন ২৩" এ ও তিনি সার্থক তা আবার প্রমাণ করে দিয়েছে ।   তারা ফিল্মস বড়পর্দায় প্রথমেই সফলতা প্রমাণ করেছে 

 

৯ ফেব, ২০১১

কুরুম্ভেরা দুর্গে কিছুক্ষণ !



এখন যে আই-আই-টি খড়গপুরকে আমরা দেখি প্রাক স্বাধীনতার যুগে সেখানে ছিল হিজলী জেল ।
আই-আই-টি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে দক্ষিণদিকে যাত্রা করলে হিজলি ফরেস্ট শুরু হয় ।

শীতের রোববারের সকালে এই অরণ্যের হাত ধরে, কেশিয়াড়ি হয়ে ঘুরে আসা যায় ভসরাঘাট| সুবর্ণরেখা নদীর ধবধবে সাদা, মসৃণ ও রোদের আলোয় চিকচিকে বালির চরে হেঁটে নদীকে ছুঁয়ে দেখে আসা যেতেই পারে ।

নদী দেখে ফেরার পথে বেলদার রাস্তায় ২ কিলোমিটার গেলে পড়বে কুকাই গ্রাম । সেখান থেকে আরো ২ কিলোমিটার গেলে পড়বে গগনেশ্বর গ্রামে কুরুম্ভেরা দুর্গ । পুরাতাত্মিক মনুমেন্ট হিসেবে স্বীকৃত এই ফোর্টটি সত্যি সত্যি এখনো স্বমহিমায় তার রাজকীয়তা বজায় রেখেছে ।

পশ্চিম মেদিনীপুরে যে এত অভিনব একটি স্থাপত্য আছে তা হয়ত অনেকেরই জানা নেই ।

কোলকাতার অনতিদূরে এমন একটি জায়গা আছে । কোলকাতায় আছে অনেক সৃষ্টিশীল মানুষ । কিন্তু কোনারক আর খাজুরাহে হয় ডান্স ফেষ্টিভাল কিন্তু কুরুম্ভেরাতেও তো হতে পারে ! আমার এখানে গিয়ে কেবলই মনে হতে লাগল সে কথা । আমার মনের ক্যামেরায় ধরা র‌ইল সেই রাজকীয় দুর্গের ছবি !
 

৪ ফেব, ২০১১

"থট-শপ"


সে এক ছিল মজার দোকান । দোকানের নাম "থট-শপ" ;সেই দোকান সাধারণ মানুষ খুঁজে পেত না, যার যাবার ইচ্ছে হত সে ঠিক পৌঁছে যেত সেই দোকানে । মালিক এক থুড়থুড়ে, দাড়ি ওলা বুড়ো যার নাম চিন্তামণি, অনেক বয়স তাঁর ।  এক সময় ছিলেন রসায়নবিদ । ক্রিস্টালের ওপরে রিসার্চ করেছিলেন বহু বছর ।  সে দোকানে কত রকমের  সব জিনিষ বিক্রি হত । থরে থরে সব সাজানো থাকতো কাঁচের বয়ামের মধ্যে  । ঠিক যেন লজেন্স ! লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা.... কত রঙের বাহার।  কত ধরণের গড়ন সেই সব রঙীন লজেন্স-ক্রিস্টালের; কোনোটা ছুঁচের মত, কোনোটা রম্বসের মত, কোনোটা আবার চোঙাকৃতির, কোনটে বা আয়তঘনাকার ।প্রত্যেক বয়ামের গায়ে স্ফটিকের নাম, দাম আর গুণাবলী লেখা থাকত।  বুড়ো চিন্তামণি দোকানের মধ্যে  টেষ্টটিউব, বানসেন বার্নার, বিকার, ফিল্টারপেপার, ফানেল  আর আইসবক্স নিয়ে বসে থাকত ঘন্টার পর ঘন্টা নাওয়া-খাওয়া ভুলে । ছোট ছোট বাক্সের মধ্যে রাখা রঙবেরঙয়ের নুন-চিনির মত দানা  বের করে তাদের জলে দ্রবীভূত করে , ফুটিয়ে ধীরে ধীরে ঠান্ডা করে বরফে কিম্বা ঠান্ডা জলের মধ্যে রেখে রাতে  বাড়ি চলে যেত; পরদিন এসে দেখত কেমন সব রঙ বেরঙয়ের স্ফটিকের উত্পত্তি ।বুড়োর ছিল এক গ্লাসরড যা প্রত্যেক ক্রিস্টালে ছোঁয়ালেই একটা করে চিন্তা বা "থট" ঢুকে যেত তার মধ্যে । আর যে সেই ক্রিস্টাল বুড়োর কাছ থেকে কিনে নিয়ে বাড়ি গিয়ে বয়ামে লেখা নিয়ম মাফিক গ্লাসে জল নিয়ে এক এক করে যেই ফেলত অমনি চিন্তার বুদবুদেরা গ্লাসের জলের মধ্যে থেকে সেই মানুষটির মাথায় যেত চলে । আর ঠিক তক্ষুণি সেই মানুষটি পাড়ি দিত চিন্তার কল্পলোকে ।     "কিউবিক"
ছোট্ট অপু একদিন সেই দোকানের খোঁজ পেল । তার অনেক দিনের সাধ পাখি হয়ে উড়ে মেঘেদের কাছে যাবার; নীলচে সবুজ "স্ফটিক"নামের    লজেন্স-ক্রিস্টালের পাউচ কিনে নাচতে নাচতে বাড়ি এল । বুড়োর কথামত এক গ্লাস জল নিয়ে যেই একদানা ক্রিস্টাল জলে ফেলা অমনি অপু পাড়ি দিল পাখির বেশ ধরে  স্বপ্নের কল্পনায় । মাছরাঙার নীলটুকু ,কাঠঠোকরার হলদে টুকু, টিয়ার ঠোঁটের লালটুকু নিয়ে অপু হল ছোট্ট পাখি  টুনিয়া । শিস দিয়ে গান গাইতে গাইতে টুনিয়া উড়ে গেল মেঘের বাড়ি। অনেক দিন ধরেই অপুর মা বলছিল বৃষ্টিহীনতা আর খরার কথা । মেঘের কাছে গিয়ে টুনিয়া গান শুনিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে মেঘকে নিয়ে এল নিজের বাড়ির ছাদের মাথায় আর শুরু হল ঝমাঝম বৃষ্টি ।

ছোট্ট মেয়ে তাথৈ সমুদ্রের নীচে  দ্বীপে পাড়ি দিতে চায় ।  তাথৈ সেই দোকানে গিয়ে  কমলা রঙয়ের "রম্বিক"নামের ক্রিস্টাল কিনে নিয়ে এল আর জলে ফেলতেই চিন্তার বুদবুদেরা তাথৈকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সমুদ্রের নীচে । ছোট ছোট সি এনিমন, কোরাল, হাইড্রা আর এলগিদের সাথে তার বন্ধুত্ব হল। মায়ের কাছে গল্প শুনেছিল ঝিনুকের পেটে মুক্তোর কথা । কিন্তু কোনোদিন তা চোখে দেখেনি সে। খুব ইচ্ছে হত হাতে করে দেখার । নীচে গিয়ে দেখে কত কত ঝিনুক । ঢাকনা খুলে পেটে করে পেল্লায় মুক্তো নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে । দুচোখ ভরে তা দেখতে দেখতে হঠাত্‌ তাথৈ ভাবল "আমি যদি এমন একটা মুক্তো হতে পারতাম"  । যেমনি ভাবা অমনি একটা বিরাট গোলাপী ঝিনুক তার দিকে ছুটে এসে বলল "আজ থেকে তুমি হলে এই জলমন্ডলের রাণী । তোমার নাম আমি দিলাম মুক্তা, এস আমার কোলে"  আহ্লাদে আটখানা হয়ে মুক্তারাণী ঝিনুকের কোলে বসে পড়ল । আর তখুনি আর সব জলদেশের বন্ধুরা তাকে ঘিরে হৈচৈ করতে লাগল, নাচতে লাগল, গাইতে লাগল । মুক্তা তাদের বলল যাবে তোমরা আমার বাড়ির বাগানে? একটা ছোট্ট লিলিপুলে থাকবে । আমার সাথে রোজ খেলবে এই ভাবে । রাণীর কথা কি আর অমান্য করা যায় সব ছোট বড় ঝিনুকেরা, মস-ফার্ণ, শাঁখেরা  অমনি রাজী হয়ে গেল । তাথৈ তাদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ির বাগানের লিলিপুলে ছেড়ে দিল । অনেকদিনের শখ তার পূর্ণ হল ।
অপু, তাথৈ স্কুলে গিয়ে সব বন্ধুদের তাদের নতুন অভিজ্ঞতার কথা বলল ।  স্কুলের টিচারদেরও বলল সব । একজন টিচার দোকানের নাম জিগেস করল । তার অনেকদিনের সাধ চাঁদে যাবার ।  তা তিনি রাস্তা চিনে সেই "থট-শপে" গেলেন । সেখানে গিয়ে চিন্তামণির কাছ থেকে বেগণি রঙের "কিউবিক"  নামের   ক্রিস্টালটি পছন্দ করে কিনে ফেললেন । বুড়োকে টিচার এবার প্রশ্ন শুরু করলেন । আচ্ছা আমি তাহলে সত্যি সত্যিই আমার শখ পূরণ করতে পারবতো এই লজেন্স-ক্রিস্টালের সাহায্যে? যদি না হয় আমার কিন্তু পয়সা ফেরত চাইই-চাই । আমার কোনো বিপদ হবে নাতো?"আরো বললেন " আচ্ছা জলে দিলেই হবে ? এতো মনে হচ্চে গ্যাঁজাখুরির গল্পের মত ।  আমি আবার ফিরতে পারবো তো এই পৃথিবীতে ? ইত্যাদি ইত্যাদি ..."বুড়ো চিন্তামণি বিরক্ত হয়ে বললেন " আচ্ছা বাপু, তোমার যখন এতই চিন্তা তখন কেন আমার দোকানে আসা ? আমি কি আর তোমার মত খদ্দেরের জন্যে সে কোন সূদুর থেকে এই সব লজেন্স নিয়ে এসে বিক্রি করি ?  অপু, তাথৈ এদের মত শিশুরা যাদের আমার কথার ওপর অগাধ আস্থা আর যারা শুধু বিশ্বাস করে আমাকে তাদের জন্যই আমি বেচি । তাই তারা ফলও পায়  । তুমি চাইলে তাই বিক্রি করলাম ঐ বেগণি লজেন্স-ক্রিস্টাল গুলো । এই নাও তোমার পয়সা ফেরত, আমার জিনিস দিয়ে দাও আমাকে"

এমনি করে চিন্তামণির রঙিন দিন গুলো কাটতে থাকে একে একে । হঠাত সে ভাবল আচ্ছা আমিও তো এমন করে পৌঁছে যেতে পারি আমার ড্রিমল্যান্ড স্বর্গপুরের দরজায় । আমার তো কেউ কোত্থাও নেই; আমার জন্যে তো ভাববার ও কেউ নেই; আমি মরে গেলে কাঁদবার ও কেউ নেই; তাহলে দেখি না আমি যদি যেতে পারি চিরকালের মত সেখানে । আর শুনেছি সেখানে গেলে আর জন্ম হয় না । আর যুগযুগ ধরে মানুষের বিশ্বাস এই যে যারা ভাল কাজ করে তারা নাকি স্বর্গে যায় । আর চিন্তামণি জ্ঞানত: কোনো খারাপ কাজ করেনি কোনোদিন । মিথ্যে বলেনি, লোক ঠকায়নি, মানুষকে হিংসে করেনি । তাহলে সেও তো পৌঁছে যেতে পারে সেই স্বর্গদ্বারে ।  ব্যাস, যেই ভাবা অমনি খুলে গেল একটা বয়ামের ঢাকনা । বয়ামের লেবেলে লেখা "কসমিক",  রঙ টুকটুকে লাল  । বয়ামের মুখ থেকে উঠে আসছে একটা স্টিক আর তার থেকে ছোট ছোট লাল ফুল স্বচ্ছ পাপড়ি মেলে চিন্তামণির দিকে চাইছে, ঘরের  মধ্যে জোছনার  আলো চুঁইয়ে পড়েছে সেই পাপড়িতে আর ফুল গুলো ঝলমল করে উঠছে, যেন বলছে "এস, চল আমার সাথে, তোমার এবার যাবার সময়" চিন্তামণি উঠে ফুলের কাছে গেল| হাতে করে একটা ফুল নিল আর এক গ্লাস জলে ফেলল সেই লজেন্স-ক্রিস্টালের লাল ফুলটিকে ; সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার বুদবুদেরা চিন্তামণিকে নিয়ে চলল স্বর্গের দিকে ।  যেতে যেতে সে ছুঁয়ে দেখল আকাশের নীল রঙ, পাহাড়ের গাছেদের সবুজ রঙ , সূর্যের হলুদ-কমলা রঙ মেখে নিল বেশ করে । একটা বিশাল গুহার মধ্যে পৌঁছাল সে । যেখানে একধারে ঝরণার জল ওপরে সাদা কিন্তু ঝরে পড়ার মুখে নীল । কোথাও বা ফোয়ারা উঠছে মাটি থেকে লাল রঙের, লাল নীল ফুলেরা ফুটছে সবেমাত্র তাদের কুঁড়ি থেকে । ফুলের পাপড়ি যে এই ভাবে চোখের সামনে খোলে তা দেখে চিন্তামণির আনন্দ আর ধরে না ।  এইবার সে দেখতে পেল বিশালাকার ঝুলন্ত স্ট্যালাকটাইটের পাহাড়। মনে পড়ে গেল কেমিস্ট্রি ব‌ইতে ছবি দেখেছিল । কিছুদূর গিয়েই চোখে পড়ল স্ট্যালাগমাইটের প্রোথিত স্তম্ভ । ক্রিস্টাল নিয়ে গবেষণা করতে করতে , পড়াশুনো করতে করতে অনেক দিনের ইচ্ছে  ক্যালসিয়াম কার্বনেটের ক্রিস্টালাইজেশনের কারসাজিতে প্রাকৃতিক ভাবে তৈরী স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাগমাইটের দেশে যাবার । এই বুঝি তার স্বর্গের ঠিকানা । সে সত্যি আজ পৌঁছে গেল স্বর্গের আঙিনায় ।

ছোটদের ম্যাগাজিন "ইচ্ছামতী" তে প্রকাশিত

"টাইটানিক বৃষ্টি"


সেদিন তিন্নি পার্কে বসেছিল দাদুর সাথে। উঠল ভীষণ ঝড়, পড়ল বাজ, চমকাল বিদ্যুতমালা আকাশের গায় । এল বৃষ্টি । আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি। গাছপালা নতুন বর্ষার জল পেয়ে নেচে উঠল। দাদুর সাথে গল্প হচ্ছিল চাঁদের বৃষ্টির। চন্দ্রযান খবর পাঠিয়েছে জলের, বৃষ্টি ঝরেছে কয়েক ফোঁটা সেখানে । পৃথিবীর সাতসমুদ্রের কত জল তিন্নি তা জানে; মহাসিন্ধুর কত জল বাষ্পীভূত হয়ে বৃষ্টি রূপে তাই ঝরে পড়ে মাটীর বুকে। পার্কের ঘেরা বারান্দার ওপরে উঠে বৃষ্টি দেখল প্রাণ ভরে, ঘুম এল তার চোখ জুড়ে। দাদুর কোলে মাথা রেখে ছোট্ট তিন্নি বৃষ্টির নূপুর শুনতে শুনতে স্বপ্নের দেশে পাড়ি দিল । আকাশের গায়ে ভূগোল ব‌ইয়ের সৌরমন্ডলের ছবি । পৃথিবীর কোল আলো করে দাঁড়িয়ে আছে তিন্নি । একে একে কাছে তার এল বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, আর সবশেষে নেপচুন ।

"বল তোমরা কে কে বৃষ্টি দেখেছ?" তিন্নি প্রশ্ন করে তাদের ।

শান্ত সৌম্য চেহারায় ঠান্ডা মাথায় জবাব দিল বুধ | বললে, "বড্ড গরম, সূয্যিমামার কাছে থাকি, মোটে আরাম নেই, কি যে বল, বৃষ্টি কি তাই জানিনা ।"

ধবধবে ফর্সা রঙের শুক্র বললে, "শুনেছি মেঘ থেকে নাকি বৃষ্টি হয়, কিন্তু আমার কাছে মেঘের অনেক বাড়ি, তাতে বাষ্প নেই, আছে সালফারডাই-অক্সাইড গ্যাস । বৃষ্টি হবে কোত্থেকে? আমি কি ছাই বৃষ্টি দেখেছি!"

এল মঙ্গল। গম্ভীর মুখ করে রেগেমেগে বলল, "জানিনা, জানতে চাইও না ; বৃষ্টি! দূর দূর ! পাথরে, পাহাড়ে, লোহার শরীরে কঠিনে আমি লাল হয়ে গেছি দেখছ, আর তুমি বলছ বৃষ্টি?"

বিশালাকার বৃহষ্পতি মাথা চুলকে উত্তর দিল "জল নেই তো বৃষ্টি কোথা? হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম সেথা ।" জানো? আমার এখানে তো শুধু হিলিয়ামের সাইক্লোন দেখি, বৃষ্টি তো দেখি না

সবশেষে এল শনি । "বল তিন্নি কি বলবে। অনেক কিছু বলার আছে তোমায় । তুমি যে দেশে থাকো তার নাম পৃথিবী। তুমি অনেক ভাগ্যবতী যে ওখানে আছ । আমার চারপাশ ভীষণ ঠান্ডা, জানো? বরফের কুচি আমার চারধারে বলয়ের মত আমাকে বেষ্টন করে রেখেছে । আর আমার চাঁদের নাম টাইটান । তা তো তুমি জানো তিন্নি । সেখানে দেখেছি বৃষ্টি আমি ; সেদিন বর্ষা নেমেছিল শনির ঘরে, শনির দেশে, শনিগ্রহে। অতি ঠান্ডায় সব মিথেন গ্যাস তরলায়িত হয়ে ঝরঝর করে ঝরে পড়ে বাদলরূপে,ঠায় পড়তেই থাকে | যাকে তোমরা পৃথিবীর বুকে বৃষ্টি বল আমি তাকে শনির বুকে সৃষ্টি বলি । আহা কি সুখ কি সুখ! তোমায় যদি দেখাতে পারতাম তিন্নি। তুমি কি যে খুশি হতে!"

শনিদাদার কথা শুনে ভয় পেয়ে ইউরেনাস আর নেপচুন পিছু হাঁটল। মুখে তারা তিন্নির সামনে রা'টি কাটল না । যেতে যেতে বলল ফিস ফিস করে

"বৃষ্টি কিরে? কেমন তর?
বৃষ্টি কোথা? কেমন বড়?
বৃষ্টি নামে জলের ফোঁটা,
বৃষ্টি মানেই বাদল ফোটা"

"দাদাই, দাদাই," ঘুম থেকে ধড়মড়িয়ে উঠে তিন্নি বলল দাদুকে আমাকে টাইটানের গল্প বলবে ? আমি মিথেনের বৃষ্টির গল্প শুনব । তখন পার্কের মধ্যে বৃষ্টি-বাদল গেছে টুটে । আকাশে রামধনু উঠেছে । বৃষ্টির জলের ফোঁটায় আলোর প্রতিসরণে কি করে রামধনু সৃষ্টি হয় সেই গল্প শুনতে শুনতে দাদুর সাথে তিন্নি বাড়ি ফিরল সে বিকেলে। কিন্তু দাদাই যত তাকে রামধনুর গল্প বলে তিন্নি তত‌ই টাইটানের মিথেন বৃষ্টির গল্প শুনতে চাইল।
ছোটদের ম্যাগাজিন "দিয়ালা"য় প্রকাশিত

১৭ জানু, ২০১১

মকরের মেলা



আজ দেখে এলাম খড়গপুর থেকে বেরিয়ে একটা ছোট্ট গ্রাম কাশীজোড়ায় মকর সংক্রান্তির মেলা । খড়গপুর আইআইটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে প্রেমবাজারের পরই সালুয়া । সেখানে এয়ারফোর্সের বেস । ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসের হেড কোয়ার্টার এই সালুয়া । সালুয়া ক্রস করে যখন ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে চললাম তখন বিকেল সাড়ে চারটে । সূর্য তখন পশ্চিম মেদিনীপুরের পশ্চিম আকাশের কোলে ঢলে পড়েছে । মাইলের পর মাইল ধরে চলল অনাবাদী জমিও । ফসল নেই কোনো ।লালমাটির রাস্তা খুব চওড়া নয় । প্রত্যন্ত গ্রাম । আবার কিছুটা ধানজমি । ফসল উঠে গেছে পোষের পরবে । গ্রামের লোককে জিগেস করে করে পৌঁছে গেলাম কাশীজোড়া আর বেশ অনেকটা ধানক্ষেতের এবড়োথেবড়ো জমির ওপর মহা ধূমধামে বসেছে এই মকর সংক্রান্তির মেলা কুঝলাঝেঠি গ্রামের নাম । মেলার একপাশে মহাপুরুষ-থান অর্থাত সব দেবদেবীর মূর্ত্তি পূজো হয়েছে । আর নবান্নে ওঠা সদ্যপ্রসূত ধানগাছের গোড়ায় শুকনো মাটিতে বসেছে মেলা । সাতদিন ধরে চলে এই মেলা । জমজমাট মেলা প্রাঙ্গণ । একদিকে হচ্ছে তরজা গান । 

 অন্যদিকে খাবারদাবার । আর পাঁচমিশেলী হরেকরকম জিনিষপত্র বিক্রি হচ্ছে । আমি কিনলাম একটি ছোট্ট শিবলিঙ্গ । আর পাঁচটা মেলার মত লোহার সব জিনিষ, প্লাস্টিকের জিনিষ, খেলনা, বাসনকোসন তো আছেই । আর চোখে পড়ল দূর দূর গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে আসা সব মানুষ গুলো। কত আনন্দে ঘুরছে মেলায় । শীতের বিকেলে মা বাবার হাত ধরে কত কুচোরা বায়না ধরেছে এটাসেটা কেনার । 

ফেরার সময় দেখলাম গ্রামের মাটীর সব দোতলা বাড়ি । আর দেখলাম ধানের গোলা । ঢেঁকিও দেখলাম । কিন্তু খুব গরীব এই গ্রাম । ঠিক আর পাঁচটা বাংলার গ্রাম যেমন । বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া সর্বত্র একরকম গ্রাম । একধরণের মেলা । অনেকটা একই রকমের দেখতে মানুষগুলো ও । কেউ পায়ে হেঁটে মেলায় গেছে কেউ সাইকেলে ডাবল ক্যারি করে । কেউ আবার নতুন কাপড় ও পরেছে , কেউ বা একখানা নতুন চাদর । কোনো বাচ্চা মেয়ের মাথায় টুকটুকে লাল ফিতে আর তার মায়ের মাথায় একগাদা তেলমাখা সিঁথিতে টকটকে সিঁদুর । কিন্তু সূর্য ছিল একটাই ! পশ্চিম মেদিনীপুরের পশ্চিম আকাশে । একাই রঙ ছড়িয়ে চলেছে আপন মনে ....ঠিক যেমন ছড়ায় রোজ রোজ এই গ্রাম বাংলার আকাশে । মনে হল, এত দারিদ্রের মধ্যেও এদের মেলা বসে, এরা মকর সংক্রান্তি পালন করে ধূমধাম করে । সদ্য উঠেছে ধান তাদের ঘরে । কি জানি তাই বুঝি এত মজা তাদের ! 

১০ জানু, ২০১১

সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং

 গত ২৩শে ডিসেম্বর ২০১০,  তারা নিউজ চ্যানেলে "আজকের সুবর্ণলতা" অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে  আমন্ত্রিত হয়েছিলাম সাধারণ হোমমেকার হয়ে "সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং" নিয়ে আলোচনা করার জন্য  :



সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং বা সামাজিক জটাজাল নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই উদ্ধৃতি 
"কত অজানারে জানাইলে তুমি কতঘরে দিলে ঠাঁই, 
দূরকে করিলে নিকট বন্ধু পরকে করিলে ভাই"
আমরা আজ অনেক যান্ত্রিক অনেক বেশি আধুনিকতার স্বীকার হয়েছি । আমরা আজ হারিয়েছি যৌথ পরিবার । পরিবার পরিকল্পনার স্বার্থে আমরা আজ একটি কিম্বা দুটির প্রতিপালনে রত । অণু পরিবারের সদস্য হয়ে আজ আমরা বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি কেরিয়ার, চাকরী আর প্রতিদিনের ইঁদুর দৌড়ে । ভুলতে বসেছিলাম বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে শীতের রোদে দুটি পাশের বাড়িতে ঘন্টার পর ঘন্টা উলবোনার আড্ডা, লুডো খেলা ; ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম ক্যারামের স্ট্রাইকার, ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম মেয়েদের বিন্তিখেলার তাসগুলোকে । ঠিক তখনই ঝোড়ো হাওয়ার মত যন্ত্রজালে পেয়েছিলাম ছোট ছোট আড্ডার ঠেক, সেই হারিয়ে যাওয়া ঘোষবাড়ি, বোস বাড়ির সান্ধ্য আড্ডা, সেই ফিরে পাওয়া পুরোণো বন্ধুত্ব ।

রবীন্দ্রনাথ সেই কবে বলেছিলেন " তুমি মোর পাও নাই পাও নাই পরিচয় " । কিন্তু পরিচয় বোধ হয় মানুষের বন্ধুত্বে কোনো বাধা নয় আর । বিশ্ব জোড়া যন্ত্রজালের ফাঁদে স্থান কাল পাত্র ভেদে মানুষ পরিচয় পায়নি অনেকের কিন্তু অপরিচিতকে বন্ধু করে অনেক ভাল সময় পেয়েছে । একটু চোখ কান খোলা রাখতে হবে । একটু যাচাই করে নিতে হবে সেই বন্ধুত্বকে আর মাঝে মধ্যে ঝালিয়ে নিতে হবে । সব কিছুরই যেমন পজিটিভ ও নেগেটিভ দিক আছে তেমনি সোশ্যালনেট ওয়ার্কিং এর মাধ্যমে বন্ধুত্ব করতে গেলে একটু সংযত হতে হবে আর সময়টি একটু মেপে দিতে হবে নয়ত বিপদ হতে পারে । সমাজে যেমন খারাপ বা ভালো দুরকমই আছে , খারাপ ভালো বন্ধু নির্বাচনও যেমন কিছুটা নিজের ওপর নির্ভর করে ডিজিটাল আড্ডার এই ঠেকেও সেই সম্ভাবনা থেকে যায় ।
প্রথমে আলোচনা করি সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং এর ভাল দিক গুলি । 
  • সারাদিনের ব্যস্ততায় সোশ্যাল নেট ওয়ার্ক মানুষকে দিতে পারে কিছু ভাল সময়। যে বোর্ড হোমমেকারটি দিনের পরদিন সংসারের টানাপোড়েনে নিজের আইডেন্টিটি হারিয়ে ফেলেন তার কাছে এর জুড়ি আর কিছু নেই। ছেলে মেয়ে বিদেশে বাস করছে যে বাবা মায়ের তাদের কাছে সোশ্যাল নেট ওয়ার্ক মরুভূমিতে ওয়েসিসের মত । হঠাত সংসারের সব কর্তব্য শেষ হয়েছে মনে হলে, মধ্য বয়সে সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং এর যজ্ঞে সামিল হ'লে এর থেকে ভাল আর কিছুই নেই । সর্বোপরি যে স্কুলের বা কলেজের বন্ধুটিকে এতদিনে চেয়েও পাইনি তার দেখা মিলে গেলে তার চাইতে ভালো কিছুও বুঝি আর হয়না । আবার মনে পড়ে যায় কবিগুরুর সেই গান " কাছে থেকে দূর রচিল " ছোটবেলা থেকে আমরা শিখেছিলাম "Birds of a same feather flock together" এই সোশ্যাল নেটের দুনিয়ায় এমন সমমনস্ক বন্ধু খুঁজে পাওয়া বোধ হয় আজকের দিনে অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে । আগে যে ভৌগোলিক বাধা ছিল আজ আন্তর্জালের কৃপায় তা আর বাধা নয় ।
  • অত্যন্ত কম খরচে ( কেবল সুস্থিত ইন্টারনেট কানেকশন এবং একটি কম্পিউটার যা বোধ করি টেলিভিশনের মত ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে আজকাল ) সোশ্যালনেটে বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা ও অনেক কিছু শেখা যায় । নিজের ভালোলাগা অনেক জিনিষপত্র ( ব‌ই বা সিডি , ডিভিডি , অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ পত্র ) প্রোমোশানের মাধ্যমে অনেকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় বিনাপয়সায় । সোশ্যাল নেটের বন্ধুর কমিউনিটি থেকে বন্ধু সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য উঠে আসতে পারে যা জানলে সেই বন্ধু সম্পর্কে মানুষ সচেতন হতে পারে ।
তবে সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং এর নেগেটিভ দিক ও আছে । 
স্টুডেন্ট যখন সোশ্যাল নেটের দুনিয়ায় হাজির হচ্বে তখন তার ব্যাবহার সম্পর্কে মা বাবাকেই সচেতন করে দিতে হবে । পারলে টিন এজ ছেলে বা মেয়েটির বন্ধু হয়ে যেতে হবে সোশ্যালনেটের সেই আড্ডার ঠেকে । তাহলে সে কার সঙ্গে বন্ধু পাতাচ্ছে বা সে কোন কমিউনিটির মেম্বার হচ্ছে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে তাহলে বা মায়ের সাথে ছেলে মেয়ের তদানীন্তন জেনারেশন গ্যাপ ও হবে না আর উভয়ের বন্ধুতাতে স্বচ্ছতাও আসবে । তাকে শিখিয়ে দিতে হবে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাবহার করলে তার পড়াশোনার ক্ষতি হতে পারে । অচেনা বন্ধুত্ব থেকে তার ভবিষ্যতে কি ক্ষতি হতে পারে । 
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল privacy violation আর তারপরের সমস্যা হল false impersonation এবং identity theft । নিজের ছবি না দিয়ে অন্য কিছুর ছবি যখন প্রোফাইল পিকচার হিসেবে লাগায় তখন যাচাই করে নিতে হবে তার অন্য বন্ধু মারফত এবং সে কোন কোন কমিউনিটির মেম্বার তা দেখে । 

আর সবশেষে বলি,  
রেসিডেনশিয়াল এড্রেশ আর টেলিফোন নাম্বার সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইটে না দেওয়াই বাঞ্ছনীয় ।

৫ জানু, ২০১১

কর্ণ তোমাকে ...দ্রৌপদীর লেখা চিঠি



কর্ণ তোমাকে,
আজ আমরা মহাপ্রস্থানের পথে পা বাড়িয়ে, হিমালয়ের কত নাম না জানা হিমবাহ, পেরিয়ে পঞ্চকেদার অভিমুখে পাড়ি দিলাম পারিজাতের দেশে, পাখিদের স্বর্গরাজ্যে..তুমি হয়ত পুনর্জন্ম নিয়ে আবার আসবে এ পথে, তাই পাহাড়ের গায়ে লিখে রেখে গেলাম এই স্বগতোক্তি ; আমার ইহকাল পরকাল সব‌ই কালের স্রোতে ভেসে চলে গেছে জম্বুদ্বীপের জ্বালাময়ী আগুণে, আমার অভিশপ্ত জীবনের শেষ ইচ্ছের তাগিদে এই চিঠি তোমাকে লেখা । শেষ হতে হতে তবুও এখনও শেষ হলাম না | এইবার বোধ হয় আমার মোক্ষলাভ হবে তাই সেই মুক্তিপ্রদেশে পৌঁছনোর অপেক্ষায় রয়েছি | স্বর্গরাজ্যের আঙিনায় এ চিঠি লিখে রেখে গেলাম পাহাড়ের গায়ে, প্রযত্নে হিমালয়, এই ঠিকানায় । এই ঠিকানায় কোনোও এক সময়ে জোনাকগুচ্ছ আলো দেখিয়ে আর আমার গন্ধবাতাস পথ চিনিয়ে নিয়ে আসবে এখানে; এই পাথরে খোদাই করে রেখে গেলাম আখরগুলি, আমার চিহ্ননাম, শুধু তোমার জন্য | এই চিঠিতে আমি প্রায়শ্চিত্ত করে যাবো স্বয়ংবরা হয়ে যে অপমান একদিন তোমায় করেছিলাম, সেই না বলা কাহিনী ; সারা জম্বুদ্বীপের মানুষেরাও জেনে যাবে সেই সব না বলা কথা ।
পাঞ্চালদেশে আমার জন্ম কিনা জানিনা তবে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ, তাঁর কন্যার পরিচয়ে | যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতা বানিয়ে ইন্দ্রজালের মোহে, ধোঁয়ার আড়ালে যজ্ঞের আগুণের মধ্যে থেকে আমাকে বেরিয়ে আসতে বলা হয়েছিল আর সাথে বেরিয়ে এসেছিল আমার দাদা ধৃষ্টদ্যুম্ন । জনসাধারণ জানত না এত সব । আমার নাম হল যাজ্ঞসেনী, আমি হলাম দ্রুপদরাজের অগ্নিকন্যা দ্রৌপদী, কৃষ্ণরূপা, কৃষ্ণকলি, আর সমগ্র জম্বুদ্বীপের কৃষ্ণা। যজ্ঞের অলৌকিক শক্তির মাহাত্ম্যে আমার গোধূমবর্ণ পুড়ে এই হাল হল, জানল সকলে, দেখল সকলে । আর পুড়েছিল আমার অদৃষ্ট। তুমি জানতে কর্ন যে রাজা দ্রুপদ আমাকে দত্তক নিয়েছিলেন ? এছিল রাজামশায়ের রাজনৈতিক চাল। ধনুর্ধর দ্রোণ আর পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কোঁদল অনেককালের | একসময়ে তারা ছিলেন হরিহর আত্মা । কিন্তু দ্রুপদ প্রতিপত্তিময় হয়ে ওঠার পর অভাবের তাড়নায় আশ্রয়প্রার্থী বাল্যবন্ধু দ্রোণকে সপরিবারে আশ্রয় দেননি সেই কারণে অপমানিত দ্রোণ আশ্রয় নিয়েছিলেন হস্তিনাপুরে, ধৃতরাষ্ট্রের রাজপ্রাসাদে । বুকে ছিল তাঁর একরাশ ক্ষত, চোখে ছিল প্রতিশোধের আগুণ । কৌরবদের অস্ত্রশিক্ষাগুরু দ্রোণ আক্রমণ করলেন পাঞ্চাল , বন্দী করলেন দ্রুপদকে । দ্রুপদ ও সেই রাগে দ্রোণকে বধ করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন । কুরু-পাঞ্চাল বিবাদ আজও মেটেনি কর্ণ এখনও ধিকি ধিকি জ্বলছে, জম্বুদ্বীপের অভ্যন্তরেও সেই আগুণের ফুলকি এসে লেগেছে। মহারাজ দ্রুপদ শুধুই দ্রোণের ওপরে প্রতিশোধ নিলেন না দ্রোণকে উপলক্ষ করে সমগ্র কুরুবংশের ওপরে প্রতিশোধ নিলেন। ক্ষুদ্র লক্ষ্য দ্রোণাচার্য বিশেষ লক্ষ্য হস্তিনাপুর। হস্তিনাপুরের কুরু-পান্ডবদের অন্তর্দ্বন্দ তো তুমি জান‌ই । রাজনীতির এ জট খুলতে আমার সখা কৃষ্ণও পদে পদে ব্যর্থ হয়েছেন তাও তুমি জানো।
আমার স্বয়ংবর সভা কেন হোল তাও তোমায় বলি শোনো। দ্রোণাচার্য যখন পাঞ্চাল আক্রমণ করলেন তখন দুর্যোধন আর তার ভাইদের, আর এমন কি তোমাকেও প্রতিহত করেছিলেন মহারাজ দ্রুপদ। কিন্তু আক্রমন করতে গিয়ে যে তরুণ বীর যোদ্ধার হাতে দ্রুপদ বন্দী হয়েছিলেন সেই তরুণটি দ্রুপদকে রাজোচিত মর্যাদার সঙ্গে সসম্মানে নিয়ে গেছিলেন দ্রোণের সামনে । দ্রুপদ মুগ্ধ হয়েছিলেন সম্বর্ধনায়। স্বপ্নের আবেশে আবিষ্ট হয়ে সেই তরুণটিকেই মনে মনে চেয়েছিলেন যে কিনা তাকে সাহায্য করতে পারবে যদি কুরু-পাঞ্চাল যুদ্ধ হয়। এই তরুণটিই ছিল অর্জুন যার জন্য আয়োজন হল স্বয়ংবর সভার । কৌরবরা কখনো পান্ডবদের পক্ষে যুদ্ধ করবে না আর কৌরবরাই দ্রুপদের শত্রু অতএব এই তরুণ পান্ডব অর্জুনকেই চাইলেন দ্রুপদ।
এদিকে যখন দুর্যোধনের চক্রান্তে সারাদেশের মানুষ জানল যে অজ্ঞাতবাসের প্রথম পর্যায়ে এক‌ই গৃহের মধ্যে আগুণে পুড়ে ভস্মীভূত পঞ্চপান্ডব সহ কুন্তী | দ্রুপদ সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন এক মহান রাজনৈতিক চাল চেলে যার প্রথম পদক্ষেপই ছিল স্বয়ংবর সভা। আসলে দ্রুপদের নিকট খবর ছিল যে পান্ডবরা বারণাবতে পুড়ে মরেননি তাই শূন্য থেকে ঝোলানো মাছের চোখে লক্ষ্যভেদের মত কঠিন পরীক্ষার আয়োজন করলেন যা ঊত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা একমাত্র অর্জুনের‌ই আছে। আর আমিই হলাম সেই তুরুপের তাস যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে অর্জুনের গলায় মাল্যদান করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এও আমাকে শেখানো হয়েছিল। চার প্রোথিতযশা বীর ছিলেন স্বয়ংবর সভায় ,কর্ণ তুমি, দ্রোণপুত্র অশ্বথামা, যাদব কৃষ্ণ আর অর্জুন। প্রতিশোধী পিতা দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা তার মাতুল কৃপাচর্যের মত চিরকৌমার্যব্রত পালন করছেন অতএব তিনি প্রতিযোগী নন |কৃষ্ণ নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন প্রতিযোগী হিসেবে নয় অতএব কর্ণ তুমি আর অর্জুন ছিলে সেদিনের দুই প্রধান প্রতিযোগী। দ্রুপদ পাখিপড়া করে আমাকে শিখিয়ে ছিলেন অর্জুনকে মাল্যদান করতেই হবে | আমার চোখের সামনে দুই পুরুষ; দুজনেই বীর, যোদ্ধা, সুন্দর পুরুষ ; তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা একটা ঝোড়োবাতাস আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল ...তোমাকে দেখেই আমার মনে হয়েছিল এই পুরুষই আমার প্রথম প্রেম ! তোমার ডান মণিবন্ধে তখন শানিত তরবারি, বামহস্তে পাণিগ্রহণের অঙ্গীকার ! বিহ্বলা, চঞ্চলা নবযৌবনা কৃষ্ণা তখন ষোড়শী শ্রীময়ী | যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতার চোখে তখন একরাশ কামনা, আমি চেয়েছিলাম শুধু তোমার কৃষ্ণা হতে । আমি লক্ষী মেয়ের মত তোমাকে সূতপুত্র বলে অভিহিত করলাম, গান্ডীব ধরতে নিরস্ত করলাম, সেও দ্রুপদের আদেশে। বিশ্বাস করো, অর্জুন কে চিনতাম না, ভলোওবাসিনি । যুগ যুগ ধরে জম্বুদ্বীপের ইতিহাস আমার মত কালো মেয়েকে এই ভাবেই কাজে লাগিয়ে আসছে, অবলা করে রেখে দিয়েছে। অর্জুনের অপলক দৃষ্টি ছিল মীনের অক্ষিগোলক আর আমার ছিলে তুমি । আমি ক্ষণেকের জন্যে তোমার বলিষ্ঠতা, পৌরুষে আকৃষ্ট হয়েও নিজেকে সংযত করেছিলাম অনেক কষ্টে। স্বামী সোহাগিনী , আদর্শ বধূ হতে চাইনি, ইতিহাস রচনা করতে চেয়েছিলাম, দেশ গড়তে চেয়েছিলাম, ইতিহাসের পাতায় পঞ্চকন্যার সাথে স্মরনীয়া ও বরনীয়া হতে চেয়েছিলাম ; তার জন্য যা করতে হয় সেই উচ্চাশার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার আশায়..সেই স্বপ্নকে সার্থক রূপ দেবার আশায়। যদিও সাধারন পাতিব্রত্য আর ঘরগেরস্থালিও আমার মাথায় ছিল । তাই তোমাকে দূরে সরিয়ে দিলাম নিমেষেই । স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম , স্বপ্ন নিয়েই চলে এসেছি এই মহাপ্রস্থানের দুর্গম পথে। স্বপ্ন পূরণ হলনা । শুধু রূপেই তোমাদের ভোলাব না এ ছিল আমার অমোঘ মন্ত্র। নিছক যৌবনই আমার সম্বল নয়। তিল তিল করে নারীত্বের সবটুকু দিয়ে সর্বগুণান্বিতা, তিলোত্তমা করে পাঠিয়েছিলেন বিধাতা আমাকে । রূপে লক্ষী, গুণে সরস্বতী রন্ধনে পটিয়সী চলনে বলনে, চিন্তা শক্তির দূরদশিতায় আমি হয়ে উঠেছিলাম যুগশ্রেষ্ঠা। তোমাদের সেই কালো মেয়ে দ্রৌপদী যার নাম, নারী থেকে পূর্ণ মানবী হতে চেয়েছিল যে, তাই সেদিন স্বয়ংবরা হয়ে দ্রুপদের কথায় বাধ্য মেয়ের মত মালা পরিয়েছিলাম অর্জুনকে আর প্রত্যাখান করেছিলাম তোমায়, অঙ্গরাজ তোমাকে ।
ধৃষ্টদ্যুম্ন আর দ্রৌপদী এক সাথে যজ্ঞের আগুণ থেকে উঠে এসেছিল দ্রুপদের বাসনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে। ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণ বধের কারণে আর দ্রৌপদী অর্জুনের ঘরণী হয়ে পান্ডবপক্ষে থাকলে দ্রুপদের‌ই সুবিধে সেই কারণে। অর্জুনের মত বীরজামাইকে পাশে নিয়ে রাজা দ্রুপদ শক্তিবৃদ্ধি করতে চেয়েছিলেন। বিবাহ না করলে কুরুবংশের অন্দরমহলে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করবে কে? আর আমার মত উপযুক্ত নারী যার চালনা শক্তি আছে তার ঠিকুর্জি-কুষ্ঠি সব বিচার করেই খুঁজে আনা হয়েছিল আমাকে । স্বয়ংবরসভা রচনা করল ইতিহাস আর সকলের অলক্ষ্যে ঘটে গেল কত কিছু। সেদিনটার কথা মনে পড়ে যায় ...পাঞ্চালনগরীর আকাশে বর্নালীর ছটা ! ফুলেল বাতাস সংপৃক্ত কেওড়া-কস্তুরী-আতরের গন্ধে, একনারীকে জয়ের জন্য কত পুরুষের আগমন | আমি তোমাদের সেই কালো মেয়ে পুতুলের মত মালা হাতে জীবনের সর্বপ্রথম রাজনীতির অচেনা, অদেখা সুপরিকল্পিত এক মঞ্চে হাজির ! আমার মত কালো মেয়ের এত দাম? আমাকে লাভ করার জন্য এত বড় বড় বীরেরা, রাজপুত্রেরা পরীক্ষা দেবেন? আমার অদম্য ইচ্ছা ছিল নারীত্বের পূর্ণতা পেতে সেটা বধূ বা মাতারূপে নয় সমগ্র জম্বুদ্বীপের ইতিহাসে মানবী রূপে প্রতিষ্ঠা পেতে।আদর্শ দেশ গড়ার ব্রতে ব্রতী হতে চেয়েছিলাম । সেই কারণেই রাজী হয়ে গেছিলাম স্বয়ংবর সভার প্রস্তাবে। আমার জীবন বাঁক নিল অন্যধারায়, জীবনধারা ব‌ইতে শুরু করল অন্যখাতে, জীবনদর্শন বদলে গেল নিমেষে।
তোমাকে জাতপাঁত তুলে "সূতপুত্র" বলতে চাইনি আমি । বিশ্বাস করো। তুমিও পরিস্থিতি সামলে নিয়েছিলে যদিও তা তোমার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল ; তোমার বক্র হাসিতে সেদিন ঝরতে দেখেছিলাম প্রচ্ছন্ন ক্রোধাগ্নি, অপমানের নীরব অশ্রু ; সর্ব সমক্ষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছিল তোমার বীরত্বের অহঙ্কার। সেই মূহুর্তে আমার মনে হয়েছিল পৃথীবিতে তোমাকেই আমি সবচেয়ে ভালোবাসি, সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, আরো আরো ভালবাসি। কিন্তু রাজনীতির মারপ্যাঁচে তোমার সঙ্গসুখ থেকে চিরকালের মত বঞ্চিত হলাম।আর সেই সাথে জননী কুন্তীর আদেশে আমার পাঁচস্বামীর ব্যবস্থাটিও পাকাপাকি হয়ে দাঁড়াল। কৃষ্ণা হোল ভাগের স্ত্রীরত্ন । উত্কৃষ্ট ভোগ্যবস্তু, লোভনীয় বিলাসিতার দ্রব্য যেমন মিলেমিশে ভাগ করতে হয়... তেমন এক ভোগ্যপণ্যে পর্যবাসিত হল দ্রৌপদীর মেয়েবেলা । দ্রুপদ ব্যবহার করলেন আমায়, অর্জুনকে পাওয়া তো হয়েই গেছে এখন আরো চারজন কে বিনামূল্যে জামাই রূপে পাওয়া... সে তো তাঁর‌ই দলের শক্তিবৃদ্ধি ঘটাবে আর স্বার্থসিদ্ধির ব্যাঘাত ঘটাবে না অতএব মোটেই উদ্বেগ প্রকাশ করলেন না আমার এমন বহুস্বামিনী হওয়ার ঘটনায় । ধৃষ্টদ্যুম্ন আপত্তি করেছিলেন বলেছিলেন খুব অধর্ম এটা..একপুরুষের অনেক স্ত্রী থাকে কিন্তু একনারীর অনেক স্বামী ? প্রবাদপুরুষ কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ বেদব্যস দিয়েছিলেন ধর্মের প্রতিবিধান বলেছিলেন এ নাকি আমার ভাগ্যলিপি ! মোটকথা তোমার কৃষ্ণা হোল রাজমহিষী, পঞ্চস্বামীর ভার্য্যা।
এবার বলি আমার রাজ অন্তঃপুরের বেত্তান্ত। ইন্দ্রপ্রস্থের পাঁচকুমারের ভোগ্যবস্তু হলাম ঠিক‌ই কিন্তু যাকে তুমি ভালবাসা বল সেই ভালোবাসার কড়িখেলা আমার কোনোদিনও খেলা হল না অঙ্গরাজ। স্বয়ংবরসভায় তোমাকে প্রত্যাখান করবার পরেই আমার রূপ, মন, যৌবন সব কিছুই ভেবেছিলাম সঁপে দেব অর্জুনকে মিথ্যে বলব না, তার বীরত্ব, ব্যাক্তিত্ত্বকেও মনে মনে সেলাম করেছিলাম !
যুধিষ্ঠিরের জ্ঞানবত্তাকে শ্রদ্ধা জানাই, কিন্তু পতিরূপে তাঁকে ভাবিনি কখনো, তিনিও আমাকে তাঁর ধর্মপথের সঙ্গিনী করেই রেখেছিলেন আজীবন। স্ত্রীর মর্যাদা দেননি তাই পাশাখেলায় পণ রাখতেও দ্বিধা করেন নি। ভীমসেন যদিও পাঞ্চাল যাবার পূর্বেই আরণ্যক কন্যা হিড়িম্বাকে গান্ধর্ব মতে বিবাহ করেছিলেন এবং ঘটোত্‌কচ নামে তাদের একটি পুত্র ও ছিল তবু এ বিবাহকে আমি মেনে নিয়েছিলাম কারণ আমি আসার আগেই তা অতীত । আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমাকে লাভ করার পর ভীমসেন পুনরায় বিবাহ করতেন না আর সেই কারণেই যত বার আমি বিপদে পড়েছি এই মধ্যম পান্ডবই একমাত্র আমাকে সাহারা যুগিয়ে গেছেন । ভীম আমাকে একটু উগ্র ভাবেই ভালোবেসেছিলেন আমি বহুবার হাতেনাতে সে প্রমাণ পেয়েছি । দুর্যোধনের অশালীন ইঙ্গিতে আমার সম্মানরক্ষা করার জন্য তার উরু ভঙ্গ করার প্রতিজ্ঞাও পালন করেছিলেন |পাশাখেলায় সর্বস্বান্ত হয়ে বনবাসে তখন আমি পঞ্চপান্ডবের সাথে, একদিন যুধিষ্ঠির ধর্মের অমোঘ বাণী শুনিয়ে আমাকে ঈশ্বর সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা ব্যাখ্যা করতে বসলেন । ভীমসেন থাকতে না পেরে সেদিন বলেছিলেন "এত তত্ত্ব কথা তোমার কোথায় ছিল সেদিন যেদিন তুমি পাশা খেলতে বসেছিলে আর স্ত্রী সহ সবকিছু পণ রাখলে, আর আজ তোমার জন্য আমাদের রাজসুখ ছেড়ে বনে বাদাড়ে ঘুরতে হচ্ছে"
দ্যূতসভায় সর্বস্ব খুইয়ে যুধিষ্ঠির যখন আমাকে পণ রাখলেন তখন আমি একবস্ত্রা, রজস্বলা ; লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে আমাকে আসতে হল সেখানে, যেখানে একপাল নীতিবাগীশ, নপুংসকের দল বসে উপভোগ করছেন আমার লজ্জাডুবে যাওয়ার চরম মূহুর্ত, আমার লাঞ্ছনার প্রতিটি দন্ড, প্রতিটি পল। না কর্ণ না ভালোবাসা আঘাত দেয়, দেয় আরো নিবিড় করে কাছে পাওয়ার আকুতি। কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয় কিন্তু অপমান করতে কি শেখায়? আমি তোমার জন্যে যে অপমানের আখরগুলো ছুঁড়েছিলাম তার কি হবে কর্ণ? আমিও তো রক্তমাংসের মানুষ ছিলাম, ছিলাম যৌবনসর্বস্ব একনারী । এখনও শুনি ইতিহাস রচনা করার কলমের শব্দ, দেখতে পাই সংগঠিকার বেশে, দেশনেত্রী রূপে কল্পনা করে যাই নিজেকে । তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো সেই অপমানের কিছুটা ; রাজবধূ, রাজনন্দিনীর কি এই প্রাপ্য ছিল? চুলোয় গেল রাজেন্দ্রাণীর পদমর্যাদা, ঘুচে গেল স্বপ্ন, রসাতলে গেল তার ইজ্জত। পদ্মপলাশ অক্ষি, কুঞ্চিত দীর্ঘ কেশ, সর্বাঙ্গসুন্দরী তোমার না পাওয়া কৃষ্ণাকে নিয়ে জম্বুদীপের ইতিহাসে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মত টানা হেঁজড়া করা হল । সেই কালোমেয়েটার রূপের অহঙ্কার মাটিতে মিশে গেল । একদল অতি বৃদ্ধ, বৃদ্ধ, প্রৌঢ়, যুবক তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন আমার লাঞ্ছনার সে সব দৃশ্য | ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ, আর ভীষ্ম, বিদূর, দ্রোণেরা মনে প্রাণে ছিলেন চির-অন্ধ | চিনলাম যুধিষ্ঠিরকে আরো একবার| নারীচোখের চিরায়ত ইশারায় সাড়া দিলেন না অর্জুন । মনে মনে ধিক্কার দিলাম তাকে | ভীমসেন মূহুর্তের জন্যে বারে বারে মন ছুঁয়ে গেলেন | কৌরবদের অট্টহাসিতে দাসীরূপে বন্দী হল তোমাদের কৃষ্ণা আর তুমি নিলে প্রতিশোধ! স্খলিত আমার ঊর্ধাঙ্গের বসন, লজ্জারূপ ভূষণ, জলাঞ্জলি ততক্ষণে। একপাল লোলুপ লোভাতুর চোখ আমাকে গিলছে তখন | ক্লীবেদের বোধবুদ্ধি তখন ভেসে চলে গেছে নদীমাতৃক জম্বুদ্বীপের মোহানায়, গড্ডলিকা প্রবাহে, তুমিও তার ব্যাতিক্রম ছিলেনা | নতুন সমাজ গড়বে তোমরা? সেদিনই বুঝেছিলাম... নতুন দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্‌ গড়বে এই মানুষ গুলো? ধর্ম-অধর্ম, ইহকাল-পরকাল সবকিছুর বিসর্জন সেই মূহুর্তে। দুঃশাসন আমার কেশাকর্ষণ করে সকলের সম্মুখে নিয়ে এসে একে একে আমার বস্ত্র উন্মোচিত করতে শুরু করলেন ...সে তো তুমি ও দেখেছো তাই না? আর সেই স্বয়ংবরসভার প্রতিশোধ সেদিন তুমি নিলে কর্ণ? আমায় বেশ্যা-বারাঙ্গনা বলেছিলে কারণ আমি তো "নাথবতী অনাথবত্‌"| আমায় বেশ্যা বলে অভিহিত করতেও তোমার বাধ সাধলো না ? দুঃশাসনের ওপরে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন মধ্যম পান্ডব ভীম । তার বুক চিরে রক্ত পান করবার প্রতিজ্ঞা পালন করেছিলেন।বিরাটের রাজসভায় আমরা যখন ছদ্মবেশে সেদিনও কীচকের লোভাতুর চোখ থেকে আমাকে বাঁচিয়েছিলেন ভীম |
নকুল-সহদেব তো বড়দের ছত্রছায়ায় আজন্মকাল অতিবাহিত করলেন | কাব্যে উপেক্ষিতর মত‌ই রয়ে গেলেন।
অর্জুন হয়ত চেয়েছিল আমায় ভালোবাসতে একান্ত নিজের করে নিতে কিন্তু চার ভাইয়ের লোভ তো তিনি চাক্ষুষ দেখেছিলেন । সেই অভিমানে আমার প্রতি নীরব ঔদাসিন্য দেখিয়েছিলেন বরাবর।যুধিষ্ঠিরের সাথে অস্ত্রাগারে আমি সেদিন বক্ষলগ্না ; রতিক্রীড়ায় উন্মত্ত যুধিষ্ঠির সেদিন আমাকে নিয়ে মেতে রয়েছেন রাজপুরীর নিভৃতে, । নারদমুনির নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ধনুর্বান আনার অছিলায় অর্জুন প্রবেশ করলেন সেখানে ফলস্বরূপ নিয়মভঙ্গ হেতু বারোবছরের বনবাস আর ব্রহ্মচর্য যাপন সেই মূহুর্তে অর্জুনের পরম কাঙ্খিত ছিল যাতে রাজপুরী ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে তিনি যৌবনের স্বাদ গ্রহন করতে পারেন | যৌবনের উন্মাদনায় বহুস্বামিনী কৃষ্ণাকে সেদিন ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেছিলেন রাজপুরী ছেড়ে বহুদূরে | পাঞ্চালীর একেশ্বরাধিপতি না হতে পারার ক্রোধে আর কামাগ্নি নির্বাপনের জন্য একে একে নাগরাজ কন্যা উলুপী, মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা আর সব শেষে দ্বারকায় কৃষ্ণের ভগিনী সুভদ্রাকে বিবাহ করে আমার প্রাসাদে এনেই তুললেন। পরে জানলাম উলুপীকে তিনি দিয়েছেন ইরাবান নামে এক সন্তান, চিত্রাঙ্গদার শরীর চিনে তাকে গোপনে দিয়েছেন বভ্রূবাহনকে আর আমার সামনেইতো সুভদ্রার কোলে এল অভিমন্যু। তিন নারীর উদ্দাম শরীরী ঝঞ্ঝায় উড়ে গেছিল অর্জুনের প্রতিজ্ঞা । এর পরেও তুমি বলবে অর্জুন কে আমি ভালবাসি?
যুদ্ধ থেমে গেছে কর্ণ। অভিমন্যুর পুত্র পরীক্ষিত হয়েছে জম্বুদ্বীপের রাজা | আমি আমার পাঁচস্বামীর অনুগামিনী হয়ে যাত্রা করলাম মহাপ্রস্থানের পথে, আবার আদর্শ স্ত্রীলোকের মত জীবনের শেষ বেলাতেও তাঁদের সঙ্গীনী হলাম, আবার শেষ চেষ্টা করে দেখি নারী থেকে মানবী, তারপর মানবী থেকে ইতিহাস গড়তে পারি কিনা, এ হোল যুক্তিহীন স্বামীর সঙ্গে অনুগমন । আমার চারিপাশের স্বপ্নের বর্নালীরা, ব্যথার ঝরাপাতারা না বলা বর্ণমালারা টুপটাপ ঝরে পড়ে গেল | আমার জন্য বেঁচে থাকার প্রহরগুলো আর অবশিষ্ট নেই । জীবনটাকে নিজের মত করে পেলাম না । শেষের সেদিন সত্যি ভয়ংকর ! আজ আমার রূপ-যৌবন বয়সের ভারে কুব্জ এবং ন্যুব্জ। চলেছি নিরুদ্দেশের পথে যেখানে নেই কোনো কামনা, নেই কোনো ভোগবিলাসের হাতছানি। আছে আমার জন্য অপেক্ষমানা ধরিত্রীর একটুকরো মাটি । হয়তো অচিরেই মিশে যাবো সেই মাটিতে, কোনো হিমশীতল গ্লেসিয়ারে অচিরেই ভেসে চলে যাবে তোমার কালোমেয়ের পায়ের ছাপ। ফুরিয়ে যাবে শ্বাস, নিবে যাবে প্রাণপ্রদীপ | আবার এই মাটিতেই ফিরে আসার ইচ্ছে থেকে যাবে সঙ্গে । সত্যের পথে আবার পা বাড়াতে চেষ্টা করবে তোমার কৃষ্ণা | শুধু সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসবে তার না দেখা স্বপ্নগুলোকে... আজ থেকে কাল, কাল থেকে পরশু কিম্বা ভবিষ্যতের সীমানায়। সেদিন দেখবে জম্বুদ্বীপের সার্থক সকাল একটা, ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে পা রাখবে তোমাদের কৃষ্ণা।পঞ্চভ্রাতাকে একসূত্রে বন্ধনকারী গ্রন্থীস্বরূপ নারীর মর্যাদায়, পঞ্চস্বামীর পত্নীরূপে সতীত্ব রক্ষায়, সপত্নীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে আর পাঁচস্বামীর কাছ থেকে পাওয়া পাঁচটি পুত্রের অভাগীনি জননী রূপে, ইতিহাস তাকে মনে রাখবে যুগ যুগ ধরে |
যেখানেই থাকো ভালো থেকো কর্ণ ! আমায় যেন ভুল বুঝোনা তুমি ও তোমরা |
ইতি,
তোমার দ্রৌপদী