২৯ জানু, ২০২৬




 লীলাবতীর নবদুর্গা বইটি নিয়ে লিখলেন বেথুন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষা ডঃ কৃষ্ণা রায় 

বাঙালি মেয়েদের  বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। আধুনিক বিজ্ঞান যতই দাবি করুক নারীর মেধা-মনন পুরুষের থেকে কোন অংশে কম নয়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কিন্তু দীর্ঘদিন নারীকে  শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে  বাঙলার মেয়েরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পেলেও  তাদের  বিজ্ঞান পড়ার অনুমতি ছিলনা। আমাদের দেশে উনিশ শতকে ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র  সেন পরামর্শ দিয়েছিলেন , মেয়েদের বিজ্ঞান  পড়ার দরকার নেই। সে সময়  কোন কোন বিখ্যাত মানুষ বলে থাকতেন , মেয়েদের মেধার যথেষ্ট ঘাটতি আছে । তবুও মেয়েরা  হাল ছাড়েনি।  অনেক মেয়েই এই সব প্রচলিত বাধার গন্ডি পেরিয়ে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে চেয়েছেন । উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকেই মেয়েরা ডাক্তারি পড়তে এসেছে, বিশ শতকের গোড়ায় ফিজিক্স , কেমিস্ট্রি, বায়োলজি অঙ্ক নিয়ে দিব্য পড়াশুনো চালিয়ে গেছে।  দেশের কত মেয়ে  বিজ্ঞানের গবেষণা করতে  বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন ।

কিন্তু  প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ না পেয়েও   গত শতকে  এই বাঙলায় কয়েক জন মেয়ে তাদের নিজস্ব ভঙ্গীতে  , স্বাভাবিক আগ্রহে বিজ্ঞান চর্চা করেছে। তাদের সবার কথা আমরা হয়তো জানিনা। কিন্তু দুটি  নারীর নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতেই হয়। প্রথম-জন রবীন্দ্রনাথের ন’দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী(১৮৫৬-১৯৩২), বাঙলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রবন্ধ রচয়িতা। অন্যজন নিজেকে মেলে ধরেছিলেন বিজ্ঞান নির্ভর সাহিত্যে, জনবিজ্ঞানের প্রবন্ধে  এবং  কল্পবিজ্ঞানের দুনিয়ায়। তিনি বেগম রোকেয়া( ১৮৮০-১৯৩২)। আক্ষরিক অর্থে এরা ছিলেন বিজ্ঞান-মনস্ক , বিজ্ঞানী নন।  কিন্তু যে পূর্বজ নারীর চেতনা বহন করে ছিলেন এঁরা, তিনি ছিলেন দ্বাদশ শতকের এক অসামান্যা নারী, বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ দ্বিতীয় ভাস্করাচার্যের কন্যা  গণিতজ্ঞ  তথা  জ্যোতির্বিদ  লীলাবতী। এই লীলাবতীর  চেতনা বহনকারী পরবর্তী  নয় জন বিশিষ্ট নারী বিজ্ঞানীর দিকে আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন সুসাহিত্যিক  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় ।  বর্তমান গ্রন্থের নাম তাই” লীলাবতীর নবদুর্গা”। এই  দুর্গা প্রতিম নারীদের তালিকায় যারা আছেন , তাঁরা সকলেই বিদগ্ধ প্রথমা, প্রচলিত কাচের দেয়াল ভেঙ্গে যারা অভীষ্ট লক্ষে নির্ভয়ে হেঁটে গেছেন ।  এই তালিকায় প্রথমেই আছেন ১৮৬১ সালে জাত কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, পাশ্চাত্য  শিক্ষায় চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করে চিকিৎসকের বৃত্তিতে  যিনি আজীবন নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন । আছেন অসামান্য পদার্থবিদ বিভা চৌধুরি( জঃ১৯১৩-), জনপ্রিয় বিশিষ্ট রসায়নবিদ অসীমা চট্টোপাধ্যায়( জঃ১৯১৭)। মেয়েরা ইতিহাস পড়তে পারে, কিন্তু সেই জ্ঞান নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে নাক গলাবেন  এমন ব্যাপার কে ভেবেছিল? খুলনার  মেয়ে  দেবলা মিত্র কিন্তু ভেবেছিলেন (জঃ ১৯২৫)। ভারতে  আর্কিওলজি তথা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের  প্রথম নারী ডিরেক্টার হলেন তিনি। সচরাচর জীববিজ্ঞানে মেয়েদের স্বাভাবিক ঝোঁক থাকে । কিন্তু পদার্থবিদ্যা পড়ে জীব বিজ্ঞানের পাঠ আরো নিবিড় ভাবে আত্মস্থ করলেন অঞ্জলি মুখার্জী( জঃ ১৯২৭-), হয়ে উঠলেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ।  উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণায়  কত কাল নিজেকে জুড়ে রাখলেন প্রবাসী বাঙালি মেয়ে, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অরুণ শর্মার স্ত্রী অর্চনা শর্মা (জঃ১৯৩২)। আর বাঙলার আরেক মেয়েমহারানী চক্রবর্তী জীববিজ্ঞানের গভীরতম প্রদেশে দৃষ্টি ফেলে গবেষণায়  মাতলেন জীবকোশের ভেতরকার জিনের সাম্রাজ্যে। মলিকিউলার বায়োলজিস্ট মহারানীর গবেষণা আজ সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত।  প্রথাগত বিজ্ঞানের  বিষয়ে মেয়েরা গত শতকের প্রথম ভাগ থেকে পা রাখলেও ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে এসেছিল গত শতকের  চারটি দশক পার করে।   অবিভক্ত বাঙলার ফরিদপুরের  মাদারিপুর গ্রামের মেয়ে , প্রথম বাঙালি তথা এশিয়ার  মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনীয়র ইলা মজুমদারের ( জঃ১৯৩০-) লড়াইটা তাই পুরুষ-কেন্দ্রিক প্রকৌশলের জগতে   বড় কম ছিলনা। আর আন্টার্টিকার মত দুর্গম পথে  অভিযান চালিয়ে যে  আধুনিক বাঙালি মেয়েটি   নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন তিনি জিওলজির  উজ্জ্বল ছাত্রী তথা গবেষক- অধ্যাপিকা সুদীপ্তা সেনগুপ্ত (  জঃ ১৯৪৬)। 

তবে মেয়েদের বিজ্ঞানের  সাধনার ইতিহাসটা কোন কালেই মসৃণ ছিলনা। আমরা যাঁকে আবহাওয়া-বিজ্ঞানীর সম্মান দিই না, কিন্তু  দূর অতীতে  তিনিই --এই বাঙলার মেয়ে,” খনার “পর্যবেক্ষণে  জন্ম হয়েছিল তথাকথিত  অন্য এক বিষয়, যাকে এখন বলা যায়  আবহাওয়া সম্পর্কিত পরিসংখ্যানবিদ্যা।  এখানে উল্লেখ করা এই নয় জন বিজ্ঞানীর মধ্যে সবার চলার পথ খুব  সুগম ছিলনা।  মেধা –মনন –সাধনার   সাফল্যের  যথোচিত আলো তাদের  কয়েকজনের মুখে  বিশেষ পড়েনি, সে আলো কেড়ে নিয়েছে ,  সমকালের  পুরুষ-শাসিত সমাজ । এই তালিকায় উপেক্ষিত বিজ্ঞানী বিভা  চৌধুরির নাম করতেই হয়। মাত্র কয়েক দশক আগে দূর মহাকাশে একটি নক্ষত্র তাঁর নামেই পরিচিত হবার আগে  পর্যন্ত বাঙলার বহু মানুষই জানতেন না কে এই বিভা ?  বলতে হয় ইলা মজুমদারের সংগ্রামের কথা । মেয়েদের বিজ্ঞান সাধনার ইতিহাস তাই বরাবর বড় করুণ । একুশ শতকের মেয়েরা বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য তো কত সুযোগ পায়। সে সুযোগ পাননি  তাদের পূর্বমাতৃকারা।  সেই ভাবনাতেই এই ন’জন প্রতিভাময়ী দুর্গারূপিনী নারীর  প্রসঙ্গের অবতারণা, এই গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ। লীলাবতীর উত্তরসূরীদের  সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত  হলেও কিছুটা আলো পড়ুক  মানুষের চেতনায়,  তৈরি হোক অনুসন্ধিত্যসু পাঠকের পরবর্তী  জিজ্ঞাসার পথ। 

ব্যক্তিগত পরিচিতির সুবাদে জানি,  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় নিজে বিজ্ঞানের কৃতী ছাত্রী হলেও পরিস্থিতির কারণে গবেষণার দুনিয়ায় পা রাখতে পারেন নি। দীর্ঘকাল শিক্ষা জগতে অবস্থান করার সুবাদে  ইন্দিরার মত অনেক মেয়ের জীবনে , এই যন্ত্রণার, এই আক্ষেপের কথা জেনেছি।  কত নারীর অপ্রমেয় মেধার  হিসেব সংসার রাখেনা। যেটুকু জানা যায় , সেটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র।  এমন একটি স্পর্শকাতর অথচ অনালোচিত বিষয়  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বড় স্বচ্ছন্দে ,  বড় মমতায়  তুলে ধরেছেন । সায়ন্তন প্রকাশনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আশা রাখি বইটি পাঠক  প্রিয় হবে। 



ডঃ কৃষ্ণা রায়

প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বেথুন কলেজ

কলকাতা। 


------------------------

--------------------------

লীলাবতীর নবদুর্গা 

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

সায়ন্তন পাবলিকেশন 

মূল্য ২২০ টাকা 

কোন মন্তব্য নেই: