৬ জানু, ২০২৬

রানিয়ার রান্নাঘর - রিভিউ লিখলেন সায়ন তালুকদার

 






রানিয়ার রান্নাঘর উপন্যাসের প্রথম রিভিউ লিখলেন সায়ন তালুকদার

রানিয়ার রান্নাঘর। নাম শুনেই সহজেই অনুমেয় এ বইয়ের যাপন রান্নাকে ঘিরে। কিন্তু নিছক রেসিপিভিত্তিক বই এটি নয়; এটি আসলে রান্নাকে ভালোবেসে যাপনের গল্প। রান্নার ইতিহাসের অতল সাগরে ডুব দিয়ে জানার প্রচেষ্টা যেমন একদিকে, তেমনই এই উপন্যাসের চরিত্ররা আমার, আপনার—আমাদের চারপাশের সমাজ থেকে উঠে আসা সম্পর্কের সমীকরণের কথা বলে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রানিয়া, যে একজন ফুড ইভেঞ্জালিস্ট। ছোটবেলা থেকেই রন্ধনপটিয়সী মায়ের, দিদার হাতের রান্না খেয়ে অভ্যস্ত রানিয়া নিজেও বড় হয়ে রন্ধনের প্রতি একটা অনবদ্য আকর্ষণ অনুভব করে। রন্ধনে বন্ধন। রান্নার দ্বারা সে গোটা বিশ্বকে মজিয়ে রাখতে চায়। তার বর কুশল তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করে, পাশে থাকে স্ত্রীর এই যাত্রায়। রানিয়া ভাবে,গোটা বিশ্বের কাছে পৌঁছে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া। রানিয়া পডকাস্টে তুলে ধরে প্রাচীন থেকে নবীন রান্নার হালহকিকত, টুকরো ইনফো, হারানো ইতিহাস এবং অবশ্যই রেসিপি। সব মিলিয়ে সার্থক সমাবেশ। রানিয়ার দিদি মিঠি। একই মায়ের পেটের মেয়ে হলেও তাঁরা স্বভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত। মিঠি স্বামী শৈবালের সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরে থাকে,যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে তাদের কাজ‌। রান্না নিয়ে কোনওদিনই সেভাবে ওয়াকিবহাল ছিল না মিঠি। রানিয়ার রন্ধনপ্রীতি দেখে ব্যঙ্গ করত সে। রাঁধাই যে মেয়েদের একমাত্র কর্তব্য নয়, এটা সে সটান জানিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে অবলীলায় বেরিয়ে আসে। 

এ উপন্যাস শুধু যে রানিয়া এবং মিঠির ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব, ঈর্ষার গল্প বলে তাই নয়; পাশাপাশি আরও নানাবিধ চরিত্ররা জুড়ে থেকে উপন্যাসটিকে করে তোলেন আরও মধুর, বাস্তবতায় মোড়া। আমাদের চারপাশে চোখ রাখলেই আমরা এমন অনেক রানিয়া-মিঠির মতো দুই বোনকে দেখতে পাব যাঁরা ছোটবেলার একসঙ্গে খেলে,ঝগড়া করে, ভালোবাসায়,অভিমানে বেড়ে উঠলেও একটা সময়ের পরে এসে ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব, স্বার্থপরতার নাগপাশে জড়িয়ে গিয়ে সম্পর্কগুলোর মর্যাদা হারিয়ে ফেলে।

রানিয়া ফুডব্লগার। সুদূর ডালাসে বসে তাঁকেও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে সে কোনো কিছুতে কম নয়। এ পৃথিবীতে সে এসেছে কিছু দাগ রেখে যাওয়ার জন্য। নানাবিধ খাবার নিয়ে তাঁর এমন ভালোবাসা রয়েছে যে, তার সুলুকসন্ধানে নেমে সে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ফুড ব্লগার। বর্তমান দুনিয়ার যা অত্যন্ত প্রচলিত এবং অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিগণিতও। রানিয়া নিজে কিছু করে দেখাতে চায়, সে চায় সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত হতে। পড়াশোনা নিয়ে সেভাবে এগোয়নি বলে কম ব্যঙ্গ সইতে হয়নি তাঁকে। মিঠির ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গি তাঁকে বারংবার বিদ্ধ করেছে। তার যোগ্য জবাব দিতে চায় রানিয়া। ফুড ব্লগিং তো অনেকেই করে, রানিয়ার কন্টেন্ট অভিনবত্বের ছোঁয়া। রসকষহীন মন্তব্য নয়, বাংলার হেঁশেল থেকে উঠে আসা মা-ঠাকুমার রান্নার ইতিহাস গল্পের ছলে বলে রানিয়া। সেখানে যেমন ঝালের ঝোলের কথা থাকে, তেমনই থাকে রসুন রুটির ইতিবৃত্ত। দাতসি, কেজুনে ক্রেওল, পিৎজা, পাওভাজির মতো বিভিন্ন প্রদেশের খাবার কথা যেমন উঠে আসে তাঁর ব্লগে, তেমনই জানাতে ভোলে না তার মামাবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোয় ভোগের খিচুড়ি রান্নার গল্প। একইসূত্রে উঠে আসে রানিয়ার ছোটবেলায় মামাবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোর হইহুল্লোড়ের কথা, গোটা বাড়ির সকলে মিলে ভোগ রান্নার কথা। সে এক হইহই ব্যাপার। 

ধীরে ধীরে রানিয়ার পরিচিতি বাড়তে থাকে‌। দেশ থেকে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম। অ্যাকাউন্ট মানিটাইজড্ হয়ে টাকা আসে। মিঠি ঈর্ষান্বিত হয়। ক্যামেরার সামনে রান্না নিয়ে বকবক,দু-চারটে জ্ঞান দিয়ে রানিয়ার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্তরে উত্তরণের এই যাত্রা মিঠিকে উত্তেজিত করে তোলে। মা অনুসূয়া সিঁদুরে মেঘ দেখেন। তবে বোনের দেখাদেখি, তাঁকে টক্কর দিতে বা গৃহকর্মে নিপুণা স্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে কখনও মা, কখনও বোনের কাছে রেসিপি জেনে টুকটাক রাঁধতেও চেষ্টা করে মিঠি। রানিয়া খুশি হয়। ছোট ছোট খুশি, পরিবারকে নিয়ে একসূত্রে বেঁধে থাকতেই তো সে চায়। সুদূরে বিয়ে হওয়ার সুবাদে যখন-তখন দেশে মা-বাবার কাছে আসতে পারে না সে। তাই নিয়ে মনখারাপ,এদেশে,এদেশেও। 

রানিয়ার ফুড ব্লগ এগিয়ে চলে। ইউটিউবে নতুন চ্যানেল। নাম দেয় ‘পেন্ডুলাম’। সেই পেন্ডুলাম দুলতে দুলতে কখনও সিঙাড়া, সামোসার ফারাক বোঝায়, কখনও হিঙ কোথা থেকে এল জানায়। কখনও আবার প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর রন্ধনের প্রসঙ্গ জানিয়ে তাঁকে কুর্নিশ জানায়, তেমনই কখনও আবার চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর হাতে বানানো ফিশমোল্ডের গল্পও শোনায়। ফলোয়ার বাড়তে থাকে, বিজ্ঞাপন আসে। রানিয়া এগিয়ে যায়। তবে সাফল্য যেমন অনেক পরিচিতি দেয়,বিশ্বমাঝারে নিজেকে খ্যাতনামা করে তোলে; তেমনই আপন সম্পর্কগুলো থেকে কখন যেন ক্রমশ একাকী করে দেয়। এর পিছনে কি কেবল ঈর্ষা নাকি পারস্পরিক দ্বন্দ্ব,তা জানে না রানিয়া। রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা তাঁর আশ্রয় হয়ে ওঠে। 


হেঁশেল এবং সেখানে বিভিন্ন রান্নার জন্য, ইতিহাস,গল্প যেমন এ উপন্যাসে সুন্দরভাবে ধরা দিয়েছে, তেমনই দুই বোনের ইগো, তাঁদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, অভিমানের এক অদ্ভুত চড়াই-উতরাই সাক্ষী হয়ে থেকেছে এই উপন্যাস। রান্নাঘর কেবল একটি বাড়িতে সীমাবদ্ধ না থেকে ডিজাটাল ফুড ব্লগিংয়ের দৌলতে সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোফোনে ছড়িয়ে পড়েছে। গোটা সেদ্ধ, বাঁশ মুরগির কথা যেমন রানিয়া জানে, ফুড ব্লগিং দৌলতে আমেরিকা, টেক্সাস সহ বিদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে তা পৌঁছে গিয়েছে। রানিয়ার রান্নাঘর আজ আর কেবল তাঁর একার নয়, সর্বজনীন। 

এই রান্না, রান্নাঘর, রন্ধনপ্রীতি; তা নিয়ে ব্যঙ্গ, অভিমান, ভালোবাসা সবটুকু জুড়ে এই উপন্যাসে সম্পর্কের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন লেখিকা। তাঁর এই প্রয়াসকে কুর্ণিশ জানাই।


বইটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন শুভেন্দু সরকার। মুদ্রণপ্রমাদ খুঁজে পাইনি সেভাবে। পাতায় পাতায় কিছু ছবি থাকলে তা আরও শোভাবর্ধন করত বলে মনে হয়। তবে উপন্যাসের ঝরঝরে, টানটান গতি বইটি একটানা পড়তে বাধ্য করে, এক্ষেত্রে কলমের মুন্সিয়ানা অবশ্যই লেখিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের। পাঠ শুভ হল।


গ্রন্থ: রানিয়ার রান্নাঘর

লেখিকা: ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

প্রকাশক: মান্দাস

মূল্য: ৪০০ টাকা

কোন মন্তব্য নেই: