২৯ সেপ, ২০২৩

বীরভূমের শিবমন্দির











পশ্চিমবাংলার বীরভূম জেলা শিবক্ষেত্রের অন্যতম স্থান। এখানকার দ্বাদশ শিবমন্দির নিয়ে এই প্রবন্ধের অবতারণা। 
  • জুবুটিয়ার জপেশ্বর
 
প্রান্তিক থেকে লাভপুর হয়ে কীর্ণাহার থেকে অনতিদূরেই জুবুটিয়া গ্রাম গেছিলাম এবার পৌষে। এখানকার জপেশ্বর মন্দির অতি প্রাচীন। গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের দেওয়ান চক্রধরের অম্লশূল নিরাময়ের কারণে এই শিব মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই কারণে স্থানীয় মানুষজন জপেশ্বরকে খুব জাগ্রত বলে মনে করে। প্রাচীন শিব মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার ভাস্কর্য এখনো অমলিন। তবে কালের ঝড়ঝাপটায় এবং বিধ্বংসী যবন শত্রুর অত্যাচারে অনেকাংশেই ক্ষতিগ্রস্ত। ২০০২ সালে প্রধান মন্দিরটি ভেঙ্গে পড়ে যায়। তদানীন্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় নিজের গ্রাম মিরিটি কীর্ণাহারেই। তাঁর আনুকুল্যে মন্দিরটির নতুনভাবে সংস্কার হয়। মন্দিরটি বিশাল এলাকা জুড়ে। আর রয়েছে সংলগ্ন বিশাল ঘাট বাঁধানো পুকুর।

  • সাঁইথিয়ার কলেশ্বর
 
 
সাঁইথিয়া শহর থেকে ১২ মেইল দূরে কলেশ্বর গ্রামে অবস্থিত প্রায় ১১০ ফুট উঁচু কলেশ্বর বা কলেশনাথ শিব মন্দির। প্রাচীন মুনিদের সাধনা ক্ষেত্র ছিল এটি। অতীতের পার্বতীপুর। এখনকার কলেশ্বর গ্রামটি সাঁইথিয়ার ময়ূরেশ্বর থানার অন্তর্গত । অনাদিলিঙ্গ শিব কলেশ্বরনাথ অতি প্রাচীন। শিবের নামেই গ্রামের নাম। পর্বত নামে এক ঋষি দেবী পার্বতীর তপস্যায় রত ছিলেন। আবার কারো মতে ধানঘড়া গ্রামের কলেশ ঘোষ পুজো করে শিব কে তুষ্ট করেন। তাই অমন নাম। 
সপ্তদশ  শতকের শৈব রাজা  রামজীবন রায়চৌধুরী মন্দিরের নির্মাতা। কিন্তু সময়ের স্রোতে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এই মন্দিরের সংস্কার করেন দ্বারিকানাথ দেব তপস্বী। বর্তমানের প্রধান মন্দিরটি বিশাল নবরত্ন আকৃতির।  মুর্শিদাবাদের রাজা ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের  আর্থিক সহায়তায় মন্দির নির্মাণ হয়। প্রায় দু'মন ওজনের অষ্ট ধাতুর পার্বতী মূর্তি তিনি দান করেন। মন্দিরের পাশে পার্বতী মন্দির এবং শিবমন্দিরের অভ্যন্তরে অষ্ট্ধাতুর দুর্গামূর্তি আছে। এখানকার প্রচলিত প্রবাদ আজো লোক মুখে ছড়ায়ঃ
কুমারী পাবিরে তুই মনের মত বর
হৃদি ভক্তি রেখে কলেশনাথের উপোস কর।
স্থানীয় কিংবদন্তী বলে প্রাচীনকালে জঙ্গলাকীর্ণ এই অঞ্চলে ভয়ানক অসুরের অত্যাচার ছিল। কলাসুরের দাপটে সবাই থরহরিকম্প। কলাসুরের সুন্দরী কন্যা কলাবতী কে পত্নীরূপে লাভ করার জন্য আরেক অত্যাচারী বিল্বাসুর ব্যাকুল হলে যুদ্ধ বাধে কলাসুরের সঙ্গে। অবশেষে শিব পার্বতীর বরে সেই যুদ্ধ থামে এবং বিল্বাসুর কলাবতীকে বিবাহ করেন। রাঢ় সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ ডাঃ অমলেন্দু মিত্রের মতে ইন্দোমঙ্গোলীয় কৌলিয় জাতির থেকে কলেশ্বর গ্রাম সৃষ্টি হয়। এই কৌলিয় মোঙ্গলীয় জাতি ভারতে প্রবেশ করার পর শৈবধর্ম গ্রহণ করে। তাই রাঢ়বাংলায় শিবমন্দিরের এত আধিক্য। আবার পণ্ডিত মাধবাচার্যের মতে মানুষের কার্য তিন প্রকারঃ বিদ্যা, কলা এবং পশু। পূর্বের যোগী সাধকগণ কলা সংস্পর্শ মুক্ত হওয়ার কারণে সাধনা করেছিলেন এই অঞ্চলে। শিব তাই এখানে কলেশ্বর। কলেশ্বরের শুকদেব মিত্রের "কলেশনাথ-কলেশ্বর' পুস্তকটিতে পাওয়া তথ্য অনুসারে অন্য্যন্য অঞ্চলের মত কলেশনাথের শিবলিঙ্গটিও জঙ্গলের মধ্যে থেকে কুড়িয়ে পাওয়া যায়। কেল্শ নামক এক গোয়ালার গোরুর দুধে স্নান করে তা আত্মপ্রকাশ করে। 
 
  • বক্রেশ্বর



বীরভূমের সতীপিঠ গুলির অন্যতম হল বক্রেশ্বর।
 
পানাগড়-মোরগ্রাম হাইওয়ের থেকে বেরিয়ে ঘুরে আসা যায় বক্রেশ্বরে যেখানে সতীর তৃতীয় নয়ন বা  'মন' পড়েছিল । বক্রেশ্বর নদীর ওপর "নীল-নির্জন' ড্যাম যা একটি ট্যুরিষ্ট স্পটও বটে । এই জলাধারটি বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুত কেন্দ্রের জল সরবরাহ করে ।
এবার আসি বক্রেশ্বরের মাহাত্ম্যে । ব্রহ্মাণ্ডপুরাণে এই তীর্থস্থানকে সিদ্ধপীঠ বলা হয়েছে। এবং পীঠমালা মহাতন্ত্রে এর স্পষ্ট উল্লেখ আছে। 

বক্রেশ্বরে মনঃ পাতু দেবী মহিষমর্দিনী ভৈরবো বক্রনাথস্ত নদীতত্র পাপহরা।।   

সুজাতা ও কহোর মুনির ছেলে সুব্রত। মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সে শুনে শুনে বেদ শাস্ত্রে জ্ঞান লাভ করেছিল। একদিন সে তার পিতা কহোর মুনির বেদপাঠে ভুল ধরিয়ে দিলে অপমানিত মুনি ক্রোধবশত গর্ভস্থ পুত্র কে অভিশাপ দেন। পুত্রের অষ্টাঙ্গ বিকৃত হয়ে দেহে আটটি ভাঁজ পড়ে। এমন প্রতিবন্ধী ছেলের নাম হয় অষ্টাবক্র। 
আবার কারো মতে সত্যযুগে বৈকুন্ঠে আয়োজিত অযোনিসম্ভবা লক্ষ্মীদেবীর স্বয়ংবরা সভায় আমন্ত্রিত মহর্ষিদের সম্মুখে ইন্দ্রের দ্বারা সুব্রতমুনি অপমানিত হন। সুব্রতমুনির ক্রোধাগ্নি দমন হলেও তাঁর সেই ক্রোধ কবলিত দেহে আটটি ভয়ংকর ভাঁজ পড়ে যার জন্য তার নাম হয় অষ্টাবক্র মুনি । 
সেই যুগে জনক রাজার রাজসভায় আমন্ত্রিত হলেন শাস্ত্রজ্ঞ এই অষ্টাবক্র সুব্রত মুনি। রাজা বললেন জ্ঞান শোনালে পুরস্কৃত করবেন। সেখানে তাঁর পিতা কহোরও উপস্থিত। পিতা কে হারিয়ে দিলেন রাজার সভা পন্ডিত। কহোর মুনি নিযুক্ত হলেন সেবার কাজে। দ্বাদশ বর্ষীয় জ্ঞানী অষ্টাবক্র পিতার এহেন পরাজয়ে অপমানিত হলেন। বাবা কে মুক্ত করতে রাজার কাছে গিয়ে উপস্থিত সব পন্ডিতদের তর্কে পরাজিত করলেন। কহোর মুনি মুক্ত হলেন। খুশি হয়ে পিতা সন্তান কে বললেন " যে নদী সমান গতিতে বয়ে চলে তাঁকে বলে সমঙ্গ  নদী। সেই নদীর জলে স্নান করলে তোমার সকল অঙ্গ বিকৃতি দূর হবে।" পুত্র নদী খুঁজতে খুঁজতে হাজির হলেন ডিহি নামক স্থানে। এই ডিহি আজকের বক্রেশ্বর। 

আবার কারো মতে এই অষ্টাবক্র সুব্রত মুনি এখানকার জঙ্গলে  বহুদিন শিবলিঙ্গের সন্ধান পেয়ে  তপস্যা করার পর শিবের আশীর্বাদে মুক্তি পান । তাই এই বক্রেশ্বর শিব বা বক্রনাথ খুব জাগ্রত । বর্তমান মন্দির ৭০০ বছরের প্রাচীন। নির্মাতা রাজা নরসিংহ দেব।  প্রস্তরফলক থেকে জানা যায় যে রাজনগরের রাজার মন্ত্রী দর্পনারায়ণ সুলতানি আমলে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির কে  ১৭৬১ সালে আবার সংস্কার করেন। মন্দিরে পিতলের ধাতু মণ্ডিত শিলাই হলেন স্বয়ং অষ্টাবক্র মুনি। ঠিক পাশেই আরেকটি ছোটো শিলা হল বক্রনাথ শিবের। দেবী মন্দিরের গায়ে বটুক ভৈরবের অবস্থান। রয়েছে আরো ৫টি শিবলিঙ্গ। কুবেরেশ্বর, সিদ্ধেশ্বর, জ্যোতিরলিঙ্গেশ্বর, কালারুদ্রেশ্বর ও জম্ভশ্বর। রয়েছে দশটি উষ্ণ প্রস্রবণ আছে যাদের জল গড়ে ৬৫ থেকে ৬৬ডিগ্রি সেলসিয়াস । বক্রেশ্বরের মূল মন্দিরটি ঊড়িষ্যার প্রাচীন রেখাদেউল রীতি অনুসারে তৈরী । এই সতীপিঠের আরাধ্যা দেবী মহিষাসুরমর্দ্দিণি এবং পীঠাধীশ ভৈরব হলেন বক্রনাথ স্বয়ং ( মতান্তরে বটুক ভৈরব) । মূলমন্দিরের পশ্চিমাংশে একতলা দালানরীতির মন্দিরের মধ্যেই প্রস্তরবেদীর ওপরে অধিষ্ঠিতা দেবী । অষ্টধাতুর অসামান্যা এই অধুনা মূর্তিটি সাম্প্রতিককালের । পূর্বে পরপর দুবার দুটি ধাতব মূর্তি লুন্ঠিত হয়ে যায় । ঐ বেদীমূলের গহ্বরে সতীমায়ের শিলীভূত ভ্রূমধ্য স্থান বা ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ঠ মন পতিত হয়েছিল দক্ষযজ্ঞের সময় । 
মন কোনো স্থুল  জাগতিক বস্তু বা অঙ্গস্বরূপ নয়। তাই পীঠমাহাত্ম্য অনুযায়ী দেবীর ভ্রূ যুগলের মধ্যিখানের অংশ পড়েছিল এখানে যাকে মন রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে এখানকার পাশাপাশি দুটি কুণ্ডের একটিতে উষ্ণ এবং অন্যটিতে শীতল জল। মোট আটটি কুণ্ড আছে এখানে। ক্ষারকুণ্ড, ভৈরবকুণ্ড, অগ্নিকুণ্ড, সৌভাগ্যকুন্ড,  জীবিতকুণ্ড, ব্রহ্মাকুণ্ড, শ্বেতগঙ্গা এবং বৈতরণী। মহাতীর্থ বারাণসী যেমন বরুণা ও অসি নদীর দ্বারা বেষ্টিত তেমনি বক্রেশ্বরও পাপহরা ও বক্রেশ্বর নামে দুই পুণ্যতোয়া নদীর মাঝে।  

আপাত অনাড়ম্বর মহিষমর্দিনি মায়ের মন্দিরে দাঁড়ালে বেশ ছমছমে অনুভূতি হয় ।কত প্রাচীন এইসব মন্দির তা মন্দিরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় । বক্রেশ্বরের উষ্ণপ্রস্রবণে স্নানের ব্যাবস্থাও আছে । 
 

  • কাঞ্চীশ্বর
 
বোলপুরের প্রান্তিক থেকে কঙ্কালীতলা হল বীরভূমের পাঁচ সতীপিঠের অন্যতম। এই সতী পিঠের অন্য নাম কাঞ্চীপিঠ। উত্তরবাহিনী কোপাই নদী, শ্মশান আর কুন্ডটি সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর জায়গা। প্রাচীন মন্দির টি সংস্কার হয়েছে নতুন রূপে। সেইসঙ্গে নতুন কলেবরে দেখতে পাই রুরু ভৈরবের মন্দিরটি। রুরু ভৈরব কঙ্কালী দেবীর পুরুষ। অষ্টাঙ্গ ভৈরবের অন্যতম। আমাদের দিকপাল। সর্বদা রক্ষা করেন। 

পীঠনির্নয়তন্ত্রে পাই  

কাঞ্চীদেশে চ কঙ্কালো ভৈরবো রুরু নামকঃ দেবতা দেবগর্ভাখ্যা 

অর্থাত কাঞ্চীদেশে দেবী দেবগর্ভার কঙ্কাল পতিত হয়েছিল।  এই দেবীর ভৈরবের নাম রুরু। 
মহাদেবের সবচাইতে ক্রোধিত রূপ নাকি এই রুরু ভৈরবের । ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে এই সতী পিঠ কে কাঞ্চীপিঠ বলেছেন। 

কাঞ্চী দেশে পড়িল কাঁকালি অভিরাম।
বেদগর্ভা দেবতা ভৈরব রুরু নাম।।

দুয়ে মিলে ধরে নেওয়া যায় সতীর দেহত্যাগের  সময় বিষ্ণু চক্রে খণ্ডিত সতীর দেহাংশের কাঁখাল বা কোমরের অংশ কিম্বা কঙ্কাল পড়েছিল এই কুন্ডে। তাই একান্ন পীঠের একটি পীঠ এটি। কঙ্কালী মায়ের ভৈরব হলেন রুরু যার অপর নাম কাঞ্চীশ্বর।  স্বয়ংভূ লিঙ্গটি কালাপাহাড়ের অত্যাচারে বিনষ্ট । বর্তমানে গৌরীপট্টটি বর্তমান।
ইতিহাস বলছে রাজা রাজেন্দ্র চোল রাঢ়বঙ্গে রণশূর কে পরাজিত করে মহীপালের বিরুদ্ধে অভিযানের আগে কোপাই নদীর তীরে শিবির সন্নিবেশ করেছিলেন। তাই এই স্থানের নাম কাঞ্চীশ্বর।  

আমাদের চতুর্দিকে অবস্থান করেন দিকপাল অষ্টাঙ্গ ভৈরব যাঁরা আমাদের জগন্মাতার তন্ত্রধর্মের অতন্দ্র প্রহরী। এরা  আমাদের সীমান্ত প্রহরী। ভৈরবরা ভীতিজনক, কারণ তাঁরা শত্রুবিনাশক। ভৈরব শব্দের ব্যুৎপত্তি হল, যিনি ভীষণ রব করেন।
আমাদের পূর্বদিক রক্ষা করেন অসিতাঙ্গ ভৈরব ও রুরু ভৈরব। দক্ষিণ দিক রক্ষা করেন চণ্ড ভৈরব ও ক্রোধ ভৈরব। পশ্চিম দিকের প্রহরী হলেন উন্মত্ত ভৈরব এবং ভয়ঙ্কর ভৈরব। উত্তর দিকের প্রহরী হলেন কপাল ভৈরব এবং ভীষণ ভৈরব। এছাড়া মধ্যস্থল রক্ষায় আছেন সংহার ভৈরব।

  • নলহাটির যোগেশ  
নলহাটির ললাটেশ্বরী মন্দির একান্নপীঠের অন্যতম শক্তিপীঠ। নলহাটি স্টেশনের অনতিদূরেই একটি টিলার ঢালে এই পীঠস্থান। মন্দিরের পিছনে পাহাড় আর মন্দিরের সিঁড়ির মুখেই ললাটেশ্বরী দেবী কালিকা এবং ক্ষেত্রপাল ভৈরব যোগেশের অবস্থান। পীঠমালাতন্ত্রে বলে সতীর কনুইয়ের নিম্নভাগ বা নলা (সংস্কৃত শব্দ নলক থেকে উত্পত্তি) পড়েছিল এখানে। কেউ বলে ললাট আবার কারো মতে কন্ঠনালী পড়েছিল। 

নলহাট্যাং নলাপাতো যোগীশো ভৈরবস্তথা তত্র সা কালিকা দেবী সর্বসিদ্ধিপ্রদায়িকা ।। 

কারো মতে মন্দিরের প্রায় দু কিমি উত্তরপশ্চিমে হরিটোকা গ্রামের শিবলিঙ্গটিই আসল যোগেশ ভৈরবের। আবার ঐতিহাসিকদের মতে নিষাদরাজ্য ছিল পৌরাণিক নলের বাসভূমি। নলহাটির টিলাতে সীতার পদচিহ্ন এবং চুল্লীর পোড়া পাথর এখনো আছে। বনবাসকালে রামসীতা এই অঞ্চলের পাহাড়ে কিছুদিন বাস করেছিলেন বলে তাদের বিশ্বাস। এই নলহাটেশ্বরী মূলত নলদের মুখোস বা মুণ্ড পূজার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। 
 

  • ফুল্লরাতলার বিশ্বেশ 
বোলপুর থেকে লাভপুরে নেমে যাওয়া যায় অথবা বোলপুর থেকে প্রান্তিক-কোপাইয়ের পথ ধরে ও যাওয়া যায়। মুসলমান যুগে লাভপুর এক প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ব্যবসায় প্রভূত লাভ হওয়ার কারণে এর নাম লাভপুর। সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসস্থান। লাভপুর স্টেশনের উত্তরপুবে ফুল্লরাপীঠ। রাঙামাটীর পাথুরে টিলার ওপরে মায়ের মন্দির। নীচে প্রবাহিত উত্তরমুখী কোপাই নদী। 
পীঠনির্ণয়তন্ত্রে আছে
অট্টহাসেচোষ্ঠপাতো দেবী সা ফুল্লরা স্মৃতা বিশ্বেশভৈরবস্তত্র সর্বাভীষ্ট প্রদায়কঃ।।  

সতীর দেহত্যাগের পরে তাঁর খণ্ডিত ৫১ দেহাবশেষের ৫টি পড়েছিল আমাদের বীরভূমে। এর মধ্যে অন্যতম হল  ময়ূরাক্ষী নদীর সমতলে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মস্থান লাভপুর যার অনতিদূরেই ফুল্লরা বা সতীপীঠ অট্টহাস । এখানে সতীমায়ের অধর ওষ্ঠ পড়েছিল । মন্দিরের পাশে বিরাট পুকুর । অট্টহাসে দেবী ফুল্লরার ভৈরব হলেন বিশ্বেশ । এখানেও প্রবাহিত উত্তরমুখী কোপাই নদী।শ্রী শ্রী চন্ডীতে আছে অসুর নিধনের সময় দেবী দুর্গা অট্টহাসিতে আকাশ বাতাস ভরিয়ে দিয়েছিলেন। কথিত আছে রামচন্দ্র যখন দুর্গাপুজো করেছিলেন তখন হনুমান ১০৮টি নীলপদ্ম ফুল্লরার সংলগ্ন পুকুর থেকে সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন রামচন্দ্রের পূজার জন্য । প্রতিবছর নাকি দুর্গাপুজোর আগে সেই জলাশয়ের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ভেসে আসে একটি অদ্ভুত শব্দ। যা শোনার পরই শুরু হয় দেবীর সন্ধিপুজো।  দেবীর অধরোষ্ঠ পড়েছিল সেই তীর্থের তেমন নাম অট্টহাস সেই অর্থে বেশ কাব্যিক বটে। কারো মতে বশিষ্ট মুনির পুত্র অট্টহাস ছিলেন এই সতীপীঠের প্রথম সাধক এবং তাঁর নামানুসারেই জায়গাটির তৎকালীন নাম ছিল অট্টহাস। কেউ বলে অট্টহাস এবং ফুল্লরাতলা ভিন্ন স্থান। কারো মতে দুটি  নাকি এক‌। দেবীর এখানে কোন বিগ্রহ নেই । মন্দিরের মধ্যে রয়েছে টকটকে লাল রঙের প্রকাণ্ড এক প্রস্তরখন্ড। সেই পাথরের সামনের ভাগটা ওষ্ঠাকৃতির। সেখানেই নিত্য পুজো হয়। এখানে দেবীর ভোগের অন্যতম পদ হল মাছের টক। 
  • নন্দীকেশ্বর 

বীরভূমের সাঁইথিয়ার অন্যতম নদী ময়ূরাক্ষীর তীরে এ জেলার অন্যতম সতীপীঠ নন্দীপুর।
পীঠনির্ণয় তন্ত্রে বলে 


হারপাতো নন্দিপুরে ভৈরব নন্দিকেশ্বরঃ
নন্দিনী সা মহাদেবী তত্র সিদ্ধিমাবাপ্নুয়াত।।  


এখানে মহাদেবী হলেন নন্দিনী বা নন্দিকেশরী এবং এর ভৈরব ক্ষেত্রপাল নন্দিশ্বর বা নন্দিকেশ্বর।  অতি সাধারণ মায়ের মন্দির দালান রীতিতে নির্মিত ছায়া ঘেরা বটগাছের নীচে এই মন্দির। দেবী এখানে মহাশক্তি দুর্গা ধ্যানে পূজিতা হন। প্রবেশপথের ডানদিকে পীঠভৈরব নন্দিশ্বরের অবস্থান একতলার দালান ঘরে।  দেবীর কন্ঠের অস্থি পড়েছিল এখানে। নিত্যভোগের আয়োজন এবং ধ্যানগম্ভীর পরিবেশে দাঁডালেই বেশ মাহাত্ম্য অনুভূত হয়।   


  • মল্লেশ্বর 
বাংলার বীরভূম । সীমানায় ঝাড়খন্ড। সেখানেই ময়ূরাক্ষী নদী। কাছেই  মল্লারপুর গ্রাম। মহাদেবের নাম মল্লেশ্বর। বীরভূমের অন্যতম শিব ভূমি। 
"বীরভূমৌ সিদ্ধিনাথ রাঢ়ে চ তারকেশ্বর" এটি হল মল্লেশ্বর  শিবের মন্ত্র। সঙ্গে দ্বাদশ শতাব্দীর সিদ্ধেশ্বরী শিলা মূর্তি। মল্লেশ্বরের শিবগঞ্জের মন্দির-পল্লি তে ঢুকলেই এখনো মহাভারতের গল্প জীবন্ত হয়ে ওঠে। 
চারিদিকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এক বিরাট চৌহদ্দির মধ্যে মল্লেশ্বর শিব মন্দির ছাড়াও রয়েছে লাইন করে একের পর এক সব প্রাচীন  মন্দির। বেশিরভাগই ছোটো ও বাংলার চারচালা রীতিতে তৈরি। উত্তর দিকে দোতলা প্রধান তোরণদ্বারের ওপর নহবতখানা। আগে বোধহয় সানাই বাজত। শিববাড়ির ভেতরের মন্দিরগুলির গায়ে টেরাকোটার নানা অলংকরণ। অজস্র দেবদেবীর মূর্তি। এখনও অক্ষত। এই শিবপল্লি দ্বাদশ শতাব্দীর। 
সিঁদুরে লেপা সেই পাথরের সিদ্ধেশ্বরী দেবীর মুখমণ্ডলে এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে ত্রিনয়ন। সব শক্তি পীঠে  যেমন থাকে একজন পুরুষ আর একজন প্রকৃতি। তেমনি এখানে এই সিদ্ধেশ্বরী দেবী বুঝি মল্লেশ্বর শিবের শক্তিস্বরূপা। 

মল্লারপুরের ঘন জঙ্গলে এক মেষপালকের অসামান্য সুন্দরী মেয়ে পদ্মিনীর সঙ্গে স্থানীয় এক  সাধুর বিয়ে হয়। তাদের সন্তান মল্লনাথ। সবই জনশ্রুতি । একদিন গভীর বনের মধ্যে গোরু চরাতে গিয়ে মল্লনাথ চমকে ওঠে। একটি দলছুট গরু বটগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে দুধ দিচ্ছে আপনা আপনি। প্রকান্ড সেই ঝুরি নামা প্রাচীন বট এখনো আছে।  কয়েক দিন পরপর একই জিনিষ দেখে মল্লনাথ তার সেই সন্ন্যাসী বাবা কে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হতেই তার বাবা বলল গ্রামের আরও লোকজন নিয়ে জায়গাটা খুঁড়তে। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে উদ্ধার হল ঘড়া ঘড়া গুপ্তধন। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে তার কিছুপরেই কোদাল আর পাথরের ঘর্ষণে বিশাল শব্দ। হঠাত আগুন জ্বলে উঠতেই সবাই চমকে উঠল। মল্লনাথ নাকি দৈববাণী শুনতে পেয়েছিল তখনি। মাটির নীচে ছিল মহাভারতের রাজা জয়দ্রথের পূজিত শিব বাবা সিদ্ধিনাথ। বাবা সিদ্ধিনাথই এখানকার এই মল্লেশ্বর শিব। পাথরের শিলায় এখনও সেই কোদালের ক্ষতচিহ্ন আছে। আর সেই গুপ্তধনের মালিক হয়েছিল মল্লনাথ যার নামেই এই জায়গার নাম মল্লারপুর। 
মহারাজ মল্লনাথ সিংহই এই জনপদের উন্নয়ন করে রাজধানী নির্মাণ করান এবং শিব মন্দিরের সংস্কার করেন, তাই জনপদের নাম মল্লারপুর এবং শিবের নাম 'মল্লেশ্বর' হয়েছে।
পাশেই ফতেপুর গ্রামে অনেক প্রাচীন কালে এক জনজাতির বাস ছিল। এই দেখো না পড়ে। মল্লনাথের জন্মের কথা সব লেখা আছে পাথরে। 
মোট ২৩টা মন্দির এই শিব পল্লী তে। একটি মন্দিরে সিদ্ধেশ্বরী মূর্তি বাকি সব শিব মন্দির।
এই গ্রামের পুবদিকের জঙ্গলে গেলে শিবপাহাড়ি নামে এক পাহাড় আছে। পাণ্ডবরা বনবাসকালে যখন কাম্যক বনে বাস করছিলেন তখন মাতা কুন্তী এই শিব পুজো করতেন। দুর্যোধনের বোন দুঃশলার স্বামী রাজা জয়দ্রথ গিয়েছিলেন দ্রৌপদীকে হরণ করতে। ভীমের হাতে অপমানিত হয়ে জয়দ্রথ তখন কঠোর তপস্যা শুরু করেন।সিদ্ধিনাথ শিব শেষ পর্যন্ত জয়দ্রথের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে তাঁকে বর দেন এবং বর পান এমনি যে কেউ তাঁকে কোনোদিনও যুদ্ধে হারাতে পারবে না। 

  • মদনেশ্বর  (কোটাসুর, সাঁইথিয়া)   

 

২৮ সেপ, ২০২৩

কোভিড কালে হুতোম এল / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় রিভিউ লিখলেন ডঃ জয়ন্তী মণ্ডল (রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা বিভাগ)



কোভিড কালে হুতোম এল

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

মূল্য - ২০০

রা' প্রকাশন

বই নয় যেন দেড়শ বছর আগের পুরোনো কলকাতার এক ঘন কালো ছবি। এটাও একপ্রকার স্মৃতি গ্রন্থ। তবে কলকাতার এক ঘন পাতার জামরুল গাছের ডালে বসেছিল দেড়শ বছর আগের বাঙালি বাবু বিবিদের অশরীরী ভূতেদের স্মৃতির আড্ডা। এদের সঙ্গে এসে জুটল দেড়শ বছর আগের ক্ষণজন্মা বাঙালি বাবু কালীপ্রসন্ন সিংহ। কালীপ্রসন্ন অবশ্য একালে হুতোম প্যাঁচা হয়েই জন্মেছে। সেও প্রাণের শহর কলকাতাকে দেখবে বলে অশরীরী বাবু বিবিদের আড্ডায়। পাঠক গ্রন্থটি পড়তে পড়তে চলে যাবেন আগেকার পুরনো কলকাতায়। স্মৃতিপটে ভেসে উঠবে সেকালের কলকাতাবাসীর এক চমৎকার ছবি। এই অশরীরী ভূতেদের চোখ দিয়েও যদি পুরনো কলকাতাকে একবার দেখতে  পায় তো মন্দ কী?

লেখকের কল্পনার সুতোয় জাল বোনা এক অদ্ভুত কাহিনি যেন। প্রতি মুহূর্তেই লেখক শরণাপন্ন হয়েছেন সেই বহু চর্চিত, বিতর্কিত কালজয়ী গ্রন্থ "হুতোম পেঁচার নকশা"র উল্লেখযোগ্য অংশগুলির উল্লেখ বর্তমান প্রজন্মের পাঠক পাঠিকাদের ভাবাবে। আর সেই পুরনো কাহিনির মোড়কে নতুন এবং আধুনিক ভাবে লেখা বাংলার সব নামীদামী মানুষের চরিত্রেরা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে এ বইতে। 

অনেক খুঁজে খুঁজে হুতোম কলকাতাতে এসে জুটেছে। কেমন লাগছে হুতোমের? বহুকাল আগের দেখা কলকাতা আর এখন চলমান কলকাতাকে সে মেলাতে চাই। কখনো স্মৃতির অতলে অবগাহন করে তুলে আনতে চায় পুরনো সেসব দিনের কথা। হুতোমের চোখে ভেসে ওঠে পুরনো কলকাতার বাবুরা কেমন করে ঘোড়ায় চড়ে অফিসে যেতেন। তারপর এল জমিদারদের বজরা, সাহেব বিবিদের ফিটন গাড়ি থেকে যানবাহন জায়গা নিল ঘোড়ায় টানা ট্রাম। হুতোম দেখে ঘোড়ার গাড়ির বংশ পরম্পরায় মালিকেরা এখনো এই শহরেই রয়ে গেছে। তবে তারা অন্য পেশায় অবাঙ্গালীদের বিয়ে বাড়ির প্রশেসনে ঘোড়াগুলোকে ভাড়া দিয়ে জীবন চালায়। হুতোম অবশ্য ট্রাম দেখে যেতে পারেনি। 

এখন তার আস্তানা কখনো পুরনো বাড়ির ছাদের আলসেতে তো কখনো কারো জানালার কার্নিশে। গাছের কোটরে বসে বসে তার স্মৃতি ছুটে বেড়াই একবার এ জন্মে আর একবার গত জন্মের কলকাতাতে। মাত্র তিরিশটা বছর সে কলকাতাকে দেখেছিল। হুতোমের একটাই আফসোস আগের জন্মের মতো যদি কলকাতাকে নিয়ে এ জন্মে দুটো কথা লিখতে পারত। 

এক অশরীরী ভুতের সঙ্গে হুতোমের কলকাতার অলিগলি বেয়ে চলা ট্রামে গল্প জমে ওঠে। তবে অশরীরী বন্ধু ভূত হুতোমকে জানাই খুব শীঘ্রই ট্রাম এ শহর থেকে বিদায় নেবে। হুতোম এর চোখে ভেসে ওঠে পুরনো কলকাতার গোবিন্দরাম মিত্রের আপার সার্কুলার রোডে বাগানবাড়ির নন্দন বাগানের কথা। গোবিন্দ রাম  চিতপুর রোডে নবরত্ন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার চূড়া ১৬৫ ফুট মনুমেন্টের চেয়েও উঁচু। অবশ্য ১৭৩৭ এর ভূমিকম্পে মন্দিরের চূড়া ভেঙে যায়। এসব কথা সে বই এ পড়েছে।

কখন যেন ভূত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব একসঙ্গে কথা বলে ওঠে এ উপন্যাসের মাধ্যমে। 

হুতোম ঠাকুমার মুখে শুনেছে, জব চার্ণক যখন কলকাতায় আসেন তখন কলকাতার লালদিঘি নিয়ে খুব উত্তেজনা ছিল। পলাশীর যুদ্ধের ঠিক আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছিল এই লালদিঘিতে। হুতুম তার নকশাতে লিখেছিল কলকাতায় কেমন সন্ধ্যে বেলা রামায়ণ,মহাভারত, পুরাণ পাঠের সমবেত আসর বসার কথা। একালে টপ্পা গান বাজলে বা চড়ক এলে হুতোমের কানে ভেসে ওঠে সেকালের টুনোয়ার সেই টপ্পা গান – 

' কহই টুনোয়া -

শহর শিখাওয়ে কোতোয়ালী ' 

চিৎপুরের রাস্তায় জেলেপাড়ার সঙ্গের কথা লিখেছিল সে তার নকশায়। বাবুরা কালীঘাটের চড়ক দেখতে গিয়ে দেখতেন মত্ত সন্ন্যাসীদের নৃত্য আর কেরাঞ্চি গাড়ি করে বেশ্যার আগমন।

স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে মাহেশের স্নানযাত্রা। বাবুরা বজরা ভাড়া করে মদ গাঁজা নিয়ে নৌকায় উঠতেন। স্নানযাত্রার পর বাইনাচের আসর বসত। বাবুদের সাজসজ্জা ছিল তেমন। গায়ে পিতলের বোতাম দেওয়া সবুজ ফ্তুই, আর ঢাকায় উড়নি। পরনে শান্তিপুরী ধুতি। রাতের কলকাতায় কান পাতলেই শোনা যেত ঘুঙুরের আওয়াজ। এখন শহরজুড়ে শুধুই হইহুল্লোড়।

কখনো কখনো আকাশপথে উড়তে উড়তে হুতোম একালের রথযাত্রা দেখে। মনে পড়ে সেকালের রথের কথা। জানবাজারের রাসমণির স্বামী রামচন্দ্র দাসের রুপোর রথ টানতো দুটি সুসজ্জিত ঘোড়া, রথের সঙ্গে বের হতো কলকাতার সং।

দুর্গাপুজো এলে হুতোমের বুকটা হুহু করে ওঠে। তখন দুর্গাপুজো হতো কি বিরাট করে বাবুদের বাড়িতে। পাল্লা দিয়ে চলত সাহেব বিবিদের নেমন্তন্ন। তাদের বিনোদনের জন্য নর্তকীদের আনা হতো মোটা মাইনে দিয়ে। নিকি নামের নর্তকী ছিল সবার সেরা। তারপর এসেছিল বুলবুল। এখনকার শহরের আনাচে-কানাচে থিমের বারোয়ারি পূজোর আলোর ঝলকানিতে চোখ ঝলসে যায় হুতোমের। পুজো মিটলে বাঁচে হুতোম।

লেখক চমৎকার বয়ানে, কল্পনার জাল বুনেছেন ধীরে ধীরে। সেখানে বাস্তব আর কল্পনা যেন রুপকথা হয়ে উঠেছে এক একবার। 

হুতোম দক্ষিণ কলকাতার এক বিরাট গাছের মগডালে বসে বসে কখনো দেখে এ কালের আবাসনের ঝগড়া। তার চোখ চলে যায় বাবুদের হাতে শ্লেট এর মতো জিনিসটাই। এ যুগের বাবুরা আঙুল দিয়ে তার উপর কি সব হিসেব করে চলে।  হুতোম ভাবে এই বাবুরাই আবার গাড়ি হাঁকিয়ে সন্ধ্যেবেলা কোথায় যায়? 

অমনি গাছের ফাঁক থেকে নাকি সুর এক অশরীরী বলে ওঠে কোথায় আবার ক্লাবে আড্ডা দিতে যাচ্ছে। একালের বাবুদেরও এক আধটা উপপত্নী থাকে। কিন্তু স্ত্রীকে তারা সম্মানও দেয় আসলে বুদ্ধিমান নব্য বাবুরা আটঘাট বেঁধে নামে। হুতোম দেখে একালের বিবিরা সন্ধ্যেবেলা লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়ে না। তখন তারা কিটি পার্টি করে, ফেসবুক করে। অশরীরী ভূত নাকি কণ্ঠে আর হুতোম গাছের ডালে ঠোঁট ঠুকে ঠুকে দুজনেই স্মৃতির অতলে ডুব দিয়ে চলে যায় মহাভারতের যুগে, শশাঙ্কের আমলে, ইসলামী আমল হয়ে একেবারে ইংরেজ আমল।

এমন সময় এসে জুটলো এক নারী কণ্ঠী পেত্নী সে যুগের কবিয়াল এন্টনি ফিরিঙ্গির স্ত্রী সৌদামিনী। সেকালের বিখ্যাত টপ্পা গায়ক রামনিধি গুপ্তের অশরীরী  ভূত সঙ্গ দিল এদের সঙ্গে। তিনজনে মিলে বেশ জমেছে আড্ডা। লেখিকা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাবু রাজা নব কৃষ্ণের অশরীরী ভূতটাকেও এনে জমিয়ে দিলেন ভূতেদের আড্ডায়। অবশ্য হুতোম এ যুগে জীবন্ত একটা পাখি হয়ে জন্মেছে।

রাজা নব কৃষ্ণের অশরীরী ভুতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আড্ডা অন্য মাত্রা পেল। হুতোম যেন তার নকশায় আঁকা বাবুদের এ যুগে একবার হাতে পেল। ক্লাইভের সঙ্গে নবকৃষ্ণ বাবুর জোট বেঁধে সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসন চ্যুতের কথা গল্পচ্ছলে বলতে ছাড়ল না হুতোম। টপ্পা ভূত আর হুতোমের কথোপকথনে সেকালের বাবুদের স্বেচ্ছাচার, জমিদারদের আমোদ প্রমোদ, বাংলার দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর, যুদ্ধে ক্ষত বিক্ষত বাঙালির কথা যখন ওঠে তখন বাবুভূত রেগে ওঠেন। রামনিধি বাবুর সেই কালজয়ী টপ্পা অশ্লীলতা দায় দেখিয়ে রক্ষণশীলদের জোটবদ্ধ হওয়ার কথা  রমনিধি গুপ্তের ভূত বলে আস মেটাল একালে। সে দুঃখ আজও টপ্পা ভূতের রয়ে গেছে। একটা শান্তি যখন দেখে তাদের গান নিয়ে এখনকার ছাত্র-ছাত্রীরা গবেষণা করছে তখন আনন্দে ভরে ওঠে মনটা তার।

ভূত পেত্নীদের আড্ডা শেষ হতে হতে ভোর। গাছের কোটরে হুতোম ঘুমোয় । মানুষের কলরবে ঘুম পাতলা হয়ে যায় হুতোম এর। রাতের মজলিসের কথা বসে বসে ভাবে সে। এ জন্মে তো সে লিখতে পারেনা। সেকালে কলকাতাকে দেখে নকশা লিখেছিল সে। সবে বাবুদের জমিদারি শুরু।  বাঙালি সেদিন কেমন করে বাবু তৈরি হয়েছিল তা হুতোমের নিজের চোখে দেখা তাই তো সে তার নকশা তে লিখেছিল। তা নিয়ে সমাজ উত্তাল। এর জন্য বাবুদের কাছ থেকে কম লাঞ্ছনা গঞ্জনা শুনতে হয়নি তাকে। শেষে মহাভারতের অনুবাদ করে সেই বই বিলিয়ে দিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেল।

এর মধ্যে আবার নতুন বিপদ। হুতোম পেঁচা কে দেখে তার ডাক শুনে আবারো অমঙ্গলের ইঙ্গিত পায় কলকাতাবাসী। কোভিড কালে হুতোম এলো। অতিমারি সে দেখেনি। মন্বন্তরের নাম শুনেছিল। এই অতিমারি তাও তার প্রাণের শহর কলকাতায়! হুতোম দেখে কোভিডের হাত থেকে বাঁচার জন্য বস্তির পাগলী শারি সকলের মঙ্গলের আকাঙ্ক্ষায় বন্ধ শেতলা মন্দিরে গিয়ে অশ্বস্থ গাছের নিচে ফুল আর একটা টাকা রেখে আসে। হুতোম এমন একটা শারি কে সে জীবনে চেয়েছিল কিন্তু পাইনি।

শারিকে দেখে হুতোমের মনে পড়ে যায় গত জন্মের কথা, ছ বছর বয়সে বাবা মারা যান। হিন্দু কলেজে ভর্তি হলেও ঠাট্টা ইয়ার্কি আর দুষ্টুমিতে ওস্তাদ ছেলের কলেজের পাঠ চুকোতে হলো। অগত্যা বাড়িতেই পাঠ নিতে হয় তাকে। রাতে ঘুমোতে গিয়ে ঠাকুমার মুখে রামায়ণ, মহাভারতের গল্প শোনে। ঠাকুমা শোনান তার জন্মের ও আগের কলকাতার গল্প।

গাছের কোটোরে বসে গোল গোল চোখ ঘুরিয়ে অতীতের স্মৃতিতে ডুব দেয় তের বছরের কিশোরের বিয়ের স্মৃতি। বর কালীপ্রসন্ন সিংহ। কি বিরাট আয়োজন হয়েছিল সেদিন। একদিন দেশীয় বাবুদের নিয়ে নাচ গান উৎসব। ব্রাহ্মণদের বিদায় দক্ষিণার কি আয়োজন! ঘড়া, থালা, শঙ্খ, রুপোর থালা-বাসন আরো কত কি! ক বছরের মধ্যে চলে গেল বাগবাজারের বসু পরিবারের একরত্তি মেয়েটা। আবার দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ সেও টিকলো না। সারস্বত সমাজকে নিয়েই সে ভুলে থাকতে চাইলে সবকিছু। দান  ধ্যানেও সিদ্ধ হস্ত ছিল হুতোম। কখনো বিদ্যাসাগর কে কখনো মধুসূদন কে দিয়েছেন টাকা। শেষে নিজেই হয়ে গিয়েছিল মাথা অবধি দেনার দায়ী।

কলকাতার বাঙালি বাবুরা যখন দিনে ঘুমিয়ে রাতে বাইজি নৃত্য দেখে, ঘুড়ি উড়িয়ে, পায়রা উড়িয়ে, বুলবুলির লড়াই দেখে দিন যাপন করে হুতোম তখন সারস্বত চর্চার নতুন নেশায়। মাত্র তখন তার ষোল বছর বয়স। বাংলার নাট্যমঞ্চের দরকার ভেবে নিজের বাড়িতেই তৈরি করল 'বিদ্যোৎসাহিনী' থিয়েটার। সেখানে রামনারায়ণ তর্ক রত্নের ' বেণীসংহার' নাটক মঞ্চস্থ হলো। প্রশংসিত জনতার মুখের দিকে তাকিয়ে হুতোম আবার কালিদাসের বিক্রমোবর্শী, নাটকের অনুবাদ করে মঞ্চস্থ করল। কালীপ্রসনের অভিনয় দেখার জন্য হলে সেদিন লোক ধরেনি। ফিরে যেতে হয়েছিল অনেককে। পরে কেউ কেউ বিশ্বাসই করলেন না এটা একটা নাবালকের লেখা নাটক। এরপর ' সাবিত্রী সত্যবান ' ' মালতী লতা' মঞ্চস্থ করল হুতোম। যত্নের অভাবে সবই হারিয়ে গেল। জামরুল গাছের মগডালে বসে শুধুই হা-হুতাশ।

এমন মন কষ্টের সময় গাছের কোটোরে বসে হুতোম মন ফিরিয়ে নেয় বস্তির মেয়ে শারির দিকে। কোভিড কালে সে কি প্রাণশক্তি নিয়ে বস্তির আবাসনের মানুষজনকে কোভিডের হাত থেকে রক্ষা করছে শারি। লেখিকা হুতোমের চোখ দিয়ে কোভিড কালে আধুনিক কলকাতার আবাসনের বাস্তব চিত্রটিও তুলে ধরেছেন।

কোভিড কালে হুতোম এর আর এক বিপদ আমফানের ঝড়। সে একবার এডালে বসে তো আর একবার কারো  আবেস্টারে বসে। হুতোম দেখে মিছিল নগরী কলকাতা জনশূন্য। সেদিন বেশ মিটিং বসেছিল। আবার কবে হবে সেই মিটিং ভয় হয় হূতোম এর।

আম ফানের ঝড়ে সব তছনছ। কোথায় সেই উদীয়মান শিল্পী মঞ্জুরীর দাদু রণদেব বাবুর বাড়ি। ঝড়ে হারিয়ে গেছে বাড়ির নিশানা। জন্মের আগে একবার এমন ঝড় হয়েছিল বই পড়ে জেনেছিল সে। হুতোমের কালেও একবার আশ্বিনের ঝড় হয়েছিল। যাক ভাবতে ভাবতে অবশেষে হুতোম খুঁজে পেল সেই বাক্স বাদাম গাছ।

হুতোম এর ডাকে এসে জুটলো রাজাবাবু ভূত। শাঁখ চুন্নি সৌদামিনী ও হাজির। '  ভালবাসিবে বলে ভালবাসিনে। ' নাকি সুরে গাইতে গাইতে এসে হাজির হল টপ্পাভূত। কিন্তু বাবু ভূতের বড় দুঃখ হয় এখন তাকে তেমন কেউ সম্মান করে না। চেনেও না। তবে শোভাবাজার রাজবাড়িতে ধুম করে দুর্গা পুজোটা এখনো হয়।

বিদ্যাসাগরকে বড্ড মিস করে হুতোম তার নকশাকে কলকাতার কেচ্ছা বলে দাগিয়ে দিল কলকাতার বাবুরা। তারপর বিদ্যাসাগরের অনুরোধে সে লিখেছিল মহাভারত। দ্বিতীয় অধিবেশন জমে উঠলো রণদেব মুখুজ্জের বিয়ের গল্পে। হুতোমের আসরে লেখিকা সেকালের বাংলার পটচিত্র শিল্পের কথা পাঠককে কিছুটা হলেও ধারণা দিলেন।

হুতোম গাছের মগডালে বসে মনে মনে একপ্রকার প্রতিজ্ঞাই করে ফেলল এই প্যাঁচার শরীর ছেড়ে দুর্গা বাবু বা লক্ষী বাবু হয়ে এই কলকাতা শহরেই জন্ম নিতে চায়। আড়াই লক্ষ টাকা নিজের পকেট থেকে খরচ হয়েছিল তার মহাভারতের অনুবাদ করতে গিয়ে। একের পর এক মামলাতে সিংহ বাড়ির সব সম্পত্তি বিক্রি হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত কাঠগড়ায় পর্যন্ত যেতে হয়েছিল তাকে। সেসব কথা মনে পড়তেই দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে তার। গাছের ডালে চোখের জল মোছে হুতোম। শেষমেষ বাবু ভূত আর হুতোম দুজনেই একসঙ্গে ঠিক করে এবার জন্ম নিয়ে তারা বাঙালি বাবুর চরিত্র নিয়ে হাইপোথিসিস লিখবে।

হুতোম এর মুখ দিয়ে লেখিকা সে কালের পুরনো কলকাতার চিত্রটি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। তবে হুতোম যেখানে নায়ক সেখানে কৌতুক প্রিয়তার আর একটু থাকলে ভালো লাগত। বইটির প্রচ্ছদে ই হুতোম এর ভারাক্রান্ত মুখের ছবি। হুতোম তাকিয়ে আছে একালের কলকাতার মানুষের দিকে। আজকাল খুব কম পাঠকই হুতোম পেঁচার নকশা বইটি পড়ে। এমন সহজ সরল গদ্যে পুরনো কলকাতার গল্প শুনতে হলে  ' কোভিড কালে হুতোম এল '  বইটি সংগ্রহে রাখা ভালো। সেইসঙ্গে মারণ সেই কোভিড রোগে আমাদের সবার যাপন এই বইয়ের শারি চরিত্রটিকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে যেন। তাই হুতোমের ভূতপূর্ব সেই প্রেমিকা বর্তমানের এই শারির মুখ দিয়ে লেখিকা বলিয়েছেন কোভিডকাল যাপনের সংলাপ। সেও আমাদের বড় প্রাপ্তি। 


২৪ জুন, ২০২৩

আষাঢ়ী চিঠি

 

image courtsey: https://india.postsen.com/

প্রিয়া মেঘবতী, 

তোমার কথা আজ খুব মনে পড়ছে। নতুন বর্ষা, আকাশের মেঘমেদুরতার অনুষঙ্গে। এখন তখন এলোমেলো বৃষ্টির ছিটেফোঁটা গায়ে এসে পড়লেই মনে পড়ছে তোমার সঙ্গে প্রথম বৃষ্টি দেখার কথা। দুজনের স্বাধীনভাবে বৃষ্টিতে বিচরণের মুহূর্তগুলো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আজ আমায়। কেন সেদিন কাজে মন দিলাম না? কেন সেদিন বিস্মৃত হলাম শিবপুজোর জন্য আমার প্রভু কুবেরের বাগানের ফুল তুলতে ?  তুমি তো ছিলেই, থাকতেই আমার সঙ্গে। বড় ভুল হয়ে গেল প্রিয়া। সেদিন শুনিনি তোমার বারণ। 

মনে পড়ে প্রিয়া? সেই রুদ্রাক্ষ গাছের নীচে? যেদিন শেষ ছুঁয়েছিলাম তোমায়? তুমি হাতে হাতে রেখে বলেছিলে, "এভাবেই থাকবে তো সারাটা জীবন?" 

হ্যাঁ, প্রিয়া। থাকতে তো চেয়েই ছিলাম, থাকতে তো চাই এখনও। কিন্তু কী যে সব হয়ে গেল আমাদের! জীবনটা তছনছ হয়ে গেল। এসব কথা আর কাকেই বা বলি? এই ক' মাসেই হাক্লান্ত, রিক্ত আমি, শূন্য আমি। তোমায় ছাড়া। 

দেখতে দেখতে আবারও এসেছে বর্ষা। আবার পাহাড়ের আকাশে ঘন মেঘ জমেছে। আমার মনের দুঃখের ভার, বিরহ বেদনা আর বিচ্ছেদ যন্ত্রণা একটুও লাঘব হলনা প্রিয়া। 

তুমি বিহনে আমি শীর্ণ আমার হাতের সেই বালাজোড়া খুলে পড়ে যাচ্ছে। মনে পড়ে? যেদিন তোমায় প্রথম আলিঙ্গন করেছিলাম সেদিন ঐ বালাজোড়া খুলে রেখেছিলাম পাছে তোমার আঘাত লাগে। 

এখানে বাতাসিয়া পাহাড়ে সর্বক্ষণ কেতকী, কদম্ব আর কুড়চি ফুলের সুবাস ভেসে আসে আর কেবলই তোমার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে গেলাম প্রিয়া। এর নামই বুঝি প্রেম? কিন্তু আমাদের প্রেম পূর্ণতা পাবার আগেই সমূলে কেউ কুঠারাঘাত করে দিল। 


দূরত্ব প্রেম কে অন্য মাত্রা দেয়। এই বিরহ যন্ত্রণা আমাদের প্রেম কে আরও ঘনীভূত করবে কিন্তু আমি যে আর এই বিচ্ছেদ কে মেনে নিতে পারছি না প্রিয়া। তার মধ্যেই আবার আমার এই অভিশপ্ত জীবনে আষাঢ় এল ফিরে। আবারও সেই গিরিমল্লিকা ফুটেছে থরে থরে। আমি চোখ সার্থক করছি আর ঘ্রাণ নিচ্ছি তার। মনে হচ্ছে যদি এই কুড়চি ফুলের মালা গেঁথে তোমার কবরীতে পরিয়ে দিতে পারতাম! সেইসঙ্গে আকাশের মেঘের দিকে চেয়ে থাকি একদৃষ্টে আর ভাবি আহা! যদি এই মেঘ ভেসে ভেসে তোমার কাছে যায় আর একটিবার আমার কথা বলে? সেই মেঘের কাছে তুমিও যদি এক টুকরো বার্তা দিয়ে পাঠাতে ! 

বল না প্রিয়া, পারবে আমার এই চিঠির উত্তর দিতে? আচ্ছা, মেঘ কী আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছে? না কী এসব আমার মনের ভুল? 

মেঘ কেও সম্বোধন করে, করজোড়ে রোজ তার কাছে প্রার্থনা করে চলেছি। কুবেরপুরীর বাইরের উদ্যানে যে মহাদেব বাস করেন তিনিও কী শুনতে পান না আমার আর্তি ? তোমরা যাকে ঈশ্বর বল, তিনিই তো সৃষ্টি করেছেন প্রেম, বিরহ সবকিছু। তাকে একবার ডেকে বল প্রিয়া, আমার এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে। 


প্রিয়া, তুমি কী আমার মত বিরহবিধূরা নও? যেসব স্ত্রীলোকের স্বামীরা প্রবাসে থাকেন আসন্ন বর্ষায় তাদের সবার স্বামীরাও দীর্ঘদিন পর্যটনে ক্লান্ত হয়ে একসময় দেশে ফিরবেন নির্ধারিত দিনক্ষণে । শুধু আমি ছাড়া। কারণ আমি এখন রামগিরির নির্বাসিত অ-তিথি। তিথি না মেনেই এখানে এসে পড়েছি নিজের ভুলে। 


আমার মনে হয় এই মেঘ যেন পাকেচক্রে আমাদের একপ্রকার শাস্তি দিয়ে জব্দ করছে জানো ? এই মেঘের দল হাওয়ার আনুকূল্যে কোথায় যেন ভেসে ভেসে যাচ্ছে দল বেঁধে । তুমি শুনতে পাচ্ছো না প্রিয়া? বর্ষার আগমনে আকাশে ভেসে চলা সারেসারে চাতকের দলের মধুর সুরে গান অথবা দলে দলে আকাশের বুকে বকের সারি দেখতে পাচ্ছো? মেঘমিনারে ধাক্কা খাবেনা বলে কত সতর্ক ওরা।  ওদের গর্ভাধানের সময় যে আসন্ন। বর্ষার আগমনে কী আনন্দ ওদের চোখেমুখে! 

যক্ষের প্রিয়া বিরহে মরে যাবে, এ আশঙ্কা করিনা আমি। আমার মত মিলনের অদম্য আশায় ঠিক বেঁচে থাকবে সে। এ আমার বিশ্বাস। 

আমি কেমন কল্পনা করছি তোমার সঙ্গসুখ । তুমি যেন এই উত্তুঙ্গ রামগিরি পর্বতের সানুদেশ দিয়ে ধীরে ধীরে আমার কাছে আসছ। আলিঙ্গন করছ পাহাড় কে। পর্বতের কটিদেশে দাঁড়িয়ে আমি তোমায় প্রথম দেখতে পেলাম যেন। আর পাহাড় যেন তোমার স্পর্শে তার সব গাম্ভীর্য ছেড়ে বেরিয়ে এল অনেকদিন পর। তোমায় কাছে পেয়ে যেন উষ্ণ বাষ্প মোচন করে পাহাড় মধুর সম্ভাষণ জানাল। ঠিক যেমন দারুণ গ্রীষ্মে পাহাড়ের গায়ে যেদিন প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে উষ্ণ হয় তেমনি কিছুটা। আসবে প্রিয়া আমার কাছে? এই রামগিরি পর্বতে? তুমি কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই আসতে পারো। আসার পথে শ্রান্ত হলে পাহাড়ে পাহাড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারো। কত ছোটো , বড়, মাঝারি নদী পড়বে সেই যাত্রাপথে। সেখানে জল পান করে শীতল হতে পারো। 

এই দেখ প্রিয়া, আমি কেমন আজব বায়না করে বসছি তোমার কাছে। তার চাইতে বরং মেঘকেই তোমার কাছে পাঠাই আমি? আসলে আমার কল্পনায় তুমিই যেন মেঘ হয়ে বারেবারে ফিরছো আমার কাছে। মেঘের দিকে চোখ পড়লেই যে তোমায় মনে পড়ে যায়। আজ থেকে তাই তোমার নতুন নাম দিলাম আমি। মেঘবতী। 

এসো তবে মেঘবতী। মেঘের ভেলায় ভেসে এসো আমার কাছে। আমার ঘরে। আমার নিবিড় সান্নিধ্যে। 

আসার পথে পাহাড়ের দিকে তুমি যতই এগুবে , ততই লক্ষ্য করবে নবাগত বর্ষায় উর্বরা জমির হলাকর্ষণে মুগ্ধ সরল গ্রাম্যবধূদের চোখেমুখে উপচে পড়া খুশি । তারাও তোমায় সতৃষ্ণ নয়নে দেখবে আর অভিবাদন জানাবে। আম্রকূট পর্বতে তখন সুপক্ব আম্রফলের ভারে সব গাছ অবনত। পর্বতের বিশাল পাদদেশ ঐসময় পক্ব ফলের কারণে পাণ্ডুবর্ণ ধারণ করবে। এরপর বিন্ধ্য পর্বত পেরুতে হবে তোমায়। রেবা নদীর রব শুনতে পাবে তুমি। সেই নদীর মিষ্টি জল পান করতে ভুলোনা। অরণ্যে মৃত্তিকার অতিমধুর সুগন্ধ পেলে জানবে তা নিশ্চয়ই বর্ষার ফুল কদমের। বায়ু তোমায় পরাভূত করতে পারবে না। দূরত্ব তোমায় পরাস্ত করতে পারবে না। 


তবে আর দেরী কেন কর মেঘবতী? আমার কাছে একটিবার হাজির হও মেঘের সাম্পানে চড়ে। 

সজল নয়ন ময়ূরের কেকারব শুনতে শুনতে। 

সুশান্ত সারঙ্গের পাল তোমার দিকে ধাবিত হবে। তবে ওরা বড় নিরীহ। সলজ্জে চেয়ে থাকবে কেবলই। এরা সকলেই তোমার মত সুন্দরীর সন্দর্শনের আনন্দে আত্মহারা হবে। তবে এত আদর যত্ন পেলে আবার যাত্রাপথে যতিচিহ্ন এঁকো না যেন। 


জানো মেঘবতী? বিদিশা রাজনগরী তে পা দিলেই তোমার মনে হবে যেন প্রেম নগরীতে এসেছো। সেখানে সব বেতসলতার মত সুন্দরী বারাঙ্গনারা থাকে। তবে তাদের চকিত, চপল চাহনির দিকে তাকিয়ে বিলম্বিত নাহয় যেন যাত্রা। এই দেখ, বারাঙ্গনাদের কথা বললাম বলে আমায় যেন আবার ভুল বুঝোনা। তবে তোমার সঙ্গে আমার সেই ভুল বোঝাবুঝিগুলোর পুঙ্খ, অনুপুঙ্খ রাগ-অনুরাগ অধ্যায় গুলো আমি জীবনেও ভুলি না। কেমন সুন্দর লাগত তোমার সেই অভিমানী মুখশ্রী! নিজেকে বড় ভাগ্যবান মনে হত তখন। 

তা যা বলছিলাম, বিদিশায় প্রবেশকালে তরঙ্গায়িত বেত্রবতী নদীর জলে বিশ্রাম নিতে ভুলোনা। কী সুস্বাদু সে নদীর জল! নদীও তোমার স্পর্শে রোমাঞ্চিত হবে দেখো। ঠিক যেমন আমি হতাম তোমায় পেয়ে শিহরিত। আমি যে এখনও স্বপ্নে, জাগরণে তোমার সেই স্পর্শ সুখে কাতর হই মেঘবতী! 


এরপর তুমি অবন্তী প্রদেশে প্রবেশ করে রাজধানী বিশালায় হাজির হবে যার অপর নাম উজ্জয়িনী। বড়ই শ্রীবৃদ্ধিশালিনী নগরী। সেখানে পা দিলেই মনে হয় যেন স্বর্গে এসেছি। সেখানে ঊষাকালে শিপ্রা নদীর তীরে সারসদের সম্মিলিত সুতীক্ষ্ণ কূজন আর সরোবরে প্রস্ফুটিত থিক থিকে পদ্মের সৌরভ সুবাসিত করবে তোমার যাত্রাপথ। এক আদি অকৃত্রিম মন্দিরময়তা আচ্ছন্ন করে রাখবে তোমায়। তুমি ধন্য হবে চন্ডীশ্বর, মহাকাল মন্দির দর্শনে। 

সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় অবধি থেকো মন্দিরে। মহাকালেশ্বর মন্দির চত্বরে সন্ধ্যায় মহাদেব উদ্দাম নৃত্য পরিবেশন করে থাকেন। বর্ষার মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জনে সেই নৃত্যশৈলী কে আরও আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে পারো তুমি তোমার নূপুরের ঝঙ্কারে । অন্ধকার রাতে উজ্জয়িনীর পথে তুমি দেখতে পাবে অভিসারিকাদের। যাদের নীল নিচোল দেহবাস মিশে যায় অন্ধকারের মধ্যে। প্রণয়ীর সান্নিধ্য উপভোগ করবে বলে তারা সব ফেলে ছুটে চলে। 

বিশ্বাস কর প্রিয়া, আমার জন্য কেউ দাঁড়ায় নি কোনোদিন। তুমি আসার পরে আমার জীবন ছন্দে ফিরেছিল। তুমিই সেই নীলাম্বরী অভিসারিকা যার জন্য আমি এত কষ্টে আছি আজ। মেঘবতী, তুমিই আমার সেই বিদ্যুৎলতা প্রেয়সী। আকাশের গায়ে মেঘের মধ্যে দিয়ে যে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলে যায় বিদ্যুতের তরঙ্গের মত । আমি তো ন্য নারীতে আসক্ত হই নি। তোমায় পাবার পরে অন্য পুরুষেরা আমার প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিল। তাই বুঝি নজর লেগে গেল আমাদের দাম্পত্যে।  


এই দেখ, আবার আমি কেমন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। 

অন্ধকার রাতে যে বাসগৃহের ছাদে পারাবতেরা সুখে সুপ্ত আছে সেখানে গিয়ে একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে পারো। 

আবার ভোরবেলায় একটা নতুন দিনের সূচনালগ্নে তুমি পথ চলতে থাকবে। গম্ভীরা নদীর জলে তোমার স্নিগ্ধ ছায়া পড়বে। তা দেখে নদীও সচকিত হবে। 

তখন তুমি চলেছ দেবগিরি অভিমুখে। নববর্ষার বারিধারা বর্ষণে প্রকৃতি যেন তন্ময় তখন। উচ্ছ্বসিত বসুধা যেন সুগন্ধি ফুলের সুবাস ছড়িয়ে শীতল বাতাস ব্যজন করবে তোমায়। 

জানো মেঘবতী? এই দেবগিরি পর্বতে কার্তিকেয়র বাস। তুমি আর্দ্র পুষ্পধারায় সম্পৃক্ত করবে দেব সেনাপতি কে। এরপর পর্বতে প্রতিধ্বনিত হবে মেঘমালার সম্মিলিত গুরুগম্ভীর গর্জন। কার্তিকেয়র বাহন ময়ূর সেই শব্দে কেকারব তুলে দাপুটে নৃত্যকলায় তোমায় ভুলিয়ে রাখবে। 

এইভাবেই পথ চলতে চলতে একসময় তুমি হাজির হবে ব্রহ্মাবর্ত জনপদ ক্ষত্রিয়দের স্বনামধন্য সেই কুরুক্ষেত্রে। যেখানে মহামান্য রাজন্যবর্গ একদা শত শত শাণিত শর বর্ষণ করেছিলেন। মেঘবতী তুমি ধন্য হবে সেই স্থান পরিদর্শন করে। পুণ্যসলিলা সরস্বতীর জল পান করবে। অন্তরে বাইরে শুদ্ধ হবে। এই করতে করতেই কনখল এসে পড়বে। দেখবে সেখানে হিমালয় পর্বত থেকে স্বয়ং অবতীর্ণ গঙ্গা। মেঘবতী, তুমি জানো? এই গঙ্গা আবার ছিলেন মা গৌরীর সপত্নী? শিবের প্রতি তাই গৌরী রুষ্ট ছিলেন। তবে গৌরীর এই সপত্নীর কারণে ঈর্ষা তো অস্বাভাবিক কিছুই নয়। মেয়েদের মন তো এমনই হয়। আচ্ছা শোনো প্রিয়া, আমি যদি এমন করি? মানে তোমার জন্য ঘরে সপত্নী আনি? তুমি আমায় ক্ষমা করবে তো?

যাক। বাদ দাও সে কথা। আগে তো তোমার সঙ্গে দেখা হোক তারপর অন্য কারোর জন্য ভাববো নাহয়। 

তবে গঙ্গার উৎপত্তিস্থলে এসে তার রূপ লাবণ্য দেখে তুমি বিস্ময়ে হতবাক হবে, এ আমার স্থির বিশ্বাস। তখন নিজেই নিজেকে শুধিও। কেন শিবের মতিভ্রম হয়েছিল। গৌরীর মত সুরূপা, সর্বগুণান্বিতা সহধর্মিণী থাকতেও কেন তিনি গঙ্গার প্রতি দুর্বল হয়েছিলেন । 

কী আশ্চর্য! দেখ মেঘবতী! গৌরী, গঙ্গা উভয়েই হিমালয় তনয়া। আর সেই পিতা হিমালয়ের কোলেই চির, দেবদারু বৃক্ষের আশ্রয়েই তুমি তখন বিশ্রামরত। 

সেখানে জলদগম্ভীর মেঘের গগনভেদী তর্জনে, গর্জনে পশুপতি শিবের পুজো হবে সমারোহে। দেখবে কিন্নরীগণ তখন পর্বত কন্দর থেকে বাইরে এসে উদাত্ত কণ্ঠে ত্রিপুরবিজয় গাইতে শুরু করেছে। ত্রিপুর হল তিন অসুর ভ্রাতার নগর। শিব যা ধ্বংস করেছিলেন। 


এবার তুমি এসে দাঁড়ালে হিমালয়ের তটদেশে। কার্তিকেয়র সঙ্গে দ্বন্দে যেখানে পরশুরাম শরনিক্ষেপ করেছিলেন। বড়ই মনোরম এই স্থানের নাম ক্রৌঞ্চপর্বত। হিমশৈলের চূড়া হংসের সারি দেখতে পাবে সেখানে। আর তখনি বুঝবে তুমি কৈলাসে এসে গেছো। এই সেই কৈলাস। স্বয়ং মহাদেবের বাসস্থান। এখানেই আমার প্রভু কুবেরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছিলেন রাক্ষসরাজ রাবণ। রাবণের দুরভিসন্ধি ছিল কৈলাস পর্বত সমেত শিব কে লঙ্কায় তুলে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু অসমর্থ হন। হ্যাঁ, এখানেই শিব গৌরীর ভয় নিবারণের জন্য নিজের সর্প বলয় খুলে ফেলে গৌরীর হাত ধরেন। 

মেঘবতী, তুমি আদি অকৃত্রিম মানস সরোবরের দুগ্ধশুভ্র জল গ্রহণ করতে ভুলোনা। মহার্ঘ্য স্বর্ণকমল ফুটে থাকে সেখানে। দুষ্প্রাপ্য ব্রহ্মাণী হাঁসেদের আহার, নিদ্রা, মৈথুন যাপন সেই জলে। 


যাও মেঘবতী যাও। আর দেরী না করে ভূভারত পরিক্রমণান্তে আমার কাছে আবার প্রত্যাবর্তন কর। মেঘের কাছে আকুতি জানাই, আমার প্রিয়া কে বায়ুর সাহায্যে আকর্ষণ করে যেন অচিরেই আমার কাছে এনে দেয় । 

মেঘাবরণ মুক্ত হয়ে অনেকদিন পর আবারও নির্মল চন্দ্রকিরণে সিক্ত হবে ধরিত্রী। সিক্ত, স্নাত হব আমরা দু'জন। চাঁদের আলোয় বানভাসি সেই নিশীথে আমরা আবারও আগের মত মিলিত হবে মেঘবতী। চন্দ্ররশ্মির রজতশুভ্র তন্তুজাল ভেদ করে আবারও তোমার ওষ্ঠে ওষ্ঠ রাখব কবে মেঘবতী? আবারও আমাদের মিলনে কিন্নরগণ উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার প্রভু কুবেরের জন্য মধুর কণ্ঠে যশোগান করবে তখন। আমার জন্য ব্যস্ততায় নৈশ অভিসারের পথে তোমার করবী থেকে খসে পড়বে মন্দার পুষ্পগুচ্ছ। শেষ বর্ষার বিন্দু বিন্দু জলকণা তোমার স্তনের ওপর যেন বহুমূল্য রত্নহার হয়ে এলিয়ে পড়ে শোভা পাবে। সূর্যোদয়ের প্রথম আলোকরশ্মির ছটায় সেই হার তোমায় আরও সুন্দর, আরও মোহময় করে তুলবে। 


মনে পড়ে প্রিয়া মেঘবতী? সেই আমার প্রভু ধনপতি কুবেরের প্রাসাদের উত্তরে ইন্দ্রধনু তুল্য চারু তোরণ বিশিষ্ট তোমার আমার স্বপ্নের সেই আগার? আমাদের ভালোবাসা, মন্দবাসার সংসার। 

যার পাশেই ছিল সেই থোকা থোকা পুষ্পগুচ্ছে আবৃত মন্দার বৃক্ষটি? সেখানে একরত্তি সেই পান্না পাথরের মত টলটলে সবুজ পুষ্করিণী? যার ঘাটের সিঁড়ি মরকত শিলায় সযত্নে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন আমার প্রভু। তুমি আমি সেই ঘাটে বসে আবারও কত গল্পগাছা করব। আচ্ছা হাঁসগুলো এখনও তেমনি বিচরণ করে সেই পুষ্করিণীর জলে? সেখানে এখনও সেই রক্তবর্ণ অশোকগাছটা আছে? আর জোরে বাতাস বইলে মাধবীলতার পত্রপুষ্প এখনও তেমনি চঞ্চল, চপল হয়ে ওঠে? আর সেই ঝাঁটি ফুলের গাছটা? জানো প্রিয়া? প্রবাদ আছে, সুন্দরী রমণী সেই গাছে পা দিয়ে আঘাত করলে সে গাছ নাকি মঞ্জরিত হয়। 


আমার বিহনে আমাদের সেই আগার, বাগান, পুস্করিণী ক্ষীণপ্রভ হয়নি তো প্রিয়া? সে যাই হোক। আমার প্রিয়া আমার অদর্শনে তন্বী, শিখরা, শ্যামা... ঠিক যেমন আগে ছিল তেমনি আছে। এ আমার বিশ্বাস। আমার বিরহে মোটেও তুমি শ্রীহীনা অন্যরূপা হয়ে যাও নি। আচ্ছা প্রিয়া, তুমি কী আগের মতোই স্বল্পভাষী আছো? আমার জন্য এতদিন তোমার উৎকণ্ঠা ছিল? তা আমি বুঝব কেমন করে? না কী প্রবল রোদন হেতু তোমার স্ফীতনেত্র অথবা নিঃশ্বাসের উষ্ণতা হেতু আজ তোমার ওষ্ঠদ্বয় বিবর্ণ ? 

এই চিঠি শেষ করার আগে আরও কয়েকটা কথা জিগেস করি তোমায়। আমাদের এই বিচ্ছেদকালের শুরুর মুহূর্ত থেকে শেষ অবধি বিস্তৃত দিনগুলোয় তুমি তোমার দেহলীতে প্রতিদিন একটি করে পুষ্প ভূতলে রাখতে? আমাদের বিচ্ছেদকালের হিসাব রাখতে ? আমি কিন্তু গিয়ে মাত্রই প্রতিদিন চৌকাঠে তোমার রাখা সেই শুষ্ক পুষ্প গুণতে বসব। 

আর তারপরই চন্দ্রকিরণ সংপৃক্ত গবাক্ষপথে তোমায় আলিঙ্গন করব সেই রাতে। তোমায় নতুন করে পাবো ভেবেই শিহরিত আমি। তুমিও আশাকরি রোমকূপে এমনই শিহরণের আভস ইঙ্গিত পাচ্ছো? 

আর যেন কেউ আমাদের পৃথক না করতে পারে প্রিয়া। আর কোনোদিন আমি প্রভু কুবেরের কর্তব্যে অবহেলা করব না। কথা দিলাম। ভালো থেকো মেঘবতী প্রিয়া আমার। 


ইতি 

অফুরান ভালোবাসায় 

মিলনোন্মুখ তোমার দয়িত যক্ষ  


(মহাকবি কালিদাসের "মেঘদূত" অবলম্বনে নিজ পত্নী কে লেখা যক্ষের কাল্পনিক  আষাঢ়ী চিঠি ) 


১৫ জুন, ২০২৩

লৌকিক দেবী পেরিয়াচি আম্মান

 







দক্ষিণ ভারতের এক অত্যন্ত জনপ্রিয় লৌকিক দেবী পেরিয়াচি কালী আম্মান। দেবী পার্বতী, মা কালীর আরেক উগ্ররূপী অবতার এই দেবী। যাকে ঘিরে এক লোকগল্প রয়েছে। সিঙ্গাপুরে এসে লিটল ইন্ডিয়ায় ঘুরতে ঘুরতে রাস্তার ধারে এই পেরিয়াচিআম্মান মন্দির দেখে টুক করে ঢুকে পড়ি। মারাত্মক এক গল্প এই দেবী কে ঘিরে। যিনি নিজের মাহাত্ম্যেই বলীয়ান। আদতে ছিলেন এক ধাত্রী। আর কিভাবে এই মিডওয়াইফ থেকে তাঁর দেবীতে উত্তরণ, সেই নিয়েই এই গল্প।

তামিল ডাকাতরাজা বল্লরাজনের রানী কারকুজালি।জ্যোতিষী গণনায় জানা গেল তাঁদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে রাজার সমূহ বিপদ। অমঙ্গলের আশঙ্কা রয়েছে তাই গর্ভস্থ সন্তানকে ভূমিস্পর্শ না করিয়েই প্রসব করাতে হবে। ডাক পড়ল পেরিয়াচি আম্মানের। তাই রাজা চাইলেন শিশুটিকে তো বটেই, এমনকি যে নবজাতককে স্পর্শ করেছে, তাকেও হত্যা করা উচিত! পেরিয়াচি উগ্র মূর্তি ধারণ করলেন। ত্রিশূল এবং তরবারির সাহায্যে একে একে বল্লভনের সব সেনাদের হত্যা করে অবশেষে মেরে ফেলেন রাজাকেও। রাণীর পেট চিরে বের করলেন গর্ভস্থ শিশুটি কে। এ যেন ঠিক আজকের যুগের সিজেরিয়ান সেকশন। শিশুর যাতে কোনো ক্ষতি নাহয় তাই ভেবেই হয়ত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এ সময়ে কারকুজালি তাঁকে বাধা দিতে এলে পেরিয়াচি তাঁকেও ছাড়লেন না। রাণীর মধ্যে লক্ষ্য করলেন সন্তানস্নেহের অভাব। তাই রাণীকেও হত্যা করলেন।

প্রসূতির গর্ভাবস্থা এবং জন্মের পরে মা ও সন্তানের সুরক্ষার জন্য উপাসনা করা হয় তাঁর। পাথরের উপরে উপবিষ্ট এই দেবী পদতলে দলিত করেন এক মন্দবুদ্ধি রাজাকে। তাঁর কোলের উপরে দেখা যায় রাণীর শব যার পেট চিরে নাড়িভুড়ি বের করে এনে দুই হাতে তা ধরে চেবান পেরিয়াচি। ষড়ভুজা দেবীর হাতে একটি নবজাত শিশু, ত্রিশূল, নাগপাশে বাঁধা ডমরু, পাশ, তরবারি এবং একটি রক্তপূর্ণ পাত্র থাকে।

একদিকে সিজারিয়ান সেকশন, অন্যদিকে আমাদের ষষ্ঠীদেবীর মত gurdian spirit বা শিশু রক্ষয়িত্রী দেবী এই পেরিয়াচি। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন মনে করায় অত্যাচারী রাজা হিরণ্যকশিপু আর তাঁর পুত্র প্রহ্লাদের গল্প। সেখানে বিষ্ণুর নরসিংহ অবতার হিরণ্যকশিপুর বুক চিরেছিলেন। প্রহ্লাদ বেঁচে গেছিল। আমাদের শিশুজন্মের পরে যেমন ষষ্ঠীপুজো হয় তেমনি দক্ষিণ ভারতে হয় পেরিয়াচির পুজো।

ইতিহাস বলছে আজ থেকে ৬০০ বছর আগে (1400 AD) সত্যিই ছিলেন পেরিয়াচি নামের এক বয়স্ক মহিলা। প্রসূতির সুখপ্রসব করানোর কারণে যার খুব নামডাক ছিল। তামিলভাষায় যাকে বলে Maruthuvachi (doctor)। অধুনা চেন্নাইয়ের Thondai Nadu অঞ্চলের Kondithoppu গ্রামের এই ধাত্রী রীতিমত অস্ত্রশস্ত্র চালনায় পারদর্শী ছিলেন।১৪০৬ সালে রাজা বল্লভরাজন আর তাঁর স্ত্রী কারকাজুলি নামেও ছিলেন সেখানকার এক অত্যাচারী রাজা। বাকীটুকু মিথ না মিথ্যে তা যাচাই করার স্পর্ধা বা দুঃসাহস কোনটাই নেই আমার তবে গতকাল রাতে ন'টার পরেও ব্যস্তসমস্ত, আধুনিক সিঙ্গাপুরের পেরিয়াচি কালী আম্মান মন্দিরে ভীড় দেখে মালুম হল, যা রটে তা হয়তবা কিছু বটে।

৫ মে, ২০২৩

"হীরের আংটি আবার বেঁকা" / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 "হীরের আংটি আবার বেঁকা"

এ প্রবাদের জন্ম যেন সত্যিই  আমাদের প্রাচীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মাথাদের দ্বারা। ছেলেরা ভুল করতে পারেনা। তাদের সাত খুন মাপ। তারা রাত করে বাড়ি ফিরতে পারে। উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে পারে। তারা নিস্কম্মা, অলস হয়ে দিন যাপন করতে পারে। এখনও গ্রামে গঞ্জে এমনি তো দেখি। স্বামী দিনের পর দিন ঘরে বসে বসে খাচ্ছে আর বউটি  উদয়াস্ত খেটে দুটো পয়সা আনছে সংসারের জন্য।এমনকি সে মদ্যপান করে বউকে পেটাতেও পারে।  কারণ তার স্বামী হল পুরুষ মানুষ। সে বাড়ির কর্তা। তার কোনো দোষ থাকতে পারেনা। সে জন্মেই হীরের আংটির মত মহার্ঘ। তাই তা টেরাবাঁকা হোক কিম্বা ভাঙা। ধর্ষণেও তাদের পূর্ণ অধিকার। নারী পুরুষ একসঙ্গে কোনো দোষ করলে সমাজের চোখে মেয়েটিরই দোষ হয়। শ্লীলতাহানির  পরেও সমাজ মেয়েটিকে দোষারোপ করে তার খুল্লামখুল্লা সাজ পোষাকের জন্য। কারণ ছেলেদের দোষ থাকতে পারেনা। মেয়েদের কলঙ্কের ভয় আছে কিন্তু। বিয়ের বাজারে পাত্রের রূপ গুণ না থাকলেও সে সর্বগুণসম্পন্ন পাত্রী অপেক্ষা কম যায় না কারণ সে পুরুষ। সে হীরক খচিত সেটাই আসল কথা। মানে তার লিঙ্গই তার সামাজিক অবস্থান নির্দেশ করছে। 

এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ে আরো একটি প্রবাদের কথা। "ছেলের মুতে কড়ি, মেয়েদের গলায় দড়ি" 

তাই বুঝি সে যুগে সংসারে পুত্র সন্তানের কামনায় তার বাবা মা প্রাণ পাত করতেন। তাই বুঝি একের পর এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিতে দিতে বিধ্বস্ত বাবা মা মন্দিরে ছুটতেন কাকভোরে সশীষ ডাব নিয়ে কিম্বা দরগায় গিয়ে হত্যে দিতেন অথবা চিস্তিতে গিয়ে লাল সুতো বেঁধে আসতেন। ছেলে আসবে মায়ের কোল আলো করে। তার প্রস্রাবটিও ফেলার নয়। তার মধ্যে মহার্ঘ কড়ি আছে যে। সে জন্মালে বাড়িতে শাঁখ বাজবে। তার অন্নপ্রাশন হবে ঘটা করে। তার জন্য মা বছরের পর বছর ষষ্ঠী পালন করবে। তার মঙ্গলের আশায়। আর মেয়ে হলে? এসব কিছুর প্রয়োজন নেই। পারলে মুখে নুন পুরে হত্যা তো আর করা যায় না বরং তার জন্য সবকিছু অন্যরকম নিয়ম হোক। কন্যা সন্তানের  জন্য অত গদ্গদ হবার কিছু নেই। এই  বৈষম্যই তো তাকে সেই ছেলের থেকে আলাদা করে রাখবে। সে জন্মালে শাঁখ বাজবে না। তার জন্মদিনে পায়েসের বাটি, মাছের মুড়ো কিছুই আয়োজন হবে না। 

আজ মেয়েরা সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে আমরাও পারি। তাদের সময় হয়েছে পুরো আকাশের সবটাই ছেলেদের সঙ্গে ভাগ করে নেবার। বরং তাদের জন্যই এই প্রবাদের বদলের সময় এসেছে। কালো মেয়ের রঙের জন্য শুনতে হয় কত কিছু। কালো মেয়ের বিয়ে নিয়েও ভাবতে হয় বিস্তর। সেই কালো মেয়ে যখন রাষ্ট্রের মধ্যমণি কিম্বা মহাকাশের পথে পাড়ি দেয় অথবা মারণ রোগের ওষুধ আবিষ্কার করে ছেলেদের সঙ্গে পঙক্তিভোজে সেরা বিজ্ঞানীর আসনে বসে আর তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হয়ে বিদেশ দাপিয়ে বেড়ায় তখন বলতেই হয় কয়লার কালোতেই কিন্তু হীরে লুকিয়ে থাকে। 

"হলুদ জব্দ শিলে, বউ জব্দ কিলে, পাড়াপড়শী জব্দ হয় চোখে আঙুল দিলে" / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 "হলুদ জব্দ শিলে, বউ জব্দ কিলে, পাড়াপড়শী জব্দ হয় চোখে আঙুল দিলে"

এই প্রবাদ নারীর অগ্রগতির যুগে অচল। সেকালে মেয়েদের অল্প বয়সে কিছু বোঝার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত। আর শ্বশুরবাড়ি অবলা বধূটিকে চাপে রাখবে। তার ওপর সর্বপ্রকার শুল্ক আরোপ করবে। তা সে মাথার ঘোমটা থেকে ছাদে গিয়ে চুল শুকোনো কিম্বা উঁচু করে কাপড় পরা যাতে না পায়ের গোছ দেখা যায় থেকে মৃদুস্বরে কথা বলা এমন কি তর্কে লিপ্ত হওয়া কিম্বা পরপুরুষের সামনে বের হওয়া... সবেতেই যেন সেই নিরীহ বধূটির ওপর ফতোয়া জারি থাকত। সে এগোলেও মুশকিল আবার পিছোলেও দোষ। কথা না শুনলে কিল, ঘুষি, চড় চাপড় এমন কী আরো নানাবিধ শারীরিক অত্যাচারেও পিছপা হতনা তার পরম আকাঙ্ক্ষিত শ্বশুরবাড়ির লোকজন। প্রতিদিন রান্নাঘরের শিলে হলুদ বাটার মতোই বেচারী বউয়ের অবস্থা। এখন সে দিন বদলে এসেছে মেয়েদের সুদিন। বানভাসি স্বাধীনতায় বাঁচে তারা। 

এবার প্রবাদের পরের ভাগটি অর্থাৎ পাড়াপড়শীর কথা কিন্তু এখনকার যুগেও বেশ প্রাসঙ্গিক। এই ধরুন কেউ প্রতিদিন ওপরের বারান্দা থেকে রাস্তায় টুক করে জঞ্জাল ফেলেন। কেউ আবার বারান্দা ঝেটিয়ে জল আপনার গায়ে ফেলেন, কেউ আবার ভেজা শাড়ি লম্বা করে বারান্দা থেকে ঝুলিয়ে মেলেন আবার কেউ কুকুরকে আদর করে  বেড়াতে নিয়ে গিয়ে আপনার সদরের সামনেই মলত্যাগ করান নির্বিবাদে। তাই বলে আপনার তো আর  মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলে চলবে না। তাই ধৈর্যের বাঁধ যখন ভেঙে যায় তখন এসে উপস্থিত হয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। নিরূপায় আপনি তখন ওনার সদরে গিয়ে কলিংবেল বাজিয়েই ফেলেন বিস্তারিত জানিয়ে। আপনার অবস্থা তখন "আপনি বাঁচলে বাপের নাম" । এসব মুখ বুজে সহ্য করাও উচিত নয়। বরং  চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেই বাঁচে প্রতিবেশী আর আপনি। সুস্থতায়  বাঁচে পরিবেশ । পড়শী বুদ্ধিমান হলে আপনার বন্ধু না হলেও মনে মনে কিন্তু অনুতপ্ত হয়ে শুধরে যান। 


৩০ মার্চ, ২০২৩

শান্তা

হে পিতা দশরথ! 

আজ আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রামচন্দ্রের জন্মদিনে এই চিঠি। জানো পিতা? রামের দিদি শান্তা আজো  বিস্মৃত । রামায়ণ পাঠকের প্রিয় কথাকার বাল্মিকী  আমার কথা খুব সামান্য লিখেছেন । রাজশেখর বসুর রামায়ণে শান্তা অনুপস্থিত । অথচ শান্তা তার প্রিয় ভাই রামের দিদি। রামায়ণ পাঠকদের প্রিয় কবি কৃত্তিবাস সাফাই গাইলেন। নাকি লোমপাদ আর তাঁর স্ত্রী বর্ষিণী মানে আমার মা কৌশল্যার বোন নাকি আমাকে দত্তক নিয়েছিলেন। কিন্তু কেন পিতা? আমি কন্যা বলে? 

দেখো পিতা দশরথ, আমি তোমার ঔরসজাতা । কৌশল্যা আমার মাতা। কিন্তু তুমি  আর আমাকে মনে রাখলে কই? আমিই তো সেই ইক্ষাকু রাজপরিবারের প্রথম সন্তান, রাজতনয়া শান্তা। আমি যে মেয়ে তাই আমাকে বিলিয়ে দেওয়া যায়। কী বল? কারণ তোমার বংশের ধারক হবে তোমার পুত্র। কী ঠিক বলছি তো  আমি? আমার জন্মের পরে তাই অযোধ্যায় কোনো সাজো সাজো রব নেই। নেই কোনো আনন্দোৎসব, শঙ্খধ্বনি। সিংহাসনের দাবীদার তো মেয়ে হতে পারেনা। এমনি চলে আসছে। তাই আমি আসায় সন্তুষ্ট হলে না তুমি। তবুও আমি ভূমিষ্ঠ হলাম। রাজা-রাণীর মধুর দাম্পত্যের প্রথম প্রেমের ফসল এক সামান্য মেয়ের মূল্যায়ণ হলনা রাজবাড়িতে, নিজের পরিবারে। আমার পরিচয়, জন্মসূত্র যেন কিছুটা গোপন রইল। পায়েসের বাটি, চূড়াকরণ, অন্নপ্রাশন, আদিখ্যেতা সব শিকেয় তোলা রইল তোমাদের আগামী  উত্তরাধিকারের জন্য। তবুও জন্মপরিচয়ে দশরথ আমার বাবা, কৌশল্যা আমার মা।   

অথচ আমি হলাম গিয়ে বুদ্ধিমতী, বিদুষী, সুন্দরী শান্তা। ব্রাত্য, উপেক্ষিতা  রাজ পরিবারে। কারণ তোমার চাই পুত্র সন্তান। সিংহাসন রক্ষা করবে সে পুত্র। রাজ পরিবারে মন্ত্রী সান্ত্রী, দাস দাসী সবাই বুঝেছিল এই শান্তাকে। কতটা সর্বগুণসম্পন্না হতে পারে এই মেয়ে জানতেন তাঁরা। কিন্তু আমি যতই বিকশিত হতে থাকলাম ততই যেন অবসাদগ্রস্ত হতে থাকলে তুমি। মা কৌশল্যার কিছুটা স্নেহ পেলেও তুমি মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিলে আমার থেকে। মা এবং মায়ের বাকী তিন সপত্নী কেউই ছেলে দিতে পারছে না তোমায়। সেই চিন্তায় তোমার রাতের ঘুম গেল। তারপর? সবাই জানে সে ঘটনা। কোথা থেকে যেন খবর পেলে তুমি।

পিতা, সেদিন আমি ভগ্ন হৃদয়। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনি। তোমার পরম বন্ধু লোমপাদের কাছে দান করে  দিয়েছিলে আমায়। সবার মুখে সেদিন কুলুপ। 

 বোধহয় লোমপাদই জানালেন তোমায়। ছেলে হবার কৌশল। ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির খবর । তিনি করবেন পুত্রেষ্টি যজ্ঞ। তা করলে আমার চার মায়েদের নাকি কোল আলো করে পুত্র সন্তান আসবে। কিন্তু তারপর? সেই মুনির নাকি যজ্ঞের আগে প্রয়োজন নারী সঙ্গের। সেখানে আমাকে দিব্য কাজে লাগালে তুমি আর আমার পালক পিতা লোমপাদ । বালিকা বয়সেই মুনির সঙ্গে বিয়ে দিলে তোমরা । মুনির সঙ্গে আমার সহবাস হল। তৃপ্ত হলেন মুনি। তোমার কন্যা শান্তার স্বামী ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিই সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে সপরিবারে শান্তাকে সঙ্গে নিয়ে অযোধ্যায় এসে প্রথমে অশ্বমেধ যজ্ঞ, তার পরে পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করেন। যে যজ্ঞের প্রসাদ খেয়ে শান্তার ভাইদের জন্ম হল শান্তার পয়েই। 

 একটা নয়, চার চারটে ছেলে পেলে তুমি। রাজপ্রাসাদের জীবন চিরকালের মত ছেড়ে শান্তার শুরু হল আশ্রমিক জীবন। আমি হলাম গিয়ে মুনিপত্নী। আর পুত্রলাভের আনন্দে তখন বানভাসি অযোধ্যা। আমাকে কেউ আর মনে রাখেনি। রাজ পরিবারের চাহিদা মেটাতে আমি এসেছিলাম আবার হারিয়েও গেলাম অনাদরে, অবহেলায়। 

হ্যাঁ, পিতা, আমি তো দন্ডকারণ্যে ওদের বনবাসে গিয়ে তোমার পুত্র এবং পুত্রবধুর খোঁজখবর নিতে দেখা করে এসেছিলাম। আমার সুলক্ষ্মণা, সাধ্বী, সুন্দরী ভ্রাতৃবধূ সীতার সঙ্গে সভ্য ননদিনী সুলভ আচরণও  করে এসেছিলাম।আমিই তো ওদের অনসূয়া আর অত্রিমুনির আশ্রমে নিয়ে গেছিলাম।  

আজ খুব মনে পড়ছে ভাইকে। ভায়ের জন্মদিনের সেই শ্লোক? বারাণসীর দশাশ্বমেধ ঘাটে বসে সেই যে রামায়ণী পাঠকদের তুলসীদাস লিখলেন? ভাইয়ের গুণগান করে। অথচ দেখ তিনিও আমায় ভুলে গেলেন। 

"নৌমী তিথি মধুমাস পুনীতা 

সুকল পচ্ছ অভিজিত হরিপ্রীতা 

মধ্য দিবস অতি সীত ন ঘামা 

পাবন কাল লোকবিস্রামা।।" 

চৈত্র মাস মধুমাস। তার শুক্লা নবমী তিথি। ঈশ্বরের প্রিয় অভিজিত মুহূর্তে দুপুরবেলায় নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায়,  মানুষের   আনন্দদায়ক এক পবিত্র সময়ে জন্মেছিল আমার ভাই, রামচন্দ্র। 

কোশল দেশের শোভা, তোমাদের পুত্র রামচন্দ্র। কী অপূর্ব রূপবান সে! সর্বাঙ্গে সুলক্ষণ চিহ্নিত। পেটে ত্রিবলী রেখা, গভীর নাভি, প্রশস্ত স্কন্ধ, উন্তত ললাট, আজানুলম্বিত দুই বাহু, শাঁখের মত গ্রীবা, নীল পদ্মের মত চোখ, কুঞ্চিত কেশরাজি আর? কত কত বলব আর ?  চাঁদের কিরণের মত ভায়ের দন্তরুচিকৌমুদী ছড়িয়ে পড়ে চারিদকে। ভায়ের নখ, আঙুল, চিবুক, পক্ক বিম্বের ন্যায় ওষ্ঠ দেখে রাজ জ্যোতিষী বলেছেন বীরের সমস্ত লক্ষণ ভায়ের দেহে।

মিটেছে তো পিতা ? তোমার মনে সেই পুত্রের হাহাকার চিরকালের মত মিটেছে আশাকরি। বশিষ্ঠদেব  ঠিকই আদেশ দিয়েছিলেন কী বল? পুত্রেষ্টি যজ্ঞ না করলে কী আর তোমার জ্যেষ্ঠ পুত্র রামচন্দ্রের জন্ম হত?  


ইতি 

তোমার পয়মন্তী  শান্তা    


২৬ মার্চ, ২০২৩

গঙ্গোপাধ্যায়দের কিংবদন্তীর হেঁশেলে / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

ছবি সূত্রঃ ইরাবতী ডট কম 

গঙ্গোপাধ্যায়দের কিংবদন্তীর হেঁশেলে

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বাজার সফর’ বইতে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সেই কবে যেন লিখেছিলেন, ‘ঘুম থেকে উঠে অনেকে ঈশ্বরের কথা ভাবেন, কেউ বা তক্ষুণি করার মতো কাজ, আগের থেকে ঠিক করে রাখেন৷ আমি তো ভাবি আজ কী খাব? তার মানে আজ কী বাজার করব? কেমনভাবে করব? এই মন দিয়ে বাজারে গেলে দাউ দাউ আগুন বাজারকেও মনে হবে শীতলা এবং রহস্যময়৷’

এমন রসরচনায় নাল ঝরে আজও আমার। ঠিক যেভাবে লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, তার মধ্যে দিয়ে বাঙালির বাসনার সেরা বাসাটা এখনও আমাদের অন্তরে, যাপনে আর জিভের ডগায় সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমি বলে না। সব বাঙালীরই এই রসনা সংস্কৃতি বুঝি উথলে ওঠে সেই আদিম কাল থেকেই। আসলে রোজ ভোরে উঠে আমাদের সবার এই রকম একটা মন তৈরি করার দরকার।

তাঁর লেখাতেই রয়েছে...

"ভাত ডাল, ভাজা এবং কাটা পোনা এই চেনা ছকের খাবার থেকে বাঙালি কবে বেরোবে?’ আমি নিজে অবশ্য এই ছকের বাইরের নানান খাওয়া খেতে বরাবরই পছন্দ করি৷ হয়ত একটা পদই খেলাম, মানে ধরুন কেবল মাত্র বাটি চচ্চরিই খেলাম, তার পরের দিন হয়তো আমি খেলাম লাল শাক এবং বড়ি, আবার তার পরের দিন হয়ত আমি খেলাম আড় মাছের কালিয়া, তার পরের দিন হয়তো খেলাম লইট্যা মাছের ঝুড়ো, আর তারও পরের দিন খেলাম ধোকার ডালনা যেটা আবার ছোলা সেদ্ধতে পরিকীর্ণ৷ এই রকমভাবে আমার মনে হয় যে যদি একটা নিশ্চিদ্র এবং নিখুঁত পরিকল্পনা করা যায় যে অমুক দিন এক পদই খাব এবং এই দিয়ে খাব তাহলে সেই এক পদী আহারই হয়ে উঠবে প্রায় যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সমান৷"


সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভোজন রসিকতা সাহিত্যমহলে সর্বজনবিদিত। আদ্যোপান্ত ফুডি এই সাহিত্যিকের হেঁশেল ঘরের সেই পরম্পরা আজো বহন করে চলেছেন তাঁর সুযোগ্যা কনিষ্ঠা কন্যা ডক্টর ললিতা চট্টোপাধ্যায়। ডাক্তারির ব্যাস্ত কর্মজীবন সামলিয়ে তিনিও তাঁদের গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের ঘরানায় মাংস রাঁধেন এখনো। ললিতার রান্নাবান্নার শখ তাঁর মা ইতি গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। বড় মেয়ে মল্লিকা অত রাঁধিয়ে নন তবে ইতিদির বেশির ভাগ জবাবের খুঁটিনাটিগুলো মলিদিই দিলেন। এবং তার থেকে প্রমাণিত হল তিনিও বেশ রান্নাবান্না জানেন এখনো। আর আড্ডা দিতে গিয়ে মনে হল পুরো গঙ্গোপাধ্যায় পরিবার একসময় তাঁদের এই কিংবদন্তীর হেঁশেল টিকে পরিপূর্ণতায় ভরিয়ে রাখতেন পঞ্চব্যঞ্জনের সুঘ্রাণে।

এই রান্নাবাটি নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে চুলোচুলি হত খাদ্যরসিক শ্যামলবাবুর। হঠাত অসময়ে, নিদারুণ গরমে পাঁচ, 'রকম মাছ এনে হাজির করে উনি বলতেন সেগুলি এখুনি রান্না করে দিতে। আর অচেনা, অজানা সব মাছ কি দিয়ে, কেমন করে রাঁধতে হবে তা ও তিনি জেনে আসতেন বাজারের লোকজনের কাছ থেকে। ইতি দি বিরক্ত হয়ে বাপের বাড়ি যাবার ধান্দা করতেন। বলতেন, বরং কাল কাজের লোকেরা এসে কেটেকুটে, ধুয়ে বেছে দিক। আমি রান্না করে দেব। কিন্তু শ্যামলবাবুর যে সেদিনই খেতে হবে সেই টাটকা মাছ।

সেই মতস্যসূত্র ধরেই আবার দু'জনের ভাব‌ও হয়ে যেত কিছু পরেই। রান্নার সুঘ্রাণে ভরে উঠত তাদের হেঁশেল। আড়ি আড়ি ভাব ভাব। আর সেটা খাওয়াদাওয়া নিয়েই। তারমানেই বুঝে দেখুন কেমন খাদ্যচর্চার রমরমা ছিল তাঁদের হেঁশেলে। আর জন্মসূত্রে যিনি বাংলাদেশের খুলনার আর কর্মসূত্রে বরিশালের বানোরী পাড়ার তাঁর তো এমন হতেই পারে।


মলি দি বললেন, বাবাদের পূর্ববঙ্গের রান্নায় একফোঁটা মিষ্টি পড়ত না। আর মা নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের মেয়ে। মা রান্নায় একটু করে চিনি দিতেন। ব্যাস! বাবার সেটাই মনে ধরে গেল। মায়ের হাতের রান্না খেতে বাবা সবচেয়ে পছন্দ করতেন। বাবার সব রান্নায় চাই নুন-মিষ্টির পারফেক্ট ব্যালেন্স।

হোটেলের রান্না বাড়িতে এনে বাবা মা'কে বলতেন, খেয়ে বল, কি করে রেঁধেছে এরা? মশলাপাতি কী দিয়েছে?আমাকে ঠিক এমনি করে বানিয়ে দাও।

বললাম, ইতি দির হাতের কোন্‌ পদটি এ বাড়ির অথেন্টিক ডেলিকেসির পর্যায়ে পড়ে? মলি দি লালায়িত হয়ে বললেন, কচ্ছপের মাংস। মা যে কী ভাল রাঁধতেন! গোল গোল আলু, মূলো, কচ্ছপের ডিম আর মাংস একসঙ্গে প্রেসার কুকারে দিয়ে কষতেন মা। আর রাঁধতে রাঁধতে আমাদের চাখা আর সেই মাংস টেবিলে সার্ভড হবার আগেই ফুরিয়ে যেত। আরেকটা নিরামিষ রান্না বাবার বড্ড প্রিয় ছিল কচি লাউশাকের ডগা দিয়ে সাদা ঝোল। বললাম সেটা কেমন?

তেলের মধ্যে পাঁচফোড়ন আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে আলু একটু ভেজে নিতে হয়। তারপর লাউডগা দিয়ে নুন দিয়ে সেদ্ধ হয়ে এলে দুধ, ময়দা আর পোস্তবাটা দিয়ে নামাতে হয়। আর সামান্য চিনি। আর বাবা খেতেন গন্ধরাজ লেবু দিয়ে মূসুর ডাল। স্যুপের মত চুমুক দিতেন ডালে। মা রান্না করতে ভালবাসতেন আর বাবা তাড় কদরও করতেন। আর তাই বুঝি রান্নাটা মায়ের নেশা হয়ে উঠেছিল। বাবাদের মামাবাড়ি ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে। সেখানে রান্নায় মিক্সড কালচার। ওদের হিট রেসিপি হল শোল-মূলো। ওরা ব্রেকফাস্টেও মাংসভাত খেতেন শুনেছি।

এছাড়াও মায়ের হাতে পিঠেপুলি, পাটিসাপটা, রাঙ্গা আলুর পান্তুয়া, রসপুলি দারুণ লাগত আমাদের। মা ছাঁচে ফেলে অপূর্ব ক্ষীরের সন্দেশ করতেন।

বললাম আর আপনাদের বাড়ির রোজকার রান্না ? মানে শ্যামলবাবু যখন সাহিত্যজগতে বেশ উদীয়মান, আনন্দবাজার পত্রিকার দফতর যাঁর কর্মজগত অথবা যুগান্তর-অমৃতবাজারে যখন চাকুরীরত সেই সময়টায়?

ইতি দি জানালেন, ওল-চিংড়ি কিম্বা মোচা-চিংড়ি, কাঁচা ইলিশের ভাপা, মৌরলা, কাচকি কিম্বা আমুদি মাছের চচ্চড়ি, তেল কৈ, কচুর লতি, কচুর শাক, কালোজিরে কাঁচালঙ্কা আর বেগুন দিয়ে ইলিশের পাতলা ঝোল কিম্বা মাছের মাথা দিয়ে ডাল যেমন হয় সব বাড়িতে। বললাম ইলিশের ভাপার রেসিপিতে বিশেষ কিছু দিতেন ? বললেন, নাহ্! কাঁচা মাছ নুন, সর্ষে কাঁচালঙ্কা বাটা দিয়ে ম্যারিনেট করে সামান্য নারকোল বাটা দিতাম। এবার সর্ষের তেল আর চেরা কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে বন্ধ কৌটোয় পুরে মিনিট পাঁচেক। ব্যাস!

আর মেয়েদের হাতের রান্না ? মলিদি বললেন, এ ব্যাপারে মা'কেই বাবা হায়েষ্ট নম্বর দিতেন। আর আমরা দুই বোনে রাঁধলে খুঁতগুলো ধরিয়ে দিতেন পরিষ্কার ভাবে। কোনো রাখঢাক নেই সে ব্যাপারে। বাবা মাটন পছন্দ করতেন একটু শক্ত, তবে ছিবড়ে না। প্রেসারে গলিয়ে ফেললে চলবেনা। মাটন কারিতে মা সামান্য আদা, পিঁয়াজ, জিরে, গোলমরিচ বাটা দিতেন। মাংস রিচ হবে না গুচ্ছের পিঁয়াজ, আদা, রসুন পড়বে না।

বললাম ইতি দির হাতের মাটন কারির স্ট্যু এর খুব সুনাম শুনেছি। স্পেশ্যাল টিপস আছে কিছু? বৃদ্ধা বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে স্মৃতির সরণি বেয়ে চললেন খানিক।

ধর ৫০০ গ্রাম খাসির মাংস সেদ্ধ করে, গোল গোল আলু কেটে সামান্য আদাবাটা আর চার টুকরো করা দুটো কাঁচা পিঁয়াজ দিয়ে ফুটবে। এবার সেই উপাদেয় স্ট্যু উনি রোজ রাতে খাবেন কড়া করে টোষ্ট করা পাউরুটির সঙ্গে।

আর রোজকার রুই বা কাতলার ঝোলের রেসিপি? বললেন, সব বাড়িতে যেমন হয়। জিরে ফোড়ন, আদা-জিরে বাটা দিয়ে, তেমনি। অর্থাৎ বাড়ির রান্নাই তবে বেশি ভালবাসতেন তিনি।

মলি দি বললেন, সে তো বটেই। আমাদের ছোটবেলায় বাইরের খাবারের চল কম ছিল। তবে আমরা সপরিবারে জিলিপি-সিঙ্গাড়ার পাশাপাশি চাইনিজ খেতাম চাঙোয়ায় বা ওয়ালড্রফে গিয়ে। বাবা তখন আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরী করতেন। ১৯৭২ সালে কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে আসার আগে আমরা থাকতাম ক্যানিং লাইনের চম্পাহাটিতে। পত্রিকার অফিসের উল্টোদিকে তৃপ্তি বলে একটা অসামান্য রেস্তোঁরা ছিল। বাবা ফেরার পথে আমরা দুই বোন আর মা সকলে মিলে খেতে যেতাম সেখানে। গিয়ে দেখতাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় কে। জমিয়ে আড্ডা হত খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে। তারপর খেয়েদেয়ে আমরা শেষট্রেনে বাড়ি ফিরতাম চম্পাহাটির বাড়িতে ।

দুই মেয়েই জানালেন আরেকটি রান্নার কথা। চিতলমাছের গাদায় খুব কাঁটা তাই গাদা ঘষে নিয়ে আলুসেদ্ধ দিয়ে মেখে ধোঁকার মত কেটে পিস করে। ওরা বলেন মুঠিয়া। তাঁদের বাবার পছন্দের ডিশ । এছাড়া শুক্তো, আলু-উচ্ছে-কুমড়ো ভাজা ছিল খুব প্রিয় পদ। থোড় দিয়ে চিংড়ি করতেন মা। বললাম শিগগির রেসিপি দিন।

মলি দি বললেন, থোড় কেটে সেদ্ধ করে নিতে হবে। এবার তেলে পাঁচফোড়ন আর লঙ্কা দিয়ে চিংড়িমাছ দিয়ে নাড়াচাড়া করে থোড় সেদ্ধ দিয়ে সামান্য মিষ্টি আর নামানোর সময় নারকোল কোরা ছড়িয়ে দিতে হবে। আর আমাদের বাড়িতে শুক্তোয় আমরা দুধ, আদা আর পোস্তবাটা দি।

আপনারা দুই বোন বাবা কে রান্না করে কী খাইয়েছেন?

মলি দি বললেন, আমি কোনোদিন কোনো ডিফিকাল্ট রেসিপিতে অভ্যস্ত ন‌ই। সে ব্যাপারে আমার বোন পারদর্শী। আমি খাওয়ালে স্রেফ মাংস-ভাত।

এই খাওয়াদাওয়া নিয়ে আপনাদের হেঁশেলের কোনো স্মরণীয় ঘটনা?

তাহলে তো বলতে হয় সরস্বতী আর লক্ষ্মীপুজোর কথা। বছরে এই দুটোদিন হৈ হৈ করে কব্জ্জী ডুবিয়ে সবাই খিচুড়ি ভোগ, পায়েস খেত। মায়েরা সব জায়ে জায়ে মিলে একসঙ্গে রান্না করতেন। লক্ষ্মীপুজোর ভোগে পরিবারের রীতি অনুযায়ী বাড়ির লোকেদের জন্য মোচা দিয়ে চিংড়ি , লালশাক ভাজা আর মুগের ডাল হত। সরস্বতীপুজোয় হত জোড়া ইলিশ। আর ওদিকে বাবা আর কাকাদের জন্য হত স্পেশ্যাল মাংস, ভাত। পুজো শুরু হয়েছে। বাবারা উশখুশ করতেন কখন পুজো শেষে ওরা মাংস ভাত খাবেন। এমন শুনেছেন কোনোদিন? মলি দির ট্রু কনফেশন।

আচ্ছা আদ্যোপান্ত খাদ্যরসিক এই মানুষটি নিজে রেঁধেছেন কোনোদিন?

যদ্দূর মনে পড়ে একবার মোটে মাছের ঝোল রেঁধেছিলেন। ইতি দি স্মৃতি হাতড়ে বের করে আনলেন। সেই প্রথম আর সেই শেষ।


ওনার বিদুষী কন্যা ললিতা এখনো রন্ধনে দ্রৌপদী, পেশায় ডাক্তার। ফোন করতেই বললেন, বাবার জন্য স্পেশ্যাল লালমংস হত বাড়িতে। খুব স্বাস্থ্যকর নয়। তবে একটু তেল গড়ানো মাংসের ঝোল মাঝেমধ্যে খাওয়া যেতেই পারে। সেটা কী করে বানাতেন বলায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ললিতা বললেন, ১ কেজি খাসির মাংসে মোটে তিনটে মাঝারি সাইজের পিঁয়াজ কুচো, এক চামচ রসুন বাটা, একচামচ আদাবাটা আর একটু বেশি সরষের তেল লাগবে। এই হল কেমিষ্ট্রি। প্রেসার কুকারে তেল দিয়ে পিঁয়াজ, তেজপাতার সঙ্গেই দিতে হবে সামান্য পরিমানে অল্প জলে ভিজিয়ে রাখা গোলমরিচ-জিরে-ধনে-বাড়ির তৈরি গরমমশলা গুঁড়ো। বাদামী হয়ে এলে মাংস দিয়ে কষতে হবে আরো কিছুক্ষণ। তারপরেই এবার দু চামচ ফেটানো টক দৈ, আদা-রসুনবাটা দিয়ে কষে জল দিতে হবে সামান্য। ঠিক যতটুকুনি জল প্রয়োজন তার বেশি নয় কিন্তু। ব্যাস্! সেদ্ধ হলেই নামিয়ে রেডি টু সার্ভ।

জানালেন আরেকটি হালিমের সমতুল্য পদের কথা। যেটি হত তাঁদের বাড়িতে। মুসুর ডাল, মাংস, আদা, পিঁয়াজ, রসুন দিয়ে প্রেসারে সেদ্ধ করে গলিয়ে নিতে হবে। তারপর ঘিয়ের মধ্যে শুকনো লঙ্কা আর গরমমশলার ছঁক দিয়ে পরিবেশিত হবে।


বাবা আমার হাতে মাটন কাবাব খুব পছন্দ করতেন। জানালেন ললিতা। রেসিপি জানতে চাইলেই বললেন,

ধর ২৫০ গ্রাম মাংসের কিমা। তার সঙ্গে একমুঠো ছোলার ডাল, পিঁয়াজ কুচি, রসুন, গোটা গোলমরিচ, দারচিনি আর কয়েকটা শুকনোলঙ্কা সামান্য জল দিয়ে সবশুদ্ধ প্রেসারে সেদ্ধ করবে।তারপর পুরো মিশ্রণটি মিক্সিতে কিম্বা শিলে বেটে নিয়ে বীজমুক্ত কাঁচালঙ্কা কুচি, সামান্য আদা কুচি, নুন, সাজিরে গুঁড়ো আর গরমমশলা দিয়ে মেখে নেবে শক্ত করে। তারপর টিকিয়ার মত করে মাটন কাবাব গড়ে ভেতরে একটি করে লঙ্কা কুচি পুরে দিয়ে তাওয়ায় ঘি মাখিয়ে সেঁকতে হবে। রুটির সঙ্গে স্যালাড সহযোগে জমে যায় এই কাবাব।

এবার বললাম শ্যামলবাবুর খাওয়া নিয়ে কোনো মজার ঘটনা?

ললিতা বললেন,

মারা যাবার আগে বাবা দক্ষিণ কলকাতার মুদিয়ালির কাছে একটি স্কুলের সেক্রেটারি হন। আমি হঠাত একদিন স্কুলে গেছি । গিয়ে দেখি একটি ছেলে স্কুলে নতুন চাকরী পাওয়ার খুশিতে এসেছে বাবার সঙ্গে দেখা করতে।

বললাম, তা সঙ্গে ওটা কি? সে জানাল, স্যার কে বললাম, স্যার, আপনাকে চাকরী পাবার খুশিতে কি দেব ভেবে পাচ্ছি না।

স্যার বললেন, বাড়িতে যা রান্না হবে তাই এনো একদিন। তাই আজ ওনার প্রিয় বিউলির ডাল আর পোস্তর বড়া এনেছি ওনাকে খাওয়াব বলে।