৩০ এপ্রি, ২০১৬

ভোটের আমি, ভোটের তুমি

 কি মজা! কি মজা! আজ পরীক্ষা শেষ হল। আবার সারাবছর পড়বনা। মা মন্দিরে ফুল চড়াবে আর বলবে, এবারটার মত পাস করিয়ে দিও ঠাকুর। পরেরবার থেকে আমি নিজে দেখব ওর পড়াশুনো। মা অমন হামেশাই বলে। মা তো নিজেই জানে। তিনি নিজেও কখনো পড়াশুনো করতেন না। আমি এবারেও মা'কে প্রমিস করে বলব, আর ফাঁকি দেবনা। বাবা যখন প্রতিমাসে তার কষ্টার্জিত নোটগুলো দিয়ে টিউশান-ফি দেবে তখন বলব, এবার দেখো আমি ঠিক মন দিয়ে পড়াশুনো করব। তারপর? তারপর একবার যদি আমি টিচারের চোখের মণি হয়ে যাই, আমাকে আর কে পায়? না পড়েই পাস করে আসছি এ যাবত। তাই সেটাই আমার স্বভাবটা খারাপ করে দিয়েছে। নয়ত বিশ্বাস করুন, মা-বাবা কারোকে বলতে হত না পড়, পড়। কোশ্চেনগুলো কমন এসেচে। কিন্তু তবুও অনেক ছেলেরা টুকলি করার চেষ্টা করেছে জানেন্? আমি অবিশ্যি ভালো ছেলে। অনেক আটঘাট বেঁধে রেখেছিলাম। তাই মনে হয় উতরে যাব এবারেও। বেশ খেয়ে, পরে, ঘুমিয়ে, ছবি এঁকে, কবিতা লিখে, সিনেমা দেখে, ব‌ই পড়ে থাকি। পরীক্ষার চাপ থাকেনা। ভাল্লাগেনা এই পরীক্ষার সময়টা। বড্ড চাপ হয়ে যায়। মা-বাবার টেনশান বেড়ে যায়। তবুও পরীক্ষা দিতেই হয়। নয়ত মানুষ হব কি করে?    

......

কাল সকাল চান সেরে উপোস করে অঞ্জলি দি প্রতিবার। আমার আবার ধম্মেকম্মে খু‌উব মতি কিনা! নির্জ্জলা উপোস করে পুজো না দিতি পারলে মনটা যেন সাফসুতরো হয়না। যবে থেকে নাবালিকা নাম ঘুচেছে তবে থেকে এইপুজোর ব্রত করছি। তবে কিছু পাবার আশায় নয়। পেত্থম পেত্থম ভাবতি কত অদলবদল হবে নাজানি। দেশটা আমার ফুলছোঁড়াতেই আমূল বদলে যাবে! ও হরি! এতো ঢপের চপ! রাস্তার ফুটপাথে রোজ পা মচকায় তবুও এই পুজো করি আমি। ছেলেগুলো কত্ত পড়ে এসেও চাকরী পায়না এখানে তবুও এই পুজো করে মরি আমি। মায়ের চিকিত্‌সা করতে ভেলোরে যাই আমি তবুও নাকটিপে পুজো করব । আমার বাড়ির সামনের রাস্তায় টাইমকলের জল উপচে পড়ে তবুও আবাসনে ডিপ টিউবওয়েল। তাও আমার শিক্ষে হয়নি, এই পুজো আমি করে ছাড়ব‌ই। রাস্তাঘাট আলোয় আলোয় ছয়লাপ তবুও শিল্পের হাহাকার। তো কি? লোডশেডিং তো নেই! কাল সারা রাত ধরে সব ভেবে দেখনু, এই পুজো করেই ছাড়ব কারণ এ পুজোয় আমার জন্মগত অধিকার।
আর এবার বাপু উপোস করিনি। দিব্যি চা-টা খেয়ে টেয়ে, সেজে আর গুজে গেনু।  
আম্মো এই গরমে পাট ভেঙে একখান মলমলি ছাপাশাড়ী পরে দিয়ে এনু । তবে শাড়ির রং সম্বন্ধে খুউব সন্দিহান সকলে । কমলা নয়, লাল নয়, নীল নয়, সবুজ নয়। স্রেফ সাদা পরে। কানে গুঁজে  ফুল। তবে পদ্ম, ঘাসফুল নৈব নৈব চ! পিঠে বেঁধে  কুলো। থুড়ি হাতে বেঁধে কুলো, পড়শীরা সব দেখে আমায় বলল এ কি হল? 
আর? ছোট্ট টিপ, হালকা লিপিস্টিক আর? চোখের চারপাশের কমনীয় ত্বক ঢাকিনি রোদচশমাতে। কারণ অত সকালে দরকার নেই। পোষাক তো হালকা রংয়ের আছেই। ছাতা শুনলাম অনেকেই ফোকটে পেয়েছে। শুনলাম SPF 15 সমেত সানস্ক্রিন লোশানও দিচ্ছে মহিলা ভোটারদের । আর যে যাচ্ছে বিরিয়ানিও পাচ্ছে অতএব দুপুরের খাওয়ায় নো চাপ!কারণ সাথে আছে চিকেন চাপ।  সব মিলিয়ে its Vote time! party time! long weekend celebration ahead ! ভোটপুজো বলে কতা!    

...
 

ভোলা/ভুলু/? শুনতে পাচ্ছিস্‌? রাত পুইলেই পরীক্ষে না? তা না পড়ে পড়ে শুধু ঘুম আর ঘুম। যে গুলো পরীক্ষেয় ইম্পটেন্ট সেগুলো ভুলিসনি যেন বাপ্‌ আমার।  এই গরমে তোর মাথার ঘিলুতে শুধু যে কোশ্চেনগুলো গেঁথে দিলুম সেগুলোই আসবে কিন্তু। ঠিকমত পোশ্নের উত্তর দিস বাপ্‌ আমার। আর রাতে হালকাপুলকা খাবার খেয়ে নে বাপ্‌। বেশী খেলে বদহজম হবে। তাপ্পর সব ভুল করে আসবি তুই। আর শোন্‌ আরেকটা কথা। আজ এট্টু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়িস বাপধন! হক্কাল হক্কাল উইঠ্যা, চিঁড়া-গুড় খাইয়্যা, হাওয়াই চটি পৈরে পরীক্ষে দিতে যাস বাপ্‌। বেশী অন্ধকারে যাস্‌না ভুলু/ভোলা।  পুলিশেরা নাকি পুছতাছ করতে পারে। কপালে দৈয়ের ফোঁটাটা পরিয়ে দেব আমি। হলুদ-সিঁদুরে চাল দিয়ে দৈয়ের ফোঁটা খুব শুভ। কিন্তু তুই মুছে নিস বাপ্‌। পেন্সিলবাক্স নিস্‌না যেন। পকেটের মধ্যেই পেন রাখিস। ওরা নিয়ে নিতে পারে। রঙীন জামা পরিসনি যেন ভোলা/ভুলু। ওরা সন্দেহ কত্তে পারে। মোবাইলটা বাড়িতে রেখে যাস। ওরা নিয়ে নিতে পারে। ঐ যে কোন্‌ পার্টির থেকে ছাতা দেছিল, ওটাও নিয়ে যাস্‌নি বাবা। কি দরকার? কোত্থেকে কি হয়ে যায়? ভোলা বললে, আমাকে হাওয়াই চটি পরতি বলছ আর নিজে তো কপালে ইয়া বড় কালোজামের মত টিপ প‌ইরেছো। রাতেই টিপটা খুলে রাকো দিকিনি। নয়ত ওরা সন্দেহ করবে।

 .......

২৪ এপ্রি, ২০১৬

c/o সীতায়ণ



 "সীত" বা লাঙলের ফলায় মাটি থেকে উত্পন্ন সেই সীতার কাহিনী নিয়ে সীতায়ণ বা অন্য রামায়ণ লিখেছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। জন্ম থেকে বিলীন হয়ে যাওয়া এই কন্যার দুর্ভাগ্যের আঁধার ছিল নিবিড় ছায়াসঙ্গী। আদর্শবাদকে দূরে সরিয়ে রেখে সেই কন্যার অন্ধকার পরিবৃত জীবনে আলো ফেলেছিলেন লেখক। এই ধ্রূপদী উপন্যাস যখন মঞ্চের আলোআঁধারে জনকনন্দিনীর প্রতিবাদী লালিত্যে উদ্ভাসিত হয় তখন তা সত্য সীতায়ন। শুধু রামায়ণের স্তুতিগীতিতে মুখর নয় তা। জনকদুহিতার আড়ম্বরহীন, ব্যসনে-ভূষণে সীতাকন্ঠ বারেবারে প্রতিধ্বনিত হয়ে একটাই কথা বলে" জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা, জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্তটীকা" । কি হবে বিবাহের প্রলোভনে পা দিয়ে? কি হবে নিজের বহু আকাঙ্খিত প্রিয়তম পুরুষের বীজ গর্ভে ধারণ করে? কি‌ই বা হবে আজীবন সেই পুরুষের হাতের ক্রীড়ানক হয়ে মধুচন্দ্রিমার ভোগ্যবস্তু হয়ে? জীবনের সর্বোত্তম মূহুর্তে ভুলে যাও মধুযামিনী যাপনচিত্রকথা। সেই চিত্রকূটে, সেই নৈমিষারণ্যেই হয়ত হতে পারে তোমার নির্বাসন। তাই এই সীতাকে আজ হতে হয়নি বাক্যহীনা। সতীত্বের পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত সে সীতা। তার জীবনের প্রথম পুরুষ, শেষ পুরুষ, উত্তর পুরুষ, মধ্যম পুরুষ সব‌ই অযোধ্যার আদর্শবান রাজা রামচন্দ্র নামে এক আর্য যুবক। যে রাজা শুধু সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া। সবার উপরে পিতৃসত্য, প্রজাসত্য। চুলোয় যাক মাতা, পত্নী।
একটাই তো ব‌ই জীবন। একটাই তো ব‌ই যুগ। যার নাম ত্রেতা। তিনি না ত্রাণ করতে এসেছেন। কার ত্রাণ? কিসের ত্রাণ? স্ত্রী, মাতা এরা সামান্য নারী। ত্রাণ যদি করতেই হয় তবে প্রজাই মুখ্য ত্রেতাযুগে। প্রজাবত্সল হলেই পরজন্মে আবার অবতারত্বের গ্যারান্টি । তাই না তিনি যুগেযুগে আদর্শ ভ্রাতা, আদর্শ পুত্র, আদর্শ রাজার তকমা লাগিয়ে মহত হলেন। কিন্তু সীতা নামের মেয়েটি? যে মধ্যবয়সে সেই আদর্শবানের বীজ গর্ভে ধারণ করে , নিজের গর্ভিণী জীবন একাকী লালন করে আশ্রমবাসী হয়ে। লঙ্কা থেকে ফেরার পর যাকে রাবণ রূপ খলনায়কের দূষণ, কালিমা, পাপ মোছার জন্য সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হয়। মনে মনে সেই সীতার কেবল একটাই প্রশ্ন জাগে সীতায়ণে। নারীর কলঙ্ক মোচনের জন্য আগুণ‌ই কি প্রকৃষ্ট পরীক্ষক? কালিমা-কলঙ্ক কি আগুণের লেলিহান শিখাতেই ধুয়েমুছে সাফ করে নারীকে আবার পরিচ্ছন্ন করে দেয়? যে স্বামী একদিন তার কন্ঠলগ্না হয়ে, আলিঙ্গন করে স্বেচ্ছায় তার যোনিপথে ঢেলে দিয়েছিল উষ্ণবীর্য। সেই নারীর মুখের কথা, চোখের ভাষাই কি সব নয়? কেন তাকে বিশ্বাস করা যায়না? কারণ সে নারী বলে? তেজোদৃপ্ত, পেশীবহুল পুরুষের কাছে এই সীতার প্রশ্ন সেটাই। এই সীতা সোচ্চার সেই প্রতিবাদে।এই পুরুষের পৌরুষ কি কাপুরুষতায় পর্যুবাসিত? "কানপাতলা" তো মেয়েদের হয়। পুরুষদেরো হয় নাকি? তাই বুঝি প্রজাসর্বস্ব এই রাজা বারেবারে স্ত্রীকে দূরে সরিয়ে আত্মতুষ্টিতে নিজের মহত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। আর তাই বুঝি নৈমিষারণ্যে বাল্মিকীর আশ্রমে সীতার মুখ থেকেই স্বয়ং বাল্মিকী শুনতে চান সীতার জীবনের করুণ কাহিনী। কিন্তু কবি বাল্মিকীও ভারতবর্ষের এক সনাতন আদি কবি। মস্যাধারে খাগের কলম ডুবিয়ে ভুর্জপত্রে সীতার মুখনিঃসৃত সত্যি কথাগুলি আড়াল করে বলেন, "না, মা, ভুলে যেওনা। তিনি তো অবতার। তিনি আদর্শ রাজা রামচন্দ্র। তোমার অনেক সৌভাগ্য যে তুমি তাঁর সন্তানের জননী। ইক্ষ্বাকু বংশের মর্যাদায় তুমি তাঁর ধর্মপত্নী।"
গল্পের শুরুতেই শুনি নদীতে নৌকার ছলাত ছলাত শব্দ। হোমশিখার মত পবিত্র মাতৃত্বে বিভোর হয়ে বহুদিন পর সীতা চলেছেন লক্ষণের সঙ্গে। কিন্তু যেইমাত্র জানলেন যে রামচন্দ্রের আদেশে বাল্মিকীর আশ্রমে শুরু হবে তাঁর এই গর্ভিণী জীবন তখনি শুরু সীতায়ণ। তিনি হয়ে উঠলেন প্রগলভ, প্রতিবাদী এক নারীকন্ঠ। তাঁর স্বামীর হৃদয়ে সীতা নামের নারীটির জন্য কোনো স্থান নেই। সে শুধু রাষ্ট্রতত্ত্বকে প্রতিপালন করে। চিরদুঃখের পথে হাঁটতে গিয়ে সেই নারী নিজে রচনা করলেন নতুন এক পথ। নতুন পথে ধরে র‌ইলেন সেই অমোঘ আলোকবর্তিকা। সেই পথে হাঁটবেন দর্শক। সেই পথের নামকরণ করেছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। সেই পথের আজকের ঠিকানা c/o সীতায়ণ।
আমিও সেই প্রজননকারী নারীর এককণা। তাই আমি জননী। আমার দ্বারাও পুরুষের রমণ হয়েছে। তাই আমি রমণী। আমার প্রতিবাদীনি রূপের চেয়ে মহলে মহলে থাকাটাই পুরুষের সর্বকালের পছন্দের তাই আমি মহিলা। রাজার রাজ্যশাসনের আওতায় কি স্ত্রীর প্রতিপালন পড়েনা? স্ত্রী শুধুই বংশরক্ষার্থে যুগে যুগে আবির্ভূতা হন? এ তুমি কেমন রাজা রামচন্দ্র? লোকে তোমায় মান্যিগণ্যি করে। লোকে তোমার আদর্শ নিয়ে স্তুতিগান করে । রামায়ণের হিরো তুমি হতে পারো কবির কলমে। আমার মনে নয়।
প্রতিবাদী সীতার মেনে নিতে কষ্ট হয়। সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ। তিনি বারেবারে মঞ্চ কাঁপিয়ে আজকের নারীর উদ্দেশ্যে সেই কথা ছুঁড়ে দিতে লাগলেন। আর আমার মত এহেন নারীদর্শক সেই অণুরণন কানে নিয়ে ফিরে এল গতকাল শিশিরমঞ্চ থেকে।

শাঁওলি মিত্রের দ্রৌপদীর আখ্যান নিয়ে "নাথবতী অনাথবতের" পর রোকেয়া রায়ের সীতায়ণ। ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে এলে সম্পূর্ণ হয় একপাক। যেমন উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ণ।

আদর্শরাজা (?) রামচন্দ্রের জীবনের সম্পূর্ণ নিয়ে বাল্মিকীর কলমে রামায়ণ। আর মল্লিকা সেনগুপ্তর বহুচর্চিত এই সীতায়নের সম্পূর্ণতার রূপায়ণ বল চরিত্রায়ণ বলো সবটুকুনি‌ই হল তোমার অভিনয়ে, রোকেয়া রায়। তোমার মঞ্চ পরিকল্পনা অনবদ্য। নাটকের নির্দেশনায় মলয় রায় অত্যন্ত পটুতা দেখিয়েছেন। বহু অভিনয়ে একক চরিত্রে সুমন অত্যন্ত দাপুটে। কখনো সে অত্যাচারী রাবণ, কখনো ন্যায়নিষ্ঠ দেবর লক্ষণ, কখনো সেই ইক্ষাকুনৃপতি রাঘবেন্দ্র রাম, আবার কখনো বয়সের ভারে কুব্জ, ন্যুব্জ বাল্মিকী মুণি, আবার এক ঝলকে ছোট্ট কিশোর লব। কি অপূর্ব ট্রানজিশান তার স্বরক্ষেপণে, ব্যাক্তিত্ত্বে। তবে মঞ্চে সীতার পোশাক আরো অন্যরকম হতে পারত। রামের কাপুরুষতা একটু প্রচ্ছন্ন লেগেছে। আর সংলাপে এক‌ই কথার বারবার প্রয়োগ একটু অস্বস্তির কারণ। কে জানে? হাতুড়ি দিয়ে আমাদের সমাজের মানুষগুলোর মাথায় বোধহয় এইকথাগুলোই প্রোথিত করতে চেয়েছেন স্বয়ং পরিচালক। আর নয় পুরুষের জয়গান। ভুলে যাও রামগান। শুরু হোক সীতায়ন। মোটের ওপর প্রখর গ্রীষ্মের চোখরাঙানি ভুলে, ভোটরঙ্গ শিকেয় তুলে পয়সা উশুল সন্ধ্যেনাটক। আরো একবার দেখার ইচ্ছে র‌ইল। টিম সীতায়ণ যুগ যুগ জিও!

১৭ এপ্রি, ২০১৬

নূতন রতনে-১

পাতপেড়ে খেতে কার না ভালো লাগে! তাই আবারো সুরজিত ও বন্ধুরা কবিতাক্লাবের নতুন বছরের আমন্ত্রণে "নতুন"থিমে মুক্তগদ্যের পংক্তিভোজনে আমিও।
http://www.kobitaclub.com/tomar_kobita_comment.php?tkid=17689  


১৪ এপ্রি, ২০১৬

বারাণস্যাং অন্নপূর্ণাং



বারাণসী বা কাশী মহাতীর্থে দেবাদিদেব বিশ্বেশ্বর বিরাজ করেন। বিশ্বনাথের মন্দিরের পাশেই অন্নপূর্ণার মন্দির। বারাণসী একান্ন সতীপীঠের অন্যতম কারণ এখানে দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর কুন্ডল পড়েছিল। কথিত আছে বারাণসীর গঙ্গার অন্যতম মণিকুন্ডল ঘাটের নাম এই থেকেই। তাই কাশীর বিশ্বেশ্বর হলেন এখানে মায়ের ভৈরব এবং দেবী অন্নপূর্ণা হলেন তাঁর প্রকৃতি। পীঠ হয়ে ওঠার পেছনে যে স্থান মাহাত্ম্য থাকে অর্থাত উত্তরবাহিনী নদী, সংলগ্ন শ্মশান সবকিছুই বর্তমান এখানে। তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থে আছে, 

বারাণস্যাং বিশালাক্ষী দেবতা কালভৈরবঃ 
মণিকর্ণীতি বিখ্যাতা কুন্ডলঞ্চ মম শ্রুতেঃ।।
 যদিও এখানে বলা হয়ৈছে দক্ষযজ্ঞের সময় দেবীর কুন্ডল পড়ার কথা স্কন্দপুরাণের কাশীখন্ডে আছে একদা বিষ্ণু এখানে মহাতপস্যা করেন। তপস্যার পর তিনি তাঁর চক্র দিয়ে একটি পুকুর খনন করেন এবং নিজের স্বেদ দিয়ে তা পূর্ণ করেন। মহেশ্বর তা দেখে খুশি হয়ে মাথা নাড়তে থাকেন ও তাঁর মাথা নাড়ার ফলে কানের কুন্ডল ঐ পুকুরে পতিত হয়। তাই ঐ স্থানের নাম মণিকর্ণিকা। শিবপুরাণে বলা হয় তপস্যার সময় বিষ্ণুর কান থেকে বিবিশ রত্নে ভূষিত কর্ণকুন্ডল পতিত হবার আখ্যান । পীঠনির্ণয় তন্ত্রে দেবীর কর্ণকুন্ডল পতিত হবার জন্য দেবী হলেন মণিকর্ণী বা বিশালাক্ষী আর তাঁর ভৈরব হলেন কালভৈরব।

আদ্যাস্তোত্রে আমরা পাই "বারাণস্যাং অন্নপূর্ণা" । কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গলে পাই এখানে দেবীর বক্ষদেশ পতিত হবার কথা।

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের ছত্রে ছত্রে দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য কীর্তণের গল্প পাই। শিব ও পার্বতীর সংসারের ঘোর দারিদ্রের বর্ণনা দিয়ে শুরু এই কাহিনী। মা অন্নপূর্ণা তখনো অন্নপূর্ণা হয়ে ওঠেননি। এহেন দেবী পার্বতী একদিন শিবকে বললেন মনের কথা। দারিদ্র্য তাঁর আর সহ্য হয়না। মাথার চুলে ও সর্বাঙ্গে তেল না পড়ে রুক্ষ ও শুষ্ক হয়ৈছে তাঁর গাত্র ও কেশরাজি। শিবের জন্য নিত্য সিদ্ধিপাতা বেটে বেটে হাতে পড়েছে কড়া। এক পুত্র গজানন, চারহাতে খায় ও অন্য পুত্র ষড়ানন ময়ূর নিয়ে অহোরাত্র খেলে বেড়ায়। এতজনের সংসারে অন্ন নেই। তাই পার্বতীর হাহুতাশ দেখে মহাদেব ভিক্ষায় বেরুলেন।

আর পার্বতী তাঁর সখী জয়ার কাছে মনের দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন..


কি করিব একা ঘরে রয়ে বৃথা

কেন দুঃখ পাই বাপের মন্দিরে যাই

গণপতি কার্তিকেয় লহে।।

যে ঘরে গৃহস্থ হেন সে ঘরে গৃহিণী কেন

নাহি ঘরে সদা খাই খাই

কি করে গৃহিণী পানে ক্ষণক্ষণ ঝন্‌ঝনে

আসে লক্ষ্মী বেড় বান্দে নাই।।

মনস্তাপ করতে করতে দেবী বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন ভাবলেন। জয়া তাঁকে নিরস্ত করে বললেন" দ্যাখো, স্বামী ধনহীন হলে বাপের বাড়িতে মেয়েদের কোনো সম্মান নেই" তার চেয়ে তুমি অন্নপূর্ণা রূপ ধারণ কর। সারা বিশ্বের যত অন্ন আছে তা তোমার সংগ্রহে রাখো। মহাদেব ভিক্ষা করে কোথাও যখন অন্ন পাবেননা তুমিই তাঁকে অন্ন যোগাবে" দেবী অন্নপূর্ণার রূপ ধারণ করলেন। সারা বিশ্বের সমস্ত অন্ন একত্র করে নিজের সংগ্রহে রাখতে শুরু করলেন। এদিকে মহাদেব আর ভিক্ষা পান না। অবশেষে তিনি লক্ষ্মীর কাছে গেলেন অন্নের জন্য। লক্ষ্মী তাঁকে বললেন, " অন্ন তুমি কোথায় পাবে? তোমার ঘরণী সব অন্ন নিজের কাছে রেখেছেন যে! তাই তো বিশ্ব সংসারে অন্ন অপ্রতুল" মহাদেব তখন ঘরে ফিরে দেবীর কাছে ভিক্ষা চাইলেন। পরিতৃপ্তি সহকারে উদরপূর্তি করে বিশ্বকর্মাকে অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য কাশীতে স্বর্ণ দেউল মদির নির্মাণের আদেশ দিলেন। চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমীতিথিতে দেবীর পূজা চালু হল।





দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য ও প্রকাশ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গলের পরের পর্বে আরেক লৌকিক কাহিনীর অবতারণা করলেন। দেবীর দুই সখী জয়া ও বিজয়া দেবীকে বললেন, ধনপতি কুবের নিত্য তোমার পুজো করে। পূজার ফুল সংগ্রহ করেন কুবের অনুচর বসুন্ধর । বসুন্ধরকে শাপগ্রস্ত করো। এবং তবেই বসুন্ধরের মাধ্যমে তোমার পূজার প্রচলন হবে। ধনপতি কুবের পূজার ফুল সংগ্রহ করলেন। কিন্তু দেবীর মায়ায় ফুলের বাগানে তার স্ত্রী বসুন্ধরার সঙ্গে সাক্ষাত হল। বসুন্ধরের স্ত্রী তার স্বামীকে বললে, এই এত ফুলে পুজো করে কি হবে স্বামী? তার চেয়ে আমরা এই ফুল দিয়ে বাসর রচনা করে প্রেমালাপ করি"

এদিকে কুবের ভবনে বসুন্ধরের বিলম্ব দেখে দেবী ক্রুদ্ধ হলেন। এবং বসুন্ধরকে অভিশাপ দিয়ে মর্ত্যে প্রেরণ করলেন। মর্ত্যে বসুন্ধর বাংলাদেশের গঙ্গার তীরে বরগাছি গ্রামে হরি হোড় রূপে জন্ম নিলেন । খুব দুঃখ কষ্টে তার জীবন কাটে। বনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে কাঠ কেটে, ঘুঁটে কুড়িয়ে তার বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য অন্নের জোগাড় করে হরি হোড়। একদিন দেবী অন্নপূর্ণা এক বুড়ির বেশ ধরে তার সামনে উপস্থিত হলেন। হরি হোড় দেখল, সেই বুড়ি তার সংগৃহীত কাঠ-ঘুঁটে সব একত্র করছে।


কোথা হতে আসে বুড়ি, ঘুঁটে পায় ভরে ঝুড়ি সর্বনাশ করিল আমার।

কাড়ি নিলে হবে পাপ, বুড়ি পাছে দেয় শাপ এ দুঃখের নাহি দেখ পার।।

বুড়ি তখন তাকে বললে, বাছ, আমি এত ব‌ইতে পারছিনা, তুমি যদি আমার বোঝাটি বয়ে দাও এর অর্ধেক কাঠ ও ঘুঁটে আমি তোমাকে দান করব"

বৃদ্ধারূপিণী দেবী এত ধীরগতিতে হাঁটতে শুরু করলেন যে হরির বাড়ির কাছে যেতেযেতেই সন্ধ্যে নেমে এল। বুড়ি বলল" এখন তো আর চলতে পারিনে বাবা, তোমার ঘরেই থেকে যাই" হরি বললে" বুড়িমা, আমরা যে হতদরিদ্র, তোমাকে কি খাওয়াব?"

বুড়ি বললে

"বাছা, তোমার মা'কে বল, অন্নপূর্ণার নাম করে ভাতের হাঁড়ি বসাতে"

হরির মা তখন বুড়ির আদেশ মত ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে দেখেন তার মধ্যে নানাবিধ সুখাদ্য রয়েছে। এবার হরি বুঝতে পারলেন বৃদ্ধাবেশী দেবী অন্নপূর্ণার ছলনার কথা। দেবী হরি হোড়কে বরদান করতে উদ্যত হলে হরি বলল, "এই বর দিন, যাতে দেবীর পাদপদ্মে যেন আজীবন ঠাঁই হয়" দেবী তথাস্তু বলে অন্তর্হিত হলেন। এরপর হরির তিনবার বিয়ে হল। ধন সম্পদের অভাব র‌ইলনা। প্রত্যহ তার ঘরে অন্নপূর্ণার পূজা হতে থাকল। কিন্তু এক গৃহে বেশীদিন বাধা পড়ে থাকলে বসুন্ধরের শাপমুক্তি ঘটবে কিভাবে? তাই দেবী আবারো ফন্দী আঁটলেন। এদিকে দেবী হরিকে কথা দিয়েছেন যে তার গৃহ ছেড়ে অন্যত্র যাবেননা। স্বর্গে বসুন্ধরের স্ত্রী বসুন্ধরা ব্যস্ত হলেন তার স্বামীর জন্য। দেবীকে সে কাতর হয়ে প্রার্থনা জানালো। একে পতি বিরহে সে আকুল, অন্যদিকে তিন সতীনের কষ্ট সে আর সহ্য করতে না পেরে দেবীকে বলল" আমাকে রক্ষা করুন, অনেকদিন তো হল আমার স্বামীর মর্ত্যবাস। এদিকে আমি যে আর স‌ইতে পারিনে"

দেবী ভাবলেন বসুন্ধরাকেও যদি মর্ত্যে বদুন্ধর অর্থাত হরি হোড়ের গৃহে পাঠাই তাহলে ওদের ঘরে চরম অশান্তি সৃষ্টি হবে আর সেই অছিলায় তিনি অন্যত্র গমন করবেন।

কিন্তু হরি হোড়ের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে অন্নপূর্ণার ব্রতী হবে কে? তাই নিত্যপূজা চালু রাখার জন্য দেবী গমন করলেন ভবানন্দ মজুমদারের গৃহে। হরি হোড়ের পূজার সময় দেবী তার মেয়ের রূপ ধরে এসে বললেন, " বাবা, আমি তবে যাই?" হরি বললেন, " হ্যাঁ, যাও।" ব্যাস্! সেই অপেক্ষাই করছিলেন দেবী। তিনি ভক্তের সাথে ছলনা করে ভবানন্দের গৃহে পা বাড়ালেন।

হরি হোড়ের বাড়ি থেকে ভবানন্দের বাড়ি যেতে হলে নৌকায় নদী পেরুতে হবে দেবীকে। নদী পার হবার জন্য ঈশ্বরী পাটনীর সাহায্য চাইলেন তিনি। একা মেয়েছেলেকে নৌকা পার হতে দেখে মাঝি ঈশ্বরী তার পরিচয় জানতে চাইলেন। দেবী রহস্যাবৃত করে বলতে লাগলেন সেই বিখ্যাত কবিতা।


গোত্রের প্রধান পিতা মুখ্য বংশজাত।

পরম কুলীন স্বামী বন্দ্যো বংশখ্যাত।।

পিতামহ দিলা মোরে অন্নপূর্ণা নাম।

অনেকের পতি তেই পতি মোর বাম।।

এইভাবে যুগ যুগান্ত ধরে অন্নদামঙ্গলের এই সাধারণ লৌকিক কাহিনীগুলি হরি হোড় থেকে ভবানন্দ মজুমদার, বাংলার একগ্রাম থেকে অন্য গ্রাম দেবী অন্নপূর্ণার দেবী মাহাত্ম্য প্রচার করে আসছে ।

১২ এপ্রি, ২০১৬

নীলষষ্ঠী কথা

 

অশোকষষ্ঠী বা বাসন্তীদুর্গাপুজো হয় চৈত্রমাসের শুক্লাতিথিতে। মহাদেবের নীলের পুজোর দিনটা বরাদ্দ চড়ক বা গাজনের দিনক্ষণ অনুযায়ী, বর্ষশেষের সংক্রান্তির আগের দিনে। প্রতিবছর এই নিয়ে দুগ্গার সঙ্গে শিবের বেশ ঠান্ডা লড়াই চলে।  তা এবার সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে বাসন্তী-অশোকষষ্ঠী আর নীল একদিনে পড়েছে। শিবের ফন্দী আর কি দুগ্গার জানা নেই? দুগ্গা একটু বাপেরবাড়ি আসতে চান নিরিবিলিতে কিন্তু এবার সেই গাঁটছড়া বেঁধে নেশাখোরটা সঙ্গী হল।  
আসার পথে দুগ্গা বলেছিল একবার, এবার ভোটের হাওয়া গরম, বোশেখ না পড়তেই হাওয়াবাতাস গরম। তুমি চুল-দাড়ি-জটা-গোঁফ কেটে চলো। শিব বলল, আমি মেয়েছেলের কথায় কান দি‌ই না। 
দুগ্গা বলল, ক'দিন আগেই তো ঠান্ডায় ঠান্ডায় শিবরাত্তিরে কত ক'দিন আগেই তো মহা ধূমধাম করে কত্ত পুজো পেলে । ফাগুনদিনের মাগ্যির বেলের পানা, তরমুজ, ফুটি খেয়ে পথ্যি করলে। সিদ্ধি-মধু-ঘিয়ের ফেসপ্যাক নিলে । ডাবের জলে মুখ আঁচালে । ঠান্ডার পর নতুন গরমে টক দৈয়ের ঘোল খেয়ে ব্যোম্‌ ব্যোম্‌ করে ত্রিভুবন শান্তি কল্লে । মাথা ঠান্ডা তো তোমার গুরু! আবার নীলষষ্ঠী ? ষষ্ঠী তো এতদিন জানতাম একবগ্গা মেয়েদের সম্পত্তি। এবার সেখানেও ভাগ বসালে তো আমাদের ব্র্যান্ড ডাইলুশান হয়। 
শিব বলল, নিজের আত্মতুষ্টিতে বিভোর তুমি। জানবে কি করে প্রজারঞ্জনের মাহাত্ম্য? 
আবার ষষ্ঠীর পেছনে নীল জোড়া কেন বাপু? ক‌ই আমরা তো লাল,সবুজ, হলুদ ষষ্ঠীর দোহাই দি‌ই না মানুষকে।
পাশ থেকে সাওকড়ি মেরে নন্দী বলল, মা ঠাকরুণ তো ঠিক‌ই বলেচে বাবা।   
নীলষষ্ঠী নীল কেন ? লাল বা সবুজ নয় কেন?
নীল কথাটি নীলকন্ঠ মহাদেবের সাথে সাযুজ্য রেখে... এতদিন আমার কাছে আচিস এটাও জানিস নে?  মহাবাবা বলেন । সেই যে সেই সমুদ্রমন্থনের  সময়  আমি দুনিয়ার  সব বিষ আমার কন্ঠে ধারণ করেছিলাম । তাই তো সকলে আমাকে নীলকন্ঠ বলে ডাকে রে ।
তার সঙ্গে ষষ্ঠী জুড়লো কে বাবা ? নন্দী বললে
তাহলে শোন্‌ বলি:
এক বামুন আর বামনীর পাঁচছেলে আর দুটি মেয়ে । ( ফ্যামিলি প্ল্যানিং তো আর ছিলনা সে সময়ে )তারা খুব পুজোআচ্চা করত । কিন্তু এত পুজো, বারব্রত করেও তাদের সব ছেলেমেয়েগুলো একে একে মরে গেল । তখন বামনীর ঠাকুরদেবতায় বিশ্বাস চলে গেল । তাদের আর সেই জায়গায় থাকতেও ভালো লাগল না । বামুন-বামনী ঠিক করল  সব ছেড়েছুড়ে তারা মনের দুঃখে কাশীবাসী হল । দশাশ্বমেধ ঘাটে স্নান করে অন্নপূর্ণার পুজো করে মণিকর্ণিকার ঘাটে বসে আছে , এমন সময় মা-ষষ্ঠী বুড়ি এক বামনীর বেশে এসে বললে " কি ভাবছ গো মা?" বামনী বললে " আমার সব ছেলেমেয়েদের হারিয়েছি । এত পুজোআচ্চা সব বিফলে গেল আমাদের । সব অদৃষ্ট। ঠাকুর দেবতা বলে কিছ্ছু নেই । "
ষষ্ঠীবুড়ি বললেন " বারব্রত নিষ্ফল হয়না মা, ধর্মকর্ম যাই কর ঈশ্বরে বিশ্বাস চাই । তুমি মা-ষষ্ঠীকে মানো? তাঁর পুজো করেছ কখনো?  তিনি সন্তানদের পালন করেন । বামনী বললে " আমি এযাবতকাল সব ষষ্ঠী করে আসছি কিন্তু তবুও আমার ছেলেরা র‌ইল না ।
ষষ্ঠীবুড়ি বললেন্" তুমি নীলষষ্ঠীর পুজো করেছ কখনো? চৈত্র সংক্রান্তির  আগের  দিন উপোস করে শিবের পুজো করবে । শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে জল খাবে । সন্তান্‌দের মঙ্গলকামনা করবে"
বামনী সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে  পুনরায় মাতৃত্ব লাভ করলে । নন্দী সব শুনে বললে" বাবা, এ তো তবে তোমার নিজের ব্র্যান্ড ক্রিয়েট করলে তুমি । আর সবষষ্ঠীর পুজোয়তো মাষষ্ঠীর পাল্লা ভারী হয়ে যাচ্ছিল তাতে যদি তোমার নামডাকে ভাটা পড়ে তাই বুঝি এমনটি কল্লে তুমি?"মহাবাবা বললেন " দেখ নন্দী, এখন যা যুগ এয়েচে তাতে নিজের ব্র্যান্ড যে মূল্যেই হোক ক্রিয়েট করতে হবে । নয়ত তুই স্থান পাবিনা জগতে , যা কম্পিটিটিভ মার্কেট এয়েচে! লাখলাখ দেবদেবীর ভিড়ে মহাদেবকে কেউ আর মানবেনা ।          
আর এবার সেজন্যেই একসঙ্গে এসেচি আমরা। বাসন্তী-অশোক ষষ্ঠীও থাক। নীলষষ্ঠীও থাক। মানুষ জানুক রসায়নের জারণ-বিজারণের মত, পদার্থবিদ্যার স্থিতি-গতির মত শিব-দুগ্গার স্মরণ-মনন যুগপত ঘটে।  

১১ এপ্রি, ২০১৬

বাসন্তীপুজো এবং অথ অশোকষষ্ঠী কথা


মাদের দেশে শীতের শেষে চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে মাদুর্গার পুজোকে বাসন্তীপুজো বলে। শাস্ত্রে শরত ও বসন্ত এই দুই ঋতুকে বলা হয় "যমদংষ্ট্রা" অর্থাত এই দুই ঋতুতে মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধি ভোগ করে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। শরত এবং বসন্ত এই দুই ঋতুর আগমনেই ভারতবর্ষের মত গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী তাই আবির্ভূতা হন এই দুই সময়ে।
সূর্যের গতিপথে সূর্য ছয়মাস উত্তরদিকে ও ছয়মাস দক্ষিণদিকে গমন করে। উত্তরায়নের সময় দেবকুলের দিন আর দক্ষিনায়নে তাদের রাত্রি। 
 বসন্তকালেই দুর্গাপূজা নির্দ্দিষ্ট ছিল কারণ এই সময় সূর্যের উত্তরায়ণের ফলে দেবতারা জাগ্রত থাকেন। কিন্তু  শরতকাল হল সূর্যের দক্ষিণায়নের সময়। রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য এইসময় দেবতাগণকে জাগ্রত করে দুর্গাপূজা করেছিলেন। তাই রামচন্দ্র প্রবর্তিত শরতকালীন দুর্গাপুজোকে অকালবোধন বলা হয়।   
শস্যাধিষ্ঠাত্রী দেবীর আরেক নাম শাকম্ভরী।  একবার দুর্ভিক্ষের সময় দেবী দুর্গা তাঁর অর্থাত পৃথিবীর সমস্ত উত্পন্ন শাক দিয়ে জগত পালন করেছিলেন। শাককে এখানে সমস্ত প্রকার শস্যের প্রতিনিধি বলা হযেছে।  দেবী শাকম্ভরীর আরেক প্রকাশ হল অন্নপূর্ণা বা অন্নদা। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।  
পন্ডিতেরা আমাদের অন্নপূর্ণা ও দুর্গার সাথে মিশরের আইসিস ও গ্রীসের সিরিসের সাদৃশ্য খুঁজে পান। সিরিয়া, গ্রীস, সাইপ্রাস, এথেন্স ও ক্রীটে আমাদের দেশের মত শস্যদেবীর পূজা দেখা যায়। শরতকালে বাসন্তী বা দুর্গাপূজার মত পাশ্চাত্যে ইস্তারাদেবীর পূজা হয়। এই ইস্তারাদেবীর রূপটি অনেকাংশেই আমাদের দুর্গার মত। তিনিও সিংহারূঢ়া ও অসুর নিধনে মগ্ন। এই ইস্তারাদেবীর উত্সব সেখানে হয় বসন্তকালে ইষ্টারের সময়। মন্ডি থার্সডে , গুডফ্রাইডে, হোলি স্যাটারডে, ইষ্টার সানডে ও ইষ্টার মানডে এই পাঁচদিন ধরে আমাদের দুর্গাপুজোর মত উত্সব চলে।  


বাসন্তীপূজার দিন পশ্চিমবাংলার রীতি অশোক ষষ্ঠী পালনের। কি এবং কেন এই অশোক ষষ্ঠী?   




বহুযুগ আগে অশোকবনের মধ্যে এক ঋষির পর্ণকুটীর ছিল ।

একদিন সেই ঋষি স্নান সেরে ফেরার পথে অশোকগাছের নীচে এক সদ্য প্রসূতা কন্যাকে কাঁদতে দেখলেন । দৈবযোগে ধ্যানের মাধ্যমে ঋষি জানতে পারলেন কন্যাটি এক শাপভ্রষ্টা হরিণী মায়ের । ঋষি মেয়েটিকে আশ্রমে এনে লালন করতে লাগলেন । তার নাম দিলেন অশোকা । ঋষিকন্যা বড় হতে লাগল । যৌবনে উত্তীর্ণ হল  ।

এক রাজপুত্র মৃগয়ায় বেরিয়ে ঐ পরমাসুন্দরী অশোকাকে একদিন দেখতে পেয়ে তার পরিচয় জানতে পারলেন । ঋষিকন্যার সঙ্গে রাজপুত্রের কথোপকথনের মধ্যেই ঋষির আগমন হল সেই স্থানে । রাজপুত্র অশোকার পাণিপ্রার্থী হয়ে ঋষিকে অনুরোধ জানালে ঋষি যারপরনাই আনন্দিত হয়ে তাতে সম্মতি দিলেন ।

অশোকাকে রাজপুত্রের হাতে সঁপে দিয়ে ঋষি বললেন  :

" আজ থেকে তুমি রাজার ঘরণী হ'লে কন্যা । যদি কখনো বিপদে পড় আশ্রমে চলে এস । আর রাজপুরী থেকে চিনে একাএকা এই আশ্রমে যাতে আসতে পারো তাই এই অশোকফুলের বীজ তোমাকে দিলাম । এখন যাবার সময় এই বীজ ছড়াতে ছড়াতে যেও । পরে কখনো প্রয়োজন হলে এই বীজ থেকে উত্পন্ন অশোকগাছ বরাবর   চিনে পায়েহেঁটে তুমি চলে আসতে পারবে "

অশোকফুলের বীজ  সযত্নে আঁচলে বেঁধে নিয়ে অশোকা রাজপুত্রের সাথে পতিগৃহে যাত্রা করল । যাত্রাপথে বীজ ছড়াতে ছড়াতে চলল অশোকা । রাজপুরীতে পৌঁছালে রাজা-রাণী সস্নেহে তাদের বরণ করে ঘরে তুললেন । অশোকা আর রাজপুত্রের বাড়বাড়ন্ত সংসারে সুখের বন্যা । অশোকা ক্রমে সাত ছেলে ও এক মেয়ের মা হল । অশোকার শ্বশুর রাজামশাই মারা গেলেন শ্রাদ্ধের দিন অশোকষষ্ঠীর কথা বিস্মৃত হল অশোকা । ভাত মুখে দিয়েই মনে পড়ল ষষ্ঠীর কথা । রাতে শুয়ে পড়ল মনখারাপ নিয়ে । পরদিন ভোরে উঠে দেখল সাতছেলে-বৌ যার যার ঘরে মরে পড়ে আছে আশোকা তা দেখে ঋষির কথা ভাবলে । রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আশ্রম বরাবর চলতে লাগল ।

ততদিনে বীজ থেকে অশোকগাছ মহীরুহের আকার ধারণ করেছে । চৈত্রমাসে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে তার শাখাপ্রশাখা । ঋষির আশ্রমের কাছে এসেই  অশোকা ঋষিকে দেখে কেঁদে উঠলো । ঋষি ধ্যানের বলে সব অবগত ছিলেন । কন্যাকে সাথে করে রাজবাড়ী ফিরে গেলেন । কমন্ডুলু থেকে জল ছিটিয়ে  দিলেন  অশোকার মৃত ছেলে বৌ নাতিপুতির গায়ে  । দৈবগুণে সকলে চোখ মেলে চাইল ।

ঋষি বললেন অশোকষষ্টীর ব্রত পালন করলে  কখনো শোক প্রবেশ করবেনা সংসারে ।

৮ মার্চ, ২০১৬

নারীনক্ষত্র

 
ছবি- ইন্টারনেট 


দলে যাচ্ছে কি সমাজের পরিস্থিতিটা? আজ কি তবে আকাশের বাকী অর্দ্ধেকটা থেকে উড়ে যাচ্ছে সামিয়ানাটা? চাঁদের আলো কি পড়ছে আজ অন্ধকার বাকী অর্ধেক আকাশের গায়ে? দেখতে পাচ্ছি কি আমরা নারীর এগিয়ে চলা? নাকি পিছিয়ে পড়ছি আরো? এগিয়ে তো চলেইছি প্রতিনিয়তঃ। নয়ত কি মেরি কম, সুনীতা উলিয়ামস, কল্পনা চাওলার গল্প উঠে আসছে বারেবারে? রবিঠাকুরের কথায় বলতে ইচ্ছে করে


সে কি রহিল লুপ্ত আজি সব জন পশ্চাতে? ল‌উক বিশ্ব কর্মভার মিলি সবার সাথে।

নূতন যুগ সূর্য উঠিল, ছুটিল তিমির রাত্রি তব মন্দির অঙ্গন ভরি মিলিল সকল যাত্রী





আজ আমার নারী আমার সম্পূর্ণ আকাশ।

আন্তর্জাতিক নারীদিবস পালন তো একটা ছুতো। আসলে আমরা মেয়েরা মনেপ্রাণে রোজ‌ই চাই এমন দিন। আমাদের কেউ মাথায় তুলে রাখুক। আমাদের জন্যে ভাবুক, তাই তো আজ জমায়েত হয়েছি এই অঙ্গনে, শরতচন্দ্রের বাসভবনে। যে কথাসাহিত্যিক মেয়েদের নিয়ে লিখেছিলেন কত কত গল্প, উপন্যাস, শুধু তাদের স্থান দিয়েছেন তাঁর লেখনিতে। তাদের পারিপার্শ্বিক টানাপোড়েন এখনো আমাদের বারেবারে মনে করায় । লিঙ্গগত এই বৈষম্যের জন্য আমাদের গ্রামেগঞ্জের অন্দরমহলে কি দেখতে পাইনা সুষ্পষ্ট একটা বিভাজন? এখনো কি ঘটা করে পুত্রসন্তানের জন্য পায়েসের বাটি, মাছের মুড়োটি তুলে রাখা হয়না? ছেলের পড়াশোনায় বেশী খরচাপাতি করা হয়না? তারপর সেই কথা? আহা, ও ছেলে, ও কি আর রান্নাঘরে যেতে পারে অথবা ওর কি এসব করার কথা? এর পরেও রয়েছে কণ্যাভ্রূণ হত্যা, মেয়ে পাচারের মত ঘটনা। যে কোনো বয়সের মেয়েকে স্থান কাল পাত্র ভেদে শারীরিক উত্পীড়ন, ডাইনি সন্দেহে হত্যা করা কিম্বা বৃদ্ধ মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার মত মর্মান্তিক ঘটনা।


আর আমার বাংলার নিতান্ত সাদামাটা দশভুজা, আটপৌরে মেয়েরা? কন্যাশ্রী, কন্যা সমৃদ্ধি, বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও কত কত প্রকল্প! কত কত গালভরা নাম! কিন্তু তার প্রাপ্য সম্মানটুকুনি? তাকে পুরুষের সমকক্ষ হবার জন্য এগিয়ে দেওয়া? তাকে সুরক্ষা দেওয়া আরো কত কিছু আছে ভাববার! কিন্তু আজো যেন মা হওয়াতেই তার চূড়ান্ত সার্থকতা। আবার ভাবি মাসমাইনে নিয়ে বাড়ি ফিরে সম্মানের সঙ্গে ঘরে ফেরাটাই কি তার মুক্তির পথ, অর্ধেক আকাশ পাওয়া? নিজের পায়ে দাঁড়ানো নারীও কিন্তু যথাযোগ্য সম্মান পায়না সর্বদা। নারীর লড়াই তার নিজের সঙ্গে। সর্বদা অর্ধেক আকাশ জিতে নেবার জন্য।




তোমার জন্যে সিঁথেয় সিঁদুর, মঙ্গলসূত্র গলায়

ঝমঝমিয়ে চুড়ির সাথে, নোয়া, শাঁখাপলায়।

তোমার জন্য ঘোমটা দেওয়া, আলতাপাটি রাঙা

হাতের তেলোয় মেহেন্দিতে খয়েরডুমো ভাঙা।

তোমার জন্যে ভোরে ওঠা, অগোছালো আঁচল

সব সামলে, নাভিঃশ্বাসে ধেবড়ে চোখের কাজল।

তুলসীতলায় প্রদীপজ্বালা, নিতসিঁদুর ব্রত

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু এঁয়োস্ত্রীদের মত।





হঠাত মনে পড়ে গেল সুকান্ত ভট্টাচার্যের রানার কবিতার অমোঘ সেই লাইনটি! রানার গ্রামের ডাকহরকরা, রাতের পর রাত ক্লান্তিহীন, মানুষের সুখদুঃখের খবর সে পৌঁছে দেয় দোরে দোরে, কিন্তু তার খবর কে রাখে?

আমি বলি? রূপনগরের কন্যা, পছন্দপুরের গৃহবধূ কিম্বা নিশ্চিহ্নপুরের মা'টি? সেই কোন ভোর থেকে উঠে রাত অবধি সামাল দেয় সংসারে। ক্লান্তিহীন শরীরকে বুঝতেও দেয়না তারা। তারা জানে তাদের থকে যেতে নেই। এটাই জীবন। জোয়াল কাঁধে নেবার জন্য‌ইতো জন্মেছে তারা। পুরুষরা সারাদিন রুটিরোজগারের পর বাড়ি এসে তাদের চোখ রাঙাবে, ভুলভ্রান্তি হলে ক্ষমা করবেনা, সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মা, গৃহবধূ অথবা কন্যাটি সেই স্বামী বা সংসারের মঙ্গলের জন্য‌ই সন্ধ্যেবেলায় তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালবে, আবার রাতেরবেলায় শরীরে ঘামের গন্ধ দূর করতে ঠান্ডা জল ঢেলে এসে ডিওস্প্রে ছড়িয়ে নেবে স্বামীর মনোরঞ্জনের জন্য। স্বামী হয়তবা বলবে ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্সের খবর, এই তো তোমার আসল সিকিউরিটি। সব একাউন্টেই তার বৌয়ের সংগে জয়েন্ট নাম, আইদার অর সার্ভাইভার ! কিন্তু রূপনগরের কন্যা, পছন্দপুরের গৃহবধূ কিম্বা নিশ্চিহ্নপুরের মা'টির মনের খবর কে রাখে? সে মন তো খুব ঠুনকো। সুদৃশ্য কাঁচের জিনিস বন্দী বাক্সের অন্তঃপুরে, তার বাইরে লেখা আছে, Glass inside, handle with care! সেটা ক'জন খেয়াল রাখে?



আমার নারী গ্রীষ্মঋতুতে জ্বর এলে জলপটি

আমার নারী বর্ষা-শরতে শাড়ি তার ধুলোমুঠি । 

আমার নারীটি মায়ের মতন আধফোটা ভেজা শিউলি

ল্যাজাতে-মুড়োতে ঢেকেছে লজ্জা, কনে দেখা মেঘ গোধূলি  ।

আমার নারী হেমন্তে ধান নবান্নে  পোষ-লক্ষ্মী

পিঠেপার্বণে কয়লার আঁচে ওম্‌ নেওয়া যেন পক্ষী  ।

আমার নারী নিরাভরণা সে শাঁখায় সিঁদুরে লাবণী 

খড়কে ডুরেতে আটপৌরে সে বৈশাখী বা শ্রাবণী  ।

নিজের জন্যে বাঁচতে শেখেনি আমার শ্রীমতী নারী

ভাললাগাটুকু ঝেড়ে ফেলে বলে "ভালো আছি আমি  তোমারি"  !

আমার নারী বৃষ্টিশাড়িতে, উঠোনে ইলশেগুঁড়িতে

শীতরোদ্দুরে নকশীকাঁথায়, উলের গোলায় কাঁটাতে  ।

আমিও যে সেই নারীর কন্যা  খোলা বসন্ত উঠোনে

লজ্জা চাউনি আমার অঙ্গে  ভালোবাসার সে ফাগুণে । 




আজকেও কি মেয়েদের হয়ে কথা বললে আমাদের "নারীবাদী" আখ্যা দেওয়া হবে? সেই কবে পুরাণের গল্পেও তো দেখে আসছি অপ্সরাদের মুণিঋষিদের হাতে লাঞ্ছিত হবার ঘটনা। রামায়ণে দেখেছি সীতার অপমান, পাতাল প্রবেশের মত ঘটনা। মহাভারতে দেখেছি দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, কেশাকর্ষণের মত নারকীয় ঘটনা। এখনো কেন এইযুগে বসে যে দেখতে হবে এসব সেটার উত্তর কেউ দেয়না আমাকে।



আবারো আজকের দিনে স্মরণ করি কবিগুরুকে...


দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরি, আসিল যত বীরবৃন্দ আসন তব ঘেরি

দিন আগত ঐ ভারত তবু ক‌ই ?

স্থান দাও, স্থান দাও, দাও দাও স্থান হে জাগ্রত ভগবান হে, জাগ্রত ভগবান

প্রাণ দাও, প্রাণ দাও, দাও দাও প্রাণ হে জাগ্রত ভগবান হে, জাগ্রত ভগবান ।







১৩ ফেব, ২০১৬

জয় শীতলষষ্ঠী! বসন্ত এসে গেছে.....

 তোলা থাক শিলনোড়া আজ! জ্বলবেনা গ্যাস-উনুন।  শিলকে হলুদ জলে স্নান করিয়ে তেল হলুদ ছোপানো ঠান্ডা কাপড় পরিয়ে জোড়া শিম, জোড়া মটরশুঁটি রেখে তার কোলে রাখো তার সন্তান সম নোড়াটি। কাল সকালে তার এই ঠান্ডা জল থেকে মুক্তি।

শীতকাল আমাদের কেমন যেন একটু অলস করে দেয়। বিশেষতঃ বৃদ্ধরা যেন এইসময় আরো জরাগ্রস্ত, কুঁড়ে এবং ঘরকুনো হয়ে পড়েন। শীতের দাপট এখন আর তেমন দেখিনা কিন্তু একসময় মাঘে শীত পড়ত। তাই বুঝি "মাঘের শীত বাঘের গায়".. এই প্রবাদটি প্রচলিত।  মাঘের শেষে বসন্তপঞ্চমীতে গোটাষষ্ঠী বা শীতলষষ্ঠীর ব্রতকথা পড়তে পড়তে মনে হল সেইকথা। কাহিনীতে সংসারের কর্ত্রী এক বৃদ্ধা মাঘমসেও গরম ভাত খেতে চান আর উষ্ণজলে স্নান করতে চান। তার ফলে তাঁর বিপদ আসে।  আর ধর্মভীরু মানুষকে এই কাহিনী শুনিয়ে বলতে হয়, বসন্ত এসে গেছে, আর শীত নয়। গরম জামাকাপড় বাক্সে ভরো। ঠান্ডা জলে স্নান করো।  শরীর ঠান্ডা রাখো নয়ত রোগভোগ হবে। 

এতদিন শীতের দাপটে মানুষের শুধু গরম খাব, গরম পরব, লেপ, বালাপোষ রোদ খাওয়াব, একটু আলসেমিকে প্রশ্রয় দিয়ে আরো শীতকাতুরে হয়ে পড়ব....এই মনোভাবটির বুঝি বর্জন হল এইবার। কারণ বসন্ত এসে গেছে। এবার শীতকে বিদায় জানাতেই হবে। এখন গরম খেলে, গরম পরলে রোগের প্রকোপ বাড়বেই। তাই ঠান্ডা খাও, ঠান্ডা পরো, স্বাগত জানাও নাতিশীতোষ্ণ পরিমন্ডলকে।  তাই বুঝি শীতলষষ্ঠী।  
বাংলাদেশের সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা মাটির বুকে শক্তির আরাধ্যারূপে পূজিতা দেবী শীতলা, ষষ্ঠী, সকলেই মা দুর্গার অংশ বিশেষ। শাস্ত্রে শরত ও বসন্ত এই দুই ঋতুকে বলা হয় "যমদংষ্ট্রা" অর্থাত এই দুই ঋতুতে মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধি ভোগ করে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। শরত এবং বসন্ত এই দুই ঋতুর আগমনেই ভারতবর্ষের মত গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী তাই আবির্ভূতা হন এই দুই সময়ে। ঈশ্বরে বিশ্বাস আর সেই বিশ্বাসের ভেলায় চেপে সংসারসমুদ্রের ঝড় সামলাই আমরাও । অযথা তর্কে না গিয়ে অনেকেই সংসারের বিপদমোচনের জন্য এই শীতলষষ্ঠী ব্রত করে থাকি ।  আর তাই

শ্রীপঞ্চমী থাকিতেই গোটাসিদ্ধ করিও
জোড়া জোড়া ষড় আনাজ গোটামুগে ফেলিও।
গোটা শুকনোলংকা, তাও দিও জোড়ায়
লবণ, সরিষার তেল ঢালিও শেষ ফোটায়।
আতপচালের পান্তা ভাতে, জল ঢালিও রাতে
টোপাকুলের অম্বল রাঁধিও, সজনেফুল সাথে।
টক দৈ খাইও শেষে, ঠান্ডা, ঠান্ডা সবই
শীতলষষ্ঠী পালন হোক, এই তো আমরা চাহি।


৫ ফেব, ২০১৬

শীতকালীন জার্নাল

 (১)  
কেমন যেন হুড়মুড়িয়ে বড়দিনের সকাল 
কেমন যেন ওম জড়ানো মিষ্টি রোদের সকাল 
তবুও যেন একটা বড় মনের বড়ই আকাল !  

কেমন যেন ঠান্ডা হাওয়ায় কমলা খোসার নূপুর  
কেমন যেন কুয়াশাতে অকাল টাপুরটুপুর 
তবুও যেন মনখারাপ আর বছর শেষের দুপুর ! 
কেমন যেন  শীতের বিকেল উষ্ণ প্রদোষ আলো । 

কেমন যেন ঈশাণ কোণে হালকা মেঘের ছোঁয়া
 আজ বিকেলের কয়েক পশলা  রেশমী উলের রোঁয়া । 
আমি যেন বদলে গেছি হয়ত বা সেই ভুল
আমি যেন আমিই আছি কিম্বা সর্ষেফুল । 
আমি যেন রাতদুপুরে তোমার কথা ভাবি 
সময় হলে খুঁজে দিও স্বপ্নলোকের চাবি । 


 (২)
কেকমাস আজ মধুমাস, ক্রিসমাস পোষমাসে
একাকার হল হাড়মাস, শীতমাস সব্বোনেশে !
বাকী তিনমাস পর পচামাস তাই বাঁচো ভাই বেশ কশে
আজ ক্রিসমাস, ঝোলাগুড় খাস আর কেক খাস বসে বসে ।


(৩) 
 উলটে দ্যাখো শীতকে। পালটে গেছে কলকাতার শীত । মুঠোমুঠো রোদের কণায় একভর্তি ব্যালকনি । রোদের উঠোনে আরাম চেয়ারে হেলান দিয়ে আমি । গায়ে ওষ জড়ানো পশমিনা । পায়ে মোজা । ব্যালকনির সামনের ফুটপাথে সারেসারে পথশিশু । আদুড় গা কারো। কারো সোয়েটারের হাত ছেঁড়া । নাক দিয়ে দুরন্ত গতিতে শ্লেষ্মা । ভ্রুক্ষেপ নেই কারো । খেলে বেড়াচ্ছে । রাত হলে ঘরে গিয়ে খাবে দুপুরের জলঢালা ভাত দুমুঠো আর সাথে পাড়ার দোকানের গরম ফুলুরি আধখানা হয়ত । কপালে থাকলে এককুটি চারামাছ ।
আমাদের শিশু এসব বোঝেনা । তার জীবন জুড়ে " লাইফ অফ পাই" অথবা ডোমিনোস এর কুপন কিম্বা বাসকিন রবিনস এর জাগলিং ।
"কারো পোষমাস কারো সর্বনাশ" !!!

(৪)  
"মাঘের শীত বাঘের গায়"..... তো কি? শীতও চলে যাবে । মাঘের রোদের ওম্‌ জড়িয়ে রাজকীয় কায়দায় বাঘ চলে যাবে জঙ্গলের মধ্যে । বেচারা বাঘ! বোঝেওনা সে । নিছক শিকারের খোঁজে বেরোবে সে । নিজের জন্যে আর বাচ্চাটার জন্যে । জানেনাতো নরসিংহেরা ওত পেতে থাকে তার জন্য । তাদের শীত নেই গ্রীষ্ম নেই । তাপ-উত্তাপ কিছুই নেই । মাঘ গিয়ে ফাগুন আসবে ।
বাঘের রোদ পোহানোর দিনের শেষ আর কাগজ খুলে আমরা দেখে যাব সেই নিরীহ বাঘকে মারার নাটকীয় খবর ।
এমনি করেই চলবে আমাদের জীবন । নৃশংসভাবে, নোংরাভাবে, নারকীয় ভাবে......

 (৫) 
শিকেয় তোলা থাক ক'দিনের ঘুমপাড়ানির গান, রেওয়াজের সরগম চিলেকোঠার মাচায়।  আপাততঃ কবিতার খুচরো পঙতি আটকে থাকুক কাপড় মেলার তারে । এলোমেলো ভাবনার গদ্যগুলো ঝরে যাক নিজের মত ড্র‌ইংরুমের দেওয়ালের পুরোনো নোনা ধরা বালিগুলোর সাথে । তোমাদের হাসিগুলো নিশ্চিন্তে দিনকয়েক ঘুমিয়ে পড়ুক কবিতার ওষুধ খেয়ে । আমিও পথ হয়ে এঁকেবেঁকে আসছি তোমাদের কাছে, সেই  ফুরিয়ে যাওয়া ডাল-ভাতের আমি, সেই ধোপা-নাপিতের হিসেবের আমি, সেই না বলা অল্পের আমি হয়ে, মুঠোফোনের রিংটোন হয়ে.....

২৫ জানু, ২০১৬

পিকনিক-২০১৬


বনভোজন-২০১৬   

ডিজিটাল ক্লিকে মুখর নৌকাবিহার
সদলবলে নৌকায় গঙ্গাবক্ষে

 আমি তরী নিয়ে বসে আছি নদী কিনারে...

থ্রি মাস্কেটিয়ার্স



এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার রায়পুর। গঙ্গার ধার, মাঘের শীত বাঙালীর তসরে, পুলওভারে, টুপিতে, পশমিনা চাদরে। কনকনে হাওয়া, মিঠে রোদে ভেসে যাওয়া সকালে বনভোজন। আমাদের Praxis Buisness School এর annual picnic ! সারাবছর আমরা এইদিনটার জন্য মুখিয়ে থাকি। অনিতা আর জয়দীপদা লেট করতে করতে অবশেষে আমাদের তুলল ঠিক গাড়িতে। তারপর চারটে গাড়ির কনভয় অবশেষে নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছল। ফুলকো ফুলকো লুচি আর কড়াইশুঁটি দেওয়া সাদা আলুচচ্চড়ি। তারপরেই ডাবের জল আর ভদকা কিম্বা পাতি বিয়ার।সঙ্গে শীতসব্জীর পকোড়া, চিকেন পকোড়া আর রুইমাছ ভাজা। নদীর ধার দিয়ে ডিঙিনৌকায় চলে মাছওয়ালা....
কি মাছ আছে? উত্তর এল খোকা ইলিশ।
খেলবনা।
কেন ম্যাডাম?
ধরেছো কেন?
কি খাব? আপনারা কিনলে একটু রোজগার হয়, ভালো দাম পাব, এই দেখুন, একদম লড়ছে, ডিম হয়নি। আজ যেকটা ধরেছি সব আপনাদের দি‌ই তবে?
বললাম, কথা দিতে হবে, আর ধরবেনা।
এই শীতকালেই তো পিকনিক পার্টির রমরমা, তারপরেই হাতখালি। কিছুই নেই বাংলায়।ছেলেপুলেদের পড়াশুনো করিয়েও লাভ নেই । অগত্যা মাছ ধরেই বেচি। তারপর অসুখবিসুখ, নৌকো মেরামতি, ঘরের খড়, জমির ধান, মেয়ের বিয়ে...কোথায় যাই? মাগঙ্গার সাথেই ওঠবোস, গঙ্গার কাছেই সারাদিন মিনতি জানাই, শরীল থাকতি নিয়ে নাও মা।
মাছ ছিল সর্বসাকুল্যে এককেজি দুশো গ্রাম। তাই স‌ই। কেটেকুটে খাবি খাওয়া মাছভাজা সকলেই খেল চেটেপুটে। মন মানলোনা। কামড় দিয়েই মনে হল হায়রে দারিদ্র্য! কোথায় মাগঙ্গা! কোথায় সেই ছোটবেলা? এককিলোর কম ইলিশ আমরা চোখেই দেখিনি। জেলেটির কথাগুলো‌ও তো ফেলতে পারিনা। খোকা ইলিশ ধরা বন্ধ করা হল কিন্তু এই জেলেটির সেদিনের ভাত কে জোটাবে? তবুও তো পেল পাঁচশোটা টাকা। এরপরেই সবশুদ্ধু নৌকাবিহার। ম্যাডামদের হাতে ডাবেরজল মিশ্রিত ভদকার গ্লাস, পেপার ন্যাপকিনে মোড়া পকোড়া আর মাছভাজা.....কত গান, কত ফূর্তি আমাদের্! ভেসে গেলাম গঙ্গাবক্ষে টানা একটা ঘন্টা । কনকনে উত্তুরে হাওয়ায় আমাদের শাল-দোশালা, জ্যাকেট, সোয়েটার টুপি, মাফলার আরো কতকিছু শীত অনুষঙ্গে মাঘীশীত জমে দৈ! গরম ভাত আর মাটনকারিতে ভরাপেটে আবার ভরা মানে তেলা মাথায় তেল বা Carrying Coal to New Castle । তারপরেই জয়মা বলে গঙ্গার ধারে ভাসাও থার্মোকলের থালার তরী! পরপর গঙ্গার ধারে পিকনিক স্পট। পিকনিক স্পটের মালিক পয়সা নিয়েছে। রসিদ দিয়েছে। কিন্তু কোনো ট্র্যাশ ফেলার জায়গা নেই। মাননীয় সরকারী অফিসাররা, আপনারা কি নৌকাবিহারে যান? তবে দেখে আসুন গঙ্গার ধারের আবর্জনাগুলো। এখনো কত জাহাজ চলে এই গঙ্গায়। এখনো কত জল, কত সুন্দর তার রূপলালিত্য!

চড়ুইভাতি-২০১৬
এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ফলতা  

আমরা এমনি এসে ভেসে যাই...।গানে, কবিতায়, নাচে, কুইজে... 

জগদীশ চন্দ্র বসুর বড়ি... দূর থেকে...

এখনো সে বৃন্দাবনে বাঁশী বাজেরে...

 
"আপ্‌কো কিতনা বার বোলা থা, জলদি আনেকে কে লিয়ে? হমলোগ ব্রেকফাস্ট খায়েঙ্গে ন'বাজে। যাইহোক অব স্টার্ট তো কি জিয়ে।" সাড়ে আটটায় ছাড়ল টাটা উইঙ্গার। সদলবলে আমি দক্ষিণ কলকাতা পাঠচক্রের সদস্যাদের নিয়ে।
সাদার্ণ এভিনিউ আসতেই গাড়ি বাঁদিকে ঘুরছে। কেন? কেন আবার? ডানদিকে ফলতা যদিও কিন্তু ডায়মন্ডহারবার দিয়ে গেলে "গঙ্গাসাগর মে হমারা গাড়ি পাকড় লেগা" মতলব? বারুইপুর, আমতলা ঘুমকে জানা হ্যায়। তার মানে? কড়াইশুঁটির কচুরী-কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা দিয়ে আলুর তরকারী, চা, নলেনগুড়ের সন্দেশ ভোগে? পেছনের সিট থেকে প্রবাসী শুভশ্রীদির হুঙ্কার শিট্‌! আমার বাঁদিক থেকে মনীষামাসীর অনুযোগ...আপনার তো বোলনা চাহিয়ে থা! ডান দিক থেকে বন্দনাদি তখন তারস্বরে গেয়ে চলেছে..." আমার পরাণো যাহা চায়....তুমি তাই...." অমিতামাসী বলে উঠল, তুই চুপ্‌ করবি বন্দনা? আমার মাইগ্রেন শুরু হয়ে গেল। বাড়ি থেকে শুধু এককাপ চা খেয়ে বেরিয়েছি আমি" আবার শুভশ্রীদি রোদচশমাটা মাথার ওপরে তুলে বলে উঠল, ডিসগাস্টিং! দিস ইস কলকাতা! আমি তখন ড্রাইভারের সাথে বলে চলেছি, এডভান্স লেনে কা টাইম মে ইয়ে মালুম নেহি থা? বলতে না বলতেই হুশ্‌ করে গাড়ি এসে পড়ল। ড্রাইভার বলে কিনা উতর যাইয়ে! হমারা গাড়ি নেহি হ্যায়! মালিকনে বাতা দিয়া....ব্লা, ব্লা, ব্লা....তখন উনি মানে আমার হিরোটি বলে উঠলেন
" অগর হমলোগ উতর জায়েঙ্গে তো আপ জিন্দা নেহি ঘর পৌঁছেঙ্গে....." উরিব্বাস! একদম অক্ষয়কুমার মার্কা ডায়লগ! পেছন থেকে মিসেস বালসারা তো ভয়ে, কুঁকড়ে অস্থির। আমাদের আরেকটি প্রাইভেট কার তখন ফোন করে বলছে, এই শোনো আমরা না ডায়মন্ডহারবারের পথ দিয়েই চললাম...
এক মাসীমা বলে উঠলেন, তো?
ফলতা আসতেই একজন বলে উঠলেন, "ইতনা সংকীর্ণ গলি মে কিঁউ ঘুসা?" আর আমরা হেসে কুটি আর পাটি।
এই করতে করতে অবশেষে ফলতা পৌঁছে যেন মনে হল বিশ্বজয় করেছি। কে যেন গাড়িতে বলছিলেন তাঁর অম্বল হয়েছে। কার যেন গ্যাসের ব্যাথাটা বাড়ছিল। কেউ একজন মাইগ্রেনে কষ্ট পাচ্ছিলেন। আর আমার টেনশনযুক্ত এহেন মনের অবস্থা, পেটের ভিতর ছুঁচোবাবুর ডন-বৈঠক দেওয়া....সবকিছুর আগুণে জল পড়ল। গঙ্গার ধারে টেবিল পাতা লোকনাথ রেসর্টে কি ভালোই আয়োজন করেছিলেন আমাদের কলকাতার ঠাকুর(ওরফে কেটারার)..টোপা টোপা, পুর ঠাসা, বটলগ্রীন রংয়ের কড়াইশুঁটির কচুরী পেয়ে মুখে সব কুলুপ এঁটে বসে গেল চুপচাপ। ঝগড়া তখন মাথায়। গাড়ির কাজিয়া রণে ভঙ্গ দিয়েছে ততক্ষণে। তাপ্পর ছোট ছোট জগদীশবাবুর বাড়ি দেখতে। আঃ মলো যাঃ! বোস ইন্সটিট্যুটের সরকারমশাইরা আমাদের ঢুকতে পর্যন্ত দিলনি! আমরা এতোই অছ্যুত! তা বাপু আমরা আমাদের মত সব গেম খেলিচি অনেক। সিনিয়র সিটিজেন মাসীমাদের স্মৃতিতে শান দি‌ইয়েচি বাপু...মেমারি গেম খেলিয়েচি, ক্যুইজ হল, ডাম্ব-শারড, ছোট্ট ক্লু থেকে অণুগল্প ( ৫ মিনিটে পাঁচ লাইনে) সব করিচি।খেলতে খেলতে সেকেন্ডরাউন্ড চা আর পকোড়া এল। মাসীমাদের কি খুশি! তাপ্পর হেব্বি লাঞ্চ করিচি...মেইন কোর্সে দ‌ইমাছে আখাম্বা কাতলা ছিল আর চিকেন চাঁপ। ও হ্যাঁ, মধুরেণ সমাপয়েত আমসত্ত্ব-আলুবখরার চাটনী আর নলেন গুড়ের রসোগোল্লা! জেরিয়াট্রিক এই মহানগরে এই মানুষগুলি আমার বড্ড ওয়েল উইশার। এরা বছরের এই একটি দিন বসে থাকেন আমার মুখ চেয়ে। কবে আমি একটু নিয়ে যাব এদের পিকনিকে!

১৪ নভে, ২০১৫

ভাইফোঁটা


কার্তিকের শুক্লা প্রতিপদ কিম্বা দ্বিতীয়া । নরকাসুর বধ করে কেষ্টাদা সবেমাত্র ফিরেছেন ঘরে। বোন সুভদ্রা দাদার মুড বুঝে নিল চটপট। আগের দিন দেওয়ালির রান্নাঘর থেকে ঘিয়ের গন্ধ তখনো পুরোপুরি যায়নি চলে। রান্নাঘরে গিয়ে দুখানা মুচমুচে নিমকি, গোটাকতক ম্যাওয়া কুচোনো লাড্ডু, সোহন পাপড়ি আর এক ভাঁড় রাবড়ি এনে দাদার মুখের সামনে ধরল। কেষ্টদা তো মহা খুশি। একে মিশন সাকসেসফুল...দুষ্কৃতের বিনাশ করে সাধুদের পরিত্রাণ করতে চলেছেন বলে মহা ফূর্তি মনে আর দুই দেওয়ালির সুহাগ রাতে অগণিত গার্লফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে ছাদে গিয়ে কখন ফষ্টিনষ্টি করবেন সেই অহ্লাদে ভরপুর তাঁর মেজাজ। বিদ্যুতলতারা সকলে শৃঙ্গারে ব্যস্ত তখন। কেউ কেতকী-কুর্চি-কদম্ব প্রলম্বিত জলে স্পা নিচ্ছেন। কেউ আবার কর্পূর-কেওড়া-অগরুর জলে গাত্রমার্জনা করে সুগন্ধা হচ্ছেন। কেউ ধূপের ধুনোয় কেশ শুষ্ক করে ফুলের মালা জড়াতে ব্যস্ত।

কেষ্টদার দুই গৃহিণী সত্যভামা আর রুক্মিনী বৌদির মেজাজ একটু ক্ষেপে আছে আজ। একে বহুদিনের অদর্শণে প্রাণের ভেতরটা আঁকুপাঁকু অন্যথায় আসামাত্র‌ই ননদিনী সুভদ্রা কেষ্টদাকে চিলের মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে গেল তাদের কাছ থেকে। তারপর যদিও ননদিনী ছাড়বে তাদের কর্তামশায় তো এবার যাবেন ছাদের ওপর কিম্বা নদীর তীরে। একে কার্তিকের আকাশে রাসপূর্ণিমার হাওয়া ব‌ইল বলে !
সুভদ্রা বলল, দাদা মনে আছে কালকের কথা? এবারে কিন্তু আরো বড় উপহার চাই। ঐ ময়ূরের পালক, কদমফুলের আর্মলেট আর জাঁতিফুলের মুকুটে কিন্তু চলবেনা বলে দিলাম। এবার ডাবল ধামাকা কিন্তু। একে ভাই ফোঁটা তায় নরকাসুর বধ হয়েছে। অতএব ট্রিট চাই বস!
কেষ্টাদা মুখটা বেঁকিয়ে বললেন, তা আমাকেই বা কেন বধ করা বারেবারে? আরো একজন দাদাও তো আছে নাকি। সুভদ্রা বলল, তুমি তো গেছ নরকাসুর নিধন করতে। বলরাম দাদা? তিনি তো দ্রাক্ষারসে অবগাহন করে পড়ে রয়েছেন সেই ধনতেরস থেকে।

কেষ্টাদা প্রমাদ গনলেন। চটপট স্মার্টফোনে দেখে নিলেন ব্যাংকে কিছু পড়ে আছে কিনা। সুভদ্রাকে বললেন, ঠিক হ্যায় তব। মানাও ভাই দুজ, ঘটা করে ভাইফোঁটা হোউক! !!!

রুক্মিনী, সত্যভামা বৌদিদ্বয় শশব্যস্ত হয়ে গাত্রোত্থান করে বাজারের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।হাজার হৌক রান্নাবাটিতো তাদেরি করতে হবেক। আরতো সকলে সুখের পায়রা! যদি আবার নন্দাই বাবু অর্জুন এসে পড়েন তাহলে আর কথাই নেই! জামাই বলে কথা! বৌদিরা আবার নন্দাইকেও ভাইফোঁটা দেয়।

১২ নভে, ২০১৫

দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো


কালীপুজোর অমাবস্যার দিনে পশ্চিমবঙ্গীয়দের রীতি  দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো করার। ব্রতকথা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম অনেক কিছু। লক্ষ্মীপুজো করলেই যে অর্থাগম হবে, ঐশ্বর্য্যপ্রাপ্তি হবে এ বিশ্বাস আমি করিনা তবে সব ধর্মের মূল কথা "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর" এই আপ্তবাক্যটি আমি মানি। আর গল্পটি এযুগেও বেশ যুক্তিসম্মত বলে মনে হল। কারণ আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। ঈশ্বর, মানুষ, পুজোআর্চা এসবকিছুই  তো মানুষের মনগড়া। এই অনুষঙ্গগুলি জীবনযাপনের উপলক্ষ্যমাত্র। 

দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো ব্রত কথা
 
এক রাজার পাঁচ মেয়ে ছিল। একদিন সকলকে একত্র করে রাজা তাঁদের জিগেস করলেন, তোমরা কে কার ভাগ্যে খাও? ছোটমেয়েটি অত্যন্ত সপ্রতিভ উত্তর দিল।

সে বলল "মা লক্ষ্মী খাওয়ান আমাদের। মানুষের কি সাধ্য যে সে নিজে খাবে। মানুষতো উপলক্ষ্য মাত্র। আমরা সকলেই নিজের ভাগ্যে খাই বাবা"

কন্যার কথায় রাজা তো অগ্নিশর্মা। সাথেসাথে তিনি জ্বলে উঠে বললেন, "রাজার মেয়ে তাই কিছু বুঝতে পারলিনা। এ জীবনে অর্থ, যশ প্রতিপত্তির জোরেই আমরা সকলে বেঁচে আছি। ঠিক আছে, ভালো কথা। কাল সকালে আমি যার মুখ আগে দেখব তার সাথে তোর বিয়ে দেব। তখন দেখব তুই কি করে আর কার ভাগ্যে খাস"

রাণী সেই কথা শুনতে পেয়ে প্রমাদ গনলেন। রাজপুরীতে সকলকে সাবধান করে দিলেন, কেউ যেন পরদিন রাজবাড়ির মুখো না হয় আর রাজধানীর সব দোকানপাট সব বেশ বেলায় খোলার পরামর্শ দিলেন। যাতে রাজার চোখের সামনে কোনো ব্যক্তি এসে পড়ে। প্রজারা ঢেঁড়া পিটিয়ে সেই খবর চালু করে দিল। সেই কথা জানতে পেরে অন্য একপ্রদেশের গরীব বামুন তার ছেলেকে সঙ্গে করে চুপিচুপি রাজ অন্তঃপুরে এসে লুকিয়ে থাকল সেদিনের মত। পরদিন ঘুম ভাঙতে রাজার চোখে পড়ল সেই গরীব বামুনের ছেলেটি। রাজা তাঁর ছোটমেয়ের বিয়ের আয়োজন করলেন সেই ছেলের সাথে আর বিদায়বেলায় মেয়েকে বললেন, "দেখি এবার কেমন তুই নিজের ভাগ্যে খাস!”

গরীব বামুন রাজকন্যাকে ছেলের বৌ করে, পুত্র আর বৌমাকে সাথে নিজের কুঁড়েতে ফিরে এল। রাজকন্যা স্বামী-শ্বশুরকে বলে রাখল, যখনি তারা বাড়ির বাইরে থেকে ঘরে ফিরবে রাস্তায় যা পাবে তা যেন কুড়িয়ে নিয়ে আসেন, খালি হাতে যেন না ফেরেন। একদিন বামুন ফেরার পথে রাস্তায় একটি মরা কালকেউটে পড়ে থাকতে দেখল। সেটিকে ঘরে এনে রাজকন্যাকে দেখালো। রাজকন্যা বললে ওটিকে ঘরের চালে ফেলে রাখুন, কাজে আসবে। এবার সেদেশের আরেক রাজার ছেলে কঠিন অসুখে পড়েছে। রাজবৈদ্য এসে জানালো কালকেউটের মাথাটা পেলে তিনি রাজপুত্রকে সারিয়ে তুলতে পারেন। রাজা ঢেঁড়া পিটিয়ে খবর করলেন, যে ব্যক্তি তাঁকে মরা কালকেউটের মাথা দিতে পারবে সে যা চাইবে তাই পাবে।

রাজকন্যা সেই কথা শুনে শ্বশুরকে বললে, "ঢ্যাঁড়াদারদের ডেকে আমাদের ঘরের চালে যে মরা কেউটে রাখা আছে তার মাথাটা রাজাকে দিয়ে আসুন তবে তার বিনিময়ে কিছু চাইবেননা"

রাজবৈদ্য সেই মরা কেউটের মাথা থেকে ওষুধ তৈরী করে রাজ্পুত্রকে তা খাওয়াতে সে সুস্থ হয়ে উঠল। রাজা মহা খুশিতে বামুনকে ডেকে পাঠালেন। যাবার আগে রাজকন্যা শ্বশুরকে বলে দিল যে কার্তিকমাসের অমাবস্যা তিথিতে রাজধানীর কোথাও যেন বিন্দুমাত্র আলো না জ্বলে। এইকথাটুকু রাখলেই হবে, বিনিময়ে কিছু চাইনা তাদের। বামুন সেকথা রাজাকে জানালো। রাজা বললেন কার্তিকমাসের অমাবস্যায় রাজধানীতে যেন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার থাকে। যে আলো জ্বালাবে তাকে দন্ড পেতে হবে।

এদিকে রাজকন্যা সেদিন নিজে উপোস করে তার কুঁড়েটি গোবর দিয়ে নিকিয়ে পিটুলিগোলার আলপনা দিয়ে ফুলচন্দন-মালা, ধূপ-ধুনো দিয়ে যতসামান্য আয়োজনে মালক্ষ্মীর জন্য ঘট পেতে তাঁর আগমনের অপেক্ষায় বসে র‌ইল।

ঐদিনে সর্বত্র ঘোর আঁধার আর রাজকন্যার কুঁড়েতে প্রদীপের আলো জ্বলা দেখে মালক্ষ্মী সেখানে অবতরণ করলেন। তুষ্ট হয়ে নিজের পায়ের নূপুরটি রেখে গেলেন কমলাসনে। এরপর যা হয় বামুনের ঐশ্বর্য আর দেখে কে! ধীরে ধীরে তাদের মালক্ষ্মীর কৃপায় অবস্থা ফিরে গেল। একদিন বামুন ঠিক করল বাড়ির পাশে একটি পুকুর কাটাবে। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিনে দলেদলে লোক এল। রাজকন্যা জানলা দিয়ে হঠাত দেখতে পেল তার একদা রাজ-চক্রবর্তী বাপকে। তিনি আজ হতদরিদ্র। পুকুর খননের কাজে এসেছেন তাদের গ্রামে। পুকুর খননের কাজ শেষ হলে রাজকন্যা সকলকে খাওয়ালে। দরিদ্র পিতাকে যখন ভাত বেড়ে দিতে যাবে তখন তিনি কেঁদে বললেন, আমার ঠিক তোমার মত একটি মেয়ে ছিল। এদ্দিনে সে কোথায় আছে, কেমন আছে কিছুই জানিনা আমি। রাজকন্যা বাবার কন্ঠস্বর চিনে ফেলেছে এর মধ্যে। বাবাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললে, বাবা, তুমি যে আমায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছিলে , এই দ্যাখো আমি কেমন এখনো নিজের ভাগ্যেই খেয়ে পরে বেঁচে আছি। সেই পরীক্ষার শেষ হয়েছে বাবা। দরিদ্র বাপ তখন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোর কথাই ঠিক মা, আজ আমি নিজের অহঙ্কারে সর্বস্বান্ত। সত্যি‌ই বলেছিলি তুই। মানুষ নিজের ভাগ্যেই খায়।অর্থ-যশ-প্রতিপত্তি থাকলেই হয়না রে। মানুষের ভাগ্য‌ই মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। নয়ত আমি আজ ফকির হয়ে গেছি আর তুই আজ রাজরাণী! ঈশ্বরবিধাতাই সব মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন।

রাজকন্যা বললে, "বাবা এবার থেকে তোমার ঘরে কার্তিকমাসের অমাবস্যার দিনে লক্ষ্মীপুজো করো। আবার তোমার হৃত ঐশ্বর্য্য সব ফেরত পাবে।"

......
শেষলাইনটি কতটা সত্যি জানিনা তবে ভাগ্যে আমিও কিছুটা বিশ্বাসী। আর তোমরা?

৯ নভে, ২০১৫

ধন-তেরস

আকাশে বাতাসে ধ্বনির ত্রাস, পালন করছি ধন-তেরস 
ধন কিনতে পকেট হ্রাস, সোনারূপোয় গিলছি গ্রাস  !   

  • সকল দ্বন্দ বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো, সেই তো তোমার ভালো....

সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চতুর্দশীর আগের দিন অর্থাত ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস নামে উত্সব পালন হয় । পুরাণের গল্পে আছে সমুদ্রমন্থনের সময়কালীন এক গল্প। ঐশ্বর্যের ভারে অহংকারী দেবরাজ ইন্দ্র সকলকে খুব হেয় করছিলেন। একদিন দুর্বাশা মুনি তাঁর গলার পারিজাতের মালাটি অত্যন্ত স্নেহের সাথে হাতির পিঠে চড়া ইন্দ্রকে গলায় পরিয়ে দিতে যান। মালাটি ইন্দ্রের গলায় না পড়ে হাতির দাঁতের ওপর গিয়ে পড়ে ও হাতি ততক্ষণাত সেই মালাটিকে শুঁড়ে করে মাটিতে ফেলে দেয়। তা দেখে দুর্বাসা অতীব ক্রুদ্ধ হন ও দেবরাজকে "লক্ষ্মী চ্যুত হও" এই বলে অভিশম্পাত করেন। মুনির এই অভিশাপে দেবরাজ ইন্দ্র অসুরদের পরাজয় লাভ করেন ও রাজ্য, সিংহাসন, লোকবল সব হারান। অসুররা তখন স্বর্গের মালিকানা পান ও লক্ষ্মীদেবী সহ সমগ্র দেবতাকুল পালিয়ে গিয়ে সমুদ্রের অতলে আশ্রয় নিলেন। দেবকুলের এহেন সমূহ বিপদে দেবরাজ ইন্দ্র প্রজাপিতা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। তিনি সব শুনে বললেন একমাত্র বিষ্ণুই পারেন দেবতাদের বিপন্মুক্ত করতে। আর তখনি শুরু হল সেই মহাকার্য যার নাম সমুদ্রমন্থন। সমুদ্রের গভীরে নাকি "অমৃত" নামে এক অমোঘ সঞ্জিবনী সুধা আছে যা পান করলে দেবতারা অমরত্ব লাভ করবেন। বিষ্ণুর আদেশে মন্দার পর্বত হল সমুদ্রমন্থনের দন্ড। আর নাগরাজ বাসুকী হল মন্থনের রজ্জু। মন্দার পর্বতকে বাসুকী তার সমগ্র শরীর দিয়ে বেষ্টন করে র‌ইল আর দেবতারা দুইদিক থেকে তার মুখ ও লেজ ধরে টানতে লাগলেন। শুরু হল ভয়ানক সমুদ্রমন্থন প্রক্রিয়া। ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত নামে হস্তী, চন্দ্র, উচ্চৈঃশ্রবা নামক অশ্ব, বৈচিত্রময় মণিমাণিক্য, পারিজাত নামক স্বর্গের নান্দনিক পুষ্পবৃক্ষ সব উঠে আসতে লাগল একে একে । এরপর অমৃতের ভান্ড হাতে উঠলেন দেবতাদের চিকিত্সক ধ্বন্বন্তরী। আর সবশেষে বাসুকীরাজের সহস্র ফণারূপ ছত্র মাথায় উঠে এলেন মা লক্ষ্মী।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতেই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধ্বন্বন্তরী। তাই এই তিথির নাম হল ধনতেরস। তাই এই দিনটিতে ধনের উপাসনা করতে হয়। আর তার ঠিক পরেপরেই লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়। সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেদিন নাকি ছিল কার্তিক অমাবস্যা। তাই লক্ষ্মীকে বরণ করে স্বর্গে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুষ্ঠানটিতে আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল স্বর্গকে।

  • ডুব দে রে মন কালী বলে, হৃদি রত্নাকরের অগাধ জলে...

দীপাণ্বিতাই বল কিম্বা দীপাবলী অথবা ধনতেরসে লক্ষ্মী-গণেশের পুজো...উদ্দেশ্য একটাই ধনাগম ও শ্রীবৃদ্ধি। তবে কোথাও যেন কালীর সাথে সবকিছু একাত্ম হয়ে যায়। বাজি পোড়ানো, আলোর উত্সব, মিষ্টিমুখ, উপহারের আদানপ্রদান সবকিছুই যেন সেই সনাতন ধর্মের সৌহার্দের বার্তা বহন করে আনে।  কালী করেন অশুভ শক্তির বিনাশ আর লক্ষ্মী ঘটান শ্রীবৃদ্ধি। দেওয়ালী হল মিলনোত্সব, দীপাণ্বিতা সেই উত্সবে আলোর রোশনাই। 

২১ অক্টো, ২০১৫

সন্ধিপূজা? তার আবার বিশেষত্ব কি ?


রামায়ণে আছেঃ 

শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পুজো চলতে লাগল । সপ্তমীর দিন দেবী স্বয়ং রামের ধনুঃশ্বরে প্রবেশ করলেন । অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নিলেন । অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করলেন রামচন্দ্র ।
দেবী দুর্গা নাকি এই দুইতিথির মিলনক্ষণেই আবির্ভূতা হন দেবী চামুন্ডারূপে । চন্ড এবং মুন্ড এই দুই উগ্রমূর্ত্তি ভয়ানক অসুরকে বধ করেছিলেন এই সন্ধিক্ষণে । আশ্বিনমাসে রামচন্দ্রের অকালবোধন এবং অপ্রতিরোধ্য রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করার জন্য যে দুর্গাপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায় কৃত্তিবাসের রামায়ণে সেখানেও দেখি রামচন্দ্র সন্ধিপূজা সমাপন কালে দেবীর চরণে একশো আট পদ্ম নিবেদন করার আশায় হনুমানকে দেবীদহ থেকে একশো আটটি পদ্মফুল তুলে আনতে বলেন । হনুমান একশোসাতটি পদ্ম পেলেন । দেবীদহে আর পদ্ম ছিলনা । এবার প্রশ্ন কেন দেবীদহে একটি পদ্ম কম ছিল । তার কারণ স্বরূপ কথিত আছে , দীর্ঘদিন অসুর নিধন যজ্ঞে মাদুর্গার ক্ষত বিক্ষত দেহের অসহ্য জ্বালা দেখে মহাদেব কাতর হলেন । মায়ের সারা শরীরে একশো আটটি স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল । মহাদেব তাঁকে দেবীদহে স্নান করতে বললেন সেই জ্বালা জুড়ানোর জন্য । দেবীদহে মায়ের অবতরণে একশো সাতটি ক্ষত থেকে সৃষ্টি হয়েছিল একশো সাতটি পদ্মের । মহাদেব দুর্গার এই জ্বালা সহ্য করতে না পারায় তাঁর চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু নিক্ষিপ্ত হল মায়ের একশো আটতম ক্ষতের ওপর । দেবীদহে স্নানকালে সেই অশ্রুসিক্ত ক্ষতটির থেকে যে পদ্মটি জন্ম নিয়েছিল সেটি মা নিজে হরণ করেছিলেন । কারণ স্বামীর অশ্রুসিক্ত পদ্মফুলটি কেমন করে তিনি চরণে নেবেন । আবার কৃত্তিবাসের রামায়নে পাই রাবণ নিধন যজ্ঞের প্রাক্কালে রামচন্দ্র বলছেন

” যুগল নয়ন মোর ফুল্ল নীলোত্পল
সংকল্প করিব পূর্ণ বুঝিয়ে সকল ।।

রাম ধনুর্বাণ নিয়ে যখন নিজের নীলোত্পল সদৃশ একটি চক্ষু উত্পাটন করতে উদ্যত তখন দেবী রামচন্দ্রের হাত ধরে তাঁকে নিবৃত্ত করে বলেন

“অকালবোধনে পূজা কৈলে তুমি, দশভুজা বিধিমতে করিলা বিন্যাস।
লোকে জানাবার জন্য আমারে করিতে ধন্য অবনীতে করিলে প্রকাশ ।।
রাবণে ছাড়িনু আমি, বিনাশ করহ তুমি এত বলি হৈলা অন্তর্ধান ”

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ হল এই সন্ধিপুজো। অষ্টমীতিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীতিথির শুরুর ২৪ মিনিট....এই মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যেই  অনুষ্ঠিত হয়। মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধের সময় দেবী দুর্গার পিছন দিক থেকে আক্রমণ করেছিল দুই ভয়ানক অসুর চন্ড ও মুন্ড। দেবী তখন এক অদ্ভূত রূপ ধারণ করেন। কেশরাজিকে মাথার ওপরে সু-উচ্চ কবরীতে বেঁধে নিয়ে, কপালে প্রজ্জ্বলিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি টিপ ও তিলক এঁকে, গলায় বিশাল মালা ধারণ করে, কানে সোনার কুন্ডল ও হলুদরঙা শাড়িতে নিজেকে সজ্জিত করেন। তাঁর রক্তচক্ষু, লাল জিহ্বা, নীলাভ মুখমন্ডল  এবং ত্রিনয়ন থেকে অগ্নি বর্ষণ করতে থাকেন। ঢাল ও খড়্গ নিয়ে চন্ড ও মুন্ডকে বধ করেছিলেন দেবী এই সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণে।  

সন্ধিপূজার এই মাহেন্দ্রক্ষণে কেউ বলি দেন । কেউ সিঁদুর সিক্ত একমুঠো মাসকলাই বলি দেন । সবকিছুই প্রতিকী । সর্বকালের সর্বক্ষণের দুষ্টের দমন হয় দেবীর দ্বারা । রক্তবীজ অসুর কুল বিনষ্ট হয় । ঢাকের বাদ্যি বেজে ওঠে যুদ্ধজয়ের ভেরীর মত । একশো আট প্রদীপের আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয় ভারতবর্ষের আনাচকানাচ । উত্তিষ্ঠত ভারতবাসীর জাগ্রত মননে দুষ্কৃতের বিনাশিনী এবং সাধুদের পরিত্রাণ কারী মা দুর্গা কান্ডারী হয়ে প্রতিবছর অবতীর্ণ হন মর্ত্যলোকে ।

২০ অক্টো, ২০১৫

মহাসপ্তমীঃ নবপত্রিকা স্নান করায় কেন?


ছোটবেলায় জ্ঞান হবার পর থেকে আমরা সকলেই দুর্গাপুজোর সপ্তমীর ভোরে মহা সমারোহে ঢাকের বাদ্যির সাথে সাথে গঙ্গায় বা নদীতে “কলা-বৌ” স্নান করানোর আয়োজন দেখি । স্নান করিয়ে সেই কলাবৌটিকে নতুন লালপাড় শাড়ি পরিয়ে মাদুর্গার পাশে রাখা হয় এবং পুজোর পাঁচটাদিন পুজো করা হয় ঐ কলাবৌটিকে । বিসর্জনের দিন প্রতিমার সাথে তাকে ও বিসর্জন দেওয়া হয় । ছোটবেলায় প্রশ্ন করলে বলা হত ওটি গণেশের কলা-বৌ । আদতে গণেশ কিন্তু বিয়েই করেন নি ।  মা দুর্গাকেই ঐ রূপে পুজো করা হয় । আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে এই কলাবৌটির পুজোটি এই প্রসঙ্গে যথেষ্ট তাতপর্য পূর্ণ । বেদে আছে ভূমি হল মাতা, মৃত্শক্তি  যা ধারণ করে জীবনদায়িনী উদ্ভিদকে । আযুর্বেদের  ঐতিহ্যবাহী ভারতবর্ষে রোগভোগের প্রাদুর্ভাব ও কিছু কম নয় । এবং মা দুর্গার চিন্ময়ীরূপটি এই কলা-বৌয়ের অবগুন্ঠনেই যে প্রতিস্থাপন করা হয় সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । এই কলাবৌকে বলা হয় নবপত্রিকা । নয়টি প্রাকৃতিক সবুজ শক্তির সঙ্গে আধ্যাত্মিক চেতনশক্তির মিলন হয় দেবীবন্দনায় । সম্বচ্ছর যাতে দেশবাসীর রোগ ভোগ কম থাকে এবং  দেশ যেন সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠে সেই বাসনায় এই নবপত্রিকাকে দুর্গারূপে পুজো করা হয় । ন’টি উদ্ভিদের প্রত্যেকটির গুরুত্ব আছে । প্রত্যেকটি উদ্ভিদ ই দুর্গার এক একটি রূপ এবং তার কারিকাশক্তির অর্থ বহন করে । এরা সমষ্টিগত ভাবে মাদুর্গা বা মহাশক্তির প্রতিনিধি ।  যদিও পত্রিকা শব্দটির অর্থ হল পাতা কিন্তু নবপত্রিকায় নয়টি চারাগাছ থাকে । আবক্ষ অবগুন্ঠনের আড়ালে নববধূর একটি প্রতিমূর্তি কল্পনা করা হয় । বাসন্তী এবং দুর্গা এই দুই পুজোতেই নবপত্রিকা অর্চনার নিয়ম আছে । যে ক’টি চারাগাছের সমষ্টিকে একত্রিত করে অপরাজিতার রজ্জু দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকা তৈরী করা হয় সেই নয়টি উদ্ভিদের নাম শ্লোকাকারে লেখা আছে  আর এই ন’টি গাছের প্রত্যেকের আবার অধিষ্ঠাত্রী দেবী আছেন

রম্ভা, কচ্বী, হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িমৌ। অশোক মানকশ্চৈব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা ।।

অর্থাত

(১) কলা–ব্রহ্মাণী(শক্তিদাত্রী)

(২) কালো কচু– কালিকা (দীর্ঘায়ুদাত্রী)

(৩) হলুদ– ঊমা( বিঘ্ননাশিনী)

(৪) জয়ন্তী–জয়দাত্রি,  কার্তিকী( কীর্তিস্থাপয়িতা )

(৫) বেল–শিবাণী(লোকপ্রিয়া)

(৬) ডালিম–রক্তবীজনাশিনী( শক্তিদাত্রী)

(৭) অশোক–দুর্গা(শোকরহিতা)

(৮) মানকচু– ইন্দ্রাণী( সম্পদদায়ী)

(৯) ধান–মহালক্ষ্মী( প্রাণদায়িনী)

মহাসপ্তমীর সূচনা হয় নবপত্রিকার স্নানপর্ব দিয়ে । নবপত্রিকা দেবীদুর্গার প্রতিনিধি । শ্বেত অপরাজিতা লতা এবং হরিদ্রাক্ত সূতা দিয়ে এই ন’টি উদ্ভিদ একসাথে বেঁধে নদীতে স্নান করানো হয় । দেবীর প্রিয় গাছ বেল বা বিল্ব । নদীতে নবপত্রিকা স্নানের পূর্বে কল্পারম্ভের শুরুতে দেবীর মুখ ধোয়ার জন্য যে দাঁতন কাঠি ব্যাবহৃত হয় তাও আট আঙুল পরিমিত বিল্বকাঠেরই তাছাড়া মন্ত্রে সম্বোধন করে নবপত্রিকাকে দেবীজ্ঞান করা হয় । শস্যোত্পাদনকারিণি দেবী দুর্গা স্বয়ং কুলবৃক্ষদের প্রধান অধিষ্ঠাত্রীদেবতা ও যোগিনীরা দেবীর সহচরী । স্নানান্তে নতুন শাড়ি পরিয়ে তিনটি মঙ্গলঘটে আমপাতা, সিঁদুর স্বস্তিকা এঁকে জল ভরে একসাথে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ, ঘন্টা এবং উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে, মন্ডপে মায়ের মৃন্ময়ীমূর্তির সাথে স্থাপন করা হয় । এই তিনটি ঘটের একটি মাদুর্গার ঘট, একটি গণেশের এবং তৃতীয়টি শান্তির ঘট । নবপত্রিকার পূজা একাধারে কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষের বৃক্ষপূজা অন্যদিকে রোগব্যাধি বিনাশকারী বনৌষধির পূজা । মহাসপ্তমীর ভোরে বিল্ববৃক্ষের পূজা, নবপত্রিকা এবং জলপূর্ণ ঘটস্থাপন এর দ্বারাই দেবীপূজার সূচনালগ্ন ঘোষিত হয় ।


ওঁং চন্ডিকে চল চল চালয় চালয় শীঘ্রং ত্বমন্বিকে পূজালয়ং প্রবিশ।

ওঁং উত্তিষ্ঠ  পত্রিকে দেবী অস্মাকং হিতকারিণি”

 
এঁরাই আবার নবদুর্গা রূপে পূজিতা হ’ন । তাই দুর্গাপূজার মন্ত্রে পাই 


“ওঁ পত্রিকে  নবদুর্গে ত্বং মহাদেব-মনোরমে”

ভবিষ্যপুরাণে পাওয়া যায়.. 

"অথ সপ্তম্যং পত্রিকাপ্রবেশন বিধিঃ" 


নবপত্রিকাকে জনপদে মঙ্গলের দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে পূজা করা হয় । একাধারে এটি কৃষিপ্রধান দেশের চিরাচরিত কৃষিলক্ষ্মী যা প্রাক্‌-আর্যসভ্যতার নিদর্শন অন্যাধারে জীবজগতের কল্যাণকর এই উভিদগুলির রোগনিরাময়ক গুণাবলীর জন্য  বনৌষধিও বটে । তাই এই ন’টি গাছকে অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে দেওয়ার অর্থ হল জনকল্যাণকর এই উদ্ভিদগুলি যেন রোগ-ব্যাধির হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে বা মানুষ যেন এই পুজার মাধ্যমে রোগ ব্যাধিকে জয় করতে পারে ।