২১ আগ, ২০১৬

শ্রাবণী পূর্ণিমা, রবিঠাকুর এবং

   http://www.magazine.kolkata24x7.com/blog/21-08-2016-sriboni-purnima-by-indira/

" আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে কী এনেছিস বল্‌–'
রবিঠাকুরের বহুশ্রুত গানটি দিয়েই না হয় শুরু করি শ্রাবণী পূর্ণিমার কথা। কবির কথা ধার করে, গঙ্গাজলেই নাহয় গঙ্গা পুজো সেরে বলি কি আনিনি আমরা এই শ্রাবণী পূর্ণিমাতে?  ফুল ফোটার হাসি, ফুল ঝরার কান্না, বিরহ-মিলন, বাদল হাওয়া... এসবের সাথে বর্ষাঋতুর অন্তিম লগ্নে, বর্ষণস্নাত সবুজ ও সজীব এনেছি । ফল এনেছি কত রকমের। আদিগন্ত ফুলের সৌরভ ছড়িয়েছি । দিকে দিকে বৃক্ষরোপণ করেছি। বনমহোত্সবের বার্তা ছড়িয়েছি প্রকৃতির আনাচেকানাচে।  
এ যেন আবারো চলে যাওয়ার আগের মূহুর্তে আরো একবার বর্ষামঙ্গল। আবারো  বিদায়ী বর্ষার আঁচল টেনে ধরে, তুমি যেওনা, তুমি যেওনা বলে তার পথ রুখে দেওয়া। আবার তো আসবে একটা বছর পরে। তার চেয়ে আরো কটাদিন কাটিয়েও যাওনা, আমাদের সাথে।
শেষ শ্রাবণের মেঘজাল ভেদ করে শুক্লা একাদশীর চাঁদ বেরিয়ে আসবে। ধীরে ধীরে তা পূর্ণতা পাবে। ষোলকলা পূর্ণ করবে। তারপর সেই পূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্না চুঁইয়ে পড়বে সমস্ত চরাচরে। শ্রাবণের ধারাজলে ধৌত সবুজ প্রকৃতি, বৃষ্টি স্নানে আপ্লুত পাখীকুল সেই শেষ বর্ষার পূর্ণিমার আলো দেখবে । ধানচারা রোপণের আনন্দে কৃষকের মনে পরম তৃপ্তি আর তৃষ্ণার্ত চাতক চাতকীর মন যেন কানায় কানায় পূর্ণ । মৈথুন সুখে তৃপ্ত ময়ূর ময়ূরী আর বৃন্দাবনের ব্রজবাসীর মন টৈটুম্বুর আসন্ন ঝুলন উত্সবের প্রস্তুতিতে। সাজোসাজো রব শুধু বৃন্দাবনেই নয়। রাধাকৃষ্ণের সব থানগুলিই আনন্দমুখর এই ঝুলন তথা রাখীর মিলনোত্সবে সামিল হবার তাগিদে। বৌদ্ধ বিহারগুলিতেও বেশ তাত্পর্যপূর্ণ এই শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথি। বুদ্ধের নির্বাণলাভের পর ভিক্ষুরা গত চারমাস ধরে  চাতুর্মাস্যে ব্রতী হয়ে শ্রাবণী পূর্ণিমায় তা উদযাপন করে। বিশ্ব শান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। এ হল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাব্রত পালন।  
হিন্দুদের বৈষ্ণবধারার সাথে শৈবধর্মও এই শ্রাবণী পূর্ণিমায় শিবলিঙ্গে জলধারা বর্ষণ করে....এও তাদের বিশ্বাস। বিশ্বনাথের জন্মমাস নাকি শ্রাবণ। শ্রাবণীপূর্ণিমাতে সেই জন্মমাস উদযাপিত হয় ভারতবর্ষের সর্বত্র। কাশ্মীরের অমরনাথ থেকে বিহারের বৈদ্যনাথ ধাম, বেনারসের কাশীর বিশ্বনাথ থেকে পশ্চিমবাংলার তারকনাথ ধাম সর্বত্র‌ই পুরো শ্রাবণ মাস ধরে মহাদেবের পুজোয় সামিল হয় শৈবরা। যারা দূর দূর শৈবতীর্থ যেতে পারেনা তারাও নিজের জায়গাতে প্রাচীন কোনো শিবমন্দিরে গিয়ে পাশের কোনো নদী থেকে জল ঢেলে আসে এই মাসে। শ্রাবণী পূর্ণিমায় সারা ভারত জুড়ে শিবের মেলা হয় ধুম করে।

আসেপাশের নদী, নালা, সমুদ্র, কুন্ড যা আছে সবই তো বর্ষার জল পেয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা জলাধার।  এবার শিবভক্তদের বাঁক কাঁধে নিয়ে খালি পায়ে সেই জলাধার থেকে মাটির ঘটি কিম্বা কলসী ভর্তি করে আবারো পায়ে হেঁটে শিবমন্দিরে গিয়ে শিবলিঙ্গকে সেই জলে সিক্ত করা....এ তো চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। সোমবার নাকি শিবের বার । তাই শ্রাবণের সপ্তাহান্ত গুলো জমজমাট থাকে শিবভক্তদের কোলাহলে। নতুন গৈরিকবাস, নতুন মাটির কলস, বাঁক আরো আনুষাঙ্গিক কতকিছু! আবালবৃদ্ধবণিতা সামিল হয় কাঁবর কাঁধে এই পথচলায়। কিসের এই পথচলা? কিসের এই আকুতি? মহাদেব নাকি ভক্তের বয়ে আনা এই জলেই তুষ্ট হন। কাঁধে বাঁক নিলেই কঠোর সংযম। বাঁক রাখলেই আবার শুদ্ধ হয়ে তবেই পুনর্যাত্রা। ভাল, মন্দ, সৎ অসৎ সকলেই পাপ স্খালনের আশায় এই ব্রত করে।
"ভোলেবাবা পার লাগাও, ত্রিশূলধারী শক্তি জাগাও, ব্যোম্‌, ব্যোম্‌ তারক ব্যোম্‌, ভোলে ব্যোম্‌, তারক ব্যোম্‌ …' এই সম্মিলিত বাণী ছড়িয়ে যায় তারা। তাদের পথচলায় অনুরণিত হয় এই শব্দগুলো বারেবারে আর সেই সাথে থাকে টুং টাং ঘন্টাধ্বনি।
পুরাণে বলে সমুদ্র মন্থন হয়েছিল এই শ্রাবণেই। মহাদেব সেই মন্থনের ফলে উঠে আসা গরল নিজকন্ঠে ধারণ করে নীলকন্ঠ হয়েছিলেন। তাঁর এই বিষের জ্বালা নিরাময়ের কারণেই শিবলিঙ্গে অনর্গল জল ঢালার রীতি।    

আবার মনে পড়ে রবিঠাকুরের সেই গানের লাইন...
"আজ-শ্রাবণের সজল ছায়ায় বিরহ মিলন–'  এ ও এক অদ্ভূত মিলন আমাদের। শ্রাবণ আসে, শ্রাবণ যায়। রেখে চলে যায় বাইশে শ্রাবণের স্মৃতি আর উৎসবের চিহ্ন, মহামিলনের বার্তা। কখনও ঝুলন পূর্ণিমা বা রাখীবন্ধন কখনও শ্রাবণী পূর্ণিমার মত বারব্রত।
আমাদের রাঢ়বঙ্গে কত শৈবতীর্থ আর কত পরিচিত এই সব প্রাচীন শৈবতীর্থে এই শ্রাবণেই  মানুষ জমায়েত হয় পুণ্যলাভের আশায়। শুধুই কি পুণ্যলাভ? এই দল বেঁধে প্রতিটি পাড়া থেকে জনায় জনায় কত মানুষ এই শিবলিঙ্গে জলঢালা আর শ্রাবণী পূর্ণিমার মেলায় সামিল হবার আশায় জমায়েত হন বছরের এই সময়টায়। তাই আক্ষরিকভাবে বৈষ্ণবদের ঝুলনপূর্ণিমার মহামিলনে অথবা শিবমন্দিরগুলির প্রাঙ্গণে শৈবদের এই শ্রাবণী পূর্ণিমাটিও মহামিলনের বার্তা দেয় । 
তারকেশ্বরের বাবা তারকনাথ, মেদিনীপুরের খড়্গেশ্বর, বলিপুরের সুরথরাজার আরাধ্য সুরথেশ্বর, সাইঁথিয়ার কলেশ্বর, বর্ধমানের একশো আট শিবমন্দির সর্বত্র এই জন সমাবেশ। শিবের তুষ্টিতে জনগণের শান্তি। গোটা শ্রাবণ মাস শুধু ট্রেনগুলিই নয়, হাওড়া এবং শিয়ালদহ শাখার বহু স্টেশনই কার্যত চলে যায় শিবভক্তদের দখলে।


জলযাত্রীদের জন্য পসরা নিয়ে আশপাশের গ্রাম থেকে দোকানিরাও বসে পড়ে। প্লাস্টিকের ঘট, মাটির কলসি, ফুল বেলপাতা, গেরুয়া পোশাক, বাঁক, গামছা, তোয়ালে, বাঁক সাজানোর উপকরণ হিসেবে ঘণ্টা, কী থাকে না সেখানে? এভাবেই বুঝি বছরের পর বছর টিকে থাকে হিন্দুদের শিবমহিমা, তাদের ধর্মবিশ্বাস। শ্রাবণ যে মহাদেবের বড়ো প্রিয় মাস। ভক্তের ঢল নামাতে তিনিও খুশি হন যে! 

আবারো রবিঠাকুরের কথায় বলি,
যুগল মিলনমহোৎসবে শুভ শঙ্খরবে 
পূর্ণিমা-আকাশে জাগুক হাসি

কবির "শেষ বর্ষণ' গীতিনাট্যে রাজা নটরাজকে বলছেন 
"শ্রাবণের পূর্ণিমায় পূর্ণতা কোথায়? ও তো বসন্তের পূর্ণিমা নয়'
তার উত্তরে নটরাজ বললেন, 
"মহারাজ, বসন্তপূর্ণিমাই তো অপূর্ণ। তাতে চোখের জল নেই কেবলমাত্র হাসি। শ্রাবণের শুক্ল রাতে হাসি বলছে আমার জিত, কান্না বলছে আমার। ফুল ফোটার সঙ্গে ফুল ঝরার মালাবদল। ওগো কলস্বরা, পূর্ণিমার ডালাটি খুলে দেখো, ও কী আনলে।
আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে কী এনেছিস বল্‌...'

সেখানেও আবার নটরাজের মুখ দিয়ে কবি বলিয়ে নেন,
"মধুরের সঙ্গে কঠোরের মিলন হলে তবেই হয় হরপার্বতীর মিলন' 
 সেই শ্রাবণের অনুষঙ্গে শিবদুর্গার মিলন প্রসঙ্গও আনলেন আমাদের রবিঠাকুর। 


  হিন্দুধর্মে মহামিলনের জন্য‌ই কি এমন ঢালাও আয়োজন চলে আসছে প্রত্যেক পূর্ণিমা তিথিতে ? নয়ত শ্রাবণে ঝুলনযাত্রা, কার্তিকে রাসযাত্রা, ফাল্গুনে দোলযাত্রার মত এত মিলনোৎসবে আজও কেন সামিল হাজার হাজার মানুষ ? বছরের এই বিশেষ দিনগুলোতে তিথিক্ষণ মেনে কেন আমরা এখনো জমায়েত হ‌ই মেলা প্রাঙ্গণে?
আর কেন‌ই বা ঝুলনযাত্রার শেষে রাখী বেঁধে দিয়ে মিষ্টিমুখ করায় আমার বন্ধু ? রাধাকৃষ্ণ, ঝুলন সাজানো, এসব তো মানুষের মনগড়া । আসল তো মাঝেমাঝে সম্পর্কটাকে ঝালিয়ে নেওয়া। কৃষ্ণ স্বয়ং সেকথাও বুঝেছিলেন। হঠাত হঠাত মথুরা থেকে বৃন্দাবন, সেখান থেকে দ্বারকা ...তাঁর সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক  সদাব্যস্ত কর্মসূচীর টানাপোড়েনে  শ্রীরাধার সাথে সম্পর্কটা যায় যায় হয়ে দাঁড়াতো। তাই তো এই উতসবের মধ্যে দিয়ে আবারো মধুর সম্পর্কটা টিঁকিয়ে রাখার চেষ্ট করে যাওয়া। একান্তে দিনকয়েক কাছের করে পাওয়া। দুজনের কত শৃঙ্গার, ভৃঙ্গারে  গল্পমুখর দিনরাত এক হয়ে যাওয়া।
বছরের তিনটে বিশেষ পূর্ণিমাতে হয় রাধাকৃষ্ণের তিন লীলা-উত্সব বা যাত্রা  । ফাল্গুণী পূর্ণিমায় দোলযাত্রা, শ্রাবণী পূর্ণিমায় ঝুলনযাত্রা আর কার্তিক পূর্ণিমায়  রাসযাত্রা। ঝুলন হল বর্ষার লীলা যার অপর নাম হিন্দোলনলীলা। ব্রজবাসীরা কদমগাছে ঝুলা বেঁধে রাধাকৃষ্ণকে দোল খাওয়ায়। কাজরী গান হয়। মেঘমল্লারে বৃন্দাবনের আকাশবাতাস সঙ্গীতমুখর হয়ে ওঠে। একাদশী থেকে শুরু হয় ঝুলন আর শেষ  হয় পঞ্চমদিনের পূর্ণিমাতে। রাখী বাঁধা হয় সেদিন।
তবে অন্য্যন্য যাত্রাগুলির থেকে ঝুলনযাত্রা একটু ভিন্ন। এটি রূপকধর্মী। দোলা বা হিন্দোলনের অর্থ হল সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন ময় মানুষের  জীবনের প্রকৃত অর্থ‌ই হল ঘড়ির পেন্ডুলামের মত চলমানতায় ভরা। একবার আসবে দুঃখ। তারপরেই সুখ। কখনো বিরহ, কখনো মিলন। কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদ। স্থির হয়ে থাকাটা জীবন নয়। এই দোলনার আসা ও যাওয়াটি হল রূপকমাত্র। তাই জন্যেই তো বলে "চক্রবত পরিবর্ততে সুখানি চ দুখানি চ'   
উপনিষদে বলে " আনন্দ ব্রহ্মেতি ব্যজনাত" অর্থাত ব্রহ্ম আনন্দস্বরূপ। কিন্তু তিনি একা সেই কাজ করবেন কি করে? তাইতো তিনি সৃষ্টি করেন বন্ধু-বান্ধব, পিতামাতা, দাসদাসী, ভাইবোন, স্বামী-স্ত্রীর মত সম্পর্কের জালে আবদ্ধ মানুষদের। তাই প্রেমের আবাহনে পুরুষ আর প্রকৃতির যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠে হিন্দোলন বা ঝুলনের মত উত্সব। সম্পর্ক টিঁকিয়ে রাখার জন্য সৃষ্টিকর্তা প্রজাপিতা ব্রহ্মের এরূপ দায়বদ্ধতা। মানুষ যাতে মানুষকে নিয়ে অহোরাত্র বেঁঁচে থাকে...... আর সেখানেই ঝুলন নামক মিলনোত্সবের সার্থকতা !   
শ্রীমদ্ভাগবতে বলে, বর্ষণমুখর বৃন্দাবন তখন বানভাসি। বর্ষণসিক্ত ধরিত্রী সবুজ। নদীনালা বর্ষার আনন্দে থৈ থৈ। প্রাণীকুল খলখল কলধ্বনিতে মুখর। পক্ষীকুল মনের আনন্দে সরব তাদের কূজনে। আসন্ন পূর্ণিমার রূপোলী জ্যোত্স্নায় ব্যাপ্ত আদিগন্ত চরাচর। এমন প্রাকৃতিক আবাহনে মেতে উঠলেন শ্রীরাধিকা তাঁর দয়িতের সাথে।  এতো মানুষের জীবনের মত‌ই মিলনের আর্তি। বহুদিনের অদর্শণের অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি। এতো আমাদের জীবনে চেনা ঘটনা...তাই নয় কি ? 
 
রবিঠাকুর বলে ওঠেন

দে দোল্‌ দোল্‌ ।
দে দোল্‌ দোল্‌ ।
এ মহাসাগরে তুফান তোল্‌ ।
বধূরে আমার পেয়েছি আবার —
ভরেছে কোল ।
প্রিয়ারে আমার তুলেছে জাগায়ে
প্রলয়রোল ।
বক্ষ-শোণিতে উঠেছে আবার
কী হিল্লোল!
ভিতরে বাহিরে জেগেছে আমার
কী কল্লোল!

সত্যি এ যেন পরাণের সাথে পরাণ বাঁধার উত্সব! চির বন্ধুতার আবেগে মাখোমাখো উত্সব।ঝুলনযাত্রা বহুযুগ আগে থেকে ব্রজভূমি বৃন্দাবনে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হত। শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরাধিকা তাঁদের অষ্টসখী ইন্দুরেখা, চিত্রা, চম্পকলতা, ললিতা, বিশাখা, তুঙ্গবিদ্যা, সুদেবী এবং রঙ্গদেবীর সাথে লীলা করেছিলেন ঐ দিনে। শ্রীচৈতন্যদেবের লীলাক্ষেত্র নবদ্বীপধামেও এখন ঝুলন পালিত হয় মহাসমারোহে। রাধাগোবিন্দের প্রচলিত ঝুলনযাত্রার হাত ধরে এসে পড়ে রাখীবন্ধন যা এখন গ্লোবাল মার্কেটে আরো জনপ্রিয়।
পুরাণের কাহিনী অনুযায়ী দেবতারা যখন অসুরদের দৌরাত্ম্যে স্বর্গ থেকে ক্ষমতাচ্যুত তখন দেবরাজ ইন্দ্র দেবগুরু বৃহস্পতির শরণাপন্ন হলেন। ইন্দ্রের স্ত্রী পৌলমী তখন বৃহস্পতির নির্দেশে ইন্দ্রের হাতে বেঁধে দিলেন একগুচ্ছ রাখী। এই রাখী হল রক্ষাকবচ যা দেবরাজকে রক্ষা করবে অসুরদের সকলপ্রকার অত্যাচারের হাত থেকে। শ্রাবণী পূর্ণিমার দিনে রাখী পরার পরেই নাকি দেবরাজ ইন্দ্র সমর্থ হয়েছিলেন অসুরদের পরাস্ত করে স্বর্গরাজ্য উদ্ধ্বার করতে।
ইতিহাস বলে অনেক কাহিনী।
তার মধ্যে বাঙালীদের কাছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ ও রাখীবন্ধনে রবিঠাকুরের অগ্রণী ভূমিকা। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে দুভাগ করে বসলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করে দেশপ্রেমের মন্ত্রে জাতীয়তাবাদকে আরো সোচ্চার করার চেষ্টায় জাতিধর্ম নির্বিশেষে, আপামর জনসাধারণের হাতে রাখী বাঁধলেন। বীজমন্ত্র একটাই। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে দেশবাসীকে একসূত্রে আবদ্ধ করা। লিখলেন সেই অনবদ্য গান
"বাংলার মাটী বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল, পুণ্য হোক, পুণ্য হোক হে ভগবান! তাই সেইথেকে রাখীপূর্ণিমার দিনটি বাঙালীর মননে, স্মরণে আরো গুরুত্ব পেয়ে আসছে। 
রাখী হল সেই রক্ষাবন্ধনের কবচ যা পরিয়ে দিলে কোনো অমঙ্গলের আশঙ্কা থাকেনা। তাই বুঝি মা যশোদা কৃষ্ণের হাতে এই মঙ্গলসূত্র বা ডোর বেঁধে দিতেন। বালগোপাল অরণ্যে, প্রান্তরে গোচারণায় যেতেন সখাসখীদের সাথে, তার যাতে কোনো অনিষ্ট না হয় সেই জন্য । আবার ব্রজবালারা কিশোর কৃষ্ণের হাতে ফুলের রাখী বেঁধে দিতেন প্রেম-প্রীতির বন্ধন হিসেবে। মাতা কুন্তী নাকি অর্জুনপুত্র অভিমন্যুর হাতে যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে রাখী বেঁধে দিয়েছিলেন। অতএব রাখী হল স্নেহ-ভালবাসার বন্ধন দিয়ে মোড়া এক রক্ষাকবচ যা কেবল মাত্র ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
মধ্যযুগের একটি ঘটনায় পাওয়া যায় অন্য বৃত্তান্ত। মোগলসম্রাট হুমায়ুনের হাতে রাখী বেঁধেছিলেন রাজপুতানার রাজকন্যা কর্ণাবতী । প্রবল পরাক্রমশালী বাহাদুর শাহর কাছে পরাজিত হয়ে রাজকন্যা খুব ভেঙে পড়লেন।  কিন্তু রক্ষাবন্ধনের দিনেও  দাদার মতন শুভাকাঙ্খী হুমায়ুনকে রাখী পাঠাতে ভুলে গেলেননা তিনি। সৌহার্দ্যপূর্ণ বন্ধনের এই রাখী পাওয়া মাত্র‌ই মোগলসম্রাট হুমায়ুন বুঝতে পারলেন ভগিনীসমা কর্ণাবতীর আবেগ। ততক্ষণাত তিনি ভগিনীর সম্মান ও তার রাজ্যের গৌরব বাঁচাতে সসৈন্যে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করলেন । কর্ণাবতী  ততক্ষণে সতী হয়ে অগ্নিশিখায় আত্মাহুতি দিয়েছেন। হুমায়ুন সেখানে পৌঁছেই ভগিনীর জন্য অশ্রুপাত করেন। 

কিংবদন্তীর কড়চা বলে, গ্রীক সম্রাট আলেকজান্ডারের  ব্যাকট্রিয়ান  ধর্মপত্নী রোকসানা পুরুর সাথে তাঁর স্বামীর সাথে ঝিলামনদীর  তীরে  যুদ্ধের প্রাক্কালে পুরুর হাতে নিজে রাখী বেঁধে দিয়েছিলেন। পুরুরাজা এই রাখীবন্ধনে তৃপ্ত হয়ে এক লহমায় যুদ্ধাস্ত্র নামিয়ে ফেলেছিলেন। সে যাত্রায় এভাবে রোকসানার স্বামী আলেকজান্ডারের প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল  কেবলমাত্র একগুচ্ছ রাখীর জন্য। 

তাই শ্রাবণী পূর্ণিমা ফিরে এলেই মনে হয় রাখীই হোক কিম্বা মহাদেবের জন্য বাঁক কাঁধে গৈরিক বসনে শিবলিঙ্গে জল ঢালা সবটুকুনিই কি মহামিলনের মন্ত্র ?
যা শ্রাবণী পূর্ণিমা তাই তো ঝুলন পূর্ণিমা যার অপর নাম রাখী পূর্ণিমা!

শ্রাবণী পূর্ণিমা নিয়ে লিখতে বসে রবিঠাকুর দিয়েই শুরু করেছিলাম তাই শেষ করলাম তাঁর সোনারতরী কাব্যগ্রন্থের "ঝুলন" কবিতার প্রথম ও শেষ লাইনদুটি দিয়ে। আজো এই কবিতা ঝুলনের দিনে কত প্রাসঙ্গিক। 

আমি পরানের সাথে খেলিব আজিকে, মরণখেলা, নিশীথবেলা ।

......

আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে, ঝুলনখেলা, নিশীথবেলা । 



৩০ জুন, ২০১৬

বিয়ের পদ্য

    এই হল শ্রীমান অনিন্দ্য(বাপ্টু)  এবং তার নবপরিণীতা বধূ ঐশিকা । তাদের মধ্যিখানে উঁকি দিচ্ছে বাপ্টুর ভাই বান্টি (অরিজিত) । তারা ক্লাবের সূত্রে এবং তারাটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান "আজ সকালের আমন্ত্রণে" মাধ্যমেই আমাদের আলাপ অনিন্দ্য, অরিজিতের মা ছন্দা নন্দীর সাথে।  সেই ২০০৮ থেকে আমরা একসূত্রে জড়িয়ে আছি। আর এই যোগসূত্রের মধ্যমণিরা হলেন সঞ্চালিকাত্রয় মৈত্রেয়ী, মল্লিকা এবং রিণি। সেই সাথে আরো কিছু বন্ধুও রয়েছে এই ঘটনাবহুল কর্মকান্ডে। সে এক সময় ছিল যখন নিজের কবিতা অন দ্যা স্পট লিখে ফেলে টিভির এই লাইভ কল শোতে শোনাতাম। সে ছিল এক নেশা। তারপরেই বন্ধুদের এসেমেস বৃষ্টি হত ফোনে। সেইদিন আজ গিয়ে পৌঁছল এক ঘটনায়। আমি ছন্দার ছেলের বিয়েতে তাদের নিয়ে লিখলাম এক বিয়ের পদ্য। ছন্দা সেই শিল্পসৃষ্টিকে সম্মান করে ছাপিয়ে তা প্রতিটি নিমন্ত্রিতদের হাতে দিল। এ আমার পরম সৌভাগ্য।
 পাত্রপাত্রী উভয়েই প্রেসিডেন্সীতে একসাথে জিওলজির স্টুডেন্ট ছিল।এখন ঐশী একটি ব্যাঙ্কে চাকরী করে আর অনিন্দ্য কর্পোরেট হাউসে। তাই সেইকথা মাথায় রেখে ওদের নিয়ে এই মজা করা। ছন্দা নন্দীর আদি শ্বশুরবাড়ি হল বড়বাজারে শিবঠাকুর লেনে। প্রতিবছর যে বাড়িতে মহা সমারোহে অন্নপূর্ণা পুজো হয়। তাই অন্নপূর্ণা-মহাদেবের আশীর্বাদ নিয়ে এই লেখার শুরু।  



।। শ্রী শ্রী অন্নপূর্ণা মাতা সহায়, ভাল হউক,শুভ হউক অনিন্দ্য-ঐশিকার জয়।।

*********************

।। গহনকুসুম কুঞ্জ মাঝে অনুপমাতে বাদ্যি বাজে। কিসের বাজনা, কিসের বোল? ভিআইপি রোডে বাজল ঢোল
আও আও সজনীবৃন্দা, ছেলের বিবাহে নন্দী ছন্দা । এহেন বিয়ের জিওলজি নিয়ে বন্ধু ইন্দিরা বন্দিছে ।।

**************

    একদিন বাপ্টু আসিয়া মা'র কানে কহিল, কে যেন আমার বুকে ছুরিটি গুঁজিল...

একদিন রাতে আমি স্বপন দেখিনু, দেবী অন্নপূর্ণা এসে আমারে কহিনু
চেয়ে দেখি ঠোকাঠুকি টেকটনিক প্লেটে, এক কন্যা আসিয়াছে অনুপমার গেটে

    কে তুমি? কে তুমি মম অঙ্গনে? দাঁড়ালে একাকী! নহ মাতা, নহ বিবাহিতা, পরিষ্কার দৃষ্টি আমার, সবে ছানি কাটিয়াছি।

কেউ ন‌য়, সাধারণী শুধু সহপাঠিনী
দেবী প্রেরিত, উপযুক্ত, আধুনিকা নন্দিনী।
মা! ভূতত্ত্ব পড়তে গিয়ে একেই খুঁজে এনেছি....
মাটীর নীচে কোথায় আকর, কোথায় খনি, কোথায় পাথর?
সেই খুঁজতে গিয়ে আমি তাকেই খুঁজে পেয়েছি।
শোনো শোনো,
মাটী খুঁড়েই কষ্ট করে (তার) ঘাড় ধরে টেনে এনেছি।

পাত্র অনিন্দ্য বাপ্টু নন্দীবংশ খ্যাত, অন্নপূর্ণার আশীর্বাদে সুচাকুরীই ব্রত।
পাত্রী ঐশিকা হল দাস বংশ জাত, প্রেসিডেন্সীর সহপাঠী ব্যাঙ্কে কর্মরত ।।
পড়তে পড়তে ভূতত্ত্বে কত যে গোলমাল, টেকটনিক প্লেট ওঠাপড়ায় সব‌ই বেসামাল।
দুজনেরি প্রথম প্রেম ভূতত্ত্ব বলে কথা, দ্বিতীয়তঃ ওলটপালট বিগড়ে গেল মাথা।
ঘন ঘন ফিল্ড ট্রিপ, গাঢ় প্রেমরস, ভূকম্পনে উথালপাথাল, বেজায় নামযশ।।

    বলতে পারো পাত্রপাত্রী কখন নামল ধ্বস? কখনি বা বন্যা এসে ভাসিয়ে দিল ঘর?
।। পাত্র গেল মুম্বাইতে, ধানবাদে পাত্রী, রইল রিমোটকন্ট্রোলে অন্নপূর্ণা সহযাত্রী
ঝালিয়ে নেওয়া চ্যাটবাক্স, বদলে ছিল ঘাঁটি। তবুও এ প্রেম অনিন্দ্যসুন্দর এক্কেবারে খাঁটি
ভাগ্যি ছিল হোয়াটস্যাপ আর হৃদয়পুরের গল্প! তাইতো সে প্রেম পূর্ণতায় দুষ্টুমিষ্টি অল্প।।

    শিবঠাকুর লেনের আপনদেশে, ছাঁদনাতলায় অবশেষে 

    *****************
    শুনল শুনল বালিকা, ঐ যে আসিল ঐশিকা...

।। একজন সেই খুঁজতে গেল অয়েল-ন্যাচারাল গ্যাস, অন্যে সামলায় তখন রাশিরাশি ক্যাশ
অন্নপূর্ণার মন্ত্রবলে কাছাকাছি তারা, ছন্দার ঘর আলো করে বাঁধছে জুটি কারা?
ভজ নিতাই গৌর রাধেশ্যাম ! তেলখনি আর ব্যাঙ্ক ভুলে হানিমুনই ধরাধাম।।

    ।। ওলো তোরা দেখে যা গো, বিরহের একি জ্বালা দেখে যা গো!
নিতাই নন্দী ওকালতি ছেড়ে প্লেনের টিকিট কাটিতেছেন
ছেলেবউ মধুচন্দ্রিমায়, তাই তেনারাও প্ল্যান ফাঁদিতেছেন।।


ঐশী শোনো, লাইফ জমাও ! পরে কোনো সময় মাসীদের রেঁধে খাওয়াও!
ঘরে তোমার লক্ষণ দেবর বান্টি অরিজিত । কিছুদিনেই বাবলি আসিবে, জানিও নিশ্চিত!
সজনি সজনি ঐশি আইল, বাপ্টুর চোখে চোখটি রাখিল
মধুর মিলনে সাক্ষী থাকিল মায়ের সজনী মাসীরা।
আজি এ আষাঢ়ে সমবেত স্বরে, মৌসুমী, বর্ণালী, ইন্দিরা।।

************************

।। আমাদের প্রিয় ছন্দাদি, শ্বশ্রূমাতা হৈলেন।
অনিন্দ্য-ঐশিকার হাতে সংসার সঁপিলেন।
এক্ষণে ফোনে ফোনে সাড়া পাইব নিশ্চিত
ফ্রিকোয়েন্টলি ফোনের ধারে পাইব কিঞ্চিত!
অনুষ্ঠানে ফোনাফুনি শিখিয়া ল‌ইও ঐশী
এও জানিবে একটি শিল্প, কিছু কমবেশী
মোরা খলবলে রোজ ঝলমলে ভোরে কলকল করে হাসি
মোরা ঝলমলে শাড়ি পরিপাটি তাজা নীলপর্দায় আসি ।
মোরা কেশ এলাইয়া, গান শুনাইয়া তোমাদের কথা শুনি
মোরা ঘুম ভাঙানিয়া, সুখ জাগানিয়া ধূমায়িত চায়ে ভাসি !
মল্লিকা-মৈত্রেয়ী-রিণি সঞ্চালিকা ত্রয়ী
শুভেচ্ছায় রৈলাম জেনো পাত্রপাত্রী উভয়েই ।।

**** মৈত্রেয়ী, মল্লিকা, রিণি, বর্ণালী, শিল্পা, শর্মিলা, মৌসুমী ও ইন্দিরা ****

২৭ জুন, ২০১৬

পঞ্চমের সপ্তসুরে

 ইথার তরংগে তখন ভেসে যেত আমার ইহকাল, পরকাল। আমিই যেন তার অনুরাধা, মোনালিসা কিম্বা রুবি রায়। আজ আবার মনে মনে নি:শব্দ স্মৃতি তরপণ।।
আজ সকাল থেকে সেই সুর বাজছে মনের ভেতর। তুমি ছিলে তাই। রোদজ্বলা দুপুর আমার সুর তুলেছিল নূপুরে...কেমন যেন হয়ে যেত আশপাশ। বদল হত দৃশ্যপট। আমি পৌঁছে যেতাম সুরের ভেলায় ভেসে সব পেয়েছির দেশে। তোমার সঙ্গে দেখা না হলে সুরালোকের দেশটা আমার দেখা হতনা!


একটা কেমন স্তব্ধতা !
অন্ধকারে হাতড়ে মরি, শিল্পী তোমার শূণ্যতা
আকাশ ভরা তারার মাঝে, নায়ক তোমার পূর্ণতা ।
রাতের গায়ে দিন ঢলে যায়, গড়িয়ে চলে সময়টা
আনন্দের এই জীবন সফর, ব্যস্ত ইঁদুর-দৌড়টা ।
সাঁঝসবেরে, নীল আকাশে ভোকাট্টা সেই ঘুড়িটা
কেমন জানি হাতড়ে মরি, সুপারস্টারের শূণ্যতা !

জীবন? সে তো অনেক দিল, কমিয়ে দিল আয়ুটা
শিল্পী ! তুমি ঘুমিয়ে থেকো, কাটাও সুখের স্বর্গটা !
আকাশ যেন ঝলসে গেল, বদলে গেল দৃশ্যটা
একটা তারা খস্‌ল পড়ে, থম্‌‌কে গেল শহরটা !
কোথায় যেন হারিয়ে গেল, জ্বলজ্বলে সেই তারাটা
দম্‌কা বাতাস উড়িয়ে দিল, শুটিং স্টারের ফুলকিটা !
শূণ্য ঘরে, একা আমি থম্‌‌কে ঘড়ির কাঁটাটা
হঠাত ! যেন একলা ঘরে শিল্পী তোমার স্তব্ধতা !
অকালে চলে গেছিলেন তিনি । লিখেছিলাম তাঁকে নিয়ে এই কবিতাটা। আজ আদরের নৌকার আমন্ত্রণে সেই রাহুলদেব বর্মণের জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য জানালাম নিঃশব্দ এই স্মৃতিতর্পণের মধ্যে দিয়ে।
আমার ভালোবাসার গান ভাসতে ভাসতে চলত স্টাডিরুমের সংলগ্ন একফালি বারান্দা দিয়ে।তখন আমার সুইট টিন পেরোচ্ছে লাফিয়ে লাফিয়ে । ভালোবাসার প্রথম কদমফুল ফুটতে দেখছি আনাচেকানাচে। আর তখন নতুন দূরদর্শন এসেছে ড্র‌ইংরুমের সুখি গৃহকোণে। সেখানে গুরুগম্ভীর সংবাদ পরিবেশনের ফাঁকে ফাঁকে সাদায় কালোয় রবীন্দ্রসংগীত। আর মায়ের শোবার ঘরে ঢাউস রেডিওতে মায়ের বরাদ্দ নাটক আর আমাদের জন্য রোব্বারের গল্পদাদুর আসর । শনিবার স্কুল হাফছুটি হত। উইকএন্ডের সূচনালগ্নে জোরকদমে ট্রানসিষ্টর রেডিওতে প্রথম চিনতে শেখা আমার রাহুলদেব বর্মণকে বা গানবাঙালির পঞ্চমদা কে ।
ভোরের আলোর পর্দা সরিয়ে, কচি রোদ্দুর গায়ে মেখে গান চলত আমার কৈশোরে । একটু থামত আবার ফিরে আসত । স্কুলব্যাগ গোছানোর ফাঁকে ফাঁকে আশপাশের বাড়ির থেকে কানে আসত আধুনিক গান।আমি তখন ক্ল্যাসিকাল গানের তালিম নিচ্ছি আর গীতবিতানের স্রোতে ভাসছি। অতএব আধুনিক গানের চর্চা? নো ওয়ে! অথচ বাবা-মা দিব্য গাইছেন তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর অথবা আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে। কিন্তু আমার গানের ওপর যত্ত ট্যাক্স বসানো! গীতবিতানের জানলা খুলে আবার ভাসত আমার গান । ভালোবাসার গান । ক্রমে শুক্রবারের সন্ধ্যের অন্ধকারের পরত ছিঁড়েখুঁড়ে ভালোলাগার গান এসে পড়ত শনিবারের গানভাসি দুপুরবেলায়, শ্রাবন্তী মজুমদারের মনের মত গান, মনে রাখার কথা অনুষ্ঠানে। রাহুলদেবের গান বাজত সেখানে অনেক। এই ভাবে আমার স্বপ্নপথে ভালোবাসার গান এসেছিল সেদিন । আর কেন জানিনা অঙ্কখাতা হাতে আমি রাহুলদেব বর্মণের গান শুনতাম। কেমন এক ফ্যান্টাসিময়তা! কোনোদিন ঐ অনুষ্ঠানে ওনার গান না শুনতে পেলে মুড অফ হয়ে যেত । ঠিক যেন প্রেমিক পুরুষের সাথে দেখা হয়েও হলনা টাইপ আমার মনের অবস্থা তখন।
একটু আফশোস ছিল একদিন । সেই অপূর্ণতা নিয়ে রাতে ঘুমিয়ে এই স্বপ্ন দেখেছিলাম ভালোবাসার গান নিয়ে ।

তারপর ধড়মড়িয়ে উঠে দেখি গান আমার মনখারাপের উঠোন পেরিয়ে, স্বপ্নপথ বেয়ে সোজা আবার আমার পাশে লাইভ । বিয়ের পরদিন শ্বশুরবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার স্বামী দেখালেন, ঐ দ্যাখো ওয়েডারবার্ণ রোডের ঐ বাড়িটায় তোমার রাহুলদেব এক সময় রেগুলার এক বন্ধুর বাড়িতে আসতেন। চোখ চকমক করে উঠল। আমার ভাসুরের সাথে তীর্থপতি ইন্স্টিটিউশানে পড়তেন তিনি। আর পিসি শাশুড়ি বললেন, পঞ্চমকে তো আমরা কত্ত দেখেছি। পড়াশোনা একদম করতনা। বিকেল হলেই ছেলেরা ইনক্লুডিং আমার ভাসুর ঐ আড্ডাবাড়ির সামনে গিয়ে চীতকার করে ডাক দিতেন রাহুলদেবকে নিয়ে খেলতে যাবার জন্য। ভাবলাম, ইস্‌ এই বাড়িতে আরো আগে কেন আসিনি।

আমার মন তখনো আকুপাঁকু রোদজ্বলা দুপুরে.. ইস্‌ ! যদি আমার পায়ের নূপুরের সুর তুলতে পারতাম তার জন্য! ঠিক তেমন ভাবসাব আমার। এখনো রঙীন পর্দায় গানছবিতে রাহুলের সেই সৃষ্টির জন্য পথ চেয়ে থাকি। ইয়াদো কি বরাত মুখে মুখে ফিরেছিল আমার ছোটবেলায়। তখন হিন্দী বুঝতাম কম। সেই ১৯৭৬ সালে রাহুল শোলের সেই বিখ্যাত মেহেবুবা মেহেবুবা গানটি গেয়ে বেষ্ট পুরুষ কন্ঠের এওয়ার্ডটি পেলেন। এই গানটি বুঝি নিজের জন্যেই বানিয়েছিলেন তিনি আর কিংবদন্তী হয়ে র‌ইলেন। গান বানানোর সেই অদ্ভূত সমীকরণ আজো অধরা নতুন প্রজন্মের সঙ্গীত পরিচালকদের কাছে। প্রতিনিয়ত চ্যানেল সার্ফিং হঠাত করে হয়ত ধরা দেয়, মনে করিয়ে দেয় সনম তেরী কসমের টাইটেল ট্র্যাক.. "কিতনে ভি তু করলে সিতম্‌'..১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি। আর আমার বেথুন কলেজে ফার্স্ট ইয়ার। সেবছরেই শীতে আমরা অজন্তা-ইলোরা গেছিলাম । বম্বে থেকে টানা বাসে পাহাড়ি পথে সেই গান সারা রাস্তা বেজেছিল। আর সিনেমাতেও কামল হাসানের সেই বাসেই গানদুষ্টুমি। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার সবুজে নীলে আমার কবিতা তখন পঞ্চমময়তায় ভরা। তারপর ১৯৮৪ তে মাসুম। অনুপ ঘোষাল, আরতি মুখার্জি গাইলেন হিন্দী ছবিতে পঞ্চমের সুরে সেই অনবদ্য গান। আরো কত স্মৃতি আছে এমন। হেমা মালিনী-রাজেশ খান্নার মেহবুবা দেখতে গেছিলাম জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ি গিয়ে, দিদিরা নিয়ে গেছিল, মেনকা সিনেমা হলে। সেই আমার জ্ঞানত প্রেমের হিন্দী ছবি দেখা। আমি তখন ক্লাস সেভেন। প্রচন্ড বকুনি জুটল বাড়ি ফিরে। পঞ্চম যেন হারিয়ে গেল কিছুদিনের জন্যে আমার জীবন থেকে।
তারপর শোলে, হাম কিসিসে কম নহি, কিনারা... সব সুপার ডুপার ফিট ফর্মুলা, হিট পঞ্চম। আবার নতুন করে পেলাম 1942 এ লাভ স্টোরিতে। কিন্তু হারালাম সেই ক্ষণেই আমার ভালোবাসার গানের মানুষকে, যিনি প্রকৃত বুঝতেন গানের কেমিষ্ট্রিকে। হিন্দীছবির সাথে গান মেশানোর এলগরিদমটা তদ্দিনে তাঁর রফ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ফুরিয়ে গেল জীবনটা। সাফল্যের শিখরে উঠেই হারিয়ে যাওয়া আমার পঞ্চমের।

ফিরে এসো অনুরাধা শুনে মনে হত আমাকেই যেন বলছেন উনি। "যেতে যেতে পথে হল দেরী'র সুরে যখন আঁধি ছবিতে "তেরে বিনা জিন্দেগী সে কোয়ি' গানটি তৈরী হল তখন আমি যেন পাগল প্রায়। কিছুদিন পড়াশুনো ভুলে রেডিও খুলছি কেবলি। কোথায় পাব তারে? তখন এত গান শোনা যেতনা, এখন যেমন ইউটিউব, সিডি সব কিছুর কৃপায় কোনো গান‌ই অধরা নেই কারোর কাছে। আর আমাদের বুঝি সেইজন্যেই গানশোনার কান এবং অদ্ভূত এক ভালোলাগা তৈরী হয়ে গেছিল। কি আকুতি সেই প্রেমিক কন্ঠে তা আজো বসে ভাবি। অনেক রিমেক হচ্ছে, হয়েছে। ডিস্কোথেকে ওনার ট্র্যাকগুলো রিমিক্সিং হয়ে বাজতে দেখি।

মনে মনে হাসি, ভাবি সেই লাইনটা, 'আমি গিয়ে দেখি, তুমি নেই একি'.......থাকলে তিনি হয়ত খুশিই হতেন মনে মনে বলি, 'চলে যে গেছো তুমি, দাঁড়িয়ে থেকে থেকে ওগো, চলে গেছো, চলে গেছো, বুকে কাঁটা লয়ে, ব্যথা তবু সয়ে....'..... বেঁচে আছি তোমার হয়ে পঞ্চম। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার যেন উজাড় করে কথা লিখেছিলেন সেদিন আর পঞ্চম তাঁর উদাত্ত কন্ঠে গেয়ে গেয়ে সুর করেছিলেন বুঝি! অবাক হ‌ই এই কথা-সুরের অভিনব মেলবন্ধন দেখে। সত্যি সত্যি তিনি দেবশিশুর মত নেমে এসেছিলেন সুরলোক থেকে । নয়ত এ সৃষ্টি কি আর হত?

কতজন তো গাইলেন মনে পড়ে রুবি রায় এতগুলো বছরে। কিন্তু সেই শুরুটার আবেগ? আর প্রতি ছত্রে ছত্রে দেখেছি বা ডেকেছির 'ছি' অক্ষরটা? এমন করে কেউ গেয়েছেন বলে আমার মনে হয়না। অথবা সে কথা কি কোনোদিনো ভাবতের 'তে' অক্ষরটার অনুরণন?
আমি কি আর দীপজ্বলা সন্ধ্যায়, আমার হৃদয়ের জানলায় বসে বসে শুনতে পাবো সেই পঞ্চমের সপ্তসুর? পাখি সে তো আসেনি আর আসবেওনা কোনোদিন।

১৮ জুন, ২০১৬

মনসুন সোনাটা

 ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার 
সম্প্রতি  আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি  sms poll এ দেখছিলাম জানতে চাওয়া হয়েছে "বাংলা কি বেকার ভাষা?" এই উক্তির পক্ষ একেবারেই না নিয়ে বলতে চাই বাংলা আজ বেকার ভাষা হলে সেই ভাষাকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষের রুজিরোজগার এবং তাও আবার ঐ পত্রিকাকে ঘিরে । এমন জনপ্রিয় একটি সংবাদপত্রের ট্যাগলাইন হোল "পড়তে হয় নয়ত পিছিয়ে পড়তে হয়" ।  এই দৈনিক পত্রিকাটি বাংলাভাষায় বলেই হয়ত এতটা জনপ্রিয় এবং তার সুষ্ঠু সম্পাদনাকে ঘিরে আজ কোলকাতা সহ পশ্চিমবাংলার অনেক মানুষই সাকার ।  তাই বুঝি সুদীর্ঘ ৯০টা বছর পার করেও তার পাঠককুল সাতেও থাকেন, পাঁচেও থাকেন । আবার নয় নয় করে তার পাঠক সংখ্যা ৯লাখে পৌঁছায় ।  তবুও অবাক হ‌ই যখন বাংলাকে বেকার ভাষা বলে ভোট নিতে চান দেখে । হয়ত বা আমার ভুল এই ভাষাকে কেন্দ্র করে এই বেকারত্বকে ঘিরে । কিম্বা হয়ত পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাভাষার গুরুত্ব যাচাই করার জন্য এই ভোট । সে যাই হোক কিছুদিনের মধ্যেই দেখি সেই ভোটের ফল প্রকাশিত । আকাশতলে অনিলে জলে, দিকে দিগন্তলে ৮৮ শতাংশ মানুষ এই বাংলাভাষাকে ভালোবেসে "ভালোভাষা" বলে জানিয়েছেন । 
এই ভোটাভুটির মাঝামাঝি কোলকাতায় আয়োজিত হল এক আলোচনাচক্র । ইন্টারনেটে বাংলাভাষার প্রসার, প্রচারকে ঘিরে নেটসাহিত্যের অগণিত পাঠক, লেখক ও সম্পাদকদের আনুকুল্যে । যার নাম "ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার"  । বাংলাভাষায় সাহিত্য রচনা করতে ভালোবাসেন অনেকেই । এবং এই ভাষাকে কেন্দ্র করে সম্পাদিত হয় অনেক অনেক ই-পত্রিকা বা ওয়েব ম্যাগাজিন ।   আর বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির রমরমায় বাঙালীর ঘরে ঘরে ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের অধিক্যে সেই সাহিত্য এখন এককথায় হাতের মুঠোয় ।  তাই এরূপ একটি সেমিনারের প্রয়োজনীয়তা এই মূহুর্তে খুব জরুরী ছিল । সৃষ্টি, ইচ্ছামতী এবং ওকোলকাতা এই তিনটি ওয়েব পত্রিকা এবং ব্লগজিনের  আতিথেয়তায় আমিও হাজির ছিলাম গত ১২ই অগাস্ট ২০১৩ বাংলা একাডেমীর জীবনানন্দ সভাঘরের ঐ আলোচনাচক্রে ।   
-->
ব্লগ লেখা শুরু করি ২০০৮ এর গোড়ার দিকে । ততদিনে বাংলা লেখার সফটওয়ার ও ইউনিকোডের জয়জয়াকার । এরপর সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ও ব্লগার বন্ধুদের সাথে ঘনিষ্ঠতায় ব্লগের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে । সোনারতরী ছিল আমার নিজের ব্লগ ।
অর্কুটময় দুনিয়ায় তখন বন্ধুদের সাহিত্যরস উপচে পড়ছে দেখে ভাবতাম এগুলি আমার ব্লগে একত্রে রাখলে তো মন্দ হয়না ।
কবি তো বলেইছেন "সেই সত্য যা রচিবে তুমি' ....সেই ভাবনা নিয়ে বেশ কয়েকজন বন্ধুকে বাংলা লেখা শিখিয়েও ফেলেছিলাম অনলাইন । কিন্তু ব্লগ খুলতে তারা নারাজ অথচ নিজের লেখা নেট-সাহিত্যে দেখতে খুব উদগ্রীব । সেই ভাবনা নিয়ে সোনারতরী থেকে প্রথম আত্মপ্রকাশ হয় "অর্কুট আগমনী পাঁচালী'
সেটাই ব্লগ থেকে আমার সম্পাদনায় ওয়েবম্যাগের জন্মলগ্ন, ২০১০ সালে পুজোতে । জনপ্রিয়তা দেখে ২০১১ তে "দোলছুট" ও ১লা বৈশাখে "পয়লা সাহিত্য পার্বণ" প্রকাশিত হল ।
তখুনি মেটামরফোসিস। ছিল রুমাল, হল বেড়াল । সোনারতরী র‌ইল আমার লেখার জন্য কিন্তু প্যাপিরাসের জন্ম হল ২০১১ পুজোতে । এইভাবে ব্লগ-বৈতরণী পার হতে গিয়ে কত লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ হল প্যাপিরাস । পরিচিতি বাড়তে থাকল ।
গুণমানের উত্কর্ষতার কথা চিন্তা করে বছরে দুটি উত্সব সংখ্যা বের করি আমরা । পুজোসংখ্যাটি একটু বিস্তারিত হয়,একগুচ্ছ গল্প, কবিতা, ভ্রমণকাহিনী, নিবন্ধ ও হোমমেকারের হেঁশেলের রেসিপি দিয়ে । আর ২০১২ থেকে শুরু হল একটি আলোচনাচক্র বা ফোরাম যার নাম "চক্রবৈঠক"। সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছ থেকে কোনো বিষয়ের ওপর মতামত সংগ্রহ করে সেটিকে প্যাপিরাসের পাতায় উপস্থাপিত করা হয় । ধারাবাহিক স্মৃতিচারণা থাকে একটি বিভাগে । ধরণীর পথেপথে নামে ভ্রমণের পাতা থাকে একটি । কখনো অণুগল্প থাকে ডজন খানেক অথবা নির্দ্দিষ্ট থিমে ছোটগল্প স্থান পায় ।

আমাদের ওয়েবম্যাগাজিনের ঠিকানা হল papyrus.sonartoree.com
আপনারা পড়ুন ও পড়ান সকলকে আর আপনাদের সুচিন্তিত মতামতের অপেক্ষায় র‌ইলাম ।


ক্যান-আনসার
 ক্যান-আনসার নামক একটি ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করেছিলাম স্বেচ্ছায় । আমাদের এক পুরোণো বন্ধু  অয়ন চৌধুরী এই গ্রুপের হোতা এবং প্রধান কর্ণধার । এবছর ছিল ক্যান-আনসারের প্রথম বর্ষপূর্তি ।  পাটুলীর কাছে কেন্দুয়া শান্তিসংঘ ক্লাব ও ক্যান আনসারের উদ্যোগে ১৫ই আগষ্ট ২০১৩ তে  আমরা হাজির হয়েছিলাম ঐ দিন সন্ধ্যায় । প্রচন্ড বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও প্রচুর মানুষ হাজির হয়েছিলেন ঐ আলোচনা চক্রে । অনেক নামী অঙ্কোলজিষ্ট, বৈজ্ঞানিক, চিত্রশিল্পী, এবং কোলকাতার নাট্যমঞ্চের বেশ কয়েকজন মানুষ উপস্থিত হয়ে ওনাদের এই মারণ ব্যাধি নিয়ে সুচিন্তিত মতামত রেখেছিলেন ।   অভিনেতা চন্দন সেন, বাদশা মৈত্র, অনিন্দ্য এবং ডাঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়, ডাঃ টিঙ্কু আচার্য কোলকাতায় এই রোগটির ভবিষ্যত এবং সুযোগ সুবিধা নিয়ে আলোচনা করলেন । ছিল একটি প্যানেল ডিসকাশান । আমি আমন্ত্রিত হয়েছিলাম উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশনের জন্য । শুভাপ্রসাদ নন্দী মজুমদার এবং তাঁর সুযোগ্যা কন্যা ডানা, অমিতাভ চৌধুরী এবং শ্যামল চৌধুরী সংগীত পরিবেশন করেন । শুভাপ্রসাদের কন্ঠে শুধু তোমার বাণী নয় গো হে এবং ডানার কন্ঠে ও আমার দেশের মাটী, অমিতাভর কন্ঠে  মাগো ভাবনা কেন, শ্যামল চৌধুরীর কন্ঠে সার্থক জন্ম আমার সত্যি সত্যি প্রশংসনীয় ।  সকলেই বললেন কর্কট রোগাক্রান্ত মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে, তাদের পাশে থাকতে এবং তাদের সঙ্গ দিতে । ডাক্তারবাবুরা আলোচনা করলেন কি করা উচিত, কোথায় সর্বাগ্রে যাওয়া উচিত এই নিয়ে । কোলকাতায় এরূপ আলোচনাচক্র হওয়া খুব জরুরী । কারণ কোলকাতার চিকিত্সার ওপর আস্থা না রেখে বহু মানুষ পাড়ি দেন ভিন রাজ্যে । আমার প্রশ্ন তাহলে কি ভিনরাজ্যে এই রোগ নিয়ে সচেতনতা  আরো বেশী এবং চিকিত্সক এবং সহকারীরা কি আরো বেশী কম্পিটেণ্ট না কি কোলকাতার মানুষজনরা এই রোগ কে নিয়ে অহেতুক ত্রাসে ভোগেন ?  এমন অনুষ্ঠান আরো হোক । তবেই হবে এই রোগকে দমন করার মত সাহস । রোগ তো মানুষের শরীরে দিনক্ষণ তিথি না মেনেই বাসা বাঁধে কিন্তু আমরা কি পারিনা দিনক্ষণ তারিখ মেনে প্রতি মাসে গুগল হ্যাঙ আউটের মাধ্যমে এরূপ আলোচনা চক্রে যোগ দিতে? ক্যান আনসার ভাবো এবং ভাবাও সকলকে । তাহলে দেশের গন্ডী পেরিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক আলোচনা চক্র তৈরী করতে পারি । অনেক তথ্যের আদানপ্রদানে রোগটি সম্পর্কে আরো সচেতন হতে পারি । মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি । 
অলীক সুখ 
শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটির হ্যাট্রিক ! দেখেছি এদের আগের ছবিদুটিঃ ইচ্ছে ও মুক্তধারা । খুব বাস্তববাদী কাজ করেন এরা । আর নতুন রকমেরো ।  আমার পছন্দের লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কাহিনী। পছন্দের অভিনেতা দেবশঙ্কর হালদারকে নায়করূপে প্রথম দেখা। আর সোহিনীকে নতুন করে কিছু বলার নেই । চন্দ্রবিন্দুর অনিন্দ্যকে আরো একবার Hats off! দারুন লিরিকস আর দারুন সুর। আর জয় সরকারের অনবদ্য সঙ্গীত আয়োজন ।পুরোটাই পাওয়ার সুখ । আমার কাছে যা মোটেও অলীক নয় ।
সব মিলিয়ে রোবাবরের বিকেল + প্রিয়া সিনেমা + অলীক সুখ = টোট্যালি পয়সা উশুল ছবি । সাথে বোনাস হল বিশ্বনাথ + নন্দিতা + শিবপ্রসাদের সাথে প্রিয়ার সিঁড়িতে করমর্দন !!!
এই হল কলকাতার মানুষজনের অলীক সুখ । বাঙালী বেশ আছি আমরা বেঁচে বরতে ...কি বল ? বাইরে বেরিয়ে দেখি একজন ব্যাগ ভর্তি আচার নিয়ে চেঁচাচ্ছে " ও মা একটা প্যাকেট আচার নিয়েই দেখুন না ! ওদিকে ন্যানোর কারখানা হলে সে সিঙ্গুরে গিয়ে সেই আচারের ব্যাগ পুরোটাই হয়ত বিক্রি করে আসতে পারত । অন্যথায় যারা আচার তৈরী করা শেখালো তারা সেই আচারের বিশ্বব্যাপী মার্কেটিং করে আজ ক্রোড়পতি। আজ তারাই এই শহরটাকে গ্রাস করে ফেলল । তাই তো ন্যানো ওদের দেশে ।আমাদের অলীকসুখ আছে বাবা। আমরা এই নিয়ে দিব্য আছি বেঁচে । আমাদেরই বা সুখ কম কিসের?
ভামের ফলাহার
রোজ‌ই দেখছি ফলের ঝুড়ি ক্রমশঃই নিম্নগামী । আজ দুটো আপেল, কাল একটা পেয়ারা । কাল রাত্তিরে হাতেনাতে । কে বলেছে ভীড়ভাড়াক্কার মহানগরে "ভাম" নামক জীবটি লুপ্তপ্রায়? সাততলার ছাদ দিয়ে ঢুকে মনের আনন্দে সে একটা মস্ত পাকাপেঁপে প্রায় আধখানা খেয়ে বামাল সমেত গ্রেফতার । বেচারা পাকা পেঁপের আধখানা খেয়ে ফেলেছিল ভাগ্যিস! বাকীটা বাথরুমের পাশে রেখে আমাকে দেখেই পত্রপাঠ জানলা দিয়ে ইয়া মোটা সুললিত ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে পথ পায়না! রেশমী তার দাড়ি চকচকে পশমী গা, ধূসর সোনালী আভা ফুটে বেরুচ্ছে। শহুরে ভামের ব্যাপারই আলাদা । আবার হানা রাতদুটোতে । শব্দ পেয়েও উঠিনি । বারান্দার কোলাপ্সিবল গেট দিয়ে ঢুকে আবার একটা আপেল সিঁড়িতে, আরেকটা ধোপদুরস্ত টেবল-লিনেনে ছত্রাকার করেছে !
 "খাবিতো খা, না খাবিতো যাঃ" ....তাই বলে ঈদের বাজারে মাগ্যির ফল নিয়ে নষ্ট করবি! প্রফেট মহম্মদ ঈদের দিনে পাঠিয়েছিলেন এই দেবদূতটিকে । একে না কি খট্টাশ বলে । নিশাচর হয় এরা ! যাক্‌ আমার ঈদের নামাজ পড়াতো জানা নেই । জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর! ইংরেজী নাম Large Indian Civet Cat.
  

মনসুন মোমেন্টস-২

   ভেজা টাওয়েলটা আবার বিছানার ওপর রেখেছিস? ….সরি মা! তুমি তো আছো তাই।
দাদাই বলল, পরের বারে এসে হয়ত আমার সাথে আর দেখাই হবেনা তোর।.... ধুস্! দাদাই! কি যে বলো! 
দিদা বলল, আর কি পরের বার তোকে নিজের হাতে মাংস রেঁধে খাওয়াতে পারব? ….ঠিক পারবে দিদা। 
ঠাম্মা বলল, কি রে আরেকবার আজ দেশপ্রিয় পার্ক খেলনার দোকানে যাবি নাকি? হট-হুইলসের গাড়ি কিনতে? ….এখন আর অত ছোট্ট গাড়িতে হবেনা ঠাম্মা। রিয়েল মডেল চাই ফর্মুলা ওয়ান কারের।  

.....আইনক্সের সেই মুভিটা? মানিস্কোয়ারের সেই আইসক্রিমটা? গড়িয়াহাটের মোড়ের সেই রোলকর্ণার? মনে পড়ছে কি তোমার বলো? বলো? চুপ করে আছো কেনো মা? নিউমার্কেট যাবে যে বলেছিলে? সেই কত কত ফেক ঘড়ি ছিল ! পার্কস্ট্রীটের চেলো কাবাবটা খাওয়ানো হলনা তোমাকে আজো! প্রিয়ার কাছে সেই দুপুরগুলো? তুমি ফুটপাথী মোমো খেতে দিতেনা, বলতে বানিয়ে দেবো। মায়ের কেবিনের চপ আজো খাওয়া হলনা আমাদের্! এখনো ফুটপাথে বিরিয়ানির হাঁড়িগুলো বসানো থাকে মা? কি উগ্র গন্ধ বেরোয় আশপাশ থেকে। 

তোমাদের ধর্মের সংজ্ঞাটা আজো ক্লিয়ার না আমার কাছে। জানো মা ? আজ আমাদের দেশে এত রেপ হয় কেন?
এই তোমাদের মত অর্থডক্স যারা সংস্কারের বশে হাত ধুয়ে পুজো করো, পুজোর ফুল মাথায় ঠেকাও তাদের জন্য। মেয়েদের জন্যে যারা একটুও ভাবোনা তাদের জন্যে।  ঠাম্মা-দিদাই তো বলে ফুলো লুচিগুলো আমার পাতে দিতে। আর তোমরা সব মিয়োনো, ন্যাতন্যাতে, পোড়াগুলো নাও নিজেদের পাতে। ছেলেদের উচ্চাসনে বসিয়ে কি লাভ মা? সমান করতে শিখলেনা আজো? আমের আঁটিটা তুমি‌ই কেন খাবে? বাবার পাতে কেন দেবেনা মা? মেয়েদের এত নীচু করে রেখে আসার মাশুল দাও এবার। 
….
মা, আবার তুমি আজ সেই চিকেনটা বানিয়েছো? জিও! বেশী রুটি করেছ তো ?   
মা, জিনসের এই বাটনটা  একটু সেলাই করে দিও প্লিজ! কতবার বললাম এই নিয়ে!
ঘুম থেকে উঠবনা, ব্যাস্! আজ রোববার! আজ দেরী করব‌ই।
মা, রান্নার মাসী আসেনিতো কি? আজ তাহলে রান্না কোরোনা। কাবাব খেতে যাব চলো। প্লিজ মা, কাবাব এন্ড বিয়ার !!!
ফাটাফাটি হয়েছিল কালরাতের  পুডিংটা। আবার বানিও। ওজন বাড়ছে বাড়ুক, নো চাপ! চিল, চিল! কুল, কুল!
….
এই উইকএন্ডে তবে শান্তিনিকেতন ফাইনাল তো ?... ইয়েস!
মা শুনেছো? ইউটিউবে শানের রবীন্দ্রসংগীত! হোয়াট এন ইম্প্রোভাইজেশান! কর্ডগুলো ফলো করলে? এই নেক্সট উইকেন্ডে কিন্তু উইকেন্ডার কলকাতায়। ফসিলস থাকছে। যাবে তুমি?
নজরুল মঞ্চে ইন্দ্রায়ুধের বাবা তেজেন্দ্র নারায়ণ আছেন, সাথে জাকির হোসেনের তবলা। যাবে তো ? 
ঐ দ্যাখো মা, আমার সেন্ট জেভিয়ার্সের বন্ধু কবীর তোমার তারা মিউজিকে পারফর্ম করছে!
….
মা, রান্নার মাসীরো তো ছুটির দরকার আছে? সপ্তায় সাতদিন তোমার ছেলে যদি কাজ করত?
চিনি-দুধ না দিয়ে ঐ অখাদ্য চা যে তোমরা কি করে খাও?  
আমার ডিমের পোচে "মোলগরিচ" মাস্ট কিন্তু!    
….
 বিয়েবাড়ি থেকে ফিরে বাড়ির মেয়েরা বলাবলি করছিলাম "বৌ কিন্তু বেশ ময়লা। রং টা আমাদের বাড়ির মতো নয়" ব্যস! ঝাড় খেলাম সক্কলে ছেলের কাছে।
আচ্ছা মা গায়ের "কমপ্লেকশান"টা কি  মেয়েটার দোষ? গায়ের ওপরে কি কোনো ট্যাগ লাগানো থাকে? "ফর্সা", "কালো" এইসব? তোমরা কতবড়ো হিপোক্রিট বলো! মাকালীর পুজো করো আবার কালো বৌ বাড়িতে এলে ক্রিটিসাইজ করো! 
….
অবশেষে ভরে গেল তার স্ট্রলি ব্যাগ। মামা-মামীর আদরে উপচে পড়া সেই হাসিটা ডোরবেল শুনে দৌড়ে গিয়ে রিসিভ করতেই থাকল সুদূর ব্যাঙ্গালোর থেকে পাঠানো  একের পর এক গিফ্ট...পারকার পেন, টাই, লেদার ওয়ালেট, ফার্ষ্টট্র্যাক ঘড়ি ....মায়ের চুপিচুপি ওয়েষ্টসাইডে গিয়ে  কিনে আনা পুজোর জামা, টিশার্ট- ব্লু জিন্স, মোজা, রুমাল, ভেস্ট, ড্রয়ার, ট্র্যাকস্যুটস, মেডিসিন, আর বাবার  ওয়ালেটে পড়ে থাকা কিছু খুচরো ডলার নোটস। ঠাকুমা, দাদু-দিদারা আলমারী ঘেঁটে আরো কয়েকটা ছোট নোট।
…..
মামাদাদুর ওভারকোর্টটাই নেব আমি। ড্রাই ক্লিন করিয়ে দাও। ওটা উইসকনসিন থেকে এবার ফিলি যাবে আমার সাথে।  তনুমা লাস্ট-ইয়ার  পুজোতে যে ব্লু শার্টটা দিয়েছিল? আর সেই ফুলস্লিভ রেড গেঞ্জীটা? দিয়েছো তো মা? 
….
ঠাম্মা, আজ বাজারে তপসে মাছ পেলে নাকি?  মৌরলাটা পেলেও এনো প্লিজ!
দিদা, তোমার সব লুচিগুলো গোল হয় কি করে? 
দাদাই,  তুমি তো কানে শুনতে পাবেনা, বরং আবার বলো সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের গল্পগুলো। 
কাজের মেয়ে বলে, ও বৌদি, খুব ভালো করে উজালা দিয়ে দিলাম গেঞ্জীগুলোতে....ওখানে বেচারার কি হবে কে জানে?
রান্নার মাসী বললে, ও দিদি? ওকে সহজে চিকেন স্ট্যু-টা শিখিয়ে দি চলো।
বাবু, কিচেনে ঢোকার আগে হাতটা ওয়াশ করে নিস। কুকিং রেঞ্জে হাত দেবার আগে গ্লাভস পরে নিস।  কি যে করবি তুই একা একা!  বাবু, ওখানে একটা মিক্সার-গ্রাইন্ডার কিনে নিস কিন্তু। মাসী নেই যে শিলে তোর মাংসের মশলা বেটে দেবে। 
দ্যাখ, এমনি করে স্ক্রেপার নিয়ে আলু ছাড়িয়ে, চপিং বোর্ডে রেখে তারপর ছুরি দিয়ে.....ব্যাস, ব্যাস! আর বলতে হবেনা মা, তোমার রান্নার ব‌ইটাতে এসব আছে তো ?
আমি বললাম, ধুস্! সেখানে তো শুধুই রেসিপি! এগুলো আস্তে আস্তে শিখে যাবি দেখিস!দেখিস বাবা হাতটা কেটে ফেলিসনি যেন! তুই যা ধড়পড়ে!  
আর তোমার সেই প্রেসারকুকারে ফেমাস চিকেন বিরিয়ানির রেসিপি? ওটাতো লাইফসেভার, মামু বলেছিল ফার্গোতে পৌঁছেই। 

সত্যি খুব ইজিরে ওটা। সকালবেলা কলেজ যাবার আগে চিকেনটা মশলাপাতি দিয়ে ম্যারিনেট করে, ইয়োগার্টে ভিজিয়ে ফ্রিজে রেখে দিবি।  সন্ধ্যেবেলা ঘরে এসেই প্রেসারকুকারে রিফাইন্ড তেলে গরমমশলা, আলু, পেঁয়াজটা বাসমতী চালের সাথে ভেজে নিয়ে চিকেনটা দিয়েই একটা সিটি ব্যাস! আর্সেনালের ম্যাচ আর আর্সেলানের বিরিয়ানি জমে দৈ এক্কেরে! ও হ্যাঁ, জলটা দিবি ডাবল অফ রাইসের একটু কম।
মা আমার দ্বারা এত্তসব হবেনা। ঠিক হবে দেখিস! একদিন বানিয়ে দু দিন খাবি। আর খিচুড়ি, ফ্যানেভাতে, ডাল সেদ্ধ, ওমলেট, আলুভাজা তো এতবার শেখালাম। 

৩০ এপ্রি, ২০১৬

ভোটের আমি, ভোটের তুমি

 কি মজা! কি মজা! আজ পরীক্ষা শেষ হল। আবার সারাবছর পড়বনা। মা মন্দিরে ফুল চড়াবে আর বলবে, এবারটার মত পাস করিয়ে দিও ঠাকুর। পরেরবার থেকে আমি নিজে দেখব ওর পড়াশুনো। মা অমন হামেশাই বলে। মা তো নিজেই জানে। তিনি নিজেও কখনো পড়াশুনো করতেন না। আমি এবারেও মা'কে প্রমিস করে বলব, আর ফাঁকি দেবনা। বাবা যখন প্রতিমাসে তার কষ্টার্জিত নোটগুলো দিয়ে টিউশান-ফি দেবে তখন বলব, এবার দেখো আমি ঠিক মন দিয়ে পড়াশুনো করব। তারপর? তারপর একবার যদি আমি টিচারের চোখের মণি হয়ে যাই, আমাকে আর কে পায়? না পড়েই পাস করে আসছি এ যাবত। তাই সেটাই আমার স্বভাবটা খারাপ করে দিয়েছে। নয়ত বিশ্বাস করুন, মা-বাবা কারোকে বলতে হত না পড়, পড়। কোশ্চেনগুলো কমন এসেচে। কিন্তু তবুও অনেক ছেলেরা টুকলি করার চেষ্টা করেছে জানেন্? আমি অবিশ্যি ভালো ছেলে। অনেক আটঘাট বেঁধে রেখেছিলাম। তাই মনে হয় উতরে যাব এবারেও। বেশ খেয়ে, পরে, ঘুমিয়ে, ছবি এঁকে, কবিতা লিখে, সিনেমা দেখে, ব‌ই পড়ে থাকি। পরীক্ষার চাপ থাকেনা। ভাল্লাগেনা এই পরীক্ষার সময়টা। বড্ড চাপ হয়ে যায়। মা-বাবার টেনশান বেড়ে যায়। তবুও পরীক্ষা দিতেই হয়। নয়ত মানুষ হব কি করে?    

......

কাল সকাল চান সেরে উপোস করে অঞ্জলি দি প্রতিবার। আমার আবার ধম্মেকম্মে খু‌উব মতি কিনা! নির্জ্জলা উপোস করে পুজো না দিতি পারলে মনটা যেন সাফসুতরো হয়না। যবে থেকে নাবালিকা নাম ঘুচেছে তবে থেকে এইপুজোর ব্রত করছি। তবে কিছু পাবার আশায় নয়। পেত্থম পেত্থম ভাবতি কত অদলবদল হবে নাজানি। দেশটা আমার ফুলছোঁড়াতেই আমূল বদলে যাবে! ও হরি! এতো ঢপের চপ! রাস্তার ফুটপাথে রোজ পা মচকায় তবুও এই পুজো করি আমি। ছেলেগুলো কত্ত পড়ে এসেও চাকরী পায়না এখানে তবুও এই পুজো করে মরি আমি। মায়ের চিকিত্‌সা করতে ভেলোরে যাই আমি তবুও নাকটিপে পুজো করব । আমার বাড়ির সামনের রাস্তায় টাইমকলের জল উপচে পড়ে তবুও আবাসনে ডিপ টিউবওয়েল। তাও আমার শিক্ষে হয়নি, এই পুজো আমি করে ছাড়ব‌ই। রাস্তাঘাট আলোয় আলোয় ছয়লাপ তবুও শিল্পের হাহাকার। তো কি? লোডশেডিং তো নেই! কাল সারা রাত ধরে সব ভেবে দেখনু, এই পুজো করেই ছাড়ব কারণ এ পুজোয় আমার জন্মগত অধিকার।
আর এবার বাপু উপোস করিনি। দিব্যি চা-টা খেয়ে টেয়ে, সেজে আর গুজে গেনু।  
আম্মো এই গরমে পাট ভেঙে একখান মলমলি ছাপাশাড়ী পরে দিয়ে এনু । তবে শাড়ির রং সম্বন্ধে খুউব সন্দিহান সকলে । কমলা নয়, লাল নয়, নীল নয়, সবুজ নয়। স্রেফ সাদা পরে। কানে গুঁজে  ফুল। তবে পদ্ম, ঘাসফুল নৈব নৈব চ! পিঠে বেঁধে  কুলো। থুড়ি হাতে বেঁধে কুলো, পড়শীরা সব দেখে আমায় বলল এ কি হল? 
আর? ছোট্ট টিপ, হালকা লিপিস্টিক আর? চোখের চারপাশের কমনীয় ত্বক ঢাকিনি রোদচশমাতে। কারণ অত সকালে দরকার নেই। পোষাক তো হালকা রংয়ের আছেই। ছাতা শুনলাম অনেকেই ফোকটে পেয়েছে। শুনলাম SPF 15 সমেত সানস্ক্রিন লোশানও দিচ্ছে মহিলা ভোটারদের । আর যে যাচ্ছে বিরিয়ানিও পাচ্ছে অতএব দুপুরের খাওয়ায় নো চাপ!কারণ সাথে আছে চিকেন চাপ।  সব মিলিয়ে its Vote time! party time! long weekend celebration ahead ! ভোটপুজো বলে কতা!    

...
 

ভোলা/ভুলু/? শুনতে পাচ্ছিস্‌? রাত পুইলেই পরীক্ষে না? তা না পড়ে পড়ে শুধু ঘুম আর ঘুম। যে গুলো পরীক্ষেয় ইম্পটেন্ট সেগুলো ভুলিসনি যেন বাপ্‌ আমার।  এই গরমে তোর মাথার ঘিলুতে শুধু যে কোশ্চেনগুলো গেঁথে দিলুম সেগুলোই আসবে কিন্তু। ঠিকমত পোশ্নের উত্তর দিস বাপ্‌ আমার। আর রাতে হালকাপুলকা খাবার খেয়ে নে বাপ্‌। বেশী খেলে বদহজম হবে। তাপ্পর সব ভুল করে আসবি তুই। আর শোন্‌ আরেকটা কথা। আজ এট্টু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়িস বাপধন! হক্কাল হক্কাল উইঠ্যা, চিঁড়া-গুড় খাইয়্যা, হাওয়াই চটি পৈরে পরীক্ষে দিতে যাস বাপ্‌। বেশী অন্ধকারে যাস্‌না ভুলু/ভোলা।  পুলিশেরা নাকি পুছতাছ করতে পারে। কপালে দৈয়ের ফোঁটাটা পরিয়ে দেব আমি। হলুদ-সিঁদুরে চাল দিয়ে দৈয়ের ফোঁটা খুব শুভ। কিন্তু তুই মুছে নিস বাপ্‌। পেন্সিলবাক্স নিস্‌না যেন। পকেটের মধ্যেই পেন রাখিস। ওরা নিয়ে নিতে পারে। রঙীন জামা পরিসনি যেন ভোলা/ভুলু। ওরা সন্দেহ কত্তে পারে। মোবাইলটা বাড়িতে রেখে যাস। ওরা নিয়ে নিতে পারে। ঐ যে কোন্‌ পার্টির থেকে ছাতা দেছিল, ওটাও নিয়ে যাস্‌নি বাবা। কি দরকার? কোত্থেকে কি হয়ে যায়? ভোলা বললে, আমাকে হাওয়াই চটি পরতি বলছ আর নিজে তো কপালে ইয়া বড় কালোজামের মত টিপ প‌ইরেছো। রাতেই টিপটা খুলে রাকো দিকিনি। নয়ত ওরা সন্দেহ করবে।

 .......

২৪ এপ্রি, ২০১৬

c/o সীতায়ণ



 "সীত" বা লাঙলের ফলায় মাটি থেকে উত্পন্ন সেই সীতার কাহিনী নিয়ে সীতায়ণ বা অন্য রামায়ণ লিখেছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। জন্ম থেকে বিলীন হয়ে যাওয়া এই কন্যার দুর্ভাগ্যের আঁধার ছিল নিবিড় ছায়াসঙ্গী। আদর্শবাদকে দূরে সরিয়ে রেখে সেই কন্যার অন্ধকার পরিবৃত জীবনে আলো ফেলেছিলেন লেখক। এই ধ্রূপদী উপন্যাস যখন মঞ্চের আলোআঁধারে জনকনন্দিনীর প্রতিবাদী লালিত্যে উদ্ভাসিত হয় তখন তা সত্য সীতায়ন। শুধু রামায়ণের স্তুতিগীতিতে মুখর নয় তা। জনকদুহিতার আড়ম্বরহীন, ব্যসনে-ভূষণে সীতাকন্ঠ বারেবারে প্রতিধ্বনিত হয়ে একটাই কথা বলে" জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা, জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্তটীকা" । কি হবে বিবাহের প্রলোভনে পা দিয়ে? কি হবে নিজের বহু আকাঙ্খিত প্রিয়তম পুরুষের বীজ গর্ভে ধারণ করে? কি‌ই বা হবে আজীবন সেই পুরুষের হাতের ক্রীড়ানক হয়ে মধুচন্দ্রিমার ভোগ্যবস্তু হয়ে? জীবনের সর্বোত্তম মূহুর্তে ভুলে যাও মধুযামিনী যাপনচিত্রকথা। সেই চিত্রকূটে, সেই নৈমিষারণ্যেই হয়ত হতে পারে তোমার নির্বাসন। তাই এই সীতাকে আজ হতে হয়নি বাক্যহীনা। সতীত্বের পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত সে সীতা। তার জীবনের প্রথম পুরুষ, শেষ পুরুষ, উত্তর পুরুষ, মধ্যম পুরুষ সব‌ই অযোধ্যার আদর্শবান রাজা রামচন্দ্র নামে এক আর্য যুবক। যে রাজা শুধু সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া। সবার উপরে পিতৃসত্য, প্রজাসত্য। চুলোয় যাক মাতা, পত্নী।
একটাই তো ব‌ই জীবন। একটাই তো ব‌ই যুগ। যার নাম ত্রেতা। তিনি না ত্রাণ করতে এসেছেন। কার ত্রাণ? কিসের ত্রাণ? স্ত্রী, মাতা এরা সামান্য নারী। ত্রাণ যদি করতেই হয় তবে প্রজাই মুখ্য ত্রেতাযুগে। প্রজাবত্সল হলেই পরজন্মে আবার অবতারত্বের গ্যারান্টি । তাই না তিনি যুগেযুগে আদর্শ ভ্রাতা, আদর্শ পুত্র, আদর্শ রাজার তকমা লাগিয়ে মহত হলেন। কিন্তু সীতা নামের মেয়েটি? যে মধ্যবয়সে সেই আদর্শবানের বীজ গর্ভে ধারণ করে , নিজের গর্ভিণী জীবন একাকী লালন করে আশ্রমবাসী হয়ে। লঙ্কা থেকে ফেরার পর যাকে রাবণ রূপ খলনায়কের দূষণ, কালিমা, পাপ মোছার জন্য সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হয়। মনে মনে সেই সীতার কেবল একটাই প্রশ্ন জাগে সীতায়ণে। নারীর কলঙ্ক মোচনের জন্য আগুণ‌ই কি প্রকৃষ্ট পরীক্ষক? কালিমা-কলঙ্ক কি আগুণের লেলিহান শিখাতেই ধুয়েমুছে সাফ করে নারীকে আবার পরিচ্ছন্ন করে দেয়? যে স্বামী একদিন তার কন্ঠলগ্না হয়ে, আলিঙ্গন করে স্বেচ্ছায় তার যোনিপথে ঢেলে দিয়েছিল উষ্ণবীর্য। সেই নারীর মুখের কথা, চোখের ভাষাই কি সব নয়? কেন তাকে বিশ্বাস করা যায়না? কারণ সে নারী বলে? তেজোদৃপ্ত, পেশীবহুল পুরুষের কাছে এই সীতার প্রশ্ন সেটাই। এই সীতা সোচ্চার সেই প্রতিবাদে।এই পুরুষের পৌরুষ কি কাপুরুষতায় পর্যুবাসিত? "কানপাতলা" তো মেয়েদের হয়। পুরুষদেরো হয় নাকি? তাই বুঝি প্রজাসর্বস্ব এই রাজা বারেবারে স্ত্রীকে দূরে সরিয়ে আত্মতুষ্টিতে নিজের মহত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। আর তাই বুঝি নৈমিষারণ্যে বাল্মিকীর আশ্রমে সীতার মুখ থেকেই স্বয়ং বাল্মিকী শুনতে চান সীতার জীবনের করুণ কাহিনী। কিন্তু কবি বাল্মিকীও ভারতবর্ষের এক সনাতন আদি কবি। মস্যাধারে খাগের কলম ডুবিয়ে ভুর্জপত্রে সীতার মুখনিঃসৃত সত্যি কথাগুলি আড়াল করে বলেন, "না, মা, ভুলে যেওনা। তিনি তো অবতার। তিনি আদর্শ রাজা রামচন্দ্র। তোমার অনেক সৌভাগ্য যে তুমি তাঁর সন্তানের জননী। ইক্ষ্বাকু বংশের মর্যাদায় তুমি তাঁর ধর্মপত্নী।"
গল্পের শুরুতেই শুনি নদীতে নৌকার ছলাত ছলাত শব্দ। হোমশিখার মত পবিত্র মাতৃত্বে বিভোর হয়ে বহুদিন পর সীতা চলেছেন লক্ষণের সঙ্গে। কিন্তু যেইমাত্র জানলেন যে রামচন্দ্রের আদেশে বাল্মিকীর আশ্রমে শুরু হবে তাঁর এই গর্ভিণী জীবন তখনি শুরু সীতায়ণ। তিনি হয়ে উঠলেন প্রগলভ, প্রতিবাদী এক নারীকন্ঠ। তাঁর স্বামীর হৃদয়ে সীতা নামের নারীটির জন্য কোনো স্থান নেই। সে শুধু রাষ্ট্রতত্ত্বকে প্রতিপালন করে। চিরদুঃখের পথে হাঁটতে গিয়ে সেই নারী নিজে রচনা করলেন নতুন এক পথ। নতুন পথে ধরে র‌ইলেন সেই অমোঘ আলোকবর্তিকা। সেই পথে হাঁটবেন দর্শক। সেই পথের নামকরণ করেছিলেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। সেই পথের আজকের ঠিকানা c/o সীতায়ণ।
আমিও সেই প্রজননকারী নারীর এককণা। তাই আমি জননী। আমার দ্বারাও পুরুষের রমণ হয়েছে। তাই আমি রমণী। আমার প্রতিবাদীনি রূপের চেয়ে মহলে মহলে থাকাটাই পুরুষের সর্বকালের পছন্দের তাই আমি মহিলা। রাজার রাজ্যশাসনের আওতায় কি স্ত্রীর প্রতিপালন পড়েনা? স্ত্রী শুধুই বংশরক্ষার্থে যুগে যুগে আবির্ভূতা হন? এ তুমি কেমন রাজা রামচন্দ্র? লোকে তোমায় মান্যিগণ্যি করে। লোকে তোমার আদর্শ নিয়ে স্তুতিগান করে । রামায়ণের হিরো তুমি হতে পারো কবির কলমে। আমার মনে নয়।
প্রতিবাদী সীতার মেনে নিতে কষ্ট হয়। সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ। তিনি বারেবারে মঞ্চ কাঁপিয়ে আজকের নারীর উদ্দেশ্যে সেই কথা ছুঁড়ে দিতে লাগলেন। আর আমার মত এহেন নারীদর্শক সেই অণুরণন কানে নিয়ে ফিরে এল গতকাল শিশিরমঞ্চ থেকে।

শাঁওলি মিত্রের দ্রৌপদীর আখ্যান নিয়ে "নাথবতী অনাথবতের" পর রোকেয়া রায়ের সীতায়ণ। ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে এলে সম্পূর্ণ হয় একপাক। যেমন উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ণ।

আদর্শরাজা (?) রামচন্দ্রের জীবনের সম্পূর্ণ নিয়ে বাল্মিকীর কলমে রামায়ণ। আর মল্লিকা সেনগুপ্তর বহুচর্চিত এই সীতায়নের সম্পূর্ণতার রূপায়ণ বল চরিত্রায়ণ বলো সবটুকুনি‌ই হল তোমার অভিনয়ে, রোকেয়া রায়। তোমার মঞ্চ পরিকল্পনা অনবদ্য। নাটকের নির্দেশনায় মলয় রায় অত্যন্ত পটুতা দেখিয়েছেন। বহু অভিনয়ে একক চরিত্রে সুমন অত্যন্ত দাপুটে। কখনো সে অত্যাচারী রাবণ, কখনো ন্যায়নিষ্ঠ দেবর লক্ষণ, কখনো সেই ইক্ষাকুনৃপতি রাঘবেন্দ্র রাম, আবার কখনো বয়সের ভারে কুব্জ, ন্যুব্জ বাল্মিকী মুণি, আবার এক ঝলকে ছোট্ট কিশোর লব। কি অপূর্ব ট্রানজিশান তার স্বরক্ষেপণে, ব্যাক্তিত্ত্বে। তবে মঞ্চে সীতার পোশাক আরো অন্যরকম হতে পারত। রামের কাপুরুষতা একটু প্রচ্ছন্ন লেগেছে। আর সংলাপে এক‌ই কথার বারবার প্রয়োগ একটু অস্বস্তির কারণ। কে জানে? হাতুড়ি দিয়ে আমাদের সমাজের মানুষগুলোর মাথায় বোধহয় এইকথাগুলোই প্রোথিত করতে চেয়েছেন স্বয়ং পরিচালক। আর নয় পুরুষের জয়গান। ভুলে যাও রামগান। শুরু হোক সীতায়ন। মোটের ওপর প্রখর গ্রীষ্মের চোখরাঙানি ভুলে, ভোটরঙ্গ শিকেয় তুলে পয়সা উশুল সন্ধ্যেনাটক। আরো একবার দেখার ইচ্ছে র‌ইল। টিম সীতায়ণ যুগ যুগ জিও!

১৭ এপ্রি, ২০১৬

নূতন রতনে-১

পাতপেড়ে খেতে কার না ভালো লাগে! তাই আবারো সুরজিত ও বন্ধুরা কবিতাক্লাবের নতুন বছরের আমন্ত্রণে "নতুন"থিমে মুক্তগদ্যের পংক্তিভোজনে আমিও।
http://www.kobitaclub.com/tomar_kobita_comment.php?tkid=17689  


১৪ এপ্রি, ২০১৬

বারাণস্যাং অন্নপূর্ণাং



বারাণসী বা কাশী মহাতীর্থে দেবাদিদেব বিশ্বেশ্বর বিরাজ করেন। বিশ্বনাথের মন্দিরের পাশেই অন্নপূর্ণার মন্দির। বারাণসী একান্ন সতীপীঠের অন্যতম কারণ এখানে দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর কুন্ডল পড়েছিল। কথিত আছে বারাণসীর গঙ্গার অন্যতম মণিকুন্ডল ঘাটের নাম এই থেকেই। তাই কাশীর বিশ্বেশ্বর হলেন এখানে মায়ের ভৈরব এবং দেবী অন্নপূর্ণা হলেন তাঁর প্রকৃতি। পীঠ হয়ে ওঠার পেছনে যে স্থান মাহাত্ম্য থাকে অর্থাত উত্তরবাহিনী নদী, সংলগ্ন শ্মশান সবকিছুই বর্তমান এখানে। তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থে আছে, 

বারাণস্যাং বিশালাক্ষী দেবতা কালভৈরবঃ 
মণিকর্ণীতি বিখ্যাতা কুন্ডলঞ্চ মম শ্রুতেঃ।।
 যদিও এখানে বলা হয়ৈছে দক্ষযজ্ঞের সময় দেবীর কুন্ডল পড়ার কথা স্কন্দপুরাণের কাশীখন্ডে আছে একদা বিষ্ণু এখানে মহাতপস্যা করেন। তপস্যার পর তিনি তাঁর চক্র দিয়ে একটি পুকুর খনন করেন এবং নিজের স্বেদ দিয়ে তা পূর্ণ করেন। মহেশ্বর তা দেখে খুশি হয়ে মাথা নাড়তে থাকেন ও তাঁর মাথা নাড়ার ফলে কানের কুন্ডল ঐ পুকুরে পতিত হয়। তাই ঐ স্থানের নাম মণিকর্ণিকা। শিবপুরাণে বলা হয় তপস্যার সময় বিষ্ণুর কান থেকে বিবিশ রত্নে ভূষিত কর্ণকুন্ডল পতিত হবার আখ্যান । পীঠনির্ণয় তন্ত্রে দেবীর কর্ণকুন্ডল পতিত হবার জন্য দেবী হলেন মণিকর্ণী বা বিশালাক্ষী আর তাঁর ভৈরব হলেন কালভৈরব।

আদ্যাস্তোত্রে আমরা পাই "বারাণস্যাং অন্নপূর্ণা" । কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গলে পাই এখানে দেবীর বক্ষদেশ পতিত হবার কথা।

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের ছত্রে ছত্রে দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য কীর্তণের গল্প পাই। শিব ও পার্বতীর সংসারের ঘোর দারিদ্রের বর্ণনা দিয়ে শুরু এই কাহিনী। মা অন্নপূর্ণা তখনো অন্নপূর্ণা হয়ে ওঠেননি। এহেন দেবী পার্বতী একদিন শিবকে বললেন মনের কথা। দারিদ্র্য তাঁর আর সহ্য হয়না। মাথার চুলে ও সর্বাঙ্গে তেল না পড়ে রুক্ষ ও শুষ্ক হয়ৈছে তাঁর গাত্র ও কেশরাজি। শিবের জন্য নিত্য সিদ্ধিপাতা বেটে বেটে হাতে পড়েছে কড়া। এক পুত্র গজানন, চারহাতে খায় ও অন্য পুত্র ষড়ানন ময়ূর নিয়ে অহোরাত্র খেলে বেড়ায়। এতজনের সংসারে অন্ন নেই। তাই পার্বতীর হাহুতাশ দেখে মহাদেব ভিক্ষায় বেরুলেন।

আর পার্বতী তাঁর সখী জয়ার কাছে মনের দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন..


কি করিব একা ঘরে রয়ে বৃথা

কেন দুঃখ পাই বাপের মন্দিরে যাই

গণপতি কার্তিকেয় লহে।।

যে ঘরে গৃহস্থ হেন সে ঘরে গৃহিণী কেন

নাহি ঘরে সদা খাই খাই

কি করে গৃহিণী পানে ক্ষণক্ষণ ঝন্‌ঝনে

আসে লক্ষ্মী বেড় বান্দে নাই।।

মনস্তাপ করতে করতে দেবী বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন ভাবলেন। জয়া তাঁকে নিরস্ত করে বললেন" দ্যাখো, স্বামী ধনহীন হলে বাপের বাড়িতে মেয়েদের কোনো সম্মান নেই" তার চেয়ে তুমি অন্নপূর্ণা রূপ ধারণ কর। সারা বিশ্বের যত অন্ন আছে তা তোমার সংগ্রহে রাখো। মহাদেব ভিক্ষা করে কোথাও যখন অন্ন পাবেননা তুমিই তাঁকে অন্ন যোগাবে" দেবী অন্নপূর্ণার রূপ ধারণ করলেন। সারা বিশ্বের সমস্ত অন্ন একত্র করে নিজের সংগ্রহে রাখতে শুরু করলেন। এদিকে মহাদেব আর ভিক্ষা পান না। অবশেষে তিনি লক্ষ্মীর কাছে গেলেন অন্নের জন্য। লক্ষ্মী তাঁকে বললেন, " অন্ন তুমি কোথায় পাবে? তোমার ঘরণী সব অন্ন নিজের কাছে রেখেছেন যে! তাই তো বিশ্ব সংসারে অন্ন অপ্রতুল" মহাদেব তখন ঘরে ফিরে দেবীর কাছে ভিক্ষা চাইলেন। পরিতৃপ্তি সহকারে উদরপূর্তি করে বিশ্বকর্মাকে অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য কাশীতে স্বর্ণ দেউল মদির নির্মাণের আদেশ দিলেন। চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমীতিথিতে দেবীর পূজা চালু হল।





দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য ও প্রকাশ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গলের পরের পর্বে আরেক লৌকিক কাহিনীর অবতারণা করলেন। দেবীর দুই সখী জয়া ও বিজয়া দেবীকে বললেন, ধনপতি কুবের নিত্য তোমার পুজো করে। পূজার ফুল সংগ্রহ করেন কুবের অনুচর বসুন্ধর । বসুন্ধরকে শাপগ্রস্ত করো। এবং তবেই বসুন্ধরের মাধ্যমে তোমার পূজার প্রচলন হবে। ধনপতি কুবের পূজার ফুল সংগ্রহ করলেন। কিন্তু দেবীর মায়ায় ফুলের বাগানে তার স্ত্রী বসুন্ধরার সঙ্গে সাক্ষাত হল। বসুন্ধরের স্ত্রী তার স্বামীকে বললে, এই এত ফুলে পুজো করে কি হবে স্বামী? তার চেয়ে আমরা এই ফুল দিয়ে বাসর রচনা করে প্রেমালাপ করি"

এদিকে কুবের ভবনে বসুন্ধরের বিলম্ব দেখে দেবী ক্রুদ্ধ হলেন। এবং বসুন্ধরকে অভিশাপ দিয়ে মর্ত্যে প্রেরণ করলেন। মর্ত্যে বসুন্ধর বাংলাদেশের গঙ্গার তীরে বরগাছি গ্রামে হরি হোড় রূপে জন্ম নিলেন । খুব দুঃখ কষ্টে তার জীবন কাটে। বনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে কাঠ কেটে, ঘুঁটে কুড়িয়ে তার বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য অন্নের জোগাড় করে হরি হোড়। একদিন দেবী অন্নপূর্ণা এক বুড়ির বেশ ধরে তার সামনে উপস্থিত হলেন। হরি হোড় দেখল, সেই বুড়ি তার সংগৃহীত কাঠ-ঘুঁটে সব একত্র করছে।


কোথা হতে আসে বুড়ি, ঘুঁটে পায় ভরে ঝুড়ি সর্বনাশ করিল আমার।

কাড়ি নিলে হবে পাপ, বুড়ি পাছে দেয় শাপ এ দুঃখের নাহি দেখ পার।।

বুড়ি তখন তাকে বললে, বাছ, আমি এত ব‌ইতে পারছিনা, তুমি যদি আমার বোঝাটি বয়ে দাও এর অর্ধেক কাঠ ও ঘুঁটে আমি তোমাকে দান করব"

বৃদ্ধারূপিণী দেবী এত ধীরগতিতে হাঁটতে শুরু করলেন যে হরির বাড়ির কাছে যেতেযেতেই সন্ধ্যে নেমে এল। বুড়ি বলল" এখন তো আর চলতে পারিনে বাবা, তোমার ঘরেই থেকে যাই" হরি বললে" বুড়িমা, আমরা যে হতদরিদ্র, তোমাকে কি খাওয়াব?"

বুড়ি বললে

"বাছা, তোমার মা'কে বল, অন্নপূর্ণার নাম করে ভাতের হাঁড়ি বসাতে"

হরির মা তখন বুড়ির আদেশ মত ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে দেখেন তার মধ্যে নানাবিধ সুখাদ্য রয়েছে। এবার হরি বুঝতে পারলেন বৃদ্ধাবেশী দেবী অন্নপূর্ণার ছলনার কথা। দেবী হরি হোড়কে বরদান করতে উদ্যত হলে হরি বলল, "এই বর দিন, যাতে দেবীর পাদপদ্মে যেন আজীবন ঠাঁই হয়" দেবী তথাস্তু বলে অন্তর্হিত হলেন। এরপর হরির তিনবার বিয়ে হল। ধন সম্পদের অভাব র‌ইলনা। প্রত্যহ তার ঘরে অন্নপূর্ণার পূজা হতে থাকল। কিন্তু এক গৃহে বেশীদিন বাধা পড়ে থাকলে বসুন্ধরের শাপমুক্তি ঘটবে কিভাবে? তাই দেবী আবারো ফন্দী আঁটলেন। এদিকে দেবী হরিকে কথা দিয়েছেন যে তার গৃহ ছেড়ে অন্যত্র যাবেননা। স্বর্গে বসুন্ধরের স্ত্রী বসুন্ধরা ব্যস্ত হলেন তার স্বামীর জন্য। দেবীকে সে কাতর হয়ে প্রার্থনা জানালো। একে পতি বিরহে সে আকুল, অন্যদিকে তিন সতীনের কষ্ট সে আর সহ্য করতে না পেরে দেবীকে বলল" আমাকে রক্ষা করুন, অনেকদিন তো হল আমার স্বামীর মর্ত্যবাস। এদিকে আমি যে আর স‌ইতে পারিনে"

দেবী ভাবলেন বসুন্ধরাকেও যদি মর্ত্যে বদুন্ধর অর্থাত হরি হোড়ের গৃহে পাঠাই তাহলে ওদের ঘরে চরম অশান্তি সৃষ্টি হবে আর সেই অছিলায় তিনি অন্যত্র গমন করবেন।

কিন্তু হরি হোড়ের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে অন্নপূর্ণার ব্রতী হবে কে? তাই নিত্যপূজা চালু রাখার জন্য দেবী গমন করলেন ভবানন্দ মজুমদারের গৃহে। হরি হোড়ের পূজার সময় দেবী তার মেয়ের রূপ ধরে এসে বললেন, " বাবা, আমি তবে যাই?" হরি বললেন, " হ্যাঁ, যাও।" ব্যাস্! সেই অপেক্ষাই করছিলেন দেবী। তিনি ভক্তের সাথে ছলনা করে ভবানন্দের গৃহে পা বাড়ালেন।

হরি হোড়ের বাড়ি থেকে ভবানন্দের বাড়ি যেতে হলে নৌকায় নদী পেরুতে হবে দেবীকে। নদী পার হবার জন্য ঈশ্বরী পাটনীর সাহায্য চাইলেন তিনি। একা মেয়েছেলেকে নৌকা পার হতে দেখে মাঝি ঈশ্বরী তার পরিচয় জানতে চাইলেন। দেবী রহস্যাবৃত করে বলতে লাগলেন সেই বিখ্যাত কবিতা।


গোত্রের প্রধান পিতা মুখ্য বংশজাত।

পরম কুলীন স্বামী বন্দ্যো বংশখ্যাত।।

পিতামহ দিলা মোরে অন্নপূর্ণা নাম।

অনেকের পতি তেই পতি মোর বাম।।

এইভাবে যুগ যুগান্ত ধরে অন্নদামঙ্গলের এই সাধারণ লৌকিক কাহিনীগুলি হরি হোড় থেকে ভবানন্দ মজুমদার, বাংলার একগ্রাম থেকে অন্য গ্রাম দেবী অন্নপূর্ণার দেবী মাহাত্ম্য প্রচার করে আসছে ।

১২ এপ্রি, ২০১৬

নীলষষ্ঠী কথা

 

অশোকষষ্ঠী বা বাসন্তীদুর্গাপুজো হয় চৈত্রমাসের শুক্লাতিথিতে। মহাদেবের নীলের পুজোর দিনটা বরাদ্দ চড়ক বা গাজনের দিনক্ষণ অনুযায়ী, বর্ষশেষের সংক্রান্তির আগের দিনে। প্রতিবছর এই নিয়ে দুগ্গার সঙ্গে শিবের বেশ ঠান্ডা লড়াই চলে।  তা এবার সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে বাসন্তী-অশোকষষ্ঠী আর নীল একদিনে পড়েছে। শিবের ফন্দী আর কি দুগ্গার জানা নেই? দুগ্গা একটু বাপেরবাড়ি আসতে চান নিরিবিলিতে কিন্তু এবার সেই গাঁটছড়া বেঁধে নেশাখোরটা সঙ্গী হল।  
আসার পথে দুগ্গা বলেছিল একবার, এবার ভোটের হাওয়া গরম, বোশেখ না পড়তেই হাওয়াবাতাস গরম। তুমি চুল-দাড়ি-জটা-গোঁফ কেটে চলো। শিব বলল, আমি মেয়েছেলের কথায় কান দি‌ই না। 
দুগ্গা বলল, ক'দিন আগেই তো ঠান্ডায় ঠান্ডায় শিবরাত্তিরে কত ক'দিন আগেই তো মহা ধূমধাম করে কত্ত পুজো পেলে । ফাগুনদিনের মাগ্যির বেলের পানা, তরমুজ, ফুটি খেয়ে পথ্যি করলে। সিদ্ধি-মধু-ঘিয়ের ফেসপ্যাক নিলে । ডাবের জলে মুখ আঁচালে । ঠান্ডার পর নতুন গরমে টক দৈয়ের ঘোল খেয়ে ব্যোম্‌ ব্যোম্‌ করে ত্রিভুবন শান্তি কল্লে । মাথা ঠান্ডা তো তোমার গুরু! আবার নীলষষ্ঠী ? ষষ্ঠী তো এতদিন জানতাম একবগ্গা মেয়েদের সম্পত্তি। এবার সেখানেও ভাগ বসালে তো আমাদের ব্র্যান্ড ডাইলুশান হয়। 
শিব বলল, নিজের আত্মতুষ্টিতে বিভোর তুমি। জানবে কি করে প্রজারঞ্জনের মাহাত্ম্য? 
আবার ষষ্ঠীর পেছনে নীল জোড়া কেন বাপু? ক‌ই আমরা তো লাল,সবুজ, হলুদ ষষ্ঠীর দোহাই দি‌ই না মানুষকে।
পাশ থেকে সাওকড়ি মেরে নন্দী বলল, মা ঠাকরুণ তো ঠিক‌ই বলেচে বাবা।   
নীলষষ্ঠী নীল কেন ? লাল বা সবুজ নয় কেন?
নীল কথাটি নীলকন্ঠ মহাদেবের সাথে সাযুজ্য রেখে... এতদিন আমার কাছে আচিস এটাও জানিস নে?  মহাবাবা বলেন । সেই যে সেই সমুদ্রমন্থনের  সময়  আমি দুনিয়ার  সব বিষ আমার কন্ঠে ধারণ করেছিলাম । তাই তো সকলে আমাকে নীলকন্ঠ বলে ডাকে রে ।
তার সঙ্গে ষষ্ঠী জুড়লো কে বাবা ? নন্দী বললে
তাহলে শোন্‌ বলি:
এক বামুন আর বামনীর পাঁচছেলে আর দুটি মেয়ে । ( ফ্যামিলি প্ল্যানিং তো আর ছিলনা সে সময়ে )তারা খুব পুজোআচ্চা করত । কিন্তু এত পুজো, বারব্রত করেও তাদের সব ছেলেমেয়েগুলো একে একে মরে গেল । তখন বামনীর ঠাকুরদেবতায় বিশ্বাস চলে গেল । তাদের আর সেই জায়গায় থাকতেও ভালো লাগল না । বামুন-বামনী ঠিক করল  সব ছেড়েছুড়ে তারা মনের দুঃখে কাশীবাসী হল । দশাশ্বমেধ ঘাটে স্নান করে অন্নপূর্ণার পুজো করে মণিকর্ণিকার ঘাটে বসে আছে , এমন সময় মা-ষষ্ঠী বুড়ি এক বামনীর বেশে এসে বললে " কি ভাবছ গো মা?" বামনী বললে " আমার সব ছেলেমেয়েদের হারিয়েছি । এত পুজোআচ্চা সব বিফলে গেল আমাদের । সব অদৃষ্ট। ঠাকুর দেবতা বলে কিছ্ছু নেই । "
ষষ্ঠীবুড়ি বললেন " বারব্রত নিষ্ফল হয়না মা, ধর্মকর্ম যাই কর ঈশ্বরে বিশ্বাস চাই । তুমি মা-ষষ্ঠীকে মানো? তাঁর পুজো করেছ কখনো?  তিনি সন্তানদের পালন করেন । বামনী বললে " আমি এযাবতকাল সব ষষ্ঠী করে আসছি কিন্তু তবুও আমার ছেলেরা র‌ইল না ।
ষষ্ঠীবুড়ি বললেন্" তুমি নীলষষ্ঠীর পুজো করেছ কখনো? চৈত্র সংক্রান্তির  আগের  দিন উপোস করে শিবের পুজো করবে । শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে জল খাবে । সন্তান্‌দের মঙ্গলকামনা করবে"
বামনী সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে  পুনরায় মাতৃত্ব লাভ করলে । নন্দী সব শুনে বললে" বাবা, এ তো তবে তোমার নিজের ব্র্যান্ড ক্রিয়েট করলে তুমি । আর সবষষ্ঠীর পুজোয়তো মাষষ্ঠীর পাল্লা ভারী হয়ে যাচ্ছিল তাতে যদি তোমার নামডাকে ভাটা পড়ে তাই বুঝি এমনটি কল্লে তুমি?"মহাবাবা বললেন " দেখ নন্দী, এখন যা যুগ এয়েচে তাতে নিজের ব্র্যান্ড যে মূল্যেই হোক ক্রিয়েট করতে হবে । নয়ত তুই স্থান পাবিনা জগতে , যা কম্পিটিটিভ মার্কেট এয়েচে! লাখলাখ দেবদেবীর ভিড়ে মহাদেবকে কেউ আর মানবেনা ।          
আর এবার সেজন্যেই একসঙ্গে এসেচি আমরা। বাসন্তী-অশোক ষষ্ঠীও থাক। নীলষষ্ঠীও থাক। মানুষ জানুক রসায়নের জারণ-বিজারণের মত, পদার্থবিদ্যার স্থিতি-গতির মত শিব-দুগ্গার স্মরণ-মনন যুগপত ঘটে।