২৩ মার্চ, ২০২০

করোনার কড়চা

ঠাত যেন আলোর ঝলাকানি তারই মাঝে। অভিভূত হয়ে পড়ছি সবাই। এদ্দিন স্বার্থপর মানুষ শুধু দারা-পুত্র-পরিবারের অসুখে প্রার্থনা করত। এখন অপারগ হয়ে সারা বিশ্ববাসীর জন্য ভাবছে। শিখছে সভ্য, শিক্ষিত মানুষ। পরিবার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব একে অপরের খবর নিচ্ছে, সেটাও আমাদের পরম পাওয়া। সব মানুষের পাখীর চোখ এখন করোনা দমন। রাজনীতির রঙ, জাতপাত সব ভুলে সবার লক্ষ্য এক । সেটাই বা কম কিসের? ভাবছিলেন তো মিলন হবে কত দিনে? এইতো এগিয়ে এল সেই বহু আশার মিলনক্ষণ। আমরা সবাই এখন এককাট্টা হয়েছি। মোরা মিলেছি আজ মায়ের সাথে।
ওদিকে রাস্তায় গাড়ি চলছেনা। সব বন্ধ। কেউ বাইরে বেরুচ্ছেনা। যেন বন্ধ উদযাপন চলছে দিনের পর দিন। অর্থাত প্রচুর এনার্জি কনজারভেশন হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। প্রকৃতি খুব খুশি । এজন্য‌ই বুঝি বলে রিসোর্সেস লিমিটেড, বুঝে চল।
আরেকদল শিক্ষিত মানুষ জেনেবুঝেও অন্ধ। এই একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের দাপটে রাজার ঘরেও যে অসুখ টুনির ঘরেও তাই। বিলেত ফেরত গায়ক গায়িকা এদ্দিন নিজেকে যত‌ই সেলেব ভাবুন না কেন উনি আসলে কিস্যু নন। গণ্ডমূর্খ। মোটেও সমাজ সচেতন নন। শিল্পী হবার কোনো যোগ্যতাই আসলে নেই তাঁদের, শুধু গান গাইলেই শিল্পী হওয়া যায় না। তাঁরা ছড়ালেন রোগ। ছড়াচ্ছেন‌ও প্রতিমূহুর্তে। মরছি আমরা, যারা সরকারি বিধি মেনে চলছি। দামী চিকিত্সক থেকে নামী আমলা, খেলোয়াড় থেকে অভিনেতা আজ আমি-আপনি কিন্তু সমান রিস্কে, সেটা অন্ততঃ বুঝুন। রাজার রোগ, টুনির রোগ এখন সমান।

আমাদের তো দিব্য চলছিল কবিতার আড্ডা, সাহিত্য‌আড্ডা, জনসমাবেশ, মাল্টিপ্লেক্সে হৈ হৈ হ্যাঙ‌আউট, শপিংমলের ফুডকোর্টে মস্তির দিনলিপি। ক্রমে চীন, জাপান, কোরিয়া আর তারপর দস্তুর মত ইউরোপ। ইতালি কে শেষ করে ইরান। আমেরিকাতেও অনুরূপ অবস্থা।  দাপিয়ে বেড়াতে বেড়াতে অবশেষে ভারতে ঢুকে এল করোনা ।  তখনও হুঁশিয়ার নয় আম বাঙালী। ওয়ার্ক ফর্ম হোম, অনলাইনে পড়ানো এসব করতে করতে ঘরে বোরড হয়ে ক্লাবে কিম্বা রেস্তোরাঁয় গিয়েছে তারা। নাহ! তারপর অ্যাটলাস্ট সেই অশৌচ পর্ব পালন আবশ্যিক হয়েই পড়ল। তবুও ভবি ভোলার নয়। কলকাতায় কাজের লোকেরা সবেমাত্র বলতে শুরু করেছে, কি একটা রোগ এইয়েচে গো?
এর মধ্যে ফুলেল শহরে বসন্তের কোকিলের কুহুতান । তার শুধু চিন্তা আহার-মৈথুনের আর বাঙালীর ভ্রমণের। তায় আবার পুরোদস্তুর ছুটির আমেজ। বাঙালীর ভ্রমণ পিপাসা পায়। ভাবতে অবাক লাগে। হোয়াটস্যাপে দী-পু-দার প্ল্যান হয়। ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ যেন। এরা আবার গাড়ির মধ্যে ঢুকে সেলফি তুলে এই ডামাডোলের বাজারে ফেসবুকে পোস্ট‌ দেবার লোভ সামলাতে পারেনা। বলে ওঠে, হ্যালো ফ্র্যান্দস...চললুম পলাশের দেশে। কারণ বসন্ত ফুরায়। বাঙালীর বেড়ানোর নেশা পৃথিবীর সব জাতের চেয়ে বেশী কিনা।
ততক্ষণে লন্ডন ফেরত শিক্ষার্থী, আমলা ও ডাক্তারের পুত্র ছড়িয়েই দিল সেই মারণ রোগ কলকাতায় । ঠিক তারপরেই দক্ষিণ কলকাতার ওয়েসিস আবাসনের ব্যাবসায়ী পুত্র। এরা সবাই লন্ডন ফেরত। কিন্তু কারোর কোনও হেলদোল নেই। নেই স্বাস্থ্য সচেতনতা। বাড়ির লোকেও ভাবল না নিজেদের কথা, পড়শির কথা। মশাই এরা মানুষ? মানুষের তো আক্ষরিক অর্থে মান এবং হুঁশ দুই থাকতে হয় জানি। আবার নির্লজ্জের মত কলকাতার বাপ মায়েরা তাদের বিদেশে পড়া ছেলেপুলেকে ডেকে ডেকে নিয়ে এলেন দেশে। আহা! বলুন তো! মায়ের প্রাণ! আয় তোরা আয় ফিরে অথবা বেটা তুরন্ত  বাপাস আ যা । সঙ্গে নিয়ে আয় দু' চারটে করোনা।
তাদের উদ্দেশ্যে বলি, আমাদেরও আছে মশাই বত্রিশ নাড়ী ছেঁড়া ধন সেদেশে পড়ে। তবু বলেছি বেরুবি না একদম। প্রয়োজন না হলে। ঘরে বসে পড়াশুনো। কনফারেন্স, মিটিং সব চলছে গবেষকদের। দুগগা নাম জপছি অহোরাত্র ঘরে বসে।

এখন অনলাইন ম্যানেজমেন্টের ছাত্রের পরীক্ষার ইন্টার্ভিউতেও করোনা ইস্যু। ম্যানেজমেন্ট গুরু শিষ্যকে শুধান " আচ্ছা বল দেখি স্যনাইটাইজারের খুব চাহিদা এখন। বাজারে পাওয়াই যাচ্ছেনা। তোমায় যদি একটা মডেল সেট আপ করতে বলা হয় কি হবে তার স্ট্র্যাটেজি?” তারপর তার সাপ্লাই আর ডিমান্ড নিয়েও ভাবনাচিন্তা । ভাব ম্যানেজমেন্ট ট্রেনী ভাব। গ্রুম কর নিজেকে। করোনার যুগে তোমাদের এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই হবে ম্যানেজমেন্ট পড়লে।

পরীক্ষাগারে সহজে রাসায়নিক স্যানিটাইজার তৈরী কিম্বা গ্রামে গঞ্জে ভেষজ পদ্ধতিতে। এমন সব ইনোভেশন দৌড়চ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তেই কলকাতার করোনা কথার জন্ম হল। শয়নে স্বপ্নে জাগরণে এভাবেই করোনা ঢুকে পড়েছে বাঙালীর জীবনযাত্রায়। ধীর গতিতে আমরা পেরিয়ে চলেছি একের পর এক স্টেজ গুলি। এক, দুই, তিন। কে জানে ততদিনে আমিই বা কেমন থাকি।

কলকাতা করোনা কথা - ৫ 
২৩ শে মার্চ, ২০২০
অবশেষে করোনার এপিসেন্টার দক্ষিণ কলকাতার পন্ডিতিয়ার আবাসন ওয়েসিসে গতকাল মধ্যরাতে চারজন আমেরিকার অভিবাসী ফিরলেন দীর্ঘ দিনের ছুটি কাটিয়ে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। এর মধ্যে দুজন আমাদের ব্লকে, দুজন পাশের ব্লকে। ফেসবুকেও তাঁরা আমার খুব ভালো বন্ধু দিদি। তারা সবাই বেশ বয়স্ক। সিনিয়ার সিটিজেন। বিদেশ থেকে ফিরে কিছুদিন এখানে থেকে তারপর ভারত পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন।প্রতিবারেই যান এমন। শুনলাম তাদের আইসোলেশনে থাকতে বলা হয়েছে। সরকারি নোটিশ। আমার প্রশ্ন হল রোগের সিম্পটম না দেখা দিলে টেস্ট করা হবেনা? না কি অপর্যাপ্ত টেস্ট কিট বেলেঘাটা আইডি তে এবং পিজি তে। আরো দুজনের পড়ুয়া কন্যা বিদেশ থেকে এসে ঘাপটি মেরে ঘরে বসে রয়েছে। ওয়েসিস টাওয়ারে করোনা আক্রান্ত চারজনের কথা তো সবার জানা। তাঁরা এখনও সবাই আইডিতে ভর্তি আছেন। তারপরেই শুনলাম এইমাত্র আমার নীচের তলায় একজন প্রৌঢ় ফিরেছেন কাতার থেকে একমাস আগে। তার নাকি জ্বর জ্বর ভাব আজ থেকে। তবে একমাস বোধহয় পেরিয়ে গেলে ভয়ের কিছু নেই। করোনার ইনকিউবেশন পিরিয়ড দু-সপ্তাহ ভাগ্যিস!
ধরিত্রী দেবী দ্বিধা হ‌ও। রিয়েল এস্টেট নিপাত যাক। ফ্ল্যাট কালচার আর নয়। পুনর্মুষিকো ভব। বাড়িই ভালো। বুঝবেন তো রিয়েল এস্টেটের মালিকরা? সম্বিত ফিরবে আপনাদের? বাড়ি ভেঙে, পুকুর বুজিয়ে বড় বড় আবাসন বানাবেন তো? এই শিক্ষাই করোনার কাছ থেকে নিতে হবে কিন্তু। 
বাকী চার পর্ব  আরও পড়ুন এখানে  CORONA EPICENTRE KOLKATA 

১০ মার্চ, ২০২০

ব্রহ্মা জানেন এসব তত্ত্ব


স্বয়ং ব্রহ্মা জানতেন না। এবার জানুন দয়া করে। 

হ্যাঁ, প্রজাপিতা ব্রহ্মাও জানেন মেয়েদের চেপে রাখা, চেপে দেওয়ার গোপন তত্বটি । আবহমানকাল ধরে সেটাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লেগাসি মশাই। পান থেকে চুন খসে যাবে তবুও ব্রহ্মা অনড়।

আমাদের আড়িয়াদহের বাড়ি ছিল রক্ষণশীল। দাদুর গঙ্গাস্নানে গিয়ে বারেবারে পায়ে ঠেকতে থাকা শিবলিঙ্গ মাথায় করে এনে নিত্য ফুল-বেলপাতা-জল আর বাতাসা দিয়ে পুজো এখনো হয় দুবেলা। ঐ সার্ধশতবছরের ধাতব শিব এখন আমার বাবা-মায়ের কাছে। সেই সূত্র ধরেই ছোটোবেলা থেকেই আমাদের বাড়ির মেয়েরা শিবপুজো ও অন্যান্য পুজোয় সামিল হয়েছি সেই ছোট্টবেলা থেকেই।  এ আমার সংস্কার। এ আমার অহংকার। একে আমার লালন করতেও মন্দ লাগেনা। দক্ষিণ কলকতার শ্বশুরবাড়িতে পুজোআচ্চা বড় একটা দেখিনি। ষষ্ঠী, বারব্রত তে গায়ে উপোস আর পয়সা তুলে রাখা ছাড়া। "ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মোটি" দেখতে দেখতে এসব খুব মনে পড়ছে কাল থেকে। পৈতে কেন পরব না, আমারো মনে হত বৈকি । পরে জেনেছি নবদুর্গার ব্রাহ্মণী রূপে আর সরস্বতী পুজোয় দেবীরাও উপবীত পরেন বৈকি। বাড়িতে মা অনেক ট্যাবু ভেঙেছিলেন । রোজ আমি বা মা কেবল সন্ধ্যে জ্বেলে শাঁখ বাজাব কেন? তাই ভাই আর বাবাও প্রক্সি দিত। বাড়ির প্রথম মেয়ে আমার জাঠতুতো দিদির প্রথম অসবর্ণ বিয়ে হল। বিয়ের পরে অষ্টমঙ্গলায় এসে দিদি বলেছিল আমি তো শিবঠাকুর ছোঁবনা, আমার তো ব্রাহ্মণত্ব ঘুচেছে। মা বলেছিল, আলবাত জল দিয়ে ছুঁয়ে পুজো করবি তুই। বাড়িতে সরস্বতী পুজো বা শিবরাত্রির পুজো বাবার সঙ্গে সমান তালে মাকে করতে দেখেছি। মন্ত্র বলে আমাদেরো পুজো করাতে শিখিয়েছে মা। শাঁখা-পলা আমাদের ঘটিবাড়িতে ঠাকুমাও পরতেন না। সিঁদুরও অতি সামান্য। তবে কেউ পরলে বাধা দেয়নি। এই যেমন আমার ভালো লাগে লোহা পরে থাকতে, একটু সিঁদুর ছোঁয়াতে সেটা আমার বিশ্বাস। সেটাও আমার সংস্কারের মধ্যেই পড়ে। তাই বলে কেউ না পরলে আমিও জোর করে চাপাতে রাজী ন‌ই। আমার আশেপাশের মানুষকে খুশি করাই নয়, আমারো ভালো লাগে। তবে আমি অত আড়ম্বরে পুজোআচ্চা করিনি কোনোদিনো। যতটুকুনি না হলে নয়। আর ঐ পাঁজির পুরুত? তাদের মৌলবাদ বা ফতোয়া জারি করা, এটা হবে না, ওটা করতে নেই, এসবকে আমিও এক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দি চিরকাল। সেইসঙ্গে বিজ্ঞান আমাকে অনেক যুক্তি দেয় এবং দিয়ে চলে। এই যেমন বাসিকাপড় ছেড়ে রান্না ঘরে ঢোকা। সেটার একটা হাইজিনের অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি। তাই বলে ভোরবেলায় স্নান করেই ঠাকুরঘরে বা রান্নাঘরে ঢুকতে হবে, তাই আবার একজন মেয়েকে সেটা আমার নাপসন্দ। গায়ত্রী মন্ত্র বা ওম্‌ কেন মেয়েরা উচ্চারণ করবেনা? সেটা নিয়েও আমার সঙ্গে তুমুল হয়েছে বাবার সঙ্গে এক আধবার। সত্যি‌ই তো পিতৃতান্ত্রিক সমাজ এসব ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করে রেখে দেবে আজন্মকাল? মেয়েরাই আজন্মকাল পুজো গোছাবে, ভোগ রাঁধবে, বাড়বে  অথচ প্রধান পুজোটা করবে একজন পুরুষ পুরোহিত? সেই সঙ্গে বিয়ের সময় পিঁড়ি করে মেয়ে কে ঘোরানো বা কন্যা সম্প্রদান কে বড়োই অহেতুক বলে মনে হয়েছে আমারো।
গতবছর আমর ঋতুমতী পুত্রবধূকে কালীমন্দিরে প্রবেশ করিয়েছি আমি ও আমার কর্তা দুজনে মিলে। সে নিজে অবাক হয়েছে। সে নিজে মানেনা কিন্তু সোজা একেবারে মন্দিরের গর্ভগৃহে  ঢুকতে আপত্তি করছিল, ভাবছিল হয়ত তার নতুন শ্বশুর শাশুড়ি কি ভাববে। কিন্তু আমরাই বলেছি, আয় তুই। তখন তার চোখ চিকচিক করে উঠেছে। এত লিবারাল তার আধুনিক শ্বশুর শাশুড়ি?
আমিও বলেছি সেদিন তাকে, এই পুরুত গুলোই তো অম্বুবাচীতে কামাখ্যায় যজ্ঞ করে আসে না? যত্ত জ্বালা তাদের রক্তমাংসের মেয়েদের নিয়ে? তাই বলে শবরীমালা প্রসঙ্গ কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য। খ্রিষ্টানদের হাত থেকে একটা হিন্দু মন্দির কে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় এত সরব তারা। এমনিতেই দক্ষিণে পুজোটুজোয়, আচার বিচারে আমাদের এক কাঠি ওপরে সেখানে আর এক শ্রেণীর মানুষরা সেই পিরিয়ডস নিয়েই এত সোচ্চার ।সেখানে আবার রাজনৈতিক কারণও আছে অতএব সিনেমায় এই প্রসঙ্গটি না এলেও পারত। আরেকটা ছোট্ট ভুল। ঊমা কে হোয়াটস্যাপ পাঠিয়েছিল শবরী। কিন্তু ঊমা এসে বলল, এসেমেস পেয়েছে। এছাড়া সুপার ফ্ল পেলুম না। সত্যি বলছি ভালো লেগেছে ছবিটি। আমাদের সবার প্রিয় কবি সম্রাজ্ঞীর সংলাপ, ঋতাভরীর চমৎকার অভিনয় এর জন্যই ১০০ তে ৮০ দিলাম। অতিকথনে দুষ্ট নয়, প্যানপ্যানে প্রেম নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা হল মেয়েদের উত্তরণের গল্পটি। বাঙালিদের জীবনে মেয়েদের তুলে আনার জন্য যিনি এই কাজটির পুরোধায় সেই গৌরী ধর্মপাল কে আবারো শ্রদ্ধা। খুঁটিনাটি সব বলে দিয়েছে ছবির চিত্রনাট্য। সবাইকে দেখে আসার অনুরোধ জানাই। মেয়েদের পৌরোহিত্য এর জয়জয়াকার হোক। কন্যা সম্প্রদান, লগ্নভ্রষ্টা, পুজোর তিথি এসবের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে এগিয়ে চলুক তাদের ধ্বজা উড়িয়ে।
সব শত্রুমুখে ছাই দিয়ে ব্রহ্মাদের আবহমানকালের লেগাসি কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিন মেয়েরা, মায়েরা, ঘরের ঝি বৌরা। ধর্ম ভীরু হবেন না দোহাই। ধর্ম প্রাণ হয়ে উঠুন। মানবিকতাই হোক আসল ধর্ম। সবার ওপরে মানুষ সত্য। অতএব লিঙ্গ বৈষম্য আর নয়!
স্বয়ং ব্রহ্মা জানতেন না। এবার জানুন দয়া করে।  দিন আগত ঐ! 

৬ মার্চ, ২০২০

ফালতু দিনের ঝরাপাতা / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়




ধুর মশাই ! আর এই প্রতিবছর এই নারীদিবসে আর হ্যাজাতে ভাল্লাগেনা আমার। এই বিশেষ দিনগুলো আসলে বড্ড দেখনদারির আর গ্লোবালাইজেশনের চক্করে পড়ে ঐ উইমেনস হরলিকস, কেলগস স্পেশাল কে, হীরের গয়নায় ছাড়, শড়িতে ফ্ল্যাট ডিসকাউন্ট আজকের জন্য অথবা বেকারী শপে শুধু মেয়েদের জন্য আজ কেক কিনলে চকোলেট ফ্রির শোয়িং অফ । এসবে আমার চিঁড়ে ভেজার নয়। আমি রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছি। রক্ষণশীল পরিবারে বিয়ে হয়ে এসেছি। মেয়েদের অধিকার টধিকার নিয়ে, আদ্দেক আকাশের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে দুই পরিবার বেশ সজাগ এবং সচেতন। তবে এদের সেই "ভবি ভোলার নয়" ব্যাপারটাকে আমি প্রায় ৮০ শতাংশ ভুলিয়েই ছেড়েছি। তাই ঐ সব নারীদিবস উদযাপন টুজ্জাপন আমার কাছে নয়। অধিকারের প্রশ্নে যে জন্য আজকের দিনটা পালন হয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সেটা বেশ স্পেশ্যাল বটেই।
শৈশব থেকে কৈশোর পদার্পণেই আমি দেখেছি চরম লিঙ্গ বৈষম্য। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে সংসারে মেয়ের কোলে কি করে ছেলে আনতে হয় অথবা মেয়ে জন্মালে শাঁখ বাজাতে নেই কিম্বা ছেলের জন্মদিনে কেমন পরিপাটি করে পায়েসের বাটি কিম্বা মাছের মুড়োটি আগেভাগে তুলে রাখা হয়। দেখে এসেছি । আমাদের বাড়িতেই বলতে শুনেছি "ছেলের মুতে কড়ি, মেয়ের গলায় দড়ি"

অথবা মাধ্যমিকে স্টার পেলে "হীরের টুকরো ছেলে" বলতে শুনেছি। হীরের টুকরো মেয়ে বলতে শুনিনি আজ অবধি। তা যা বলছিলাম, একটু বড় হতেই মেয়েবেলার স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে একাধিকবার। হাঁটু ঝাড়িয়ে ফ্রকের ঝুলেই হোক কিম্বা বুকের কাছে ফ্রিল দেওয়া ফ্রকেই হোক। ফ্যাশন নয় মোটেও। শ্যাম্পু করা চুলে একখাবলা তেল। সেটা নিজের অপছন্দ হলেও। একটা পনি টেল নয়, দুই বিনুনী‌ই মাস্ট কারণ "বড় হ‌ওনি এখনো" কিম্বা এখুনি "ব্রা" নয়। আরো পরে। মামারবাড়িতে দেখেছি পঙক্তিভোজে একপাল তুতো ভাইবোনদের মাঝে নাতনীদের বরাদ্দ আধখানা ডিম আর নাতিদের পুরো ডিম পরিবেশিত হতে ।এমনকি নিজের যখন সিজারিয়ান সেকশন করে ছেলে সবেমাত্র বেবিকটে তখনো সম্পূর্ণ জ্ঞান আসেনি। আধো ঘুমঘোরে আমি। আর আমার মাথায় হাত রেখে অভিভাবকরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন, "ছেলের সব কিছুই আলাদা"
আমার নিজের জন্মের ন'বছর পরে ভাই হওয়াতে ধুমধাম করে অন্নপ্রাশন হতে দেখেছিলাম। ভাই হতে স্কুলে ক্লাস শুদ্ধ বন্ধুদের লজেন্স খাওয়াতে দিয়েছিলেন বাবা মা। অথচ আমার নাকি সেভাবে ঘটাই হয় নি মুখেভাতে। কারণ আমাদের বাড়িতে নাকি মেয়েদের মুখে ভাত হয়না। আর যেহেতু আমার ভাই আমার থেকে অনেকটাই "ধলা" অর্থাত সাহেবদের মত ফর্সা তাই আজন্মকাল বাড়িতে শুনে এসেছি "মেয়েটা ছেলেটার মত "রং" পেল না"
আমার জন্য মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে একজন অংকের মাস্টারমশাই ছাড়া আর কোনো প্রাইভেট টিউটার ছিল না। তখন ভাবতাম বাবার সামর্থ্য নেই। সামান্য চাকরী। একটা বড় বাড়ি করেই তিনি ফতুর। আরেকটু লাইফ সায়েন্সটা যদি কেউ দেখিয়ে দিত! লেটার মিস করেছিলম চার নম্বরের জন্য। শুধু ভেবেই গেছি। মুখ ফুটে চাইতে পারিনি কখনো। তারপর ভাইয়ের মাধ্যমিক এগিয়ে আসতে দেখেছি  প্রতি বিষয়ের ওপর তার জন্য নিযুক্ত প্রাইভেট টিউটর। মনে মনে খুব আঘাত পেয়েছি কিন্তু ভাইয়ের প্রতি অকুন্ঠ স্নেহের জন্য কিছুই বলতে পারিনি। আবার তখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আগে আমি‌ই ওকে পড়তাম। অতএব শিক্ষক তো লাগবেই।এমনি ভেবে শান্ত হয়েছি। 
বিয়ের ঠিক করেছেন বাবা। বিদেশ যাত্রা হয়েছে তারপরেই। নিজের সংসার, ছেলের জন্ম, কেরিয়ারে ইতি ঘোষণা। শ্বশুরবাড়িতে এসে দেখেছি আরেকরকমের রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপ।

সেখানেও একবাড়ির মধ্যে মন্ত্রণাদাতা একপাল শাশুড়ির দল। কেউ সধবা, কেউ বিধবা, কেউ আজন্ম আইবুড়ো, কেউ হতবান্ধব। এবার আরো শুল্ক আরোপ। আরো বৈষম্য। বাড়ির ছেলে বৌয়ের কাপড় তুললে বা মেললে সেখানে রীতিমতো রে রে করে তেড়ে আসে কেউ। ছুটির দিনে বরের সঙ্গে বারান্দায় দাঁড়ালে বা দুপুরবেলায় দরজা বন্ধ করে শুলে মহাপাপ হয়। নাইট শো'তে সিনেমা গেলেও এক‌ই অবস্থা। অবিশ্যি আমার বর একহাত নিতেও ছাড়ে নি কখনো। আমার দিদা এদিকে রক্ষণশীল হলেও বলতেন, ওসব, "সহে রহে বাদ দাও, বুকে বসে দাড়ি ওপড়াতে হবে সেটাই নিজের অধিকার রক্ষার একমাত্র উপায়, মেয়েদের" তাই "আমারে কেহ দাবায়ে রাখতে পারবা না" সেই আপ্তবাক্যি মাথায় নিয়েই চলেছি এখনো অবধি। আমেরিকায় গিয়ে সেই মাত্র ২৩ বছরে স্টুডেন্ট পার্টির জন্য বর এবং তার বন্ধুদের সঙ্গে হৈ হৈ করে ওয়াইন শপে গিয়ে যখন ক্যান ক্যান বিয়ার আর লিকারের ক্রেট কিনে গাড়িতে উঠেছি তখন বন্ধুরা হাসতে হাসতে বলেছে" ছবি তুলে রেখে দে, বঙ্গবধূর এহেন পদস্খলন দেখলে আর দেখতে হচ্ছে না" অথবা প্যারিসের নাইটশো'তে ক্যাবারে, সেখানেও সেই এক কথা, বুঝেছ? বাড়ি গিয়ে এসব গল্প করে বোলো" তখন মনে হয়েছে মুখে আগুণ নারীস্বাধীনতার! মেয়েদের তো ছেলেরাই এভাবে জায়গা করে দেবে তা নয় আমাদের বাড়ির মেয়েরাই তো আজন্মকাল মেয়েগুলোর স্বাধীনতা খর্ব করে দিয়েছে। ডাক্তার জামাইবাবুর সঙ্গে সিনেমা দেখা নিয়ে অথবা গোপনে সব শালীদের নিয়ে চকোলেট ফ্লেবার্ড সিগার সেবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আর প্রশ্ন কিন্তু তুলেছেন মেয়েরাই। ছেলেরা বরং বলেছেন ছেড়ে দাও। 
তবে আমি অনেক বদল এনেই ছেড়েছি। মায়ের কাছেও, শাশুড়ির কাছেও। রীতিমত কাউন্সেলিং করে চলেছি এখনো। শাশুড়িকে স্লিভলেস ব্লাউজ থেকে হাউসকোটে উত্তরণ করতে সমর্থ হয়েছি। তাঁর সাধের পুত্রটিকে দিয়ে জামাকাপড় তোলানো থেকে মেলা অথবা নিজের মা'কে এমন মোল্ড করেছি যে বাবা এখন রান্নাঘরের চায়ের ডিপার্টমেন্ট এর দায়িত্ত্বে। 
আমার ছেলে আরো বদলে দিয়েছে। "ফুলকো লুচি আমি আর বাবা খাব না ঠাম্মা। ওগুলো মা আর তুমি খাবে। কিম্বা কাজের মাসী ছুটি চাইছে, সেটাই তো স্বাভাবিক মা, তুমি হলে পারতে রোজ রোজ কাজ করতে? অথবা আমাদের ঐ কুচকুচে কালীমায়ের ওপর তোমাদের এত দরদ অথচ বিয়েবাড়িতে গিয়ে নতুন বৌ "কালো" হয়েছে ব‌লে গাড়িতে উঠেই তোমরা সমালোচনায় মত্ত হ‌ও! কি হিপোক্রিট তোমরা, আই মিন এই মেয়েরা!" এমনো বলেছে।
আমি অবিশ্যি তার আগেই বদলে গেছি নিজের মত করে। ছেলের বিয়ের পর থেকেই প্রতি মা ষষ্ঠীর পুজোয় ছেলে-বউ দুজনের নামেই পয়সা তুলে রাখি ঠাকুরের কৌটোতে। সব পয়সা জমিয়ে সারাবছর পর দুর্গাষষ্ঠীতে পুজো দি‌ই।

আমার মা ও বদলেছেন। শুধু ছেলের জন্য নয়। মেয়ে, জামাই, বৌ সকলের জন্য পুজো তুলে রেখে ষষ্ঠীদেবীর কাছে মঙ্গল কামনা করেন সবার জন্য । তবে আমার শাশুড়ি মা কিন্তু এখনো পারলেন না। এবারেই শীতল ষষ্ঠীর দিন ছেলের কপালে কয়েন ছোঁয়ালেন। আমি বললাম তক্ষুণি, আমি বাদ? বললেন, আহা! ও তো আমার ছেলে বলো! বললাম "তো"? আমিও তো আপনার ছেলের ছেলেকেই গর্ভে ধারণ করেছি। বললেন ও আলাদা। আমার বত্রিশ নাড়ী ছেঁড়া ছেলে। তোমার মা তোমার জন্য তো করবেই । আমাকে আমার মত করতে দাও। তাই এই কিস্‌সার শেষ হবেনা জীবনেও। ভবিরা ভুলবেওনা কোনোদিনো। মেয়েরাই আজন্মকাল মেয়েদের দাবিয়ে রাখবে। আবার খবরের কাগজে, টিভি চ্যানেলে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গুরুগম্ভীর সব বক্তিমে শুনে হাততালি দেবে। পারলে নিজেদের লেডিসক্লাবে গিয়ে চুপুচুপি বন্ধুদের একটা করে লবেঞ্চুস খাইয়ে বলবে "হ্যাপ্পি উইমেন্স ডে" তবে ঐটুকুই। ভাগবত বা গীতার সারমর্মটুকু পাঠস্থানে রেখে এসেই খালাস তাঁরা। বাড়ি বাড়ির মতোই। সেখানে মেয়েদের নিজের টাঁইস্যে রাখতে হয়। কথাতেই তো বলে "লঙ্কা জব্দ শিলে,ব‌উ জব্দ কিলে" নয়ত বাড়ির নারী এগিয়ে যাবে তার স্বাধিকার লঙ্ঘনে।   
আজন্মকাল ধরে যদি আন্তর্জাতিক নারীদিবস পালন করে এই নারীদের নাড়িতে সামান্যতম বিদ্যুত খেলত! তবেই হত এইদিনের সার্থকতা!  
আর পারলাম না নিজের বাবাকেও। একমাত্র ভাই দূরে থাকে। নিজের কাজের জন্য আসতেও পারেনা। দেখভালও করেনা। তাদের সব দায়িত্ত্ব আমার ওপরেই বর্তেছে । মাঝেমাঝেই তিনি বলে ওঠেন "তুই আমার বড় ছেলের কাজ করছিস" খুব দুঃখে বলে উঠি, কেন গো বাবা? মেয়ে বলতে এখনো তোমার এত কষ্ট হয়? আমার যে খুব ক্লিশে লাগে শুনতে।

( যুগশঙ্খ ডিজিটালে প্রকাশিত ২০১৯ নারীদিবসে )  

২৮ ফেব, ২০২০

সুলতার শাড়ি - বম্বে Duck বইমেলা সংখ্যায় প্রকাশিত

সুলতার এখন মধ্যবয়স। এমনিতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে বেশ ফিট তিনি কিন্তু আগের মত তণ্বী নন আর। একসময় নিত্যনতুন শাড়িতে ক্লাবে গেলেই তাকে দেখে সবাই বলত ঐ যে এসে গেছে আমাদের হেড টার্নার। এখন ক্লাবে তিনি অনিয়মিত । আগের চেয়ে একটু পৃথুলা তাই শাড়ি বড় একটা পরা হয়না।


কিন্তু বাঙালীদের আড্ডায় শাড়ি মাস্ট। তখন শাড়ির আলমারীখানি খুলতেই হয়। আজকেই কিছু বন্ধুবান্ধব ক্লাবে ডেকেছে অতএব না গিয়ে উপায় নেই তাঁর ।

একসময় এই শাড়ি পরে সেজেগুজে ক্লাবে যাওয়া ছিল নেশার মত। সেই তাগিদটাও আর অনুভব করেন না সুলতা।

আলমারির দিকে এগিয়ে যান। পঙ্খের কাজ করা, মেহগিনি পালিশের কেতাদুরস্ত কাঠের আলমারীতে শাড়ী সম্ভার বন্দী হয়ে পড়েই থাকে। সুলতার মনখারাপ হয় ঐ শাড়ির আলমারীটির দিকে চোখ পড়লেই। এমনিতে আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড। আলমারী খুললেই শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা খুচরো গল্পের স্মৃতিরা বেরিয়ে আসে শাড়ির পরত খুলে। সুলতার মনখারাপ সজোরে যেন আছড়ে পড়ে বার্মাটিকের পাল্লায়, ড্রয়ারে এমন কি দামী শাড়ি ঝোলানোর রডের ওপরে। বাঁদিকের পাল্লার ওপরে আবার পেতলের ছোট্ট ছিটকিনি। সেটি খুলতে আঙুলের জোর লাগে এখন। সুলতা ভাবেন, কি যে হবে এত শাড়ি তাঁর! মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে ওঠে...

"কি আবার হবে? তুমি কেটে পড়লে শাড়িরাও ঠিক নিজেদের জায়গা করে নেবে, তাদের ভাবনা তারাই ভাববে, তুমি তখন বিন্দাস, সুখস্বপনের পারে, শ্মশানের ধারে"


সুলতা ভাবেন, যাক্‌ গে! সত্যি‌ই তো একসময় প্রয়োজন ছিল, নেশা ছিল শাড়ি কেনার। এখন আর নেই। তিনি চলে গেলে তো আর কেউ ভাববে না এই শাড়িগুলোর অবস্থা। যা হবার হবেখন। ছিটকিনি টা খুলেছেন। হাতে অল্প চোট পেলেন। আঙুলটা লাল হয়ে গেল। একটু জিভ দিয়ে চেপে ধরে র‌ইলেন কয়েক সেকেন্ড। মনে পড়ে গেল তমালের কথা। একসময় হাত কেটে গেলে তমাল এভাবেই নিজের ঠোঁটের মধ্যে পুরে নিত সুলতার নরম আঙুল। তমাল প্রসঙ্গ মাথায় এলেই মনে পড়ে কতকিছু ।


আলমারীর বাঁদিকের পাল্লা খুলতেই তমালের স্মৃতি সব। প্যান্ডোরার বাক্স যেন। চেপে রাখা যায়না তাদের। শাড়ি ঠাসাঠাসি । আলমারীর চাপে বশীভূত ছিল। চাপ মুক্ত হতেই একের পর এক পড়ে গেল মেঝের ওপর। শাড়ি, শাড়ি আর শাড়ি। সব তমালের দেওয়া। কোনোটা বিয়ের প্রথম বছরে। পিচ রঙের বালুচরী। আঁচলে পাড়ে মীনাকারীর কাজ। রাধাকৃষ্ণের গল্প। ঠিক সুলতা আর তমালের প্রেমের মতোই । একসময় মুক্তোর সেটের সঙ্গে খুব পরেছেন সুলতা। এখন বালুচরী অবসোলিট। ভাল্লাগেনা পরতে। তমাল সেবার বিষ্ণুপুর থেকে কিনে এনে চমকে দিয়েছিল। ক্লাবের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পরে গান গেয়েছিল সুলতা।


এবার চোখ পড়ে গেল প্রুশিয়ান ব্লু রঙের সিল্ক শিফনের দিকে। পিঁজে গেছে শাড়িখানা। মখমলি জমিন থেকে রেশমের পাড়খানি আলাদা হয়ে আসছে। ঠিক যেন এটাই চেয়েছিলেন সুলতা। এই শাড়ির প্রতি তাঁর কোনো দুর্বলতা অবশিষ্ট নেই। নিউমার্কেট গিয়ে সেবার বিয়ের তারিখে পছন্দ করেছিলেন ।

স্লিভলেস ব্লাউজের সঙ্গে অমন সি থ্রু শাড়ি পরে ক্লাবে যাবে তুমি? তমাল বলেছিল।

সুলতা বলেছিল, কেন আপত্তি আছে বুঝি?

তা আছে, আমার ব‌উয়ের শরীরের ভাঁজ, খাঁজ অন্য পুরুষ দেখুক আমি চাইনা।

তা মশাই? আপনি যখন বন্ধুর স্ত্রীয়ের চুলকাটার প্রশংসা করেন? সেটা বুঝি আমার খুব ভালো লাগে? এমন সব উত্তপ্ত বচসার পর ব্লেড দিয়ে সেই সিল্ক শিফনের কিছুটা চিরে ফেলেছিল সুলতা। ছিঁড়ুক শাড়ি। মরুক গে।

খুব শখ করে কেনা শাড়িখানা আর অঙ্গে তোলেনি সুলতা। পায়ের কাছে একটা শাড়ি অনেকক্ষণ পায়ের পাতা ছুঁয়েই চলেছে। হাতে তুলে নিল সুলতা তাকে। বাবা দিয়েছিলেন কলেজে পড়াকালীন তার জন্মদিনে। বাংলাদেশী ঢাকাই। হালকা গোলাপী রঙের ওপর ঘন গোলাপীর কাজ। মধ্যে মধ্যে রূপোলী জরির বুটি। এই শাড়িটার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তমালের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মূহুর্ত। দুইবাড়ির মধ্যে গ্রিন সিগনালের পরে ছাদে উঠে জীবনের প্রথম পুরুষের হাতের ছোঁয়া, চুমুর স্মৃতি। সেদিন রোমকূপের শিহরণ টের পেয়েছিল একমাত্র এই গোলপী ঢাকাইখানি। তমাল কেমন বদলে গেল তাইনা সুলতা? শাড়ি যেন তাকে প্রশ্ন করল। সুলতা বলল তাকে, এমনি হয় গোলাপী। সময় বদলে দেয় কতকিছু। এই যেমন তোকেও আমি কত্তখানি ভালোবেসেছিলাম আমার কলেজ জীবনে। তুইও তো একদিন নিজে থেকেই ঐ জরির বুটি থেকেই ফাটতে শুরু করলি। সুতো সরে সরে আমাকে কত কষ্ট দিয়েছিলি। সবাই এমনি হয় সংসারে। তোর কাজ সেদিন শেষ হয়ে গেছিল রে গোলাপী। সেদিন বিকেলের কনে দেখা আলোয় তোকে জড়িয়েছিলাম বলেই নাকি আমায় ওরা পছন্দ করেছিল। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা পাত্রীর জন্য কনে দেখা আলোয় গোলাপী রং নাকি উত্কৃষ্ট রে। মা বলেছিল। আমায় নিয়ে কত চিন্তা ছিল মায়ের! গায়ের রং কেন আরেকটু উজ্জ্বল হলনা মেয়ের। তা তুই আমায় উতরে দিয়েছিলি সেদিন, গোলাপী। তবুও তমালের সঙ্গে ঠিক জমল না আমার।


এবার চোখ গেল হ্যাঙারে ঝোলানো ইঁট রঙা মাইশোর জর্জেটের দিকে। সোনালী সুতোর পার্শি কাজ করা। জমিনে ঝকমকে চুমকী যেন আজো জ্ব্বলছে চিকমিক করে। এই শাড়িখানি পরে বিয়ের পরে নেমন্তন্ন খেতে গেছিল কটকটে রোদ্দুরে। তমালের সঙ্গে জোড়ে, মাসীর বাড়ি। ঘরে ঢোকা মাত্তর মাসীর মেয়েরা খুব হেসে উঠেছিল। তুই এই রোদে এমন ঝকমকে শাড়ি পরে এলি কি করে কলকত্তাওয়ালি? বারাকপুরে অবিশ্যি চলে এ সব। তবে তোদের ওখানে ভরদুপুরে এই শাড়িখানা পরলে সবাই আওয়াজ দেবে কিন্তু।

মাসীর ছোট মেয়ে ফিক করে হেসে বলেই ফেলল, "মেটিয়াবুরুজ"। জ্বলছিস পুরো। সোনার গয়না আর সোনালী জরি, সেই সঙ্গে চুমকি।

মেটিয়াবুরুজ? সে তো মুসলমানদের পাড়া। তমাল বলেছিল।

তাই তো বলছি মশাই। আপনারা খাস দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা হয়ে...

মাসি বলেছিল, আরে ওদের ঢুকতে তো দে আগে। শাড়ি প্রসঙ্গ ধামা দিয়ে চাপা পড়ে গেছিল।সেদিনের পর আর পরা হয়নি শাড়িখানা। শাড়ির আবার পাড়া হয়? জাতপাঁত হয় বুঝি?

এরপর কত শীত, বসন্ত পেরিয়ে এসেছে সুলতা-তমালের জীবন। শাড়ি জমা হয়েছে আলমারীর অন্দরে। উপলক্ষ্য পয়লা বোশেখ, পুজো, জন্মদিন, বিয়ের তারিখ। যেমন হয় সব মেয়েদের জীবনে। হাইফাই কর্পোরেট স্বামীর জীবনসঙ্গিনী সুলতা ক্লাব কালচারে অভ্যস্ত হয়েছে। শাড়ি কিনতে হয়েছে আরো আরো। বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ব্যোমকাই থেকে গাদোয়াল, ধর্মাভরম্‌ থেকে কলাক্ষেত্র কতরকমের শাড়িরা এসেছে জীবনে তার। ঠিক যেন মানুষের জীবনে কতরকমের, কত স্বভাবের মানুষের আনাগোনা হতেই থাকে সারাটা জীবন ধরে।

তবু এত সুখের জীবনে সুলতার মা হওয়া হয়ে ওঠেনি। শাড়ি জানে সেই দুঃখ। শাড়ি সাক্ষী আছে সব ঘটনার। প্রথমবার পেটে এসেছিল মেয়ে।

"সেক্স ডিটারমিনেশন ইজ নট ডান হিয়ার" লেখাটাকে এড়িয়েছিল তমাল। একবার নয় দুবার। দুবার‌ই মেয়ে ছিল যে। তাই ফেলে দিল তমাল। অমন সব নার্সিংহোমে লেখা থাকে। চুপ করে থাকো, বলেছিল তমাল। ডাক্তারবাবুরাও জেনেবুঝেই ফেলে দেন। কিন্তু ...সুলতার মুখটা চাপা দিয়েছিল তমাল। চল। আজ বেরিয়ে আমরা ক্লাবে গিয়ে খাব আর তোমায় সেই কি যেন বলছিলে? কোন্‌ শাড়িটার কথা? তোমার সেই ফেবারিট শাড়িটা?অনুসন্ধানে  রাখী পরেছিল যেটা? স্কার্ট পাড় পিওর সিল্ক তাই তো? মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল সুলতা। খুব দুর্বল ছিল শরীর। প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল দুমাসের বাচ্ছাটাকে ফেলতে। শরীরের কষ্টের চেয়েও প্রবল ছিল মনের কষ্ট, না পাওয়ার খেদ, তমালের ওপর ঘেন্না। নিকুচি করেছে অনুসন্ধানের শাড়ির।

সুলতার মায়ের ওপরেও ছিল প্রচ্ছন্ন অভিমান। কলেজের কেমিষ্ট্রি প্র্যাকটিকাল ক্লাসগুলোয় মায়ের ভালো ভালো তাঁতের শাড়িগুলো এক একদিন একএকটা পাট ভেঙে পরে যেত আর এসিডের ফোঁটায় ফুটো করে বাড়ি ফিরত। কপালে জুটত মায়ের বকুনি। এতকিছুর পরেও বিয়ের পরদিন চলে আসার সময় মায়ের পুরনো একটা সাধারণ শাড়ি বাক্সের মধ্যে ভরে নিয়েছিল সুলতা। সেটা ছিল মায়ের আর তার বৃষ্টিশাড়ি। অক্ষয় অব্যয়। বড়বাজারের সিন্থেটিক কোটা শাড়ি। কি অপূর্ব প্রিন্ট শাড়িটার। সুলতার আলমারীর সবচেয়ে সস্তার শাড়ি ছিল সেটা। পরীক্ষার দিন পরত। খুব পয়া ছিল তার। কি আর হল তাকে বয়ে শ্বশুরবাড়ি এনে? নতুন ব‌উয়ের উচ্চশিক্ষা, চাকরীর মুখে নুড়ো জ্বেলে দিয়ে শাশুড়ি ঠাকরুণ কিছুদিনের মধ্যেই গত হলেন।

এরপরে আরো একটা মেয়ের মুখ দেখা হলনা ঠিক আগের মতোই। সেই দুঃখ ঘোচাতে আরেকটা শাড়ি, দুটো শাড়ি, হঠাত শাড়ি, কারণে, অকারণে আরো শাড়ির আগমন হল বটে কিন্তু জীবনে আর মা হওয়া হলনা সুলতার।

কেমন বদলে গেছিল তমাল ঠিক সেই কথা জানার পরেই। আলমারীর ডানদিকের তাকে ন্যাপথলিন বল রেখেছিল সুলতা। পাতলা ন্যাকড়ার পুঁটলিতে ভরে। ও মা! কেমন দাগ লেগে গেছে শাড়ির ভাঁজে। কি শাড়ি এটা? ওহ্! সেই লাল পাড় গরদ। সুলতার মা দিয়েছিলেন সেবার পুজোয়। বলেছিলেন আমি থাকব কিনা তাই এটা রাখ। বাচ্চা পেটে সাধ দেবার দিন, লক্ষ্মীপুজোর ভোগ রাঁধার দিন এমন সব শাড়ি নাকি পরতে হয়। আর পরা হয়নি সেই শাড়ি। সাদা শাড়ি জুড়ে ন্যাপথলিন কলঙ্কের দাগ। মনখারাপ হল সুলতার। শাড়িখানা খুলতেই একটা লালচে হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরো পড়ে গেল টুক করে । পাখার হাওয়ায় উড়ে পালাচ্ছিল চিরকূটটা। সুলতার পায়ের জোর কমে গেছে। তবু ছুটে গিয়ে ধরে আনল হাতের মুঠোয়। কাগজের ভাঁজে ভাঁজে কত কথা। তমালের অফিসের সহকর্মী লগ্নজিতার চিঠি। সেই প্রেমপত্র আমূল বদলে দিয়েছিল সুলতার জীবনটাকে। তমাল কে আর ধরে রাখতে পারেনি সে। সংসারের অজস্র টানাপোড়েনের মধ্যেও টিকে থাকা সম্পর্কের সুতোটা টুক করে একদিন ছিঁড়ে ফেলেছিল সুলতা। গাছেরো খাব, তলারো কুড়োব করে আমার সঙ্গে থাকতে পারবে না তুমি। চলে যাও আমার কাছ থেকে।

তমাল বলেছিল, তাই যাব। একটা ছেলের জন্য যা করতে হয় তাই করব। গাড়িবাড়ি, ক্লাব মেম্বারশিপ সবকিছু থাক তোমার নামে। তবুও যা পড়ে থাকবে তা আমার ছেলের। লগ্নজিতা আমায় ছেলে তো দিল। তুমি আর পারলে ক‌ই ?

নিজের মনেই দু-হাত বাজিয়ে তালি দিয়ে সুলতা বলে উঠল

"সাবাস্! সাবাস্! গরদের শাড়ি, এইজন্যেই তোমার গায়ে বুঝি এত কলঙ্ক "


শাড়ি ঘাঁটতে ঘাঁটতে বেলা বাড়ল সেদিন। হঠাত কলিংবেল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন সুলতা। সুদর্শন এক যুবক দাঁড়িয়ে। হাতে একটি চিঠি।

কে আপনি? আমার নাম প্রত্যয়। বাবা চলে গেলেন। মা আগেই চলে গেছেন। বাকীটা চিঠিতেই লেখা আছে। এটা আপনার জন্য, বলে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল সে সুলতার দিকে।


সুলতা কিছুই বুঝতে পারলেন না। চিঠিখানি হাতে নিয়ে তিনি চমকে উঠলেন । তমালের হাতের লেখা। ছেলেকে দিয়ে গেছে সুলতার জন্য? একটা মধুবনী শাড়ি । যেটা খুব পছন্দ ছিল সুলতার একসময়। কেনা হয়ে ওঠেনি নানা কারণে।

প্রত্যয় বলল, আন্টি হ্যাপি বার্থ ডে।

ওহ! দ্যাট রিমাইন্ডস মি। সুলতা বলে উঠলেন । ভাবলেন, তাই বুঝি আজ ক্লাবে বন্ধুরা ডেকেছে তাকে। সারপ্রাইজ পার্টি তে তমালের দেওয়া জন্মদিনের সেই মধুবনী শাড়িখানাই পরেই তবে বন্ধুদের সারপ্রাইজ দেবেন তিনি ।


২১ ফেব, ২০২০

আমার ভাষা

আমার ভাষাতেই দিদা বলতেন, খুব "তার" হয়েছে আজ আমার রাঁধা আলুর দমে। সেই শুনে মা বলতেন "বাসি" বলে "মজেছে" আরো। ঠাম্মা আমার চিবুক ছুঁয়ে বলতেন, "আমার এক ভুবন আকাশ"। ভাইকে বলতেন "আমার শিব্রাত্তিরের সলতে"। বুড়ো বাবা সেই শুনে দুই ভাই বোনের মাথায় দুটো হাত রেখে বলতেন, এরা "আমার এক‌ বৃন্তে দুটি কুসুম"।রান্নাঘর থেকে প্রায়শ‌ই মুখ বাড়িয়ে ফোন ধরে মা এখনো বলেন "নাটাঝামটা" খাচ্ছি। বাবা টিভিতে খবর শুনতে শুনতে চেঁচিয়ে আজো বলেন "উচিত তর্পণে গাঙ শুকলো" উন্নতি আর হল না রাজ্যের। মা বিয়ের পর আমার নতুন সংসার দেখে বলেছিলেন" কি সুন্দর "ঘরুনি-গেরুনি" হয়েছিস!   
সেই ভাষায় জ্বর আসে "তাড়সে" আর কাঁচালংকা আজও কামড়ে খাই প্রতিটি "গরাসে"।আজও সেই ভাষায় কাজের পরে লাগে একটু "জিরেন"। আজও হাতড়ে এই যে ভাষায় খুঁজি আমার "দোসর"। আজও মিস্ত্রীর পারিশ্রমিক দিই "ফুরোনে"।এই ভাষায় মা এখনও সামলায় "ভাঁড়ার"। এই ভাষাতেই বাবা লেখাপড়ায় ফাঁকি দিলে এখনও বলেন বলে "ব্যাদড়া"। অশীতিপর শাশুড়ি মা এখনও বলেন দিনভর "ব্যারাম" এর কথা।
আবার ঘুম এলে এই ভাষায় চোখের "পাতা ভারি" হয়ে আসে আবার সারারাত জেগে থেকে দুচোখের "পাতা এক" করা যায় না যে ভাষায়। এই ভাষাতেই বহুদিন আড়ির পর দুই বন্ধু আবার "আমে-দুধে" মিশে যায়। বড় ঘরে মেয়ের বিয়ে দিয়ে যে ভাষায় মেয়ের মায়ের "পায়াভারি" হয়। সেই মিষ্টি ভাষাতেই আবার বন্ধু বন্ধুকে তেড়ে যান "ষাঁড়ের নাদ" বলে। বিষহীন সাপ এই ভাষায় "ঢ্যামনা"। বেকার পুত্রকে বাবা রেগে গিয়ে বলে ওঠেন "ঢেঁড়স"। শাশুড়িকে ব‌উ ঝগড়ার সময় বলেন তাঁর "শাঁখের করাতের" মত অবস্থার কথা অথবা বলে ওঠেন মা কি "মুখে মধু" দেয় নি গা? শাশুড়ি আরও বলেন বৌয়ের মুখে "কুলুপ আঁটার" কথা। সেই শুনে শ্বশুর বলেন নিজের "উভয়সংকটের" কথা। ট্রেন যাত্রায় "ভোগান্তির" কথা বলে সেই ভাষা, অথচ সেই ট্রেনে চড়ার জন্য "হত্যে" দিয়ে থাকে কত মানুষ। মা সংসারে দেন "গতর" আর "আলটপকা" কিছু বলে ফেলেই বিপদ বাড়ান তিনি। মা বলেন সারাদিন পিঠটা "দোমড়" করতে পারিনি। এই ভাষাতেই কেউ তাঁর কাজের "কদর" করে না বলে অভিযোগ জানান তিনি। "আগুপিছু" কিছু না ভেবেই এ ভাষায় মন্তব্য করি আমরা।
সেই ভাষা হল আমাদের মিষ্টি মাতৃভাষা। আমাদের বাংলাভাষা।
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়   

২৮ জানু, ২০২০

কলাবতী কথা সানন্দা পুজো ২০১৫


সানন্দা পুজোসংখ্যা-২০১৫ এ প্রকাশিত উপন্যাস  
মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যঃ
এবছরের সেরা পুজো উপন্যাস ছিল কলাবতী কথা। 

প্রত্যুষা চক্রবর্তীঃ  
অপেক্ষা করছি অনেক অনেক দিন ধরেই ...
হাতে আসামাত্র পড়ে ফেললাম একটু ও দেরি না করে,
ঘড়ির কাঁটা কি করে তিরিশ মিনিট ঘুরে গেল, টের পেলাম না!
পটশিল্পের কি অসাধারণ কথামালা বোনা হয়েছে বাংলার রীতি আচার অনুষ্ঠান আর ব্রতকথার সুতো দিয়ে ।মেদিনীপুর এর প্রত্যন্ত গ্রাম তাদের কথা নিয়ে উঠে এসেছে অবলীলায়। নয়াগ্রাম , খড়্গেশ্বর , পিংলা, পাথরা , কুকাই , নানকারচক , কুরুম্ভেরা গনগনি কত নাম না জানা গাঁয়ের গন্ধ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে বৈশাখী অশোক ষষ্ঠীর ব্রতকথা থেকে মঙ্গলচণ্ডী, ভৈমীএকাদশী,বিপত্তারিণী , লোটন ষষ্ঠীর কথার সাথে ।আর চরিত্রেরা ! মাটির গন্ধ পাচ্ছি যেন ।
সবশেষে লেখিকার উদ্দেশ্যে বলি, আপনি লুপ্তপ্রায় একটি শিল্পকে পুনঃজীবিত করার প্রয়াস করেছেন ।
অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ 
কাছের মানুষদের নাম যখন বহুল প্রচারিত পত্রিকার পুজোসংখ্যায় দেখি, গর্বে ও খুশিতে ভরে ওঠে।
প্রিয় মানুষ, বন্ধু ও দিদি ইন্দিরাদির প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে সানন্দা পুজো সংখ্যায়। ‘কলাবতী কথা’। পড়া শেষ করলাম কাল।
মেদিনীপুর নিয়ে রীতিমত রিসার্চ করা এ উপন্যাস। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম গঞ্জের অলিগলি, গ্রামীন সংস্কৃতি ও তার রীতিনীতি, ব্রতকথার নানা হারিয়ে যাওয়া গল্প, গ্রামীন মেলা ও উতসব, নানা পার্বন ও গ্রামীন মানুষের জীবনের এত ডিটেইলস এ উপন্যাসে পেলাম যে অবাক হতে হয় লেখকের পরিশ্রম ও গবেষনায়। উপন্যাসের পটভূমিকা হল গ্রাম বাঙলার পট শিল্প। এই পটশিল্পীদের জীবন, তাদের মনস্তত্ব, দারিদ্র, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধা, তাদের স্বপ্ন, অপ্রত্যাশিত সুযোগ, সাফল্য সবকিছুই এসেছে এ উপন্যাসের সাজানো ইটের সারিতে। লতু, কনক,  কলাবতী, মিকি, আকিও এবং আরো নানা চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে লেখক বলেছেন অনেক অনেক গ্রামীন সংস্কারের গল্প, তাদের বিচিত্র জীবন চর্চা, প্রতিবাদ, বেঁচে থাকার স্বপ্ন। নিবিড় গ্রাম বাংলার সাহচর্য্য, ক্ষয়ে যেতে থাকা এক শিল্পী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ও তাদের লড়াই হয়ে উঠেছে এ উপন্যাসটির উপজীব্য।
অর্ণব রায়চৌধুরীঃ 
কলাবতী কথা পড়লাম। বাংলার পটশিল্পীদের জীবন নিয়ে এরকম লেখা আগে পড়িনি। গ্রামবাংলার এত মেলার কথাও জানা ছিল না। কুরুম্ভেরা মেলা বা ময়নাগড়ের রাসমেলার বর্ণনা পড়ে ইচ্ছা করে ঘুরে আসতে। তবে যে জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করেছে তা হল সহজ সরল ভাষায় কথকতার গল্প। পুরাণ নিয়ে তোমার গল্প সম্ভার আমাকে মোহিত করেছে। যদিও 'অহল্যা' নিয়ে তোমার বিশ্লেষণ পড়ে জেনেছিলাম পুরাণ নিয়ে তোমার অগাধ আগ্রহ ও knowledge। উপন্যাসের শেষে নোট থেকে জানলাম মেদিনীপুরের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকার সময় তুমি এই পটশিল্পীদের সান্নিধ্যে এসেছিলে। অনেক ধন্যবাদ তাদের কথা এরকম সুন্দর উপন্যাসের রূপ দেওয়ার জন্য। দু একটা জায়গায় একটু প্রশ্ন এসেছে মনে। এক জায়গায় পড়ে মনে হয়েছে আকিও বাংলা ভাষা জানে না। আবার সে রাতেই সে দিব্যি পরিষ্কার বাংলায় কলাবতীর সাথে কথা বলে। মনে হল এখানে কথোপকথন টা না থাকলেও চলত। আর উপন্যাসের শেষ লগ্নে যখন কলাবতী জাপানে নিজের সংসার শুরু করেছে তখন জানা গেল না তার স্বামী রামু বা তার শ্বাশুড়ি কনকের মনের অবস্থা কেমন হল বা তারা এত সহজে কি করে মেনে নিল ব্যাপারটা। আর জানতে ইচ্ছা করছে এখন কি গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে এইসব পটশিল্পীদের জন্য কম্পিউটার পৌঁছেচে নাকি তোমার উপন্যাসে ভবিষ্যতের রূপরেখার ইংগিত আছে। সব শেষে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম একটা উপন্যাস আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। আশাটা এবার বেড়ে গেল।
সুনন্দা চক্রবর্তীঃ 
দিদি আজ আমি সারা দুপুর ধরে লেখাটি পড়েছি । প্রথমেই বলি তোমার ধৈর্য অপরিসীম । তোমার লেখা ১) খুব ক্লাসি, ২) ঐতিহাসিক তথ্য সমৃদ্ধ , ৩) বাংলার বার ব্রত যা অনেকেই জানেনা তা সুচারুরূপে ব্যক্ত করেছ, ৪) বাংলার একটা শিল্প তোমার লেখনীতে স্থান পেয়েছে বলে খুব ভালো লেগেছে। এবার আসি কলাবতীর কথায়, তিনটে একই সংসারে থাকা নারী যেখানে ঝগড়া ঝাঁটি আর গালাগালিতেই পার করে সেখানে সুন্দর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর একে অপরের পরিপূরক , উদার হৃদয় চরিত্রগুলো অপূর্ব এঁকেছ । পুরো উপন্যাসটাই আসলে রূপকথা । যা বেঁচে থাকার রসদ দেবে । 
শর্বরী ব্যানার্জিঃ
কলাবতী কথা পড়লাম। গ্রামীন শিল্পীদের অনেক অনেক সম্মান ও মর্যাদা প্রাপ্য। আমরা শহরে বসে তাঁদের শিল্পীমন বা শিল্পের কথা জানতেই পারিনা তাই হয়ত প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিতে পারিনা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই শিল্পীদের তুলে ধরার জন্য।

শ্রাবণী দাশগুপ্তঃ
কলাবতীকথা - অনেক যত্নের বহু পরিশ্রমের ফসল উঠেছে লেখিকার কর্ষণে। প্রয়োজনীয় বৃষ্টি দিয়েছে সজীবতা, শ্যামল হয়ে উঠেছে উপন্যাস - বারব্রত, সংস্কার মিলেমিশে। একেক সময়ে মন ভার হয়ে উঠেছে, কত দ্রুত এসব হারিয়ে গিয়েছে শহুরে জীবন থেকে, নিষ্প্রাণ দেখনদারী এসে দখল করে নিয়েছে সজল আত্মীয়তা - আত্মার কাছাকাছি, মনের কাছাকাছি থাকা মানুষদের। হয়ত আছে গ্রামে-গঞ্জে এখনো - থাকুক, বেঁচে থকুক। বেঁচে থাকুক পটচিত্র আর স্বরচিত গান নিয়ে কলাবতীরা। শহরায়ন বিশ্বায়ন - অনেক কিছু শুকিয়ে দিয়েছে, কোথাও বাঁধ দরকার...। নইলে আমাদের নিজস্বতা হারিয়ে যাবে।
টানাপোড়েন আছে উপন্যাসে, কিন্তু তেমনটা নয়, খুব সাবলীল ভাবে ঘটে যায় ওঠা-পড়া। জটিলতা ধরা যায়না তেমন।

নন্দিতা ভট্টাচার্যঃ
এত ডিটেলিং ভাবা যায়না।  অনেকদিনের প্রয়াস মনে হচ্ছে। বাংলাকে এভাবে  একেবারে টেনে তুলে এনেছ, তুলে ধরেছ ভুলে যাওয়া সব কথা।

অমৃতা ঘোষঃ
অনেক কিছু জানতে পারলাম বাঙলার পটচিত্রও কিংবদন্তীর ব্যাপারে। অসাধারণ শুধুই কলাবতী নয়। কনক, লতু প্রত্যেকেই। আরো একটি ব্যাপার যেটি খুব ভালো লেগেছে সেটি হল একজন নারী হয়ে অন্য আরেকজনকে অণুপ্রাণিত করা। লতু, তার পুত্রবধূ কনককে আর কনক তার পুত্রবধূ কলাবতীকে।  আমাদের জীবন এমন হলে বরতে যেতাম।

রুচিরা চ্যাটার্জিঃ 
কলাবতী কথা পড়ে পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারলাম আগে যা অজানা ছিল। ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস জেনে ভালো লেগেছে। সত্যি অনেক অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে লড়াই করে ওঁরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বাংলার সব ব্রতকথার ছোতছোট গল্পগুলি বিশেষতঃ উমনোঝুমনোর কথা জেনে অনেকদিন বাদে খুব মজা পেলাম। আবারো নস্টালজিক হয়ে পড়লাম।

শর্মিলা দাশগুপ্তঃ
খুব ভালো লাগল কলাবতী কথা পড়ে। পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অজানা কথা, ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস, আমাদের গ্রামবাংলার এতসব ব্রতকথা আর পুজোআর্চার গল্প জানতামনা। কনক আর কলাবতীর সম্পর্কটা এত সুন্দর ভাবে দেখিয়েছ খুব ভালো লাগছে। কনকের প্রতিবাদী চরিত্রটি দারুন। কিন্তু শেষের দিকটা পড়ে মনে হল কলাবতী কেন এত স্বার্থপর হয়ে গেল? যে শাশুড়িমা তার জন্য এতকিছু করল তাকে ছেড়ে, স্বামীকে ছেড়ে সে চলে গেল কি করে? হতেই পারে এটাই বাস্তব কিন্তু কনক এত পুজো করে কি পেল? খুব‌ই বাস্তবিক পটভূমি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পুরোটাই নিঃসন্দেহে উপভোগ্য। 

২০ জানু, ২০২০

সীতায়ণের খোঁজে শ্রীলঙ্কার পথে পথে





আমাদের প্রতিবেশী দেশ সিংহল দ্বীপ বা শ্রীলংকাকে আবিষ্কার করতে গেলে মহাকাব্য রামায়ণের সাহায্য নিতেই হয়। তখন রামায়ণকে আর নিছক কাল্পনিক কাব্য নয়, ইতিহাস বলেই মেনে নিতে ইচ্ছে করে ।
রামায়ণের স্মৃতিচিহ্ন বিজড়িত দশটি এমন প্রধান স্থান নিয়ে এই আলোচনা করব আজ। এদেশের ট্যুর এজেন্টরা রামায়ণ ট্রেইল বা রামায়ণ ট্যুর আখ্যা দিলেও আমি বলব সীতায়ণের রুট এটি। কারণ সেই দেশে সীতা আর হনুমান সর্বত্র পূজ্যতে। তাই রামায়ণের মাহাত্ম্য না সীতায়ণের দাপট সে নিয়ে আমার আর সংশয়ের অবকাশ নেই।


শ্রীলংকার সিগিরিয়া আর মান্নার বাদে বাকী একই রুটে অবস্থিত আটটি এমন স্থান ছুঁয়ে আসার পরে মনে হল এই নিয়ে আলোকপাত করাই যায়। প্রথমে দেখে নি কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ দশটা সেই জায়গায় রামায়ণের আলো পড়েছিল। তাই এখনও সেগুলি দেশ বিদেশের মানুষের কাছে অন্যতম ট্যুরিস্ট গন্তব্য।


  • সিগিরিয়া (রাবণের ভাই কুবেরের প্রাসাদ)
  • মান্নার (রামেশ্বর সেতুর শেষ বিন্দু)
  • নুয়ারা এলিয়া (অশোকবন, সীথাআম্মার মন্দির, হনুমানের পায়ের ছাপ, সীতার স্নানের জায়গা)
  • সীথা এলিয়া (হনুমান মন্দির)
  • ধিভুরাম্পুলা (সীতার অগ্নি পরীক্ষার স্থান)
  • রামবোডা জলপ্রপাত (হনুমান শক্তি সঞ্চয় করেন)
  • রামবোডা (চ্যারিয়ট পাথ, সীথা অশ্রুকুন্ড)
  • গুরুলাপোথা ( সীথা দুর্গ )
  • গায়াত্রীপীঠ ( নিকুম্ভিলা)
  • উনাবান্টুনা (গল, গন্ধমাদন উপড়ে এনে ফেলেছিল হনুমান)

অশোকবন 

সীতা মন্দির 

এছাড়াও রয়েছে আরও কয়েকটি স্থান যেগুলি রামায়ণের জন্য এখনও বিখ্যাত তবে আমাদের এবার শ্রীলংকার সেদিকটায় যাওয়া হয়নি। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রাবণ গুহা । সংলগ্ন ঝর্ণার ধারে পাহাড়ের মাথায় এই গুহার মধ্যে সীতাকে নিয়ে লঙ্কায় আসার পর রাবণ লুকিয়ে রাখেন কিছুদিন। এই স্থানটি এল্লা নামক স্থানে।
আর রয়েছে শঙ্করী দেবী শক্তি পীঠ যেটি শ্রীলঙ্কার পূর্ব উপকূলে ত্রিনকোমালিতে অবস্থিত অন্যতম হিন্দু তীর্থস্থান । শঙ্করী মাদুর্গার সঙ্গে এখানে রয়েছেন তাঁর ভৈরব ত্রিকোণেশ্বর এর কোণেশ্বরম্‌ মন্দির।পর্তুগীজরা সপ্তদশ শতাব্দীতে যা ধ্বংস করে। পরম শৈব রাবণ মা দুর্গার তপস্যা করেছিলেন এখানে । দেবী শঙ্করী প্রসন্ন হয়ে বিশ্বকর্মা নির্মিত রাবণের প্রাসাদে এসে বাস করেছিলেন। রাবণ শঙ্করী দেবীর জন্য বিশাল মন্দির বানিয়ে দেন।
তামিল রামায়ণ মতে মুনেস্বরমে রাবণ বধের পর রাম সেখানে তপস্যা করেন ।
রামায়ণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য তীর্থস্থান হল উসসাংগোডা । এটি দক্ষিণ শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত, রামায়ণ মতে যেখানে সীতার সঙ্গে দেখা করার পর হনুমান রাবণ এবং তাঁর রাক্ষস বাহিনীর শক্তি পরীক্ষা করার জন্য লঙ্কাপুরী আগুণ লাগিয়ে ছারখার করেন। তখন হনুমানের লেজটি রাক্ষসরা আগুন ধরিয়ে দেয়। উসসাংগোডায় নাকি রাজা রাবণের ব্যবহৃত আকাশপথে চালিত পুষ্পক রথের বিমানবন্দরটি ছিল বলে বিশ্বাস স্থানীয় মানুষজনের।
তবে আমরা এবার যে স্থানগুলি গিয়েছিলাম সেগুলি মানচিত্রে মোটামুটি আশেপাশেই রয়েছে আর এগুলির গুরুত্ব রামায়ণে সবচেয়ে বেশী।


সিংহলের উঁচু পাহাড়্চূড়ায় সিংহগিরি বা সিগিরিয়া তে ছিল রাবণের রাজপ্রাসাদ যেখানে পাহাড় কেটে রাবণের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কুবের তৈরী করেছিলেন এক বিশাল দুর্গ। প্রায় হাজার দেড়েক খাঁড়াই সিঁড়ি ভেঙে সেই পাহাড়ে উঠতে হয়।

তামিলনাড়ুর পাম্বান বা রামেশ্বরম থেকে শ্রীলঙ্কার মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত সেই পাথরের সেতুর অস্তিত্ব পাওয়া যায় এখনও। কথিত আছে, সীতা উদ্ধারের জন্য লঙ্কাপুরী যাত্রার জন্যই পাথরের এই সেতু তৈরি করেছিলেন রাম।সেই যুগে শ্রীলঙ্কা পৌঁছানোর অন্য কোন উপায় ছিলনা। সীতা উদ্ধারের পরে ফিরে এসে, রাবণকে বধ করে ব্রহ্মহত্যার পাপ খণ্ডনের জন্যই শিবের আরাধনা করেন রাম। তিনি যে শিবলিঙ্গের আরাধনা করেন তামিলনাডুর সেইস্থানই আজ আমাদের হিন্দু তীর্থ রামেশ্বরম নামে পরিচিত।
শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে হালকা ঠান্ডার অপূর্ব শৈল শহর ক্যান্ডি হয়ে যেতে হয় মনোরম এক নৈসর্গিক শহরে যার নাম "নুয়ারা এলিয়া"। সিংহলী ভাষায় নুয়ারা মানে নগর আর এলিয়া মানে জ্যোতি। এখানে সীতা আম্মার জন্য বিগলিত স্থানীয় জনগণ তথা আমাদের মত ভারতীয় পর্যটকেরাও। নুয়ারা এলিয়ার সবুজ পাহাড় ঘেরা ফুলপাখীর স্বর্গরাজ্য অশোক বটিকা বা অশোক বন আজো জ্বলজ্বল করছে নিজের সবুজ জ্যোতিতে। রাবণের বিলাস বহুল প্রাসাদে সীতার থাকতে আপত্তি থাকায় এই সুন্দর অশোক বনে রাবণ তাঁকে রেখেছিলেন, এমনি বিশ্বাস রামায়ণে। এই অশোকবন শ্রীলঙ্কার হাকগালা ন্যাশানাল পার্ক এখন। অত্যন্ত সুন্দরভাবে সংরক্ষিত এই বটানিকাল গার্ডেনটি বেশ দামী টিকিট কেটে আমাদের মত বিদেশী পর্যটকদের দেখতে যেতে হয়। সেখানে পৃথিবীর সব গাছ রয়েছে। সেখানেই দূরের এক উঁচু পাহাড়ের খোঁচাটির নাম হাকগালা রক। দেখে মনে পড়ল আবারো রামায়ণের কাহিনী। সেই পাহাড়ের উল্টোদিকেই এখন হয়েছে সীতা মাঈয়ার অপূর্ব এক মন্দির। বন্দিনী সীতাকে এখানেই কাঁদতে দেখে পাহাড়ের মাথা থেকে হনুমান এক লাফে সেখানে হাজির হয়ে সীতার হাতে দেন রামের আংটি, সীতা যা রাবণের পুষ্পক রথে আসার সময় ছুঁড়ে ফেলেছিলেন আকাশপথে। চোখে পড়ল মন্দির সংলগ্ন খরস্রোতা পাহাড়ী নদী, নুড়িপাথরের বুকে এখনো যা বয়ে চলেছে অবিরত। সীতাকে রাবণ অশোক বনের এই অঞ্চলেই বন্দী করে রেখেছিলেন। তবে সসম্মানে। সীতা প্রতিদিন এই নদীতেই স্নান করতেন । এই নদীর তীরেই রয়েছে মস্ত এক শিলাখন্ডের ওপর হনুমানের পায়ের ছাপ। শক্তিমান হনুমানের লাফানোর ফলে যা বহু যুগ আগে পাথরের মধ্যে গর্ত সৃষ্টি করে রেখেছে । এমনি বিশ্বাস স্থানীয় মানুষের।
এই অঞ্চলে আসার পথে তাই বুঝি পড়েছিল ভক্ত হনুমান মন্দির। এখানে সীতা আর হনুমান সর্বত্র পূজ্যতে। এই স্থানকে স্থানীয় মানুষ "সীথা এলিয়া"ও বলে যার অর্থ সীতার জ্যোতি। রাবণের সঙ্গে অশোকবনে আসার পথে বিশ্রাম নিয়েছিলেন সীতা এখানে।
সীতা স্নান কুণ্ড 

সীথা এলিয়া থেকে কিছুদূরেই এক বনভূমি যেখানে সীতার অগ্নি পরীক্ষা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। সিংহলীভাষায় এই অঞ্চলের নাম Divurumpola বা ইংরেজীতে Place of oath। দলীয় বা পারিবারিক বিবাদ, বিরোধ নিষ্পত্তি করার সময় শ্রীলংকার আইনি ব্যবস্থা এই মন্দিরে নেওয়া শপথকে এখনও আইনি মান্যতা দেয়।
নুয়ারা এলিয়া থেকে বেন্টোটা যাবার পথে পড়ে শ্রীলঙ্কার অনেকগুলি জলপ্রপাতের মধ্যে একটি, যার নাম রামবোডা ওয়াটারফলস। রামবোডা গ্রামের অন্তর্গত ১০৯ মিটার উঁচু এই জলপ্রপাতটির কাছেই হনুমান নাকি সীতা উদ্ধারের জন্য বিপুল শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন।
ক্যান্ডি থেকে নুয়ারা এলিয়া যাবার পথে রামবোডা পর্বত দেখা যায়। সেখানে এঁকে বেঁকে যে মনোরম বীথিপথ চলে গেছে সেই পথ দিয়েই রাবণ সীতা কে অশোক বনে নিয়ে যান, এমনি বিশ্বাস করা হয়। নিজের রাজধানী কেমন সুন্দর সীতাকে তা ব্যাখ্যা করতে করতে চলেছিলেন রাবণ। এই বনানীকে বলা হয় চ্যারিয়ট পাথ। সীতার চোখের জল পড়তে পড়তে গেছিল এখানে। তাই কেউ কেউ সীতা টিয়ার পণ্ড বা অশ্রুকুন্ডও বলেন।
শ্রীলঙ্কার গুরুলাপোথা কে বলা হয় লঙ্কাপুর। ক্যান্ডি থেকে গুরুলাপোথা পৌঁছতে সময় লাগে ঘণ্টা দুয়েকের কম। কিংবদন্তী বলে সবুজ পাহাড়, ঝর্ণা আর ছোট ছোট নদী ঘেরা অপূর্ব সুন্দর এই স্থানে রাবণের রাণী মন্দোদরীর প্রসাদ ছিল। আকাশ পথে সীতা কে নিয়ে যাবার সময় রাবণ এই প্রাসাদে তাকে কিছুদিন রাখেন। তারপর আবার বিশ্রাম নিয়ে অশোক বনের দিকে যাত্রা করেন। এই কারণে এই জায়গার নাম সীথা কটুয়া বা সীতা দুর্গ।
নিকুম্ভিলা ( গায়ত্রী পীঠ) 

সীতা মন্দির 

নুয়ারা এলিয়ার আরেকটি অন্যতম পীঠস্থান হল গায়ত্রী পীঠ বা গায়ত্রীদেবীর জাগ্রত এক মন্দির। সেখানে গায়ত্রীদেবীর মন্দিরে পুজো হয় নিয়মিত। এই অঞ্চল ছিল লঙ্কার অন্যতম এক উপবনাঞ্চল, রামায়ণে উল্লিখিত নিকুম্ভিলা। এই স্থানের ঐতিহাসিক আরেক মাহাত্ম্য আবিষ্কার করলাম মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করে। রাবণের পুত্র মেঘনাদ রাম-লক্ষমণের সঙ্গে যুদ্ধের পূর্বে নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করেছিলেন এই স্থানে। মেঘনাদের বরটি এমনি ছিল যে যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলেই তিনি অজেয় হবেন। তাই পরপর দুবার তিনি যজ্ঞ সম্পূর্ণ করে ধরাশায়ী করেন লক্ষ্মণ কে । লক্ষ্মণ পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন জানতে পেরে আবার মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে যজ্ঞ সম্পাদনা করতে যান। এদিকে বিভীষণ তার গুপ্তচর মারফৎ সেই সংবাদ পেয়ে রামকে সতর্ক করেন। কারণ যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলে মেঘনাদ অজেয় হয়ে যাবেন। বিভীষণ লক্ষ্মণকে যজ্ঞাগারে নিয়ে যান। যজ্ঞাগারে মেঘনাদ অস্ত্র স্পর্শ করতেন না। তিনি প্রথমে যজ্ঞের বাসন ছুঁড়ে লক্ষ্মণকে অচেতন করে দেন। কিন্তু অস্ত্রাগারে যাওয়ার সময় পান না। তার পূর্বেই লক্ষ্মণের জ্ঞান ফেরে এবং তিনি নিরস্ত্র মেঘনাদকে হত্যা করেন।

বস্তুত এটি লঙ্কার উল্লেখযোগ্য শক্তিপীঠ। পীঠনির্ণয়তন্ত্রে আছে

লঙ্কায়াং নূপুরশ্চৈব ভৈরবো রাক্ষসেশ্বরঃ
ইন্দ্রাক্ষী দেবতা তত্র ইন্দ্রোণোপাসিতা পুরা ।।

বিষ্ণুচক্রে খণ্ডিত হয়ে সতী দেবীর পায়ের নূপুর এখানে পতিত হয়। দেবীর নাম ইন্দ্রাক্ষী। তাঁর ভৈরবের নাম রাক্ষসেশ্বর। পণ্ডিতেরা এই নিকুম্ভিলা দেবীকে সেই শক্তিপীঠের দেবী মানেন। কিন্তু শাস্ত্রে লঙ্কার শক্তিপীঠের দেবীকে ইন্দ্রাক্ষী বলা হয়। বৃত্রাসুরের হাতে রাজ্য হারিয়ে দেবরাজ ইন্দ্র দেবতাদের সঙ্গে এখানে এসে দেবী ভগবতী বা গায়ত্রীদেবীর তপস্যা করেছিলেন । গায়ত্রী হলেন দৈব নারীশক্তির পুঞ্জীভূত নারীশক্তির প্রকাশ। লঙ্কায় এই দেবীর মন্দির এখনও আছে। তবে এটি শক্তিপীঠ রূপে পরে স্বীকৃতি পায় নি । ভয়ংকরী, আসুরিক দেবী নিকুম্ভিলা সাধারণের পূজিতা হয়ে উঠতে না পাড়ায় ধীরে ধীরে গায়ত্রী পীঠে পরিণত হয়েছে এই স্থান।

কৃত্তিবাসী রামায়ণেও আছে নিকুম্ভিলার কথা।

বিভীষণ বলে শুন রাজীব- লোচন ।
সামান্যেতে ইন্দ্রজিৎ না হবে পতন ।।
নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করে দুষ্ট নিশাচর ।
করিয়াছে যজ্ঞকুণ্ড লঙ্কার ভিতর ।।

আদ্যাস্তোত্রে পাই

পাতালে বৈষ্ণবীরূপা সিংহলে দেবমোহিণী
সুরসা চ মনিদ্বীপে লঙ্কায়াং ভদ্রকালিকা ।

সেসময় সিংহল আর লংকা কে পৃথক স্থান বলা হত। পরে এই দুই অঞ্চল কে এক মনে করা হয়।

তবে শক্তির উপাসক পরম শৈব রাবণের আরাধ্যা দেবী যে ছিলেন এই ভদ্রকালী সেকথা বলাই বাহুল্য ।

আমরা ভারত মহাসাগরের তটরেখা ধরে চলেছিলাম শ্রীলংকার অন্যতম সৈকত শহর বেন্টোটা থেকে মিরাস্যা । যাবার পথে পড়ে গল্‌ নামে এক বিস্তীর্ণ শহর। রামায়ণের জন্য বিখ্যাত এই গল্‌ শহরের অন্তর্গত রুমাস্যালা পর্বত। হনুমান হিমালয় থেকে শক্তিশেলে বিদ্ধ অচৈতন্য লক্ষ্মণের জন্য ভেষজ জরিবুটি বিশাল্যকরণী খুঁজতে গিয়ে পুরো গন্ধমাদন পাহাড় টিকেই নাকি তুলে এনেছিলেন এই গল্‌ অঞ্চলের উনাওয়াটুনাতে Unawatuna। যেখানে পাহাড়ের পাদদেশ অবিরত স্পর্শ করে ভারত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ। নীল আর সবুজে মাখামাখি এই সমুদ্রতট।

হাকগালা রক 
হনুমানের পায়ের ছাপ 

রামায়ণের স্পর্শে ধন্য শ্রীলংকার ইতিহাস ভূগোল যেন আরও কাছের বলে মনে হয় আমাদের। বাকীটা মানুষের বিশ্বাস। তবে যাহা রটে তাহা কিছু তো বটে, এই বিশ্বাসে এগিয়ে চলি আবারো কলম্বো এয়ারপোর্টের দিকে। মহানাগরিক ভীড়ে মিশে যাই। কানে তখনও বাজতে থাকে সীথা মাইয়ার ভজন। রামায়ণ তবে মিথ না মিথ্যে? এ নিয়ে ভাববার অবকাশ নেই আর। আপাতত মাথায় ঘুরতে থাকল সীতায়ণের ইতিহাস। অথবা রাবণায়নের প্রেক্ষাপট।  
রামবোডা ওয়াটার ফলস 
প্রবন্ধ টি প্রকাশিত যুগশঙ্খ সংবাদপত্রের রবিবারের বৈঠকে ১৬ র পাতায়