১১ এপ্রি, ২০১৬

বাসন্তীপুজো এবং অথ অশোকষষ্ঠী কথা


মাদের দেশে শীতের শেষে চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে মাদুর্গার পুজোকে বাসন্তীপুজো বলে। শাস্ত্রে শরত ও বসন্ত এই দুই ঋতুকে বলা হয় "যমদংষ্ট্রা" অর্থাত এই দুই ঋতুতে মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধি ভোগ করে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। শরত এবং বসন্ত এই দুই ঋতুর আগমনেই ভারতবর্ষের মত গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী তাই আবির্ভূতা হন এই দুই সময়ে।
সূর্যের গতিপথে সূর্য ছয়মাস উত্তরদিকে ও ছয়মাস দক্ষিণদিকে গমন করে। উত্তরায়নের সময় দেবকুলের দিন আর দক্ষিনায়নে তাদের রাত্রি। 
 বসন্তকালেই দুর্গাপূজা নির্দ্দিষ্ট ছিল কারণ এই সময় সূর্যের উত্তরায়ণের ফলে দেবতারা জাগ্রত থাকেন। কিন্তু  শরতকাল হল সূর্যের দক্ষিণায়নের সময়। রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য এইসময় দেবতাগণকে জাগ্রত করে দুর্গাপূজা করেছিলেন। তাই রামচন্দ্র প্রবর্তিত শরতকালীন দুর্গাপুজোকে অকালবোধন বলা হয়।   
শস্যাধিষ্ঠাত্রী দেবীর আরেক নাম শাকম্ভরী।  একবার দুর্ভিক্ষের সময় দেবী দুর্গা তাঁর অর্থাত পৃথিবীর সমস্ত উত্পন্ন শাক দিয়ে জগত পালন করেছিলেন। শাককে এখানে সমস্ত প্রকার শস্যের প্রতিনিধি বলা হযেছে।  দেবী শাকম্ভরীর আরেক প্রকাশ হল অন্নপূর্ণা বা অন্নদা। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।  
পন্ডিতেরা আমাদের অন্নপূর্ণা ও দুর্গার সাথে মিশরের আইসিস ও গ্রীসের সিরিসের সাদৃশ্য খুঁজে পান। সিরিয়া, গ্রীস, সাইপ্রাস, এথেন্স ও ক্রীটে আমাদের দেশের মত শস্যদেবীর পূজা দেখা যায়। শরতকালে বাসন্তী বা দুর্গাপূজার মত পাশ্চাত্যে ইস্তারাদেবীর পূজা হয়। এই ইস্তারাদেবীর রূপটি অনেকাংশেই আমাদের দুর্গার মত। তিনিও সিংহারূঢ়া ও অসুর নিধনে মগ্ন। এই ইস্তারাদেবীর উত্সব সেখানে হয় বসন্তকালে ইষ্টারের সময়। মন্ডি থার্সডে , গুডফ্রাইডে, হোলি স্যাটারডে, ইষ্টার সানডে ও ইষ্টার মানডে এই পাঁচদিন ধরে আমাদের দুর্গাপুজোর মত উত্সব চলে।  


বাসন্তীপূজার দিন পশ্চিমবাংলার রীতি অশোক ষষ্ঠী পালনের। কি এবং কেন এই অশোক ষষ্ঠী?   




বহুযুগ আগে অশোকবনের মধ্যে এক ঋষির পর্ণকুটীর ছিল ।

একদিন সেই ঋষি স্নান সেরে ফেরার পথে অশোকগাছের নীচে এক সদ্য প্রসূতা কন্যাকে কাঁদতে দেখলেন । দৈবযোগে ধ্যানের মাধ্যমে ঋষি জানতে পারলেন কন্যাটি এক শাপভ্রষ্টা হরিণী মায়ের । ঋষি মেয়েটিকে আশ্রমে এনে লালন করতে লাগলেন । তার নাম দিলেন অশোকা । ঋষিকন্যা বড় হতে লাগল । যৌবনে উত্তীর্ণ হল  ।

এক রাজপুত্র মৃগয়ায় বেরিয়ে ঐ পরমাসুন্দরী অশোকাকে একদিন দেখতে পেয়ে তার পরিচয় জানতে পারলেন । ঋষিকন্যার সঙ্গে রাজপুত্রের কথোপকথনের মধ্যেই ঋষির আগমন হল সেই স্থানে । রাজপুত্র অশোকার পাণিপ্রার্থী হয়ে ঋষিকে অনুরোধ জানালে ঋষি যারপরনাই আনন্দিত হয়ে তাতে সম্মতি দিলেন ।

অশোকাকে রাজপুত্রের হাতে সঁপে দিয়ে ঋষি বললেন  :

" আজ থেকে তুমি রাজার ঘরণী হ'লে কন্যা । যদি কখনো বিপদে পড় আশ্রমে চলে এস । আর রাজপুরী থেকে চিনে একাএকা এই আশ্রমে যাতে আসতে পারো তাই এই অশোকফুলের বীজ তোমাকে দিলাম । এখন যাবার সময় এই বীজ ছড়াতে ছড়াতে যেও । পরে কখনো প্রয়োজন হলে এই বীজ থেকে উত্পন্ন অশোকগাছ বরাবর   চিনে পায়েহেঁটে তুমি চলে আসতে পারবে "

অশোকফুলের বীজ  সযত্নে আঁচলে বেঁধে নিয়ে অশোকা রাজপুত্রের সাথে পতিগৃহে যাত্রা করল । যাত্রাপথে বীজ ছড়াতে ছড়াতে চলল অশোকা । রাজপুরীতে পৌঁছালে রাজা-রাণী সস্নেহে তাদের বরণ করে ঘরে তুললেন । অশোকা আর রাজপুত্রের বাড়বাড়ন্ত সংসারে সুখের বন্যা । অশোকা ক্রমে সাত ছেলে ও এক মেয়ের মা হল । অশোকার শ্বশুর রাজামশাই মারা গেলেন শ্রাদ্ধের দিন অশোকষষ্ঠীর কথা বিস্মৃত হল অশোকা । ভাত মুখে দিয়েই মনে পড়ল ষষ্ঠীর কথা । রাতে শুয়ে পড়ল মনখারাপ নিয়ে । পরদিন ভোরে উঠে দেখল সাতছেলে-বৌ যার যার ঘরে মরে পড়ে আছে আশোকা তা দেখে ঋষির কথা ভাবলে । রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আশ্রম বরাবর চলতে লাগল ।

ততদিনে বীজ থেকে অশোকগাছ মহীরুহের আকার ধারণ করেছে । চৈত্রমাসে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে তার শাখাপ্রশাখা । ঋষির আশ্রমের কাছে এসেই  অশোকা ঋষিকে দেখে কেঁদে উঠলো । ঋষি ধ্যানের বলে সব অবগত ছিলেন । কন্যাকে সাথে করে রাজবাড়ী ফিরে গেলেন । কমন্ডুলু থেকে জল ছিটিয়ে  দিলেন  অশোকার মৃত ছেলে বৌ নাতিপুতির গায়ে  । দৈবগুণে সকলে চোখ মেলে চাইল ।

ঋষি বললেন অশোকষষ্টীর ব্রত পালন করলে  কখনো শোক প্রবেশ করবেনা সংসারে ।

৮ মার্চ, ২০১৬

নারীনক্ষত্র

 
ছবি- ইন্টারনেট 


দলে যাচ্ছে কি সমাজের পরিস্থিতিটা? আজ কি তবে আকাশের বাকী অর্দ্ধেকটা থেকে উড়ে যাচ্ছে সামিয়ানাটা? চাঁদের আলো কি পড়ছে আজ অন্ধকার বাকী অর্ধেক আকাশের গায়ে? দেখতে পাচ্ছি কি আমরা নারীর এগিয়ে চলা? নাকি পিছিয়ে পড়ছি আরো? এগিয়ে তো চলেইছি প্রতিনিয়তঃ। নয়ত কি মেরি কম, সুনীতা উলিয়ামস, কল্পনা চাওলার গল্প উঠে আসছে বারেবারে? রবিঠাকুরের কথায় বলতে ইচ্ছে করে


সে কি রহিল লুপ্ত আজি সব জন পশ্চাতে? ল‌উক বিশ্ব কর্মভার মিলি সবার সাথে।

নূতন যুগ সূর্য উঠিল, ছুটিল তিমির রাত্রি তব মন্দির অঙ্গন ভরি মিলিল সকল যাত্রী





আজ আমার নারী আমার সম্পূর্ণ আকাশ।

আন্তর্জাতিক নারীদিবস পালন তো একটা ছুতো। আসলে আমরা মেয়েরা মনেপ্রাণে রোজ‌ই চাই এমন দিন। আমাদের কেউ মাথায় তুলে রাখুক। আমাদের জন্যে ভাবুক, তাই তো আজ জমায়েত হয়েছি এই অঙ্গনে, শরতচন্দ্রের বাসভবনে। যে কথাসাহিত্যিক মেয়েদের নিয়ে লিখেছিলেন কত কত গল্প, উপন্যাস, শুধু তাদের স্থান দিয়েছেন তাঁর লেখনিতে। তাদের পারিপার্শ্বিক টানাপোড়েন এখনো আমাদের বারেবারে মনে করায় । লিঙ্গগত এই বৈষম্যের জন্য আমাদের গ্রামেগঞ্জের অন্দরমহলে কি দেখতে পাইনা সুষ্পষ্ট একটা বিভাজন? এখনো কি ঘটা করে পুত্রসন্তানের জন্য পায়েসের বাটি, মাছের মুড়োটি তুলে রাখা হয়না? ছেলের পড়াশোনায় বেশী খরচাপাতি করা হয়না? তারপর সেই কথা? আহা, ও ছেলে, ও কি আর রান্নাঘরে যেতে পারে অথবা ওর কি এসব করার কথা? এর পরেও রয়েছে কণ্যাভ্রূণ হত্যা, মেয়ে পাচারের মত ঘটনা। যে কোনো বয়সের মেয়েকে স্থান কাল পাত্র ভেদে শারীরিক উত্পীড়ন, ডাইনি সন্দেহে হত্যা করা কিম্বা বৃদ্ধ মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার মত মর্মান্তিক ঘটনা।


আর আমার বাংলার নিতান্ত সাদামাটা দশভুজা, আটপৌরে মেয়েরা? কন্যাশ্রী, কন্যা সমৃদ্ধি, বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও কত কত প্রকল্প! কত কত গালভরা নাম! কিন্তু তার প্রাপ্য সম্মানটুকুনি? তাকে পুরুষের সমকক্ষ হবার জন্য এগিয়ে দেওয়া? তাকে সুরক্ষা দেওয়া আরো কত কিছু আছে ভাববার! কিন্তু আজো যেন মা হওয়াতেই তার চূড়ান্ত সার্থকতা। আবার ভাবি মাসমাইনে নিয়ে বাড়ি ফিরে সম্মানের সঙ্গে ঘরে ফেরাটাই কি তার মুক্তির পথ, অর্ধেক আকাশ পাওয়া? নিজের পায়ে দাঁড়ানো নারীও কিন্তু যথাযোগ্য সম্মান পায়না সর্বদা। নারীর লড়াই তার নিজের সঙ্গে। সর্বদা অর্ধেক আকাশ জিতে নেবার জন্য।




তোমার জন্যে সিঁথেয় সিঁদুর, মঙ্গলসূত্র গলায়

ঝমঝমিয়ে চুড়ির সাথে, নোয়া, শাঁখাপলায়।

তোমার জন্য ঘোমটা দেওয়া, আলতাপাটি রাঙা

হাতের তেলোয় মেহেন্দিতে খয়েরডুমো ভাঙা।

তোমার জন্যে ভোরে ওঠা, অগোছালো আঁচল

সব সামলে, নাভিঃশ্বাসে ধেবড়ে চোখের কাজল।

তুলসীতলায় প্রদীপজ্বালা, নিতসিঁদুর ব্রত

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু এঁয়োস্ত্রীদের মত।





হঠাত মনে পড়ে গেল সুকান্ত ভট্টাচার্যের রানার কবিতার অমোঘ সেই লাইনটি! রানার গ্রামের ডাকহরকরা, রাতের পর রাত ক্লান্তিহীন, মানুষের সুখদুঃখের খবর সে পৌঁছে দেয় দোরে দোরে, কিন্তু তার খবর কে রাখে?

আমি বলি? রূপনগরের কন্যা, পছন্দপুরের গৃহবধূ কিম্বা নিশ্চিহ্নপুরের মা'টি? সেই কোন ভোর থেকে উঠে রাত অবধি সামাল দেয় সংসারে। ক্লান্তিহীন শরীরকে বুঝতেও দেয়না তারা। তারা জানে তাদের থকে যেতে নেই। এটাই জীবন। জোয়াল কাঁধে নেবার জন্য‌ইতো জন্মেছে তারা। পুরুষরা সারাদিন রুটিরোজগারের পর বাড়ি এসে তাদের চোখ রাঙাবে, ভুলভ্রান্তি হলে ক্ষমা করবেনা, সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মা, গৃহবধূ অথবা কন্যাটি সেই স্বামী বা সংসারের মঙ্গলের জন্য‌ই সন্ধ্যেবেলায় তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালবে, আবার রাতেরবেলায় শরীরে ঘামের গন্ধ দূর করতে ঠান্ডা জল ঢেলে এসে ডিওস্প্রে ছড়িয়ে নেবে স্বামীর মনোরঞ্জনের জন্য। স্বামী হয়তবা বলবে ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্সের খবর, এই তো তোমার আসল সিকিউরিটি। সব একাউন্টেই তার বৌয়ের সংগে জয়েন্ট নাম, আইদার অর সার্ভাইভার ! কিন্তু রূপনগরের কন্যা, পছন্দপুরের গৃহবধূ কিম্বা নিশ্চিহ্নপুরের মা'টির মনের খবর কে রাখে? সে মন তো খুব ঠুনকো। সুদৃশ্য কাঁচের জিনিস বন্দী বাক্সের অন্তঃপুরে, তার বাইরে লেখা আছে, Glass inside, handle with care! সেটা ক'জন খেয়াল রাখে?



আমার নারী গ্রীষ্মঋতুতে জ্বর এলে জলপটি

আমার নারী বর্ষা-শরতে শাড়ি তার ধুলোমুঠি । 

আমার নারীটি মায়ের মতন আধফোটা ভেজা শিউলি

ল্যাজাতে-মুড়োতে ঢেকেছে লজ্জা, কনে দেখা মেঘ গোধূলি  ।

আমার নারী হেমন্তে ধান নবান্নে  পোষ-লক্ষ্মী

পিঠেপার্বণে কয়লার আঁচে ওম্‌ নেওয়া যেন পক্ষী  ।

আমার নারী নিরাভরণা সে শাঁখায় সিঁদুরে লাবণী 

খড়কে ডুরেতে আটপৌরে সে বৈশাখী বা শ্রাবণী  ।

নিজের জন্যে বাঁচতে শেখেনি আমার শ্রীমতী নারী

ভাললাগাটুকু ঝেড়ে ফেলে বলে "ভালো আছি আমি  তোমারি"  !

আমার নারী বৃষ্টিশাড়িতে, উঠোনে ইলশেগুঁড়িতে

শীতরোদ্দুরে নকশীকাঁথায়, উলের গোলায় কাঁটাতে  ।

আমিও যে সেই নারীর কন্যা  খোলা বসন্ত উঠোনে

লজ্জা চাউনি আমার অঙ্গে  ভালোবাসার সে ফাগুণে । 




আজকেও কি মেয়েদের হয়ে কথা বললে আমাদের "নারীবাদী" আখ্যা দেওয়া হবে? সেই কবে পুরাণের গল্পেও তো দেখে আসছি অপ্সরাদের মুণিঋষিদের হাতে লাঞ্ছিত হবার ঘটনা। রামায়ণে দেখেছি সীতার অপমান, পাতাল প্রবেশের মত ঘটনা। মহাভারতে দেখেছি দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, কেশাকর্ষণের মত নারকীয় ঘটনা। এখনো কেন এইযুগে বসে যে দেখতে হবে এসব সেটার উত্তর কেউ দেয়না আমাকে।



আবারো আজকের দিনে স্মরণ করি কবিগুরুকে...


দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরি, আসিল যত বীরবৃন্দ আসন তব ঘেরি

দিন আগত ঐ ভারত তবু ক‌ই ?

স্থান দাও, স্থান দাও, দাও দাও স্থান হে জাগ্রত ভগবান হে, জাগ্রত ভগবান

প্রাণ দাও, প্রাণ দাও, দাও দাও প্রাণ হে জাগ্রত ভগবান হে, জাগ্রত ভগবান ।







১৩ ফেব, ২০১৬

জয় শীতলষষ্ঠী! বসন্ত এসে গেছে.....

 তোলা থাক শিলনোড়া আজ! জ্বলবেনা গ্যাস-উনুন।  শিলকে হলুদ জলে স্নান করিয়ে তেল হলুদ ছোপানো ঠান্ডা কাপড় পরিয়ে জোড়া শিম, জোড়া মটরশুঁটি রেখে তার কোলে রাখো তার সন্তান সম নোড়াটি। কাল সকালে তার এই ঠান্ডা জল থেকে মুক্তি।

শীতকাল আমাদের কেমন যেন একটু অলস করে দেয়। বিশেষতঃ বৃদ্ধরা যেন এইসময় আরো জরাগ্রস্ত, কুঁড়ে এবং ঘরকুনো হয়ে পড়েন। শীতের দাপট এখন আর তেমন দেখিনা কিন্তু একসময় মাঘে শীত পড়ত। তাই বুঝি "মাঘের শীত বাঘের গায়".. এই প্রবাদটি প্রচলিত।  মাঘের শেষে বসন্তপঞ্চমীতে গোটাষষ্ঠী বা শীতলষষ্ঠীর ব্রতকথা পড়তে পড়তে মনে হল সেইকথা। কাহিনীতে সংসারের কর্ত্রী এক বৃদ্ধা মাঘমসেও গরম ভাত খেতে চান আর উষ্ণজলে স্নান করতে চান। তার ফলে তাঁর বিপদ আসে।  আর ধর্মভীরু মানুষকে এই কাহিনী শুনিয়ে বলতে হয়, বসন্ত এসে গেছে, আর শীত নয়। গরম জামাকাপড় বাক্সে ভরো। ঠান্ডা জলে স্নান করো।  শরীর ঠান্ডা রাখো নয়ত রোগভোগ হবে। 

এতদিন শীতের দাপটে মানুষের শুধু গরম খাব, গরম পরব, লেপ, বালাপোষ রোদ খাওয়াব, একটু আলসেমিকে প্রশ্রয় দিয়ে আরো শীতকাতুরে হয়ে পড়ব....এই মনোভাবটির বুঝি বর্জন হল এইবার। কারণ বসন্ত এসে গেছে। এবার শীতকে বিদায় জানাতেই হবে। এখন গরম খেলে, গরম পরলে রোগের প্রকোপ বাড়বেই। তাই ঠান্ডা খাও, ঠান্ডা পরো, স্বাগত জানাও নাতিশীতোষ্ণ পরিমন্ডলকে।  তাই বুঝি শীতলষষ্ঠী।  
বাংলাদেশের সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা মাটির বুকে শক্তির আরাধ্যারূপে পূজিতা দেবী শীতলা, ষষ্ঠী, সকলেই মা দুর্গার অংশ বিশেষ। শাস্ত্রে শরত ও বসন্ত এই দুই ঋতুকে বলা হয় "যমদংষ্ট্রা" অর্থাত এই দুই ঋতুতে মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধি ভোগ করে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। শরত এবং বসন্ত এই দুই ঋতুর আগমনেই ভারতবর্ষের মত গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী তাই আবির্ভূতা হন এই দুই সময়ে। ঈশ্বরে বিশ্বাস আর সেই বিশ্বাসের ভেলায় চেপে সংসারসমুদ্রের ঝড় সামলাই আমরাও । অযথা তর্কে না গিয়ে অনেকেই সংসারের বিপদমোচনের জন্য এই শীতলষষ্ঠী ব্রত করে থাকি ।  আর তাই

শ্রীপঞ্চমী থাকিতেই গোটাসিদ্ধ করিও
জোড়া জোড়া ষড় আনাজ গোটামুগে ফেলিও।
গোটা শুকনোলংকা, তাও দিও জোড়ায়
লবণ, সরিষার তেল ঢালিও শেষ ফোটায়।
আতপচালের পান্তা ভাতে, জল ঢালিও রাতে
টোপাকুলের অম্বল রাঁধিও, সজনেফুল সাথে।
টক দৈ খাইও শেষে, ঠান্ডা, ঠান্ডা সবই
শীতলষষ্ঠী পালন হোক, এই তো আমরা চাহি।


৫ ফেব, ২০১৬

শীতকালীন জার্নাল

 (১)  
কেমন যেন হুড়মুড়িয়ে বড়দিনের সকাল 
কেমন যেন ওম জড়ানো মিষ্টি রোদের সকাল 
তবুও যেন একটা বড় মনের বড়ই আকাল !  

কেমন যেন ঠান্ডা হাওয়ায় কমলা খোসার নূপুর  
কেমন যেন কুয়াশাতে অকাল টাপুরটুপুর 
তবুও যেন মনখারাপ আর বছর শেষের দুপুর ! 
কেমন যেন  শীতের বিকেল উষ্ণ প্রদোষ আলো । 

কেমন যেন ঈশাণ কোণে হালকা মেঘের ছোঁয়া
 আজ বিকেলের কয়েক পশলা  রেশমী উলের রোঁয়া । 
আমি যেন বদলে গেছি হয়ত বা সেই ভুল
আমি যেন আমিই আছি কিম্বা সর্ষেফুল । 
আমি যেন রাতদুপুরে তোমার কথা ভাবি 
সময় হলে খুঁজে দিও স্বপ্নলোকের চাবি । 


 (২)
কেকমাস আজ মধুমাস, ক্রিসমাস পোষমাসে
একাকার হল হাড়মাস, শীতমাস সব্বোনেশে !
বাকী তিনমাস পর পচামাস তাই বাঁচো ভাই বেশ কশে
আজ ক্রিসমাস, ঝোলাগুড় খাস আর কেক খাস বসে বসে ।


(৩) 
 উলটে দ্যাখো শীতকে। পালটে গেছে কলকাতার শীত । মুঠোমুঠো রোদের কণায় একভর্তি ব্যালকনি । রোদের উঠোনে আরাম চেয়ারে হেলান দিয়ে আমি । গায়ে ওষ জড়ানো পশমিনা । পায়ে মোজা । ব্যালকনির সামনের ফুটপাথে সারেসারে পথশিশু । আদুড় গা কারো। কারো সোয়েটারের হাত ছেঁড়া । নাক দিয়ে দুরন্ত গতিতে শ্লেষ্মা । ভ্রুক্ষেপ নেই কারো । খেলে বেড়াচ্ছে । রাত হলে ঘরে গিয়ে খাবে দুপুরের জলঢালা ভাত দুমুঠো আর সাথে পাড়ার দোকানের গরম ফুলুরি আধখানা হয়ত । কপালে থাকলে এককুটি চারামাছ ।
আমাদের শিশু এসব বোঝেনা । তার জীবন জুড়ে " লাইফ অফ পাই" অথবা ডোমিনোস এর কুপন কিম্বা বাসকিন রবিনস এর জাগলিং ।
"কারো পোষমাস কারো সর্বনাশ" !!!

(৪)  
"মাঘের শীত বাঘের গায়"..... তো কি? শীতও চলে যাবে । মাঘের রোদের ওম্‌ জড়িয়ে রাজকীয় কায়দায় বাঘ চলে যাবে জঙ্গলের মধ্যে । বেচারা বাঘ! বোঝেওনা সে । নিছক শিকারের খোঁজে বেরোবে সে । নিজের জন্যে আর বাচ্চাটার জন্যে । জানেনাতো নরসিংহেরা ওত পেতে থাকে তার জন্য । তাদের শীত নেই গ্রীষ্ম নেই । তাপ-উত্তাপ কিছুই নেই । মাঘ গিয়ে ফাগুন আসবে ।
বাঘের রোদ পোহানোর দিনের শেষ আর কাগজ খুলে আমরা দেখে যাব সেই নিরীহ বাঘকে মারার নাটকীয় খবর ।
এমনি করেই চলবে আমাদের জীবন । নৃশংসভাবে, নোংরাভাবে, নারকীয় ভাবে......

 (৫) 
শিকেয় তোলা থাক ক'দিনের ঘুমপাড়ানির গান, রেওয়াজের সরগম চিলেকোঠার মাচায়।  আপাততঃ কবিতার খুচরো পঙতি আটকে থাকুক কাপড় মেলার তারে । এলোমেলো ভাবনার গদ্যগুলো ঝরে যাক নিজের মত ড্র‌ইংরুমের দেওয়ালের পুরোনো নোনা ধরা বালিগুলোর সাথে । তোমাদের হাসিগুলো নিশ্চিন্তে দিনকয়েক ঘুমিয়ে পড়ুক কবিতার ওষুধ খেয়ে । আমিও পথ হয়ে এঁকেবেঁকে আসছি তোমাদের কাছে, সেই  ফুরিয়ে যাওয়া ডাল-ভাতের আমি, সেই ধোপা-নাপিতের হিসেবের আমি, সেই না বলা অল্পের আমি হয়ে, মুঠোফোনের রিংটোন হয়ে.....

২৫ জানু, ২০১৬

পিকনিক-২০১৬


বনভোজন-২০১৬   

ডিজিটাল ক্লিকে মুখর নৌকাবিহার
সদলবলে নৌকায় গঙ্গাবক্ষে

 আমি তরী নিয়ে বসে আছি নদী কিনারে...

থ্রি মাস্কেটিয়ার্স



এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার রায়পুর। গঙ্গার ধার, মাঘের শীত বাঙালীর তসরে, পুলওভারে, টুপিতে, পশমিনা চাদরে। কনকনে হাওয়া, মিঠে রোদে ভেসে যাওয়া সকালে বনভোজন। আমাদের Praxis Buisness School এর annual picnic ! সারাবছর আমরা এইদিনটার জন্য মুখিয়ে থাকি। অনিতা আর জয়দীপদা লেট করতে করতে অবশেষে আমাদের তুলল ঠিক গাড়িতে। তারপর চারটে গাড়ির কনভয় অবশেষে নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছল। ফুলকো ফুলকো লুচি আর কড়াইশুঁটি দেওয়া সাদা আলুচচ্চড়ি। তারপরেই ডাবের জল আর ভদকা কিম্বা পাতি বিয়ার।সঙ্গে শীতসব্জীর পকোড়া, চিকেন পকোড়া আর রুইমাছ ভাজা। নদীর ধার দিয়ে ডিঙিনৌকায় চলে মাছওয়ালা....
কি মাছ আছে? উত্তর এল খোকা ইলিশ।
খেলবনা।
কেন ম্যাডাম?
ধরেছো কেন?
কি খাব? আপনারা কিনলে একটু রোজগার হয়, ভালো দাম পাব, এই দেখুন, একদম লড়ছে, ডিম হয়নি। আজ যেকটা ধরেছি সব আপনাদের দি‌ই তবে?
বললাম, কথা দিতে হবে, আর ধরবেনা।
এই শীতকালেই তো পিকনিক পার্টির রমরমা, তারপরেই হাতখালি। কিছুই নেই বাংলায়।ছেলেপুলেদের পড়াশুনো করিয়েও লাভ নেই । অগত্যা মাছ ধরেই বেচি। তারপর অসুখবিসুখ, নৌকো মেরামতি, ঘরের খড়, জমির ধান, মেয়ের বিয়ে...কোথায় যাই? মাগঙ্গার সাথেই ওঠবোস, গঙ্গার কাছেই সারাদিন মিনতি জানাই, শরীল থাকতি নিয়ে নাও মা।
মাছ ছিল সর্বসাকুল্যে এককেজি দুশো গ্রাম। তাই স‌ই। কেটেকুটে খাবি খাওয়া মাছভাজা সকলেই খেল চেটেপুটে। মন মানলোনা। কামড় দিয়েই মনে হল হায়রে দারিদ্র্য! কোথায় মাগঙ্গা! কোথায় সেই ছোটবেলা? এককিলোর কম ইলিশ আমরা চোখেই দেখিনি। জেলেটির কথাগুলো‌ও তো ফেলতে পারিনা। খোকা ইলিশ ধরা বন্ধ করা হল কিন্তু এই জেলেটির সেদিনের ভাত কে জোটাবে? তবুও তো পেল পাঁচশোটা টাকা। এরপরেই সবশুদ্ধু নৌকাবিহার। ম্যাডামদের হাতে ডাবেরজল মিশ্রিত ভদকার গ্লাস, পেপার ন্যাপকিনে মোড়া পকোড়া আর মাছভাজা.....কত গান, কত ফূর্তি আমাদের্! ভেসে গেলাম গঙ্গাবক্ষে টানা একটা ঘন্টা । কনকনে উত্তুরে হাওয়ায় আমাদের শাল-দোশালা, জ্যাকেট, সোয়েটার টুপি, মাফলার আরো কতকিছু শীত অনুষঙ্গে মাঘীশীত জমে দৈ! গরম ভাত আর মাটনকারিতে ভরাপেটে আবার ভরা মানে তেলা মাথায় তেল বা Carrying Coal to New Castle । তারপরেই জয়মা বলে গঙ্গার ধারে ভাসাও থার্মোকলের থালার তরী! পরপর গঙ্গার ধারে পিকনিক স্পট। পিকনিক স্পটের মালিক পয়সা নিয়েছে। রসিদ দিয়েছে। কিন্তু কোনো ট্র্যাশ ফেলার জায়গা নেই। মাননীয় সরকারী অফিসাররা, আপনারা কি নৌকাবিহারে যান? তবে দেখে আসুন গঙ্গার ধারের আবর্জনাগুলো। এখনো কত জাহাজ চলে এই গঙ্গায়। এখনো কত জল, কত সুন্দর তার রূপলালিত্য!

চড়ুইভাতি-২০১৬
এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ফলতা  

আমরা এমনি এসে ভেসে যাই...।গানে, কবিতায়, নাচে, কুইজে... 

জগদীশ চন্দ্র বসুর বড়ি... দূর থেকে...

এখনো সে বৃন্দাবনে বাঁশী বাজেরে...

 
"আপ্‌কো কিতনা বার বোলা থা, জলদি আনেকে কে লিয়ে? হমলোগ ব্রেকফাস্ট খায়েঙ্গে ন'বাজে। যাইহোক অব স্টার্ট তো কি জিয়ে।" সাড়ে আটটায় ছাড়ল টাটা উইঙ্গার। সদলবলে আমি দক্ষিণ কলকাতা পাঠচক্রের সদস্যাদের নিয়ে।
সাদার্ণ এভিনিউ আসতেই গাড়ি বাঁদিকে ঘুরছে। কেন? কেন আবার? ডানদিকে ফলতা যদিও কিন্তু ডায়মন্ডহারবার দিয়ে গেলে "গঙ্গাসাগর মে হমারা গাড়ি পাকড় লেগা" মতলব? বারুইপুর, আমতলা ঘুমকে জানা হ্যায়। তার মানে? কড়াইশুঁটির কচুরী-কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা দিয়ে আলুর তরকারী, চা, নলেনগুড়ের সন্দেশ ভোগে? পেছনের সিট থেকে প্রবাসী শুভশ্রীদির হুঙ্কার শিট্‌! আমার বাঁদিক থেকে মনীষামাসীর অনুযোগ...আপনার তো বোলনা চাহিয়ে থা! ডান দিক থেকে বন্দনাদি তখন তারস্বরে গেয়ে চলেছে..." আমার পরাণো যাহা চায়....তুমি তাই...." অমিতামাসী বলে উঠল, তুই চুপ্‌ করবি বন্দনা? আমার মাইগ্রেন শুরু হয়ে গেল। বাড়ি থেকে শুধু এককাপ চা খেয়ে বেরিয়েছি আমি" আবার শুভশ্রীদি রোদচশমাটা মাথার ওপরে তুলে বলে উঠল, ডিসগাস্টিং! দিস ইস কলকাতা! আমি তখন ড্রাইভারের সাথে বলে চলেছি, এডভান্স লেনে কা টাইম মে ইয়ে মালুম নেহি থা? বলতে না বলতেই হুশ্‌ করে গাড়ি এসে পড়ল। ড্রাইভার বলে কিনা উতর যাইয়ে! হমারা গাড়ি নেহি হ্যায়! মালিকনে বাতা দিয়া....ব্লা, ব্লা, ব্লা....তখন উনি মানে আমার হিরোটি বলে উঠলেন
" অগর হমলোগ উতর জায়েঙ্গে তো আপ জিন্দা নেহি ঘর পৌঁছেঙ্গে....." উরিব্বাস! একদম অক্ষয়কুমার মার্কা ডায়লগ! পেছন থেকে মিসেস বালসারা তো ভয়ে, কুঁকড়ে অস্থির। আমাদের আরেকটি প্রাইভেট কার তখন ফোন করে বলছে, এই শোনো আমরা না ডায়মন্ডহারবারের পথ দিয়েই চললাম...
এক মাসীমা বলে উঠলেন, তো?
ফলতা আসতেই একজন বলে উঠলেন, "ইতনা সংকীর্ণ গলি মে কিঁউ ঘুসা?" আর আমরা হেসে কুটি আর পাটি।
এই করতে করতে অবশেষে ফলতা পৌঁছে যেন মনে হল বিশ্বজয় করেছি। কে যেন গাড়িতে বলছিলেন তাঁর অম্বল হয়েছে। কার যেন গ্যাসের ব্যাথাটা বাড়ছিল। কেউ একজন মাইগ্রেনে কষ্ট পাচ্ছিলেন। আর আমার টেনশনযুক্ত এহেন মনের অবস্থা, পেটের ভিতর ছুঁচোবাবুর ডন-বৈঠক দেওয়া....সবকিছুর আগুণে জল পড়ল। গঙ্গার ধারে টেবিল পাতা লোকনাথ রেসর্টে কি ভালোই আয়োজন করেছিলেন আমাদের কলকাতার ঠাকুর(ওরফে কেটারার)..টোপা টোপা, পুর ঠাসা, বটলগ্রীন রংয়ের কড়াইশুঁটির কচুরী পেয়ে মুখে সব কুলুপ এঁটে বসে গেল চুপচাপ। ঝগড়া তখন মাথায়। গাড়ির কাজিয়া রণে ভঙ্গ দিয়েছে ততক্ষণে। তাপ্পর ছোট ছোট জগদীশবাবুর বাড়ি দেখতে। আঃ মলো যাঃ! বোস ইন্সটিট্যুটের সরকারমশাইরা আমাদের ঢুকতে পর্যন্ত দিলনি! আমরা এতোই অছ্যুত! তা বাপু আমরা আমাদের মত সব গেম খেলিচি অনেক। সিনিয়র সিটিজেন মাসীমাদের স্মৃতিতে শান দি‌ইয়েচি বাপু...মেমারি গেম খেলিয়েচি, ক্যুইজ হল, ডাম্ব-শারড, ছোট্ট ক্লু থেকে অণুগল্প ( ৫ মিনিটে পাঁচ লাইনে) সব করিচি।খেলতে খেলতে সেকেন্ডরাউন্ড চা আর পকোড়া এল। মাসীমাদের কি খুশি! তাপ্পর হেব্বি লাঞ্চ করিচি...মেইন কোর্সে দ‌ইমাছে আখাম্বা কাতলা ছিল আর চিকেন চাঁপ। ও হ্যাঁ, মধুরেণ সমাপয়েত আমসত্ত্ব-আলুবখরার চাটনী আর নলেন গুড়ের রসোগোল্লা! জেরিয়াট্রিক এই মহানগরে এই মানুষগুলি আমার বড্ড ওয়েল উইশার। এরা বছরের এই একটি দিন বসে থাকেন আমার মুখ চেয়ে। কবে আমি একটু নিয়ে যাব এদের পিকনিকে!

১৪ নভে, ২০১৫

ভাইফোঁটা


কার্তিকের শুক্লা প্রতিপদ কিম্বা দ্বিতীয়া । নরকাসুর বধ করে কেষ্টাদা সবেমাত্র ফিরেছেন ঘরে। বোন সুভদ্রা দাদার মুড বুঝে নিল চটপট। আগের দিন দেওয়ালির রান্নাঘর থেকে ঘিয়ের গন্ধ তখনো পুরোপুরি যায়নি চলে। রান্নাঘরে গিয়ে দুখানা মুচমুচে নিমকি, গোটাকতক ম্যাওয়া কুচোনো লাড্ডু, সোহন পাপড়ি আর এক ভাঁড় রাবড়ি এনে দাদার মুখের সামনে ধরল। কেষ্টদা তো মহা খুশি। একে মিশন সাকসেসফুল...দুষ্কৃতের বিনাশ করে সাধুদের পরিত্রাণ করতে চলেছেন বলে মহা ফূর্তি মনে আর দুই দেওয়ালির সুহাগ রাতে অগণিত গার্লফ্রেন্ডকে সাথে নিয়ে ছাদে গিয়ে কখন ফষ্টিনষ্টি করবেন সেই অহ্লাদে ভরপুর তাঁর মেজাজ। বিদ্যুতলতারা সকলে শৃঙ্গারে ব্যস্ত তখন। কেউ কেতকী-কুর্চি-কদম্ব প্রলম্বিত জলে স্পা নিচ্ছেন। কেউ আবার কর্পূর-কেওড়া-অগরুর জলে গাত্রমার্জনা করে সুগন্ধা হচ্ছেন। কেউ ধূপের ধুনোয় কেশ শুষ্ক করে ফুলের মালা জড়াতে ব্যস্ত।

কেষ্টদার দুই গৃহিণী সত্যভামা আর রুক্মিনী বৌদির মেজাজ একটু ক্ষেপে আছে আজ। একে বহুদিনের অদর্শণে প্রাণের ভেতরটা আঁকুপাঁকু অন্যথায় আসামাত্র‌ই ননদিনী সুভদ্রা কেষ্টদাকে চিলের মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে গেল তাদের কাছ থেকে। তারপর যদিও ননদিনী ছাড়বে তাদের কর্তামশায় তো এবার যাবেন ছাদের ওপর কিম্বা নদীর তীরে। একে কার্তিকের আকাশে রাসপূর্ণিমার হাওয়া ব‌ইল বলে !
সুভদ্রা বলল, দাদা মনে আছে কালকের কথা? এবারে কিন্তু আরো বড় উপহার চাই। ঐ ময়ূরের পালক, কদমফুলের আর্মলেট আর জাঁতিফুলের মুকুটে কিন্তু চলবেনা বলে দিলাম। এবার ডাবল ধামাকা কিন্তু। একে ভাই ফোঁটা তায় নরকাসুর বধ হয়েছে। অতএব ট্রিট চাই বস!
কেষ্টাদা মুখটা বেঁকিয়ে বললেন, তা আমাকেই বা কেন বধ করা বারেবারে? আরো একজন দাদাও তো আছে নাকি। সুভদ্রা বলল, তুমি তো গেছ নরকাসুর নিধন করতে। বলরাম দাদা? তিনি তো দ্রাক্ষারসে অবগাহন করে পড়ে রয়েছেন সেই ধনতেরস থেকে।

কেষ্টাদা প্রমাদ গনলেন। চটপট স্মার্টফোনে দেখে নিলেন ব্যাংকে কিছু পড়ে আছে কিনা। সুভদ্রাকে বললেন, ঠিক হ্যায় তব। মানাও ভাই দুজ, ঘটা করে ভাইফোঁটা হোউক! !!!

রুক্মিনী, সত্যভামা বৌদিদ্বয় শশব্যস্ত হয়ে গাত্রোত্থান করে বাজারের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।হাজার হৌক রান্নাবাটিতো তাদেরি করতে হবেক। আরতো সকলে সুখের পায়রা! যদি আবার নন্দাই বাবু অর্জুন এসে পড়েন তাহলে আর কথাই নেই! জামাই বলে কথা! বৌদিরা আবার নন্দাইকেও ভাইফোঁটা দেয়।

১২ নভে, ২০১৫

দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো


কালীপুজোর অমাবস্যার দিনে পশ্চিমবঙ্গীয়দের রীতি  দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো করার। ব্রতকথা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম অনেক কিছু। লক্ষ্মীপুজো করলেই যে অর্থাগম হবে, ঐশ্বর্য্যপ্রাপ্তি হবে এ বিশ্বাস আমি করিনা তবে সব ধর্মের মূল কথা "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর" এই আপ্তবাক্যটি আমি মানি। আর গল্পটি এযুগেও বেশ যুক্তিসম্মত বলে মনে হল। কারণ আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। ঈশ্বর, মানুষ, পুজোআর্চা এসবকিছুই  তো মানুষের মনগড়া। এই অনুষঙ্গগুলি জীবনযাপনের উপলক্ষ্যমাত্র। 

দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো ব্রত কথা
 
এক রাজার পাঁচ মেয়ে ছিল। একদিন সকলকে একত্র করে রাজা তাঁদের জিগেস করলেন, তোমরা কে কার ভাগ্যে খাও? ছোটমেয়েটি অত্যন্ত সপ্রতিভ উত্তর দিল।

সে বলল "মা লক্ষ্মী খাওয়ান আমাদের। মানুষের কি সাধ্য যে সে নিজে খাবে। মানুষতো উপলক্ষ্য মাত্র। আমরা সকলেই নিজের ভাগ্যে খাই বাবা"

কন্যার কথায় রাজা তো অগ্নিশর্মা। সাথেসাথে তিনি জ্বলে উঠে বললেন, "রাজার মেয়ে তাই কিছু বুঝতে পারলিনা। এ জীবনে অর্থ, যশ প্রতিপত্তির জোরেই আমরা সকলে বেঁচে আছি। ঠিক আছে, ভালো কথা। কাল সকালে আমি যার মুখ আগে দেখব তার সাথে তোর বিয়ে দেব। তখন দেখব তুই কি করে আর কার ভাগ্যে খাস"

রাণী সেই কথা শুনতে পেয়ে প্রমাদ গনলেন। রাজপুরীতে সকলকে সাবধান করে দিলেন, কেউ যেন পরদিন রাজবাড়ির মুখো না হয় আর রাজধানীর সব দোকানপাট সব বেশ বেলায় খোলার পরামর্শ দিলেন। যাতে রাজার চোখের সামনে কোনো ব্যক্তি এসে পড়ে। প্রজারা ঢেঁড়া পিটিয়ে সেই খবর চালু করে দিল। সেই কথা জানতে পেরে অন্য একপ্রদেশের গরীব বামুন তার ছেলেকে সঙ্গে করে চুপিচুপি রাজ অন্তঃপুরে এসে লুকিয়ে থাকল সেদিনের মত। পরদিন ঘুম ভাঙতে রাজার চোখে পড়ল সেই গরীব বামুনের ছেলেটি। রাজা তাঁর ছোটমেয়ের বিয়ের আয়োজন করলেন সেই ছেলের সাথে আর বিদায়বেলায় মেয়েকে বললেন, "দেখি এবার কেমন তুই নিজের ভাগ্যে খাস!”

গরীব বামুন রাজকন্যাকে ছেলের বৌ করে, পুত্র আর বৌমাকে সাথে নিজের কুঁড়েতে ফিরে এল। রাজকন্যা স্বামী-শ্বশুরকে বলে রাখল, যখনি তারা বাড়ির বাইরে থেকে ঘরে ফিরবে রাস্তায় যা পাবে তা যেন কুড়িয়ে নিয়ে আসেন, খালি হাতে যেন না ফেরেন। একদিন বামুন ফেরার পথে রাস্তায় একটি মরা কালকেউটে পড়ে থাকতে দেখল। সেটিকে ঘরে এনে রাজকন্যাকে দেখালো। রাজকন্যা বললে ওটিকে ঘরের চালে ফেলে রাখুন, কাজে আসবে। এবার সেদেশের আরেক রাজার ছেলে কঠিন অসুখে পড়েছে। রাজবৈদ্য এসে জানালো কালকেউটের মাথাটা পেলে তিনি রাজপুত্রকে সারিয়ে তুলতে পারেন। রাজা ঢেঁড়া পিটিয়ে খবর করলেন, যে ব্যক্তি তাঁকে মরা কালকেউটের মাথা দিতে পারবে সে যা চাইবে তাই পাবে।

রাজকন্যা সেই কথা শুনে শ্বশুরকে বললে, "ঢ্যাঁড়াদারদের ডেকে আমাদের ঘরের চালে যে মরা কেউটে রাখা আছে তার মাথাটা রাজাকে দিয়ে আসুন তবে তার বিনিময়ে কিছু চাইবেননা"

রাজবৈদ্য সেই মরা কেউটের মাথা থেকে ওষুধ তৈরী করে রাজ্পুত্রকে তা খাওয়াতে সে সুস্থ হয়ে উঠল। রাজা মহা খুশিতে বামুনকে ডেকে পাঠালেন। যাবার আগে রাজকন্যা শ্বশুরকে বলে দিল যে কার্তিকমাসের অমাবস্যা তিথিতে রাজধানীর কোথাও যেন বিন্দুমাত্র আলো না জ্বলে। এইকথাটুকু রাখলেই হবে, বিনিময়ে কিছু চাইনা তাদের। বামুন সেকথা রাজাকে জানালো। রাজা বললেন কার্তিকমাসের অমাবস্যায় রাজধানীতে যেন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার থাকে। যে আলো জ্বালাবে তাকে দন্ড পেতে হবে।

এদিকে রাজকন্যা সেদিন নিজে উপোস করে তার কুঁড়েটি গোবর দিয়ে নিকিয়ে পিটুলিগোলার আলপনা দিয়ে ফুলচন্দন-মালা, ধূপ-ধুনো দিয়ে যতসামান্য আয়োজনে মালক্ষ্মীর জন্য ঘট পেতে তাঁর আগমনের অপেক্ষায় বসে র‌ইল।

ঐদিনে সর্বত্র ঘোর আঁধার আর রাজকন্যার কুঁড়েতে প্রদীপের আলো জ্বলা দেখে মালক্ষ্মী সেখানে অবতরণ করলেন। তুষ্ট হয়ে নিজের পায়ের নূপুরটি রেখে গেলেন কমলাসনে। এরপর যা হয় বামুনের ঐশ্বর্য আর দেখে কে! ধীরে ধীরে তাদের মালক্ষ্মীর কৃপায় অবস্থা ফিরে গেল। একদিন বামুন ঠিক করল বাড়ির পাশে একটি পুকুর কাটাবে। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিনে দলেদলে লোক এল। রাজকন্যা জানলা দিয়ে হঠাত দেখতে পেল তার একদা রাজ-চক্রবর্তী বাপকে। তিনি আজ হতদরিদ্র। পুকুর খননের কাজে এসেছেন তাদের গ্রামে। পুকুর খননের কাজ শেষ হলে রাজকন্যা সকলকে খাওয়ালে। দরিদ্র পিতাকে যখন ভাত বেড়ে দিতে যাবে তখন তিনি কেঁদে বললেন, আমার ঠিক তোমার মত একটি মেয়ে ছিল। এদ্দিনে সে কোথায় আছে, কেমন আছে কিছুই জানিনা আমি। রাজকন্যা বাবার কন্ঠস্বর চিনে ফেলেছে এর মধ্যে। বাবাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললে, বাবা, তুমি যে আমায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছিলে , এই দ্যাখো আমি কেমন এখনো নিজের ভাগ্যেই খেয়ে পরে বেঁচে আছি। সেই পরীক্ষার শেষ হয়েছে বাবা। দরিদ্র বাপ তখন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোর কথাই ঠিক মা, আজ আমি নিজের অহঙ্কারে সর্বস্বান্ত। সত্যি‌ই বলেছিলি তুই। মানুষ নিজের ভাগ্যেই খায়।অর্থ-যশ-প্রতিপত্তি থাকলেই হয়না রে। মানুষের ভাগ্য‌ই মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। নয়ত আমি আজ ফকির হয়ে গেছি আর তুই আজ রাজরাণী! ঈশ্বরবিধাতাই সব মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন।

রাজকন্যা বললে, "বাবা এবার থেকে তোমার ঘরে কার্তিকমাসের অমাবস্যার দিনে লক্ষ্মীপুজো করো। আবার তোমার হৃত ঐশ্বর্য্য সব ফেরত পাবে।"

......
শেষলাইনটি কতটা সত্যি জানিনা তবে ভাগ্যে আমিও কিছুটা বিশ্বাসী। আর তোমরা?

৯ নভে, ২০১৫

ধন-তেরস

আকাশে বাতাসে ধ্বনির ত্রাস, পালন করছি ধন-তেরস 
ধন কিনতে পকেট হ্রাস, সোনারূপোয় গিলছি গ্রাস  !   

  • সকল দ্বন্দ বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো, সেই তো তোমার ভালো....

সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চতুর্দশীর আগের দিন অর্থাত ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস নামে উত্সব পালন হয় । পুরাণের গল্পে আছে সমুদ্রমন্থনের সময়কালীন এক গল্প। ঐশ্বর্যের ভারে অহংকারী দেবরাজ ইন্দ্র সকলকে খুব হেয় করছিলেন। একদিন দুর্বাশা মুনি তাঁর গলার পারিজাতের মালাটি অত্যন্ত স্নেহের সাথে হাতির পিঠে চড়া ইন্দ্রকে গলায় পরিয়ে দিতে যান। মালাটি ইন্দ্রের গলায় না পড়ে হাতির দাঁতের ওপর গিয়ে পড়ে ও হাতি ততক্ষণাত সেই মালাটিকে শুঁড়ে করে মাটিতে ফেলে দেয়। তা দেখে দুর্বাসা অতীব ক্রুদ্ধ হন ও দেবরাজকে "লক্ষ্মী চ্যুত হও" এই বলে অভিশম্পাত করেন। মুনির এই অভিশাপে দেবরাজ ইন্দ্র অসুরদের পরাজয় লাভ করেন ও রাজ্য, সিংহাসন, লোকবল সব হারান। অসুররা তখন স্বর্গের মালিকানা পান ও লক্ষ্মীদেবী সহ সমগ্র দেবতাকুল পালিয়ে গিয়ে সমুদ্রের অতলে আশ্রয় নিলেন। দেবকুলের এহেন সমূহ বিপদে দেবরাজ ইন্দ্র প্রজাপিতা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। তিনি সব শুনে বললেন একমাত্র বিষ্ণুই পারেন দেবতাদের বিপন্মুক্ত করতে। আর তখনি শুরু হল সেই মহাকার্য যার নাম সমুদ্রমন্থন। সমুদ্রের গভীরে নাকি "অমৃত" নামে এক অমোঘ সঞ্জিবনী সুধা আছে যা পান করলে দেবতারা অমরত্ব লাভ করবেন। বিষ্ণুর আদেশে মন্দার পর্বত হল সমুদ্রমন্থনের দন্ড। আর নাগরাজ বাসুকী হল মন্থনের রজ্জু। মন্দার পর্বতকে বাসুকী তার সমগ্র শরীর দিয়ে বেষ্টন করে র‌ইল আর দেবতারা দুইদিক থেকে তার মুখ ও লেজ ধরে টানতে লাগলেন। শুরু হল ভয়ানক সমুদ্রমন্থন প্রক্রিয়া। ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত নামে হস্তী, চন্দ্র, উচ্চৈঃশ্রবা নামক অশ্ব, বৈচিত্রময় মণিমাণিক্য, পারিজাত নামক স্বর্গের নান্দনিক পুষ্পবৃক্ষ সব উঠে আসতে লাগল একে একে । এরপর অমৃতের ভান্ড হাতে উঠলেন দেবতাদের চিকিত্সক ধ্বন্বন্তরী। আর সবশেষে বাসুকীরাজের সহস্র ফণারূপ ছত্র মাথায় উঠে এলেন মা লক্ষ্মী।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতেই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধ্বন্বন্তরী। তাই এই তিথির নাম হল ধনতেরস। তাই এই দিনটিতে ধনের উপাসনা করতে হয়। আর তার ঠিক পরেপরেই লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়। সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেদিন নাকি ছিল কার্তিক অমাবস্যা। তাই লক্ষ্মীকে বরণ করে স্বর্গে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুষ্ঠানটিতে আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল স্বর্গকে।

  • ডুব দে রে মন কালী বলে, হৃদি রত্নাকরের অগাধ জলে...

দীপাণ্বিতাই বল কিম্বা দীপাবলী অথবা ধনতেরসে লক্ষ্মী-গণেশের পুজো...উদ্দেশ্য একটাই ধনাগম ও শ্রীবৃদ্ধি। তবে কোথাও যেন কালীর সাথে সবকিছু একাত্ম হয়ে যায়। বাজি পোড়ানো, আলোর উত্সব, মিষ্টিমুখ, উপহারের আদানপ্রদান সবকিছুই যেন সেই সনাতন ধর্মের সৌহার্দের বার্তা বহন করে আনে।  কালী করেন অশুভ শক্তির বিনাশ আর লক্ষ্মী ঘটান শ্রীবৃদ্ধি। দেওয়ালী হল মিলনোত্সব, দীপাণ্বিতা সেই উত্সবে আলোর রোশনাই। 

২১ অক্টো, ২০১৫

সন্ধিপূজা? তার আবার বিশেষত্ব কি ?


রামায়ণে আছেঃ 

শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পুজো চলতে লাগল । সপ্তমীর দিন দেবী স্বয়ং রামের ধনুঃশ্বরে প্রবেশ করলেন । অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নিলেন । অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করলেন রামচন্দ্র ।
দেবী দুর্গা নাকি এই দুইতিথির মিলনক্ষণেই আবির্ভূতা হন দেবী চামুন্ডারূপে । চন্ড এবং মুন্ড এই দুই উগ্রমূর্ত্তি ভয়ানক অসুরকে বধ করেছিলেন এই সন্ধিক্ষণে । আশ্বিনমাসে রামচন্দ্রের অকালবোধন এবং অপ্রতিরোধ্য রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করার জন্য যে দুর্গাপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায় কৃত্তিবাসের রামায়ণে সেখানেও দেখি রামচন্দ্র সন্ধিপূজা সমাপন কালে দেবীর চরণে একশো আট পদ্ম নিবেদন করার আশায় হনুমানকে দেবীদহ থেকে একশো আটটি পদ্মফুল তুলে আনতে বলেন । হনুমান একশোসাতটি পদ্ম পেলেন । দেবীদহে আর পদ্ম ছিলনা । এবার প্রশ্ন কেন দেবীদহে একটি পদ্ম কম ছিল । তার কারণ স্বরূপ কথিত আছে , দীর্ঘদিন অসুর নিধন যজ্ঞে মাদুর্গার ক্ষত বিক্ষত দেহের অসহ্য জ্বালা দেখে মহাদেব কাতর হলেন । মায়ের সারা শরীরে একশো আটটি স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল । মহাদেব তাঁকে দেবীদহে স্নান করতে বললেন সেই জ্বালা জুড়ানোর জন্য । দেবীদহে মায়ের অবতরণে একশো সাতটি ক্ষত থেকে সৃষ্টি হয়েছিল একশো সাতটি পদ্মের । মহাদেব দুর্গার এই জ্বালা সহ্য করতে না পারায় তাঁর চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু নিক্ষিপ্ত হল মায়ের একশো আটতম ক্ষতের ওপর । দেবীদহে স্নানকালে সেই অশ্রুসিক্ত ক্ষতটির থেকে যে পদ্মটি জন্ম নিয়েছিল সেটি মা নিজে হরণ করেছিলেন । কারণ স্বামীর অশ্রুসিক্ত পদ্মফুলটি কেমন করে তিনি চরণে নেবেন । আবার কৃত্তিবাসের রামায়নে পাই রাবণ নিধন যজ্ঞের প্রাক্কালে রামচন্দ্র বলছেন

” যুগল নয়ন মোর ফুল্ল নীলোত্পল
সংকল্প করিব পূর্ণ বুঝিয়ে সকল ।।

রাম ধনুর্বাণ নিয়ে যখন নিজের নীলোত্পল সদৃশ একটি চক্ষু উত্পাটন করতে উদ্যত তখন দেবী রামচন্দ্রের হাত ধরে তাঁকে নিবৃত্ত করে বলেন

“অকালবোধনে পূজা কৈলে তুমি, দশভুজা বিধিমতে করিলা বিন্যাস।
লোকে জানাবার জন্য আমারে করিতে ধন্য অবনীতে করিলে প্রকাশ ।।
রাবণে ছাড়িনু আমি, বিনাশ করহ তুমি এত বলি হৈলা অন্তর্ধান ”

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ হল এই সন্ধিপুজো। অষ্টমীতিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীতিথির শুরুর ২৪ মিনিট....এই মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যেই  অনুষ্ঠিত হয়। মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধের সময় দেবী দুর্গার পিছন দিক থেকে আক্রমণ করেছিল দুই ভয়ানক অসুর চন্ড ও মুন্ড। দেবী তখন এক অদ্ভূত রূপ ধারণ করেন। কেশরাজিকে মাথার ওপরে সু-উচ্চ কবরীতে বেঁধে নিয়ে, কপালে প্রজ্জ্বলিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি টিপ ও তিলক এঁকে, গলায় বিশাল মালা ধারণ করে, কানে সোনার কুন্ডল ও হলুদরঙা শাড়িতে নিজেকে সজ্জিত করেন। তাঁর রক্তচক্ষু, লাল জিহ্বা, নীলাভ মুখমন্ডল  এবং ত্রিনয়ন থেকে অগ্নি বর্ষণ করতে থাকেন। ঢাল ও খড়্গ নিয়ে চন্ড ও মুন্ডকে বধ করেছিলেন দেবী এই সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণে।  

সন্ধিপূজার এই মাহেন্দ্রক্ষণে কেউ বলি দেন । কেউ সিঁদুর সিক্ত একমুঠো মাসকলাই বলি দেন । সবকিছুই প্রতিকী । সর্বকালের সর্বক্ষণের দুষ্টের দমন হয় দেবীর দ্বারা । রক্তবীজ অসুর কুল বিনষ্ট হয় । ঢাকের বাদ্যি বেজে ওঠে যুদ্ধজয়ের ভেরীর মত । একশো আট প্রদীপের আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয় ভারতবর্ষের আনাচকানাচ । উত্তিষ্ঠত ভারতবাসীর জাগ্রত মননে দুষ্কৃতের বিনাশিনী এবং সাধুদের পরিত্রাণ কারী মা দুর্গা কান্ডারী হয়ে প্রতিবছর অবতীর্ণ হন মর্ত্যলোকে ।

২০ অক্টো, ২০১৫

মহাসপ্তমীঃ নবপত্রিকা স্নান করায় কেন?


ছোটবেলায় জ্ঞান হবার পর থেকে আমরা সকলেই দুর্গাপুজোর সপ্তমীর ভোরে মহা সমারোহে ঢাকের বাদ্যির সাথে সাথে গঙ্গায় বা নদীতে “কলা-বৌ” স্নান করানোর আয়োজন দেখি । স্নান করিয়ে সেই কলাবৌটিকে নতুন লালপাড় শাড়ি পরিয়ে মাদুর্গার পাশে রাখা হয় এবং পুজোর পাঁচটাদিন পুজো করা হয় ঐ কলাবৌটিকে । বিসর্জনের দিন প্রতিমার সাথে তাকে ও বিসর্জন দেওয়া হয় । ছোটবেলায় প্রশ্ন করলে বলা হত ওটি গণেশের কলা-বৌ । আদতে গণেশ কিন্তু বিয়েই করেন নি ।  মা দুর্গাকেই ঐ রূপে পুজো করা হয় । আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে এই কলাবৌটির পুজোটি এই প্রসঙ্গে যথেষ্ট তাতপর্য পূর্ণ । বেদে আছে ভূমি হল মাতা, মৃত্শক্তি  যা ধারণ করে জীবনদায়িনী উদ্ভিদকে । আযুর্বেদের  ঐতিহ্যবাহী ভারতবর্ষে রোগভোগের প্রাদুর্ভাব ও কিছু কম নয় । এবং মা দুর্গার চিন্ময়ীরূপটি এই কলা-বৌয়ের অবগুন্ঠনেই যে প্রতিস্থাপন করা হয় সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । এই কলাবৌকে বলা হয় নবপত্রিকা । নয়টি প্রাকৃতিক সবুজ শক্তির সঙ্গে আধ্যাত্মিক চেতনশক্তির মিলন হয় দেবীবন্দনায় । সম্বচ্ছর যাতে দেশবাসীর রোগ ভোগ কম থাকে এবং  দেশ যেন সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠে সেই বাসনায় এই নবপত্রিকাকে দুর্গারূপে পুজো করা হয় । ন’টি উদ্ভিদের প্রত্যেকটির গুরুত্ব আছে । প্রত্যেকটি উদ্ভিদ ই দুর্গার এক একটি রূপ এবং তার কারিকাশক্তির অর্থ বহন করে । এরা সমষ্টিগত ভাবে মাদুর্গা বা মহাশক্তির প্রতিনিধি ।  যদিও পত্রিকা শব্দটির অর্থ হল পাতা কিন্তু নবপত্রিকায় নয়টি চারাগাছ থাকে । আবক্ষ অবগুন্ঠনের আড়ালে নববধূর একটি প্রতিমূর্তি কল্পনা করা হয় । বাসন্তী এবং দুর্গা এই দুই পুজোতেই নবপত্রিকা অর্চনার নিয়ম আছে । যে ক’টি চারাগাছের সমষ্টিকে একত্রিত করে অপরাজিতার রজ্জু দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকা তৈরী করা হয় সেই নয়টি উদ্ভিদের নাম শ্লোকাকারে লেখা আছে  আর এই ন’টি গাছের প্রত্যেকের আবার অধিষ্ঠাত্রী দেবী আছেন

রম্ভা, কচ্বী, হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িমৌ। অশোক মানকশ্চৈব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা ।।

অর্থাত

(১) কলা–ব্রহ্মাণী(শক্তিদাত্রী)

(২) কালো কচু– কালিকা (দীর্ঘায়ুদাত্রী)

(৩) হলুদ– ঊমা( বিঘ্ননাশিনী)

(৪) জয়ন্তী–জয়দাত্রি,  কার্তিকী( কীর্তিস্থাপয়িতা )

(৫) বেল–শিবাণী(লোকপ্রিয়া)

(৬) ডালিম–রক্তবীজনাশিনী( শক্তিদাত্রী)

(৭) অশোক–দুর্গা(শোকরহিতা)

(৮) মানকচু– ইন্দ্রাণী( সম্পদদায়ী)

(৯) ধান–মহালক্ষ্মী( প্রাণদায়িনী)

মহাসপ্তমীর সূচনা হয় নবপত্রিকার স্নানপর্ব দিয়ে । নবপত্রিকা দেবীদুর্গার প্রতিনিধি । শ্বেত অপরাজিতা লতা এবং হরিদ্রাক্ত সূতা দিয়ে এই ন’টি উদ্ভিদ একসাথে বেঁধে নদীতে স্নান করানো হয় । দেবীর প্রিয় গাছ বেল বা বিল্ব । নদীতে নবপত্রিকা স্নানের পূর্বে কল্পারম্ভের শুরুতে দেবীর মুখ ধোয়ার জন্য যে দাঁতন কাঠি ব্যাবহৃত হয় তাও আট আঙুল পরিমিত বিল্বকাঠেরই তাছাড়া মন্ত্রে সম্বোধন করে নবপত্রিকাকে দেবীজ্ঞান করা হয় । শস্যোত্পাদনকারিণি দেবী দুর্গা স্বয়ং কুলবৃক্ষদের প্রধান অধিষ্ঠাত্রীদেবতা ও যোগিনীরা দেবীর সহচরী । স্নানান্তে নতুন শাড়ি পরিয়ে তিনটি মঙ্গলঘটে আমপাতা, সিঁদুর স্বস্তিকা এঁকে জল ভরে একসাথে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ, ঘন্টা এবং উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে, মন্ডপে মায়ের মৃন্ময়ীমূর্তির সাথে স্থাপন করা হয় । এই তিনটি ঘটের একটি মাদুর্গার ঘট, একটি গণেশের এবং তৃতীয়টি শান্তির ঘট । নবপত্রিকার পূজা একাধারে কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষের বৃক্ষপূজা অন্যদিকে রোগব্যাধি বিনাশকারী বনৌষধির পূজা । মহাসপ্তমীর ভোরে বিল্ববৃক্ষের পূজা, নবপত্রিকা এবং জলপূর্ণ ঘটস্থাপন এর দ্বারাই দেবীপূজার সূচনালগ্ন ঘোষিত হয় ।


ওঁং চন্ডিকে চল চল চালয় চালয় শীঘ্রং ত্বমন্বিকে পূজালয়ং প্রবিশ।

ওঁং উত্তিষ্ঠ  পত্রিকে দেবী অস্মাকং হিতকারিণি”

 
এঁরাই আবার নবদুর্গা রূপে পূজিতা হ’ন । তাই দুর্গাপূজার মন্ত্রে পাই 


“ওঁ পত্রিকে  নবদুর্গে ত্বং মহাদেব-মনোরমে”

ভবিষ্যপুরাণে পাওয়া যায়.. 

"অথ সপ্তম্যং পত্রিকাপ্রবেশন বিধিঃ" 


নবপত্রিকাকে জনপদে মঙ্গলের দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে পূজা করা হয় । একাধারে এটি কৃষিপ্রধান দেশের চিরাচরিত কৃষিলক্ষ্মী যা প্রাক্‌-আর্যসভ্যতার নিদর্শন অন্যাধারে জীবজগতের কল্যাণকর এই উভিদগুলির রোগনিরাময়ক গুণাবলীর জন্য  বনৌষধিও বটে । তাই এই ন’টি গাছকে অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে দেওয়ার অর্থ হল জনকল্যাণকর এই উদ্ভিদগুলি যেন রোগ-ব্যাধির হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে বা মানুষ যেন এই পুজার মাধ্যমে রোগ ব্যাধিকে জয় করতে পারে ।

১৭ অক্টো, ২০১৫

কাউন্টডাউন ৫ঃ চালচিত্তির আবার কেন?


মাদুর্গার চালচিত্র যেন দুর্গাপূজার অন্যতম অঙ্গ । বহু দেবতার সমাবেশ লক্ষ্য করা যায় এই চালচিত্রে । শিল্পীর রং তুলির টানে এই চালচিত্রের  সুষমা যেন মায়ের মূর্তিকে আরো সম্পূর্ণ এবং উজ্জ্বল করে তোলে । আমরা কেবল দেবী দুর্গাকে সপরিবারে পূজা হতে দেখি কিন্তু আসলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সকল দেবদেবীরাই কিন্তু উপস্থিত থাকেন ঐ চালচিত্রতে ।



  • শিব

দুর্গাপূজা যেন কলিকালের অশ্বমেধ যজ্ঞ । শিব ছাড়া যেমন সকল যজ্ঞ অসম্পূর্ণ তাই মায়ের চালচিত্রের মধ্যমণি হলেন মহাদেব । তিনি যেন এলাহী বৈচিত্রের মাঝে নির্বিকার স্বামীরূপে বিরাজমান । মহামায়া মা দুর্গাকে যেন তিনি সৃষ্টি ও প্রলয়ের ভার দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছেন তাঁর মাথার ওপর । মা অসুর বিনাশ করলে শিবপ্রদত্ত আশীর্বাদে আর তাই আমরা শিবকে বন্দনা করি আর মা এর কারণে প্রসন্ন হন । শিব ও শক্তির সম্মিলিত সত্তায় প্রকৃতির সর্বক্ষণের ভাঙাগড়া অব্যাহত থাকে ।

  • রাইরাজা

চালচিত্রে শিবের ডানদিকে উপবিষ্টা শ্রীরাধা । শক্তিবাদী আরাধনার সাথে সেখানে বৈষ্ণববাদের মেলবন্ধন । বিষ্ণুর শক্তি লক্ষ্মী । শ্রীরামের অবতারে তিনি সীতা আর শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গীনী শ্রীরাধিকা । দেবী-ভাগবতে বলা আছে  যে জগতের উত্পত্তিকালে বিশুদ্ধ শক্তিরূপিণী রাধিকা এবং বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী দুর্গা আবির্ভূতা হন তাই একত্রে এই দুই শক্তিযুগলের আরাধনা একান্ত কর্তব্য ।

  • নারসিংহী

রাইরাজার ডানদিকে নারসিংহী থাকেন ।  অষ্টশক্তির অন্যতম হলেন নারসিংহী । ভগবান শ্রীহরি দেবতাদের কার্যসিদ্ধির জন্য  নৃসিংহ রূপে অবতীর্ণ হয়ে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন । সেই কারণে অসুরগণের বিনাশ ও দেবতাদের কল্যাণার্থে দেবগণের মহাবল শক্তিসমূহ তাদের শরীর থেকে বহির্ভূতা হয়ে নারসিংহী নামক দেবীমূর্তিতে প্রবেশ করে ।  এই দেবীমূর্তি শ্রীচন্ডীর সমীপে উপস্থিত হন । এবং মাদুর্গার সঙ্গে অসুরের যুদ্ধের সময় এই নারসিংহী দুর্গার শরীরে লীন হয়ে যান ও মা’কে  অসুর নিধনের জন্য  আরো শক্তি দান করেন ।

  • রক্তবীজ

নারসিংহীর ডানদিকে আছেন রক্তবীজ । রম্ভাসুরের মৃত্য্র পর তার চিতার আগুণ থেকে এক বিশালাকায় দৈত্য নির্গত হয় যার নাম রক্তবীজ । চন্ডও মুন্ড বধের পর দাবরাজ শুম্ভ মহাসুর রক্তবীজকে বলে মাদুর্গাকে সংহার করতে । রথে আরোহণ করে রক্তবীজ শৈলশিখরে মাদুর্গার কাছাকাছি পৌঁছতেই দেবীদুর্গা শঙ্খধ্বনি করতে লাগলেন । সেই শঙ্খধ্বনিতে রক্তবীজ বিন্দুমাত্র ভীত না হয়ে দেবীর নিকট গিয়ে দেবীকে শুম্ভ অথবা নিশুম্ভকে বিবাহ করতে বলে । দেবী উগ্র থেকে উগ্রতর হয়ে ওঠেন । প্রচ্ন্ড যুদ্ধ হয় দুজনের মধ্যে । পাপমতি রক্তবীজ দেবীর বাণে বিদ্ধ হয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়ে । মূর্ছা ভঙ্গ হলে তার শরীরের প্রতিটি ফোঁটা রক্ত থেকে সেই দানবের অনুরূপ বলশালী দৈত্য উত্পত্তি হয় । শত সহস্র অসুরে ধরিত্রী ছেয়ে যায় । দেবগণ তখন বিপদ দেখে চন্ডিকা রূপিণিদেবীকে বলেন রক্তবীজের দেহনিঃসৃত প্রতিটিরক্তের ফোঁটাকে পান করতে তাহলে দৈত্যের উত্পত্তি রোধ হবে । চামুন্ডারূপিণিদেবী তাই করতে লাগলেন এবং অতঃপর সেই রক্তহীন রক্তবীজকে অস্ত্রাঘাতে নিহত করলেন ।

  • চামুন্ডা

রক্তবীজের ডানদিকে আছেন দেবী চামুন্ডা ধূম্রলোচন বধের পর শুম্ভের আদেশে চন্ড ও মুন্ড পদাতিক, অশ্ব, হস্ত ও রথ এই চতুরঙ্গ সৈন্য সহ দেবীর উদ্দেশ্যে ধাবিত হয় । দেবী ক্রোধে অতিশয় কৃষ্ণবর্ণ হলে তাঁর ললাট থেকে করালবদনা, লোলজিহ্বা কালী নির্গত হন । দেবী কালী চন্ডের মস্তক ছিন্ন করেন এবং পরে মুন্ডকেও অসির আঘাতে বধ করেন । সেই দেখে চন্ডিকাদেবী কালীকে চামুন্ডা রূপে অভিহিত করেন ।  তাই দুর্গার চালচিত্রে চামুন্ডার অবস্থান যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত ।

  • মাহেশ্বরী

চামুন্ডার ডানদিকে আছেন দেবী মাহেশ্বরী ।  অষ্টশক্তির অন্যতমা এই দেবী চতুর্ভুজা, ত্রিনেত্রা, বৃষভারূঢ়া ।

  • ইন্দ্রাণী

মাহেশ্বরীর ডানদিকে আছেন ইন্দ্রাণী ।  তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের পত্নী, ইন্দ্রের শক্তি । গজবাহনা, চতুর্ভুজা, বজ্রধারিণী ।

  • রামচন্দ্র

চালচিত্রে মহাদেবের বাঁদিকে আছেন রামচন্দ্র ।
সীতাহরণের পর রামচন্দ্র বানরসেনাদের সাহায্যে সেতুবন্ধ্ন করে লঙ্কায় হাজির হলেন । ব্রহ্মা তখন রামকে আদেশ করলেন অপরাজিতা দুর্গার পুজো করে জগতের উদ্ধারে নেমে পড়তে । সমগ্র রাক্ষসকুলকে ধ্বংস না করতে পারলে যে ধরিত্রীর নিস্তার নেই । তাই কৃষ্ণপক্ষেই নিদ্রিতা দেবীকে অকালে জাগ্রত করে অকালে অর্থাত শরতকালে (পূর্বে বসন্তকালে শুক্লপক্ষে দেবলোক জাগ্রত অবস্থায় পুজো হত) কাজে নেমে পড়েছিলেন রামচন্দ্র স্বয়ং । তাই তো অকাল বোধন । ব্রহ্মার পরামর্শে দেবী দুর্গার দশভুজা মূর্তি মাটি দিয়ে গড়ে সিংহবাহিনী সেই দেবীর বোধন করেছিলেন ব্রহ্মা স্বয়ং বিল্ব বৃক্ষমূলে । সেই দিনটিই ছিল মহাষষ্ঠী । শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পুজো চলতে লাগল । সপ্তমীর দিন দেবী স্বয়ং রামের ধনুঃশ্বরে প্রবেশ করলেন । অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নিলেন । অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করলেন রামচন্দ্র । নবমীর দিন সীতা উদ্ধার করলেন রাম । আর দশমীর দিন প্রাতে যুদ্ধে জয়লাভের পর দেবীমূর্তি নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে বিসর্জন মন্ত্র পাঠ হল । সেদিন পালিত হল বিজয়া দশমীর বিজয়োত্সব ।


  • জগদ্ধাত্রী

শ্রীরামচন্দ্রের বঁদিকে আছেন দেবী জগদ্ধাত্রী । তিনি মাদুর্গার অন্যতম রূপ । দেবী চতুর্ভুজা এবং কবীন্দ্রাসুর নিসূদিনী । দেবীর সাথে যুদ্ধের সময় মহিষাসুরের ছদ্মরূপ হল কবীন্দ্রাসুর । মা দুর্গা অঘটন পটীয়সী মায়ার বলে মহিষাসুরের আবরণ উন্মোচন করে কবীন্দ্রাসুরের শিরশ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছিলেন ।
  • নিশুম্ভ-শুম্ভ

চালচিত্রে জগদ্ধাত্রীর বাঁদিকে থাকে নিশুম্ভ আর নিশুম্ভের বাঁদিকে থাকে শুম্ভ ।  রক্তবীজ নিহত হবার পর নিশুম্ভ সসৈন্যে দেবীর দিকে তেড়ে যায় ।দেবীর সঙ্গে শুম্ভ ও নিশুম্ভের ভয়ানক যুদ্ধ হয় । দেবী নিশুম্ভকে বাণ দিয়ে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেন । সেই দেখে শুম্ভ কুপিত হয় । তখন দেবী শুম্ভকে শূলের দ্বারা আঘাত করেন । ইতিমধ্যে নিশুম্ভ জ্ঞান ফিরলে বাণ দিয়ে দেবীকে ও বাহন সিংহকে আঘাত করে । তারপর চলে গদাযুদ্ধ । শেষে দেবী চন্ডিকা শূলের দ্বারা নিশুম্ভের হৃদয় বিদীর্ণ করেন ।
শুম্ভকে বধ করতে দেবীর সময় লেগেছিল ।  একসময় শুম্ভ দেবতীর্থ পুষ্করে তপস্যা করে । ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর দান করেন যে কোনো পুরুষের হাতে তোমার মরণ হবেনা । চন্ডিকার সঙ্গে যুদ্ধের সময় শুম্ভ দেবীকে বলেহে উদ্ধত দেবী দুর্গা, তুমি গর্ব কোরোনা । তুমি অন্যান্য দেবীর সাহায্যেই তো যুদ্ধ করছ । সেই শুনে দেবী বলেন,    সমস্ত দেবীর প্রকাশ তাঁর শরীরেই । এরপরেই তিনি যেইমাত্র শুম্ভকে শূল দিয়ে বক্ষে আঘাত করেন সাথে সাথেই শুম্ভর মৃত্যু হয় ।


  • বারাহী

দৈত্যরাজ শুম্ভের বাঁদিকে থাকেন বারাহী । ইনি বরাহ অবতারের শক্তি । বরাহবদনা, কৃষ্ণা, পীতাম্বরী, সালঙ্কারা, বরাভয়, হল ও মুষলধারিণী । ইনিও অষ্টশক্তির এক শক্তি যিনি দাঁত দিয়ে ধরণীকে ধরে রেখে উদ্ধার করেছিলেন ।

  • ব্রহ্মাণী

ইনি ব্রহ্মার সৃষ্টিশক্তি । কমন্ডলুর  মন্ত্রপূত জল কুশ দিয়ে ছিটিয়ে দৈত্যদের হীনবীর্য করেছিলেন । ইনি রক্তবর্ণা, বিশালনয়না, বর ও অভয় মুদ্রাধারিণী, হংসারূঢা ।

  • কাত্যায়নী

দেবী ব্রহ্মাণীর বাঁদিকে আছেন দেবী কাত্যায়নী । তিনি অপরূপা, শান্ত । কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে আশ্বিনমাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে আবির্ভূতা ও পালিতা এই কন্যা দেবতাদের তেজে প্রকাশিত হন ।  তাঁর ত্রিনয়ন থেকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর সৃষ্টি হয়েছিল । তাই সকল প্রকার জাগতিক ও পারমার্থিক বিপদ থেকে রক্ষা পাবার জন্য দেবতারা কাত্যায়নীর সাহায্য নেন ।

এছাড়াও চালচিত্রে রয়েছেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, গণেশ, কার্তিক, সূর্য, চন্দ্র, পবন, ইন্দ্রাদি দেবতারা । নারীশক্তির মধ্যে অন্যতমা কালী, অন্নপূর্ণা, লক্ষ্মী সরস্বতীও আছেন সেই সাথে । সুতরাং চালচিত্রে আঁকা মূর্তিগুলি  যথেষ্ট ইঙ্গিত বহন করে এবং এই মূর্তিগুলির মধ্যে দিয়েই মায়ের সার্বিক শক্তির প্রকাশ ঘটে ।







তথ্যসূত্রঃ
(১) মহিষাসুরমর্দিণী- দুর্গা – স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ
(২)  শারদীয়া সংখ্যা উদ্বোধন ১৪১৮

২২ সেপ, ২০১৫

প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা ২০১৫ আসছে...

সোনারতরী থেকে প্রকাশিত "প্যাপিরাস" ই-পত্রিকার পুজোসংখ্যা আসছে কয়েকদিনের মধ্যেই । "চক্রবৈঠক" এবার জমজমাট আলোচনা নিয়ে। বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত মানুষদের মুক্ত কলমে উঠে আসছে বিতর্ক। "সংস্কার না সংস্কৃতি? কোনটির প্রয়োজন এ যুগে "...তা নিয়ে। আর আছে মেয়েদের লেখা একগুচ্ছ থিম অণুগল্প। বিষয়ঃ দুর্গাপুজো। এছাড়াও থাকছে নিয়মিত বিভাগ স্মৃতিকণা, রম্যরচনা এবং ভিন্নস্বাদের নিবন্ধ।

১৮ সেপ, ২০১৫

জয় বাবা গণেশ !

তিনি হলেন গিয়ে "গণানাং পতি", গণশক্তির প্রতীক, গণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ (গণ+ঈশ)  । বিনায়ক (বি+নী+অক) তাঁর অপর নাম।  প্রমথগণ হলেন শিবের অনুচর এবং সঙ্গী। তাঁরা নাচগানে পারদর্শী । সন্ধ্যার অন্ধকার প্রমথগণের আশ্রয়। বিনায়ক হলেন সেই প্রমথগণের পতি। সন্ধ্যার অধিপতি দেবতা বলে সন্ধ্যারূপিণী লক্ষ্মীদেবীর পাশে গনেশের অবস্থান। ভূতপ্রেতদের দৌরাত্ম্যি ও সকলপ্রকার বাধাবিঘ্ন নাশ করার জন্য প্রমথগণ গণপতিকে সন্তুষ্ট রাখতেন তাই গণপতির অপর নাম বিঘ্নেশ।  তাঁকে পুজো করলে সিদ্ধিলাভ হয় তাই তিনি সিদ্ধিদাতা গণেশ। গ্রীসে ও রোমে গণেশ "জুনো(Juno)" নামে পুজো পান। হিন্দুধর্ম ছাড়া বৌদ্ধধর্মেও গণপতিকে " ওঁ রাগ সিদ্ধি সিদ্ধি সর্বার্থং মে প্রসাদয় প্রসাদয় হুঁ জ জ স্বাহা" মন্ত্রে পুজো করা হয়।  কিন্তু তফাত হল হিন্দুদের গণপতি সিদ্ধিদাতা আর বৌদ্ধদের সিদ্ধিনাশক যা সম্পূর্ণ বিপরীত। হিন্দুদের দেবী অপরাজিতা মা দুর্গার ডানদিকে থাকেন গণপতি। কিন্তু মহাযানী বৌদ্ধদের অপরাজিতা দেবীর সাধনায় লক্ষ্য করা যায় গণপতি চিরবিঘ্ন প্রদায়ক। সেখানে দেবীর বাঁ পা  গণেশের উরুতে আর ডান পা ইন্দ্রের ওপরে ন্যস্ত। বিনায়ক দেবীর পদভারে আক্রান্ত। আবার পুরাণের মতে গণেশ কেবলমাত্র শিব-দুর্গার পুত্ররূপে পরিচিত। বহুযুগ আগে সমাজে দুধরণের সম্প্রদায় ছিল যাঁরা দুটি ভিন্ন মতবাদে গণেশের পূজা করত। একদল নাগ-উপাসক ছিল তাই গণেশের গলায় যে যজ্ঞ-উপবীত বা পৈতেটি রয়েছে সেটি নাগোপবীত তথা নাগের অলঙ্কারের পরিচায়ক। আর অন্য সম্প্রদায় আবার স্কন্দ বা কার্তিকের পূজারী। তারা নাগ-উপাসনার বিরোধী হয়ে কার্তিকের বাহন ময়ূরকেই বেশী প্রাধান্য দিত । ময়ূর হল নাগেদের শত্রু।
বর্তমান দুর্গাপুজোতে আমরা মা দুর্গার দুই পাশে কার্তিক ও গণেশ উভয়েরি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান লক্ষ্য করি। অর্থাত নাগ-উপবীতধারী গণেশও র‌ইলেন আবার ময়ূরবাহন কার্তিকও র‌ইলেন।  আর সেই রূপটি‌ই সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে আজো সমাদৃত।  
ছবিঃ রুচিরা চ্যাটার্জি 
মা দুর্গা  একদিন কৈলাসে বসে স্নানের পূর্বে তেলহলুদ মেখে গাত্রমার্জণা করছিলেন। মায়ের দুই সহচরী  জয়া-বিজয়া কাঁচা হলুদ বেটে তার মধ্যে সরষের তেল দিয়ে মায়ের সর্বাঙ্গে  মাখিয়ে দিতে ব্যস্ত। মা সেই আরাম পাবেন কি, মনে তাঁর খুব দুঃখ। মহাদেব কত নারীকে পুত্র দিয়ে তাদের আকাঙ্খা পূর্ণ করেন আর দুর্গাই স্বপুত্র থেকে বঞ্চিত। কার্তিককে পেয়েছেন যদিও কিন্তু সে তো তাঁর গর্ভের নয়। সে শিবের ঔরসজাত, গঙ্গার কানীনপুত্র আর ছয় কৃত্তিকার দ্বারা পালিত।  গাত্রমার্জণা শেষের দিকে। মা জয়া-বিজয়াকে বললেন, তোরা যা দেখি একটু ওদিকে, বাবার সাথে আমাকে একটু একা থাকতে দে। মা নিজের তেলহলুদ মাখা গায়ের ময়লাগুলি তুলতে তুলতে মহাদেবকে বলেই ফেললেন" আজ আমার একটা ছেলে থাকলে..." মহাদেব বললেন, তুমি ত্রিলোকের যত পুত্রসন্তান আছে তাদের সকলেরি মা"  মা বললেন,"তবুও, একটুতো দুঃখ হয়, বুঝলেনা" মহাদেব বললেন" কত ঝামেলা করে চন্দ্রলোক থেকে কৃত্তিকাদের অমতেও কার্তিককে এনে দিলাম তাও তোমার দুঃখ ঘুচলোনা?"  মা বললেন " ঠিক আছে আর বলবনা" বলতে বলতে নিজের গায়ের ময়লাগুলি তুলে তুলে মাটিতে ফেলছিলেন মনের দুঃখে। হঠাত তাঁর কি মনে হল, সেই ময়লাগুলি দিয়ে একটি পুতুল গড়ে ফেললেন মাদুর্গা। নারায়ণ সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ঐ পুতুলের মধ্যে সূক্ষ্ম শরীরে প্রবেশ করা মাত্র‌ই পুতুলটি প্রাণ পেল আর মাদুর্গাকে "মা, মা" বলে ডেকে উঠল। মায়ের বুকের ওপরে উঠে তাঁর দুধ খেতে শুরু করে দিল। দুর্গা আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেই ছেলেকে কোলে নিলেন। মহাদেব আবার কার্তিককে এনে তাঁর আরেক কোলে দিলেন। । এবার কৈলাসে মহাভোজ। দুর্গার সুখ আর দ্যাখে কে! দুই পুত্র নিয়ে, দুই কন্যা নিয়ে সুখের সংসার শিব-দুর্গার। কৈলাসের সেই মহাভোজে সব দেবতারা নিমন্ত্রিত হলেন। সকলেই নির্ধারিত দিনে এলেন কেবল শনি মহারাজ ছাড়া। শিব ক্ষুণ্ণ হলেন শনি না আসায়। শনি সম্পর্কে দুর্গার ভাই।  একবার দুর্গা শনিকে বর দিয়েছিলেন, সে যার দিকে চাইবে সাথে সাথে তার মাথাটা খসে পড়বে। মহাদেবের অসন্তোষের কারণে সেদিন শনি অবশেষে দুচোখ হাত দিয়ে ঢেকে প্রবেশ করলেন। এদিকে মহাদেব তো আর সেকথা জানেননা। তাঁদের ছেলেকে দেখছেন না শনি, সেও তো এক অপমানের বিষয়। শনি বাধ্য হয়ে  চোখ খুলে সেই ছেলের দিকে চাইতেই ছেলের মুন্ডুটি খসে পড়ে গেল মাটিতে। মাদুর্গা কাঁদতে লাগলেন। 
দুর্গা নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল দেবতারা বিচলিত হয়ে পড়লেন। তাঁদের আদেশে মহাদেব নন্দীকে বললেন ত্রিভুবন ঘুরে উত্তরদিকে শয়নরত যে কোনো ব্যক্তির মুন্ডটা কেটে আনতে। নন্দী বেরিয়ে পড়ল। স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ঘুরে দেখতে পেল উত্তরদিকে মাথা করে একটা সাদা হাতি শুয়ে আছে।  সেই হাতীর মাথাটা কেটে এনে সে মহাদেবের কাছে নিয়ে এল। মহাদেব তখুনি মাথাটা ছেলের কাঁধে জোড়া দিলেন ছেলে আবার মা, মা করে ডাকতে শুরু করে দিল। মা দুর্গার একাধারে মা ডাক শুনে আনন্দ হল আবার অন্যথায় ছেলের হাতীর মাথা দেখে দুঃখে প্রাণ কেঁদে উঠল। তাঁর দুঃখ দেখে দেবতারা বললেন, মা তুমি দুঃখ কোরোনা, তোমার এই ছেলের নাম দিলাম গণপতি। সকল দেবতার পুজোর আগে এঁর পুজো হবে সর্বাগ্রে।  মা দুর্গা ছেলের এই সম্মানে গর্বিত হলেন।আর মর্ত্যলোকে  ভাদ্রমাসের শুক্লা চতুর্থীতে গণেশের জন্মদিন পালন করা হয়।   

১৭ সেপ, ২০১৫

হ্যাপি কন্যা সংক্রান্তি!


তিনি সব্বোঘটে ক্যাঁটালি কলা। তিনি সব কাজ করতে পারেন। তিনি জ্যাক অফ অল ট্রেডস আবার মাষ্টার অফ অল ও। সবেতেই পারদর্শী।  তিনি একাধারে আর্কিটেক্ট অন্যধারে প্রোমোটার। একাধারে ইঞ্জিনিয়ার অন্যদিকে কার্পেন্টার। আবার তিনি নাকি ছিলেন ফ্যাশান কাম জুয়েলারি ডিজাইনার । তাঁর আবার অস্ত্রশস্ত্র বানানোর ফ্যাক্টরিও আছে। তাই বুঝি তিনি দেবলোকের স্থপতি, কারিগর, শিল্পী। মর্ত্যে যাকে বলে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার  কিম্বা ওয়েল্ডার, বা আর্কিটেক্ট বা পাতি মিস্ত্রী।  সমুদ্রমন্থনের একটি অনবদ্য ফলস্বরূপ তাঁর জন্ম।  সত্যযুগে যিনি স্বর্গ, ত্রেতায় লঙ্কাপুরী, দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী দ্বারকা ও পান্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থের রাজধানী নির্মাণ করেছিল। তিনি যেন ত্রিযুগের পারদর্শী এক স্থপতি।   প্রতিবছর ১৭ই সেপ্টেম্বর তাঁর পুজো হয়। কেন হয়? সেদিন নাকি তাঁর জন্মদিন। বিশ্বকর্মাজয়ন্তী বলে অন্য প্রদেশে।  একাধারে তিনি ডিজাইনার আবার একাধারে তিনি  স্থপতি। দেবতাদের রথ থেকে অস্ত্রশস্ত্র, অলঙ্কার থেকে নানাবিধ ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পের প্রস্তুতকারক।  বিশ্বকর্মার চারহাতের একটিতে জলভর্তি কমন্ডলু, অন্যহাতে কুঠার। অপরদুটি হাতে ফাঁসযুক্ত দড়ি এবং ব‌ই থাকে।  ঠিক যেমন বাস্তব জগতের মিস্ত্রির মত।  পুরাণের মতে বাস্তু হল বিশ্বকর্মার পিতা।   প্রতিবছর কন্যাসংক্রান্তির দিনে, ১৭ই সেপ্টেম্বর বা ভাদ্রমাসের শেষদিনে তাঁর পুজো হয়। সূর্য সেইদিন থেকে কন্যারাশিতে গমন করে তাই এই সংক্রান্তির অপর নাম কন্যাসংক্রান্তি। 
বেদে বলা হয়, বিষ্ণুর সুদর্শণ চক্র, মহাদেবের ত্রিশূল, দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্র এবং পুষ্পক রথ তিনি বানিয়েছিলেন। সীতার স্বয়ংবর সভায় যে বিশাল ধনুকটিতে জ্যা পরিয়ে ধনুকটি ভঙ্গ করে  রামচন্দ্র সীতাকে পেয়েছিলেন সেই  হরধনুটিও বিশ্বকর্মার হাতে তৈরী।  


 দক্ষিণবঙ্গে বর্ষার পরে  সরীসৃপের বাড়বাড়ন্ত হয়। জলে জঙ্গলে মানুষদের কাল কাটানো, বিশেষতঃ সাপখোপেদের সাথে তাদের অহোরাত্র ওঠাবসা। একটু অসতর্ক হলেই বনে জঙ্গলে সাপেকাটার খবর। তাই বর্ষা গিয়ে ভাদ্রের জল থৈ থৈ গ্রামবাংলায় শরতের নীল আকাশের আবাহনে আগমনীর সুর যেন সবে শুনতে পায় গ্রামবাসীরা। ভাদ্রমাসের সংক্রান্তিতে তারা করে রান্না পুজো। রাঁধে ভাদ্রের শেষ দিনে। আর সেই বাসি খাবার খায় আশ্বিনের প্রথমদিনে। তাদের বিশ্বাস তাদের প্রত্যেকের ঘরের নীচে যে বাস্তুসাপ আছে , যে সারাবছর তাদের বালবাচ্ছাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, যার নজরদারিতে তারা সম্বচ্ছর বেঁচেবর্তে রয়েছে তাকে এবছরের একটা দিন মনে করে পুজো করা। সাপেদের দেবী মা মনসার পুজো এটাই। মা মনসা তুষ্ট করলে তবেই সাপেরা উত্পাত করবেনা। এই তাদের বিশ্বাস। গোবরছড়া দিয়ে রান্নাঘর, উঠোন নিকিয়ে, শুকনো করে,  ধোয়ামোছা করে, ঘর রং করে ষোড়শ উপচারে সংক্রান্তির দিন রাতে তারা নতুন উনুনে রান্না করে। 
ভাত, তরকারি, ডাল চচ্চড়ি, কচুশাক, ইলিশমাছ, চিংড়িমাছ, চালতার টক, পাঁচ রকম ভাজা, আবার পিঠেপুলি, পায়েস...সব রেঁধে বেড়ে মনসাদেবীকে উত্সর্গ করে তারপর দিন সব ঠান্ডা খাবে তারা। যদি রান্নাবান্নায় কোনো অসংগতি থাকে কিম্বা পরিচ্ছন্নতায় দোষত্রুটি থাকে তবে ঐ দিন মনসাদেবী সাপকে পাঠিয়ে সব খাবার বিষাক্ত করে দেন তাই দক্ষিণবাংলার মানুষদের এই পুজোতে নিষ্ঠা চোখে দেখবার মত।
তারা কাঁটা মনসার ঝোঁপেঝাড়ে এখনো রেখে আসে দুধের বাটি আর কলা। সাথে কিছু রান্নাপুজোর ভোগদ্রব্য।   দক্ষিণবঙ্গের মেয়েরা অনেকে আজো বলে আন্নাপুজো। তারা "র" উচ্চারণে অক্ষম। তারা বলে আন্নাপুজোয় পান্না খাওয়া। পান্না হল পান্তাভাত।  ভাদ্রের পচা গরমে কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি। তাই বাসিভাতে ঠান্ডা জল ঢেলে রাখার রেওয়াজ। পরদিন ভাত টাটকা থাকবে। আর এই পান্তাও নাকি খুব স্বাস্থ্যকর।  সাথে কেউ রাঁধে ডালবড়া, মাছভাজা। কেউ উচ্ছেচিংড়ি, গাঁটিকচুর দম। কেউ আবার মহা উদ্যমে রাঁধে  ঘেঁটুফুল ও কচুপাতা বাটা, নারকোল কোরা, সর্ষে-বাটা আর সর্ষের তেল দিয়ে মাখা,  সর্ষে দিয়ে কচুর লতি আর শাপলা ডাঁটার ডাল ।  তবে ডালচচ্চড়ি, কচুরশাক, ইলিশ-চিংড়ি রাঁধতেই হয়। আর অগাধ বিশ্বাস নিয়ে তারা সেই পঞ্চ ব্যঞ্জন নিবেদন করে মনসা ঠাকুরাণী আর তাঁর চ্যালা নাগনাগিনীদের।     
বিশ্বকর্মাপুজোর দিনে এই উত্সবকে বলা হয় অরন্ধন বা রান্না পুজো।  


এই বিশ্বকর্মা তথা মনসাপুজোর পর আমাদের আর কোনো উত্সব নেই। আবার সেই শরত্কালের দুর্গোত্সব হবে মহালয়ার পর, সুপর্বে।  তখন হবে সুসময়, পুণ্যকাল। আমাদের পরবের দিন শুরু হবে। তাই তো মাদুর্গার অরেক নাম "সুপর্বা"। তাই বুঝি আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, বিশ্বকর্মা পুজো শেষ হল মানেই দুর্গাপুজোর ধুম লেগে গেল হৃদিকমলে। আর হিন্দুদের এই পরব চলবে চৈত্রের সংক্রান্তিতে চড়কপুজো অবধি । পুরণো বছর চলে যাবে আবার নতুন বাংলা সন পড়বে তারপর। 
 
 এই দিনে বাংলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উত্সব হল ঘুড়ি উত্সব। সব কলকারখানা বন্ধ বিশ্বকর্মা পুজোর কারণে। সব যন্ত্রপাতি ধোয়া মোছা করে তাদের সম্বচ্ছরি বিশ্রাম ঐদিন। আর তাই বুঝি সেই আনন্দযজ্ঞে মেতে ওঠে ছোটবড় সকলেই। অনাবিল আনন্দ। অফুরন্ত সময় ঘুড়ি ওড়ানোর। শরতের নীল, মেঘমুক্ত আকাশে রং বেরংয়ের ঘুড়ি আর ঘুড়ি। কত রকমের নাম তাদের। কত রং তাদের।  দুদিন আগে থেকে ঘুড়ি তৈরী আর সেই সাথে ঘুড়ি ওড়ানোর সূতোয় মাঞ্জা দেওয়া। কাঁচের গুঁড়োর সাথে গদের আঠা মিশিয়ে কড়কড়ে করে সেই মিশ্রণ সূতোয় লাগানো। এ প্রান্তে একটা গাছের গুঁড়িতে সুতো বেঁধে ও প্রান্তে আরেকটা গাছের গায়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পাক দিয়ে সুতোয় মাঞ্জা দেবার পালা। তারপর সেই সুতো গুটিয়ে নেওয়া কাঠের লাটাইয়ে। রান্নাবান্না বন্ধ। মেয়েদের আজ জিরেন। আর ছেলেদের মনের সুখে ঘুড়ি ওড়ানো। নীল আকাশে ঘুড়ির মেলা। আর এ পাড়ার টুবলুর দল ও পাড়ার বাপ্পার দল। কে কাকে কাটবে আজ? অসীম আকাশে উভয়েরি ঘুড়ির রাজ্যপাট । কে কার এক্তিয়ার অতিক্রম করে কাকে কাটতে পারে সেই হল গোল। একবার কাটতে পারলেই চীতকার..."ভোকাট্টা....দুয়ো, দুয়ো" আর সাথে সাথেই যারা অন্যপক্ষের ঘুড়ি কাটলো তাদের বাঁশী, কাঁসি, ঢাক, ঢোল পিটিয়ে প্রতিপক্ষকে হিউমিলিয়েট করা। সেই ফাঁকে মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় হাত কেটে রক্তারক্তি। রোদ্দুরে ঘুড়ি উড়িয়ে ছাদ থেকে তরতর করে নেমে গিয়ে ঠান্ডা জলে ঢকঢক। ব্যাস্! সর্দ্দিগর্মি। মায়ের বকুনি। পেটকাটি,  চাঁদিয়াল, একতে, দোতে, বাতিয়াল,  ঘয়লা, ময়ূরপঙ্খী,  শতরঞ্চি,  বামুনপেড়ে,
রসোগোল্লা,  মুখপোড়া, চৌখোপ্পি, জয়হিন্দ...   আরো কত নাম সব ঘুড়ির।  আর আছে হরেক কিসিমের ঘুড়ির সুতো.. ডেক্রণ, স্পেকট্রা, ডিকট। কাজ সকলের এক‌ই কিন্তু  কোন্‌ ঘুড়ি যে কাকে কাটবে ঐদিনে আর কার সুতোয় যে কত জোর অথবা পাড়ার কোন ছেলে সেদিন সবচেয়ে বেশী ঘুড়ি কাটবে আর গলা ফাটিয়ে তার বন্ধুরা তার জন্য চীতকার করবে তা ছিল দেখার মত।  
মফঃস্বলে আজো দেখি ঘুড়ির দোকান।  কিন্তু নিজের বাড়ির ছাদ তো অপ্রতুল শহরে। তাই শহুরে ছেলেপুলেদের ঘুড়ি ওড়ানোয় সেই মাদকতা চোখে পড়েনা। ঘুড়ির পাতলা, ফিনফিনে রঙীন কাগজের বদলে এখন পলিথিন হয়েছে ঘুড়ির অঙ্গশোভা। আজ সে আমাকে তেমন করে টানেওনা। আর শহরের হাইরাইজের ছেলেপুলের এখন সময়‌ই বা কোথায় ঘুড়ি ওড়ানোর? সব ফ্ল্যাটবাড়ির ছেলেরা তো একত্র হয়ে মেতে উঠতেই পারে এই ঘুড়ি উত্সবে??

১৩ সেপ, ২০১৫

মনসুন মোমেন্টস-২


ভেজা টাওয়েলটা আবার বিছানার ওপর রেখেছিস? ….সরি মা! তুমি তো আছো তাই।
দাদাই বলল, পরের বারে এসে হয়ত আমার সাথে আর দেখাই হবেনা তোর।.... ধুস্! দাদাই! কি যে বলো! 
দিদা বলল, আর কি পরের বার তোকে নিজের হাতে মাংস রেঁধে খাওয়াতে পারব? ….ঠিক পারবে দিদা। 
ঠাম্মা বলল, কি রে আরেকবার আজ দেশপ্রিয় পার্ক খেলনার দোকানে যাবি নাকি? হট-হুইলসের গাড়ি কিনতে? ….এখন আর অত ছোট্ট গাড়িতে হবেনা ঠাম্মা। রিয়েল মডেল চাই ফর্মুলা ওয়ান কারের।  

.....আইনক্সের সেই মুভিটা? মানিস্কোয়ারের সেই আইসক্রিমটা? গড়িয়াহাটের মোড়ের সেই রোলকর্ণার? মনে পড়ছে কি তোমার বলো? বলো? চুপ করে আছো কেনো মা? নিউমার্কেট যাবে যে বলেছিলে? সেই কত কত ফেক ঘড়ি ছিল ! পার্কস্ট্রীটের চেলো কাবাবটা খাওয়ানো হলনা তোমাকে আজো! প্রিয়ার কাছে সেই দুপুরগুলো? তুমি ফুটপাথী মোমো খেতে দিতেনা, বলতে বানিয়ে দেবো। মায়ের কেবিনের চপ আজো খাওয়া হলনা আমাদের্! এখনো ফুটপাথে বিরিয়ানির হাঁড়িগুলো বসানো থাকে মা? কি উগ্র গন্ধ বেরোয় আশপাশ থেকে। 
….
তোমাদের ধর্মের সংজ্ঞাটা আজো ক্লিয়ার না আমার কাছে। জানো মা ? আজ আমাদের দেশে এত রেপ হয় কেন?
এই তোমাদের মত অর্থডক্স যারা সংস্কারের বশে হাত ধুয়ে পুজো করো, পুজোর ফুল মাথায় ঠেকাও তাদের জন্য। মেয়েদের জন্যে যারা একটুও ভাবোনা তাদের জন্যে।  ঠাম্মা-দিদাই তো বলে ফুলো লুচিগুলো আমার পাতে দিতে। আর তোমরা সব মিয়োনো, ন্যাতন্যাতে, পোড়াগুলো নাও নিজেদের পাতে। ছেলেদের উচ্চাসনে বসিয়ে কি লাভ মা? সমান করতে শিখলেনা আজো? আমের আঁটিটা তুমি‌ই কেন খাবে? বাবার পাতে কেন দেবেনা মা? মেয়েদের এত নীচু করে রেখে আসার মাশুল দাও এবার। 
….
মা, আবার তুমি আজ সেই চিকেনটা বানিয়েছো? জিও! বেশী রুটি করেছ তো ?   
মা, জিনসের এই বাটনটা  একটু সেলাই করে দিও প্লিজ! কতবার বললাম এই নিয়ে!
ঘুম থেকে উঠবনা, ব্যাস্! আজ রোববার! আজ দেরী করব‌ই।
মা, রান্নার মাসী আসেনিতো কি? আজ তাহলে রান্না কোরোনা। কাবাব খেতে যাব চলো। প্লিজ মা, কাবাব এন্ড বিয়ার !!!
ফাটাফাটি হয়েছিল কালরাতের  পুডিংটা। আবার বানিও। ওজন বাড়ছে বাড়ুক, নো চাপ! চিল, চিল! কুল, কুল!
….
এই উইকএন্ডে তবে শান্তিনিকেতন ফাইনাল তো ?... ইয়েস!
মা শুনেছো? ইউটিউবে শানের রবীন্দ্রসংগীত! হোয়াট এন ইম্প্রোভাইজেশান! কর্ডগুলো ফলো করলে? এই নেক্সট উইকেন্ডে কিন্তু উইকেন্ডার কলকাতায়। ফসিলস থাকছে। যাবে তুমি?
নজরুল মঞ্চে ইন্দ্রায়ুধের বাবা তেজেন্দ্র নারায়ণ আছেন, সাথে জাকির হোসেনের তবলা। যাবে তো ? 
ঐ দ্যাখো মা, আমার সেন্ট জেভিয়ার্সের বন্ধু কবীর তোমার তারা মিউজিকে পারফর্ম করছে!
….
মা, রান্নার মাসীরো তো ছুটির দরকার আছে? সপ্তায় সাতদিন তোমার ছেলে যদি কাজ করত?
চিনি-দুধ না দিয়ে ঐ অখাদ্য চা যে তোমরা কি করে খাও?  
আমার ডিমের পোচে "মোলগরিচ" মাস্ট কিন্তু!    
….
 বিয়েবাড়ি থেকে ফিরে বাড়ির মেয়েরা বলাবলি করছিলাম "বৌ কিন্তু বেশ ময়লা। রং টা আমাদের বাড়ির মতো নয়" ব্যস! ঝাড় খেলাম সক্কলে ছেলের কাছে।
আচ্ছা মা গায়ের "কমপ্লেকশান"টা কি  মেয়েটার দোষ? গায়ের ওপরে কি কোনো ট্যাগ লাগানো থাকে? "ফর্সা", "কালো" এইসব? তোমরা কতবড়ো হিপোক্রিট বলো! মাকালীর পুজো করো আবার কালো বৌ বাড়িতে এলে ক্রিটিসাইজ করো! 
….
অবশেষে ভরে গেল তার স্ট্রলি ব্যাগ। মামা-মামীর আদরে উপচে পড়া সেই হাসিটা ডোরবেল শুনে দৌড়ে গিয়ে রিসিভ করতেই থাকল সুদূর ব্যাঙ্গালোর থেকে পাঠানো  একের পর এক গিফ্ট...পারকার পেন, টাই, লেদার ওয়ালেট, ফার্ষ্টট্র্যাক ঘড়ি ....মায়ের চুপিচুপি ওয়েষ্টসাইডে গিয়ে  কিনে আনা পুজোর জামা, টিশার্ট- ব্লু জিন্স, মোজা, রুমাল, ভেস্ট, ড্রয়ার, ট্র্যাকস্যুটস, মেডিসিন, আর বাবার  ওয়ালেটে পড়ে থাকা কিছু খুচরো ডলার নোটস। ঠাকুমা, দাদু-দিদারা আলমারী ঘেঁটে আরো কয়েকটা ছোট নোট।
…..
মামাদাদুর ওভারকোর্টটাই নেব আমি। ড্রাই ক্লিন করিয়ে দাও। ওটা উইসকনসিন থেকে এবার ফিলি যাবে আমার সাথে।  তনুমা লাস্ট-ইয়ার  পুজোতে যে ব্লু শার্টটা দিয়েছিল? আর সেই ফুলস্লিভ রেড গেঞ্জীটা? দিয়েছো তো মা? 
….
ঠাম্মা, আজ বাজারে তপসে মাছ পেলে নাকি?  মৌরলাটা পেলেও এনো প্লিজ!
দিদা, তোমার সব লুচিগুলো গোল হয় কি করে? 
দাদাই,  তুমি তো কানে শুনতে পাবেনা, বরং আবার বলো সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের গল্পগুলো। 
কাজের মেয়ে বলে, ও বৌদি, খুব ভালো করে উজালা দিয়ে দিলাম গেঞ্জীগুলোতে....ওখানে বেচারার কি হবে কে জানে?
রান্নার মাসী বললে, ও দিদি? ওকে সহজে চিকেন স্ট্যু-টা শিখিয়ে দি চলো।
বাবু, কিচেনে ঢোকার আগে হাতটা ওয়াশ করে নিস। কুকিং রেঞ্জে হাত দেবার আগে গ্লাভস পরে নিস।  কি যে করবি তুই একা একা!  বাবু, ওখানে একটা মিক্সার-গ্রাইন্ডার কিনে নিস কিন্তু। মাসী নেই যে শিলে তোর মাংসের মশলা বেটে দেবে। 
দ্যাখ, এমনি করে স্ক্রেপার নিয়ে আলু ছাড়িয়ে, চপিং বোর্ডে রেখে তারপর ছুরি দিয়ে.....ব্যাস, ব্যাস! আর বলতে হবেনা মা, তোমার রান্নার ব‌ইটাতে এসব আছে তো ?
আমি বললাম, ধুস্! সেখানে তো শুধুই রেসিপি! এগুলো আস্তে আস্তে শিখে যাবি দেখিস!দেখিস বাবা হাতটা কেটে ফেলিসনি যেন! তুই যা ধড়পড়ে!  
আর তোমার সেই প্রেসারকুকারে ফেমাস চিকেন বিরিয়ানির রেসিপি? ওটাতো লাইফসেভার, মামু বলেছিল ফার্গোতে পৌঁছেই। 

সত্যি খুব ইজিরে ওটা। সকালবেলা কলেজ যাবার আগে চিকেনটা মশলাপাতি দিয়ে ম্যারিনেট করে, ইয়োগার্টে ভিজিয়ে ফ্রিজে রেখে দিবি।  সন্ধ্যেবেলা ঘরে এসেই প্রেসারকুকারে রিফাইন্ড তেলে গরমমশলা, আলু, পেঁয়াজটা বাসমতী চালের সাথে ভেজে নিয়ে চিকেনটা দিয়েই একটা সিটি ব্যাস! আর্সেনালের ম্যাচ আর আর্সেলানের বিরিয়ানি জমে দৈ এক্কেরে! ও হ্যাঁ, জলটা দিবি ডাবল অফ রাইসের একটু কম।
মা আমার দ্বারা এত্তসব হবেনা। ঠিক হবে দেখিস! একদিন বানিয়ে দু দিন খাবি। আর খিচুড়ি, ফ্যানেভাতে, ডাল সেদ্ধ, ওমলেট, আলুভাজা তো এতবার শেখালাম।