২ অক্টো, ২০১৭

ধান্যলক্ষ্মী বা ধনলক্ষ্মী কোজাগরী


এইসময়, ২রা অক্টোবর ২০১৭


দুর্গা পুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই ধুমধাম করে আশ্বিনমাসের পূর্ণিমাতে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর রীতি মূলত পূর্ববাংলার মানুষদের। তবে এখনো বর্ধমানের ঘরে ঘরে এই পুজো লক্ষ্য করা যায়। কারণ দেশভাগের পর বহু মানুষ বর্ধমান জেলাতেও এসে ঘর বেঁধেছিলেন।এঁরা কেউ মাটীর সরায় রঙীন লক্ষ্মী মূর্তি এঁকে অথবা কেউ মাটীর প্রতিমা এনে পুজো করেন ঘরেই। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলার ব্রত ব‌ইতে আছে, দেবীর কাছে খেতের ভাল ফলনের আশায় মানুষ পুজো দেয়। বর্ধমান জেলাটি আমাদের রাজ্যের শস্যভান্ডার। তাই কোজাগরী পুজোর উপাচার হিসেবে ফলমিষ্টি ছাড়াও ধানজাত দ্রব্যাদি অর্থাত খ‌ই, চিঁড়ে, মুড়কি, মুড়ি ইত্যাদির মোয়া অবশ্য‌ই নিবেদিত হয়। তাই কোজগরী লক্ষ্মী পুজো বর্ধমনের এই লৌকিক কৃষি উত্সবও বটে। আকাশে পূর্ণচাঁদের রূপোলী জ্যোত্স্নায় ঘরে ঘরে সোনার ধানের গোলা। তাই সম্বচ্ছর যেন ধনের ফলন নিয়ে গৃহস্থ কে চিন্তা করতে না হয়, তাদের পরিবার যেন থাকে দুধেভাতে। আউস ধানে পরিপূর্ণ মাঠঘাট। লক্ষ্মী তাদের ধান্য তথা ধনদেবী।

মানুষের বিশ্বাস কোজাগরীর রাতে ঘুমোনো চলবেনা। তাহলেই লক্ষ্মী তাকে ছেড়ে চলে যাবে। মা লক্ষ্মীর হাতে ধানের শীষের গুচ্ছ। চৌকাঠে পিটুলিগোলার আলপনা, সারা বাড়ীময় লক্ষ্মীর পদচিহ্ন এই বিশ্বাসে...তিনি ঠিক আসবেন প্রত্যেক ব্রতীর ঘরে। পুরাণে বলে সমুদ্রমন্থনের সময় ক্ষীরসাগর থেকে পদ্মফুল হাতে লক্ষ্মীদেবী‌ই উঠে এসেছিলেন হাতে রাশিরাশি সোনাদানা, মণিমাণিক্য নিয়ে।
সমুদ্রমন্থনের সময় উঠে এসেছিলেন বলে লক্ষ্মীর অপর নাম সমুদ্রকন্যা। কেউ আবার ডাকে ভূদেবী অর্থাত সারা পৃথিবীর, সমগ্র প্রকৃতির পালনকর্ত্রীরূপে।
শারদপূর্ণিমা তাঁর যে ভীষণ প্রিয়। আশ্বিনের এই পূর্ণিমার সময় বর্ষা ঋতু ফিরে যায় একবছরের মত। মৌসুমীবায়ু বিদায় নেয়। শস্যশ্যামলা মাটি থেকে সোনা রঙের নতুন আউস ধানের গন্ধ ওঠে। ভক্তের ঘরে পরব আর লক্ষ্মী তখন কোজাগরী। এটি তাঁর কৌমুদী-উত্সব। চাঁদের আলোয় তখন রাত পরিক্রমার শুরু। কোজাগরী হয়ে তিনি নজর রাখেন কে তাঁকে চায়। কে তাঁর পালন করে। কে তাঁকে বেঁধে রাখে আজীবন।
অবনীন্দ্রনাথের মতে কোজাগরী লক্ষ্মী হলেন আদিম অনার্য লক্ষ্মী। আর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর ব্রত কথাটিও সেই অনার্যা কন্যা কে ঘিরেই।
উজ্জয়িনীর এক ধার্মিক রাজা তাঁর প্রজাপালনের জন্য খুব সুখে কাল যাপন করতেন। একবার তিনি ঢেঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে দিলেন যে তাঁর রাজ্যের হাটে কোনো অবিক্রিত জিনিষ যেন না পাড়ে থাকে। দিনের শেষে তিনি‌ই সেই জিনিষটি কিনে নেবেন দোকানীর কাছ থেকে। রটে গেল খবর। জানা গেল এক কামারের কাছে এক ভয়ানক চেহারার বিশ্রী নারীমূর্তি পড়ে রয়েছে। কামারকে জিগেস করতেই সে বলল, মহারাজ এটি নাকি অলক্ষ্মী মূর্তি তাই কেউ কিনতে চাইছেনা। মহারাজ বললেন, তিনি যখন কথা দিয়েছেন তখন সেটি কিনে নিয়েই বাড়ি ফিরবেন। নয়ত অধার্মিক রাজা হিসেবে তাঁকে রাজ্যের মানুষ চিনে যাবে। রাজা অগত্যা সেই লোহার মূর্তিটি কিনে এনে নিজের ঠাকুরবাড়িতে তাকে আশ্রয় দিলেন। মাঝরাতে নিজের রাজপুরীর মধ্যে মেয়েলি কান্নার কন্ঠস্বর শুনে রাজা দেখতে পেলেন এক ক্রন্দনরতা নারীমূর্তিকে।
রাজা তাকে জিগেস করলেন "তুমি কাঁদছো কেন মা?'
সেই নারী বললে," মহারাজ, আমি আপনার রাজলক্ষ্মী, আজ আপনার বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি'
রাজা বললেন, কেন মা? আমি কি অন্যায় করেছি? জানতে পারি?'
সেই নারীমূর্তি বললে," আপনি রাজবাড়িতে অলক্ষ্মীকে ঠাঁই দিয়েছেন। অতএব আমি আর এখানে থাকতে পারবনা।' এই বলে তিনি অন্তর্হিতা হলেন। আবার কিছুপরে রাজা দেখলেন আরেক সুন্দরী, সুশীলা নারী প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে হল ভাগ্যলক্ষ্মী। তার কিছুপরেই যশোলক্ষ্মী, কুললক্ষ্মী, সকলেই একে একে রাজপুরী থেকে বিদায় নিল। রাজার সেরাতে ঘুম এলনা। এবং সকলেরি বিদায় নেবার কারণ হল সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি যেটি রাজা কিনে এনেছিলেন।

এভাবেই তাঁর দিন কাটে।

তবুও শিল্পীর হাতে বানানো সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি ফেলে দিতে রাজার মন চায়না। শিল্পী তো আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরী করেছে তাকে।

শিল্পীর শিল্পীসত্তায় আঘাত করতে মন চায়না রাজার। তাই প্রাসাদ থেকে একটু দূরেই সরিয়ে রাখেন তাঁকে কিন্তু ফেলতে পারেন না। ক্রমে তিনি দরিদ্র হতে থাকলেন। ধন, মান, যশ, সাফল্য ভাগ্য তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। একদিন রাজা দেখতে পেলেন ধর্মরাজ তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। রাজা তখন নিরূপায় হয়ে ভাবলেন এটা মেনে নেওয়া যায়না। ধর্ম তাঁকে ত্যাগ করলে তিনিতো অধার্মিক রাজা রূপে পরিগণিত হবেন। রাজা তখন ধর্মকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেন।

ধর্মরাজা রাজার যুক্তি শুনে খুব খুশি হলেন। ধর্মরজের কথায় আশ্বিনমাসের পূর্ণিমায় রাণীকে কোজাগরী ব্রত পালন করতে বললেন । রাণী সারারাত জেগে বসে র‌ইলেন। আর নিষ্ঠাভরে লক্ষ্মীর পুজো করে রাজা সব ফিরে পেলেন। আবার আগের মত তাঁর রাজবাড়ি ভরে উঠল জাঁকজমকে, ধনসম্পত্তিতে।

আর ঠিক সেখানেই যেন মানব সংসারে ভাল এবং মন্দ মেয়ের টানাপোড়েনের গল্পটি উঠে আসে। লক্ষ্মী এবং অলক্ষ্মীর পুজোর তাই বুঝি চল। কারোকে ফেল না। সব মেয়েই পূজ্য। দোষে গুণে গড়া মানুষ। লক্ষ্মীকে বরণ করলেও অলক্ষ্মীকেও ফেলে দেওয়া চলবেনা...ইহজগতের মানুষের জন্য সেই শিক্ষামূলক বার্তা আজো পাই এই পুজোর থেকে। লক্ষ্মী সুরূপা আর অলক্ষ্মী কুরূপা। লক্ষ্মী শান্ত আর অলক্ষ্মী চঞ্চলা। তারা তো আমাদের ঘরের আর পাঁচটা মেয়েরি মতন। তাই অলক্ষ্মীর পুজো করে নিয়েই লক্ষ্মী পুজোর রীতি।

কুমারীপুজো এবং



এইসময় ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৭
বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলার মন্দির তিনশো বছরেরও পুরোনো এক তীর্থস্থান। এটি অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির। এখানে দেবী মূর্তি কষ্ঠি পাথরের অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী, মহিষমর্দিনী, মহালক্ষী রূপিণী । মায়ের ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে এখানে শারদোতসবের সূচনা হয়। মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদে কৃষ্ণসায়র থেকে রূপোর ঘটে জল ভরে শোভাযাত্রা বের হয় মন্দিরের উদ্দেশ্যে।ঘোড়ায় টানা রথে বাদ্যযন্ত্র, ঢাক সহকারে বিশাল শোভাযাত্রায় অংশ নেন শহরবাসীরা। শহরের রাজপথের দুই ধারে মানুষের ভিড় উপচে পড়ে । অবশেষে শোভাযাত্রা এসে সর্বমঙ্গলা মন্দিরে শেষ হয় এবং ঘট প্রতিষ্ঠা হয়।

সারাবছর এখানে দেবীর নিত্যপুজো ছাড়াও মহাষষ্ঠীতে বিল্ববৃক্ষে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস, মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা পূজা, মহা অষ্টমীতে কুষ্মান্ড বলিদান, আরতি ও সন্ধিপূজা হয় । মহানবমীতে হয় কুমারী পুজো, হোমযজ্ঞ। মহা দশমীতে বিহিত পুজোর পর অপারাজিতা পূজা ও ঘট বিসর্জন হয় ।
বর্ধমানের কোথাও আবার পালকি চেপে কুমারীকে ঘোরানো হয় সারা শহর। সেখানেও ঐতিহ্য মেনে নবমীর দিন কুমারী পুজো হয়।
বর্ধমানের সাবেকী বাড়ির পুজোগুলি খুব প্রাচীন। কোনোটি বা পাঁচশো বছরেরো পুরোনো। বুদবুদের মানকরের বড় কবিরাজ বাড়ির পুজো প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের। বর্ধমান রাজার কাছে জমিদারি পাওয়ার পরে এখানে বাস শুরু করেন পূর্বপুরুষেরা। তখন থেকেই এই পুজো চলছে।
কাঁকসার ত্রিলোকচন্দ্রপুরের মণ্ডলবাড়ির পুজো প্রায় তিনশো বছরের পুরনো। নবমীর দিন গ্রামের বাইরে তিলুইচণ্ডী তলায় পুজো হয়। এই তিলুইচণ্ডী নাকি লক্ষ্মণ সেনের আমলের। এখানে নবমীর দিন কুমারীপুজো হয় দেখবার মত। এছাড়া আসানসোল রামকৃষ্ণ মিশন ও কাটোয়ার রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে ধুম করে হয় কুমারী পুজো।

কুমারী কন্যার শুদ্ধ আত্মাতেই নাকি ভগবতী দেবী দুর্গার প্রকাশ সবচেয়ে বেশী। তন্ত্রসার মতে ১ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত অরজঃস্বলা বালিকারা কুমারী পূজার উপযুক্ত । যে কোনো জাতের কন্যাকেই মাতৃজ্ঞানে দুর্গাপুজোর অষ্টমী কিম্বা নবমী তিথিতে পুজো করা হয়। বেদ পুরাণের যুগে মুনি ঋষিরা প্রকৃতিকে কুমারী জ্ঞানে পুজো করতেন।
স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০১ সালে বেলুড়মঠে দুর্গাষ্টমীতে পুনরায় কুমারীপুজো চালু করেছিলেন। ভারতবর্ষের দুটি স্থানে, মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরে এবং কন্যাকুমারীতে দেবীশক্তিকে কুমারী জ্ঞানে পুজো করা হয়।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে ত্রিশক্তির বলে প্রতিনিয়ত যে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় ক্রিয়া অনবরত চলছে সেই ত্রিবিধ শক্তিই বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। কুমারী প্রকৃতি বা নারী জাতির প্রতীক ও বীজাবস্থা। তাই কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপিত করে দেবীরূপে তার সাধনাই হল কুমারী পূজা । এ সাধনপদ্ধতিতে সাধকের নিকট বিশ্বজননী কুমারী নারীমূর্তির রূপ ধারণ করে । তার নিকট নারী ভোগ্যা নয়, পূজ্যা।দুর্গাপুজো কে কলিকালের অশ্বমেধ যজ্ঞ বলা হয়। আর রামায়ণ্-মহাভারতে আমরা যত যজ্ঞের কথা শুনি কুমারীপুজো হল দুর্গাপুজোর মধ্যে আরো একটি বিশেষ যজ্ঞ।
বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ রামের জন্য ব্রহ্মার দুর্গাপূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। তখন শরৎকাল, দক্ষিণায়ণ। দেবতাদের নিদ্রার সময়। তাই, ব্রহ্মা স্তব করে দেবীকে জাগরিত করলেন। দেবী তখন কুমারীর বেশে এসে ব্রহ্মাকে বললেন, বিল্ববৃক্ষমূলে দুর্গার বোধন করতে। দেবতারা মর্ত্যে এসে দেখলেন, এক দুর্গম স্থানে একটি বেলগাছের শাখায় সবুজ পাতার রাশির মধ্যে ঘুমিয়ে রয়েছে একটি তপ্তকাঞ্চন বর্ণা বালিকা। ব্রহ্মা বুঝলেন, এই বালিকাই জগজ্জননী দুর্গা। তিনি বোধন-স্তবে তাঁকে জাগরিত করলেন। ব্রহ্মার স্তবে জাগরিতা দেবী বালিকামূর্তি ত্যাগ করে চণ্ডিকামূর্তি ধারন করলেন।

মনু সংহিতা অনুসারে
যত্র নার্যন্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ
যত্রৈতান্তু ন পূজ্যতে সর্বান্তুত্রাফলাঃ ক্রিয়া’।।

এর অর্থ হল, যেখানে নারীরা পূজিত হন সেখানে দেবতারা প্রসন্ন। যেখানে নারীরা সম্মান পান না, সেখানে সব কাজই নিষ্ফল। আর তাই তো নারীর সম্মান প্রদানে ব্রতী হয়ে স্বামীজি এই কুমারী পুজো চালু করেন।

আবার মহাদেব যোগিনী শাস্ত্রে বলেছেন,
কুমারী পূজনং ফলং বক্তু নার্হামি সুন্দরী।
জিহ্বাকোটি সহস্রৈস্তু বস্তুকোটি শতৈরপি’।

এর অর্থ শতকোটি জিহ্বায় কুমারী পূজার ফল ব্যক্ত করতে পারব না। কুমারীরা শুদ্ধতার প্রতীক হওয়ায় মাতৃরূপে ঈশ্বরের আরাধনার জন্য কুমারী কন্যাকে নির্বাচন করা হয়।

তবে অরজ:স্বলা কুমারীদেরই কেন পুজো করা হবে সেই নিয়ে আধুনিক ভাবনাচিন্তায় দ্বিমত। কন্যা ঋতুমতী হলেই কি অশুদ্ধ হয়ে যায় ? আর অরজস্বঃলা কন্যাই কি অপাপবিদ্ধ? তাহলে অম্বুবাচীর দিনে কামাখ্যা মন্দিরে এত ভীড় কিসের হয়?

যোগিনীতন্ত্রে বলে ব্রহ্মার শাপে বিষ্ণুর দেহে পাপ সঞ্চার হলে সেই পাপ থেকে মুক্ত হতে হিমাচলে মহাকালীর তপস্যা শুরু করেন। বিষ্ণুর তপস্যায় মহাকালী খুশি হন। দেবীর সন্তোষ মাত্রেই বিষ্ণুর হৃদ পদ্ম হতে সহসা ‘কোলা’ নামক মহাসুরের আবির্ভাব হয়। সেই কোলাসুর ইন্দ্রাদি দেবগণকে পরাজিত করে অখিল ভূমণ্ডল, বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠ এবং ব্রহ্মার কমলাসন প্রভৃতি দখল করে নেয়। তখন পরাজিত বিষ্ণু ও দেবগণ ‘রক্ষ’ ‘রক্ষ’ বাক্যে ভক্তিবিনম্রচিত্তে দেবীর স্তব শুরু করেন। দেবতাদের স্তবে প্রসন্ন হয়ে দেবী চণ্ডিকা কুমারী কন্যারূপে দেবতাদের সামনে দেখা দিয়েছিলেন।সন্তুষ্টা দেবী বলেন, ‘হে বিষ্ণু! আমি কুমারীরূপে কোলানগরী গমন করে কোলাসুরকে সবান্ধবে হত্যা করব।’ দেবী কথামতো কাজ করেন। সেই থেকে দেব-গন্ধর্ব, কিন্নর-কিন্নরী, দেবপত্নীগণ সকলে সমবেত হয়ে কুসুম-চন্দন-ভারে কুমারীর অর্চনা করে আসছেন।
আজকের সমাজের নারী নির্যাতনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কন্যাভ্রূণ হত্যা, ধর্ষণ, ইভটিজিং ইত্যাদির মত নৃশংস ঘটনায় মনে হয় প্রতিদিন যদি এভাবেই মন্দিরে মন্দিরে এক একজন জ্যান্ত কুমারীকে পুজো করা হয় তবে বুঝি কিছুটা হলেও এই কদর্য এবং বিকৃত রুচির কাজগুলির হাত থেকে মেয়েরা মুক্তি পেত। যে কুমারী কন্যাশ্রীদের দেবীজ্ঞানে পুজো করা হচ্ছে ধর্ম ভীরু সেইসব পুরুষরা পথেঘাটে তাদের স্পর্শ করতে অন্ততঃ একবার ভাববে।

১ অক্টো, ২০১৭

শারদীয়া অক্ষর প্রসব ১৪২৪

শারদসাহিত্যে ২০১৭

আবাপ ডিজিটাল, আনন্দ উতসব : লাইট-ক্যামেরা-একশন (রম্য)http://www.anandabazar.com/events/puja-parikrama/special-write-up-on-durga-puja-dgtl-1.679653?ref=puja-parikrama-new-stry
ভ্রমণ (আলাস্কার তিমি )
নিবোধত (কাশ্মীর মন্দির সোপান তলে)
পুরুলিয়া দর্পণ (বড়গল্প জন্মান্তর)
উত্তরবঙ্গসংবাদ শারদঅর্ঘ্য (ছোটগল্প পূর্বপুরুষ)
দৈনিক যুগশঙ্খ ( ছোটগল্প পিতৃত্ব)
একান্তর ( ছোটগল্প তিন কন্যা)
সপ্তপর্ণ ( ছোটগল্প বদলা)
মালিনী ( ছোটগল্প নিয়মভঙ্গ)
ম‌উল ( ছোটগল্প ডিলিট)
শৈলজা ( ভ্রমণ অরুণাচল প্রদেশ)
যুগসাগ্নিক (রম্য রচনা)
তিস্তা নন্দিনী (অণুগল্প লাবণ্যময়ীর স্বর্গ লাভ)
স্মরণিকা ( প্রান্তিক )

অনুভব (রম্যরচনা, শিব দুর্গার আধার কার্ড )
ইচ্ছামতী (ভ্রমণ ভিক্টোরিয়া, কানাডা)
ম্যাজিক ল্যাম্প (সহজে দুর্গা কথা)
কলকাতা ২৪x৭ (পুরাণ কথা)
শব্দের মিছিল (পুজোর স্মৃতি, পত্রসাহিত্য)
ঐহিক (ছোটগল্প দেবী)

১৪ আগ, ২০১৭

আজ রাত পুইলেই...।

তক্ষণে মহামান্য দেশ নেতাগণ নিশ্চয়ই ভাষণের জন্য প্রস্তুত। ভোরের আলো ফুটলেই বেরুবে প্রভাত ফেরী। বীরবিক্রমে কন্ঠনালী ফুলিয়ে গগনভেদী চিত্কার করে বাতাস ভারী করবেন সকলে । প্রচার মাধ্যমগুলি প্রতি পলে পলে স্বাধীনতার সংগীত, প্রতি দন্ডে দন্ডে স্মৃতিচারণ, সকালে স্বাধিনতা সংগ্রামের উপর তথ্যচিত্র তো বিকালে ছায়াছবি, প্রদর্শন করবে | কখনো বিরলকেশ,বর্ষীয়ান নেতাকে বহুকষ্টে উপস্থিত করে তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমাদের পরিবেশন করবেন । শহীদ-স্মৃতি ফলক অচিরেই শ্বেত-পুষ্পের অবগুন্ঠনে চলে যাবে । ব্রিগেডের মৃত্তিকা পুষ্পবৃষ্টিতে ছয়লাপ হবেই, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। শহীদমিনারের পাদদেশে লক্ষ মানুষ ভীড় করে নেতার জ্বালামুখী বক্তৃতা শুনবে, এতেও কোনও সন্দেহ নেই। সারাদেশের আকাশে বাতাসে স্বাধীনতার পাঞ্চজন্যের বজ্রনিনাদ অনুরণিত হবে আর ঠিক তখুনি তোলপাড় হবে আমাদের মত কিছু মানুষের মন। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগবে কেনই বা এই উত্সব? কি জন্য পেয়েছিলাম স্বাধীনতা? আমরা কি স্বাধীনদেশের যোগ্য উত্তরসুরী? ইত্যাদি, ইত্যাদি। হ্যাঁ, তাই তো সোশ্যালনেটে এমন কপচাচ্ছি। তবু দেখবেন বাবা, বুঝেশুনে কপচাবেন। ফেসবুক দেওয়ালেরও কান আছে কিন্তু। স্বাধীনতার অপব্যবহার করে কার্টুন ফারটুন ( বিশ্বাস করুন, খারাপ কথা আমি পারদ পক্ষে বলি না, বাক স্বাধীনতা নেই আমার ) আবার এঁকে না ফেলি! তুমি মহারাজ স্বাধীন হলে আজ, আমি আজ পরাধীন বটে!

আচ্ছা বলুন তো স্বাধীন হয়ে কি হল? নিজেই নিজের মন কে বলি, এই যে পাড়ায় পাড়ায় স্বাধীনতার ফ্ল্যাগ উড়ছে, সকলেরি এত স্বাধীনতা পালনের হিড়িক, এর তো একটা ইম্প্যাক্ট আছে না কি? স্বাধীনতা আমাদের জলভাত যে। যেখানে খুশি যেতে পারি, যা খুশি তাই করতে পারি, যা ইচ্ছে তাই বলতে পারি, যখন খুশি পুরোণো নোট বদল করে কেরামতি দেখাতে পারি। রাতারাতি আধার লিংক করার আদেশ দিতে পারি। কিন্তু পেরেও পারিনা। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারি কিন্তু অর্ধশিক্ষিত মানুষগুলিকে স্বাধীনতা দিতে পারি না। বিশেষত বৃদ্ধেরা যারা প্রযুক্তিগত ভাবে পিছিয়ে তারা দেহ রাখবার আগেও স্বাধীন হতে পারেন নি আজ। বরং উত্যক্ত হয়ে ব্যাপক বিশ্বায়নের ঊর্মিমালায় খাবি খেতে খেতে বাণপ্রস্থ নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে বাস করছে।
সমাজের অলিগলির দুষ্কৃতি, দুরাত্মা ? পেরেছি কি তাদের স্বাধীনতা খর্ব করতে?
সেই আলগা গায়ের মায়ের বাছা? তাকে কি দিয়েছি? মিড ডে মিলের লোভ দেখিয়ে বিশুদ্ধ বানান শেখাতে পেরেছি?
মোড়ের মাথার গম ভাঙ্গানোর দোকানে সেই ছেলেটার টিন ফিরিয়ে দিতে পেরেছি? টিন মানে আটার টিন নয় মশাই, তার টিন, তার মধুর কৈশোর অধরাই থেকে গেছে।
জানেন? আমার বেলাতেও দেখিনি। স্বাধীনদেশের রক্ষণশীল, একান্নবর্তী পরিবারের কন্যা সন্তানের স্বাধীনতা ছোটথেকেই ছেঁটেকেটে রাখা হয়। আমার বেলাতেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি ।ছাঁটা-কাটা স্বাধীনতার ঘেরাটোপে, শুল্ক বসানো সাজপোশাক, কর চাপানো বন্ধুনির্বাচন, আর খাজনা আরোপিত বাইরে বেরোনো মেনে নিয়ে লক্ষ্মী মেয়ে হয়েছি। হুঁ, হুঁ, বাবা, স্বাধীনতা দিলে মেয়েরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে যায়।

৮ আগ, ২০১৭

ভাদ্র লক্ষ্মী ভদ্রাবতী আজও পূজিতা

এইসময়, বর্ধমান সমাচার ৭ই আগষ্ট ২০১৭ 

দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলার মত বর্ধমানেও বেশ কিছু স্থানে ভাদ্রমাসের প্রথম দিন থেকে ভাদু পূজা আরাম্ভ হয় ।পয়লা ভাদ্র কুমারী মেয়েরা গ্রামের কোন বাড়ীর কুলুঙ্গী বা প্রকোষ্ঠ পরিষ্কার করে ভাদু প্রতিষ্ঠা করে । একটি পাত্রে ফুল রেখে ভাদুর বিমূর্ত রূপ কল্পনা করে তারা সমবেত কন্ঠে ভাদু গীত গায় । ভাদু এদের আঞ্চলিক লৌকিক দেবী। কেউ বলে ভাদু লক্ষ্মী। ভাদ্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে ভাদুর মূর্তি ঘরে এনে সংক্রান্তির সকালে দলবদ্ধভাবে ভাদু মূর্তির বিসর্জন দেয়। ভাদ্রমাসের জল থৈ থৈ দিনগুলোতে এখানে এখনো প্রত্যন্ত গ্রামে শোনা যায় ভাদু গান। আদিবাসী ঘরে ঘরে পালিত হয় ভাদু পরব।

এখনো আদিবাসী মানুষদের মুখে মুখে ফেরে বিখ্যাত আঞ্চলিক ভাদুগান

খিরই নদীর কুল ভাইঙ্গেছে
ভাদু নাকি আইস্যেছে
হাতে তার পানের বাটা
রুমালটি যার ভাঁইসেছে। 

কুমারী ভাদু দেবীর কাহিনি ঠিক যেন রূপকথা। সে ছিল এক দুঃখিনী কন্যা ।

মানভূমের পঞ্চকোট রাজ্যে তখন রাজা নীলমণি সিংদেও রাজত্ব করছেন দাপিয়ে। কোনও সন্তানাদি নেই তাঁর। মনে খুব দুঃখ। এদিকে রাজা তখন ঐ অঞ্চলে নতুন প্রজাতির এক ধান চাষ নিয়ে মত্ত। ধানের নাম দিয়েছেন তিনি নিজেই "ভাদুই' । ভাদ্র মাসে বোনা হয় সেই ধান। নিজের রাজ্য কাশীপুরের মানুষের জন্য বিগলিত প্রাণ রাজার। মানুষ ধন্য ধন্য করে।রাজা নিজেই মন্ত্রীকে সঙ্গে করে সাধারণ বেশভূষায় গ্রাম পর্যটনে বেরিয়ে পড়েন। ঐ ভাদুই ধানের ব্যাপারে গ্রামের মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে। ধানের ফলন আরো কি করে বাড়ানো যায়, ঐ ধান মানুষের পছন্দ হয়েছে কিনা এইসব তথ্য সংগ্রহের জন্য। এর মাঝে  তাঁর এক প্রজা রাজত্বের সীমানার মধ্যেই এক গ্রামে গ্রাম প্রধানের ঘরে বেড়ে ওঠা এক পরমাসুন্দরী সুলক্ষণা কন্যা ভদ্রাবতীর (মতান্তরে ভদ্রেশ্বরী) সন্ধান দিল। নিঃসন্তান রাজা সেই শোনামাত্র কন্যাটিকে চাইলেন নিজের কন্যা রূপে পালন করবেন বলে। কিন্তু মেয়েটির পিতা গ্রামের মুখিয়া কিছুতেই রাজি নন। অবশেষে স্থির হল সেই মেয়েটি তাঁর নিজের ঘরেই থাকবে তবে রাজা তার জন্য রাজকুমারীর মত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেবেন আর নিজের কন্যারূপেই দেখবেন তাকে।নিজের পিতার ঘরেই  রাজকন্যার মত বড় হতে লাগলেন ভদ্রাবতী। ভদ্রাবতীর আদরের নাম ভাদুমণি।

এদিকে সারা দেশে তখন সিপাহী বিদ্রোহের ঝড় বইছে। রাজা নীলমণি সিংদেও ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে বন্দী । জেল থেকে ফিরে এসে শুনলেন রাজকন্যা ভদ্রাবতী নাকি কবিরাজের পুত্রের প্রেমে পাগলিনী। কে এই কবিরাজ? কি তার নাম, ধাম? অবশেষে খোঁজ মিলল। তার নাম অঞ্জন।
এবার কালে কালে লোককথা, এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে লোকগাথাতে পরিবর্তিত হতে থাকে যুগ যুগ ধরে। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরে সেই রূপকথা।

ঘটনা শুনে  অগ্নিশর্মা রাজা নীলমণি সিংদেও তড়িঘড়ি আদেশ দিলেন কবিরাজ পুত্র অঞ্জনকে বন্দী করার। দুঃখে, অপমানে ভদ্রাবতী তাঁর দুই সখীকে নিয়ে রাজ্যের সমস্ত বন্দীশালায় গান গেয়ে গেয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল যাতে তার গান শুনে অঞ্জন তাকে চিনতে পারে । এবার সেই গান শুনে রাজারও অনুশোচনা হল, তিনি অঞ্জনকে মুক্তি দিলেন বটে কিন্তু ততদিনে রাজকন্যা ভদ্রাবতী নিজের মনোকষ্টে কোথায় যেন চিরদিনের মত অন্তর্হিত। কেউ বলে সে আত্মহত্যার পথ বেছেছিল। কেউ বলে সে পালিয়ে গেছিল। সেই থেকেই রাজকন্যা ভদ্রাবতীর মূর্তি স্থাপন করে শুরু হল রাজার রাজত্বে ভদ্রাবতীর পুজো আর এই পুজোই পরে গ্রামে গ্রামে ভাদু পুজো বা ভাদু পরব নামে পরিচিতি লাভ করে। আর তার দুঃখে দুঃখী হয়েই ভাদুর বারমাস্যা কীর্তন করে মেয়েরা। তাঁকে আনা হয় আদর করে, পুজো করা হয় আদর করে। তুমি থাক আমাদের মাঝে, আর চলে যেওনা তোমার প্রেমিকের খোঁজে দূর- দুরান্তরে। আমরা তোমায় যতন করে রাখব আমাদের মাঝে।

ওদিকে আবার পশ্চিমবাংলার ঘটিদের রীতি অনুযায়ী ভাদ্রমাসেই শুক্লাষষ্ঠী তিথিতে চাপড়া বা চর্পটা ষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন এ অঞ্চলের মায়েরা।

বর্ষার জল পেয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা ভাদ্রের নদনদী, খালবিলে যখন দুএকটা করে পদ্ম ফুটতে সবেমাত্র শুরু করেছে, বাতাসে যখন পুজো পুজো গন্ধ নিয়ে শিউলি ঝরতে শুরু করেছে তখন হয় চাপড়া ষষ্ঠী বা চপটা ষষ্ঠী । দুর্গা ষষ্ঠীর ঠিক একমাস আগে । কাঁঠালী কলা, পিটুলী গোলা দিয়ে পুতুল বানিয়ে পুকুরে ভাসায় গ্রামের মায়েরা, সন্তানের কল্যাণে । আর মটর ডালের চাপড়া বানিয়ে তাওয়ায় সেঁকে মায়েদের খেতে হয় ।

কোনো একদেশে এক বণিক ছিলেন যার তিন পুত্র ও তাদের তিন বৌ ছিল । বৌয়েরা পুত্রবতীও ছিল সকলে । কিন্তু পক্ষপাতিত্বের কারণে বণিক গিন্নী ছোট বৌকেই বেশি ভালবাসতেন । ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষে চাপড়া ষষ্ঠীর জন্য ছোটবৌমা'কে বণিক গিন্নী একফালি পুকুর কাটিয়ে দিলেন । কিন্তু গভীর করে পুকুর খনন করলেও সেখানে একফোঁটাও জল উঠলনা । বণিক আর গিন্নী তা দেখে অবাক হলেন । উপোস করে সারাদিন রাত পড়ে র‌ইলেন ।

অবশেষে মা ষষ্ঠী স্বপ্ন দিয়ে গিন্নীকে বললেন যে এক‌ই ঘরে ছোটবৌয়ের জন্য পুকুর কাটা হল আর বাকী দুটি বৌয়ের প্রতি এমন অসম আচরণ করার কারণে তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন তাই পুকুর শুষ্ক । আর বণিক যেন অন্য বৌদের জন্য আরো দুটি পুকুর কাটিয়ে দেন তবেই এই দুটি পুকুর সহ আগেরটিতেও জল থৈ থৈ করে উঠবে । সেই স্বপ্নাদেশ পাওয়া মাত্রই  বণিক লোক-লস্কর ডেকে  আগের পুকুরের পাশে আরো দুটি পুকুর কাটালেন  আর ঠিক সময়মত তিনপুকুরেই কাঁচের মত জল থৈ থৈ করে উঠল । বণিক গিন্নী তিন বৌমাকে নিয়ে ঐ পুকুরের জলে পিটুলীবাটার পুতুল ভাসিয়ে পুজো আচ্ছা করে ষষ্ঠীর ব্রত পালন করলেন ।  ভাদ্রে ওঠা নতুন ধানে ভাদ্র লক্ষ্মীর পাশাপাশি এই চাপড়া ষষ্ঠীর পুজো এখনো সমাদৃত।

৪ আগ, ২০১৭

সেজোমাসী

 তোমার এয়োস্ত্রী ছবিতে মালা পরাতে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি গো। আজ তোমার রঙীন ছবির দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলার কত সাদাকালো কথা। গরমের ছুটি হলেই মায়ের হাত ধরে তিন নম্বর বাসে চড়ে তোমার বাড়ি। আর  তোমার হাতে কত কত তৈরী মুখরোচক। রন্ধনে দ্রৌপদী ছিলে তুমি। আমার মা সেবার লেবার পেনে কাতরাচ্ছে উত্তর কলকাতার বনেদী প্রসূতিসদন, নর্থ ক্যালকাটা নর্সিংহোমে। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, এখনো দেরী আছে অনেক। বাড়ি থেকে মাছের কচুরী বানিয়ে এনে আসন্ন প্রসবার মুখে দিয়ে তবে তোমার শান্তি হয়েছিল। আমি জন্মেছিলাম তার কিছু পরেই। তুমি মায়ের দিদি অথচ মায়ের কোলে আগে এসে গেল সন্তান । তখনো তোমার সন্তান হয়নি তাই আমার জন্যে  সারাজীবন তোমার চোখে খুশি দেখেছিলাম গো। তারপর আমায় কোলে নিয়ে মা চলল মামার বাড়ি। তোমার অদিখ্যেতা শুরু হল তখন। একুশ দিনের ষষ্ঠীপুজোয় লোকে ছেলের জন্যে একুশটা ক্ষীরের পুতুল গড়ে ষষ্ঠীবুড়ির চুপড়ি সাজায় আর তুমি কিনা ক্ষীরের পুতুল বানিয়েছিলে এই একরত্তি মেয়ে সন্তানের জন্যে!  দেখো, প্রকৃতির কি খেয়াল! তারপরেই তোমার দুটি ছেলে হল কোল আলো করে। আমার ভাই হবার আগে বেশ মনে পড়ে, তুমি নিয়ম করে মা'কে দেখতে আসতে। আর যাবার সময় মা'কে বলে যেতে, প্রথমটি কে অযত্ন কোরো না। বলেই আমার হাতে পুতুল, চকোলেট  কেনার টাকা গুঁজে দিতে। আমি কি করে ভুলব এসব??? 
তুমি কথায় কথায় বলতে দেখিস, আমি এয়োস্ত্রী মরব। আমি রাজরাণীর মত চলে যাব। সত্যি‌ই তাই হল। তোমার ভরভরন্ত সংসার, পাশে দুই ছেলে বৌ, নাতি, নাতনী...জমজমাট সংসারের সব দেখে শুনে সত্যিই তুমি রাণীর মত চলে গেলে! এমন ভাগ্য কজনের হয় আজকের যুগে?
যেখানেই থাকো, ভালো থেকো সেজোমাসী!

শ্মশান অনলে দগ্ধসি পরিত্যক্তোসি বান্ধবৈঃ
ইদং নীরং, ইদংক্ষীরং অত্র স্নাহি ইদং পিব
আকাশস্থ নিরালম্ব বায়ুভূত নিরাশ্রয়
অত্র স্নাত্বা, ইদং পীত্বা স্নাত্বা, পীত্বা সুখি ভব।

১ আগ, ২০১৭

সনাতন আর কতদিন ?

রাজ্য জুড়িয়া সনাতনদের উত্তরোত্তর রমরমা। তন্ত্র, বশীকরণ, ব্ল্যাক ম্যাজিকের পাশাপাশি সনাতন প্রথায় বেকারত্ব দূরীকরণের প্রলোভন।

সত্য ঘটনাঃ স্থান কলিকাতা, তারিখঃ ৩০শে জুলাই, রবিবার

আমার গৃহ পরিচারিকার কন্যা এবত্সর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করিয়া কন্যাশ্রীর মহার্ঘ্য অর্থ ব্যায় করিয়া যোগমায়া দেবী কলেজে ভর্তি হ‌ইয়াছে। প্রাতঃকালীন কলেজ। সারাটা দিন তাহার অঢেল সময়। কোনোদিন সন্ধ্যায় কেটারিং এর কাজ করিয়া কিছু অর্থ প্রাপ্তিতে তাহার মন ভরিয়া ওঠে কানায় কানায়। কোনোদিন কোনো ইভেন্টের কাজে যাইয়া বিরিয়ানির প্যাকেট মায়ের হাতে, ভাইয়ের হাতে তুলিয়া দিয়া আনন্দ পায়। এহেন কন্যাশ্রীটি তাহার বন্ধুর ফাঁদে পড়িয়া গত রবিবার কালিঘাট অঞ্চল হ‌ইতে মেট্রো করিয়া কবি নজরুল এবং সেখান হ‌ইতে অটোর ভাড়া গুণিয়া তাহার মা'কে ল‌ইয়া পৌঁছায় গড়িয়ার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আরো এক সনাতনের ফাঁদ পাতা সেইস্থানে। গল্পের শুরু এইবার। বিশাল লাইন। প্রচুর কন্যাশ্রীরা লাইনে দন্ডায়মান। তাহাদের মাথাপিছু একজন অভিভাবক
(প্রধানত:তাহাদের মাতৃদেবী, টুপি পরানো সহজ বলিয়া ) বেঞ্চিতে ঘন্টার পর ঘন্টা উপবিষ্ট হ‌ইয়াই রহিলেন। অতঃপর আমাদের পরিচিত কন্যাশ্রীটির ডাক পড়িল। মাত্র আট হাজার টাকা(যাহাদের মাসিক আয় পাঁচ-ছ'হাজারের বেশী নয়) তাহাদের দিতে অনুরোধ জানাইলেন সেই সনাতন। এর বিনিময়ে আমাদের কন্যাশ্রী এবং তাহার মা পাইবেন বিস্তর সুবিধা।
১)অপুষ্টি নিবারক মাল্টিভিটামিন ক্যাপস্যুল ২) মখমলি ত্বকের জন্য অনন্য সাধারণ বডি লোশন ৩) রেশমী ও পশমী কেশের জন্য ভাইটালাইজিং শ্যাম্পু ৪) ব্রণ চিরতরে দূর করিবার ফেসপ্যাক ৫) মেনোপজের পর মেয়েদের মায়ের শরীর ঠিক রাখিবার জন্য "অল উইমেন ওয়েল বিইং" বটিকা এবং আরো কতকিছু থাকিবে সেই আট হাজারী গিফট হ্যাম্পারে।

বিধি সম্মত সতর্কীকরণ ঃ কাহাকেও বিক্রি না করিতে পারিলে নিজেরাই ব্যবহার করিয়া দেখুন এই প্রডাক্টের মাহাত্ম্য। পাইলেও পাইতে পারেন অমূল্য রতন!

গ্যাঁটের কড়ি ব্যয় করিয়া দলে দলে কন্যাশ্রীরা সনাতনের হাত থেকে মুক্ত করিয়া ফিরিয়া আসিয়াছে সেটাই রক্ষা। পিরামিড ব্যবসায়ের প্রলোভনের ফাঁদ পাতা এ ভুবনে। কখন কে ধরা পড়ে কে জানে! আটহাজারী চাকরি চাই। আটহাজারের বিনিময়ে। আর আছে রহস্যের মোড়কে আবৃত রূপলাগির বিজ্ঞাপন। যাহারা স্যানিটারি প্যাড কিনিতে পারেনা, যাহারা জ্বর হ‌ইলে প্যারাসিটামল চাহিয়া খায়, যাহারা কাজের বাড়ির দাতব্য করা সালোয়ার কামিজ টাঁকিয়া ল‌ইয়া পরে দিন চালায় তাহাদের এরূপ প্রলোভন সনাতনেরা আর কতদিন দেখাইবে? সনাতন পিরামিডের ব্যাবসা বুঝিয়া শীর্ষে উঠিয়াছে, বিদেশ যাইয়া দেশ উদ্ধার করিতেছে তাই বলিয়া সাধারণ এই মানুষগুলির মাথা আর কতদিন খাইবে তারা? সনাতন সাবধান! দিন আগত ঐ!

সনাতনরা সংখ্যায় বৃদ্ধি পাইবেই। ইহাতে আশ্চর্যের কিছু নাই। বেকারত্বের হাহাকার। উহাদের লোক ঠকাইয়া খাইতেই হ‌ইবে। কন্যাশ্রীরাও বেকার। উহাদেরো চাকুরী পাইতেই হ‌ইবে। অতএব সনাতন প্রথাগুলির বিনাশ হ‌ইবে না। আইন করিয়া সনাতন প্রথার বিনাশ অথবা সনাতনদের ধরপাকড় করিয়া লাভ নাই। সনাতন পদ্ধতিতে শিল্পে জোয়ার আনিতে হ‌ইবে। সনাতন প্রথায় চাকুরী দিতে হ‌ইবে।

২৪ জুল, ২০১৭

মঙ্গলচণ্ডী আজও

Ei Samay Bardhaman Suppliment 12th JUne 2017

বাঙলামায়ের বারোমাসে তেরো পার্বণ । আর সেই তেরো পার্বণে হাজারো বারব্রত । পূর্ববঙ্গে এই রীতির কিছুটা ছাড় কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মায়েরা নাছোড় এই বারব্রত পালনে । ঋতুর হাওয়াবদলের সাথে সাথে বর্ধমানের ঘরে ঘরে এই বাঙালীয়ানাটুকুকে সম্বল করে এখানকার মহিলারা বেশ  হুল্লোড়ে থাকেন ঐ দিনগুলোতে ।  যারা অফিস করেন তাঁরাও শুনি উপোসটুকুনি ছাড়তে নারাজ । ভোরবেলা ব্রতকথার ব‌ইখানিতে পেন্নাম ঠুকে কথকতায় চোখ বুলিয়ে তারপর দশটা-পাঁচটায় সামিল হন । সেদিন শিকেয় তোলা মাছের ঝোলভাত-ডাল-চচ্চড়ি। দুপুরে ফলাহার রাতে ময়দার ভাজা সব সুস্বাদু । কারোকে আবার বলতে শুনেছি মায়েদের মুখ বদলানোর সব উপায় করে দেওয়া হয়ে আসছে অনন্তকাল ধরে । কিন্তু সত্যি কি তাই? আসলে প্রতিটি ব্রতকথার আড়ালে যে ছোট উপাখ্যানগুলি আছে সেগুলি প্রচলিত হলেও লোকশিক্ষার মোড়কে হাজির করা হয় আমাদের সামনে । আর বিশেষ দিনগুলি পালনের অর্থ হল সেগুলিকে বারবার নিজেদের সাংসারিক টানাপোড়েনে ঝালিয়ে নেওয়া ।

মনে মনে তাঁরা বলেন "বারব্রত নিষ্ফল হয়না, ধর্মকর্ম যাই কর ঈশ্বরে বিশ্বাস চাই"

 জ্যৈষ্ঠমাসের প্রতি মঙ্গলবারে  কুমারী ও এয়োস্ত্রীরা সংসারের মঙ্গলকামনায় স্মরণ করেন মা মঙ্গল চণ্ডীকে।  বর্ধমানের মায়েরা এইদিন কাঁঠালপাতায় দুব্বোঘাস, ধান, যব ও মুগকলাই রেখে খিলি বানিয়ে মা চন্ডীকে নিবেদন করেন ও পরে কলার মধ্যে সেই ধান-যব পুরে "গদ"  গিলে খান। আমলা বাটা আর হলুদ দিয়ে স্নান করানো হয় মা'কে এবং পাঁচটি ফল দান করতে হয়। 
মঙ্গলচণ্ডীর এই  ব্রতকথায় আছে, জয়দেব ও জয়াবতীর কথা। দেবীমাহাত্ম্য বিস্তারের জন্য স্বয়ং মা দুর্গাই বুড়ী ব্রাহ্মণীর বেশ ধরে মর্ত্যে চলেন। 

"মায়া করি ধরে মাতা জরাতীর বেশ, হাতে লাঠি কাঁধে ঝুলি উড়ি পড়ে কেশ'  

উজানী নগরে এক সওদাগরের বাড়িতে তিনি হাজির হন। প্রখর রোদে হঠাত গিয়ে ভিক্ষা চাইলেন। বেনেবৌ থালায় করে চাল আর টাকা দিয়ে সিধে দিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণীর  সাতটি মেয়ে, একটিও পুত্র নেই। বুড়ি সেই শুনে আর ভিক্ষে নিলেন না।  দিনে দুপুরে ভিক্ষা না নিয়ে চলে যাওয়ায় সংসারের অকল্যাণ হবে জেনে বেনেবৌ কান্নায় ফেটে পড়লেন।  এদিকে সওদাগর খোঁজ করে সেই বুড়ির কাছে গেলেন । বুড়ি তার হাতে একটি ফুল দিয়ে বললে, সেই ফুলটি যদি তার বৌ ধুয়ে জল খায় তবে সে সুপুত্রের জননী হবে। বুড়ো বয়সে বেনেবৌ আবার গর্ভবতী হল। ফুটফুটে ছেলে হল তার। তার নাম রাখা হল জয়দেব।  এবার সেই ব্রাহ্মণী হাজির হল আরেক সওদাগরের গৃহে। তার সাতটি পুত্র, কন্যা নেই। তাই ভিক্ষে নিলেন না তাঁর ঘরে। এবারে কারণ হল কন্যাসন্তানকে প্রাধান্য দেওয়া। ঠিক আগের মত‌ই এই গৃহেও ফুল ধোয়া জলপান করে গৃহিণীর কন্যাসন্তান হল। তার নাম রাখা হল জয়াবতী। পাশাপাশি দুটি গ্রামে জয়দেব আর জয়াবতী বড় হয় । 
তারা খেলে বেড়ায়, আপনমনে ছেলেখেলার ছলে মঙ্গলচন্ডীর পুজো করে। জয়দেবের বিশ্বাস নেই কিন্তু জয়াবাতীর অগাধ বিশ্বাস। এভাবেই একদিন জয়দেবের পায়রা এসে বসে জয়াবতীর কোলে। জয়াবতী দিতে নারাজ । জয়দেব প্রশ্ন করে, সে কি পুজো করছে? জয়াবতী বলে এই চন্ডীপুজো করলে

"হারালে পায়, মলে জিওয় খাঁড়ায় কাটেনা। আগুণে জলে ফেলে দিলে মরণ ঘটে না। সতীন মেরে ঘর পায়, রাজা মেরে রাজ্য পায়'

জয়দেবের তা শুনে ভাল লাগে। জয়াবতীকে সে বিয়ে করতে চায়, মা'কে জানায়। জৈষ্ঠ্যমাসের মঙ্গলবারে তাদের বিয়ে হয় । সেদিন জয়াবতী আঁচল থেকে গদ বের করে গিলে খায়। এবার জয়দেবের জয়াবতীকে পরখ করার পালা। অঢেল ধনরত্ন, গয়নাগাটি নিয়ে জয়াবতী জলপথে শ্বশুরঘরে যাত্রা করে। মাঝপথে জয়দেব জয়াবতীকে বলে ডাকাতের উপদ্রবের কথা। কাপড়ের পুঁটুলিতে সব গয়নাগাটি বেঁধে জয়দেব সেটিকে জলে ফেলে দেয়। জয়াবতী তা দেখে মা চন্ডীকে স্মরণ করে।  শ্বশুরবাড়ি গিয়ে পরদিন বৌভাতে অতিথি আপ্যায়নের জন্য নদীতে জাল ফেলে যে মাছ ধরে আনা হয় সেই মাছ কাটতে গিয়ে লোকজন হিমশিম। বঁটি, দা, কুড়ুল কিছু দিয়েই সেই বোয়ালমাছ টি কাটা যায় না।  তখন জয়াবতীর ডাক পড়ে। জয়াবতী মা মঙ্গলচন্ডীকে স্মরণ করে অতি অনায়াসেই বঁটিতে মাছের পেট কেটে ফেলে আর তার গয়নাশুদ্ধ পুঁটুলিটা পায়। তখন জয়দেবও বুঝতে পারে দেবী মাহাত্ম্য। তাই বুঝি মঙ্গলচন্ডীর পুজোয় এখনো মেয়েরা আওড়ায় এই মন্ত্র

আটকাটি, আটমুঠি সোনার মঙ্গলচন্ডী রূপোর পা, কেন মাগো মঙ্গলচন্ডী হল এত বেলা?
হাসতে খেলতে, তেলহলুদ মাখতে, আঘাটায় ঘাট করতে, আইবুড়োর বিয়ে দিতে,
অন্ধের চক্ষু দিতে, বোবার বোল ফোটাতে, ঘরের ঝি বৌ রাখতে ঢাকতে হল এত বেলা। 

এভাবেই ব্রত উদযাপনের মাধ্যমে সংসারের রমণীটি সংসারের সার্বিক সুখ শান্তি কামনা করে থাকে ।

আরেকটা কারণ হল গ্রীষ্মের দাবদাহে ফুটিফাটা বাংলার মাঠঘাট। মা চন্ডীর পুজোয় যদি সময় মত বর্ষা নামে তবে বাংলার কৃষিপ্রধান বর্ধমান জেলাটির শস্যভান্ডারটিও ফুলে ফেঁপে উঠবে সেই আশায় বুঝি মা চন্ডীর শরণাপন্ন হওয়া।  অন্যদিকে এই সময়টা রোগভোগের প্রকোপও নিদারুণ। তাই সংসারে যাতে সেই প্রাদুর্ভাব না হয় তার খেয়াল ও রাখেন গৃহকর্ত্রী। বাকীটুকুনি মায়ের কৃপা। আসলে ঘরে ঘরে এই শীতলা, ষষ্ঠী, চন্ডীর প্রতিমাসে পুজো তো আর কিছুই নয়। মা দুর্গা  বা কালীর শরণ নেওয়া।  
মহাযানী বৌদ্ধধর্মের অবলোকিতেশ্বর কোয়াননের মধ্যে একটি দেবীমূর্তির পূজা হয়। জাপানীভাষায় এই দেবীর নাম “চনষ্টী”। এই চনষ্টী শব্দটি সংস্কৃত শব্দ চন্ডীর অনুরূপ। সুকুমার সেনের মতে চন্ডী শব্দটি এসেছে চান্ডী থেকে। চান্ডী একজন অনার্যা দেবী, যিনি ওঁরাও, বীর, হোড়দের দ্বারা পূজিতা।আর তাই বুঝি বিরচিত চন্ডীমঙ্গলে আমরা ওরাঁও উপজাতিদের দ্বারা পূজিতা দেবীদুর্গার এই চান্ডী রূপটিই পাই।  কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর এই চন্ডীমঙ্গল সর্বজনবিদিত।তাঁর জন্ম বর্ধমানের দামুন্যা গ্রামে। চন্ডীমঙ্গলে আমরা যে উজানি গ্রামের কথা পাই সেখানে একটি চন্ডীমন্দির আজো আছে। এছাড়া অজয়নদীর তীরে কোগ্রামেও রয়েছে বর্ধমানের পল্লীপ্রেমী কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বিখ্যাত চন্ডীমন্দিরটি। 

  

শ্রাবণী পূর্ণিমা এবং লুন্ঠন ষষ্ঠী

Ei Samay Bardhaman Suppliment, 24th July 2017


বর্ধমান মিউনিসিপালিটির অনতিদূরেই বর্ধমানেশ্বর শিবমন্দির খুব প্রাচীন নয় । বাংলার ১৩৭৯ সালের শ্রাবণমাসেই এঁকে আবিষ্কার করা হয়। বিশাল পরিধির এই শিবলিঙ্গটি না কি চাঁদসওদাগরের আরাধ্য গৃহদেবতা। এনাকে "মোটা শিব" ও বলা হয়। আরেকটি হল নবাবহাটের তালিতের ১০৮ শিব মন্দির। এটি ন্যাশানাল হাইওয়ের ধারেই। বর্ধমানের মহারাজা তিলকচাঁদের বিধবা স্ত্রী বিষ্ণুকুমারী নাকি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে এই ১০৮ শিবমন্দির তৈরী করেছিলেন।
১৭৮৮সালে এই মন্দির নির্মাণ কার্য শেষ হয়।

শ্রাবণমাসে মনসাপূজা, অরন্ধন ছাড়াও বর্ধমানেশ্বর আর তালিতের ১০৮ শিব মন্দিরে সারাটা শ্রাবণমাস ধরে চলে বিশেষ শিব পূজা।

শ্রাবণের মেঘজাল ভেদ করে শুক্লা একাদশীর চাঁদ বেরিয়ে আসবে। ধীরে ধীরে তার ষোলকলা পূর্ণ করবে। তারপর সেই পূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্না চুঁইয়ে পড়বে সমস্ত চরাচরে। শ্রাবণের ধারাজলে ধৌত সবুজ প্রকৃতি, বৃষ্টি স্নানে আপ্লুত পাখীকুল সেই শেষ বর্ষার পূর্ণিমার আলো দেখবে । ধানচারা রোপণের আনন্দে কৃষকের মনে পরম তৃপ্তি আর তৃষ্ণার্ত চাতক চাতকীর মন যেন কানায় কানায় পূর্ণ ।
বিশ্বনাথের জন্মমাস নাকি শ্রাবণ। শ্রাবণীপূর্ণিমাতে সেই জন্মমাস উদযাপিত হয় শিবলিঙ্গে জলধারা বর্ষণ করে । আসেপাশের নদী, নালা, সমুদ্র, কুন্ড যা আছে সবই তো বর্ষার জল পেয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা জলাধার। এবার শিবভক্তদের বাঁক কাঁধে নিয়ে খালি পায়ে সেই জলাধার থেকে মাটির ঘটি কিম্বা কলসী ভর্তি করে আবারো পায়ে হেঁটে শিবমন্দিরে গিয়ে শিবলিঙ্গকে সেই জলে সিক্ত করা....এ তো চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। সোমবার নাকি শিবের বার । তাই শ্রাবণের সপ্তাহান্ত গুলো জমজমাট থাকে শিবভক্তদের কোলাহলে। নতুন গৈরিকবাস, নতুন মাটির কলস, বাঁক আরো আনুষাঙ্গিক কতকিছু! আবালবৃদ্ধবণিতা সামিল হয় কাঁবর কাঁধে এই পথচলায়। কিসের এই পথচলা? কিসের এই আকুতি? মহাদেব নাকি ভক্তের বয়ে আনা এই জলেই তুষ্ট হন। কাঁধে বাঁক নিলেই কঠোর সংযম। বাঁক রাখলেই আবার শুদ্ধ হয়ে তবেই পুনর্যাত্রা। ভাল, মন্দ, সৎ অসৎ সকলেই পাপ স্খালনের আশায় এই ব্রত করে।

"ভোলেবাবা পার লাগাও, ত্রিশূলধারী শক্তি জাগাও, ব্যোম্‌, ব্যোম্‌ তারক ব্যোম্‌, ভোলে ব্যোম্‌, তারক ব্যোম্‌ …' এই সম্মিলিত বাণী ছড়িয়ে যায় তারা। তাদের পথচলায় অনুরণিত হয় এই শব্দগুলো বারেবারে আর সেই সাথে থাকে টুং টাং ঘন্টাধ্বনি।

পুরাণে বলে সমুদ্র মন্থন হয়েছিল এই শ্রাবণেই। মহাদেব সেই মন্থনের ফলে উঠে আসা গরল নিজকন্ঠে ধারণ করে নীলকন্ঠ হয়েছিলেন। তাঁর এই বিষের জ্বালা নিরাময়ের কারণেই শিবলিঙ্গে অনর্গল জল ঢালার রীতি।দল বেঁধে প্রতিটি পাড়া থেকে জনায় জনায় কত মানুষ এই শিবলিঙ্গে জলঢালা আর শ্রাবণী পূর্ণিমার মেলায় সামিল হবার আশায় জমায়েত হন বছরের এই সময়টায়। জলযাত্রীদের জন্য পসরা নিয়ে আশপাশের গ্রাম থেকে দোকানিরাও বসে পড়ে। প্লাস্টিকের ঘট, মাটির কলসি, ফুল বেলপাতা, গেরুয়া পোশাক, বাঁক, গামছা, তোয়ালে, বাঁক সাজানোর উপকরণ হিসেবে ঘণ্টা, কী থাকে না সেখানে? এভাবেই বুঝি বছরের পর বছর টিকে থাকে হিন্দুদের শিবমহিমা, তাদের ধর্মবিশ্বাস। শ্রাবণ যে মহাদেবের বড়ো প্রিয় মাস। ভক্তের ঢল নামাতে তিনিও খুশি হন যে!

বৈষ্ণবদের ঝুলনপূর্ণিমার মহামিলনে অথবা শিবমন্দিরগুলির প্রাঙ্গণে শৈবদের এই শ্রাবণী পূর্ণিমাটিও মহামিলনের বার্তা দেয় ।

এছাড়াও মায়েদের হাতের পাঁচ হল শ্রাবণমাসের শুক্লপক্ষের তিথিতে ধুমধাম করে হয় লোটনষষ্ঠীর পুজো। এর ব্রতকথাটিও চমৎকার।
লোটন মানে নোটন, মানে ঝুঁটিওলা পায়রা। একপাল নাতিপুতি নিয়ে কাদম্বিনীর ভরভরন্ত সুখি গৃহকোণ।পাড়ার প্রৌঢ়া বিমলিমাসিও নিমন্ত্রিত।তিনি আবার একটু আধটু ক্লেপট্যোম্যানিয়াক। সকলের অজান্তে টুকটাক জিনিসপত্র সরানোর অভ্যেস আছে তাঁর। গাঁয়ের অনেক লোকের ভীড়ে বিমলিপিসি প্রসাদ খেয়ে বাড়ি ফেরেন। সাথে হাতসাফাই করেন কাদম্বিনীর সোনার তিনটি খুদে লোটন। এই ষষ্ঠীর পুজোতে মাষষ্ঠীর পায়ের কাছে রাখা থাকে ছটি সোনার লোটন । কৌটোর মধ্যেই থাকে লোটনগুলি। সকলে যখন প্রসাদ বিতরণে ব্যস্ত বিমলিপিসি তখনই কাজটি সেরে নেন। ওনার এই স্বভাবটির কথা জানেন গাঁয়ের সকলে। পুজো শেষে জিনিষপত্র গুছিয়ে রাখতে গিয়ে কাদম্বিনী টের পেলেন তিনটি লোটন কৌটোর মধ্যে থেকে চুরি গেছে। তখুনি কাদম্বিনীর সন্দেহ হয়। বিমলিপিসির তলব করলেন তিনি কিন্তু বিমলিপিসি মানলেন না। অতঃপর কাদম্বিনী মাষষ্ঠীকে ডেকে কেঁদে কেটে একশা। মা ষষ্ঠী ভক্তের আকুল আহ্বানে বিচলিত হলেন ও বিমলিপিসির তিনটি ছেলেকে কঠিন রোগে ফেললেন। স্বপ্নাদেশ পেলেন বিমলিপিসি এবং শীঘ্র ঐ চুরি করা লোটন তিনটিকে ফেরত দিতে বললেন। এবার বিমলিপিসি কাদম্বিনীর বাড়িতে লোটন ফেরত দিতে গেল আর ষষ্ঠীর পুজোর নিয়ম জানতে চাইল। টাইমট্রাভেল করে আবারো ফিরে এল শ্রাবণের শুক্লাষষ্ঠী। বিমলিপিসি লোটনষষ্ঠীর পুজো করে তার ছেলেদের নীরোগ শরীর পেল। লোটন চুরি গেছিল বলে এই ষষ্ঠীর আরেক নাম লুন্ঠন ষষ্ঠী।

সারা বাংলার অগণিত মন্দির চত্বরে ষষ্ঠীতলা থাকবেই। আর সেখানে বট, অশ্বত্থ কিম্বা পাকুড় গাছের নীচে, মাটীর বেদীতে, অথবা নদীর ধারে পড়ে থাকবেই পরিত্যক্ত, বিসর্জিত মা ষষ্ঠী, শীতলা, মনসার মূর্তি। মানুষের অগাধ বিশ্বাস, পুজো করে জলে ফেলতেও মন চায়না। আজকাল আবার জলদূষণের জন্য নদীতে ফেলতেও মানা আছে। আর সেই পরিত্যক্ত মাটীর মূর্তিতেই ষষ্ঠী পুজোর সুতো বেঁধে ফলমূল নিবেদন করে আসে মায়েরা। সংসারের মঙ্গল কামনায়। সন্তানের কল্যাণে। অথবা কেবলমাত্র মনের শান্তিতেই মা ষষ্ঠীর আরাধনাতে মগ্ন থাকেন একটি দিন। উপোস করে পয়সা তুলে রাখেন তাকের ওপর। ব্রতকথার পুঁথিটিতে মাথা ঠেকিয়ে সেদিনের মত ফলাহার করেন। প্রত্যেক ষষ্ঠীই আসলে মা দুর্গার পুজো। মায়ের এক অঙ্গে বহু রূপ। মা কখনো চন্ডী, কখনো ষষ্ঠী, কখনো শীতলা। তবে ষষ্ঠীমাতা শুধুই সন্তানবতীদের দেখেন সেটাই বড়ো একচোখোমি।

শ্রাবণমাসে শুধুই কি শিবের পুজো হবে? তাই মা দুর্গা এগিয়ে আসেন নিজের পুজো নিতে। আর তাই বুঝি এইমাসে লুন্ঠন ষষ্ঠীর এত চল। আর সেখানেই পুরুষ আর প্রকৃতির জয়।

৩ জুল, ২০১৭

সর্বমঙ্গলা বিপদতারিণী মা দুর্গা


Ei Samay Burdwan Suppliment 3rd July 2017


বর্ধমানের মানুষজনের বিশ্বাস দেবী বিপত্তারিণী হলেন মা দুর্গার অনেকগুলি অবতারের মধ্যে একটি। আষাঢ়মাসে শনি-মঙ্গলবারে মহা ধুম করে এখানে মেয়েরা বিপদতারিণীর পুজো করেন। অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন রীতিতে এ নির্মিত মন্দির হল বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দির । ১৭০২ খ্রীষ্টাব্দে বর্ধমানের মহারাজ কীর্ত্তিচাঁদ হলেন এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠিতা  । 
এখানে দেবী কষ্টি পাথরে অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী মহিষমর্দ্দিনী। এই সেই মন্দির যেখানে দুর্গাপুজোর সন্ধিপুজোয় কামান দাগার ক্ষণটিতে সারা জেলা জুড়ে একযোগে অষ্টমী-নবমী সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম বর্ধমানের কবি রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল কাব্যেও উল্লেখ আছে এই সর্বমঙ্গলা দেবীর । 

স্থানীয় মানুষদের কিংবদন্তী  বলে বর্ধমানের উত্তরে সর্বমঙ্গলা পল্লীতে ছিল বাগদী সম্প্রদায়ের বাস। সেখানেই নাকি ছিল এই কষ্টিপাথরের বিগ্রহটি। তারা না জেনে বুঝে এই পাথরটির ওপরে তাদের খাবার জন্য গেঁড়ি, গুগলি, শামুক, ঝিনুক রেখে ভাঙত প্রতিদিন। আর চুনোলী মানে যারা চুন তৈরী করে তারা এসে খোলাগুলি পরিষ্কার করে নিয়ে যেত। একদিন তারা খোলার সাথে সেই পাথরটিও নিয়ে যায় আর চুনভাটির মধ্যে পাথরটিকেও পুড়তে দেয়। কিন্তু পাথরটি পোড়ে না। পরে তারা দামোদর নদে পাথরটি ফেলে আসে। দামোদর নদের  বিছানায় পাথরটি পড়ে থাকতে দেখে এক ব্রাহ্মণ সেটিকে ধুয়ে মুছে এনে সেটির গায়ে দেবীমূর্তির সকল চিহ্ন দেখতে পান ও তক্ষুনি তাকে গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠা করেন ।  
প্রতিবছর এখানকার মেয়েরা নিজেদের বিশ্বাসে হাজির হয় এই জাগ্রত মন্দিরে। কেউ কেউ নদীতে স্নান করে দন্ডী কাটে বিপদ কেটে যাবার আশায়।  ভাবলে অবাক হতে হয়, এই বাংলায় দেবী দুর্গা তবে শুধুই আশ্বিন মাসে পূজিতা হন না । প্রতিমাসেই তাঁর আরাধনা নিয়ে থাকে বাঙালী, সংসারের মঙ্গলকামার্থে, বিপদের হাত থেকে বাঁচবে বলে।
বিপত্তারিণী পুজোর ব্রতকথাটি ঘাঁটলে দেখতে পাই তেমনি এক গল্প যেখানে ধর্মশীল বৈদর্ভ রাজ্যের রাজার রাণী সুরূপা অগাধ বিশ্বাসে মা বিপদতারিণীর ব্রত করেছিলেন । রাজা অনেক দান-ধ্যান,  যাগ-যজ্ঞ করতেন এবং প্রজাপালক রূপে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন । তাঁর রাণী  সুরূপাও ছিলেন ধর্মপরায়ণা। তিনি জাতপাঁতের বিচার না করে সমাজের আপামর স্ত্রীলোকের সাথে সমানভাবে  মিশতেন । এক নিম্ন শ্রেণীর চামার বৌয়ের সাথে তিনি স‌ই পাতিয়েছিলেন । ফলে রাজবাড়িতে এই চামার বৌটির খুব যাতায়াত ছিল । রাণী সুরূপা ভালোভালো খাদ্যদ্রব্য তাকে দিতেন এবং তার বিনিময়ে সেই চামার বৌ রাণীকে নানাবিধ ফলমূল এনে দিত । এইভাবে বেশ চলছিল উভয়ের বন্ধুতা ।

একদিন সুরূপার সাধ হ'ল গোমাংস কেমন হয় তা চাক্ষুষ দেখতে । চামার বৌ তাকে বারবার নিষেধ করল কিন্তু রাণী তাঁর জেদ ধরে বসে র‌ইলেন। অতঃপর চামার বৌ পরদিন একটি থালায় করে চাপা দিয়ে কিছুটা গোমাংস নিয়ে যেমনি রাজবাড়িতে প্রবেশ করবেন তখুনি দ্বারীর তা নজর পড়ল । রাজাকে গিয়ে তত্ক্ষণাত সে নালিশ করলে । প্রহরীকে বেঁধে রেখে রাজা স্বয়ং রাজ অন্দরমহলে গেলেন সত্যতা  যাচাই করতে। রাণী সেই সময় তাঁর স‌ই কে আদেশ দিচ্ছিলেন, সেই গোমাংস পূর্ণ থালাটি  খাটের নীচে লুকিয়ে রাখার জন্য ।
রাজা এসে রাণীকে জিজ্ঞাসা করলেন "তোমার স‌ই তোমার জন্য কি উপহার এনেছে আমাকে দেখাও"
রাণী তো রাজাকে দেখে ভয়ে চোখে অন্ধকার দেখলেন এবং বিপদগ্রস্ত হয়ে মা বিপদতারিণীকে স্মরণ করলেন । কারণ বাড়ীতে গোমাংস ঢুকেছে  জানলে রাজা  রাণীর গর্দান নেবেন।
মাদুর্গার আসন রাণী সুরূপার আর্তিতে টলে উঠল । তিনি রাণীকে যেন কানেকানে বললেন ঐ চাপা দেওয়া থালাটির মধ্যে তার স‌ইয়ের দেওয়া চৌদ্দটি ফল  রাজাকে দেখিয়ে দিতে এবং স্নান সেরে রাজাকে সেই ফলগুলি ব্রাহ্মণকে দান করতে ।  রাণী সুরূপা তো অবাক! থালার চাপা সরিয়ে রাজাকে দেখালেন সেই চৌদ্দটি ফল । মাদুর্গার কৃপায় গোমাংসের চৌদ্দটি ফলে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনা দেখে রাজা এবং  রাণী সুরূপা নিজে তো বিস্ময়ে হতবাক । মাদুর্গা রাণীকে আরো বললেন যে তিনি স্বয়ং বিপদতারিণী মা । যে তাঁকে স্মরণ করবে তার কোনো বিপদ আপদ হবেনা ।
রাণীকে যাবজ্জীবন এই ব্রত পালন করতে বলে তিনি অন্তর্হিত হলেন। রাণী এভাবে বিপদ থেকে মুক্তি পেলেন।
রাজা স্নান সেরে এসে সেই ফলগুলি ব্রাহ্মণসেবায় দিলেন । মা বিপদতারিণীর অলৌকিক ক্ষমতায় সেদিন সুরূপা প্রাণে বেঁচে গেছিলেন।   
সেই থেকে বর্ধমান তথা সারা বাংলার এয়োতিরা এই বিপদতারিণী পুজোয় সামিল হয়ে নিষ্ঠাভরে দেবী দুর্গার পুজো করেন।  শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া থেকে দশমী অবধি যে যে শনি ও মঙ্গলবার পড়ে সেগুলিতে এই ব্রত পালনের নিয়ম। একটি চুপড়িতে তেরো রকমের ফল (দুটি খণ্ড করা), তেরো গাছা লাল সুতো, তেরো রকমের ফুল, তেরোটি মিষ্টি, পান, সুপারী হল এই পুজোর উপাচার। পুজো শেষে ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা দিয়ে তেরোটি গাঁট দেওয়া লাল সুতো বা তাগা  মেয়েদের বাঁহাতে আর ছেলেদের ডান হাতে বেঁধে দেবার  নিয়ম।
আর পুজো শেষে যেনতেনপ্রকারেণ তেরোটি নুন না দেওয়া লুচি খেতেই হবে উপোসী ব্রতীকে। তাই দেখেছি এই পুজোর দিনে ছোট্ট ছোট্ট লুচি বানাতে, পেট ভরে গেলেও যাতে শেষ করা যায় তেরোটি।  আর সারাদিনে পুজো করে ঐ একবারই খেতে পারবে সে। কোনও তরকারী খাওয়া চলবে না ঐদিন।
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। এভাবেই মা বিপত্তারিণী একাধারে সংকট হারিণী আবার বাংলায় অবশ্য কর্তব্য আষাঢ় মাসের দুর্গা পুজোও বটে।

১৪ ফেব, ২০১৭

ভ্যালেন্টাইনস ডে

ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিল না আমাদের সময়ে । কিন্তু তখনো প্রেমে পড়ত ছেলেমেয়েরা । আর বসন্ত এলেই প্রেমের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিত তারা । যেমন এখনো দেয় সকলে।  পালন করত নিত্য নতুন ভ্যালেন্টাইনস ডে । কখনো হোলি, কখনো সরস্বতী পুজো কে উপলক্ষ করে। 
আর প্রণয়ের পারাবারে সাঁতার কাটতে কাটতে বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীরা ? দৈনন্দীন জীবনের একঘেয়েমিতে কেমন পাগল পাগল ভাব নিয়ে  তারাও মাঝে মাঝে পালন করত ভ্যালেন্টাইন্স ডে । স্বামী তার বিশেষ দিনটিতে স্ত্রীয়ের জন্য ছোট খাট সোনার গয়না কিনে উপহার দিতেন । অথবা আচমকা নিয়ে আসতেন বম্বেডাইং এর ফুলকাটা সুন্দর ডাবল বেডশিট। কোনও বার গিন্নীর জন্যে একটা ফুরফুরে পাতলা ডি সি এম এর ভয়েল কিম্বা  ফুলিয়ার টাঙ্গাইল।  অফিস থেকে ফেরার পথে, জলযোগের মাংসের প্যাটিস কিম্বা ফারপোর ফ্রেশলি বেকড কেক নিয়ে বাড়ি ফিরে বলতেন... 
"কি গো চা বসাও ? দেখ আজ কি এনেছি, তোমার জন্যে" 
কিম্বা পকেট থেকে বের করতেন বিশ্বরূপা, রঙমহল এর নাটকের সস্তার টিকিট দুটি। 
সদ্য শীতের আলস্য কাটিয়ে তাঁর গৃহিণীটি ঘরের মধ্যে থেকে গা ধুয়ে কিউটিকিউরার ফুলেল গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে নরম ছাপা শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে সলজ্জে যেন হাতে চাঁদ পেতেন। কত অল্পে খুশী ছিলেন এঁরা। এগুলি যেন সংসার করার পার্কস বা উপরি পাওনা, বোনাসের মত। এ সব দেখেছি আমাদের বাবা মায়েদের আমলে ।
মনে আছে এমনি মধুর নাতিশীতোষ্ণ সময়ে একবার কলকাতার বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের সারারাত ব্যাপী জলসার টিকিট এনেছিলেন বাবা। হেমন্ত-আরতির গান দুজনেরি খুব পছন্দ। আর তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় খ্যাতির শীর্ষে আর আরতি মুখোপাধ্যায় নবাগতা। এই সারপ্রাইজে মায়ের মুখের হাসিটুকু বাঁধিয়ে রাখা হয়নি কারণ আমি তখন মাত্র ক্লাস ফোর এ।   
স্কুল জীবনের সরস্বতী পুজোর স্মৃতিটা বেশ অন্য ধরণের । যত বড় ক্লাস তত দায়িত্ত্ব । আর ক্লাস টেনের পুজোটা সবচেয়ে সুখের । সেখানে ছোটোদের ওপর দিদিগিরি আর যারপরনেই ফতোয়া জারি করা । সরস্বতী পুজোটা যেন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পাসপোর্ট হাতে পাওয়া । মায়ের হলদে শাড়ি পরে সেজে গুজে একদম ফিল্মি লুক নিয়ে স্কুলের পুজোয় সামিল হওয়া । কিন্তু আমি যে কলেজে পড়েছি সেই কলেজে মা সরস্বতী কলেজ-কন্যাদের রক্ষণশীলতার বেড়াজালেই শুধু আবদ্ধ রেখেছিলেন । মা সরস্বতীর পুজো সে কলেজে ব্রাত্য । অগত্যা বাড়িতে নিজেদের মত করে পুজো করে যে যার গ্রুপ তৈরী করে বেরোনো । ঠাকুর দেখা, খাওয়াদাওয়া, সিনেমা দেখা ব্যাস্‌ ! ঐ অবধি । ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিলনা শেষ আশির দশকে । অতএব নো প্রেম-প্রেম খেলা বা ভ্যালেন্টাইন উত্সব । সরস্বতী পুজোই আমাদের বসন্তের একমাত্র বহু প্রতীক্ষিত বসন্ত উত্সব ছিল । ফাগুণ হাওয়ায়, রঙে রঙে বেশ ছিলাম আমরা । ডিজিটাল গোলাপ ছিলনা, মুঠোফোনের রিংটোনে সংক্ষিপ্ত সংবাদ আসতনা হয়ত কিন্তু ভালোবাসা ছিল সরস্বতীর প্রতি ।



আমাদের বিয়ের ঠিক আশপাশের সময় থেকে শুরু হ'ল ভ্যালেন্টাইন্স ডে । লেট আশির দশকে । ব্যাস! সেই থেকে শুরু "ভ্যালেন্টাইন প্যাকেজ"  ফুলের দোকান থেকে শুরু করে গ্রিটিংস কার্ড , গয়না থেকে কেক, মকটেল, কফি, আইস ক্রিম সর্বত্র সেই তীর বিদ্ধ হৃদয়ের ছবি !  শপিং মলে ঝুলছে বিশাল বিশাল রক্তাক্ত হৃদয়, টিভির পরদায় প্রেমের গান, প্রেমের ছবি, প্রেমের কবিতা আবৃত্তি । আর এসেমেসের চোটে আগের দিন মধ্য রাত থেকে সেলফোনের নেট ওয়ার্ক হ'ল বেজায় স্লো হওয়া... এসব ও দেখেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেলফোন হাতে নিয়ে মুচকি হেসে কথা বলা? এসব ও দেখেছি বহুত। আর ল্যাপটপে চ্যাটালাপ? আর ম-বাবার ঝটিতি আগমন এ কন্ট্রোল টি মেরে অন্য ট্যাব খুলে গা ঢাকা দেওয়া? তাও দেখেছি। 
সামনেই সব ছেলেপুলেদের বড় বড় পরীক্ষা ! তো কি ? পরীক্ষার আগে একটু ডাইভারশান চাই না ? তাই তো সাধু ভ্যালেন্টাইন এই উপায় বাতলেছেন ।
গতবছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে'র দিন সকালে মর্নিং ওয়াকে গেছি; এক ভদ্রলোক তার সহধর্মিনীকে বলছেন " এই রোজ রোজ তোমার পাল্লায় পড়ে সকালে হাঁটতে বেরোনো আমার জীবন বিষময় করে তুলছে" 
নীরব স্ত্রীটি হাঁটতে লাগলেন আরো জোরে জোরে । 
ভদ্রলোক বললেন " খাবার ওপর ট্যাক্স ও বসালে , আর হাঁটাও ধরালে ...তাহলে যেকোনো একটাই করো হয় খেতে দিও না, নয় হাঁটতে  বোলোনা"আমার মা বেঁচে থাকলে দেখিয়ে দিত তোমার মজা  সব কিছুতেই  কাঁটছাঁট ! চায়ে চিনি বন্ধ , সকালে একগাদা ফল খাও , দুপুরে ভাত নৈব নৈব চ ! রাতে মোটে একটা রুটি ! কি কুক্ষণে একটা সেমি-ডায়েটিশিয়ান বৌ এনেছিলাম" 
বেচারী বৌটি তখনো চুপ !  
স্বামীটি আবারো বললে " দাঁড়াও দেখাব মজা , অফিসের বেয়ারাকে দিয়ে ভাল ভাল খাবার আনিয়ে খাব, তুমি জানতেও পারবে না" 
তখন বৌটি আর থাকতে না পেরে মুখ খুলল "আজকের দিনে ঝগড়া করতে  নেই গো , আজ প্রেমের দিন, আজ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে আর তুমি কি না শুধুমুদু আমাকে সক্কালবেলা গালাগালি দিচ্ছ ? আমি যে তোমার ওয়ান এন্ড ওনলি ভ্যালেন্টাইন !" 
একটা সময় ছিল যখন বসন্তের প্রথমদিনে লালগোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কোর্টশিপ চালু  হত । দোল  রঙীন হত  নীল খামে পারফিউম মাখানো চিঠির ভাঁজে লিপষ্টিকের চুমু দিয়ে ।  লুকিয়ে চুরিয়ে পার্কে গিয়ে দেখা করে কিম্বা কলেজ পালিয়ে কফিহাউসের টেবিলে মুখোমুখি হয়ে, হেদুয়া থেকে শ্যামবাজার গা ঘেঁষে ঘেঁষে হেঁটে  বাসে ওঠা ; আবার মনখারাপের পার্টির তোড়জোড় । আবার কবে হবে দেখা ? বাড়ির বড়দের চোখ এড়িয়ে চুপিচুপি লেটারবাক্স হাতড়ে চিঠি খোঁজা । টানটান উত্তেজনায় চিলেকোঠার দুপুরগুলোয় সেই কফিহাউসের স্মৃতির লালন চলত আবার যতদিন না দেখা হয় দুটিতে ।

ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সাথে । ভালোবাসার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । কত চোখ এড়িয়ে প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত ।    এখন   ভালোবাসার বাতাস বয় অর্কুট অলিন্দে। ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা  ভালোবাসা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই প্রেম ।


 প্রেম ছিল তাই রক্ষে! প্রোপোজ ডে, কিসিং ডে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, হাগ ডে,  দোল   ... এই সব দিনগুলোতো  ঐ প্রেমকেই ঝালিয়ে নেবার জন্যেই। প্রেম না থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হত? সারারাত ধরে অনলাইন চ্যাট করে রাতে আধোঘুমে স্বপ্নসুন্দরীকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কোথা দিয়ে একটা সুন্দর সকাল এসে পড়ল ! আর এই মোবাইলফোন ? সেও তো প্রেমের একটা দারুন পজিটিভ ক্যাটালিস্ট । কত সহজে একটা কথা মেসেজ করে জানিয়ে শুরু হয়ে যায় প্রেম । আর ঐ বিশেষ দিন গুলোতে  মনের মানুষটির হাতের মুঠোয়   ভালোবাসার দুটো কথা টুক করে চলে যায় । আঙুলে আঙুলে এমন চটপট প্রেম কিন্তু আগে ছিল না । এখন অনেক সহজ হয়েছে দুনিয়া ।বাজারে   গ্রিটিংস কার্ডের হার্ডকপি  ফুরোল, ভালোবাসার নটেগাছ লকলক করে ডালপালা বিস্তার করে দিল ওয়েব দুনিয়ায় ।


ভালোবাসার উপহারের তালিকায় কাফলিঙ্ক, টাইপিন  এখন অবসোলিট ; আইপড কিম্বা পেনড্রাইভের কাটতি বেশী ।   ভালোবাসার কবিতার খাতা লুকিয়ে থাকত বালিশের নীচে । আর এখন সেই কবিতা ঝরে ঝরে পড়ছে ফেসবুকের বারান্দায়, কার্ণিশে সর্বত্র । তবে ভালোবাসা আছে ভালোবাসাতেই । ভালোবাসা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে । শুধু আগে  শাড়িতে ব্লাউজে ছিল এখন কুর্তি, কেপরি লেহেঙ্গা আর জিনসে ।
তখন ছিল তরতাজা সত্যি গোলাপ । আর এখন তা ডিজিটাল গোলাপ । ছিল বসন্ত কেবিনে দুজনে মুখোমুখি দুটো ডিমের ডেভিল কিম্বা ফাউল কাটলেট । এখনো সেই সংজ্ঞা বদলায়নি কিন্তু চপ-কাটলেট থেকে প্রেম এখন বার্গার-মকটেলে আছড়ে পড়েছে অবিরত । 


ভালোবাসার চুপকথারা তখনো ছিল এখনো আছে শুধু বদলেছে তার মোড়ক । এখন চুপকে চুপকে নয়, ওপেন সিকরেট ।   তখন এই কূলে আমি আর ঐ কূলে তুমি টাইপের একটা ব্যাপার ছিল আর এখন অর্কুটে আমি আর ফেসবুকে তুমি মাঝখানে একরাশ ডেজিটাল ঢেউ । কিন্তু এখন ভালোবাসা আরো স্মার্ট হয়েছে ।  গুরুজনের সামনে ধরা পড়ে গেলে  কন্ট্রোল টি মেরে পালাও । তখন কিন্তু কাপড়ে চোপড়ে টাইপের অবস্থা ছিল । ভালোবাসার আয়ু বেড়ে গেল ভ্যালেন্টাইন পুজোর দৌলতে, আন্তর্জালের কৃপায় । মাঝখান থেকে বসন্তের কোকিল এই টেক দুনিয়া ছেড়ে পালিয়ে গেল । মোবাইল  রিংটোনের  দাপটে তার নিজেরই আজ ভাল্লাগেনা কুহুতান  ধরতে ।

আর ভালোবাসার উষ্ণতার পারদও চড়ছে বসন্ত সমাগমে । কারণটা কি গ্লোবাল ওয়ার্মিং ???    

বসন্ত এসে গেছে

তুচক্রের নির্ঘন্ট মেনে বসন্ত এসে গেছে। শীত পড়বে কি পড়বে না এই শুনতে শুনতে সুপর্ণারাও হাঁফিয়ে উঠেছে  আর সেই ফাঁকে সব শত্রুমুখে ছাই দিয়ে  মাঘের মধ্যিখনেই বিদায়ী শীতের পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়ে ফিরে যাবার তোড়জোড়। আর আমাদেরো লেপ-বালাপোষ-লাইসেম্পি আর যাবতীয় শখের শীত পোষাকদের ন্যাপথলিন বলের আড়ালে মুখ লুকোনো।
শান্তিনিকতনি ঘরাণায় কলকাতার বাঙালীর মাঘোত্সব যেন ব‌ইমেলা। আর সেই ব‌ইমেলার ফুরিয়ে যাওয়া মানেই শীতের যাই যাই ভাব। তখন স্মরণে, মননে বসন্ত জাগ্রত তার ঘরে। যেন এইটুকুনির পথ চেয়ে সারাটা বছর বসে থাকা। আর যদি শীত বাই বাই করে নাকের ডগা দিয়ে চলেই যায়, তাকে অলবিদা জানিয়ে বসন্তকে ওয়েলকাম করাটাই আমাদের একমাত্র লুকিং ফরওয়ার্ড, গোল অফ লাইফ। বসন্ত এসে গেছে।
যাই দেখি কোকিলার প্রসব বেদনা উঠল কি না! কোকিলগুলো ঠিক বুঝতে পারে। ওদের বাসা বানানোর চাপ নেই। স্বার্থপরের মত কাকের বাসায় ডিমটা পেড়েই খালাস। করণটা বসন্ত। এখন আর সময় নেই বাসা বাঁধবার। অলস কোকিল এর  পত্নী আসন্নপ্রসবা।  এখন সময় নষ্ট না করে প্রাণ উজাড় করে তাকে ভালোবাসা দাও। ট্যাঁপোর টোপর কোকিল বৌ টির থৈ থৈ রূপ তায় আবার সে বিয়োবে। অতএব এক্সট্রা কেয়ার নাও।  বাসা বাঁধতে গিয়ে যদি বৌটা হাতছাড়া হয়ে যায়! অগত্যা বরিষ্ঠ পক্ষী বাসিন্দা কাকেশ্বরই ভরসা।
এ বসন্তের প্রতিটি মূহুর্ত  বাঁচো নতুন করে। প্রেমে প্রেমে, নূতন রতনে স্বাগত জানাও। বাদাম গাছের পাতাগুলো ঝরে গিয়ে কেমন বৈধব্য পর্ব চলছিল। হঠাত তাকিয়ে দেখি তার পাতার অগ্রভাগ থেকে মুকুলোদ্গম হয়েছে। কচি পাতা সবে গজাতে শুরু করেছে। কমল মুকুলদল খুলিল বুঝি!  আগুণ রং তার। পাতাশূন্য, রিক্ত গাছ সেই আগুণ রঙে সিক্ত।  সেই গাছের শুকনো ডালে বসে কোকিল তার সন্তানসম্ভবা প্রণয়ীকে খোঁজে আর শিস্‌ দেয়। বসন্তের হিম জোছনায় ভোররাত থেকে কোকিলটা প্রহর গোনে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তার সঙ্গীটিকে কাছে পাবার আশায় ডাকতেই থাকে সে। পুরুষ হয়ে স্ত্রী টির ওপর গুরু দায়িত্ব পালন করেছে সে। সর্বশক্তি দিয়ে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে বলেছে, আমি তোমায় বড় ভালবাসি। কিন্তু তারপর? আরো বড় কাজটি করেছে। তাকে ইমপ্রেগনেট করেছে। অথচ তারপর সে কোথায় বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার পাতবে তা নিয়ে একটুও মাথাব্যাথা নেই তার। একেই বলে উদাসী বসন্ত। কবির কথায় সেই উদাসী বসন্তের হাওয়াতেই পথে পথে মুকুল ঝরে।   
-এই কোকিল ডাকিস কেন রে ? তোর জীবনে এত্ত বোলবোলা কিসের? 
দেখছিস্‌ না? বাইরে পৃথিবীটা কত অশান্ত? তবুও এত্ত স্বার্থপরের মত ফূর্তি তোদের? ভোর থেকেই ডেকেই চলেছিস তোরা। আহাম্মক! 
কোকিল সাড়া দিয়ে আবার বলে, কুহু। কু-কু...উউউউ ।
-আ মলো যা! আবার ডাকে! এই ডাক ঝালাপালা করে দেবে চৈত্রের শেষদিন পর্যন্ত। বাইরের বিশ্বে কি হচ্ছে তার কোনো হেলদোল নেই, ডেকেই চলেছে। তোর কর্কশ স্বর বৌটাকে ভাল লাগিয়েই ছাড়বি?  আমাদের জীবন থেকে বসন্ত বিদায় নিয়েছে রে মুখপোড়া। তবুও বসন্ত এসেছে বুঝতে পারি তোর জন্যে। এই কোকিল, রাগ করলি?
কোকিল বলে পি----উ..উ ।
-এবার অন্য সুর? তার মানে বুঝেছিস আমার কথা? ধরে নিলাম আগেরটা ছিল বসন্তরাগ। এবার ধরলি বেহাগ...কি তাই তো?
কোকিল বলে কু-উ-উ-উ।
-কি মিষ্টি ডাকছিস রে! নে, তোরা বরং প্রেম কর। আমি একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে আসি। বসন্ত আর কোকিল বিলাস করতে করতে যদি ঠান্ডা লেগে যায়! নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু ডেঞ্জারাস বুঝলি কোকিলা? তোদের নেই কো উত্তরপুব তাই তোদের মনে সদাই সুখ। 
শীতের অন্তিম নিঃশ্বাসটুকুনি থাকতে থাকতেই ভুঁইচাঁপা গাছগুলো কেমন শ্রীহীন। কেন বলতো? ওরাও ফুল ফোটাবে এইবারে। পাতাগুলো কেমন মন মরা তাই। সারাটা বছর যেমন তেমন পড়ে থাকে এই সময়টার অপেক্ষায়। তার পরেই বসন্তের দখিণা হাওয়া গায়ে মেখে মাটির মধ্যে থেকে ওদের স্টকগুলো বিকশিত হয়ে সদর্পে ঘোষণা করে তাদের অস্তিত্ব। আম্মো পারি ওদের মত। মানে বাগানের আর পাঁচটা ফুলগাছের মত। 
শীতের অবসান মানেই বাঙালীর ঘরে নিম বেগুণের গন্ধ। কাঁচা আম দিয়ে টকের ডাল আর সজনে ডাঁটা দিয়ে চচ্চড়ি, টোপাকুলের অম্বল । এসব নাকি খেতেই হয় এসময় । "রুড ফুড অফ বেঙ্গল"... নাম করা ফুড জার্নালিষ্ট ভীর সাঙ্ঘভির দেওয়া অনবদ্য নাম। সিম্পলি অসাম এই সময়। শীতের পার্টির অবসান। তেল-ঝাল-গরগরে রান্নাবাটির বিরাম। বসন্তে চাই হালকাপুলকা মানে সহজপাচ্য। কারণ পেট ঠান্ডা রাখো নয়ত রোগের প্রকোপে পড়বে বাপু! জন্মেছ ট্রপিকাল দেশে, মরিবে কি অবশেষে?  তাই বুঝি এদেশের আমগাছে বউল এসেই গেছে আর চিরুনির মত সারে সারে সজনে ডাঁটা ঝুলছে তো ঝুলাছেই। বাতাসে সজনে ফুলের ঘ্রাণ। নিমগাছে কচি কচি সবুজ নিমপাতা ধরেছে মনের সুখে। আবার কোকিলটা সেই নিমগাছটাতেই বসে দোলা খাচ্ছে। কারণ বসন্ত এসে গেছে। 
-ও কোকিলা, তোরে শুধাই রে? আবার সেই এক কথা। কেন রে তোর কোকিলটা বাসা বাঁধে না?
এই বসন্তটাকে  আষ্টেপৃষ্টে সে গায়ে মেখে নিচ্ছে আর তুই কেবলি তাকে সিডিউস করছিস যাতে সে অন্য কারো দিকে না চলে যায়। আচ্ছা কোকিলা তুই সত্যি সত্যি ওকে খুব ভালোবাসিস না রে? কিন্তু তোর ডিম পাড়া হয়ে গেলে  ঐ কোকিলটা আর তোর হয়ে থাকবে সারা জীবন? না কি আসছে বছর বসন্তে সে অন্য এক কোকিলার জন্য ডেকেই চলবে? আর ভুলে যাবে তোকে।
যাক আর ভ্যানতাড়া না করে সকলে বসন্তের পায়ে পড়ে থাকো দিন কয়েক। সে আসতে না আসতেই বন্ধু দিবস,  গোলাপ দিন, প্রোপোজ দিন, চকোলেট দিন, জড়িয়ে ধরার দিন, চুমুর দিন...করতে করতেই ভালবাসাবাসির দিন। এবার সে যেতে না যেতেই দে দোল, দে  দোল... দোলের দিন । রাধাকৃষ্ণের ফষ্টিনষ্টির দোহাই দিয়ে আমজনতার মাতামাতি ইত্যাদি। ওদিকে বসন্ত সমাগমে সারস্বত সমাজ হাইপার।  সোশ্যাল নেটে সাহিত্যের ঝলক। আর কেন‌ই বা লিখবেনা তারা?  মধুর বসন্ত এলে তারা " কুহক লেখনী ছুটায়ে কুসুম তুলিছে ফুটায়ে, লিখিছে প্রণয়-কাহিনী বিবিধ বরন-ছটাতে..." রবিঠাকুরের কথা। 
কি মহিমা এ বসন্তের! তবুও শান্ত হয়না পৃথিবী, সেটাই বড় কষ্টের।
একটু বিষাদ, একটু বিরহ, একটু প্রেম, একটু ভালোলাগা সব মিলিয়ে আমাদের বেশ একটা ফিল গুড ফ্যাক্টর কাজ করে এই সময়। ভোগ্য পণ্য সবেতেই অফ সিজন ডিসকাউন্ট। কেন রে ভাই? বসন্ত তোদের কাছে একটা অফ  সিজন? ব্যবসায়িক কেমিষ্ট্রি অবিশ্যি আমরা বুঝব না। আসলে  লোকটানার কৌশল। ছুতোয় নাতায় স্প্রিং ফেস্টের আকর্ষণ। ছলে বলে কৌশলে কখনো গোলাপ ফুল, কখনো চকোলেট, কখনো বা টেডি বেয়ার আর ভ্যালেন্টাইন গিফ্ট তো হাতের পাঁচ।  বসন্তে মানুষের সম্পর্ক ঝালিয়ে নেবার পালা। সেই আবার নতুন করে পাব বলে।
কখনো হেঁটে পেরুব শিমূল বিছানো গালচের পথ, কখনো মহুয়া সরণী, কখনো পলাশ কুড়িয়ে নেব দুহাত ভরে । সেই রং চোখ থেকে মুছতে না মুছতেই আবার এসে পড়বে আমাদের বসন্তের রংয়ের উত্সব।
 ছোটবেলায় বসন্তের খোলা জানলায় দাঁড়ালে বড়রা বলতেন বসন্ত কিন্তু ভয়ানক। যতটা দেয় ততটাই নেয় উশুল করে।  সত্যি তো, ঘরে ঘরে অসুখ এই সময়ে। আর ঋতু পরিবর্তনে এই মারণ ব্যাধির থেকে মুক্তিলাভের আশায় আবার নতজানু আমরা নারীশক্তির কাছে। বাসন্তীপুজোর আয়োজন। কারণ যমদংষ্ট্রা বসন্ত ঋতুর রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে অতি প্রাচীনকাল থেকেই আমরা পরিচিত।  ঋতুর নামে রোগ‌ও রয়েছে বটে। কি আর করি? ফাগুণ হাওয়ায় সব দান করেছি যে আজ। তাই তো আমার আপনহারা, বাঁধনহারা প্রাণ।
কলকাতা ২৪x ৭ 

১১ ফেব, ২০১৭

কন্যাশ্রী সরস্বতী

 রস্বতীপুজোর  ভোর হতে না হতেই একছুট্টে কলঘরে।  তারপরেই হুড়োতাড়া করে  ফ্রকের ওপরে  কষে  মাড় দেওয়া ফুল ফুল নতুন বৃন্দাবনী ছাপাশাড়ী চাপিয়ে  কাবুলিওয়ালার মিনি সেজে, জড়ভরত মার্কা হয়ে ইস্কুলের সরস্বতী পুজো ।  শাড়ির কুঁচি, বোঁদের সঙ্গে লুচির কুচি, খিচুড়ির সাথে গরম বেগুনী আর শাড়ির  কড়কড়ে আঁচল নিয়ে আমি থরথর যেন। ল্যাজেগোবরে অবস্থা কুমারীর ।  তখন আমি দশ কি নয় । নো চাপ তখন! বড় হয়নিতো মেয়ে তাই কিছুটা নিশ্চিন্ত মা, বাবা।

এরপর বোধবুদ্ধি বিকশিত হবার আগেভাগেই  মিষ্টি টিনের আমি। একটা ফক্কড় ছোঁড়া স্কুল যাবার পথে রোজ সাইকেল চড়ে চারপাশে ঘুরপাক খেত। যদিও ধর্ষণের ধারাপাত অধরা তখন। কারণ এত মিডিয়ার প্রবচন নেই আকাশে, বাতাসে। বাড়িতে এসে জানালাম মা'কে। মা বাবাকে পাঠালো । চুপিচুপি বাবা আমাকে ফলো করল আর সেই ছোঁড়াকে ভয়টয় দেখিয়ে সেযাত্রায় তার নতুন সাইকেল চড়া মাথায় ওঠালো। তাই টিনে পা দিতেই  মায়ের চোখ ঘুরছে সর্বত্র। পারলে শ্যাম্পু করা উড়ো উড়ো মাথায় একখাবলা তেল ঢেলে দিল বলে! পাছে আমাকে ছেলেরা ঝাড়ি করে । পরেছিও জম্পেশ একখানা ডিসিএমের ভয়েল শাড়ি । আগুণ-ফাগুণ-বেগনী ফুলফুল ছাপা। শ্যম্পু চুল হাওয়ায় উড়িয়ে  লাস্যময়ীরা এমন পরেন সানন্দাতে। চেখে পড়েছে সেই টিনেই । যাবার সময় ক্যাচাল্! চুলটা বেণী করতেই হবে।মায়ের ফতোয়া। আবার ডবল ঝুঁটি। নো ওয়ে! আমিও নাছোড় । তারপর দর কষাকষি। অগত্যা মধুসূদনের মত রক্ষা করলেন বাবা। " আহা! ছেড়েই দাওনা একটা দিন্! সরস্বতী পুজো বলে কথা।  নিজের দিনগুলোর কথা ভাব দিকিনি!” 

তারপর টিন পেরোনো আমি যুবতী। যেন বেতস লতা। চোখে মুখে শিক্ষা আর কথার খ‌ই অনবরত ফুটছে টগবগ করে । একটু একটু করে বোধশক্তির অধিকারিনী হচ্ছি । মানে জাগো কুমারী, বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতা কন্যাশ্রী !   সেই কলঘরের ভোর পেরিয়ে বাথরুমে গ্লেজড টাইলস আর বাথরুমের আয়নায় নিজেকে আবিষ্কার করার পালা। সরস্বতীপুজো যেন পড়ার চাপে ফেড একটু। তবুও বছরে একটা দিন আগলছাড়া পাগল পাগল ভাব। তখনো মায়ের চোখ সামনে পেছনে। প্রেম হলনা তখনো। স্কুলের আলপনা, লুচি-আলুর দম-বেগুনী,বোঁদে আর মায়ের দামী সিল্কের শাড়ি তখন পরণে। কিছুটা বড় মাপের চামড়ার চটি পায়ে দিয়ে গেছি। আর সেই চটি  হারিয়ে ফেলে কি বিপত্তি!   সেটা ছিল মায়ের সে বছরের পুজোর নতুন চটি। বাটিকের কাজ করা । কলেজস্ট্রীটের রাদু থেকে কেনা ।
তারপর খালিপায়ে সাইকেল রিকশা চড়ে বাড়ি ফিরে বেদম বকুনি! বারণ করা সত্ত্বেও নতুন চটিজোড়া পরে গেলি! দিন দিন যেন উড়ছে মেয়ে! ঘুচিয়ে দেব উড়নচন্ডী ভাব, ইত্যাদি ইত্যাদি! 

তারপর ভাইয়ের সাথে আলমবাজার থেকে বরানগর বাজার সার্ভে করে সরস্বতী পছন্দ করা।  যেন কনে দেখতে যাওয়া। চোখ চাই বড় বড়, নাকটা টিকোলো। পাতলা ঠোঁটদুটো আর কুচযুগ শোভিত কুঁচ বরণ কন্যা ।  মনের মত করে পুজোর বাজার আর বাবা নামক পুরোহিতের দ্বারা  পুজো উতরোনো ।  ধান-যবের শীষ থেকে শুরু করে আমের মুকুল, পলাশকুঁড়ি থেকে প্যাঁড়া, চিঁড়ে-মুড়কি থেকে খৈ-দৈ... এক্কেবারে ষোড়শ উপচার । কোনও অনুষ্ঠানের ত্রুটি নেই।  কলেজবেলা তখন আমার । বীরখন্ডি-কদমায় তদ্দিনে ফ্যাশন আউট সানন্দার । ক্যালরি কনশাস তন্বী তনয়া। খাগের কলম ডোবানো মাটির দোয়াতে ভায়ের জন্য ডুবু ডুবু কাঁচা দুধ ঢালা।যেন ভায়ের হল শুরু, আমার হল সারা। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পেরোনো আমি যেন মুক্ত বিহঙ্গ। স্বাধীনতার পাসপোর্ট তখন আমার বগলে। বাব তখন বন্ধু আমাদের । পুজোয় বসে তিনি বলেন নিদেন একখান বিড়ি না হলে পুজোয় বসবেননা তিনি।পুরুতমশাইরা নাকি কানে বিড়ি গুঁজে আসেন পুজো করতে!   এবার মায়ের কাছে কাকুতি মিনতি করে বাবার জন্যে স্পেশ্যাল চা হাতে দিতেই তিনি গলে জল হয়ে পুজোয় বসলেন।  বুঝলাম, কত বিচক্ষণ হলে সংসারে গিন্নীর কাছ থেকে এক্সট্রা এককাপ চা আদায় করা যায়! 

দুই বিরুণী থেকে এক বিরুণী ও শেষে অলবিরুণি gone! খোলা চুলে ট্রানজিশান । সায়েন্স কলেজের গন্ডী পেরুনো। কোর্টশিপ চলছিল হবু বরের সাথে ।  সেবছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে আর সরস্বতী পুজো পড়েছিল পিঠোপিঠি। নীলখামে একখানা প্রেমপত্র এসে পড়ল ঐদিনেই । যেন সুরের ঝর্ণায় হায় মরি হায় মরি হায়রে! ঝর্ণা ঝরে রে! রহিনা ঘরেরে। সেই থেকে প্রেমপত্র চালাচালিতে সাহিত্যচর্চা জেগে ওঠা।  সালটা ১৯৮৯। আটপৌরে, সাদামাটা আমি। কিছুটা আবেগে, কিছুটা ভালোলাগায় ভালোবাসতে শিখলাম আমার প্রথম প্রেমকে।

বিয়ের পর  সরস্বতীপুজো জমিয়ে শুরু করলাম আবারো ছেলের হাতেখড়ি দিয়ে । তারপর মা হওয়ামাত্র‌ই সরস্বতীপুজো আসা মানেই গোটাষষ্ঠীর তোড়জোড়। মানে সব গিয়ে রান্নাঘরের খুন্তি-কড়াইতে । 
সরস্বতীপুজোর পরদিন গোটাষষ্ঠী বা শীতল ষষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গের রীতি । অনেক পূর্ববঙ্গের মানুষও শখে করেন । আমাদের অরন্ধন । পাথরের শিলকে তেল হলুদ জলে স্নান করিয়ে তার কোলে নোড়াটি রেখে দিতে হবে আর জোড়া শিম, ফুল দিয়ে তার পুজো করতে হবে । সব ঠাণ্ডা। তাই বুঝি নাম শীতল ষষ্ঠী। শ্রীপঞ্চমী তিথি থাকতে থাকেতেই গোটা রেঁধে রাখতে হয় । গোটা মুগডাল (সবুজ মুগকলাই ), গোটা শিম, গোটা মটরশুঁটি, গোটা রাঙা আলু, গোটা আলু, গোটা বেগুণ জোড়া সংখ্যায় দিয়ে  (কমপক্ষে ৬টি করে ) গোটা সেদ্ধ হয় নুন দিয়ে । সাথে গোটা শুকনো লঙ্কা আর নুন ।  গোটা মুগ ডালকে শুকনো খোলায় একটু নেড়ে নিতে হবে যতক্ষণ না হালকা গন্ধ বেরোয় । কিন্তু প্রেসারে রাঁধা চলবে না । আর কিছু পরে ঢাকা খুলে দেখতে হবে কিন্তু ডাল বা সবজীকে হাতা দিয়ে ফাটানো চলবেনা ।   সেদ্ধ হয়ে গেলে কাঁচা সরষের তেল দিয়ে নামিয়ে রাখা হয় ।  সাথে পান্তাভাত আর সজনেফুল ছড়ানো কুলের অম্বল ও টক দৈ । সরস্বতীপুজোর পরদিন আমাদের দুপুরের আহারে  সবকিছু বাসি রান্না  খাওয়া হ'ল আমার শ্বশুরবাড়ির রীতি ।
সারাটা পশ্চিমবাংলার মায়েরাই এমন করে গোটাষষ্ঠী করেন ছেলেমেয়ের মঙ্গলকামনায়।  কিন্তু যখন দেখি আজকের ছেলেমেয়ের মায়ের জন্য সেই গোটাষষ্ঠীর পুণ্যফল রেসিপ্রোকেট না করা তখন আমার এ যাবত সঞ্চিত বোধ-বুদ্ধি সব বিসর্জন হয়! 
পুজোর পরদিন পান্তা আর গোটাসেদ্ধ খেয়েদেয়ে বোধহয় একটু ঝিমুনি এসেছিল। 
দেখি বাসন্তী, ভুবনমোহিনী সরস্বতীর উপছে পড়া কলকাতায়  ব্যালকনির সুখ । মনে মনে ডাকি তাঁকে। শুধু বলি আর বছরে আবার এসো মাগো। ভেলায় ভাসতে ভাসতে বেলপাতা বোঝাই হলুদ গাঁদার ঝুড়ি তখন বোধহয়  গঙ্গার মোহানায়  । জলের বুকে ভাসমান সরস্বতী মুখে তাম্বুল আর কপালে সিঁদুর নিয়ে দুলতে থাকে ঢেউয়ের ওঠানামায় । ফিরে আসে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক। "বিদ্যাস্থানে ভয়ে-বচ"দের যেন কৃপা করেন তিনি।  বস্তির সেই ছেলেগুলো যারা বাড়িবাড়ি চাঁদা তুলতে এসে ভুল বানানে নষ্ট করে ডটপেনের সস্তার কালি।  সরস্বতী যাদের কাছে শুধুই একটা পুজো, আনন্দের হৈ হল্লা, আর পাঁচটা হুজুগের মত, খিচুড়ি-বোঁদে-দধিকর্মার সুখ আর পড়ায় ফাঁকির সুখ।  আর মাইকে জোরসে পাগলু থেকে রামলীলা অথবা শীলার জওয়ানি থেকে মুন্নির বদনাম ।  চোখ বুঁজে ফুল ছুঁড়ে আসছি আমরাও ওদের সাথে প্রতিবছর সেই মেয়ের পায়ে যার নাম সরস্বতী।
তখনো জানতাম না আমাদের আদরের সরস্বতী আজীবন কুমারী।  তখন তো জানি তিনি শিব-দুগ্গার শান্তশিষ্ট কন্যা, নারায়ণের ঘরণী।  শুধু লক্ষী মেয়ের মত লেখাপড়া আর গানবাজনা নিয়েই থাকতে পছন্দ করেন। আর তাই ছাত্রছাত্রীরা চোখ বুঁজে সরস্বতীপুজোর দিনে তাঁর পায়ে ফুল ছোঁড়ে। আমিও  ছুঁড়েছি সেই হাতেখড়ির বেলা থেকে আর এখনো ছুঁড়ে চলি মন দিয়ে।  তবে এখন এই সরস্বতীকে আমি কেবল ই বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলে ভাবতে পারিনা। তাঁকে একজন প্রতিবাদী মেয়ে হিসেবে দেখি যিনি অত্যন্ত লড়াকু ছিলেন। 
নিজেকে অনেকবার প্রশ্ন করেছি এই সরস্বতীর বিয়ে নিয়ে। আমাদের এই মেয়েটি কি সুখী বিবাহিত জীবন পেয়েছিল নাকি কদর্য এই পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতি ঘৃণায়, লাঞ্ছনায় বিয়ের মত প্রহসনের দিকে পা দেন নি ? না কি আজকের দিনের মত বিবাহ-বিচ্ছিন্নাই থেকে গেলেন আজীবন? অথবা  একাধিক সপত্নীর সাথে ঘর করার অসহ্য বেদনা বুকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে ?  
না:,পুরাণ বলে, পালিয়ে তিনি যান নি। পরাজিতও হন নি । তিনি দাপটের সঙ্গে লড়ে গেছেন পুরুষের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করে গেছেন পুরুষের কামনার স্বীকার হতে হতে । কিন্তু বেঁচে রয়েছেন আজো মানুষের মনে কারণ তিনি জয়ী ।  সে যুগে বিয়ের ফাঁদে আদৌ কি বাঁধা পড়তেন দেবদেবীরা ? রক্তমাংসের সম্পর্কের মত দেবদেবীদেরও তো কৈশোরে বয়ঃসন্ধির সুবাদে দেহরসের ক্ষরণ ও সেই হেতু ছোঁকছোঁকানিও ছিল । ছিল ইভ-টিজিং ও মোলেষ্টশান । আর জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলি দেব-দৈত্যকুলে রেপিষ্টের সংখ্যাও নিদেন কম ছিলনা সেযুগে । তারা লিভটুগেদার বা "থাকাথাকি" তে বিশ্বাসী ছিলেন না বিয়ের মত লিগাল ইনস্টিটিউশানে বিশ্বাসী ছিলেন সে তো পরের কথা।  সেক্স ও ভায়োলেন্স এর দাপট কিন্তু এ যুগের চেয়ে সেযুগে কিছু কম ছিলনা । সরস্বতী তাঁর সাজগোজ, পোশাক-আষাকের মধ্য দিয়ে আর সর্বোপরি তাঁর গুণ, বুদ্ধি আর বিদুষী ব্যক্তিত্ত্বের দ্বারা পিতৃসম ব্রহ্মা থেকে শুরু করে প্রেমিক তুল্য নারায়ণের মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন এক্কেবারে । যাকে আমরা এখন শহুরে ভাষায় বলি "হেড টার্নার" ; তিনি এমনি ছিলেন ।মানে এখনকার দিনে যাকে বলে পেজ থ্রি কাঁপানো।   সমাজে এমন মেয়ের কদর তো হবেই যিনি একাধারে রূপসী আবার বিদুষী । পুরাণ কিন্তু অন্য কথা বলে।  সরস্বতী ছিলেন অসম্ভব ঝগড়াটে আর তাঁর মেজাজ ছিল দাপুটে । হতেই পারে । যিনি একহাতে বশিষ্ঠ থেকে বিশ্বামিত্র আর অন্যহাতে ব্রহ্মা থেকে বিষ্ণুকে নাচাতে পারেন তিনি তো অযোনিসম্ভবা, অসামান্যা । কিন্তু আজকের সমাজের চিত্রটাও ঠিক তেমনি আছে অনেক ক্ষেত্রে । তবে এমনি মেয়েই তো আসল কন্যাশ্রী আজকের সমাজে। এমনি তো চাই আমাদের। এ কথা কেন বলছি তা বুঝতে গেলে জানতে হবে সরস্বতীর পুরাণ বেত্তান্ত ।
  সরস্বতীর জন্মবৃত্তান্ত এবং বিবাহ এই দুই নিয়ে অনেক কিংবদন্তী আছে । কেউ বলেন পরমাত্মার মুখ থেকে নির্গত হয়ে তিনি পাঁচ ভাগে বিভক্ত হন : রাধা, পদ্মা, সাবিত্রী, দুর্গা ও সরস্বতী । আবার কারো মতে পিতা ব্রহ্মার মানসকন্যা তিনি । ঠিক যেমন গ্রিক দেবী কুমারী এথেনা পিতা জিউসের কপাল থেকে নির্গত হয়েছিলেন । যদিও ব্রহ্মার মানসকন্যা সরস্বতী তবুও পিতা ব্রহ্মা তাঁর এই সুন্দরী কন্যাটিকে কামনা করে বসলেন । বৃদ্ধের এই চাহনি  কন্যার  পছন্দ হলনা । কন্যা এড়িয়ে চলতে লাগল পিতাকে ।পালিয়ে বেড়াতে লাগল । ব্রহ্মা অসন্তুষ্ট হলেন । কামদেব মদনকে অভিশম্পাত করলেন যে কেন এই সুন্দরী কন্যার প্রতি  তাঁর সম্ভোগ লালসা রূপায়িত হচ্ছেনা এই বলে । অচিরেই শিবের দ্বারা মদন ভস্মীভূত হল সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ! আর  প্রতি পদে পদে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর লাঞ্ছনার গল্প উঠে এল ।
বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির মূলে যখন অগ্নির করাল গ্রাসে সৃষ্টি প্রায় ধ্বংসের মুখে তখন এই বিপর্যয়কে রুখতে দেবরাজ ইন্দ্র গেলেন নদী সরস্বতীর কাছে । সরস্বতীকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে আগুন নেভাতে আদেশ দিলেন । সরস্বতী তখন সমুদ্রের দিকে ধাবমান । সে তখন বলল ব্রহ্মা স্বয়ং আদেশ দিলে তবেই সেই আগুন নেভাতে তার গতিপথ ঘোরাবে । ব্রহ্মা ইন্দ্রের অনুরোধে সরস্বতীকে আদেশ দিলেন । সরস্বতী সম্মত হল । গঙ্গা, যমুনা, মনোরমা, গায়ত্রী ও সাবিত্রী এই পাঁচ নদী তার সঙ্গ নিতে চাইল কিন্তু সরস্বতী একাই গেলেন সেই অগ্নিনির্বাপণ কাজে । পথে ক্লান্ত হয়ে ঋষি উতঙ্কর আশ্রমে বিশ্রাম নিতে গেলেন আর তখুনি মহাদেব সমুদ্রাগ্নিকে একটি পাত্রে ভরে সরস্বতীর সম্মুখে হাজির করলেন । সরস্বতী তখন উত্তরে ব‌ইতে শুরু করল । ভারতের উত্তরপশ্চিমে পুষ্করে গিয়ে তার দ্বিতীয় বিশ্রাম হল । যার জন্য পুষ্কর হ্রদ হল এখনো একটি তীর্থক্ষেত্র । নারীর মহিমায় ভারতের কোণায় কোণায় বিখ্যাত ও স্মরনীয় হয়েছে অনেক এমন স্থান । পুরাণের সরস্বতী থেকে রামায়ণের সীতা কিম্বা চিরস্মরণীয়া পঞ্চকণ্যাঃ অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা, মন্দোদরী... এঁদের প্রত্যেকের জন্য বিখ্যাত অনেক তীর্থস্থান।
এমন আরো একটি গল্প ভাবিয়ে তোলে আজো যেখানে সরস্বতী নামের মেয়েটি  পুরুষের লালসার স্বীকার হয় একাধিকবার । সেই সমাজের দুটি শক্তিমান পুরুষের সম্ভোগ লালসার টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে যায় মেয়েটির জীবন । তবুও সে ক্ষতবিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকে । 

একবার ঋষি বশিষ্ঠ সরস্বতীর তীরে তপস্যায় মগ্ন ছিলেন । তাঁর শত্রু মুনি বিশ্বামিত্র এসে সরস্বতীকে বললেন বশিষ্ঠকে নিয়ে প্রচন্ড বেগে তাকে লন্ডভন্ড করে প্রবাহিত হতে । সরস্বতী প্রথমে রাজী হননি । অবশেষে বিশ্বামিত্রের অনুরোধ উপেক্ষা না করতে পেরে দুকুল ছাপিয়ে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠকে নিয়ে বানভাসি হলেন । নদীর ঢেউয়ের সর্বোচ্চ শিখরে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠ । একবার উঠছেন আবার একবার নামছেন ঢেউয়ের দোলায় । বিশামিত্র তো বেজায় খুশি । কিন্তু এই প্লাবনে বশিষ্ঠের কোনো হেলদোল নেই দেখে তাঁর একটু সন্দেহ হল । বিশ্বামিত্র বুঝলেন সরস্বতী বশিষ্ঠকে নিশ্চয়ই রক্ষা করছে । অতএব সরস্বতীর এইরূপ ছলকলায় যারপরনেই অসন্তুষ্ট হয়ে বিশ্বামিত্র সরস্বতীকে অভিশাপ দিলেন ও সরস্বতী অচিরেই রক্ত রূপী নদীতে পরিণত হল । মুনি ঋষিরা যখন সরস্বতীর তীরে স্নান করতে এলেন তখন বিশুদ্ধ জলের পরিবর্তে রক্ত দেখে খুব আশ্চর্য হলেন । এর অর্থ আমার জানা নেই। তবে হয়ত মেয়েটি প্রতিবাদ করে বলেছিল, আমি ঋতুমতী। আমাকে রেহাই দাও। নাকি জলে ঝাঁপ দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল তা?  সরস্বতী তাঁদের কাছে কেঁদেকেটে সব কথা খুলে বললেও রেহাই পান নি? বিশ্বামিত্রের এহেন দুরাভিসন্ধির কথাও জানালেন  । নিজের মুক্তি চাইলেন ও পুনরায় পূত:সলিলা সরস্বতী রূপে ফিরে চাইলেন নিজের জীবন ।  দয়ালু মুনিঋষিদের প্রার্থনায় শাপমুক্ত হলেন সরস্বতী এবং পুনরায় বিশুদ্ধ হল নদীর জল । এই কারণে সরস্বতীর অপর এক নাম "শোন-পুণ্যা" ।
পুরাণের আরেকটি গল্পের মতে সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং গঙ্গা ছিলেন বিষ্ণুর তিন পত্নী । বিষ্ণু কিন্তু গঙ্গার প্রতি একটু বেশিমাত্রায় আসক্ত ছিলেন ।  নম্রস্বভাবের লক্ষ্মী এই ঘটনায় মনে মনে খুব দুখঃ পেতেন কিন্তু কিছু প্রকাশ করতেন না । সরস্বতী কিন্তু বিষ্ণুর এই অতিরিক্ত গঙ্গাপ্রেমকে প্রশ্রয় না দিয়ে অশান্ত এবং রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন ।  একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল ।  প্রচন্ড উগ্রমূর্তি ধরলেন তিনি ।   গঙ্গার মুখোমুখি হলেন । লক্ষ্মী একটি ভয়ানক কলহের পূর্বাভাস পেয়ে সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালেন । সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিয়ে একটি গাছে পরিণত করলেন । লক্ষ্মী আবার সেই অভিশাপে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সরস্বতীকে নদীতে রূপান্তরিত করলেন । সরস্বতী নিজেও তখন উগ্রচন্ডা । নিজে নদীতে পরিণত হয়েছেন বলে গঙ্গাকেও নদী হতে অভিশাপ দিলেন । ইতিমধ্যে বিষ্ণু সেইখানে হাজির হলেন । এতসব ঝগড়া বিবাদ দেখে ও শুনে স্থির করলেন সরস্বতী ও গঙ্গার সাথে আর নয় । এখন থেকে তিনি কেবলমাত্র লক্ষ্মীর সাথেই ঘর করবেন । সরস্বতীকে ব্রহ্মার হাতে এবং গঙ্গাকে শিবের হাতে সমর্পণ করে বিষ্ণু  হলেন লক্ষ্মীর প্রিয় পতিদেবতা । আর  সরস্বতী ও গঙ্গার ওপর এরূপ অন্যায় শাস্তির জন্য  লক্ষ্মী মনে মনে ব্যথিত হলেন আবার বিষ্ণুকে একান্ত নিজের স্বামীরূপে বরণ করে আনন্দিতও হলেন  । বিষ্ণুকে শান্ত হতে বললেন এবং তাদের দুজনের আশীর্বাদে লক্ষ্মী ও গঙ্গা মর্ত্যের ওপর দিয়ে নিজ নিজ গতিপথে ব‌ইতে লাগল । স্বর্গে তাদের দুজনার একটি করে শাখা বিষ্ণুর হাত ধরে র‌ইল।

এমন সরস্বতী যেন বারবার ফিরে আসে আমাদের সমাজে  যাকে মনে রাখার জন্য বছরে একটি নির্দ্দিষ্ট দিন পালন করা হবে আর পূজা-পাঠ-অঞ্জলি-আরতি এ সব তো মনগড়া! আসল তো সে মেয়ের ব্র্যান্ড যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে দাগ কেটে দিয়ে যাবে ।   সে তো আমাদেরই ঘরের চেনা একটা মেয়ে অথবা শুধুই মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয় !!!
 কলকাতা ২৪ x ৭