৩০ অক্টো, ২০১২

ফেলে আসা ছেলেবেলার পুজোর সাক্ষী

কোলকাতায় আমার ছেলেবেলার পুজোর স্মৃতি  আনন্দবাজার ইন্টারনেট সংস্করণে কলeকাতা বিভাগে পুজো ২০১২ তে প্রকাশিত "আমার শহর" কলমে ।




আমার ছোটবেলা কেটেছে বরাহনগরের আলমবাজারে। পুজোর মাস দুয়েক আগে কোনও একটা সপ্তাহান্তে বাবা আমাদের কলকাতায় নিয়ে যেতেন পুজোর বাজার করতে। সে ছিল আমাদের সব চাইতে বড় উত্তেজনার দিন— সারাদিনের ‘প্রোগ্রাম’। সকালবেলা ভারী জলখাবার খেয়ে বেরোনো হত আর ফেরা হত সেই রাতে। বাড়ির সামনে থেকে সরকারি স্পেশাল বাস ‘এস ১৭’য় চেপে বসতাম আমরা চার জন। তার পর গিয়ে নামা হত লিন্ডসে স্ট্রিট। প্রথমেই ঠান্ডা পানীয়— ক্যাম্পাকোলা। তার পর সোজা হেঁটে বেন্টিঙ্কট স্ট্রিটে গিয়ে চিনে বাজারের জুতো কেনা হত। চিনেপাড়ার উস্তাদদের হাতে বানানো জুতোতে নাকি পা ভাল থাকে, তাই এত কষ্ট করা! সেই জুতোর বাক্স বয়ে যাওয়া হত নিউমার্কেটে। আমার ফ্রক কেনা হত স্টাইল টেক্স থেকে। মা প্রতিটি ফ্রকের ঝুল আর ডিজাইন খুঁটিয়ে দেখতেন যাতে পোশাকে শালীনতার মাত্রা বজায় থাকে। ভাইয়েরটা কেনা হত রহমান স্টোর্স থেকে। গঙ্গাদীন গুপ্তার অর্গ্যান্ডি আর কোটা শাড়ি, জয়সওয়াল স্টোর্স থেকে মায়ের তাঁতের শাড়ি, ঠাম্মার দুধ সাদা ফাইন থান, দিদিমার ইঞ্চিপাড়ের সাদা শাড়ি, মা দুর্গার লালপেড়ে শাড়ি, জ্যাঠামশাইদের জন্য ফাইন ধুতি— সব কিনে যাওয়া হত নাহুম’স-এ। নিউমার্কেটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নাহুম’স-এর চিজ প্যাটি আর ডি গামার কেক। কেক, প্যাটি খাওয়ার পর বাড়ির জন্যও কিছু নিয়ে নেওয়া হত। তার পর যাওয়া হত লিন্ডসে স্ট্রিটের হ্যান্ডলুম হাউসে। এখানে তখন তো আর আনাচে কানাচে এত বুটিক ছিল না! তাই এক্সক্লুসিভ পিওর সিল্ক শাড়ি কিনতে মা ওখানেই যেতেন। আর সেখানে এক ঢিলে দুই পাখি! পর্দার কাপড়, বেডশিট সব কিছুই মিলত ন্যায্য দামে। বাবার জন্য প্রায় জোর করে মহাদেবী এন্ড মেহতা থেকে শার্ট প্যান্টের পিস কিনতেন মা।

তখন শহর কলকাতায় হাতে গোনা খাবারের দোকান ছিল। কিন্তু এ পাড়ায় সঠিক দামের ছোট বড় রেস্তোরাঁ ছিল বেশ কিছু। ছোলা বাটুরে আর স্পেশাল কুলফি মালাই খেতাম ইন্দ্রমহলে। র‌্যালি’স-এর সিরাপ আর সিমাইয়ের পায়েস সহযোগে এমন সুন্দর কুলফি মালাই বোধহয় আর কোথাও তখন পাওয়া যেত না। এর পর সিম্ফনিতে আমাদের অভিযান। নতুন পুজোর গানের এলপি রেকর্ড। আর তখন এইচএমভি থেকে শিল্পীদের গানের রেকর্ড কিনলে একটা গানের লিরিকসের বই দিত। মায়ের নজর থাকত ওই বইয়ের দিকেই। তত ক্ষণে ফুটপাতের দোকান থেকে ভাই মায়ের আঁচলে গেরো দিয়ে একটা গাড়ি বা মোটরসাইকেল বা একটা ক্যাডবেরি বাগিয়ে বসে আছে। আমার একটা হেয়ারব্যান্ড, জামার সঙ্গে ম্যাচ করে দু’টো ক্লিপ আর রিবনও কেনা হয়ে গিয়েছে। বাবা রেগেমেগে বলছেন ‘‘এ বছরই শেষ। তোমাদের নিয়ে আর আসা যাবে না এখানে। এত বায়না!” কথাগুলো বাবা যে এমনিই বলতেন সেটা আমি বুঝতাম। কিন্তু ভাই বেচারা খুব ভয় পেয়ে যেত।

বিকেলের চায়ের জন্য ঢোকা হত অনাদি কেবিনে। সঙ্গে অবশ্যই অনাদির স্পেশাল মোগলাই পরোটা। এই একটা দিন বাবা বাইরের খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আমাদের লাগাম ছেড়ে দিতেন। আর তখন কলকাতা এত পরিচ্ছন্ন ছিল যে বাইরের খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ভয় কম ছিল। এখন বাইরে খেতে গেলেই ভাবি ভাল জায়গায় যেতে হবে, এসি থাকতে হবে, ভাজাভুজি মোটেই না— হেলথ রুল মেনে খেতে হবে। খোলা জিনিস খাওয়া চলবে না ইত্যাদি।

এক বার বাবা আমাদের চাইনিজ রেস্তোরাঁ কারকো-য় নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন কলকাতায় চিনে খাবারের চল সবে হচ্ছে। চাংওয়া, জিমিস কিচেন, পিপিং আর কারকো— এই ক’টি রেস্তোরাঁতেই সাবেকি চিনে খাবার মিলত। আর চাইনিজ খাবারে ইন্ডিয়ানত্বের ছোঁয়াও ছিল অল্প, তাই আমাদের বরং অসুবিধেই হত। কেবল গোল্ডেন ফ্রায়েড প্রন ছাড়া আর কোনও পদই ভাল লাগত না। বাবা বলতেন, চাইনিজ খাবারের অভ্যেস করতে— সহজ পাচ্য, তেল মশলাও কম। আর সস্ ভিত্তিক রান্না, তাই মুখ বদলানোর পক্ষে আদর্শ। কিন্তু আমরা তিন জন সে কথা মানতাম না। শুধুই গোল্ডেন ফ্রায়েড প্রনের দিকে হাত বাড়াতাম।

আমাদের স্কুল ছুটি পড়ে যেত পঞ্চমীর দিন। আর খুলত ভাইফোঁটার পর। পুজোর ক’দিন বইপত্র শিকেয় তোলা থাকত।

পুজোর প্রতি দিন সকালে বাবা নিয়ম করে চালাতেন গ্রামাফোন চেঞ্জার। আর একে একে সানাই, শরদ, সেতার, নতুন গানের এলপি রেকর্ড— কলের গান বাজত। বছরের এই সময়টা নিয়ম করে বাবা সেই শব্দ যন্ত্রটির পরিচর্যা করতেন পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই। আজও সেই পুরনো আধুনিক গানগুলো রেডিওতে শুনলে মনটা যেন কেঁদে ওঠে। শিউলির গন্ধ, পুজোর ঢাকের আওয়াজ, শিশির ভেজা শরত্কাল ছুট্টে এসে মনের দরজায় কড়া নাড়ে। এক বার কেনা হয়েছিল হেমন্ত, মান্না, আরতি, প্রতিমা, শ্যামল, সন্ধ্যা, অনুপ ঘোষালের সাতটা ছোট ৪৫ আরপিএম-এর রেকর্ড, এইচএমভি থেকে বেরিয়েছিল। আর সবচেয়ে মজা হল দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সাতটা ছোট রেকর্ড এক সঙ্গে ওই চেঞ্জারে বসিয়ে সেট করে ঘুমিয়ে পড়লে নিজের থেকেই একটা একটা করে বাজতে থাকবে। খুব মজা হত— নতুন গান যা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজছে তা আবার আমাদের বাড়িতেও বাজছে। অনুপ ঘোষালের ‘বিয়ে করবই না’, আরতি মুখোপাধ্যায়ের ‘বন্য বন্য এ অরণ্য ভাল’, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘আমিও পথের মতো হারিয়ে যাব’, মান্না দের “ক’ ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ”, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘গহন রাতি ঘনায়’— এই গানগুলো আমাকে তখন ছুঁয়ে গিয়েছিল, তাই বোধ হয় আজও মনের কোটরে পড়ে রয়েছে। সে বার এই গানগুলোই কিন্তু বেরিয়েছিল পুজোর গান হিসেবে, সালটা বোধ হয় ১৯৭৩ কি ১৯৭৪ হবে, ঠিক মনে নেই। এখনকার ছোটরা দেখি পুজোর সময়েও কম্পিউটার গেম খেলছে নয়তো টিভি খুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কার্টুন দেখছে। তাদের ঠেলেঠুলে প্যান্ডেলে পাঠাতে হয় আরতি দেখতে আর অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ খেয়ে আসার জন্য।

সপ্তমীর দিন সকাল থেকেই সব প্যান্ডেলে পড়ে যেত নবপত্রিকার স্নান করানোর ধুম। আলমবাজার গঙ্গার ঘাট খুব কাছে বলে সকাল থেকেই শোনা যেত ঢাকের আওয়াজ। প্রত্যেক বার মা বলতেন নবপত্রিকার পুজো মানে আসলে মা দুর্গার পুজোই। অত বড় মৃন্ময়ী মূর্তি তো আর গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে স্নান করানো যায় না, তাই নব পত্রিকা বা কলাবউকে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ভাই কেবল বলত, ওটা তো গণেশের পাশে থাকে তাই গণেশের বৌ। মা দুর্গা কেমন করে গাছ হবে? মা তখন আবার ব্যাখ্যা করে দিতেন যে ন’রকমের উদ্ভিদ, যেমন, বেল, ডালিম, কচু, মান কচু, হরিদ্রা, অশোক, ধান, কদলী, আর জয়ন্তী গাছের চারাকে শ্বেত অপরাজিতা গাছ দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকা বানানো হয়। শস্যপূর্ণ বসুন্ধরার প্রতীক রূপে চার দিন ধরে মা পূজিত হন।

সপ্তমীর দিন বিশেষ আমিষ পদ রান্না হত— মাছের মাথা দিয়ে ডাল, ফুলকপি দিয়ে ভেটকি মাছ, চিংড়ির মালাইকারি, আরও কত কি! সে দিন বিকেলে আড়িয়াদহে আর দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর দেখতে যেতাম রিকশা ভাড়া করে। বিরাট বিরাট পুজো হয় ওই দু’টি অঞ্চলে। মাঝে মাঝে ‘হল্ট’ দেওয়া হত মামারবাড়িতে আর জ্যাঠামশায়ের বাড়িতে। জল যোগ এবং বিয়োগ করে ঠাকুর দেখার পর্ব চলত।
অষ্টমীর দিন ভোর থেকেই চলত অঞ্জলির প্রস্তুতি। একে একে স্নান সেরে সবচেয়ে ভাল আর দামি জামাটি পরে অঞ্জলি দিতে যেতাম। বিয়ের আগে পর্যন্ত এ ভাবেই কাটত ষষ্ঠী, সপ্তমী আর অষ্টমী।

বিয়ের পর প্রথম বছর কেটেছিল দক্ষিণ কলকাতার পুজো দেখে। ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজমের বাসে চেপে দেখতে গিয়েছিলাম কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজো। আধুনিক থিমের দুর্গাপুজোর চেয়ে অনেক মন কাড়ে এই পুজোগুলি। সে বার সপ্তমীর দিন ধর্মতলা থেকে বাসে চড়ে দেখেছিলাম বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের পুজো, জানবাজারে রানি রাসমণির বাড়ির পুজো, শোভা বাজারের রাজবাড়ির পুজো, উত্তর কলকাতার বিখ্যাত লাটুবাবু-ছাতুবাবুদের পুজো। ডাকের সাজের প্রতিমা, চণ্ডীমণ্ডপে সুদৃশ্য চালচিত্রে বিশাল আয়োজন, বাড়ির মহিলাদের সাবেকি গয়না ও বেনারসি শাড়ি পরে মায়ের পুজো গোছানো— সব কিছুতেই ঐতিহ্যের ছাপ।
আর এক বার আমরা একটা গাড়ি নিয়ে বেলুড় মঠে কুমারী পুজো দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানেও খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো হয়। তবে আজকাল ধর্মের নামে যে হুজুগের স্রোতে আপামর বাঙালি মেতে উঠেছে তা বেলুড় মঠের ভিড় দেখলেও বোঝা যায়।

পুজো এখন ফ্যাশানেবল হয়ে উঠেছে। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে আলোর রোশনাইয়ের সঙ্গে অনুরণিত হয় এক দিকে মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্র আর ডিজিট্যাল এলসিডি স্ক্রিনে রংচঙে বিজ্ঞাপন। আর সেই সঙ্গে থরে থরে সাজানো ফাস্টফুডের গরমাগরম হাতছানি। এক একটি বারোয়ারি পুজো এখন ‘স্পনসর্ড’ পুজো— কোনও এক কোম্পানির সম্পত্তি, কোনও একটি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের কিনে নিয়েছে ওই পাঁচটি দিনের জন্য। প্রতিযোগিতার মাপকাঠিতে মা আসেন একটা প্যাকেজে! সেরা প্যান্ডেল, সেরা প্রতিমা, সেরা দর্শক শ্রীমতি, সেরা আরও কত কিছুর ভিড়ে কিন্তু আসল পুজো একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। সরে যাচ্ছে পুজোর মূল, অনাদি আবেদন।


১৫ অক্টো, ২০১২

মহালয়ায় পিতৃপক্ষের অবসানে মাতৃপক্ষের সূচনা !!!

 রক্তবীজ বধে দেবী চন্ডমুন্ড বিনাশিনী রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি  !!!

আশ্বিনের পূর্ণিমার পর থেকে যে কৃষ্ণপক্ষ শুরু হয় তা হল পিতৃপক্ষ । সূর্য তখন কন্যারাশিতে অবস্থান করে । হিন্দুধর্মের বিশ্বাস অনুসারে   পিতৃলোক থেকে আমাদের পূর্বপুরুষের আত্মা তখন অবতরণ করেন স্বর্গ্য লোক থেকে মর্ত্যে ।   অর্থাত আমাদের আশেপাশে তাঁরা বিরাজ করেন । তাই আমরা এই সময় তাঁদের তুষ্ট করি তর্পণের মাধ্যমে ।  একপক্ষকাল অর্থাত গণেশ চতুর্থীর পর যে পূর্ণিমা তার পরদিন থেকে এই কৃষ্ণপক্ষ চলে মহালয়া অবধি । আর এই পক্ষকাল আমরা বাস করি আমাদের পরম আত্মীয় পূজনীয় বন্ধুদের  স্মৃতিতর্পণ করে ।   কিংবদন্তী অনুসারে রামচন্দ্র  রাবণ বধ করার জন্য দুর্গাপুজো করবেন স্থির করেন ।  কিন্তু তখন দেবলোক ঘুমন্ত ছিল ।  ঘুমন্ত দেবলোককে জাগ্রত  করার উদ্দেশ্যে অকালবোধন করেছিলেন । তাই সেই অর্থে এই সময়ে প্রতিবছর দুর্গাপুজোর ঠিক আগেই স্বর্গলোকে আমাদের পিতৃপুরুষদেরও জাগ্রত করি ।   হিন্দুধর্মের বিশ্বাস, মহালয়ার পরদিন মা দুর্গা স্বর্গলোক থেকে অবতরণ করেণ মর্ত্যলোকে এবং পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের   শুভ সূচনা হয় তখনি । 
মহালয়ার  অমাবস্যা তিথিতে দেবদেবীরা জাগ্রত হ'ন  এবং মাদুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তিতে ঐ দিন চক্ষুদান করা হয় ।   

২২ সেপ, ২০১২

জীবাশ্মে আর শ্বেতপাথরে




আমাদের টিকিট হাওড়া থেকে বিলাসপুর। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে । রাতের ট্রেন ছাড়ল ভোর সাড়ে চারটেয় । বিকেল চারটে নাগাদ বিলাসপুর পৌঁছলাম । ভাড়ার গাড়িতে উঠে এবার যাত্রা শুরু অমরকন্টকের উদ্দেশ্যে ।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলেবেলায় আমরা তখন অমরকন্টক থেকে আরো পশ্চিমে চলেছি ন্যাশানাল হাইওয়ে ১১ ধরে জবলপুরের দিকে । ডিন্ডোরি আর শা'পুর পেরিয়ে একটি মোড় থেকে বাঁদিকে ১৪ কিমি এগিয়ে চেয়ে দেখি ঘুঘুয়া ন্যাশানাল পার্কের বিশাল গেট । ভারতবর্ষের একমাত্র ফসিল পার্ক এটি ।আমেরিকার এরিজোনার পেট্রিফায়েড ফরেস্ট ন্যাশানাল পার্কের পর পৃথিবীতে বোধহয় এটাই একমাত্র পেট্রিফায়েড ফরেস্ট যা কয়েক মিলিয়ন বছর আগে ফসিলাইজড হয়ে রকগার্ডেনে রূপান্তরিত হয়েছে । কার্বন ডেটিং পরীক্ষায় জানা যায় এই স্থানের বিশাল ট্রপিকাল চিরসবুজ বৃক্ষের জঙ্গল ছিল । যার বয়স ৬৫ মিলিয়ন । তাই এই ন্যাশানাল পার্কের প্রবেশ দ্বারে রয়েছে কংক্রীটের বিশাল ডাইনোসরাস । 
 

তক্ষুণি মনে হল রাজোসরাস নর্মোডেনসাসের কথা । ইন্ডিয়ান অরিজিনের এই ডাইনোসরের ফসিল তো নর্মদার তীরেই আবিষ্কৃত হয়েছিল । ভারতবর্ষ যুগে যুগে রাজারাজড়ার দেশ বলে এখানকার ডাইনোসরের নামকরণেও সেই রাজকীয়তার ছোঁয়া । কে জানে হয়ত এই ঘুঘুয়াতেই ঘুরে বেড়াতো নর্মোডেন্সাসের পরিবার ।
                                 সরকারী কেয়ারটেকার । আমাদের ঘুরে ঘুরে সবটা পরিদর্শন করিয়েছিলেন যিনি 
১৯৮৩ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার ঘুঘুয়াকে ন্যাশানাল পার্কের সম্মান প্রদান করে। ঘুঘুয়া এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম উমারিয়া নিয়ে এই ফসিল পার্কের সমগ্র ব্যাপ্তি ২৭ হেক্টর জুড়ে । এখনো অবধি ৩১ টি প্রজাতির উদ্ভিদ সনাক্ত করা গেছে । প্রধানতঃ পাম ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ এরা । ইউক্যালিপ্টাস, খেঁজুর, কলা, রুদ্রাক্ষ, জাম, এই সব ট্রপিকাল সবুজ গাছকেই চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে । 
                                                          ইউক্যালিপ্টাস
সরকারী কেয়ারটেকার আমাদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখালেন । কিছু শামুক জাতীয় অর্থাত খোলসযুক্ত বা মোলাস্কা পর্বের প্রাণীর ফসিল দেখা গেল । এর থেকে বোঝা যায় যে স্থানটি আর্দ্র ছিল এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিও হত এখানে । তারই ফলস্বরূপ চির সবুজ বৃক্ষের সমারোহ ছিল । 

                                  অপর্যাপ্ত ফসিলাইজড চিরসবুজ বৃক্ষের জীবাশ্মের সাক্ষী হয়ে আমরা 

স্থানীয় মানুষ এই অঞ্চলকে বলে "পাত্থর কা পেড়" অর্থাত পাথরের গাছ । আমি বলব গাছ-পাথর । কথায় বলে বয়সের গাছ-পাথর নেই । তার মানে এতদিনে বুঝলাম । যে কত পুরোণো হলে গাছ পাথরে রূপান্তরিত হয় । 
                                                     গাছ-পাথর

অমরকন্টকে এসে পৌঁছলাম বেশ রাত্তিরে । এম পি ট্যুরিসমের লাক্সারি টেন্টে থাকবার ব্যবস্থা । রাতের খাবার খেয়ে এসে বরাদ্দ তাঁবুতে সেরাতের মত আমরা আশ্রয় নিলাম ।



পরদিন ভোরে উঠে এবার আমাদের যাওয়া লাইমস্টোনের দেশে । বিখ্যাত জবলপুর মার্বেল রকস্‌ দেখতে । প্রথমে ভেরাঘাট । জবলপুরের ২২ কিমি দূরে নর্মদা নদী একটি গর্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এখানে । দুধসাদা পাথরের ওপর দিয়ে ঝরণার মত আছড়ে পড়ছে নর্মদা এই গর্জটির দৈর্ঘ্য ৩ কিমি । নদীর কিনারা দিয়ে, বুকের ভাঁজে মিনারের মত সারে সারে উঠে এসেছে শ্বেতপাথরের স্তম্ভেরা । কি অপূর্ব সেই রূপ । আর নদীর উচ্ছলতায় পুরো পরিবেশটাই যেন ভিন্নস্বাদের অনুভূতি সৃষ্টি করে । ভেরাঘাট পৌঁছে কেবলকারের টিকিট কিনে রোপওয়েতে যাওয়া হল মাঝ নর্মদায় ধূঁয়াধার জলপ্রপাতের এক্কেবারে গায়ের কাছে । কেবলকারের ঘেরাটোপে ডিজিটাল ক্লিকে বন্দী হতে লাগল আমার নর্মদা । চারিদিকে যেন ফোটোশপড নীল আকাশ । আর ক্যালসিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেটের গাঁটছড়া । কি অপূর্ব সেই রূপ ! আর নদীর উচ্ছলতায় পুরো পরিবেশটাই যেন ভিন্নস্বাদের । পুব থেকে পশ্চিমে বহতী নর্মদা । সাদা ফেনা হয়ে জল পড়ছে গর্জের মধ্যে আর পুরো জায়গাটি ধোঁয়াময় । 
 
এবার পঞ্চবটী ঘাটে এসে নৌকাবিহারে বান্দরকুঁদনী । দুপাশে মার্বল রক্‌স এর অলিগলি রাজপথের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নর্মদা নদী । নৌকো চড়ে ঘন্টাখানেক যেন ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ভাসমান হলাম । পাথরের কত রকমের রঙ । পরতে পরতে যেন সৃষ্টির প্রলেপ । নৌকার মাঝির স্বরচিত কবিতায় বলিউড থেকে টুজি স্ক্যাম সবই উঠে এল স্বতস্ফূর্ত ভাবে । দুপুর সূর্য্যি তখন মাথার ওপরে । আদুড় গায়ে ডাইভ মারছে স্থানীয় কিশোর নর্মদার বুকে ।

 বর্ষার পর যেন আরো ঝাঁ চকচকে পাথরের রং আর নর্মদাও যেন থৈ থৈ রূপ নিয়ে খুশিতে ডগমগ । লাইমস্টোনের স্তবকে স্তবকে গাম্ভীর্য আর নদীর হাসি মিলেমিশে একাকার । কে যানে পূর্ণিমার রাতে এখানকার নিসর্গ কেমন হয় ! কোজাগরীর রাতে আবার আসতে হবে এই বলে প্রণাম জানালাম মা নর্মদাকে । 


সকালবেলা, "ঘুরেআসি"  সংবাদপত্রে প্রকাশিত বৃহস্পতিবার,  ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০১২ তে প্রকাশিত "সৃষ্টিপাথরের উপাখ্যান"   ঘুঘুয়া ফসিল ন্যাশানাল পার্ক এবং জব্বলপুর মার্বল রকস নিয়ে ভ্রমণ বৃত্তান্ত   

১৮ সেপ, ২০১২

প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা ২০১২ প্রকাশিত হল

 পটশিল্পীঃ আয়েষা ও বাবলু পটীদার
গ্রাম নানকারচক, পূর্ব মেদিনীপুর 

সেই বাংলা বছরের প্রথমদিনে প্যাপিরাসের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বন্ধুদের সাথে দেখা হয়েছিল ।

ততদিনে সুনীতা উইলিয়ামস ভেসে রয়েছেন এই মহাবিশ্বে, মহাকাশে । কিউরিয়োসিটি খোঁজ নিতে গেছে মঙ্গল গ্রহের জল-মৃত্তিকার খুঁটিনাটি কিম্বা একরত্তি জীবনের । এবারের অলিম্পিকও আমাদের একেবারে নিরাশ করেনি । স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন এক বাঙালি । উত্তরপ্রদেশের এক বাঙালী বৈজ্ঞানিক নোবেলের সমতুল্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন । “রিসেশন-ইনফ্লেশন” চাপানোতরের পাশাপাশি  সামাজিক দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় মাদুর্গাকে স্মরণ করেছি মনেমনে ।  আমাদের সকলের শুভকমনায় আর মাদুর্গার আশীর্বাদে ক্রিকেটের মাঠ আলো করে আবার যুবরাজ সিং ব্যাট হাতে ধরেছেন ।   অনেক গুণী মানুষকে আমরা হারিয়েছি এই কয়েকটা মাসে ।মনে মনে অনুভব করেছি..”একলা ঘরে হাতড়ে মরি, শিল্পী তোমার শূন্যতা” !



এই ছ’টি মাস প্যাপিরাসের নিরম্বু উপবাস । শুধু পাঠকমহলের আদর প্যাপিরাসের পাথেয় যুগিয়েছে । লেখক, কবি এবং সর্বোপরি পাঠকদের ভালোলাগা আর ভালোবাসাকে সাথে নিয়ে হৈ হৈ করে সেজেগুজে প্যাপিরাস সাজিয়েছে তার পুজোসংখ্যাটিকে ।
আমাদের এবারের সবচেয়ে বড়প্রাপ্তি হল চিলেকোঠার ঘর ঝেড়ে পাওয়া  স্বর্গতঃ শুভ্রেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একখানি কবিতার খাতা । পাতার রঙটা বাদামী হয়েছে যার সময়ের সাথে সাথে কিন্তু পেন্সিলে লেখা খাতাভর্তি কিছু দুষ্প্রাপ্য কবিতা আজো অমলিন । ১৯৪৪ সালে ছাত্রাবস্থায় মাত্র ১৭ বছর বয়সে লেখা কবিতাগুলির মধ্যে থেকে দুটি কবিতা এবারের প্যাপিরাসকে সমৃদ্ধ করেছে ।


বেশকিছু রন্ধন পটিয়সী “হোমমেকার” স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্যাপিরাসকে উপহার দিয়েছেন তাঁদের কিছু সেরা পূজোর রেসিপি । একাকীত্বের অবসাদ কাটিয়ে অনেক বছর বাদে কলম ধরেছেন খড়গপুরের বিশ্বজিত সরকার । রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর চাক্ষুষ অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছেন একদা বাংলা সাহিত্যের এই ছাত্র।  আমাদের কবিবন্ধুদের  জানাই মুঠোমুঠো শিউলিঝরা অভিনন্দন । এবারের শব্দসীমা লঙ্ঘন না করে অনেকেই লিখেছেন সুন্দর অণুগল্প, ছোটগল্প এবং ভ্রমণ বৃত্তান্ত ।


পাঠকদের অনুরোধে এবার থেকে প্যাপিরাসে রাখলাম একটি বিষয়ের ওপর ফোরাম বা আলোচনা চক্র  যার নাম দিলাম “চক্রবৈঠক” ।   সমাজের বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন বয়সের মানুষের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছিল আমন্ত্রণ মূলক লেখা, বিষয়টি ছিল “ইন্টারনেট”  । তাদের সাড়া পেয়ে প্যাপিরাস আপ্লুত এবং অনুভূত । এত ব্যস্ততার মধ্যে সকলে যে সুচিন্তিত মতামত পাঠিয়েছেন সে জন্য আরো একবার তাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাই ।
এবার যেন “হেমন্তে শরত” এর পথ চাওয়া । তাই বুঝি অতিবৃষ্টি আর খরার টানাপোড়েনে আমরা কাবু না হয়ে একটু বেশি সময় হাতে পেয়েছি পুজোসংখ্যা প্রকাশের ।
জীবনের আলপথগুলো গুলো চলতে চলতে অনেক বন্ধু এল চারপাশে । একঘেয়েমি কাটল ফেসবুকের একচিলতে ব্যালকনিতে । চলতে থাকে জীবন। আলগোছে, আলতো পায়ে । মনের কার্ণিশ বেয়ে নিঃশব্দে উঁকি দেয়  এসেমেস। বেজে ওঠে মুঠোফোন ঝন্‌ঝন্‌ । আমার মনোবীণায় সে ঝঙ্কারে হয়ত সামিল হয় অচেনা কোনো পাখি ।   ইনবক্সে উড়ে আসে অচেনা মেল, হঠাত মেল । বলে প্যাপিরাসকে ভালোবাসার কথা ।
চলতেই থাকে জীবন ছেঁড়া ছেঁড়া কবিতার ঘ্রাণ নিয়ে.. অলস সময় পেরিয়ে যায় বৃষ্টিপথ, ভাবনার গদ্যেরা ভেসে যায় আপন খেয়ালিপথে, আলগোছে, আলতো পায়ে… প্যাপিরাসের হাত ধরে  ! মনে মনে বলে উঠি,তুমি মেঘ-রোদ-বৃষ্টি হলে আমার ড্র‌ইং বারান্দায়
তুমি আলো-আঁধারের খালপাড়ে, আমি ভরাবর্ষায় ।
বৃষ্টিফোঁটায় কবিতা হতে চেয়েছিলে তুমি
আর আমি তোমার কর্ণিকা ।
জড়িয়ে ছিলে দুচোখে, ভরেছিলে ভোরবেলা
দিয়েছিলে সন্ধ্যে, অনেক অনেক আনন্দে ।
তবু এখনো বর্ষা হতে পারলাম ক‌ই ?

কিন্তু “বর্ষা” হওয়ার চেষ্টা তো আমরা করতেই পারি তাই নয় কি ?  তাই তো গ্রামবংলার শিল্পকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার চেষ্টায়  প্যাপিরাসের পুজোসংখ্যার থিম  গ্রামবাংলার পটচিত্র । মেদিনীপুরের মেলায় এবছর আলাপ হয়েছিল এক পটু পটশিল্পী দম্পতির সাথে ।  খড়গপুরে তাদের আমরা আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে বেশ কিছু পটচিত্র আঁকিয়েছিলাম বাংলার এই শিল্পকে সম্মান জানানোর জন্য ।  বন্ধুবান্ধবের অনুরোধে তারা নানারকমের পটশিল্প সামনে বসে এঁকে  পট-ভিত্তিক আনুষাঙ্গিক ঘরসাজানো এবং ফ্যাশানের জিনিষ বিক্রি করে যারপরনেই খুশি হয়ে বাড়ি ফিরেছিল  তাদের লক্ষ্মীর ঝাঁপি নিয়ে  । সেই দম্পতিকে খুশি করতে পেরে আমরা, যারা  সেদিন তাদের পাশে  ছিলাম তারাও আপ্লুত হয়েছিলাম ।

এবারের প্যাপিরাস পুজোসংখ্যাতে সেই অভিনব লোক-শিল্পের ছোঁয়া লেগেছে । পূর্ব মেদিনীপুরের নানকারচক গ্রামের বাসিন্দা বাবলু পটিদার ও আয়েষা পটিদার অক্লেশে বাঁচিয়ে রেখেছেন তাদের ২৫০ বছরের পুরোণো বংশ পরম্পরার ঐতিহ্য ।  মাদুর্গার কাছে প্রার্থনা করি তাঁরা যেন আরো বেশি প্রচারের আলোয় আসতে সক্ষম হন !


সকলের পুজো আনন্দে কাটুক ! প্যাপিরাসের লেখক ও পাঠকদের জানাই শারদীয়া শুভেচ্ছা।

প্যাপিরাস পড়ুন এবং পড়ান আপনার মূল্যবান মন্তব্যটি ওখানে কমেন্ট ফোরামে লিখুন ।  

৮ সেপ, ২০১২

প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা



প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা আসছে !
এবারের প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা ২০১২ আর কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশিত হতে চলেছে । 
একগুচ্ছ মন ভোলানো কবিতা, প্রবন্ধ, ভিন্নস্বাদের একরাশ অণুগল্প, ছ'টি  দুর্দান্ত  ছোটগল্প,  মনকাড়া একঝাঁক পুজোর রেসিপি, আর তিনটি অসামান্য ভ্রমণ বৃত্তান্ত নিয়ে  সেজেগুজে হাজির হবে প্যাপিরাস সকলের কাছে ।  
আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের অপেক্ষা । 
বন্ধুদের লেখা পাঠানোর জন্য শিউলিভেজা শারদীয়া অভিনন্দন জানাই !  


২২ আগ, ২০১২

রুদ্ধসংগীতের লেখক-গায়ককে আমার প্রণাম !


দেবব্রত বিশ্বাসকে আরো জানতে দেখুন এই নাটক । পড়ুন ওনার লেখা এই ব‌ইখানি । অনেক না জানা কথা আছে ব‌ইটিতে অন্ত্ঃসলিলা ফল্গুনদীর মত বয়ে চলেছিলেন আপনমনে । শিল্পীর প্রতি আমার নীরব শ্রদ্ধা । 



 "কালিন্দী ব্রাত্যজন" নাট্যগোষ্ঠীর পরিবেশনায় ব্রাত্য বসু পরিচালিত "রুদ্ধসংগী" নাটকটি শেষমেশ দেখা হল । এটি তাদের ৮৫তম পরিবেশন ছিল । যখন বিগত কয়েকবছর ধরে সমগ্র বাঙালী এর রস আস্বাদন করে নিয়েছেন আমি অবশেষে সেই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করলাম । আজ ৪ঠা নভেম্বর ক্যালকাটা ক্লাবে দেবব্রত বিশ্বাসের  শততম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে এই নাটক প্রদর্শন ছিল সঙ্গীতশিল্পীর উদ্দেশ্যে বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য । দেবব্রত বিশ্বাসের রচনায় " ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত" ব‌ইটি কিছুদিন আগেই পড়েছিলাম । তাই দেখবার ইচ্ছেটা প্রবল ছিল । ব‌ইটিতে দেবব্রত বিশ্বাসের সাবলীল স্মৃতিচারণা এবং ওনার সাঙ্গীতিক জীবনের টানাপোড়েন অত্যন্ত স্বতস্ফূর্ত ।   অনেক না জানা তথ্য এবং বিশেষত বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের কর্তৃত্ত এবং যারপরনাই ওনার মত প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর প্রতি অযথা হম্বিতম্বি, ওনার রেকর্ডেড রবীন্দ্রসঙ্গীতের সমালোচনা এবং  ওনার সুর এবং স্বরপ্রক্ষেপনের প্রতি কটুক্তি, যন্ত্রানুষঙ্গের ব্যাবহার ...এ সবকিছুই আছে ব‌ইটির মধ্যে । যে কঠোর সমালোচনায় দগ্ধে দগ্ধে শেষ হয়ে গিয়েও উনি হাল ছেড়ে দেননি এবং শেষজীবনে রুদ্ধ হয়েও কন্ঠ তাঁর রুদ্ধ হয়নি । রুদ্ধসঙ্গীত নাটকটি কিন্তু শুধুই এই ব‌ইটি নয় । এতে আছে কিছু নাট্যব্যক্তিত্ত্ব, নৃত্যশিল্পী, কবি, সঙ্গীতকার ও সুরকার  এবং সর্বোপরি সঙ্গীত শিল্পীর সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাস ওরফে তাঁদের সকলের জর্জদার প্রতিনিয়ত ওঠাবসা এবং আলপাচারিতা । গণনাট্যকার হেমাঙ্গ বিশ্বাস্, সলিল চৌধুরী , ঋত্বিক ঘটক্, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত ব্যাক্তিত্ত্বদের সাথে একদা বাম আন্দোলনের শরিক দেবব্রতের কেমন করে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া। উঠে আসে বেশ কিছু অজানা তথ্য এই সব ক্রিয়েটিভ মানুষদের জীবনে উঠে দাঁড়ানো নিয়ে । কেমন  করে বামপন্থী আন্দোলনে সামিল হয়েও এই সব মানুষ গুলি মেনে নিতে পারেননি তাঁদের ওপর দলের ছড়ি ঘোরানো বা ডিক্টেটরশিপ বা দলের মতে না চললে আননেসেসরি তাকে অপবাদ দিয়ে কোণঠাসা করে দেওয়া । 
জর্জদার স্নেহধন্যা নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী চাকীর সহিত কথোপকথন, সুচিত্রা মিত্রের  জর্জ বিশ্বাসের গায়কীকে শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়া ইত্যাদি আরো অনেক কিছু । 
সব মিলিয়ে নো প্যানপ্যানানি, নো মেলোড্রামাটিক কচকচানি, নো প্রেমপ্রেম খেলা, নায়কের ঘাড়ে মাথা রেখে নায়িকার ফুঁতফুতানি  । রিয়েলিস্টিক  নাটক । সত্যি ঘটনা । নেই আলাদিনের প্রদীপের চমক কিন্তু আছে স্পষ্টভাষণ। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং সলিল চৌধুরীর গান রচনার প্রেক্ষাপট  এবং সর্বোপরি দেবব্রত বিশ্বাসের বহু বিতর্কিত গান গুলির গায়কী নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি শুনতে পাওয়া গেল সেই এইচএমভির সেই ৭৮ আরপিএম রেকর্ডের গানের অংশবিশেষ । তাই এই নাটক না দেখলে অনেক কিছুই না দেখা থেকে যাবে বলে আমার বিশ্বাস । আর দেবব্রত বিশ্বাসের ভূমিকায় দেবশঙ্কর হালদার আবার প্রমাণ করেছেন যে তিনি কত বড় মাপের একজন শিল্পী ।     
http://www.youtube.com/watch?v=V7nJZjvfNA8

৬ আগ, ২০১২

ভূস্বর্গ কাশ্মীরে কয়েকদিন....

  ১৭ই মে ২০১২
প্রতিবার পাহাড় না সাগর এই বিতর্কে হেরে যাই আমি । গরমের ছুটির ফাঁদে পা দিলেই হিমালয় টেনে নিয়ে যায় তার কাছে । এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না ।
আমরা তিনজনে দিল্লী থেকে আবার শ্রীনগরের উড়ানে ।

ভূস্বর্গ কাশ্মীর কে তুলনা করা হয় ইউরোপের সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে । কয়েকদিনের জন্যে না হয় তোলা থাক সে তুলনা । সুইস আলপ্‌সের স্মৃতি তোলা থাক এলবামে । ওরে হিমালয় যে আলপ্‌সের চেয়ে কিছু কম নয় ...এই বলতে বলতে এগিয়ে চললাম ফোটোশপড নীল আকাশের দেশে । এমন নীল যে কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি চলল হৃদয়পুরা দিয়ে । 
ঝাউগাছ আর লতানে গোলাপের গুল্মের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে বারবার মনে পড়ছিল ওপি নায়ারের কাশ্মীর কি কলির গানের সিকোয়েন্স । 

স্লোপিং রুফের বাড়িগুলো দেখে মনে পড়ে গেল খবরের কাগজের তুষারপাতের কথা । পথে চাপদাড়ি যুবক, বোরখা ঢাকা যুবতী আর মোড়ে মোড়ে সিআর পিএফ জওয়ানদের ভ্যান গাড়ি দেখে অনুভব করলাম কাশ্মীরের প্রতিকূলতা । 

পথে পড়ল রাজবাগ পার্ক । ঝিলামকে দেখলাম একঝলক । একে বলে বিতস্তা । ড্রাইভার মুক্তেয়ার বলল "দরিয়া ঝালেম" । 
ঝিলাম সেতু পেরিয়ে ডাল ঝিলে এলাম আমরা । একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ । 

লেক যে এত বড় হয় আগে কখনো দেখিনি । শিলং এ বড়াপানি লেক দেখেছিলাম, সুইজারল্যান্ডের লুগানো লেক দেখেছিলাম । কিন্তু তাই বলে এত হৈ হৈ হাউসবোটের পসরা আর কূলে কূলে এত শিকারা
 শিকারার সারি বাঁধা ডাল লেকের ধারে.......

 ডালঝিলের মধ্যে ভাসমান পোষ্ট অফিস দেখে যারপরনেই অবাক আমরা !
নেহরুগার্ডেনে অবতরণ গোলাপের বাগানে । একটু ছবি তোলা । 


  নেহেরু গার্ডেন থেকে ডাললেকের প্যানোরমিক লুক  !!!
ডাললেকে ভোরের আলোয় একরকম । 

আবার ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যের ঝুলে তার রূপ অন্যরকম । আবার রাতের বেলা যেন পরী সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে রঙীন আলোর হাউসবোটের পসরা নিয়ে সেই একই ডাললেক সুন্দরী  ।  

আবার ভাসমান শিকারায় । মাছ খেগো বক, সারস আরো কত কি সেই ডাললেকের জলে ।  

 আশপাশে ভাসমান সবজী বাগানের মধ্যে দিয়ে লিলিপুলের মধ্যে দিয়ে । 

 হাউসবোটের রোয়াক ঘেঁষে । 
১৮ই মে ২০১২ 
শ্রীনগরের ডাললেকের ধারে হোটেলের কামরা থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শব্দে ঘুম গেল ভেঙে । মেঘ না মৌসুমী ? কাঁচের জানলায় অন্ধকারের থাবা । ভূস্বর্গ বৃষ্টিস্বর্গে পৌঁছে গেল না কি ! মনখারাপের পার্টির শুরু । জানলার ভারী পর্দা সরিয়ে দেখি কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেছে । 

প্রথমে টুথব্রাশ তারপর চায়ের কাপ হাতে আমি চোখ রেখেছি পাহাড়ের মাথায় । কখনো মেঘ উড়ে গেলে তুষারশিখর মুখ বেরে করছে আবার মেঘের চাদর তার গায়ে । আমাদের মনের চাপা টেনশনে ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে ততক্ষণে । রুম হিটার বন্ধ করলাম । হঠাত চানঘর থেকে এসে দেখি রোদ উঠেছে । পাহাড়ের চূড়ো হাসতে শুরু করেছে খিলখিল করে । সবজী পরোটা আর দৈ সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়া হল পহেলগামের উদ্দেশ্যে । হালকা ঠান্ডা তখন চিনার বনের মধ্যে । ঝিলামের ধারে ধারে চিনারের এই অভিভাবকত্ব মুঘল আমল থেকে । চিনারকে কেউ কুড়ুল মারতে পারবেনা । এই ইকোফ্রেন্ডলি চিনারকে নিয়ে কাশ্মীরিদের খুব গর্ব । 
এই সেই ঐতিহাসিক চিনার বৃক্ষ । সবুজতায় আর রাজকীয়তায় পূর্ণ !  চিনার পাতা কাশ্মীরের শিল্পকর্মের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত । 
পথে পড়ল পান্থচক । পাথরের সব কারখানা । কারিগরেরা সেখানে খুদে খুদে বানাচ্ছে শিল নোড়া, খলনুড়ি, হামান দিস্তা । কিনে ফেললাম একটা খলনুড়ি । বেশ অন্যরকম দেখতে । এটাই কাশ্মীরের ট্র্যাডিশানাল মশলা পেষার কল ।
লিডারভ্যালির ওপর দিয়ে চলেছি আমরা । মেঘ এসে ভাসিয়ে দিচ্ছে কখনো ।
টোলবুথে পয়সা ফেলে বেলাবেলি পহেলগামে প্রবেশ করলাম ।

 দাঁড়কাকের কর্কশ স্বর নির্জনতাকে ছাপিয়ে দিল । রাখাল ভেড়ার পাল লয়ে যায় মাঠে । ঘোড়া সওয়ারি নিয়ে ঘন্টি নেড়ে হাঁটে । হোটেলে পিটস্টপ । মালপত্র রেখেই বিলেটেড লাঞ্চ । তারপরই দরদস্তুর করে ঝিরিঝিরি ঝাউয়ের মাথায় টুপটাপ বৃষ্টি নিয়ে আমাদের ঘোড়ায় চেপে বৈশরণ এডভেঞ্চার । তিনটে জবরদোস্ত ঘোড়া , দুই সহিস আর আমরা তিন মূর্তি । ঘন বাদামী আট বছরের বুলডোজার্, হালকা বাদামী দশ বছরের চেতক আর আমার সফেদ ঘোড়া মাত্র তিন বছরের বাদল । 
বৈশরণ এল বুঝি । পাইনগাছের সারি দিয়ে ঘেরা সবুজ প্রান্তর । দূর দিগন্তে নীল আকাশের পৃথিবী । পৃথিবীর নীচে ঐ প্রান্তর যার নাম সুইত্জারল্যান্ড পয়েন্ট । ছবি তুলে তফাত করা যাবেনা আল্পসের বরফচূড়ো আর হিমালয়ের বরফচূড়োয়। ভিউপয়েন্টও বটে । নো প্লাস্টিক জোন । পরিচ্ছন্ন চা-কফির ঠেক । ঘোড়া থেকে নেমে গরম চায়ে চুমুক । ননস্টপ ডিজিটাল ক্লিকে বন্দী হল ভারতের সুইস পয়েন্ট । 
 পহেলগামে  টিপিক্যাল কাশ্মীরি ডিনার হল এক পথ-হোটেলে । অসাধারণ সুস্বাদু কাশ্মীরি খানা । গরগরে, মশলাদার মাটন গুস্তাবা আর রিস্তা । সাথে গরম রুটি । গ্যাস্ট্রোনমিক আনন্দে উদরপূর্তি । 
 
১৯শে মে ২০১২
পাহাড়চূড়োয় বরফ । বরফচূড়োয় রোদ পড়েছে । মেঘমুক্ত আকাশ । গরমজলে স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট আর তারপরেই বেরিয়ে পড়া মেঘমুক্ত আকাশের উদ্দেশ্যে । কখন আবার বৃষ্টির কবলে পড়ে যাই । আজ আমরা গাড়ি নিয়ে আবার লিডার উপত্যকায় বেড়াব । নদীকে ছুঁয়ে দেখব ; তার উষ্ণতায় আজ গরমদেশের মানুষের আহ্লাদে আটখানা হবার । 
 
 ২০শে মে ২০১২
কাশ্মীর ভ্যালি এল ।

 পৃথিবীর সর্বোচ্চ গল্ফকোর্স । ঠুকঠাক গলফ বল মারছে কোনো খেলাড়ি । গাড়ী সেই গল্ফকোর্স কে পাশ কাটিয়ে আরো আরো পাইন আর দেওদারের মধ্যে দিয়ে এসে পৌঁছাল মস আর ফার্ণ ঘেরা কাঠের হোটেল ঘরে । 
গুলমার্গ এডভেঞ্চার  শুরু !
২১শে মে ২০১২
গন্ডোলা অভিযান @ গুলমার্গ    ! লাইন দিয়ে গন্ডোলা রাইডের টিকিট কাটা হল । 

 কেবল কার রোপওয়ে দিয়ে উঠবে পাহাড়ের মাথায় । এখানে তাকে বলে গন্ডোলা রাইড । 
২২শে মে ২০১২
সোনমার্গ অভিযান  ! ছুঁতে হবে বরফকে । টবোগানিং ! অনাস্বাদিত রোমাঞ্চকর অনুভূতি হল । বরফ থেকে গড়িয়ে পড়ার । সেই উঁচু থেকে নীচে ।  
 শ্রীনগর থেকে সোনমার্গের পথ.....

৪ঠা আগষ্ট ২০১২, শনিবার   আনন্দবাজার পত্রিকার "ব্যাগ গুছিয়ে" বিভাগে প্রকাশিত   
২৩শে মে ২০১২ 

ডাল লেকের এক হাউসবোটে বন্দী হলাম আপাততঃ দুদিন, দুরাতের জন্য ।  হাউসবোটের মালিক কাশ্মিরী । তার নিজস্ব হাউসবোটের নাম "হোটেল ক্যালিফোর্ণিয়া" !

 সেই হাউসবোটের ডাইনিং টেবিলে বসে গুগল ম্যাপে খোঁজা হচ্ছে আমাদের হাউসবোটের অস্তিত্ব ।
 রাহুল সেই গৃহ নৌকার মধ্যে ঢুকেই বসে পড়েছে ব্লগ লিখতে..
আমার অন্তরে তখন বাজছে সেই গিটারের সুর... বহুযুগ আগে ঈগলস্‌ এর সেই বিখ্যাত গান ।   
কেশর, আখরোট, শিলাজিত, উইলোকাঠের ক্রিকেট ব্যাট আর কাশ্মিরী কাঠের কারুকার্য , শাল-আলোয়ানের এম্ব্রয়ডারি,  আর পশমিনার সম্ভারে এখানকার মানুষজন অনেক প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে বেঁচে রয়েছে । তবে মনে মনে এদের খুব গুমর কাশ্মীর কে নিয়ে, তার ঐশ্বর্য নিয়ে । আর কেনই বা হবেনা ?