পাঠকদের অকুন্ঠ শুভেচ্ছা। এযাবত প্রচুর রিভিউ পেয়েছি অনেক গুণী মানুষের কাছ থেকে। আমি চির কৃতজ্ঞ তাঁদের কাছে। এই রিভিউটি লিখে পাঠিয়েছিলেন স্বনামধন্যা প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক শ্রীমতী গোপা দত্ত ভৌমিক। তাঁর বন্ধু আমার আরেক প্রিয় রূপা দিদির কাছ থেকে গোপা দি বইটি উপহার পেয়েছিলেন। গোপা দির রন্ধন সংক্রান্ত লেখাগুলি পড়ে কতকিছু শিখেছি আমিও। তবে সম্পূর্ণ অচেনা এক লেখককে এভাবে উৎসাহ দেওয়ার জন্য আবারও প্রণাম তাঁকে।
৩০ জানু, ২০২৬
৫১ বর্তী নিয়ে আলোচনা- শ্রীমতি গোপা দত্ত ভৌমিক
৫১বর্তী -বই আলোচনা করলেন মধুরিমা দত্ত
inscript.me এ প্রকাশিত ৫১বর্তী নিয়ে আলোচনা করলেন মধুরিমা দত্ত । বইটির ২য় মুদ্রণ হল বইমেলা ২০২৬ এ। যারা এতদিন ফিরে গেছেন মান্দাসের কলেজস্ট্রীট আউটলেট থেকে তাদের এবার স্বস্তি।
৫১বর্তী
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
মান্দাস
২৯ জানু, ২০২৬
মান্দাসের হাত ধরে উপন্যাসে ফিরলেন রসায়নের রাজা প্রফুল্লচন্দ্র
মান্দাসের হাত ধরে উপন্যাসে ফিরছেন রসায়নের রাজা প্রফুল্লচন্দ্র
রিভিউ লিখলেন সোহিনী দাস
নিচের লিংকে গিয়ে পড়া যাবে বুক রিভিউটি।
লীলাবতীর নবদুর্গা বইটি নিয়ে লিখলেন বেথুন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষা ডঃ কৃষ্ণা রায়
বাঙালি মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। আধুনিক বিজ্ঞান যতই দাবি করুক নারীর মেধা-মনন পুরুষের থেকে কোন অংশে কম নয়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কিন্তু দীর্ঘদিন নারীকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বাঙলার মেয়েরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পেলেও তাদের বিজ্ঞান পড়ার অনুমতি ছিলনা। আমাদের দেশে উনিশ শতকে ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন পরামর্শ দিয়েছিলেন , মেয়েদের বিজ্ঞান পড়ার দরকার নেই। সে সময় কোন কোন বিখ্যাত মানুষ বলে থাকতেন , মেয়েদের মেধার যথেষ্ট ঘাটতি আছে । তবুও মেয়েরা হাল ছাড়েনি। অনেক মেয়েই এই সব প্রচলিত বাধার গন্ডি পেরিয়ে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে চেয়েছেন । উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকেই মেয়েরা ডাক্তারি পড়তে এসেছে, বিশ শতকের গোড়ায় ফিজিক্স , কেমিস্ট্রি, বায়োলজি অঙ্ক নিয়ে দিব্য পড়াশুনো চালিয়ে গেছে। দেশের কত মেয়ে বিজ্ঞানের গবেষণা করতে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন ।
কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ না পেয়েও গত শতকে এই বাঙলায় কয়েক জন মেয়ে তাদের নিজস্ব ভঙ্গীতে , স্বাভাবিক আগ্রহে বিজ্ঞান চর্চা করেছে। তাদের সবার কথা আমরা হয়তো জানিনা। কিন্তু দুটি নারীর নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতেই হয়। প্রথম-জন রবীন্দ্রনাথের ন’দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী(১৮৫৬-১৯৩২), বাঙলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রবন্ধ রচয়িতা। অন্যজন নিজেকে মেলে ধরেছিলেন বিজ্ঞান নির্ভর সাহিত্যে, জনবিজ্ঞানের প্রবন্ধে এবং কল্পবিজ্ঞানের দুনিয়ায়। তিনি বেগম রোকেয়া( ১৮৮০-১৯৩২)। আক্ষরিক অর্থে এরা ছিলেন বিজ্ঞান-মনস্ক , বিজ্ঞানী নন। কিন্তু যে পূর্বজ নারীর চেতনা বহন করে ছিলেন এঁরা, তিনি ছিলেন দ্বাদশ শতকের এক অসামান্যা নারী, বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ দ্বিতীয় ভাস্করাচার্যের কন্যা গণিতজ্ঞ তথা জ্যোতির্বিদ লীলাবতী। এই লীলাবতীর চেতনা বহনকারী পরবর্তী নয় জন বিশিষ্ট নারী বিজ্ঞানীর দিকে আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন সুসাহিত্যিক ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় । বর্তমান গ্রন্থের নাম তাই” লীলাবতীর নবদুর্গা”। এই দুর্গা প্রতিম নারীদের তালিকায় যারা আছেন , তাঁরা সকলেই বিদগ্ধ প্রথমা, প্রচলিত কাচের দেয়াল ভেঙ্গে যারা অভীষ্ট লক্ষে নির্ভয়ে হেঁটে গেছেন । এই তালিকায় প্রথমেই আছেন ১৮৬১ সালে জাত কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, পাশ্চাত্য শিক্ষায় চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করে চিকিৎসকের বৃত্তিতে যিনি আজীবন নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন । আছেন অসামান্য পদার্থবিদ বিভা চৌধুরি( জঃ১৯১৩-), জনপ্রিয় বিশিষ্ট রসায়নবিদ অসীমা চট্টোপাধ্যায়( জঃ১৯১৭)। মেয়েরা ইতিহাস পড়তে পারে, কিন্তু সেই জ্ঞান নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে নাক গলাবেন এমন ব্যাপার কে ভেবেছিল? খুলনার মেয়ে দেবলা মিত্র কিন্তু ভেবেছিলেন (জঃ ১৯২৫)। ভারতে আর্কিওলজি তথা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রথম নারী ডিরেক্টার হলেন তিনি। সচরাচর জীববিজ্ঞানে মেয়েদের স্বাভাবিক ঝোঁক থাকে । কিন্তু পদার্থবিদ্যা পড়ে জীব বিজ্ঞানের পাঠ আরো নিবিড় ভাবে আত্মস্থ করলেন অঞ্জলি মুখার্জী( জঃ ১৯২৭-), হয়ে উঠলেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণায় কত কাল নিজেকে জুড়ে রাখলেন প্রবাসী বাঙালি মেয়ে, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অরুণ শর্মার স্ত্রী অর্চনা শর্মা (জঃ১৯৩২)। আর বাঙলার আরেক মেয়েমহারানী চক্রবর্তী জীববিজ্ঞানের গভীরতম প্রদেশে দৃষ্টি ফেলে গবেষণায় মাতলেন জীবকোশের ভেতরকার জিনের সাম্রাজ্যে। মলিকিউলার বায়োলজিস্ট মহারানীর গবেষণা আজ সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত। প্রথাগত বিজ্ঞানের বিষয়ে মেয়েরা গত শতকের প্রথম ভাগ থেকে পা রাখলেও ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে এসেছিল গত শতকের চারটি দশক পার করে। অবিভক্ত বাঙলার ফরিদপুরের মাদারিপুর গ্রামের মেয়ে , প্রথম বাঙালি তথা এশিয়ার মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনীয়র ইলা মজুমদারের ( জঃ১৯৩০-) লড়াইটা তাই পুরুষ-কেন্দ্রিক প্রকৌশলের জগতে বড় কম ছিলনা। আর আন্টার্টিকার মত দুর্গম পথে অভিযান চালিয়ে যে আধুনিক বাঙালি মেয়েটি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন তিনি জিওলজির উজ্জ্বল ছাত্রী তথা গবেষক- অধ্যাপিকা সুদীপ্তা সেনগুপ্ত ( জঃ ১৯৪৬)।
তবে মেয়েদের বিজ্ঞানের সাধনার ইতিহাসটা কোন কালেই মসৃণ ছিলনা। আমরা যাঁকে আবহাওয়া-বিজ্ঞানীর সম্মান দিই না, কিন্তু দূর অতীতে তিনিই --এই বাঙলার মেয়ে,” খনার “পর্যবেক্ষণে জন্ম হয়েছিল তথাকথিত অন্য এক বিষয়, যাকে এখন বলা যায় আবহাওয়া সম্পর্কিত পরিসংখ্যানবিদ্যা। এখানে উল্লেখ করা এই নয় জন বিজ্ঞানীর মধ্যে সবার চলার পথ খুব সুগম ছিলনা। মেধা –মনন –সাধনার সাফল্যের যথোচিত আলো তাদের কয়েকজনের মুখে বিশেষ পড়েনি, সে আলো কেড়ে নিয়েছে , সমকালের পুরুষ-শাসিত সমাজ । এই তালিকায় উপেক্ষিত বিজ্ঞানী বিভা চৌধুরির নাম করতেই হয়। মাত্র কয়েক দশক আগে দূর মহাকাশে একটি নক্ষত্র তাঁর নামেই পরিচিত হবার আগে পর্যন্ত বাঙলার বহু মানুষই জানতেন না কে এই বিভা ? বলতে হয় ইলা মজুমদারের সংগ্রামের কথা । মেয়েদের বিজ্ঞান সাধনার ইতিহাস তাই বরাবর বড় করুণ । একুশ শতকের মেয়েরা বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য তো কত সুযোগ পায়। সে সুযোগ পাননি তাদের পূর্বমাতৃকারা। সেই ভাবনাতেই এই ন’জন প্রতিভাময়ী দুর্গারূপিনী নারীর প্রসঙ্গের অবতারণা, এই গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ। লীলাবতীর উত্তরসূরীদের সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত হলেও কিছুটা আলো পড়ুক মানুষের চেতনায়, তৈরি হোক অনুসন্ধিত্যসু পাঠকের পরবর্তী জিজ্ঞাসার পথ।
ব্যক্তিগত পরিচিতির সুবাদে জানি, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় নিজে বিজ্ঞানের কৃতী ছাত্রী হলেও পরিস্থিতির কারণে গবেষণার দুনিয়ায় পা রাখতে পারেন নি। দীর্ঘকাল শিক্ষা জগতে অবস্থান করার সুবাদে ইন্দিরার মত অনেক মেয়ের জীবনে , এই যন্ত্রণার, এই আক্ষেপের কথা জেনেছি। কত নারীর অপ্রমেয় মেধার হিসেব সংসার রাখেনা। যেটুকু জানা যায় , সেটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। এমন একটি স্পর্শকাতর অথচ অনালোচিত বিষয় ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বড় স্বচ্ছন্দে , বড় মমতায় তুলে ধরেছেন । সায়ন্তন প্রকাশনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আশা রাখি বইটি পাঠক প্রিয় হবে।
ডঃ কৃষ্ণা রায়
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বেথুন কলেজ
কলকাতা।
------------------------
--------------------------
লীলাবতীর নবদুর্গা
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
সায়ন্তন পাবলিকেশন
মূল্য ২২০ টাকা
৬ জানু, ২০২৬
রানিয়ার রান্নাঘর - রিভিউ লিখলেন সায়ন তালুকদার
রানিয়ার রান্নাঘর উপন্যাসের প্রথম রিভিউ লিখলেন সায়ন তালুকদার
রানিয়ার রান্নাঘর। নাম শুনেই সহজেই অনুমেয় এ বইয়ের যাপন রান্নাকে ঘিরে। কিন্তু নিছক রেসিপিভিত্তিক বই এটি নয়; এটি আসলে রান্নাকে ভালোবেসে যাপনের গল্প। রান্নার ইতিহাসের অতল সাগরে ডুব দিয়ে জানার প্রচেষ্টা যেমন একদিকে, তেমনই এই উপন্যাসের চরিত্ররা আমার, আপনার—আমাদের চারপাশের সমাজ থেকে উঠে আসা সম্পর্কের সমীকরণের কথা বলে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রানিয়া, যে একজন ফুড ইভেঞ্জালিস্ট। ছোটবেলা থেকেই রন্ধনপটিয়সী মায়ের, দিদার হাতের রান্না খেয়ে অভ্যস্ত রানিয়া নিজেও বড় হয়ে রন্ধনের প্রতি একটা অনবদ্য আকর্ষণ অনুভব করে। রন্ধনে বন্ধন। রান্নার দ্বারা সে গোটা বিশ্বকে মজিয়ে রাখতে চায়। তার বর কুশল তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করে, পাশে থাকে স্ত্রীর এই যাত্রায়। রানিয়া ভাবে,গোটা বিশ্বের কাছে পৌঁছে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া। রানিয়া পডকাস্টে তুলে ধরে প্রাচীন থেকে নবীন রান্নার হালহকিকত, টুকরো ইনফো, হারানো ইতিহাস এবং অবশ্যই রেসিপি। সব মিলিয়ে সার্থক সমাবেশ। রানিয়ার দিদি মিঠি। একই মায়ের পেটের মেয়ে হলেও তাঁরা স্বভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত। মিঠি স্বামী শৈবালের সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরে থাকে,যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে তাদের কাজ। রান্না নিয়ে কোনওদিনই সেভাবে ওয়াকিবহাল ছিল না মিঠি। রানিয়ার রন্ধনপ্রীতি দেখে ব্যঙ্গ করত সে। রাঁধাই যে মেয়েদের একমাত্র কর্তব্য নয়, এটা সে সটান জানিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে অবলীলায় বেরিয়ে আসে।
এ উপন্যাস শুধু যে রানিয়া এবং মিঠির ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব, ঈর্ষার গল্প বলে তাই নয়; পাশাপাশি আরও নানাবিধ চরিত্ররা জুড়ে থেকে উপন্যাসটিকে করে তোলেন আরও মধুর, বাস্তবতায় মোড়া। আমাদের চারপাশে চোখ রাখলেই আমরা এমন অনেক রানিয়া-মিঠির মতো দুই বোনকে দেখতে পাব যাঁরা ছোটবেলার একসঙ্গে খেলে,ঝগড়া করে, ভালোবাসায়,অভিমানে বেড়ে উঠলেও একটা সময়ের পরে এসে ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব, স্বার্থপরতার নাগপাশে জড়িয়ে গিয়ে সম্পর্কগুলোর মর্যাদা হারিয়ে ফেলে।
রানিয়া ফুডব্লগার। সুদূর ডালাসে বসে তাঁকেও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে সে কোনো কিছুতে কম নয়। এ পৃথিবীতে সে এসেছে কিছু দাগ রেখে যাওয়ার জন্য। নানাবিধ খাবার নিয়ে তাঁর এমন ভালোবাসা রয়েছে যে, তার সুলুকসন্ধানে নেমে সে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ফুড ব্লগার। বর্তমান দুনিয়ার যা অত্যন্ত প্রচলিত এবং অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিগণিতও। রানিয়া নিজে কিছু করে দেখাতে চায়, সে চায় সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত হতে। পড়াশোনা নিয়ে সেভাবে এগোয়নি বলে কম ব্যঙ্গ সইতে হয়নি তাঁকে। মিঠির ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গি তাঁকে বারংবার বিদ্ধ করেছে। তার যোগ্য জবাব দিতে চায় রানিয়া। ফুড ব্লগিং তো অনেকেই করে, রানিয়ার কন্টেন্ট অভিনবত্বের ছোঁয়া। রসকষহীন মন্তব্য নয়, বাংলার হেঁশেল থেকে উঠে আসা মা-ঠাকুমার রান্নার ইতিহাস গল্পের ছলে বলে রানিয়া। সেখানে যেমন ঝালের ঝোলের কথা থাকে, তেমনই থাকে রসুন রুটির ইতিবৃত্ত। দাতসি, কেজুনে ক্রেওল, পিৎজা, পাওভাজির মতো বিভিন্ন প্রদেশের খাবার কথা যেমন উঠে আসে তাঁর ব্লগে, তেমনই জানাতে ভোলে না তার মামাবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোয় ভোগের খিচুড়ি রান্নার গল্প। একইসূত্রে উঠে আসে রানিয়ার ছোটবেলায় মামাবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোর হইহুল্লোড়ের কথা, গোটা বাড়ির সকলে মিলে ভোগ রান্নার কথা। সে এক হইহই ব্যাপার।
ধীরে ধীরে রানিয়ার পরিচিতি বাড়তে থাকে। দেশ থেকে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম। অ্যাকাউন্ট মানিটাইজড্ হয়ে টাকা আসে। মিঠি ঈর্ষান্বিত হয়। ক্যামেরার সামনে রান্না নিয়ে বকবক,দু-চারটে জ্ঞান দিয়ে রানিয়ার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্তরে উত্তরণের এই যাত্রা মিঠিকে উত্তেজিত করে তোলে। মা অনুসূয়া সিঁদুরে মেঘ দেখেন। তবে বোনের দেখাদেখি, তাঁকে টক্কর দিতে বা গৃহকর্মে নিপুণা স্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে কখনও মা, কখনও বোনের কাছে রেসিপি জেনে টুকটাক রাঁধতেও চেষ্টা করে মিঠি। রানিয়া খুশি হয়। ছোট ছোট খুশি, পরিবারকে নিয়ে একসূত্রে বেঁধে থাকতেই তো সে চায়। সুদূরে বিয়ে হওয়ার সুবাদে যখন-তখন দেশে মা-বাবার কাছে আসতে পারে না সে। তাই নিয়ে মনখারাপ,এদেশে,এদেশেও।
রানিয়ার ফুড ব্লগ এগিয়ে চলে। ইউটিউবে নতুন চ্যানেল। নাম দেয় ‘পেন্ডুলাম’। সেই পেন্ডুলাম দুলতে দুলতে কখনও সিঙাড়া, সামোসার ফারাক বোঝায়, কখনও হিঙ কোথা থেকে এল জানায়। কখনও আবার প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর রন্ধনের প্রসঙ্গ জানিয়ে তাঁকে কুর্নিশ জানায়, তেমনই কখনও আবার চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর হাতে বানানো ফিশমোল্ডের গল্পও শোনায়। ফলোয়ার বাড়তে থাকে, বিজ্ঞাপন আসে। রানিয়া এগিয়ে যায়। তবে সাফল্য যেমন অনেক পরিচিতি দেয়,বিশ্বমাঝারে নিজেকে খ্যাতনামা করে তোলে; তেমনই আপন সম্পর্কগুলো থেকে কখন যেন ক্রমশ একাকী করে দেয়। এর পিছনে কি কেবল ঈর্ষা নাকি পারস্পরিক দ্বন্দ্ব,তা জানে না রানিয়া। রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা তাঁর আশ্রয় হয়ে ওঠে।
হেঁশেল এবং সেখানে বিভিন্ন রান্নার জন্য, ইতিহাস,গল্প যেমন এ উপন্যাসে সুন্দরভাবে ধরা দিয়েছে, তেমনই দুই বোনের ইগো, তাঁদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, অভিমানের এক অদ্ভুত চড়াই-উতরাই সাক্ষী হয়ে থেকেছে এই উপন্যাস। রান্নাঘর কেবল একটি বাড়িতে সীমাবদ্ধ না থেকে ডিজাটাল ফুড ব্লগিংয়ের দৌলতে সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোফোনে ছড়িয়ে পড়েছে। গোটা সেদ্ধ, বাঁশ মুরগির কথা যেমন রানিয়া জানে, ফুড ব্লগিং দৌলতে আমেরিকা, টেক্সাস সহ বিদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে তা পৌঁছে গিয়েছে। রানিয়ার রান্নাঘর আজ আর কেবল তাঁর একার নয়, সর্বজনীন।
এই রান্না, রান্নাঘর, রন্ধনপ্রীতি; তা নিয়ে ব্যঙ্গ, অভিমান, ভালোবাসা সবটুকু জুড়ে এই উপন্যাসে সম্পর্কের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন লেখিকা। তাঁর এই প্রয়াসকে কুর্ণিশ জানাই।
বইটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন শুভেন্দু সরকার। মুদ্রণপ্রমাদ খুঁজে পাইনি সেভাবে। পাতায় পাতায় কিছু ছবি থাকলে তা আরও শোভাবর্ধন করত বলে মনে হয়। তবে উপন্যাসের ঝরঝরে, টানটান গতি বইটি একটানা পড়তে বাধ্য করে, এক্ষেত্রে কলমের মুন্সিয়ানা অবশ্যই লেখিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের। পাঠ শুভ হল।
গ্রন্থ: রানিয়ার রান্নাঘর
লেখিকা: ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
প্রকাশক: মান্দাস
মূল্য: ৪০০ টাকা
সর্পগন্ধা - রিভিউ লিখলেন স্নিগ্ধদেব বোস
📕বই~ সর্পগন্ধা
✒️ লেখিকা~ ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
🎨 অলংকরণ~ সৌজন্য চক্রবর্তী
🖨️ প্রকাশনা~ দীপ প্রকাশন
💷 মুদ্রিত মূল্য~ ৩০০/-
📋 পৃষ্ঠা~ ১৭৫
📝পাঠ অনুভূতি- লিখলেন স্নিগ্ধদেব বোস 🌸
এ বছর সংকল্প ছিল আমার অচেনা সাহিত্যিককে চেনার। সেই সূত্রে এক বর্ণিল বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে লেখিকার সাথে পরিচয়। আজ পাঠ শেষে বইয়ের পাতায় তার সই আর ল্যাপটপের পর্দায় স্মৃতিময় ছবিগুলো দেখে মনে হচ্ছে—এ কেবল এক অনন্য সাহিত্য-সফর।
বাঙালি মনে সাপের যে চিরাচরিত আতঙ্ক, লেখিকা তাঁর জাদুকরী গদ্যে তাকে রূপ দিয়েছেন গভীর মমতায়। তাঁর গল্পে সরীসৃপ কখনো ‘নাগকন্যা’ হয়ে নিঃসন্তান দম্পতির শূন্যতা ভোরায়, কখনো ‘ফণী’ হয়ে বিশেষ শিশুর নিঃসঙ্গতার সাথী হয়। তাঁর প্রতিটি শব্দে বীরভূমের লাল মাটির ঘ্রাণ আর প্রকৃতির অলৌকিক ছোঁয়া মিশে আছে।
ভয় কাটিয়ে সাপেদের প্রতি এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে এই মায়াবী ভ্রমণ শেষ করলাম। লেখিকার সেই স্বাক্ষরটি আজ কেবল আমার বইয়ে নয়, মনের মণিকোঠাতেও স্থায়ী হয়ে রইল। এক কথায়—মুগ্ধ!
⛩️ নাগবন্ধন:
✨কলকাতার স্কুল শিক্ষক দম্পতি সায়ন ও সীমা মনের ক্ষত মুছতে আর একঘেয়েমি কাটাতে পাড়ি জমান ঝাড়খণ্ডের মন্দিরময় গ্রাম মলুটি-তে। তবে সায়নের মনে রয়েছে এক গোপন উদ্দেশ্য—এক তান্ত্রিকের খোঁজ করা, যিনি অলৌকিক উপায়ে তাদের অপূর্ণ পিতৃত্বের বাসনা পূরণ করতে পারেন। ইতিহাসের রহস্য আর তান্ত্রিকের হাতছানির মাঝে 'নাগবন্ধন' আসলে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে এক দম্পতির মানসিক টানাপোড়েনের গল্প।
🎯 লেখিকা এই গল্পে বিজ্ঞানমনস্ক সায়ন ও তার স্ত্রী সীমার ব্যক্তিগত শূন্যতাকে কেন্দ্র করে আধুনিক যুক্তিবাদ বনাম আদিম বিশ্বাসের এক চিরায়ত সংঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন। ঝাড়খণ্ডের নবরত্নগড় দুর্গ ও মন্দিরের ঐতিহাসিক আবহে মাতৃত্বের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তি পেতে এক তান্ত্রিকের দ্বারস্থ হওয়ার এই টানাপোড়েন অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। ভ্রমণের নেশায় দুঃখ ভোলার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত এক অলৌকিক আশার পেছনে ছুটে চলা মানুষের চিরন্তন আবেগের জটিল রসায়নই এই কাহিনির মূল ভিত্তি।
⭐ 'নাগবন্ধন' পড়ার সময় বিজ্ঞানের যুক্তি এবং অলৌকিক রহস্যের এক অদ্ভুত টানাপোড়েন পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে। ঝাড়খণ্ডের পটভূমিতে প্রাচীন স্থাপত্যের বর্ণনায় যেমন এক ধরণের ঐতিহাসিক গন্ধ পাওয়া যায়, তেমনি সায়ন ও সীমার সম্পর্কের আর্দ্রতা পাঠককে আবেগপ্রবণ করে তোলে। বিশেষ করে অজানার প্রতি ভয় এবং সেই ভয়কে জয় করে এক অলৌকিক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা গল্পটিকে এক গভীর মাত্রা দান করেছে। এটি কেবল একটি রহস্যগল্প নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস ও পরম আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটার এক অনন্য আখ্যান।
🛡️ সার্পেন্টিনা:
✨ কর্পোরেট ল-ইয়ার সুমেধা 'সর্পগন্ধা'র সূত্র ধরে খুঁজে পান এক অতি-গোপন রহস্যময় সংগঠন 'সার্পেন্টিনা সোস্যাইটি', যারা আড়ালে থেকে দেশের রাজনীতি ও ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। বন্ধু ইন্দ্রাণীকে সঙ্গে নিয়ে এই অন্ধকার জগতের দুর্ভেদ্য দুর্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক ভয়ঙ্কর মিশনে নামেন সুমেধা। পুরুষতান্ত্রিক এই চক্রের পাঠোদ্ধার আর অস্তিত্ব রক্ষার রোমাঞ্চকর লড়াই নিয়েই গড়ে উঠেছে এই কাহিনি।
🎯 লেখিকা এই গল্পে একটি 'সিক্রেট সোসাইটি'র রহস্য উন্মোচন এবং অজানার প্রতি দুঃসাহসী আকর্ষণকে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘদিনের পুরুষশাসিত সংস্থায় নিজের যোগ্যতা প্রমাণের মাধ্যমে এখানে এক শক্তিশালী নারীবাদী উত্তরণ ফুটে উঠেছে। সাপের প্রতীক ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলা এই রোমাঞ্চকর পথ এবং একজন পুলিশ অফিসারের অগোচরে তাঁর স্ত্রীর বিপজ্জনক মিশনে জড়িয়ে পড়ার টানাপোড়েন কাহিনিটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
⭐ 'সার্পেন্টিনা' পড়ার সময় এক অদ্ভুত শিহরণ কাজ করে। পার্ক স্ট্রিটের চেনা পরিবেশের ভেতরেই যে এমন এক অচেনা জগত থাকতে পারে, তা কল্পনাকেও হার মানায়। সুমেধা চরিত্রটির দৃঢ়তা পাঠককে মুগ্ধ করে; বিশেষ করে যখন সে নিজের স্বামী পুলিশ অফিসার অর্জুনের অগোচরেই এক বিপজ্জনক অভিযানে শামিল হয়। সাপের প্রতীকী ব্যবহার এবং গুপ্ত সংগঠনের নিয়মকানুন গল্পটিতে এক ধরণের গথিক আবহ তৈরি করেছে। গল্পের পরতে পরতে থাকা অনিশ্চয়তা এবং শেষ মুহূর্তের অভাবনীয় মোড় পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে। এটি কেবল একটি থ্রিলার নয়, বরং প্রথা ভাঙার এক শক্তিশালী রূপক আখ্যান।
🐍 কালনাগিনী:
✨ জনপ্রিয় টেলিভিশন সঞ্চালক রুচিরা এবং রহস্যময়ী ঈশানী দেবীর কথোপকথনের মাধ্যমে এই গল্পটি উন্মোচিত হয়। গ্ল্যামার জগতের তিক্ত অভিজ্ঞতায় দগ্ধ ঈশানী এখন আকালীপুরের শ্মশানে সাপদের মাঝে বাস করেন। আধ্যাত্মিক শক্তি ও প্রখর অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ঈশানী মূলত অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অদম্য প্রতিশোধের প্রতীক। তাঁর এই 'কালনাগিনী' রূপ আসলে এক কঠিন লড়াইয়ের বর্ম।
🎯 লেখিকার কলমে ঈশানী চরিত্রটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সেই সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ, যা নারীর তেজকে 'উদ্ধত' বলে দেগে দেয়। গ্ল্যামার জগতে প্রতিভার চেয়ে কেবল 'শরীরী আবেদন'কে গুরুত্ব দেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি পেতে তিনি বেছে নেন বীরভূমের আকালীপুরের শ্মশান। সেখানে সাপেদের মাঝে হঠযোগ ও কঠোর সাধনার মাধ্যমে তাঁর যে নতুন সত্তার জন্ম হয়, মহারাজা নন্দকুমারের ইতিহাস ও গুহ্যকালীর আশীর্বাদপুষ্ট সেই 'কালনাগিনী' রূপই এখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর প্রধান রক্ষাকবচ ও লড়াইয়ের মোক্ষম হাতিয়ার।
⭐ 'কালনাগিনী' গল্পটি পড়ার সময় এক ধরণের রোমাঞ্চ কাজ করে, বিশেষ করে ঈশানী দেবীর দৃঢ় এবং স্পষ্টভাষী সংলাপগুলো পাঠককে আবিষ্ট রাখে। গ্ল্যামার জগত থেকে আধ্যাত্মিকতায় তাঁর এই উত্তরণ কোনো ধর্মীয় ভণ্ডামির ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নিজের আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট-যেমন ওয়ারেন হেস্টিংস ও মহারাজা নন্দকুমারের দ্বন্দ্ব-গল্পটিতে এক গভীর মাত্রা যোগ করেছে। পরিশেষে, 'কালনাগিনী' কেবল একটি নাম নয়, বরং এক নারীর নিজেকে রক্ষা করার এবং অন্যায়ের যোগ্য জবাব দেওয়ার এক প্রতীকী রূপ।
🔱 সর্পমঙ্গলা:
✨ লাবণ্যর অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা ও সাপের প্রতি রহস্যময় টান ললিতের মনে গভীর সংশয় জাগায়। মনসার থানে গোপন আরাধনা আর এক প্রাচীন অভিশাপের ছায়ায় লখিন্দরের নিয়তি ও আধুনিক নারীশক্তির দ্বৈরথ এখানে প্রকট। ললিতকে মাধ্যম করে লাবণ্যর এই আধ্যাত্মিক লড়াই মূলত পুরুষতান্ত্রিক দম্ভকে চূর্ণ করে নিজের জয়গান গাওয়ার এক অনন্য প্রয়াস এই কাহিনী।
🎯 পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও 'মেল ইগো'-র বিপরীতে এই গল্পটি নারীশক্তির এক বলিষ্ঠ জাগরণ। বেহুলা-লখিন্দরের পৌরাণিক মিথ আর আধুনিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এখানে মিলেমিশে একাকার হয়েছে, যেখানে পুনর্জন্মের আভাস ও অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা কাহিনীকে দিয়েছে মায়াবী রহস্য। গ্রামীণ বাংলার লৌকিক বিশ্বাস আর আধুনিক জীবনবোধের এই অপূর্ব সমন্বয় গল্পটিকে এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
⭐ 'সর্পমঙ্গলা' পড়তে গিয়ে শুরু থেকেই এক ধরণের রহস্যময় আবেশ কাজ করে। ঈশানী দেবীর দৃঢ় এবং স্পষ্টভাষী সংলাপগুলো পাঠককে মোহগ্রস্ত করে রাখে। গল্পের পরিবেশ বিশেষ করে শ্মশানের পটভূমি এবং সাপেদের উপস্থিতি-এক ধরণের হিমশীতল রোমাঞ্চ তৈরি করে। এটি কেবল একটি অতিপ্রাকৃত গল্প নয়, বরং আধুনিক সমাজের মুখোশ খুলে দেওয়ার এক বলিষ্ঠ প্রচেষ্টা। গল্পের শেষে ঈশানী কেবল এক রহস্যময়ী নারী থাকেন না, বরং তিনি হয়ে ওঠেন অপরাজেয় নারীশক্তির এক প্রতীকী রূপ।
👁️ নাগমণি:
✨ বাঁশবেড়িয়ার দেড়শ বছরের প্রাচীন ভিটে আর হংসেশ্বরী মন্দিরের প্রেক্ষাপটে রহস্যময়ী কিশোরী ‘নাগমণি’র উপস্থিতি এক অতিপ্রাকৃত আবহের সৃষ্টি করে। ধ্বংসস্তূপের বুক থেকে জেগে ওঠা এই জ্যোতির্ময় মেয়েটি সাধারণ এক গ্রাম্য কিশোরী নাকি অতীতের কোনো অলৌকিক হাতছানি—সেই কুহেলিকাই এই গল্পের মূল উপজীব্য।
🎯 লেখিকা এই গল্পে শিকড়ের টানে আদি ভিটেয় ফেরার এই আখ্যানে বংশপরম্পরার ইতিহাস ও লোকজ আতিথেয়তা অনন্য মাত্রায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এক গ্রাম্য কিশোরীর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ও আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বন্দ্বের মাঝে নাগচম্পা ও সাপের প্রতীকী ব্যবহার বাস্তব ও পরাবাস্তবকে একাকার করে দিয়েছে। মূলত এটি প্রকৃতি, মিস্টিক আবহ আর আত্মপরিচয় খোঁজার এক মায়াবী উপাখ্যান।
⭐ 'নাগমণি' পড়তে গিয়ে শুরু থেকেই এক ধরণের গা-ছমছমে রোমাঞ্চ অনুভব করা যায়। লেখিকার সাবলীল বর্ণনায় পাহাড়ি পরিবেশ আর রহস্যময় গুহার আবহ যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। গল্পের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সাসপেন্স পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। বিশেষ করে সাপেদের বর্ণনা এবং লোকগাথার ব্যবহার গল্পটিতে এক ধরণের অতিপ্রাকৃত আবেশ তৈরি করেছে। এটি কেবল একটি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী নয়, বরং মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং প্রকৃতির বিশালতার এক চমৎকার আখ্যান যা শেষ হওয়ার পরেও মনে এক রেশ রেখে যায়।
🌙 অচেনা পরকীয়া:
✨ শহরের কোলাহলমুক্ত নির্জন মফস্বলে এক দম্পতির জীবনে এক বিশাল সাপের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এক অতীন্দ্রিয় আখ্যান। বিজ্ঞানের যুক্তি আর অতিপ্রাকৃতের মায়াজালে ঘেরা এই গল্পে এক রহস্যময়ী নারীমূর্তির সান্নিধ্য ও শীতল স্পর্শ জন্ম দেয় এক ‘অচেনা পরকীয়া’র। মানুষের অবদমিত কামনা আর এক মৃত সঙ্গীর আকুতি মিলেমিশে এখানে এক অলৌকিক ও শিহরণ জাগানিয়া অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করেছে।
🎯 লেখিকা এই গল্পে অতিপ্রাকৃত ও পরাবাস্তবতার নিপুণ বুননে মানুষ এবং আদিম প্রকৃতির এক রহস্যময় সম্পর্কের রসায়ন ফুটিয়ে তুলেছেন। মৃত সঙ্গীর বিরহে কাতর এক 'মাদি' সাপের হাহাকার যখন মানুষের অবদমিত কামনার সাথে মিলে যায়, তখন জন্ম নেয় এক অতীন্দ্রিয় 'পরকীয়া'। এক রহস্যময়ী ছায়ার সাথে গড়ে ওঠা এই অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্রটি শেষ পর্যন্ত পারিবারিক জীবনের চেনা সমীকরণগুলোকেই আমূল বদলে দেয়।
⭐ 'অচেনা পরকীয়া' পড়তে গিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী জগতের আমেজ পাওয়া যায়। লেখিকা যেভাবে বসন্তের বর্ণনা দিয়েছেন-শিমুল, পলাশ, আর মহুয়া সরণির মাদকতা-তা পাঠককে শুরুতেই এক স্নিগ্ধ পরিবেশে নিয়ে যায়। গল্পের নামকরণে যে চমক আছে, কাহিনী এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার সার্থকতা উন্মোচিত হয়। এটি কোনো সাধারণ নারী-পুরুষের ত্রিকোণ প্রেমের গল্প নয়, বরং এক সরীসৃপের প্রতি মানুষের মুগ্ধতার গল্প। সবচেয়ে ভালো লাগে ওঝার সেই সরল বিশ্বাসটুকু-যেখানে সে সাপটিকে 'শুভ' এবং 'মাদি সাপ' হিসেবে চিহ্নিত করে জানায় যে সে তার হারানো সঙ্গীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। গল্পের শেষে যখন দম্পতির দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে এবং তারা নতুন প্রাণের আগমনের বার্তা পায়, তখন মনে হয় প্রকৃতি তার নিজের নিয়মেই মানুষের অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দেয়। এটি একটি ভিন্নধর্মী এবং মন ছুঁয়ে যাওয়া ছোটগল্প যা জীবনের 'অচেনা' বাঁকগুলোকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে।
🌿 লাউডগা সাপ:
✨ লাউশাকের আঁটিতে লুকিয়ে আসা একরত্তি এক সবুজ সাপ অনিচ্ছাকৃতভাবেই সুতপাদের অন্দরমহলে এক মায়াবী জগতের দ্বার খুলে দেয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোর ঋভুর সাথে সেই 'ফণী'র কথোপকথন বিজ্ঞান ও যুক্তির ঊর্ধ্বে গিয়ে গতজন্মের এক অলৌকিক সংযোগকে উন্মোচিত করে। এটি মূলত এক নিঃসঙ্গ কিশোরের জগত আর প্রকৃতির এক রহস্যময় প্রাণের নিবিড় ও বিস্ময়কর মেলবন্ধনের গল্প।
🎯 লেখিকা এই গল্পে ঋভুর মতো বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুর সংবেদনশীল দৃষ্টিতে প্রকৃতি ও এক অবহেলিত সরীসৃপের মায়াবী সখ্য ফুটিয়ে তুলেছেন। গতজন্মের স্মৃতিবাহী এক অলৌকিক টান আর একাকী কিশোরের মনস্তত্ত্ব মিলে এখানে মানুষ ও বন্যপ্রাণের এক অনন্য ও মরমী বন্ধুত্বের আবহ তৈরি করেছেন।
⭐ 'লাউডগা সাপ' পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে এক মায়াবী কুহক তৈরি হয়। লেখিকা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে একটি খুদে সাপের জবানবন্দিতে মানুষের পৃথিবীকে তুলে ধরেছেন। ফ্রিজের তলার উষ্ণ আশ্রয়ে থাকা একটি তুচ্ছ সরীসৃপ যে কতটা মানবিক এবং সংবেদনশীল হতে পারে, তা ভাবিয়ে তোলে। গল্পের শেষে ঋভুর মধ্যে যে পরিবর্তন দেখা যায়, তা একাধারে রহস্যময় এবং আশাব্যঞ্জক। মানুষের অবজ্ঞা আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভিড়ে প্রকৃতি যে কতটা নীরবে আমাদের ক্ষত সারিয়ে দেয়, এই গল্পটি সেই ধ্রুব সত্যকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। এটি কেবল একটি সাপের গল্প নয়, বরং এক অদ্ভুত ভালোবাসার আখ্যান যা পাঠককে অনেকক্ষণ ঘোরের মধ্যে রাখে।
🌀 মন দোলে, তন দোলে:
✨ মেধাবী ছাত্র আদিনাথের আধুনিক স্থাপত্যচর্চার সমান্তরালে মিশে আছে তার শৈশবের রহস্যময় ও অতীন্দ্রিয় ছায়াসঙ্গী 'চাঁদু'। সহপাঠী সংগ্রামীর যুক্তিবাদী মন যখন এই সম্পর্কের মুখোমুখি হয়, তখনই শুরু হয় বিজ্ঞানের সাথে লোকজ বিশ্বাসের এক চিরায়ত দ্বন্দ্ব। মূলত সাপের প্রতীকি উপস্থিতিতে আদিনাথের সৃজনশীলতা ও তার শিকড়ের রহস্যময় রসায়নই এই আখ্যানের মূল আকর্ষণ।
🎯 শিকড়ের টান ও সৃজনশীলতার রহস্যময় মেলবন্ধনই এই গল্পের মূল উপজীব্য। এখানে আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার যুক্তির সাথে গ্রামীণ মিথ ও অতিপ্রাকৃত অনুপ্রেরণা সমান্তরালে মিশে গেছে, যেখানে 'সাপ' সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রতীক। বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের চিরায়ত দ্বন্দ্বকে ছাপিয়ে কাহিনীটি শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি ও মানুষের এক নিবিড় সখ্যতার আখ্যানে রূপ নিয়েছে।
⭐ 'মন দোলে, তন দোলে' গল্পটি পড়তে গিয়ে এক অদ্ভুত দোলাচলের অভিজ্ঞতা হয়। লেখিকা খুব সুন্দরভাবে একজন ছাত্রের কঠোর পরিশ্রমী নাগরিক জীবনের সমান্তরালে তার ফেলে আসা গ্রামের স্মৃতি ও সংস্কারকে তুলে ধরেছেন। আদির চরিত্রের মধ্যে যে দ্বৈততা আছে-একদিকে সে আধুনিক ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে সে 'চাঁদু'র পরামর্শ ছাড়া এক পা-ও চলতে পারে না-তা পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সাপের প্রতীকি ব্যবহার। বেঞ্জিন রিং আবিষ্কারের গল্পের মতোই সাপের লেজ কামড়ে থাকার যে ধারণাটি এখানে এসেছে, তা বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন আর অতিপ্রাকৃতিক বিশ্বাসের মাঝখানের সূক্ষ্ম সুতোটিকে স্পর্শ করে। বৃষ্টির দিনে সাপের ভয় আর মনসা গাছের ছবির অনুষঙ্গ গল্পে এক রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি ছাত্রের জীবনযুদ্ধ নয়, বরং মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসের এক সুন্দর প্রকাশ।
🧿 সাপের ম্যাজিক (অনুবাদ):
✨ তিব্বতের দুর্গম পথে এক দয়ালু পথিকের হাতে প্রাণ ফিরে পাওয়া তিন প্রাণী ও এক মানুষের গল্প এটি। পশুপাখিরা কৃতজ্ঞতা জানালেও, সেই মানুষটির চরম অকৃতজ্ঞতায় পথিক কারাবন্দি হন। অবশেষে এক রহস্যময় জাদু সর্পের অলৌকিক হস্তক্ষেপে অশুভের বিনাশ ও নিরপরাধের মুক্তি ঘটে। বিশ্বাসঘাতকতা বনাম মনুষ্যত্বের এই দ্বন্দ্বই গল্পটিকে এক ধ্রুপদী রূপকথায় উন্নীত করেছে।
🎯 লেখিকার কলমে অনূদিত এই তিব্বতী উপকথাটি উপকার ও অকৃতজ্ঞতার এক চিরায়ত দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছে। পশুপাখির আদিম সারল্য আর মানুষের কুটিল স্বার্থপরতার বৈপরীত্য এখানে জীবনবোধের এক গভীর পাঠ দেয়। বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যার জাল ছিন্ন করে শেষ পর্যন্ত জাদুকরী অলৌকিকতা আর প্রকৃতির অমোঘ বিচারে মনুষ্যত্বের জয় হয়। অকৃতজ্ঞতার করুণ পরিণাম এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই অনন্য আখ্যানটি এর সাবলীল অনুবাদের গুণে সংকলনের অমর অংশ হয়ে রয়ে যাবে।
⭐ 'সাপের ম্যাজিক' গল্পটি পড়তে গিয়ে এক প্রাচীন তিব্বতি লোককথার স্বাদ পাওয়া যায়, কারণ লেখিকা সেখানের গল্পটিকেই অনুবাদ করেছেন। গল্পের শুরুতেই পাহাড়ের পাকদণ্ডী পথ আর বিপন্ন চার প্রাণীর যে বর্ণনা লেখিকা অনুবাদ করেছেন, তা এক সিনেমাটিক আবহ তৈরি করে। খুব সহজ সরল ভাষায় একটি গভীর জীবনদর্শন তুলে ধরেছেন-উপকারীর অপকার করলে প্রকৃতি বা অলৌকিক শক্তি কোনো না কোনোভাবে তার বিচার করেই। গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সাপের 'জাদু' বা মায়াবী ক্ষমতা, যা রূপকথার আমেজ নিয়ে আসে। ইঁদুরের খাবার বয়ে আনা বা সাপের ছদ্মবেশ ধারণ করার মাধ্যমে প্রাণীদের যে সংবেদনশীল রূপ দেখানো হয়েছে, তা পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়। শিশুদের জন্য যেমন এটি একটি চমৎকার নীতিকথা, বড়দের জন্যও এটি সম্পর্কের বিশ্বস্ততা নিয়ে ভাবার এক সুন্দর রসদ। সব মিলিয়ে এটি একটি স্নিগ্ধ এবং শিক্ষণীয় ছোটগল্প।
🔮 সামগ্রিক অনুভূতি:
⭐ লেখিকার ‘সর্পগন্ধা’ সংকলনটি বিজ্ঞানের যুক্তি আর মানুষের আদিম বিশ্বাসের এক চমৎকার রসায়ন। এটি কেবল সরীসৃপ জগতের কথা নয়, বরং মানুষের অবচেতন মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়, ভক্তি আর অলৌকিকত্বের এক সংকলন। লেখিকা এখানে সাপকে কেবল বিষধর প্রাণী হিসেবে দেখেননি, বরং পুরাণ ও মহাকাব্যের সেই ‘মিথিক্যাল’ সত্তা হিসেবে এঁকেছেন, যা যুগ যুগ ধরে জ্ঞানের প্রতীক হয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে মিশে আছে। আধুনিক জীবনের রুক্ষ বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও মানুষ যখন অসহায় বোধ করে, তখন সে ফিরে যায় সেই প্রাচীন বিশ্বাসের কাছে—যেখানে মা মনসার আশীর্বাদ বা সাপের অলৌকিকত্ব এক পশলা স্বস্তি নিয়ে আসে।
⭐ বইটির প্রতিটি গল্প ও উপন্যাসিকায় ফুটে উঠেছে বিজ্ঞানের যৌক্তিক মন এবং এক সংবেদনশীল শিল্পীর হৃদয়ের দ্বন্দ্ব। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মনসার থানে দুধ ঢেলে আসার যে অকৃত্রিম ভক্তি, তা যেমন পাঠককে ছুঁয়ে গেছে, তেমনি আধুনিক দম্পতির সন্তানহীনতার যন্ত্রণায় অলৌকিক আশ্রয়ের সন্ধান পাঠকের মনে এক করুণ ও রহস্যময় আবহ তৈরি করে। ‘সর্পগন্ধা’ আসলে এক বিষণ্ণ ও মায়াবী অনুভূতির কোলাজ, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির রহস্য আজও বিজ্ঞানের সীমানার বাইরে অনেক গভীরে বিস্তৃত। সাপের খোলস ত্যাগের মতো এই গল্পটিও যেন মানুষের বিশ্বাসের নবজন্মের গল্প শোনায়, যা একাধারে শিহরণ জাগানিয়া এবং পরম আশ্রয়ের।
✨ পাঠ শুভ হোক। 🌸
![]() |
| দীপ প্রকাশনার সি ই ও সুকন্যা মন্ডলের সঙ্গে |
![]() |
| লেখক - ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় |
![]() |
| বইপ্রকাশ- কলেজস্ট্রীট কফিহাউজের বইচিত্র সভাঘরে |














