৩১ আগস্ট, ২০১৩

মনসুন সোনাটা পর্ব-৩

-->


তারকেশ্বর পশ্চিমবাংলার শৈবতীর্থের অন্যতম তারকেশ্বর । হুগলীজেলার এই দেবভূমি হাওড়া স্টেশন থেকে মাত্র ৩৬ মাইল দূরে । আমার চলেছিলাম বর্ষণমুখর এক কাকভোরে । গাড়ি নিয়ে সোজা উত্তরে নিবেদিতা সেতু পেরিয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে সিঙ্গুরের পর বাঁদিকে ঘুরতে হবে । তারপর স্টেট-হাইওয়ে ২ ধরে গেলেই পড়বে তারকেশ্বর । গাড়ি রাখবার চমতকার জায়গা আছে মন্দিরের বাইরে । চমত্কার রাস্তা । বহু মানুষ শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত রেলপথে যাতায়াত করে থাকেন । স্বনামখ্যাত স্বয়ংভূ শিবলিঙ্গ আছেন এখানে যাঁর কলিযুগের নাম বাবা তারকনাথ । এবার আসি প্রতিষ্ঠাতার কথায় ।
তারকেশ্বর তীর্থস্থান থেকে প্রায় মাইল তিনেক দক্ষিণ-পূর্বে কানানদীর তীরে রামনগর গ্রাম । সেখানে রাও ভারামল্ল নামে এক রাজপুত রাজা রাজত্ব করতেন । রামনগরের স্থানীয় অধিবাসীদের উপর জোর জবরদস্তি করে রাজস্ব আদায় সহ নানাবিধ অত্যাচার শুরু করলেন । রামনগরের নিকটবর্তী গ্রাম বাসিন্দারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল । তারা মুর্শিদাবাদের নবাবকে সেকথা জানালে নবাব রাজারূপী ঐ দস্যুগণকে মুর্শিদাবাদে বন্দী করে পাঠাতে বললেন । এদিকে রাজা ভারামল্ল ও তার ভাই বিষ্ণুদাসকে দেখে নবাব বুঝলেন এরা কেবলমাত্র ভিনদেশী দুই রাজপুত । যাদের ব্যবহার অত্যন্ত ভালো এবং যারা ব্যবসার কারণে বাংলায় থিতু হয়েছে। নবাব তাদের রামনগরে থাকতে আদেশ দিলেন ।
রাজা ভারমল্লের একটি গোশালা ছিল । কপিলা নামে একটি হৃষ্টপুষ্ট গোরু সেখানে প্রচুর দুধ দিত । একদিন হঠাত দেখা গেল রাজার দুধ কমে গেছে । গোরক্ষকের ওপর ভার পড়ল সেই রহস্য উদঘাটন করার জন্য । সে গিয়ে দেখতে পেল জঙ্গলের অনেক গরুর মধ্যে কেবলমাত্র কপিলা একটি চকচকে পাথরের মধ্যে খোদিত একটি গর্তে স্তন রেখে সেখানেই দুধ দিচ্ছে । রাজাকে জঙ্গলের মধ্যে এনে সেই দৃশ্য দেখালেন গোরক্ষক । আশপাশের গ্রামের মানুষ দেখতে লাগল সেই দৃশ্য । তারা জানালো সেই পাথরটির ওপর বহুদিন ধরে তারা ধান ঝাড়ে কিন্তু এরূপ দৃশ্য তারা কখনো দেখে নি । আর এই পাথরটি হল সেই স্বয়ংভূ লিঙ্গ যিনি তারকনাথ রূপে পূজিত হন ।

শ্রাবণ মাসে প্রচন্ড ভীড় হয় তাই শ্রাবণ মাস পড়ার আগেইভাগেই ভোর ভোর আমরা পৌঁছেছিলাম আর পুজো দিয়ে নিয়েছিলাম । আছে সেই বিখ্যাত দুধপুকুর যেখান থেকে জল নিয়ে বাবার পুজোসামগ্রী কিনে পুজো করার ব্যবস্থা আছে । কথায় বলে দুধপুকুরে স্নান করলে সর্ব ব্যাধি বিনাশ হয় ।   তারকনাথের সেবার জন্য বাবার গদিতে দানের সুবন্দোবস্ত আছে । রসিদের বিনিময়ে দান গ্রহণ করা হয় সেখানে । জলযোগ ও দুপুরের খাওয়ার ভালো হোটেল ও আছে আর আছে কাশী বিশ্বনাথের মত অজস্র অলিগলি ও সেখানে দন্ডায়মান ষাঁড় । মোটের ওপর বাড়ির কাছাকাছি বেশ ভালো তীর্থস্থান এই তারকেশ্বর ।

কোন মন্তব্য নেই: