১৪ ফেব, ২০১৭

ভ্যালেন্টাইনস ডে

ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিল না আমাদের সময়ে । কিন্তু তখনো প্রেমে পড়ত ছেলেমেয়েরা । আর বসন্ত এলেই প্রেমের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিত তারা । যেমন এখনো দেয় সকলে।  পালন করত নিত্য নতুন ভ্যালেন্টাইনস ডে । কখনো হোলি, কখনো সরস্বতী পুজো কে উপলক্ষ করে। 
আর প্রণয়ের পারাবারে সাঁতার কাটতে কাটতে বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীরা ? দৈনন্দীন জীবনের একঘেয়েমিতে কেমন পাগল পাগল ভাব নিয়ে  তারাও মাঝে মাঝে পালন করত ভ্যালেন্টাইন্স ডে । স্বামী তার বিশেষ দিনটিতে স্ত্রীয়ের জন্য ছোট খাট সোনার গয়না কিনে উপহার দিতেন । অথবা আচমকা নিয়ে আসতেন বম্বেডাইং এর ফুলকাটা সুন্দর ডাবল বেডশিট। কোনও বার গিন্নীর জন্যে একটা ফুরফুরে পাতলা ডি সি এম এর ভয়েল কিম্বা  ফুলিয়ার টাঙ্গাইল।  অফিস থেকে ফেরার পথে, জলযোগের মাংসের প্যাটিস কিম্বা ফারপোর ফ্রেশলি বেকড কেক নিয়ে বাড়ি ফিরে বলতেন... 
"কি গো চা বসাও ? দেখ আজ কি এনেছি, তোমার জন্যে" 
কিম্বা পকেট থেকে বের করতেন বিশ্বরূপা, রঙমহল এর নাটকের সস্তার টিকিট দুটি। 
সদ্য শীতের আলস্য কাটিয়ে তাঁর গৃহিণীটি ঘরের মধ্যে থেকে গা ধুয়ে কিউটিকিউরার ফুলেল গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে নরম ছাপা শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে সলজ্জে যেন হাতে চাঁদ পেতেন। কত অল্পে খুশী ছিলেন এঁরা। এগুলি যেন সংসার করার পার্কস বা উপরি পাওনা, বোনাসের মত। এ সব দেখেছি আমাদের বাবা মায়েদের আমলে ।
মনে আছে এমনি মধুর নাতিশীতোষ্ণ সময়ে একবার কলকাতার বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনের সারারাত ব্যাপী জলসার টিকিট এনেছিলেন বাবা। হেমন্ত-আরতির গান দুজনেরি খুব পছন্দ। আর তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় খ্যাতির শীর্ষে আর আরতি মুখোপাধ্যায় নবাগতা। এই সারপ্রাইজে মায়ের মুখের হাসিটুকু বাঁধিয়ে রাখা হয়নি কারণ আমি তখন মাত্র ক্লাস ফোর এ।   
স্কুল জীবনের সরস্বতী পুজোর স্মৃতিটা বেশ অন্য ধরণের । যত বড় ক্লাস তত দায়িত্ত্ব । আর ক্লাস টেনের পুজোটা সবচেয়ে সুখের । সেখানে ছোটোদের ওপর দিদিগিরি আর যারপরনেই ফতোয়া জারি করা । সরস্বতী পুজোটা যেন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পাসপোর্ট হাতে পাওয়া । মায়ের হলদে শাড়ি পরে সেজে গুজে একদম ফিল্মি লুক নিয়ে স্কুলের পুজোয় সামিল হওয়া । কিন্তু আমি যে কলেজে পড়েছি সেই কলেজে মা সরস্বতী কলেজ-কন্যাদের রক্ষণশীলতার বেড়াজালেই শুধু আবদ্ধ রেখেছিলেন । মা সরস্বতীর পুজো সে কলেজে ব্রাত্য । অগত্যা বাড়িতে নিজেদের মত করে পুজো করে যে যার গ্রুপ তৈরী করে বেরোনো । ঠাকুর দেখা, খাওয়াদাওয়া, সিনেমা দেখা ব্যাস্‌ ! ঐ অবধি । ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিলনা শেষ আশির দশকে । অতএব নো প্রেম-প্রেম খেলা বা ভ্যালেন্টাইন উত্সব । সরস্বতী পুজোই আমাদের বসন্তের একমাত্র বহু প্রতীক্ষিত বসন্ত উত্সব ছিল । ফাগুণ হাওয়ায়, রঙে রঙে বেশ ছিলাম আমরা । ডিজিটাল গোলাপ ছিলনা, মুঠোফোনের রিংটোনে সংক্ষিপ্ত সংবাদ আসতনা হয়ত কিন্তু ভালোবাসা ছিল সরস্বতীর প্রতি ।



আমাদের বিয়ের ঠিক আশপাশের সময় থেকে শুরু হ'ল ভ্যালেন্টাইন্স ডে । লেট আশির দশকে । ব্যাস! সেই থেকে শুরু "ভ্যালেন্টাইন প্যাকেজ"  ফুলের দোকান থেকে শুরু করে গ্রিটিংস কার্ড , গয়না থেকে কেক, মকটেল, কফি, আইস ক্রিম সর্বত্র সেই তীর বিদ্ধ হৃদয়ের ছবি !  শপিং মলে ঝুলছে বিশাল বিশাল রক্তাক্ত হৃদয়, টিভির পরদায় প্রেমের গান, প্রেমের ছবি, প্রেমের কবিতা আবৃত্তি । আর এসেমেসের চোটে আগের দিন মধ্য রাত থেকে সেলফোনের নেট ওয়ার্ক হ'ল বেজায় স্লো হওয়া... এসব ও দেখেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেলফোন হাতে নিয়ে মুচকি হেসে কথা বলা? এসব ও দেখেছি বহুত। আর ল্যাপটপে চ্যাটালাপ? আর ম-বাবার ঝটিতি আগমন এ কন্ট্রোল টি মেরে অন্য ট্যাব খুলে গা ঢাকা দেওয়া? তাও দেখেছি। 
সামনেই সব ছেলেপুলেদের বড় বড় পরীক্ষা ! তো কি ? পরীক্ষার আগে একটু ডাইভারশান চাই না ? তাই তো সাধু ভ্যালেন্টাইন এই উপায় বাতলেছেন ।
গতবছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে'র দিন সকালে মর্নিং ওয়াকে গেছি; এক ভদ্রলোক তার সহধর্মিনীকে বলছেন " এই রোজ রোজ তোমার পাল্লায় পড়ে সকালে হাঁটতে বেরোনো আমার জীবন বিষময় করে তুলছে" 
নীরব স্ত্রীটি হাঁটতে লাগলেন আরো জোরে জোরে । 
ভদ্রলোক বললেন " খাবার ওপর ট্যাক্স ও বসালে , আর হাঁটাও ধরালে ...তাহলে যেকোনো একটাই করো হয় খেতে দিও না, নয় হাঁটতে  বোলোনা"আমার মা বেঁচে থাকলে দেখিয়ে দিত তোমার মজা  সব কিছুতেই  কাঁটছাঁট ! চায়ে চিনি বন্ধ , সকালে একগাদা ফল খাও , দুপুরে ভাত নৈব নৈব চ ! রাতে মোটে একটা রুটি ! কি কুক্ষণে একটা সেমি-ডায়েটিশিয়ান বৌ এনেছিলাম" 
বেচারী বৌটি তখনো চুপ !  
স্বামীটি আবারো বললে " দাঁড়াও দেখাব মজা , অফিসের বেয়ারাকে দিয়ে ভাল ভাল খাবার আনিয়ে খাব, তুমি জানতেও পারবে না" 
তখন বৌটি আর থাকতে না পেরে মুখ খুলল "আজকের দিনে ঝগড়া করতে  নেই গো , আজ প্রেমের দিন, আজ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে আর তুমি কি না শুধুমুদু আমাকে সক্কালবেলা গালাগালি দিচ্ছ ? আমি যে তোমার ওয়ান এন্ড ওনলি ভ্যালেন্টাইন !" 
একটা সময় ছিল যখন বসন্তের প্রথমদিনে লালগোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কোর্টশিপ চালু  হত । দোল  রঙীন হত  নীল খামে পারফিউম মাখানো চিঠির ভাঁজে লিপষ্টিকের চুমু দিয়ে ।  লুকিয়ে চুরিয়ে পার্কে গিয়ে দেখা করে কিম্বা কলেজ পালিয়ে কফিহাউসের টেবিলে মুখোমুখি হয়ে, হেদুয়া থেকে শ্যামবাজার গা ঘেঁষে ঘেঁষে হেঁটে  বাসে ওঠা ; আবার মনখারাপের পার্টির তোড়জোড় । আবার কবে হবে দেখা ? বাড়ির বড়দের চোখ এড়িয়ে চুপিচুপি লেটারবাক্স হাতড়ে চিঠি খোঁজা । টানটান উত্তেজনায় চিলেকোঠার দুপুরগুলোয় সেই কফিহাউসের স্মৃতির লালন চলত আবার যতদিন না দেখা হয় দুটিতে ।

ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সাথে । ভালোবাসার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । কত চোখ এড়িয়ে প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত ।    এখন   ভালোবাসার বাতাস বয় অর্কুট অলিন্দে। ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা  ভালোবাসা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই প্রেম ।


 প্রেম ছিল তাই রক্ষে! প্রোপোজ ডে, কিসিং ডে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, হাগ ডে,  দোল   ... এই সব দিনগুলোতো  ঐ প্রেমকেই ঝালিয়ে নেবার জন্যেই। প্রেম না থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হত? সারারাত ধরে অনলাইন চ্যাট করে রাতে আধোঘুমে স্বপ্নসুন্দরীকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কোথা দিয়ে একটা সুন্দর সকাল এসে পড়ল ! আর এই মোবাইলফোন ? সেও তো প্রেমের একটা দারুন পজিটিভ ক্যাটালিস্ট । কত সহজে একটা কথা মেসেজ করে জানিয়ে শুরু হয়ে যায় প্রেম । আর ঐ বিশেষ দিন গুলোতে  মনের মানুষটির হাতের মুঠোয়   ভালোবাসার দুটো কথা টুক করে চলে যায় । আঙুলে আঙুলে এমন চটপট প্রেম কিন্তু আগে ছিল না । এখন অনেক সহজ হয়েছে দুনিয়া ।বাজারে   গ্রিটিংস কার্ডের হার্ডকপি  ফুরোল, ভালোবাসার নটেগাছ লকলক করে ডালপালা বিস্তার করে দিল ওয়েব দুনিয়ায় ।


ভালোবাসার উপহারের তালিকায় কাফলিঙ্ক, টাইপিন  এখন অবসোলিট ; আইপড কিম্বা পেনড্রাইভের কাটতি বেশী ।   ভালোবাসার কবিতার খাতা লুকিয়ে থাকত বালিশের নীচে । আর এখন সেই কবিতা ঝরে ঝরে পড়ছে ফেসবুকের বারান্দায়, কার্ণিশে সর্বত্র । তবে ভালোবাসা আছে ভালোবাসাতেই । ভালোবাসা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে । শুধু আগে  শাড়িতে ব্লাউজে ছিল এখন কুর্তি, কেপরি লেহেঙ্গা আর জিনসে ।
তখন ছিল তরতাজা সত্যি গোলাপ । আর এখন তা ডিজিটাল গোলাপ । ছিল বসন্ত কেবিনে দুজনে মুখোমুখি দুটো ডিমের ডেভিল কিম্বা ফাউল কাটলেট । এখনো সেই সংজ্ঞা বদলায়নি কিন্তু চপ-কাটলেট থেকে প্রেম এখন বার্গার-মকটেলে আছড়ে পড়েছে অবিরত । 


ভালোবাসার চুপকথারা তখনো ছিল এখনো আছে শুধু বদলেছে তার মোড়ক । এখন চুপকে চুপকে নয়, ওপেন সিকরেট ।   তখন এই কূলে আমি আর ঐ কূলে তুমি টাইপের একটা ব্যাপার ছিল আর এখন অর্কুটে আমি আর ফেসবুকে তুমি মাঝখানে একরাশ ডেজিটাল ঢেউ । কিন্তু এখন ভালোবাসা আরো স্মার্ট হয়েছে ।  গুরুজনের সামনে ধরা পড়ে গেলে  কন্ট্রোল টি মেরে পালাও । তখন কিন্তু কাপড়ে চোপড়ে টাইপের অবস্থা ছিল । ভালোবাসার আয়ু বেড়ে গেল ভ্যালেন্টাইন পুজোর দৌলতে, আন্তর্জালের কৃপায় । মাঝখান থেকে বসন্তের কোকিল এই টেক দুনিয়া ছেড়ে পালিয়ে গেল । মোবাইল  রিংটোনের  দাপটে তার নিজেরই আজ ভাল্লাগেনা কুহুতান  ধরতে ।

আর ভালোবাসার উষ্ণতার পারদও চড়ছে বসন্ত সমাগমে । কারণটা কি গ্লোবাল ওয়ার্মিং ???    

বসন্ত এসে গেছে

তুচক্রের নির্ঘন্ট মেনে বসন্ত এসে গেছে। শীত পড়বে কি পড়বে না এই শুনতে শুনতে সুপর্ণারাও হাঁফিয়ে উঠেছে  আর সেই ফাঁকে সব শত্রুমুখে ছাই দিয়ে  মাঘের মধ্যিখনেই বিদায়ী শীতের পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়ে ফিরে যাবার তোড়জোড়। আর আমাদেরো লেপ-বালাপোষ-লাইসেম্পি আর যাবতীয় শখের শীত পোষাকদের ন্যাপথলিন বলের আড়ালে মুখ লুকোনো।
শান্তিনিকতনি ঘরাণায় কলকাতার বাঙালীর মাঘোত্সব যেন ব‌ইমেলা। আর সেই ব‌ইমেলার ফুরিয়ে যাওয়া মানেই শীতের যাই যাই ভাব। তখন স্মরণে, মননে বসন্ত জাগ্রত তার ঘরে। যেন এইটুকুনির পথ চেয়ে সারাটা বছর বসে থাকা। আর যদি শীত বাই বাই করে নাকের ডগা দিয়ে চলেই যায়, তাকে অলবিদা জানিয়ে বসন্তকে ওয়েলকাম করাটাই আমাদের একমাত্র লুকিং ফরওয়ার্ড, গোল অফ লাইফ। বসন্ত এসে গেছে।
যাই দেখি কোকিলার প্রসব বেদনা উঠল কি না! কোকিলগুলো ঠিক বুঝতে পারে। ওদের বাসা বানানোর চাপ নেই। স্বার্থপরের মত কাকের বাসায় ডিমটা পেড়েই খালাস। করণটা বসন্ত। এখন আর সময় নেই বাসা বাঁধবার। অলস কোকিল এর  পত্নী আসন্নপ্রসবা।  এখন সময় নষ্ট না করে প্রাণ উজাড় করে তাকে ভালোবাসা দাও। ট্যাঁপোর টোপর কোকিল বৌ টির থৈ থৈ রূপ তায় আবার সে বিয়োবে। অতএব এক্সট্রা কেয়ার নাও।  বাসা বাঁধতে গিয়ে যদি বৌটা হাতছাড়া হয়ে যায়! অগত্যা বরিষ্ঠ পক্ষী বাসিন্দা কাকেশ্বরই ভরসা।
এ বসন্তের প্রতিটি মূহুর্ত  বাঁচো নতুন করে। প্রেমে প্রেমে, নূতন রতনে স্বাগত জানাও। বাদাম গাছের পাতাগুলো ঝরে গিয়ে কেমন বৈধব্য পর্ব চলছিল। হঠাত তাকিয়ে দেখি তার পাতার অগ্রভাগ থেকে মুকুলোদ্গম হয়েছে। কচি পাতা সবে গজাতে শুরু করেছে। কমল মুকুলদল খুলিল বুঝি!  আগুণ রং তার। পাতাশূন্য, রিক্ত গাছ সেই আগুণ রঙে সিক্ত।  সেই গাছের শুকনো ডালে বসে কোকিল তার সন্তানসম্ভবা প্রণয়ীকে খোঁজে আর শিস্‌ দেয়। বসন্তের হিম জোছনায় ভোররাত থেকে কোকিলটা প্রহর গোনে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তার সঙ্গীটিকে কাছে পাবার আশায় ডাকতেই থাকে সে। পুরুষ হয়ে স্ত্রী টির ওপর গুরু দায়িত্ব পালন করেছে সে। সর্বশক্তি দিয়ে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে বলেছে, আমি তোমায় বড় ভালবাসি। কিন্তু তারপর? আরো বড় কাজটি করেছে। তাকে ইমপ্রেগনেট করেছে। অথচ তারপর সে কোথায় বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার পাতবে তা নিয়ে একটুও মাথাব্যাথা নেই তার। একেই বলে উদাসী বসন্ত। কবির কথায় সেই উদাসী বসন্তের হাওয়াতেই পথে পথে মুকুল ঝরে।   
-এই কোকিল ডাকিস কেন রে ? তোর জীবনে এত্ত বোলবোলা কিসের? 
দেখছিস্‌ না? বাইরে পৃথিবীটা কত অশান্ত? তবুও এত্ত স্বার্থপরের মত ফূর্তি তোদের? ভোর থেকেই ডেকেই চলেছিস তোরা। আহাম্মক! 
কোকিল সাড়া দিয়ে আবার বলে, কুহু। কু-কু...উউউউ ।
-আ মলো যা! আবার ডাকে! এই ডাক ঝালাপালা করে দেবে চৈত্রের শেষদিন পর্যন্ত। বাইরের বিশ্বে কি হচ্ছে তার কোনো হেলদোল নেই, ডেকেই চলেছে। তোর কর্কশ স্বর বৌটাকে ভাল লাগিয়েই ছাড়বি?  আমাদের জীবন থেকে বসন্ত বিদায় নিয়েছে রে মুখপোড়া। তবুও বসন্ত এসেছে বুঝতে পারি তোর জন্যে। এই কোকিল, রাগ করলি?
কোকিল বলে পি----উ..উ ।
-এবার অন্য সুর? তার মানে বুঝেছিস আমার কথা? ধরে নিলাম আগেরটা ছিল বসন্তরাগ। এবার ধরলি বেহাগ...কি তাই তো?
কোকিল বলে কু-উ-উ-উ।
-কি মিষ্টি ডাকছিস রে! নে, তোরা বরং প্রেম কর। আমি একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে আসি। বসন্ত আর কোকিল বিলাস করতে করতে যদি ঠান্ডা লেগে যায়! নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু ডেঞ্জারাস বুঝলি কোকিলা? তোদের নেই কো উত্তরপুব তাই তোদের মনে সদাই সুখ। 
শীতের অন্তিম নিঃশ্বাসটুকুনি থাকতে থাকতেই ভুঁইচাঁপা গাছগুলো কেমন শ্রীহীন। কেন বলতো? ওরাও ফুল ফোটাবে এইবারে। পাতাগুলো কেমন মন মরা তাই। সারাটা বছর যেমন তেমন পড়ে থাকে এই সময়টার অপেক্ষায়। তার পরেই বসন্তের দখিণা হাওয়া গায়ে মেখে মাটির মধ্যে থেকে ওদের স্টকগুলো বিকশিত হয়ে সদর্পে ঘোষণা করে তাদের অস্তিত্ব। আম্মো পারি ওদের মত। মানে বাগানের আর পাঁচটা ফুলগাছের মত। 
শীতের অবসান মানেই বাঙালীর ঘরে নিম বেগুণের গন্ধ। কাঁচা আম দিয়ে টকের ডাল আর সজনে ডাঁটা দিয়ে চচ্চড়ি, টোপাকুলের অম্বল । এসব নাকি খেতেই হয় এসময় । "রুড ফুড অফ বেঙ্গল"... নাম করা ফুড জার্নালিষ্ট ভীর সাঙ্ঘভির দেওয়া অনবদ্য নাম। সিম্পলি অসাম এই সময়। শীতের পার্টির অবসান। তেল-ঝাল-গরগরে রান্নাবাটির বিরাম। বসন্তে চাই হালকাপুলকা মানে সহজপাচ্য। কারণ পেট ঠান্ডা রাখো নয়ত রোগের প্রকোপে পড়বে বাপু! জন্মেছ ট্রপিকাল দেশে, মরিবে কি অবশেষে?  তাই বুঝি এদেশের আমগাছে বউল এসেই গেছে আর চিরুনির মত সারে সারে সজনে ডাঁটা ঝুলছে তো ঝুলাছেই। বাতাসে সজনে ফুলের ঘ্রাণ। নিমগাছে কচি কচি সবুজ নিমপাতা ধরেছে মনের সুখে। আবার কোকিলটা সেই নিমগাছটাতেই বসে দোলা খাচ্ছে। কারণ বসন্ত এসে গেছে। 
-ও কোকিলা, তোরে শুধাই রে? আবার সেই এক কথা। কেন রে তোর কোকিলটা বাসা বাঁধে না?
এই বসন্তটাকে  আষ্টেপৃষ্টে সে গায়ে মেখে নিচ্ছে আর তুই কেবলি তাকে সিডিউস করছিস যাতে সে অন্য কারো দিকে না চলে যায়। আচ্ছা কোকিলা তুই সত্যি সত্যি ওকে খুব ভালোবাসিস না রে? কিন্তু তোর ডিম পাড়া হয়ে গেলে  ঐ কোকিলটা আর তোর হয়ে থাকবে সারা জীবন? না কি আসছে বছর বসন্তে সে অন্য এক কোকিলার জন্য ডেকেই চলবে? আর ভুলে যাবে তোকে।
যাক আর ভ্যানতাড়া না করে সকলে বসন্তের পায়ে পড়ে থাকো দিন কয়েক। সে আসতে না আসতেই বন্ধু দিবস,  গোলাপ দিন, প্রোপোজ দিন, চকোলেট দিন, জড়িয়ে ধরার দিন, চুমুর দিন...করতে করতেই ভালবাসাবাসির দিন। এবার সে যেতে না যেতেই দে দোল, দে  দোল... দোলের দিন । রাধাকৃষ্ণের ফষ্টিনষ্টির দোহাই দিয়ে আমজনতার মাতামাতি ইত্যাদি। ওদিকে বসন্ত সমাগমে সারস্বত সমাজ হাইপার।  সোশ্যাল নেটে সাহিত্যের ঝলক। আর কেন‌ই বা লিখবেনা তারা?  মধুর বসন্ত এলে তারা " কুহক লেখনী ছুটায়ে কুসুম তুলিছে ফুটায়ে, লিখিছে প্রণয়-কাহিনী বিবিধ বরন-ছটাতে..." রবিঠাকুরের কথা। 
কি মহিমা এ বসন্তের! তবুও শান্ত হয়না পৃথিবী, সেটাই বড় কষ্টের।
একটু বিষাদ, একটু বিরহ, একটু প্রেম, একটু ভালোলাগা সব মিলিয়ে আমাদের বেশ একটা ফিল গুড ফ্যাক্টর কাজ করে এই সময়। ভোগ্য পণ্য সবেতেই অফ সিজন ডিসকাউন্ট। কেন রে ভাই? বসন্ত তোদের কাছে একটা অফ  সিজন? ব্যবসায়িক কেমিষ্ট্রি অবিশ্যি আমরা বুঝব না। আসলে  লোকটানার কৌশল। ছুতোয় নাতায় স্প্রিং ফেস্টের আকর্ষণ। ছলে বলে কৌশলে কখনো গোলাপ ফুল, কখনো চকোলেট, কখনো বা টেডি বেয়ার আর ভ্যালেন্টাইন গিফ্ট তো হাতের পাঁচ।  বসন্তে মানুষের সম্পর্ক ঝালিয়ে নেবার পালা। সেই আবার নতুন করে পাব বলে।
কখনো হেঁটে পেরুব শিমূল বিছানো গালচের পথ, কখনো মহুয়া সরণী, কখনো পলাশ কুড়িয়ে নেব দুহাত ভরে । সেই রং চোখ থেকে মুছতে না মুছতেই আবার এসে পড়বে আমাদের বসন্তের রংয়ের উত্সব।
 ছোটবেলায় বসন্তের খোলা জানলায় দাঁড়ালে বড়রা বলতেন বসন্ত কিন্তু ভয়ানক। যতটা দেয় ততটাই নেয় উশুল করে।  সত্যি তো, ঘরে ঘরে অসুখ এই সময়ে। আর ঋতু পরিবর্তনে এই মারণ ব্যাধির থেকে মুক্তিলাভের আশায় আবার নতজানু আমরা নারীশক্তির কাছে। বাসন্তীপুজোর আয়োজন। কারণ যমদংষ্ট্রা বসন্ত ঋতুর রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে অতি প্রাচীনকাল থেকেই আমরা পরিচিত।  ঋতুর নামে রোগ‌ও রয়েছে বটে। কি আর করি? ফাগুণ হাওয়ায় সব দান করেছি যে আজ। তাই তো আমার আপনহারা, বাঁধনহারা প্রাণ।
কলকাতা ২৪x ৭ 

১১ ফেব, ২০১৭

কন্যাশ্রী সরস্বতী

 রস্বতীপুজোর  ভোর হতে না হতেই একছুট্টে কলঘরে।  তারপরেই হুড়োতাড়া করে  ফ্রকের ওপরে  কষে  মাড় দেওয়া ফুল ফুল নতুন বৃন্দাবনী ছাপাশাড়ী চাপিয়ে  কাবুলিওয়ালার মিনি সেজে, জড়ভরত মার্কা হয়ে ইস্কুলের সরস্বতী পুজো ।  শাড়ির কুঁচি, বোঁদের সঙ্গে লুচির কুচি, খিচুড়ির সাথে গরম বেগুনী আর শাড়ির  কড়কড়ে আঁচল নিয়ে আমি থরথর যেন। ল্যাজেগোবরে অবস্থা কুমারীর ।  তখন আমি দশ কি নয় । নো চাপ তখন! বড় হয়নিতো মেয়ে তাই কিছুটা নিশ্চিন্ত মা, বাবা।

এরপর বোধবুদ্ধি বিকশিত হবার আগেভাগেই  মিষ্টি টিনের আমি। একটা ফক্কড় ছোঁড়া স্কুল যাবার পথে রোজ সাইকেল চড়ে চারপাশে ঘুরপাক খেত। যদিও ধর্ষণের ধারাপাত অধরা তখন। কারণ এত মিডিয়ার প্রবচন নেই আকাশে, বাতাসে। বাড়িতে এসে জানালাম মা'কে। মা বাবাকে পাঠালো । চুপিচুপি বাবা আমাকে ফলো করল আর সেই ছোঁড়াকে ভয়টয় দেখিয়ে সেযাত্রায় তার নতুন সাইকেল চড়া মাথায় ওঠালো। তাই টিনে পা দিতেই  মায়ের চোখ ঘুরছে সর্বত্র। পারলে শ্যাম্পু করা উড়ো উড়ো মাথায় একখাবলা তেল ঢেলে দিল বলে! পাছে আমাকে ছেলেরা ঝাড়ি করে । পরেছিও জম্পেশ একখানা ডিসিএমের ভয়েল শাড়ি । আগুণ-ফাগুণ-বেগনী ফুলফুল ছাপা। শ্যম্পু চুল হাওয়ায় উড়িয়ে  লাস্যময়ীরা এমন পরেন সানন্দাতে। চেখে পড়েছে সেই টিনেই । যাবার সময় ক্যাচাল্! চুলটা বেণী করতেই হবে।মায়ের ফতোয়া। আবার ডবল ঝুঁটি। নো ওয়ে! আমিও নাছোড় । তারপর দর কষাকষি। অগত্যা মধুসূদনের মত রক্ষা করলেন বাবা। " আহা! ছেড়েই দাওনা একটা দিন্! সরস্বতী পুজো বলে কথা।  নিজের দিনগুলোর কথা ভাব দিকিনি!” 

তারপর টিন পেরোনো আমি যুবতী। যেন বেতস লতা। চোখে মুখে শিক্ষা আর কথার খ‌ই অনবরত ফুটছে টগবগ করে । একটু একটু করে বোধশক্তির অধিকারিনী হচ্ছি । মানে জাগো কুমারী, বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতা কন্যাশ্রী !   সেই কলঘরের ভোর পেরিয়ে বাথরুমে গ্লেজড টাইলস আর বাথরুমের আয়নায় নিজেকে আবিষ্কার করার পালা। সরস্বতীপুজো যেন পড়ার চাপে ফেড একটু। তবুও বছরে একটা দিন আগলছাড়া পাগল পাগল ভাব। তখনো মায়ের চোখ সামনে পেছনে। প্রেম হলনা তখনো। স্কুলের আলপনা, লুচি-আলুর দম-বেগুনী,বোঁদে আর মায়ের দামী সিল্কের শাড়ি তখন পরণে। কিছুটা বড় মাপের চামড়ার চটি পায়ে দিয়ে গেছি। আর সেই চটি  হারিয়ে ফেলে কি বিপত্তি!   সেটা ছিল মায়ের সে বছরের পুজোর নতুন চটি। বাটিকের কাজ করা । কলেজস্ট্রীটের রাদু থেকে কেনা ।
তারপর খালিপায়ে সাইকেল রিকশা চড়ে বাড়ি ফিরে বেদম বকুনি! বারণ করা সত্ত্বেও নতুন চটিজোড়া পরে গেলি! দিন দিন যেন উড়ছে মেয়ে! ঘুচিয়ে দেব উড়নচন্ডী ভাব, ইত্যাদি ইত্যাদি! 

তারপর ভাইয়ের সাথে আলমবাজার থেকে বরানগর বাজার সার্ভে করে সরস্বতী পছন্দ করা।  যেন কনে দেখতে যাওয়া। চোখ চাই বড় বড়, নাকটা টিকোলো। পাতলা ঠোঁটদুটো আর কুচযুগ শোভিত কুঁচ বরণ কন্যা ।  মনের মত করে পুজোর বাজার আর বাবা নামক পুরোহিতের দ্বারা  পুজো উতরোনো ।  ধান-যবের শীষ থেকে শুরু করে আমের মুকুল, পলাশকুঁড়ি থেকে প্যাঁড়া, চিঁড়ে-মুড়কি থেকে খৈ-দৈ... এক্কেবারে ষোড়শ উপচার । কোনও অনুষ্ঠানের ত্রুটি নেই।  কলেজবেলা তখন আমার । বীরখন্ডি-কদমায় তদ্দিনে ফ্যাশন আউট সানন্দার । ক্যালরি কনশাস তন্বী তনয়া। খাগের কলম ডোবানো মাটির দোয়াতে ভায়ের জন্য ডুবু ডুবু কাঁচা দুধ ঢালা।যেন ভায়ের হল শুরু, আমার হল সারা। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পেরোনো আমি যেন মুক্ত বিহঙ্গ। স্বাধীনতার পাসপোর্ট তখন আমার বগলে। বাব তখন বন্ধু আমাদের । পুজোয় বসে তিনি বলেন নিদেন একখান বিড়ি না হলে পুজোয় বসবেননা তিনি।পুরুতমশাইরা নাকি কানে বিড়ি গুঁজে আসেন পুজো করতে!   এবার মায়ের কাছে কাকুতি মিনতি করে বাবার জন্যে স্পেশ্যাল চা হাতে দিতেই তিনি গলে জল হয়ে পুজোয় বসলেন।  বুঝলাম, কত বিচক্ষণ হলে সংসারে গিন্নীর কাছ থেকে এক্সট্রা এককাপ চা আদায় করা যায়! 

দুই বিরুণী থেকে এক বিরুণী ও শেষে অলবিরুণি gone! খোলা চুলে ট্রানজিশান । সায়েন্স কলেজের গন্ডী পেরুনো। কোর্টশিপ চলছিল হবু বরের সাথে ।  সেবছর ভ্যালেন্টাইন্স ডে আর সরস্বতী পুজো পড়েছিল পিঠোপিঠি। নীলখামে একখানা প্রেমপত্র এসে পড়ল ঐদিনেই । যেন সুরের ঝর্ণায় হায় মরি হায় মরি হায়রে! ঝর্ণা ঝরে রে! রহিনা ঘরেরে। সেই থেকে প্রেমপত্র চালাচালিতে সাহিত্যচর্চা জেগে ওঠা।  সালটা ১৯৮৯। আটপৌরে, সাদামাটা আমি। কিছুটা আবেগে, কিছুটা ভালোলাগায় ভালোবাসতে শিখলাম আমার প্রথম প্রেমকে।

বিয়ের পর  সরস্বতীপুজো জমিয়ে শুরু করলাম আবারো ছেলের হাতেখড়ি দিয়ে । তারপর মা হওয়ামাত্র‌ই সরস্বতীপুজো আসা মানেই গোটাষষ্ঠীর তোড়জোড়। মানে সব গিয়ে রান্নাঘরের খুন্তি-কড়াইতে । 
সরস্বতীপুজোর পরদিন গোটাষষ্ঠী বা শীতল ষষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গের রীতি । অনেক পূর্ববঙ্গের মানুষও শখে করেন । আমাদের অরন্ধন । পাথরের শিলকে তেল হলুদ জলে স্নান করিয়ে তার কোলে নোড়াটি রেখে দিতে হবে আর জোড়া শিম, ফুল দিয়ে তার পুজো করতে হবে । সব ঠাণ্ডা। তাই বুঝি নাম শীতল ষষ্ঠী। শ্রীপঞ্চমী তিথি থাকতে থাকেতেই গোটা রেঁধে রাখতে হয় । গোটা মুগডাল (সবুজ মুগকলাই ), গোটা শিম, গোটা মটরশুঁটি, গোটা রাঙা আলু, গোটা আলু, গোটা বেগুণ জোড়া সংখ্যায় দিয়ে  (কমপক্ষে ৬টি করে ) গোটা সেদ্ধ হয় নুন দিয়ে । সাথে গোটা শুকনো লঙ্কা আর নুন ।  গোটা মুগ ডালকে শুকনো খোলায় একটু নেড়ে নিতে হবে যতক্ষণ না হালকা গন্ধ বেরোয় । কিন্তু প্রেসারে রাঁধা চলবে না । আর কিছু পরে ঢাকা খুলে দেখতে হবে কিন্তু ডাল বা সবজীকে হাতা দিয়ে ফাটানো চলবেনা ।   সেদ্ধ হয়ে গেলে কাঁচা সরষের তেল দিয়ে নামিয়ে রাখা হয় ।  সাথে পান্তাভাত আর সজনেফুল ছড়ানো কুলের অম্বল ও টক দৈ । সরস্বতীপুজোর পরদিন আমাদের দুপুরের আহারে  সবকিছু বাসি রান্না  খাওয়া হ'ল আমার শ্বশুরবাড়ির রীতি ।
সারাটা পশ্চিমবাংলার মায়েরাই এমন করে গোটাষষ্ঠী করেন ছেলেমেয়ের মঙ্গলকামনায়।  কিন্তু যখন দেখি আজকের ছেলেমেয়ের মায়ের জন্য সেই গোটাষষ্ঠীর পুণ্যফল রেসিপ্রোকেট না করা তখন আমার এ যাবত সঞ্চিত বোধ-বুদ্ধি সব বিসর্জন হয়! 
পুজোর পরদিন পান্তা আর গোটাসেদ্ধ খেয়েদেয়ে বোধহয় একটু ঝিমুনি এসেছিল। 
দেখি বাসন্তী, ভুবনমোহিনী সরস্বতীর উপছে পড়া কলকাতায়  ব্যালকনির সুখ । মনে মনে ডাকি তাঁকে। শুধু বলি আর বছরে আবার এসো মাগো। ভেলায় ভাসতে ভাসতে বেলপাতা বোঝাই হলুদ গাঁদার ঝুড়ি তখন বোধহয়  গঙ্গার মোহানায়  । জলের বুকে ভাসমান সরস্বতী মুখে তাম্বুল আর কপালে সিঁদুর নিয়ে দুলতে থাকে ঢেউয়ের ওঠানামায় । ফিরে আসে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক। "বিদ্যাস্থানে ভয়ে-বচ"দের যেন কৃপা করেন তিনি।  বস্তির সেই ছেলেগুলো যারা বাড়িবাড়ি চাঁদা তুলতে এসে ভুল বানানে নষ্ট করে ডটপেনের সস্তার কালি।  সরস্বতী যাদের কাছে শুধুই একটা পুজো, আনন্দের হৈ হল্লা, আর পাঁচটা হুজুগের মত, খিচুড়ি-বোঁদে-দধিকর্মার সুখ আর পড়ায় ফাঁকির সুখ।  আর মাইকে জোরসে পাগলু থেকে রামলীলা অথবা শীলার জওয়ানি থেকে মুন্নির বদনাম ।  চোখ বুঁজে ফুল ছুঁড়ে আসছি আমরাও ওদের সাথে প্রতিবছর সেই মেয়ের পায়ে যার নাম সরস্বতী।
তখনো জানতাম না আমাদের আদরের সরস্বতী আজীবন কুমারী।  তখন তো জানি তিনি শিব-দুগ্গার শান্তশিষ্ট কন্যা, নারায়ণের ঘরণী।  শুধু লক্ষী মেয়ের মত লেখাপড়া আর গানবাজনা নিয়েই থাকতে পছন্দ করেন। আর তাই ছাত্রছাত্রীরা চোখ বুঁজে সরস্বতীপুজোর দিনে তাঁর পায়ে ফুল ছোঁড়ে। আমিও  ছুঁড়েছি সেই হাতেখড়ির বেলা থেকে আর এখনো ছুঁড়ে চলি মন দিয়ে।  তবে এখন এই সরস্বতীকে আমি কেবল ই বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলে ভাবতে পারিনা। তাঁকে একজন প্রতিবাদী মেয়ে হিসেবে দেখি যিনি অত্যন্ত লড়াকু ছিলেন। 
নিজেকে অনেকবার প্রশ্ন করেছি এই সরস্বতীর বিয়ে নিয়ে। আমাদের এই মেয়েটি কি সুখী বিবাহিত জীবন পেয়েছিল নাকি কদর্য এই পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতি ঘৃণায়, লাঞ্ছনায় বিয়ের মত প্রহসনের দিকে পা দেন নি ? না কি আজকের দিনের মত বিবাহ-বিচ্ছিন্নাই থেকে গেলেন আজীবন? অথবা  একাধিক সপত্নীর সাথে ঘর করার অসহ্য বেদনা বুকে নিয়ে পালিয়ে গেলেন এই পৃথিবী ছেড়ে ?  
না:,পুরাণ বলে, পালিয়ে তিনি যান নি। পরাজিতও হন নি । তিনি দাপটের সঙ্গে লড়ে গেছেন পুরুষের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করে গেছেন পুরুষের কামনার স্বীকার হতে হতে । কিন্তু বেঁচে রয়েছেন আজো মানুষের মনে কারণ তিনি জয়ী ।  সে যুগে বিয়ের ফাঁদে আদৌ কি বাঁধা পড়তেন দেবদেবীরা ? রক্তমাংসের সম্পর্কের মত দেবদেবীদেরও তো কৈশোরে বয়ঃসন্ধির সুবাদে দেহরসের ক্ষরণ ও সেই হেতু ছোঁকছোঁকানিও ছিল । ছিল ইভ-টিজিং ও মোলেষ্টশান । আর জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলি দেব-দৈত্যকুলে রেপিষ্টের সংখ্যাও নিদেন কম ছিলনা সেযুগে । তারা লিভটুগেদার বা "থাকাথাকি" তে বিশ্বাসী ছিলেন না বিয়ের মত লিগাল ইনস্টিটিউশানে বিশ্বাসী ছিলেন সে তো পরের কথা।  সেক্স ও ভায়োলেন্স এর দাপট কিন্তু এ যুগের চেয়ে সেযুগে কিছু কম ছিলনা । সরস্বতী তাঁর সাজগোজ, পোশাক-আষাকের মধ্য দিয়ে আর সর্বোপরি তাঁর গুণ, বুদ্ধি আর বিদুষী ব্যক্তিত্ত্বের দ্বারা পিতৃসম ব্রহ্মা থেকে শুরু করে প্রেমিক তুল্য নারায়ণের মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন এক্কেবারে । যাকে আমরা এখন শহুরে ভাষায় বলি "হেড টার্নার" ; তিনি এমনি ছিলেন ।মানে এখনকার দিনে যাকে বলে পেজ থ্রি কাঁপানো।   সমাজে এমন মেয়ের কদর তো হবেই যিনি একাধারে রূপসী আবার বিদুষী । পুরাণ কিন্তু অন্য কথা বলে।  সরস্বতী ছিলেন অসম্ভব ঝগড়াটে আর তাঁর মেজাজ ছিল দাপুটে । হতেই পারে । যিনি একহাতে বশিষ্ঠ থেকে বিশ্বামিত্র আর অন্যহাতে ব্রহ্মা থেকে বিষ্ণুকে নাচাতে পারেন তিনি তো অযোনিসম্ভবা, অসামান্যা । কিন্তু আজকের সমাজের চিত্রটাও ঠিক তেমনি আছে অনেক ক্ষেত্রে । তবে এমনি মেয়েই তো আসল কন্যাশ্রী আজকের সমাজে। এমনি তো চাই আমাদের। এ কথা কেন বলছি তা বুঝতে গেলে জানতে হবে সরস্বতীর পুরাণ বেত্তান্ত ।
  সরস্বতীর জন্মবৃত্তান্ত এবং বিবাহ এই দুই নিয়ে অনেক কিংবদন্তী আছে । কেউ বলেন পরমাত্মার মুখ থেকে নির্গত হয়ে তিনি পাঁচ ভাগে বিভক্ত হন : রাধা, পদ্মা, সাবিত্রী, দুর্গা ও সরস্বতী । আবার কারো মতে পিতা ব্রহ্মার মানসকন্যা তিনি । ঠিক যেমন গ্রিক দেবী কুমারী এথেনা পিতা জিউসের কপাল থেকে নির্গত হয়েছিলেন । যদিও ব্রহ্মার মানসকন্যা সরস্বতী তবুও পিতা ব্রহ্মা তাঁর এই সুন্দরী কন্যাটিকে কামনা করে বসলেন । বৃদ্ধের এই চাহনি  কন্যার  পছন্দ হলনা । কন্যা এড়িয়ে চলতে লাগল পিতাকে ।পালিয়ে বেড়াতে লাগল । ব্রহ্মা অসন্তুষ্ট হলেন । কামদেব মদনকে অভিশম্পাত করলেন যে কেন এই সুন্দরী কন্যার প্রতি  তাঁর সম্ভোগ লালসা রূপায়িত হচ্ছেনা এই বলে । অচিরেই শিবের দ্বারা মদন ভস্মীভূত হল সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ! আর  প্রতি পদে পদে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর লাঞ্ছনার গল্প উঠে এল ।
বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির মূলে যখন অগ্নির করাল গ্রাসে সৃষ্টি প্রায় ধ্বংসের মুখে তখন এই বিপর্যয়কে রুখতে দেবরাজ ইন্দ্র গেলেন নদী সরস্বতীর কাছে । সরস্বতীকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে আগুন নেভাতে আদেশ দিলেন । সরস্বতী তখন সমুদ্রের দিকে ধাবমান । সে তখন বলল ব্রহ্মা স্বয়ং আদেশ দিলে তবেই সেই আগুন নেভাতে তার গতিপথ ঘোরাবে । ব্রহ্মা ইন্দ্রের অনুরোধে সরস্বতীকে আদেশ দিলেন । সরস্বতী সম্মত হল । গঙ্গা, যমুনা, মনোরমা, গায়ত্রী ও সাবিত্রী এই পাঁচ নদী তার সঙ্গ নিতে চাইল কিন্তু সরস্বতী একাই গেলেন সেই অগ্নিনির্বাপণ কাজে । পথে ক্লান্ত হয়ে ঋষি উতঙ্কর আশ্রমে বিশ্রাম নিতে গেলেন আর তখুনি মহাদেব সমুদ্রাগ্নিকে একটি পাত্রে ভরে সরস্বতীর সম্মুখে হাজির করলেন । সরস্বতী তখন উত্তরে ব‌ইতে শুরু করল । ভারতের উত্তরপশ্চিমে পুষ্করে গিয়ে তার দ্বিতীয় বিশ্রাম হল । যার জন্য পুষ্কর হ্রদ হল এখনো একটি তীর্থক্ষেত্র । নারীর মহিমায় ভারতের কোণায় কোণায় বিখ্যাত ও স্মরনীয় হয়েছে অনেক এমন স্থান । পুরাণের সরস্বতী থেকে রামায়ণের সীতা কিম্বা চিরস্মরণীয়া পঞ্চকণ্যাঃ অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা, মন্দোদরী... এঁদের প্রত্যেকের জন্য বিখ্যাত অনেক তীর্থস্থান।
এমন আরো একটি গল্প ভাবিয়ে তোলে আজো যেখানে সরস্বতী নামের মেয়েটি  পুরুষের লালসার স্বীকার হয় একাধিকবার । সেই সমাজের দুটি শক্তিমান পুরুষের সম্ভোগ লালসার টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে যায় মেয়েটির জীবন । তবুও সে ক্ষতবিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকে । 

একবার ঋষি বশিষ্ঠ সরস্বতীর তীরে তপস্যায় মগ্ন ছিলেন । তাঁর শত্রু মুনি বিশ্বামিত্র এসে সরস্বতীকে বললেন বশিষ্ঠকে নিয়ে প্রচন্ড বেগে তাকে লন্ডভন্ড করে প্রবাহিত হতে । সরস্বতী প্রথমে রাজী হননি । অবশেষে বিশ্বামিত্রের অনুরোধ উপেক্ষা না করতে পেরে দুকুল ছাপিয়ে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠকে নিয়ে বানভাসি হলেন । নদীর ঢেউয়ের সর্বোচ্চ শিখরে ধ্যানমগ্ন বশিষ্ঠ । একবার উঠছেন আবার একবার নামছেন ঢেউয়ের দোলায় । বিশামিত্র তো বেজায় খুশি । কিন্তু এই প্লাবনে বশিষ্ঠের কোনো হেলদোল নেই দেখে তাঁর একটু সন্দেহ হল । বিশ্বামিত্র বুঝলেন সরস্বতী বশিষ্ঠকে নিশ্চয়ই রক্ষা করছে । অতএব সরস্বতীর এইরূপ ছলকলায় যারপরনেই অসন্তুষ্ট হয়ে বিশ্বামিত্র সরস্বতীকে অভিশাপ দিলেন ও সরস্বতী অচিরেই রক্ত রূপী নদীতে পরিণত হল । মুনি ঋষিরা যখন সরস্বতীর তীরে স্নান করতে এলেন তখন বিশুদ্ধ জলের পরিবর্তে রক্ত দেখে খুব আশ্চর্য হলেন । এর অর্থ আমার জানা নেই। তবে হয়ত মেয়েটি প্রতিবাদ করে বলেছিল, আমি ঋতুমতী। আমাকে রেহাই দাও। নাকি জলে ঝাঁপ দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল তা?  সরস্বতী তাঁদের কাছে কেঁদেকেটে সব কথা খুলে বললেও রেহাই পান নি? বিশ্বামিত্রের এহেন দুরাভিসন্ধির কথাও জানালেন  । নিজের মুক্তি চাইলেন ও পুনরায় পূত:সলিলা সরস্বতী রূপে ফিরে চাইলেন নিজের জীবন ।  দয়ালু মুনিঋষিদের প্রার্থনায় শাপমুক্ত হলেন সরস্বতী এবং পুনরায় বিশুদ্ধ হল নদীর জল । এই কারণে সরস্বতীর অপর এক নাম "শোন-পুণ্যা" ।
পুরাণের আরেকটি গল্পের মতে সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং গঙ্গা ছিলেন বিষ্ণুর তিন পত্নী । বিষ্ণু কিন্তু গঙ্গার প্রতি একটু বেশিমাত্রায় আসক্ত ছিলেন ।  নম্রস্বভাবের লক্ষ্মী এই ঘটনায় মনে মনে খুব দুখঃ পেতেন কিন্তু কিছু প্রকাশ করতেন না । সরস্বতী কিন্তু বিষ্ণুর এই অতিরিক্ত গঙ্গাপ্রেমকে প্রশ্রয় না দিয়ে অশান্ত এবং রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন ।  একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল ।  প্রচন্ড উগ্রমূর্তি ধরলেন তিনি ।   গঙ্গার মুখোমুখি হলেন । লক্ষ্মী একটি ভয়ানক কলহের পূর্বাভাস পেয়ে সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালেন । সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিয়ে একটি গাছে পরিণত করলেন । লক্ষ্মী আবার সেই অভিশাপে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সরস্বতীকে নদীতে রূপান্তরিত করলেন । সরস্বতী নিজেও তখন উগ্রচন্ডা । নিজে নদীতে পরিণত হয়েছেন বলে গঙ্গাকেও নদী হতে অভিশাপ দিলেন । ইতিমধ্যে বিষ্ণু সেইখানে হাজির হলেন । এতসব ঝগড়া বিবাদ দেখে ও শুনে স্থির করলেন সরস্বতী ও গঙ্গার সাথে আর নয় । এখন থেকে তিনি কেবলমাত্র লক্ষ্মীর সাথেই ঘর করবেন । সরস্বতীকে ব্রহ্মার হাতে এবং গঙ্গাকে শিবের হাতে সমর্পণ করে বিষ্ণু  হলেন লক্ষ্মীর প্রিয় পতিদেবতা । আর  সরস্বতী ও গঙ্গার ওপর এরূপ অন্যায় শাস্তির জন্য  লক্ষ্মী মনে মনে ব্যথিত হলেন আবার বিষ্ণুকে একান্ত নিজের স্বামীরূপে বরণ করে আনন্দিতও হলেন  । বিষ্ণুকে শান্ত হতে বললেন এবং তাদের দুজনের আশীর্বাদে লক্ষ্মী ও গঙ্গা মর্ত্যের ওপর দিয়ে নিজ নিজ গতিপথে ব‌ইতে লাগল । স্বর্গে তাদের দুজনার একটি করে শাখা বিষ্ণুর হাত ধরে র‌ইল।

এমন সরস্বতী যেন বারবার ফিরে আসে আমাদের সমাজে  যাকে মনে রাখার জন্য বছরে একটি নির্দ্দিষ্ট দিন পালন করা হবে আর পূজা-পাঠ-অঞ্জলি-আরতি এ সব তো মনগড়া! আসল তো সে মেয়ের ব্র্যান্ড যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে দাগ কেটে দিয়ে যাবে ।   সে তো আমাদেরই ঘরের চেনা একটা মেয়ে অথবা শুধুই মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয় !!!
 কলকাতা ২৪ x ৭

৮ জানু, ২০১৭

মাছে ভাতে বাঙ্গালী

"ও বৌমা, ও বৌমা আঁশবটিটা বার করোগো শিকার ধরেছি'
ছোটবেলার রূপকথার গল্প বলতেন বাবা।
যেখানে এক ডাইনি বুড়ি একটি ছোট ছেলেকে তার আঁশ বটিতে কুপিয়ে কাটবে বলে মনের আনন্দে নাচতে নাচতে ছেলের বৌকে কথাগুলো বলছিল।
শুধু রূপকথা কেন?  বাঙালী বাড়ির বনেদিয়ানা ছিল বিশাল এই আঁশবটি। আমবাঙালীর গরীব গেরস্থ, সকলেরি ঘরে থাকত একখানা আঁশবটি। এই আঁশবটির সংগে মাছের নিবিড় সম্পর্ক। তাই মত্স্যপ্রিয় বাঙালীর পেল্লায় আঁশবটি ছিল রান্নাঘরের ঐতিহ্য। আমাদের ঘটিবাড়িতে আঁশ-নিরামিষের ছুঁতমার্গ বেশ দাপটের সঙ্গে মানা হত। ঠাকুমার ঝুলকালির রান্নাঘরের কুলুঙ্গীর মধ্যে মাছভাজার লোহার আঁশ কড়া আর সেই আঁশবটি খানি থাকত। আঁশবটির ইজ্জত মাছের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলনা। কোনো বৃহষ্পতিবারে বাড়িতে মাছ না এলে ঠাকুমা তাঁর ছেলের বৌদের বলতেন, আঁশবটি ধুয়ে জল খেতে।  এয়োতির বেষ্পতিবারে মাছ না খেলে  পাছে ঠাকুমার ছেলেদের অকল্যাণ হয় তাই এই ব্যবস্থা। মায়েরা অবিশ্যি তা খেত না। ঐ আঁশবটিতে পেঁয়াজ কেটে ভাতের সঙ্গে খেয়ে নিত। 
অথবা দুপুরবেলায় মা তার নিজের দুই হাঁটুর মধ্যে আমাকে নিয়ে দোল খাওয়াতে খাওয়াতে বলতেন,

ঘুঘু ঘুঘু মতি স‌ই, পুত কই ?
হাটে গেছে।
কি মাছ আনতে?
সরলপুঁটি
কি দিয়ে কুটি?
বোঁচা বঁটি।

কিম্বা

মাছ কুটলে মুড়ো দেব
ধান ভাঙলে কুলো দেব,
কালো গরুর দুধ দেব,
দুধ খাবার বাটি দেব....

এসব ছড়া আজকের ছোটরা শোনেনা তাই রান্না ঘরে আঁশবটি কি জিগেস করলে তারা হয়ত উত্তর দিতেও পারবেনা। তারা জানে মাছ বাজার থেকে কেটে এনেই রান্না করা হয়। আমার বাপু বাবার মুখে এইসব ছড়ার গান না শুনলে একসময় ঘুম আসতনা ছুটির দুপুরে। 
বাবা গাইতেন,

আয়রে আয় ছেলের দল মাছ ধরতে যাই,
মাছের কাঁটা পায় ফুটেছে দোলায় চেপে যাই,
দোলায় আছে স্বপনকড়ি গুনতে গুনতে যাই....তখন কড়ি দিয়ে মাছ কেনা যেত। 

এই মাছ ধরার প্রসংগে মনে পড়ে আমাদের বাড়ির সবচেয়ে বড়দাদার কথা। আমরা বলতাম দাদাভাই। নিজে ছিলেন স্পোর্টসম্যান। পড়াশুনো শেষে চাকরী সামলিয়ে তাঁর যত ছিল ফুলগাছের নেশা তত ছিল মাছ ধরার নেশা। ঠিক ছুটির সকালে মাছ ধরবার জিনিষপত্র যেমন  মাছের চার অর্থাত আটামাখার গুলি, জ্যান্ত কেঁচো, ভাতের মন্ড ইত্যাদি, ছিপ, ফাতনা, সুতো নিয়ে তিনি চলে যেতেন গঙ্গার ধারে। মাছ উঠলেই হত আমাদের পারিবারিক মহামেছো ভোজ। 
বাবা আরো জানতেন ছড়ার গান। সেখানেও ঐ মাছ প্রসঙ্গ যেন এসেই পড়ত।


ও পাড়ার ঐ ছেলেগুলো নাইতে নেমেছে
দুইদিকে দুই রুইকাতলা ভেসে উঠেছে...    

কীর্তণে কানু বিনে গীত নাই আর বাঙালীর মত্স্য বিনে গতি নাই। তাই বুঝি শয়নে, স্বপনে, জাগরণে মাছ অনুষঙ্গটি এড়াতে পারেনা তারা।  

মাছ শুভ। মাছ পুণ্যতার প্রতীক। তাই বিয়ে, পৈতে, অন্নপ্রশনের তত্ত্বে মাছকে তেল, হলুদ, সিঁদুর লাগিয়ে তত্ত্বের তালিকায় রাখা হয়।  এমনকি শ্রাদ্ধের পিন্ডদানের পরেও মৃতের আত্মার রসনা তৃপ্তিতে কলাপাতার ওপরে এক টুকরো মাছ ভেজে দেওয়ার রীতিও দেখেছি। যেন তাঁকে নিবেদন করে অশৌচের পর বাড়ির লোকজন আবার মত্স্যমুখী হতে পারে।
তারপর সেই ছড়ার গানটি? আয়ঘুম যায় ঘুম বাগদীপাড়া দিয়ে বাগদীদের ছেলে ঘুমোয় জালমুড়ি দিয়ে। সেসময়  জেলে, বাগদী এদের এত‌ই আর্থিক অনটন এতটাই প্রবল  ছিল যে মাছ ধরার বাতিল জাল গুলিও তারা বুঝি ফেলত না । গায়ে দেবার কাঁথার কাজ করত সেই মাছ ধরবার জাল। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের সেই মেছুনির গল্প। মাছ নিয়ে যাদের কারবার সেই মেছুনির নাকি  রাতে শোবার সময় মাছের ঝুড়িটা মাথার শিয়রে না রাখলে ঘুম আসেনা। অর্থাত মানুষের যেমন আধার তেমন কর্ম। মেছুনির ভাল লাগে মাছের আঁশটে গন্ধ। ঐ গন্ধ না পেলে তার ঘুম‌ই আসবেনা ঠিক যেমন ছোট ছেলেকে গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ানোর অভ্যেস  অথবা শোবার সময় ব‌ইপড়ার অভ্যেস।

এই মীন শরীরের  সব ভাল কেবল ঐ আঁশটে গন্ধটা ছাড়া। এই আঁশের কথাতে মনে পড়ে দিদিমার কথা। কালো ভেলভেটের ওপর ক‌ইমছের আঁশ দিয়ে যে অপূর্ব শিল্পকর্মের গল্প শুনেছি তা বুঝি আজ হারিয়ে গেছে। ক‌ইমাছের আঁশ তো রূপোর মত চকচকে আর ছোট্টছোট্ট। আর এতো নষ্ট হবার নয়।  কোনো বাড়িতে কতগুলি ক‌ইমাছ এলে অমন শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তোলা যায় তা ভেবে কুল পাইনা। এখন তো বাজারে বড় ক‌ইমাছ অর্ডার না দিলে মেলেনা। ছোটোগুলিতে এত কাঁটা যে কেউ খাবেনা।
এহেন "আমি'র  শিরা-উপশিরায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বাঙাল রক্ত ও বাকী পঞ্চাশ ভাগ ঘটি রক্ত বহমান । আমার মায়ের বাবা এবং বাবার মা দুজনের বাংলাদেশের খুলনাজেলার সাতক্ষীরায় জন্ম। তাই এহেন "আমি" সেই অর্থে  হাফ বাঙাল ও হাফ ঘটি । অন্তত: আমার শ্বশুরালায়ের মন্তব্য তাই । ইলিশ আর চিংড়ি দুইয়ের সাথেই আমার বড় দোস্তি ।
বাঙালদের সেই চিতলামাছের মুইঠ্যা একবগ্গা মাছের এক্সোটিক ডিশ ফর গ্যাস্ট্রোনমিক তৃপ্তি । আর আছে কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বেগুণ দিয়া বাদলা দিলে কাদলা মাছের পাদলা ঝোল। ঘটির হল জিরে-মরিচ-ধনে বাটা দিয়ে আলু-পটল-ফুলকপি দিয়ে কাটাপোনার ঝোল, হিং,আদাবাটা, টামেটো আর ডুমোডুমো আলু দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি পোনার কালিয়া ? আমাশা রোগীর জন্য সেই ঝোলে একটুকরো কাঁচকলা ফেলে দিলেও মন্দ নয়। এই শিলে বাটা জিরে-ধনে-গোলমরিচের যে কত গুণ তা আয়ুর্বেদ পড়লে জানা যায়।
এক টুসকী কাগজী লেবুর রস দিয়ে এই পাতলা ঝোল যেন গ্রীষ্মেবর্ষায় অমৃত। বাটির ঝোলে আবার বাকী লেবুটুকুনি নিংড়ে স্যুপের মত খেলেও পুষ্টি। এত রিফ্রেশিং এই ঝোল ভাত যে খেলেই মনে হয় পুকুরে ডুব দেবার অনুভূতি। তবে মা বলতেন ঝোলের মাছ যেন খুব টাটকা হয়। আর সবজীগুলো ভেজে নিয়ে জিরে অথবা পাঁচফোড়ন দিয়ে ভাজা মাছ, সবজী সেদ্ধ হবার পর নামানোর ঠিক আগে দেবে ঐ জিরে-ধনে-গোলমরিচ বাটা। তবেই হবে ঝোলের আসল স্বাদ। মশলার গুণও বজায় থাকবে।
 এছাড়া এই একেঘেয়ে রুই কাতলার বাঙালী ঘরোয়া পার্টিতে আরো অনেকভাবে ধরা দেয়। মাছ সেদ্ধ করে মাছের কাঁটা বেছে নিয়ে চপের মত পুর বানিয়ে ফিশ ক্রোকে, মাছের কচুরী, মাছের চপ,  টাটকা রুই- কাতলার পেটি দিয়ে দৈ-মাছ, কোর্মা, মাছের পোলাও, আরো কত বলব ! ঘটি হেঁশেলে শুঁটকি ফুটকির নো এন্ট্রি !  তাই বেশীরভাগ ঘটিবাড়িতেই রুই-কাতলা-ভেটকি-পার্শ্বে, চিংড়ি, ইলিশ, ক‌ই, ট্যাংরা আর মৌরলা নিয়ে মজে থাকতে হয় বারোমাস। 

আমার দিদিমা খাস উত্তর কলকাতার কুটিঘাটের ব্যানার্জি পরিবারের মেয়ে। বয়স মাত্র এগারো। ঐটুকুনি মেয়ে বিয়ের কি বোঝে! সে আবিষ্কার করতে শুরু করেছিল গ্রাম্য পরিবেশের মাধুর্য্য। গাছের ফলপাকড়, টাটকা শাকসব্জী, নদী-পুকুর থেকে মাছ ধরে আনা সেই বিবাহিতা কিশোরীর কাছে যেন বিস্ময় তখন। শ্বশুরবাড়িতে  দুপুর হলেই পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা ছিল তার কাছে এক আশ্চর্য্যের বিষয়।
দিদিমার মুখে গল্প শুনেছি শাশুড়ি, ননদ ভাজের মধুর সম্পর্কের কথা।  নতুন বৌ হয়ে তিনি  শ্বশুরবাড়ি যাবার পর তাঁকে এত যত্ন তাঁরা করেছিল যে তিনি মারা যাবার শেষদিন বধি বলে গেছেন সে কথা। দিদা ছিল বাড়ির মেজবৌ। ননদরা নদী থেকে সদ্য ধরা ট্যাংরামাছ ভাজা আর তেল দিয়ে একথালা ভাত দিয়ে নতুন বৌকে বসিয়ে আদর করে খেতে দিয়েছিল। নদীর টাটকা মাছ আর অমন যত্ন দিদার মাও বুঝি করেনি তাকে..তিনি বলতেন।
অনেকেই এই ট্যাংরামাছ পিঁয়াজ দিয়ে খান তবে আমাদের ঘটিবাড়িতে রাঁধবার ধরণটা সম্পূর্ণ আলাদা। মাছ ভাল করে ভেজে নিয়ে সরষের তেলে পাঁচফোড়ন দিয়ে টমেটো কুচি, কাঁচালঙ্কা, কড়াইশুঁটি আর সর্ষে-শুকনো লঙ্কাবাটা দিতেন মা। মাছ সেদ্ধ হলে বেশ গায়ে মাখামাখা এই ট্যাংরার ঝালে এবার সর্ষের তেল ছড়িয়ে  গরগরে করে নামিয়ে যে পাত্রে রাখবে তার মধ্যে ছড়াও একটু গরমমশলা। ব্যাস! দিদিমার হাতে এই রান্নার স্বাদ আর কোথাও পাইনি। শীতকালে গরমমশলার বদলে ধনেপাতা কুচিয়েও দেওয়া যায় ওপর থেকে। 
মামাবাড়িতে এক প্রকান্ড বাঁধানো পুকুর ছিল। আমার দিদিমার নেশা ছিল লাল শান বাঁধানো পুকুরের ঘাটের সিঁড়িতে বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরা। সেই টাটকা মাছের কাঁচা ঝাল দিয়ে গরম ভাত হত সেদিন রাতের আহার। মায়েরা তাদের ছোটবেলায় ঐ পুকুরে গরমের ছুটিতে সব তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে চানে নামত। প্রত্যেকের লাল গামছা পুকুরের জলে ফেলে ছোট ছোট চিংড়িমাছ ধরত। এবার চান সেরে যে যার মত বাগানের কোনে কাঠকুটো জ্বেলে ছোট কলাইয়ের বাটিতে সেই মুঠোমুঠো  জ্যান্ত চিংড়িমাছ, ঝিরিঝিরি  আলুর কুচি, কাঁচা সর্ষের তেল, নুন, হলুদ আর চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে বসিয়ে দিত। বাটিতে হয় বলে এর নাম বাটিচচ্চড়ি। পংক্তিভোজে দুপুরের খাবার সময় যে যার নিজের বাটি নিয়ে বসে পড়তে মাটিতে। বাড়ির বড়রা তা দেখে তাজ্জব হয়ে যেতেন। এখনো বাটিচচ্চড়ি রাঁধি তবে জ্যান্ত মাছ আর পাই ক‌ই? 
দাদামশাই এই বাটিচচ্চড়ি খেতেন আর বলতেন, তোমাদের কোফতা কালিয়া চুলোয় যাক্‌! আজ এটা আর খাবনা, খেলেই তো ফুরিয়ে যাবে। বরং বাটিটা মাথার বালিশের পাশে নিয়ে শুই। কত সম্মান ছিল এই বাটিচচ্চড়ির মত সাধারণ পদটির। 
রবিঠাকুরের প্রিয় খাবারের তালিকায় ছিল পান্তাভাত আর চিংড়িমাছ ভাজা। তাঁর লেখা কবিতাতেও প্রচুর পাই এমন চিংড়ির কথা। 

তিমি ওঠে গাঁ গাঁ করে
চিঁ চিঁ করে চিংড়ি
ইলিস বেহাগ ভাঁজে
যেন মধু নিংড়ি।
অথবা 
মাছ এল সব কাৎলাপাড়া, খয়রাহাটি ঝেঁটিয়ে ,
মোটা মোটা চিংড়ি ওঠে পাঁকের তলা ঘেঁটিয়ে ।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে সহজপাঠ দ্বিতীয় ভাগের সেই কথা...
"কাংলা, তোর ঝুড়িতে কী? ঝুড়িতে আছে পালং শাক, পিড়িং শাক, ট্যাংরা মাছ, চিংড়ি মাছ। সংসারবাবুর মা চেয়েছেন'

সে ছিল অনুঃস্বরের অধ্যায়। চিংড়ি আমাদের নিজের হাতে বেছে খেতে দেওয়া হতনা। কারণ সহজপাঠ পড়ুয়াদের পেটখারাপ হবে তাই।  
আজকাল হোটেলে ডাবচিংড়ি নামে একটি মাগ্যির ডিশ সার্ভ করা হয়। মামারবাড়িতে ডাব দিয়ে নয়। নারকোলের শাঁসসুদ্ধ দুটি মালার মধ্যে বাগদাচিংড়ি সর্ষে-পোস্ত-কাঁচালঙ্কা বাটা দিয়ে মেখে, কাঁচা সর্ষের তেল, হলুদ, লঙ্কা, নুন দিয়ে নারকোলের মালায় রেখে এবার নারকোলটিকে বন্ধ করে সেই ফাটা অংশে ময়দার পুলটিশ লাগিয়ে মরা উনুনের আঁচে ঐ নারকোলটি রেখে দেওয়া হত ছাইয়ের ভেতরে । ঘন্টা দুই পরে তাক লাগানো স্বাদ ও গন্ধে ভরপুর ভাপা চিংড়ি নাকি খুঁড়লেই বেরিয়ে আসত নারকোলের শাঁসের সঙ্গে। চিংড়ির মালাইকারীও এভাবে রাঁধা হয়েছে বহুবার। সেখানে সর্ষের বদলে পিঁয়াজ, আদা-রসুন গরমমশলা বাটা আর তেলের বদলে ঘি দেওয়া হত। পোলাও সহযোগে এই মালাইকারী জমে যেত। 
চিংড়ি মাছের কথা উঠলেই মনে পড়ে যায় আমার এক মামার কথা। উনি খুব রগুড়ে ছিলেন। ওনাদের সময় কত্তবড় চিংড়ি খেয়েছিলেন তা বোঝানোর জন্য উনি একবার বলেছিলেন" জানিস? এ আর কি চিংড়ি? এ তো লবস্টার কো বাবালোগ। আমরা যে চিংড়ি খেয়েছি তার খোলাগুলো ডাস্টবিনে পড়ে থাকলে তার মধ্যে দিয়ে কুকুরের বাচ্ছা ঢুকতো আর বেরুত।"  
চিংড়ি আর কাঁকড়া মাছ নয় বলে আর সম্পূর্ণ অন্যজাতের সজীব বলে বুঝি ওদের এত স্বাদ। আঁশটে ব্যাপরটা নেই । আছে এক অন্য রসায়ন। সংস্কৃত শ্লোকে পর্যন্ত চিংড়ি নিয়ে ঠাট্টা পড়েছিলাম কল্যাণী দত্তের "থোড় বড়ি খাড়া' য়। 

গলদাং বাগদাং রস্যাং নারিকেল সমণ্বিতাম্‌
অলাবু লোভানাং কৃত্বা তক্ষিতব্যং শুভে যোগে।। 

অর্থটি খুব সহজ। নারকেল অথবা লাউয়ের সঙ্গে চিংড়ির কেমিস্ট্রিটা সবচেয়ে ভাল জমে যে কোনও শুভযোগে।

ঘটির হেঁশেলে সবকিছুতে চিংড়ি। রোজকার পদে একটি কুচো বা ঘুষো, চাবড়া (ধানক্ষেতের জলে হয়)   কিম্বা বাগদার পদ থাকবেই। সেটি হল সাইড ডিশ। বড় চিংড়ি দিয়ে মোচা, এঁচোড় কিম্বা ফুলকপি দিয়ে ডালনা হল রাজভোগ্য। সবকিছুর রেসিপিতেই সবজী ভেজে নিয়ে আদাবাটা, টমেটো, লঙ্কা দিয়ে গরগরে কালিয়া আর নামানোর আগে মোক্ষম অস্ত্র ঘি আর গরমমশলার কম্বিনেশান।   
আমার ঠাকুমার হাতের আরেকটি বিশেষ পদ হল চিংড়ি দিয়ে পটলপোস্ত। শুধু পাঁচফোড়নের মহিমা আর লঙ্কাবাটার প্রশ্রয়ে পোস্তর সাথে ভেজে নেওয়া কুচোনো পটল, আলু আর নামানোর সময় কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে শুকনো ভাতে মেখে খাও।  
 চিংড়ির পরেই মনে পড়ে কাঁকড়ার কথা। কেউ বলে দশরথ। সকালবেলায় এর নাম নিলে নাকি দিন খারাপ যাবে,  যত্তসব কুসংস্কার বাঙালীর।  অথচ তার স্বাদ নেয়নি  এমন বাঙালীর সংখ্যা বিরল। 
রসিক রবির গল্পে  পাকড়াশীদের কাঁকড়াডোবা অথবা ডিমভরা কাঁকড়ার কথায় মনে পড়ে মেয়ে কাঁকড়ায় ডিম হয় বলে ছেলে কাঁকড়া কিনলে নাকি মাস বেশী পাওয়া যায়। যাদের এলার্জি তারা এ স্বাদের ভাগ পাবেনা। দাঁড়াগুলো ভেঙে নিয়ে চুষে রস বের করতে ছোটবেলায় আমাদের সারাটা দুপুর কাবার হত। হাতের এঁটো শুকিয়ে যেত। ভাত শেষ হয়ে যেত। কাঁকড়ার এমনি মোহ। কেউ রাঁধে পিঁয়াজ-রসুন-আদা দিয়ে রসা। তার এক স্বাদ। তবে সর্ষে কাঁকড়ার ঝাল অন্যরকম। কাঁকড়ার গন্ধটা পুরো পাওয়া যায়। আর তার পা গুলো দিয়ে পুঁইশাক চচ্চড়ির স্বাদ অনবদ্য।
বৈষ্ণবরা নাকি এ রসে বঞ্চিত তাই ঠাট্টা করে ট্রেনে এক বৈষ্ণবের পাশে বসে একজন শৈব গেয়েছিলেন
"বোষ্টম টমটম, হাঁড়ির ভেতর কাঁকড়া রেখে যায় বৃন্দাবন' 
মানে শৈব গায়ক বোঝালেন, বোষ্টমরা চুপিচুপি সব‌ই খায় তাদের যত্তসব হিপোক্রেসি। 
আমরা বলি কাঁকড়া অযাত্রা অথচ সংস্কৃতের পঞ্চতন্ত্রের গল্পে রয়েছে এই কাঁকড়াই নাকি সাপকে মেরে এক বণিকের পুত্রের জীবন বাঁচিয়েছিল । 
বিদেশের ট্রাউটের সমগোত্রীয় হল আমাদের ভেটকী। ভেটকীর ফ্রাই বা ব্যাটারে ডুবিয়ে ফিশ ওরলি নেমন্তন্ন বাড়ির মোষ্ট ফেবারিট।  ফিশ ফিঙ্গার হল কেতাদুরস্ত ককটেল স্ন্যাক। দুধসাদা টার্টার সসে একটি একটি করে ডুবিয়ে মুখের মধ্যে পুরে আলতো চাপ দিলে আদা-রসুন সমন্বয়ে ভেটকিফিলের এই  স্লিম আঙুল তখন ফুলে উঠেছে ডিম আর বেডক্রাম্বের কোটিঙয়ে ।  কিন্তু ভেটকীর সর্ষেবাটা ও আদা দিয়ে ঝাল অথবা শীতের মরশুমী ফুলকপি দিয়ে কালিয়া কিম্বা কাঁটাচচ্চড়ি হল আটপৌরে বাঙালীর আভিজাত্যপূর্ণ সাবেকী ডিশ। এখন কলাপাতায় মুড়ে ভেটকীর ফিলে দিয়ে পাতুড়ির খুব চল। আমি এই রেসিপিকে একটু মডিফাই করেছি। কলাপাতার বদলে পুঁইশাকের পাতায় কিম্বা লাউপাতায় মুড়ে ননস্টিকে এই পাতুড়ি করলে পাতার মধ্যে লেগে থাকা তেলমশলা সমেত এই পাতুড়িটা ভাতে মেখে খেয়ে ফেলা যায়।
ঘটিবাড়ির আরেকটি প্রধান মাছের রান্না হল মৌরলার টক। তেঁতুল অথবা আমের টক করে নিয়ে তার মধ্যে মুচমুচে করে ভাজা মৌরলা ভেসে থাকবে। আর সরষে ফোড়নের সঙ্গে তার রসায়নে যে রসনা সৃষ্টি হবে তা যেকোনো ঋতুতেই শেষপাতে দৌড়বে। অরুচির রুচি আনবে। এই মৌরলা মাছ শানের মেঝেতে রেখে একপ্রকার ডলে নিতেন মা। তার ন্যানো সাইজের আঁশগুলো বেরিয়ে যাবে আর পেটটা ধরে আলতো করে চাপ দিলে পিত্তিটা বেরিয়ে যাবে।  পিত্তিসমেত রান্না করলে দশসের দুধে একফোঁটা গো-চোনার সামিল হবে সেই তেতো পদটি।
এবার আসি বাঙ্গালীর আদরের রূপোলী সজীব শস্যে।  ঝিরঝির করে অবিরাম ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেই থাকবে আর ঠিক তখনি ঝাঁকেঝাঁকে গভীর জলের এই ইলিশমাছ সমুদ্রের নোনা জল সাঁতরে, জোয়ারের আনুকূল্যে  স্বল্প পরিশ্রমে,  নদীর কাছে আসবে, আমাদের ধরা দিতে। বলবে, বাঙ্গালী, তোমার জলকে নেমেছি।
ছোটবেলায় সবচেয়ে মজা ছিল রেনিডেতে  হঠাত ইলিশের গন্ধটা। হঠাত ছুটির সাথে বৃষ্টি আর হঠাত পাওয়া ইলিশের অনুষঙ্গে মন কানায় কানায় !
মায়ের সারপ্রাইজ। উনুনের পিঠে হাঁড়ির মধ্যে গরম ভাত আর তার মুখে চাপা দেওয়া একটা টিফিনকৌটোর মধ্যে বন্দী ইলিশমাছের ভাতে বা ভাপা । হলুদ পড়বেনা এই পদে।টাটকা মাছের গন্ধ নষ্ট হয়ে যাবে।  কৌটোর মধ্যেই নুন মাখানো ইলিশের গাদা-পেটি সর্ষে, কাঁচালঙ্কা বাটা, কাঁচা সর্ষের তেল আর বেশ কয়েকটি চেরা কাঁচালঙ্কার সাথে জারিয়ে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে মিনিট দুয়েক রেখে দিলেই এই অমূল্য পদ তৈরী।  আমার রন্ধন পটিয়সী দিদিমা তার বিশাল সংসারে বিরাট এক হাঁড়ির মুখে বিশাল এক কচুপাতার মধ্যে মাছগুলিকে ম্যারিনেট করে পাতাটি সুতো দিয়ে বেঁধে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে রাখতেন। মা বলত, সে ভাপা ইলিশের নাকি অন্য স্বাদ। দিদিমার নাতনী মানে এহেন আমি একটু ইম্প্রোভাইজ করে এই কায়দাটি করি লাউপাতায় মুড়ে এবং ননস্টিক প্যানে অর্থাত পাতুড়ির স্টাইলে। যাই করো এ কানুর তুলনা নেই। কাঁচা তেলঝাল, ভেজে ফোড়ন দিয়ে ঝাল, গায়ে মাখামাখা হলুদ সর্ষেবাটার ঝাল, বেগুন দিয়ে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বাঙালদেশের পাতলা ঝোল...সব‌ই যেন এই বর্ষায় দৌড়তে থাকে গরম ভাতের সঙ্গে। 
তাবে আমি বাপু রসুন-পেঁয়াজ-আদা সহযোগে ইলিশমাছের স্বাদ ও গন্ধ কোনোটাই পাইনা। এমনকি কাঁটা বেছে খেতে যারা ভয় পায় তাদের স্মোকড হিলসা অথবা ইলিশ বিরিয়ানীর স্বাদেও আমি বঞ্চিত কারণ সেক্ষেত্রে যেন মনে হয় মাছটাই নষ্ট হল। 
ইলিশমাছের কিছুই যায়না ফেলা। মাথা আর তেল দিয়ে ছ্যাঁচড়াও আমাদের ঘটি হেঁশেলের একটি অভিনব বর্ষার পদ। সাদাভাত অথবা খিচুড়ি দিয়ে জমে যায় এই চচ্চড়ি। সর্ষের তেলে মুচমুচে করে মাথা ভেজে নিয়ে ঐ তেলের মধ্যেই পাঁচফোড়ন আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে দুনিয়ার সবজী অর্থাত আলু, মূলো, কুমড়ো, ঝিঙে বেশ করে নেড়ে নিয়ে পুঁইশাক ডাঁটা ও পাতা দিয়ে ঢেকে দাও। নুন, হলুদ ছড়িয়ে দাও। কুচোনো থোড়, বাঁধাকপিও দিতে পারো সাথে। তারপর নুন, হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো, চিনি আর নামানোর আগে সর্ষেবাটা দিয়ে নাড়তে থাকবে। এটাই হল সফল ছ্যাঁচড়া টেষ্টি হবার উপায়। মা বলতেন, যতক্ষণ না অবধি কড়ায় "লাগা লাগা' অর্থাত একটু পোড়া পোড়া হবে ততক্ষণ রাখতে হবে আঁচে। সিল্ক পিওর কিনা পরখ করতে গিয়ে দাদু বলতেন, শাড়ির কোল আঁচল থেকে একগাছি সুতো পুড়িয়ে যদি "ছ্যাঁচড়া পোড়া' অর্থাত একটা মেছো অথচ পোড়া গন্ধ পাওয়া যায় তবেই সেটি আসল সিল্ক। তার মানে বুঝেছিলাম ছ্যাঁচড়া কড়ায় একটু লেগে গেলে তবেই হবে অথেন্টিক।আর যেহেতু পিওর সিল্ক হল ফাইব্রাস প্রোটিন জাতীয় তা পোড়ালে ঐ গন্ধ পাওয়াটা কিছু অস্বাভিক নয়। 
ঘটি হেঁশেলে রুই বা কাতলার মুড়ো দিয়ে সোনামুগ ডাল ভেজে নিয়ে করা হয় মুড়িঘন্ট বা মাছের মাথা দিয়ে ডাল। এ এক উপাদেয় যজ্ঞ্যিবাড়ির পদ। বাঙালবাড়িতে এটাই রাঁধা হয় সুগন্ধী আতপচাল দিয়ে। বাকীটুকু এক‌ই রকম। শুরুতে মাথা ভেজে নিয়ে পিঁয়াজ, রসুন আদা, টমেটো কষে ওরা দেয় সেদ্ধ করা ভাত আর আমরা তার মধ্যে দি সেদ্ধ করা সোনামুগ ডাল। তারপর ঘি, গরমমশলার ছোঁয়া আর চিনির স্পর্শে তা যেন হয়ে ওঠে অমৃত ডাল। একঘেয়ে ডালের থেকে ধোঁয়া ওঠা এই ডাল বরং ক্ষুধার উদ্রেক করে। আর মাছের মুড়োয় যেন অল্প মাছ থাকে আর ডাল ফোটার সময়  মুড়ো একটু ভেঙে দিতে হয়। হলুদ সোনামুগ ডালের মধ্যে চেরা সবুজ কাঁচালঙ্কার অনুষঙ্গে এই ডাল শুধু ডাল নয় বরং একটি সম্পূর্ণ পদ। 
মনে পড়ে কোনও এক পৈতেবাড়ি আর সাধভক্ষণের দ্বিপ্রাহরিক নিমন্ত্রণে এই ডাল দিয়ে তপসে মাছের ফ্রাই খেয়েছিলাম।  অতুলনীয়  সেই যুগলবন্দী। এই তপসে মাছ সন্ন্যাসীর মত শ্বশ্রুগুম্ফ যুক্ত আর তপস্বীর মত গেরুয়া পোষাক পরিহিত অর্থাত তার ল্যাজা মুড়ো, পাখনা, দেহের রং সবেতেই গেরুয়া রঙের ছোঁয়া। এ মাছের ভাজা বানানো অতীব সহজ। আমার শাশুড়িমা বাড়িতে এনে মাথার কাঁটা দিয়ে এর পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুঁড়ি, পিত্তি টেনে বের করতেন। কারণ কেটে ফেললে মাছ ভাজতে গিয়ে ভেঙে যাবে তাই। তারপর ড্রেশ করা সেই মাছ রগড়ে নিয়ে আঁশ বের হয়ে গেলে, ধুয়ে এক টুসকী পাতিলেবুর রস, নুন আর সামন্য হলুদ দিয়ে জারিত করতেন।  কিছু পরে এর মধ্যেই আদা-রসুন কাঁচালঙ্কা বাটা নরম হাতে মাখিয়ে দিতেন । পড়ে থাক তেমনি করে অন্ততঃপক্ষে ঘন্টাখানেক। ওদিকে ব্যাটার তৈরী হল দুরকমের বেসন (ছোলা ও মটরের), ঠান্ডা জল,  নুন, হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো, পোস্তদানা আর কালোজিরে দিয়ে। এবার ব্যাটারটি হবে নাতি পাতলা নাতি ঘন অর্থাত মাঝামাঝি। এবার সে মিশ্রণ ফ্রিজে রাখতে হবে। তারপর খাবার সময় কড়াইতে সর্ষের তেল গনগনে করে গরম করে ঐ মিশ্রণে চালের গুঁড়ো ছড়িয়ে একটি একটি করে মাছের গায়ে অতি সন্তর্পণে কোটিং করে ভাজতে হবে আঁচ কমিয়ে বাড়িয়ে। ছোট সাইজের গুর্জাওলি মাছও এমন করে ফ্রাই করলে মন্দ লাগেনা খেতে। 
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে এই অনুপম তপসে মাছের কথা। 

তপ্ত তপ্ত তপসে মাছ, গরম গরম লুচি,
অজামাংস ভাজাকপি আলু কুচি কুচি।
শীতের দিনে খাবে যদি তুলে থাবা থাবা
দশ নম্বর পদ্মপুকুর দৌড়ে এস বাবা। 

আরেকটি সামুদ্রিক মাছ হল ফ্যাঁশা। ইলিশের মত রূপোলী, ঝকঝকে দেখতে। দামও বেশ কম। নদীর ফ্যাঁশার স্বাদ সমুদ্রের চেয়ে ঢের ভাল। সমুদ্রের গুলো হয় বড় আর নদীর গুলো হয় অপেক্ষাকৃত ছোট। এই ফ্যাঁশামাছ ডালের সাথে প্রথম পাতে মুচমুচে ভাজা আর বড়ি আর সর্ষেবাটা দিয়ে গায়ে মাখা ঝাল ঘটিদের আরেকটি প্রিয় পদ। 
 
মাছভাজার কথা বললেই মনে পড়ে যায় অরুচির রুচিকারক ঘুষোচিংড়ির বড়ার কথা। এর দোষ একটাই বড্ড তেল লাগে ভাজার সময়। তবে যারা এই ঘুষোচিংড়ির বড়া খায়নি তারা একবার খেলে আর ভুলতে পারবেনা। অনেকের কাছেই এ হল সস্তার মাছ, গরীবের খাবার অথবা খেলে "পেটের অসুখ করবে' টাইপ। কিন্তু ভাল করে ধুয়ে বেছে নুন, হলুদ, পোস্তদানা, কাঁচালঙ্কা কুচি আর বেসন ছড়িয়ে এই বড়া ডালের সাথে অথবা অম্বলে ফেলে খেতে বড়ো ভাল লাগে। 
ঘুষোচিংড়ির কথাতে মনে পড়ে কবি ঈশ্বর গুপ্তকে।

"দীনের তারণকারী চিংড়ির ঘুষো
সুমধুর বাতহর পয়সায় দুশো'


আজকের সফিষ্টিকেটেড মডিউলার কিচেনে মাছকাটা কিম্বা আঁশবটি ব্রাত্য কারণ স্থানাভাব। কিন্তু বাবা বলতেন পরিপাটি করে মাছকে কেটে সাজিয়ে রান্নার উপযুক্ত করে তোলাটাও হল এক শিল্প। তাইতে মনে হয় তখনকার দিনে মেয়েরা  বেশীর ভাগ বাড়িতেই আটকে থাকতেন। কর্তামশাই বাজার থেকে মাছ এনে দিলে তবে তিনি সেই কর্তণ পারিপাট্য দেখাবেন। কারণ যে রাঁধে সে মাছও কাটে। আর কথাতেই বলে মাছ ধুলে মিঠে, মাংস ধুলে রিঠে। তাই তেল, পোঁটা, আঁশ ফেলে কাটা মাছ ভালো করে ধুলে তবেই তা হবে সুস্বাদু। বাড়ির গিন্নীরাই সেই কাজটি করতেন সে যুগে।  এসব আজকের বদলে যাওয়া গতিশীল দুনিয়ায় স্বপ্ন। বিশ্বায়নের যুগে  হংকং থেকে হনললু, টরোন্টো থেকে টেক্সাস কিম্বা লন্ডন থেকে লাসভেগাস সর্বত্র মাছ কিচেনে প্রবেশ করে বরফের সমাধি থেকে। কখনো বা ক্যানবন্দী হয়ে। এমনকি আমাদের ভারতেও ডিপারটমেন্টাল স্টোরসের দুর্গন্ধময় ফিশকর্ণার থেকে কেটেকুটে সোজা প্রবিষ্ট হয় বাড়ির ফ্রিজে। রান্নার মাসী তাকে কিভাবে ধুয়েছে তা দেখবার সময় নেই বাড়ির ব্যস্ত গৃহিণীর। এখনকার চালানীর মাছে শুনছি আধিক্য রয়েছে পর্যাপ্ত কীটনাশক অথবা মাছকে বহুদিন তাজা রাখবার রাসায়নিক। তাই বারেবারে ধোয়াটাও খুব জরুরী। তার চেয়ে মনে হয় বাজার থেকে জিওল মাছ খাওয়া অনেক বেশী পুষ্টিকর। আর অল্পসংখ্যক চুনোচানা মাছ নিয়ে যারা বাজারে বসে সেগুলি বোধহয় স্বাস্থ্যকর । এদের মাছের স্বাদও ভাল আর রিস্কফ্যাক্টরও কম।

শিলাদিত্য ডিসেম্বর সংখ্যা ২০১৬

২৩ ডিসে, ২০১৬

প্লিজ, পজ এন্ড পার্ডন !!!

সেবারও অতিবৃষ্টি হয়েছিল । থৈ থৈ শ্রাবণের পথঘাট । উপছে পড়া জলের ভারে নদীনালা বানভাসি । গাছপালা ফুলপাতার মনে হয়েছিল হাঁফ ছেড়ে বাঁচি ।  আর চাইনে বৃষ্টি ! এবার থামবি তোরা ? মেঘ বিদায় দিবি? টুপটাপ, ঝরা বকুলও সিক্ত, কদম ঝরা সন্ধ্যে নিঝুম শান্ত  । মাটি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ছিল জলের থেকে ।   মেঘ মিনারে ফাটল ধরেছিল । বৃষ্টি কেঁদে চলেছিল অঝোরে । রোদের মুখ দেখেনি সবুজ ঘাস বহুদিন । এই বার্তা বোধহয় পৌঁছে গেছিল  বৃষ্টির দেবতার কাছে । মেঘের কাছে চিরকূট পৌঁছেছিল । তাই বুঝি বৃষ্টি এবার থেমেছে । বুকের কষ্ট চেপে রেখেছে মেঘ অতিকষ্টে । কোথায় থামতে হবে বুঝতে পেরেছে এতদিনে । প্রকৃতির এমনটি যদি প্রাণীকুল বুঝে নিত ! কোন্‌ এক অদৃশ্য মেল এসে যদি জীবজগতকে বুঝিয়ে দিত ! তাহলে না হত কোনো অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন বা মনকষাকষি ।   তাহলে সব সম্পর্কের খুঁটিনাটিগুলো নিয়ে সারাজীবন নিয়ে চলা যেত । আর সম্পর্কের কাঁটাতারের বেড়া না ডিঙিয়েও বেশ সুন্দর বেঁচে থাকা যেত ।   
এই সম্পর্কের "কাঁটাতারের বেড়া" শব্দযুগল প্রথম পড়েছিলাম জয় গোস্বামীর "জলঝারি" ব‌ইখানিটিতে। কাঁটাতারের বেড়া বড়ো ভয়ানক বস্তু।  ক্রস করতে গেলেই বিপদ । ক্রস করলে জয় হলেও হতে পারে কিন্তু জয় না করেও তো এপারেও দিব্যি কাটানো যায়। রামায়ণের লক্ষণরেখা ক্রস করে সীতার কি বিপদ হয়েছিল তা আমাদের সকলেরি জানা। কিন্তু আমরা হলাম জ্ঞানপাপী। প্রতিনিয়ত সামাজিক, রাজনৈতিক এমনকি নিজেদের আপনজনের সাথেও ডিল করার সময় সেই লক্ষণরেখা ক্রস করে যাই। ফলে নেমে আসে বিপর্যয়, মন কষাকষি, সম্পর্কের টানা ও পোড়েন। 

এখন না হয় ছেলেবুড়ো অনুপম রায়ের জন্য বলতে শিখেছে "আমাকে আমার মত থাকতে দাও"

আদতে সব মানুষেরি কিন্তু মনের কথা এটি। সে শিশু বা কিশোর, যুবক বা বৃদ্ধ সকলেই মনে মনে চায় এই স্বাধীনতা। 
 আমার ছেলে যখন খুব ছোট এক ডাক্তারবাবুর কাছে ওকে নিয়ে গেছিলাম পেটখারাপের চিকিত্সা করাতে। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন একটা দামী কথা।
-বাচ্ছাকে মানুষ করতে গিয়ে একটা কথা মাথায় রাখুন, "কেয়ারফুলি কেয়ারলেস" !
আমি বললাম -মানে?
ডাক্তারবাবু বলেছিলেন "মানে সে সারাক্ষণ কি করছে সে ব্যাপারে নাক না গলিয়ে কেয়ারফুলি তাকে আড়াল থেকে অবসার্ভ করুন কেয়ারলেস ভাবে যাতে সে বুঝতে না পারে যে আপনি ওর ওপর খেয়াল রেখেছেন।"
খুব কাজে দিয়েছিল কথাগুলো।

 শৈশব পেরোনো , কৈশোরের শিশুটিও কি চায় এমনটি? তার পড়ার টেবিল এলোমেলো, ব‌ইয়ের তাক অগোছালো। তার নিজের বৃত্তের মধ্যে একভুবন পৃথিবী আর বাইরের জগতে আপনজন। কিন্তু আপনজন তার ঐ অন্তর্বৃত্তটিতে নাক গলাতে গেলেই  বিপদ। হঠাত সদ্য টিন পেরোনো কিশোরের সেলফোনে চোখ রাখতে যান অনেক অভিভাবক। বিস্তর আর এন্ড ডি করেন সে কাকে ফোন করছে, কাকে কি মেসেজ পাঠাচ্ছে, বন্ধুদের সাথে কোথায় যাচ্ছে...এইসব নিয়ে। মানছি সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করার দায়িত্ব তাদের কিন্তু কোথায় থামতে হবে আর লক্ষণরেখা পেরিয়ে তার অন্তর্বৃত্তে প্রবেশ করব কিনা সেটা ভেবেচিন্তে করলেই কিন্তু অনেক মুশকিল আসান। সারাক্ষণ কানের কাছে কানাইয়ের বাসা যেন! মায়ের রাতে ঘুম নেই। ছেলেটা আমার কি করছে, কার সাথে মিশছে.....প্লিজ সেটা একটু দূর থেকে খেয়াল রাখুন মা, অত কাছ থেকে নয়। ছেলের সাথে সম্পর্কটা একবার খারাপ হয়ে গেলে পস্তাবেন পরে। বন্ধু হয়ে উঠুন, অভিভাবক নয়। 
ছেলে আরো বড়ো হয়ে যখন চাকরী পেল তখন তার রোজগারের টাকায় সে অহোরাত্র অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কি কিনছে জানতে চাইবার দরকার নেই আপনার। দেখবেন সে নিজে থেকেই দেখাবে আপনাকে। বারবার তার কাঁধের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে জানবার দরকারো নেই সে ফেসবুকে কার সাথে কি চ্যাট করছে। তার ক'জন গার্লফ্রেন্ড হল, তার উইকএন্ডের কি প্ল্যান, কোন রেস্তোঁরায় সে হ্যাঙাউটে যাচ্ছে সে....কি হবে আপনার নাক গলিয়ে? আপনি নিজের নিয়ে থাকুন। একটা সময়ের পর যার যার নিজের জীবন তার‌ই। বেশী প্রশ্ন করলে আপনার অপমানিত হবার সম্ভাবনাই বেশী। সেই থেকে আপনি ভুগবেন আত্মগ্লানিতে। বরং ডিনার টেবিলে একসাথে খেতে বসার সময়  একটু আধটু পুছতাছ হোক হাসিমুখে...ঠিক যেন সাপো মরলো অথচ লাঠিও ভাঙলোনা তেমন করে।  বেশী খোঁচানোর প্রয়োজন নেই। বেশী কিউরিওসিটি কিন্তু তাকে আপনার থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেবে। সে কি কখনো জানতে চেয়েছে আপনার কাছ থেকে আপনি কতবার কলেজ কেটে এ মার্কা ছবি দেখতে গিয়েছিলেন কিম্বা ইউনিভার্সিটির ক'জন ছেলেকে ফ্লার্ট করেছিলেন?  বরং আপনিও চলে যান তার সাথে হ্যাঙাউটে। জমিয়ে মুভি দেখুন, কব্জি ডুবিয়ে খান একসাথে। কিন্তু সেদিন বান্ধবীর সাথে সে বিয়ার খেয়েছিল কিনা বা রোজ রোজ পাবে যাস কেন, এসব কথা নৈব নৈব চ!  

তারপর সেই ছেলেটির টেটুম্বুর যৌবনে যখন তার সঙ্গী হয়ে এল অন্য পরিবারের একটি মেয়ে তখনো কিন্তু নিজেকে প্রতিমূহুর্তে গ্রুম করুন। 
এমনো অনেকের কথা শুনেছি স্বামী সারাদিন পর অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে তার মা পুত্রবধূটিকে অন্য কাজে পাঠিয়ে দিয়ে ছেলের সাথে গল্পগুজব করতেই থাকেন...দুটি প্রাণ খুব কষ্ট পায় তখন। মা ছাড়তে পারেননা তাঁর অধিকারবোধ। এতে কিন্তু তিনি ছেলে-বৌ দুজনের কাছ থেকেই অনেকটা দূরে সরে যান...সেটা বুঝতে পারেন না। 

নারীশিক্ষার প্রসার হয়েছে আমাদের দেশে । বালিকা আর বধূ হয় না শিক্ষিত সমাজে । শাশুড়িমাও কিন্তু শিক্ষিতা আজকের যুগে, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়ায় উভয়ই হিমশিম খান আজকের যুগেও । তার মূল কারণ কিন্তু এই লক্ষণরেখা ডিঙিয়ে অহেতুক অশান্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা।
ছেলে-বৌ কোথায় গেল, কি খেয়ে বাড়ি ফিরল অথবা শ্বশুরবাড়ির জন্য কি উপহার নিয়ে এল বিদেশ থেকে এসব জেনে আপনার কি লাভ মশাই? একবার ভাবুন তো আপনার শাশুড়ি যদি আপনাদের দাম্পত্য জীবনে এভাবে অহোরাত্র মাথা গলাতেন ভালো লাগত কি আপনার?

এবার আসি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে।  নিজেদের পারষ্পরিক বোঝাপড়ায় সম্পর্কের ঘানি টানতে টানতে ফেসবুকে আপনাদের বন্ধু হল অনেক। এবার স্বামীটির গার্লফ্রেন্ড তাকে কি মেসেজ পাঠাচ্ছে বা স্ত্রীয়ের বয়ফ্রেন্ড তার সাথে রাতে কতক্ষণ অনলাইন হচ্ছে, জানতে চাইলেই কিন্তু বিপদ হতে পারে। তার চেয়ে বলি আবারো বন্ধুতার মধ্য দিয়ে জেনে নিন কোনো দুর্ঘটনার আভাস-ইঙ্গিত পাচ্ছেন কিনা। সকলেই সকলের কমন ফ্রেন্ড হয়ে যান, রিস্ক ফ্যাক্টর কমে যাবে। আর কখনোই একে অন্যের মেলবক্সে কোথা থেকে মেইল উড়ে এল কিম্বা চ্যাটবক্সে কার মেসেজ সবচেয়ে বেশী আছে এসব নিয়ে আর এন্ড ডি মোটেও নয় কিন্তু। 
একবার এক আত্মীয়ের  বাড়িতে গেছি তার ছেলের বিয়ে উপলক্ষে। সেদিন তার বৌভাতের সকালবেলা। নবপরিণীতা বৌটির বাড়ির থেকে ফোন এসেছে। বৌটি তার সেলফোনটি নিয়ে যত‌ই আড়ালে যায়, তার শাশুড়িমাটি ছুতোয়নাতায় তত‌ই তার আশেপাশে ঘুর ঘুর করতে থাকে। আমি আর না পেরে সেই শাশুড়িমাটিকে অন্য ঘরে নিয়ে চলে এলাম এক অছিলায়। এখনতো তবু মোবাইল ফোনের যুগে। আমার বিয়ের পর আমার স্বামীকে তখন প্রায়শ‌ই অফিসের কাজে বিদেশ যেতে হত। তখন নব্ব‌ইয়ের গোড়ার দিকে মোবাইল ফোন নেই। ল্যান্ডলাইনে বিদেশ থেকে বহুমূল্যের ফোন কলটির  অপেক্ষায় থাকতাম আমি। আর ফোন এলেই সব কাজ ফেলে যেই সেই ফোনটি ধরতে যেতাম আমার দুই পিসিশাশুড়ি, জ্যেঠিশাশুড়ি সকলে সব কাজ ফেলে রেখে আমার কাছে মানে ঐ টেলিফোনটির চৌহর্দ্দির মধ্যে ঘুরপাক খেতেন।  অবশেষে আমি খুব ডিষ্টার্বড হয়ে ফোন রেখে দিতাম। 
বিয়ের সময় আমার বয়স ২৩ আর আমার স্টুডেন্ট স্বামীর ২৭।  একান্নাবর্তী বাড়ির এরা আমাকে দেখেশুনেই এনেছিলেন বৌ করে। বাড়িতে আমার শ্বশুরমশাই আর শাশুড়ি ছাড়াও ছিলেন নিঃসন্তান জ্যেঠশ্বশুর ও জ্যেঠিশাশুড়ি আর দুজন অবিবাহিত পিসিশাশুড়ি। আর ছিলেন শ্বশ্রুমাতার দিদি মানে আমার মাসীশাশুড়ি আর তাঁদের মা অর্থাত দিদিশাশুড়ি। এঁরা কিছুটা দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোল করতেন ।   আমরা ছিলাম বাড়ির মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ দম্পতি তাই কেন জানিনা আমাদের ওপর সকলেই ছড়ি ঘুরিয়ে অপার আনন্দ পেতেন সেই সময়ে মানে ১৯৮৯-৯০ সালে।  দক্ষিণের খোলা বারান্দায় দুজনে পাশাপাশি দাঁড়ালে সমালোচনা হত। অফিস থেকে তিনি ল্যান্ডলাইনে ফোন করলে প্যারালাল লাইনে কেউ একজন আমাদের ট্যাপ করত। এছাড়া অফিস থেকে তিনি ফিরলে তাঁর সামনে দাঁডানোর জো ছিলনা। আমাকে কেউ সেখানে দেখলেই তুরন্ত রান্নাঘরে খাবার গরম করতে পাঠিয়ে দিতেন। সে অফিস যাবার সময় আমার বাই করার তো কোনো কোশ্চেন নেই! নো ওয়ে!   টিফিনের সুস্বাদু খাবার খেয়ে আমার স্বামী ফোন করলেন একবার দুপুরে। কেউ একজন বললেন" যত্তসব! আদিখ্যেতা!" রবিবারের সকালে তাঁরা একজোট হয়ে মহাভারত দেখছেন। আমরা তখন আমাদের ঘরে গল্পে-আড্ডায় মশগুল। ছুতোয় নাতায় ঘরে ঢুকে  আমাদের অনাবিল শান্তি হরণ করে নিতেন। এমনকি নবদম্পতির ছুটির দুপুরে দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য ফোন করে অযাচিত অতিথিকে আপ্যায়ণ করতেও  ছাড়তেন না তাঁরা। উদ্দেশ্য একটাই আমাদের অবাধ মেলামেশায় যতিচিহ্ন টেনে দেওয়া।  আমি যেন পরপুরুষের সাথে গল্প করছি নিজের বেডরুমে বসে। আজ ভাবি তখন কেন whatsapp ছিলনা রে? শত্রুমুখে ছাই উড়িয়ে দেদার প্রেমালাপ করতে পারতি দুজনে!!! 

 সবশেষে বলি 
জীবনে এমনিতেই অনেক কমপ্লিকেশনস। তাই চারিপাশের আপনজনের সাথে বোঝাপড়াটাও একটু বুদ্ধি করে করুন। তাহলেই সকলের কাছেই আপনার ওয়ার্ম অ্যাকসেপটেন্স।
জয়জয়ন্তী সিনেমার  বিখ্যাত গানটি মনে আছে? "আমরা তো আর ছোট নেই, আর ছোট নেই, যেখানেই থাকি সেখানেই ভালো থাকব....."
সত্যি সত্যিই ভালো থাকব তাহলে ।  আর এত কথা শোনার পরেই যদি ভবি ভোলার না হয় তবে চালাও পানসি বেলঘরিয়া। ক্রস করেই ফেলুন লক্ষণরেখা, বিপদের ঝুঁকি নিয়ে। হয় এস্পার, নাহয় ওস্পার..য়া থাকে কপালে, একটাই তো জীবন, লড়ুন নিজেনিজেই, ডিঙিয়ে ফেলুন কাঁটাতারের অতিকষ্টের বেড়া। পা দিয়েই ফেলুন মনের মানুষটির, কাছের মানুষটির একান্ত আপন ঘেরাটোপের অন্তর্বৃত্তে। তবে মাথায় রাখুন 
"চলো লেটস গো" সিনেমায় রূপম ইসলামের সেই গানটি...

কাম ক্রস দ্যা লাইন,
মনের চৌকাঠ  
কাম ক্রস দ্যা লাইন
সময়ের বিভ্রাট
কাম ক্রস দ্যা লাইন
আমার হাতটা ধরো
কাম ক্রস দ্যা লাইন  
তুমি চাইলেই পারো ।  


প্রকাশিত কলকাতা ২৪x৭  

২২ ডিসে, ২০১৬

আমার ইলশে স্মৃতি

   টিপটিপ, টুপটাপ, ঝমঝম, ঝিরঝির... অপেক্ষার অবসান, বর্ষা এসেছে। আবার এসেছে আষাঢ় আমাদের শহরে। মেঘকালো করা সকালে মন বলে আয় কবিতা লিখি, উজাড় করি ফেসবুকের দেওয়ালে বৃষ্টিকাব্য। ওদিকে রান্নাঘর ডাকে আয়, ছুটে আয় । টেষ্টবাড গুলো লকলক করে বলে খিচুড়ি আর ইলিশমাছ ভাজা। 
ইলিশমাছের গন্ধে ভাতের খিদে একধাপ বেড়ে যায়। ভাত খেয়ে ছুটির দিনে দিবানিদ্রা কিম্বা অলসদুপুরে মাছের স্তুতিগান, এও বাঙালীর আরেক রসনা। মনে হয় কি এমন স্নেহ আছে এই ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডে? যার মোহে ইলশে পদ্যরাও ধরা দেয় ইলশেগুঁড়ির সাথে। বলে উঠি নিজের মনে 

ভাই ইলিশ, তুই খলবল কর জলে,
বড় হয়ে ওঠ, তারপর আয় দেখি !
রান্নাঘরে সর্ষে বাটি,  নুন-হলুদ-তেলে
জমিয়ে রাঁধি, তোকে ভাপাই লঙ্কা দুটি ডলে;

ভাতের হাঁড়ির মুখে কৌটো বন্দী ইলিশভাপা
নরম চালের গরম ভাতে মাছের কৌটো চাপা ।
সরষে ঝাঁঝে পরাণ গেল ইলিশ ম’ল দুখে
বেজায় কাঁটা, রূপোর মাছে  তবুও খাব সুখে ।

 কথায় বলে হালকা হাওয়া দেবে, ঝিরঝির করে অবিরাম ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেই থাকবে আর ঠিক তখনি ঝাঁকেঝাঁকে গভীর জলের এই ইলিশমাছ সমুদ্রের নোনা জল সাঁতরে, জোয়ারের অনুকূলে স্বল্প পরিশ্রমে,   নদীর কাছে আসবে, আমাদের ধরা দিতে। 
ছোটবেলায় সবচেয়ে মজা ছিল  রেনিডেতে  হঠাত ইলিশের গন্ধটা। হঠাত ছুটির সাথে বৃষ্টি আর হঠাত পাওয়া ইলিশের অনুষঙ্গে মন কানায় কানায় !
মায়ের সারপ্রাইজ। উনুনের পিঠে হাঁড়ির মধ্যে গরম ভাত আর তার মুখে চাপা দেওয়া একটা টিফিনকৌটোর মধ্যে বন্দী ইলিশমাছের ভাতে বা ভাপা । হলুদ পড়বেনা এই পদে।টাটকা মাছের গন্ধ নষ্ট হয়ে যাবে।  কৌটোর মধ্যেই নুন মাখানো ইলিশের গাদা-পেটি সর্ষে, কাঁচালঙ্কা বাটা, কাঁচা সর্ষের তেল আর বেশ কয়েকটি চেরা কাঁচালঙ্কার সাথে জারিয়ে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে মিনিট দুয়েক রেখে দিলেই এই অমূল্য পদ তৈরী।  আমার রন্ধন পটিয়সী দিদিমা তার বিশাল সংসারে বিরাট এক হাঁড়ির মুখে বিশাল এক কচুপাতার মধ্যে মাছগুলিকে ম্যারিনেট করে পাতাটি সুতো দিয়ে বেঁধে ভাত ফোটবার সময় হাঁড়ির মুখে রাখতেন। মা বলত, সে ভাপা ইলিশের নাকি অন্য স্বাদ। দিদিমার নাতনী মানে এহেন আমি একটু ইম্প্রোভাইজ করে এই কায়দাটি করি লাউপাতায় মুড়ে এবং ননস্টিক প্যানে অর্থাত পাতুড়ির স্টাইলে। যাই করো এ কানুর তুলনা নেই। কাঁচা তেলঝাল, ভেজে ফোড়ন দিয়ে ঝাল, গায়ে মাখামাখা হলুদ সর্ষেবাটার ঝাল, বেগুন দিয়ে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বাঙালদেশের পাতলা ঝোল...সব‌ই যেন এই বর্ষায় দৌড়তে থাকে গরম ভাতের সঙ্গে। 
ইলিশমাছের কথায় মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। আমার বাড়ী গঙ্গার ধারে। বর্ষা এলেই  মোটা, কালো, দশাশয়ী চেহারার এক  হিন্দুস্তানী বুড়ো ধবধবে পোষাকে "হিলিস মাছ গোঙ্গা'  বলে চিল চীত্কার করতে করতে আমাদের পাড়ায় ঢুকত  । বুড়োটা কুচকুচে কালো । দুকানের কালো লতিতে  সোনার চকচকে মাকড়িটা দেখতে বড্ড ভাল লাগত । সে বাড়ির সামনে এলেই আমরা ভাইবোনে মিলে মাকে ধরে এনে ইলিশমাছ কিনিয়েই ছাড়তাম । ইলিশ মাছ আমাদের দুজনেরি ভীষণ প্রিয়।  সেই হিন্দুস্তানী মাছওয়ালা শীতকালে সন্ধ্যের ঝুলে গান ধরত, "বাদাম ভাজা খাইও, আউর ভুখে গুণ গাইও, ইয়ে ঝাল বানানেওয়ালা, ইসমে নমক ডালা হুয়া ...... ইয়ে গরম মুমফালি-ই-ই-ই " 
তখন বুঝতামনা শীতকালে বাদাম আর বর্ষায় ইলিশের কেমিস্ট্রিটা । মা বলেছিল, শীতে ইলিশ পাওয়া যায়না তাই পেট চালানোর জন্যে বাদাম ভাজতে হয় তাকে।
বাবার মুখে শুনেছি বিস্ময়কর ইলিশ উপাখ্যান। বাবা বলেছেন,
" প্রতিবছর বর্ষা শুরু হলেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি মাথায় করে চানে বেরোতাম ছুটির দিনে । যাবার সময় মা চার আনা পয়সা দিয়ে বলতেন নদী থেকে সদ্য ওঠা ইলিশ মাছ কিনে আনতে । সেই চার আনাটিকে অতি সন্তর্পণে ট্যাঁকে গুঁজে ঝাঁপিয়ে পড়তাম জলে । মাঝ নদীতে সাঁতার কেটে গিয়ে যখন মাছধরার জেলের নৌকো দেখতে পেতাম তখন উঠে পড়তাম নৌকায় । চার আনা পয়সা দিয়ে ইয়া বড় এক ইলিশ কিনে নৌকায় করে আবার ঘাটে ফিরে এসে বাড়ি যেতাম নাচতে নাচতে ।
পরবর্তী আকর্ষণ ইলিশের ভোজবাজি । যা দেখাতে  সিদ্ধহস্ত ছিলেন আমার মাতাঠাকুরাণী ।  এখন সে বড় ইলিশও আর নেই আর নেই সেই দামও'

প্রতিবছর আমার ছোটপিসিমা আসতেন বিহারের দ্বারভাঙা থেকে। বাবা তাঁর আবদারে দুটি বড় বড় ইলিশমাছ কিনে আনতেন। মা তাঁর ননদিনীর জন্য আহ্লাদে আটখানি হয়ে বঁটি নিয়ে বসে পড়তেন সেই মাছ নিজে কাটতে। জলে ধুয়ে নিয়ে এই মাছ কাটার রীতি নয়ত স্বাদ নষ্ট হয়। তারপর সেই মাছ একটি হাঁড়িতে করে নুন, হলুদ দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখা হত। পিসিমা তা নিয়ে মহানন্দে ট্রেনে উঠতেন। বিহারে ইলিশমাছ অপ্রতুল আর পিসিমা ইলিশের বড়‌ই ভক্ত। তাই এরূপ ব্যাবস্থা। এর দিন দশেক পর একখানি পোষ্টকার্ডে সেই ইলিশের জয়গান করে বার্তা আসত পিসিমার কাছ থেকে। টাটকা ইলিশ নাকি একরকম আর এই নোনা ইলিশ নাকি আরেক রকম। অনেকদিন রেখে খাওয়া যায়। 
বিশ্বে ইলিশমাছের সর্বোচ্চ উত্পাদন নাকি হয় বাংলাদেশে। কিন্তু একবার বিদেশ থেকে বাংলাদেশ হয়ে ফিরছিলাম।ভেবেছিলাম সত্যি পদ্মার ইলিশের স্বাদ নেব ভাগ করে।  ট্রানজিট ভিসায় দুপুরবেলা ঢাকার  একটি বেশ উচ্চমানের হোটেলে গিয়ে শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা দুপুরে ইলিশ মাছ চেয়ে পাইনি। তার বদলে বাঙালীর "চিলি চিকেন'  খেয়ে পেট ভরাতে হয়েছিল। 
বহুবার বাঙালবাড়িতে নিমন্ত্রিত হয়ে সরস্বতী এবং কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোতে জোড়া ইলিশের পুজো দেখেছি । ধানদুব্বো, তেল-সিঁদুর মাখিয়ে বরণ করে নতুন শাড়ি পরিয়ে  জোড়া ইলিশের পুজোর পর জমিয়ে ইলিশমাছ ভোগ দেওয়া হয়।  আগে বলা হত সরস্বতীপুজোর দিনে শুরু আর ঐ লক্ষ্মীপুজোর দিনে শেষ । মধ্যিখানে আশ্বিন থেকে মাঘ অবধি আর ইলিশ খাওয়া যাবেনা। এর বিজ্ঞানসম্মত কারণটি হল মাছকে সংরক্ষণ করা । মাছকে আকারে বাড়তে দেওয়া।বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠের মধ্যে যুবতী থেকে গর্ভবতী হয়ে তবে সে বর্ষার জল পেয়ে নধর হবে। আর গুটিগুটি সেই পোয়াতি মাছ সাঁতরে সাঁতরে জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা জল থেকে  যত নদীর দিকে এগিয়ে আসবে তত তার শরীর থেকে আয়োডিন আর নুন ঝরে ঝরে মিষ্টতা বাড়বে। সেই অর্থে ইলিশ হল পরিযায়ী মাছ।মরশুমি সজীব শস্য। বর্ষার বিশেষ তিথিতে ধরা দেয়। বাকী সময় থাকে গভীর জলে। তখন তার মনের তল পাওয়া দুষ্কর। এইসময় সে খায় বিশেষ ধরণের জলজ শ্যাওলা। খেতে খেতে যত বাড়তে থাকে তত সে পুষ্ট ও নধর হয়। রূপে লাবণ্যে থৈ থৈ তার গর্ভিণী যৌবন যেন স্নেহ পদার্থের আধিক্যে ঢলঢল হয়। সেই বিশেষ ধরণের স্নেহপদার্থ বা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড সব মাছে থাকেনা তাই বুঝি ইলিশের এত কদর, অনন্য স্বাদ । হৃদরোগী থেকে ছোট শিশু সকলেই খেতে পারে এই মাছ। 

আজকাল খোকা ইলিশ ধরে নেওয়া হয় বলে আগেকার সেই বড় ইলিশের রমরমা নেই অন্ততঃ কলকাতার বাজারে। আর পাওয়া গেলেও তার দাম আকাশছোঁয়া। তাই বলতে ইচ্ছে করে  

অধরা এই জলজ শস্য, রূপোলী রঙের রূপসী পোষ্য
খেতেন পিতামহরা তস্য, পরিবেদনা কা কস্য !
খাচ্ছি যদিও চর্ব্যচূষ্য, তবুও অধরা বর্ষাশষ্য !   

 মনে পড়ে যায় রবিঠাকুরের গান "মেঘ বলেছে যাব যাব, রাত বলেছে যাই......'  এই যাই যাই করতে করতে বর্ষাও ফুরিয়ে যাবে আমাদের । আবারো  হাপিত্যেশ করে বসে থাকা পরের বছরের তরতাজা ইলিশের জন্যে।

আমার ঠাম্মা ছিলেন সাতখীরার মেয়ে। উনি বলতেন বর্ষার ক্ষুধামান্দ্য কাটাতে, ডিপ্রেশান কাটাতে ইলিশের জুড়ি নেই। তিনি ছিলেন রসেবশে ৫০% বাঙাল ও ৫০% ঘটি। তাই ছ্যাঁচড়া, অম্বল, কচুশাক দিয়ে ইলিশমাছের সব পদ‌ই সমান তালে রাঁধতেন জমিয়ে। আর বলতেন, যতদিন না দুগ্গাপুজো আসছে বর্ষায় হয় দুগ্গারুচি। দুর্গার জন্য উতলা, পুজোর জন্য এই পথ চাওয়ার প্রতীক্ষা আর একঘেয়ে খাওয়াদাওয়ার অরুচির দাওয়াই হল ইলিশ মাছ। এখন শুনছি ডাক্তারবাবুরাও এইকথা বলছেন....."যতদিন পারুন এই মাছ খেয়ে নিন। এ হল সোনার গৌর। একবার ছেড়ে দিলে আর পাবেন না। হৃদমাঝারে লালন করুন একে। হার্ট ভাল থাকবে, মন ও ভাল হবে' । 

কয়েকবছর আগে গঙ্গাবক্ষে এক ইলিশ উত্সবে গান গাইবার সুযোগ পেয়ে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম এই রূপোলী শস্যবিলাসে। 
সেদিন ছিল শ্রাবণের ঘন মেঘাচ্ছন্ন সকাল। কখনো ইলশেগুঁড়ি কখনো ঝমঝম বৃষ্টি । কেউ মিলেনিয়াম পার্ক, কেউ কয়লাঘাটা, কেউ আবার বাবুঘাট থেকে এসে সোজা জমায়েত হল ঐ জেটির কাছে।  স্টীমারে উঠে পড়লাম আমরা। স্টিমারের নীচে ইলিশমাছ ভাজার গন্ধে ম ম করছিল আশপাশ। আমরা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম। শুরু হল ঘাট পরিক্রমা আর সাথে লোকগান, বর্ষার কাজরী গান, বাউলগান ।  চোখ রাখতে থাকলাম গঙ্গার দুপাশের ঘাটে। কোনোটি ভগ্নপ্রায়, কোনোটি নিয়মিত সংস্কারের ফলে সেজেগুজে, বর্ষার জল পেয়ে ঝকঝকে ।  কোনোটি আবার ভেঙেচুরে   নিশ্চিহ্ন। মনে হল  বর্ষা, বৃষ্টি, ইলিশমাছ আর গঙ্গা এই অনুষঙ্গগুলি বাঙালীর প্রাণের। কিন্তু সেই গঙ্গার ঘাট আর সেই ইলিশের স্বাদ আজ আর অবশিষ্ট নেই  । সেটাই বড় কষ্টের। ছোট ছোট মাছগুলিকে ধরে ফেলার নিষেধাজ্ঞা কেউ মানছেনা। গঙ্গার ঘাটগুলিরও সংস্কার প্রয়োজন। নদীর নাব্যতা নিয়েও সংশয় রয়েছে।  তবে কি ইলিশও অবলুপ্তির পথে?  এই দোলাচলে বাড়ি ফিরে শান্তি পাইনি। তারপর বছর তিনেক কেটে গেছে। গঙ্গা ও ইলিশ দুইকে বাঁচা তে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ দেখলাম কি আমরা? গঙ্গাই তো সুস্বাদু ইলিশের ঘরবাড়ি। গঙ্গার জলেই তার সঙ্গীর সাথে প্রতিনিয়ত মৈথুন, জীবনযাপন ও সহমরণ । তবুও বাঙালীর কোনো হেলদোল নেই।  


অবসর ( তথ্য ও বিনোদনের ওয়েবসাইট )

২০ ডিসে, ২০১৬

শীতকালীন জার্নাল



পিকনিক-১








তুণীর বাসে উঠেই চটপট সকলের মাথা গুণে নিয়ে বলল মোট বত্রিশ জন আমরা। গুণ গুণ করে উঠল নিজের মনে ...একদিন দল বেঁধে কজনে মিলে... এবার  দেখি তো তোরা ক'জন জানিস "পিকনিক" শব্দের অর্থটা।
অঙ্কিতা বেশ সচকিত হয়ে জবাব দিল, চড়ুইভাতি।
বিপাশা বাসের কোণা থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠল বনভোজন।
তুণীর বলল ওটা তো প্রতিশব্দ বাংলায়। পিকনিক শব্দটার উত্সটা জানিস কেউ?
তিতলি বলল, জানতাম একটা ফ্রেঞ্চ শব্দ।
তুণীর অমনি বলল, স্পেলিং বল দিকিনি । 
তিতলি সপ্রতিভ হয়ে জবাব দিল, picque-nique। 
এবার মানে বল দেখি। তুণীর বলল।
তিতলি আমতা আমতা করে বলল, ফার্স্ট পার্ট picque মানে pick আর সেকেন্ড পার্ট nique মানে ? 

তিতলি বলল, ঐ আর কি, টুকটাক তুলে নিয়ে মুখে পুরে দাও যেখানে, তার নাম‌ই পিকনিক। 
অঙ্কিতা আর বিপাশা বলল, তোরা কত কিছু জানিস রে!
অতএব খাওয়াটাই পিকনিকে প্রধান। আরেকটা হল বাড়ির বাইরে। সেটা রান্না করেই নিয়ে যাও সকলে মানে যাকে বলে পটলাক অথবা গিয়ে রান্না করে খাও, আক্ষরিক অর্থে বনভোজন যাকে বলে। তুণীর বলল।   
আগে ছিল নিজেরাই হাত পুড়িয়ে খাওয়া। কি ভাগ্যিস এখন কেটারার সঙ্গে যায়! তিতলি বলে ওঠে। একদিন আউটিং এ যাও, আবার রান্নার যোগাড় দাও। এখন টোটাল ব্লিস বস্‌! 
তবে যাই বল বাপু, কাঠকুটো জ্বেলে মাংসের ঝোল আর ভাত রান্না করবার মজাটাই ছিল অন্য রকমের। অঙ্কিতা বলল। 
বিদিশা বলল, একটা ছুটির দিন শনিবার, আবার পিকনিকের জোগাড়? রক্ষে করো বাপু!

সেদিন ছিল সোনা রোদ গলে পড়া এক শীতভোর। সেদিন ছিল নদীর জলের ঠান্ডা ভোর। কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে পোষের পিঠে চড়ে রোদ এসে নেমেছিল গড়চুমুকে। হাওড়ার মৃগদাব গড়চুমুকে। তূণীর এন্ড কোম্পানির চড়ুইভাতির সকাল তখন বনভোজনের দেশে পাড়ি দিয়েছিল । সাদাসাদা ফুলকো লুচি আর নতুন আলুর সাদা চচ্চড়ির গন্ধে মাত গড়চুমুকের নদীর ধার। সেক্টর ফাইভের একদল টেকি  গিয়ে হাজির হল নদীর ধারে । শীতের সব অনুষঙ্গ যেমন নলেনগুড়, কমলালেবু, মটরশুঁটি, লেপ-বালাপোষ, পশমিনা-পুলওভার নিমেষে উধাও চড়ুইভাতির আনন্দে। হফতা ভর কাজের চাপে শীত ফুরায়। ভাবতে ভাবতেই দোল ফুরোয় । অমৃত কমলার মিঠে রোদ, উলকাঁটার দুপুর গড়িয়ে যদি চৈত্র এসে যায়? তার আগেই চল প্ল্যান করি, তূণীর হল অফিসের পিকনিক প্ল্যানার।
এখন শুধুই শান্তি জলের ধার। শুধুই শান্তি নীল আকাশ। নীল আকাশ গিয়ে চুমু খেয়ে নিল দামোদরের পাড়কে। নদের জল উছলে উঠল ছলাত করে। সকলে একটু ছুঁয়ে নিল নদের পাড়ের ক্যাসুরিনার নুয়ে পড়া সবুজ পাতা ভরা ডালকে। ডিজিটাল ক্লিকে মুখর হল আশপাশ। এখানেও সেই পোষমাস। যা এসেছিল  আমাদের শহরেও। এখানেও সেই শীত ছিল যা ছিল আমাদেরো। এখানেও পারদ নামে প্রতিবারের মত। শীত আসে, শীত যায়। চড়ুইভাতি ফুরিয়ে যায়। সকলেই  পরিযায়ীর মত ঘরে ফিরে যায় । শীতঘুমিয়ে ফুরিয়ে যায় শীত।
ভাগীরথী ও দামোদর মিশেছে হাওড়া জেলার গড়চুমুকে। ৫৮ গেট বলে জল ধরে রাখার ও ছাড়ার বিশাল স্লুইসগেট। ডিয়ারপার্ক। জমপেশ উদরপূর্তি, গানের লড়াই, কুইজ,খেলা । সবমিলিয়ে শীতের অমৃত কমলার দুপুর জমজমাট!

পিকনিক-২ 



"আপ্‌কো কিতনা বার বোলা থা, জলদি আনেকে কে লিয়ে? হমলোগ ব্রেকফাস্ট খায়েঙ্গে ন'বাজে। যাইহোক অব স্টার্ট তো কি জিয়ে।" গাড়ী ভর্তি লোকজন বন্দনাদির হিন্দি শুনে হাসিতে ফেটে পড়ল।   সাড়ে আটটায় ছাড়ল টাটা উইঙ্গার। সদলবলে ব্যান্ড মাষ্টার চললেন পাঠচক্রের সদস্যাদের নিয়ে। সিনিয়ার সিটিজেনরা সবেতেই বিরক্ত, অধৈর্য বুঝি! মনে মনে ভাবলেও পরক্ষণে গাড়ি ছাড়তেই তাদের মুখে স্বর্গসুখ যেন।

সাদার্ণ এভিনিউ আসতেই গাড়ি বাঁদিকে ঘুরছে। কেন? কেন আবার? ডানদিকে ফলতা যদিও কিন্তু ডায়মন্ডহারবার দিয়ে গেলে "গঙ্গাসাগর মে হমারা গাড়ি পাকড় লেগা" মতলব? বারুইপুর, আমতলা ঘুমকে জানা হ্যায়। তার মানে? কড়াইশুঁটির কচুরী-কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা দিয়ে আলুর তরকারী, চা, নলেনগুড়ের সন্দেশ ভোগে? পেছনের সিট থেকে প্রবাসী শুভশ্রীদির হুঙ্কার শিট্‌! আমার বাঁদিক থেকে মনীষামাসীর অনুযোগ...আপনার তো বোলনা চাহিয়ে থা! ডান দিক থেকে বন্দনাদি তখন তারস্বরে গেয়ে চলেছে..." আমার পরাণো যাহা চায়....তুমি তাই...." অমিতামাসী বলে উঠল, তুই চুপ্‌ করবি বন্দনা? আমার মাইগ্রেন শুরু হয়ে গেল। বাড়ি থেকে শুধু এককাপ চা খেয়ে বেরিয়েছি আমি" আবার শুভশ্রীদি রোদচশমাটা মাথার ওপরে তুলে বলে উঠল, ডিসগাস্টিং! দিস ইস কলকাতা! ব্যান্ড মাষ্টার তখন ড্রাইভারের সাথে বলে চলেছে একনাগাড়ে... এডভান্স লেনে কা টাইম মে ইয়ে মালুম নেহি থা? বলতে না বলতেই হুশ্‌ করে গাড়ি এসে পড়ল। ড্রাইভার বলে কিনা উতর যাইয়ে! হমারা গাড়ি নেহি হ্যায়! মালিকনে বাতা দিয়া....ব্লা, ব্লা, ব্লা....তখন উনি মানে আমার হিরোটি বলে উঠলেন

" অগর হমলোগ উতর জায়েঙ্গে তো আপ জিন্দা নেহি ঘর পৌঁছেঙ্গে....." উরিব্বাস! একদম অক্ষয়কুমার মার্কা ডায়লগ! পেছন থেকে মিসেস বালসারা তো ভয়ে, কুঁকড়ে অস্থির।
তাদের আরেকটি প্রাইভেট কার তখন ফোন করে বলেই চলেছে, এই শোনো,  আমরা না ডায়মন্ডহারবারের পথ দিয়েই চললাম...কচুরিটা না ফাটাফাটি খেলাম।

এক মাসীমা সেই শুনে বলে উঠলেন, তো? আমরা যাবার আগেই কচুরি খেয়ে নিলি?
 ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের আদরের পিকনিক স্পট ফলতা এসে পড়ল।

ফলতা আসতেই আরেক মাসীমা  বলে উঠলেন, "ইতনা সংকীর্ণ গলি মে কিঁউ ঘুসা?"
আর বাকীরা হেসে কুটি আর পাটি।

এই করতে করতে অবশেষে ফলতা পৌঁছে ওনাদের যেন মনে হল বিশ্বজয় করেচেন । কে যেন গাড়িতে বলছিলেন তাঁর অম্বল হয়েছে। কার যেন গ্যাসের ব্যাথাটা বাড়ছিল। কেউ একজন মাইগ্রেনে কষ্ট পাচ্ছিলেন। আর ব্যান্ড মাষ্টারের  টেনশনযুক্ত এহেন মনের অবস্থা, পেটের ভিতর ছুঁচোবাবুর ডন-বৈঠক দেওয়া....সবকিছুর আগুণে জল পড়ল। গঙ্গার ধারে টেবিল পাতা লোকনাথ রেসর্টে কি ভালোই আয়োজন করেছিল তাদের কলকাতার ঠাকুর(ওরফে কেটারার)..টোপা টোপা, পুর ঠাসা, বটলগ্রীন রংয়ের কড়াইশুঁটির কচুরী পেয়ে মুখে সব কুলুপ এঁটে বসে গেল চুপচাপ। ঝগড়া তখন মাথায়। গাড়ির কাজিয়া রণে ভঙ্গ দিয়েছে ততক্ষণে। তাপ্পর ছোট ছোট জগদীশবাবুর বাড়ি দেখতে।
আঃ মলো যাঃ! বোস ইন্সটিট্যুটের সরকারমশাইরা তাদের ঢুকতে পর্যন্ত দিলনি! বজ্র  আঁটুনি সেথায়।
আমরা এতোই অছ্যুত! শুভশ্রী দি তো বলেই বসলেন।
তা বাপু তোরা সব তোদের মত সব গেম খেলার ব্যবস্থা কর দিকিনি। সিনিয়ার একজন বললেন। হাই টেম্পো তাঁর।
তারপর বন্দনার ফোনে লাইভ কমেন্টারি...
 সিনিয়র সিটিজেন মাসীমাদের স্মৃতিতে শান দি‌ইয়েচি বাপু...মেমারি গেম খেলিয়েচি, ক্যুইজ হল, ডাম্ব-শারড, হাউজি, ছোট্ট ক্লু থেকে  ৫ মিনিটে পাঁচ লাইনে অণুগল্প, সব করিচি। খেলতে খেলতে সেকেন্ড রাউন্ড চা আর পকোড়া এল। মাসীমাদের কি খুশি! তাপ্পর হেব্বি লাঞ্চ করিচি...মেইন কোর্সে দ‌ইমাছে আখাম্বা কাতলা ছিল আর চিকেন চাঁপ। ও হ্যাঁ, মধুরেণ সমাপয়েত আমসত্ত্ব-আলুবখরার চাটনী আর নলেন গুড়ের রসোগোল্লা!
জেরিয়াট্রিক এই মহানগরে এই মানুষগুলি ব্যান্ডামাস্টারের বড্ড ওয়েল উইশার। এরা বছরের এই একটি দিন বসে থাকেন তার  মুখ চেয়ে। কবে সে একটু নিয়ে যাব এদের পিকনিকে!

পিকনিক-৩


 

এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার রায়পুর। গঙ্গার ধার, মাঘের শীত বাঙালীর তসরে, পুলওভারে, টুপিতে, পশমিনা চাদরে। কনকনে হাওয়া, মিঠে রোদে ভেসে যাওয়া সকালে বনভোজন। কলেজের প্রফ দের বার্ষিক পিকনিক  ! কেউ লেট করতে করতে অবশেষে আরও কিছুকে তুলে নেয়  লাস্ট  গাড়িতে। তারপর চারটে গাড়ির কনভয় অবশেষে নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছয় । ফুলকো ফুলকো লুচি আর কড়াইশুঁটি দেওয়া সাদা আলুচচ্চড়ি।
" সারাবছর আমরা এইদিনটার জন্য মুখিয়ে থাকি স্যার"  ডাব কেটে দিতে দিতে অফিস বেয়ারা বলে ওঠে।  তারপরেই ডাবের জল আর ভদকা কিম্বা পাতি বিয়ার।সঙ্গে শীতসব্জীর পকোড়া, চিকেন পকোড়া আর রুইমাছ ভাজা। নদীর ধার দিয়ে ডিঙিনৌকায় চলে মাছওয়ালা....
" কি মাছ আছে?”  উত্তর এল খোকা ইলিশ।
" খেলবনা " 
" কেন ম্যাডাম?”
" ধরেছো কেন?”
" কি খাব? আপনারা কিনলে একটু রোজগার হয়, ভালো দাম পাব, এই দেখুন, একদম লড়ছে, ডিম হয়নি।কুমারী ইলিশ। আজ যেকটা ধরেছি সব আপনাদের দি‌ই তবে?”
বললাম, " কথা দিতে হবে, আর ধরবেনা।"

" এই শীতকালেই তো পিকনিক পার্টির রমরমা, তারপরেই হাতখালি। কিছুই নেই বাংলায়। ছেলেপুলেদের পড়াশুনো করিয়েও লাভ নেই । চাকরী কই? অগত্যা মাছ ধরেই বেচি। তারপর অসুখবিসুখ, নৌকো মেরামতি, ঘরের খড়, জমির ধান, মেয়ের বিয়ে...কোথায় যাই? মাগঙ্গার সাথেই ওঠবোস, গঙ্গার কাছেই সারাদিন মিনতি জানাই, শরীল থাকতি নিয়ে নাও মা "

মাছ ছিল সর্বসাকুল্যে এককেজি দুশো গ্রাম। তাই স‌ই। কেটেকুটে খাবি খাওয়া মাছভাজা সকলেই খেল চেটেপুটে। মন মানলোনা। কামড় দিয়েই মনে হল হায়রে দারিদ্র্য! কোথায় মাগঙ্গা! কোথায় সেই ছোটবেলা? এককিলোর কম ইলিশ আমরা চোখেই দেখিনি। জেলেটির কথাগুলো‌ও তো ফেলতে পারিনা। খোকা ইলিশ ধরা বন্ধ করা হল কিন্তু এই জেলেটির সেদিনের ভাত কে জোটাবে? তবুও তো পেল পাঁচশোটা টাকা। এরপরেই সবশুদ্ধু নৌকাবিহার। ম্যাডামদের হাতে ডাবেরজল মিশ্রিত ভদকার গ্লাস, স্যারেদের হাতে বিয়ার আর পেপার ন্যাপকিনে মোড়া গরম ভেজ পকোড়া আর মাছভাজা.....কত গান,কত কবিতা আর  কত ফূর্তি ! ভেসে গেলাম গঙ্গাবক্ষে নৌকায় টানা একটা ঘন্টা । কনকনে উত্তুরে হাওয়ায় আমাদের শাল-দোশালা, জ্যাকেট, সোয়েটার টুপি, মাফলার আরো কতকিছু শীত অনুষঙ্গে মাঘী শীত জমে দৈ!
যথাসময়ে গরম ভাত আর মাটনকারিতে ভরাপেটে আবার ভরা মানে তেলা মাথায় তেল বা Carrying Coal to New Castle । তারপরেই জয় মা বলে গঙ্গার ধারে ভাসাও থার্মোকলের থালার তরী! পরপর গঙ্গার ধারে পিকনিক স্পট। পিকনিক স্পটের মালিক পয়সা নিয়েছে। রসিদ দিয়েছে। কিন্তু কোনো ট্র্যাশ ফেলার জায়গা নেই।
মাননীয় সরকারী অফিসাররা, আপনারা কি নৌকাবিহারে যান? তবে দেখে আসুন গঙ্গার ধারের আবর্জনাগুলো। এখনো কত জাহাজ চলে এই গঙ্গায়। এখনো কত জল, কত সুন্দর তার রূপলালিত্য! আজও  ডিজিটাল ক্লিকে মুখর হয়  নৌকাবিহার, গঙ্গার বিস্তীর্ণ দুপার, রঙ্গীন জাহাজ।, পালতোলা নৌকা।

পিকনিক-৪

 

এবার কাকভোরে বেরিয়ে হাজার ঘড়ি গ্রামের কুমোরপাড়ায়। বাড়ীর কাজের মেয়ের পিকনিকের নেমন্তন্ন বলে কথা! দক্ষিণবাংলার নদীমাতৃক অঞ্চল। আরো কিছুটা এগুলেই সমুদ্রের নোনা জল আর বালিয়াড়ি দেখা যাবে । গ্রামবাংলা অনেকটাই শহুরে হয়েছে নগরায়নের দৌলতে। অরণ্যমেধ যজ্ঞের সামিল হয়ে । কিন্তু গ্রামবাংলার মানুষের সেই দারিদ্র, সেই অতিবৃষ্টির জন্য বানভাসি ঘর দুয়ার অথবা খরায় বৃষ্টির হাহাকারে ধান লাগাতে না পারার কষ্ট রয়েই গেল । যারা পারল তার মধ্যে থেকেই পালিয়ে গেল চেন্নাই অথবা হায়দ্রাবাদে কিম্বা ব্যাঙ্গালোরে, যা হোক একটা চাকরী নিয়ে আর যারা নিতান্ত‌ই সাদাসিধে, অল্পে সন্তুষ্ট তারা পড়েই থাকল বদ্বীপের ফাঁকে অধঃক্ষিপ্ত নাগরিক হয়ে । পঞ্চায়েত আপিসে হানা দিল। পার্টি আপিসে দৌড়ালো অথবা ভোটও দিল কথামত ঠিক সময়ে, সঠিক চিহ্নে । তবুও তাদের উত্তরণ হলনা । তারপর চল বৌদি, মন্দিরে। একাদশ শতাব্দীতে তৈরী অতি প্রাচীন একটি মন্দির দেখতে যাওয়া  ।
 মন্দিরের নাম জটার দেউল । স্বয়ংভূ শিব মন্দির । আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার দেখভালে  মন্দির ও তার আশপাশ বেশ সংরক্ষিত তবে তৃতীয় বিশ্বের চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিকরা যথারীতি পর্যাপ্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক পূর্ণ করে ফেলেছে ঐ সুন্দর এবং নিরিবিলি স্থানটিকে । ঐ একটি কাজে আমরা খুব পটু। তা হল নিয়ম ভাঙা । সেখানে গার্বেজ ফেলার ব্যাবস্থা করে রেখেছে এ এস আই তবুও সংবরণ করা যায়না যত্রতত্র জঞ্জাল ফেলার অভ্যাসকে ।  মন্দিরের গায়ে পোড়া ইঁটের ওপর নিখুঁত স্থাপত্য ।  অনেকটাই সময়ের ভারে নষ্ট হয়ে গেছে । অভ্যন্তরে গর্ভগৃহের মধ্যে তাকালে দেখা যায় কত উঁচুতে দেওয়ালের গায়ে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানোর ব্যাবস্থা ।
ঐ গ্রামের বৌটি আমাদের জন্য লুচি আর আলুর দম বানিয়ে হাজির হয়েছিল রায়দীঘিতে । তারপর গরম চা । সেখান থেকে আমরা গেলাম সেই গ্রামের আতিথেয়তার স্বীকার হতে । পূর্ব পরিকল্পিত চড়ুইভাতি বা প্রকৃত অর্থে বনভোজনের মেজাজ নিয়ে । ধানজমির সরু আলের মধ্যে দিয়ে ডাইনে পান্নাপুকুরের সবুজ জলে ভাসমান গোলাপী শালুক আর বাঁয়ে গোলা ভরা ধান চলল সাথে ।  কোথাও হলুদ সর্ষে ক্ষেত কোথাও আলু, একফালি সবুজ কচি ধানগাছের পিছনে সয়াবিনের ক্ষেত অথবা ফুলকপি ।
বড় সুন্দর এই অনুভূতি। শহর থেকে গিয়ে শুধু সবুজে চোখ জুড়োনো যে কি ভালো লাগে! বারবার এই  মাটির রূপ দেখতে ইচ্ছে করে । দীঘিভরা জল করে টলমল।শীতকালে খেজুরগাছে হাঁড়িবাঁধার ধুম । আর স্নানের অছিলায় গ্রাম্য বধূর পুকুর সাঁতরে গামছা দিয়ে চিংড়ি-কাঁকড়া নিয়ে ভিজে কাপড়ে ঘরে ফেরা । 

এখনকার প্রজন্মের কাছে শীত-পিকনিক মানেই কেটারিংয়ে কব্জি ডোবানো, দুটো সাউন্ডবক্স থেকে জোরদার গানের সাথে উদ্দাম নৃত্য আর ইবিজা, কান্ট্রিক্লাব বা বেদিক ভিলেজের মত বিলাসবহুল আপ্যায়নে অবগাহন। এর থেকে অব্যাহতি পেতে গতকাল আমরা বনভোজনে গেলাম দক্ষিণবঙ্গের রায়দিঘীর কাছেই এক গ্রামে ।পালবংশের আমলে তৈরী অতি প্রাচীন মন্দির "জটার দেউল" দেখা একটি বিশেষ পাওয়া ।
খাড়ির জল যত্রতত্র খেলে বেড়ায় সেগ্রামে ।   মাটীর নীচে কাঁকড়ার বাসা যেখানে আর ধানক্ষেতের আলের ওপর দিয়ে দিয়ে হেঁটে আসা যায় সেখানে । কুড়োনো যায় নোনাবালির মধ্যে থেকে ঝিনুক আর শামুকের খোলা । সুন্দরী আর গরাণ গাছও আছে কিছু । কচি কচি টোপা কুল ধরেছে গাছে । কচি নারকেল পাড়িয়ে তেষ্টা মেটানো।খেজুর গাছে হাঁড়ি এখনো বাঁধেনি তারা । ঠান্ডা নেই । কুয়াশা নেই তাই । বড় বড় কাঁকড়া ধরানো হল গর্তর মধ্যে থেকে । দাম পেয়ে গ্রামের মানুষ ও বেজায় খুশী । আমাদের পিকনিকের  গরম ভাত মাটির উনুনে ফুটতে লাগল । আমরা পৌঁছতেই মাটির ঘরের দালানে রেডি দুপুরের আহার ।গরম ভাত, ডালের সাথে নদী থেকে সদ্য ধরা চুনোমাছ ভাজা, ক্ষেতের টাটকা শাকসব্জীর চচ্চড়ি, দিশী মুরগীর ঝোল আর টমেটোর চাটনী ।

তেলা মাথায় তেল না দিয়ে তোমরাও ভেবে দেখতে পারো গ্রামের মানুষদের সাথে কি করে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মাটির গন্ধ নিয়ে পিকনিক করে আসা যায় । প্রকৃত অর্থে চড়ুইভাতির মজা পাবে। মাটির উনুনে রান্নাবান্না আর টিউকলের জলে আঁচানো সব মিলিয়ে আমি ও আমার সর্বক্ষণের ওঠাবসার সাথীরা বেজায় খুশি । আর অতিথি আপ্যায়নে গ্রামের মানুষের কোনো খামতি নেই । ফেরার পথে তাদেরি বাড়ির একজন প্রত্যেকের হাতে একঠোঙা করে মুড়ি, আলুর চপ আর বেগুনী দিয়ে দিল গরম গরম । তারপর গাছের কলাটা, মুলোটাও। ওরাও খুশি একটু বিক্রিবাটরায়  আর আমরাও খুশী তরতাজা প্রাকৃতিক বনভোজন সেরে ।

পিকনিক-৫





জায়গাটা কলকাতার খুব কাছেই। নাম "বনের হাট'। আর এটা বারুইপুরে একটি ছোট ঘরোয়া বনভোজনের স্পট।সবুজ গাছগাছালি ঘেরা, একটুকরো জলের ঠাণ্ডা ধার, তক্তপোশে শীতলপাটি বিছানো একটা ছোট্ট বিশ্রামের কুঁড়ে, রান্নাবাটির জন্য টালির শেড, বাথরুম সব আছে তবে নেই ইলেকট্রিক। তাতে অবিশ্যি অসুবিধেও নেই। দিনে দিনেই ফিরে এসেছি আমরা।
কলকাতা থেকে  সোজা বাইপাস দিয়ে বারুইপুর স্টেশন। তারপর ফ্লাইওভার পেরিয়ে ওপারে গিয়ে নেমে সোজা যে রাস্তা ক্যানিং এর দিকে গেছে সেটা ধরা। পেরুবে ফুলতলা, রামনগর হাইস্কুল তারপরেই রাস্তার ওপরেই ডানদিকে পড়বে ঝাঁ চকচকে রেসর্ট যার নাম বনের হাট। যাবার রাস্তা খুব ভাল (টাচ্‌ উড্‌) । ভোরবেলা গড়িয়াহাট থেকে সময় লাগল মাত্র ৫০-৫৫ মিনিট। বেলা বাড়লে বাজারের ভীড় পড়ে তাই বেশী সময় লাগে। এহেন বনভোজন @ বনের হাট ছিল গতকাল  অর্থাত অঘ্রাণের অলস ছুটির দিনে।  শীত পড়তে না পড়তেই বাঙালীর কফি আর স্যুপ প্রেম যেমন উথলে ওঠে তেমনি আর কি পিকনিক প্রেমেও ভেসে যায় অমৃত কমলার ভোর। সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে দুপুরের চাইনিজ লাঞ্চ সব কিছুই হল ঠিকঠাক। আবারো কেউ ভুললেন হাঁফের টান, কেউ আরথাইটিস, কেউ বা COPDর কষ্ট, কেউ ডিপ্রেশান, কেউ আবার পিকনিকের এক্সাইটমেন্টে রাতের ঘুমটুকুনিও।

আমার কাছে বৈচিত্র্যময় রূপসী বাংলার শীতের উইকএন্ড মানেই বেরিয়ে পড়বার সুখ। বেরিয়ে পড়া মানেই সদলবলে কাছেপিঠে পিকনিকের আনন্দ। বেরিয়ে পড়া মানেই অফুরান হৈ চৈ তে সামিল হয়ে ওঠা। যে ঐশ্বর্য্য এখনো অধরা  তার দিকে দু চোখ মেলে দেওয়া। আর তারিয়ে তারিয়ে আমার বাংলার রূপলাবণ্য উপভোগ করা।  

গ্রীষ্মে যাই উত্তরবাংলায় হিমালয়ের কোলে দুটিপাতা-একটি কুঁড়ির স্বর্গরাজ্যে তো শীতের রোদের গনগনে আঁচে ছুটে যাই সাগরের দিকে । কোনোবার বসন্তের পিকনিকের ভোরে ছুটে গেছি দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে লালমাটির দেশে কিম্বা বাসন্তী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা ইছামতীর ধারে বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টাকীতে। অথবা বসন্তের পাহাড়ে পলাশের আগুণ লাগা মুকুটমণিপুর কিম্বা শঙ্করপুরের সমুদ্রসৈকতে । 
রূপসীবাংলার বুকে পিকনিকের গল্প এক বৈচিত্র্যময় রূপকথার মত। এ গল্প ফুরোয়না। কালেকালে আরো যেন রূপবতী হয় আমার বাংলা। থৈ থৈ তার রূপ লাবণ্য নিয়ে। মানুষ পিকনিকে আসে, পিকনিকে যায় প্রতি বছর। একটু জিরেন আধটু নিরালার খোঁজে।   
প্রতিবার বাংলার সবুজে বনভোজনের মজা পাই আর ফেরার সময় তাকে বলি...
তোমার সবুজে সবুজ আর নীলিমায় নীল দিগন্তে আমি মোহিত আবারো । আক্ষেপ কেবল একটাই.. শুধু চাই ভালো ও চওড়া রাস্তা যাতে শহর থেকে গ্রামের মানুষগুলো সহজেই আসা-যাওয়া করতে পারে আর চাই একটু শিল্প । গ্রামবাংলার যা আছে তা অনেকের কাছে ঈর্ষার । শুধু চাই দক্ষ পরিচালনা  আর পরিকাঠামো । চাষের জমি থাকুক । পাশাপাশি ফ্যাক্টরি  হোক দু-চারটে ।  ঐ মানুষগুলোর কর্মসংস্থান হোক  ! শুধু চাষ করে আর মাছ কাঁকড়া ধরে ওদের বালবাচ্চাগুলোর দুবেলা পেটটা হয়ত ভরে কিন্তু কুঁজোরও তো চিত হয়ে শুতে ইচ্ছে হয় !

Truly your's হয়েই থাকলাম পশ্চিমবাংলা।

কলকাতা ২৪x৭ রোববার

অঘ্রাণের সুঘ্রাণে


হেমন্তে কোন্‌ বসন্তেরই বাণী শুনছ কি? অমি কিন্তু শুনছি দিব্যি।  ভোরের গোলাপী কুয়াশায় আর সন্ধ্যের হিমঝরা নেশায় আমি শুনতে পাচ্ছি অঘ্রাণের পদধ্বনি।  আমার অঘ্রাণের অনুভূতিমালা কখনো বেশ মায়ামাখানো কখনো আবার করুণ। ঠিক যেন তার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার মত।  তাই তার পাতাঝরার টুপটাপ শব্দ পেলেই  সদা ভয় হয়, তারে হারাই হারাই । এখন  ঠান্ডা তো আর পড়েইনা আর এসেই যাই যাই করে। শীতফুলগুলো চোখ মেলে চাইতে না চাইতেই শীত ফুড়ুত। রবীন্দ্রসরোবরের বিদেশী পাখীগুলোর মত শীতও এখন পরিযায়ী আমাদের শহরে। তাইতো তাকে হারিয়ে ফেলি চকিতে। আর যেটুকুনি পাই সেটুকুনি চেটেপুটে নি আহ্লাদে। এ আমাদের সোনার গৌর। একবার চলে গেলে আর তো পাবনা। তাই অঘ্রাণে রাজ্যের বাইরে নৈব নৈব চ। বরং চোখ ফেলে যেটুকুনি দেখা বাকী সেটুকুনি চেঁচেপুঁছে নিয়ে নি। 
ওরে ওরে! কলকাতার এত কাছেই সাগরদ্বীপ, বকখালি। যাবি নাকি সুন্দরবন কিম্বা শান্তিনিকেতন? কিম্বা চল বাংলাদেশের সীমানা অবধি, বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টাকীতে? আহা! ইছামতীর কি রূপ! নৌকাবিলাসে কি আনন্দ! আর তার টাটকা তাজা মাছের ব্যাঞ্জন? ছেড়ে আসতে মন চায়না। তবুও ফিরে আসতে হয় নিজের ডেরায় । টাকী থেকে আসার পথে পাটালী কেনা হয়েছে বলে কথা! এ পাটালী নাকি বিখ্যাত।  মাঘ পড়লেই পিঠেপুলির রসনায় মত্ত হওয়া আমবাঙালীর অবশ্য কর্তব্য। অঘ্রাণে খেঁজুরগাছ ছুলে দিয়ে মাটীর হাঁড়ি বেঁধে দেয় গ্রামের মানুষ। তারপরেই খেজুরগুড়, পাটালী, তক্তি, মোয়ার গন্ধে পাগল আমরা। 
অতএব অঘ্রাণ জমে কুলফিমালাই । এ আমার দেশের বিদেশ যেন। কে বলে মকরসংক্রান্তিতেই যেতে হবে সাগরে? কে বলে পৌষমেলার ভীড়েই পৌঁছতে হবে শান্তিনিকেতনে? শীতের আমেজ পাবি, বেড়ানোর আনন্দে যাবি। টেষ্টবাডগুলো লকলক করে বলে ওঠে, তাজা মাছ, কাঁকড়া খাবি সুন্দরবনের? তবে রাতারাতি প্ল্যান। চলো লেটস গো!
যদি ভেসে যায় আদরের শীত? 


এই তো কেমন দিন ছোট তার, রাতটা বড়োই বড়।
তবে কি এবার শীত পড়ল, না কি লোকদেখানোয় দড়ো?

শীতের কলকাতার জন্য সারাটা বছর ধরে ঠিক যেন হাপিত্যেশ করে বসে থাকা আমাদের।
কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে আমাদের ঘুম ভাঙে কোলকাতায় । আমি কান পেতে র‌ই । উশখুশ প্রাণ । খবরের কাগজ ছিনিয়ে শীতের কলকাতার কোথায় কি! আজ নন্দনে ছায়াছবি উৎসব তো কাল আইসিসিআর এ চিত্র প্রদর্শনী । একাডেমিতে নাটক কিম্বা মিলনমেলায় টেরাকোটা-ডোকরার সার্বজনীন আবেদনে । মেলায় মেলায় ছয়লাপ মহানগর! খবরের কাগজ হাতে তুললেই শয়ে শয়ে পিকনিক স্পট । এখন আর কেউ চড়ুইভাতি বলেনা । এখন গিয়ে মেয়েদের মাঠেঘাটে রান্নাবান্না করতে হয়না । জমিয়ে কেটারিং হয় পিকনিকে । শুধু চাই একফালি সোনালী রোদের সকাল, নীল আকাশ আর একচিলতে সবুজ খোলা মাঠ ।  অঘ্রাণে লংড্রাইভ জমে আইসক্রিম আবারো । অমৃত কমলার সকাল ।
পাড়ায় পাড়ায় ব্যাডমিনটন । শুরু এই আঘ্রাণেই  । আবার কখনো রাস্তা ব্লক করে বারোয়ারি ক্রিকেট ।
ছোটবেলায় দক্ষিণের বারান্দায় মায়ের পিঠের  ভেজা চুল রোদের দিকে মেলা আর সামনে দুহাতে উল কাঁটা ? শীতের এই মিঠে রোদ পিঠে নিয়ে কমলালেবুর দুপুরগুলো ছিল বেশ টেনশনের  । কারণ  স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার দিনগুলো, ক্লাসে ওঠাউঠির ক্ষণও ঠিক এই সময়েই । শীতের ভালো ও মন্দ, সার্কাস-মেলা কিম্বা চিড়িয়াখানা-চড়ুইভাতি সব নির্ভর করছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের ওপর ।
অঘ্রাণে উত্তরের হাওয়া ব‌ইতে শুরু করলেই মনে হয় নজর না লাগে। আমাদের শহরের শীত বড়‌ই ক্ষণস্থায়ী। তার মধ্যেই কাশ্মীরি শালওয়ালাদের বাড়িবাড়ি ঘুরে বেড়ানো আর ওয়েলিংটনে গোলগাল ভুটিয়ামাসীদের উলের শীতপোষাক নিয়ে পসরা সাজানোর কথা মনে পড়ে যায়।  তবে এখন আমাদের তেমন একটা শীতপোষাকের চাহিদা নেই। হালকাপুলকা ট্রেন্ডি শীতবস্ত্র মিলে যায় হাতের কাছের শপিংমলে। তাই জমিয়ে আর কাশ্মিরী শাল, ফিরান অথবা জম্পেশ কার্ডিগান, পুলওভার কেনার সৌভাগ্য হয়না। আর দুটোমাস তো ব‌ই শীত। গরম কাপড়চোপড় আবার মথবল এর গন্ধে বাক্সবন্দী হয়ে যায়। তবে শীত যতটুকুনি‌ই থাকুক, শীতের রকমারী সব্জি, উচ্চ হজমশীলতা আর মেলা, পার্টি ইত্যাদির দৌরাত্ম্যে আমাদের গ্যাস্ট্রোনমিক ফূর্তি কিন্তু জমিয়ে চলতে থাকে।    
বাঙালীর শীতকাল মানেই একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। অঘ্রাণের নতুন চাল, মটরশুঁটি, মূলো, কমলালেবু আর খেজুরের গুড়ের পাটালী দিয়ে মা ঠাকুরঘরে "নতুন" দিতেন। দুধের মধ্যে সব নতুন জিনিস দিয়ে পাথরের বাটিতে ঠাকুরকে নিবেদন করা আর কি! আর পুজোর পর সেই প্রসাদের কি অপূর্ব স্বাদ! তখন মনে হত, 
আহা শীতকাল, থাক্‌না আমার ঘরে। বারেবারে ফিরে আসুক নবান্ন, ঠিক এমনি করে । 
অঘ্রাণের শুক্লপক্ষে "বড়িহাত" করতেন মা।  নতুন বিউলির ডাল ভিজিয়ে রেখে শীলে বেটে নিয়ে তার মধ্যে চালকুমড়ো কুরে দিয়ে, হিং, মৌরী সব মিশিয়ে  মা অঘ্রাণের রোদে পিঠ দিয়ে ভিজে এলো চুলে বড়ি দিতেন। একটি বড় কুলোর ওপরে পাতলা পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে সুচারু হস্তে এই বড়ি হাত অর্থাত বড়ি দেওয়ার রীতি অনেকেরি আছে। ঝোলে খাবার বড় বড়ি, ছোট্ট ছোট্ট ভাজাবড়ি এসব আজকাল স্মৃতি। আমরা দোকান থেকে কিনে খাই। আর ডালের সাথে পরিবেশিত হওয়া এই ভাজাবড়ির অন্যতম অঙ্গ ছিল কালোজিরে আর পোস্ত। কেনা বড়িতে পাইনা তেমন আর। এই বড়িহাতের দিন দুটি বড় বড়ি গড়ে তাদের বুড়ো বুড়ি করা হত। বুড়ি-বড়িটির মাথায় সিঁদুর আর দুজনের মাথাতেই ধানদুব্বো দিয়ে, পাঁচ এয়োস্ত্রীর হাতে পান, কপালে সিঁদুর ছুঁইয়ে, শাঁখ বাজিয়ে তাদের রোদে দেওয়া হত। একে বলে বড়ির বুড়োবুড়ির  বিয়ে দেওয়া।  


অঘ্রাণের প্রত্যেক রবিবারে মা-মেয়েরা মিলে করে ইতু ঠাকুরাণীর পুজো। ইতুপুজো হল মিত্র বা সূর্যের পুজো।
মাটি কিম্বা পেতলের সরায় মাটির ঘট পাতা হত। সরার মধ্যে মাটি ফেলে পঞ্চশস্য ছড়িয়ে দেওয়া হত। মন্ত্রবলে পুজো করে ঝি-বৌরা ইতুব্রতকথা পাঠ করত আর সেদিন নিরামিশ খেতে হত। সারাটা অঘ্রাণ মাস ধরে প্রত্যেক রবিবারে ইতুপুজো করে সংক্রান্তির দিনে ইতু ভাসানো হত গঙ্গায়। আর ততদিনে সেই সরার মধ্যে পঞ্চশস্যদানার অঙ্কুরোদগম হয়ে সেই মাটির সরা কি অপূর্ব এক সবুজ সজীবতা পেত । মায়ের সাথে
 আমিও বলতাম মায়ের সাথে সাথে...  
অষ্টচাল, অষ্টদূর্বা কলসপাত্রে থুয়ে
শোন সবে ইতুর কথা এক মন দিয়ে, 
ইতু দেন বর,
ধনধান্যে পুত্রপৌত্রে ভরে উঠুক ঘর। 
আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে ইতুদেবীর পুজো বোধহয় দুর্গাপুজোর নবপত্রিকার মত । কৃষির জন্য সূর্যদেবতার অবদান অনস্বীকার্য তাই বুঝি "ইদম্‌ অর্ঘ্যম্‌ নমো শ্রী সূর্যায় নমঃ" বলে অর্ঘ্য দেওয়া হয় ইতুর ঘটে।  সূর্যদেবতা এবং ইতুদেবী উভয়কেই তুষ্ট রাখা হয়।  
গ্রীষ্মের সময় যেমন মঙ্গলচন্ডীর ব্রত হয় অঘ্রাণে আমাদের আছে কুলুইমঙ্গলচন্ডীর ব্রত।
অঘ্রাণমাসের শুক্লাষষ্ঠীতে ব্রতকথা পড়ে জল খেতে হয় ।  অঘ্রাণ মাসের শুক্লপক্ষের মঙ্গলবারে কেন মেয়েরা কুলুই চন্ডীর ব্রত করে মা?
এমন প্রশ্ন জাগত ছোটবেলায় ।
মা শোনাতেন ব্রতকথা আর  বলতেন " বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর "
ইতুপুজোর উমনো-ঝুমনো কিম্বা মঙ্গলচন্ডীর আকুলি-সুকুলি সেই চিরাচরিত মেয়েদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে  আড়াল করে রাখার গল্প আবার মেয়েদের হাত ধরেই  কখনো ইতুদেবী কখনো মঙ্গলচন্ডীকে স্মরণ করে সে যাত্রায় উদ্ধার। 
প্রতিবছর অঘ্রাণের ভোরে যখন শীত দরজায় কড়া নাড়ে তখন মনে পড়ে এইসব। পাল্টায়না ব্রতকথার গল্পগুলো। শুধু পাল্টে যায় সমাজের চিত্রকল্পটা। বদলে যায় চরিত্রগুলো। ব্রতের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলে এ যুগেও  । সমাজে মেয়েগুলো আজো ব্রাত্য । শীতপোষাকে জানু-ভানু-কৃশাণু তারা শীতের হাত থেকে রক্ষে পাবে বলে। 
তবুও প্রকৃতির নির্ঘন্ট মেনে শীত আসে।  পালংশাকের ঘন সবুজে, কমলালেবুর ঘ্রাণের মধ্যে দিয়ে। বাঁধাকপির হালকা সবুজের পরতে পরতে শীত খুলতেই থাকে। রঙীন বাজার সরগরম হয় শীতসবজীর রামধনুতে।  
বাংলার মেয়েগুলো বাবা-ভাই-স্বামীর মঙ্গলের জন্য বছরের পর বছর ব্রতের উপবাসী হয়ে নতুন অঘ্রাণের ঠান্ডায় পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান করে পুজোর যোগাড় করে কিন্তু তাদের কথা কে মনে রাখে? যারা এই নতুন শীতকে ওয়েলকাম করতে পারেনা? তারাই বা কি করে এই অঘ্রাণে?  যে বা যারা পারল না এই অঘ্রাণের অনুভূতিগুলো ভাগ করে নিতে?  তাদের বাজারের থলি থেকেও উঁকি দেয় পিঁয়াজকলি কিম্বা হাতে ঝোলানো দিশী ফুলকপি। তাদেরো সাধ হয় একটা দুধের প্যাকেটে একটু সুজি ছড়িয়ে গুড় দিয়ে গরম পায়েস খাবার।  কারণ শীত তো বারেবারে আসেনা বছরে।  
এইসব অনুভূতিতে পার হয়ে যায় আমার অঘ্রহায়ণ । আমার শীতের সূচনা। শীত আসে, শীত যায়। আমাদের ঘুম ভাঙে কলকাতায়। 
সবশেষে আবার রবিঠাকুরের শরণাপন্ন হয়ে বলি, "অঘ্রাণ তবে ফাগুন রহিত ব্যেপে"। অতএব,  কিছুক্ষণ আরো নাহয় রহিতে কাছে। 


কলকাতা ২৪x ৭ "রোববার"

১ ডিসে, ২০১৬

ষোড়শী সই এর ষোলোকলা পূর্ণ

বনীতা দেব সেনের হাতে তৈরী "স‌ই" পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের সৃষ্টিশীল মেয়েদের একটি সংগঠন। "স‌ই" এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আজ থেকে ষোলো বছর আগে ২০০০ সালের ৩০ শে নভেম্বর। এই দিনটি নবনীতাদির মা কবি রাধারাণী দেবীর জন্মদিনও। "স‌ই" এর ষোলো বছর পূর্তিতে হৈ হৈ করে "স‌ই" এর ওয়েবসাইট www.soicreativewomen.org উদ্বোধন হয়ে গেল গতকাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা বিভাগের বিবেকানন্দ হলে। প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করলেন শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষ, ভারতী রায় এবং মানবীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ ঐশিকা চক্রবর্তী। স‌ই এর ওয়েবসাইট তৈরীর কৃতিত্ব Argentum Web Solutions এর মহাশ্বেতা রায়ের। কবি শঙ্খ ঘোষ মহাশ্বেতার সাহায্যে ওয়েবসাইট উদ্বোধন করলেন। স‌ই এর সভাপতি সাহিত্যিক নবনীতা দেব সেন উপস্থিত সকলকে ওয়েবসাইটের ব্যাপারে অবগত করলেন। লেখিকাদের স্বাধীন মত প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম এই ওয়েবসাইটে র‌ইল যার নাম "ব্লগবগম্‌"। 
"স‌ই" এর পূর্ব প্রকাশিত প্রিন্ট ম্যাগাজিন "স‌ই-সাবুদ" ও এবার ই-পত্রিকার আকারে দেখতে পাওয়া যাবে।  রাজ্যের গন্ডী পেরিয়ে দেশ এবং আন্তর্জাতিক স্তরের বহু স্বনামধন্য লেখিকারাও স‌ই এর সাথে যুক্ত আছেন।আন্তর্জাতিক স্তরে চমত্কার একটি ডেটাবেস তৈরী হল সই এর সব লেখিকাদের। এ যাবত স‌ই এর সমস্ত অনুষ্ঠান, কর্মকান্ড সবকিছুর ছবিও আর্কাইভ করে রাখা রয়েছে ওয়েবসাইটে। 



গতকাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যা বিভাগের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন স‌ই শর্মিষ্ঠা। স‌ই এর ভালবাসার মৌসুমী ভৌমিক এবং রঞ্জিনী-ইন্দ্রানী-সোহিনীর অভিনব সঙ্গীত পরিবেশনা এক অপূর্ব মাত্রা যোগ করল।  এরপর ছিল নবনীতাদির বাড়িতে স‌ইদের নৈশভোজের নিমন্ত্রণ। কারণ স‌ই এর প্রতিষ্ঠা দিবস ও কবি রাধারাণী দেবীর জন্মদিন। সব মিলিয়ে আমাদের বেশ অন্যরকমের পাওয়া ।   
সমগ্র অনুষ্ঠাটির সুচারু এবং দৃষ্টিনন্দন পরিবেশনার দায়িত্ত্বে থাকা সব স‌ইরা হলেন স‌ইয়ের সেক্রেটারি গার্গী রায়চৌধুরী, ওয়েব এডিটর, চৈতালি চট্টোপাধ্যায়, যশোধরা রায়চৌধুরী, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং দেবলীনা ত্রিপাঠী । এছাড়াও বাকী স‌ইদের জন্য অঢেল কৃতজ্ঞতা জানাই যারা ছাড়া অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ হতনা। তাদের মধ্যে আছেন সাহিত্যিক কণা বসু মিশ্র, চুমকী চট্টোপাধ্যায়, রূপা মজুমদার, সুস্মেলী দত্ত, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, জয়া চৌধুরী, কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়, পৃথা বল, সুতপা  বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্যোত্স্না কর্মকার, বনানী দাস চক্রবর্তী, দীপাণ্বিতা রায়, কৃষ্ণা রায় প্রমুখ সই সকল  ।