১ জুলাই, ২০১৩

স্মৃতিরূপেণ-১


মামারবাড়ি দক্ষিণেশ্বরে মায়ের ডেলিভারি পেন উঠেছিল ।  তখন পৌষমাসের ঠান্ডায় মা নাকি দাপুটে ব্যাথায় ঘেমে নেয়ে সারা । পাড়াপড়শীর মতে ছেলে হওয়াটাই স্বাভাবিক । তবুও ছেলে হতে হতে মেয়ে । কি কুলুক্ষুণে জানিনা!

যাইহোক, উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারের নার্সিংহোমে ঘুমবিছানার বেবিকটে  প্রথম আলো দেখা... প্রথম কান্নার সাথে হাতেখড়ি ।

সকলে মা'কে বলেছিল "প্রথম মেয়ে সন্তান হোলো"?

মা বলেছিল  "কেন? আমার বন্ধু হবে, রুটি বেলে দেবে, আর আমরা সিনেমা যাব একসাথে "

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মা বঙ্কিমের "ইন্দিরা" পড়েছিলেন  । সেই থেকে ঐ নামের ওপর ভালোলাগা ।

তবুও ১৯৬৫ সালেও নাক সিঁটকোনো ভাবসাব বাড়ির সকলের । বাবা  কিন্তু সিস্টারদের বখশিস দিয়েছিলেন "মেয়ে" হবার খবরটা জানানোর জন্য ।

দিদা বলেছিল "আমাদের বাড়ির মত রং পেলনা"

মা বলেছিল "হীরের আংটি, আবার বেঁকা !  যেমন তেমন মেয়ে বিয়োবো, বয়সকালে গুণ দেখাবো"

কি গুণ যে মা দেখালেন জানিনা তবে আমার গ্রুমিংটা সম্পূর্ণ মায়ের জন্য সম্ভব হয়েছিল । আড়িয়াদহে গঙ্গার তীরে বাবাদের ভাগের বাড়িতে এসেছিলাম মুখেভাতের সময় । পাশে পুকুর, পেছনে ঘন সিংহি বন আর পুরোণো বাড়ির ফাটল থেকে উঁকিঝুঁকি দেওয়া তেঁতুলে বিছে । বাবা জমি কিনে বাড়ি করলেন  কিছুদূরে আলমবাজারে ।  বাড়িতেই আমার পড়াশোনা শুরু হল মায়ের কাছে । আর রোজ দুপুরে, রাতে শোয়ার আগে গল্প পড়ে শোনানো শুরু মায়ের । বাবা বলত যুদ্ধের গল্প, পশুপাখীর গল্প । মা পড়ে শোনাত রুশ দেশের উপকথা, উপেন্দ্রকিশোরের মহাভারতের গল্প । নিজে নিজে পড়তে শুরু করলাম কিছুপরে । পাঁচবছরের জন্মদিনে দাদু উপহার দিলেন "আবোলতাবোল" ।  বাবা দিলেন পুতুল । 

সুকুমার-সাহিত্য মজ্জাগত হতে হতে হাতে এল "ছোটদের বুক অফ নলেজ" । সে ব‌ই আমার চেয়েও ভারী । সেই ব‌ইকে বালিশে রেখে আমি বসতাম খাটে আর উল্টে যেতাম পাতাগুলো । হঠাত সেই পাতা উল্টোতে গিয়ে এসে পড়ল ইস্কুলবেলা । সাথে গানভাসি হল কৈশোর । 

স্কুলে ভর্তির আগেই মোটামুটি দ্বিতীয়শ্রেণীর পাঠ কমপ্লিট । মুখে মুখে আর লিখে লিখে । মফস্বলের নাম করা মেয়েদের স্কুল বরানগর রাজকুমারী বালিকা বিদ্যালয়ে সেই ভর্তি হওয়া পাঁচবছরে ক্লাস টু'তে । পুরোণো কোলকতার মেয়েদের স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম । প্রথম চালু হয়েছিল বিজ্ঞান শাখা । আর ছিল কেতাদুরস্ত ল্যাবরেটারি । লাইব্রেরীতেও ছিল বিশাল ব‌ইয়ের সম্ভার । ছিল খেলার মাঠ । একটা প্রকান্ড চেরী গাছ আর তার পাশে লিলিপুল । মাঠের একদিকে ছোটমোট গ্রিণ হাউস । অনামা সব ফুলেল ক্যাকটাস থাকত সেই গ্রিণহাউসে। স্কুলের দুটো গেট । একটা কেবল সকালে খুলত প্রাথমিক সেকশানের জন্য আর দুপুরে খুলত দুটোই  । দুই গেটের মাথায় জুঁইফুলগাছের আর্চ আর দুই গেট পেরিয়ে স্কুল অফিসে ঢোকার মুখে দুপাশে গোলাপের কেয়ারি । কি সুন্দর পরিবেশ !  রাজকুমারীদেবীরা ক্রিশ্চান ছিলেন ।   স্কুলের মধ্যে ছিল একটা সেমেটারি ।  সেমেটারীতে বসে টিফিন খেতাম আমরা ।

স্কুলের বাতাবরণ রবীন্দ্রগানে উদ্বুদ্ধ করেছিল । প্রতিবছর স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান আর বর্ষাশেষে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে রবীন্দ্রচর্চা অব্যাহত ছিল বারোটা বছর ।

বাড়িতে হত ক্লাসিক্যাল গানের চর্চা । জ্যাঠামশাই ছিলেন বেতারশিল্পী, তারাপদ চক্রবর্তীর ছাত্র । মায়ের কাছে কীর্তনে নাড়া বেঁধে নেওয়া খুব ছোট বয়সে । মা ছিলেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ছাত্রী ।

গ্রীষ্মের   ছুটির পরেই  বৃক্ষরোপণ উত্সবের তোড়জোড়  । দস্তুর মত রিহার্সাল কমন রুমে । বনমহোত্সবের একটা স্ক্রিপট বছর বছর হয়ে আসছে । একটু রদ বদল করে কয়েকটা গান এদিক ওদিক করে নৃত্যনাট্য দাঁড় করানো হয়। সবুজ গাছ লাগানো হয় । খুব উত্সাহে মেয়েরা নাচ গান প্র্যাকটিস করে প্রতিবছর । অনুষ্ঠান শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের গান 'আয় আমাদের অঙ্গনে, অতিথিবালক তরুদল ' দিয়ে আর শেষ হয় 'মরুবিজয়ের কেতন ওড়াও, এ শূন্যে ওড়াও ওড়াও হে প্রবল প্রাণ' দিয়ে ।   প্রথম দৃশ্যে একদল মেয়ে নেচে নেচে মঞ্চে এসে প্রবেশ করে আর শেষ দৃশ্যে তারাই আবার প্রত্যেকে হাতে একটা করে সবুজ চারা গাছ নিয়ে  মঞ্চ থেকে নেমে এসে খোলা স্কুল মাঠের ধার দিয়ে নেচে নেচে চলে । গাইতে থাকে বাকি সকলে যারা এতক্ষণ ধরে গান পরিবেশন করছিল । নাচের মেয়েদের মেঘ রংয়ের শাড়ি আর সবুজ উড়নি মাথায় । গানের মেয়েরা কচিকলাপাতা রঙের শাড়ি আর মেঘ নীল ব্লাউজে । আগে থেকে স্কুলের মালি যেখানে যেখানে নতুন গাছ পোঁতা হবে তার জন্য মাটি খুঁড়ে নির্দ্দিষ্ট ব্যাবধানে গর্ত করে রাখে । নাচের মেয়েরা  নাচ করতে করতে একে একে  গাছগুলি সেইখানে রেখে দেয় আর গানের মেয়েরা জলঝারি দিয়ে জল দান করে সেই নতুন গাছের চারায় ।  এভাবেই হয়ে আসছে বছরের পর বছর ।