২৩ জুলাই, ২০১৩

বেথুন জার্নাল (২)


মার বেথুন কলেজ নিয়ে সবচেয়ে সুখের স্মৃতি হল ফড়িয়াপুকুরের টাউন স্কুলের পাশে স্যারের বাড়িতে সপ্তাহে একদিন করে পড়তে যাওয়াকে ঘিরে । আমরা বেথুনের সাত-আটজন প্রতি শনিবার কলেজ ছুটির পর হাঁটতে হাঁটতে হেদো থেকে বিধান সরণী হয়ে পৌঁছাতাম টাউন স্কুলের সামনে । আমাদের পথ-গল্পের মুচমুচে গসিপ আর রূপবাণী সিনেমা হলের উল্টোদিকের ভুজিয়াওয়ালার কুড়মুড়ে সাড়ে বত্রিশভাজা চলত মুঠো থেকে মুঠোর পরে । অনার্সের পড়ার চাপে আর কলেজ যাতায়াতের ক্লান্তি যেন শনিবারের নিয়মিত পথচলায় এক দমকা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আনত । আমাদের স্যার মানে প্রোফেসার বিবেক চ্যাটার্জি তখন জয়পুরিয়া কলেজের কেমিষ্ট্রির অধ্যাপক । নিঃসন্তান বিবেকবাবু ও ওনার স্ত্রী (আমাদের কাকীমা) যেন আমাদের সকলের পরিবারের দু'জন হয়ে উঠেছিলেন । জীবনের ভালোলাগা, মন্দলাগা, সাহিত্যচর্চা থেকে সিনেমা রিভিউ, পিকনিক যাওয়া থেকে হর্টিকালচারে সদলবলে ফ্লাওয়ার শো সবকিছুর সঙ্গী ছিলেন এই দুজন মানুষ । আমরা পড়তে যেতাম ইনর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রি বা বাংলায় যাকে বলে অজৈব রসায়ন । স্যারের ঐটি স্পেশ্যালাইজেশান । কলেজের সবচেয়ে বোরিং ক্লাসগুলো বিবেকস্যারের কৃপায় যেন সবথেকে ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠত । ওই বিষয়গুলো পড়তে ইচ্চে করত না যতক্সণ না স্যার বুঝিয়ে দিতেন গল্পের মত করে আর কোথা থেকে কতটুকুনি পড়তে হবে বলে দিতেন । বিশাল সিলেবাসের মধ্যে স্যারের পরামর্শ পেলে পড়তে আনন্দ হত । স্যার বলতেন " যে খাতা বা নিজের তৈরী করা নোটটা থেকে পড়তে শুরু করবে সেই নোটটাই পরীক্ষার শেষ দিন অবধি দেখে যাবে তবে মনে গেঁথে থাকবে ।
আমরা দলবেঁধে গল্প করতে করতে যেতাম স্যারের বাড়ি । কোনো কোনো দিন যেতে যেতে খিদে পেয়ে যেত খুব । টাউন স্কুলের নীচেই একটা মাদ্রাজী দোকানে অথেন্টিক দোসা পাওয়া যেত । দোসা খেতাম হৈ হৈ করে । তারপর শ্যামপুকুর স্ট্রীট দিয়ে স্যারের বাড়ি পৌঁছে আবার কাকীমর হাতের আচার অথবা পড়ানোর ব্রেকে স্যারের আনানো কচুরী-আলুরদম । বৃষ্টি পড়লেই আমাদের বরাদ্দ ছিল মোড়ের মাথার বিখ্যাত একটা দোকানের তেলেভাজা-মুড়ি । সেদিন আর পড়া হত না । ভূতের গল্প শুনতে বসতাম । কাকীমাও যোগ দিতেন আমাদের আসরে । এইভাবে চলত আমাদের কেমিষ্ট্রি টিউশান আর ফাঁকে ফাঁকে আমাদের অনাবিল আনন্দের মূহুর্তেরা ।
ইনর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রির বোরিং লেকচারগুলো অনায়াস মনসিঁড়ি বেয়ে গেঁথে যেত মাথায় । বিবেকস্যারের অপত্যস্নেহে আর বৈচিত্রে সেই বোরিং লেকচারগুলো যেন ভালোলাগায় পরিণত হত । একটু পড়া একটু গান অথবা একটু খাওয়াদাওয়ার অনুষঙ্গ যে রেগুলার পড়াশোনায় কতটা জরুরী সেটা উপলব্ধি করেছিলাম কলেজে পড়াকালীন ।
১৯৮৫ এ ইন্দিরা গান্ধী যখন নিহত হলেন সারা কলকাতা জুড়ে কি অবস্থা । পথরোখো, বাস বন্ধ । আমাদের ফিজিক্স প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষা ছিল । মনে আছে বাস টবিন রোড অবধি গিয়ে বলল আর যাবেনা । পরীক্ষা দিতে হবে বলে পায়ে হেঁটে টবিন রোড থেকে বিডন স্ট্রীট পৌঁছেছিলাম । ফেরার সময় শিয়ালদহ অবধি হেঁটে তারপর লোকাল ট্রেনে দক্ষিণেশ্বর ফিরে মনে হয়েছিল রাজ্য জয় করেছি । মনে মনে একদিকে যেমন পায়ে ব্যথার জন্য এ শহরকে কটাক্ষ করেছি আবার বাসের বিকল্প ট্রেনের সান্নিধ্যে এসে মনে হয়েছিল কি সুন্দর এই শহরের যাতায়াতের নেটওয়ার্ক ।
আরেকবার ৫ই জুন ১৯৮৪ । কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ট ওয়ান শুরু । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পরীক্ষা । সংস্কৃত কলেজে সিট পড়েছিল আমাদের । ৪ঠা জুন থেকে অবিরাম বর্ষণে শহর কলকাতা বিপর্যস্ত । আমাদের মফঃস্বলও জলমগ্ন ।
সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বেরুলাম । একটি ৩২ নম্বর বাস শ্যামবাজার পাঁচমাথা মোড়ে নামিয়ে দিল । বিধানসরণীতে হাঁটু জল । সেন্ট্রাল এভিনিউ আর সার্কুলার রোডও তথৈবচ । একটি টানা রিক্সা ৫০টাকায় কলেজ স্ট্রীট পোঁছে দিতে রাজী হল । বাবার সাথে রিক্সায় চড়ে বসলাম । রিক্সার পাদানীতে থৈ থৈ জল । তখন না আছে সেলফোন না আছে ইন্টারনেট । এমন বন্যা কবলিত হয়ে আশা করেছিলাম অন্তত সংবাদের মাধ্যমে পরীক্ষা বন্ধের আদেশ দেবেন কর্তৃপক্ষ । কিন্তু সেখানে পৌঁছে অগণিত ছাত্রছাত্রী পরিবেষ্টিত আমি... কিছুটা ধিক্কার দিয়েছিলাম এ শহরকে । দশটা থেকে বারোটা বেজে গেল কিন্তু কোনো খবর এলনা । প্রশ্নপত্র পৌঁছায়নি তখনো আর আমরা ব্‌ইপত্র উল্টে চলেছি । বারাসাত, বসিরহাট থেকে যারা এসেছে তারা তখন ফিরে যাবার তোড়জোড় করছে । অশনি সঙ্কেতের মত প্রশ্নপত্র হাজির হল । বলা হল বেলা দুটোয় পরীক্ষা শুরু হবে । আমরা সেই না খাওয়া দাওয়া স্টেজে ম্লান মুখে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে দেখি কোনো বিজলীবাতি নেই । অতিবৃষ্টিতে ইলেকট্রিক কেবল জলের নীচে । মোমের আলোয় জীবনের প্রথম এবং কঠিন অনার্সের পরীক্ষা দিতে দিতে সোজা প্রশ্নের উত্তর গুলোও মনে পড়ছিলনা ঠিকঠাক । এভাবে চার ঘন্টা পার করে বাইরে এলাম । বাড়ি ফেরা হল আমার সেই বন্ধু মল্লিকার গাড়িতে ; ফিরে এসে দূরাদর্শনের সংবাদে ঘোষণা হল সেদিনের পরীক্ষা বাতিলের কথা । এত কাঠখড় পোড়ানো সেই পরীক্ষা বাতিলের খবরে খুব রাগ হয়েছিল এ শহরের ওপর আর পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের ওপর । এমন নাম করা বিশ্ববিদ্যালয় ! তার কি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ! আমারো তখন ভোটাধিকারের বয়স । আমিও তো এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এক জনমত । কিন্তু এ কি হাল আমার শহরের !
কলকাতার নামকরা মিষ্টি কেসিদাসের বাড়ির মেয়ে মল্লিকার বাড়িতে আমাদের ছিল নিত্যি আনাগোনা । বাগবাজারের নবীন ময়রার বিখ্যাত সেই বাড়িটা ছিল আমাদের নিজের বাড়ির মত । কতবার যে ওর সাথে আমরা ঐ বাড়িতে গেছি তার ঠিক নেই । মল্লিকা খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল । ও বেশি কথা বলত না কিন্তু বলত তোরা বলে যা আমি শুনে মন্তব্য করব । কলেজ ছুটি থাকলে মল্লিকার সাথে আমার চলত পত্র বিনিময় । আমার লেখার ভীষণ ভক্ত ছিল সে । আমাকে সমানে মল্লিকা বলত "তুই কিন্তু লেখাটা চালিয়ে যা" আমি কোনো গুরুত্ব দিতামনা । মল্লিকার বাবা-মায়ের ২৫ বছরের বিয়ের তারিখে আমাকে কবিতা লিখতে বলেছিল । কুড়িবছরের সেই আমি ছাই তখন বিয়ের কি বুঝি !
যাইহোক লিখে ফেললাম একখানা। সেটা আবার ছাপিয়ে অতিথিদের হাতে হাতে বিলি করা হয়েছিল । আমার কাছে সেটা বিশেষ পাওনা । ওদের বাড়িতে যাওয়া মানেই এক থালা নানা রকম মিষ্টি ও নোনতা সহযোগে জলযোগ । কলেজজীবনের আনন্দটা আরেক কাঠি বেড়ে যেত সেই আতিথেয়তায় । তারপর মল্লিকা বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে মাস্টারস করল বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে আর আমি গেলাম পিওর কেমিস্ট্রি পড়তে রাজাবাজারে ।

কোন মন্তব্য নেই: