৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বটতলার উপন্যাস বলতে কী বোঝায় ?

আজ আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা ‘বটতলা সাহিত্য’ বলতে ঠিক কী বোঝায়। এই বটতলা টা কোথায়? বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ক্রমবিবর্তন ধারায় বটতলার প্রকাশন ও সাহিত্য কে কিন্তু মোটেও ভুলে যাওয়ার নয়।  উত্তর কলকাতার শোভাবাজার-চিৎপুর এলাকার এক বিশাল বটগাছকে কেন্দ্র করে এই নামের উৎপত্তি। উনিশ শতকের বাংলার মুদ্রণ ও প্রকাশনাশিল্প এখানেই শুরু হয়েছিল। এই বটগাছ এবং তাঁকে কেন্দ্র করে তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্প গড়ে উঠেছিল তা মূলত কম শিক্ষিত আর অত্যন্ত সাধারণ মানের পাঠকের চাহিদা মেটাতে। বটতলার ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে সুকুমার সেন তাঁর ‘বটতলার বই’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন—

“সেকালে অর্থাৎ আজ থেকে দেড়শ বছরেরও বেশি কাল আগে শোভাবাজার কালাখানা অঞ্চলে একটা বড় বনস্পতি ছিল। সেই বটগাছের শানবাঁধানো তলায় তখনকার পুরবাসীদের অনেক কাজ চলত। বসে বিশ্রাম নেওয়া হত। আড্ডা দেওয়া হত। গানবাজনা হত। বইয়ের পসরাও বসত। অনুমান হয় এই বই ছিল বিশ্বনাথ দেবের ছাপা, ইনিই বটতলা অঞ্চলে এবং সেকালের উত্তর কলকাতায় প্রথম ছাপাখানা খুলেছিলেন, বহুকাল পর্যন্ত এই ‘বান্ধা বটতলা’ উত্তর কলকাতায় পুস্তক প্রকাশকদের ঠিকানা চালু ছিল... ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ছোট সস্তার প্রেস গড়ে ওঠে। এগুলির চৌহদ্দি ছিল দক্ষিণে বিডন স্ট্রিট ও নিমতলা ঘাট স্ট্রিট, পশ্চিমে স্ট্র্যান্ড রোড, উত্তরে শ্যামবাজার স্ট্রিট এবং পূর্বে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট”।

বাংলা ছাপাখানার আঁতুড় ঘর যদি হয় হুগলির শ্রীরামপুর, তবে তার যৌবনের উপবন বটতলা।  সে যুগে এই বটতলার প্রকাশন সংস্থা সমূহ সত্যি সত্যি সস্তার বই ছেপে বের করে ফিরিওয়ালা মারফত পাঠকের হাতে তুলে দিত।শুধু বাংলাভাষার প্রসার আর পাঠকমনের ক্ষুধা মেটাতে। উত্তর কলকাতার নিমু গোস্বামী লেন এবং আহিরিটোলার জংশনে এক প্রকাণ্ড বটগাছ ছিল। তার নীচেই এই বটতলা প্রকাশনার জন্ম। বিশ্বনাথ দেব, বাণেশ্বর ঘোষ ছিলেন এর রূপকার। এভাবেই আমাদের কলকাতা যাবতীয় জ্ঞানজনিত কর্ম কাণ্ডের সাক্ষী তথা বইপোকা বাঙালির জ্ঞানার্জনের পীঠস্থান হয়ে দাঁড়ায়। 

বটতলার আশেপাশের অলিগলি ‘বটতলা’ এবং এসব অঞ্চল থেকে প্রকাশিত বইপত্র ‘বটতলার পুঁথি’ নামে পরিচিত। সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পুঁথি, পাঁচালি, পঞ্জিকা, পুরাণ, লোককাহিনি, ধর্মগ্রন্থ, দেবদেবীর পূজা পদ্ধতি, আয়ুর্বেদ, গার্হস্থ্য স্বাস্থ্য, সচিত্র রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি এখান থেকে প্রকাশিত হত। বটতলার লেখক ও প্রকাশকেরা বৈষয়িক লাভের কথা চিন্তা করেই শুধু পুরাণকাহিনি, লোককাহিনি, পাঁচালি এবং পত্রিকা প্রকাশ করতেন। কারণ, সাধারণ পাঠকের কাছে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা ছিল। 

কিন্তু ১৮৫০-এর দশক থেকে মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে এর গুরুত্ব কমতে থাকে। জ্ঞানবিজ্ঞান এবং উন্নতরুচির গ্রন্থসমূহ এই অঞ্চলের ছাপাখানার বাইরে থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। 

আদৌ কি অতখানি অবজ্ঞার যোগ্য বটতলার সাহিত্য? বোধ হয় না। এখনও বহুলোকের মনে ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, এখান থেকে শুধুই ষড়রিপুর উসকানিমূলক বই ছাপা হত। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যে না হলেও অনেকাংশেই ভুল ধারণা। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যেমন এরকম বই অনেক বেরিয়েছিল, তার থেকে কিন্তু অনেক বেশি সংখ্যায় প্রকাশিত হত সাধারণ মানুষের ব্যবহারিক জীবনের চাহিদাকে মাথায় রেখে লেখা বইগুলি। তৎকালীন বঙ্গজীবনের তৃণমূল স্তরের মানুষের চাওয়া-পাওয়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেছিল বটতলার সাহিত্যে। শুধুমাত্র সাহিত্যচর্চা বললে ভুল হবে, সাধারণ এবং সামান্য শিক্ষিত মানুষদের সাংসারিক ও সামাজিক চাহিদা পূরণ করত এই বটতলার বইগুলি।

আবার লাভের কথা চিন্তা করে বটতলার বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হতে থাকে এমন কিছু বই যার মূল উপজীব্য শহরের বহু নামী পরিবার কিংবা সমাজপতিদের পরিবারের কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির কথা। কারও-কারও মতে, ‘কেচ্ছার বই’ মানেই নাকি ‘বটতলা সাহিত্য’। বটতলায় ছাপা পঞ্জিকা সেই আমলে কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় ঝাঁকায় করে বিক্রি করত ফেরিওয়ালারা। আর সেই পঞ্জিকার ফাঁকেই অন্তঃপুরে ঢুকে পড়ে তখনকার নানা কেচ্ছা কাহিনি। এই কারণে তৎকালীন প্রগতিশীল সমাজ বটতলার প্রকাশনা সংস্থাকে উচ্চাঙ্গ সাহিত্যের মর্যাদা দেয়নি। 

বাংলায় পঞ্চাননের হরফ তো ছিল কিন্তু বইয়ের মধ্যে চিত্র সংযোজন এবং নানারকম অলংকরণ বটতলারই অবদান। ইউরোপের কাঠখোদাই ও প্রস্তরখোদাই প্রযুক্তির অনুকরণে চিত্র সংযোজনের মাধ্যমে বটতলার মুদ্রাকররা গ্রন্থের গুণাগুণ বৃদ্ধি করতেন, যা আগে এ দেশে কারও জানা ছিল না। দেবদেবীর এবং অন্যান্য পৌরাণিক ছবি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করত। 

বিশেষ করে তৎকালীন সমাজের বেশ কিছু কেচ্ছাকাহিনির রগরগে উপস্থাপন করে বটতলার কিছু প্রকাশনা সংস্থা যেভাবে লক্ষ্মীলাভে তৎপর হয়ে উঠেছিল, তাতে বটতলার বইমাত্রেই ‘নিম্নরুচির বই’ ভাবতে শুরু করে সচেতন বঙ্গসমাজ। সামগ্রিকভাবে প্রগতিশীল সমাজের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্যতা আর মান দুইই হারিয়ে ফেলে বটতলার প্রকাশনা কেন্দ্রগুলো এবং কালেকালে নিম্নমানের সাহিত্যের সমার্থক হিসেবে ‘বটতলা’ রীতিমতো প্রবাদে পরিণত হয়। তাই বটতলা নিছক কেচ্ছা-প্রকাশক নয়, সে আদতে এই বাংলারই এক ঐতিহ্য।



কোন মন্তব্য নেই: