১৪ নভেম্বর, ২০১১

ভাগিরথীর উত্স সন্ধানে



উত্তরকাশী থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লাম গঙ্গোত্রীর পথে ।  ভাগিরথীর তীর ঘেঁষে চলতে লাগলাম অজস্র মন্দিরময় শহরতলীকে ফেলে ।

সামনে এল ভেড়ার পাল । অগণিত মেষ শাবক গড্ডলিকা প্রবাহে পাহাড় থেকে নেমে আসছে সমতলে । কারণ সেইদিনই এই পথ বন্ধ হয়ে যাবে । দীপাবলী অবধি তীর্থ যাত্রা হয় তারপর শুরু হয় প্রবল তুষারপাত ফলে রাস্তা বন্ধ থাকে । যাই হোক সেই মেষ শাবকের দল আপাততঃ মাস ছয়েকের জন্য সমতলে ঘরকন্না করতে আসছে । সেই জ্যামে পড়লাম কিছুক্ষণ ।
প্রথমে নদীর সমতলে কিছুটা চলার পর আবার উঁচুতে উঠতে শুরু করল আমাদের গাড়ি ।বীভত্স সরু পাহাড়ের চড়াই পথ । উল্টোদিক থেকে একটা বাস বা গাড়ি এসে গেলে আমাদের গাড়িকে সামলে নিতে হচ্ছিল বারবার । অতি সন্তর্পণে পিছু হটে সামনের গাড়িকে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে আবার চলা ।  ১৯৯১ সালে ভয়ানক ভূমিকম্পের ফলে উত্তরকাশী জেলার রাস্তাঘাট খুব ভয়ানক হয়ে রয়েছে ।  তবে ভাল গাড়ি ও অভিজ্ঞ চালক থাকলে তেমন কিছু ভয় নেই ।

পথে পড়তে লাগল অজস্র ল্যান্ডস্লাইড । বড় বড় পাথরের চাঙড় এখনো ঝুলে রয়েছে পাহাড়ের গা ঘেঁষে । আর ধ্বসের কারণে রাস্তাগুলির আকৃতি হয়েছে ভয়ানক । যেন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে রয়েছে !

নীল আকাশের গায়ে  বরফের টুপি পরা হিমালয়ের চূড়ো । সামনে ঘন সবুজ পাহাড়, স্তরে স্তরে সাজানো । সম্ভবতঃ ঐ বরফচূড়োই গোমুখ গ্লেসিয়ার ।
গঙ্গনানী পড়ল । সেখানে একটি গরম জলের কুন্ড আছে । সালফার হট স্প্রিং আর কি ! জলে পা ডুবিয়ে খানিক বসে তুঙ্গনাথের ক্লান্তি কমল কিছুটা;  ফুটন্ত প্রায় জল । কি অপূর্ব সৃষ্টি । বাইরে কি ঠান্ডা আর জলটা কি ভীষণ গরম । স্থানীয় নাম “গর্মকুন্ড”  ।

এবার আবার দেখা গেল ভাগিরথীকে এক ঝলক । পথে ভাগিরথীর ওপর মানেরী ড্যাম আরো সুন্দর করে তুলেছে স্থানটিকে ।  কিছুটা সমতলের মত আর
কিছুদূরে পাহাড়ের ওপর শৈল শহর হর্ষিল   ( উত্তরকাশী থেকে ৭৩কিমি দূরে) । হর্ষিল বিখ্যাত সুমিষ্ট আপেলের জন্যে ।

এবার এক চমত্কার দৃশ্য চোখে পড়ল ।
দুটি পাহাড়ের মধ্যে তৈরী হয়েছে গর্জ আর সেই গর্জ দিয়ে ফেনার মত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে ভাগিরথীর স্রোত ।

এবার এল ভৈরোঘাঁটি বা প্রাচীন এক শিব মন্দির সেখানে রয়েছেন আনন্দ ভৈরবনাথ,  মা গঙ্গাকে পাহারা দিচ্ছেন । সেখানেই লেখা রয়েছে “ওয়েলকাম টু গঙ্গোত্রী” । মহাদেব এখানে মা গঙ্গার দ্বারী বা সিকিউরিটি গার্ড ।  ততক্ষণে সেই বরফের চূড়ার বেশ কাছে এসে গেছি ।

গঙ্গোত্রীর কাছাকাছি এসে মা গঙ্গাকে দেখবার জন্য আকুলি বিকুলি প্রাণ  আমাদের । সেদিন কালীপুজো আর দীপাবলী ।
উত্তরদিকে ঘন সবুজ দুইপাহাড়ের মাঝখানে বরফঢাকা গোমুখ । ভাগিরথীর নেমেছে সেখান থেকে ।

আমার ভূগোল ব‌ইয়ের খোলাপাতা তখন চোখের সামনে
বরফ গলা জলের তাপমাত্রা শূণ্য ডিগ্রীর কম বৈ তো বেশি নয় । ভাবছি বসে নামব কেমন করে জলে ! জলে পা দিয়ে মনে হল শরীরের নীচের দিকটা অবশ হয়ে গেছে । এদিকে কালীপুজোর দিন এসে তিনবার ডুব না দিলে পুণ্যি হবেনা । খুব দোটানায় মন !

অন্য জন ততক্ষণে জলে নেমেই বলে ভিডিও তোলো, জলের এমন গর্জন আর শুনতে পাবেনা ….

স্নান সেরে মা গঙ্গার  তীরে বসে পুজো আর আরতি সারলাম । তারপর আসল মন্দিরে গিয়ে আবার পুজো । দেওয়ালী বলে খুব সাজিয়েছিল ফুল দিয়ে । তবে সেদিন মন্দির বন্ধ হয়ে যাবে বলে তীর্থযাত্রীর ভীড় নেই বললেই চলে । কিছু লোকাল মানুষজন এসেছিলেন পুজো দিতে আর দু চার জন দূর থেকে, আমাদের মত ।

ভাগিরথীর ব্রিজের ওপরে মন্দিরে পুজো দেবার পর
এবার যুদ্ধজয়ের আনন্দ নিয়ে প্রাক্‌গঙ্গা বিজয়ের দ্বিপ্রহর , অবাঙালী ফুড জয়েন্টে । আগুন গরম তন্দুরী রুটি, ডাল ও পনীর । সেই মূহুর্তে খিদেও চরম…..

৩টি মন্তব্য:

manjusree বলেছেন...

একেই বলে টান... হিমালয়ের টান। লোভে-লোভে ফের হাজির হয়েছি দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে। কি যে ভাল লাগল... কি সুন্দর ছবি... আমি মুগ্ধ।

Ushnish Ghosh বলেছেন...

Dear Indira
Ek din er jonno Algiers eshe prothom kaj chhilo Visa extend tar par ei page khola...Net is also behaving well here...Kal abar sei morubhumi..
Ekhon Mon shanti , chhobi dekhe ar lekha PoD-e..Gangotri Jaoa hoeni..janina Maa'r dak asbe kab-e..Tab-e as-be ami jani
Bhalo theko

indira mukerjee (ইন্দিরা মুখার্জি) বলেছেন...

মঞ্জুশ্রী সোনারতরীর প্রতি তোমার টান, হিমালয়ের প্রতি টান দেখে খুশি হলাম ।
উষ্ণীষদা,এবার এলজেরিয়ার ডায়রী চাই কিন্তু প্যাপিরাসের পরবর্তী সণ্খ্যার জন্য । অল্প কথায় হলেও লিখতে শুরু করে দিন । টাইপ করিয়ে নেব আমি । আর আপনি বাংলায় লিখতে পারলে তো হয়েই গেল ! সাথে এলজেরিয়ান ফ্রেঞ্চ ঘেঁষা রেসিপি ।