৩১ ডিসেম্বর, ২০১৩

লাষ্টপোষ্ট ২০১৩


একটু অন্যরকম বর্ষবিদায় । একটু আনমনা বর্ষবরণ । কিছুটা খামখেয়ালীপনায় আর কিছুটা উত্তেজনায় অবগাহন । বড়দিনের পরেপরেই এসেছি বোলপুরের এক নিরিবিলি শহর প্রান্তিকে। যার সোনালী রোদ্দুরে পিঠ পুড়িয়ে দুপুর ভাসানো যায় , ভোরের মিঠে রোদের ঠান্ডায় ভিজে ওঠে গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন আর যার উষ্ণতা মেখে হেঁটে আসা যায় কোপাইয়ের ধার, ক্যানালের পাড় । খোয়াই হাটের অস্তরাগের শীতল গোধূলিতে  নক্সীকাঁথা যেখানে কথা হয়ে ওঠে আর গোয়ালপাড়ার ভোর হয় খেজুররসের হাঁড়িতে । শ্যামবাটির বাজার সকাল ঝলমলে হয় বিকিকিনিতে । সরগরম হয়ে ওঠে চিতল-পাবদা-পার্শ্বে আর সুরুল-পুকুরের চিংড়িতে । ভুবনডাঙা সবুজ হয়ে যায় চাষীদের পসরায় । পৌষমেলায় যায় আমবাঙালী। আমি যাই নিরিবিলিতে। আর গ্রামের মেঠো পথের গন্ধ নিতে । ঘর থেকে দু-পা ফেলে কত কিছু বাকী এখনো সেই ভেবে মরে যাই ।


গতকাল গেছিলাম প্রান্তিক থেকে বেরিয়ে ইলামবাজার, পানাগড়, দুর্গাপুর, রাণীগঞ্জ, আসানসোল, ডিসেরগড় হয়ে দামোদর পেরিয়ে নেতুরিয়া ব্লকে ঢুকে পাঞ্চেত পাহাড়ের গায়ে গড়পঞ্চকোট । ভোরের গোলাপী কুয়াশা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম ইলামবাজারের সোনাঝুরি এভিনিউর মধ্যে দিয়ে । ১২১ কিমি চলার পর সরবড়ি মোড় এল । সেখান থেকে বাঁকামোড়, জুলিমার্গ, তিলতোড় আর সামনেই পাঞ্চেত জলাধার । পুরুলিয়া জেলার মধ্যে তখন রঘুনাথপুর বনাঞ্চলে বনবিভাগ দফতরের  ইকোট্যুরিজম সেন্টারের মধ্যে পুছতাছ করা হল গড়পঞ্চকোট নিয়ে । সরকারী সাহায্য পাওয়া তো দূরের কথা তাঁরা বেশ ধান্দা করলেন কিভাবে গাড়ি প্রবেশ করিয়ে পয়সা আদায় করা যায় । অগত্যা হাঁটা দেওয়া উল্টোপথে । বনের মধ্য দিয়ে অরণ্য অভিযান করতে করতে । দারিদ্র্য লুটেপুটে খাচ্ছে অরণ্য । বাঘমারা জুনিয়ার হাইস্কুলের পর গোবাগ মোড় পড়ল । বিশাল এক পুকুরের পাশ দিয়ে দেখা গেল গড়পঞ্চকোট হাইস্কুলের পাঁচিল । সেই রাস্তা ধরেই গেলাম স্থানীয় মানুষকে জিগেস করতে করতে গড় দেখতে । গ্রামের মেঠো পথ। দুধারে মরাই ভরা ধান উঠেছে সবেমাত্র। আর গোয়াল ভরা গরুও আছে তাদের কিন্তু তবুও দারিদ্র্য, এখনো দারিদ্র্য । আজ তাদের পৌষপার্বণ হবার কথা। নবান্নে মুখরিত হবার কথা । কিন্তু স্থানকালপাত্রভেদে বাংলা আজো এমনটাই রয়ে গেল ! ২০১৩'র শেষদিনে ওদের জন্য একটু প্রার্থনা করলাম মনে মনে । 

 দারুণ অভিজ্ঞতা হল । পাহাড়ের ওপর প্রায় ঘন্টাখানেক ট্রেকিং হল। ইংরেজরা বলত পানচেট। সেই থেকে পাঁচেট বা আমাদের পাঞ্চেত। তবে এই নামের উত্সমূলে পঞ্চকোট পাহাড়। পুরাণের শেখর পর্বত। পাহাড়টির পাঁচটি চূড়াবিশিষ্ট বলে এই নাম। নিঃসন্দেহে শীতভ্রমণের জন্য আদর্শ শাল-মহুয়া-পলাশ-আকাশমণির জঙ্গল পরিবেষ্টিত এই অঞ্চল। পঞ্চকোট বংশের প্রতিষ্ঠাতা দামোদর শেখর। রাজারা এসেছিলেন সুদূর পশ্চিমের মাউন্ট আবু থেকে। এরা ছিলেন প্রখরবংশীয়। এই রাজবংশের এক রাজা কল্যাণ শেখর নাকি বাংলার রাজা বল্লান সেনের কন্যা সাধনাকে বিয়ে করে যৌতুকস্বরূপ পান সেনবংশের কুলদেবী শ্যামরূপা। এই দেবী‌ই নাকি কল্যানেশ্বরী। পাঞ্চেত পাহাড়ের কাছেই এই কল্যাণেশ্বরীর মন্দিরটি। গড়পঞ্চকোট এলাকার সব মন্দির কালাপাহাড়ের অত্যাচারে ধ্বংস হয়।  পাহাড়ের মাথায় নদীর ঝোরা আর অতি প্রাচীন রঘুনাথজীর  মন্দির । আর নীচে  প্রবেশদ্বার, রাজার প্রাসাদ, রাণীদের মহল, আরো মন্দির...সব মিলিয়ে যার নাম গড়পঞ্চকোট । জুতো খুলে এখনো ভগ্ন মন্দিরে মানুষ পা রাখে । পাথরের মন্দির । প্রবেশদ্বারেই দুয়ারবাঁধ তোরণ, পোড়াইঁটের পঞ্চরত্ন মন্দির রাসমন্দির, রাণিমহল সবকিছুই ছিল  একসময়। তবে এখন বেশীটাই ধ্বংসাবশেষ।  মধ্যে লক্ষ্মী নারায়ণের খোদাই করা পায়ের ছাপ আর মূল মন্দিরে যেখানে আগে রঘুনাথ অর্থাত রামচন্দ্রের বিগ্রহ ছিল সেখানে চামচিকের আবর্জনাময় । কিন্তু মন্দিরের ভেতরে মাথার দিকে তাকালে অবশিষ্ট কারুকার্য এখনো লক্ষ্য করা যায় । দূর থেকে দেখা যায় পাহাড়ের মাথায় ওয়াচ টাওয়ার । দুই ভাই শেখরচন্দ্র আর আখরচন্দ্র ছিলেন এখানকার রাজা । সম্ভবতঃ বর্গি আক্রমণে নষ্ট হয়ে গেছে গড়পঞ্চকোট ও সন্নিহিত মন্দিরগুলি । দুটি গ্রামের ছেলে হল আমাদের গাইড। ঘুরে ঘুরে পাহাড়ের এমাথা থেকে ওমাথা সব দেখালো। তন্ময় কৈবর্ত আর রামু বাউরী দুই বন্ধু । প্রথম জন স্কুলে যায় । অন্যজন যায়না। মাঠে গরু চরায় । ট্যুরিষ্ট সিজনে ওরা গাইডগিরি করে । তন্ময়ের শখ বড় হয়ে পড়াশুনো করে গাইড হবার । আর রামুর শখ দেবের মত হিরো হবার । দেবের সব সিনেমা তার ঠোঁটস্থ । দারুণ হেল্পফুল ছেলেদুটো ।  আমার বছর শেষ হল ওদের মঙ্গলকামনা করে। 


আজ বছরের শেষদিনে গেলাম আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রপতির গ্রাম কীর্ণাহারে । অদূরেই চন্ডীদাসের বাসভূমিখ্যাত নানুর গ্রাম  । প্রান্তিক থেকে মাত্র ঘন্টাখানেকের রাস্তা । কীর্ণাহারে রাস্তার ওপর "ফাইকাস" নামে এক ইকো রেসর্টে বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে লস্যি খাওয়া হল । এদের নিজস্ব ডেয়ারীর দুধের দৈ থেকে তৈরী লস্যিটি অতীব সুস্বাদু । বিশাল পুকুর সামনে। বক মাছ ধরে খাচ্ছে । বনের মধ্যে অসংখ্য ফলের গাছ, ফুলের গাছ। টাটকা সবজী কেনা হল । 


কোন মন্তব্য নেই: