৯ নভেম্বর, ২০১০

"মেঘ-মেল"

আটলান্টার পুজো ম্যাগাজিন "অঞ্জলি"২০১০ এ প্রকাশিত রম্য রচনা

মেঘ-মেল
গল্পের নায়ক যীশু একজন বিরহী যক্ষ । সে সফট্‌ওয়ার কনসালটেন্ট। বছরের মধ্যে তিনভাগ থাকে দেশের বাইরে আর একভাগ থাকে তার হোমটাউন আলিপুরের অলকাপুরীতে। সবেমাত্র বিয়ে করেছে অনন্যাকে। বিয়ের পর প্রথম বর্ষা অনন্যাকে ছাড়া যীশু ভাবতে পারছে না, তাই মেঘের উদ্দেশ্যে তার এই মেল লেখা।
পূর্বমেঘ
"মেঘ", এবারের বরষা আমার জীবনে অভিশাপ । আমি জানিনা তোমার এবারের গতিপথ, জানিনা তোমার ট্রাভেল-আইটিনারি। কোলকাতায় "মেঘমৌসুমী" তুমি হাজির হওয়া মাত্রই আমায় সঙ্কেত দিও। আলিপুরের অলকাপুরীতে আমার প্রিয়া অনন্যা অপেক্ষমানা। সে আমার শোকে কাতর কিনা জানিনা তবে আমি তার বিরহে বড় কষ্টে আছি। তাকে বোলো গিয়ে একটিবার, যে সকল প্রোষিতভর্তৃকারাই এরূপে আছে, তাদের সকলের স্বামীও শীঘ্র ফিরবে । সে যেন মন খারাপ না করে।"মেঘ", উদাসী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমিবায়ুর আনুকুল্যে ভেসে চলেছ তুমি ; পথে শুনবে দলে দলে চাতকের সুখ শ্রাব্য বর্ষা মঙ্গল, নববর্ষার আগমনী বার্তা তুমি ঘোষণা করবে তোমার গুরু গুরু গর্জন দিয়ে। উত্সুক রাজহংসেরা নবকিশলয়ের মত গ্র্রীবা উঁচিয়ে তোমাকে অভিবাদন করবে। শোন মেঘ, আমার প্রিয়াকে অভিবাদন কোরো তোমার শিলাবৃষ্টি দিয়ে, মুছিয়ে দিও তার উষ্ণ অশ্রুবিন্দু আর তাকে শুনিও আমাদের দুজনার সম্ভাব্য মিলনগান, রবিঠাকুরের গানই শুনিও পারলে, "এমন দিনে তারে বলা যায়" অথবা "আজি ঝরঝর মুখর বাদরদিনে" । শ্রান্ত হলে পাহাড়ের ঢালে পা ফেলে জিরিয়ে নিও, পিছলে পড়ে অন্যকোথাও চলে যেও না, তাহলেই কোলকাতায় পৌঁছান হবেনা তোমার । নদীর জল পান কোরোনা যেন জন্ডিস হতে পারে । মিনারাল ওয়াটার সাথে রেখ।গরমে বাইরের খাবারই তোমার খেতে হবে । হলদিয়া বন্দর হয়ে, ডায়মন্ডহারবারের দিক দিয়ে, রায়চকের রেসর্টে দুদন্ড জিরিয়ে নিও; তারপর দক্ষিণ কোলকাতার সাউথসিটিমলের মাথায় ধাক্কা না খেয়ে ভেতরে গিয়ে ফুডকোর্টে একটা ধোসা আর একটু হিমশীতল টকদৈ খেও | যদি পেটে জায়গা থাকে তবে আইসক্রিম খেতে পারো । যা খাবে সব কিছুই যাতে তোমায় ঠান্ডা রাখে দেখো। আমপান্না, লস্যি এজাতীয় পানীয়ই তোমার পক্ষে আদর্শ এখন । হাজরা পার্কে ফুচকা খেও খুব সুস্বাদু ! তবে দেখো যেন মিনারাল ওয়াটারে বানায় । দূষণ এখন কোলকাতার ভূষণ তাই চমকে উঠনা । নিজেকে বাঁচিয়ে রেখ একটু, শুকিয়ে যেও না যেন । উর্বর কোরো কৃষিভূমি আর কোলকাতায় মাত্রাতিরিক্ত জলবর্ষণ করোনা যেন, তাহলে অনন্যার মত সকল প্রোষিতভর্তৃকাদের জলমগ্ন হয়ে কালাতিবাহিত করতে হবে ।
উত্তরমেঘ
আলিপুরের প্রাসাদোপম অলকাপুরী এপার্টমেন্টের টপফ্লোরে আমার ফ্ল্যাট । দেখো গিয়ে অনন্যা বোধ হয় বাড়ি থাকেনা সব সময় । তবে কোনো একটা শপিংমলে তাকে তুমি পেয়ে যাবে নিশ্চয়‌ই । শোনো মেঘ, তুমি উড়ে গিয়ে দেখ একটিবার কোথায় আমার অনন্যা? কার কন্ঠলগ্না হয়ে কোন ক্লাবে বসে আছে নাকি বক্ষলগ্না হয়ে ডিস্কোথেকে, তন্ত্রে মন্ত্রে মেতে আছে ! আমার সাথে তার যোগাযোগ বিছিন্ন, মেলের উত্তর দিচ্ছেনা নেট খারাপ বোধ হয়, ট্যুইয়াটেরো বহুদিন ট্যুইট নেই, অর্কুটের আইডি ডিলিট করেছে, জি-টকেও আসে না আজকাল। সেল ফোনটা সব সময় ব্যস্ত তার |
কি জানি অনন্যা এখন বসে আছে যোগাসনে না জিমনেসিয়ামে ! নাকি কোনো বিউটিস্যালনে অথবা মায়া নাকি ছায়া সুশীতল কোনো ক্লিনিকে কুড়চি-কদম্ব-কেতকী প্রলম্বিত স্পা এর অবগাহনে অলকাপুরীর বেডরুমে তো সর্বদা শীর্ষাসনে থাকত সে, মেদশূন্যতার আশায় । যাবার সময় তার জন্য কিছু টাটকা কচি শশা অথবা অমৃততুম্বী এবং মেদনিবারক পাকা পেঁপে নিয়ে যেও অনন্যা আমার আর কিছুই খায়না সাথে সুশীতল বরফকুচি দিও তাকে, তার প্রসাধনে কাজে লাগবে তোমাকে এককপি ছবি এটাচ করে দিলাম এই মেলের সাথে যাতে আমার অনন্যাকে তুমি চিনতে পারো সহজেই । তার রূপের কথাতো তোমাকে বলিনি এখনো। একলহমায় দেখো মনে হবে অপরূপা, অসমান্যা, অতুলনীয়া ! সে চলনে বিপাশা বসু, বলনে বরখা দত্‌, ভূষণে সেনকো গোল্ড, বসনে মোনাপালি । চোখদুটোয় ল্যাকমে-কোহলের চিরায়ত ইশারা, তিলফুলের মত নাসারন্ধ্রে সানিয়ার ছোঁয়া, কর্ণপটহের উপর থেকে নীচ অবধি পাঁচটি ছিদ্রে পঞ্চরত্ন খচিত, ওষ্ঠাধারে ম্যাটফিনিশ!কেশরাজি ? কালো নয় বারগ্যান্ডি বর্ণের... এই ঠিক তোমার গায়ে পড়ন্ত সূর্যের আভা লাগলে যেমনটি হয় তেমনি।
ময়শ্চারাইসড নিটোল বাহুপেশী আর মণিবন্ধে ট্যাটু আঁকা তার, তুমি দেখলেই চিনতে পারবে। সুন্দর করে ম্যানিকিওর্ড হাতের অনামিকায় নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বলে হীরকের দ্যুতি আর সাথে এক্সপ্রেস মিউজিক, সুন্দর পেডিকিয়োর্ড পদযুগলের পাঁচজোড়া নখ, দুষ্প্রাপ্য নখরঞ্জনীর বিচিত্রতায় তোমার দিকে প্রকট ভাবে তাকিয়ে আছে । দেখা মাত্রই তুমি বলবে "দেহি পদপল্লবমুদারম্‌" । ভাইটাল স্টাটিস্টিকস্‌ ৩৬-২৪-৩৬ ! মিস কোলকাতা হতে পারতো !
মেঘ , তুমি দেখ, আমার বিদ্যুতলতার মত অনন্যা যেন আমাকে শুধু ভুলে না যায়। আমি কেবলই তার চকিত হরিণীর মত নয়নের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছি। তোমার ধারাবর্ষণে তাকে সিক্ত করে তুমি ফিরে এস আমার কাছে ।
ভলো থেকো মেঘ। আবার দেখা হবে আমাদের !
ইতি
আমার বাউল মন