১৯ জুলাই, ২০০৮

More ভাবনারে ..... তৃতীয় পর্ব

আসলে কলকাতার বাঙালীর গতরে শুঁয়োপোকা, ভাবনায় উইপোকা, এবং মানসিকতায় ঘুণপোকা । এরা কুরে কুরে সর্বক্ষণ বাঙালী কে খেয়ে ফেলছে। বাঙালীর কর্মে আলস্য, আলস্যের পরিণামে নিদ্রা , এবং সর্বোপরি নিদ্রায় আতিশয্য এদের শ্রম-বিমুখতার কারণ। এ জাতি ভাঙ্গতে জানে বেশী, গড়তে জানে কম।

এ শহরের লোকের মজ্জায় মজ্জায় মত্স্যের ঘ্রাণ, হাড়ে হাড়ে হাওয়া বদলের জন্য সদা ব্যাকুলিত প্রাণ, রক্তের প্রতিটি কণায় কণায় নৃত্য-গীত-বাদ্যানুরাগ | এদের চোখের চাহনিতে চপলতা, চলনে চঞ্চলতা , গমনে গতিহীনতা , ব্যাক্তিত্বে ছদ্ম-গাম্ভীর্য্য ,ভোজনে ভুঁড়ি-বিলাসিতা , আর মুখে তর্কের ফুলকি ও যুক্তির ভেলকি। বাঙালী দিনের বেলায় মাছ-ভাত খেয়ে ভুঁড়ি উঁচিয়ে যত ঘুম দিতে পারে সন্ধ্যাবেলায় মুড়ি-তেলেভাজা সহযোগে ততধিক আড্ডার আরাধনা করে। এ শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্ধ ভালবাসা, যার গন্ধে গন্ধে বিজাতীয় মানুষ এখানে ভীড় করে | মানুষের চৌম্বকীয় আবেশে মানুষকে বশ করে কাছে টানে। সস্তার এ শহরে একবার কেউ এসে ব্যবসা ফাঁদলে ধনী হয়,পস্তায় না | বাঙালী কেবল শাড়ি,স্বর্ণ এবং শর্করাজাত অর্থাত্ মিষ্টান্ন --এই তিনটির ব্যবসায় যুগে যুগে হাত পাকিয়েছে। অধুনা বাঙালী রমণীদের গতিশীলতায় কলকাতার বুকে বিউটিপারলার তো পিঠে শাড়ির বুটিক ,ও হাতে হোম্-ডেলিভারি |

শত-সহস্র তারকাখচিত এ শহরের আকাশ। যার রূপে সুচিত্রা রসে ভানু, বর্ণে সৌমিত্র কন্ঠে শানু | এ শহর আমাদের উপহার দিয়েছে সৌরভকে তেমনি হারিয়েছে নিজের গৌরবকে। এখানকার মানুষের শয়নে উত্তমকুমার,স্বপনে হেমন্তকুমার আর জাগরণে কিশোরকুমার। এ কলকাতাবাসীর ছন্দে তনুশ্রী-আনন্দ, সুরে শচীনকর্তা-কৃষ্ণচন্দ্র, সঙ্গীতে নজরুল-রবীন্দ্র, রসে রাজশেখর-সঞ্জীবচন্দ্র, সাহিত্যে বঙ্কিম-শরত্চন্দ্র, স্পর্শে সিনিয়র-জুনিয়র প্রদীপচন্দ্র, শিল্পকলায় যামিনী-গগনেন্দ্র ,স্বর্ণে পিসিচন্দ্র আর সর্বোপরি মিষ্টান্নে কে.সি.দাস কিংবা যাদবচন্দ্র.....এদের নিয়েই বাঙালী বহাল তবিয়তে কাল যাপন করছে। যুগ যুগ ধরে এ শহর তৈরি করেছে ব্রান্ডেড-ব্যাক্তিত্ব । যেমন অফুরান হাসিতে ঘনাদা, রহস্যে ফেলুদা, রোমাঞ্চে টেনিদা ইত্যাদি।

এখনকার বহুতলে বর্ণময় কলকাতার তালতলা , বেলতলা , নাকতলার সাথে যুক্ত হয়েছে হাইতোলা ও হিলতোলা এক কালচার। এ কলকাতার হাওয়ায় হাঁপানি হয়, জলে জন্ডিস হয়,এবং মশায় ম্যালেরিয়া হয়।আধুনিক কলিকাতার দার্শনিক মানুষের জলে এখন আর্সেনিক, নবনির্মিত নর্দমার মুখে প্ল্যাসটিক ,যা কিনা পরিবেশবিদের উদ্বেগের কারণ। মিষ্টান্নে মেটানিল-ইয়েলো এবং সরবতে এলিজারিন-রেড রসায়নবিদের গবেষণার বিষয়।

পথে যেতে যেতে কলকাতা কে দেখে একখানা পুরভর্তি মচ্ মচে পরোটা মনে হয় যার কোথাও যাদবপুর,কোথাও সেলিমপুর; কোথাও আলিপুর তো কোথাও চিত্পুর। কখোনো আবার আলমবাজার, বড়বাজার, বাগবাজার, শ্যামবাজার, নাগেরবাজার শুদ্ধ এ শহরকে মনে হয় বাস্তবিকই আমরা প্রত্যেকে বিগ্-বাজারের ব্যাপারী। যে শহরের আকাশে বাতাসে মাছের আঁশটে গন্ধ কেন তার কাছে অ-বাঙালীর ভীড়্? চিংড়িহাটায় জ্যাম নিয়ে ,তপসিয়ায় তৃণমূলীদের নিয়ে, ট্যাংরার চাইনিজ নিয়ে আমরা আজও আছি ও থাকবো। ভেতো বাঙালীর বাজারের থলি থেকে সজনেডাঁটা আর পুঁইশাক উঁকি দেবে। বাঙালীর পোস্তোচচ্চড়ি ছাড়া কড়াই এর ডাল রুচবে না , বাঙালী যুত করে মাছের কাঁটা চচ্চড়ি চিবোবে, বাঙালী মজা করে মৌরলার টক খাবে আর সরষের তেল ছাড়া ইলিশমাছ রাঁধবে না । এই নিয়ে তারা শন্তিতে থাক না.. ক্ষতি তো নেই। তাতে যদি অন্যের ক্ষতি না হয় ... রোজ সন্ধ্যায় তুলসীতলায় আলো দিয়ে রেডিও খুলে অনুরোধের আসরে প্রতিমার আরতি শুনুক .. ...অথবা বিকেলে ভোরের শুকনো ফুল ফেলে শাঁখ বাজিয়ে বাড়ির মঙ্গল কামনা করুক .... নৈশাহারের পরে দিলখুশের জন্যে মন উস্-খুস্ করবে, নতুন প্রজন্ম লোডশেডিং এ অঙ্ক কষে বিদেশ যাবে, বাংলা ব্যান্ডের ফাজলামি আর নেতাদের পাগলামি নিয়েই পড়ে থাকবো...ক্ষতি কি? শুধু দফ্তরের ডেস্কে বসে ঘুমোব না আর নিজের পায়ে কুড়ুল মারব না। তাহলেই আমাদের মোক্ষলাভ হবে। সৃজনশীল বঙ্গসন্তান বুদ্ধি বেচে বড় হবে, অদূর ভবিষ্যতে কোলকাতা হবে "The entertainment hub for the world" যেথায় আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সৃষ্টি সুখের উল্লাসে উদ্দাম নৃত্য-গীত-বাদ্যের সমন্বয়ে জগতের মনোরঞ্জন করে "কলযুগ্-কি-কলিউডের" আখ্যা পাবে। এখানেই তার সার্থকতা। তথ্য-সংস্কৃতি-শিল্পকলার সেরা পীঠস্থানে বঙ্গ সন্তানদের শর্মিলা-জয়া-রাণী-রিয়ার মতো কিংবা রাহুল-কিশোর-শান-শানুর মতো মুম্বাই পাড়ি দিতে হবে না।কলকাতার মানুষ দোল-দুর্গোত্সবে দক্ষযজ্ঞ নিয়ে, বামে-ডানে দলাদলি করে, নন্দনে সত্যজিতের বন্দনা, রবীন্দ্রসদনে রবির আরাধনা আর রবীন্দ্র সরোবরে প্রেমের উপাসনা নিয়ে যদি কোনো এক দিন জগতের আনন্দ-যজ্ঞে নিমন্ত্রণ পায় ......শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি -hypocrisy এবং corruption এই মানিকজোড় যেন আমাদের জীবন থেকে বিদায় নেয়। পুনরায় আমাদের কল্লোলিনী কোলকাতা যেন ভারতবর্ষের রাজধানী হবার যোগ্যতা অর্জন করে। উপর থেকে নেতাজি-নেহেরু-গান্ধীরা দিল্লির মসনদের ঘাড় ধরে কোলকাতায় নিয়ে আসার আদেশ দেন। এ তো যেকেনো সময়েই সম্ভব। মহম্মদ-বিন্-তুঘ্-লক্- আমাদের সেই রূপ শিক্ষা দিয়েছেন।

সবশেষে বলি, কলকাতার কালিমা ,কলুষতা ,কপটতা আলোকের ঝর্ণাধারায় ধুয়ে মুছে সাফ হোক। এই জনমেই ঘটাতে চাই--- জন্ম-জনমান্তর........ সুন্দর,হে সুন্দর!!

(সমাপ্ত)